জয়ঢাকের অভিযান লাইব্রেরি- এভারেস্ট-এরিক শিপটন(অনু-বাসব চট্টোপাধ্যায়) অন্নপূর্ণা-মরিস হারজগ(অনু তাপস মৌলিক) কন-টিকি অভিযান- থর হেয়ারডাল (অনু-শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায়)

স্ভেন হেডিন একাধারে একজন সুইডিশ ভূগোলবিদ, টপোগ্রাফার, অভিযাত্রী, ফটোগ্রাফার ও চিত্রশিল্পী। ১৮৬৫ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারিতে সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে জন্মগ্রহণ করেন। মৃত্যু: ২৬ নভেম্বর, ১৯৫২, স্টকহোম।
এই আত্মজীবনীতে নিজের জীবনভর অভিযাত্রার দুর্ধর্ষ সব অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করেছেন হেডিন। রোমহর্ষক উত্তর মেরু অভিযানের নায়ক সুইডিশ অভিযাত্রী নর্দেনস্কিওল্ডকে দেখে অনুপ্রাণিত হন এবং পনেরো বছর বয়সেই ভবিষ্যতে উত্তর মেরু অভিযাত্রী হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। পরে তাঁর অভিযাত্রার গতিমুখ পরিবর্তিত হয়ে এশিয়ার দিকে ধাবিত হয়। নিয়তির ফেরে কাস্পিয়ান সাগরতীরের ঝড়ের শহর বাকুতে আসেন আর সেখান থেকেই যাত্রা শুরু করেন এশিয়ার পথে। শুরু হয় রাশিয়া, ককেশাস আর পারস্য হয়ে প্রায় সমগ্র এশিয়া ভ্রমণের অভিজ্ঞতা অর্জন। বাধাবিঘ্ন বিপত্তির সম্মুখীনও হন প্রচুর। তুলে ধরেন দেশীয় সমাজ, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ভূগোল আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বিবরণ। গবেষণার নিরিখে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই লেখাচিত্র তারই সাক্ষ্য বহন করে। MY LIFE AS AN EXPLORER স্ভেন হেডিনের অসামান্য সৃষ্টি। ১৯২৬ সালে কাসেল অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেড-এর হাত ধরে বইটি প্রথম প্রকাশিত হয়।
দ্বিতীয় পর্ব
॥ চার॥
মেসোপটেমিয়া হয়ে বাগদাদ
বুশহর সম্ভবত আমার দেখা এশিয়ার সবচাইতে অখাদ্য শহর। এইখানে থাকা বা কাজে আসা শাস্তির সামিল। গাছগাছালির চিহ্নও নেই, ইতিউতি এক দুটো খেজুর গাছ দাঁড়িয়ে। আছে শুধু দোতলা সব সাদা সাদা ঘরবাড়ি। চারদিকে কানাগলি। একফোঁটা ছায়া নেই কোত্থাও। সারাবছরই প্রখর রোদ, গ্রীষ্মকালে তো অসহ্য গরম। আমি একচিলতে ছায়াতে দাঁড়িয়ে নিজেই সেখানে ১১০ ডিগ্রি ফারেনহাইট মেপেছি। সে নাকি ১১৩ ডিগ্রিতেও উঠে যায় কখনও। পারস্য উপসাগরের এই উষ্ণ অঞ্চলে প্রাণের চিহ্ন অপ্রতুল।
আমি সেখানে ক’জন ইউরোপিয়ানদের সঙ্গেই ছিলাম। লোকগুলো ভালো। ছাদে মশারি টাঙিয়ে শুয়েছি। কিন্তু সূর্য ওঠার আগেই আবার উঠে গিয়ে ছায়ার নীচে ঢুকতে হত। নয়তো গায়ে ফোস্কা-টোস্কা পড়ে সে এক অসহ্য যন্ত্রণা।
ব্রিটিশ স্টিমার অ্যাসিরিয়া বুশহরের খোলা জাহাজঘাটায় এসে নোঙর করল একদিন। তড়িঘড়ি তৈরি হয়ে তাতে বোর্ডিং করলাম। পয়সা বাঁচাতে খোলা ডেকের টিকিটই কাটতে হল অবশ্য। স্টিমারটা বম্বে এবং বসরার মধ্যে মালপত্র আর লোকজন আনা-নেওয়া করে। ভারতীয়, পার্সি এবং আরবি যাত্রীতে গিজগিজ করছে স্টিমার। অবশ্য পারস্য উপসাগর পেরোতে সময় বেশি নেয়নি যদিও। চারদিকে ভালো করে চোখে বুলিয়ে আনবার আগেই প্রকাণ্ড নদী শৎ-অল-আরবের মুখে চলে এল সে। ইঞ্জিনের গতি কমিয়ে ক্যাপ্টেন তখন সাবধানে জলবেষ্টিত বদ্বীপের ঘোলা নদীর মোহনায় স্টিমার ঢুকিয়েছে। টাইগ্রিস এবং ইউফ্রেটিসের সঙ্গমস্থল থেকে এই নদীর উৎপত্তি। আর সেটি এমন কাদা আর বালি বয়ে আনে যে প্রতিবছর গড়ে ১৭৫ ফুট করে পারস্য উপসাগরকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে সে।
নদীপথ ধরে চলেছি এইবারে। সমতল পাড়ে খেজুরের ঝোপ, ছোটো ছোটো কুঁড়ে আর কালো কালো তাঁবু। বিভিন্ন গবাদি পশু আর ভেড়ার পাল চরে বেড়াচ্ছে। ছাইরঙা মোষের দল শিং বাগিয়ে কাদামাটি গুঁতোচ্ছে। বসরার বাইরে নোঙর করল অ্যাসিরিয়া। আর সঙ্গে-সঙ্গেই গোটা ত্রিশেক নৌকো ছপাছপ দাঁড় ফেলে দৌড়ে এল কাছে। এ-দেশে এগুলোকে বেলেম বলে। নৌকোগুলো স্টিমার থেকে যাত্রী আর মালপত্র নামিয়ে নিয়ে যায়। নদীর জল যেখানে বেশি সেখানে বেঁটেখাটো দাঁড় আর কাজে আসে না, প্রশস্ত পাটা নামানো হয়। তারপর অগভীর জলে আরবি মাল্লারা লাফিয়ে নেমে নৌকো ঠেলে নিয়ে গিয়ে সরু সরু খুঁটিতে নৌকো বাঁধে।
নদীর ধারে ইউরোপীয় দূতাবাস, সওদাগরি অফিস-কাছারি আর কলকারখানা রয়েছে। আমার সেখানে আর কিছুই করার নেই দেখে একখানা বেলেম ভাড়া করে ফেললাম—দেখতে শুনতে ডিঙির মতোই। নিজেই বাইতে লাগলাম ঘূর্ণিজলের এক খাঁড়ি ধরে। ঘন জঙ্গল পেরিয়ে মনোরম এক খেজুর বনে হাজির হলাম গিয়ে তারপর। ভ্যাপসা গরম, একফোঁটা বাতাস নেই। তবুও খেজুরের ম ম গন্ধে মন ভরে এল। পারস্যের এক কবি বলেছিলেন, বিভিন্ন জাতের সত্তর রকমের খেজুর নাকি ফলে এ-দেশে। আর তিনশো তেষট্টি রকমের কাজে লাগে। খেজুরকে ‘ইসলামের আশীর্বাদ বৃক্ষ’ বলা হয়। নিঃসন্দেহে এই বৃহৎ অঞ্চলের আপামর মানুষের পুষ্টির জোগান দেয় এই গাছ।
তুর্কিরা এই আরবি বসরা জয় করেছিল ১৬৬৮-তে। বারান্দাযুক্ত দোতলা সব ঘরবাড়ি। জাফরিকাটা খিড়কির সরু পথ গলে ঘরের মেয়েরা দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় চোখে রাখে। খোলা বারান্দার চা দোকান। সেখানে তুর্কি, আরবি, পার্সি আর স্থানীয়রা বসে চা বা কফিতে চুমুক দেয়। মুঠোয় ধরা নার্গিলেহ্-এর (হুঁকো) নল।
তবে শহরটি নোংরা এবং জ্বরের উপদ্রব রয়েছে। যত আবর্জনা সব শেয়াল আর হায়েনাদের দখলে। রাতে মরুবালিতে টেনে নিয়ে যায় এসে। অলিগলির পচাগলা আবর্জনা এরাই সাফ করে।
