গল্প-ছেঁড়া সুত্রের সন্ধানে- প্রবাহনীল দাস-বর্ষা ২০২৪

golpochhenrasurersandhane

রবিনের অ্যালার্মটা বাজতে শুরু করেছে কি করেনি, কী একটা পাখি এসে রবিনের কাচের জানালায় ঠকঠক করতে লাগল। তড়িঘড়ি করে উঠে বসল রবিন। অ্যালার্মটা বন্ধ করতে-করতেই তার চোখ চলে গেল জানালার দিকে। পাখিটা ভালো করে লক্ষ করে রবিন বুঝল, ওটা একটা বুলবুলি। শহরে তো এইসব পাখি দেখাই যায় না! রবিন মনে মনে ভাবল, সত্যি তো, সে গ্রামের বাড়িতে আছে বলেই না কত কিছু দেখতে পাচ্ছে! শহরে তো এসবের কোনও প্রশ্নই নেই। তবে রবিন তার স্কুলে শিখেছে, মানুষ নাকি আগে মাটির উপরেই থাকত। রবিন এই প্রথম তাদের গ্রামের বাড়িতে এল। রবিনের মিঠামা, অর্থাৎ রবিনের বাবার ঠাম্মা এর আগেও অনেকবার রবিনের বাবা-মাকে বলেছেন ওকে গ্রামে নিয়ে আসতে, কিন্তু রবিনের সময় কোথায়?

শহরের নিয়ম গ্রামের নিয়মের চাইতে একদম আলাদা। শহরবাসী সব বাচ্চাদেরকেই পড়তে হয় একই স্কুলে, থাকতেও হয় স্কুল চত্বরে। রবিন শুনেছে, আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে কোন এক বিধ্বংসী বিস্ফোরণের কারণে লন্ডন শহর পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়। পুরোপুরি না বুঝলেও রবিন এটুকু বুঝেছিল, সৌরশক্তি উৎপাদনকারী কোন এক কারখানায় প্রচণ্ড বিস্ফোরণ ঘটে। সেই থেকেই ধীরে ধীরে সারা পৃথিবী জুড়ে সব শহরই স্থাপন করা হয় ভূগর্ভে, আর তাঁর সমস্ত শক্তি আসে মাটির উপরের সৌরশক্তিকেন্দ্র থেকে। সারা দুনিয়ার বেশিরভাগ কর্মসংস্থান করে এই শক্তিকেন্দ্রগুলি। মাটির উপরে সেই কেন্দ্রে কাজ করতে যাওয়ার ট্রেনিং তাই নিতে হয় সবাইকেই। শহরের সব স্কুলেই তাই পনেরো বছর বয়স অবধি সবাইকেই দেওয়া হয় ট্রেনিং, যাতে অসুবিধেয় পড়লে সকলেই কাজ চালানোর মতো কাজটুকু পারে। তবুও ছাত্রছাত্রীরা চাইলে পনেরো বছর বয়সের পর সিলেবাসে ওই বিষয়টা নাও রাখতে পারে—এই স্বাধীনতাটুকু আছে। রবিনের অনেক সাধ, তাদের এই কৃত্রিম ছাদ ডিঙিয়ে সেও একদিন যাবে ভূপৃষ্ঠের উপরে, কিন্তু ওই জবরজং কারখানায় শক্তি উৎপাদন করার কোনও ইচ্ছাই তার নেই।

এ-বছরই পনেরোয় পা দিয়েছে রবিন। তাই নিজের পাঠ্য সে থেকে বাদ দিয়ে দিয়েছে তার এই অপছন্দের বিষয়টা। আর ঠিক সেই কারণেই, শক্তি-উৎপাদনের ছাত্ররা যখন পরীক্ষায় ব্যস্ত, রবিনের মতো যারা, তারা পেয়েছে একটা লম্বা ছুটি। নতুন বছরের ক্লাস শুরু হওয়ার আগে তাই যে-যার মতো মিলিত হয়েছে পরিবারের সঙ্গে।

