ধারাবাহিক অভিযান-আমার অভিযাত্রী জীবন(এপিসোড ৩)-স্যেন হেডিন-অনু-রাজীবকুমার সাহা-বসন্ত ২০২৫

জয়ঢাকের অভিযান লাইব্রেরি- এভারেস্ট-এরিক শিপটন(অনু-বাসব চট্টোপাধ্যায়)  অন্নপূর্ণা-মরিস হারজগ(অনু তাপস মৌলিক) কন-টিকি অভিযান- থর হেয়ারডাল (অনু-শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায়)

obhijanhedinheader

স্ভেন হেডিন একাধারে একজন সুইডিশ ভূগোলবিদ, টপোগ্রাফার, অভিযাত্রী, ফটোগ্রাফার ও চিত্রশিল্পী। ১৮৬৫ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারিতে সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে জন্মগ্রহণ করেন। মৃত্যু: ২৬ নভেম্বর, ১৯৫২, স্টকহোম।
এই আত্মজীবনীতে নিজের জীবনভর অভিযাত্রার দুর্ধর্ষ সব অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করেছেন হেডিন। রোমহর্ষক উত্তর মেরু অভিযানের নায়ক সুইডিশ অভিযাত্রী নর্দেনস্কিওল্ডকে দেখে অনুপ্রাণিত হন এবং পনেরো বছর বয়সেই ভবিষ্যতে উত্তর মেরু অভিযাত্রী হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। পরে তাঁর অভিযাত্রার গতিমুখ পরিবর্তিত হয়ে এশিয়ার দিকে ধাবিত হয়। নিয়তির ফেরে কাস্পিয়ান সাগরতীরের ঝড়ের শহর বাকুতে আসেন আর সেখান থেকেই যাত্রা শুরু করেন এশিয়ার পথে। শুরু হয় রাশিয়া, ককেশাস আর পারস্য হয়ে প্রায় সমগ্র এশিয়া ভ্রমণের অভিজ্ঞতা অর্জন। বাধাবিঘ্ন বিপত্তির সম্মুখীনও হন প্রচুর। তুলে ধরেন দেশীয় সমাজ, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ভূগোল আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বিবরণ। গবেষণার নিরিখে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই লেখাচিত্র তারই সাক্ষ্য বহন করে। MY LIFE AS AN EXPLORER স্ভেন হেডিনের অসামান্য সৃষ্টি। ১৯২৬ সালে কাসেল অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেড-এর হাত ধরে বইটি প্রথম প্রকাশিত হয়।

তৃতীয় পর্ব

॥ সাত॥

পারস্যের শাহি দরবারে দূত

৩০ এপ্রিল রাশিয়ান জাহাজ রস্তোভ-ওডেসায় চেপে বসলাম আমরা। বসপোরাস হয়ে চলেছি। বাঁয়ে ইউরোপীয় উপকূল, ডানদিকে এশীয়। প্রকৃতির অপূর্ব বাহার চারদিকে। সন্ধের দিকে শেষ লাইট হাউসটাও ছাড়িয়ে জাহাজ কৃষ্ণসাগরে পড়ল। এ-পথে আসাযাওয়ার অভিজ্ঞতা আমার আগেই হয়েছে। এশিয়া মাইনর উপকূলবর্তী শহর বাটুমিতে এসে নামলাম আমরা। তারপর রেলে তিবলিসি হয়ে বাকু। সেই আগেরবারের পথঘাট, সেই কাফেলা, ঘোড়সওয়ারের দল। সেই মেষপালকেরা ভেড়া চরাচ্ছে, ছাইরঙা মোষের দল মালবোঝাই গাড়ি টেনে নিয়ে চলেছে। আহা!

এই সফরেও বাকুর বালাখানি তৈলক্ষেত্র দেখতে গিয়েছি আমরা। বর্তমানে (১৮৯০) এখানে ৪১০টি তৈলকূপ, যার মধ্যে ১১৬টিই নোবেল কোম্পানির। ৪০টি থেকে এখন তেল উত্তোলন হচ্ছে। আর ২৫টির চলছে আরও গভীরে খননকার্য। এক-একটা কূপ থেকে চব্বিশ ঘণ্টায় প্রায় ১৫০,০০০ পুড তেল নির্গত হয়। কূপগুলো ১২০ থেকে ১৫০ পামার (pumar) গভীর হয় সাধারণত। আর সবচাইতে লম্বা পাইপগুলোর ব্যস ২৪ ইঞ্চি। দুই সারি পাইপে রোজ প্রায় ২৩০,০০০ পুড কাঁচা তেল পাঠানো হয় ব্ল্যাক সিটিতে। পরিশোধন করবার পর দৈনিক ৬০,০০০ পুড বিশুদ্ধ তেল উৎপাদিত হয়।

১১ মে তারিখে সন্ধের পর মিখাজল নামে এক বাস্পচালিত জাহাজে চেপে বসলাম। সঙ্গে নোবেল কোম্পানির ক’জন ইঞ্জিনিয়ার। জাহাজের পিছন দিকে গিয়ে বসেছিলাম আমরা। কথাবার্তার মধ্যেই আচমকা কানফাটানো তীক্ষ্ণ হইসেল বেজে উঠল চারদিকে। তাকিয়ে দেখি ব্ল্যাক সিটির দিকে লকলকে আগুন। আকাশে গাঢ় খয়েরি রঙের মেঘের মতো কুণ্ডলীর উদ্গিরণ। সুইডিশ ইঞ্জিনিয়ারেরা তাড়াতাড়ি নেমে গেলেন জাহাজ থেকে। তারপর দৌড়ে চললেন আগুনের দিকে। মিখাজল রওনা হল। আমরাও আগুনটাকে পেছনে রেখে এগিয়ে চললাম পারস্য উপকূলের দিকে।

আঞ্জেলিতে গিয়ে নামামাত্রই উচ্চনিনাদে ভেরী বেজে উঠল, চল্লিশ তোপের সেলামি দেওয়া হল আমাদের সম্মানে। সাগরতীরে উপস্থিত আছেন সেই দেশের দুই উচ্চপদস্থ আধিকারিক। ঝলমলে রাজপোশাক গায়ে, সোনাদানা গাঁথা। মেষের চামড়ার টুপিতে সূর্য আর সিংহের প্রতিচ্ছবি আঁকা। এঁদের একজন হলেন সেনাধ্যক্ষ মহম্মদ আগা। আজ ইনিই মেহমানদার, অর্থাৎ অতিথিসেবক। পারস্য শাহের প্রতিনিধি হিসেবে সাদর অভ্যর্থনা জানালেন। সুবিশাল প্রহরীদল আর কাফেলা নিয়ে তেহরান অবধি যাবেন আমাদের সঙ্গে।

এইবারে চলেছি রেশ্তের পথে। আমাদের একটা নৌকোয় বসিয়ে গুণ টেনে নিয়ে চলল ক’জন। ঢিলেঢালা পোশাক গায়ে। মাঝে মাঝে নদীর পাড়ের ঝোপঝাড় আর নলখাগড়ার ফাঁকে ফাঁকে দেখা যাচ্ছিল তাদের। তাই দেখে রবিন গুডফেলোস বা অরণ্য দানবদের কথা মনে পড়ে গেল আমার।

নগরপাল দস্তরখান (ভোজসভা) বসালেন আমাদের সম্মানে। পঞ্চাশ পদের পরিবেশন।

১৬ মে রেশ্ত ছাড়লাম। সঙ্গে তাঁবু, কম্বল, বিছানা আর আনুষঙ্গিক জিনিসপত্র সব চুয়াল্লিশটা খচ্চরের পিঠে চলেছে। কালো উর্দির প্রহরীদল চলেছে নিজেদের কাফেলায়; হাতে হাতে রাইফেল, তলোয়ার আর পিস্তল তাদের।

এইবারের পথচলার দৃশ্যটি কেবল প্রাচীন পুথিগুলোতে লিখিত বর্ণনার সঙ্গেই মেলে। চারদিকে প্রাকৃতিক শোভার অপূর্ব সমারোহ। ভরা বসন্ত। বনজঙ্গল থেকে ছুটে আসছে মনোলোভা সৌরভ। ঝরনা-ঝোরা চলেছে নিজের ছন্দে। পাখপাখালিরা মিষ্টি গান গেয়ে আমাদের অভ্যর্থনা জানাচ্ছে। রোজ দুই ধাপে এগোচ্ছি আমরা—সকালে আর বিকেলে। দুপুরের সময়টায় তাপমাত্রা পৌঁছে যাচ্ছিল ৮৬ ডিগ্রিরও ওপরে। তখন জলপাই বা তুঁত গাছের ছায়ায় তাঁবু খাটাতে হত। খোলা তাঁবু, বাতাস আসত। যে-গ্রামের ওপর দিয়েই গিয়েছি, বৃদ্ধ মুরুব্বিরা এসে অভ্যর্থনা জানিয়ে গেছে। গাল ভরতি পাকা দাড়ি, পরনে পা অবধি কাফতান, মাথায় খাড়া পাগড়ি।

