গল্প-ওপারের বাসিন্দারা-অর্ণব চ্যাটার্জি-শীত ২০২০

সেদিন অফিস থেকে বাড়ি ফিরতে পলাশের বেশ রাত হল। একেই মান্থ এন্ডিং-এর প্রেশার, তার উপর আবার সিগনালের কী একটা ঝামেলায় ট্রেন লেট। দেরি হওয়াতে ও দ্রুত পা চালাচ্ছিল। স্টেশন থেকে একটু দূরে বড়ো রাস্তার পাশ দিয়ে ডানদিকে যে গলিটা ঢুকে গেছে, তার মধ্যে একটু এগিয়েই পলাশদের বাড়িটা। কিন্তু গলিতে ঢুকতেই দেখল গলির মুখে সেনবাবু দাঁড়িয়ে। এত রাতে ওঁকে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে পলাশ অবাকই হল।

“কী ব্যাপার সেনবাবু! এত রাতে কী করছেন?”

“এই, ঘুম আসছে না, একটু পায়চারি করছি।”

এরপর দু-চারটে কুশল বিনিময় করে পলাশ বাড়ি ফিরল। কিন্তু লক্ষ করল, সেনবাবুর সঙ্গে কথা বলার সময় ওর কেন যেন একটা অস্বস্তি হচ্ছিল। কারণটা ঠিক বুঝতে পারছিল না।

বাড়ি ফিরে ফ্রেশ হযে সবে বসেছে, এমন সময় বিদ্যুৎচমকের মতো ওর মাথায় এল কথাটা। আরে! এই সেনবাবু তো মাস খানেক আগে মারা গেছেন! ওর মনে পড়ল, ওঁর ছেলে গায়ে কাছা জড়িয়ে এসেছিল শ্রাদ্ধের নিমন্ত্রণ করতে। স্নান করে পাখার তলায় বসলেও পলাশ ঘামতে লাগল। মাথা ভোঁ ভোঁ করতে লাগল। ওকে এরকম অবস্থায় দেখে মিতা শরীর খারাপ কি না জিজ্ঞেস করাতে ও ‘কিছু নয়’ বলে পাশ কাটিয়ে দিল।

রাতে শুয়েও মাথার মধ্যে ওই চিন্তটাই ঘুরপাক খেতে লাগল। ও কি ভুল দেখল? নাহ্‌! ওর চোখের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন সেনবাবু। ওর সঙ্গে গল্প করতে করতে ওঁর বড়ো ছেলের নতুন চাকরির খবরটাও দিলেন, যেটা পলাশ শুনেছিল উনি মারা যাবার কিছুদিন পর ওঁর স্ত্রীর থেকে। তাহলে? মনে অজস্র প্রশ্ন থাকলেও কোনো উত্তর পলাশ পেল না।

পরদিন অফিসে কাজের চাপে ঘটনাটা ফিকে হয়ে আসছিল। টিফিন টাইমে হাত ধুতে গিয়ে হঠাৎ দাসদার সঙ্গে দেখা। ওকে দেখে হাসলেন। একই অফিসে থাকলেও ওর মনে হল, দাসদাকে অনেকদিন পরে দেখল। টুকটাক কিছু কথার পর উনি চলে গেলেন। পলাশ ফিরে এসে টিফিন খেতে বসল। কিন্তু টিফিন খেতে খেতে ও বিষম খেল। এ কী? এই দাসবাবুর স্মরণসভায় ও সপ্তাহ খানেক আগে গেল না? এসব কী হচ্ছে ওর সঙ্গে? পলাশের গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। খাবার যেন আর গলা দিয়ে নামতে চাইছে না।

টিফিন টাইমে ঘরে কেউ নেই, সবাই বাইরে। ফাঁকা ঘরে বসে। এখন যদি হঠাৎ দাসবাবু আসেন? ভাবনাটা আসতেই পলাশ ঘামতে লাগল। তাড়াতাড়ি বাইরে চলে এল। বসকে শরীর খারাপ বলে বাড়ি ফিরে এল।

পলাশ বাড়ি ফিরতেই মিতা ওকে চেপে ধরল। “তোমার কী হয়েছে বলো তো? কয়েকদিন থেকেই দেখছি সবসময় কী যেন যেন চিন্তা করছ!”

