জয়ঢাকের অভিযান লাইব্রেরি- এভারেস্ট-এরিক শিপটন(অনু-বাসব চট্টোপাধ্যায়) অন্নপূর্ণা-মরিস হারজগ(অনু তাপস মৌলিক) কন-টিকি অভিযান- থর হেয়ারডাল (অনু-শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায়)
সোমাউল্যান্ড থেকে লামু হ্রদে প্রথম অভিযান। আর্থার ডোনাল্ডসন স্মিথ M.D., F.R.G.S। ফিলাডেলফিয়া জাতীয় বিজ্ঞান অ্যাকাডেমির অনারারি সদস্য। প্রকাশকাল: ১৮৯৭।
প্রথম অধ্যায়
ভূমিকা
১৮৯৩-র গরমকালে যখন ফিলাডেলফিয়া ছাড়ি, তখন আমি মোটেই শারীরিক পরিশ্রম বা কষ্টের জীবনে অভ্যস্ত ছিলাম না। কিন্তু বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে খেলাধুলায় অংশগ্রহণ করার সুবাদে নানা পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে শিখে গিয়েছিলাম। আমার শিরায় বয়ে চলা অ্যাংলো-স্যাক্সন জাতের রক্ত সহজাতভাবে আমায় টেনে নিয়ে যেত অ্যাডভেঞ্চার ও খেলাধুলার জগতে। সঙ্গে, আমার সাত বছর ধরে আমেরিকা আর ইউরোপে ডাক্তারির পাঠ শিখিয়েছিল যে-কোনো বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের সুযোগ পেলে তাকে হাতছাড়া না করার। এমনই একটি অন্বেষণ অভিযান আমাকে আমার সব ইচ্ছে আর উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণের সুযোগ করে দেয়।
১৮৯৩-তে ম্যাসাচুসেটসের বাসিন্দা আমার প্রিয় বন্ধু ড. উইলিয়াম লর্ড স্মিথের সঙ্গে নরওয়েতে গিয়েছিলাম মাছ ধরতে, সঙ্গে খানিক শিকারও করেছিলাম। সেখানেই সে বলেছিল সোমালিল্যান্ডে শিকার অভিযানে গেলে বেশ হয়। আমিও সাগ্রহে মত দিয়েছিলাম। শুধু শিকারের লোভে নয়, আমার ইচ্ছে ছিল সেখানকার স্থানীয় বাসিন্দা আর পশুপাখিদের সম্পর্কে জানার, যা আমার ভবিষ্যৎ স্বপ্নের আফ্রিকা অভিযানে সাহায্য করবে।
আমাদের শিকার অভিযান চমৎকার হয়েছিল। ছ’টা সিংহ শিকার করেছিলাম। সঙ্গে কয়েকটা হাতি, গন্ডার-সহ বেশ কিছু জন্তু। শিকারের অভিজ্ঞতা নয়, আমার কাছে যেটা সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ছিল তা হল আফ্রিকায় আমার আগামী অভিযানের ছক বানিয়ে ফেলা।

আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে আমার পরিকল্পিত সোমালিয়ার বন্দর বারবেরা থেকে ইথিওপিয়ার ভেতর দিয়ে কেনিয়ার লেক রুডলফ (বর্তমান নাম লেক তুরকানা) পর্যন্ত যাত্রা একটি কঠিন আর ভয়ংকরতম অভিযান হবে। যাত্রাপথের প্রতিটি খুঁটিনাটি তথ্য সংগ্রহ করতে প্রচুর পড়াশোনা আর খোঁজখবর নিতে হবে। প্রতি মুহূর্তে বিপদ ওঁত পেতে থাকবে। তাই প্রস্তুতিতে কোনও খামতি রাখা যাবে না।
স্যার রিচার্ড বার্টনের প্রথম অভিযানের পর থেকে এ-অঞ্চলে বেশ কিছু ইউরোপিয়ান অভিযান হয়েছে সোমালিল্যান্ড থেকে লেক রুডলফ পর্যন্ত যাওয়ার, কিন্তু কোনও অভিযানই সফল হয়নি। ক্যাপ্টেন এইচ. জি. এস. সোয়াইন আমাকে আমার অভিযান নিয়ে খুব উৎসাহিত করছিলেন প্রথম থেকেই। বেশ কিছু অভিযান করেছেন ক্যাপ্টেন সোয়াইন সোমালিল্যান্ডে। শেষ অভিযানে ইনি শেবেলি নদীর ধারে ইমে পর্যন্ত পৌঁছতে পেরেছিলেন। তারপর আরও এগিয়ে গালা দেশে (ইথিওপিয়া) ঢোকার চেষ্টা করেছিলেন। ক্যাপ্টেন সোয়াইনের সঙ্গে মাত্র চল্লিশজন সশস্ত্র সৈনিক ছিল। কিন্তু গালারা তাকে ঢুকতে প্রবল বাধা দিয়েছিল। কারণ, এর আগে এই অঞ্চলে সাদা চামড়ার যে দুজন প্রবেশ করেছিল— সেই প্রিন্স রুসপোলি এবং ক্যাপ্টেন