শিবশঙ্কর ভট্টাচার্যের সমস্ত লেখা

“বনোয়ারি বলছিল তোমাদের যত ফালতু গল্প। শুনলে আমার ভঁইসটাও হাসবে। ভূত বলে কিছু আছে নাকি! সই বলে, জঙ্গলে থাকে বরমদেও আর টিপাটিপিরা। ওদের ভূত বলে ডাকলে খুব রাগ করবে। ক’জন দলেও থাকে পাহাড়ের গুহায়। তারাও কেউ ভূত বলে শুনিনি। ওসব তোমাদের শহুরে ব্যাপার, এখানে ওদের জায়গা নেই। ও হ্যাঁ, কিছু জিন আছে বটে, কমজোর।”
beshi লছমি এসে ওর ওপর খুব রাগ করতে লাগল, “তোর কাজকাম নাই রে! সনঝা হতে চলল দুধ দোওয়া, লাকড়ি কাটা সব বাকি! যা যা, মানুষ পেলেই বসে যাবে বাত করতে। ওর কোনও কথা শোনো না তোমরা, সব বকোয়াস। কামচোর আদমি আমার। কী খাবে রাতে বলো। যাবার সময় আমার হুঁকাটা দিয়ে যা, ধরিয়ে দিবি। ঝটসে যা। আমি বলি কী, খিচুড়ি হোক আলু-কপি দিয়ে।”
কে বলবে ওরা বর-বউ! এই খুদে বন বাংলোর সব কাজকর্ম সামলায় এই দুজন। লছমি আবার বয়সে বড়ো বনোয়ারির থেকে, তাগতও বেশি। বনোয়ারিটা রোগা, চিমসে আর তোতলা। এটা বোধ হয় বউয়ের বকুনি খেয়ে-খেয়েই হয়েছে। তবে রাতে খুব ভালো কেন্দরি আর বাঁশি বাজায়। তাই শুনে নাকি ওদের প্যায়ার হয়ে যায়। তারপর শাদি। এখনও বাচ্চা হয়নি। অবশ্য বয়েসও ফুরিয়ে যায়নি। একজনের বাইশ, আর একজন পঁচিশ। মারপিট লাগলে বউটাই জেতে।
যাই হোক, হুঁকো ধরিয়ে দিয়ে গেল বনোয়ারি আর ওতে ফুঁক দিতে দিতে লছমি বারান্দার থামে রোদ্দুর পিঠে বসল। ওর কথাগুলো যেমনই হোক, গলার আওয়াজটা বেশ মিঠে। যেন কুয়োর মধ্যে ট্যামটেমি বাজছে।
“বুনো জানেই-বা কী আর বলবেই-বা কী? ক’দিন আগেও তো নাকে সর্দি লেগে থাকত। বেশি দানোর কথা তো বললই না। আরও কত আছে! ছিপাছিপির কথা বলেছে? জানলে তো বলবে। চিপাচিপির কথা শুনেছ ওর কাছে? হুহ্! কড়ুয়া মে তেল নেই তো গিটির গিটির।”
বড়ো করে নাক-কান-মুখ দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে শিবনেত্র হল লছমি। বনোয়ারিকে ও ডাকে বুনো। হালচাল দেখে কে কর্তা, কে গিন্নি বুঝে ওঠা যায় না। বিকেলের আলো কমতে কমতে সন্ধের দিকে ঝুঁকেছে। লছমি উঠে ছুটল উনুন ধরাতে। মোষ দুটোকে খামারে ঢুকিয়ে কাঠের বোঝা কাঁধে বনোয়ারি চলল রসুইঘরে। অন্ধকার হওয়ার আগেই আমাদের ঘরে চলে এল আঙ্গোটি আর হ্যারিকেন। আঙ্গোটি কাকে বলে জানো না বুঝি? লোহার বাটিতে জ্বলন্ত কাঠকয়লা। গা গরম থাকবে আর একটু আলোও হবে। বসে গপ্পো করতে হ্যারিকেন না হলেও চলে।
বনোয়ারিকে বলতে হ্যারিকেন সরিয়ে বারান্দায় রেখে এসে বসল আমাদের কাছে। খানিক বাদে গরম পেঁয়াজি আর মুড়ি-মটরশুঁটির ধামা নিয়ে লছমিও চলে এল ঘরে।
