তন্ময়বিশ্বাসের আরো গল্প- উৎসর্গপত্র, রূপকথার ভাঁজে, পর্দার আড়ালে, ক্যারন, আনক্যানি ভ্যালি

সব কুকুরের নাম মোটেই ভুলু হয় না। আমার সামনে পায়ে নাক ঠেকিয়ে যে বসে আছে তারও নিশ্চয়ই অন্য নাম আছে। তাই টুকাইদা বার বার ‘ভুলু ভুলু’ করে ডাকলেও ব্যাটা আমার কাছেই বসে আছে। মাঝে মাঝে মাথা উঁচু করে মেঘের রঙটা দেখে নিচ্ছে। আমার তো বৃষ্টি ভিজলেই হাঁচু হয়। তাই বোধ হয় বৃষ্টি পাহারা দিচ্ছে। মেঘ আলগা হয়ে এলেই আমাকে বলে দেবে ঠিক। তখন দাদাদের কাছে গেলেই হবে। এখন এখানেই লিখি। আমার কিন্তু এমন করে লেখালেখি করার কথা নয়। আরে বাবা, আমি তো আসলে লেখকও নই। শুধু হাতের লেখাটা একটু ভালো। মানে শুধু স্কুলে প্রাইজ পেয়েছি বলে ভালো বলছি না, একবার বীথি-মিস এজন্য গালে হামিও খেয়েছিলেন। আমি অবশ্য এটা কাউকে বলিনি।
আর আমি এখানে এসেছিলুম বই পড়তে। এখানকার ব্যাপারটা একটু শক্ত। তার ওপর আমি ছোটো বলে কেউ পুরোপুরি বলতেও চায় না তেমন। টুবলুদারা এটাকে বলে সাইলেন্ট রিডিং। একটা সুন্দরমতো জায়গায় গিয়ে সবাই ঘণ্টার পর ঘণ্টা বই পড়বে। শুধু পড়বে। কেউ কারোর সঙ্গে কথা বলবে না। এমনকি ফোন এলেও নাকি ধরবে না কেউ। যদিও একটু আগে আমার আর কুকুরটার (ও তো নামই বলছে না) একটা ছবি তুলে নিয়ে গেল টুবলুদা। ফোনেই তুলল। এটা নাকি আব্বুলিশ! মাঝে মাঝে করা যায়। কী জানি!
আমার অবশ্য এই নিয়মে অসুবিধা নেই। আমার তো আর ফোন নেই। ওই আলোয় মাথাব্যথাও করে একটু একটু। তাই আমি বই-ই পড়ি সারাদিন। মা বলে, এতে নাকি শাপে বর হয়েছে। যদিও আমি সাপের বিয়ে দেখিনি কোনোদিন।
আমি পড়তে ভালোবাসি বলেই টুবলুদা আমাকে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে। কিন্তু এসে দেখা গেল আমার পড়ার মতো কোনও বই নাকি ওদের কাছে নেই। বোঝো! অনীকদার কাছে সুন্দরমতো একটা দিদির ছবিওয়ালা বই ছিল। দিদিটার একটা কানে গোলাপ আর কপালে একখান ইয়া বড়ো প্রজাপতি। কত করে চাইলাম অনীকদার কাছে, কিছুতেই দিল না। আমি পেলে ঠিক প্রজাপতিটা উড়িয়ে দিতাম। গায়ে বসলে বড়ো কাতুকুতু লাগে।
শেষে খুঁজেপেতে এই ছেঁড়াখোঁড়া খাতাটা আমাকে দেওয়া হয়েছে, যা-খুশি লেখার জন্য। তাতে অবশ্য আমার মনখারাপ হয়নি। গুপ্তধনের নকশাও তো ছেঁড়া ছেঁড়া হয়। তাতে কি তার দাম কমে যায়? টুবলুদার ফোনে সেদিন একটা সিনেমা দেখছিলাম। এই একটা নকশার জন্য কী মারপিট বাবা রে! স্ক্রোলটা একবার এই রাজার কাছে যায়, তো পরক্ষণেই ওই রাজকুমার ঘোড়ায় চড়ে সেটা নিয়ে পালায়।
তাই দেখে বোন ভুলি জিজ্ঞেস করে, “শুধু রাজকুমাররাই কেন যুদ্ধ করছে? রাজকন্যারা সবাই কোথায়?”