বোত্তেগো, গালাদের অঞ্চলে ঢুকে ক্রমাগত হামলা চালিয়েছিল। এই দুই ইতালিয়ান ‘গানানা’ ওরফে ‘যুব’ নদীর ধারে বিশাল সেনা নিয়ে হাজির হয়েছিল। গালারাও জোট বেঁধে আক্রমণ শানিয়েছিল, আর ঠিক করেছিল, তাদের অঞ্চলে কোনও ইউরোপিয়ান ঢোকার চেষ্টা করলেই বাধা দেওয়া হবে। তাই শেবেলি নদীর পশ্চিম পাড় থেকে লেক রুডলফ (Lake Rudolf) পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চল ইউরোপিয়ানদের কাছে অজ্ঞাত থেকে গেছে। তবে উপকূলের নেটিভদের থেকে পাওয়া তথ্য বলে, এম. বোরেলি এবং এম. ডি. আবাদি নামের দুই অভিযাত্রী উত্তরের দিক থেকে নিষিদ্ধ অঞ্চলে ঢোকার চেষ্টা করেছিলেন।
ডক্টর স্মিথের সঙ্গে শিকার করতে করতে সোমালি দেশের মিলিমিল ছাড়িয়ে খানিক আগে পর্যন্ত গিয়েছিলাম। সোমালিদের সঙ্গে কথা বলে মনে হয়েছিল, ঠিক-ঠিকমতো প্রস্তুতি থাকলে গালা দেশের ভেতর দিয়ে এগোনো সম্ভব। হ্যাঁ, অসম্ভব ধৈর্য নিয়ে নেটিভদের সঙ্গে কথা বলে ওদের বুঝিয়ে-সুঝিয়ে সন্তুষ্ট করে যদি এগোনো যায়। তবে যে-কোনো পরিস্থিতির মোকাবিলা করার জন্য সঙ্গে কিছু সশস্ত্র প্রহরীও নিতে হবে। যদিও আমি অগ্নিবর্ষণ করে নয়, সমঝোতা করে আলাপচারিতার মাধ্যমে এগোনোতেই বিশ্বাসী। তবুও সঙ্গে সত্তরটা রাইফেল নিতে মনস্থ করেছিলাম অপ্রীতিকর পরিস্থিতির মোকাবিলা করার জন্য। তবে কোনও কারণে নেটিভরা জোট বেঁধে আক্রমণ করলে এই সামান্য সংখ্যক আগ্নেয়াস্ত্র কতটা কাজের হবে— সে নিয়ে সন্দেহ ছিল।
১৮৯৪ সালে ১ ফেব্রুয়ারি উপকূলে ফিরে আমি বারবেরার এক অভিজ্ঞ ব্যবসায়ী মোহাম্মদ হিন্দিকে আমার অভিযানের জন্য কিছু সেরা উট কেনার জন্য অর্ডার দিয়ে দিয়েছিলাম। আমাদের শিকার অভিযানে অংশ নেওয়া বেশ কিছু সোমালিকেও খুঁটিনাটি নানা কাজের জন্য নিযুক্ত করে দিয়েছিলাম। বুলহারের ইংরেজ বাসিন্দা মি. ম্যালকম জোনস, এডেনের মেসার্স ব্রাউন এবং এজেন্ট শিপলি অ্যান্ড কোম্পানি আমাকে সবরকম সাহায্যের আশ্বাস দিয়েছিলেন যাতে পরের গ্রীষ্মে ফিরে এসে জোগাড়যন্ত্র করতে আমার সময় নষ্ট না হয়।
ইংল্যান্ডে ফিরে নিজেকে অভিযানের জন্য তৈরি করার জন্য পড়াশোনা শুরু করে দিয়েছিলাম। বিশেষ করে ভূগোল আর জীবতত্ত্ব নিয়ে জ্ঞান খুব জরুরি ছিল। পূর্বদিক থেকে রুডলফ লেকে পৌঁছনোর পরিকল্পনার গুরুত্ব যে বিশাল, সেটা আমি বেশ বুঝতে পারছিলাম। এর আগে কাউন্ট স্যামুয়েল টেলিকি ছিলেন প্রথম ইউরোপিয়ান যিনি দক্ষিণদিক থেকে প্রথম রুডলফ লেকে পৌঁছতে পেরেছিলেন।

কিন্তু আমি শুধু লেক রুডলফে পৌঁছতে নয়, ভৌগোলিক আর বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে অভিযানকে সফলও করতে চাইছিলাম। রয়্যাল জিওগ্রাফিক্যাল সোসাইটির কিউরেটর মিস্টার জন কোলেস আমাকে নিজের অবস্থান নির্ণয়ের নানা পদ্ধতি ও ম্যাপে নির্ভুলভাবে তার উপস্থাপনার বিষয়টি হাতে ধরে শিখিয়েছিলেন। ব্রিটিশ মিউজিয়ামের কর্মীরা আমাকে শিখিয়েছিলেন কী করে নমুনা সংগ্রহ করে তা সংরক্ষণ করতে হবে। তা সত্ত্বেও আমি কোনও ঝুঁকি নিতে চাইনি। নমুনা সংগ্রহ ও তা সংরক্ষণ, বিশেষ করে পশুপাখির চামড়া ছাড়ানোর জন্য এক তরুণ ইংরেজ ট্যাক্সিডার্মিস্ট মিস্টার এডওয়ার্ড ডডসনকে দলে নেবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।
