
একটা বাচ্চা ভূত ছিল। তার বয়স বিরানব্বই হাজার বছর। নাম মানবচন্দ্র রাক্ষস। মুখে দাড়িগোঁফ গজায়নি। গজানোর কথাও নয়। কারণ সে বাচ্চা। ভূতেদের বয়স ব্যাপারটা খুব গোলমেলে। তার হিসাব রাখাটা আরও গোলমেলে। এর জন্য যে অঙ্ক শেখা দরকার সেটা কেশব-স্যার মানে কেসি নাগ স্যারও শেখাতে পারবেন না, এ আমি বাজি ধরে বলতে পারি। যেমন এখন বেশিরভাগ বাচ্চা জানে না কেসি নাগ স্যারকে, তেমন বেশিরভাগ মানুষই জানে না, ভূতেরা যখন জীবন শুরু করে তখনই তাদের বয়স হয় ছিয়াশি হাজার বছর। না, ঠিক জীবন শুরু নয়, যখন তাদের চোখে দেখা যায়, তারা হাঁটাচলা করতে শেখে, খাবার খাবে না বলে মায়ের সঙ্গে ঝামেলা করে, পড়ে না বলে বাবার কাছে মার খায়। একটু অর্ধেক এদিক ওদিক হতে পারে, তবে ব্যাপারটা মোটামুটি এই।
তার আগেও তারা অবশ্য বাতাসে ভেসে বেড়ায় অদৃশ্য হয়ে। তারপর এক হাজার বছর বয়সে তাদের সাইজ হয় পোস্ত দানার আটশো ভাগের এক ভাগ। ধীরে ধীরে যখন আস্ত পোস্ত দানার অবয়ব পায় তারা, তখন তাদের বয়স পঞ্চাশ হাজার বছর পেরিয়ে গেছে। তখনও খুব খেয়াল না করলে তাদের দেখা যায় না। ভূত তাড়ানোর ওঝারা ঠিক এই বয়স পর্যন্ত তাদের সর্ষে দানার বাড়ি মেরে মানুষের শরীর থেকে ঝাড়তে পারে। ওই যে বলে না, মানুষকে ভূতে পেয়েছে, তার আসল মানে হল ওই পোস্ত দানাগুলো মানুষের ঘেমো গায়ে আটকে যায়। তখন তার শরীর চুলকায়। বেশিরভাগ মানুষ এটাও জানে না যে ভূতে পাওয়ার আসল উপসর্গ হল শরীর চুলকানো। সর্ষে দানা যেহেতু পোস্ত দানার থেকে আয়তনে বড়ো, সুতরাং ভূতে পাওয়া মানুষকে সেটা ছুড়ে মারলে সেই সর্ষের মোমেন্টামে ওই পোস্ত ভূতগুলো তার গা থেকে খুলে যায়। এতে ওঝা বা সর্ষে কারও কোনও কৃতিত্ব নেই। পুরোটা বিজ্ঞানভিত্তিক।
এরপর থেকে তারা মানুষের মতো ডেঞ্জারাস হয়ে যায়। তাদের আর ঝাড়া যায় না। ক্রমশ সর্ষে ভূতটা থেকে তারা ভুট্টা ভূতে পরিণত হয়। এই সময় ‘ভূতটা’ কথাটা টাইপ করলে মাঝে মাঝে সেটা অটো কারেকশনে ভুট্টা হয়ে যায়—পরখ করে দেখতে পারো। মানে হল, এই সময় ভূতে পাওয়া মানুষের বিচিত্র ব্যবহারের জন্য অন্য মানুষ তাদের পাগল বলে ভুল করে।
বাচ্চা ভূতটা নিয়ে গল্প বলার আগে ইচ্ছা করেই ভূত নিয়ে একটা জেনারেল ডিসকাস করে নিলাম, যাতে বিষয়টা নিয়ে তোমাদের আগ্রহ বাড়ে।
তো সে যাই হোক, সেই মানবচন্দ্র রাক্ষসের খুব দুঃখ তার দাড়িগোঁফ নেই বলে। অন্য ভূতদের মতো যদি সে বেখেয়ালে হত তাহলে তার তত দুঃখ থাকত না। কিন্তু কপাল খারাপ, সে মানুষদের মতো সবকিছু খেয়াল করে। সেই খেয়াল থেকে সে দেখেছে, তার বয়সি একটাও মানুষ নেই। আর যারা বয়সে তাদের সমানুপাতিক অর্থাৎ বাচ্চা, তাদের অন্তত এক লক্ষ জন্মে এক লক্ষ বার গোঁফ-দাড়ি গজিয়েছে। কারও খুব চাপচাপ, কারও আবার চিনাদের মতো আট-দশটা, আর সেটাই তারা বাহারি বিনুনি করে রাখে।