ভুলিটার সব ভালো, শুধু বড্ড ঘ্যান ঘ্যান করে। একবার কিছু মাথায় ঢুকলে হল। সেটা মাথা কেটে ফেললেও বের করা যায় না। এই যে রাজকুমারীরা ওর মাথার ভেতর মাদুর পেতে বসল, তারা আর বেরোয়ই না! খেতে, ঘুমাতে, পটিতে—সেই একই কথা।
আর লেখকগুলোও হয়েছে রাম বদমাশ। কেন রে বাবা! রাজকুমারীরা কেন সবসময় কেল্লার জানালায় গাল ঠেকিয়ে বসে থাকবে? রাজপুত্রদেরও একটু-আধটু অসুখ হোক। রাক্ষসী রানিরা তাদের কিডন্যাপ করে খিক খিক করে হাসুক। তখন রাজকন্যা তলোয়ার হাতে বেরিয়ে পড়বে। দুর্গা ঠাকুরের মতো চুল উড়বে। যে দেখবে সে না পারবে পালাতে, না পারবে চোখে চোখ রেখে কথা বলতে। ড্রাগনে চেপে যেতে পারে। কিন্তু আমি গিরগিটিতে ভয় পাই তো, তাই ঘোড়ার কথা ভাবছি। সবাই সাদা ঘোড়া আঁকে, আমি কালো ঘোড়া দেব।
যে করে হোক ভুলির জন্য গল্পটা লিখে ফেলতে হবে। নইলে ওর মাথার সমস্ত সার্কিট পুড়ে ঝামা হয়ে যাবে যে-কোনো দিন। বেরোবেই না। একবার ওর কানে টিয়াপাখির পালক ঢুকিয়ে বার করতে গেছিলাম সব। তাই দেখে বাবা কী জোরেই না একটা গাঁট্টা মারল! এতে নাকি কানের পর্দা ফেটে যায়। এদিকে নিজে দিব্যি ফোনে গান শুনতে শুনতে টুথপিক দিয়ে কান খোঁচায়। সে কী আরাম তখন! চোখও বুজে ফেলে। বড়োদের এই নিজের বেলায় আমটি সাঁটি, পরের বেলায় চিমটি কাটি স্বভাবটা আমার একদম ভালো লাগে না।
গল্প ভাবতে ভাবতে একবার জোরে মেঘ ডেকে উঠল। আসলে জায়গাটা ভারি সুন্দর। বৃষ্টি হব হব করছে বলে আরও ভালো লাগছে। দাদা-দিদিরা যেখানটায় পড়ছে, সেই চালাটার মধ্যে ঠাকুর বানানো চলছে একদিকে। টিয়াগুলো কিছুতেই ঠিক করতে পারছে না বৃষ্টি এলে কোন গাছে বসবে। কালো মেঘের নীচ দিয়ে রাইস মিলের সাদা ধোঁয়া শহরের দিকে উড়ে যাচ্ছে। একটা বিশাল চিল ওর মধ্যে ঢুকেই আবার বেরিয়ে এল। পাখিটার নিশ্চয় খুব কষ্ট হয়েছে। আহা রে।
আমি একটু চিত হয়ে শুলাম। টিয়াদের ওড়াউড়ি আরও বেড়ে গেছে। ওরা তো পাখি। নজর ভালো। কিন্তু এখন আমিও বেশ বুঝতে পারছি, মেঘ আলগা হচ্ছে। এই পড়ল এক ফোঁটা—টপ, টপ, টপ-টপ-টপ। বাকিরা অনেকক্ষণ ধরেই আমাকে মণ্ডপে উঠতে বলছিল। আমি তখন যাইনি। সাড়াই দিইনি। তাই এখন ছুটতে ছুটতে গেলে হাসবে সবাই। সেজন্য আমি খুব ধীরেসুস্থে উঠে এলাম ওপরে। একটু ভিজেও গেলাম সেজন্য। তাতে কী!