অভিযানের প্রস্তুতির শেষ পর্বে আমার এক বন্ধু মিস্টার ফ্রেড গিলেট আমার অভিযানে যোগ দিতে চেয়ে ইচ্ছে প্রকাশ করেছিল। সে সঙ্গে জনা বারো লোক আর কুড়িটা উট নিয়ে শিকার খেলতে যেতে চাইছিল। আমিও ওর সঙ্গ পেতে উৎসাহীই হয়েছিলাম।
অভিযানের জন্য আমি রয়্যাল জিওগ্রাফিক সোসাইটি থেকে কিছু মূল্যবান সরঞ্জাম ধার হিসেবে পেয়েছিলাম। এর মধ্যে ছিল একটি ছয় ইঞ্চি থিওডোলাইট, সেক্সট্যান্ট, আর্টিফিশিয়াল হরাইজন, বয়েলিং পয়েন্ট থার্মোমিটার, অ্যানেরয়েড আর একটা প্রিজম্যাটিক কম্পাস।
আমার অভিযান নিয়ে লন্ডনে অনেক উৎসাহের সৃষ্টি হয়েছিল। আমার বন্ধুরা আমাকে শুধু উৎসাহই দেয়নি, যতটা সম্ভব প্রাণ খুলে সাহায্যও করেছিল। পাশাপাশি লন্ডন ও এডেনে এটাও বলা শুরু হয়েছিল যে, সামান্য সংখ্যক অস্ত্রধারী লোক নিয়ে গালা দেশের ভেতর দিয়ে লেক রুডলফে পৌঁছনো অসম্ভব। কম করে দুশো থেকে তিনশো সৈন্য সঙ্গে নেওয়া উচিত। এতে অবশ্য আমি হতোদ্যম হয়ে পড়িনি। পরিবর্তে অভিযান সফল করতে আমার আগ্রহ আরও বেড়ে গিয়েছিল।
দ্বিতীয় অধ্যায়
এডেনে

১৮৯৪ সালের ১ জুন লন্ডন থেকে যাত্রা শুরু করে ১৮ দিন পর এডেনে পৌঁছেছিলাম। আমাদের স্টিমারের গায়ে প্রথম যে নৌকাটি এসে ভিড়েছিল, তাতে ছিল আমার বিশেষ বন্ধু মিস্টার চার্লস ম্যাককনকি আর তার পেছন থেকে যে মুখটা উঁকি মারছিল, একবার দেখেই তাকে চিনে ফেলেছিলাম। অদ্ভুত গড়নের, কালো কুচকুচে একটা হাস্যোজ্জ্বল মুখ। আনন্দ ফেটে পড়ছিল মুখটা থেকে। মুখটা ছিল হাসানের, আমার এক পুরোনো শাগরেদ। আমাকে নিয়ে যাবার জন্য ওরা এসেছিল।
হাসান মক্কায় হজ করতে গিয়েছিল, তাই সবাই ওকে ডাকত হাজি হাসান বলে। শেষবার এডেন হয়ে স্টিমারে চেপে লন্ডন ফেরার সময় হাসানকে দেখে আমি হাসি চেপে রাখতে পারিনি। সাদা জামার ওপর আমার দেওয়া দুটো ফ্লানেলের জামা ও চাপিয়ে রেখেছিল। একটার ওপর একটা, তার ওপর দিয়ে আর একটা জামার কলার বেরিয়ে ছিল। আর নীচের অংশে একজোড়া মোটা ছেঁড়া বুটজুতো ছাড়া প্রায় কিছুই ছিল না। বেশ মনে আছে, ও চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলেছিল, “হফিসার, তাড়াতাড়ি ফিরে আসতে হবে, আমি আপনার জন্য দাঁড়িয়ে থাকব কিন্তু!” হাসান এডেনে থেকে থেকে কাজ চালানো গোছের ককনি ইংলিশ শিখে গিয়েছিল। তাকে দেখে আমার ভীষণ ভালো লেগেছিল। এর আগের অভিযানে সে আমার সঙ্গী ছিল। আমার দলে তখন সর্দার গোছের কেউ ছিল না। আমি নিজেই সব দেখে নিতাম। হাসান তখন খুব সাহায্য করেছিল আমায়। নিজে থেকেই এগিয়ে এসে সবকিছু একবার দেখে নিত, কোনও ভুল হচ্ছে কি না। সেইমতো ও আমাকে সবকিছু জানাত। ওর সবকিছু সামলে রাখার ধরন দেখে আমি ওকে দলের ‘হেডম্যান’ বানিয়ে দিয়েছিলাম। সব সোমালিদের মতোই ওরও ছেঁড়া-ফাটা কাপড়ের টুকরো সংগ্রহ করার বাতিক ছিল। কিন্তু এটা ও করত খুব রয়ে সয়ে। আমাকে কোনোভাবেই বিরক্ত না করে।
একরাতে মিলমিল বলে একটা জায়গায় ক্যাম্প করে ছিলাম। রাতে এসে হাজি আমাকে ফিসফিস করে ডেকে ঘুম থেকে তোলার চেষ্টা করেছিল। আমি একবার সাড়া দিয়ে হাজির ডাককে কোনও গুরুত্ব না দিয়ে আবার ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ঘণ্টা খানেক বাদে আবার হাজি আমার টেন্টের বাইরে দাঁড়িয়ে আমাকে ডেকেছিল, “সাহেব, ওরা আমাদের একটা ছেলেকে মেরে ফেলেছে।”
ঘুমের ঘোর ছুটে গিয়েছিল আমার ‘মেরে ফেলেছে’ শুনে। আমি লাফিয়ে উঠে বলেছিলাম, “মেরে ফেলেছে মানে?”
