অনন্যা দাশ -এর সমস্ত লেখা একত্রে

মাঝরাতে কিসের যেন একটা খট খট শব্দে রেখাদেবীর ঘুমটা ভেঙে গেল। ওটা কিসের আওয়াজ? কয়েকদিন ধরেই যেন মনে হচ্ছে ওই রকম একটা কিছু শব্দ শুনছেন কিন্তু কিছুতেই বুঝতে পারছেন না কোথা থেকে শব্দটা আসছে। ওঁর স্বামী নেভিতে কাজ করেন বলে বাড়িতে থাকেন না বেশির ভাগ সময় আর বাচ্চারা তো নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে। এত রাতে বাইরে গিয়ে দেখতেও ঠিক সাহস হচ্ছে না। পরদিন বাইরে গিয়ে বুঝতে চেষ্টা করবেন ঠিক করলেন। ছোটো টাউনে থাকেন ওঁরা। চারিদিক বেশ ফাঁকা ফাঁকা। রাতের বেলা ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে যায় তাই বাইরে যেতে মোটেও ইচ্ছে করে না। লোকে ভূতের ভয় দেখায়, বুনো জন্তুর ভয় দেখায়, আরো না জানি কত কী! তাই শব্দটাকে পাত্তা না দিয়ে আবার ঘুমিয়ে পড়লেন রেখাদেবী।
পরদিন ভোরে উঠে বাচ্চাদের ওঠার আগে তাদের জলখাবার তৈরি করবেন বলে জোগাড়োযন্ত্র করছেন এমন সময় তিনি রাতের শব্দের কারণটাকে দেখতে পেলেন। একটা ছোটো কুকুরছানা। খুবই রোগা টিংটিঙয়ে, যেন অনেক দিন খায়নি। সারা গায়ের লোম নোংরা হয়ে গায়ের সঙ্গে লেপটে আছে। বাইরে যে ঘর মোছার ন্যাতাটা শুকোতে দিয়েছিলেন বেচারা সেটাকে খাওয়ার চেষ্টা করছে। মনে মনে বললেন রেখাদেবীই, ‘ও তার মানে এই কুকুরছানাটাই রাতে শব্দ করছিল! যাক বাবা ভয়ের কিছু নয়।’
“হুশ, হুশ! যা ভাগ!”বলে ছানাটাকে তাড়িয়ে দিলেন তিনি। কুকুর একটা কিনবেন সেটা ঠিক হয়েই আছে কিন্তু সেটা এই রকম কিছু নয়। টগবগে অ্যালসেশিয়ান একটা কিনবেন সেটা মনে মনে স্থির করে রেখেছেন। ওই রকম বড়োসড়ো চেহারার কুকুর সঙ্গে থাকলে আর ভয়ের কিছু থাকে না।
উনি রান্নাঘরের কাজে মন দিলেন। একটু পরেই আবার ঘুট ঘুট ঘুট শব্দ। আবার জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখলেন তিনি। কুকুরছানাটা আবার ফিরে এসেছে। আবার ওই কাপড়ের টুকরোটাকে খেতে চেষ্টা করছে। এবার রেখা দেবীর নরম মন ভিজে গেল। আহারে কী প্রচন্ড খিদের জ্বালায় বেচারা কাপড়ের টুকরো খেতে চাইছে। তিনি কয়েকটা পাউরুটি নিয়ে গিয়ে বাইরে দিয়ে এলেন। ওমা কুকুর ছানাটা গপ গপ করে সব কটা পাউরুটি খেয়ে ফেলল। এদিকে ততক্ষণে বাচ্চারা সব ঘুম থেকে উঠে পড়েছে। রাজু আর রিয়া যমজ, তাদের বয়স আট আর কাজু সব চেয়ে ছোটো, তার বয়স দুই।
রাজু আর রিয়া তো কুকুরটাকে খেতে দেখেই বলল, “মা, আরো কয়েকটা পাউরুটি দাও। কুকুর ছানাকে খাওয়াব!”