রবিন বইয়ে পড়েছে, মানুষ যখন মাটির উপরে থাকত, তখন বসবাসের জন্য তাদের হাতে ছিল কেবল চার ভাগের এক ভাগ, আর বাদ বাকি শুধুই জলাশয়, মহাসাগর। তাও বিশ্ব উষ্ণায়নের জন্য ধীরে ধীরে বাড়ছিল জলের স্তর। তার উপর আবার পর্বত, মালভূমি—কত জায়গার অভাব! তারপর মানুষ যখন মাটির নীচে নেমে এল, তখন ঘুচে গেল দেশের কাঁটাতার। সমস্ত জায়গাটা জুড়েই থাকতে শুরু করল মানুষ। শক্তি আর জলের জোগান আসে মাটির উপর থেকে, আর খাবার তো তৈরি হয় কারখানায়। রবিন ইতিহাস আর ভূগোল পড়ে বুঝেছে, তাদের সভ্যতার মূল শহরগুলো সবই নিজস্ব নামাঙ্কিত আসল শহরগুলোর নীচে-নীচেই স্থাপিত। আর আগে যেগুলো ছিল মহাদেশ, সেগুলোর তলাতেই রয়েছে উন্নতমানের জীবন। সাগরতলের তলার জায়গাটা সেই তুলনায় অনেক কম উন্নত, এগুলোই ওদের সভ্যতার গ্রাম। তবে রবিনের গ্রামের বাড়িটা যেখানে, সেটার উপরটা অদূর অতীতে জলের তলায় থাকলেও সুদূর অতীতে ছিল জমি। রবিন মিঠামার কাছে শুনেছে, সেই গ্রামে থাকতেন মিঠামার দাদু; সেই গ্রামের নাম খেজুরি। খেজুর গুড়ের জন্য বিখ্যাত বলেই নাকি গ্রামের নাম ছিল ওইরকম।

রবিন এই প্রথম গ্রামের বাড়িতে এসেই খেজুর গাছ দেখেছে। রবিনের দাদু তাকে খেজুর গুড়ও খাইয়েছেন। তবে রবিন জানে, এই আনন্দ বেশিদিনের নয়। স্কুল খুললেই তাকে ফিরে যেতে হবে শহরে। শহরে না আছে গাছ, না কোনও পশুপাখি, না অন্য কোনও অপ্রয়োজনীয় জিনিস। কেবলমাত্র গ্রামের মানুষরাই নিজেদের অতীতকে ভালোবেসে কৃত্রিম উপায়ে এদের বাঁচিয়ে রেখেছে নিজেদের পরিবেশে। বুলবুলি পাখি বা খেজুর গাছ—কোনোটারই প্রয়োজন নাকি নেই এই সভ্যতায়। তাই এখনও যারা এই স্মৃতি আঁকড়ে বাঁচে, তাদের এলাকাগুলোই চিহ্নিত হয়ে গেছে গ্রাম হিসেবে। এসব ভেবেই খারাপ লাগে রবিনের।

গ্রামের বাড়িতে এসেই রবিন দখল করেছে চিলেকোঠার ঘরটা, কারণ তাদের সাহিত্য পাঠ্যে বার বার এই ‘চিলেকোঠা’-র উল্লেখ থাকলেও শহরে কারোর বাড়িতেই নেই এই দারুণ জিনিসটা। চিলেকোঠা থেকে ছাদে বেরিয়ে কৃত্রিম আকাশের দিকে তাকিয়ে রবিন ভাবে, পৃথিবীর সত্যি আকাশের আকার কেমন! তারা যে কৃত্রিম আকাশ দেখে, তা তো ভূপৃষ্ঠের উপরের সভ্যতার অতীত আকাশের প্রতিরূপ। এখন কি আর সেই নীলাকাশ আছে! নাকি বায়ুমণ্ডলের উপর মানুষের কারসাজিতে সেও নিজের রঙ হারিয়েছে?

