
মণিপুর, ২০১৮ সাল
অক্টোবরের শেষ সপ্তাহ। চুড়াচন্দ্রপুর জেলার একটা বাড়িতে, ভোরবেলা গৃহকর্তা উঠে যা দেখলেন, তাতে তাঁর চক্ষু চড়কগাছ! তার বাড়িতে পোষা হাঁস, মুরগি, ছাগল – মরে পড়ে আছে। এরকম যদিওবা খুব একটা আশ্চর্যের বিষয় নয়। মাঝে মাঝে রাস্তার কুকুর বা বুনো জন্তু রাতের অন্ধকারে গৃহস্থ বাড়িতে হানা দিয়ে পোষা হাঁস-মুরগি নিয়ে পালায়। কিন্তু, এইবার যেটা ঘটল সেটা সত্যিই আশ্চর্যের বিষয়। মৃত পশু-পাখিগুলোকে দেখে মনে হচ্ছে – কেউ যেন কোনো অতিপ্রাকৃতিক কায়দায় হতভাগা প্রাণীগুলোর শরীর থেকে সমস্ত রক্ত চুষে নিয়ে গেছে। অথচ, মৃত প্রাণীগুলোর শরীরে একটা আঁচড়ের দাগ পর্যন্ত নেই। শিকারী কোথা থেকে যে রক্ত বের করে নিয়ে, নিথর দেহগুলোকে ফেলে রেখে গেল – তা কিছুতেই ভেবে পাওয়া যাচ্ছে না। তবে কি এটা কোনো মানুষের কাজ! ইঞ্জেকশন দিয়ে কি এটা করা যেতে পারে! কিন্তু… মানুষ হলে শিকারগুলো ফেলে রেখে কেন চলে যাবে! দিব্যি তো বাড়িতে নিয়ে গিয়ে মাংস খেতে পারত!
একমাসের মধ্যে কাকচিং সহ মণিপুরের আরও পাঁচটি জেলায় একই ঘটনা ঘটল। হাঁস, মুরগি, গরু, ছাগল, এমনকি কুকুরও বাদ গেল না। দৃশ্যপট সবক্ষেত্রেই প্রায় এক। নিহত প্রাণীদের শরীর থেকে খুব সন্তর্পণে সমস্ত রক্ত বের করে নেওয়া হয়েছে, অথচ আঘাতের কোনোরকম চিহ্ন নেই!
ডিসেম্বরের প্রথম দিনেই পূর্ব ইম্ফলের একটা অঞ্চলে, রাত্রিবেলা এক মহিলার উপর আক্রমণ হয়। এই প্রথমবার কোনো মানুষের উপর আক্রমণ হল। তবে, শিকারী মহিলাকে কাবু করতে পারেনি। ভাগ্যবশত মহিলা একটা মোটা লাঠি নিয়ে আক্রমণকারীকে তাড়া করে, এবং ভয়ে সেটি ওই মহিলাকে ছেড়ে পালিয়ে যায়। তাঁর বর্ণনা মতে – আক্রমণকারী কোনো মানুষ বা চেনা কোনো পশু নয়, তা ছিল অদ্ভুত একটা জন্তু। এরকম একটা জন্তু, যার অস্তিত্ব সম্পর্কে মহিলার কোনো ধারণাই ছিল না। গায়ের রঙ কালচে ধুসর। জন্তুটা আবার উড়তে পারে, অথবা খুব উঁচু লাফ দিতে পারে – যা দেখে মনে হয় সেটা উড়ছে। আর সবথেকে বড়ো ব্যাপার হল – জন্তুটার বিকট মুখ দেখতে অনেকটা ভাল্লুকের মত! মুখের দুই পাশ দিয়ে বেরিয়ে রয়েছে দুটো তীক্ষ্ম শ্বদন্ত!
এই ঘটনার পর স্থানীয় সরকার চুপ থাকতে পারল না, তারা নড়েচড়ে বসল। দেরাদুন’স ওয়াইল্ডলাইফ ইন্সটিটিউট অফ ইন্ডিয়া থেকে কয়েকজন বিশেষজ্ঞ আনা হল তদন্তের জন্য। কিন্তু তাঁরাও ঘটনার যথাযত কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারলেন না। তাঁদের সন্দেহ – রাস্তার কুকুরের দ্বারাই ঘটনাগুলো ঘটেছে।
কিন্তু এই ব্যাখ্যা অনেকেই মেনে নিতে পারল না। বিশেষ করে তারা, যাদের বাড়ির পোষা পশুগুলো মারা গিয়েছে।
***
ইঙ্গুদাম লুহান একজন স্থানীয় চাষী। তবে, চাষ-আবাদ ছাড়াও তার অনেক বিষয়ে জ্ঞান আছে। অনেকে অবশ্য তাই-ই মানে। আবার অনেকের মতে সে একটা বদ্ধ পাগল। স্ত্রী-কন্যার অকাল মৃত্যুর পর থেকে তার উন্মাদনা নাকি বহুগুণে বেড়ে গেছে।
লুহানের বয়স এখন পঞ্চান্ন। সারাদিনের মধ্যে বেশিরভাগ সময়েই কিছু একটা বিড়বিড় করতে থাকে সারাক্ষণ। অদ্ভুত পশুহত্যার খবর শুনে তার হাবেভাবে যেন অনেক পরিবর্তন এসেছে। সে চীৎকার করতে করতে সবাইকে বলে, “আমি ঠিক। আমি ঠিক…” কখনও বলে, “আমি বলেছিলাম ওরা আছে। ওরা একদিন ঠিক আসবে… ওরা পুরো পৃথিবীটাকে দখল করে নেবে।” -এরকম বলতে বলতে কখনও এমন উত্তেজনা দেখায় যে আশেপাশের মানুষজন অতিষ্ট হয়ে পড়ে।
অবশেষে একদিন পাড়ার কয়েকজন মিলে তাকে একটা মেন্টাল অ্যাসাইলামে ভর্তি করে দেয়। ডাক্তার তাকে ‘কে আসবে?’ জিজ্ঞেস করায় সে বলে, “ওরা… চুপাক্যাব্রা… আর বেশিদিন লুকিয়ে থাকবে না ওরা…”
***
২০ নভেম্বর ২০৩০ সাল
রাত ঠিক বারোটার পর, পৃথিবীর প্রথম সারির তাবড় তাবড় নেতাদের উপর একটা আক্রমণ হয়। কিন্তু সেটাকে আদৌ আক্রমণ বলা যায় কিনা তা নিয়ে প্রশ্নচিহ্ন উঠতেই পারে। তবে এই ঘটনায় নেতাদের প্রাণ-পাখি যে খাঁচা ছাড়া হবার উপক্রম হয়েছিল – সেই ব্যাপারে কারো বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ২০ নভেম্বর বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই শিশু দিবস পালিত হয়। ঠিক তার আগের রাতে বিশ্বের সবচেয়ে বড়ো বড়ো নেতারা, যাঁরা পাপেটিয়ার-এর মত নিজেদের অঙ্গুলি হেলনের মাধ্যমে দেশ তথা পৃথিবীকে পরিচালনা করেন – তাঁদের সঙ্গে এরকম একটা ঘটনা ঘটা সত্যিই আশ্চর্যজনক!
