অনন্যা দাশ -এর সমস্ত লেখা একত্রে

অনিমেষ জেঠু ওদের বাড়িতে এলেই বাড়ির আবহাওয়াটা অন্যরকম হয়ে যায়। মা ভালো ভালো রান্না করেন, পোলো আর রাইলিকে পড়ার জন্যে চাপ দেন না, বাবা অফিস থেকে তাড়াতাড়ি বাড়ি চলে আসেন; সবকিছু যেন বেশ ঢিলেঢালা হয়ে যায়। তবে একটা ব্যাপার ঘটে, ফোন আর টিভির ব্যবহার কমে যায়। টিভি তো প্রায় চলেই না বলতে গেলে আর ফোনেও শুধু কথা বলা। অনিমেষজেঠু আসলে বাবার নিজের দাদা-টাদা কিছুই নন। এককালে বাবাদের প্রতিবেশী ছিলেন, সেই থেকেই বাবার দাদা আর পোলো-রাইলিদের জেঠু। জেঠু সারা বিশ্বে ঘুরে বেরিয়েছেন আর তাঁর অভিজ্ঞতার ঝুলি কখনোই খালি হয় না। উনি এসে যে-ক’দিন থাকেন, সেই ক’টা দিন দেদার মজায় কাটে। আর গরমের ছুটিতে এলে তো কথাই নেই।
এবারে গরমটা একটু বেশিই পড়েছে। জেঠু মাকে বললেন, “জানোই তো, আমি সাধারণত এসির হাওয়া পছন্দ করি না, কিন্তু এবারে তো আর থাকা যাচ্ছে না!”
মা বললেন, “হ্যাঁ দাদা, আর বলবেন না। তাও যদি ফাঁকা জায়গায় থাকতাম। এখানে আশেপাশে ফ্ল্যাট, তাই গরমটা যেন আরও জাঁকিয়ে বসেছে।”
দুপুরের খাওয়াদাওয়ার পর মা ঘুম দিতে গেলেন আর পাশের ফ্ল্যাট থেকে বাপ্পা, তাতাই আর মোম চলে এল জেঠুর কাছে গল্প শুনতে।
জেঠু বললেন, “আজকে যে-ঘটনার কথা তোমাদের বলব সেটা কিন্তু সত্যি ঘটনা। তোমরা তো নিশ্চয়ই জানো, ইংরেজরা একসময় আমাদের দেশকে শাসন করেছিল।”
বাপ্পা প্রবল পাকা। সে বলল, “হ্যাঁ, জানি তো! ইতিহাসে পড়িয়ে পড়িয়ে কী বোর করে!”
অনিমেষজেঠু ওর কথা শুনতেই পাননি এমন করে বলে চললেন, “আমার দাদুর কাহিনি এটা। এটা যে সময়কার কথা, তখন বাংলার মানুষের মনে ইংরেজদের প্রতি একটা ঘৃণা তৈরি হয়েছে। ক্ষুদিরাম বোসের মতন বেশ কয়েকজনকে ফাঁসি দিয়েছে ওরা। আমার দাদুও স্বাধীনতা আন্দোলনের সেই জোয়ারে ভেসে গিয়েছিলেন। মিটিং-মিছিল করে সাধারণ লোকেদের মধ্যে ইংরেজদের প্রতি বিরূপ মনোভাব তৈরি করার চেষ্টা করছিলেন।”
তাতাইটা সবচেয়ে ছোটো। সে বলে বসল, “বিরূপ মনোভাব আবার কী?”
বাপ্পা বলল, “আরে বাবা, যাতে লোকেরা ইংরেজদের পছন্দ না করে!”
“ও!”
