বয়স:- ১৪। শ্রেণি:- অষ্টম। গোরাবাজার ঈশ্বর চন্দ্র ইনস্টিটিউশন (আই. সি. আই), মুর্শিদাবাদ

॥ ১॥
বাঙালির হাওয়া বদলের শ্রেষ্ঠ স্থান হল শিমুলতলা। এই শিমুলতলা নামের সঙ্গেই হয়তো কোনোভাবে কোথাও জড়িয়ে রয়েছে বাঙালির হৃদয়ের প্রাণ। আর সেই ঐতিহাসিক শিমুলতলাতে আমি আজ চলেছি। প্রথমেই রাজবাড়িতে আমি ভ্রমণে কিংবা হাওয়া বদল করতে নয়, যাচ্ছি অ্যাডভেঞ্চার করতে। বিষয়টা শুনে অবাক হয়ে গেলেও, এটাই সত্যি। তবে শুধু দিনের শিমুলতলা রাজবাড়ি পর্যবেক্ষণ করতে নয়, রাতের শিমুলতলা রাজবাড়ি দেখতে যাচ্ছি। ছোটোনাম আর আমি যাচ্ছি। ছোটোনাম আমার স্কুলের বন্ধু। ছোটোনামের কিন্তু চোখে-মুখে তীক্ষ্ণ বুদ্ধি। আসলে ছোটোনাম হল একজন পেশাদার গোয়েন্দা। তবে শুধু ছোটোনাম গোয়েন্দা নয়, একজন অ্যাডভেঞ্চার পিপাসু মানুষ। ও-ই একদিন ঠিক করল যে রাতে শিমুলতলা রাজবাড়ি যাব। মানে ঠিক রাতে নয়, যাব দিনে দিনে। কিন্তু সারারাত থাকব ওখানে। আমরা ঠিক করেছি, তাঁবু খাটিয়ে রাতটা শিমুলতলাতে কাটিয়ে দেব। সঙ্গে থাকবে আমাদের পর্যাপ্ত পানীয় জল, কিছু শুকনো খাবার, ইলেকট্রিক কেটলি (ওই চা-কফি খাওয়ার জন্য), ইমারজেন্সি আলো। এ-ছাড়া ফার্স্ট এইড বক্স, যেটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই অ্যাডভেঞ্চারে। এই শিমুলতলা রাজবাড়িতে যাওয়ার পূর্বে কত নবীন-প্রবীণ ব্যক্তিরা আমাদের জ্ঞানগর্ভ বক্তৃতা দিলেন যে ওই জায়গায় রাতে একদম থাকা উচিত নয়। প্রথমত, প্রচণ্ড ফাঁকা এরিয়া। দ্বিতীয়ত, না থাক, আর না বলাই ভালো। বলে তো আর কোনও লাভ নেই। যখন আমরা একবার যাব বলে ঠিক করে নিয়েছি তখন আমরা যাবই। পৃথিবীর কোনও শক্তি আমাদের যাত্রা আটকাতে পারবে না।
যাই হোক, ঠিক করেছি আগামীকাল কাকভোরে রওনা দেব বহু প্রতীক্ষিত সেই শিমুলতলা রাজবাড়ির উদ্দেশ্যে। তবে আমরা ট্রেনে করে নয় বা বাসে করেও নয়, যাব একটা স্করপিও গাড়ি করে। এতে আরাম অনেকটাই বেশি। আর অনেক ব্রেক জার্নি করা যায়। কারণ, যেতে যেতে কোথাও মনে হল একটু দাঁড়াই, তখন? বা মনের মতো হোটেলে আহার করি। কিন্তু বাসে বা ট্রেনে করে শিমুলতলা রাজবাড়ি গেলে প্রায় একটানা জার্নি। তাই ঠিক করেই নিলাম, গাড়ি ভাড়া করে যাব। ছোটোনামের একজন চেনাশোনা কাকু ছিল যিনি গাড়ি চালান। ওঁকেই ছোটোনাম বলে ঠিক করে রেখেছে।