রেখাদেবী আরো দুটো পাউরুটি দিলেন। ক্ষুধার্থ কুকুরছানা সেই দুটোকেও খেয়ে ফেলল। তাই না দেখে বাচ্চারা আনন্দে লাফালাফি জুড়ে দিল।
রিয়া বলল, “মা, কী মিষ্টি কুকুর ছানা! ওকে আমরা পুষব!”
কাজুও তাই শুনে বলে উঠল, “পুষব, পুষব!”
রেখাদেবী ওদের বঝাতে চেষ্টা করলেন যে উনি ওদের জন্যে ভালো জায়গা থেকে সুন্দর মিষ্টি কুকুরছানা কিনে এনে দেবেন ওদের বাবা আসলে কিন্তু বাচ্চারা কিছুতেই শুনবে না। ওই বাইরের কুকুরছানাটাকেই ওদের পছন্দ হয়ে গেছে আর সেও খাবার আশায় পিছনের দরজায় গ্যাঁট হয়ে বসে আছে। নড়াচড়ার নাম নেই! একবার খেতে পেয়েছে যে আর যায় ওখান থেকে!
রেখাদেবী কিছুতেই ওই নোংরা কুকুর ছানাকে ঘরের মধ্যে আনতে চাইছিলেন না। রাজু আর রিয়া তখন জল দেওয়ার পাইপটা নিয়ে কুকুছানাটার গায়ে জল ছিটিয়ে তাকে স্নান করিয়ে ফেলল। চারজনে মিলে জল ছিটিয়ে খুব খেলা হল।
রেখাদেবী আবার বোঝাতে চেষ্টা করলেন, “ও বাইরের কুকুরছানা, ওর কোন অসুখ থাকতে পারে। ওই রকম ভাবে বাইরে থেকে নোংরা কুকুরছানা ঘরে নিয়ে আসাটা ঠিক নয়!”
রাজু প্রায় কেঁদে পড়ে বলল, “ওকে তো আমরা ধুয়ে ফেলেছি মা। ও তো আর নোংরা নয়! ওর সাদা লোম দেখাও যাচ্ছে এখন।”
রিয়ার মাথায় আবার খুব বুদ্ধি, সে বলে উঠল, “ঠিক আছে, পশুদের ডাক্তার কাকুকে বলছি। উনি একবার ওকে চেকআপ করে দেবেন। তাহলে তো তুমি ওকে রাখতে দেবে?”
রেখাদেবী আর কী বলবেন এর পর? ডাক্তার কাকু বলতে ডাক্তার সুনীল ঘোষ। ওদের বাড়ির তিনটে বাড়ি পরে থাকেন। পশুদের চিকিৎসক তিনি। মেন রোডে ওঁর নিজের চেম্বারও আছে।
তাঁকে ফোন করে বলতেই তিনি তাঁর ক্লিনিক থেকে একজনকে পাঠিয়ে দিলেন। সে এসে চট করে কুকুরছানাটাকে তুলে নিয়ে গেল। কুকুরছানাটা কোন বাধাও দিল না। সঙ্গে অবশ্য রাজু, রিয়া, কাজু আর রেখাদেবীও গেলেন।
সব কিছু পরীক্ষা হল। ডাক্তার কাকু বললন, “ও মনে হয় কারো পোষ্য ছিল কারণ কাউকে কামড়ানোর চেষ্টা একেবারেই করছে না। আর কিছুদিন খেতে পায়নি বলে রোগা কিন্তু এমনিতে অবস্থা ভালোই। ওকে বাড়িতে রাখলে কোন সমস্যা হওয়ার কথা নয়। ওর গায়ের লোমগুলো জট পাকিয়ে গিয়েছিল তাই সুখরাম ছেঁটে দিয়েছে। এবার নিয়মিত স্নান করালে আর ব্রাশ করে দিলে আর কোন অসুবিধা হবে না।”