আমরা পাঁচজন কলেজের পরীক্ষার পর এসেছি বেড়াতে। কুড়ির নীচেই সবার বয়েস। ফার্স্ট ইয়ারে পড়ি জিওলজি নিয়ে। সুন্দরগড়ে ভালো খনিজ লোহা আর কপার আছে। দিনের বেলা কয়েক ঘণ্টা যন্ত্রপাতি হাতে প্রসপেক্টিং করি, দুপুর আর রাতে বিশ্রাম। বড়ো কাঠের তৈরি একটাই ঘর, মেঝেও কাঠের। একসঙ্গেই মস্ত ঢালাও বিছানাতে ঘুমোই। খণ্ডডহরের ঝরনায় চান করি, খাওয়া চমৎকার। ছেলেমেয়েরা মিলে দিব্যি আছি। মেয়েরা আলাদা ঘরে থাকতে চায়নি, ঘর তো একটাই। তাছাড়া ডোরা আর মুন্নির খুব ভূতের ভয়। তাই ভূতের গল্পই চলছে রাত্তিরে। ভাগ্যিস বাথরুমটা আছে লাগোয়া। উজানটাও ভিতু খুব। লছমি আর বনোয়ারিকে দিদি আর দাদা বলে ডাকি। ওরাও এই ঘরেই ঘুমোয়। ঠান্ডার দিন বলে রাতে বাইরে যাওয়ার পাট নেই। মাঝে মাঝে নাকি হাতির দল নেমে আসে দলমা পাহাড় থেকে। আর চিতাবাঘ, ভালুও। লোমরী, হুড়ার তো আছেই। এই আমাদের প্রথম এক্সকার্শন। গাইড আসতে পারেননি হঠাৎ জ্বর আসায়। গাইড মহাশ্বেতাদি রউরকেল্লায় থেকে গেছেন, সেরে উঠলে চলে আসবেন।
জঙ্গলের এইখানটা একটু বেশি নির্জন, তাই বোধ হয় কেউ আসে-টাসে না। খণ্ডধর বা খণ্ডডহরের বিশাল উঁচু ঝরনাটা এখান থেকে সরাসরি দেখা না গেলেও শব্দ কানে আসে আর জলের একটা ধারা পাথরের স্তূপের মাঝে বয়ে যাচ্ছে। তার পাড়েই খাড়া পাহাড় আর পুরোটাই ঘন জঙ্গলে ঢাকা। পাথর কুড়োতে কুড়োতে বাংলোটা খুঁজে পেয়েছে মুন্নি। পছন্দ হয়ে যাওয়ায় আর কোথাও যাইনি। থাকার কথা ছিল সরকারি রিসর্টে, কে আবার খোঁজাখুঁজি করতে যায়। দিব্যি আছি এখানে। জায়গাটা বেজায় বড়ো বড়ো গাছে ঢাকা বলে শঙ্কু একটু ক্যাওম্যাও করলেও এখন দেখছি খুব খুশি। একদম নিরিবিলি জায়গা এটা।
মুড়ি চিবোতে চিবোতে মুন্নি লছমির কাছে ঘেঁষে বসল, “লছমিদিদি, তুমি কাদের সব নাম বললে, তারা কারা? ভূত তো নেই বললে!”
“নেই-ই তো! থাকবে কী করে? বরমদেও আছে না! ভূত ঢুকতেই দেবে না এই বনে। ঢুকলেও মিঠা পাথর বানিয়ে পুষে রাখবে পাহাড়ে। কেঁদে কূল পাবে না।”
“আর কারা আছে বলছিলে না? লুকাছুপি নাকি?”
“ওরা তো আছেই! ছিপাছিপি, টিপাটিপি আর চিপাচিপি। ওরা না থাকলে বনও থাকবে না।”
“ওরা বুঝি ফরেস্ট গার্ড? বন পাহারা দেয়?”
“ফরেস গাট তো আমার বুড়ো পরদাদা। ওরা এমনি থাকে।”
“দেখা যায় না?”
“দেখা দিলে যায়। তবে খুব লাজুক ওরা। দিনের বেলায় লুকিয়ে থাকে, রাতে…”
“রাতে কী করে? ও, লছমিদিদি!”
“দূর বোকা! ভয় কী রে? ওদের তো চিনতেই পারবি না।”
“মানে?”