মে মাসের শেষদিনে প্যাডেল-হুইল স্টিমার ‘মেসিদিয়েহ্’ বসরা ছেড়ে বাগদাদের উদ্দেশে রওনা দিল। আপার ডেকে একটা কেবিন পেয়ে গেলাম আমি। জাহাজের অফিসাররা সবাই ব্রিটিশ আর কর্মচারীরা তুর্কি। যাত্রীদের মধ্যে এক আমিই কেবল সাদা চামড়ার, বাকিরা সব প্রাচ্যদেশীয়। জাহাজের ডেক বড়ো অদ্ভুত জিনিস। এই একটি স্থানে কত রঙ্গতামাশা যে দেখা যায়! একধারে আরবি ব্যাপারীরা বসে ট্রিকট্র্যাক খেলছে। অন্যধারে পার্সিরা বসে ধূমপান সহযোগে সামোভারের (চা) ভাণ্ডে তুফান তুলছে। কেউ-বা নীচে হারেমের পথ ধরেছে। সেখানে নীল রঙের ঝালর দেওয়া অস্থায়ী ঘরে মখমলি বিছানায় বসে রূপজীবীরা খদ্দেরের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। তাকিয়ায় ঠেস দিয়ে চা আর মিষ্টান্নাদি চেখে সময় কাটাচ্ছে। সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলেছে ধূমপান। ওদিকে ততক্ষণে এক দরবেশ এসে উদাত্ত কণ্ঠে লোকজনকে হিতোপদেশ শোনাচ্ছে। তারপর নারকোল মালার ভিক্ষাপাত্র এগিয়ে ধরছে সবার সামনে।
টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস—বেহেশতের দুই নদী কুর্নাতে এসে মিশেছে। আরবিদের মতে, এই দুই নদীর মধ্যবর্তী উপদ্বীপের মুখটাই হচ্ছে আসলে মূল ইডেন গার্ডেন। প্রয়োজনে প্রমাণস্বরূপ জ্ঞানবৃক্ষ ও হারাম বৃক্ষ দুটোও দেখিয়ে দেবে তারা। অন্য মতে, ইউফ্রেটিস হচ্ছে পুরুষ নদী আর টাইগ্রিস নারী। আর এই কুর্নাতেই বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিল তারা। অথচ ম্যাপে তাকালে এই দুই নদীর সঙ্গমস্থলকে কোনও এক ষণ্ডের দুটো শিং বলেই মনে হয়। বস্তুত, কুর্না শব্দটার সঙ্গে ল্যাটিন ‘কর্নু’-র যথেষ্ট মিল রয়েছে।
পশ্চিম এশিয়ার সর্ববৃহৎ নদী ইউফ্রেটিস, ১৬৬৫ মাইল লম্বা। আর্মেনিয়ার উচ্চভূমি থেকে এর উৎপত্তি। পবিত্র ভূমি আরারাত থেকে দূরে নয়। তুলনায় ছোটো নদী টাইগ্রিসের হাত ধরে সে মেসোপটেমিয়ায় প্রবেশ করেছে। মেসোপটেমিয়াকে বলা হয় ‘দ্য ল্যান্ড বিটুইন রিভারস’। আরবিতে ‘অল-ইয়েজিরেহ্’, অর্থাৎ দ্বীপ। এই ভূমিতে আজও তৎকালীন যুগের দুই শক্তিধর রাষ্ট্র অ্যাসিরিয়া ও ব্যাবিলনের শতাব্দী-প্রাচীন যুদ্ধবিগ্রহের গন্ধ পাওয়া যায়। ব্যাবিলন তখন খুবই উন্নত রাষ্ট্র। সেখানকার অহংকারী প্রজারা স্বর্গের সিঁড়ি বাবেল মিনার তৈরির অপরাধে ঈশ্বরের বিরাগভাজন হয়েছিল। অন্যদিকে টাইগ্রিসে তটে প্রাচীন নিনেভেহ্ নগরের ধ্বংসাবশেষের সন্ধান মেলে। একসময় রাজা সেনাচেরিব, তাঁর পুত্র এসারহাদ্দন এবং রাজা সারদানাপালুসের রাজধানী ছিল এই নিনেভেহ্।
ইউফ্রেটিসের মুখ পেরিয়ে ধীরে ধীরে ঘূর্ণি-জলের টাইগ্রিসে উজানে ঢুকল আমাদের স্টিমার। আর্মেনিয়া আর টরসের তাজা বরফগলা জলে পুষ্ট এই নদী। বাগদাদ পৌঁছতে এখনও চারদিন বাকি। সবজেটে রঙের অগভীর জল, আবর্জনা, চোরাবালির চর—বার বার স্টিমারের তলা হেঁচড়ে যাচ্ছিল বালিতে। তখন নুড়ি-পাথর সরিয়ে, লোকজন ও মালপত্রের ভার কমিয়ে ধীরে ধীরে এগোতে হচ্ছিল। এই করতে করতে চারদিনের জায়গায় দিন সাতেক লেগে গেল আমাদের। অথচ ভাটির পথে বাগদাদ থেকে বাসরা ফিরে যেতে সময় নেয় মাত্র বিয়াল্লিশ ঘণ্টা।

অজরা সমাধিতে এসে লাগল আমাদের স্টিমার। খেজুরগাছের কালো কালো ছায়া পড়েছে জলে। আমুদে ইহুদি ছেলেপিলে সব নৌকো নিয়ে হইহই করে মালপত্র আর যাত্রী তুলে নিতে এল। নদীতীরে বন্য মন্টেফিক আর আবু মহম্মদ উপজাতির যাযাবরেরা পশু চরাচ্ছে। হাতে বর্শা, মাথায় ঘোড়ার চুলের লম্বা টুপি। সে আবার কাঁধ বেয়ে নেমে ওড়নায় মতো পতপত করছে।
ঝাঁকে ঝাঁকে পালতোলা নৌকো (কশতি) ঘুরে বেড়াচ্ছে নদীর বুকে। মৃদু বাতাসে ফুলে ফুলে উঠছে পালগুলো। দূরে কুর্দিস্তানের নীলচে পর্বতমালা দৃশ্যমান। একপাল মোষ জলে নেমে সাঁতরে পার হচ্ছে। রাখাল একটা বল্লম হাতে এদের একসারিতে রাখার চেষ্টা করছে। নদী-পাড়ের ধু ধু মাঠে কালো কালো সব তাঁবু খাটানো। সন্ধে ঘনিয়ে এলে তাঁবুতে তাঁবুতে ক্যাম্প-ফায়ার জ্বলে উঠল রাতের অন্ধকার ফুঁড়ে।
সূর্য ওঠার আগেই গরমে হাঁসফাঁস করতে লাগল শরীর। সন্ধেতে জ্বালিয়ে খেয়েছে যত মশা, আর দিনের আলো ফুটতেই ঝাঁকে ঝাঁকে গঙ্গাফড়িংয়ে ছেয়ে ফেলল আকাশ। গোটা দঙ্গলটাই হানা দিয়েছে নদীর বুকে। দেখতে দেখতে জাহাজের আনাচে-কানাচে, ফাঁকে-ফোকরে ঢুকে পড়ল এসে। কাপড়চোপড়, নাক-মুখ কিছুই বাদ নেই আমাদের। কেবিনের দরজা-জানালা সব বন্ধ করে দেওয়া হল তাড়াতাড়ি। আপদগুলো তপ্ত ফানেলে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছে, আর ডানা-পাখনা পুড়িয়ে তক্ষুনি ঘুরে পড়ছে নীচে।
কুত-এল-আমারা থেকে বস্তায় বস্তায় পশম উঠল জাহাজে। তারপরই আটকা পড়লাম বালুচরায়। তারপর আবার সেই কসরত। বালি, নুড়ি পরিষ্কার করে ক্ষীণ এক জলধারায় ভর করে জাহাজ মুক্তি পেল ফের। সেই স্রোতের গতি ছিল ঘণ্টায় আড়াই মাইল। অল্প উজান বাইতেই সুবিশাল এক বাঁকে গিয়ে পড়ল জাহাজ। দুই ঘণ্টা চল্লিশ মিনিট লাগল সেটা পেরোতে। অথচ পায়ে হেঁটে গেলে আধঘণ্টার বেশি নয়। এই অন্তরীপটা আসলে প্রাচীন পারস্য নগর টেসিফনের ধ্বংসাবশেষ। একসময় পার্থেনিয়ান, রোমান, সাসানিড আর আরব সাম্রাজ্য ছিল। টাক-কেসরা বা ‘খসরুর ধনু’ নামে সুন্দর দেখতে এক দুর্গের ধ্বংসস্তূপও রয়েছে এখানে। সাসানিয়া সুলতান খসরু অনুশিরভানের (৫৩১ – ৫৭৮ খ্রিস্টাব্দ) নামেই এই দুর্গ।