পলাশ মিতাকে সব খুলে বলল। সব শুনে মিতা শিউরে উঠল, “বলো কী গো? এ আবার হয় নাকি? শুধু তুমিই দেখছ, নাকি আর কেউ ওদের দেখতে পাচ্ছে?”

পলাশ মাথা নাড়ল। এসব তো কাউকে জিজ্ঞেস করা যায় না! মৃত মানুষকে দেখছে শুনলে সবাই ওকে নিয়ে হাসাহাসি করবে, নয়তো পাগল ভাববে। পলাশ কী করবে অনেক ভেবেও কোনো সুরাহা পেল না।

ব্যাপারটা এখানেই শেষ হল না। সেদিন বাজারে গিয়ে ও রায়বাবুকে দেখল। ওকে দেখে মুচকি হাসলেন। পরে মাছ কিনতে গিয়ে মাথায় এল যে উনি গতমাসে মারা গেছেন। অরুণের মুদির দোকানে গিয়ে বিমলবাবুর সঙ্গে দেখা। টুকটাক গল্প চলছে। আড়চোখে মনে হল অরুণ অবাক হয়ে ওকে দেখছে। জিনিস দেবার সময় ও পলাশকে জিজ্ঞেস করল, “একা একা কী কথা বলছিলেন দত্তদা?”

তখনই মাথায় এল কথাটা, যে এই বিমলবাবু বছর খানেক আগে গত হয়েছেন। বয়স্ক মানুষটি একলা থাকতেন। রাতে হার্ট অ্যাটাকেই শেষ।

“ওই নাটকের একটা ব্যাপার ঝালিয়ে নিচ্ছিলাম আর কী।” বলে পলাশ চলে আসে।

আতঙ্কে, টেনশনে পলাশের চেহারাটা উদ্ভ্রান্তের মতো হয়ে গেছে। চোখের দৃষ্টিটা কেমন যেন পাগলের মতো। মিতার চিন্তা বেড়ে যায়। সুস্থ সবল মানুষটার যে কী হল! ও একরকম জোর করেই পলাশকে একজন ভালো সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে নিয়ে যায়। কিন্তু সাইকিয়াট্রিস্টের ওষুধ খেয়ে পলাশের শুধু ঘুম পায়। আর ঘুমিয়ে পড়লেই ওর মনে হয় অনেক দূর থেকে কেউ ওকে ডাকছে। গলার স্বরগুলো সব মৃত মানুষের। ভয়ে ঘুম ভেঙে যায়। ঘুম না হলে একটা ঝিমুনি আসে, কারুর সঙ্গে কথা বলতে ভালোই লাগে না।

এমনই একদিন পলাশ চুপ করে বসে আছে, স্টোরের স্বপনদা এসে পলাশের পাশে বসলেন। “ভায়া, তোমার কী হয়েছে বলো তো? বেশ কিছুদিন ধরে দেখছি খুব চুপচাপ হয়ে গেছ। আগের মতো আর কারুর সঙ্গে মেশো না। কী যেন একটা ভাব! খুব ব্যক্তিগত না হলে আমাকে বলতে পারো। দেখি কোনোভাবে কাজে আসতে পারি কি না।”

পলাশ ওঁকে সব খুলে বলতে স্বপনদা বললেন, “যদিও মনে হয় তুমি মানবে না, তবুও একটা সাজেশন তোমাকে দিতে পারি। অনেক তো ডাক্তার দেখালে, ওষুধ খেলে। কিন্তু কিছুই তো হল না। আমার খুব চেনা একজন তান্ত্রিক আছেন। অনেককে পাঠিয়েছি। তারা ভালোই উপকার পেয়েছে। তুমি একবার দেখতে পারো। ক্ষতি তো কিছু নেই!”