এমনি মানবচন্দ্র খুব নরম মনের ভূত। সে একদম কষ্ট সইতে পারে না। তাতে তার খিদে পায়, আর মানুষের ঘাড় মটকাতে ইচ্ছে করে। তাই সবদিক বিবেচনা করে হাজার খানেক বছর ভেবে তার বাবা অসুরচন্দ্র রাক্ষসকে মনের দুঃখের কথাটা সে খুলে বলল। ভেবো না ভূতেদের মন থাকে না। আলবাত থাকে। তবে তা মানুষের মতো নয়। তাকে বুঝতে গেলেই সে এদিক ওদিক খসখস করে পালিয়ে যায়। টিকির নাগাল পাওয়া যায় না।
বাবা অসুরচন্দ্রর বয়স তিন কোটি তেতাল্লিশ লক্ষ বছর। অর্থাৎ বাবা হিসেবে সে খুব পরিণত নয়, যা হতে পাঁচ কোটি বছর বয়স হতে লাগে। কাজেই মাঝে মাঝে এটা ওটা ভুল করে দাদু দেবচন্দ্র রাক্ষসের কাছে টুকটাক বকুনি খায়।
খিদে পেয়েছে বলে সবেমাত্র আস্ত একটা তালগাছ ভেঙে খেয়ে সামনের দাঁত ভেঙে রক্তপাত হয়েছে তার। সে-কারণে হাতের কাজ সেরে ডাক্তার দেখিয়ে তাঁর পরামর্শমতো পাড়ার ভূতনাথের বাড়ির টিনের চালে বসে উত্তুরে হাওয়া দিয়ে কাচ ভাজা চিবিয়ে খাচ্ছিল সে। ছেলের কান্না শুনে টেরিয়ে তার দিকে তাকাল। তারপর রেফারির মতো ফুর-র-র করে একটা বাঁশির বাজানোর শব্দ করে বলল, “ফাউল! পেনাল্টি হবে।”
“আমি মরছি আমার জ্বালায়, আর তুমি বলছ ফাউল? যাও তোমাকে সাসপেন্ড করা হল।” ছেলে রেগে গড়গড় করে বলল।
“সেদিনের পুঁচকে ছোঁড়া, তোর আবার কীসের জ্বালা রে? তোকে কি মানুষে ধরেছে? আর সাহস দ্যাখো! বলে কিনা আমাকে সাসপেন্ড করবে?”
“আমার মতো দাড়ি-গোঁফ না গজালে বুঝতে।”
“পেটে মানুষ দিতে (আমরা যেমন পেটে ভাত দিই, ওনারা তেমন পেটে মানুষ দেন।) হিমশিম খেয়ে যাচ্ছি, আর উনি শোনাচ্ছেন দাড়ি না ওঠার গল্প! কাজ না থাকলে ভূতেও খই ভাজে।”
“সে তুমি যাই বলো বাবা, এ-কারণে কিন্তু মানুষ বন্ধুদের কাছে আমার কোনও প্রেস্টিজ থাকছে না। সবাই বলছে মাকুন্দে।”
“তোরও যেমন বুদ্ধি। তুই তাদের পালটা আক্রমণ করতে পারিস না?”
“কী করে?”
“বলবি, এ বাবা! তোমাদের এত দাড়িগোঁফ কেন? বিশ্রী দেখাচ্ছে!”
“তাতে কী হবে?”
“প্রথম প্রথম মানবে না তারা। কিন্তু তুই বলতেই থাকবি। দেখবি একদিন ওটাকেই তারা সত্যি মনে করে দাড়িগোঁফ গজানোর জন্য লজ্জা পাবে। এটা তো বেঁচে ছিলেন যখন তখন আজকের গোয়েবেল ভূত বলে গেছেন। এখনও বলেন। আর আমরা কত এরকম দেখেছি ছোটবেলায়! বরং ওসব না করে একটু কাজকম্মে মন দে তো!”
“কী কাজ করব? আমি এটুকু বাচ্চা, কাজ করার সময় হয়েছে?”
“আকাশে কালো মেঘগুলো ভিজে খুব কষ্ট পাচ্ছে, দেখছিস না? ওদের একটু আঁকশি দিয়ে পেড়ে কাঁথা জড়া।”
“টাকা কত পাব?”