তো যাই হোক, রাতের খাওয়া-দাওয়া শেষ হলে একটু হাঁটাহাঁটি করলাম। ওই আমাদের বাড়ির ডাইনিংটায়। তারপরে শয়নকক্ষে চলে গেলাম নিদ্রাদেবীর আরাধনা করতে।
॥ ২॥
দেখতে দেখতে পাখির অপরূপ সুন্দর ডাকে ভোর হল। মোবাইলে অ্যালার্ম দেওয়া ছিল। সময়মতো ঘুম থেকে উঠে পড়লাম। পাখির কুজনে মনটা স্নিগ্ধ হয়ে গেল। ঘুম থেকে উঠে বাড়ির বাগানে গেলাম। ভোরের লাল টকটকে সূর্যকে দর্শন করলাম। মন থেকে সমস্ত ক্লান্তি এক লহমায় মিলিয়ে গেল। হঠাৎই ফোনটা বেজে ওঠায় জামার পকেট থেকে ফোনটা বের করলাম এবং দ্রুত রিসিভ করে বললাম, “হ্যালো।”
ও-প্রান্ত থেকে ছোটোনাম বলল, “তাড়াতাড়ি রেডি হ। আধঘণ্টার মধ্যে গাড়ি নিয়ে আসছি তোদের বাড়িতে।”
আমি বললাম, “আচ্ছা বেশ।”
যত দ্রুত সম্ভব ফ্রেশ হয়ে নিলাম। তারপরে জামা-প্যান্ট পরে দ্রুত রেডি হয়ে নিলাম। কোনোরকমে এক কাপ চা খেয়ে নিয়ে ওই বাড়ির বাগানে গিয়ে বসলাম। তারপরে ফোনটাকে বের করে শর্ট রিলস দেখতে লাগলাম। যতক্ষণ না ছোটোনাম আসে আর কি! হঠাৎই একটা স্করপিও গাড়িকে আমার বাড়ির দিকে আসতে দেখলাম। আর গাড়ির জানালা দিয়ে ছোটোনামের হাসি হাসি মুখ দেখে বুঝতে পারলাম, শিমুলতলা রাজবাড়ি যাওয়ার সে সময় আগত। তারপরে দ্রুত চেয়ার থেকে উঠলাম। গাড়িটা ঠিক আমার বাড়ির পাশেই দাঁড়াল। আমি গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে চললাম স্করপিওর দিকে। তারপরে গাড়ির দরজা খুলে উঠে পড়লাম। আর বসে পড়লাম স্করপিওর এক প্রান্তে। গাড়ির কাচটা অর্ধ খোলা অবস্থায় ছিল। আমি গাড়ির কাচটাকে পুরোপুরি বন্ধ করে দিলাম। তারপরে ড্রাইভারকে বললাম, “এসিটা অল্প পাওয়ারে চালিয়ে দিন।”
তারপরে আস্তে আস্তে এসির ঠান্ডা হাওয়া সারা শরীরের মধ্যে প্রবেশ করল। সারা শরীরটা সতেজ হয়ে গেল। এসির মৃদু বাতাস খেতে খেতে চললাম শিমুলতলা রাজবাড়ি।
॥ ৩॥
দেখতে দেখতে কিছুটা পথ অতিক্রম করলাম। এখন ন্যাশনাল হাইওয়ে দিয়ে যাচ্ছি। রাস্তায় প্রচণ্ড গাড়ি। প্রচুর ধোঁয়া ও ধুলো চারপাশে। দেশটা পলিউশনে শেষ হয়ে গেল। ভাগ্যিস, প্রথমেই গাড়ির জানালার কাচটা বন্ধ করে দিয়েছিলাম। না-হলে এতক্ষণ প্রচণ্ড কাশি হত। এইবার ছোটোনামের দিকে হাসি হাসি মুখ নিয়ে তাকালাম।
ছোটোনাম বলল, “কী রে, চুপচাপ আছিস যে! ব্যাপারটা কী?”
আমি একটা শ্বাস নিয়ে বললাম, “কী আর বলব বল? আর ব্যাপার-ট্যাপার বলতে আলাদা করে কিছু নেই।”
ছোটোনাম বলল, “চলেছি হাওয়া বদলের দেশে। কেমন অনুভূতি বল?”
