Toyঢাক- হানাবাড়ির গল্প- সমাদৃত দাস-বর্ষা২০২৪

বয়স:- ১৪। শ্রেণি:- অষ্টম। গোরাবাজার ঈশ্বর চন্দ্র ইনস্টিটিউশন (আই. সি. আই), মুর্শিদাবাদ

toydhaksonudas

আমার মামার বাড়ি শিমুরালিপুর। বেশ কয়েকবার আমি গিয়েছি সেখানে। কিন্তু এর আগে আমার মামাতো ভাই ছোটনাম, আমাকে কোনোদিনও একবারও মুখ ফুটে বলেনি যে ওখানে একটা পোড়ো বাড়ি আছে। বিষয়টা হয়েছে কী, আজকে টিভিতে আমি দেখলাম খবরের চ্যানেলে দেখাচ্ছে যে শিমুরালিতে ভূত দেখা গিয়েছে ওই ভাঙা পোড়ো বাড়িটাতে। মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। প্রথমবার আমার ওই পোড়ো বাড়ি দেখবার সৌভাগ্য হল। তাও অবশ্য ছবিতে মানে টিভিতে। আমি তৎক্ষণাৎ খবরটা দেখবার সঙ্গে সঙ্গে ছোটনামকে ফোন করলাম। রিং হল। ফোন ধরল ছোটনাম। আমি বললাম, “হ্যালো ছোটনাম, বলছি কী, তোদের শিমুরালিতে নাকি একটা পোড়ো বাড়ি রয়েছে? কই, তুই তো আগে আমাকে বলিসনি কখনও! আর তুইও তো নিজে অ্যাডভেঞ্চার পিপাসু মানুষ। এই সমস্ত বিষয়ে তোর জুড়ি মেলা ভার।”

প্রথমটা শুনে ছোটনামও যে বেশ অবাক হয়ে গেল সেটা বুঝতে পারলাম। ছোটনাম বলল, “হ্যাঁ, একটা পোড়ো বাড়ি রয়েছে বটে, কিন্তু সেখানে তো আজ অবধি কোনও ভূত-প্রেতের সন্ধান পাইনি। তাই তো তোকে আর কিছু বলা হয়নি কখনও।”

আমি বললাম, “ওহ্‌! আচ্ছা।”

ছোটনাম বলল, “তোকে আমি পরে ফোন করব। আমার একটা ফোন আসছে। এখন রাখ, কেমন?”

আমি এর প্রত্যুত্তরে কিছু বললাম না। ছোটনাম ফোন কেটে দিল।

একটা কথা পূর্বেই বলে রাখি। ছোটনাম আমার দীর্ঘদিনের বন্ধু। হতে পারে ও আমার মামাতো ভাই, কিন্তু পরিচয়টা মামাতো ভাই হিসেবে নয়, পুরো বন্ধুর মতনই ভালোবাসা, ভরসা। আসলে ছোটনামের সঙ্গে আমার যখন পরিচয় হল, তখন থেকেই ওর অদম্য সাহস আমার জীবনকে নতুন করে নতুনভাবে চলতে শিখিয়েছে। জীবনে চলার পথকে আরও মসৃণ করে তুলেছে।

যাই হোক, শিমুরালিপুর যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। নাহ্! আমি একা সিদ্ধান্ত নিইনি। আসলে ছোটনামের সঙ্গে আমার পরে কথা হয়েছিল। ও বলেছিল না যে পরে ফোন করবে? তারপরে ফোন করেছিল। আমিই ওকে কথায় কথায় বলেছিলাম যে আমরা একটা অভিযান চালাব ওই ভাঙা পোড়ো বাড়িটাতে। প্রথমটা শুনে ছোটনাম বলেছিল, “কী করবি ওখানে গিয়ে? প্রথমত, সে পোড়ো বাড়ি ঠিকই, কিন্তু এখনও পর্যন্ত তো কোনও ভূতের সন্ধান পাওয়া যায়নি। বেকার গিয়ে কী করব ওখানে?”