“দাদুদের দলে বোমা ইত্যাদি বানানোর শিক্ষাও দেওয়া হচ্ছিল। তাঁরা ইংরেজ অফিসারদের মারার জন্যে প্রস্তুত হচ্ছিলেন। তখন দাদুর বয়স কতই-বা, কুড়ি বা একুশ হবে। রক্ত গরম। মাথায় জেদ চেপে গেল যে কয়েকজন ইংরেজকে মারতেই হবে। কিন্তু তখন দাদুদের অবস্থা খুবই খারাপ, পয়সাকড়ি একদমই নেই কিছু। হেমচন্দ্র কানুনগো বলে একজন বিদেশ থেকে বোমা বানানোর পদ্ধতি শিখে এসেছিলেন। পিকরিক অ্যাসিড, ডিনামাইট এইসব নানা জিনিস জোগাড় করে ঘরোয়া বোমা বানাতে চেষ্টা করতেন দাদুরা। তা সেইরকমই একটা বোমা নিয়ে দাদু একজন সাহেবকে মারতে গিয়ে ইংরেজদের হাতে ধরা পড়ে গেলেন। দাদুর বানানো ঘরোয়া বোমা ফাটলই না! তবু দাদুকে ধরে নিয়ে গিয়ে জেলে পুরে দিল ইংরেজ পেয়াদারা। বোম ফাটেনি আর কারও লাগেনি বলে জেলে গেলেন, না-হলে তো ফাঁসিই হয়ে যেত।
“যাই হোক, যা বলছিলাম। তখনকার দিনের জেলের অবস্থা খুবই খারাপ ছিল। অকথ্য অত্যাচার করা হত কয়েদিদের ওপর। একটা খুবই ছোটো ঘরে চারজন কয়েদিকে রাখা হয়েছিল। তার মধ্যে দাদু ছিলেন একজন। বাকি তিনজন রতনলাল, বিজয় চন্দ আর মুকেশ কুমার। এঁদের চারজনের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে উঠল কিছুদিনের মধ্যেই। একসঙ্গে থাকা যখন, তখন বন্ধুত্ব না হয়ে উপায়ও নেই। খাবারদাবার খুবই বাজে আর খুব কম পরিমাণে দেওয়া হত। অত্যন্ত অপরিষ্কার অবস্থার মধ্যে দিন কাটাতে হত তাঁদের। কিন্তু তার মধ্যেও তাঁরা খুশি থাকার চেষ্টা করতেন হেসে, মজা করে, গান গেয়ে। কেন ওখানে এসেছেন তাঁরা সেই নিয়ে খুব একটা কথা বলতেন না। লাভও ছিল না। পেয়াদারা সবসময় আড়ি পাতত। কে কখন কী শুনে নিয়ে কাকে গিয়ে কী বলবে আর বেঘোরে কারও একটা প্রাণ যাবে। মাঝে মাঝে তাঁদের ঘর থেকে বার করে খোলা চত্বরে নিয়ে গিয়ে রোদের মধ্যে ইট-পাথর বওয়া, ইট ভাঙার কাজ করানো হত আর কাজ ঠিক মতন না করলে চাবুক আর পেয়াদাদের মার। খুবই কষ্টের ছিল সে-জীবন।
“এবার আসল গল্পতে আসি। একদিন একটা ভয়ানক ঘটনা ঘটল। একজন ইংরেজ পেয়াদাকে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেল দাদুদের ঘরে। দাদুরা তখন বাইরে ইট ভাঙতে গিয়েছিলেন। সন্ধ্যার সময় ফিরে এসে দেখলেন ওই কাণ্ড। পেয়াদাদের ওপর সবার রাগ ছিল। সেটাই স্বাভাবিক। তারা প্রচুর অত্যাচার করত কয়েদিদের ওপর, প্রচুর খারাপ কথাও বলত, ক্ষুধার্ত কয়েদিদের দেখিয়ে দেখিয়ে তাদের সামনে খেত। পেয়াদাদের কাউকে একা পেলে কয়েদিরাও তখন বদলা নেওয়ার চেষ্টা করত। দাদু চিৎকার করে খবরটা দিলেন অন্য একজন পেয়াদাকে। খবর পেয়ে কারাগারের ইন-চার্জ রিচ হ্যারিসন নিজে এসে হাজির হলেন। দাদুরা কারাগারের বাইরে ছিলেন, ফিরে ওই কান্ড দেখেছেন বলতে তিনি বললেন, ‘সেটা আমি মানছি, কিন্তু তোদের মধ্যে কেউ একজন কিছুক্ষণের জন্যে এসেছিল। পেয়াদা খুন হয়েছে। তোদের চারজনের মধ্যে কেউ ওই কাজ করেছে। কে সেইজন?’
“চারজনের কেউই মুখ খুললেন না। রিচ হ্যারিসন প্রচণ্ড রাশভারী এবং কড়া মানুষ, কিন্তু তাঁর একটা গুণ ছিল। তিনি ছিলেন নিরপেক্ষ। মানে যে দোষী নয় তাকে তিনি শাস্তি দিতে চাইতেন না। যাই হোক, তিনি ওঁদের চারজনকে বাইরের চত্বরে নিয়ে গেলেন। বেশ কয়েকজন বন্দুকধারী ইংরেজ এবং ভারতীয় পেয়াদা তাঁদের ঘিরে দাঁড়িয়ে রইল যেন এখুনি সবাইকে গুলি করে মারা হবে।
“রিচ হ্যারিসন গলা নামিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী হয়েছিল?’