আমি বললাম, “এখনও তো পৌঁছয়নি। তবে এর আগে কিছু বছর আগে গিয়েছিলাম শিমুলতলাতে। তবে সেটা সূর্য অস্ত যাওয়ার আগে।”
ছোটোনাম বলল, “আমিও তো তাই। যতবারই গিয়েছি শিমুলতলাতে, ততবারই দিনের বেলাতে গিয়েছি। তবে লাট্টু পাহাড়টাও কিন্তু বেশ সুন্দর।”
আমি বললাম, “শিমুলতলাতে ধারালা জলপ্রপাতটাও কিন্তু বেশ আকর্ষণীয়।”
আসলে আমাদের যাত্রার মূল আকর্ষণ ও কেন্দ্রবিন্দু হল শিমুলতলা রাজবাড়ি। কিন্তু ধারালা ফলস এবং লাট্টু পাহাড়টাও আবারও ঘুরে দেখব। আসলে এগুলো যতবারই দেখি না কেন, পুরোনো বলে গণ্য করতে পারি না। যতই দেখি ততই যেন মুগ্ধ হয়ে পড়ি।
যাই হোক, আরও বেশ কিছুক্ষণ ছোটোনাম আর আমার মধ্যে পারিবারিক কিছু আলোচনা হল। দেখতে দেখতে আরও বেশ কিছু দূর পথ অতিক্রম করলাম। হঠাৎই ড্রাইভারবাবু বললেন, “তা সুজ্জিমামা তো মাথার ওপর চড়াও হল। সকালে কিছু খাবেন না?”
খিদে যে পাচ্ছিল না তা নয়। বেশ জোরেই খিদে পাচ্ছিল। বাড়িতে তো অত ভোরে সেভাবে কিছুই খেয়ে বেরোইনি। আমার বলার পূর্বে ছোটোনাম বলল, “হ্যাঁ, খিদে বেশ জোরেই পেয়েছে আমাদের। আপনি বরং একটা ভালো ধাবার সামনে গাড়িটাকে দাঁড় করান। আর আমাদের সঙ্গে আপনিও কিছু খেয়ে নেবেন।”
ড্রাইভারবাবু বেশ ইতস্তত বোধ করে বললেন, “না না, আমি কিছু খাব না। আপনারা যা খাওয়ার খান। আমি একটু ওই চা খাব শুধু।”
ছোটোনাম বলল, “আচ্ছা, তাই খাবেন।”
তারপরে গাড়ি আবার নিজের গতিতে চলতে শুরু করল। আমাদের স্করপিওর পাশ দিয়ে যে কতরকমের গাড়ি চলছে তার ঠিকঠিকানা নেই। কিছু দূর যাওয়ার পর ড্রাইভারবাবু একটা ধাবার সামনে এসে গাড়িটাকে দাঁড় করালেন। তারপরে বললেন, “এই যে। ধাবায় গিয়ে সকালের জলখাবার খেয়ে আসুন।”
আমি আবারও বললাম, “আপনি আমাদের সঙ্গে চলুন। আমাদের সঙ্গে কিছু খেয়ে নেবেন।”
ড্রাইভারবাবু আবারও একই কথাই বললেন, “না না, আমি এখন কিছু খাব না। আমি শুধু এক গ্লাস চা খাব।”
আমরা আর কথা বাড়ালাম না। যত তাড়াতড়ি দেওঘরে পৌঁছাতে পারি ততই মঙ্গল। তারপরে ধাবাতে প্রবেশ করলাম। ধাবাটা যে খুব বড়ো তা কিন্তু নয়। রাস্তার ধারে ঘুপচি একটা ধাবা। একচালা টিনের ধাবা। চেয়ার নেই। বেঞ্চ করে দেওয়া আছে। আমরা ব্রেকফাস্টে গরম গরম কড়াইশুঁটির কচুরি আর তরকারি অর্ডার করলাম। খুব বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। গরম গরম খাবার চলে এল। তৃপ্তি করে চেটেপুটে সাফ করে দিলাম সব। বাইরে থেকে ধাবাটাকে ছোটোখাটো মনে হলেও ধাবার খাবারগুলো সত্যিই প্রশংসনীয়। যাকে বলে অতীব সুন্দরম। খাবারের টাকা পেমেন্ট করে দিয়ে গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে চললাম আবারও স্করপিওর দিকে। গন্তব্যে পৌঁছাতে যে এখনও ঢের দেরি। দুগ্গা, দুগ্গা বলে আবারও স্করপিওতে উঠে পড়লাম। তারপরে গাড়ি তার ছন্দে চলতে শুরু করল। নাহ্, এবার আর ব্রেক নয়, সোজা গন্তব্যে মানে দেওঘরের শিমুলতলাতে।