আমি উত্তরে বলেছিলাম, “ছোটনাম, বাংলায় একটা প্রবাদবাক্য আছে কিনা—‘পাইলেও পাইতে পারো অমূল্য রতন।’ দেখা গেল ভূত-প্রেত কিছু দেখতে পেলাম না, কিন্তু একটা অ্যাডভেঞ্চার তো হবে! তাই না? চলই না!”

শেষ পর্যন্ত আমার কথাতে রাজি হয়েছিল ছোটনাম।

***

আজ বোধ হয় সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। বহুদিন পর আমি চলেছি আমার ভালোবাসার সেই শিমুরালিপুর। হয়তো আত্মার টানে কিংবা মনের মিলনে চলেছি মামার বাড়ি। ছোটনাম এখন শিমুরালিপুরেই থাকে। ও একটা চাকরি করে। বিয়ে-থা এখনও করেনি। কতটুকুই-বা বয়স ওর? মামার বাড়িতেই রয়েছে।

এখান থেকে শিমুরালিপুরের দূরত্ব যে খুব বেশি তা কিন্তু নয়। এই পথটা ট্রেনে যাওয়া যায় না। গাড়িতে যাওয়াই অনেক বেশি সুবিধা। তাই তো পূর্বেই ঠিক করেছিলাম যে স্করপিও গাড়ি করেই গন্তব্যে যাব। তাই কথা মতন বেড়িয়ে পড়লাম গন্তব্য মানে শিমুরালিপুরের উদ্দেশ্যে।

একদম কাকভোরে ঘুম থেকে উঠেছি। অন্যান্য দিন তো ঘুম ভাঙে মনুষ্যসৃষ্ট ঘড়ির অ্যালার্মে। কিন্তু আজকের ঘুমটা ভাঙল প্রকৃতির এক অপরূপ সৃষ্টি ও সৌন্দর্যের অধিকারী কোকিলের ডাকে। মধুর কুহু কুহু ডাকে। ভোরবেলায় ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে নিলাম। স্নান করে নিলাম ভোর-ভোরই। তার কারণ কখন মামার বাড়ি পৌঁছাব, তারপরে কখন স্নান করব তার কোনও তো ঠিকঠিকানা নেই। তাই ভোরেই স্নান করলাম। স্করপিও কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার নিকটে উপস্থিত হবে, সেটা আমি পূর্বেই জানতাম। তবে খুব বেশিক্ষণ কিন্তু অপেক্ষা করতে হল না, স্করপিও আমার বাড়ির দরজার কাছে উপস্থিত হল। আমিও পোঁটলা-পুঁটলি বেঁধে দুগ্গা দুগ্গা বলে রওনা দিলাম শিমুরালিপুর মানে আমার মামাবাড়ির উদ্দেশ্যে।

এইবার তাহলে আমি আমার প্ল্যানটা বলি। আমি আর ছোটনাম এই দুজনে মিলে যে প্ল্যানটা করেছি সেটা হচ্ছে যে প্রথমে আমি শিমুরালিপুর যাব, আমার মামার বাড়িতে। ওখানে সারাদিন থাকব। তার সঙ্গে খাওয়াদাওয়া এবং গল্পগুজব তো পাল্লা দিয়ে চলবেই। আর রাতে ওই আটটা-সাড়ে আটটা নাগাদ বেড়িয়ে পড়ব ভাঙা পোড়ো বাড়িটার দিকে। এইরকমই তো প্ল্যান করে রেখেছি। তবে জানি না কতটা প্ল্যান সাকসেসফুল হবে—ওখানে গিয়ে আবার সমস্ত প্ল্যান ঘেঁটে ঘ হয়ে যাবে কি না।