চোখ-মুখ ধুয়ে নীচে নামল রবিন। খাওয়ার ঘরে ঢুকে দেখল, থমথমে মুখে বসে আছেন মিঠামা, দাদু, ঠাম্মি, বাবা ও মামা। টেবিলের অপর প্রান্তে গম্ভীর হয়ে বসে একজন অপিরিচিত মানুষ। কৌতূহলী হয়ে একটা চেয়ার টেনে বসে পড়ল রবিন। একটু ইতস্তত করে মিঠামা কিছু বলতে শুরু করার আগেই গলাখাঁকারি দিয়ে অপরিচিত লোকটি তার চেহারার সঙ্গে বেমানান এক মিষ্টি গলায় বলে উঠল, “সুপ্রভাত রবিন! আশা করি ভালো আছ। আমার নাম জিতেন্দ্র সান্যাল, ওরফে এজেন্ট জিতু।”

কথা শেষ করেই কেতাবি কায়দায় সামনের দিকে হাতটা বাড়িয়ে দিল লোকটি। ইশারায় মিঠামার অনুমতি নিয়ে রবিনও হাত মেলাল লোকটির সঙ্গে।

আর একবার গলাটা খাঁকরে নিয়ে এজেন্ট জিতু বলতে শুরু করল, “জানো তো রবিন, বহুদিন ধরেই বিজ্ঞানীরা খ্যাতনামা সব মানুষদের মনের একটা ছাপ, একটা ডিজিটাল প্রতিরূপ জমিয়ে রাখার চেষ্টা করেছে কম্পিউটারের মধ্যে। এই খ্যাতনামা মানুষদের মধ্যে সবাই যে বিখ্যাত তা কিন্তু নয়, নানা কুখ্যাত লোকের ‘মেমরি’ও যত্নসহকারে রাখা হয়েছে ভূপৃষ্ঠের উপর তৈরি বিরাট বিরাট মেমরির গুদাম ঘরে। এতদিন সেইসব মেমরি জমিয়ে রাখা থাকলেও, তা উদ্ধার করা বা আহরণ করা—কোনোটাই সম্ভব হচ্ছিল না। কিন্তু কয়েকদিন আগেই আমাদের বিজ্ঞানীরা এক এমন উপায় আবিষ্কার করেছেন যাতে জমিয়ে রাখা এই স্মৃতিগুলোর মর্মোদ্ধার করা যায়। যাদের মৃতদেহ থেকে মেমরিগুলো সংগ্রহ করা হয়েছিল, তাদের ডি.এন.এ-ও পরীক্ষার কাজে সংগ্রহ করা হয়েছিল। দেখা গেছে, সেই ডি.এন.এ-র সঙ্গে কোষে মিল আছে এমন কোনও মানুষকে যদি বিশেষ উপায় সেই স্মৃতির সংস্পর্শে আনা যায় তবে সে সমস্তটাই একটা সিনেমার মতো চোখের সামনে দেখতে পাবে। তারপর, তার বিবরণ থেকেই স্পষ্ট হয়ে যাবে কী ছিল সেই স্মৃতিতে। কিন্তু জানোই তো, বিজ্ঞান কখনও থেমে থাকতে শেখেনি। বিজ্ঞানীরা তাই নিজেদের সুবিধার্থে এমন ব্যবস্থা করেছেন যাতে স্মৃতিটি সেই নির্দিষ্ট মানুষটির মাধ্যমে উদ্ধার হলে তার মস্তিষ্ক থেকে যেন তার চোখের সামনে হলোগ্রামেও ভেসে ওঠে একই দৃশ্য। বিজ্ঞানীরা তো পরীক্ষা শেষেই খালাস, এরপরেই কাজ শুরু আমাদের। আমরা ডি.এন.এ ম্যাপ মিলিয়ে মিলিয়ে সেইসব মানুষদের খুঁজে বেড়াচ্ছি যাদের মাধ্যমে মেমোরিগুলো সঠিকভাবে উদ্ধার করা যায়। তুমিও তাদের মধ্যে অন্যতম। আশ্চর্যের ব্যাপার এই যে, অন্যান্য মেমোরিগুলির ক্ষেত্রে একাধিক মানুষের সঙ্গে ডি.এন.এ-র মিল পাওয়া গেলেও তোমারটার বেলায় তুমি একাই পারো কাজটা সফলভাবে বাস্তবায়িত করতে। তাই শহর থেকে খুঁজে খুঁজে এখানে এসে, তোমার বাড়ির লোককে রাজি করিয়ে, আমি তোমাকে ভূপৃষ্ঠের উপর নিয়ে যেতে এসেছি। কথা দিচ্ছি, স্মৃতি উদ্ধারের কাজ শেষ হওয়ামাত্র আমি নিজে এসে তোমাকে এখানে ফিরিয়ে দিয়ে যাব।”