পলাশ এখন খড়কুটো আঁকড়ে ধরেও এই সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে চায়। তাই বিশ্বাস না থাকলেও ‘দেখাই যাক’ ভেবে স্বপনদার সঙ্গে যেতে রাজি হল।

পরদিন ওরা দুজনে গেল সেই তান্ত্রিকের কাছে। তবে তান্ত্রিক বলতে যা বোঝায় কালীচরণ সান্যালের চেহারা বা পোশাকে তার কোনো ছাপ নেই। উনি পাজামা-পাঞ্জাবি পরে বসে ছিলেন। মন দিয়ে পলাশের কথা শুনলেন, কিছু জিজ্ঞাসাও করলেন। তারপর বেশ কিছুক্ষণ ধরে পলাশের হাত দেখে বললেন, “মৃত মানুষদের জগৎ আমাদের জগৎ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। একটি সূক্ষ্ম স্তর সেটাকে আলাদা করে রেখেছে। আপনি সেই বিরলতম লোকদের একজন যে সেই স্তর ভেদ করেও ওই জগতের লোককে দেখতে পাচ্ছেন, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন। আসলে কোনো কারণে আপনার মধ্যে এক বিশেষ শক্তির আবির্ভাব ঘটেছে। তবে এসব বিদেহী আত্মার থেকে কোনো বিপদের আশঙ্কা কিন্তু উড়িয়ে দেয়া যায় না। তাই আমি আপনাকে একটি বিশেষ রক্ষাকবচ দেব। সামনের অমাবস্যার রাতে আসুন আমার কাছে।”

কালীবাবুর কথা শুনে পলাশ আরো ভয় পেয়ে যায়। তবে স্বপনদা ওকে আশ্বস্ত করে, “আরে কালীদা খুব অভিজ্ঞ লোক। উনি এরকম কত সমস্যার সমাধান করে দিয়েছেন। তুমি কিছু চিন্তা কোরো না।”

এসে গেল অমাবস্যার রাত। দুরুদুরু বুকে পলাশ স্বপনদাকে নিয়ে হাজির হল কালীবাবুর কাছে। স্বপনদা বসে থাকল কালীবাবুর চেম্বারে। কালীচরণবাবু পলাশকে নিয়ে এলেন কাছের একটি শ্মশানে। চারদিক ঘুটঘুটে অন্ধকার। ঝিঁঝিঁর ডাক শোনা যাচ্ছে। তাকে ছাপিয়ে যাচ্ছে কিছু কুকুরের তারস্বরে ডাক। এদিক ওদিক কয়েকটি চুল্লি এখনো জ্বলছে। কটু গন্ধে ভরে গেছে আকাশ বাতাস। সব মিলিয়ে একটা গা ছমছমে পরিস্থিতি। মা-বাবার মৃত্যুর সময় পলাশ শ্মশানে এসেছে বটে, কিন্তু সে পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ আলাদা।

একটা ফাঁকা জায়গা দেখে কালীচরণবাবু যজ্ঞের প্রস্তুতি শুরু করলেন। সঙ্গে দুটো চাটাই এনেছিলেন। একটায় নিজে বসলেন, আরেকটায় পলাশকে বসতে বললেন। এরপর পলাশের হাতে লাল রঙের একটা সরু সুতো বেঁধে বললেন, “আমি না বলা অবধি এই আসন ছেড়ে উঠবে না। তোমার পরিচিত মৃত আত্মাদের দেখতে পাবে, ওরা তোমাকে ডাকবেও। কিন্তু কিছুতেই ভয় পাবে না। সবসময় মনে রাখবে, তোমাকে সুরক্ষা দেওয়া আছে। কিন্তু ভয় পেয়ে আসন ছেড়ে উঠলে বড়ো অনর্থ ঘটে যাবে, এই বলে দিলাম।”