হঠাৎ ড্রাইভার-সাহেব বলে উঠলেন, “বলছিলাম কী, আগে ধারালা জলপ্রপাতটা দেখবেন? আসলে এদিক থেকে যেতে ওটাই আগে পড়বে। তারপরে শিমুলতলা রাজবাড়ি, লাট্টু পাহাড় এইসব।”
আমি কিছু বলার পূর্বে আবারও ছোটোনাম বলল, “হ্যাঁ হ্যাঁ, আগে ধারালা ফলসটাই দেখব। তারপর শিমুলতলা রাজবাড়ি।”
ছোটোনাম যখন রাজি হল তখন আমি আর কী বলব বলুন? ছোটোনামই তো এই অ্যাডভেঞ্চারের উদ্যোক্তা। আমি তো নিমিত্তমাত্র। এইসব টুকটাক আলোচনা হতে লাগল চলার পথে।
॥ ৪॥
দেখতে দেখতে আমরা ঝাড়খণ্ড রাজ্যের সন্নিকটে পৌঁছে গিয়েছি। আর দেড়-দুই ঘণ্টার অপেক্ষা শিমুলতলা পৌঁছাতে। এখন আকাশে সূর্যের বেশ প্রখর তাপ। দেওঘরের এইদিকটায় এখন যে বেশ গরম সেটা বুঝতে পারলাম। তো যাই হোক, ছোটোনাম বলল, “আচ্ছা, রাতে যে আমরা রাজবাড়ির প্রান্তরে তাঁবু খাটিয়ে থাকব, তার জন্য গাড়িতে কী কী আছে বল তো?”
আমি বললাম, “ওই তো আমি যতদূর জানি আমাদের দু-জোড়া গামবুট, একটা ফোল্ডিং টেন্ট, হাই পাওয়ারের ইমারজেন্সি লাইট, এইসব আর কী!”
ছোটোনাম বলল, “হ্যাঁ, তবে এই অ্যাডভেঞ্চারে কিন্তু বেশ রিস্ক আছে।”
আমি বললাম, “হ্যাঁ, তা একশো শতাংশ সঠিক।”
হঠাৎ দেখলাম ড্রাইভারবাবু পেট্রোল পাম্পের দিকে স্করপিওটাকে নিয়ে গেলেন। ড্রাইভারবাবু গাড়ি থেকে নামলেন। এই সুযোগে আমরাও গাড়ি থেকে নামলাম। তারপরে চারপাশটাকে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করতে শুরু করলাম। বুঝলাম, অলরেডি দেওঘরে পৌঁছে গিয়েছি। হয়তো আর কিছুক্ষণের মধ্যেই গন্তব্যে পৌঁছে যাব। গাড়িতে পেট্রোল ভরতি করা হলে উঠে পড়লাম আবারও গাড়িতে। এবারে সোজা ধারালা ফলস। অনেকক্ষণ জার্নি করার পর শরীরটা যে বেশ ক্লান্ত লাগছে সেটা অনুভব করলাম। এবারে গাড়িটা বেশ জোরে ছুটছে। দেওঘরের রাস্তা সত্যিই বেশ মসৃণ। পুরো পিচের রাস্তা। দু-পাশে গাছগাছালি দিয়ে ঘেরা। মাঝখান দিয়ে রাস্তা চিরে চলে গিয়েছে। এই রাস্তাটা বেশ ফাঁকা ফাঁকা। শুধু তাই নয়, বিঘা বিঘা জমি চারদিকে। আমি শুধু মন্ত্রমুগ্ধের মতন স্করপিওর জানালা দিয়ে বাইরের দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে রইলাম। ড্রাইভারবাবু বললেন, “ওই যে দেখতে পাচ্ছেন ধারালা জলপ্রপাত।”
ছোটোনাম বলল, “হ্যাঁ, তাই তো।”
