শুভাশিস বিশ্বাসের আগের লেখা-অন্য নীল

ছেলেবেলায় আমাদের কাছে জন্মাষ্টমী মানে ছিল ঝুলন। হারু তোর মনে আছে তোদের বাড়ির বারান্দায় আমরা সবাই ঝুলন সাজাতাম। বাসবেরও মনে থাকার কথা। মোটামুটি ঝুলনের তিনচার দিন আগে থেকেই লেখাপড়া ডকে উঠত, সে নিয়ে অবশ্য আমাদের কোন আফশোশও ছিল না। দাদুর বাগান থেকে ঘাসের চাপ কোদাল দিয়ে খুঁড়ে আনতাম, বর্ষা কালের সেই মাটির নিচে কেঁচো লেগে থাকত। সেই ঘাসের চাপ দিয়ে তৈরি হত পাহাড়, চাষের জমি, খেলার মাঠ। পাহাড়ের মাথায় ছোট ছোট প্লাস্টিকের সৈন্য দাঁড়িয়ে থাকত বন্দুক হাতে। পুরো জায়গা জুড়ে যার যা পুতুল আছে তাই দিয়ে সাজিয়ে দিতাম, ছেলেবেলার সেই কল্পনার জগতকে বাস্তবে ফুটিয়ে তুলতাম। খুব মজা লাগত।
ওহো একটা পুকুরও বানাতাম। তাতে আবার একটা টিনের লঞ্চ, সলতে তেলে চুবিয়ে আগুন ধরিয়ে তার পেটে ঢুকিয়ে দিলে ফট ফট শব্দ করে চলত। আর একজন মনুষের কথা না বললেই নয়। হারুর এক মামা ছিলেন। তা তিনি ছিলেন আমাদের সকলের মামা। খুব ভালবাসতেন আমাদের। উনি কথা বলতে পারতেন না। শব্দ করে আর আকার-ইঙ্গিতে কথাবার্তা চলত। আমাদের অবশ্য তাতে কিছু সমস্যা ছিল না। সেই মামার বাঁ-হাতে ছিল অসীম শক্তি। আমাদের দলে, আমাদের সঙ্গে তিনিও লেগে যেতেন ঝুলনের কাজে।
এই ঝুলন সাজানো নিয়ে পাড়ার বন্ধুদের মধ্যে তলে তলে একটা প্রতিযোগিতা ছিল। প্রত্যেকেই ইশকুলে গিয়ে সবাই দাবি করতাম আমাদেরটাই বেস্ট। সন্ধ্যা হলে সবাই পাড়ায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে ঝুলন দেখতাম। যার যার ঝুলনের কাছে সবাই একটা পাহারাদার বসিয়ে রাখত। না হলে হয় কেউ ঘেঁটে দেবে নয়তো পুতুল চুরি হবে।
আমাদের পাহারাদার ছিল সেই মামা, তাকে দেখে কেউ ভয়ে ট্যাঁ ফুঁ করত না। কেউ নষ্টামি করবার তাল করলে মামা শুধু তার হাত চেপে ধরত, ব্যাস ওতেই তার প্যান্ট হলুদ। অসীম শক্তি ছিল তাঁর বাঁ হাতে।
অনেকে বাড়িতে গেলে তালের বড়া খেতে দিত, দিব্যি সেই তালের বড়া পকেটে ঢুকিয়ে নিয়ে তেলচিটে প্যান্ট পরে ঘুরে বেড়াতাম।
তবে সব চেয়ে ভাল ঝুলন হত আমাদের নৈহাটি অরবিন্দ রোডের ধর্মশালাতে। কী যে সুন্দর সাজাত! একটা পুরো গ্রামের ছবি পুতুল দিয়ে তুলে ধরত। হাঁ করে দেখতাম। একটা ছোট ফোয়ারা বানাত। তার জলের মাথাই একটা প্লাস্টিকের পিংপং বল থাকত। সেইটা শূন্যে জলের মাথায় নাচানাচি করত। একমনে তাকিয়ে থাকতাম।
এই যে গল্পের ছলে এত সব কিছু বললাম, এই সব কিছুই কিন্তু আজ থেকে প্রায় পাঁচ দশক আগের নৈহাটির ছবি। কিন্তু সত্যি বলছি সব কিছুই আমার কাছে এখনো দিনের বেলার মত পরিষ্কার। চোখ বুঝে ভাবলে সব কিছুই মনে পড়ে। ভাবতে ভাবতে এক সময় এক সময় বুকের ভিতরে মোচড় দিয়ে ওঠে, চোখের কোনে বাষ্প জমে। বুকের ভিতরে সেই ইটচাপা দুঃখ এখনো বয়ে বেড়াই, আর ভাবি একবার যদি সেই দিনগুলো ফেরত পাই… শুধু একবার…
শীর্ষচিত্রঃ সংগৃহীত