রবিন করুণ চোখে সবার দিকে তাকাল। এতক্ষণে মিঠামা মুখ খোলার সুযোগ পেলেন। কাঁদো কাঁদো গলায় তিনি বললেন, “জিতু, অনেক ভরসা করে তোমার সঙ্গে রবিনকে ছাড়ছি। ওর যেন কোনও ক্ষতি না হয় তা কিন্তু তোমাকেই দেখতে হবে। এই প্রথম রবিন ভূপৃষ্ঠের উপর যাচ্ছে, কথাটা মাথায় রেখো কিন্তু।”

এজেন্ট জিতু ঝটপট উঠে পড়ল। মাথায় টুপি চাপিয়ে রবিনকে বলল, “চলো। আর একদণ্ড দেরি করার সময় নেই।”

ঘুম থেকে উঠে এমনিতেই ধাতস্থ হতে সময় লাগে। তার উপর এই আকস্মিক ঘটনাপ্রবাহে রবিন কেমন যেন থম মেরে গিয়েছিল। এতক্ষণে সামলে উঠে তাড়াতাড়ি এজেন্ট জিতুর সঙ্গে রওনা হল সে।

যে-গাড়িটায় এজেন্ট জিতুর সঙ্গে চেপে বসল রবিন, সেটাকে বেশ কয়েকবার শহরে উড়তে দেখেছে সে, তবে সাধারণের ব্যবহারের জন্য যে সেটা নয় সেটা রবিন ভালোই বুঝত। গাড়িটার একটা অসাধারণ ক্ষমতা হল মাধ্যাকর্ষণের উলটোদিকে কোনও জ্বালানি ব্যবহার না করেই স্রেফ পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্রের সাহায্যে সেটি আউটার আর্থ টানেলের মধ্যে দিয়ে ভূপৃষ্ঠের উপর উঠে যায়। গাড়িটা ওদের গ্রামের বাড়ি থেকে টেক-অফ করে হুশ করে গ্রামের সীমানা ছাড়িয়ে চলে এল ফাঁকা জায়গার উপর। তারপর আচমকা কৃত্রিম আকাশের একটা নির্দিষ্ট জায়গা দিয়ে ঢুকে গেল একট আউটার আর্থ টানের মধ্যে। চোখের নিমেষে রবিন আর এজেন্ট জিতু উঠে এল ভূপৃষ্ঠের উপর। রবিন যে-গাড়িটায় বসে ছিল, সেটা বাইরে থেকে দেখতে সাধারণ গাড়ির মতো হলেও ভিতর থেকে পুরোপুরি স্বচ্ছ। তাই ভূপৃষ্ঠের উপর উঠে আসার সঙ্গে সঙ্গে রবিন ঘাড় তুলে তাকাল উপরের দিকে। না, আকাশ তাকে আশাহত করল না। রবিন দেখল, তাদের সভ্যতার ছাদ জুড়ে রয়েছে যে কৃত্রিম আকাশ, তার চেয়ে ভূপৃষ্ঠের আকাশ আদতে ঢের বেশি সুন্দর। তবে এটা বুঝতে তার এতটুকু দেরি হল না যে তাঁদের কৃত্রিম আকাশও তৈরি এই আসল আকাশের আদলেই। তবে সবচেয়ে বেশি যেটা রবিনের চোখ টানল, সেটা হল মেঘ—মানুষের হাতের কারসাজি থেকে মুক্ত, আপন খেয়ালে আকাশপথে ভ্রমণ করা পেঁজা তুলোর মতো মেঘ। রবিনের ইচ্ছা হল পাক খেয়ে একবার নেচে নিতে, কিন্তু তার কোন উপায় নেই। অগত্যা রবিন চলতে লাগল সেই অদ্ভুতদর্শন গাড়িতে চেপে।