“সব ব্যাপারে এত টাকা কী? তোকে কি খাবার কিনতে হয়, না পোশাক কিনতে হয়? নাকি ফ্ল্যাট বুক করতে হয় থাকার জন্য? নাকি কথায় কথায় চাঁদা দিতে হয় মানুষের মতো? সঙ্গে অসুখ-বিসুখ কিছু নেই, সবকিছু ফ্রি।”
“তা হোক। আমি টাকা জমাব। তাতে বড়োলোক ভূত বলে লোকে ইজ্জত তো দেবে?”
“ইজ্জত? আর হাসাস না।” এই বলে অসুরচন্দ্র তার দিকে তাকিয়ে হিস হিস করে হাসতে শুরু করল।
“হাসার কী হল? আমি কি জোকার?”
“না না, তা নয়। মানুষের বুদ্ধির কথা ভেবে আমার হঠাৎ একটা গল্প মনে পড়ল তাই হাসছি।” এই বলে টিনের চাল থেকে নেমে ছেলের কাঁধে হাত দিয়ে ঈশান কোণের শ্যাওড়া গাছটার দিকে হাঁটতে হাঁটতে সে মানবচন্দ্রকে বলল, “শোন তবে। সে প্রায় দু-কোটি বছর আগেকার কথা। আজকালকার বাচ্চা ভূতেরা বাবা-মা ভূতেদের আর তেমন ভক্তিশ্রদ্ধা করে না। শুধু কথায় কথায় অবিশ্বাস। আওয়াজ দেওয়া। সে-দোষ অবশ্য অভিভাবক ভূতেদেরই। বকাঝকা করলে শিশু ভূতেদের ডিপ্রেশন হয় বলে তাদের সঙ্গে বন্ধুর মতো মিশতে গিয়ে এখন বড়ো ভূতেরা ভক্তিশ্রদ্ধা সব খুইয়েছে ছোটোদের কাছে।”
অসুরচন্দ্র গল্প শুরু করার সঙ্গে সঙ্গে তাই মানবচন্দ্র বলে উঠল, “ঢপ দিও না।”
“আরে, ঢপ দেব কেন? বিশ্বাস না হলে ভূতেদের ইতিহাস বইটা অনলাইনে এনে পড়ে দেখিস। পিডিএফও ডাউনলোড করতে পারিস। কেউ না দিলে টাকা আয় করে তো আর হার্ড কপি কেনা সম্ভব না ভূতেদের পক্ষে!”
“ছাড়ো ছাড়ো! এখন যা বলছিলে তাই বলো।”
“কথা বলতে শুরু করার সঙ্গে-সঙ্গেই তো মেজাজ খারাপ করে দিস আজকাল, বলব কী? দাঁড়া আগে আবার নতুন করে মনে করি সবকিছু।” এই বলে বাবা ভূত আকাশের দিকে মুখ করে ডানহাতের বুড়ো আঙুলের হাড় চুষতে শুরু করল উদাস হয়ে। তারপর বলল, “হ্যাঁ, যা বলছিলাম। এখন থেকে প্রায় দু-কোটি বছর আগেকার কথা। তখন রুবির পাশে যে পাসপোর্ট অফিস, সেই বিল্ডিংয়ের চিলেকোঠায় এক ভূত থাকত, তার নাম দাঁড়া শিং।”
“দু-কোটি বছর আগে রুবি? আর দাঁড়া শিং কী নাম?”
“বেশি ফক্কুরি করলে গল্প শুনতে হবে না। ডেঁপো ছেলে কোথাকার!”
“আচ্ছা বেশ। বলো বলো, তারপর কী হল?”
“তখন ভূত এখনকার মতো ছিল না। তাদের স্বভাবও ছিল খুব ভালো।”
“মানে?”
“মানে, তারা কথায় কথায় মানুষের গলা টিপতে আসত না। তাদের ভয় দেখাত না। এমনকি এও শোনা যায়, দুই গোষ্ঠীর অনেকের মধ্যে এমনও বন্ধুত্ব ছিল যে ভূত চতুর্দশীই বলো বা বিজয়া দশমীই বলো, মানুষ এবং ভূতেদের পরস্পরের বাড়ি যাতায়াত লেগেই থাকত। খাওয়া-দাওয়া চলত বিস্তর।”
“তাই নাকি?”