সবাই মিলে বসার চাদরটা উঠিয়ে আরও ভিতরে টেনে আনল। বৃষ্টির ছাঁট আসছে। আমি অবশ্য মেঝেতেই বসলাম। এমন কিছু ময়লা নেই। রত্নাদির সবকিছুতেই বেশি বেশি। আমি নাকি পরিষ্কার পরিছন্ন নই, তারপর হ্যানাত্যানা কত কী যে বলে গেল। বলুক গে, না শুনলেই তো হল। ওকে আমার গল্পের রাজকন্যা করব না। রত্নাদি পক্ষীরাজের গায়ের বোঁটকা গন্ধেই অজ্ঞান হয়ে যাবে, তো চড়বে কী! ওটা ভুলিই হবে।
অবশ্য তার আগে ওকে একটু রোগা হতে হবে। ও আমার ঠিক উলটো। টুবলুদা বলে, ও হচ্ছে দুর্ভিক্ষের কারণ, আর আমি ফলাফল। টুবলুদাটা খুব বাজে। অমনি করে কাউকে মোটা বলতে আছে? রত্নাদিও তো ভুলির মতোই গোলগাল। কই, ওকে তো কিছু বলে না! শুধু ছোটোদের বেলাতেই এত কিছু!
এসব শুনলে খুব দুঃখ হয় ভুলির জন্য। কান্নাও পায় একটু একটু। বাবা কাঁদতে দেখলে রেগে যায়। মা বলে, কান্না পেলে কেঁদে নিতে। কাঁদলে নাকি অনেকটা হালকা হওয়া যায়। অবশ্য আমি আর কতই-বা হালকা হব! বরং ভুলিকে রোজ নিয়ম করে কাঁদালে ওর খানিকটা ওজন কমবে।
এটা আমার একটা নতুন আবিষ্কার। পারিদাদু যোগ ব্যায়াম শেখায় বটে, কিন্তু এটার কথা জানেই না। আমিও এখন বলব না। পরে যখন বিখ্যাত হয়ে যাব, তখন সবাই কেমন হাঁ হয়ে যাবে! হুঁ হুঁ বাবা।
তবে অনেক ভেবে দেখেছি, শুধু কাঁদলে ভুলি তেমন হালকা হতে পারবে না। কান্নাতে আর কত জল থাকে বলো? তাই আমি অনেক মাথা খাটিয়ে একটা গোটা ফর্মুলা বানিয়েছি। যাতে চাইলে অনেকটা করে ওজন কমিয়ে ফেলা যায়। খাতা পেয়েছি যখন লিখে রাখি।
১) বেশ কিছু কাঁচা বরফ চিবিয়ে খেতে হবে। ভুলির দাঁত ছোটো ছোটো। তাই শক্ত বরফ চিবিয়ে খেলে কিছুটা দাঁত ক্ষয় হবে। (তাতে ওজন কমবে)
২) অত ঠান্ডা খেলে সর্দি তো হবেই। বিরাট বিরাট হাঁচি পড়বে। মোটামুটি কুড়ি-তিরিশখানা হাঁচি পড়লে শরীরের আধখানা জলই বেরিয়ে যাওয়ার কথা। (ওজন কমবে)
৩) এবার পেটে এত জল যাচ্ছে, নিশ্চয় হিসু পাবে খুব। (ওজন আরও কমবে)
৪) মা বলে বেশি বেশি জল খেলে নাকি পটি ভালো হয়। (ওই খবরে যেমন বলে, রেকর্ড হারে ওজন কমবে)
৫) এত ঠান্ডা লাগলে জ্বর আসবে না, তাই হয়? জ্বর এলেই বাবা খুব বকবে। আর বাবার বকুনি খেলে কে না কাঁদে? (আগেই লিখেছি কাঁদলে তো এমনিই হালকা হয় সবাই।)
৬) এই শেষেরটা সবচেয়ে দরকারি। জ্বর তো আর সবসময় থাকবে না। ক’দিন পরই ঘাম দিয়ে জ্বর সারবে। তাতেও কত জল বেরোবে! (ওজন কমবে না মানে?)