আমি পাড়ে যাবার বাসনা করলাম। মেসিদিয়ের ক্যাপ্টেন আপত্তি করলেন না। চারজন আরবি মাল্লা নৌকো বেয়ে পাড়ে লাগাল। এদের দুজনকে সঙ্গে নিয়ে অন্তরীপটায় উঠে গেলাম আমি। হাঁটছি আর পায়ের নীচে পোড়ামাটি ভাঙার মতো মরমর শব্দ উঠছে। খসরুর ধনুতে ঘণ্টা খানেক বসে ছবি আঁকার সুযোগ পেয়ে গেলাম। মরুস্থানটার জায়গায় জায়গায় টেসিফনের ধ্বংসপ্রাপ্ত নগর-প্রাচীরের নিদর্শন পেলে। মনোরম রাজ-উদ্যান। সবুজের সমারোহ। তবে মধ্যিখানটায় বেশ আগাছা আর কাঁটাঝোপ গজিয়ে উঠেছে।
আর বাগানের এই জায়গাটা সম্পর্কেই একবার এক রোমদেশীয় রাজদূতের কৌতূহল জেগেছিল। সম্রাট জানিয়েছিলেন, মধ্যিখানের ওইটুকু জমি নাকি অসহায়া এক বিধবার। সে বিক্রি করতে রাজি নয়। রাজদূত প্রশংসা করে, যে এইটুকু জমিই রাজ-উদ্যানের সবচাইতে দৃষ্টিনন্দন স্থান।
৬৩৭ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট তৃতীয় ইয়াজদিগার্ড আগ্রাসী শক্তিধর আরবদের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। তাদের সঙ্গে বাদানুবাদের সময় সম্রাট উক্তি করেন, “কতশত জাতি দেখলাম জীবনে, কিন্তু তোমাদের মতো বর্বর একটাও দেখিনি। তোমরা সাপ খাও, ইঁদুর খাও। ভেড়ার চামড়া, উটের চামড়া পরো। তা এহেন একটা জাতি আমার সাম্রাজ্য দখল করে কী উপায়ে, ভেবে পাই না।”
আরবি দূত উত্তর দেয়, “কথা আপনার মিথ্যে নয় সম্রাট। আমরা ঠিক করে খেতে পাই না, প্রায়-উলঙ্গ জাতি। তবে ঈশ্বর এক নবী পাঠিয়েছেন আমাদের জন্যে। ধর্মটুকুই আমাদের মূল শক্তি।”
এইবারে বাগদাদ আর দূরে নয়। চারদিকে ঊষর ভূমি—গোটাটাই কুয়াশার চাদরে ঢাকা। আরব্য রজনীর দেশ। স্বপ্নের মতো গল্পগুলো চোখে ভেসে উঠছিল একে একে। সমস্ত প্রাচ্যদেশে কী জাঁকই না ছিল তখন আব্বাসিদ খলিফার এই রাজধানীর। ধীরে ধীরে কুয়াশা কেটে গিয়ে মাটির বাড়িঘর আর খেজুর বন ফুটে উঠল একে একে। আমারও স্বপ্ন দেখা সাঙ্গ হল। টাইগ্রিসের বুকে খেয়া নৌকোর পলকা একখানা সাঁকো নজরে এল। ঘোড়ায় টানা বড়ো একটা চাকা ঘুরিয়ে নদী থেকে চাষের জল যায়। নদীর ডান পাড়ে হারুন-অল-রশিদের প্রিয়তমা বেগম জুবেইদার সমাধি।
শুল্ক দপ্তরের কাছাকাছি মেসিদিয়েহ্ নোঙর করল। দেখতে খোলার মতো একসার নৌকো (গুফা) দৌড়ে এসে জাহাজের চারদিক ঘিরে দাঁড়িয়ে আমাদের পাড়ে নিয়ে গেল। এগুলো দেখে হেরোডোটাসের উক্তি মনে পড়ে গেল—‘এদের না আছে গলুই, না আছে পৈছা। যেন এক ঢালের অনুরূপ।’
৭৬২ খ্রিস্টাব্দে দোর্দণ্ডপ্রতাপ খলিফা আবু জাফর আবদাল্লা অল-মনসুর এই বাগদাদ প্রতিষ্ঠা করেন। তবে এই নগরের গৌরব সর্বাপেক্ষা উজ্জ্বল হয়েছিল তাঁর পৌত্র হারুন-অল-রশিদের শাসনকালে। ১২৫৮-তে হুলাগু খাঁর নেতৃত্বে মোঙ্গলরা ব্যাপক লুণ্ঠন চালায়। বাগদাদ ভস্মীভূত হয়। যদিও ১৩২৭-এ ইবন বতুতা এই নগরের সৌন্দর্যে অভিভূত হয়ে পড়েন। কিন্তু ১৪০১-এ ফের বাগদাদের আকাশে কালো ছায়া পড়ে। এইবারে নগর প্রান্তে এসে উপস্থিত হন তৈমুর লং। মসজিদগুলো বাদ দিয়ে অতর্কিতে লুঠ আর ধ্বংসলীলা চালান তিনি। ন’হাজার নরমুণ্ডের এক পিরামিড গড়ে তুলেন নগরের বুকে।
খলিফাদের আমলের আর বিশেষ কিছু অবশিষ্ট নেই এখন বাগদাদে। আছে কেবল এক কাফেলা সরাই, এক নগরতোরণ, জুবেইদার সমাধিটা আর সুউচ্চ এক মিনার—সুক-অল-গজল। থরে থরে ঘরবাড়ি আছে সেখানে। দু-হাজার লোকের বাস। বাগদাদের পথঘাট সংকীর্ণ, কিন্তু দর্শনীয়। কতশত জাতির ভিড়ে ঘুরে ঘুরে বেড়িয়েছি আমি—আলখাল্লাওয়ালা ফুর্তিবাজ আরবি, বেদুইন, তুর্কি, পার্সি, ভারতীয়, ইহুদি আর আর্মেনীয়। বাজারে বাজারে ভারত থেকে আমদানিকৃত চমৎকার সব কম্বল, সিল্কের পাগড়ি, পর্দা, কিংখাবের কাপড় ইত্যাদি বেচাকেনা হয়।
নাগরিকদের বারান্দাযুক্ত সব দোতলা ঘরবাড়ি। গ্রীষ্মকালে মাটির নীচের ঘরে থাকবার ব্যবস্থা। ছাদ থেকে পাঙ্খা বা পাখা ঝুলছে। একটা ছেলে অবিরাম দড়ি টেনে হাওয়া করে চলেছে। লম্বা লম্বা খেজুর গাছ ঘরবাড়ির ছাদ ছাড়িয়ে আকাশে মাথা তুলেছে। গ্রীষ্মের মৃদু হাওয়ায় তার ডালপালায় কাঁপন ধরে।
॥ পাঁচ॥
পশ্চিম পারস্যে যাত্রা
বাগদাদে মি. হিলপার্নের বাড়িতে উঠেছিলাম আমি। ভদ্রলোক জাতিতে ইংরেজ, ব্যবসায়ী। কর্তা-গিন্নি দুটিতে মিলে বড়ো সেবা দিয়েছেন। তিনদিন ছিলাম আমি। ইচ্ছেমতো চরে বেড়িয়েছি, গুফা নিয়ে নদীতে নেমেছি আর গৃহকর্তার অন্ন ধ্বংস করেছি।
আমার যা মতিগতি দেখছেন মি. হিলপার্ন, তাতে আমাকে কাণ্ডজ্ঞানহীন উচ্ছন্নে যাওয়া এক ছোকরা ভেবে নেওয়া তাঁর পক্ষে অস্বাভাবিক নয়। বাগদাদ চলে এসেছি সম্পূর্ণ একা, আর এখন কিনা নিদেন একটা চাকরবাকর ছাড়াই মরুভূমিতে যাবার মনস্থ করেছি। সবাই জানে, কুর্দিস্তান আর পারস্য হয়ে তেহরানের পথটা খারাপ, মোটেই নিরাপদ নয়। অথচ আমি প্রকাশও করতে পারছি না যে আমার কোমরের বেল্টে নয় নয় করেও দেড়শমতো ক্রান লুকিয়ে রেখেছি আমি। এই অঞ্চলে আমাকে একটু সমঝে চলতে হবে জানি। পয়সার গরমটা একদমই দেখানো যাবে না। খচ্চর পালকের ভেকও নিতে হবে প্রয়োজনে।
মি. হিলপার্ন বাজার লাগোয়া বড়োসড়ো এক কাফেলা সরাইতে নিয়ে গেলেন আমাকে। তার উঠোন জুড়ে ক’জন দেখি মালপত্র বাঁধাছাঁদায় ব্যস্ত। খচ্চরের পিঠে দু-দিকে ঝুলিয়ে তুলে দেওয়া হবে। যাবে কোথায় জিজ্ঞেস করাতে উত্তর দিল, “কেরমানশাহ্।”
“ক’দিন লাগে পৌঁছতে?”
“এই এগারো-বারো দিন।”
“তা কত বড়ো কাফেলা তোমাদের? আছ ক’জন?”
“গোটা পঞ্চাশ খচ্চর আছে, মাল বইবে। দশজন ব্যাপারী আছেন, তাঁরা ঘোড়ায় যাবেন। ক’জন মক্কা ফেরত তীর্থযাত্রী আছে, ছ’জন ফিরছে কারবালা থেকে। আর চলদিয়া ব্যাপারী আছেন একজন।”
জিজ্ঞেস করলাম, “আমাকে নেবে?”
“বেশ তো, ভালো দাম পেলে নেব না কেন?”
“আচ্ছা, কেরমানশাহ্ পর্যন্ত ঘোড়ায় কত পড়বে?”