“হ্যাঁ সাহেব, আমাদের একটা ছেলেকে মেরে ফেলেছে।” বলে হাজি আমার তাঁবুর দরজা খুলে ধরেছিল। বাইরে বেরোতেই হাজি আমাকে দেখিয়েছিল মাটিতে শুইয়ে রাখা একটা মৃতদেহ। প্রচণ্ড শীতে একটি ছেলের দেহ মাটিতে পড়ে, শরীরে একখণ্ড কাপড়ের টুকরোও নেই। ঘণ্টা খানেক আগে ওরা ছেলেটার দেহটা এনে ফেলে রেখেছিল। কিন্তু একটা ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে এই কারণে আমাকে ঘুম থেকে তুলে বিরক্ত করতে চায়নি সে। ছেলেটা কাছের এক কুয়ো থেকে জল আনতে গিয়েছিল, তখন এক নেটিভ ওকে খুব পিটিয়ে কাপড়জামা খুলে নেয়, মারাত্মকরকম আহত হয়ে পড়ে থাকে ও। আমার লোকেরা ক্যাম্পে তুলে আনার আগেই মারা গিয়েছিল ছেলেটি।
***
হাসান জাহাজে উঠতেই ওকে জড়িয়ে ধরলাম। বলে দিলাম, তার মূল কাজ হচ্ছে যত নমুনা সংগ্রহ হবে তা ঠিকঠাকমতো সংরক্ষণ করা, আর এই ব্যাপারে ডডসনের সঙ্গে ওকে কাজ করতে হবে। আমার সঙ্গে আগে কাজ করা যেসব ছেলেরা দেখা করতে এসেছিল, তারাও উদগ্রীব ছিল তাদের কার কী কাজ হবে জানতে। এরপর একে একে সেইসবও করা হল।
লোকজন জড়ো করা, নেটিভদের সঙ্গে বিনিময়ের জন্য কাপড়, পুঁতি, পেতলের তার এইসব রকমারি জিনিসপত্র কেনাকাটা সারতে ও এইসব গুছিয়ে নিতে দশদিন এডেনে কেটে গিয়েছিল। এছাড়াও দলের ইউরোপীয় সদস্যদের জন্য খাবারদাবার, গোলাবারুদ ও অন্যান্য জিনিস, যেগুলো আগেই লন্ডন থেকে পাঠিয়েছিলাম, সেগুলো জড়ো করে ঠিকমতো গোছগাছ করার দরকার ছিল। পাশাপাশি যেসব স্থানীয় লোকদের আমার দলে নেওয়া হচ্ছিল, তাদের সঙ্গে চুক্তি করাটাও বিশেষ দরকার ছিল। চুক্তির প্রধান শর্ত— ডিসিপ্লিন। আমি যেখানে যেভাবে চাইব সেভাবে এগোতে হবে। যাত্রা শুরুর আগে এক মাসের বেতন অগ্রিম দেব, আর বাকি টাকা অভিযান শেষ করে বন্দরে ফিরে আসার পর দেওয়া হবে। কিছু বিশেষ ক্ষেত্র ছাড়া। আর সেই বিশেষ ক্ষেত্রটা হল, যাদের পরিবার আছে তারা মাসে মাসে কিছু টাকা পাবে। আর যদি কেউ অভিযান চলাকালীন মারা যায়, তার উত্তরাধিকারী সে যতদিন কাজ করেছে ঠিক ততদিনের বকেয়া মজুরি পাবে, তার বেশি কিছু নয়। আর যদি কেউ মাঝপথে কাজ ছেড়ে চলে যায়, সে বকেয়া কিছুই পাবে না। এডেনে সোমালির রাজনৈতিক এজেন্ট লেফটেন্যান্ট কর্নেল সিলি পুরো চুক্তির সাক্ষী ছিলেন এবং পরিষ্কারভাবে ঘোষণা করেছিলেন, কেউ চুক্তিভঙ্গ করলে তার কঠোর শাস্তি হবে।
আমি দুটো শক্তসমর্থ খচ্চর আর দুটো টাট্টু ঘোড়া কিনেছিলাম। মি. ফ্রেড গিলেটও একটা খচ্চর আর টাট্টু কিনেছিলেন। ২৯ জুন এডেন থেকে একটা ছোট্ট স্টিমারে চেপে বারবেরার দিকে রওনা দিয়েছিলাম আমরা। আমাদের মালপত্রেই প্রায় ভরতি হয়ে গিয়েছিল স্টিমারটা। পঞ্চাশ জন সোমালি কুলি, বাক্সবোঝাই জিনিসপত্র আর তিনটে খচ্চর ও টাট্টু। এছাড়াও ছিল কাপড়ের গাঁঠরি নিয়ে আরও জনা পঞ্চাশেক নেটিভ। ব্যাবসার মালপত্র কিনে ওরা ফিরছিল সোমালিল্যান্ডে। আমার ভয় হচ্ছিল গালফ অফ এডেন পার হবার পথেই না স্টিমার মালপত্রের ভারে ডুবে যায়।
স্টিমারটা সরাসরি বারবেরা যায় না। প্রথমে যায় জেইলায়, তুর্কিদের অধীনে থাকা এক ছোট্ট বন্দর শহরে। সেখান থেকে বারবেরায়।

