গল্প-সূর্যমুখীর মেয়ে-রঞ্জন রায়-শরৎ২০২৪

golposurjomukhirmeye

নদীর পাড়ে সবুজ মাঠ। সেখানে আছে ফুলের গাছ। তাতে ফুটেছে সূর্যমুখী ফুল। হলুদবরণ ফুল, এই এত্তো বড়ো। তোমরা দেখতে চাও?

তা সেই সূর্যমুখী কী করে? ওর সুয্যিমামা যা বলেন তাই করে। রাত পোহালে আকাশ ফরসা হলে ও ঘুম থেকে ওঠে। সুয্যিমামা পুব-আকাশে একটু একটু করে মুখ দেখান। আমাদের ফুলটি তখন একটু একটু করে চোখ মেলে। সুয্যি যখন মাঝ আকাশে, ও তখন ঘাড় তুলে সেদিকে তাকায়। দুপুরের পর সুয্যিঠাকুর পশ্চিমদিকে হেলতে থাকেন। আমাদের ফুল ঘাড় ঘুরিয়ে সেদিকে তাকায়। তাকিয়েই থাকে।

তারপর আকাশে সিঁদুর খেলে সুয্যি অস্ত যান। তখন সূর্যমুখী ফুলও মুখটি করুণ করে ধীরে ধীরে চোখ বোজে। পরের দিন ভোরবেলা আবার সেই—সুয্যিমামার কথামতো ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে থাকা।

দিন যায়। এবার সূর্যমুখী ফুলের বয়স হয়েছে। তার গজিয়েছে আরও দু-তিনটি ডাল। ওর পরিবার বড়ো হচ্ছে। কিন্তু বাদ সেধেছে আর একটি ফুল—ঠিক ফুল নয়, ফুলের কুঁড়ি। ছোট্ট এক খুকুমণি। ওর এখনও চোখ ফোটেনি। তবে মুখে কথা ফুটেছে।

“মা, ও মা! তুমি কোথায়?”

“এই তো বাছা। আমি তোর পাশেই আছি।”

“মা, ও মা! শীত করছে যে!”

“ভাবিস না, পাতা দিয়ে তোকে ঢেকে দিচ্ছি।”

মা-সূর্যমুখী তার কুঁড়িকে শোনায় অনেক গল্প। সবুজ ঘাসের গল্প, প্রজাপতি ও ফড়িংয়ের গল্প।

হাওয়া বয়ে যায়। সেই হাওয়ার ভাষায় ফুলেরা কথা বলে। আমাদের ফুলের কুঁড়িও শিখে গেছে সেই ভাষা।

“মা, ও মা, আমি কেন তোমাকে দেখতে পাচ্ছি না?”

“পাবে, পাবে। চোখ ফুটলেই দেখতে পাবে।”

“তোমাকে দেখতে পাব? আর নদী? সবুজ মাঠ?”

“সব দেখতে পাবে, আগে চোখ ফুটুক।”

“কবে ফুটবে মা? আর কত দেরি?”

“রোজ সকালে আমার সঙ্গে এই মন্তর বলতে থাকো। তাহলেই হবে।”—

‘সুপ্রভাত হে সুয্যিমামা
ঘুম হল কাল কেমনটি,
তোমার ভয়ে চাঁদ আর তারা
লুকায় কেন এমনটি?
দেখেছিলাম কালকে তুমি
সাঁঝের বেলায় শুতে গেলে,
কষ্ট কিছু হয়েছিল কি
খাট-বিছানা কোথায় পেলে?
সূর্য মোদের বাসেন ভালো
বাসেন ভালো ঊষারানি,
সূর্য মোদের সবার মামা
ঊষা মোদের মাতুলানী।’

“নাও, এবার নমস্কার করো। বলো, নমস্তে!”

সূর্যমুখীর খুকু-কুঁড়ি রোজ মন্তর পড়ে।

একদিন আকাশ জুড়ে ধেয়ে এল কালো কালো মেঘ। ওদের আড়ালে ঢাকা পড়ল সূর্য। হু হু করে ছুটে আসছে পাগল হাওয়া। বলছে—পালা! পালা!

কেঁপে উঠল শিশু-কুঁড়ি।

“মা, মা! শোঁ শোঁ আওয়াজ—কী হয়েছে?”

“ঝড় উঠেছে, বৃষ্টি নেমেছে। ভয় পাস নে। আমি তোকে বুকের মধ্যে আগলে রাখব।”

তারপর সূর্যমুখী তার গোটা শরীর দিয়ে ঢেকে দিল মেয়েকে।

হাওয়ায় দুলে দুলে উঠছে ফুলগাছেরা। ছিঁড়ে ছিঁড়ে উড়ে যাচ্ছে পাতা, ফুলের রেণু। কিন্তু কিছুতেই হার মানবে না সূর্যমুখী-মা।

ঝড়-বৃষ্টির শোঁ শোঁ আওয়াজে কিছু শোনা যায় না। আকাশ চিরে ঝলসে উঠছে বিদ্যুৎ। বাজের কড়কড় আওয়াজে কানে তালা লাগার জো। ফুল-কুঁড়ি আর শুনতে পায় না মায়ের কথা।

এইভাবেই কেটে গেল তিনদিন, তিন রাত। তারপর থামল ঝড়, থামল বৃষ্টি। নেমে এল শান্তি। সবাই চুপচাপ। সবাই গাঢ় ঘুমে।

পরের দিন সকাল হল। শোনা গেল পাখির ডাক। এবার ফুল-কুঁড়ি সূর্যমুখীর ঘুম ভাঙল। রোদ পড়ছে ওর চোখে-মুখে। এ কী! চোখের সামনে এত রঙ! নীল আকাশ, সবুজ ঘাস, হলুদ হলুদ রোদ। তবে কি আমার চোখ ফুটল? কিন্তু মা কোথায়? হ্যাঁ, একটা বড়ো ফুল জলকাদায় মুখ থুবড়ে পড়ে আছে বটে। কেঁদে উঠল ফুলখুকি।—“মা, কোথায় তুমি?”

হাওয়ায় ভেসে এল মায়ের কথা।—“আমি আছি রে। চলে গেছি সুয্যিমামার দেশে। ভয় পাস নে। তুই এখন বড়ো হয়েছিস। তোর চোখ ফুটেছে। রোজ সুয্যিমামার দিকে চোখ তুলে তাকাবি। তখন আমাকে দেখতে পাবি।”

জয়ঢাকের সমস্ত গল্প-উপন্যাসের লাইব্রেরি

 

Leave a Reply