টাইম মেশিন-আন্দামানে ভাইসরয় নিধন- কৃষ্ণেন্দু দেব-বর্ষা ২০২৫

আগের লেখাভূবনডাঙার ভূত  অছু সাহেবের বিষয় আশয়, শিক্ষাব্রতী বিদ্যাসাগর, আহত ঈশ্বর, স্বাধীনতার তিন অধ্যায়

সামনে শুধুই অতল জলরাশি। কালো তার রং। তাই সবাই বলে কালাপানি। কালাপানির সাজা বড় নির্মম। এই সাজা নরক বাসের সমান। একবার যাকে এখানে নিয়ে আসা হয়, সে আর শত ইচ্ছা হলেও প্রিয়জনদের মুখদর্শনের সুযোগ পায় না। শের আলি গত দুবছর ধরে প্রায় প্রতিদিনই বিকালবেলা তাকিয়ে থাকেন আন্দামান সাগরের অনন্ত বিস্তৃত জলরাশির দিকে। ফেলে আসা দিনগুলোর স্মৃতি ভিড় করে তাঁর মনের মধ্যে। বেশি করে মনে পড়ে ১৮৬৭ সালের ২ এপ্রিল দিনটার কথা। ওই দিনই তাঁর ফাঁসির সাজা ঘোষণা হয়েছিল। পুলিশ হাতে পায়ে বেড়ি পরিয়ে আদালত থেকে বের করে নিয়ে এসেছিল। আদালত চত্বরে সেদিন বাড়ির অন্যান্য লোকেদের সঙ্গে হাজির হয়েছিল ছোট বোনটাও। সে শের আলির সামনে এসে হাউহাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল, দাদা আমার জন্যই আজ তোমার এই দশা হল। তুমি কেন হায়দারকে নিকেশ  করতে গেলে?

কিন্তু শের আলি বিশ্বাস করেন হায়দার আলিকে খুন করে তিনি কোনও অপরাধ করেননি। তিনি আফগানিস্থানের খাইবার পাস সংলগ্ন তিরাহ উপত্যকার বাসিন্দা। জন্ম জামরুদ গ্রামে, জাতে তিনি পশতুন। আর পশতুনি সংস্কৃতিতে মা বোনের অসম্মান কেউ বরদাস্ত করে না। মাস চারেক আগে বেশ কিছুদিনের ছুটি পেয়ে নিজের গ্রামের বাড়িতে গিয়েছিলেন শের আলি। বাড়ির লোকের সঙ্গে বেশ মজাতেই দিন কাটাচ্ছিলেন। হঠাৎই সেই আনন্দে বাদ সাধল ওই শয়তান হায়দার আলি। সে ওঁরই এক জ্ঞাতি ভাই। হায়দার একদিন তাঁর ফুলের মত সুন্দর বোনটাকে জোর করে ভোগ করার চেষ্টা করল। সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করল বোন, উঠল চিৎকার করে। তখন বাড়িতেই ছিলেন শের আলি। ছুটে গেলেন বোনের কাছে। সব দেখেশুনে ওঁর মাথায় রক্ত উঠে গেল। ওদিকে হায়দার ভয়ে দৌড় দিয়েছে। শের আলি ওকে ধাওয়া করলেন। খানিক পরেই পেয়ে গেলেন নাগালের মধ্যে। প্রকাশ্য দিবালোকে জনসমক্ষেই খুন করলেন শয়তানটাকে। হায়দারকে হত্যা করে সেদিন এতটুকু আফসোস হয়নি তাঁর। এমনকি কোনও আত্মীয় স্বজন বা তিরাহ উপত্যকার কোনও মানুষই সেদিন ওই হত্যাকাণ্ডকে খারাপ চোখে দেখেনি। বরং বোনের অপমানের বদলা নিয়েছেন বলে সবাই শের আলিকে বাহবাই দিয়েছিল সেদিন। ফলে শের আলির মনেও হায়দারকে জাহান্নামে পাঠানো নিয়ে কোনো অপরাধবোধ ছিল না।