ব্যস ফেক্লু ওদের বাড়িতে চলে এল। তার স্বভাব সত্যিই খুব ভালো। বাচ্চারা ওর সঙ্গে হুটোপাটি করে খেলে, যা খুশি করে কিন্তু সে কিছুই করে না, রেগেও যায় না। কাজু তো ওর কানও মুলে দেয় মাঝে মাঝে তাও সে চুপ করে সব সহ্য করে। যেন এই পরিবারের কাছে সে যে কতটা কৃতজ্ঞ সেটা সে বোঝে।
তবে এর পর যা ঘটল সেটা অভাবনীয়।
একদিন রেখাদেবী দুপুরে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। রাজু আর রিয়া তখন স্কুলে গেছে। ঘুম থেকে উঠে রেখাদেবী দেখলেন কাজুকে পাওয়া যাচ্ছে না। বাড়ির প্রতিটা ঘর খুঁজে দেখলেন তিনি। নাহ, কাজু কোথাও নেই। তারপর তাঁর খেয়াল হল যে পিছনের দরজাটা হয়তো খোলাই ছিল কাজু মনে হয় সেই দিক দিয়েই বেরিয়ে গেছে। গিয়ে দেখলেন ঠিক তাই, পিছনের দরজাটা খোলা। তিনি ছুটে প্রতিবেশিদের বাড়িতেও গেলেন। ওঁদের জায়গাটা ফাঁকা ফাঁকা ছোটো টাউন বলে তত বাড়ি নেই ওঁদের রাস্তায়। সবাইকে জিগ্যেস করার পরও যখন কাজুকে পেলেন না তখন বাধ্য হয়ে তিনি পুলিশে খবর দিলেন।
এদিকে ওখান থেকে আধ মাইল দূরে গাড়ি চালকরা একটা পাগলা কুকুরের জ্বলায় হয়রান। কুকুরটা কিছুতেই কাউকে রাস্তা দিয়ে যেতে দিচ্ছে না। ঘেউ ঘেউ করে তেড়ে আসছে। সেই পাগলা কুকুর আসলে আর কেউ নয় ফেক্লু! সে এখন আর ছোটো কুকুর ছানাটি নেই। ভালো খাবার দাবার খেয়ে বড়ো সড়ো হয়ে গেছে। তারপর লোকজন গাড়ি থেকে নেমে ভালো করে দেখতে বুঝতে পারল ওমা কুকুরটা আসলে পাগলা নয়। একটা ছোটো বাচ্চা রাস্তার মাঝখানে ঘুমিয়ে রয়েছে আর কুকুরটা তাকে পাহাড়া দিচ্ছে! যাতে বাচ্চাটার লেগে না যায় তাই কাউকে রাস্তা দিয়ে যেতে দিচ্ছে না!
রেখাদেবী ঘুমিয়ে পড়েছিলেন কিন্তু ফেক্লু লক্ষ করেছিল যে কাজু পিছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে তাই সে ওর পিছু নিয়েছিল। কাজুকে না পেয়ে রেখাদেবী এতটাই দিশেহারা হয়েছিলেন যে তিনি খেয়ালই করেননি যে ফেক্লুও বাড়িতে নেই।
অবশেষে লোকে পুলিশকে খবর দিতে তারা দুয়ে দুয়ে চার করে কাজু আর ফেকলুকে তুলে নিয়ে বাড়িতে পৌঁছে দিল। রেখাদেবী কাজুকে ফিরে পেয়ে পুলিশের কাছে সব শুনে ফেক্লুর গলা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বললেন, “ফেক্লু রে! ভাগ্যিস সেদিন তুই আমাদের বাড়িতে এসে কাপড়ের ন্যাতা খাচ্ছিলি আর বাচ্চারা তোকে বাড়িতে নিয়ে এসেছিল। নাহলে আর কাজুকে আস্ত পেতাম না আমরা!”