“তবু চারজনের কেউ কোনও উত্তর দিলেন না।
“তিনি কড়া স্বরে আবার বললেন, ‘কী হয়েছিল?’
এবার আমার দাদু সাহস করে বললেন, ‘আমরা সবাই তো বাইরের পাথর ভাঙার জায়গায় ছিলাম। কাজ শেষ হতে ফিরে এসে দেখি সেই লোক মাটিতে পড়ে রয়েছে এবং মৃত। তখন আমি আপনাদের জানাই।’
“রিচ হ্যারিসন একে একে বাকি তিনজনকেও একই কথা জিজ্ঞেস করলেন। তাঁরা সবাই একই উত্তর দিলেন। ততক্ষণে দাদুদের ওই ঘরটা আপাদমস্তক খোঁজা হয়ে গেছে। খবর এল, যে পেয়াদা মারা গিয়েছিল তার গলায় একটা সরু লম্বা মরচে পড়া পেরেক ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। অত্যন্ত চালাক এবং দক্ষভাবে। সেই জন্যেই তার মৃত্যু হয়েছে। তার পকেট থেকে একটা ব্যাগ-ভরতি তামাক আর কিছুটা নুন পাওয়া গেছে।
“রিচ হ্যারিসন বললেন, ‘ঠিক আছে, তোরা কেউ যখন কিছু বলবি না তখন আমাকেই খুঁজে বার করতে হবে তোদের মধ্যে থেকে খুনি কে। আমি ঠিক বার করেই ছাড়ব। যে নির্দোষ তাকে আমি শাস্তি দিতে চাই না, কিন্তু যে দোষী, যে একজন পেয়াদার প্রাণ নিয়েছে তাকে তো শাস্তি পেতেই হবে। আমি তোদের সবার তল্লাশি নেব।’
“দাদুদের জামাকাপড়ের অবস্থা তো বেশ খারাপ। কত যুগ কাচা হয়নি— ছেঁড়া, ময়লা, দুর্গন্ধে ভরতি। কারও পায়ে চটি রয়েছে, কারও তাও নেই। মাথায় উকুন আর দুর্বল শরীরে অজস্র ঘা। প্রথমেই দাদুকে ধরা হল। দাদুর পকেট থেকে একটা ছেঁড়া খাতা বের হল। সেই খাতাতে দাদু তাঁর পরিবারের সবার নাম লিখে রেখেছিলেন। সেটাই ছিল তাঁর সম্পদ, কারণ তিনি লেখাপড়া জানতেন। দিনে রোজ একবার করে ওই খাতাটা বার করে দেখতেন নামগুলো। এছাড়া ইট-পাথর বয়ে বয়ে আর পেয়াদাদের কাছে মার খেয়ে দাদুর কাঁধের হাড় সরে গিয়েছিল আর কয়েকটা আঙুলও ভেঙে গিয়েছিল।
“রতনলালের তল্লাশি নিতে তাঁর পকেট থেকে একটা খুব পুরোনো তামাকের পাউচ পাওয়া গেল।
“রিচ হ্যারিসন বললেন, ‘ও, তুই বুঝি তামাকের জন্যে ওকে মেরে ফেললি! তামাকের নেশা ভয়ানক নেশা।’
“রতনলাল শুকনো হাসি হেসে বললেন, ‘এই পাউচে যে তামাক ছিল সেটাই আমার শেষ তামাক খাওয়া তাই এটাকে বাঁচিয়ে রেখেছি। মাঝে মাঝে বার করে দেখি শুধু। এখন মনে হয় অভ্যাসও চলে গেছে।’
“মুকেশ কুমারের তল্লাশি নিয়ে কিছুই পাওয়া গেল না। পেয়াদারা তখন ওঁকে মেরে মেরে আধমরা করে ফেলছিল প্রায়। তখন দাদু ভয়ে ভয়ে মুখ খুলে বললেন, ‘ওকে মেরে কী হবে স্যার? ও তো চোখেই দেখতে পায় না ভালো করে। একেবারে চোখ খারাপ। যখন ধরে আনা হয়েছে তখন চশমা হারিয়েছে, তারপর থেকে কিছুই দেখেনি বেচারা! কোনোমতে আমাদের সাহায্যে দিনযাপন করে।’
“রিচ হ্যারিসন পেয়াদাদের বললেন, ‘থামো!’