“যদি বলি ছিপাছিপি এই হুঁকো সেজে বসে আছে, চিনতে পারবি? ওরা ওইরকম লুকিয়ে থাকে মানুষের মধ্যে। মানুষের গায়ের গন্ধ ভালোবাসে। কত কাজ করে দেয়! তবে রেগে গেলে আলাদা কথা।”
বনোয়ারি এতক্ষণ কোনও কথা বলেনি। এখন ধামা থেকে শেষ মুড়ি ক’টা তুলে নিয়ে উঠে দাঁড়াল, “যাই, ভঁইস দুটো দাপাচ্ছে কেন দেখে আসি।”
ও বাইরে যেতেই ডোরা চেঁচাল, “অন্ধকারে গেলে কেন, ও বুনোদাদা? যদি ভালুক আসে!”
বনোয়ারির হাসি শোনা গেল। সঙ্গে সঙ্গে কতজন হেসে উঠল বনের ভেতর থেকে।
“হায়েনার দল এসেছে বনে। ওরা ওভাবে ডাকে, হাসির মতো শোনায়। ও কিছু না। যাই, খিচুড়ি বোধ হয় হয়ে এল। গন্ধ পাচ্ছি।”
লছমিও চলে গেল। রান্নাঘরটা বাইরে।
রাত অনেক হল। বনোয়ারি বাইরে বসে কেন্দরি বাজাচ্ছে। কম্বল চাপা দিয়ে শুয়ে শুয়ে শুনছি। কেন্দরির আওয়াজ কেমন চাপা কান্নার মতো শোনায়। আমরা ঘুমিয়ে পড়বার আগে পর্যন্ত বুনোর কেন্দরি বাজতেই থাকল। সারা বন-পাহাড় যেন সেই কান্নায় গলা মিলিয়ে কাঁদছে। পাথর, বড়ো বড়ো গাছ কান্নায় গলে গলে পড়ছে। আধখানা চাঁদ পুব আকাশ থেকে গাছের মাথা ডিঙিয়ে উঠে আসার পর ঘুম এল চোখে।
মুন্নির ফিসফিস গলার চাপা আওয়াজ পেলাম পাশ থেকে, “রাতের রান্নাটা কে করল রে শিবু? ওরা তো আমাদের সঙ্গেই ছিল সারাক্ষণ!”
বাইরে ঝিঁঝিঁর ডাকের সঙ্গে ওর কথার শেষটা মিলিয়ে গেল। বাইরে কাদের চলার ঝিপঝিপ শব্দ। হিম পড়ার টুপটাপ আওয়াজ কানে আসছে।
সকালে উজান লোটা হাতে মাঠে যেতে যেতে আমার পাশে ঘনিয়ে এল। ঠান্ডায় ওর গলা ভাঙা, “দূর! ওদের খুব কুসংস্কার। বরমদেও, না ছাই। ভূত-টুত তো নেই বলেই জানি।”
খুব রাগ হল। বাবু আগাগোড়া কম্বলের তলায় কাঁপলেন। সে কি ঠান্ডায়, না ভূতের ভয়ে? একবারও বাইরে যাওয়ার নাম করল না পর্যন্ত। ভূতের ভয় নাকি নেই! বললাম না কিছু। ও আমাদের ক্যাপ্টেন। রাতের খিচুড়িটা কী যে ভালো ছিল, বলবার নয়! বাড়িতে অমন পাই না।
সারাদিন পাহাড়ে পাহাড়ে কাজ করে ফিরলাম বেলা দুটোয়। আজ ভাত আর দেশি মুরগা। বাঘা খিদে পেয়েছিল সকলের। ঠান্ডায় চান করার কথা মনেই পড়েনি কারও। জঙ্গল থেকে এক বুড়ো এল লাঠি ঠুকঠুক করতে করতে। সে নাকি লছমির পরদাদা। বন পাহারার কাজ করে। শ সালের জ্যাদা উমর, চাকরি বা থাকলেও বন পাহারা দেয়। দাদাজি অনেক কাহানি জানে দেখলাম। এখানে নাকি আগে বাঘ আর হাতি ছিল অনেক। হিরণ আর লকড়া বাঘ এত ছিল না! লোমরীর দল বাঘের আগে আগে জানান দিয়ে ফিরত, তাকে বলে ফেউ। আর হনুর দল ভিড় করে থাকত গাছে গাছে। কত বড়ো বড়ো গাছ ছিল বনে! নিজের থেকে মরে শুকিয়ে না গেলে সেই গাছে কেউ কুড়ুল ঠেকাত না। সিংবোঙা পুরো বন পাহাড় দেখেশুনে রাখতেন। মাটির তলায় কী হত তার খবরই রাখে না এখনকার লোকেরা। জানতে চায় বলেও মনে হয় না।
লছমির পরদাদা হল ওর দাদুর বাবা। বন পাহারা দেয় বলে মনে হয় খুব দেমাক। প্রথম দেখায় কথাই বলতে চাইল না। লছমি আলাপ করিয়ে দেবার পর এসে বসল বারান্দায় পেতে রাখা ঝ্যাঁথলায়। ঝ্যাঁথলা হল খেজুর পাতায় বোনা পাটি। বাতাসার গায়ে এই ঝ্যাঁথলার দাগ দেখতে পাবে।