কালীবাবু মন্ত্র উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে আগুনে ঘি ঢালতে লাগলেন। আগুনের প্রজ্জ্বলিত শিখার সঙ্গে মন্ত্র উচ্চারণের জোর যেন বেড়ে গেল।

একভাবে বসে থাকতে থাকতে পলাশের একটু ঝিমুনি চলে এসেছিল। হঠাৎ ওর বাবার কণ্ঠস্বর শুনে চমকে তাকাল। ওর বাবা তো প্রায় বছর পাঁচেক হল চলে গেছেন। পলাশের মনে হল, ওর বাবা যেন দূরে দাঁড়িয়ে ওকে হাতছানি দিয়ে ডাকছেন। কালীবাবুর বলা কথাটা মনে পড়াতে ও চোখ বন্ধ করে মনে মনে ভগবানের নাম জপ করতে লাগল। আশেপাশে আরো কিছু চেনা গলার আওয়াজ শুনলেও চোখ মেলল না।

একসময় যজ্ঞ শেষ হল। কালীচরণবাবু যজ্ঞের ছাইয়ের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে লাল সুতো দিয়ে বাঁধা একটা তাবিজ বার করে আনলেন। পলাশ অবাক হয়ে ভাবল, ওটা ওখানে কীভাবে এল? আগেই ছিল? কিন্তু তাহলে তো এতক্ষণে পুড়ে ছাই হয়ে যাবার কথা।

পলাশের মনের কথা পড়তে পেরেই যেন উনি বললেন, “এটা মন্ত্রপূত তাবিজ। আগুন, জল, বায়ু একে বিনষ্ট করতে পারে না। এর তুল্য শক্তিশালী বস্তু আর হয় না। একটা মন্ত্র শিখিয়ে দিচ্ছি। কাল স্নান করে শুদ্ধ বস্ত্র পরে প্রথমে এই মন্ত্র উচ্চারণ করবে আর তারপর এটা ধারণ করবে। তবে সাবধান, এটা যেন কোথাও খুলে পড়ে না যায়। আর নিজে থেকে তো খুলবেই না। খুললেই কিন্তু মহা সর্বনাশ হবে!”

পলাশ কবচটা নিয়ে বাড়ি চলে এল। মিতা ওর বরের কাণ্ডকারখানা দেখে তো রীতিমতো অবাক।

“শেষে তোমার মতো নাস্তিকও কেমন অন্ধ কুসংস্কারে বিশ্বাস করতে শুরু করল! একেই বলে ঠেলার নাম বাবাজি।” মিতা হাসতে হাসতে বলল।

কবচটা ওদের বেড-রুমের টেবিলের উপর রাখা ছিল। হঠাৎ মাঝরাতে একটা আওয়াজে মিতার ঘুম ভেঙে গেল। দেখল, টেবিল থেকে কবচটা শুধু নয়, একটা প্লেটও মাটিতে পড়ে ভেঙে গেছে। জানালা তো বন্ধ। তবে কি ইঁদুর নাকি? কিন্তু ইঁদুর তো এখানে আগে ও দেখেনি। আর ওটা তো টেবিলের মাঝখানে ছিল! কবচটা তুলে রাখতে গিয়ে ওটায় হাত দিতেই মিতা চারপাশে একটা ক্ষীণ অথচ চাপা গুঞ্জন শুনতে পেল। মনে হল চাপাস্বরে অনেকে যেন কথা বলছে, অথচ কাউকেই দেখা যাচ্ছে না। মিতা ভয় পেয়ে ঠেলেঠুলে পলাশকে জাগাল। পলাশ ঘুমকাতুরে। ঘুম চোখে ঘটনাটা শুনে বলল, “ও কিছু নয়। ইঁদুরের উপদ্রব। কাল বিষ কিনে আনতে হবে। এখন শুয়ে পড়ো।” এই বলে পাশ ফিরে শুল।