সেই রাতে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, রাজা, এমনকি উচ্চপদস্ত নেতারা যেখানেই থাকুক না কেন – তাঁদের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় এক অদ্ভুতদর্শণ প্রাণীর। এমন প্রাণী কেউ আগে কখনও দেখেছে বলে মনে হয় না। প্রাণীগুলো নেতাদের আঘাত করার অভিপ্রায় নিয়ে আসেনি বোঝা গেল তখন, যখন তারা নিজেদের বিকটদর্শণ রূপ দেখিয়ে, ভীত-সন্ত্রস্ত নেতাদের হাতে একটা চিরকুট ধরিয়ে, আস্তে করে পাশ কাটিয়ে দূরে অন্ধকারে গিয়ে মিলিয়ে যায়। ততক্ষণে নেতাদের প্রাণ একেবারে ওষ্ঠাগত। দুর্বল চিত্তের কেউ কেউ সঙ্গে সঙ্গে মূর্ছা গেলেন। কিন্তু বিশেষ ক্ষতি কারোই তেমন হল না।
পূর্বের দেশগুলোতে দিন আগে শুরু হয়। তাই খবরও প্রথমে সেইসব জায়গা থেকেই আসতে শুরু করল। প্রথমে অস্ট্রেলিয়া মহাদেশ, তারপর এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা হয়ে আমেরিকা।
‘ব্রেকিং নিউজ – অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রীর উপর অজ্ঞাত আততায়ীর দ্বারা হামলা, সঙ্গে হুমকি চিঠি!’
‘ব্রেকিং নিউজ – মাঝ রাতে অচেনা জন্তু দ্বারা আহত জাপানের প্রধানমন্ত্রী।’
‘ব্রেকিং নিউজ – চিনের প্রেসিডেন্টকে হুমকি! খতিয়ে দেখা হচ্ছে ব্যাপারটায় কোনো শত্রু দেশ জড়িত কিনা!’
‘ব্রেকিং নিউজ – সৌদি আরবের রাজার উপর গত রাতে হয়ে গেল প্রাণঘাতী হামলা। সৌভাগ্যবশত রাজার বিশেষ কোনো ক্ষতি হয়নি। আশ্চর্যের ব্যাপার হল – হামলাকারী অসফল হবার পর ছেড়ে যায় একটা চিরকুট। যাতে লেখা – শিশু দিবস পালন করে কী লাভ হবে? তোমরা তো স্বহস্তে আগামী প্রজন্মকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছ। এখন যদি আমাদের কথা না শোনো, তাহলে আমরা আর লুকিয়ে থাকব না, নামব সম্মুখ সমরে। আর তাতে তোমাদের ভয়ানক ক্ষতি হবে। কী করতে হবে – তা পরে জানিয়ে দেওয়া হবে।’
‘ব্রেকিং নিউজ – ইংল্যান্ডের রাজা হঠাৎ সম্মুখীন হলেন অজানা প্রাণীর। মাঝ রাতে হামলাকারী সেই প্রাণীটি এই গ্রহের বাসিন্দা বলে মনে হয় না। হামলার সঙ্গেসঙ্গে তড়িঘড়ি রাজার রয়্যাল গার্ড আসতেই, সেই প্রাণীটি যেন বাতাসে মিলিয়ে যায়। তবে রাজার পাশ থেকে উদ্ধার হয় একটা হুমকি চিঠি।’
‘ব্রেকিং নিউজ – গত রাতে অদ্ভুত প্রাণীর দ্বারা আক্রান্ত হলেন ইউ.এস. প্রেসিডেন্ট ডেভিড চ্যাপম্যান। এটা অন্য কোনো দেশের চক্রান্ত কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আরও অদ্ভুত ব্যাপারটা হল এই যে – প্রাণীটা চলে যাবার আগে ছেড়ে গিয়েছে একটা চিরকুট। তাতে স্পষ্টতই হুমকির বার্তা।’
সকাল সকাল এই ধরণের খবরে ভরে উঠল খবরের কাগজের প্রথম পাতাগুলো। সঙ্গে নিউজ চ্যানেলগুলোতেও পাল্লা দিয়ে সম্প্রচার হতে থাকল এই ধরণের খবর।
ইউনাইটেড নেশনস, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, দ্য নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অরগানাইজেশন, অ্যাসোসিয়েশন অফ সাউথ ইস্ট এশিয়ান নেশনস, ইত্যাদি সংস্থাগুলো চিন্তায় ব্যস্ত হয়ে উঠল। পৃথিবীর প্রতিটা দেশই যখন এই হামলার শিকার, তখন কে কাকে দোষ দেবে! দুশ্চিন্তায় কপালে ভাঁজ পড়ল সমস্ত নেতাদের। এটা কোনো এলিয়েন ইনভেশন নয়তো?