“তারা থেমে গেল। মুকেশ কুমার কুঁকড়ে মাটিতে পড়ে রইলেন।
“বিজয় চন্দর পকেট থেকেও কিছুই পাওয়া গেল না একটা পুরোনো রঙচটা ছবি ছাড়া। সেই ছবিতে কয়েকজন দাঁড়িয়ে রয়েছে। তাঁর পরিবারেরই হবে হয়তো।
“রিচ হ্যারিসন চারজনের দিকে তাকিয়ে দেখলেন। চারদিক নিস্তব্ধ। যে খুনি তার কপালে নিশ্চিত মৃত্যু, এটা সবাই বুঝতে পারছিল। দুজন পেয়াদা বন্দুক হাতে তৈরি, পারলে চারজনকেই গুলি করে মেরে ফেলে।
“হঠাৎ রিচ হ্যারিসন বলে উঠলেন, ‘বুঝতে পেরেছি! বলে আঙুল দিয়ে একজনের দিকে দেখালেন। তুই-ই তো, তাই না?’
“যাঁর দিকে আঙুল তুললেন তাঁর মুখে অবিশ্বাসের এক ঝলক অভিব্যক্তি ফুটে উঠেই মিলিয়ে গেল। পরক্ষণেই পেয়াদাদের গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে গেল তাঁর দেহ।
“রিচ হ্যারিসন বললেন, ‘ভয় নেই। ভুল লোককে মৃত্যুদণ্ড দিইনি। মুকেশ চোখে দেখতেই পায় না তো গলায় পেরেক ঢোকাবে কী করে? তাই সে খুনি নয়। রতনলাল যদি খুন করত তাহলে লোকটার পকেট থেকে তামাকের পাউচটা নির্ঘাত বার করে নিত। কিন্তু পাউচ-ভরতি তামাক যে-কে-সেই রয়ে গেছে মৃত পেয়াদার পকেটে। বিশের তো হাত ভাঙা, সেও কাউকে মারতে পারবে না। তাহলে বাকি রইল বিজয় চন্দ। ওর পকেটে যে ছবিটা ছিল সেটা দেখে প্রথমে খেয়াল করিনি, পরে মনে হল, আরে সে তো গোপাল চন্দর ছেলে! ওদের তো নুনের ব্যাবসা ছিল। সেই ব্যাবসা লাটে উঠেছে আর তবে থেকে ওরা পুরো পরিবার তো নুনের আইনের বিরুদ্ধে লড়াই করে চলেছে। সেই আইনের প্রতিবাদের জন্যেই তো তাকে জেলে ভরা হয়েছিল!’ ”
“নুনের আইন আবার কী?” এবার বাপ্পাই জিজ্ঞেস করল।
“আরে তখন ইংরেজরা এই বাংলায় আমাদের নুন তৈরি করতে দিত না। সব নুন ব্রিটেন থেকে আসত আর তার ওপর থাকত কড়া ট্যাক্স বা কর। বাংলার নুন ব্যাবসার কোমর ভেঙে দিতে চেয়েছিল ওরা। পেয়াদা নুনের থলি হাতে নিয়ে বিজয়কে দেখিয়ে দেখিয়ে মশকরা করছিল মনে হয়, তখন আর বিজয় নিজেকে স্থির রাখতে পারেননি, শেষ করে দিয়েছিলেন পেয়াদাকে ওই একটা মরচে পড়া পেরেক দিয়ে।”
এতটা বলে জেঠু থামলেন। ওরা চারজন গম্ভীর মুখ করে বসে রয়েছে দেখে জেঠু বললেন, “মনখারাপ কোরো না। স্বাধীনতার জন্যে অত লোক প্রাণ দিয়েছিল বলেই তো আমরা আজ স্বাধীন! এই ঘটনাটার কয়েক বছর পর বাকি তিনজন ছাড়া পেয়ে যান এবং ক্রমে ভালো জীবন কাটাতে শুরু করেন। এই ঘটনাটার কথা আমি শুনেছি আমার বাবার কাছে, আর বাবা শুনেছিলেন তাঁর বাবা বিশ্বনাথ বোসের কাছে। রিচ হ্যারিসন ইংল্যান্ডে ফিরে গিয়েছিলেন ভারত স্বাধীন হওয়ার পর, কিন্তু বেশিদিন বাঁচেননি। দুরারোগ্য এক অসুখের কবলে পড়ে মারা গিয়েছিলেন। আর সেটা তো হবারই ছিল। এতগুলো মানুষের অভিশাপ মাথায় নিয়ে কি আর ভালো থাকা যায়?”