পুরো ঘটনাটায় মিতার মতো সাহসী মেয়েও ভয় পেয়ে গেল। শুয়ে ঘুমোনোর চেষ্টা করল, কিন্তু সেই রাতে ঘুম আর এল না। তবে পরদিন স্নান করে কবচটা পড়তে গিয়ে পলাশও একটা ঝাটকা খেল। মনে হল যেন কোনো খোলা ইলেক্ট্রিক তারে হাত দিয়েছে। শক খেয়ে মাথাটাও কেমন ঘুরে গেল। ও প্রথমে একটু ঘাবড়ে গেলেও কালীবাবুর দেওয়া মন্ত্রটা আওড়াতে আওড়াতে কবচটা পরে নিল। তারপর খেয়েদেয়ে রোজকারমতো অফিসে বেরিয়ে গেল।

পলাশের মতো নাস্তিক ছেলের হাতে কবচটা দেখে অফিসে শোরগোল পড়ে গেল। রায়দা, পালদারা সব হাসাহাসি শুরু করলেন। রায়দা তো বলেই দিলেন, “যাক! স্বপন এতদিনে কাউকে নিজের দিকে টানতে পেরেছে। তাও আবার পলাশের মতো ছেলেকে।”

এর কিছুদিন পরে পলাশ মাকে স্বপ্ন দেখল। ওকে বলছেন, ‘কী রে খোকন! দূরে চলে গেলি? আর আমার সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছা করে না বুঝি?’

ও যেন স্পষ্ট দেখল, মা ওর থেকে একটু দূরেই দাঁড়িয়ে। ও ছুঁতে গেলেই মিলিয়ে গেলেন। ঘুম ভাঙতেই মনটা খারাপ হয়ে গেল। ছোটোবেলা থেকেই মা ছিল ওর সবচেয়ে কাছের। যত সুখদুঃখের কথা মায়ের সঙ্গে ভাগ করে না নিলে ও যেন শান্তি পেত না। তাই বছর দশেক আগে মা যখন মারা গেলেন, ও সবচেয়ে ভেঙে পড়েছিল। কয়েকদিন খাবারে কোনো রুচি ছিল না। রাতে শুয়ে ঘুম হত না। পুরোনো স্মৃতিগুলো সব ভিড় করে আসত। কান্নায় বালিশ ভিজে যেত। সেসব কথা মনে পড়ে গেল। তবে মায়ের ওই ‘দূরে চলে গেলি’ কথাটা নিয়ে ও ভাবতে বসল। এটা কি কবচের প্রভাব? তবে স্বপ্ন স্বপ্নই, এর সঙ্গে বাস্তবের মিল খোঁজার চেষ্টা মুর্খামি।

যাই হোক, কবচ ধারণের কয়েকদিন পর থেকেই কিন্তু রাস্তাঘাটে মৃত ব্যক্তিদের সাক্ষাৎ বন্ধ হয়ে গেল। তবে স্বপ্নে কেন জানি মনে হত, কারা সব কটমট করে ওর দিকে তাকিয়ে আছে আর কবচটা খুলে ফেলার জন্য পীড়াপীড়ি করছে, এমনকি হুমকিও দিচ্ছে। কিন্তু ধীরে ধীরে সেটাও একসময় বন্ধ হয়ে গেল।

সবকিছু ক্রমে স্বাভাবিক হয়ে এল। পলাশ ফের দৈনন্দিন রুটিন বাঁধা জীবনে অভ্যস্ত হয়ে উঠল। ফলে আগের সেইসব ভয়াবহ অভিজ্ঞতার স্মৃতি আস্তে আস্তে একেবারে ফিকে হয়ে এল।

মিতা একদিন ওকে বলল, “ডক্টর পালের ওষুধ খেয়েই তোমার উপকার হয়েছে। ওই তান্ত্রিক আর কবচের ব্যাপারটা কাকতলীয় ছাড়া কিছুই নয়। এসব থেকেই তো মানুষের মনে অন্ধ বিশ্বাস ছড়ায়!”