বেলা খানিক বাড়তেই আসল সত্যি সারা পৃথিবীর কাছে প্রকাশ পেল। এবং বিশ্বের জনসাধারণের কাছেও দিনটা একটা আতঙ্কের দিন হিসেবে প্রমাণিত হল।
সারা পৃথিবীর সমস্ত টিভি চ্যানেলে একটা নির্দিষ্ট লাইভ ভিডিও সম্প্রচার হতে থাকল। এমন একটা ব্যাপার তখনই সম্ভব, যদি সমস্ত স্যাটেলাইট হ্যাক হয়ে গিয়ে থাকে।
একেকটি দেশ কেন্দ্র করে একেকজন উপস্থাপক হাজির হল টিভি স্ক্রীনে। এবং সবথেকে ভয়ের কথা হল এটা যে – উপস্থাপক কোনো মানুষ নয়। অদ্ভুত দেখতে এক জন্তু। অথচ তারা মানুষের মতই, মানুষের ভাষাতে কথা বলতে পারে। এরা হয়তো কোনো এলিয়েন, নয়তো কোনো অজানা-অচেনা জীব।
***
একে একে প্রাচ্যের দেশগুলো পেরোতে পেরোতে ব্যাপারটা যখন ভারতে এসে ঢুকল – তখন ভারতের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, বিদেশমন্ত্রী, সেনাপ্রধাণ, এবং আরও অনেকে মিলে জরুরি বৈঠক করছিলেন। গত রাত্রে এঁদের সবার উপরেই হামলা হয়, এবং সবার কাছেই একটা হুমকি চিরকুট আসে।
মিটিং রুমের টিভিতে চালু হল ভয়ঙ্কর প্রাণীটার লাইভ টেলিকাস্ট। উপস্থাপক জন্তুটি বলতে থাকে, “নমস্তে ইন্ডিয়া। আপনারা হয়তো আমাদের চেনেন না। আবার চিনে থাকতেও পারেন। কারণ, ২০২৩ সালে আন্দামানে আপনাদের সরকারের হাতে আমাদের মধ্যে একজন বন্দি হয়েছিল। তারপর বিস্তর জলঘোলা হয়েছিল। যাক সেসব কথা। কাজের কথায় আসি… আমরা আপনাদের মতই এই পৃথিবীর বাসিন্দা। এই গ্রহ যতটা আপনাদের, ততটা আমাদেরও। এর আগে আপনারা আমাদের দেখতে পাননি খুব একটা। কারণ, আমরা দেখা দিতে চাইনি। আমরা শান্তিপূর্ণ জীবন যাপনে অভ্যস্ত। কারো ব্যক্তিগত ব্যাপারে নাক গলাই না। তবে, আজ একপ্রকার বাধ্য হয়েই যেচে পড়ে আপনাদের সঙ্গে কয়েকটা বিষয়ে আলোচনা করতে এসেছি। এত কোমর বেঁধে আমরা আপনাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছি মানে আশাকরি বুঝতেই পারছেন – বিষয়টা খুবই জরুরি…”
উপস্থাপক জন্তুটির চেহারা দেখে সকলের ভিরমি খবার উপক্রম হল। দেশজুড়ে অনেকেই টিভি দেখতে দেখতে অজ্ঞান হয়ে গেলেন। কিন্তু সেই সরকারি মিটিং রুমটাতে যাঁরা বসেছিলেন, তাঁদের মধ্যে আতঙ্কের উদ্রেক হলেও কেউ জ্ঞান হারালেন না। তাঁরা প্রত্যেকেই সবরকম পরিস্থিতির সম্মুখীন হবার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিয়েই ছিলেন।
অনেকটা ভাল্লুকের মত মুখের গড়ন, শরীরটা কালচে ধুসর রঙের লোমে ঢাকা, কালো কুচকুচে ডিম্বাকৃতি দুটো চোখ, চওড়া একটা মুখ, কথা বলার সময় মুখের ভিতর থেকে মাঝে মাঝেই বেরিয়ে আসছে একটা লকলকে জিভ, আর সবথেকে ভয়ঙ্কর হল মুখের দুপাশ থেকে বেরিয়ে থাকা দুটো তীক্ষ্ম ক্যানাইন দাঁত – যা দেখলে খুব সহজেই বোঝা যায় প্রাণীটা কতটা হিংস্র হতে পারে! তা সে নিজে যতই বলুক যে তারা শান্তিপ্রিয় জাতি।
জন্তুটা বলতে থাকল, “…প্রধান বিষয়টা হচ্ছে আমাদের পৃথিবী। আপনারা, অর্থাৎ মানুষরা এই পৃথিবীর উপর যা অত্যাচার শুরু করেছেন যে – আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এই পৃথিবীতে আর প্রাণের চিহ্ন অবশিষ্ট থাকবে না। এই আপনারাই আবার নিজেদের ‘পৃথিবীর সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী’ বলে দাবি করেন। আমরা আপনাদের থেকে শতগুণে বুদ্ধিমান প্রাণী। তবে তা নিয়ে কখনও বড়াই করি না। আসলে ফাঁকা কলসী বাজে বেশি। আপনারা তো আত্মঘাতী জীব। নিজেদের খাবারে নিজেরাই বিষ মেশান, স্বজাতীকে ধ্বংস করার জন্য বিভিন্নভাবে ফন্দি আঁটেন। পিঁপড়েরাও আপনাদের থেকে বেশি বুদ্ধিমান, ওদের থেকে আপনাদের অনেককিছুই শেখা উচিৎ। আজ আমাদের বাধ্য হয়ে নিজেদের বড়াই করতেই হচ্ছে। কারণ, আপনাদের ভুল ভাঙ্গিয়ে দেওয়াটা এখন আমরা আমাদের কর্তব্য বলে মনে করছি। আমাদের মুখ দেখে আপনাদের মনে হতে পারে আমরা হিংস্র। আসলে সেটা একেবারেই না। আমাদের চেহারা আমাদের বেঁচে থাকতে সাহায্য করে। ভনিতা না করেই বলি – আমরা আসলে ভ্যাম্পায়ার। অর্থাৎ জীবিত প্রাণীর রক্ত পান করে জীবন ধারণ করি। তবে এই কাজটা এমনভাবেই করি যাতে কারো ক্ষতি না হয়। আমরা যেই প্রাণীর রক্ত পান করি – তাদের কোনোরকম কষ্ট হয়না। নির্দিষ্ট পরিমাপের রক্ত পান করি, যাতে সেই প্রাণীর কোনো দৈহিক ক্ষতি না হয়। আমাদের মুখের লালাতে এমন একটা উপাদান আছে, যার প্রভাবে যে কোনো ক্ষতস্থান দ্রুত মিলিয়ে যায়। এগুলোকে যদি হিংস্রতা বলা হয়, তাহলে শুধু এটুকুই মাত্র। এছাড়া কোনো প্রাণীজাতের কোনোরকম বিষয়ে আমরা নাক গলাই না। কোনোরকম অভিঘাতেও জড়াই না। যেগুলো আপনারা খুব গর্ব করে করে-থাকেন। তবে আমাদের মধ্যে যে কোনো নিয়ম-ভঙ্গকারী একদমই নেই – তা বলব না। কিন্তু আমাদের মধ্যে নিয়মভঙ্গকারীদের আমরা সঠিক উপায়ে দমন করতে সিদ্ধহস্ত। কারণ আমাদের মধ্যে কোনো দুর্নীতি নেই।”
