
আধুনিক যুগ বিজ্ঞানের যুগ। এই যুগে সবকিছুর প্রতিই আমাদের একটা বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গী থাকা উচিত। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গী দিয়ে বাংলাভাষার প্রবাদগুলোকে দেখলে বোঝা যায় সেগুলি মোটেও বিজ্ঞানসম্মত নয়। তাই এগুলোর খুব শিগগির আধুনিকীকরণ দরকার।
উদাহরণ হিসাবে একটা প্রবাদ নেওয়া যাক –‘কান টানলে মাথা আসে’। প্রথম কথা, শুধু কান টানলেই যে মাথা আসে তা তো নয়। চুল টানলেও আসে, কান টানলেও আসে (সর্দির নাক টানা অবশ্য আলাদা), সাঁড়াশি দিয়ে দাঁত টানলেও আসে। হঠাৎ কানের প্রতি এমন পক্ষপাত কেন?
দ্বিতীয় কথা হচ্ছে কান টানলে কি সবসময়েই মাথা আসে? যদি কারো বাঁ কানটা দড়ি দিয়ে জানালার শিকে বেঁধে ডান কান ধরে টানা হয় তবে মাথা আসতে পারে না। যদি কারো বাঁ কানে দশ নিউটন বলপ্রয়োগ করা হয় আর ডান কান ধরে পাঁচ নিউটন বলে টানা হয় তবে মাথাটা বাঁ দিকে যাবে। অর্থাৎ যে ডান কান ধরে টানছিল সে বলবে, ‘কান টানলে মাথা যায়’। আবার ধরা যাক ক আর খ দুটো ছেলে। খ ছেলেটি ক এবং একটা জানালার মাঝে দাঁড়িয়ে। এখন খ-এর কানে একটা দড়ি বেঁধে জানালার শিকে এক পাক ঘুরিয়ে ক-র হাতে দিয়ে বললাম টানো। এবার ক দড়ি ধরে টানলে খ জানালার দিকে, অর্থাৎ ক-র থেকে দূরে সরে যাবে। এক্ষেত্রেও কান টানলে মাথা ‘যাচ্ছে’।
কানে টান মেরে মাথা আনতে গেলে একটা ন্যূনতম বল দরকার। একটা পুঁচকে ছেলে যদি দারা সিং-এর কান ধরে টানে তবে কি আর মাথা আসবে? মাথার স্থিতিজাড্য কাটাবার জন্য প্রয়োজনীয় এই বলকে আরম্ভ বল বা থ্রেশোল্ড ফোর্স বলা হয়। কান টানলে মাথা আসবে তখনই যখন টানটা এই আরম্ভ বলের চেয়ে বেশি হবে। ‘বল’ জিনিসটার মান-এর সঙ্গে দিকনির্দেশ করাও সমান জরুরি। কেউ যদি কারো কান ধরে ওপরদিকে টানে তবে বলা যাবে ‘কান টানলে মাথা ওঠে’। আবার নীচের দিকে টানলে বলতে হবে ‘কান টানলে মাথা নামে’। এই দুই ক্ষেত্রে সবসময়েই টানটা আরম্ভ বলের চেয়ে বেশি হতে হবে। বলা বাহুল্য, আরম্ভ বলের মান একেকজনের ক্ষেত্রে একেকরকম। মাথামোটা বা কানভারী লোকেদের আরম্ভ বল বেশি লাগে।
আরো অনেক ব্যাপার আছে। যারা নির্লজ্জ, এক কানকাটা তাদের ক্ষেত্রে মাত্র একটা কান ধরে টানলে তবেই মাথা আসবে। যেদিকের কানটা কাটা সেদিকে মাথা যাবার কোন প্রশ্ন নেই। ঝামেলা কম (উদাহরণ- ডানকান ফ্লেচার)। আর দু’কানকাটাদের তো কান টানার কোনো ব্যাপারই নেই – তাই তারা নির্ভয়ে রাস্তার মাঝখান দিয়ে হাঁটে। যাদের কানপাতলা তাদের ক্ষেত্রে ভয়টা হচ্ছে হ্যাঁচকা টানলে কানটা না ছিঁড়ে বেরিয়ে আসে – তাহলে আর মাথা আসবে না। এমনও হতে পারে কারো কারো কান টানলে শুধু ইলাসটিকের মতো বেড়েই যায় – মাথাটা যেখানকার সেখানেই থাকে। এদের স্থিরমস্তিষ্ক বলে। বাকিরা অস্থিরমস্তিষ্ক। আর লজ্জায় যাদের মাথা কাটা গেছে, তাদের তো ‘মাথাই নেই তার মাথাব্যথা’।
এসব কথা বিচার করে দেখলে ‘কান টানলে মাথা আসে’ কথাটার পরিবর্তন যে কতটা জরুরি তা টের পাওয়া যায়। সমস্ত দিক হিসেব করে এ বিষয়ে নতুন একটা প্রবাদ তৈরি করা খুব শক্ত। দুইকানবিশিষ্ট লোকেদের জন্যে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে প্রবাদটাকে ঠিকঠাক করে বলা যেতে পারে – ‘কোন ব্যক্তির দুই কানে প্রযুক্ত বিপরীতমুখী আকর্ষণ বলের অন্তর (বা বিয়োগফল) আরম্ভ বলের সমান বা বেশি হলে অধিক মানের বলটির অভিমুখে ব্যক্তিটির মাথার সরণ হবে।’ এতবড় প্রবাদ মনে রাখা শক্ত। তাই ছোট করে বলা যায় – ‘কান টানলে মাথা আসতেও পারে, নাও আসতে পারে।’
এটাতেও ভুল আছে। আমরা আগেই আলোচনা করেছি কান টানলে মাথা আসা, না আসা ছাড়াও ওঠা, নামা, স্থির থাকা ইত্যাদি নানা ঘটনা ঘটতে পারে। তাই প্রবাদটা হওয়া উচিৎ – ‘কান টানলে মাথার যে কী হবে কিচ্ছু বলা যায় না।’ এখানেও ভুল আছে। আমরা এই প্রবাদে ধরেই নিচ্ছি যে কানটার অস্তিত্ব আছে এবং সেটা টানা হতে পারে। অথচ আমরা একটু আগেই দেখলাম যে কান ছাড়া লোক (uncanny বা cannot) হতেই পারে। আর কান ধরে টানাটা মোটেই কিছু আহামরি কিংবা উচিৎ কাজ নয়।
আরো বহু অবৈজ্ঞানিক প্রবাদ চারদিকে ছড়িয়ে আছে। যেমন ‘বামন হয়ে চাঁদে হাত’ – যেন লম্বা লোকেরা প্রতিদিন একবার চাঁদটা ছুঁয়ে দেখে নেয়! যেমন ‘যেখানে ধোঁয়া সেখানেই আগুন’ – যেন শীতের সকালে যখন আমাদের মুখ দিয়ে শ্বাস ছাড়লে ধোঁয়া বেরোয় তখন পেটের ভেতর আগুন জ্বলে। যেমন ‘চোরের মায়ের লম্বা গলা’ – যেন জিরাফের ছানাপোনারা সবাই এক একটা সাক্ষাৎ চোর।
তাই বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গী দিয়ে দেখলে এসব প্রবাদে কান না দেওয়াই ভালো।