লেখকের আগের উপন্যাস–তিন পলাতক

মর্নিং-ওয়াক সেরে রমিত একটি চায়ের দোকানে গিয়ে বসল। শীতের সকাল, ঠান্ডা কনকনে হাওয়া দিচ্ছে, দোকানের ঝাঁপ সবে খুলেছে। উনুনের ধোঁয়া উড়ছে; এক রোগা শ্যামলা ছেলে হাতপাখা দিয়ে বাতাস করছে উনুনে। ছেলেটি গান গাইছে আপনমনে, ‘তুমি নির্মল করো মঙ্গল করে মলিন মর্ম মুছায়ে।’
রমিত গালে হাত রেখে শুনছিল। বাহ্, ছেলেটি তো বেশ গাইছে! গলা পরিষ্কার না হলেও উচ্চারণ নিখুঁত। ছেলেটির গায়ে নোংরা জামা, জামার ওপরে হাফ-সোয়েটার, সেটা বেশ কয়েক জায়গায় ছেঁড়া।
“কী হচ্ছে রে? ওটা বাতাস করা হচ্ছে? সকাল থেকেই ফাঁকি!” দোকানের মালিক সপাটে চড় মারল ছেলেটির গালে।
রমিত চমকে উঠল। বড্ড জোরে মেরেছে, শব্দটা কানে ঠক করে লাগল।
ছেলেটির চোখের জল মুছে গান থামিয়ে দিল। জোরে জোরে হাতপাখা নাড়তে শুরু করল।
রমিত থাকতে না পেরে বলল, “এই যে দাদা, চড় মারলেন কেন ওকে?”
“কাজ করছিল না। তাই মেরেছি।”
“মারবেন কেন? মারার অধিকার আপনাকে কে দিয়েছে?” রমিত জোরগলায় বলল।
“আমার দোকানে রেখেছি। মাইনে দিই। বেশ করেছি, মেরেছি। আপনি বলার কে?”
দোকানদারের মেজাজি কথায় রমিত রেগে গেল, “ভালোভাবে বলা যেত না? আমি বলার কে মানে? জানেন যে বাচ্চাদের এভাবে খাটানো বেআইনি? শিশুশ্রম অপরাধ?”
দোকানদার মাছি তাড়ানোর ভঙ্গিতে বলল, “সাতসকালে জ্ঞান দেবেন না। আমার দোকান, আমি বুঝব। আপনাকে নাক গলাতে কে বলেছে?”
রমিত কড়া চোখে তাকাল, “আমি ভদ্রভাবে কথা বলেছি। অত মেজাজ দেখাচ্ছেন কেন? চোখের সামনে একটা বাচ্চা ছেলেকে মারবেন আর আমি চুপচাপ দেখে চলে যাব?”
“কথা না বাড়িয়ে এখান থেকে ফুটুন তো।”
রমিত বেঞ্চ থেকে উঠে দাঁড়িয়ে পকেট থেকে আই.ডি. কার্ড বের করে দোকানদারকে দেখাল। নিমেষেই সে চুপসে গেল। ঢোঁক গিলল ক’বার। গলা নরম করে বলল, “না, মানে স্যার, ভুল হয়ে গেছে। কিছু মনে করবেন না। আপনি বসুন। চা বানিয়ে দিচ্ছি। দুটো বিস্কুট দেব চায়ের সঙ্গে?”
“ছেলেটাকে ছেড়ে দিন। ও আমার কাছে এসে বসুক। গল্প করব ওর সঙ্গে।” রমিত গম্ভীরভাবে বলল।
“ছোটু, উনুন ধরে গেছে। স্যার তোকে ডাকছেন। ওঁর কাছে গিয়ে বোস।”
রমিত মনে মনে হাসল। একটু আগেই লোকটি চোটপাট করছিল। কার্ডটা দেখানোয় গলার সুর বদলে গেছে।
ছোটু পাশে জড়োসড়ো হয়ে বসতেই রমিত বলল, “ভালো করে বোস। আমাকে ভয় করার কিছু নেই। কদ্দিন কাজ করছিস এখানে?”