এতটা বলে খানিক থামল জন্তুটা। মিটিং রুমে এখন পিন পতন নিস্তব্ধতা। কারো মুখে কোনো কথা নেই। সবাই যেন জমে গেছেন জন্তুটার এতক্ষণের ভাষণ শুনে।
জন্তুটা আবার বলতে শুরু করল, “আপনারা এতই বুদ্ধিমান প্রাণী যে – বর্তমানকালে পৃথিবীতে বসবাসকারী সমস্ত প্রাণী সম্পর্কেও আপনাদের ধারণা নেই। অচেনা কোনো প্রাণী দেখলেই আপনারা ভাবেন – ভিনগ্রহী। যারা নিজেদের মাটি, জঙ্গল, জল, মরুভূমিকে ঠিক করে চিনতে পারল না – তারা আবার ভিনগ্রহীদের সন্ধান করে! আমরা এই পৃথিবীর সমস্ত প্রাণীদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারি, তাদের সঙ্গে কথা বলতে পারি। এমনকি আমরা আপনাদের অর্থাৎ মানুষদেরও ৮৬৩ রকম ভাষায় কথা বলতে পারি। প্রযুক্তি বিদ্যায় আমরা যে কতটা উন্নত – তার প্রমাণ তো আপনারা পেয়েই গেলেন। আরও পাবেন আগামী সময়ে। আমরা মানুষের থেকে অনেক উন্নত জীব। তবুও আমরা নিজেদের গুটিয়ে রাখতেই পছন্দ করি। আমরা সচরাচর আপনাদের সামনে না আসারই চেষ্টা করি। কিন্তু আমাদের কিছু নিয়মলঙ্ঘণকারী সদস্য বেশ কয়েকবার আপনাদের চোখে ধরা পড়ে যায়। দুবার দুজন একেবারে তো হাতেনাতেই ধরা পড়ল। তাদের মধ্যে একজনের অবস্থা হয়েছিল খুব দুর্ভাগ্যজনক। আমরা অনেক চেয়েও তাকে বাঁচাতে পারিনি। তাকে আমেরিকার ‘এরিয়া ফিফটি ওয়ান’-এ নিয়ে গিয়ে আপনারা কাটা-ছেড়া করেছেন। তার উপর বিভিন্ন গবেষণা চলেছে। অকথ্য অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছে তাকে। এতকিছু সত্ত্বেও আমরা কখনও আপনাদের সামনে এসে প্রতিবাদ করিনি। কিন্তু এখন প্রশ্ন উঠেছে জন্মভূমি নিয়ে। যেটাকে আপনারা আপনাদের পিতৃ-প্রদত্ত সম্পত্তি বলেই ধরে নিয়েছেন। এটা নিয়ে আপনারা সমস্ত প্রাণীকূলের সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেছেন। আপনারা স্বার্থপর ও আত্মঘাতী প্রাণী হিসেবে নিজের জন্মভূমিটাকে তো ধ্বংস করতে উঠে-পড়ে লেগেইছেন। সঙ্গে পৃথিবীর অন্যান্য প্রাণীদেরও সমূলে বিনাশ ডেকে আনছেন। যা আমরা হতে দিতে পারি না…”
কথা শুনতে শুনতে মিটিং হলের সকলের মুখ পান্ডুর বর্ণ ধারণ করেছে। অনেকেরই নড়াচড়া না করে একইভাবে বসে থাকার কারণে শরীর অসাড় হয়ে আসছে। কিন্তু সেসব দিকে কারো খেয়াল নেই। সকলেই যেন একটা দুঃস্বপ্ন দেখছেন! সকলেই যেন একটা ঘোরের মধ্যে রয়েছেন!
এরমধ্যে জন্তুটি আবারও একটু থেমে, তার বক্তব্য বলতে থাকল, “…এবার আমি আমাদের দাবিগুলো জানাতে চাই। এক) যথেচ্ছভাবে গাছ কাটা এবং জলাশয় বোজানো বন্ধ করতে হবে। একজন মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যাক্তিও যেই থালাতে খাবার খান, যেই থালা ফুটো করেন না। কিন্তু আপনাদের মত কিছু তথাকথিত শিক্ষিত ব্যাক্তি নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য প্রতি বছর একর একর জমির গাছ কেটে ফেলেন। এছাড়াও পৃথিবীতে পর্যাপ্ত পরিমাণ পানীয় জল নেই জেনেও প্রাণীকূলের কাছে পানীয় জলের উৎস বন্ধ করে দিচ্ছেন। আপনারা কি বোঝেন না – উদ্ভিদকূল এবং প্রাণীকূল একে অপরের পরিপূরক? দুটিতে ভারসাম্য বজায় না থাকলে দুটি কূলেরই ক্ষতি। দুই) জৈব জ্বালানীর ব্যবহার কমাতে হবে। জৈব জ্বালানীর ফলে যে পরিমাণ পরিবেশ দূষণ হচ্ছে, সেই ক্ষতি পূরণ করার মত অবস্থা নেই আর। যথেচ্ছ পরিমাণে জৈব জ্বালানীতে চালানো ব্যাক্তিগত গাড়ি কেনার প্রতি বিধি-নিষেধ আরোপ করা হোক। তিন) ক্লোরোফ্লোরোকার্বন-এর ব্যবহারের ফলে বিশ্ব-উষ্ণায়ণ হচ্ছে – এরকম প্রচুর জ্ঞান বাক্য আপনাদের বাচ্চাদের বইয়েও লেখা থাকে। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে আপনারা সেই জ্ঞান ব্যবহার করেন না কেন? আপনাদের দ্বারা ব্যবহৃত এ.সি., রেফ্রিজারেটর, ইত্যাদি প্রচুর পরিমাণে সি.এফ.সি. প্রস্তুত করে বাতাসে ছড়িয়ে দেয়। এই এ.সি. কেনাতেও গাড়ির মতই বিধি-নিষেধ আরোপ করতে হবে। কোনো মানুষ একটা এ.সি. কিনতে চাইলে তার জমিতে অন্তত একটা বৃক্ষ জাতীয় গাছ থাকতে হবে। কোনো প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে প্রতি দুই কাঠা জমিতে একটা বৃক্ষ জাতীয় গাছ থাকতে হবে। কেউ সেন্ট্রাল এ.সি.