রোগা, ঢ্যাঙা—এই বয়সেও টানটান চেহারা পরদাদার। ডোরা কাছে গিয়ে, হুঁকো ধরিয়ে, পিঠে মাথায় হাত বুলিয়ে দেবার পর খুশি হয়ে গপ্পো শুরু করল। এত বছর ধরে বনে জঙ্গলে কাটিয়ে কত যে গপ্পো জমা হয়ে আছে! শোনাবার লোক পেয়ে ঝুলি খুলে বসল বুড়োদাদু। বিকেল হল। ডুংরির চূড়া থেকে রোদ মুছে গেল। অন্ধকার হয়ে ওশ পড়তে লাগল। লছমি ওকে রাতে থেকে যেতে বলল। রাতে বনের গল্প শোনা হবে।
মুন্নি আজকেও খিচুড়ির বায়না করায় বুড়ো খুব খুশি। আঙ্গোটির ওপর হাতের পাতা সেঁকতে সেঁকতে বুড়ো আমাদের মুখের দিকে তাকাল। বাজ পড়ার মতো বিচ্ছিরি গলার আওয়াজ।
“শোন তবে। জীবজন্তুদের চোখে দেখতে পাওয়া যায়, চলার শব্দ শোনা যায়, গায়ের গন্ধে টের পাওয়া যায়। যারা আঁধারে মিশে থাকে, প্রাণ নেই কিন্তু তারা আছে, তাদের চিনতে পারা যায় না। তাদের ইচ্ছে না হলে দেখতে পাবি না। ওরা কিন্তু নজর রাখছে তোর ওপর। বরমদেও আর সিংবোঙা বন রক্ষা করে। মানুষ বনের ক্ষতি করলে তারা ছেড়ে দেবে না। বনকে ভালোবাসলে তারাও তোর ভালো করবে। সরকার বাঁধ বানাল, চাষের জন্য দরকারে জল দেবে বলল। জমা জলে কত গ্রাম, কত বন ডুবে নষ্ট হল। কত জীবজন্তু, কত মানুষ ঘরছাড়া হয়ে গেল। সিংবোঙা বান ডাকিয়ে বাঁধ ভেঙে দিল। অথবা দু-বছর বৃষ্টিই হল না। মাটি শুকিয়ে ফেটে গেল। খোদার ওপর খোদকারি করলে ভালো হয় না কখনও।”
লছমি মুড়ির ধামা নিয়ে এসে বসল মাঝখানে, “ওসব সবাই জানে, তোমার গপ্পোগুলো বলো। সেই খনির গল্পটা বলো আজ, অনেকদিন শুনিনি।”
পরদাদা কিছু বলার আগেই বনোয়ারি ফোঁস করে উঠল— “তোর কথাতেই সব হবে, নাকি? না না, তুমি টিপাটিপির কথা বলো, দাদা। ওরা শোনেনি কেউ।”
খানিক চুপ করে থেকে নাক-মুখ দিয়ে তামাকের ধোঁয়া ছেড়ে সোজা হয়ে বসল পরদাদা, “শুধু টিপাটিপি না রে, ওরা তিনজন আছে! ছিপাছিপি, টিপাটিপি আর চিপাচিপি। এমনিতে খুব হাসিখুশি আর মিশুকে, রেগে গেলে তিনজন মিলে একজন হয়ে যায়। তখন কী করবে না করবে বলা যায় না। ওদের চিনতে পারা মুশকিল। ধর এই ঘরেই চেনা কেউ হয়ে বসে গল্প শুনছে এখন। অথবা দেয়ালের ইট হয়ে নজর রাখছে। তাই আন্দাজ করে নিতে হয়।
“তখন আমি ছোটো। ঝুপড়ির মধ্যে থাকি বাবা-মায়ের সঙ্গে। ভাইবোন মিলে আমরা সাতজন। আমি সবার ছোটো বলে আদরে আদরে থাকি। ঝুপড়ির দেয়াল কঞ্চি আর কাশফুলের ডাঁটি দিয়ে তৈরি। মাটির মেঝেতে শুকনো পাতার মধ্যে গা ঢাকা দিয়ে ঘুমোই। আকাশমণি আর সোনাঝুরি গাছের শুকনো পাতার তলায় ঘুমোনোর মজাই আলাদা। তলায় পাতার স্তূপ, ওপরে পাতার স্তূপ, মাঝে আমরা ক’জন আরামে রাত কাটাই, শীত করে না। সেই পাতা কুড়িয়ে আনতে বনে গেছি ভাইবোন মিলে। আর মেটে আলু, পিঁপড়ের ডিম খুঁজে পেলে আনব। মৌচাক পেলে তো কথাই নেই।”
ডোরা উশখুশ করল চাপা গলায়, “পাতার মধ্যে পোকামাকড় থাকে না?”