“পঞ্চাশ ক্রান।”
মি. হিলপার্ন ইশারায় রাজি হয়ে যেতে বললেন। আমিও তাঁর বাড়িতেই জুনের ৭ তারিখ সন্ধেবেলা যেতে বললাম তাদের। যথাসময়ে দুজন আরবি এসে হাজির। ভাড়ার ঘোড়ার পিঠে আমার পার্সি জিন চাপালাম। কর্তা-গিন্নির কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ঘোড়ায় চড়ে বসলাম। আরবিদের সঙ্গে সেই কাফেলা সরাইয়ে ঢুকলাম গিয়ে।
রমজান মাস চলছিল। এখানকার বাসিন্দেরা এই গোটা মাসে দিনে কিছুই মুখে দেয় না, ধূমপানও বন্ধ। কিন্তু সন্ধের পর সে এক দেখার মতো দৃশ্য হয়। বাজারে বাজারে খোলা চা দোকানে ভিড় জমে। ধর্মীয় আচার মেনে দিনের উপোস ভাঙে সবাই। বাজারের ঠিক ভেতর দিয়ে আমাদের সরাই যাবার পথ। কানা গলিতে যেন কুয়াশা নেমেছে এমনই হুঁকোর ধোঁয়া চারদিকে। তেল-পলতের টিমটিমে বাতিগুলো যেন আঁধারের সঙ্গে যুঝছে।
রাত প্রায় দুটোর কাছাকাছি। খচ্চরের পিঠে পিঠে মালপত্র চাপিয়ে আমাদের লম্বা কাফেলা রওনা দিল। আস্তে আস্তে বাগবাগিচা, ঝোপঝাড়ও মিলিয়ে গেল, নিঝুম অন্ধকার মরু চারদিকে। খচ্চরের গলায় গলায় বাঁধা ঘণ্টির টুংটাং আর সর্দার খচ্চরটির কাঁসার ঘণ্টার ডং ডং ছাড়া আর কোত্থাও কোনও শব্দ নেই। ভোরের সামান্য আগে এক রাস্তার ধারে গিয়ে পৌঁছলাম আমরা। আশেপাশে চুপিসারে কিছু ছায়া ঘুরে বেড়াচ্ছে। বুঝলাম, শেয়াল আর হায়েনার দল রাতের অভিযান শেষে বাসায় ফিরছে।

ভোর সাড়ে চারটায় সূর্য উঠল মরুতে। আরও চার ঘণ্টা পর বেন-ই-সইদ নামে এক কাফেলা সরাইয়ে গিয়ে উঠলাম। খচ্চরের পিঠ থেকে মাল নামিয়ে আনা হল। দলের লোকজন দেখি সব যার-যেমন শুয়ে পড়েছে, এই প্রচণ্ড তাপের সময়টা ঘুমিয়ে কাটাবে তারা।
দিয়ালা নদীর পাড়ে ছোট্ট এক শহর বাকুবা। সীমান্ত রক্ষীর এক দল পাহারা দিচ্ছে। হঠাৎ ক’জন এসে আমাকে ঘিরে ধরে বলে, আমার এই সুইডিশ পাসপোর্টে নাকি তুর্কি-পারস্য সীমান্ত পার হবার ছাড়পত্র নেই। আমাকে জবরদস্তি আটকে দেবার চেষ্টা করতে তেড়েফুঁড়ে প্রতিবাদ জানালাম আমি। রীতিমতো ধস্তাধস্তি। কাফেলার আরবি সহযাত্রীরা পক্ষ নিল আমার। যুদ্ধ শেষ হল নগরপালের দরবারে। ছয় ক্রান দণ্ডির পর আমার কাগজপত্র ঠিকঠাক করে দিলেন তিনি।
রাতে আবার পথচলা। তখন চোখ তো আর খোলা রাখতে পারছি না আমি। জিনে পড়ে-পড়েই লম্বা একটা ঘুম দিলাম। আচমকা এক মোক্ষম ঝটকায় চোখ খুলে কিছু বুঝে ওঠবার আগেই দেখি আমার ঘোড়াটা চিঁহি চিঁহি রব তুলেছে আর আমি বালিতে পড়ে আছি। সামনে এক মরা উট দেখে ভড়কে গেছে ব্যাটা। আমাকে পিঠ থেকে উলটে ফেলেই এই অন্ধকারে চোঁ-চা দৌড়। শেষে অবশ্য একদল আরবি মিলে খুঁজেপেতে এনেছে ধরে। ততক্ষণে আমার ঘাম দিয়ে ঘুম ছুটে গেছে।
৯ জুন সন্ধেতে দলের এক বয়স্ক আরবি আমাদের পেছনে রেখে এগিয়ে গেল। জাত আরবি ঘোড়া তার। আমিও দল ছেড়ে বেরিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত একরকম পাকাই করে রেখেছি। এই নিকষ অন্ধকারে ১৮০ মাইল পাড়ি দিয়ে কেরমানশাহ্ পৌঁছানোর রুচি আমার নেই। কিন্তু সম্পূর্ণ একাই-বা সাহস করি কী করে? ফলে সেই চলদিয়া ব্যাপারী আর দলে নতুন ঢোকা এক আরবির সঙ্গে সন্তর্পণে আলোচনা চালালাম। দলে টানবার চেষ্টা করলাম। দেখা গেল, ব্যাপারী মোটেই রাজি নয়। বলে কিনা, কুর্দ ডাকাতেরা পথেই মেরে দেবে নাকি। পরের জনের অবশ্য সে-ভয় নেই। কিন্তু পঁচিশ ক্রান পেলে তবেই আমাকে সঙ্গে নেবে সে। আমি পুরো দাম অগ্রিম মিটিয়ে দিলাম। তার সঙ্গে আরামসে চারদিনে কেরমানশাহ্ পৌঁছে যেতে পারতাম আমি। নয়তো নয় রাতের ধাক্কা। তারপর কী করে কী ঘটল, আমার পকেট কী করে সম্পূর্ণ ফাঁকা হয়ে গেল—সে-কথায় পরে আসছি। তখন আমার অবস্থা করুণ—খেতে না পেয়ে মরতে বসেছি প্রায়। কাফেলায় এখন খচ্চর চালকের চাকরি নেওয়া ছাড়া আর কোনও উপায় নেই। নয়তো দরবেশের মতো দুয়ারে দুয়ারে ভিক্ষে চাইতে হবে।
আর এক ব্যাটা আরবি কখন আড়ি পেতে শুনে সব গিয়ে লাগিয়েছে সঙ্গীদের কাছে। তারা কিছুতেই আমাদের ছাড়তে রাজি নয়। কাফের ব্যাটা মরুক গে যাক, কিন্তু একটা ঘোড়াও কম হলে চলবে না দলে। অগত্যা আমিও তাই মেনে নেওয়ার ভান করে পথচলা অব্যাহত রাখলাম। চাঁদ উঠল আকাশে। চলছি তো চলছিই, সময় যেন ফুরোতে চায় না আর। খচ্চরের ঘণ্টির একঘেয়ে টুংটাং শব্দে চোখের পাতা ভারী হয়ে আসছে। ক্লান্ত ব্যাপারীরা একে একে ঘোড়ার পিঠে ঘুমিয়ে পড়েছে। কেউ কেউ ঘুম তাড়াতে গান ধরেছিল, সেও একসময় বন্ধ হয়ে গেল। কেউ লক্ষ করেনি যে আমি আর সেই আরবি পাশাপাশি চলেছি অনেকক্ষণ ধরে। আমার পকেটের রুপোর টাকার টানে তার দলছুট হতেও বাধা নেই। ধীরে এবং সন্তর্পণে কাফেলার মাথা অবধি উজিয়ে গেলাম আমরা। অপেক্ষা করে আছি চাঁদ ডুবে গিয়ে কখন অন্ধকার হয়। চাঁদ ডুবল, আমরাও খুব আস্তে আস্তে এগোতে শুরু করলাম। পেছনে কাফেলার ঘণ্টির শব্দ ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে আসছে। যেই দেখলাম শব্দ আর আসছে না, সেই মুহূর্তে বেগে ঘোড়া ছুটিয়ে দিলাম দুজনে। দুই ঘোড়া দুর্বার গতিতে ছুটে চলেছে কেরমানশাহের পথে।
সূর্য ওঠার পর অল্প সময়ের জন্যে এক গ্রামে দাঁড়িয়েছিলাম আমরা। সারসের ঝাঁক ঠোঁটে ব্যাঙ ধরে বাসায় ফিরে আসছে। আবার ঘোড়ায় চড়ে বসলাম। তক্ষুনি জোর একপশলা বৃষ্টি এল তেড়ে। দেখতে দেখতে গ্রামের শেষ খেজুরগাছটিও মিলিয়ে গেল পেছনে। ততক্ষণে ভয়ানক এক পার্বত্য এলাকায় পা রেখেছি আমরা। যত্রতত্র খুনখারাপি আর ডাকাতির চিহ্ন ছড়িয়ে। রিভলভার আমি তৈরিই রেখেছি। যাক বিপদ-আপদ ঘটেনি কিছুই, পথে নির্ঝঞ্ঝাট লোকজন, সাধারণ ঘোড়সওয়ার আর বিভিন্ন কাফেলার সঙ্গেই সাক্ষাৎ হয়েছে কেবল।
খচ্চরের পিঠে একদল তীর্থযাত্রী চলেছে বাগদাদ হয়ে দামাস্কাস ও মক্কার পথে। মাউন্ট আরাফাতের শিখরে দাঁড়িয়ে পবিত্র তীর্থ দর্শন করে জীবন সার্থক করবে তারা। তারপর ক্বাবাতে সেই পবিত্র কালো পাথরের সামনে বসে নমাজ পড়ে হাজি উপাধিপ্রাপ্ত হবে। অর্থাৎ, মক্কাযাত্রী।
এলাকাটা নিরাপদ নয় বুঝে একটা কাফেলার সঙ্গ ধরলাম আমরা। আমাদের পথেই যাচ্ছিল ওটা। কিছুটা সময় পার্সি সৈনিকদের ছোটো একটা অশ্বারোহী দলও সঙ্গে ছিল আমাদের। পরনে তাদের নীল-সাদা জোব্বা আর রুপোলি সুতোয় কাজ করা কোমর বন্ধনী। শেষে বলে কিনা, আমরা তোমাদের পাহারা দিয়েছি, ডাকাতদের হাত থেকে রক্ষা করেছি, পুরস্কার দাও। এদিকে ওদের দেওয়ার মতো টাকাপয়সা আমার কাছে নেই। কী করি, ওদের সাহায্য আর কখনও নেব না, ঘাট হয়েছে বলে কোনোক্রমে রক্ষা পেলাম সে-যাত্রা।
১৩ জুন কেরমানশাহ্ পৌঁছলাম। গিজগিজে বাজার দিয়ে খচ্চর, দরবেশ, কাফেলা, ঘোড়সওয়ার, দোকানি আর খরিদদারদের ভিড়ে কনুই মেরে মেরে পথ করে নিতে হচ্ছিল আমাদের।
শেষে এক কাফেলা সরাইয়ে গিয়ে ঘোড়া দাঁড় করাল আমার আরবি সঙ্গী। আমিও নামলাম। তাকে একশো ক্রান মিটিয়ে দেওয়ার পরও গোটা কতক রুপোর টাকা ছিল আমার হাতে। ও-ব্যাটা বকশিসের জন্যে উঠেপড়ে লাগায় সে-ক’টাও গেল। উপস্থিত আর একটাই পয়সা রয়েছে আমার হাতে, পনেরো সেন্টের মতো হবে। রাতের জন্যে ক’টা ডিম, খানিকটা রুটি আর ক’কাপ চা কিনতে তাও খরচ হয়ে গেল। এইবারে সেই আরবির কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বোঁচকাটা কাঁধে ফেলে শহরের পথে হাঁটা লাগালাম।
কেরমানশাহ্ এসে দেখি একজন ইউরোপীয়েরও বাস নেই এখানে। মহম্মদীদের দেখাব এমন চিঠিও নেই সঙ্গে। শুনশান মরুতেও এমন একা লাগেনি নিজেকে। ধ্বসে পড়া এক মাটির দেওয়ালের ধারে বসে ভাবতে লাগলাম। তাকিয়ে রইলাম গিজগিজে ভিড়ের দিকে। সামনে দিয়ে লোকজন আসছে যাচ্ছে। আর এমনভাবে তাকাচ্ছে যেন কোন বন্যজন্তু দেখে ফেলেছে। আমার চারদিকে ভিড় করে দাঁড়িয়ে কীসব বলাবলি করছে। একটা লোকও নেই যার আমার মতো করুণ দশা। কোথা যাই এবারে? আর ক’ঘণ্টা পরই যে সন্ধে নেমে যাবে। রাত কাটাবার কোনও আস্তানা না পেলে তো শেয়ালে ছিঁড়ে খাবে। জনতার ভিড় এমনিতেই নিষ্ঠুর হয়। তদুপরি এক খ্রিস্টান কাফেরের কথা কে ভাবে?