-তে বসে ঠান্ডা থাকবে, আর কেউ সেটার মাশুল দিতে গিয়ে তাপে পুড়বে – এ’ কেমন বিচার! আপনারা এতটাই স্বার্থপর যে নিজেদের ছাড়া কিছুই বোঝেন না। আপনারা ‘ঘর’ বলতে বোঝেন শুধু নিজের বেডরুম-টা। তাই আপনারা নিজেদের সেই ‘ঘর’ পরিষ্কার রাখেন আর বাইরে আবর্জনা ফেলেন। নিজেদের ‘ঘর’ ঠান্ডা রাখেন আর বাইরের পরিবেশ গরম করেন। পুরো পৃথিবীটাকেই আপনারা ‘ঘর’ ভেবে গ্রহন করতে পারেন না। কিন্তু আমাদের কাছে পুরো পৃথিবীটাই একটা ‘ঘর’। আপনারা যেই ‘ঘর’-এ থাকেন, তার সিমেন্ট প্রস্তুত করতে যে পরিমাণ কার্বন-ডাই-অক্সাইড তৈরি হয় – তা আট শতাংশ দায়ী বিশ্ব উষ্ণায়নের জন্য। চার) প্লাস্টিকের ব্যবহার কমাতে হবে। আপনারা অনেক বুদ্ধিমান প্রাণী। তাই কী করে কী করবেন তা আমাকে বিস্তৃতভাবে বোঝাতে হবে না আশা করি! শুধু এটুকুই আশা করি – সহ উত্তরজীবী হিসেবে আপনারা আমাদের দাবিগুলো সাদরে মেনে নেবেন, এবং যথাযথ পদক্ষেপ নেবেন। যদি অন্যথা করেন – তাহলে আমরা আপনাদের ওপর নিজেদের পদ্ধতিতে কার্যক্রম চালু করব। আমাদের কাছে এমন প্রযুক্তি আছে, যার সাহায্যে আপনাদের একেকটা এলাকা চোখের পলকে বাতাসে মিলিয়ে দিতে পারি, কোনোরকম পরিবেশ দূষণ ছাড়াই। সারা পৃথিবী জুড়ে আমাদের সৈন্য প্রস্তুত আছে। আপনাদের পুরো দু’মাস সময় দিচ্ছি। আগামী জানুয়ারী মাসের কুড়ি তারিখে আমরা আবার আসব। আমাদের দাবি মানা হল না-কি তা মিলিয়ে নেব। তারপর… বাকিটা আপনারা জানেন। আমরা কোনো ফাঁকা হুমকি দিচ্ছি না – এটা বোঝানোর জন্য আপনাদের একটা লাইভ ভিডিও দেখাচ্ছি।”
জন্তুটার কথা শেষ হতেই টিভিতে আরেকটা ভিডিও দেখা গেল। বিশ্বের সবথেকে বড়ো জৈব-তেলে চলমান গাড়ির প্রস্তুতকারক কোম্পানীর প্রধান কার্যালয়। যা চোখের নিমেষে বাতাসে মিলিয়ে গেল। এবং জায়গাটা জুড়ে বিশাল একটা গর্তের সৃষ্টি হল, যা ধীরে ধীরে জলে ভরে যেতে শুরু করল।
এই দৃশ্য দেখে মিটিং রুমে বসে থাকা সকলের মুখ হাঁ হয়ে গেল। কে কী করবে কিছুই বুঝতে পারলেন না তাঁরা। চোখের সামনে যা দেখছেন – তা কি সত্যি!
জন্তুটি আবার টিভিতে ফিরে এসে কথা শুরু করল। “যা এইমাত্র দেখলেন – তা শুধুমাত্র একটা সতর্কতামূলক বার্তা ছিল। আমাদের দাবি না মানলে চারিদিকে এরকম ঘটনা ঘটেই চলবে। আপনাদের সৃষ্টি করা এই পরিবেশে আপনাদের বাচ্চারাও সুরক্ষিত নয়, আমাদের বাচ্চারাও নয়। সুতরাং… নিজের ভালোটা বুঝুন এবং সঠিক পদক্ষেপ নিন। নয়ত আমরা আবার আসছি দু’মাস পর। এবার সম্মুখ সমরে নামতে বাধ্য হব। তার জন্য প্রস্তুত হোন। আর আপনাদের মধ্যে কারো যদি কিছু জিজ্ঞাসা থাকে তাহলে এখনই জিজ্ঞাসা করতে পারেন। প্রধানমন্ত্রী যেখানে আছেন, সেখান থেকে একটা ল্যান্ড-ফোনের রিসিভার তুলে নিলেই আমার সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে পারবেন।”
মিটিং রুমের সবাই একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করলেন। তারপর প্রধানমন্ত্রী নিজেই কাঁপা কাঁপা হাতে একটা ফোনের রিসিভার তুলে নিলেন। তিনি কী বলবেন তা নিজেও বুঝতে পারছিলেন না। মনের মধ্যে অনেক প্রশ্ন একসঙ্গে ভিড় জমাচ্ছিল। এইমাত্র যেই ভিডিওটা দেখলেন, সেটা কি সত্যি! সবকিছু কেমন গুলিয়ে যাচ্ছে তাঁর মনের ভিতরে। তিনি যথাসম্ভব নিজের মনটা শান্ত রেখে দৃঢ় কন্ঠে কথা বলতে গেলেন। আজ সারা দেশ না চাইলেও তাঁকে শুনবে। নিজের মানসিক দুর্বলতা দেশের মানুষের কাছে কিছুতেই প্রকাশ করতে পারেন না তিনি। কিন্তু সব প্রশ্ন মনে এমনভাবে জট পাকিয়ে গেছে যে – কোনটা আগে জিজ্ঞেশ করবেন বুঝতে পারলেন না। শেষমেষ জিজ্ঞেস করলেন, “আপনারা আসলে কী?”
টিভি থেকে একটা হাসির শব্দ আসল। তারপর উত্তর এলো, “আপনারা আমাদের বিভিন্ন নামে ডাকেন। কেউ বলেন ‘সিগবিন’, কেউ বলেন ‘পিউচেন’, কেউ বলেন ‘ওজার্ক হাউলার’, কেউ বলেন ‘গ্রাঞ্চেস’ আবার কেউ বলেন ‘চুপাক্যাব্রা’। তবে আমাদের একটা ভালো নামও আছে। আপনারা যেমন আপনাদের বলেন ‘হিউম্যান’, তেমনই আমরা আমাদের বলি ‘লাইসোনেট’।”
কথা চলতে থাকা কালে সেনা প্রধান একটা চিরকুট লিখে প্রধানমন্ত্রীর দিকে এগিয়ে দিলেন। তাতে লেখা – “আমার পরিচিত একজন আছেন, যে চুপাক্যাব্রা সাম্পর্কে অনেককিছু জানেন।”
চিরকুটটা পড়তে পড়তে প্রধানমন্ত্রী একবার সেনা প্রধানের দিকে দেখে নিলেন। এবার যেন তাঁর গলায় আত্মবিশ্বাসের ছাপ ফুটে উঠল। তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন, “আচ্ছা… যদি আপনার সঙ্গে পরে আবার কথা বলতে চাই, তাহলে কী করতে হবে?”