১ জুলাই যখন বারবেরা বন্দরে পৌঁছলাম, তখন আমাদের অবস্থা সঙ্গিন। এরকম ভয়াবহ সমুদ্রযাত্রার অভিজ্ঞতা আগে হয়নি। আমার সোমালি কুলিগুলোকে তো স্টিমারের খোলে ভেড়ার পালের মতো গাদাগাদি করে রাখা হয়েছিল।
বারবেরাতে পৌঁছে হতাশ হলাম। কারণ, আমার অভিযানের জন্য যতগুলো উট প্রয়োজন ছিল ততগুলো সেখানে জোগাড় করা যায়নি। জানলাম, এই বছর এত খরা চলছে যে খুব কম ক্যারাভানই বারবেরাতে এসেছে। কারণ, উটেদের জন্য প্রয়োজনীয় খাবার প্রায় নেই। তীব্র গরম। দিনের বেলায় ছায়াতে তাপমাত্রা ১১০ ডিগ্রি ফারেনহাইট। রাতের তাপমাত্রাও ৯৫ থেকে ১০০ ডিগ্রির আশেপাশে ঘোরাফেরা করছে। প্রবল শুকনো ঝোড়ো বাতাস বয়ে বেড়াচ্ছে ধুলো আর বালি। আগুনের হলকা বইছে রীতিমতো।
এখানে আমরা দশদিন থাকতে বাধ্য হয়েছিলাম নানা কাজের জন্য। দলের লোকদের জন্য খেজুর, চাল, ঘি এইসব কেনা, উটের পিঠের বোঝা ভাগ করে সেগুলো প্যাক করা। আমি কম করে ১৫০ দিনের খাবারদাবার সঙ্গে নিতে চাইছিলাম। এর সঙ্গে পথিমধ্যে বিনিময় করার জন্য বিপুল মালপত্র তো ছিলই।
আমার লোকদের জন্য প্রতিদিন এক পাউন্ড চাল, আধা পাউন্ড খেজুর, দু-আউন্স ঘি বা মাখন বরাদ্দ রেখেছিলাম। ৪৩টা উট লাগছিল শুধু আমার লোকদের খাবার নেবার জন্য। স্পিরিট ভরা একশো তামার পাত্র সঙ্গে যাচ্ছে সরীসৃপ, মাছ, পোকামাকড়, ব্যাট্রাকিয়া (Batrachia), পাখি ইত্যাদির নমুনা সংরক্ষণ করে সঙ্গে আনার জন্য। এছাড়া নানা যন্ত্রপাতি, বন্দুকের কার্তুজ, খুলে গুটিয়ে নেওয়া যায় এরকম বেরথন বোট-সহ হাজারও টুকিটাকি জিনিস।

প্রতিটি জিনিস আলাদা আলাদা প্যাক করে সেগুলোর জিম্মেদার ঠিক করে তাকে বুঝিয়ে দেওয়া কাজটা সহজ ছিল না। বারবেরার ভারপ্রাপ্ত রেসিডেন্ট কমিশনার ক্যাপ্টেন এল. জেড. কক্স আর তাঁর স্ত্রী আমাদের জন্য যথাসাধ্য করছিলেন। বারবেরাতে আরও ২৭ জন লোককে দলে নিয়েছিলাম। গিলেটের বারো জন রাইফেলম্যান-সহ আমাদের দলের নেটিভ সদস্য সংখ্যা হয়েছিল ৮২ জন।
যাত্রা শুরু
১০ জুলাই আমরা বারবেরা থেকে যাত্রা শুরু করলাম। একটা জটিল অভিযানের মালপত্র বইবার জন্য যত সংখ্যক উট দরকার তা আমাদের সঙ্গে ছিল না। যা উট ছিল সেগুলোও খাবারের অভাবে দুর্বল ছিল। যাত্রা শুরুর সময় মোট ৮৪টা উট আমাদের সঙ্গে ছিল। এর মধ্যে আবার ২০টা উট এক স্থানীয় বন্ধুর। কাজেই স্বল্প সংখ্যার কারণে উটগুলো অনেক বেশি মাল বইতে বাধ্য হয়েছিল। ২৫০ থেকে ৪০০ পাউন্ড পর্যন্ত মাল চাপাতে হয়েছিল এক-একটা উটের পিঠে। সাধারণত উটের পিঠে ১০০ পাউন্ড পর্যন্ত মাল চাপানো হয়। কিন্তু সামনে দীর্ঘ যাত্রার কারণে মালপত্র কমানোর কোনও উপায় আমার কাছে ছিল না।
ঠিক করে নিয়েছিলাম, পথে যেতে যেতে উট পেলেই কেনা হবে। পাশাপাশি দুর্বল উটগুলোকেও মুক্তি দিতে হবে। চেষ্টা করতে হবে কম করে ১১০টা শক্তপোক্ত উটের দল বানাতে।
গনগনে রোদ্দুরে দিনের বেলায় সমুদ্রতট ধরে অসুস্থ উটগুলোর পিঠে অতিরিক্ত বোঝা চাপিয়ে এগোলে হিতে বিপরীত হতে পারে বুঝে আমি বিকেলবেলা থেকে মার্চ করা ঠিক করেছিলাম। এতে উটগুলো খানিক স্বস্তি পাবে।