ছোটু উত্তর দিল, “সাত মাস।”
“স্কুলে যাস না?”
“না।”
“কেন?”
“মা জানে।” ছোটু বলল।
“বাড়ি কোথায়?”
“চাঁদমারি।”
“কে কে আছে বাড়িতে?” রমিত জানতে চাইল।
“মা আর দাদা।”
“মা কী করেন?”
“মা এ-বাড়ি ও-বাড়ি রান্নার কাজ করে।” ছোটু বলল।
“আর দাদা?”
“দাদা গাড়ির গ্যারেজে কাজ করে। দাদা বলেছে, একটু বড়ো হলে আমাকেও গ্যারেজের কাজে ঢুকিয়ে দেবে।” ছোটু হাসল।
“গান জানিস?”
“না।”
রমিত বলল, “তাহলে একটু আগে যে গান করছিলি!”
“বাবা ট্রেনে গান গাইত। শুনে শুনে দু-একটা গান শিখেছি।”
“বাবা কোথায়?”
“নেই। একদিন ট্রেন থেকে নামতে গিয়ে পড়ে গেছল। ট্রেনের চাকার তলায় পড়ে মারা যায়।” ছোটুর গলা ধরে এল।
রমিত ছোটুর মাথায় হাত রাখে, “ কখন?”
“আমি তখন কেলাস টু-তে পড়তাম।”
“আচ্ছা, এখন কাজ কর। বিকেলে আমি আসব। তুই আমাকে বাড়ি নিয়ে যাবি।” রমিত বলল।
ছোটু প্রশ্ন করল, “কেন?”
“তোকে ধরে নিয়ে যাব। জেলে রাখব।” রমিত হাসল।
ভয়ে ছোটুর মুখ শুকিয়ে গেল। রমিত বলল, “বোকা, অমনি ভয় পেয়ে গেলি? কিচ্ছু করব না। তোর মায়ের সঙ্গে কথা বলব। তোর পড়াশোনার ব্যবস্থা করতে হবে। বুঝেছিস?”
চায়ের গ্লাসে চুমুক দিয়ে রমিত দোকানির দিকে তাকাল, “ছোটুর বাড়ি জানেন?”
“আজ্ঞে, হ্যাঁ।”
“কী নাম আপনার?”
“মধু বিশ্বাস।”
“মধুদা, আমাকে ভয় পাবার কিছু নেই। বাচ্চা ছেলে, কাজে মন নাও বসতে পারে। বোঝাবেন, বকবেন না। মারধোর করাটা কি ঠিক?”
“আজ্ঞে, ভুল হয়ে গেছে।”
“ছোটুর বাড়িতে খুব অভাব? তাই ও এখানে কাজ করছে?”
“হ্যাঁ, স্যার। ওর বাবা শুনেছি ট্রেনে ট্রেনে গান গেয়ে ভিক্ষে করত। তারপর তো শুনলেন।”
“গান শুনিয়ে রোজগার করতেন, ভিক্ষে নয়। কোনও কাজ না করে কিছু চাওয়াকে ভিক্ষে করা বলে। শুনুন, ছোটুর বাড়িতে আমি আজ বিকেলে যাব। ছোটু যেন বিকেলে এখানে থাকে। মনে থাকবে?”
মধু মাথা নাড়ল, “ মনে থাকবে। ছোটুর ছুটি সন্ধেবেলা হয়।”
“তা ছোটুর মাইনে ঠিকঠাক দেন? নাকি কম টাকায় খাটিয়ে নেন?”
মধু জিভ কাটে, “না, বাবু। কম টাকায় খাটাই না। মাসে ছ’শো টাকা আর টিফিন। দুপুরে খাওয়া বাবাদ রোজ দশ টাকা।”
রমিত হাসল, “ আমার পরিচয় জেনেছেন। সেটা কাউকে খবরদার বলবেন না। আসছি রে ছোটু।”
রমিত চলে গেলে ছোটু জিজ্ঞেস করল, “বাবুটি কে?”