কিন্তু সব ধারণা বদলে গেল পেশোয়ারে ফিরে কাজে যোগ দেওয়ার পর। ওই হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করল। শুরু হল মামলা। অথচ গত সাত বছর ধরে শের আলি ওই পুলিশবিভাগেই অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেছেন। আম্বালা রেজিমেন্টের একজন ঘোড়সওয়ার হিসাবে কাজে যোগ দিয়ে সিপাই বিদ্রোহের সময়ে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রেসিডেন্সি আর্মিতে রোহিলখণ্ড এবং অযোধ্যায় ডিউটি করেছেন। তারপর চলে এসেছেন পেশোয়ারে, উত্তর-পশ্চিম ফ্রন্টিয়ারের পাঞ্জাব পুলিশের ঘোড়সওয়ার বাহিনীতে। নিজের কাজে কোনওদিন এতটুকু ফাঁকি দেননি। আর সেই কারণেই তো খুশি হয়ে বেঙ্গল আর্মির মেজর জেনারেল রেনেল টেলর শের আলিকে নিজের ঘোড়সওয়ার-আর্দালি হিসাবে যুক্ত করেছিলেন। শুধু তাই নয়, কিছুদিন বাদে খুশি হয়ে জেনারেল টেলর শের আলিকে একটি ঘোড়া, একটি পিস্তল ও একটি সার্টিফিকেটও দিয়েছিলেন। আর সঙ্গে দিয়েছিলেন নিজের সন্তানদের দেখাশোনার ভারও। কতটা বিশ্বস্ততা অর্জন করলে তবে এই দায়িত্ব পাওয়া যায়! কিন্তু কী কপাল! ইংরেজ বড় কর্তাদের এমন কাছের লোক হওয়া সত্ত্বেও তাঁকে ফাঁসিতে ঝোলানোর হুকুম দেওয়া হল।

এমন আদেশ যে হতে পারে তা শের আলি বিশ্বাসই করতে পারেননি। উনি এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করলেন। এবার অবশ্য জজসাহেব কর্নেল পোলক একটু সদয় হলেন। উনি মৃত্যুদণ্ড থেকে নিষ্কৃতি দিয়ে শের আলিকে নির্বাসিত করলেন আন্দামানে। তখন থেকেই শের আলি কালাপানির সাজা ভোগ করছেন।

আন্দামানে একমাত্র ভাইপার দ্বীপ ছাড়া আর কোনও কারাগার নেই। তাই বন্দিদের বিভিন্ন দ্বীপে কঠোর পাহারায় রাখা হয়, চার দেওয়ালের বাইরেই। তাদের মধ্যে রাজনৈতিক বন্দি যেমন আছে তেমনি আছে সাধারণ অপরাধীও। শের আলিকে পোর্ট ব্লেয়ারের হোপ টাউন অঞ্চলের পানিঘাটায় বন্দি করে রাখা হয়েছে গত চার বছর ধরে। তবে ইদানীং নিজের আচরণের জন্য আর পাঁচটা বন্দির তুলনায় অনেক বেশি সুযোগ সুবিধা ভোগ করছেন শের আলি। মনে মনে ইংরেজ বিদ্বেষী হলেও এখানে আসার পর থেকে উনি সব নিয়মকানুন মেনে চলেছেন, কারুর সঙ্গে কখনও ঝগড়াঝাঁটি করেননি। আর এমনিতেও উনি নম্র স্বভাবের। সেইজন্য বড়ো অফিসারদের সহানুভূতি পেয়েছেন। ওঁকে আর তাই হাতেপায়ে বেড়ি পরিয়ে রাখা হয় না। বড় সাহেবরা ওঁকে হোপ টাউনে নাপিত হিসাবে কাজ করারও অনুমতি দিয়েছেন। যা পরিস্থিতি, তাতে হয়ত কয়েকমাস বাদে  শের আলি এই বন্দিজীবন থেকে মুক্তিও পেয়ে যাবেন।

কিন্তু ইংরেজরা জানে না, শের আলি মুক্তি পেতে মোটেই আগ্রহী নন। এই নির্জন দ্বীপে নির্বাসিত হয়ে আসার পর থেকেই ইংরেজদের সম্পর্কে মনোভাব একেবারে পাল্টে গেছে তাঁর। শের আলির কেবলই মনে হয়, এতদিন ধরে ব্রিটিশদের সেবা করার এই প্রতিদান পেলেন? উনি তো কোনও অপরাধই করেননি, তাও ইংরেজরা এই পাণ্ডব বর্জিত স্থানে তাঁকে বন্দি করে পাঠিয়ে দিল? এর প্রতিশোধ উনি নিয়েই ছাড়বেন। কিন্তু কীভাবে নেবেন এই প্রতিশোধ?