অল্পক্ষণের মধ্যেই এজেন্ট জিতুর সঙ্গে ওদের বেস-ক্যাম্পে এসে পৌঁছল রবিন। দূর থেকে দেখে একটা একবিংশ শতকের ভাঙা বাড়ি মনে হলেও কাছে আসতেই রবিন বুঝতে পারল খানিকটা ইচ্ছা করেই ওইরকম আকার দেওয়া হয়েছে বাড়িটিকে।

গাড়ি থেকে নেমে পায়ে পায়ে এজেন্ট জিতুর পিছন পিছন বেস-ক্যাম্পের মধ্যে ঢুকল রবিন। কিছুক্ষণের মধ্যেই একদল কালো স্যুট পরা লোকজন এসে ঘিরে ফেলল ওদের দুজনকে। ভিড়ের মধ্যে এজেন্ট জিতুকে হারিয়ে ফেলল রবিন। কীসের যেন একটা স্রোত তাকে ঠেলে নিয়ে চলল একটা নির্দিষ্ট ঘরের দিকে। আচমকা খুব ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছিল চারদিক। সংজ্ঞা যেন হারিয়ে যেতে লাগল রবিনের। যখন জ্ঞান ফিরল, তখন রবিন দেখল, একটা অদ্ভুত চেয়ারের উপর আধশোয়া হয়ে বসে আছে সে। তার হাত-পাগুলো দৃশ্যমান কিছুর সঙ্গে বাঁধা না থাকলেও সেগুলো নাড়ানো তো দূর, হাতে পায়ে কোনও সারই পাচ্ছে না রবিন। একটা অদ্ভুত লালচে নীলাভ আলো ছেয়ে রয়েছে সারা ঘরটাকে, কিন্তু সেই আলোর উৎস যে রবিন খুঁজে পাচ্ছে না তা নয়, বরং কোনও দৃশ্যমান উৎস থেকেই যে সেটা আসতে পারে এমনটাও অসম্ভব লাগতে শুরু করল রবিনের।

হঠাৎ রবিন দেখতে পেল, পুরোনো যুগের ডাক্তারদের মতো পোশাক পরা একজন হাতে একটা পাইপ এবং একটা কর্ড নিয়ে এগিয়ে আসছে তার দিকে। রবিন এতক্ষণে বুঝতে পারল যে তার মাথায় পরানো রয়েছে একটা ওলটানো বাটির মতো জিনিস। কর্ডটা তার সঙ্গে জুড়ে দিয়ে কর্ডের অপর প্রান্ত একটা গোলাকার চকচকে বস্তুর মধ্যে ঢুকিয়ে দিল লোকটি। তারপর গোলাকার জিনিসটির পিছন দিকে পাইপটা লাগিয়ে জুড়ে দিল একটা তরল সলিউশনের ট্যাংকের সঙ্গে। তারপর আর কিছু মনে নেই রবিনের।