“আগামী দু’মাসের মধ্যে ‘রাষ্ট্রপতি ভবন’ বা ‘পি.এম.ও.’ থেকে যেকোনো ফোন দিয়ে ‘৩৯৪’ ডায়াল করলেই আমার সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে পারবেন।” -উত্তর এল।
“বেশ। বাকি কথা পরেই হবে তাহলে।” -বললেন প্রধানমন্ত্রী। মনে মনে ভাবলেন – গোপন কূটনৈতিক আলোচনা এভাবে সকলের সামনে না করাই ভালো। জনসাধারণও সন্ত্রস্ত হয়ে থাকবে, এবং কোনো শত্রুপক্ষ সুযোগও নিতে পারে।
“আর কিছু জিজ্ঞাস্য নেই?” -টিভি থেকে জন্তুটার প্রশ্ন এল।
“না। আপাতত নেই।” -প্রধানমন্ত্রী বললেন।
এরপর ফোন কেটে গেল। এবং সঙ্গে সঙ্গে টিভিতেও স্বাভাবিক চ্যানেলটা ফিরে এল।
***
এটা বোঝা গেল যে – জন্তুগুলো, যারা নিজেদের লাইসোনেট বলে পরিচয় দেয়, তারা বহুদিন ধরেই এরকম একটা পরিকল্পনা করছিল। রাতারাতি এই ধরণের কর্মকান্ড ঘটিয়ে ফেলা সম্ভব নয়। তারা বহুদিন ধরে পৃথিবীর সমস্ত উচ্চ-বর্গীয় নেতাদের দৈনিক চলাফেরা গোপনে অনুসরন করেছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেল – পৃথিবীর সবথেকে বড়ো জৈব-তেলে চলমান গাড়ির প্রস্তুতকারক কোম্পানীর চোখের পলকে হাওয়ায় মিলিয়ে যাবার ভিডিওটাও মিথ্যা নয়। সারা পৃথিবী জুড়ে একটা ত্রাহি ত্রাহি রব উঠল।
ভারতবর্ষ যদিও খুব গরম একটা দেশ, তবুও ২০২৬ সাল থেকেই এই দেশে এ.সি. কেনার উপর বিধি-নিষেধ আরোপ হয়েছে। এখন যে কেউ চাইলেই নিজের ঘরে এ.সি. বসাতে পারে না। তার জন্য নির্দিষ্ট মানদন্ড নির্ধারণ করা হয়েছে, তার উপর ভিত্তি করে লাইসেন্স নিতে হয়। কিন্তু এই দেশের দুর্নীতি বন্ধ হয়ে যায়নি। ফলে, আইন অমান্য করে অনেককিছুই হয়ে থাকে। এছাড়া দূষণমুক্ত ব্যাটারি চালিত গাড়িও বাজারে এসেছে। তবে জৈব-জ্বালানীতে চলা পুরোনো গাড়িগুলো একেবারেই বন্ধ হয়ে যায়নি। সেগুলোও দিব্যি ধুঁয়ো ছেড়ে ছুটে চলেছে দেশের সমস্ত রাস্তা দিয়েই।
কিন্তু এরমধ্যে যে এরকম একটা কান্ড ঘটে যাবে, তা কেউ ভাবতে পারেনি। দেশের শিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত, অশিক্ষিত মানুষ নির্বিশেষে সবার মনে ভীতি সঞ্চার হল। বুদ্ধিজীবিরা ভাবতে শুরু করলেন – সত্যিই তো, আগামী প্রজন্মকে আমরা কী দিয়ে যাচ্ছি!
লাইসোনেটদের নিয়ে একদিকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মহলের নেতাদের মধ্যে রাজনৈতিক-কূটনৈতিক শলা-পরামর্শ চলতে থাকল। অন্যদিকে তাদের দমন করার অন্যান্য উপায়ও খোঁজা শুরু হল।
***
ভারতের বর্তমান সেনা প্রধান রাজকুমার কমলজিৎ সিং মণিপুরের ভূমিপুত্র। ২০১৮ সালে মণিপুরের বিভিন্ন জায়গায় চুপাক্যাব্রা আক্রমণও তার অজানা নয়। কাকতালীয়ভাবে, একটা সময় পাগল লুহানকেও তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছেন। চুপাক্যাব্রার সম্পর্কে বিভিন্ন গল্প শুনেছেন তিনি ইঙ্গুদাম লুহান-এর কাছ থেকে। যদিও এখন লুহান একটা মেন্টাল অ্যাসাইলামে ভর্তি আছে, তাও প্রায় বারো বছর হয়ে গেল।
টিভিতে আসা সেই জন্তুটা, যে নিজেকে লাইসোনেট বলে পরিচয় দিয়েছিল, সে যদি সত্যিই চুপাক্যাব্রা জাতীয় কোনো প্রাণী হয়ে থাকে, তাহলে সেনা প্রধানের বিশ্বাস – লুহানকে অ্যাসাইলাম থেকে বের করে নিয়ে আসলে, নিশ্চয়ই তার থেকে বর্তমান পরিস্থিতিতে কিছু না কিছু সাহায্য পাওয়া যাবেই। মানবতার স্বার্থে লুহান কখনই তাদের সাহায্য করতে পিছপা হবেন না।
***
সেনাপ্রধান কয়েকজন লোক সঙ্গে নিয়ে পাগল লুহানকে অ্যাসাইলাম থেকে নিজের গ্রামে ফিরিয়ে আনেন।
ফেরার সময় গাড়িতেই লুহানকে সমস্ত ঘটনা সংক্ষেপে বুঝিয়ে বলেন সেনাপ্রধান। তিনি জানান কোনো এক অজানা প্রাণী টিভিতে এসে সমস্ত মানবকূলকে হুমকি দিয়েছে – যদি তাদের দাবি না মানা হয় তাহলে তারা সম্মুখ সমরে নামবে। তিনি এও বলেন – পরিচয় দেবার সময় প্রাণীটা নিজেকে চুপাক্যাব্রা বলে।
লুহানকে আসল ভিডিওটা দেখানো হয়নি। সমস্ত ঘটনা সেনাপ্রধান নিজের মুখেই বলেন লুহানকে। শুনতে শুনতে লুহানের চোখগুলো যেন দপ্ করে জ্বলে ওঠে। অস্বাভাবিক ভাবেই সে আবারও বলতে থাকে, “আমি বলেছিলাম ওরা আসবে। একদিন ওরা গোটা পৃথিবী দখল করে নেবে। কেউ আমার কথা শোনেনি… কেউ না…”
লুহানকে যখন অ্যাসাইলামে পাঠানো হয়েছিল, তখন লুহানের ঘর দেখাশোনা করার দায়িত্ব পড়েছিল পাড়ারই একজন পরিবারের উপর। ফিরে এসে লুহান দেখে তার বাড়ি এক প্রতিবেশী দখল করে বসে আছে। লুহানের রাগ হল না, বরং সে খুশিই হল। এতদিন তার বাড়ি কেউ পাহারা দিয়ে, সাজিয়ে গুছিয়ে রেখেছে বলে। কিন্তু তার অন্য কোনোদিকে বিশেষ মন ছিল না। তার চাই সেই ট্রাঙ্কটা, যেটাতে সে নিজের গবেষণার সবকিছু ভরে রেখেছিল। চুপাক্যাব্রা নামক প্রাণীজগতের জীবন্ত দলিল বোধহয় সারা পৃথিবীতে ওই এক জায়গাতেই আছে, তার সেই ট্রাঙ্কের ভিতরে।
বাড়ির চারিদিক তন্ন তন্ন করে খুঁজে অবশেষে বাড়ির এককোণ থেকে আবিষ্কার হল ট্রাঙ্কটা। কিন্তু একি! লুহান সবসময় এই ট্রাঙ্কটায় একটা তালা ঝুলিয়ে রাখত, পাছে তার গোপনীয় জিনিস কারো হাতে না পড়ে যায়। এখন তো দেখা যাচ্ছে ট্রাঙ্কটার তালা ভাঙা!