ইতিমধ্যে শের আলির মনে ওয়াহাবি আন্দোলনের প্রভাব পড়েছে। আসলে ভারতে সিপাহী বিদ্রোহের আগুন নিভতে না নিভতেই জ্বলে উঠেছিল ওয়াহাবি বিদ্রোহের আগুন। উত্তরপ্রদেশের রায়বেরিলির সুলতান আহমেদের নেতৃত্বে শুরু হয়েছিল মুসলিমদের ব্রিটিশ বিরোধী তীব্র বিক্ষোভ। ইংরেজরা এই বিদ্রোহ দমন করতে ব্যাপক পীড়ন চালিয়েছিল। তারা অনেক ওয়াহাবি নেতাকে কয়েদ করে ১৮৬৪ সালে আম্বালা মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাজা দিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছিল আন্দামানে। তাঁদেরই মধ্যে বেশ কয়েকজনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হয়েছে শের আলির। ইংরেজরা ভারতে নিজেদের সাম্রাজ্য বিস্তার করতে কতটা নিচে নামতে পারে, সেটা এবার বুঝে ফেলেছেন তিনি। ভারতীয়দের ওপর সাহেবদের দমননীতি এখন ওঁকে কষ্ট দেয়। নিজে পুলিশে চাকরি করার সময় এই ইংরেজদের সেবা করেছেন ভেবে অনুশোচনাও হয়। ফলে দ্বীপান্তরের সাজা পাওয়ার পর ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে তাঁর মনে যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল তা এখন বদলে গেছে তীব্র ঘৃণায়। কিন্তু নিজের আচরণে শের আলি কাউকে এসব কিছুই বুঝতে দেন না।

এর মধ্যেই 1871 সালের অক্টোবরে কলকাতা থেকে একটা রোমহর্ষক খবর এসে পৌঁছল আন্দামানে। মোহাম্মদ আবদুল্লাহ নামের একজন লোক গতমাসে কলকাতা টাউন হলের সিঁড়িতে বিচারপতি জন প্যাক্সটন নরম্যানকে গুলি করে হত্যা করেছে। এই বিচারপতিই ওয়াহাবিদের কঠোর সাজা দিয়ে আন্দামানে পাঠিয়েছিলেন। মোহাম্মদ আবদুল্লাহ একজন ওয়াহাবি আন্দোলনের সমর্থক। তাই নরম্যানকে হত্যা করতে তাঁর হাত এতটুকু কাঁপেনি। এই খবর শোনার পরেই শের আলি ঠিক করে নিয়েছেন কোনও বড়ো ব্রিটিশ আধিকারিককে খুন করেই তিনি নিজের বিরুদ্ধে হওয়া অন্যায়ের প্রতিশোধ নেবেন। ইংরেজদের সবক শেখাবেন। কিন্তু কাকে করবেন হত্যা? কীভাবেইবা মিলবে সেই সুযোগ?

কয়েকমাস বাদেই খানিক অপ্রত্যাশিতভাবেই শের আলি ওই সব প্রশ্নের জবাব পেয়ে গেলেন। ১৮৭২-এ আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের সুপারিন্টেন্ডেন্ট, জেনারেল স্টুয়ার্ট, ভারতের বড়োলাটকে আমন্ত্রণ জানালেন আন্দামান সফরে। বড়োলাট জাতিতে আইরিশ, পুরো নাম রিচার্ড সাউথওয়েল বার্ক, মেয়োর ষষ্ঠ আর্ল। তবে সবাই তাঁকে চেনে লর্ড মেয়ো নামেই। ৮ ফেব্রুয়ারি, ১৮৭২-এ সকালবেলা এইচ. এম. এস. ফ্রিগেট ‘গ্লাসগো’তে চেপে লর্ড মেয়ো এসে পৌঁছলেন আন্দামান। রাত কাটাবেন তিনি রস আইল্যান্ডে। এই রস-ই ব্রিটিশ আন্দামানের রাজধানী। বড়োলাট আসার কয়েকদিন আগে থেকেই আন্দামানের সব দ্বীপের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করে ফেলা হয়েছে। ভাইপার এবং রস দ্বীপে যেসব কয়েদিরা আছে, তাদের সবার ওপর কড়া নজরদারি চালানো হচ্ছে। তাদের কাজ করানো হচ্ছে হাতে-পায়ে বেড়ি পরিয়ে। কোথাও বা মাটির সঙ্গে লম্বা একটা লোহার রড পুঁতে তার এক-দেড় ফুট দূরত্বে লাগানো এক-একটা হাতকড়িতে আটক রেখে উবু হয়ে বসে কাজ করতে বাধ্য করা হচ্ছে কয়েদিদের। বড়োলাটের নিরাপত্তা বলে কথা!