“মস্ত অফিসার।”
“সেটা কী গো?” ছোটু জানতে চাইল।
“ও তুই বুঝবি না। দোকানটা ঝাঁটা মেরে পরিষ্কার কর গে এখন।” মধু নরম গলায় বলল।
***
“অভাবের ঠেলায় ছেলেটাকে কাজে পাঠাতে হয়েছে, বাবু। কোন মা সাধ করে ওইটুকু ছেলেকে পরের দোকানে কাজ করতে পাঠায়?” সুলেখার চোখ ভিজে আসে।
“তা বলে স্কুলে পাঠানো বন্ধ করে দিলেন?” রমিত বলে, “কত আর বয়স ওর?”
“আজ্ঞে বাবু, এই কার্তিক মাসে এগারোয় পড়ল।”
“মাত্র ছ’শো টাকায় কিছু হয়?”
“গরিবের সংসারে ওই টাকাটাই অনেক।” ছোটুর মা বললেন।
“ইচ্ছে হয় না যে ছোটু পড়াশোনা শিখে বড়ো হোক? ভালো কিছু করুক?” রমিত জিজ্ঞাসা করে।
“গরিব মানুষদের স্বপ্ন দেখতে নেই। বড়ো ছেলেটা গ্যারেজে কাজ করে। ছোটুও বড়ো হলে কিছু কাজ করে দুটো পয়সা রোজগার করবে।”
রমিত বলল, “আপনি রাজি হলে ছোটুর দায়িত্ব আমি নিতে পারি।”
সুলেখা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকেন। তিনটি বাড়িতে রান্নার কাজ করেন, কোথাও তাঁকে কেউ ‘আপনি’ বলে না, “দায়িত্ব?”
“হ্যাঁ, এরকম ছেলেদের দায়িত্ব নিতে আমি পছন্দ করি। খুলেই বলি আপনাকে। একটি বাড়িতে এরকম বেশ কিছু ছেলেকে রেখে তাদের থাকা-খাওয়া, পড়াশোনা, সমস্ত কিছুর দায়িত্ব নিই। স্কুলে ভরতি করাই। খুব আরামে রাখি না, একটু কষ্ট করেই থাকতে হয়। আপনাকে একটি টাকাও খরচ করতে হবে না। শুধু ভরসা করে আমাদের কাছে রাখতে দিতে হবে। ছোটু কাজ করে যে-টাকাটা পায় সেটা না পেলে খুব সমস্যা হবে আপনার?”
সুলেখা লজ্জা পেলেন, “তা কেন হবে? কমবয়স থেকে খেটে রোজগার করতে শিখবে ভেবে পাঠিয়েছিলাম।”
“নিজের ছেলেকে বিশ্বাস করে আমার কাছে রাখতে দিচ্ছেন। তাই কাল জায়গাটা দেখে আসবেন। পছন্দ হলে পাঠাবেন। জোর করব না।”
সুলেখা ঘাড় নেড়ে বললেন, “যাব। নিশ্চয়ই যাব।”
“ঠিক আছে। যাবেন কিন্তু। অশোকনগরে গিয়ে বলবেন ঊষা ভবন কোথায়। জিজ্ঞাসা করলেই দেখিয়ে দেবে সবাই।” রমিত বলল।
বাইরে বেরিয়ে এসে হিমেন জিজ্ঞাসা করে, “ছেলেটার মধ্যে কী এমন পেলি যে ওকে রাখার জন্য ব্যস্ত হলি?”
রমিত উদাস হল, “তুই তো সব জানিস। যখন আমার মাত্র এগারো বছর বয়স বাবা হার্ট অ্যাটাকে মারা যান। দাদা আর আমাকে কত কষ্টে মা বড়ো করেছেন তা আমরাই জানি। এই ছেলেটাও কমবয়সে বাবাকে হারিয়েছে। অভাবে কাজ করছে এই বয়সে। এইসব ছেলেদের জীবনে আলো আনার জন্যই দাদা ঊষা ভবন খুলেছে।”
“কিন্তু ঊষা ভবন যে শুধু গরিব আর মেধাবী ছেলেদের জন্য!”