ড্রাইভারবাবু স্করপিওটাকে রাস্তার এক প্রান্তে রাখলেন। আমরা গাড়ি থেকে নামলাম। ধারালা জলপ্রপাতটা কিন্তু বেশ নীচুতে। তাই সিঁড়ির ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছে। সিঁড়িটা বেশ লম্বা আর খাড়া। আস্তে আস্তে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেলাম এবং আমাদের সামনে দৃশ্যমান হল সেই বিখ্যাত ধারালা জলপ্রপাত। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হল, জলপ্রপাতের কাছে গিয়ে পিছনের ভিউটা দেখতে সত্যিই ভীষণ ভালো লাগছে। মনে হচ্ছে কোনও রূপকথার রাজ্যে প্রবেশ করেছি। অনেক সেলফি তুললাম ছোটোনাম আর আমি। সূর্যের প্রখর আলোয় ছবিগুলো কিন্তু বেশ ভালো আসছিল। তবে জলপ্রপাতের জলটা যে খুব উঁচু স্থান থেকে পড়ছে, তা কিন্তু নয়। তবে খুব বেশিক্ষণ জলের শব্দ শুনলে হয়তো চোখে ঘুম চলে আসতে পারে। এতটাই মনোরম স্থান এটি। আর প্রাকৃতিক শোভাও কিন্তু অনন্য।
ছোটোনাম বলল, “তুই ভাব, এখনই এত ফাঁকা জায়গা এই ধারলা ফলস। তাহলে হাজার বছর আগে কেমন ছিল এই জায়গা।”
এটা কিন্তু সত্যিই লাখ টাকার প্রশ্ন। এখনই যদি এত মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশ হয় তাহলে হাজার বছর পূর্বে কেমন ছিল এই স্থান? আমি বললাম, “কে জানে? হয়তো আরও আরও ঘন বন-জঙ্গল ছিল।”
আরও বেশ কিছুক্ষণ এখানে মনোরম প্রাকৃতিক শোভা উপভোগ করলাম। খুব সুন্দর একটা মিষ্টি বাতাস বইছিল। যেটা শরীরে চামড়ার ভিতর প্রবেশ করতে সারা শরীর ও মন জুড়িয়ে এল। যাই হোক, এবার আস্তে আস্তে সিঁড়ি ভেঙে উঠে পড়লাম। পরবর্তী আসল গন্তব্যে যাওয়ার জন্য। তারপরে গাড়িতে উঠে পড়লাম। আর কিছুক্ষণ পরেই ঐতিহাসিক শিমুলতলা রাজবাড়ি ও লাট্টু পাহাড়। শুধু সময়ের অপেক্ষা। দেখতে দেখতে আরও কিছুক্ষণ সময় কেটে গেল। ছোটোনাম চিৎকার করতে লাগল—“ওই তো সেই ঐতিহাসিক শিমুলতলা রাজবাড়ি! আর ওই তো লাট্টু পাহাড়!”
আমি বললাম, “হ্যাঁ হ্যাঁ, তাই তো। ওই তো লাট্টু পাহাড় আর শিমুলতলা রাজবাড়ি।”
রাজবাড়ি থেকে বেশ কিছুটা দূরেই গাড়িটাকে পার্ক করলেন ড্রাইভারবাবু। আমি আর ছোটোনাম তাড়াতাড়ি করে গাড়ি থেকে নেমে পড়লাম। তারপরে একপ্রকার দৌড়াতে দৌড়াতে চলে গেলাম সেই বহুপ্রতীক্ষিত শিমুলতলা রাজবাড়ির দিকে। এর আগে বেশ অনেক বছর পূর্বে এসেছিলাম এখানে। সেই আবছা স্মৃতি আস্তে আস্তে ভেসে উঠল চোখের মণিকোঠায়। আসলে শিমুলতলা রাজবাড়ি অর্ধেকেরও বেশি অংশ ধ্বসে পড়ে গেছে। এখন যেটা চোখের সামনে ধরা দিচ্ছে সেটা আসলে শিমুলতলা রাজবাড়ির ধ্বংসস্তূপ। প্রায় ১০০০ বছরের পুরোনো এই রাজবাড়িটা কত না স্মৃতি বহন করে নিয়ে চলেছে। হয়তো এই দণ্ডায়মান রাজবাড়িটির সঙ্গে কত কিছু ঘটে গিয়েছে অতীতে যেগুলো আমার কাছে ভাবনাতীত ও কল্পনাতীত। এখানে এসে সত্যিই মনে হয় ঝাড়খণ্ডের এক অপরূপ সৌন্দর্যের অধিকারী এই স্থান। যেটা হয়তো আমরা সাধারণত রূপকথার গল্পে পড়ে থাকি। পুরো দূষণমুক্ত জায়গা। জনবসতির যে কোনও চিহ্ন নেই, সেটা স্পষ্ট। স্মৃতির পাতায় বয়ে চলা এই রাজবাড়িটিকে যে আবার দেখতে পারব এটাও আমরা কাছে বেশ রোমাঞ্চকর বিষয়। সত্যিই আমিই ভাগ্যবান। আর সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হল, আমি আর ছোটোনাম ছাড়া একটাও টুরিস্টও নেই এখন।