লর্ড মেয়ো প্রথম জীবনে ব্রিটিশ কনজারভেটিভ পার্টির বিশিষ্ট সদস্য হিসেবে আয়ারল্যান্ডের মুখ্য সচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন। তারপর ভারতের ভাইসরয় করে তাঁকে ১৮৬৮তে এদেশে পাঠানো হয়েছে। খুব কাজের মানুষ উনি। এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করেন না। তাই আজ জাহাজ থেকে নেমেই রস আইল্যান্ডে দ্বীপের আধিকারিকদের সঙ্গে বন্দি-নিবাস সংক্রান্ত নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা সেরে ফেললেন। তাঁর একান্ত ইচ্ছে কয়েদিদের সংশোধন করে কারাগার থেকে মুক্তি দিয়ে আন্দামানে তাদের দিয়ে চাষ-আবাদ করিয়ে একটা ‘স্বাবলম্বন গ্রাম’ তৈরি করবেন। 

এদিকে বড়োলাট আন্দামানে আসছেন শুনেই শের আলি চঞ্চল হয়ে উঠেছেন। মনে মনে মেয়োকেই বেছে নিয়েছেন নিজের শিকার হিসেবে। কারণ ব্রিটেনের রানি আর প্রধানমন্ত্রীর পর ভাইসরয় মেয়োই সবচেয়ে ক্ষমতাধর ইংরেজ। তাই তাঁকে হত্যা করতে পারলে প্রতিশোধটা জব্বর হবে। কিন্তু তাঁর কাছে খবর ছিল, বড়োলাট এই সফরে শুধু পা রাখবেন রস আইল্যান্ডে। শের আলি তাই দুদিন আগে থেকেই বড় কর্তাদের কাছে গিয়ে রস যাওয়ার অনুমতি চেয়ে অনেকবার তদবির করেছেন। কিন্তু তাতে কোনো ফল হয়নি। অনুমতি মেলেনি। ফলে ভেঙেই পড়েছিলেন শের আলি। ইস, নাগালের মধ্যে পেয়েও শিকার ফসকে যাবে। কিন্তু হঠাৎই শের আলির কপাল খুলে গেল। শিকার নিজেই চলে এল তার শিকারীর কাছে। লর্ড মেয়ো ওই ৮ ফেব্রুয়ারি দুপুরেই লাঞ্চের পর নৌকো করে সমুদ্র পার হয়ে চলে এলেন পোর্ট ব্লেয়ারে। উদ্দেশ্যে, মাউন্ট হ্যারিয়েটে কয়েদিদের জন্য একটা যক্ষ্ণা হাসপাতালের জমি দেখবেন উনি। 

প্রহরী পরিবেষ্টিত হয়ে লর্ড মেয়ো উঠছেন মাউন্ট হ্যারিয়েটে। পথের দুপাশে ঘন জঙ্গল। প্রহরীরা জানতেই পারল না যে ঐ জঙ্গলের ভিতর নিজেকে আড়াল করে আঁকাবাকা পাথর বেয়ে আরেকজনও চলছেন শিখরের দিকে। তিনি শের আলি। শের আলির নজর কিন্তু ভাইসরয়ের দিকে। প্রহরীরা একটু অসাবধান হলেই ঝাঁপিয়ে পড়বেন তাঁর ওপর। কিন্তু সেই সুযোগ আর এল না। প্রহরীরা এক মুহূর্তের জন্যও বড়লাটকে একা ছাড়ল না, সব সময় ঘিরেই রইল তাঁকে। 

সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। আন্দামানে বঙ্গোপসাগরের ওপর সূ্র্য অস্তাচলে যাচ্ছে। সাগরের কালো জলে এখন লাল আর কমলা রঙের ঝিকিমিকি, তৈরি হয়েছে এক অপরূপ দৃশ্য। প্রকৃতির এমন শোভা দেখে অভিভূত লর্ড মেয়ো। যতক্ষণ না সূর্য পুরোপুরি অস্ত গেল ততক্ষণ বড়লাট ওখানেই দাঁড়িয়ে রইলেন। চোখ রইল আকাশ আর সাগরের দিকে। আপন মনেই বলে উঠলেন, “আহা, কী অপূর্ব শোভা! এমন দৃশ্য আগে তো কখনো দেখিনি। এমন সৌন্দর্যের সামনে জীবনে এই প্রথম এসে দাঁড়ালাম।”

এই কথা শুনে নিয়তি শুধু মুচকি হাসল। সে জানে, এটাই বড়োলাটের জীবনের শেষ সূর্যাস্ত দর্শন!

এবার বড়লাট নিচে নামতে শুরু করলেন। শের আলি কিন্তু ওখানে আর অপেক্ষা করেননি। ঝট করে মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেছে তাঁর। বড়োলাট তো আজ রস আইল্যান্ডে ফিরবেনই। তাঁর জন্য জেটিতে অপেক্ষা করছে নৌকা। শের আলি তাই দ্রুত পা চালিয়ে চলে এলেন নিচে। অন্ধকারে লুকিয়ে রইলেন চুনাভাটা (হোপটাউন) জেটিতে। কেউ তাঁকে খেয়াল করল না।

ঘড়িতে তখন সাতটা। চারদিক ঢেকে গেছে অন্ধকারে। নৌকাতে বসে লেডি মেয়োর বেশ চিন্তা হচ্ছে স্বামীর জন্য। এই সময়েই তাঁর চোখে পড়ল বিন্দু বিন্দু আলো। দূরে অন্ধকারের মধ্যে বাতি জ্বেলে একদল সৈনিক বড়োলাটকে নিয়ে ফিরছে। নিশ্চিন্ত হলেন লেডি মেয়ো। তিনি খুশির চোটে লর্ড মেয়োকে আভিবাদন জানাতে ব্যান্ডবাদকদের ‘রুল ব্রিটানিয়া’র সুর বাজাতে বললেন।

ওদিকে লর্ড মেয়োও আজ দারুণ খুশি। সূর্যাস্তের অপরূপ দৃশ্য তাঁর মন এখনও আচ্ছন্ন করে রেখেছে। পাশেই আছেন জেনারেল স্টুয়ার্ট। মেয়ো তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, “রস আইল্যান্ডে ফিরে গিয়ে কী ধরনের পার্টির আয়োজন করেছ?” স্টুয়ার্ট সঙ্গে সঙ্গে আয়োজনের বিবরণ দিলেন। ইতিমধ্যে ওঁরা চলে এসেছেন জেটির মুখে। লর্ড মেয়ো নেমে এলেন জেটির সিঁড়ি বেয়ে। যেই না রাজকীয় নৌকায় পা দিতে যাবেন, অমনি অন্ধকার থেকে বাঘের মতো লর্ড মেয়োর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন শের আলি। নাপিতের কাজ করতেন। সঙ্গে ছিল ধারালো ক্ষুর। সেটা দিয়েই উপর্যুপরি লর্ড মেয়োর পিঠ ক্ষত-বিক্ষত করলেন। বড়োলাট পড়ে গেলেন জলে। সঙ্গে সঙ্গে শের আলির ওপর জনা বারো সৈনিক ঝাঁপিয়ে পড়ল, তক্ষুনি মেরেই ফেলত। কিন্তু একজন ইংরেজ অফিসার নিরস্ত করল ওদের। বন্দি হলেও বেঁচে রইলেন শের আলি।

ইতিমধ্যে, হাঁটু ডোবা জল থেকে কোনোমতে উঠে দাঁড়িয়েছেন লর্ড মেয়ো। সকলকে দেখানোর চেষ্টা করছেন যে তিনি ঠিক আছেন। ভারতবর্ষের ভাইসরয় বলে কথা। হাত দিয়ে কোনমতে নিজের মাথার জল ঝাড়লেন। বায়ার্ন তাঁর ব্যক্তিগত সচিব। তিনি ইতিমধ্যে হাত ধরে টেনে মেয়োকে জল থেকে ওঠানোর চেষ্টা করছেন। লর্ড মেয়ো তাঁকে ক্ষীণ স্বরে বললেন, “বায়ার্ন, আমাকে ওরা মেরেছে।” এরপর সবাইকে আশ্বস্ত করে বেশ জোরের সঙ্গেই বলে উঠলেন, “আমি ঠিক আছি। মনে হয় না খুব বেশি আঘাত লেগেছে।”