সেদিন সারারাত ধরে চলে আমরা পাহাড়ের অনেকটাই কাছে পৌঁছে গেলাম। সেখানে তাপমাত্রা অপেক্ষাকৃত কম। উটগুলোর পিঠ থেকে মালপত্র নামিয়ে দিতে ওরা চরে বেড়িয়ে খানিক ঘাসপাতা খেতে পেয়েছিল।
জলবায়ু আর উচ্চতার নিরিখে সোমালিল্যান্ডকে মোটামুটি তিনভাগে ভাগ করা যেতে পারে। প্রথম— উপকূলীয় সমভূমি, যার জলবায়ু ভয়ংকর আর গরম অসহনীয়। দ্বিতীয়— এক বিস্তৃত মালভূমি, এর উচ্চতা মোটামুটি সমুদ্রতল থেকে ৩৫০০ ফুট। এখানে বায়ুমণ্ডল অপেক্ষাকৃত শুকনো আর গরমও সেরকম নয়। তৃতীয়ত— উচ্চভূমি, যা সোমালিল্যান্ডের কেন্দ্রীয় অংশ। এখানকার উচ্চতা সমুদ্রতল থেকে ৪০০০ ফুট থেকে ৬০০০ ফুট।
আমরা চাইছিলাম সকালের সূর্য চড়ে ওঠবার আগেই মালভূমিতে পৌঁছে যেতে। কাজেই দ্বিতীয় দিন বিকেল চারটে নাগাদ আবার উটের পিঠে মালপত্র চাপিয়ে রওনা হয়ে গেলাম আমরা।
প্রায় ছয় ঘণ্টা চলার পর আমরা পাহাড়ের পাদদেশে পৌঁছলাম। কুলি আর উটের দল ক্লান্তিতে ভেঙে পড়ছিল। এর মধ্যে চারজনের আর হাঁটার ক্ষমতা ছিল না। দলের তিন ইউরোপিয়ান সদস্য মোটামুটি সুস্থই ছিল। যদিও দীর্ঘ পথ টাট্টুর পিঠে চেপে খানিক কাহিল হয়ে পড়েছিল তারাও।
সোমালিরা
পরদিন ভোরে বেশ খানিক চড়াই ভেঙে আমরা ডেরে-গডলেতে পৌঁছলাম। মালভূমির শুরু বলতে গেলে এখান থেকেই। বেশ কিছু জলের গর্ত ছাড়া জায়গাটা একদম ন্যাড়া। কোনও গাছপালার চিহ্ন নেই, জনবসতিহীন একটা অনুর্বর জায়গা। চারদিকে পাথর আর পাথর। শুধু কিছু শেয়াল, হায়েনা আর বোতলের মতো নাকওয়ালা গ্যাজেল ঘুরে বেড়াচ্ছিল। আমার কাছে এসে একজন বলল, আমাদের দলের একজনকে নাকি বিষধর সাপে কামড়েছে। গিয়ে দেখি লোকটা কান্নাকাটি করতে করতে এমনভাবে আছড়াচ্ছে যেন যন্ত্রণায় মরে যাবে। ভালো করে যে জায়গায় কামড়েছে বলছে সেই জায়গাটা পরীক্ষা করে দেখি, ফোলা বা দংশনের চিহ্নমাত্র নেই। বুঝলাম, লোকটা সাপের কামড় খাওয়ার ভান করছে। ওর পায়ে একটা কাটার খোঁচা লেগেছিল কেবল। পায়ে জোরসে একটা ঘুসি মারতেই সে-ব্যাটা লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল। ও বুঝে গিয়েছিল, আমি ওর অভিনয় ধরে ফেলেছি। এই জাতের লোকেদের এই এক ব্যারাম— ছোটোখাটো বিষয়কে বিশাল বড়ো করে দেখানো।
সোমালিদের অনেকেই মিশ্র রক্তের। আরব আর কৃষ্ণাঙ্গদের মিশেল। গায়ের রঙ হালকা বাদামি আর চুল কোঁকড়ানো। বুদ্ধিদীপ্ত, লাবণ্যময় আর চেহারায় ছোটোখাটো। পরিশ্রমের কাজ দেখলেই সরে যায়, কিন্তু যে-দক্ষতায় এরা উটের পিঠে ভারী ভারী মাল সুন্দর করে গুছিয়ে চাপিয়ে তাদের বন্ধুর পথে হাঁটিয়ে নিয়ে যায়, তা তারিফ করার মতো। উটের সঙ্গে এরা প্রচণ্ড উদ্যম নিয়ে ছোটাছুটি করে কাজ করে, কিন্তু সে ছাড়া অন্য কায়িক পরিশ্রম করতে বললেই গুটিয়ে যায়। মিশনারি স্যামুয়েল গোবাট যিনি দীর্ঘদিন আফ্রিকার এই অঞ্চলে কাটিয়েছেন, তিনি এদের সম্পর্কে বলেছিলেন, “এরা এই সুস্থির তো পরক্ষণেই চূড়ান্ত অস্থির। এমনিতে নরম স্বভাবের মানুষ, কিন্তু রেগে গেলে ভয়ানক নৃশংস হয়ে ওঠে।” অবশ্য এখনও পর্যন্ত এদের সম্পর্কে আমার সেরকম কিছু মনে হয়নি। শুনেছি, এরা যখন কারও সঙ্গে লড়াই করে তখন প্রথমে ভয় দেখাতে দূর থেকে তির বা বল্লম ছোড়ে যাতে যতটা সম্ভব আঘাত এড়ানো যায়। এরা নিরপদ দূরত্বে থাকতেই পছন্দ করে। কিন্তু আসল লড়াই শুরু হলে বীরের মতো লড়ে।