কাজভিনে পৌঁছে পথকষ্ট সব ভুলে গেলাম আমরা। নগর থেকে অনেকটা দূর এসে পৌরকর্তা বিশাল এক রক্ষীদল নিয়ে দেখা করলেন আমাদের সঙ্গে। তারপর নগরপাল এলেন, সঙ্গে একশো জন অশ্বারোহী। দেখতে দেখতে বড়োসড়ো এক অশ্বারোহী দলে পরিণত হল আমাদের কাফেলা। একই তালের কদমে টগবগ টগবগ শব্দে চকিত হয়ে উঠেছে পথঘাট। কখনও আবার খুরের ধুলোতে ঢেকে যাচ্ছে দল। গোটা দলটার মুখে দুই অগ্রদূত—একজনের কালো উর্দি, অন্যজনের লাল—রুপোর মুদ্রা গাঁথা। দুজনেরই মাথায় ভেড়ার ছালের সাদা টুপি। এদের পেছন পেছনে ভেরীবাদক একদল ঘোড়সওয়ার, তারপর নীল উর্দির পদাতিক সেনাদল। ঘোড়ার পেছনে দৌড়ে চলেছে তারা। চমৎকার জিগিতোভকা (ঘোড়ার পিঠে মনোরঞ্জক কৌশল প্রদর্শন) দেখাল অশ্বারূঢ় বাহিনী। এক থেকে এক দুর্ধর্ষ খেলা দেখিয়ে চলেছে তারা। কখনও সর্বোচ্চ গতিতে ঘোড়ার পিঠে উঠে দাঁড়াচ্ছে, কখনও চোখের পলকে নীচু হয়ে ছোঁ মেরে মাটি থেকে তুলে নিচ্ছে কিছু। ছুটতে ছুটতে কখনো-বা নিজের বন্দুক ছুড়ে দিল আকাশে, মুহূর্তেই লুফে নিল আবার। কেউ কেউ ঘোড়ার পিঠে বসেই পাতলা ক’টা তীক্ষ্ণ ধারওয়ালা তলোয়ার নিয়ে লোফালুফি খেলছে। সূর্যের কিরণে থেকে থেকে ঝলসে উঠছে সেগুলো। তুমুল হইহইয়ের মাঝে আমরা চলেছি আঙুর বাগান আর ক্ষেতখামার পেরিয়ে। তারপর চিনামাটির এক তোরণদ্বার পেরিয়ে এসে ঢুকলাম কাজভিন নগরে। বাজার পেরোলাম, পেরিয়ে এলাম গুটিকতক খোলা ময়দান।

এইবারে সম্পূর্ণ এক ভিন্ন দলের মুখোমুখি হলাম আমরা। শিয়াদের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার এক শোভাযাত্রা চলেছে পথ বেয়ে। দুটো লাল নিশান এগিয়ে এল প্রথমে। তাতে কালো রঙের ফিতে উড়ছে। তারপর বিশাল আকৃতির এক পাত্রে ভাত, রুটি আর মিঠাই ডাঁই করা। কোনায় কোনায় জ্বলন্ত মোমবাতি লাগানো। তার পেছন পেছন একদল মানুষের করুণ হাহাকার—‘হা হুসেন, হা হাসান!’ এদের পেছনে সুতোর নকশাদা কাপড়ের ওপর সুদৃশ্য এক জিন পিঠে মৃত ব্যক্তির ছাইরঙা ঘোড়া। জিনের সামনের দিকের ঊর্ধ্বভাগে সবুজ এক পাগড়ি। মৃত যে নবীর বংশধর, এ তার প্রমাণ-প্রতীক। শবাধারটি বাদামি রঙের কম্বলে মুড়ে বেশ উঁচু করে বাঁধা হয়েছে। শবাধার বইবার বাসনায় দর্শকদের মধ্যে হুড়োহুড়ি পড়ে গিয়েছে। সবাই চাইছে একটুক্ষণের জন্যেও যদি সুযোগ মেলে। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, মৃত ব্যক্তি যে-সে মানুষ ছিলেন না—উচ্চস্তরীয় এক ধর্মযাজক। শোভাযাত্রার একেবারে শেষভাগে চলেছেন সাদা পাগড়ি মাথায় একদল ধর্মযাজক।

কাজভিনে সাদর অভ্যর্থনা গ্রহণের পর তেহরানের পথে রওনা হলাম এইবারে। পথে নামল বৃষ্টি, আর আমাদের গাড়িঘোড়া সব জলে-কাদায় একশা। এগিয়ে যাব, তার জো নেই। খচ্চরের বড়ো এক কাফেলা পথ আটক করে রেখেছে। মেঝের ফরাস নিয়ে যাচ্ছিল দলটা। পেছনে আমাদের দলটার হই-চিৎকার শুনে খচ্চর সব ভড়কে গিয়ে লাফিয়ে ছুটেছে। ফলে পিঠে বাঁধা দড়িদড়া সব ঢিলে হয়ে একের পর ফরাসের বোঝা গড়িয়ে পড়ছে মাটিতে। এইবারে যেই পিঠটি হালকা হয়েছে, ব্যাটারা দৌড় লাগিয়েছে ঊর্ধ্বশ্বাসে। ফুর্তি লেগেছে, লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে পেরিয়ে গেল আমাদের গাড়িঘোড়ার ফাঁকফোকর গলে। হাসতে হাসতে আমাদের পেটে খিল ধরে যাওয়ার জোগাড়। ওদিকে তুম্বো মুখে খচ্চর মালিকেরা ততক্ষণে কাদা থেকে ফরাস তুলতে লেগেছে।

দারুণ বিস্ময়াভিভূত হয়ে পড়লাম তেহরানে ঢুকলাম যেদিন। প্রাচ্যভূমির বুকে এমন দৃশ্য দেখবার সৌভাগ্য আর হয়নি। এর আগে যখন এসেছিলাম তখন আমি নিঃস্ব, অসহায়। আর এইবারে এসেছি রাষ্ট্রদূত হিসেবে। কত পার্থক্য! অশ্বারোহী বাহিনীর গোটা রেজিমেন্ট আনুষ্ঠানিক উর্দিতে বেরিয়ে এসেছে। পদাতিক বাহিনী সার দিয়ে পথে দাঁড়িয়ে। বাজনদারেরা সুইডিশ জাতীয় সংগীত বাজাল। মনোহর এক বাগে এ-দেশের এক উচ্চপদাধিকারীর দল এসে অভ্যর্থনা জানাল আমাদের। এইখানে গোটা দল ছেড়ে দরকারমতো নিজস্ব একটা অশ্বারোহী বাহিনী গুছিয়ে নিলাম আমরা। গোটাকতক আরবি ঘোড়া দেওয়া হল আমাদের। এদের পিঠে চিতাবাঘের ছাল বিছিয়ে জিন বাঁধা। জিনের ওপর সোনা-রুপোর সুতোর কাজ করা সুদৃশ্য কাপড়। বাজনার তালে তালে দেখি ঘোড়াগুলোও সব সাড়া দিতে শুরু করেছে। কী সুন্দর নাচতে নাচতে নগরতোরণ পার হয়ে গেল। গোটা নগর ভেঙে পড়ল আমাদের দেখতে। শেষে একটা বাগানে এসে সমাপ্তি ঘটল আমাদের এই শোভাযাত্রার। এমন আশ্চর্য সুন্দর বাগান আমি দেখিনি আর। ঠিক মধ্যিখানটায় এমারেট সিপাহ্‌ সলারের জমকালো অট্টালিকা। এখানেই আমাদের থাকবার বন্দোবস্ত।

তারপর তো ভোজের পর ভোজসভা চলল বারো দিন ধরে। বড়োসড়ো একখানা অশ্বারোহী রক্ষীদল সঙ্গে রয়েছে আমাদের। আর ছায়ার মতো লেগে আছে রাজকর্মচারীরা। পারস্য শাহের শ্যালক বৃদ্ধ ইয়াহিয়া খাঁ রয়েছেন খাবারদাবারের তত্ত্বাবধানে। সন্ধেতে মহলের সামনে সুবিশাল এক মার্বেলের জলাধারের পাশে বসে বাজনদারেরা বাজনা বাজায়।

ক’দিন অপেক্ষার পর পারস্য অধিপতির তলব এল। শাহি সরকার আর উচ্চপদস্থ শাহি কর্মচারীর দলের সঙ্গে রওনা হলাম শাহি-শকটে চড়ে। চার ঘোড়ায় টানা এক-একটা গাড়ি। প্রত্যেকটা ঘোড়া ধবধবে সাদা আর লেজটি বেগুনি রঙে রাঙানো। লাল পোশাকে ঘোষক আর রুপোর লাঠি হাতে অগ্রদূতের দল দৌড়ে চলেছে আমাদের আগে আগে।

শাহি দরবারের পার্শ্বকক্ষে কয়েক মিনিট অপেক্ষার পর এক সভাসদ ঘোষণা করল যে আলা হজরত (পারস্য অধিপতি) এইবারে আমাদের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্যে প্রস্তুত হয়েছেন। সুবিশাল এক কক্ষে নিয়ে যাওয়া হল আমাদের। সুদৃশ্য ঝালর আর কম্বলে পার্সি শৈলীতে সুসজ্জিত। দেওয়াল ধরে মন্ত্রী-পারিষদ, সেনাধ্যক্ষরা সব সার দিয়ে মূর্তিবৎ দাঁড়িয়ে। পরনে তাঁদের পুরোনো কায়দার কাফতান।