“দাঁড়া শিংয়ের আগে পর্যন্ত ভূতেরা সব প্রায় মানুষের মতোই দেখতে ছিল, কেবল তাদের মধ্যে বিশেষ কিছু ক্ষমতা ছিল, যেমন তারা বাড়িতে অন্ধকার হলে আকাশ থেকে তারা পেড়ে এনে কুলুঙ্গি রাখতে পারত। সমুদ্রের ও-পারে দাঁড়িয়ে থাকা আত্মীয়দের হাত বাড়িয়ে এ-পারে তুলে আনতে পারত। কিন্তু এতে একটা সমস্যা হচ্ছিল। মানুষেরা মাঝে মাঝে বুঝতে পারছিল না কোনটা আসলে ভূত আর কোনটা নকল।”
“তাতে কী সমস্যা?”
“সমস্যা একটাই। অনেক সময় ভূতকে মানুষ ভেবে মানুষ মেয়ের বাবা-মা তাদের মেয়েদের সঙ্গে ভূতের বিয়ে দিয়ে দিচ্ছিল।”
“তাতেই-বা সমস্যা কী?”
“সমস্যা হবে না? একেই মেয়ে ভূতের তুলনায় সংখ্যায় ছেলে ভূত কম। এরপর এমন হলে তাদের বিয়ের জন্য ছেলে ভূত কম পড়ে যাবে না?”
“তাতে কী?”
“তাতে কী মানে? ভূতের তাহলে বংশরক্ষা হবে কী করে? আর বিয়ে না হলে ছেলে ভূত মেয়ে ভূত ঝগড়াটাই-বা করবে কী করে?”
“তাই তো! তারপর কী হল?”
“কী করা যায়? কোনও উপায় না দেখে তখন ভূতেদের হাই-কম্যান্ড, যাদের হেড অফিস আমেরিকা, সকলে মিলে বসে ঠিক করল এর একটা বিহিত করা দরকার। তা না হলে ভূতেদের আর মান রক্ষা হয় না।
“সে-সময় মানুষেরাও ঠিক আজকের মানুষের মতো দেখতে ছিল না। তাদের গায়ে প্রচুর লোম ছিল, একটা দশ ফুট লম্বা ল্যাজ ছিল জন্ম থেকেই আর চোখ দুটোতে সর্বদা লাল আলো দপদপ করে জ্বলত নিভত, বাল্ব যেমন খারাপ হয়ে যাওয়ার আগে জ্বলে নেভে।
“আগেই বলেছি, ভূতেরাও প্রায় একইরকম দেখতে ছিল, কেবল চোখে লালের বদলে ছিল নীল আলো। এটা ভেবে হাই-কমান্ড ঠিক করল, দেরি না করে নিজেদের পালটে ফেলতে হবে। আর ঘটনাক্রমে দাঁড়া শিং হল সেই পালটে যাওয়া সম্প্রদায়ের প্রথম ভূত, যাদের মাথায় চারটে শিং আছে, আর হাত ও পায়ের জায়গায় কাঁকড়াবিছের মতো দাঁড়া আছে চারটে। ল্যাজের দৈর্ঘ্য কমে হয়ে গেছে পাঁচ ফুট।”
“তারপর?”
“আবার কী? গল্প তো শেষ!”
“ইয়ার্কি হচ্ছে? আমাকে বোকা ভেবে যা ইচ্ছে তাই নাকি? আমার দাড়ি না থাকার দুঃখ দেখে তোমার একটা গল্প মনে পড়ল। সে-গল্প আমাকে শুনতে হল। তার সঙ্গে দাড়ি থাকা না থাকার বিন্দুমাত্র সম্পর্ক নেই। এরপরেও বলো তুমি আমাকে আরও বোকা বানাচ্ছ না?”
“না। কারণ, কিছু জানা অতটা সহজ নয়। আর দাড়ির ব্যাপারটা জানতে হলে আরও একটা গল্প শুনতে হবে। যদি রাজি থাকিস তাহলে ফুজিয়ামা থেকে খানিকটা জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি ভেঙে আন আমার জন্য। গরম গরম কিছু না খেলে গল্প বলার মেজাজটা ঠিক আসছে না। প্রচণ্ড খিদে পেয়ে গেছে।”
বাবার কথামতো এক চাঙর হাতেগরম ফুজিয়ামার টুকরো তার হাতে দেওয়ার পর ট্যাবলেটের মতো তা মুখে পুরে টুকুস করে গিলে ফেলে বাবা অসুরচন্দ্র রাক্ষস শুরু করল তার দ্বিতীয় গল্প।—
“তখন তুই খুব ছোটো। এতটাই যে, এমনকি কলকাতা থেকে গ্যাংটক পর্যন্ত হাত বাড়িয়ে পাহাড়ি কুকুরকে সুড়সুড়িও দিতে পারিস না।”
“যাহ্! তাই আবার হয় নাকি?” ছেলে মানবের গলায় অবিশ্বাসের সুর।
“মায়ের দিব্যি। আজকাল দেখি তুই আমার কোনও কথা বিশ্বাস করিস না। তাই দিব্যি-টিব্যি কাটতে হয় আমাকে।”
“না না, তা নয়। আমার কি আর জীবন সম্বন্ধে তেমন আইডিয়া আছে?”