লুহান তাড়াতাড়ি করে ট্রাঙ্কটা খুলে জিনিসপত্র বাইরে বের করল। নাহ্… কিছুই তো চুরি যায়নি! তার ডায়েরি, বেশ কিছু কাগজপত্র, ক্যামেরায় তোলা ছবি, কাঁচা হাতে আঁকা ছবি – সবকিছুই যেমনটা ছিল তেমনটাই আছে। শুধু একটু এলোমেলোভাবে রাখা। হয়তো বর্তমানে যারা এই বাড়িতে থাকে, তারা কোনো গুপ্তধন পাবার আশায় তালাটা ভেঙ্গেছিল। কিন্তু আশানুরূপ কিছু না পেয়ে, মনক্ষুণ্ণ অবস্থায় ট্রাঙ্কটাকে বাড়ির একটা কোণে ঠাঁই দিয়েছে।
লুহানের এসবে কিছু যায় আসে না। তার সম্পত্তি সে আবার ফিরে পেয়েছে – এতেই সে খুশি।
***
লুহান চুপাক্যাব্রা সম্পর্কে যা বর্ণনা দিল, তা মোটামুটি এইরকম – চুপাক্যাব্রা রক্তপান করে জীবন ধারণ করে। তারা খুবই চতুর প্রাণী। খুব নিঃশব্দে যাওয়া আসা করে। রাত ছাড়া বাইরে বেরোয় না। মানুষকে যথাসম্ভব এড়িয়ে চলে। প্রাকৃতিক গুহা বা মাটির নিচে গর্ত করে তারা থাকে। চ্যাপ্টা একধরণের লেজ আছে। ক্যাঙ্গারু যেমন লেজের উপর ভর করে লাফিয়ে চলে, এরাও সেরকম লেজের উপর ভর দিয়ে লাফাতে পারে। তবে এরা খুব বড়ো বড়ো লাফ দিতে পারে। একলাফে প্রায় দশ-বারো ফুট উঁচুতে উঠে যায় এরা। আবার খুব নিঃশব্দে মাটিতে নেমে আসে। বড়ো বড়ো লাফ দেবার সময় অনেকের মনে হতে পারে প্রাণীটা উড়ছে। কিন্তু ডানা জাতীয় কোনো অঙ্গ ওদের নেই। তবে ঈশ্বরপ্রদত্ত বেশ কিছু ক্ষমতা আছে তাদের। যেমন – তারা ছদ্মবেশ ধরতে ওস্তাদ। যেই স্থানে অবস্থান করছে, নিজেদের শরীরের রঙ পালটে হুবহু সেই প্যাটার্নের করে ফেলতে পারে তারা। ফলে তাদের উপস্থিতি কারো চোখে ধরা পড়া দুষ্কর হয়ে যায়। এছাড়া তাদের লালাতে এমন কিছু উপাদান আছে, যার ফলে যেকোনো ক্ষত স্থান দ্রুত মিলিয়ে যায়। এর জন্যই যেসব পশু-পাখিদের শরীরে তারা শিকার হিসেবে রক্ত পানের জন্য দাঁত ফোটায়, তাদের শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায় না। যদিও এরা রক্তপান করে কোনো প্রাণীকে মৃত্যুমুখে ঠেলে দেয় না খুব একটা। যতটা রক্ত পান করলে ক্ষতি হবে না ততটাই পান করে। মেরে ফেলার থেকে প্রাণীটাকে বাঁচিয়ে রাখলে তাদের বেশি লাভ। তাতে ভবিষ্যতে আবারও সেই প্রাণীটির রক্তপান করতে পারবে। একজন বিশেষজ্ঞই ভালো করে শিকার হওয়া প্রাণীটিকে খুঁটিয়ে দেখলে বুঝতে পারবে – তার উপর চুপাক্যাব্রা দাঁত বসিয়েছে কিনা! ২০১৮ সালে মণিপুরে যেই চুপাক্যাব্রা-টা অথবা চুপাক্যাব্রা-গুলো রক্তপান করে প্রাণীহত্যা করেছিল, সেগুলো হয়তো মানসিক ভারসাম্যহীন নয়ত কিছু একটা বার্তা দেবার জন্য করেছিল। ওটা ওদের স্বাভাবিক শিকার পন্থা একেবারেই না।
***
লুহান খুব খুশিই হয়েছিল। এই প্রথমবারের জন্য কেউ তাকে পাগল ভেবে তার কথাগুলো উড়িয়ে দিচ্ছে না। সবাই গম্ভীরভাবে তার সমস্ত কথা মন দিয়ে শুনছে। সে নতুন উদ্যমে আরও মনোযোগ সহকারে কাজ করতে থাকল। চুপাক্যাব্রাদের সম্পর্কে আরও তথ্য জোগাড় করতে থাকল সে।
২০২৩ সালে আন্দামান থেকে বন্দি হওয়া চুপাক্যাব্রাটি এখনও ভারত সরকারের হাতে বন্দি অবস্থাতেই রয়েছে, একটা বিশেষ জায়গায়। লুহান নিজে গিয়ে দেখা করেছে সেই প্রাণীটির সঙ্গে। আশ্চর্যের বিষয় হল – এত বছর প্রাণীটির পেট থেকে কোনো কথা বের করতে পারেনি কেউ। এই প্রথমবার লুহানের সঙ্গে প্রাণীটি কথা বলেছে। তবে গোপনে।
***
চুপাক্যাব্রা অর্থাৎ লাইসোনেটদের সমূলে বিনাশ করার একটা রাস্তা ইতিমধ্যেই খুঁজে পেয়েছে লুহান। সে জেনেছে লাইসোনেটরা সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে থাকা তাদের যত রকমের প্রজাতি আছে – সবার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখে। বড়ো বড়ো কাজ তারা খুবই গোষ্ঠীবদ্ধভাবে করে এবং কোনো অজানা উপায়ে বিভিন্ন দেশে তাদের নিয়মিত যাতায়াত আছে।