অনেকক্ষণ পর (অন্তত রবিনের তাই মনে হল) রবিন জেগে উঠল একটা অন্ধকার কারখানার মতো জায়গার মধ্যে। আশেপাশে তাকিয়ে রবিন দেখল, প্রচুর লোক দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে এদিক ওদিক ছুটে বেড়াচ্ছে। কালো ধোঁয়ায় ছেয়ে রয়েছে সমস্ত জায়গাটা। কারখানার ছাদের কাছে একটা বারান্দার মতো জায়গায় দুজন লোক হাত-পা নেড়ে কিছু বলছে। ভাবভঙ্গি দেখে মনে হল তাদের কথা কাটাকাটি হয়েছে। আশেপাশে কী হচ্ছে সেদিকে ভ্রূক্ষেপ করার সময় ব্যয় করল না রবিন। চারদিকে চোখ চালিয়ে একটা লিফট চোখে পড়ল রবিনের। তাড়াতাড়ি সেটায় চড়ে বারান্দাটার কাছে গিয়ে পৌঁছল রবিন। সেই লোক দুটোকে এখন আরও কাছ থেকে দেখতে পাচ্ছিল রবিন। এতক্ষণে দুজনার মুখ স্পষ্ট দেখতে পেল রবিন, যদিও সে চিনতে পারল না কাউকেই। আর এগোনোর সাহস না করে সেখানেই দাঁড়িয়ে কান খাড়া করে রবিন শুনতে লাগল রহস্যজনক এই দুই ব্যক্তির কথোপকথন।

“সব জায়গায় শুধু লাভ আর ক্ষতির হিসাব করলেই চলে না অমিতাক্ষ। সমাজের ভালোর জন্য এক-এক সময় নিজের ভালোটাকে দূরে সরিয়ে রাখতে হয়।”

গর্জে উঠল অমিতাক্ষ, “রাখো তোমার সমাজের ভালো। জানো কত টাকা আসে আমার এই শক্তিকেন্দ্র থেকে? ব্যাবসার কী বোঝো তুমি? সরকার যা নিয়ম তৈরি করবে, তাতেই যদি আমাদের মতো ব্যবসায়ীরা নাচা শুরু করে, তাহলে দেশের অর্থনীতি তো তলানিতে গিয়ে ঠেকবে!”

প্রথমজন নিজের চেষ্টা অক্ষুণ্ণ রেখে আবারও বোঝানোর চেষ্টা করতে গেলেন—“আরে মানুষ না বাঁচলে কীসের অর্থনীতি? এই কথাটাও কি তোমার মাথায় ঢুকছে না?”

অমিতাক্ষ পা টিপে টিপে পিছোতে শুরু করেছে। এবার তার হাত এগিয়ে গেল একটা মস্ত সুইচ বোর্ডের দিকে। কাটা-কাটাভাবে সে বলল, “দেখো সুরেশ, যদি আমার এই ব্যাবসায় আমার কোনও লাভই না হয় তাহলে আমি এই ব্যাবসা রেখে কী করব? তার চেয়ে বরং কারখানারটাকেই ধ্বংস করে ফেলা যাক। হ্যাঁ, মানছি। হ্যাঁ, আমি মানছি যে পঞ্চাশ বছর আগে বিজ্ঞানীরা সৌরশক্তি ব্যবহারের যে উপায় আমাদের দেখিয়েছিলেন, তাতে সমগ্র মানবজাতির উপকার হয়েছিল নিঃসন্দেহে, কিন্তু সমগ্র মানবজাতির উপকারে তো আর পুঁজিবাদীদের পেটের ভাত জোটে না। আমার বাবাই প্রথম এগিয়ে এসেছিলেন এই কাজে সাহায্য করার জন্য, আজ এর সমাপ্তি না-হয় আমার হাতেই ঘটুক!”