ভাবলাম, ঘোড়ার জিনটা আর কম্বলটা বেচে দিই। তক্ষুনি আগা মহম্মদ হাসনের কথা মনে পড়ল। বুশহর আর বাগদাদে তাঁর অনেক নাম শুনেছি। ধনী আরবি ব্যবসায়ী। পশ্চিম এশিয়ায় হেরাত, জেরুজালেম, সমরখন্দ আর মক্কায় তাঁর কাফেলা আসাযাওয়া করে। এছাড়া পশ্চিম এশিয়ায় ‘ওয়কিল-এৎ-দোবলেত-ই-ইংলিশ’, অর্থাৎ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের এজেন্ট নিযুক্ত আছেন। এই লোকটাকেই আমার দরকার। তিনিও যদি ঘাড়ধাক্কা দেন তবে কোনও সরাইয়ে গিয়ে চাকরি নেব।
উঠে দাঁড়ালাম। তারপর দয়ামায়া আছে বোঝা যায় এমন এক লোককে ডেকে জিজ্ঞেস করলাম, “হ্যাঁ গো, আগা মহম্মদ হাসন কোথায় থাকেন জানো?”
সঙ্গে সঙ্গে উত্তর পেলাম—“নিশ্চয়ই। এসো আমার সঙ্গে।”
খানিকক্ষণের মধ্যেই পাঁচিলঘেরা একটা বাড়ির সামনে হাজির হলাম এসে। দরজার পাশে একটা পাতের ওপর লোহার আংটা লাগানো। তাতে শব্দ তুলতেই দারোয়ান দরজা খুলল। আমার প্রয়োজনটা জানালাম। দারোয়ান একটা বাগানের ভেতর দিয়ে প্রাসাদোপম এক বাড়ির দিকে নিয়ে চলল আমাকে। বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখে দৌড়ে উঠে গেল সিঁড়ি বেয়ে। তারপর প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই আবার ফিরে জানাল যে আমাকে ভেতর ডাকছে।
পার্সি কম্বল, কাশ্মীরি ঝালর আর খাট-পালঙ্কে সাজানো জমকালো সব ঘরের ভেতর দিয়ে হেঁটে আগা মহম্মদ হাসনের পাঠাগারে গিয়ে হাজির হলাম আমি। মেঝেতে কম্বল পেতে বসে আছেন তিনি। চারদিকে সব গাদা গাদা কাগজপত্র আর চিঠিচাপাটি। ক’জন সেক্রেটারি মিলে তাঁর আদেশ-নির্দেশ সব লিখে নিচ্ছে। দেওয়ালের একপাশে ক’জন দর্শনার্থী দাঁড়িয়ে।

আগা মহম্মদ হাসন বয়স্ক মানুষ। কাঁচাপাকা দাড়িগোঁফ। সৌম্যকান্তি চেহারা। চোখে চশমা, সাদা পাগড়ি মাথায়। পরনে সোনার সুতোয় কাজ করা সিল্কের জোব্বা। উঠে দাঁড়িয়ে আমাকে কাছে যাওয়ার আহ্বান জানালেন। আমার ছেঁড়াখোঁড়া একমাত্র পোশাক, পায়ে ধূলিধূসরিত বুট—সে নিয়েই নরম কম্বল মাড়িয়ে এগিয়ে গেলাম। হাত বাড়িয়ে বসতে বসলেন আমাকে। তারপর আমার এ-যাবৎ সফরনামা, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ইত্যাদির সমস্ত খোঁজ নিলেন। আমার উত্তরে সন্তুষ্ট হয়ে মাথা নাড়তে লাগলেন। তবে সুইডেনটা ঠিক কোথায় বুঝতে পারছিলেন না। বুঝিয়ে বললাম, সুইডেন দেশটা ইংল্যান্ড এবং রাশিয়ার মাঝামাঝি।
একটু ভেবে নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “আচ্ছা, সেই টেমিরবাশের দেশ?”
আমাদের দেশের রাজা দ্বাদশ চার্লস সত্যিই টেমিরবাশ বা ‘আয়রন হেড’ নামে পরিচিত ছিলেন। উত্তর দিলাম, “ঠিক ধরেছেন। আমি সেই টেমিরবাশের দেশেরই লোক।”
আগা মহম্মদ হাসনের চোখ-মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল এই কথা শুনে। মাথা নুইয়ে শ্রদ্ধা জনালেন। বললেন, “আমার অতিথি আপনি। মাস-ছ’মাস থেকে যান এখানে। নিজের বাড়ি বলেই জানবেন। যা কিছু প্রয়োজন ব্যস হুকুম করবেন। এইবারে আমায় খানিক মাপ করতে হবে, রাজ্যের কাজ পড়ে আছে। তবে মির্জারা আপনার খিদমতে হাজির থাকবে। আমার বাগের অতিথি কক্ষে নিয়ে যাবে আপনাকে। আশা করি আপনার অসুবিধে হবে না সেখানে।”
তারপর খাদিক এফেন্দি আর মির্জা মিসাক নামে দুই খিদমতগার কাছেই এক মহলে নিয়ে তুলল আমায়। জাঁকালো পার্সি স্থাপত্যশৈলীতে তৈরি সে-বাড়ি—প্রশস্ত সব ঘরদোর, মেঝেতে চমৎকার কম্বল, ঝকঝকে খাট-পালঙ্ক, চকমকে স্ফটিকের ঝাড়বাতি—কী নেই। দেখেশুনে মস্ত এক স্বস্তির নিশ্বাস বেরিয়ে এল বুক থেকে। আহ্লাদিত হয়ে দুই খিদমতগারকে আলিঙ্গনও করে ফেললাম। মাত্র আধঘণ্টা আগেও আমি পথে দাঁড়িয়ে ছিলাম। কপর্দকহীন। চারদিক ভিড় করে তখন দাঁড়িয়ে ছিল যারা তারাও সম্ভ্রান্ত কেউ ছিল না। একেই বলে কিসমতের খেল। এই মুহূর্তে নিজেকে আরব্য রজনীর কোনও শাহজাদার চেয়ে কম কিছু মনে হচ্ছে না।
কথাবার্তার মাঝখানেই প্রেতের মতো নিঃশব্দে ক’জন গোলাম এসে ঘরে ঢুকে মেঝের কম্বলের ওপর পাতলা একখানা কাপড় বিছিয়ে দিল। তারপর রাতের খাবার পরিবেশন করল। তার সদ্ব্যবহার করলাম দ্রুত। ছিল শিকে ঝলসানো ছোটো ছোটো ভেড়ার মাংসের টুকরো, বাটি ভরতি মুরগির মাংস, পোলাও, মাখন, রুটি ও খেজুরের মিষ্টি শরবত। আর শেষে ছিল তুর্কি কফি ও পার্সি হুঁকো কলিয়ান।
ভরপেট খেয়ে উঠে এইবারে বিছানা খুঁজছি। দেখি, বাগানে এক মার্বেলের দেওয়ালের ধারে আমার পালঙ্ক পাতা হয়েছে। পাশেই মার্বেলের বড়োসড়ো এক খাদা বা গামলা, তাতে গোল্ডফিশ খেলে বেড়াচ্ছে। খাদার মধ্যিখান থেকে আবার এক পিচকারি ছুটেছে—চুলের মতো সূক্ষ্ম তার ফোয়ারা, স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ। চাঁদের আলোয় রুপোর মতো ঝকঝক করছে। গরমকাল, মৃদুমন্দ হাওয়া দিচ্ছে। অসংখ্য গোলাপ আর লাইলেকের (Lilac: ইউরেশিয়ান অঞ্চলের জলপাই গোত্রের ঝাড়। বেগুনি, সাদা, গোলাপি রঙের সুগন্ধি ফুল হয়। বিপুল পরিমাণে চাষ হয় ঘরদোর সাজানোর জন্যে।) সৌরভ ভেসে আসছে বাগান থেকে। আহা, কোথায় এই স্বর্গ আর কোথায় সেই নরক কাফেলা সরাই! এ কি কোনও রূপকথার দেশ, নাকি স্বপ্ন দেখছি আমি!