রমিত বলল, “হ্যাঁ, ওটা একটা শর্ত। কেউ অভাবে পড়াশোনা ছেড়ে দিলে তার কথাও তো ভাবতে হবে। ভাবছি এবার থেকে পড়াশোনাতে ভালো নয়, কিন্তু বিশেষ গুণ আছে এমন ছেলেদেরও দায়িত্ব নেব। একটা ছেলেকে পেয়েছি, নাম নিতাই দাস। তাকেও রাখব।”
“নিতাইয়ের বিশেষ গুণ কিছু আছে?”
“এলেই দেখতে পাবি।”
রমিত আর হিমেন দুজনে সেই স্কুলজীবন থেকেই ভালো বন্ধু। রমিত পুলিশের গোয়েন্দা দপ্তরের অফিসার, হিমেন একটি প্রেস চালায়। রমিতের কাজের খুব চাপ, ব্যস্ত থাকে। হিমেনই ঊষা ভবনের দেখভাল করে; সে ম্যানেজার কাম সুপারভাইজার। ভালোবেসেই কাজটা করে হিমেন। রমিতের মায়ের স্বপ্ন ছিল যে ছেলেরা বড়ো হয়ে শুধু নিজেদের কথা ভাববে না, অন্যদের জন্যও কিছু করবে। রমিতের দাদা সুমিত সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, আমেরিকার টেক্সাসে থাকেন। কত মেধাবী ছেলে অভাবের জন্য বেশিদূর এগোতে পারে না। তাদের জন্য আশ্রয় এবং পড়াশোনা, এই দুটোরই ব্যবস্থা করতে চাইল দুই ভাই। ঠিক হল যে একটি বড়ো বাড়ি নেওয়া হবে, সেখানে গরিব মেধাবী ছেলেদের রেখে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করা যাবে। অশোকনগরে এক পুরোনো আমলের জমিদারবাড়ি খালি পড়ে ছিল। বিশাল দোতলা বাড়ি, সব মিলিয়ে ন’খানা রুম, কড়িকাঠের বরগা, মোটা দেয়াল। বেশ পছন্দ হয়ে গেল সুমিতের। কিছু জায়গায় ফাটল ধরেছে, বট-অশ্বত্থর চারা গজিয়েছে। সবাই বাইরে থাকে, বাড়িটার সংস্কার হয়নি। কিনে মেরামত করে বাড়িটাকে সাদা রঙ করা হল। সুমিত-রমিতের মা স্বর্গত ঊষাদেবীর স্মৃতিতে নাম রাখা হল ‘ঊষা ভবন’। সুমিত মিত্রের প্রচুর রোজগারের কিছুটা অংশে খরচ দিব্যি চলে যায়।
***
সুলেখা সকালে ঊষা ভবন ঘুরে এসেছেন। সাতটি বড়ো বড়ো রুম, প্রত্যেকটায় চারখানা করে চৌকি পাতা রয়েছে। চৌকির ওপরে যার যার নিজস্ব বিছানা, দেয়ালের কাছে একটি করে আলনা। সবই দেওয়া হয়, কিছুই কিনতে হয় না। প্রত্যেকের জন্য আলাদা টেবিল আর চেয়ার। মস্ত বড়ো রুম, অনেক উঁচুতে ছাদ, যথেষ্ট আলো-বাতাস খেলা করছে। পেল্লাই বাড়ির সামনে সবুজ ঘাসের একফালি মাঠ, ফুলের বাগান, কয়েকটি দোলনা খাটানো রয়েছে বাগানের পাশে। এ তো রীতিমতো রাজকীয় ব্যবস্থা! দেখে তাক লেগে গিয়েছে তাঁর। কেমন যেন স্বপ্ন মনে হচ্ছে। বস্তির ঘিঞ্জি পরিবেশ থেকে এসে তাঁর ছোটু একানে থাকবে এবার। আপত্তির কোনও প্রশ্নই নেই। রমিতবাবু বলেছেন যে সামনের রোববার ছোটুকে ওখানে দিয়ে আসতে হবে।