মৃদুমন্দ বসন্তের হাওয়া গায়ে মেখে চলেছি শিমুরালিপুর। আমার বাড়ি থেকে শিমুরালিপুরের যেতে ওই ঘণ্টা চারেক লাগে। তবে ন্যাশনাল হাইওয়ে দিয়ে গেলে সময় লাগবে মোটামুটি ওই প্রায় ছয় ঘণ্টা। আসলে শিমুরালিপুর যাওয়ার দু-খানা রাস্তা রয়েছে। একটা শর্টকার্ট রাস্তা রয়েছে। ওই শর্টকার্ট রাস্তা দিয়েই ড্রাইভারবাবু আমাকে নিয়ে যান। আজ আমি যাচ্ছি একা একা। বেশ অন্যরকম কিছু যে হতে চলেছে সেটা ভালো মতন টের পাচ্ছি।

আমি বলছিলাম না, হয়তো আমার সঙ্গে আজ কিছু ঘটবে? হ্যাঁ, সত্যিই তাই। আজ রাস্তায় বড্ড জ্যাম। সার সার লরি দন্ডায়মান অবস্থায় পড়ে রয়েছে। তা ছাড়া রাস্তা প্রচুর বাইকে ভরতি। শুধু কি বাইক? আমার স্করপিওর মতন কত না কত স্করপিও দাঁড়িয়ে রয়েছে। অগুনতি যাকে বলে।

আজকে যে কী দশা হল কে জানে! প্রায় আধঘণ্টা হয়ে গেল জ্যামে আটকে রয়েছি। কিন্তু জ্যাম কিছুতেই যেন কাটছে না। বিরক্তিকর ও অপ্রীতিকর একটা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে এইখানে—জানি না শেষ পর্যন্ত কী হবে।

যাক বাবা বাঁচা গেল। জ্যামটা কাটল অবশেষে। স্বস্তির নিশ্বাস ফেললাম। প্রায় একঘণ্টা জ্যামে পড়ে গিয়েছিলাম। ভালো লাগে, বলো তো? আজ অনেকটাই দেরি হয়ে যাবে পৌঁছাতে পৌঁছাতে। কী আর করব? সবটাই ভাগ্যের পরিহাস। তবে এখন গাড়ি বেশ জোরে ছুটছে। রাস্তা কিন্তু একদম ক্লিয়ার হয়ে গিয়েছে। দেখা যাক কখন পৌঁছাতে পারি।

এত বড়ো একটা লম্বা জার্নিতে চাকে সঙ্গী করতেই পারিনি এখনও। এক কাপ চা পান করা হয়নি। আসলে আমি চা পান করতে খুব খুব ভালোবাসি। কিন্তু এত সকালে আজ বেরিয়ে পড়েছি, যে চা পান করার কোনও অবকাশ পাইনি। আসলে অত ভোরে চা পান করলে গা খুব গোলায়। বমি বমি ভাব হয় আমার। সে এক বড়ো যন্ত্রণাদায়ক ব্যাপার-স্যাপার। তাই অত ভোরে কোনোদিন উঠলেও সচরাচর চা পান করি না। যাই হোক, গাড়ি তার নিজের ছন্দে ও গতিতে চলেছে। আমি শুধু ড্রাইভারবাবুকে বললাম, “দাদা, একটা ভালো চায়ের দোকানের সামনে গাড়িটাকে দাঁড় করাবেন। সকাল থেকে এক কাপ চা খাওয়া হয়নি।”

এর প্রত্যুত্তরে ড্রাইভারবাবু কিছুই বললেন না। শুধু ঘাড় শুধুমাত্র ঘাড় নেড়ে জবাব দিলেন। গাড়ি তাঁর আমাকে বহন করে নিয়ে চলল গন্তব্যে।

দেখতে দেখতে বেশ কিছুদূর পথ অতিক্রম করলাম। ড্রাইভারবাবু বুঝেশুনে একটা ভালো চায়ের দোকানের সামনে পার্ক করালেন গাড়িটাকে। আমি গাড়ি থেকে নেমে পড়লাম। ড্রাইভারবাবুকেও বললাম একটু চা খেয়ে নিতে।