ইতিহাস বিখ্যাত সেই ময়ূর সিংহাসন। তার পাশেই মেঝে অবধি নামানো এক খিড়কি। মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন শাহ্‌ নাসির-উদ-দিন। আশ্চর্য সিংহাসনটি পৃষ্ঠদেশসহ বিশালাকৃতির এক কেদারার অনুরূপ। সুপ্রশস্ত গদি, তাতে আরোহণের জন্যে মেঝে থেকে সিঁড়ি উঠে গেছে ওপরে। ময়ূরপুচ্ছের আদলে মোটা সোনার পাতে বহুমূল্য সব মণিমুক্তো গাঁথা। প্রায় দুশো বছর আগে নাদির শাহ্‌ ভারতবর্ষ আক্রমণ করে দিল্লির মোঘল সম্রাটের কাছ থেকে ছিনিয়ে এনেছিলেন সিংহাসনটি।

শাহ্‌ নাসির-উদ-দিনের পরনে কালো শাহি পরিচ্ছদ। বুকে আটচল্লিশটা বৃহদাকার হিরে। দুই কাঁধে তিনটে করে বড়ো বড়ো পান্না বসানো। কালো টুপিতে হিরের আঁকড়া। কোমরে মণিমুক্তো বসানো খাপে ভরা তলোয়ার। স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন আমাদের দিকে। যেন নিজ শ্রেষ্ঠত্ব আর ক্ষমতা সচেতন এশিয়ার সার্বভৌম সম্রাটটি দাঁড়িয়ে আছেন সামনে।

আমাদের দলের প্রধান রাষ্ট্রদূত সুইডেন অধিপতির বার্তা পত্রটি অর্পণ করলেন। একজন দোভাষী সেটি গ্রহণ করে শাহকে দেখালেন। শাহ্‌ কিছুক্ষণ কথাবার্তা চালালেন আমাদের প্রত্যেকের সঙ্গে। সুইডেন আর নরওয়ের সম্পর্কে কিছু প্রশ্ন করলেন। জানালেন, ইউরোপে নাকি মোট তিনবার গিয়েছেন তিনি। পরের বারে সুইডেন আর আমেরিকায় যাবার ইচ্ছা রাখেন।

সে-বার গোটা রাজ-সাক্ষাতেই চিরাচরিত একটা পার্সি গৌরবের পরিবেশ বিরাজমান ছিল। কিন্তু বছর পনেরো পর শাহ্‌ নাসির-উদ-দিনের পুত্র মুজফফর-উদ-দিনের আমলে গিয়ে দেখি সে-সব দিনকাল তখন অতীত।

তারপর দিনভর চলল নানা মনোরঞ্জক কার্যকলাপ। মস্ত এক শাহি ভোজের আয়োজন করা হল আমাদের সম্মানে। শাহি মহলে তখন সমস্ত উচ্চপদাধিকারীরা উপস্থিত। শাহ্‌ অলক্ষ্যে থেকে দেহলিজে বসে আমাদের সুবিধে-অসুবিধের দিকে নজর রাখছিলেন।

শাহি প্রদর্শশালায় নিয়ে যাওয়া হল আমাদের। সিলমোহর করে তালাবন্ধ পড়ে ছিল। অতিথিদের সম্মানেই তা ভাঙা হল আবার। সেখানে দরিয়া-ই-নূর (আলোর সমুদ্দুর) নামে এক হিরে আছে। রয়েছে দুই ফুট ব্যাসের আঞ্চলিক এক গ্লোব। তাতে ঠাসবুননে নীলকান্তমণি বসিয়ে সমুদ্র নির্দেশ করা হয়েছে। মেরু অঞ্চলে স্ফটিক-স্বচ্ছ হিরে বসানো। তেহরানের ওপর বসে আছে উজ্জ্বল এক মণি। বাহরিনের দ্বীপ থেকে তুলে আনা খাঁটি মুক্তো, নিশাপুরের নীলকান্তমণি আর বাদাকশানের পদ্মরাগমণিতে ঠাসা ভরতি গুটিকতক কাচের ঘনক।

শাহি আস্তাবলের সামনে গিয়ে ন’শোটি উঁচু জাতের ঘোড়া দেখে এলাম আমরা। প্রত্যেকটির পিঠে একজন করে সহিস।

সবচাইতে দুর্দান্ত লেগেছিল নগরীর বাইরে এক ময়দানে গিয়ে। চোদ্দ হাজারি একটা দল ময়দানের চারদিক ঘিরে দাঁড়িয়েছে। শাহি রেলে করে পরিদর্শনে বেরোলাম আমরা। প্রদক্ষিণ শেষে সুবিশাল এক লাল রঙের তাঁবুতে গিয়ে বসলেন শাহ্‌। আমাদের জন্যে তার পাশেই গোলাপি রঙের তাঁবুর ব্যবস্থা। পদাতিক সৈন্যদল সম্রাটকে অভিবাদন জানাতে জানাতে সামনে দিয়ে কুচকাওয়াজ করে গেল। অশ্বারোহী বাহিনী ঝড়ের বেগে ঘোড়া ছুটিয়ে গেল। দেখতে সবচাইতে সুন্দর লাগছিল এদেরই—টকটকে লাল জোব্বা পরনে, মাথায় লাল ফেট্টি।

শেষ পর্যন্ত রেয় ধ্বংসস্তূপে চলে গেলাম একদিন। সলমানাসারের আমলে প্রাচীন সমৃদ্ধ নগরী ছিল রেয়। বুক অফ টবিটেও এর উল্লেখ পাওয়া যায়। ‘কাস্পিয়ান গেট’ গিরিপথ বেয়ে একদিনের যাত্রাপথে আলেকজান্ডার বিশ্রাম নিয়েছিলেন এখানে। এর প্রায় হাজার বছরেরও বেশি পরে খলিফা অল-মনসুরের এই নগরী সমৃদ্ধশালী হয়ে ওঠে। হারুন-অল-রশিদ এই নগরীতেই জন্মগ্রহণ করেন। আরবের তখন চন্দ্রের দশা চলছে। পরে ত্রয়োদশ শতাব্দীতে মোঙ্গলদের হাতে এই নগরী সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত হয়। আর বর্তমানে উত্তমরূপে সংরক্ষিত একটামাত্র মিনারই কেবল মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে এই ধ্বংসস্তূপের বুকে।

তেহরানে এসে বেশ দোটানায় পড়ে গেলাম আমি। এরপর কী করি? কাজ তো আপাতত শেষ। আর যে-ক’টা দিন আছি খাই-দাই, ফুর্তি করি, নাকি যে মাটি আমাকে অবিরত টানছে সেই এশিয়ার হৃদ মাঝারে বেরিয়ে পড়ি। এধরনের সফরে বেরিয়ে পড়তে গেলে অবশ্য পোক্ত প্রস্তুতির প্রয়োজন জানি। তবে ইচ্ছে থাকলে আটকায় কে—এও জানি। এইবারের সফরটা আমি ধাপে ধাপে করব বলেই স্থির করে রেখেছি। বিশেষত এই ভূখণ্ডের এ-যাবৎ অদেখা মরু অঞ্চল, তিব্বতি উজানভূমি চাক্ষুষ করার জন্যে অস্থির হয়ে উঠছিলাম দিন দিন।

সুইডেনের যে রাষ্ট্রদূত দলের সঙ্গে এখানে এসেছি আমি, তাঁরা কেউই আমার প্রস্তাবে অমত করলেন না। ফলত আমাদের রাজা অস্কারকে টেলিগ্রাফ করলাম। জানালাম, পারস্য থেকে পুবের দেশে বেড়াতে যেতে চাই আবারও। রাজা শুধুমাত্র অনুমতিই দিলেন না, সঙ্গে কথাও দিলেন যে এই সফরে আমার যাবতীয় পথখরচা তিনিই বহন করবেন।

অতএব জুনের ৩ তারিখে সুইডেনের রাষ্ট্রদূতেরা যখন দেশে ফেরার পথ ধরলেন, আমি ততক্ষণে বন্ধুবর হাইবেনেটের বাড়ি গিয়ে উঠেছি। সঙ্গে আপাতত যা টাকাকড়ি আছে তাতে চিন সীমান্ত অবধি পৌঁছে যেতে পারব।

॥ আট॥

সমাধি ভূমি

সবাই জানি পৃথিবীর প্রাচীন ধর্মগুলোর মধ্যে জরথুস্ট্রবাদ একটি। জরথুস্ট্র এই ধর্মবাদের প্রবর্তক। এঁদের ধর্মগ্রন্থের নাম জেন্দ-আভেস্তা। পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা ক্ষমতাবান লোকদের একজন এই ধর্মে দীক্ষিত ছিলেন। হাজার হাজার বছর ধরে এই ধর্ম প্রতিপালিত ও সমৃদ্ধি লাভ করেছিল। তারপর একসময় তার গৌরব হ্রাস পেতে শুরু করে। সেও কয়েক হাজার বছরের ইতিহাস। শেষে ৬৪০ খ্রিস্টাব্দে এই ধর্মের বিলুপ্তি ঘটে। খলিফা ওমর নবীর নিশান হাতে তখন পারস্যে এসে উপস্থিত হন এবং ইকবাতানায় পার্সিদের পরাস্ত করেন। ইসলাম ধর্মের আগ্রাসী বিস্তারের সময় প্রচুর জরথুস্ট্রবাদী মানুষ জাহাজে করে হরমুজ থেকে বম্বে পালিয়ে যায়। উপস্থিত প্রায় ১ লক্ষ জরথুস্ট্রবাদী মানুষ রয়েছে ভারতবর্ষে। আর পারস্যে আছে ৮ হাজার। সেই ধর্মের পবিত্র আগুন তাই নিভে যায়নি এখনও এই দেশে।