“না রে। পাতায় থাকা তেলের গন্ধে পোকামাকড় পালিয়ে যায়। সাপ থাকতে পারে, তারা কিছু বলে না।”
“বাবা-মা বা বড়ো কেউ যেত না তোমাদের সঙ্গে?”
“ওরা তো কাঁড় ধনু নিয়ে শিকারে যেত রাত থাকতে উঠে। বুনো শুয়োর, হিরণ আর খরগোশ মেরে মাংস খেতাম আমরা কাঠের আগুনে পুড়িয়ে।”
“ভাত খেতে না?”
“ভাত খেতে পেতাম বছরে একদিন। রথযাত্রার দিন লঙ্গরখানায়। পঞ্চাশ মাইল হেঁটে যেতে হত ভাত-ডাল খেতে। এত ভারী জঙ্গলে ধান চাষ করবে কে? তবে বনে খাবারের অভাব ছিল না।
“আমরা বনকুল আর জাম কুড়িয়ে খেতে খেতে বড়ো ঝোড়ায় করে পাতা কুড়োচ্ছি, চারটে ঝোড়া ভরে গেছে। পেয়েছি একটা মস্ত বড়ো মেটে আলু। তার ওজন আমাদের দুটোর সমান। ঝুপড়ি অবধি বয়ে নিয়ে যাব কী করে? তখন দিনের আলো কমে গেছে, সন্ধে হয় হয়। খালি হাতেও ফিরে যাওয়া যায় না। বসে বসে ভাবছি কী করা যায়।
“হঠাৎ বন থেকে বেরিয়ে এল একদল বন মহিষ। কোনও ক্ষতি করল না। আমাদের পাশে বসে মানুষের গলায় বলল, ঝোড়া তুলে আমাদের পিঠে উঠে বোস তোরা। আমরা বোকা মানুষ, অবাক হতে শিখিনি। উঠে বসলাম পিঠে। রাত হবার আগেই পৌঁছে গেলাম ঝুপড়ির কাছে। আমাদের পিঠ থেকে নামিয়ে ওরা পাখা মেলে উড়ে গেল বনের মধ্যে। কে না জানে ওটা ছিপাছিপির কাজ!
“হতে পারি তখন আমরা ছোটো, বোকাও বলতে পারিস। তাই বলে আমাদের চোখে দেখা ঘটনা তো মিথ্যে হয়ে যায় না! বুনো মোষ মানুষের গলায় কথা বলছে, ডানা মেলে উড়ে যাচ্ছে—এইরকম তো কতবার হতে দেখলাম। খনির কথাটা শোন তবে।
“সাহেবরা জানতে পারার অনেক আগে থেকেই এই বন-পাহাড়ের লোকেরা জানত কোন পাহাড়ে লোহা আছে, কোথায় তামা পাওয়া যায়, নদীর কোন বালিতে সোনা থাকে। ওদের কাছে দরকারি ছিল লোহা। হাজার বছর ধরে চুল্লিতে সেই লোহা পাথর গলিয়ে তারা অস্ত্র বানাত। শিকারের অস্ত্র, কাঠ কাটার অস্ত্র আরও কত কী। ছোটোরাও খুঁজে বেড়াত লোহা পাথর। জঙ্গলে লুকোনো গুহায় ঢুকে পাতালে যাবার রাস্তা থাকলেও ছোটোদের যাওয়া বারণ ছিল। বড়োরা যেত মশাল জ্বেলে, দল বেঁধে হাতে অস্ত্র নিয়ে। ছোটোরা ওসব পাবে কোথায়? কাঠে কাঠ ঘষে আগুন জ্বালতেও শিখিনি। একটা চকমকি পাথর নিয়ে চললাম আমি, আর জুরানভাই খনির মুখ খুঁজবে। তখন একটু বড়ো হয়েছি। দুজনে দুটো বড়ো মেটে আলু নিয়েছি পুঁটুলি বেঁধে। খিদে পেলে কাজে লাগবে। জলের কথা মনেই ছিল না। অবশ্য পরে তার দরকার হয়নি আমাদের।