ছোটুর ঘুম আসছিল না। মা বলেছে এবার থেকে সে অদ্ভুত সুন্দর একটা জায়গায় থাকবে, লেখাপড়া করতে পারবে। এখনও বিশ্বাস হচ্ছে না তার। এতদিন ভোরে উঠেই তাকে বেরিয়ে পড়তে হত কাজে। কতবার যে চায়ের বাসন ধুতে হয় তার ইয়ত্তা নেই। নানারকম ফাইফরফাশ খাটা তো আছেই। ছুরি দিয়ে পেঁয়াজ আর লংকা কাটতে হত অজস্রবার; ঝাঁঝে চোখে জল এসে যেত। সামনের জলের কল থেকে পাঁচখানা বড়ো ডাব্বায় জল ভরতি করে বয়ে আনতে হত। মধুকাকার চোটপাট আর দাঁত খিঁচুনি যে দিনের মধ্যে কতবার জুটত তার ঠিক নেই। কাজ থেকে ছুটি পেত সন্ধে সাতটা নাগাদ। দুপুরে খদ্দেরের ভিড় কম থাকলে বেঞ্চে বসে কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে নিত। দুপুরের খাবার সে উলটোদিকের ফুটপাথের হোটেলে খেয়ে নিত। মধুকাকার বরাদ্দ ছিল মাত্র দশ টাকা। ভাত, জলের মতো ডাল, কাঁচা পেয়াজ আর সবুজ একটা লংকা জুটত বেশিরভাগ দিন। মাঝে-সাঝে হোটেলের কাকুদের দয়া হলে একহাতা সবজি জুটত।
রোববার চলে এল। সুলতা চটের ব্যাগে দু-খানা জামা, একটা খাটো ফুল-প্যান্ট, দু-খানা হাফ-প্যান্ট আর ছেঁড়া সোয়েটার গুছিয়ে দিলেন। তাঁর আনন্দ হচ্ছে খুব, আবার বুকের কোণে চিনচিনে ব্যথাও হচ্ছে। এতদিন অন্তত রাতটায় ছোটুকে কাছে পেতেন। এবার থেকে শুধু ছুটিছাটায় ছোটু বাড়ি আসতে পারবে। প্রতি রোববার সকালে তিনি দেখা করতে যেতে পারবেন। নীচে যে বড়ো রুমটা আছে, সেখানে এসেই ছেলেরা তাদের বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করতে পারবে। ছোটুকে আদর করে তিনি বললেন, “একদম দুষ্টুমি করবি না। তোর অনেক কপাল যে এমন জায়গায় থাকতে পাচ্ছিস। ভালোভাবে থাকবি।”
***
“তাহলে তোর নাম হচ্ছে শ্যামসুন্দর রাউত। ডাকনাম ছোটু?” সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে জিজ্ঞাসা করলেন মানুষটি।
“হ্যাঁ।”
“আমি সত্যবান রায়। এখানে সবাই আমাকে সত্যদা বলেই ডাকে। তুইও ওই নামেই ডাকবি। আমি হলাম এখানকার কেয়ারটেকার। তোদের সারাক্ষণের দেখভালের জন্যই আছি।”
ছোটু অবাক হয়ে বলল, “বা রে, তুমি এত বড়ো, তোমাকে দাদা বলে ডাকব?”
“দূর, দাদা ডাকটা অনেক কাছের। আমিও তোদের মতোই ছেলেমানুষ। বুঝেছিস?”
মাথা নাড়ে ছোটু, “হ্যাঁ।”
“তোর রুমে আরও দুজন নতুন এসেছে আজ। কই রে লাট্টু আর নাড়ু, কোথায় গেলি?” রুমে ঢুকেই হাঁক পাড়লেন সত্যবান।
“আমি এখানে।” একটা ছেলে খাটের ওপর বসে পা দোলাতে দোলাতে বলল। গায়ের রঙ কালো, গাট্টাগোট্টা চেহারা, মাথায় শজারুর মতো চুল, গলায় তুলসি কাঠের মালা।
“এ হল ছোটু। তোদের নতুন বন্ধু। এখানে তিন নম্বর বেডে থাকবে। আর একটা কোথায় গেল?”