মধুর রাত কাটালাম। সকাল হতে এইবারে বেড়াবার জন্যে মন উচাটন হল। খিদমতগারকে ইশারা করতেই ঘোড়ায় জিন দিয়ে নিয়ে এল। মির্জা মিসাককে আর এক গোলাম সঙ্গে করে টাক-ই-বস্তানের পথ ধরলাম। জায়গাটা এক সাসানীয় সম্রাটের শাহি বাগিচা। সেখানে কঠিন কঠিন পাথর কেটে তৈরি অপূর্ব কারুকাজ করা ৩৮০ খ্রিস্টাব্দের আশেপাশের ঘোড়ায় চড়া রাজরাজড়াদের ছোটো-বড়ো সব মূর্তি। আছে খুসরু দ্বিতীয় পারভেজের (৫৯০ – ৬২৮ খ্রিস্টাব্দ) মূর্তি। বর্ম পরা, হাতে বর্শা। প্রিয় যুদ্ধ-ঘোটক শবদেজের পিঠে বসে আছেন। এছাড়াও রয়েছে শাহি শিকার অভিযানের সব মূর্তি-চিত্র। জীবন্ত তাদের কারুকাজ। কোথাও হাতি তাড়া করেছে বুনো শুয়োরকে, ঘোড়া ছুটেছে বনরুইয়ের পেছনে; কোথাও-বা নৌকো চলেছে সামুদ্রিক পাখি শিকারে।
দিন কেটে যাচ্ছে প্রমোদভ্রমণে, ঘুরেফিরে। এদিকে পকেট কিন্তু গড়ের মাঠ। একটা তামার পয়সাও নেই যে ভিখারিকে দিই। এই করুণ দশা কাউকে বুঝতেও দিচ্ছি না। কিন্তু এভাবে আর কদ্দিন চলে? সাহস করে একদিন খাদিক এফেন্দিকে বলেই ফেললাম, “আর তো থাকা চলে না ভাই। হিসেবের বাইরে অনেক বেশিদিন রয়ে গেছি এখানে। এইবারে যেতে হয়।”
খাদিক এফেন্দি আশ্চর্য হল প্রথমে। তারপর হেসে ফেলল। কেমন একটা সহানুভূতির ভাব চোখে। ব্যাটা সন্দেহ করল নাকি কিছু? তারপর যা বলল, আজীবন মনে থাকবে আমার। হেসে বলে, “আপনি যা টাকা লাগে নিতে পারেন আগা হাসনের কাছ থেকে।”
১৬ জুন মাঝ রাতের পর আমার রওনা হওয়ার ব্যবস্থা হল। যাব এক সংবাদবাহকের সঙ্গে, নাম আলি আকবর। ডাকাত পাহারায় তিনজন সশস্ত্র অশ্বারোহীও থাকবে। তবে লোকটার সন্দেহ, এদের সঙ্গে পাল্লা টেনে পারব না আমি, পিছিয়ে পড়ব। কেননা, কেরমানশাহ্ আর তেহরানের মধ্যে প্রায় তিনশো মাইলের এই সুদীর্ঘ পথে হামেদান শহরে একদিন-একরাতের বিশ্রামই মিলবে কেবল। তবে পথে পথে জায়গামতো ঘোড়া বদলাবার খানিকটা করে সময় পাওয়া যাবে। সঙ্গে ডিম, রুটি, ফল আর চা খেতে যতটা সময়। আমিও কুড়ি বছুরে ছোকরা, এত সহজে দমবার পাত্র নই। ঘোড়ার ঝাঁকুনিতে দই হয়ে গেলেও আমি জিন ছেড়ে পালাবার বান্দা নই, জানিয়ে দিলাম সটান। পারি কি না দেখিয়ে দেব ওই ব্যাটা আলি আকবরকে।
রাতে শেষবারের মতো আগা মহম্মদ হাসনের সঙ্গে বসে আহার করলাম। খেতে খেতে ইউরোপ আর এশিয়ার অনেক গল্প হল। বেশ খুশমেজাজে রয়েছেন তিনি। তাঁর উপচিকীর্ষা আর দানশীলতার খ্যাতি চারদিকে। কিন্তু টাকাপয়সার বিষয়ে একটা শব্দও তিনি উচ্চারণ করলেন না, আমিও কিছু বললাম না। অকুণ্ঠ ধন্যবাদ আর বিদায় জানিয়ে বেরিয়ে এলাম। স্মিত হেসে বিদায় জানালেন তিনিও। আজ বহুদিন হল তিনি গত হয়েছেন। কোন এক সাধকের পাশেই কবর দেওয়া হয়েছে তাঁকে। আজও তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় মন ভরে ওঠে আমার।
শেষবারের মতো আমার মহলে ঢুকেছি যখন, মির্জা মিসাক রুপোর ক্রানের এক চামড়ার থলে তুলে দিল আমার হাতে। পরে অবশ্য যথাবৎ আমি তা শোধও করে দিয়েছি। এরপর আর কী, আলি আকবর আর তিন পাহারাদারের সঙ্গে পথে নেমে পড়া।
মিথ্যে বলব না, বড্ড ধকলের পথ ছিল সেটা। ষোলো ঘণ্টায় একশো দুই মাইল পাড়ি দিলাম আমরা। পরদিন সকালে তুষারাবৃত অলভন্ডের (১০,৭০০ ফুট) চুড়ো উজ্জ্বল হয়ে উঠল চোখের সামনে। তার পাদদেশে হামেদান শহরে সেদিনের মতো বিশ্রাম মিলল। অর্ধেকটা দিন আমি সেখানে ঘুমিয়েই কাটালাম। বাকি সময়টা রানি এস্তারের সমাধি আর একবাটানা নগরীর ধ্বংসস্তূপ দেখে কাটিয়ে দিলাম।
তারপর আবার সেই গ্রাম পেরিয়ে গ্রামান্তরে, মৃতবৎ অবস্থায় এক-একটা জায়গা টানা পেরিয়ে যাওয়া। মাঝে মাঝে ঘোড়া বদলাবার সময় একটু আগুন ঘিরে বসা। এক কাপ চা। আবার পথচলা। পাহাড় বেয়ে উঠে গিরিপথ বেয়ে চলা। কত বাগবাগিচা আর উপত্যকা যে পেরিয়ে এলাম। কত ঝোরার বুকে সাঁকো ধরে পার হলাম। দিনে রোদের তাপে পুড়েছি, রাতে হায়েনার ভয়ে সিটিয়ে থেকেছি। পথের ধারে পড়ে থাকা কাফেলার মরা পশু কাড়াকাড়ি করে খেতে দেখেছি। সূর্য ওঠে, দিন কাটিয়ে অস্ত যায়; চাঁদ ওঠে, ঘন নীল-কালো আকাশের বুকে কোটি তারার মাঝে ভেসে বেড়ায়, তারপর ঢলে পড়ে। একদিন এক কবরযাত্রী দলের সঙ্গে দেখা। কম্বলে মোড়া মৃতদেহ থেকে দুর্গন্ধ ছেড়ে দিয়েছে। খচ্চরের পিঠে কারবালা নিয়ে চলেছে একে। ইমান হুসেনের সমাধির পাশে গোর দেওয়া হবে।
২১ জুন সক্কাল সক্কাল তেহরানে গিয়ে ঢুকলাম শেষতক। বিগত পঞ্চান্ন ঘণ্টায় আমাদের একজনেরও দু-চোখের পাতা এক হয়নি এক মুহূর্তের জন্যে। বিধ্বস্ত অবস্থা।
টানা বিশ্রাম শেষে অলবুর্জ পর্বতমালা পেরিয়ে কাস্পিয়ান সাগরের পাড়ে বারফ্রাশে এলাম। সেখান থেকে নৌকোয় তুর্কোমানের সাগর পাড় ধরে ক্রাসনোভদস্ক। ওখান থেকে বাকু। তারপর ট্রেনে তবিলিসি হয়ে কৃষ্ণসাগরের বাটুমি। আবার নৌকো করে সেখান থেকে কনস্টান্টিনোপল। আদ্রিয়ানোপোলে সঙ্গে স্কেচ বুক রাখার অপরাধে গ্রেপ্তার হলাম।
২৪ আগস্টে সোফিয়া পৌঁছলাম। অল্পের জন্যে প্রাণে রক্ষা পেয়েছিলাম সেখানে। দুর্গের এতটাই কাছ ঘেঁষে হাঁটছিলাম যে গার্ড-ব্যাটা গুলিই করতে যাচ্ছিল। মাত্র তিনদিন হয়েছে ওখানে মহা এক বিপ্লব ঘটে গিয়েছে। বাটেনবার্গের আলেকজান্ডার সিংহাসনচ্যুত হয়েছেন। স্ট্রালসান্ড থেকে সুইডিশ এক স্টিমারে বাড়ি গেলাম শেষে। মা-বাবা, ভাইবোনদের দেখা পেলাম ফের। এশিয়ার মাটিতে আমার প্রথম অভিযান শেষ হল।

॥ ছয়॥
কনস্টান্টিনোপল
এইবারে খানিকটা পড়াশোনায় মন দিয়েছি। উপসালা ও বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভূগোল এবং ভূবিদ্যা রপ্ত করলাম প্রথমে। সঙ্গে স্টকহোম হোগস্কলা (আক্ষরিক অর্থে হাই-স্কুল) তো আছেই। বার্লিনে আমার শিক্ষক ছিলেন ব্যারন ফার্দিনান্দ ভন রিক্টোফেন। চিন ভ্রমণের জন্যে বিখ্যাত। তৎকালীন সময়ে এশিয়ার ভৌগোলিক খুঁটিনাটি সম্পর্কে তিনিই শেষ কথা।
