রঞ্জন রায়ের আগের গল্প –ঐরাবত ঐ আসছে তেড়ে, সময়ের অক্ষরেখা পেরিয়ে

তুলিকে নিয়ে সবাই ফাঁপরে পড়েছে। দেখতে দেখতে পাঁচ বছরে পড়ল। কিন্তু এখনও মুখে ঠিক করে কথা ফোটেনি।
না, ঠিক তা নয়। ওর মুখ দিয়ে কথা বেরোয় বটে! কিন্তু সে-সব যত অদ্ভুত কথা। নাহ্, কথা নয়, কিছু শব্দ। তাই ওর একরত্তি দাদা সুনীলের ভারি চিন্তা। সুনীল পড়ে ক্লাস থ্রিতে। ছোটো বোনটাকে ও খুব ভালোবাসে। কিন্তু পাঁচ বছরের বোনটা আচমকা এমনসব উদ্ভট বিদঘুটে শব্দ বলে যে তার মানে বোঝা দায়। আবার হাসিও পায়। কিন্তু তুলির কথা শুনে দাদা হাসলে ওর মুখটা যেন কেমন কাঁদো কাঁদো হয়ে যায়। অবশ্যি সবসময় নয়, কখনো-কখনো তুলিও হাসে। হাসলে ওর খুদে খুদে ঝকঝকে সাদা দাঁতগুলো কেমন ঝিকমিকিয়ে ওঠে।
সেদিন রাত্তিরে বাবা সুনীলের হোম-টাস্ক দেখছিলেন। বললেন, “দার্জিলিং বানানটা ভুল লিখেছ। দেখে ঠিক করে পাঁচ বার লেখো। তাহলে কোনোদিন ভুল হবে না। আচ্ছা, আগে দার্জিলিং বানানটা বলো।”
সুনীল আমতা আমতা করতে থাকে।— “দ-এ আকার, র, জ, হ্রস্ব-ই…”
তুলি একপাশে কার্পেটে বসে পুতুল খেলছিল। হঠাৎ বলে ওঠে, “দারর-জি-কিলিং-কিলিং।”
সবার হাসি আর থামতে চায় না।
এই তো সেদিন মা রান্নাঘর থেকে চেঁচিয়ে বললেন, “সুনু, যা তো, দেখ বোন জলখাবার খেয়েছে কি না। তাহলে চিঁড়েভাজার খালি বাটিটা আমায় দিয়ে যা। আমার এখন হাতজোড়া, এখান থেকে নড়লে মাছটা পুড়ে যাবে।”
সুনীল গিয়ে দেখে কোথায় কী! তুলি বাটি থেকে আদ্দেকটা চিঁড়েভাজা খেয়েছে, খানিকটা মাটিতে ছড়িয়েছে। ওকে দেখে বাটিটা আবার পেছনে লুকোচ্ছে। রকমসকম দেখে সুনীলের হাসি পেয়ে গেল।— “তুলি সোনা, আর খাবে? তাহলে খেয়ে নাও।”
তুলি দু-দিকে মাথা নাড়ে।
“তাহলে খালি বাটিটা আমায় দাও। রান্নাঘরে রেখে আসব।”
তুলি ফের দু-দিকে মাথা নাড়ে।
“দুষ্টুমি হচ্ছে? দাও বলছি! মাকে বাটিটা দিয়ে স্কুলের ব্যাগ গোছাতে হবে।”
তুলি কোনও কথা বলে না। গোল গোল চোখে দাদার দিকে তাকিয়ে থাকে। ওর গালে লেপটে আছে দু-একটা ভাজা চিঁড়ে, একটা বাদামভাজার খোসা আর চিনির দুটো দানা।
“অনেক হয়েছে। এবার দাও বলছি, আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে।” সুনীলের গলার স্বরে একটু কড়া ভাব।
তুলির চোখে আষাঢ়ের মেঘ ঘনায়। তাই দেখে সুনীলের মন ছোট্ট বোনের জন্যে কেমন করে ওঠে।— “না না, আমি বকিনি তো! তুমি আমার সোনা বোন, কে তোমায় বকে দেখি?”