যদি কোনোভাবে ভারত সরকারের হাতে বন্দি থাকা লাইসোনেটটিকে ছেড়ে দেওয়া হয়, তাহলে নিশ্চয়ই সে আবার গিয়ে মিলিত হবে তাদের দলে। আর যদি কোনোভাবে একটা মারণ ভাইরাস ওটার মাধ্যমে সমস্ত লাইসোনেটদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া যায়, তাহলে খুব সহজেই তাদের কাবু করা যেতে পারে।
তবে, কেন জনেনা লুহান এই কথাটা তার নিয়োগকর্তাদের জানাতে পারছে না। মনের মধ্যে কী যেন একটা খুঁতখুঁত করছে! আন্দামানে ধরা পড়া লাইসোনেটটার সঙ্গে তার যা যা কথা হয়েছে, তাতে তো তাদের খারাপ বলে মনে হয়নি তার! সে এখনও ২০ তারিখে টিভিতে আসা লাইসোনেটটির লাইভ ভিডিওটা দেখেনি। সেটা সম্পর্কে শুধু শুনেইছে সেনাপ্রধানের কাছ থেকে।
লুহান সেনাপ্রধান রাজকুমার কমলজিৎ সিং-কে অনুরোধ করে লাইসোনেটের লাইভ ভিডিওটা দেখানোর জন্য। সে বলে – ওটা দেখলে হয়তো সে লাইসোনেটদের সম্পর্কে আরও কোনো সূত্র খুঁজে পেতে পারে!
সেনাপ্রধান খুশি মনেই ভিডিওটা দেখান বৃদ্ধকে। তার সঙ্গে এতদিন সেটা না দেখানোর জন্য ক্ষমা প্রার্থনাও করেন। আসলে বিভিন্ন কাজের চাপে লুহানকে সেটা দেখানোর সুযোগ হয়ে ওঠেনি তাঁর।
***
লাইসোনেটদের লাইভ টেলিকাস্টের ভিডিওটা দেখার পর থেকেই লুহানের মধ্যে কেমন যেন একটা অদ্ভুত পরিবর্তন আসে। সবাই লক্ষ করতে থাকে – সে আবার আগের মত নিজের মনে বিড়বিড় করে কথা বলতে শুরু করেছে। সঙ্গে অদ্ভুত অদ্ভুত কিছু কথা বলে চিল্লে ওঠে মাঝে মধ্যেই। উদ্ভ্রান্ত চোখে কী যেন খুঁজে বেড়ায় সবসময়! মানুষের চোখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকে কী যেন বোঝার চেষ্টা করে! কেমন যেন দেখলে মনে হয় তাকে… যেন সে সত্যিই মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছে!
আসলে লাইসোনেটের লাইভ ভিডিওটা দেখে লুহানের মনে একটা আমূল পরিবর্তন এসেছে। সে ভেবে দেখেছে – লাইসোনেটদের দাবি কি সত্যিই অন্যায্য? সত্যিই কি মানুষ গোটা পৃথিবীটাকে ধ্বংসের দোরগোড়ায় নিয়ে যাচ্ছে না?
তাই সে মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েছে – সে পাগল হয়েই থাকবে। লাইসোনেটদের ক্ষতি করার মত কোনো উপায় সে অন্তত বাতলে দেবে না। উন্নত মানুষদের সঙ্গে পাগলামি করার থেকে অ্যাসাইলামের পাগল জীবনই বরং ভালো তার কাছে।
একদিন লুহান তার সংগ্রহ করা সমস্ত তথ্য, কাগজপত্র, ছবি – সবকিছু একসঙ্গে করে তাতে আগুন লাগিয়ে দেয়। তারপর “আমি পাগল, আমি পাগল…” -বলে চেঁচাতে থাকে।
দিনে দিনে লুহানকে এতটাই মানসিকভাবে ভারসাম্য হারাতে দেখে সেনাপ্রধান রাজকুমার কমলজিৎ সিং বুঝতে পারেন – তাঁর শেষ আশাটাও নিভু নিভু হয়ে এসেছে! একদিন বাধ্য হয়ে তিনি লুহানকে আবার সেই মেন্টাল অ্যাসাইলামে ভর্তি করে দিয়ে আসেন।
***
এর পরের ঘটনা খুবই সংক্ষিপ্ত। লাইসোনেটরা দু’মাস সময় দিয়েছিল মানবজাতিকে। বলেছিল – এর মধ্যে তাদের দাবি না মানা হলে তারা নামবে সম্মুখ সমরে। আর তাদের সঙ্গে যুদ্ধের পরিণাম কি ভয়ঙ্কর হতে পারে তা সকলেই দেখে নিয়েছে ইতিমধ্যে।
অতএব, ভারত সরকার ধীরে ধীরে লাইসোনেটদের সমস্ত দাবি মেনে নেবার কার্যক্রম শুরু করল। অন্যদিকে, যেসব দেশ দু’মাসের মধ্যে লাইসোনেটদের দেওয়া শর্তগুলো মানতে পারেনি, তাদের উপর লাইসোনেটদের পক্ষ থেকে নেমে এল ভয়ঙ্কর রোষানল।
সবশেষে একটাই প্রশ্ন রয়ে যায় – লাইসোনেটদের এই জয় কি শুধু তাদেরই জয়? গোটা মানবজাতি তথা প্রাণীকূলের জয় নয় কি?
ছবি- মৌসুমী রায়