“বাদ দে। যা বলছিলাম তাই বলি এখন। সে-সময় নবজাতক ভূতেরাও গোটা শরীরে দাড়িগোঁফ আর চুল নিয়ে জন্মাত। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিমুহূর্তে সেগুলো একটু একটু করে লম্বায় কমতে কমতে একটা সময় এমন হত যে মনে হত ভূত তো নয়, একটা আস্ত টাক ঘুরে বেড়াচ্ছে চোখের সামনে।”
“হা হা হা। তারপর?”
“এতে বয়স্ক ভূতেদের খুব প্রেস্টিজে লাগত। কারণ, তারা দেখছে মানুষের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা ঘটে ঠিক উলটো। অর্থাৎ, তাদের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চুল দাড়িগোঁফ বাড়তে থাকে, যদি না শরীরে টাকপোকার আমদানি হয়।”
“টাকপোকা? সে আবার হয় নাকি সত্যি সত্যি? আমি তো জানি চুল উঠে যাওয়াটা একটা রোগ, যাকে বলে অ্যালোপেশিয়া। সেদিন ব্যাংককে স্কিন স্পেশালিস্ট ডাক্তারদের কনফারেন্সে শুনছিলাম।”
“আরে মানুষদের কথা বাদ দে। ওদের বিদ্যাবুদ্ধি দেখে আমার রাগ হয়ে যায় মাঝে মাঝে। সবকিছুতেই বিজ্ঞান গুঁতিয়ে দেয়। একদিন বিজ্ঞানী আর ডাক্তারগুলোকে অন্ধকারে চমকে দিতে হবে।”
“কেন? আমরা যেটা জানি না সেটাই ভুল আর যা ভুলভাবে জানি সেটাই ঠিক? খুব অহংকারী অহংকারী শোনাচ্ছে না ব্যাপারটা?”
“ওরে আমার আদর্শবান ভূত এলেন রে! একটু বয়স বাড়ুক, দেখব এমন বড়ো বড়ো বুলি তখন কোথায় থাকে! আমরা ভূত বলে কি মানুষ না?”
“আহা, রাগ করো কেন? বাচ্চারা তো এমন একটু-আধটু করেই!”
“ওই জন্যই তো বার বার মাপ করে দিই তোকে। তো হল কী, তখন এই টাকপোকারা ছিল ভূতের এক নম্বর শত্রু। মোটেও তাদের ভালো দেখতে পারত না। তার অবশ্য একটা কারণও ছিল।”
“কী কারণ?”
“কারণ খুঁজতে হলে আরও কয়েক কোটি বছর পেরিয়ে যেতে হবে যখন প্রথম টাকপোকা আর প্রথম চুলভূত একই মায়ের পেটের দুই ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতি অথচ ভাই হিসাবে জীবন শুরু করেছিল।”
“চুলভূত?”
“হ্যাঁ। তবে আর বলছি কী? যখন নবজাতক ভূত প্রচুর চুল নিয়ে জন্মাত, এ-ঘটনা তারও বহু আগের। তখন বাল্মীকি সবেমাত্র রামায়ণ লেখার পারমিনেশনটা জোগাড় করেছেন হায়ার অথরিটির কাছ থেকে।”
“কী বলো?”
“হ্যাঁ। সে-যুগেও এসব ছিল। পারমিনেশন-টারমিনেশন করাতে হত। সে-গল্প বলতে গেলে তো আসল গল্পটা চাপা পড়ে যাবে। তাই ওটা থাক।”
“পারমিশন-টারমিশন। ইংরাজি ঠিকঠাক বলো। আর এই সাইড টকগুলো থাক। দাঁত শিরশির করছে। তুমি বরং আসল গল্পটা বলো।”
“আরে এ-টক সে-টক নয় যে দাঁত শিরশির করবে। এটা ইংরাজি কথা। বানাম, টি এ এল কে।”
“বানাম নয়, কথাটা বানান। তুমি মাঝে মাঝে দেখি মাখনকে মাখমও বলো। এমন করলে ছোটোরা কী শিখবে? যাক গে, তারপর বলো।”
“চুলভূত আর টাকপোকা একই মায়ের পেটের দুই ভাই হলেও তাদের পরস্পরের মধ্যে খুব হিংসা ছিল। তাই কেউ কাউকে দেখতে পারত না।”
“কেন?”