এখন দুপুরবেলা। সূর্য এখন মধ্যগগনে। রাজবাড়ির যে সিঁড়িগুলো রয়েছে, সেই সিঁড়িগুলোর মধ্যে একটা সিঁড়িতে বসলাম। ছোটোনামকে বললাম, “ছোটোনাম শোন, আমাকে কয়েকটা ছবি তুলে দে তো। এখন ছবি তুললে পারফেক্ট আসবে। আর অপরাহ্নের পরে ছবি তুললে সেটা ঠিক মানানসই হবে না।”
ছোটোনাম গুটি গুটি পায়ে আমার কাছ থেকে এসে আমার মোবাইলটা নিয়ে গেল আমার ছবি তুলে দেবে বলে। তারপরে বেশ কিছু ছবি তুলে দিল আমার। আমিও নানারকম অ্যাঙ্গেলে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলাম। এইভাবে এখানে বেশ কিছুক্ষণ সময় কেটে গেল। ছোটোনাম বলল, “চ’ লাট্টু পাহাড়ে। এরপর তো সন্ধ্যা হয়ে যাবে। তখন তো আর পাহাড়ে ওঠা যাবে না।”
আমিও ওর কথায় সায় দিলাম। তারপরে লাট্টু পাহাড়ের দিকে এগোলাম। এই শিমুলতলা রাজবাড়ির একদম পিছনেই লাট্টু পাহাড়। তবে এটা ঠিক, এই পাহাড়টা কিন্তু বেশ ঘন জঙ্গলে ঘেরা। আর নানারকমের যে পাহাড়ি সাপ রয়েছে এটা একদম নিশ্চিত। যদি একবার কামড়ায় তাহলে একদম স্পট ডেথ। কোনও ডাক্তার বাঁচাতে পারবে না। তাই আমরা গামবুট পরে নিলাম। অন্তত হাঁটু থেকে পা পর্যন্ত তো রক্ষা। এখানেও বেশ অনেকগুলো সিঁড়ি রয়েছে। এই পাহাড়ি সিঁড়ি ভেঙে তবে পাহাড়ের চূড়ায় ওঠা যাবে। আস্তে আস্তে সিঁড়ি ভেঙে উঠলাম। খানিকটা পাহাড়ে উঠে পিছনের দিকে তাকালাম। ওহ্! অসম্ভব সুন্দর ভিউ। অনেকটা সেই উড়োজাহাজে চেপে নীচের দিকে তাকালে যেমন দেখতে লাগে ঠিক তেমনই দেখতে লাগছে। দেখতে দেখতে উঠে পড়লাম লাট্টু পাহাড়ের একদম ঠিক চূড়ায়। পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে এই গোটা শিমুলতলাটাকে দেখা যাচ্ছে। ওপর থেকে নীচের সমস্ত কিছু ক্ষুদ্র লাগছে। অসম্ভব সুন্দর ভিউ। এমনিতে পাহাড়ের ওপরে বিশেষ কিছু নেই। একটা হনুমান মন্দির রয়েছে। হনুমান মন্দিরে কোনও মূর্তি নেই। ছবি টাঙানো আছে। স্বল্প কিছু দক্ষিণা দিয়ে প্রণাম করে পাহাড় থেকে নীচে নামতে শুরু করলাম। উপরে উঠতে যতটা না কষ্ট হচ্ছিল, কিন্তু নীচে নামতে ঠিক ততটাই ভালো লাগছিল। হনহন করে যেন পা-টা তিরের বেগে চলে যাচ্ছিল।
নীচে নেমে আবারও চলে গেলাম রাজবাড়ির দিকে। ছোটোনাম বলল, “এই যে হনুমান মন্দিরটা দেখছিস না, এটা কিন্তু এখানকার সমস্ত নেগেটিভিটিকে কাটানোর জন্য করা হয়েছে। আসলে ইতিহাসের পাতায় এই হনুমান মন্দিরের কথা উল্লেখ নেই। এটা বেশ কিছু বছর আগে তৈরি করা হয়েছে।”
আমি বললাম, “ওই ভূতপ্রেতকে তাড়ানোর জন্যই করেছে আর কি!”