হঠাৎ তুলির ঠোঁট নড়ে। ও নিজের বুকে হাত দিয়ে বলে ওঠে, “হামতিমানু কাস্টা গোকুল।”
সুনীল চোখ কুঁচকে মন দিয়ে বোঝার চেষ্টা করে। ইশারায় তুলিকে বলে—কী বলছিস বোন, কিছু চাই?
তুলি মাথা নাড়ে। তারপর দাদার বুকে হাত ঠেকিয়ে বলে, “ইস্টিমানু কাস্টা গোকুল।”
সুনীল হতাশ। এসব কী বলছে তুলি? এগুলো কাদের ভাষা? পাপাঙ্গুলের দেশের? নাকি ব্রবডিংনাগদের?
সুনীল স্কুলে শিখেছে যে কয়েকটি শব্দ মিলে বাক্য হয়। আর অনেকগুলো বাক্য নিয়ে ভাষা। কিন্তু এলোমেলো আবোলতাবোল কিছু শব্দকে একসঙ্গে করলেই বাক্য হয় না, সেগুলোর অর্থ বা মানে হওয়া চাই, যাতে যে বলছে তার মনের ভাব অন্যেরা বুঝতে পারে। কিন্তু তুলির ওই আবোলতাবোল শব্দগুলো! এগুলোকে ঠিক বাক্য বলা যাবে? কী করে যাবে? ওর মানে তো স্পষ্ট হল না।
তবে তুলি যদি কোনও বিদেশি ভাষা বলতে থাকে? আমরা কি আর সবরকম সাহেবদের ভাষা চিনতে পারি? সুনীল তো ভালো করে ইংরিজিই বুঝতে পারে না। টিভিতে খালি ছবি দেখে।
আচ্ছা, তুলি যদি স্কুলে যেতে পারত? এ-পাড়ায় তুলির বয়সি সব বাচ্চারা স্কুলে যায়। ওর মনটা ভিজে গেল। আজকাল তো বিশেষ বাচ্চাদের জন্য অন্যরকম স্পেশাল স্কুল হয়েছে। বাবাকে বলে দেখবে নাকি?
“অ বোন, তুই স্কুলে যাবি সোনা? দেখবি, কত বন্ধু হবে। খুব মজা।”
তুলি আবার দু-দিকে মাথা নাড়ে। দুই গালে টোল ফেলে হাসে আর বলে, “আড্ডাপাডা বাড্ডাপাডা।”
তখন সুনীল ওকে আর আদর না করে পারে!
তবে ওর কথা বলার ব্যাপারটা! বাবা অফিস থেকে ফিরে এসে মায়ের কাছে সারাদিনের রিপোর্ট শোনেন, তুলিকে আদর করেন। তারপর গম্ভীর হয়ে যান। কিন্তু আজ চা খেতে খেতে মাকে বললেন, “শুনছ গো, অফিস থেকে একজন ভালো স্পিচ থেরাপিস্টের খোঁজ পেয়েছি। খুব নাম, আমার সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছে। উনি একবার দেখবেন। কাল সন্ধেবেলা তুলিকে ওঁর চেম্বারে দেখাতে নিয়ে যাব।”
পরের দিন বিকেলবেলায় মা যখন ওকে সাদা সাটিনের ফ্রক পরিয়ে, চোখে কাজল দিয়ে, চুল আঁচড়ে মাথায় সাদা ক্লিপ লাগিয়ে দিলেন তখন ওকে পরির মতো দেখাচ্ছিল। ঠিক যেন জ্যোৎস্নার সিঁড়ি বেয়ে আকাশ থেকে নেমে আসা কোন পরি।