চায়ের দোকানটা বেশ গুমটি টাইপের। টিনের চালে ঘেরা। একটা শেড করা আছে। তবে প্রচুর ভিড়। দোকানের নাম ‘বিশুর স্পেশাল চা’। নামটা ভারি সুন্দর। দেখলাম বিশু আর ওর স্ত্রী মিলে চায়ের দোকানটাকে সামলাচ্ছে। হ্যাঁ, মিলেমিশে কাজ করাটাই দরকার। আমি চায়ের দোকানের বেঞ্চে বসলাম। ড্রাইভারবাবু আমার আর ওঁর দু-কাপ চা অর্ডার করলেন।

সুজ্জিমামা আস্তে আস্তে মাথার ওপর চড়াও হচ্ছে। সেটা অনুভব করলাম। আসলে বেলা বাড়ছে। তাই সূর্যের তাপও বেশ প্রখর হচ্ছে। দোকানদার ছেলেটি দোকান থেকে বেরিয়ে আমাদের দুজনকে দু-কাপ চা দিল। ছেলেটির পরনে সাদা টি-শার্ট আর একটা ঘিয়ে ঘিয়ে রঙের হাফ প্যান্ট। গায়ের রঙ বেশ চাপা। যাই হোক, সকাল সকাল এক কাপ ধোঁয়া-ওঠা গরম চা পান না করলে আমার কাছে সারাদিনটাই মাটি হয়ে যায়। আসলে কী জানো তো, শরীরকে তরতাজা রাখবার মূলমন্ত্র হল এক কাপ ধোঁয়া-ওঠা গরম চা। সঙ্গে স্ন্যাকস বা বিস্কুট হলে তো জমে দই! চায়ে বেশ জোরে একটা চুমুক দিলাম। প্রাণটা জুড়িয়ে এল। তবে দুঃখের বিষয় এই যে একটু পান করতে না করতেই চা ফুরিয়ে এল। ওইটুকু চা কতক্ষণ চলে? বাড়িতে হলে আরও সকালে বারান্দায় বসে বসে খবরের কাগজ পড়তাম আর চায়ে চুমুক দিতাম। আপাতত চায়ের বিলখান মিটিয়ে দিয়ে উঠে পড়লাম আবারও গাড়িতে। গন্তব্যের উদ্দেশ্যে।

গাড়িতে উঠে বসতে না বসতেই গাড়িটা স্টার্ট দিল। এখন আর ন্যাশনাল হাইওয়ের ওপর দিয়ে যেতে হবে না। এবার বাইপাস ধরেই শিমুরালিপুর যাব। আর মাত্র ঘণ্টা খানেক। তারপর শিমুরালিপুর থেকে ছোটনামের বাড়িটুকু যেতে যতক্ষণ।

এখন যে-রাস্তাটার ওপর দিয়ে চলেছি, সেটা কিন্তু একদম ফাঁকা। রাস্তাটার দু-পাশে ঘন বন। আবাগান। প্রচুর আমগাছ। এখন বসন্তকাল। গাছে মুকুল ধরেছে। বসন্তের বহিঃপ্রকাশ আমি চারধারে লক্ষ করছি। বেশ লাগছে কিন্তু দেখতে এই দৃশ্যটা। আসলে কী বলো তো, গাড়ির সামনের আসন থেকে মানে ড্রাইভারের পাশের সিট থেকে বসে সামনের দৃশ্যগুলো দেখবার একটা আলাদা অনুভূতি রয়েছে। সেই অনুভূতি কিংবা আনন্দটা সবাইকে বোঝানো সম্ভব নয়। এ-আনন্দের কোনও সীমা থাকে না। যাই হোক, স্করপিও এগোতে থাকল।

দেখতে দেখতে প্রবেশ করলাম শিমুরালিপুরে। আর কিছুক্ষণের প্রতীক্ষা। তারপরেই পৌঁছাব। এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা। আর হ্যাঁ, ব্রেক দিইনি কিন্তু আর এই জার্নিতে। ড্রাইভারবাবু টানা গাড়ি চালিয়ে চলেছেন।