“একটা পাথরের ফাটল থেকে বাদুড় বার হতে দেখে বুঝলাম, এখানেই আছে সেই লুকোনো গুহা। আমাদের রোগাপাতলা শরীর হলেও খুব কঠিন ছিল সেখানে ঢোকা। বোধ হয় এটা আসল পথ নয় গুহায় ঢোকার। ঢোকার পর গুহা নেমে গেছে নীচে। একটু দূর থেকেই কুপকুপ করছে অন্ধকার। শুকনো পাতা জড়ো করে আগুন জ্বালতে অনেক দূর অবধি নজর চলল। চকমকি পাথর ঠুকে আগুন জ্বালানো যায় বোধ হয়। কতকালের শুকনো শিকড়বাকর মাথার ওপরকার পাথর ভেদ করে নীচের মেঝেতে জাল বুনেছে, পাশ কাটিয়ে এগোনো মুশকিল।
“কানে ফিসফিস শব্দ পেয়ে থেমে গেছি। কারা যেন কথা বলছে! তারপর তারা এল। হালকা ধোঁয়ার মতো নীলচে শরীর তাদের। খানিক আমাদের মতোই ছোটো মাপের। কাঁধের সঙ্গে লাগানো দু-জোড়া করে পাতলা ডানা। আমাদের তখন পালাই পালাই ভাব। আগুনটাও কমে এসেছে, নজর চলছে না ভালো। তাছাড়া পালাব কোথা, তারা যে ঘিরে রেখেছে আমাদের। ফিসফিস করে বলছে, আয় আমাদের সঙ্গে, খনি দেখাই।
“পায়ে পায়ে গেলাম ওদের পিছুপিছু। এবার যা দেখলাম, তাতে আমাদের দম বন্ধ হয়ে এল। কোথা থেকে এক বিন্দু আলো এসে পড়েছে গুহার ভেতর। তাতে জ্বলজ্বল করে জ্বলছে রাশি রাশি সোনালি পাথর। এ যে সোনার খনি রে বাবা! দেখেশুনে গলা শুকিয়ে এল। ছায়ারা মাথার ওপর গোল হয়ে উড়ছে আর বলছে, আরও চাই? এরপর আছে হীরার খনি। সাতশো রাজার ধন।
“হঠাৎ কী মনে হল, বললাম, কিছু চাই না। এখান থেকে ফিরে যেতে চাই ঘরে। আমরা পাতার ঘরে থাকি, এত সোনা নিয়ে কী করব? দুটো লোক রাজা হলে বাকিরা তো আরও গরিব হবে। কী হবে এত সোনা দিয়ে? কোন কাজে লাগবে? যেতে দাও আমাদের।
“অমনি ওরা হাওয়ায় মিশে কোথায় চলে গেল। একটা কথা কানে এল— তোরা বেঁচে গেলি। টিপাটিপির আশীর্বাদ পেয়ে এবার ফিরে যা। ব্যস, গুহা আবার শুনশান, অন্ধকার। আবার শুকনো পাতা জড়ো করে আগুন জ্বেলে ফেরার পথ পেলাম। ফাটল দিয়ে বাইরে এসে প্রাণ পেলাম।”
খিচুড়ি খেয়ে হাত চাটতে চাটতে লছমি তাকাল বুড়ো পরদাদার মুখের দিকে। ওর মুখে দুষ্টু হাসি, “আগে শোনা গল্পের সঙ্গে এবারকারেরটা মিলল না। ও তুমি বানিয়ে বলছ বুড়ো। খুব দুষ্টু তুমি।”
বুড়ো চোখ মটকাল, “সব কি আর আগের মতো থাকে রে। জল-মাটি-হাওয়া পেলে বীজ থেকে গাছ হয় না? বিশ বছর আগের সেই ছোটো লছমি পালটায়নি? গল্পও বলতে বলতে পালটায়। এখনকার সত্যিটাই সত্যি। চিপাচিপিকে বলিস, রান্নাটা খুব ভালো হয়েছে। এখন ঘুমোতে দে।”