এখন বিকালবেলা মানে অপরাহ্ন আর কি! এখানে বিকালবেলায় একটা মৃদু বাতাস বইছে। সেটা অনুভব করলাম। এত দূর জার্নি করার যে কষ্ট, সেটা নিমেষেই যেন কেটে গেল। পরম মমতায় এই মৃদু বাতাসকে নিজের আত্মীয় মনে করে গ্রহণ করে নিলাম। অপূর্ব সুন্দর এখানকার এই বিকালবেলা। তবে বিকালবেলাটা এখানে খুব বেশিক্ষণ স্থায়ী নয়। বিকালবেলাটা চট করে চলে গেল। তবে এখানে সূর্যাস্তের দৃশ্যটাও কিন্তু ভারি মধুর লাগছিল। মনে হচ্ছিল কোনও নিভে যাওয়া লাল আগুনের গোলা আমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। আস্তে আস্তে সূর্য ডুবে গেল। আমরাও আমাদের তাঁবু সূর্যের আলো থাকতে থাকতে খাটিয়ে নিলাম। তবে বৃষ্টির দিন হলে কিন্তু অন্যরকম হয়ে যেত। এই জরাজীর্ণ প্রসাদকে সাক্ষী রেখে আপাতত কিছুক্ষণের জন্য তাঁবুতে প্রবেশ করলাম।
॥ ৫॥
ইলেকট্রিক কেটলিটা সঙ্গে করেই নিয়ে এসেছিল ছোটোনাম। পাওয়ার ব্যাংকের সঙ্গে কানেক্ট করে দিল ছোটোনাম। তারপরে বেশ কিছুক্ষণের মধ্যে হাজির হয়ে গেল গরম গরম চা। আস্তে করে একটু চুমুক দিলাম চায়ে। এক স্বর্গীয় তৃপ্তি অনুভূত হল। শরীর ও মন সতেজ হয়ে গেল। চায়ের গ্লাসটা নিয়ে বাইরে বেরিয়েছি, দেখলাম বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার। আমাদের ইমার্জেন্সিতে যেটুকু আলো জ্বলছে, সেইটুকুই। আসলে এইসব জায়গায় তো আর ইলেকট্রিসিটি নেই। মনে হচ্ছে কোনও ম্যান-হোলের মধ্যে প্রবেশ করেছি। পুরো মিশমিশে কালো চারপাশটা। শিমুলতলা রাজবাড়ি এবং তার আশেপাশের এই অন্ধকার দেখে গায়ে রীতিমতো শিহরন খেলে গেল। আজকে আবার মনে হয় অমাবস্যা। চাঁদের একটু মায়াবী আলো চোখে পড়ছে না। এখন মনে হচ্ছে হয়তো কোনও হিংস্র জন্তু আমাদের ওপর ক্রমাগত নজর রেখে চলেছে। সুযোগ বুঝে কখনও ঝাঁপিয়ে পড়বে আমাদের ওপর। আর বেশ জোরেই ঝিঁঝিঁপোকার ডাক শুনতে পাওয়া যাচ্ছে। রাজবাড়ির দিকে তাকালে কিন্তু বেশ ভয় লাগছে। মনে হচ্ছে একটা কালো ধ্বংসস্তূপ পড়ে রয়েছে। তাকালে রীতিমতো ভয় লাগছে। আমি ঢোঁক গিলে ছোটোনামকে বললাম, “ভাই, অনেক তো হল, এবার বাড়ি চলে গেলে তো হয়। বেশ ভয় ভয় লাগছে।”
ছোটোনাম তাচ্ছিল্যের সুরে হেসে বলল, “তুই সত্যিই খুব ভিতু প্রকৃতির ছেলে ভাই। সবে তো এখন কলির সন্ধ্যা।”
আমি ভয়ের সুরে বললাম, “না ছোটোনাম, আমি বাড়ি যাব। আমার ভয় করছে খুব।”
ছোটোনাম বলল, “এই দেখ, বাচ্চা ছেলে একবারে। আরে বাবা, তুই এখন কোথায় যাবি?”