মিনিট খানেকের মধ্যে জেটির পাশে একটা ঠেলাগাড়িতে শোয়ানো হল লর্ড মেয়োকে। তাঁর পিঠ থেকে তখনও গলগল করে রক্ত ঝরছে। সবাই নিজেদের রুমালগুলো পিঠের ক্ষতস্থানে চেপে ধরে সেই রক্ত বন্ধ করার চেষ্টা করছে। একটু বাদে মেয়ো  ঠেলাগাড়িতেই ধীরে ধীরে উঠে বসলেন। তার পরমূহূর্তেই ধপ করে শুয়ে পড়লেন। কোনও মতে বললেন, “আমার মাথাটা একটু তুলে ধরো।”

ব্যাস, আর কোনও শব্দ তাঁর মুখ দিয়ে বেরলো না। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে রানি এবং ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রীর পর তৃতীয় ক্ষমতার অধিকারী ষষ্ঠ আর্ল অফ মেয়ো চিরনিদ্রায় চলে গেলেন।

কিছুক্ষণ পরে শের আলিকে ধরে নিয়ে আসা হল লর্ড মেয়োর মৃতদেহের সামনে। বিদেশ সচিব, ক্যাপ্টেন অ্যাটিচসন তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, “কেন তুমি বড়োলাটকে হত্যা করলে।” শের আলি অবলীলায় জবাব দিলেন, “খুদা নে হুকুম দিয়া।” আবার প্রশ্ন ভেসে এল, “আর কে আছে তোমার সঙ্গে?” উত্তরে শের আলি বললেন, “মেরা শরিক কই আদমি নেহি, মেরা শরিক খুদা হ্যায়।” পরদিন সকালে যখন তাঁকে স্বীকারোক্তি করতে বলা হল, তিনি বললেন, “হাঁ, ম্যায় নে কিয়া।” এরপর ফটোগ্রাফির জন্য পোজ দিলেন নির্বিকার চিত্তে।

এরপর শুরু হল বিচার। বিচারকের ভূমিকায় পোর্ট ব্লেয়ারের চিফ কমিশনার। ইংরেজরা এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ওয়াহাবি নেতাদের জড়িয়ে দেওয়ার অনেক চেষ্টা করেছে। কিন্তু শের আলি নিজের বক্তব্যে অটল থেকেছেন, মেরা শরিক কই আদমি নেহি, মেরা শরিক খুদা হ্যায়। ফলে ইংরেজরা এই মামলায় আর কাউকে ফাঁসাতে পারেনি। বলাই বাহুল্য, বিচার শেষে শের আলির ফাঁসির হুকুম হল। ১১ মার্চ, ১৮৭২-এ ভাইপার দ্বীপে শের আলি নির্দ্বিধায় ফাঁসির দড়ি গলায় পরলেন।

পরবর্তীকালে দেশকে স্বাধীন করার লক্ষ্যে ভারতীয় বিপ্লবীরা অনেক ইংরেজ আধিকারিককে হত্যা করেছেন। কিন্তু কেউই কোনও ভাইসরয়কে নিকেশ করতে সমর্থ হননি। এই কৃতিত্ব একমাত্র শের আলির। এই হত্যাকাণ্ডের পরেই ব্রিটিশরা ভারতে প্রথম গোয়েন্দা ব্যুরো গঠনের পরিকল্পনা করে। অথচ শের আলিকে আমরা আজ ভুলেই গেছি।

স্বাধীনতার লড়াইয়ের এমনই সমস্ত বীর যোদ্ধাকে নিয়ে আসছে জয়ঢাকের বই আগুনপথের যাত্রী (তৃতীয় খণ্ড)
আগের দুটো খণ্ডের লিঙ্ক রইল সঙ্গে।
জয়ঢাক প্রকাশন থেকে বইগুলো সংগ্রহ করতে নীচের লিঙ্কে ক্লিক করতে পারেন।

‘আগুন পথের যাত্রী প্রথম খণ্ড’

‘আগুন পথের যাত্রী দ্বিতীয় খণ্ড’

Leave a Reply