“লাট্টু? দেখো গে খাটের নীচে।” নাড়ু বলল।
“কেন? খাটের নীচে কেন?” ঝুঁকে পড়লেন সত্যবান, “ওখানে ঢুকেছিস কেন রে? বেরিয়ে আয়।”
“টিকটিকি।” খাটের নীচ থেকে মিহি গলা ভেসে এল।
“ভিতুরাম কোথাকার! টিকটিকি কি তোকে খেয়ে ফেলবে? বেরিয়ে আয়।” সত্যবান ধমক দিতেই সুড়সুড় করে খাটের তলা থেকে একটা ছেলে বেরিয়ে এল। ছোটু হাঁ করে তাকিয়ে রইল। কেউ এত রোগা হতে পারে? সে রোগা বলে মায়ের কত দুঃখ। এ তো তার অর্ধেক! মনে হচ্ছে হাত লাগালেই উলটে পড়ে যাবে।
“টিকটিকিকে ভয় তোর এত?” সত্যবান হাসলেন, “দেয়ালে দেখতে পাবি মাঝে-মধ্যে। কতবার ঢুকবি? খাটের তলা টিকটিকিদের খুব পছন্দের জায়গা। একদম ভয় করবি না।”
“আমি কিছুতেই ভয় পাই না।” নাড়ু দাঁত বের করে হাসল, “ভূতেরও ভয় নেই।”
“বুঝলাম তুই নির্ভীক। দেখব পরে।” সত্যবান হাসেন।
নাড়ু মাথা চুলকে বলে, “নির্ভীক মানে?”
লাট্টু বলল, “জানিস না তুই? নির্ভীক মানে হল যে কিছুতেই ভয় পায় না।”
“তোরা তিনজনে গল্প কর, ভাব কর। খবরদার, ঝগড়া করবি না। ঝগড়ার গন্ধ পেলেই মাথায় ইট রেখে রোদে দাঁড়িয়ে থাকার শাস্তি জুটবে।” চোখ পাকিয়ে বললেন সত্যবান।
সত্যবান চলে গেলে বিছানায় প্রায় লাফিয়ে উঠে পড়ল ছোটু। সবুজ রঙের ফুলকাটা নকশা-করা চাদর, নরম বালিশ, নরম বিছানা, বসলেই কী আরাম!
লাট্টু এসে বিছানায় তার পাশে বসল, “তোর নাম ছোটু?”
“হুঁ।”
“আমি ক্লাস সিক্সে পড়ব। তুই?”
“জানি না।”
“সে কি!” লাট্টু অবাক হল, “কোন ক্লাসে পড়বি জানিস না?”
ছোটু বলল, “ক্লাস ফাইভের পর আর পড়িনি।”
“আমি ক্লাসে ফার্স্ট হই। সুদামপুর গাঁয়ে বাড়ি।” লাট্টু মুখের মধ্যে ডানহাতের বুড়ো আঙুল ঢুকিয়ে বলল।
নাড়ু ফিক করে হাসল, “তুই টিকটিকিতে ভয় পাস, আঙুল চুষিস? কী রে তুই!”
লাট্টু আঙুল বের করে লাজুক হেসে বলল, “সবাই বকে, তবু ছাড়তে পারিনি। তুই কোন ক্লাসে পড়বি রে নাড়ু?”
“সিক্সেই পড়ব। তবে বইপত্তর আমার ভাল্লাগে না। পড়তে বাজে লাগে।”
“পড়তে ভাল্লাগে না? বাবা যে বলল পড়াশোনায় খারাপ ছেলেদের এখানে রাখে না?”
নাড়ু ঠোঁট উলটে বলল, “অত জানি না।”
“তোর ভালো নাম কী?”
“নিতাই দাস। তোর?”
“সৌম্যকান্তি দে।” লাট্টু বলল।
“আর তোর?” নাড়ু ছোটুর দিকে তাকাল।
“শ্যামসুন্দর রাউত।” ছোটু বলল।
“ঘুড়ি ওড়াতে পারিস?”
“না।”
“গাছে উঠতে পারিস?”