সুরেশ ব্যাকুল হয়ে উঠে বলল, “কিন্তু এতে তোমারই-বা কী লাভ? তুমি এই কাজ করলে তো এখানে উপস্থিত সবাই মারা পড়ব! তোমারও তো একই পরিণতি ঘটবে।”

অট্টহাস্য করে উঠল অমিতাক্ষ।—“পরিণতির ভয় দেখাচ্ছ? আমি চাই আমার ভালো কাজ যদি সমাজের উপর ছাপ রেখে যেতে পারে, খারাপ কাজেরও একই পরিণতি ঘটুক।”

কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই একটা প্রচণ্ড শব্দের সঙ্গে সুইচ বোর্ডের সবচেয়ে বড়ো লিভারটা টেনে নীচে নামিয়ে ফেলল অমিতাক্ষ। চারদিকে প্রচণ্ড বিস্ফোরণের রব উঠল, চোখে অন্ধকার দেখল রবিন।

যখন আবার জ্ঞান ফিরল রবিনের, তখন সে নিজেকে খুঁজে পেল খোলা আকাশের নীচে। আকাশের গা বেয়ে হামাগুড়ি দেওয়া মেঘগুলো দেখে রবিন বুঝতে পারল, তখনও সে রয়েছে ভূপৃষ্ঠের উপরেই। ঘাড় ঘোরাতেই রবিন দেখল, এজেন্ট জিতু সস্নেহে মাথায় হাত বোলাচ্ছে তার। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাতেই এজেন্ট জিতু বলে উঠল, “থাক, তোমার প্রশ্ন করার কোনও প্রয়োজন নেই। তুমি এখন চুপচাপ শুয়ে বিশ্রাম করো এবং মন দিয়ে আমার কথাগুলো শোনো।

“আজ থেকে একশো বছর আগে, একবিংশ শতকের শুরুর দিকে শক্তির অভাব, দূষণের আধিক্য এবং বসবাসের স্থানের অভাব দেখা দিতে শুরু করে। বসবাসের স্থানের অভাব সেই মুহূর্তে দূর করা না গেলেও অন্য দুটি সমস্যার সমাধানের কাজ সহজ করতে অগ্রসর হন বিজ্ঞানীরা। দূষণের মূল কারণ শক্তি উৎপাদন কেন্দ্রগুলোই। অগত্যা শক্তি উৎপাদনকে প্রতিস্থাপন করতেই বিজ্ঞানীরা সফলভাবে এক এমন উপায় বার করলেন যাতে সৌরশক্তি দিয়েই মানবজাতির সমস্ত শক্তির চাহিদা পূরণ করা যায়। পরীক্ষামূলকভাবে যন্ত্র তৈরি হলেও এর ব্যাপক ব্যবহারের জন্য প্রয়োজন ছিল কারখানার। সেই সময়ের কিছু পুঁজিবাদীদের সাধু উদ্যোগের ফলেই সম্ভব হয়েছিল এই উপায়ের বাস্তবায়ন। কিন্তু তার কয়েক বছর পর তৎকালীন বিশ্বসংস্থাগুলি ঠিক করে, এই কারখানাগুলি অধিগ্রহণ করবে সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রীয় সরকারগুলি। অন্যান্য জায়গায় সেরকম সমস্যা তৈরি না হলেও ইংল্যান্ডের কারখানাটিতে মনোমালিন্য দেখা দিতে শুরু করে। লন্ডনের কারখানার মালিক এই সিদ্ধান্তে প্রচণ্ড বিরক্ত এবং ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন এবং প্রায় দুম করেই সেই শক্তি উৎপাদন কেন্দ্র থেকে জায়গায় জায়গায় বিদ্যুৎ পৌঁছানো বন্ধ হয়ে যায়। এরপর আচমকাই একদিন সেই কারখানায় একটি প্রচণ্ড বিস্ফোরণ ঘটে এবং তার পরের ইতিহাস তো তোমরা পাঠ্যবই থেকেই পড়েছ। এই বিস্ফোরণের পিছনে কারণ আন্দাজ করতে পারলেও কোনও প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছিল না। এই রহস্যের একটামাত্র ছেঁড়া সুতোর ফলে বিশ্বের ইতিহাসে যেন এক মস্ত ফাটল দেখা দিচ্ছিল। আচমকাই কারখানার এক কর্মীর সঙ্গে তোমার সেলের ডি.এন.এ-র বেশ স্পষ্ট এবং একমাত্র নিকটতম মিল পাওয়া যায়। তোমার সাহায্যেই আজ এই রহস্যের সমাধান হল। শুধুমাত্র তোমার মস্তিষ্কের অশেষ ক্ষমতার জন্য আজ থেকে পঞ্চাশ ও একশো বছর আগের দুটি ঘটনাস্রোত একই সুতোয় বাঁধা গেল আজ। ভেবে দেখো তো, একশো বছর আগেও যদি তারও একশো বছর আগের কোনও মানুষ বেঁচে থাকতেন, তিনি কী প্রতিক্রিয়া দিতেন এই অদ্ভুত ঘটনাপ্রবাহের? কবি সাহিত্যিক হলে আবার আলাদা কথা। হয়তো লিখতেন—