অবশেষে পৌঁছালাম মামার বাড়িতে। ছোটনাম হচ্ছে আমার মামার ছেলে মানে মামাতো ভাই, সেটা আমি পূর্বেই বলেছি। আমি প্রথমে এক চক্কর বাড়িটাকে লক্ষ করলাম। বহুদিন আমি আসিনি এখানে। নাহ্! বহুদিন বলছি কেন? বহুবছর হল আমি আসিনি। এই বছরগুলোতে বাড়িটার অনেকটাই পরিবর্তন ঘটেছে। বাড়ির সামনে অনেকগুলো নারকেলগাছ ছিল। কিন্তু সেগুলো এখন আর নেই। তা ছাড়া আমি যখন কয়েক বছর পূর্বে মামার বাড়িতে এসেছিলাম তখন বাড়িটাতে এত পরিবর্তন আসেনি। এখন ভিতরের বিল্ডিং প্রচুর বাড়িয়েছেন মামা। যাই হোক, বড়ো গেটের কাছে একটা কলিং বেল ছিল, কলিং বেলে চাপ দিলাম। ও-প্রান্ত থেকে একটা কণ্ঠস্বর ভেসে এল—“যাই-ই…”

কিছুক্ষণ পর এক ব্যক্তি দরজা খুলে দিল। যে-সে ব্যক্তি নয়, আমার মামাতো ভাই ছোটনাম। দুজন দুজনকে দেখে প্রথমে চমকে গেলাম। ছোটনামের মনে খুশির জোয়ার বইতে লাগল। আমরা একে অপরকে আলিঙ্গন করলাম। মনে পুলক লেগে গেল। ছোটনাম আমাকে নিয়ে ভেতরে গেল।

মামার বাড়িটা সত্যিই একটা বিশাল বাংলোবাড়ি। একতলার ওপরে একটা ঝাড়বাতি টাঙানো রয়েছে। সত্যিই টিপটপ, একদম নিট অ্যান্ড ক্লিন মানে ঝকঝকে এবং তকতকে বাড়ি। সিঁড়ি দিয়ে আস্তে আস্তে দোতলায় উঠলাম। সিঁড়িটা কাঠের। ওইজন্য খটখট শব্দ হচ্ছিল। উঠেই মামাকে দেখলাম একটা আরামকেদারায় ঠেস দিয়ে আরাম করে বসে রয়েছেন এবং হাতে একটা খবরের কাগজ নিয়ে অবশ্য। আমি উঠতেই তিনি একগাল হেসে উঠে বললেন, “আরে কী ব্যাপার, এতদিন পর? কেমন আছিস? সব কুশল-মঙ্গলে তো?”

আমি বললাম, “এই তোমার কথা আর মামিমার কথা বড্ড মনে পড়ছিল। তাই চলে এলুম। আর হ্যাঁ, আমি বেশ ভালোই আছি। সব কুশল-মঙ্গলেই আপাতত।”

মামা বললেন, “বাজে বকিসনে। এদ্দিন পর এলি। তা কিছু খাওয়াদাওয়া হয়েছে?”

আমি বললাম, “রাস্তায় খুব বেশি কিছু খাইনি। ওই দু-কাপ চা খেয়েছি।”

মামা বললেন, “বলিস কী রে? শুধু দু-কাপ চা খেয়েছিস! আর কিছু খাসইনি?”

আমি বললাম, “না, সকালে অত কিছু খাইনি।”

মামা বললেন, “বুঝেচি বুঝেচি, বোস বোস, তোর মামিমা লুচি আর আলুর দম করেছে। খেয়ে নে।”

আমি মুচকি হাসলাম।

পেটপুরে খাওয়াদাওয়া হল। দেখতে দেখতে দুপুর গড়িয়ে বিকাল হয়ে গেল। পোড়ো বাড়িতে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিলাম।

দেখতে দেখতে রাত্রি হয়ে গেল। বেড়িয়ে পড়লাম হানাবাড়ির উদ্দেশ্যে। আমি যে স্করপিওটা করে এসেছি শিমুরালিপুরে, ওটাতে করেই এগিয়ে চললাম হানাবাড়ির দিকে।