আগেই বাকুর সুরাখানিতে পরিত্যক্ত এক অগ্নি-মন্দির দর্শনের কথা বলেছি। পারস্যের ইয়েজদে এখনও বেশ কিছু মন্দিরের হদিস মেলে। কিন্তু অতীতে এর ধরন বা চেহারা ছিল আলাদা। পার্সেপোলিসে এমন প্রচুর সংখ্যক অগ্নি-বেদি ছিল বলে জানা যায়। বিশিষ্ট দার্শনিক ও ইতিহাসবিদ জেনোফোনের উল্লেখে পাওয়া যায়—

সম্রাট সাইরাস নিজের প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে আসতেন, ক’টা ঘোড়াও নিয়ে আসা হত সূর্যদেবের প্রতি উৎসর্গের জন্যে। সঙ্গে সাদা মালায় সজ্জিত এক শকট। তারপর আসত বেগুনি সাজে সজ্জিত এক অশ্ব শকট। এর সঙ্গেও থাকত ঘোড়া। পেছন পেছন প্রকাণ্ড এক অগ্নিকুণ্ডে আগুন নিয়ে আসত একদল মানুষ। তাতেই উৎসর্গ করা হত ঘোড়া। ম্যাজাইরা এই প্রথার প্রবর্তক।

জুরথ্রস্ট্রের অনেক আগে থাকতেই ভারতবর্ষ ও পারস্যে ম্যাজাইবাদ প্রচলিত ছিল। অপার্থিব আত্মা এবং জল ও আগুন—এই দুটি উপাদানের উপাসক ছিল তারা। মায়া ও ডাকিনীবিদ্যার চর্চাও হত।

জুরথ্রস্ট ছিলেন দ্বৈতবাদী; একাধারে ঈশ্বর এবং শয়তানের পূজারি। ঐশ্বরিক শক্তি হিসেবে আহুরামাজদাকে যেমন সমস্ত আলোর স্রষ্টা হিসেবে আরাধনা করা হত, তেমনি কালোর শক্তি হিসেবে ধরা হত আহরিমানকে। অতএব ধর্মাধর্মের এই দুই বিপরীত শক্তির শত্রুতা ছিল আবহমান। ফলত সৃষ্টিকে রক্ষা করতে ধর্মনিষ্ঠ মানুষের প্রয়োজন পড়ল বেশি, কারণ যে-কোনো মূল্যে আহরিমানকে পরাজিত হতেই হবে আহুরামাজদার কাছে।

প্রাচীনতম পুণ্য অগ্নিকুণ্ডগুলোর মধ্যে একটার হদিস মেলে রেয়তে। সূর্য এবং আগুনকে এ-দেশে সর্বশক্তিমান ঈশ্বর রূপে আরাধনা করা হয়। অগ্নি আলো দেয়, তাপ দেয় আর সব পুড়িয়ে বিশুদ্ধ করে তোলে। তার তুলনা এই জগতে আর কিছু নেই।

শবদেহ পরিবেশ দূষিত করে তোলে। তাই চারদিকে উঁচু দেওয়াল তুলে কবরখানা নির্দিষ্ট করা আছে, সেখানেই মিনার বা বুরুজের নীচে মাটি দেওয়া হয়। কবরখানা যাবার পথটাও খারাপ বলেই মনে করা হয়। তবে শবযাত্রীর আগে আগে যদি চোখের চারদিকে কালো ফুটকি আছে এমন সাদা বা হলদে রঙের কোনও কুকুর হেঁটে যায় তবে সেই পথে আর দোষ থাকে না। যতসব ভূতপ্রেত অপদেবতা, সে-ই তাড়িয়ে দেয়। শবদেহ ঘিরে ওড়া মাছিরা নাকি এক-একটা আহরিমানের দূতী পেত্নী। মৃত শত্রুরা পৃথিবীর ক্ষতি করে না, কারণ তারা কালোর বিরুদ্ধে আলোর জয়ের সাক্ষী।

পারস্য দেশের ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা পার্সিদের, অর্থাৎ অগ্নি উপাসকদের বারবারই ঘৃণা আর অবজ্ঞার চোখে দেখে এসেছে। ফলত ধীরে ধীরে অগ্নি উপাসকেরা নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যে নিজেদের সীমাবদ্ধ করে ফেলেছে যাতে নিজস্ব ধর্মীয় আচার পালনে কোনোরকম বাধা না আসে। এদের মধ্যে অনেকেই বণিক ও মালি সম্প্রদায়ের। হাজার হাজার বছর পরও তারা জুরথ্রস্টেরই অনুগামী। সমস্ত ঘরে একটা করে প্রদীপ জ্বলে ওদের। সেই পবিত্র অগ্নির সামনে তামাক সেবন করা পাপ। আগুন লাগলে নেভানো মানা। অগ্নিশক্তির বিরুদ্ধাচরণ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

পার্সিরা মারা গেলে সাদা কাপড়ে ঢেকে দেওয়া হয়। আর এক টুকরো সাদা কাপড়ে মাথাটাও মুড়ে দেওয়া হয়। তেলের প্রদীপ জ্বলে মৃতদেহের শিয়রে। শবদেহ রাখা হয় একটা লোহার খাটুলিতে। এক টুকরো রুটি থাকে পায়ের কাছে। তারপর একটা কুকুরকে যেতে দেওয়া হয় শব কক্ষে। সেই কুকুর ঢুকে যদি রুটিটা খেয়ে নেয় তবে ধরা হয় মানুষটা সত্যিই মৃত। আর কুকুরটা যদি রুটি না খেয়ে ফেরত যায় তবে মনে করা হয় যে মৃতের আত্মা দেহ ছেড়ে যায়নি এখনও। পচন না ধরা অবধি মৃতদেহ তখন সেখানেই রেখে দেওয়া হয়। ডোম এসে মৃতদেহ পরিষ্কার করে দিয়ে যায় নিয়মিত। সমাজে সে অস্পৃশ্য, তার বাড়িতে পা রাখা নিষিদ্ধ।

তারপর একদিন বহতা জলে ধোয়া সাদা রঙের পোশাকে চারজন কুলি এসে খাটুলি তুলে নিয়ে যায় নৈঃশব্দ্যের মিনারে, অর্থাৎ কবরস্থানে। ও আসলে মিনার-টিনার কিছু নয়, প্রায় ২৩ ফুট উঁচু আর ২২৩ ফুট ঘেরের একটা দেওয়াল। এর ভেতর বড়ো এক খোঁদলের মধ্যে আয়তাকার চাতালে মৃতদেহ শুইয়ে রাখা হয়। দেহের কাপড়চোপড় আলগা করে আস্তে আস্তে খুলে দেওয়া হয়, মাথা মুড়ে রাখা সাদা কাপড়টাও। তারপর শবযাত্রীরা ধীরে ধীরে দেওয়াল পেরিয়ে বাড়ির পথ ধরে। এইবারে একে একে শকুনের দল উড়ে এসে বসে দেওয়ালের মাথায়। ঝাঁকে ঝাঁকে কাক চক্কর দিতে শুরু করে জায়গাটার ওপর। চারদিক শান্ত হয়ে গেলে এইবারে আসল কাজ শুরু হয় এদের। একসময় মৃত ব্যক্তির কঙ্কালটাই পড়ে থাকে কেবল, সূর্যের গনগনে তাপে ভাজা ভাজা হয়।

অগ্নি উপাসক পার্সিরা নিজেদের জুরথ্রস্টের অনুগামীদের বংশধর হিসেবে দাবি করে। সেই কারণে তারাই একমাত্র ইন্দো-ইউরোপীয় জাতির বিশুদ্ধতম প্রতিনিধি।

স্টকহোম থেকে রওনা হওয়ার আগে চিকিৎসা ও নৃতত্ত্ববিদ্যার এক বিখ্যাত অধ্যাপক যে-কোনো উপায়ে এ-দেশের অগ্নি উপাসকদের কিছু করোটি সংগ্রহ করে আনতে বলেছিলেন। জুনের মাঝামাঝি তখন। চূড়ান্ত গরম। ছায়াতেই ১০৬ ডিগ্রি উঠেছে থার্মোমিটার। ড. হাইবেনেটকে নিয়ে সেই সমাধি স্থলের উদ্দেশে রওনা হলাম আমি। জায়গাটা তেহরানের দক্ষিণ-পূর্বে। বিকেল পড়ার আগে অর্থাৎ দুপুরের ঠিক পরের সময়টা বেছে নিলাম আমরা। কারণ, অত্যধিক তাপ এড়াতে এই সময়টায় মানুষজন তখনও ঘরেই সেঁধিয়ে থাকে, বাইরে বেরোয় না বিশেষ।

আমার জিনের নরম ব্যাগটা নিলাম সঙ্গে, সেই কার্চিন। তার দুই পকেটে খড়, কিছু কাগজ আর দুটো তরমুজ ভরে দিলাম। তরমুজ দুটো আকারে মানুষের মাথার মতো।

শাহ্‌ আবদুল আজিম তোরণ পেরিয়ে ছুটে চলল আমাদের শকট। শুনশান পথ, নদীনালা সব শুকিয়ে খটখটে। নগরের বাইরে খোলা ময়দানে উটের দল চরে বেড়াচ্ছে। কাঁটাঝোপ চিবোচ্ছে। পোড়া মাটির ওপর এদিক ওদিক থেকে ধুলো উড়ে যাচ্ছে অপদেবতার মতো।