“ব্যাপারটা খুবই হাস্যকর।”
“কীরকম?”
“টাকপোকার খাবার ছিল মানুষের চুল, গোঁফ আর দাড়ি। তাই তাদের খাওয়া-দাওয়ায় কোনও হ্যাপা ছিল না। মানুষ তাতে প্রাণের ভয় পেয়ে তেড়ে আসত না তাদের। সে-হ্যাপা না থাকলে কী হয়, তাতে তারা অখুশিই ছিল বেশি, কারণ এ-ধরনের খাবারে বিশেষ স্বাদ থাকে না। সেই একঘেয়ে চুল চেবানি। কিন্তু চুলভূত কী সুন্দর মানুষ ধরে ধরে খায়! কী স্বাদ তাতে! কিন্তু তাতে মাঝে মাঝে কোণঠাসা মানুষের আক্রমণে তার মারা পড়ারও সম্ভাবনা তৈরি হত। অর্থাৎ, টাকপোকা চুলভূতকে হিংসা করত সে ভালো খায় বলে, আর চুলভূত টাকপোকাকে হিংসা করত তার কোনও লাইফ রিস্ক নেই বলে।
“এরকম করতে করতে ব্যাপার একসময় এমন দাঁড়াল যে দুই ভাইয়ের মধ্যে হিংসায় ছাড়াছড়ি হয়ে গেল। ওদিকে মানুষেরাও টাকপোকাদের বিরুদ্ধে প্রচুর প্রতিবাদ, আন্দোলন এসব করায় টাকপোকার মানুষের চুল, দাড়িগোঁফ খাওয়া বন্ধ করে দিল তার বাবা। তখন বেচারা ভাবল, চুলভূত তো আর আমাকে বাগে আনতে পারবে না, ফসকে ফসকে পালাব, আর আমি মানুষও নই যে আমার মাংস খাবে, বরং আমি এখন থেকে তার চুলটাই খাই।”
“ইন্টারেস্টিং! তারপর?”
“এই হল ভূতেদের চুল-দাড়িগোঁফ কমতে থাকার সূত্রপাত।”
“হ্যাঁ, কিন্তু এই যে আমরা এখন এমন মাকুন্দে, সেটার কারণ তো তা নয়! এখন তো আর টাকপোকা আমাদের থেকে খায় না। তুমি বলার পর ভূতেদের ইতিহাস পড়ে জেনেছি, সেও বন্ধ হয়ে গেছে ভূত-বিদ্রোহের পর থেকে।”
“ভাবছিলাম এর কারণটা এখন আর তোকে বলব না। কিন্তু পড়াশোনা করিস যখন, তখন তোকে আর লুকিয়ে লাভ কী? তাহলে শুনেই নে ফাইনাল গল্পটা।”
“আবার সেই আবোল-তাবোল গল্প? এবার তো আমি অসুস্থ হয়ে পড়ব!”
“অসুস্থ হয়ে পড়লেও শুনতে হবে। জ্ঞান বাড়াতে গেলে এটুকু ঝুঁকি নিতে হবে।”
“বলো তবে। পড়েছি বাবার হাতে…”
“বলো বললেই তো হবে না! আমার তো আবার খিদে পেয়ে গেল। কিছু উপায় কর আগে!”
“এখন আবার কী খাবে? আচ্ছা পেটুক যা হোক!”
“লোহিত সাগরের নীচেরও একশো মাইল গভীরে সোনালি আভা ছড়ানো সুগন্ধী পাঁক পাওয়া যায় যা হাজার কেজি মতো খেতে পারলে জীবনে আর খিদে পায় না। আর ভূতজন্ম শেষ হয়ে মানুষ জন্ম শুরু হয়।”
“এই তো নিন্দে করছিলে মানুষের। তবে এখন আবার মানুষ জন্মের সাধ কেন?”