দু-পাশে ঘন জঙ্গল। মধ্যিখান দিয়ে পিচের রাস্তা। এ-কথা বলতে আমি বাধ্য যে দেওঘরের রাস্তাঘাট সত্যিই অনন্য, অনবদ্য ও অতুলনীয়। এগিয়ে চললাম ক্রমশ।

দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম হানাবাড়িটার কাছে। হানাবাড়িটার নামেই হানাবাড়ি। সাধারণত আমরা গল্প-কবিতায় যে-ধরনের হানাবাড়ির বর্ণনা দেখি, সেই ধরনের হানাবাড়ি এটা নয়। একটা একতলা বাড়ি সমান হানাবাড়ি। দেওয়ালের ইট ভেঙে পড়েছে। মনে হচ্ছে বাড়িটা জীবন্ত। যেন আমাদের দিকে মাথা নুইয়ে রেখেছে। অন্ধকারাছন্ন পরিবেশ চারদিকে। একটা টর্চ হাতে নিয়ে চললাম।

এখন বেশ রাত্রি। একটা অচেনা ভয় আমার মনকে গ্রাস করে রেখেছে। মনে হচ্ছে কেউ বুঝি আমায় ধরে ফেলল।

‘সময় বহিয়া যায় নদীর স্রোতের প্রায়।’ কীভাবে যেন সময় কেটে যাচ্ছে। কোনও অ্যাডভেঞ্চারও নেই। এদিকে সমানে হাই তুলে চলেছি আমি। ঘুম পাচ্ছে। সকাল থেকে কতটাই না পরিশ্রম গেল, উফ্‌!

এখন ঘড়ির কাঁটায় রাত একটা ছুঁই ছুঁই। আমি যেখানে রয়েছি, তার চারপাশটা ছিমছাম অন্ধকার। কেমনই একটা হয়ে রয়েছে। হঠাৎই একটা শব্দে গা-টা ঝাড়া দিয়ে উঠল। চমকিত হলাম। একটা অচেনা ভয় তাড়া করল আমার মনে। এদিকে ছোটনাম ব্যাটাকেও দেখতে পাচ্ছি না। কী হল আবার ছোটনামের? হঠাৎই একটা ভৌতিক হাসির শব্দে ভয়ে হাঁটু দুটো ঠকঠক করে উঠল। আমি ভয়ে দৌড়াতে শুরু করলাম। ঘুটঘুটে অন্ধকার চারপাশটা। পিছনে সবটাই অন্ধকার। দৌড়াতে-দৌড়াতেই একবার পিছনে ঘাড় ঘোরালাম। কাউকে দেখতে পাচ্ছি না। তবে একটা ভয় আমায় ক্রমশ ভিতু করে তুলেছে। পিছনে একটা অন্ধকারময় চাদর। আমি প্রাণভয়ে ছুটতে শুরু করলাম। এদিকে ছোটনাম যে কোথায় কে জানে। আমি দৌড়াতে দৌড়াতে কোন অন্ধকারের পৃথিবীতে প্রবেশ করলাম। অনেক কষ্টে আমি এন.এইচ রোডে উঠেছিলাম। আর ছোটনাম? তার খবর পেয়েছিলাম তিনদিন পর। জ্ঞান হারিয়ে পড়ে ছিল হানাবাড়ির সামনে অর্ধ-মৃত অবস্থায়। কী হয়েছিল ছোটনামের? সেটা শুধুমাত্র ঈশ্বরই জানেন। কারণ, ছোটনামও কিছুই ঠিক করে বলে উঠতে পারেনি। সেইদিনের ঘটনা আর ওই কথা জিজ্ঞাসা করলেই ওর বিস্ফারিত চোখ বারংবার আমার দিকেই চেয়ে আসে।

 

খুদে স্রষ্টাদের সমস্ত কাজের লাইব্রেরি

 

Leave a Reply