হাশেমাবাদ গাঁয়ের মাঝ দিয়ে পথ ধরলাম আমরা। সেখানে এক জালা জল আর একটা মই ধার করলাম এক চাষির কাছ থেকে। কবরস্থানে গিয়ে তাড়াতাড়ি মই লাগানো হল পাঁচিলে। কিন্তু কপাল মন্দ, দেওয়ালের মাথা থেকে সে প্রায় ফুট তিনেক খাটো পড়ে গেল। আমি কোনোমতে হ্যাঁচোড়প্যাঁচোড় করে উঠে বসলাম মাথায়। তারপর শরীরটা মোচড় মেরে ঘুরে হাতটা বাড়িয়ে দিলাম ড. হাইবেনেটের দিকে।

পচা দেহের গা গুলনো গন্ধ ভেতরটায়। হাইবেনেট পাঁচিলের মাথায় বসে আমাদের বাহন চালকের দিকে নজর রেখেছেন। সে-ব্যাটা আবার কাউকে না খবর দিয়ে বসে। আমি ততক্ষণে পাঁচিল থেকে সিমেন্টের সিঁড়ি বেয়ে সেই প্রকাণ্ড খোঁদলটায় নেমে এসেছি। শবদেহ এনে ফেলে যাবার একষট্টিটা খোলা চাতাল রয়েছে সেখানে। এর মধ্যে গোটা দশটার ওপর কঙ্কাল আর পচাগলা শবদেহ পড়ে আছে। এক-একটার অবস্থা এক-একরকম; কোনোটায় সদ্য পচন ধরেছে, কোনোটা গলে গেছে। ঝড়-বাদল লাঞ্ছিত সাদা সাদা হাড়গোড় সব ডাঁই হয়ে আছে পাঁচিলের পাশে।

কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজির পর তিনটে পূর্ণবয়স্ক পুরুষ শবদেহ বেছে নিলাম আমি। অল্প ক’দিন হল মাত্র ফেলে রেখে গেছে এখানে। মাংস, চামড়া, নাড়িভুঁড়ি সব ছিঁড়ে খেয়েছে যম পাখির দল। চোখগুলো খুবলে নিলেও মুখটা অক্ষতই রয়েছে বলা চলে। শুকিয়ে চামড়ার কাগজের মতো শক্ত হয়ে আছে। প্রথমে একটা দেহ থেকে খুলিটা আলাদা করে নিয়ে ভেতরের আবর্জনা ঝেড়ে ফেললাম আমি। দ্বিতীয়টাও তাই। তিন নম্বরটার দেখি রোদে পড়ে থাকতে থাকতে মাথার ঘিলু-টিলু সব শুকিয়ে পাথর হয়ে আছে।

আমার সেই জিনের ব্যাগ আর পথে ধার করে আনা জলের জালাটা পাঁচিল টপকিয়ে ভেতরে নিয়ে এসেছিলাম আমি। আমাদের ড্রাইভারটার সামনে ভান করেছিলাম যেন ভেতরেই দুপুরের খাবার খেয়ে নেব আমরা। সেই জলে ভালো করে হাত ধুয়ে নিজের ব্যাগটা খুললাম এইবারে। ব্যাগটা খালি করে খুলি তিনটে ভালো করে কাগজে মুড়ে নিলাম প্রথমে। তারপর ব্যাগের তলায় খড় বিছিয়ে তরমুজগুলোর জায়গায় খুলিগুলো ভরে নিলাম। ফলে ব্যাগটাও ঠিক আগের মতোই দেখতে হয়ে গেল। ড্রাইভারের চোখে অস্বাভাবিক কিছু ঠেকার কথা নয়। হ্যাঁ, দুর্গন্ধটা নাকে গেলে হয়তো একটু সন্দেহ হতে পারে।

পোঁটলাপুটলি নিয়ে গাড়ির কাছে ফিরে দেখি পাঁচিলের একচিলতে ছায়ায় বসে ড্রাইভার সাহেব অঘোর ঘুমে। যাক, ব্যাটা বেচাল কিছু করেনি তবে। ফেরার পথে জালা আর মই ফেরত দিয়ে আবার সেই খাঁ খাঁ ময়দান পেরিয়ে হাইবেনেটের বাড়ির রাস্তা ধরলাম আমরা।

খুলি তিনটে মাটিতে পুঁতে রাখলাম একমাস। তারপর তুলে এনে দুধে ফেলে ফোটালাম যতক্ষণ না পর্যন্ত পরিষ্কার হয়ে হাতির দাঁতের রঙ ধরছে।

বলা বাহুল্য, গোটা কাজটাই করতে হয়েছে অত্যন্ত গোপনে। এ-দেশের লোকজন, বিশেষত ধর্মভীরু পার্সিরা যদি একটিবার টের পায় যে বিধর্মীরা তাদের সমাধি স্থল থেকে খুলি চুরি করে এনেছে, তবেই হয়েছে আর কি। ওদিকে হাইবেনেট আবার স্বয়ং পারস্য শাহের ব্যক্তিগত ডাক্তার, বিশেষত দাঁতের। অতএব যে-কেউ ভেবে নিতেই পারে যে মড়ার খুলি থেকে দাঁত খুলে নিয়ে শাহের চোয়ালে বসাবে ডাক্তার। চূড়ান্ত এক পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে তাতে, একটা দাঙ্গা হাঙ্গামা বেধে যাওয়াও বিচিত্র কিছু নয়। সেক্ষেত্রে এত কষ্ট করে চুরি করে আনা খুলিগুলো জনতার হাতেই তুলে দিতে হবে আমাদের। যাক, সে-সব কিছুই হল না, গোপনেই কর্ম সমাধা হল আমাদের।

কিন্তু ধরা আমি পড়লাম ঠিকই। আর সেটা বাকুর ঘাটে। সে-বারের মতো এশিয়া সফর শেষে যখন বাড়ির পথ ধরেছি, পড়লাম সোজা কাস্টমস অফিসারদের খপ্পরে। তন্নতন্ন করে আমার জিনিসপত্রের তল্লাশির সময় কাগজে মোড়া ফুটবলের মতো তিনটে বস্তু গড়িয়ে গেল মেঝেতে।

কাস্টমস ইন্সপেক্টর সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন, “কী এগুলো?”

আমার নির্বিকার উত্তর—“মানুষের খুলি।”

“কী বলছেন, মানুষের মাথা?”

“হ্যাঁ। নিজেই খুলে দেখুন না।”

একটা খুলির মোড়ক খুলতেই সে যেন খি খি করে হেসে উঠল ইন্সপেক্টরের হাতে। অফিসারেরা এ-ওঁর মুখে হতবিহ্বল দৃষ্টিতে তাকাচ্ছেন, কিংকর্তব্যবিমূঢ়। শেষে সার্ভেয়র মশাই কোনোমতে নির্দেশ দিলেন—“কাগজে মুড়ে যেমনটা ছিল তাড়াতাড়ি ব্যাগে ঢোকাও ওটা।” তারপর আমাকে বললেন, “আপনার ওই লটবহর নিয়ে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কেটে পড়ুন এখান থেকে।”

ভদ্রলোক হয়তো ভেবেছেন খুলি তিনটে কোনও ট্রিপল মার্ডারের প্রমাণ হতে পারে। উটকো ঝামেলায় জড়িয়ে পড়াটা তাঁর পক্ষে বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।

আজও হয়তো সেই পার্সি খুলি তিনটে স্টকহোমের ক্র্যানিওলজিক্যাল মিউজিয়ামে খুঁজে পাওয়া যাবে।

॥ নয়॥

দেমাভেন্দের শিখরে

গ্রীষ্মের সময়টায় তেহরানের তাপ থেকে রেহাই পেতে শাহ্‌ নাসির-উদ-দিন বছরে একবার অলবুর্জ পর্বতমালায় গিয়ে বাস করেন। এ-বছর তার দিনক্ষণ স্থির হল জুলাইয়ের চার তারিখে। ড. হাইবেনেটের অতিথি হওয়ার সুবাদে শাহ্‌ আমাকেও আমন্ত্রণ পাঠালেন এই দলে যোগ দিতে। মাস খানেকের ওপর সেখানে থাকব আমরা। আর একজন ইউরোপিয়ানও আছেন দলে—ড. ফেউভ্রিয়ের। পারস্য শাহের প্রথম ব্যক্তিগত চিকিৎসক তিনি, জাতিতে ফরাসি। এই প্রমোদভ্রমণে খুব অল্প সংখ্যক ইউরোপিয়ানই সুযোগ পেয়েছেন এ-যাবৎ।

যথারীতি জোগাড়যন্ত্র শুরু হল। দেখেশুনে বেশ উত্তেজনাই বোধ হচ্ছিল আমার। বেরোনোর আগের দিন একজন শাহি গোমস্তা এসে দেখা করলেন আমাদের সঙ্গে। পথঘাট সম্পর্কে অবগত করালেন প্রথমে। তারপর শাহের পাঠানো একমুঠো পারস্য স্বর্ণমুদ্রা হাতে ধরিয়ে দিলেন আমাদের। উদ্দেশ্য, পথযাত্রীরা কেউ যাতে অর্থের অভাবে না পড়ে।

পর্বতমালার উত্তর-পূর্ব পথ ধরে এগোচ্ছে আমাদের দল। জাজে-রুদ এবং লার নামে দুটো নদীর অববাহিকাও পেরিয়ে এলাম। প্রথমটা দক্ষিণ ধরে মরুর দিকে বয়ে চলেছে। আর দ্বিতীয়টা উত্তরে কাস্পিয়ান সাগরের দিকে। ক্রমে দুটো উত্তুঙ্গ গিরিপথও পার করতে হল। দ্বিতীয়টার উচ্চতা ছিল ৯,৫০০ ফুট।