‘নড়িয়া উঠিবে সমাজের ভিত

লাভ ও ক্ষতির সুক্ষ্ম ঝড়ে,

বদলিয়া যাবে মানচিত্রই,

আজি হতে শত বর্ষ পরে।’

“না অনেক হল, তোমার ছোট্ট মাথায় আর চাপ দেওয়া উচিত হবে না। চলো, তোমাকে ছেড়ে আসি।”

তখনও ঘোর কাটেনি রবিনের। টলমল পায়ে আবার সেই গাড়িতে উঠে বসল সে। ভূপৃষ্ঠের উপরের জগৎটাকে প্রাণভরে দেখে নিয়ে সমুদ্রের মাঝের একটা আউটার আর্থ টানেলের মধ্যে প্রবেশ করল রবিন। এজেন্ট জিতু ফিসফিস করে তাকে বলল, “জানো তো রবিন, যে সাগরের মধ্যে দিয়ে আমরা নীচে এলাম, সেখানেই ছিল খেজুরি, তোমার মিঠামার দেশ বাড়ি।”

রবিনের মুখে একটা হাসি ফুটে উঠল।

***

প্রচণ্ড ক্লান্তিতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিল, টের পায়নি রবিন। চোখ খুলতে দেখল, গাড়ি এসে নেমেছে গ্রামের বাড়ির উঠোনে। ঘর থেকে উদ্বিগ্ন মুখে বেরিয়ে এলেন সবাই। মিঠামা এগিয়ে আসতেই এজেন্ট জিতু ঝুঁকে অভিবাদন করল তাঁকে। তারপর খুলে বলল সব ঘটনা। গর্বে মিঠামার ভেজা চোখ আর হাসিমুখ আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল। দাদু আর ঠাম্মা ততক্ষণে এসে জড়িয়ে ধরেছেন রবিনকে।

এজেন্ট জিতু আবার টুপি খুলে সবাইকে অভিবাদন জানিয়ে উঠে পড়ল গাড়িতে। রবিনকে উদ্দেশ করে বলল, “আবার কখনও ভূপৃষ্ঠের উপর দেখা হবে। তবে এর মধ্যে যদি খেজুরির কোনও মানুষের মেমরি উদ্ধার হয়, তোমাকে অবশ্যই খবর পাঠানো হবে, মনে রেখো কিন্তু!”

মুহূর্তের মধ্যে তার গাড়ি আকাশে উঠে মিলিয়ে গেল দূরে। আনন্দে, গর্বে ঝলমল করতে লাগল মিঠামার শাড়ির আঁচল থেকে উঁকি দেওয়া রবিনের মুখ।

ছবি- মৌসুমী

জয়ঢাকের সমস্ত গল্প ও উপন্যাস

Leave a Reply