মাসে এরকম দু-বার করতে পারলেই প্লে-স্কুল থেকে এমনি স্কুলে যেতে যেতে ভুলি আমার মতো হয়ে যাবে। তখন আর দেশে কোনও দুর্ভিক্ষ থাকবে না। ওকে ক্লাসে কেউ খ্যাপাবেও না। তবে এখনও ফ্রিজ থেকে বরফ বের করতে পারিনি বলেই এক্সপেরিমেন্টটা করে ওঠা হয়নি।
এই, হ্যালো হ্যালো? তখন খাতা বন্ধ করে দিয়েছিলাম। বাবাইদা খালি উঁকি মারছিল খাতায়। কেন রে বাবা, যা করতে এসেছ করো না। সে-বেলা তো আব্বুলিশ করে করে, এক ডজন সাদা পুলিশ হয়ে গেছে। আমি বলছি শোনো, এরা শুধু বাইরে গিয়েই বলে টানা তিন ঘণ্টা চুপচাপ বই পড়ে, আসলে মাঝে মাঝে আড্ডা মারে, ফোন ঘাঁটে। আর… আচ্ছা বলেই দিই, সিগারেটও খায়। কী বাজে! আমার দম বন্ধ লাগে।
ওরা যা পারে করুক। আমি বরং গল্পটা নিয়ে ভাবি। সবটা রাজপুত্রদের মতো হলে চলবে না। তখন বলবে নকল করেছি। রাজকন্যাদের যুদ্ধ হবে অন্যরকম। ভুলির মতো রাজকন্যা হলে সে গানও গাইতে পারবে অবশ্য। কারণ, ভুলি ভালোই গান গায়। কিন্তু বড়োরা বললে গায় না। সেদিন ববিপিসিরা এসেছিল, তখন মা কত করে বলল, ‘ভুলি, পুরানো সে দিনের কথাটা গেয়ে শোনা। একবার গা মা।’ কিছুতেই গাইল না বদমাশটা। অবশ্য গাইবে কী, ওর তো দিন পুরোনোই হয়নি। তাই ওকে অন্য গান তুলতে বলেছি।
এই এতটা যখন লিখেছি তখন একটা বেশ কাণ্ড হল। বাইরে তো বৃষ্টি পড়ছে, তাই কুকুরগুলোও মণ্ডপে ঢুকে এসেছে। আমার সঙ্গে যে ছিল তখন, সে এখানে বসেছে আমার গা ঘেঁষে। কেউ কিছু বলেনি। কিন্তু কোথা থেকে চুলে সোনালি রঙ করা একটা ছেলে (দাদা বলতে ইচ্ছা করছে না) ছুটে এল এগুলো তাড়াতে। মণ্ডপে কুকুর ঢুকেছে বলে সে কী চিৎকার! এটা ওদের পাড়া নয় বলে দাদারাও কিছু বলছে না। ওর চিৎকারে সবগুলো কুকুরই এই বৃষ্টির মধ্যেই বেরিয়ে গেল। শুধু আমার পাশের জন গোঁ গোঁ করে গর্জাচ্ছিল। প্রথম থেকেই বলছিলাম না, ও একটু মুডি! একবার ভুক করে ধমকও দিল যেন।
তাতে ছেলেটা গেল আরও রেগে। প্রায় ছুটে এসে ওর দিকে সবে ডান পা-টা তুলেছে, আর তক্ষুনি বদমাশটার তলপেটে পড়ল একটা বেদম লাথ! আমি তো চোখ বন্ধ করে ফেলেছিলাম। তাকিয়ে দেখি রত্নাদি উঠে দাঁড়িয়েছে। ছেলেটাও দাঁড়িয়েছে কোনোরকমে। ও তো আর জানে না রত্নাদি ব্রাউন বেল্ট, তাই তেড়েফুঁড়ে আবার কী একটা বলতে যাচ্ছিল—আবার মার! আমি শুধু রত্নাদিকে হাতটা পিছনে আনতে দেখেছিলাম। তারপর সেটা কোন দিক দিয়ে কী গেল দেখতেই পেলাম না। শুধু সেই আওয়াজে চালার পায়রাগুলো সবাই ডানা ঝাপটে উঠল। তারপর আর বদটাকে উঠতে হয়নি। চার হাত-পায়ে প্রায় লেজ গুটিয়েই পালাল।
তখন রত্নাদি কুকুরটার মাথায় হাত বোলাতে বলাতে বাকিদের দিকে আগুন চোখে তাকাল একবার। চুলগুলো হাওয়ায় একটু একটু উড়ছে। নাকের কাছে ফোঁটা ফোঁটা ঘাম। রেগে গেছে বলে জোরে নিশ্বাস পড়ছে।
কাউকে কিছু না বলে নিজের কালো স্কুটিটায় চেপে বসল দিদি। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “ইলিশ, তুই বাড়ি যাবি?”
আমিও ‘যাই’ বলে ছুট দিলাম।
আরে ততক্ষণে তো দেখে নিয়েছি। রত্নাদির কালো ঘোড়াটা ব্রুম ব্রুম করে মাটিতে পা ঠুকছে। আমি চাপলেই উড়ে যাবে আকাশে।
ছবি-লেখক
জয়ঢাকের সমস্ত গল্প ও উপন্যাস