“হবে না কেন? মানুষ কত কী আবিষ্কার করে! লেখে, আঁকে, গান গায়, নাটক করে—আমরা কী করি? কিছুই তো পারি না! শুধু সকলে ভয় পায় আমাদের কথা শুনে। এটা কি একটা জীবন? এবার জন্মালে মানুষ হয়েই জন্মাব। তাদের নিন্দে করি তো মিছিমিছি! সোনালি পাঁকের ব্যবস্থা কর বাবা। বড্ড খিদে পেয়েছে।”
“আরে সময় তো দেবে, নাকি! উঠল বাই তো কটক যাই। এত অত্যাচারে আর পারা যায় না বাপু।”
“সে তুই দেখে নে কতক্ষণ কৌতূহল ধরে রাখতে পারিস। আমি কিন্তু বাপু না খাওয়ালে স্পিকটি নট।”
“বেশ তো, অন্যকিছু খাও! মাছ, মাংস, সবজি, বাসমতী চালের ভাত, সোনা মুগের ডাল।”
“ছ্যা! ওসব খাদ্য ভূতে খায়?”
“তবে কি ভূতে কাদা খায়? তুমি কি কাদাখোচা পাখি?”
“তুই তর্ক কর। আর এই আমি ঘুমিয়ে পড়লাম।”
“আরে না না, প্লিজ। এখনি ব্যবস্থা করছি তোমার পাঁকের।”
এভাবে জরুরি ভিত্তিতে বাবার খাবার তো জোগাড় হল। তা খেয়েদেয়ে অসুরচন্দ্র রাক্ষস তার ফাইনাল গল্পটা শুরু করল। তার আগে ছেলেকে বলল, “এখন আর কোনও প্রশ্ন চলবে না, ওকে? হাতে সময় নেই একদম। গল্পটা শেষ করেই আমাকে ছুটতে হবে বৃহস্পতি গ্রহে। সেখানে ভূতেদের নতুন সেট-আপ তৈরি হচ্ছে। পৃথিবী এখন থাকার পক্ষে যে ভালো নয়, সেটা ভূত হয়েও বুঝতে পারছি। ওখানে কোন ভূত কতটা জায়গা নিয়ে থাকবে, কাকে কতটা ফুল-ফলের গাছ লাগাতে হবে, নিজের সংসার ছাড়া গোটা গ্রহের উন্নতির জন্য কার কী দায়িত্ব—এ নিয়ে জ্ঞানী, বিজ্ঞানী ও প্রাজ্ঞ ভূতেদের নিয়ে একটা মিটিং ডাকা হয়েছে আগামীকাল। আমিই উদ্যোক্তা।”
“আচ্ছা আচ্ছা, ঠিক আছে। বলো। এই আমি মুখে কুলুপ আঁটলাম।”
চোখ বুজে মস্ত বড়ো একটা ঢেঁকুর তুলে এক মন মোষের দুধের ছানা দিয়ে দাঁতের হাড় মেজে বাবা ভূত তার ফাইনাল গল্পটা শুরু করল।—
“শোন তবে। ভূত হিসাবে এই আমার শেষ গল্প। এরপর আমার মানুষ জন্ম শুরু হবে। পাঁক খাওয়ার পর থেকে পেট গুরগুর করে সে-কথা জানান দিচ্ছে। অবশ্য বলা ভালো এই গল্পটা দ্বিতীয় গল্পের দ্বিতীয় ভাগ। অতঃপর টাকপোকাদের গেরিলা আক্রমণে চুলভূতদের জীবন ক্রমশ দুর্বিষহ হয়ে উঠল। চোখের সামনে তাদের চুল, গোঁফ, দাড়ি খেতে খেতে মাথা ও গোটা শরীরের এমন দশা করতে লাগল টাকপোকারা যে তাদের দেখে মনে হতে লাগল, যেন ধান কেটে নেওয়ার পর গরমকালের জমি। আর যখন নিজেদের চেহারার এরকম হালত দেখল চুলভূতেরা তখন যা যা ঘটল, তার ফল হল মারাত্মক। সে-সময় ভূত সাম্রাজ্যে খুব বিখ্যাত এক কেমিস্ট ভূতের রমরমা, তাঁর নাম কেমি ক্যালক্যাটা। আর এত সাংঘাতিক তাঁর গবেষণার জোর যে তিনি সর্বদা দিনকে রাত আর রাতকে দিন করছেন। চুল, গোঁফ-দাড়ির সেই দশা নিয়ে কাঁদো-কাঁদোভাবে চুলভূত সটান মিস্টার কেমির পায়ে গিয়ে পড়ল। বলল, তিনি বিহিত না করলে এর থেকে তার কোনও নিস্তার নেই।
“এ-কথা শুনে দয়ালু কেমি বললেন, ‘আরে ঘাবড়াও কেন? টেক ইট ইজি। খোঁচা খোঁচা চুলের গোড়ায় সালফার গোলা জল লাগাও। তাহলে ঝিঙে গাছের আঁকশির মতো সুন্দর লতানে চুল, দাড়িগোঁফে ছেয়ে যাবে গোটা শরীর।’
“আর কী আশ্চর্য, তাঁর কথায় অব্যর্থ ফল ফলল ঠিক দু-হাজার মাসের মাথায়। গোটা শরীর হলুদ করে ঝিঙে ফুলের রঙের হলুদ হলুদ লম্বা লতানো চুল, দাড়িগোঁফে ছেয়ে গেল চুলভূতের গোটা শরীর।”
“আরিব্বাস! এ তো সাংঘাতিক ব্যাপার!”