সোমালিরা লড়াইতে যে খুব একটা দড় নয় তা বিভিন্ন রিপোর্ট থেকে আগেই জেনেছিলাম। পুরুষরা উট, ভেড়া আর ছাগলের পাল চরিয়ে বেড়ায় আর মহিলাদের দিয়ে সমস্ত ভারী কাজগুলো করায়। মহিলাদের তারা ভেড়া-ছাগলের মতোই মনে করে। আমার দলের একটা ছেলে কথা প্রসঙ্গে বলে, ও মাত্র পাঁচটা উটের মালিক। ওর একটা বোন আছে, যাকে বিয়ে দিয়ে অনেক টাকা পণ হিসেবে কামাবে আশা করেছিল, কিন্তু যত টাকা কামাবে আশা করেছিল তত টাকা পায়নি। ফলে বেশি উটের মালিক হওয়ার স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে গেছে।
এরা মহিলাদের কঠিন পাহারায় রাখে, কারণ মহিলারা এক-একজন এদের কাছে টাকার থলে। মহিলাদের প্রতি নৈতিকতা বলে বস্তুটা এদের প্রায় নেই বললেই চলে। তাঁদের মধ্যে কোনও স্বাধীন চেতনার লক্ষণ দেখলেই পুরুষদের হম্বিতম্বি শুরু হয়ে যায়। আমার দলের আর একটা ছেলে বলেছিল যে বিয়ের পর অধিকাংশ সোমালি পুরুষ তার সদ্য বিয়ে করা বউকে মারধোর শুরু করে। এমন ভয় দেখায়, যাতে সে অন্য কোনও পুরুষের কথা স্বপ্নেও না ভাবে। সোমালি মহিলারা যে ভীষণ সুন্দরী এ-কথা বলব না। এরা সবসময় গা চুলকোতে থাকে। তবে এদের বড়ো বড়ো চোখগুলো খুব মায়াবি আর দাঁতগুলো ধবধবে সাদা। এরা এদের দাঁত মাজে আথেই গাছের ডাল দিয়ে। আর এই গাছের ডাল এরা সবসময় কোমরে গুঁজে রাখে।
সোমালিরা গানবাজনা পছন্দ করে। অধিকাংশই প্রেমের গান। অল্প কয়েক লাইনের গানগুলো এরা পরপর গাইতে থাকে। প্রথমে একজন এক লাইন গায়, তারপর অন্যরা তাতে গলা মেলায়।
মহিলা ও পুরুষরা সাধারণত লম্বা ঝুলের সাদা কাপড়ের আলখাল্লা পরে থাকতে পছন্দ করে। একই কুয়োর ধারে এরা একসঙ্গে স্নান করে আর তখন শালীনতার ধার ধারে না।
সোমালিরা যে খুব একটা শক্তসমর্থ তা নয়। এরা হামেশাই জ্বর আর বাতে ভোগে। কিন্তু হাঁটিয়ে হিসেবে এদের জুড়ি মেলা ভার। এরা একদিনে অক্লেশে পঁয়ত্রিশ থেকে চল্লিশ মাইল পথ হাঁটতে পারে। দীর্ঘ সময় জল বা খাবার ছাড়া থাকতে পারে। তবে এরা ভীষণ পেটুক। একটা আস্ত ভেড়া তিনজন মানুষ মিলে একরাতে সাবড়ে দেবে।
সোমালিদের নিয়ে খুব বেশি কিছু বলব না, কারণ এদের নিয়ে অনেক কথা অনেকেই লিখে গেছেন। এরা নিজেদের নবীর খুড়তুতো ভাই আলি বিন্দালের বংশধর বলে দাবি করে। সোমালিদের তিনটে মূল জাত হল হাবর-আউয়াল, হাবর-গিরহাগিস আর হাবর-তোলজালা। এরা আলি বিন্দালের বড়ো পুত্র হুসেনের বংশধর। এছাড়া আছে দোলবহান্ত-সহ আরও কিছু উপজাতি। এরা আলি বিন্দালের অন্য ছেলে হাসানের বংশধর। এছাড়াও আছে মিডগান, টোমাল আর ইয়েবি; এদের নিম্নবর্ণের মানুষ বলে গণ্য করা হয়।