আমি ভয়ার্ত গলায় বললাম, “ড্রাইভারকে ফোন কর। আমার আর ভালো লাগছে না এখানে এক মুহূর্ত থাকতে।”
ছোটোনাম বেশ হেসে বলল, “তুই সত্যিই একবারে পাগল হয়ে গিয়েছিস। আমি সাপোজ গাড়ির ড্রাইভারকে ফোন করলাম। উনি আসবেন এখানে রাতে? যেখানে দেখছিস একটা মানুষ তো দূর কুকুর-বিড়াল পর্যন্ত নেই, সেখানে উনি আসবেন? তোর যদি নেহাত ভয় লাগে তাহলে এক কাজ কর, একটা চাদর চাপা দিয়ে শুয়ে পড়। আর রামনাম জপ কর।”
এই দেওঘরে সকালে তীব্র গরম ছিল। আর এখন বেশ ঠান্ডা। সত্যিই প্রকৃতির কী ভিন্ন খেয়াল, তাই না? আমি আর কথা বাড়ালাম না। ছোটোনামের কথা মতন রামনাম জপ করতে করতে শুয়ে পড়লাম। খানিকক্ষণ এ-পাশ ও-পাশ করতে করতে ঘুমে চোখ ভারী হয়ে এল। চোখ বুজে গেল। ঘুমিয়ে পড়লাম।
॥ ৬॥
কয়েক ঘণ্টা পর হঠাৎ চোখটা খুললাম। ঘুম চোখে উঠে দেখি আমি শিমুলতলা রাজবাড়ির একদম ছাদে। বিস্ময়ে আমার ঠোঁট দুটো আপনা-আপনি ফাঁক হয়ে গেল। ছাদের ধারে আসতে দেখি, ছোটোনাম চিৎকার করে বলছে, “পিছনে তাকা।”
আমি পিছনে তাকাতেই রীতিমতো গায়ে শিহরন খেলে গেল। একদল নরকঙ্কাল আমার দিকে ধেয়ে আসছে। তারপরে আমি কিছু বোঝার আগেই শিমুলতলা রাজবাড়ির ছাদ থেকে ঠেলে ফেলে দিল আমাকে। আমি অভিকর্ষের টানে দ্রুত মাটিতে পড়ে গেলাম। এবড়ো-খেবড়ো পথে পড়ার কারণে সারা শরীরটা আমার রক্তারক্তি হয়ে গেল। আমার মাথায় ভীষণ চোট লাগল। সেটা আমি অনুভব করলাম। কিন্তু আমার একটুকরো শক্তি নেই ওঠার। আমি জ্ঞান হারালাম।
॥ ৭॥
পরের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি আমি তাঁবুতেই একইভাবে শুয়ে রয়েছি। ছোটোনাম বলল, “চল, সকাল হয়ে এল, সুজ্জিমামা আস্তে আস্তে মাথার ওপর উঠছে।”
আমি ধড়মড় করে উঠলাম। তারপরে ছোটোনামকে সমস্ত ঘটনাটা খুলে বললাম। ছোটোনাম শুনে রীতিমতো থ মেরে গেল। তারপরে ছোটোনাম বলল, “না না, তুই তো তাঁবুতেই শুয়েছিলিস। তবে হ্যাঁ মাঝরাতের দিকে তুই কীসব ভুলভাল বকছিলি ঘুমের ঘোরে। সম্ভবত তুই স্বপ্ন দেখছিলি এবং স্বপ্নটা ছিল ভয়ের। আমি বুঝতে পেরেছি।”
আমি বললাম, “তুই জানলি কী করে যে আমি স্বপ্ন দেখছিলাম?”
ছোটোনাম বেশ বিজ্ঞের মতন করে বলল, “আসলে আমরা যখন স্বপ্ন দেখি তখন আমাদের আই বল মানে চোখের ভিতর যে ডিমের মতন অংশটা থাকে ওটা ক্রমাগত ঘুরতে থাকে।”
আমি এর প্রত্যুত্তরে কিছু বললাম না। আমি ফ্রেশ হয়ে নিলাম দ্রুত। স্করপিও চলে এসেছে। এবারে বাড়ি ফেরার পালা। এই শিমুলতলা রাজবাড়ি আমাকে দিয়ে গেল অনেক অভিজ্ঞতা। যেগুলো থেকে যাবে সারাজীবন। তারপরে শিমুলতলা রাজবাড়িকে শেষবারের মতন স্বচক্ষে দেখে নিলাম। কী ভয়ংকর রে বাবা! জানি না আবার কবে আসব। তাড়াতাড়ি করে গাড়িতে উঠে পড়লাম। আবার লম্বা গন্তব্য। যাই হোক, স্করপিও চলতে শুরু করল। কিছুক্ষণের মধ্যে দূরে মিলিয়ে গেল ঐতিহাসিক শিমুলতলা রাজবাড়ি।
খুদে স্রষ্টাদের সমস্ত কাজের লাইব্রেরি
অসাধারণ লেখনী।