মিতার এইধরনের কথাবার্তা তো ছিলই, তার উপর আবার রায়দা-সেনবাবুরাও বলছিলেন, ‘এইসব তান্ত্রিকেরা মানুষের দুর্বলতার ফায়দা নেন। এদের বুজরুকির ফাঁদে আমরা পা যত দেব, তত এদের ব্যাবসা ফুলে ফেঁপে উঠবে। মানসিক দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠো। ওটা ফেলে দিয়ে দেখো কোনো সমস্যাই হচ্ছে না।’

অনেকে আবার বলছিল যে এসব কবচ-তাবিজ যে ধাতুতে তৈরি তাতে চামড়ায় ইনফেকশন পৰ্যন্ত হতে পারে। এরকম অনেক উদাহরণ আছে। এটা ঘটনা যে কবচটা পরার পর পলাশের একটু অস্বস্তিই হত, জায়গাটা কেমন চুলকাত। কিন্তু উপকারের কথা ভেবে এতদিন সহ্য করেছে। তবে এখন সমস্যাটা কেটে যাওয়াতে ও ওটা খুলে রাখার কথা চিন্তা করতে লাগল। কিন্তু তখনই কালীচরণ সান্যালের সাবধানবাণী মনে পড়ল। কী করবে ভেবে পলাশ বেশ দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ল। তবে একসময় সব দ্বিধা দ্বন্দ্ব ঝেড়ে ফেলে পলাশ ভাবল, এটা একদিন খুলে দেখাই যাক না। সেরকম হলে না হয় আবার পড়তে আরম্ভ করব। ওষুধ তো এখন শেষ। তাহলেই কবচের প্রভাব বোঝা যাবে।

সেইমতো পলাশ একদিন কবচটা খুলেই রাখল। কয়েকদিন কিছুই হল না। সব আগের মতোই স্বাভাবিক। পলাশ নিশ্চিন্ত হল, নাহ! এতদিন ধরে যা হয়েছে সব ওর মনের ভুল।

কিছুদিন পরে অফিসের একটা কাজে পলাশ নৈহাটি গিয়েছে। ফেরার ট্রেন ধরতে হলে একটা ওভার ব্রিজ পেরিয়ে উলটোদিকের প্ল্যাটফর্মে যেতে হয়। অথবা সরাসরি রেল লাইন পেরিয়ে ওই প্ল্যাটফর্মে যেতে হয়। ট্রেন আসার সময় হয়ে গেছে। পলাশ সাধারণত নিয়ম মেনে ওভার ব্রিজ পেরিয়েই যায়। কিন্তু আজ কেন জানি ওর মনে হল, কী দরকার অত ঝামেলা করে? রেল লাইন পেরিয়ে সোজা গেলেই তো হয়। মান্থলি থাকায় টিকিট কাটার দরকারও পড়েনি।

পলাশ রেল লাইনে সবে গিয়ে উঠেছে, এমন সময়ে ওর মনে হল যেন মা ওকে ডাকছেন। চমকে পেছনে তাকাতেই বুকের হৃৎপিণ্ড যেন ধড়াস করে লাফিয়ে উঠল গলায়। প্ল্যাটফর্ম থেকে হলুদ আলো যেটুকু চুইয়ে আসছে তাতে ও স্পষ্ট দেখল মা হাত খানেক দূরে দাঁড়িয়ে। মুখে মৃদু হাসি। পলাশ এতটাই হতভম্ব আর অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল যে ও খেয়ালই করেনি হুইসেল দিয়ে ঝড়ের বেগে একটা ট্রেন ওর ঘাড়ের কাছে এসে পড়েছে। লোকের সমবেত চিৎকার-চেঁচামেচিও ওর কানে পৌঁছায়নি।

রেল লাইন থেকে পলাশ দত্তের ছিন্নভিন্ন দেহটা উদ্ধারের সময় পাশে পড়ে ছিল লাল সুতো দিয়ে বাঁধা একটা কবচ।

অলঙ্করণ:মৌসুমী রায়

জয়ঢাকের সমস্ত গল্প ও উপন্যাস

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s