মিডগানরা বিষাক্ত তির আর ধনুক ব্যবহার করে তাদের মনিবদের জন্য শিকার করে আর কসাইয়ের কাজ করে। এরা শাসকদের হয়ে প্রতিবেশীদের সঙ্গে লড়াই করে। এরা যেমন ধূর্ত, তেমন বিশ্বাসঘাতক। ভালো রক্তের সোমালিদের বিয়ে করার অধিকার নেই এদের।
টোমালরা আসলে কামার। এরা এক গ্রাম থেকে আর এক গ্রামে ঘুরে বেড়ায়। আর গ্রামে গিয়ে সামান্য কাজের বিনিময়ে এরা অনেক অর্থ দাবি করে। সাধারণ গ্রামবাসীরা ভয়ে ভয়ে এদের দাবি করা টাকা দিয়ে দেয়, কারণ সবাই বিশ্বাস করে, এরা জাদুবিদ্যায় পারদর্শী। ইয়েবিরাও অনেকটা টোমালদের মতো। তবে এরা মূলত চামড়ার জিনিসপত্র বানায়।
আমরা দক্ষিণদিকে এগোনোর সময় পরপর দুটো জলের ‘টাগ’-এর পাশ দিয়ে গিয়েছিলাম। বালুময় জমির ওপর খানিক জলের প্রবাহকে সোমালিরা টাগ বলে। শ-খানেক গজ ব্যাপ্তি হবে এই টাগগুলোর। এই টাগগুলোকে ঘিরে খানিক সবুজের ছোঁয়া চোখকে তৃপ্তি দেয়। বেশ কিছু নারকোল গাছ ছিল টাগগুলো ঘিরে। খানিক দূরেই ঝোপগুলো যথারীতি শুকনো। কয়েকটা ধূসর পাতাকে জোর করে ধরে রেখে টিকে আছে।
দ্বিতীয় দিনের যাত্রায় আমাদের গোটা ছয়েক উটকে ছেড়ে দিতে হয়েছিল। উটগুলোর হাল এত খারাপ ছিল যে, মাল বওয়া তো দূরের কথা, হাঁটার অবস্থা অবধি ছিল না। তবে আমাদের পাশ দিয়ে যাওয়া কিছু স্থানীয় ব্যবসায়ীদের থেকে বেশ কয়েকটা উট কিনতে পেরেছিলাম। এক-একটার দাম পড়েছিল বেয়াল্লিশ মুদ্রা। লাফারাগ-এ পৌঁছে আরও এগারোটা তরতাজা উট কিনেছিলাম, এছাড়াও কিনেছিলাম বেশ কিছু ছাগল আর ভেড়া। আবার এখানেই মিডগান (এরা গাবুয়ে নামেও পরিচিত) উপজাতির লোকেরা চারটে উট চুরি করে পালিয়েছিল। আমি দলের ছেলেদের পাঠিয়েছিলাম চোরাই উটগুলোর খোঁজে। মাঝ-রাত্তিরে ওর উটগুলো খুঁজে বের করে ফেরত এনেছিল। শুধু তাই নয়, একটা চোরকেও পাকড়াও করে এনেছিল।
বালি, পাথর আর কাঁটা বোঝাই পথে চলে প্রায় সব উটই কাহিল হয়ে পড়েছিল। কিন্তু তারপর আস্তে আস্তে আবার সবুজের ছোঁয়া পেয়ে ওরা খানিক চনমনে হয়ে উঠল। শুধু তাই নয়, বৃষ্টি এসেও ধুয়ে দিয়েছিল আমাদের।
আগে থেকেই ঠিক করে এসেছিলাম যে আফ্রিকাতে থাকাকালীন শুধুমাত্র ফোটানো জল পান করব। শুধু আমি একাই নয়, আমার তিন ইউরোপিয়ান সঙ্গীও তাই করবে। সেই জন্য লন্ডন থেকে দুটো বিশেষ জলের ব্যারেলও নিয়ে এসেছিলাম। যে খচ্চরটার পিঠে জলের ব্যারেল দুটো ছিল, সেটা লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে ব্যারেল দুটোকে পিঠ থেকে ছিটকে ফেলে দিয়েছিল। ভাগ্য ভালো ব্যারেল দুটো আস্তই ছিল আর খচ্চরটারও কোনও চোট লাগেনি।
কয়েকটা গ্যাজেল আর অরিক্স বেইসা আমাদের নাকের ডগায় ঘুরে বেড়াচ্ছিল। কিন্তু আমরা ওদের গুলি করিনি, কারণ বারবেরা থেকে দক্ষিণে হারগেসা পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চল যা হাবর-আউয়াল নামে পরিচিত তা এডেনের ইন্ডিয়ান গ্যারিসনের জন্য সংরক্ষিত। আমি আর গিলেট মিলে খাওয়ার জন্য কয়েকটা মোরগ
জাতীয় পাখি মেরেছিলাম। কয়েকটা সরীসৃপের নমুনাও সংগ্রহ করেছিলাম। তার মধ্যে ছিল একটা পুঁচকে লেজওয়ালা গিরগিটি। লেজটা দেখতে ঠিক পাখার মতো (আগমা বাটিলিফেরা)।

(ক্রমশ)