ততদিনে আমার লেখক হিসেবেও অভিষেক ঘটে গেছে। নিজেরই আঁকায় এক খণ্ড বইয়ে পারস্য ভ্রমণের গল্প লিখে ফেলেছি। আগে কখনও কোনও প্রকাশনার জন্যে বই লিখিনি। তাজ্জবের বিষয়, একদিন বৃদ্ধ এক প্রকাশক এলেন আমার কাছে। একশো কুড়ি পাউন্ড হাতে দিয়ে বললেন, আমার ভ্রমণবৃত্তান্ত প্রকাশের স্বত্ব কিনে নিতে চান। ভাবছিলাম আমার পাণ্ডুলিপিটা পকেট থেকে না খসিয়ে কীভাবে প্রকাশ করা যায়, অমনি এই অমায়িক ভদ্রলোক এসে হাজির। বই শুধু প্রকাশই করবেন না, সঙ্গে যথাযোগ্য দক্ষিণাও দেবেন। এ যে মহার্ঘ জিনিস! তবে কথার সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে যাওয়াটাও বুদ্ধিমানের কাজ নয়। বিষয়টার গুরুত্ব অনুধাবন করে খানিকটা বাজিয়ে দেখার চেষ্টা করলাম। ভুরু কুঁচকে জানালাম, প্রাণ হাতে করে যে কঠিন পথ আমি পাড়ি দিয়েছি, তার তুলনায় প্রস্তাবিত এই মূল্য কিছুই নয়। তবে লাভ হল না, রাজি হতে হল। আসলে এতেই তো ভেতরে ভেতরে টগবগ করে ফুটছিলাম আমি।
এই সাফল্যে উৎসাহিত হয়ে রাশিয়ান সেনানায়ক এন. এম. প্রজেভালস্কির আভ্যন্তরীণ এশিয়ায় তাঁর ভ্রমণবৃত্তান্তগুলোর সংক্ষেপিত অনুবাদ করে ফেললাম তারপর। এক খণ্ডে তা প্রকাশিতও হল। যেহেতু আমার নিজের লেখা বই নয়, তাই মাত্র চল্লিশ পাউন্ড নিলাম আমি এর জন্যে।
১৮৮৯-এর গ্রীষ্মকাল। সে-বছর ‘কংগ্রেস অফ ওরিয়েন্টালিস্টস’-এর সভা বসেছে স্টকহোমে। এশিয়া আর আফ্রিকার লোকজনে রাস্তাঘাট ভরতি। এশিয়বাসীদের মধ্যে চারজন বিশিষ্ট পার্সি এলেছিলেন শাহ্ নাসির-উদ-দিনের হুকুমে রাজা দ্বিতীয় অস্কারকে রাজ-সম্মান জানাতে। এই পারস্য ভূমিপুত্রদের সঙ্গে কথা বলে কী যে আনন্দ হল! প্রবল ইচ্ছে হল আবারও চলে যাই সে-দেশে। আলাদিনের প্রদীপটি আবার জ্বলে উঠেছে আমার মনে। যেন আগা মহম্মদ হাসনের বাগানের উজ্জ্বল সেই অগ্নিশিখাটি।
শরতে এক বোন আর মাকে নিয়ে একমাস কাটালাম দক্ষিণ স্টকহোমের সমুদ্র উপকূলে। রইলাম সেই নায়ক ভেগার অভিযাত্রী নর্দেনস্কিওল্ডের নিজস্ব তালুকের খামারবাড়ি ডালবিওতে। একদিন একটা চিঠি পেলাম বাবার কাছ থেকে। লিখছেন—‘ফিরে এসো। আগামীকাল সকাল এগারোটার মধ্যে অবশ্যই শহরে উপস্থিত থাকতে হবে তোমাকে। প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাতে যেতে হবে। সামনের বসন্তে পারস্যের শাহের দরবারে একজন দূত পাঠাতে চলেছেন রাজা। তোমাকে সঙ্গে যেতে হবে। কী মজা!’
যে কটেজটায় আমরা আছি, তার দেওয়ালে দেওয়ালে যেন প্রতিধ্বনিত হতে লাগল—কী মজা! কী মজা! তক্ষুনি এ নিয়ে আলোচনায় বসে গেলাম আমরা। চলল দীর্ঘক্ষণ। চোখে আর ঘুম এল না সে-রাতে। ভোর চারটেতে উঠে পড়লাম আমি। ডালবিও থেকে স্টকহোমের রাস্তার অবস্থা আর না বলাই ভালো। জঙ্গল পার হয়ে মাইল সাতেক নৌকো বাইতে হয় আর্কিপেলগো ডিঙিয়ে স্টিমার ধরতে। আমি যেন একদৌড়ে জঙ্গল পেরিয়ে, বুনো হাঁসের মতো জল কেটে সময়মতো এসে পৌঁছলাম স্টকহোমে।
সুইডেন এবং নরওয়ে তখন একই রাজার অধীনে। নরওয়েবাসী রাজ-গোমস্তা এফ. ডবলু, ট্রেসচোউকে রাষ্ট্রদূত দলের প্রধান নিযুক্ত করলেন রাজা। সেক্রেটারি হলেন সি. ই. ভন গিজের। কাউন্ট ক্লিস লিউয়েনহপ্ট হলেন মিলিটারি সহদূত। আর দলে সর্বশেষে আমি হলাম গিয়ে দোভাষী। ১৮৯০-এর প্রথমদিকেই বেরিয়ে পড়লাম আমরা। নিজের মহাদেশ পেরিয়ে রমজান মাসে কনস্টান্টিনোপল পৌঁছলাম গিয়ে।
সৌন্দর্যে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ নগরগুলোর মধ্যে কনস্টান্টিনোপল একটি। যেন সংকীর্ণ জলপ্রণালী বসপোরাসে শুয়ে আছে সে। এই প্রণালীর দুই জলপথ গোল্ডেন হর্ন এবং সি অফ মারমোরা যেমন দুই সমুদ্রের সঙ্গে যুক্ত, তেমনি দুটো মহাদেশকেও বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে।
রোম আর মস্কোর মতো এও সাত পাহাড়ের নগরী। এর প্রধান এলাকাটির নাম ইস্তানবুল—এক তুর্কি শহর। জিহ্বার মতো তেকোনা একটি জায়গায় অবস্থিত। নগরের দিকটা এক প্রাচীর দিয়ে সুরক্ষিত। সুউচ্চ অট্টালিকা। অন্যদিকটা গোল্ডেন হর্ন উপসাগর পেরা এবং গালাটা থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। ইস্তানবুলে সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো উজ্জ্বল রঙের সব ঘরবাড়ি। সে থেকে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে দৈত্যাকার সব গম্বুজ আর মসজিদের লম্বা সরু মিনার। রমজানে মসজিদগুলো হাজার হাজার বাতিতে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। মিনারে মিনারে নবী আর ইমামদের নামে বাতি দেওয়া হয়।
যতসব উপাসনালয় আছে ইস্তানবুলে, এর মধ্যে সেন্ট সোফিয়া গির্জা ছিল যেমন সবচাইতে বড়ো, তেমনি দেখতে সুন্দর। ৫৪৮ খ্রিস্টাব্দে বাইজেন্টাইন সম্রাট জাস্টিনিয়ান এটি তৈরি করেন। গ্যালারির ওপরে গম্বুজটাকে একশোটি থাম মিলে ধরে রেখেছে। কিছু থাম ঘন সবুজ রঙের মার্বেলে তৈরি, কিছু আবার ঘন লাল অত্যন্ত কঠিন বিবিধ পাথর দিয়ে।
তৎকালীন সময়ে এই দেশে এই গির্জার গৌরব ছিল গগনচুম্বী। কিন্তু তার নয় শতাব্দী পর গ্রীষ্মের এক উষ্ণ রাতে নবীর সবুজ পতাকা হাতে নগরীর দ্বারপ্রান্তে এসে হাজির হল হিংস্র এক দল। সঙ্গে দলপতি মহম্মদ। সময়টা ২৯ মে, ১৪৫৩। শেষ রোমান সম্রাট কনস্টেন্টাইন প্রাণপণ শক্তিতে বাধা দিলেন। তাঁকে হত্যা করে, রাজ-পোশাক খুলে নিয়ে ফেলে দেওয়া হল মৃতদেহের স্তূপে। কিন্তু রোমান সম্রাটের অপূর্ব রাজপ্রাসাদ চাক্ষুষ করে বিজয়ী সুলতান কেমন যেন বিষাদগ্রস্ত হয়ে পড়লেন। কত দ্রুত মানুষের জীবনের গতিমুখ পালটে যায়, সে ভেবে বেশ দুঃখিত হলেন মনে মনে। পার্সি কবির পঙক্তি উদ্ধৃত করে বললেন, ‘ঊর্ণনাভ ছিঁড়েছে জাল দেখো ওই রাজপ্রাসাদে, পেঁচক ধরেছে গান দিন শেষের ওই আফ্রাসিয়াব মিনারে।’