পাহাড়ে পাহাড়ে খাঁজ আর গিরিপথ ধরে যাচ্ছি। জোরালো বাতাস। কখনও আবার উপত্যকা আর চারণভূমিতে নেমে আসছি। একজায়গায় এসে হঠাৎ দেখি দু-দিক দিয়েই পথ একেবারে আটক। উট, খচ্চর আর ঘোড়া মিলে হাজার দুই পশু রয়েছে আমাদের দলে। তাঁবু, স্বয়ং পারস্য সম্রাট আর তাঁর মন্ত্রী-সান্ত্রী, দাসদাসীর যাবতীয় লটবহর বয়ে নিয়ে চলেছে তারা। মোট বারোশো লোক রয়েছে এই দলে। তার মধ্যে দুশো জন সেপাই। রাতারাতি তিনশো তাঁবুর যেন এক জনপদ গড়ে উঠল এই নির্জন উপত্যকা।

পরিচারকেরা বাদে দলের প্রত্যেকেরই আর এক প্রস্থ তাঁবুর সরঞ্জাম রয়েছে সঙ্গে। যত দ্রুতই পথ চলি না কেন, ঘুম থেকে উঠে পরদিন দেখা যায় পরের গন্তব্যে আগে থেকেই তাঁবু খাটানো রয়েছে আমাদের।

শাহি তাঁবু চলেছে লাল রঙের ধ্বজায় সজ্জিত উটের পিঠে। তাঁর নিজস্ব বাক্স-প্যাঁটরা সব লাল কাপড়ে মোড়া, চারধারে কালো বর্ডার। সে-সব বয়ে নিয়ে চলেছে খচ্চরের দল। শাহি ঘোড়ার দলও লাল ধ্বজায় সজ্জিত, আর সাদা ঘোড়াগুলোর লেজ সব বেগুনি রঙে কলপ করা।

তাঁবু খাটানোরও আলাদা আইন আছে দেখলাম। এলোমেলো যত্রতত্র খাটিয়ে দিলেই হল না। দলের প্রত্যেকে নিজের তাঁবুর অবস্থান সম্পর্কে ওয়াকিফহাল। তাঁবুর সারির মাঝে মাঝে সরু পথের হদিসও সবাই জানে। পারস্য শাহের থাকবার সুবিশাল লাল তাঁবুর পাশাপাশি আরও দুটো আলাদা তাঁবু খাটাতে হয় তাঁর খাওয়াদাওয়া আর ধূমপানের জন্যে। এছাড়া শাহি হারেমের জনানাদের জন্যে আলাদা তাঁবু তো আছেই। ঠিক কতজন স্ত্রীলোক তিনি হারেম থেকে সঙ্গে এনেছেন তার হদিস পাওয়া যায় না। কেউ কেউ বলে চল্লিশ। এর মধ্যে অবশ্য হারেমের দাসীরাও ধরা আছে। প্রায় রোজ দিনই পথে শাহি জনানাদের টপকে এগিয়ে যেতাম আমরা। একগাদা অবগুণ্ঠিত নারীর দল মরদের মতো ঘোড়ার পিঠে পথ চলেছে। স্বাভাবিক সম্ভ্রম বশেই পাশ কাটিয়ে যাবার সময় আমরা পুরুষেরা মুখ ঘুরিয়ে রাখি। খোজা আর বামনের দল আগুপিছু পাহারায় থাকে তাঁদের।

শাহি তাঁবুগুলো ঘিরে খুঁটির ওপর মোটা লাল কাপড়ের উঁচু পাঁচিল। তাঁবুর বাইরের একফালি উঠোনটাও এই পাঁচিলের ঘেরের মধ্যেই। আর তার বাইরে প্রহরী সর্দার, ধ্বজাবাহীর দল, রসদ ভাঁড়ার, পাকশালা ইত্যাদির তাঁবু পড়েছে। দু-হাজার চারশো বছর আগের সম্রাট সাইরাসেরও এক্কেবারে ঠিক এইরকম তাঁবু সজ্জার উল্লেখ পাই জেনোফনের বিবরণে।

এই চলমান তাঁবু নগরীর শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে থাকেন প্রধান উজির আমিন-ই-সুলতান। পাকশালা আর শাহি প্রতিনিধির দায়িত্ব দেওয়া আছে পারস্য শাহেরই একজন আত্মীয় মেজ-ইদ-দোভলেহ্‌ নামে একজনের ওপর। এছাড়া আস্তাবল প্রধান, জিন কক্ষ সর্দার, দেহরক্ষী সর্দার, তোষাখানা প্রধান, শাহের শয়নকক্ষ প্রধান (বৃদ্ধ একজন মানুষ, শাহের শয্যা তাঁবুর মুখে সবসময় পড়ে পড়ে ঘুমোন), খোজা সর্দার, কলিয়া সর্দার (যারা জলের নল পরিষ্কার রাখে), প্রধান পাচক, খানসামা, নাপিত সর্দার, সক্কা সর্দার (যারা ক্ষণে ক্ষণে শাহি তাঁবুর চারদিকে জল ছেটায় যাতে ধুলো না হয়) আর ধ্বজাবাহক সর্দার প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য বলা চলে।

বৃহৎ এই তাঁবু নগরীর ঠিক মধ্যিখানে আমার আর হাইবেনেটের আস্তানা। তিনটে তাঁবু বরাদ্দ আমাদের—একটা নিজেদের জন্যে, একটায় পাকশালা আর একটা চাকরবাকরদের। সন্ধে হতেই এমন হই-চিৎকার শুরু হয়, পাশের জনের সঙ্গে কথা বলাও তখন দায়। চারদিকে শুধু কাফেলার লোকজনের সঙ্গে প্রহরীদের চেঁচামেচি, ঘণ্টির শব্দ, ঘোড়ার হ্রেষাধ্বনি, খচ্চরের ডাক আর উটের তর্জনগর্জন। রাত ঠিক দশটায় একবার ভেরী বাজিয়ে সংকেত দেওয়া হয়। তখন ছাড়পত্র আছে এমন লোকজনেরা শাহি তাঁবু থেকে খানিক তফাতে দাঁড়ায় গিয়ে। অপরিচিত নিশাচর কাউকে হাঁটাচলা করতে নজরে এলেই চৌকিদারেরা হুঁশিয়ারি দিয়ে চিৎকার করে ওঠে। সারারাত অগ্নিকুণ্ড জ্বলে চারদিকে, তাঁবুর ভেতর থেকেও আলো ভেসে আসে। একজন আর একজনের সাক্ষাতে গেলে পেছন পেছন কাগজের লন্ঠনে তেলের বাতি হাতে কেউ না কেউ সঙ্গে যায়।

বিশেষ বিশ্বস্ত কর্মচারী পরিচালিত বিচারসভার ব্যবস্থাও রয়েছে শিবিরে। শাহি পশু দ্বারা কোনও চাষির ক্ষেতখামার নষ্ট হলে অভিযোগকারীকে ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে তাকে বেত মারা হয়।

দস্তুরমতো শাহ্‌ও স্বয়ং মন্ত্রীদের সঙ্গে করে রোজ দরবার কক্ষে এসে বসেন। দরবারের কাজ শুরু হবার আগে কখনো-কখনো তাঁর দোভাষী এতেমাদ-এ-সলতানতকে উচ্চৈঃস্বরে ফরাসি সংবাদপত্র পড়ে শোনাতে আদেশ দেন। মস্ত দলবল নিয়ে কখনও শিকারে বেরিয়ে পড়েন। তেমন কিছু পেয়ে গেলে দলের মধ্যে ভাগ করে দেন। আমাদের পাঠাতেও ভোলেন না। কোনও গাঁয়ের পাশ দিয়ে যেতে গিয়ে দেখেছি, গাঁ ভেঙে লোকজন হাজির হয় তাদের শাহেনশাহকে দেখতে। শাহ্‌ তখন তাদের মুঠো মুঠো স্বর্ণমুদ্রা বিতরণ করেন। পথ চলার সময় শাহ্‌ সাধারণত একটা বাদামি রঙের আলখাল্লা পরে থাকেন। সঙ্গে কালো টুপি। কালো রঙের এক ছজ্জা থাকে মাথার ওপর। তাঁর জিন এবং জিনের কাপড়ে সোনার কারুকার্য।

লার নদীর তীরে বড়োশি নিয়ে বসে মস্ত মস্ত রুইমাছ ধরা হল। দারুণ স্বাদ তার। দল-কে-দল যাযাবর কালো কালো আর রঙিন তাঁবু ফেলেছে সেখানে। আমি তাড়াতাড়ি ছবি আঁকতে বসে গেলাম। বার বার ওদের দিকে তাকাচ্ছি আর আঁকছি। এমনি সময় দারুণ সুন্দর দেখতে একটি মেয়ের দিকে চোখ গেল। তার ছবি আঁকতে চাইলাম। কিন্তু না, তার বাবা রাজি হল না কিছুতেই। বলে কিনা, “না হুজুর, এ-কাজটি করবেন না। ছবি শাহের নজরে পড়ে গেলে হারেমে ডাক পড়বে মেয়ের।”

শাহ্‌ নিজেও দেখেছি ছবি আঁকার কদর করেন। আমার আঁকা ছবি বেশ পছন্দও করেন। কখনো-কখনো তাঁর তাঁবুতে ছবিসুদ্ধ ডাকও পড়ে আমার।