সন্ধেবেলা বাবা-মায়ের সঙ্গে তুলি গেল স্পিচ থেরাপিস্টের চেম্বারে। ফিরে এসে সবাই একটু গম্ভীর। উনি বলেছেন সময় লাগবে। আরও বলেছেন, তুলি অনেক বিষয়ে স্পেশাল না কী যেন। উনি ওর কথাবার্তা, মানে ওই আবোলতাবোল রেকর্ড করে নিয়েছেন। বলেছেন যে ওগুলো অর্থহীন খাপছাড়া প্রলাপ নয়। ওর মধ্যে নাকি একটা প্যাটার্ন আছে। আরও বলেছেন, তুলিকে নানারকম গান শোনাতে। উনি পরীক্ষা করে দেখেছেন যে ওর নাকি মিউজিক্যাল ইয়ার আছে। ও আলাদা করে স্বর চিনতে পারছে।
তুলি যেন একটু ক্লান্ত। চেহারাটা টসটস করছে। মা থার্মোমিটার দিয়ে বললেন একটু জ্বর জ্বর ভাব আছে। কফ সিরাপ খাইয়ে দেওয়া হল। সকালে সব ঠিক হয়ে যাবে।
তুলি আর সুনীল একই খাটে শোয়। মা বলে গেলেন, “সুনু, বোনের খেয়াল রাখিস। একটু এদিক-ওদিক হলে আমাকে ডাকবি।”
রাত্তিরে বৃষ্টি শুরু হল। অসময়ের বৃষ্টি। জানালার কাচে বিদ্যুতের ঝলক দেখতে দেখতে আর ঝিঁঝিঁর গান শুনতে শুনতে সুনীল ঘুমিয়ে পড়ল।
রাত কত হয়েছে কে জানে। সুনীলের মনে হল একবার তুলিকে ছুঁয়ে দেখে গা বেশি গরম হল কি না। কিন্তু ওর পাশের জায়গাটা যে খালি! তুলি কি খাট থেকে পড়ে গেল? চমকে উঠে বসে চোখ রগড়ে ও তুলিকে খুঁজতে লাগল।
বৃষ্টি থেমে গেছে। বন্ধ জানালাটা কেউ খুলে দিয়েছে। মেঘের ফাঁক দিয়ে চাঁদ। আর আকাশ থেকে এক ফালি জ্যোৎস্না এসে বিছানায় পড়েছে, ঠিক যেন সাদা রঙের সিঁড়ি। সুনীলের দেখা ম্যাগনাম মলের এসকালেটর।
কিন্তু সেই সিঁড়ি বেয়ে কারা নেমে আসছে? ফুটফুটে দশজন বাচ্চা মেয়ে। সবার পরনে সাদা সাটিনের ফ্রক আর মাথায় সাদা রিবন। সেই ফ্রকের কী সুন্দর ফ্রিল, মেমসায়েবের গাউনের মতো লম্বা ঝুল।
আর তুলি? ওরও পরনে বিকেলের সেই পোশাক। ওরা এসে তুলির সামনে হাঁটু গেড়ে বসল। তুলি মিষ্টি হেসে সবাইকে হাত ধরে তুলে দাঁড় করাল। জানালা দিয়ে ভেসে আসছে পিয়ানোর সুর।
আর কী আশ্চর্য! তুলি মাথা নেড়ে বলল, “উঁহু, জি মাইনর স্কেল দাও।”
সুর বদলে গেল। এবারে গান আর নাচ শুরু হল। ওরা সবাই হাত ধরাধরি করে হালকা পায়ে নাচল আর গাইল—
‘হামতিমানু কাস্টা গোকুল, ইস্টিমানু কাস্টা গোকুল,
হিয়ার হিয়ার! আড্ডাপাডা, বাড্ডাপাডা।’
(পিয়ানো ও ভায়োলিন)
শোন শোন জোছনপরি,
উই আর অল ভেরি সরি,
আর হবে না এমনতর ভুল।
মাথায় বাঁধা রেশমি ফিতে,
এসেছি গো তোমায় নিতে,
মোবাইল হাতে আমরা বড়ো কুল।
দার্জিলিং কিলিং কিলিং
হ্যাভ সামথিং ফিলিং ফিলিং
হালেলুইয়া! আড্ডাপাডা, বাড্ডাপাডা।
হামতিমানু কাস্টা গোকুল,
ইস্টিমানু কাস্টা গোকুল,
হালেলুইয়া! আড্ডাপাডা, বাড্ডাপাডা।
গানের সুরের সঙ্গে সঙ্গে জ্যোৎস্নার সিঁড়ি বেয়ে ওরা সবাই বাতাসে মিলিয়ে গেল।