কাতারে কাতারে আতঙ্কগ্রস্ত খ্রিস্টান সেন্ট সোফিয়া গির্জায় আশ্রয় নিয়েছিল। কিন্তু তুর্কিদের তখন রক্তের নেশায় পেয়েছে। দরজা ভেঙে ফেলে গির্জায় ঢুকল তারা। শুরু হল নিধনযজ্ঞ। একজন গ্রিক বিশপ দাঁড়িয়ে ছিলেন উঁচু এক বেদির ওপর। পরনে তাঁর জমকালো পোশাক। উচ্চৈঃস্বরে বাইবেলের প্রধান এক অংশ পড়ে যাচ্ছিলেন মৃতদের আত্মার উদ্দেশে। প্রকৃতপক্ষে এই একজনই বেঁচে ছিলেন সে-মুহূর্তে। পড়তে পড়তে ভেঙে পড়েন তিনি। অর্ঘ্যের মদ্য পেয়ালা তুলে নিয়ে সিঁড়ি ভেঙে ছুটে গেলেন ওপরতলার গ্যালারিতে। হায়েনার দলও তাঁর পিছু নিয়েছে। বিশপ এক দেওয়ালের কাছে দৌড়ে যেতেই দরজা খুলে গেল একটা। ভেতরে ঢুকে যেতেই আবার বন্ধও হয়ে গেল। তুর্কি সেনারাও প্রাণপণ বর্শা আর কুঠার চালিয়ে দেওয়ালটা ভাঙার চেষ্টা চালিয়ে গেল, কিন্তু সফল হল না। সেই থেকে প্রায় সাড়ে চার শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে গ্রিকদের স্থির বিশ্বাস ছিল যে যেদিন এই সেন্ট সোফিয়া গির্জা আবার খ্রিস্টানদের দখলে আসবে, সেই দেওয়ালের দরজা নিজে থেকে খুলে যাবে আর বিশপও মদ্য পেয়ালা হাতে বেরিয়ে আসবেন সশরীরে। সেই একই বেদিতে দাঁড়িয়ে তিনি বাইবেল পড়বেন সেদিনকার মতোই। যাই হোক, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালিন মিত্রশক্তি কনস্টান্টিনোপল দখল নিল ঠিকই, কিন্তু সেই বিশপ আর বেরিয়ে এলেন না।

আমরা যখন ও-দেশে যাই, দেখি তার গম্বুজে আর মিনারের মাথায় মাথায় সব অর্ধচন্দ্র রেখা জ্বলজ্বল করছে। গোলাকার অলিন্দ থেকে মুআজ্জিনদের গলায় তখন উচ্চগ্রামে সুর খেলছে—‘আল্লাহ্ সুমহান। দীনদুনিয়ায় আল্লাহ্ ছাড়া আর কেউ নেই। আল্লাহর নবী মহম্মদ। এসো ভাই নমাজ পড়ো, চিরসুখে ভাস্বর হও। আল্লাহ্ সুমহান। লা ইল্লাহা ইল আল্লাহ্!’
অসংখ্য প্রদীপে সজ্জিত সুবিশাল এই মসজিদের দরদালানে দাঁড়িয়ে হাজার হাজার ভক্তের প্রার্থনা চাক্ষুষ করলাম।
মহম্মদ নিজস্ব প্রাসাদ (সেরালিউ) নির্মাণ করলেন। এখানে বসেই পঁচিশ জন সুলতান রাজত্ব করে গেছেন তারপর। মহম্মদের সেই বিজয় অভিযানের ঠিক চারশো বছর পর আবদুল মজিদ বসপোরাসে ডলমাবাহসে প্রাসাদ তৈরি করে সেখানে থেকে সরে আসেন। নগরীর সবচাইতে উঁচু স্থানে সেরালিউটি তৈরি করেছিলেন মহম্মদ। সূর্যের প্রথম আলোটি এসে পড়ত তার চূড়ায়। দিনশেষের গোধূলির আলোটিও বিদায় নিত তার গা থেকেই। রাজপ্রাসাদের ছাদে দাঁড়ালে মার্মোরা সাগর, গোল্ডেন হর্ন আর এশিয়া উপকূলের অপূর্ব দৃশ্য চোখে পড়ত।
বেশ ক’টি দরদালান আর দরবার কক্ষের গুচ্ছের সমন্বয় এই সেরালিউ। প্রতিটি দালান আবার তোরণ দ্বারা পৃথক করা ছিল। জানিসেরিদের (সুলতানের তুর্কি দেহরক্ষী) কাছারির মধ্যবর্তী তোরণকে বলা হত ওর্তা কাপু। ওতে দুইজোড়া দরোজা। মাঝামাঝি স্থানে খিলান দেওয়া অন্ধকার এক কুঠুরি। সুলতানের বিষ নজরে পড়ে যাওয়া পাশাদের (তুরস্কদেশীয় রাজপ্রতিনিধি) ওই কক্ষে এসে দাঁড়াবার নিয়ম ছিল। অন্ধকার কুঠুরিতে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে পেছনের দরোজা বন্ধ হয়ে যেত। জীবনের শেষ মুহূর্তে এসে মৃত্যুর প্রহর গুনতে শুরু করত সে। দেখতে-দেখতেই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়ে যেত।
তৃতীয় তোরণটাকে বলা হত বাব-ই-সিদেত, অর্থাৎ কোষাগার তোরণ। এর ভেতরে অন্যান্য বহুমূল্য সম্পদের পাশাপাশি থাকত সোনার সিংহাসন, মণিমুক্তো ইত্যাদি। এ সবই পারস্যের শাহ্ ইসমাইলের কাছ থেকে ছিনিয়ে এনেছিলেন সুলতান প্রথম সেলিম। আর নবীর নিশান, রাজপোশাক, রাজদণ্ড, তলোয়ার আর ধনুক ইত্যাদি সংরক্ষিত থাকত রাজপ্রাসাদের নিভৃত কোনও অংশে। সেখানে কারও প্রবেশের অনুমতি নেই। বছরে একবার সুলতান স্বয়ং এই পবিত্র স্থান পরিদর্শনে যেতেন।
সুলতানি ইফতারের নেমন্তন্ন এল একদিন। রমজান মাসের সান্ধ্য আহার। আয়োজন করা হয়েছে ইলদিজ প্রাসাদে। ওসমান গাজি পাশার ওপর অতিথিসেবার দায়িত্ব পড়েছে। এই মানুষটিই ১৮৭৭ সালে প্লেভনাতে দুর্ধর্ষ রাশিয়ান বাহিনিকে চার মাসেরও বেশি সময় ধরে ঠেকিয়ে রেখেছিলেন। গাঢ় রঙের আহার কক্ষটি দেখতে ছোটো হলেও বেশ আলোকোজ্জ্বল। বাইরে তখন গোধূলির মরা আলো। সূর্যাস্তের কামান দাগানোর শব্দ কানে না আসা অবধি প্রত্যেকে মূর্তির মতো স্থির বসে। সাগ্রহ দৃষ্টি নিবদ্ধ খাঁটি সোনার থালার ওপর। শেষে কামান দাগতেই খাবার চলে এল। খাদ্য-সহায়কেরা পরিবেশন শুরু করল।
এইবারে সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদ সানন্দ অভ্যর্থনা জানালেন আমাদের। মানুষটি দেখতে ছোটোখাটো, পাণ্ডুর বর্ণ। নীলচে কালো দাড়ি। কালো, অন্তর্ভেদী চোখ। আর নাসিকাটি এক্কেবারে রোমানদের মতো। পরনে গাঢ় নীল রঙের লম্বা ঝুলের রাজপোশাক। মাথায় লাল ফেজ টুপি। বাঁহাতটা তরবারির হাতলে রাখা। সসম্মানে মাথা ঝুঁকিয়ে আমাদের রাজার পাঠানো মোহরাঙ্কিত চিঠিটা নিলেন হাত থেকে।
তারপর মৃতের নগরী বলে খ্যাত এই জায়গাটা ঘুরেফিরে দেখলাম। ইস্তাম্বুলের বাইরে বা উস্কুদারের সমাধিস্থলগুলোতে নিস্তব্ধ ও শান্ত পরিবেশে ঘুরে বেড়ালাম। মাঝে মাঝে লম্বা কালো সাইপ্রেস গাছ মাথা তুলে দাঁড়িয়ে। মৃত্যুপথযাত্রী আগন্তুক বা পথিকের অসংখ্য স্মারকদণ্ড রয়েছে সেখানে। সেগুলোর মাথায় মাথায় গামলার মতো অবতল এক-একটা পাত্র বসানো। তাতে বৃষ্টির জল জমলে পাখপাখালিরা খেতে আসে। আর তাদের কলতানে পাথরের নীচে শুয়ে থাকা মানুষটি বোধ করি চিরশান্তি লাভ করে।

ক্রমশ