শাহি দলের সঙ্গে এসেছে আর এক আশ্চর্য মানুষ। তার উল্লেখ এখনও করিনি। অসিস-ই-সুলতান, যার অর্থ দাঁড়ায় ‘সুলতান স্নেহ’। দেখতে কুৎসিত, ক্ষয়িষ্ণু চেহারার এক বছর বারোর ছেলে। শাহের নাকি পয়া রক্ষাকবচ সে। তাকে ছাড়া শাহ্‌ এক পাও কোথাও বাড়ান না। অতিসাধারণ এক ছেলের জন্যে তাঁর এই অন্ধ স্নেহের কারণ এক ভবিষৎবাণী। তাতে বলা হয়েছিল, শাহের প্রাণ ভোমরাটি নাকি রয়েছে ওই ছেলের ভেতরে। অতএব এ-ছেলে যে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার ঘেরাটোপে বন্দি থাকবে, বলাই বাহুল্য। তার আবার রাজপাট আলাদা। দরবার কক্ষ, বামনের দল, বিদূষকের দল, নিগ্রো বাহিনী, ব্যক্তিগত অঙ্গমর্দিকা বা দাসদাসীর দল—প্রতিটি জিনিস নিজস্ব। মুখ থেকে পড়তে না পড়তেই হুকুম তামিল করে তারা। সে নিজে আবার শাহি সৈন্যদলের সেনাপতি। শাহের ওপর তার একচ্ছত্র আধিপত্যের কারণে কেউই তাকে অমান্য করতে সাহস করে না। তবে গোপনে সবাই মুণ্ডপাত করতেও ছাড়ে না—ব্যাটা মরে না কেন।

নাসির-উদ-দিনের অভ্যাস অবশ্য সবসময়ই কোনও না কোনও জীবের প্রতি স্নেহপ্রবণ হয়ে পড়া। যেমন, এই অসিস-ই-সুলতানের আগে পঞ্চাশটা বেড়ালকে নিয়ে পড়েছিলেন তিনি। এগুলোরও নিজস্ব মহল ছিল। আর শাহ্‌ যখনই কোথাও যেতেন ভেলভেটের ঝুড়িতে করে এদেরও সঙ্গে নিতেন। এদের সর্দার ছিল বাবর খাঁ—এক বাঘা বেড়াল। শাহের সঙ্গে এক টেবিলে বসে রোজ প্রাতরাশ করত সে। ক্রমে বেড়ালের বংশবৃদ্ধি হল, সংখ্যায় বাড়ল তারা। দল বেঁধে প্রাসাদের ফরাসে ফরাসে ঘুরে বেড়ায়। কোন মন্ত্রীর ঘাড়ে ক’টা মাথা তাদের অমান্য করে, এমনি অবস্থা তখন।

যাই হোক, মোটের ওপর আমাদের গ্রীষ্মাবকাশ বেশ ভালোই কাটছিল। ঘুরে বেড়ানো, ছবি আঁকা আর লেখালিখি বিনে আমার আর কাজ নেই। শিবিরে এক আমিই ইংরেজি জানা লোক। মাঝেমধ্যে ইংরেজি ডাকে যাওয়া কাগজপত্র তর্জমা করে আমিন-ই-সুলতানকে শোনাতে হয়।

আমরা লার নদীর উপত্যকায় রয়েছি তখন। দেমাভেন্দ থেকে দূর নয়। মন উচাটন হল পারস্যের সর্বোচ্চ পর্বত শিখরে ১৮,৭০০ ফুট বেয়ে উঠতে। তেহরানে থাকতে ইউরোপিয়ান কূটনীতিবিদদের সঙ্গে অমন কত পাহাড় বেয়ে উঠেছি।

দেমাভেন্দ একসময় সক্রিয় অগ্ন্যুৎপাতের অঞ্চল বলে পরিচিত ছিল। তবে এখন অনেকটাই নিষ্ক্রিয়। জ্বালামুখ বেয়ে লাভার সঙ্গে ক্ষারধর্মী পাথর, রঙবেরঙের কঠিন শিলা, গন্ধক ইত্যাদি বেরিয়ে আসত তখন আধ কিলোমিটার জুড়ে। তার মাথা আবার বরফে ঢাকা থাকে চিরকাল। প্রাচীনকালে পারস্যের কবিয়ালরা একে নিয়ে গান বাঁধত। এর আসল নাম নাকি ছিল দিভবান্দ—প্রেতের আবাস। আজও এরা বিশ্বাস করে যে এর চূড়ায় জিন এবং দিভের (ভালো এবং প্রেতাত্মা) বাস।

আমার ইচ্ছের কথা শুনে শাহ্‌ অত্যন্ত উৎসাহ প্রকাশ করলেন। পাশাপাশি সন্দেহও প্রকাশ করলেন যে ভালো মতন প্রস্তুতি আর প্রচুর লোকজন সঙ্গে না নিলে এই পাহাড় বেয়ে ওঠা একপ্রকার অসম্ভব। তাঁর হুকুমে প্রধান উজির রাহনা গ্রামের মোড়লকে সমস্ত ব্যবস্থা করে রাখতে লিখে পাঠালেন। সেই গ্রাম থেকেই পর্বতারোহণ শুরু হবে আমাদের।

৯ জুলাই সকালে শাহের আজ্ঞবাহী জাফর নামে এক লোক এসে সঙ্গে নিয়ে চলল আমাকে। আমি ঘোড়ায় আর সে খচ্চরের পিঠে—রওনা হলাম রাহনার পথে। সেখানেই রাত কাটল। মোড়ল প্রথমেই জানিয়ে রাখল, আমার যে-কোনো আদেশ পালনে সে রাজি থাকবে—এমনটাই নির্দেশ এসেছে। দিন দু-একের জন্যে দুজন বিশ্বস্ত গাইডের আবশ্যক হয়ে পড়ল। তৎক্ষণাৎ দেখি কাবালাই তাগি আর আলি নামে দুই মূর্তিমান এসে হাজির। জানাল, এই দেমাভেন্দের শিখরে এর আগে তারা ত্রিশ বার গেছে গন্ধক সংগ্রহ করতে।

ভোর সাড়ে চারটেয় রওনা হলাম যখন, দেমাভেন্দের চুড়ো তখন মেঘে ঢাকা। গাইড দুজন আগায় তামার লোহা বাঁধানো লাঠি, যন্ত্রপাতি আর যাবতীয় লটবহর কাঁধে আমার সঙ্গ নিয়েছে।

নুড়ির ঢাল বেয়ে, পাথরের মাঝখান দিয়ে আর ঝোরা-ঝরনা পেরিয়ে ধীরে ধীরে পথ চলেছি আমরা। গোটা দিনটা এভাবেই কাটল। সন্ধের মুখমুখ একটা গুহার সামনে এসে পৌঁছলাম আমরা। গাইড দুজন রাতটা এখানেই কাটাতে চাইছে। আমি রাজি হলাম না। গন্তব্য এখনও অনেকটা দূর, এগিয়ে চলার নির্দেশ দিলাম। জায়গাটা তখন এতই বন্ধুর যে রাতের অন্ধকারে পায়ে হেঁটে এগিয়ে যেতে হচ্ছিল। শেষে বরফের ছোঁয়া পেতে সেখানেই রাত্রিযাপনের আদেশ দিলাম আমি। একটা ঝোপ বেছে নিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হল। আর কী অদ্ভুত, তার ধোঁয়াটুকু উড়ে গেল না, পর্দার মতো ঝুলে রইল দক্ষিণের ঢালে। ডিম আর মাখন সহযোগে রুটি খেয়ে আমরাও খোলা আকাশের নীচে ঘুমিয়ে পড়লাম।

দারুণ শীত পড়েছিল রাতে, বাতাসও বইছিল জোর। আগুনটা জ্বালিয়ে রাখা হল। ওম পেতে যতটা সম্ভব আগুনের কাছাকাছি গিয়ে জানোয়ারের মতো একে অপরকে জড়িয়ে শুয়ে রইলাম আমরা।

পরদিন ভোর চারটের সময় আলি ডেকে তুলল আমাকে। পাশে দাঁড়িয়ে চিৎকার করছে, “সাহেব, বেরিম!” অর্থাৎ, এইবারে উঠে পড়া যাক। কয়েক চুমুক চা আর খানিকটা রুটি খেয়ে নিয়ে আবার বেয়ে ওঠা। অত্যন্ত কঠিন রঙবেরঙের আর চুনাপাথরের শৈলশিরা বেয়ে উঠছি। দেমাভেন্দের আকৃতি ঠিক আগ্নেয়গিরির শঙ্কুর মতোই দেখতে। ১১,০০০ ফুট উচ্চতায় চির বরফের রাজ্যে এসে পৌঁছলাম আমরা। দেখতে অনেকটা পর্বত-কঙ্কালের মাথায় টুপির মতো। ঢাল অবধি বিস্তৃত পাথুরে শিরার গায়ে আঁকাবাঁকা সাদা ডোরাকাটা। এমনি দুই শিরার মধ্য দিয়ে আমাদের পথ।