“না না, সংঘাতিকের কিছুই হয়নি তখনও। আসল ঘটনা শুরু হল তারও সাড়ে সাতশো বছর পর। এসবের এমন গ্রোথ দেখে টাকপোকার লোভ আরও বেড়ে গেল এবং সে দ্বিগুণ উৎসাহে আবার ঝাঁপিয়ে পড়ল চুলভূতের উপর। এতে চুলভূত আবার মিস্টার কেমির শরণাপন্ন হওয়ায়, তিনি চুলের গোড়ায় সালফারের সঙ্গে সঙ্গে খানিক হাইড্রোজেন মিশিয়ে অনুঘটকের দ্বারা রাসায়নিক বিক্রিয়া করে সে সালফারকে হাইড্রোজেন সালফাইড বানিয়ে দিলেন। তার গন্ধে টাকপোকা বাঁচার জন্য মিউটেশন ঘটাল, আর চুলভূতকে ছেড়ে মানুষের চুলে বেপরোয়া টার্গেট করল।”
“তারপর?”
“আর সেই মিউট্যান্ট টাকপোকাকে কায়দা করতে না পেরে মানুষের সব রাগ গিয়ে পড়ল সেই চুলভূতের উপর।”
“বেশ সন্দেহ হচ্ছে, গল্প শেষের দিকে যাচ্ছে ক্রমশ।”
“ঠিক ধরেছিস। তারপর শোন। মানুষ তো হাইড্রোজেন সালফাইডের গন্ধ মোটে নিতে পারে না। তাই কী উপায় করল সে? বল তো কী?”
“জানি না। তুমি বলো। আমার উত্তেজনা হচ্ছে।”
“তা তো হবেই! তখন মানুষ করল কী, হাইড্রোজেন সালফাইড রেসিস্ট্যান্ট এক ডজন মানুষ-কমান্ডো তৈরি করল এবং যাদের উপর ভার পড়ল সেই চুলভূতকে জব্দ করার। সেই কমান্ডোরা সকলে মিলে অভিমন্যুর মতো ঘিরে ধরল চুলভূতকে।”
“এই রে!”
“টেনশন হচ্ছে বুঝি?”
“তা বলতে পারো।”
“কিচ্ছু না। এরপর যেটা হল, সেটা আরও আশ্চর্য। এই যে স্বর্ণলতা পরজীবী শরীরে নিয়ে যে শ্যাওড়া গাছটার নীচে আমরা দাঁড়িয়ে আছি, চুলভূতের বিপদ দেখে তার তখন খুব দয়া হল। তখন সে বাজারে নামল চুলভূতকে রেসকিউ করার জন্য। সে-সময় তার গায়ে মোটেও হলুদ চুলের মতো এই পরজীবী উদ্ভিদ হত না।”
“আচ্ছা।”
“সে করল কী, মুহূর্তের মধ্যে চুলভূতের সেই হলুদ লতানো চুল, গোঁফ, দাড়ি নিজের শরীরে স্বর্ণলতা নাম দিয়ে নিয়ে নিল। আর সেদিন থেকে চুলভূত তো মাকুন্দে ও টেকো হয়ে গেলই। তার উত্তরপুরুষ যেমন তুই আমি, বাকিরা—সকলের এই দশা হল।”
“তারপর?”
“তারপর আবার কী? প্রশ্নের উত্তর পাওনি বুঝি? মারব মাথায় এক চাঁটি।”
মানবচন্দ্র রাক্ষস ফ্রাস্ট্রেটেড হয়ে বলল, “ধুত্তোরি! দিল সবকিছুর পিণ্ডি চটকে।”
জয়ঢাকের সমস্ত গল্প-উপন্যাসের লাইব্রেরি