পরিষ্কার আকাশে ঝলমলে রোদ উঠতে অপূর্ব এই বন্য পরিবেশে যেন সোনার রেণু ছড়িয়ে পড়ল। দক্ষিণ-পশ্চিমে পুল-ই-পুলুর পাথরের সাঁকো থেকে দেখি নীচের উপত্যকাটা সাদা ফুটকিতে ভরে আছে। বলা বাহুল্য, এই ফুটকি আসলে শাহের গ্রীষ্মকালীন শিবিরের তাঁবুর রাশি। গত সন্ধেতেই এইখানে এসে ঘাঁটি গেড়েছেন শাহ্‌। এরপরই আকাশ কালো করে এল। চাবুকের মতো শিলাবৃষ্টি এসে আছড়ে পড়ল আমাদের ওপর। শিগগিরই থেমে গিয়ে গুড়ি মেরে দুই পাথরের নীচে আশ্রয় নিতে বাধ্য হলাম। তবে সবটা রক্ষা হল না, দমাদম শিল পড়তে লাগল আমাদের পিঠে।

এরপর আমাদের খাড়া ঢাল বেয়ে ওঠা। আমার গাইডেরা দেখি পাহাড়ি হরিণের মতো তরতর করে উঠে যাচ্ছে। এদিকে আমার পা দুটো যেন দশ মনি পাথর, কিছুতেই তুলতে পারছি না। আমি পর্বতারোহী নই আদৌ। বিন্দুমাত্র অভ্যেসও নেই। তাছাড়া উঁচু পাহাড় বেয়ে ওঠবার কোনও অভিজ্ঞতাও হয়নি কখনও। দশ কদম এগিয়েই দাঁড়িয়ে পড়ে দম নিচ্ছি বার বার। তারপর আবার কয়েক পা এগোই। মাথার রগ দুটো দপদপ করছে। তারপর এমন মাথাব্যথা শুরু হল যেন মরেই যাব।

পাথুরে পথ শেষ করে পুরোপুরি বরফে গিয়ে পড়লাম এইবারে। অবোধের মতো বরফের ওপর লম্বা হয়ে শুয়ে পড়লাম তক্ষুনি। ভাবনা এল, এই চুড়োয় গিয়ে উঠতে পারব তো শেষ অবধি? কীই-বা পাব তাতে? তার চেয়ে এখান থেকেই ফিরে যাওয়াই কি মঙ্গল নয়? পরক্ষণেই ঠিক বিপরীত ভাবনাটুকুও চলে এল—না, কক্ষণও নয়! তাহলে আজীবন আর শাহের সামনে মুখ দেখাতে পারব না আমি। এতখানি উঠে এসে এখন আর ফিরে যাওয়া চলে না। মিনিট খানেকের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়লাম আমি। কখন টেনে তুলল আলি।—“সাহেব, বেরিম!”

ধড়মড় করে উঠে দাঁড়িয়ে রওনা হলাম ফের। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যাচ্ছে, আমরা পাহাড়ই বাইছি। যতই এগোই ততই মনে হয় চুড়োটা যেন আরও দূরে, অনন্ত সেই পথ। কখনও মেঘ এসে ঢেকে দিচ্ছে, কখনো-বা তুষারের ঘূর্ণির আড়ালে লুকিয়ে পড়ছে। শেষে আলি নিজের কটিবন্ধ খুলে এনে এক প্রান্ত ধরে, আমাকে বেড় দিয়ে অন্য প্রান্তটা কারবালাইর হাতে দিল। এভাবে দুজনে মিলে বরফের ওপর দিয়ে প্রায় হেঁচড়ে নিয়ে চলেছে আমাকে। দেখলাম, কৌশলটা বেশ কাজের, প্রায় অনায়াসে বেয়ে উঠছি আমি।

আকাশটা আবার পরিষ্কার হতেই হঠাৎ শিখরটা বেশ কাছে চলে এল যেন। ঘণ্টা বারোর হাড়ভাঙা খাটুনির পর সাড়ে চারটের সময় শেষতক পাহাড়ের মাথায় এসে উঠলাম আমরা। কাজটা সহজ ছিল না মোটেও। সেখানে তাপমাত্রা তখন ২৯ ডিগ্রিরও নীচে। জোর বাতাস, তাতে শীতটা যেন কামড় বসাচ্ছে। একটা স্কেচ করলাম আমি, গন্ধকের কিছু নমুনা সংগ্রহ করলাম। ওপর থেকে মেঘের ফাঁক দিয়ে দেখা কাস্পিয়ান সাগর আর দক্ষিণে তেহরানকে ঘিরে সমতল ভূমিটার অপূর্ব দৃশ্যের প্রশংসা না করে থাকতে পারলাম না।

পৌনে এক ঘণ্টা বিশ্রামের পর ফের রওনা হবার নির্দেশ দিলাম। দুই গাইড তুষার আবৃত এক ফাটলের মুখে এনে হাজির করল আমাকে। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে ক্রমশ সরু হয়ে নেমে গিয়েছে তা। সেখানকার তুষারের পাতলা চাদরের ওপর উবু হয়ে বসে আগায় লোহা বাঁধানো লাঠি দিয়ে জোর গুঁতো মারল তারা। আর সঙ্গে সঙ্গে অবিশ্বাস্য গতিতে নীচের দিকে নামতে শুরু করল। দেখাদেখি আমিও তাই করলাম। থামবার প্রয়োজন হলে পায়ের গোড়ালি চেপে ধরে গতি কমাতে হচ্ছিল আমাদের। আর তাতে সামনের বরফ গুঁড়ো ছিটকে উঠছিল ফুলঝুরির মতো। এই শ্বাসরুদ্ধকর উপায়ে হাজার সাতেক ফুট নেমে এলাম প্রায়। শেষে তুষার এতটাই পাতলা হয়ে এল যে তখন পাথর বেয়ে নেমে আসাই স্থির হল। সূর্য অস্ত যাবার মুখে মেঘের পর্দা সরে গেল। রাতের আশ্রয় হল এক গুহার ভেতর। জাফর আর ক’জন মেষপালক আমার ঘোড়া নিয়ে অপেক্ষায় ছিল সেখানে। পৌঁছে কয়েক মিনিটের মধ্যেই মড়ার মতো ঘুম দিলাম আমি।

ক’দিন পরেই শাহ্‌ ডেকে পাঠালেন আমাকে। মস্ত লাল তাঁবুর ভেতর বসে আছেন, চারদিক ঘিরে জনাকতক পারিষদ। তাঁদের ক’জনার সন্দেহ, আদৌ আমি পাহাড়ের চূড়া অবধি উঠেছি কি না। তবে শাহ্‌ আমার করা স্কেচ দেখামাত্রই এঁদের দিকে ফিরে বলে উঠলেন, “রেফতে, রেফতে, বালা বুদ।” (উনি নিশ্চয়ই চূড়ায় গেছেন, এই যে প্রমাণ।) পারিষদেরা তক্ষুনি ফরাসে মাথা ঠেকিয়ে আমার প্রশংসা করলেন। মনের সন্দেহটুকু যেন দেমাভেন্দকে ঘিরে থাকা মেঘের মতোই উবে গেল।

পাহাড়ে আর ক’টা দিন আনন্দে কাটিয়ে শাহ্‌-সহ একদিন রাজধানীতে ফিরে গেলাম আমরা।

তেহরানের আমার শেষ অভিজ্ঞতাটুকু বড়ো দুর্বিষহ, রীতিমতো রক্তারক্তি কাণ্ড। সে এক বলি উৎসর্গের অনুষ্ঠান উদযাপিত হল নগরে—কুরবান বৈরাম। খোলা ময়দানে উঁচু এক জয়ধ্বজার পাশে রুপোর লাগাম পরিয়ে একটা উটকে শুইয়ে দেওয়া হল প্রথমে। গায়ে তার সুতোর কারুকাজের বহুমূল্য কাপড়। চারদিক ঘিরে হাজার হাজার মানুষ। বাজনদারের দল বাজনা বাজিয়ে চলেছে। ঘোড়সওয়ারের ব্যস্ত চালে ঘোরাফেরা করছে। শাহি ঘোষকেরা লম্বা দড়ি দিয়ে ভিড় সামলাচ্ছে।

গোল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা জনতার ঠিক মাঝখানে উটটাকে এনে শোওয়ানো হয়েছিল। একগোছা ঘাস এনে তার মুখে ধরল একজন। সে খেতে শুরু করলে তার বাঁধন খুলে দেওয়া হল তারপর। অ্যাপ্রন গায়ে হাতা গুটিয়ে দশজন কসাই এগিয়ে এল এইবারে। এদের একজনের আবার দৈত্যের মতো চেহারা। চোখের পলকে হাতের ছোরাটা আমূল বিঁধিয়ে দিল উটটার বুকে। একটা ঝটকা মেরে জীবটা পড়ে গেল মাটিতে। মাথাটাও ধীরে ধীরে যেই নেমে এসেছে ঠিক সেই মুহূর্তে আর একজন কসাই দু-কোপে ধড় থেকে আলগা করে দিল মুণ্ডুটা। তারপর হাতে হাতে ছাল ছাড়িয়ে নিতেই জনতা যেন ক্ষুধার্ত নেকড়ের মতো হামলে পড়ল উটটার ওপর। চারদিকে রক্তের বান ডেকেছে। একজন নিজের ভাগের মাংসটুকু ছিঁড়ে নিতেই আর একজন এসে সরিয়ে দিচ্ছে তাকে। মিনিট কয়েকের মধ্যেই রক্তের একটা ফোঁটাও আর রইল না সেখানে। একটু আগেও উট একটা যে ছিল এখানে, বোঝার কোনও উপায় নেই। উৎসর্গ যদি করতেই হয় তবে সেই সর্বশক্তিমানের প্রতি করা উচিত যিনি জীবের ভাগ্যলিপি রচনা করেন।

(ক্রমশ)

ছবি: লেখক

 

 

Leave a Reply