“না।”
“ধুর! কী পারিস তাহলে? আমি ঘুড়ি ওড়াতে পারি, বড়ো বড়ো গাছে চড়ে বসে থাকতে পারি, ঢোল বাজাতেও জানি।” নাড়ু সগর্বে বলল, “লাট্টুটাকে জিজ্ঞেস করে লাভ নেই। ও কিছুই জানে না বোঝাই যাচ্ছে। তোরা কেউ কিছুই জানিস না।”
শুনে ছোটুর বেশ রাগ হল। সে মাথা নেড়ে বলে, “তুই চাকরি করেছিস?”
“চাকরি! ও তো বড়োরা করে।”
“আমি করতাম। চায়ের দোকানে সকাল ছ’টা থেকে সন্ধে সাতটা। মাইনে পেতাম।”
লাট্টু বলল, “ও! তুই তাহলে শিশুশ্রমিক ছিলি? আমার বাবা ভ্যান-রিকশা চালায়। তোর বাবা কী করে?”
ছোটু বলল, “বাবা নেই। মা লোকের বাড়িতে রান্নার কাজ করে।”
নাড়ু ছোটুর দিকে তাকাল, “তোর বাবা নেই? ইস! আমার বাবা কীর্তন দলে গায়। মা স্কুলের মিড-ডে মিলের রান্না করে।”
“কীর্তন দল! সেটা কী?”
নাড়ু বেশ মজা পেল ছোটুর প্রশ্নে, “তাও জানিস না? যারা কীর্তন গেয়ে বেড়ায়। অষ্টপ্রহর সংকীর্তন হয় দেখেছিস?”
“দেখেছি। বাজারের আটচালায় বছরে একবার হয়।”
“বাবা এখানে সেখানে যায়, কীর্তন গায়। আমার খুব ইচ্ছে যে আমিও বাবার মতো হব। জানিস, নিজেই ঢোল বাজাতে শিখেছি। পড়াশোনা আমার একদম ভাল্লাগে না। এখানে থাকলে নাকি লেখাপড়া করতে হবে। কী ঝামেলা!”
“সেজন্যই রমিতকাকু আমাকে এখানে নিয়ে এসেছেন। কাকুর মামাবাড়ি আমাদের পাশের গাঁয়ে।” লাট্টু বলে।
“আর তোকে?”
লাট্টুর প্রশ্নে ছোটু বলল, “জানি না। চায়ের দোকানে কাজ করছিলাম। কাকু দেখেছিল।”
“ও! তোরা তাহলে কেউ লেখাপড়ায় ভালো নোস।” লাট্টু হাসে, “এখানে এসে রেজাল্ট ভালো না করলে পরের বছর রাখবে না।”
নাড়ুকে হতাশ দেখাল, “তাড়িয়ে দেবে? জায়গাটা ভারি মনে ধরেছে যে! আমি তো কাল রাতে এসেছি। রাতে ভাত, ডাল, ফুলকপির তরকারি, ডিমের ঝোল খেলাম।”
ছোটু শুনে জানতে চাইল, “পেটভরে খেতে দেয়?”
“দেয় না মানে?” নাড়ু হাসল, “আমি তিনবার ভাত নিয়েছি। ডিমের ঝোল আরও এক ডাবু নিয়েছিলাম।”
“তুই এত খাস?” লাট্টু অবাক হল।
নাড়ু বলল, “কী ঝামেলা! প্রথমদিন বলে কম নিয়েছিলাম। চাইলে আমি তিন ডবল খেতে পারি।”
নাড়ুর খাওয়ার ক্ষমতা টের পাওয়া গেল দুপুরবেলা। খাওয়ার ঘণ্টা পড়তেই তারা তিনজন থালা-বাটি নিয়ে বড়ো হল-ঘরে পৌঁছে গেল। বড়ো হল-ঘরে মেঝেতে পাতা শতরঞ্জির ওপর সবাই বসে পড়ল। খেতে বসার আগে সত্যবান ওদের তিনজনকে দাঁড় করিয়ে রেখে বললেন, “ছেলেরা, এই তিনজন নতুন আবাসিক। আজ থেকে তোমাদের ভাই বা বন্ধু।”
তিনজনের ভালো নাম, ডাকনাম আর বাড়ির ঠিকানা উঁচুগলায় বলে দিয়ে সত্যবান বললেন, “এবার তোরা খেতে বোস।”
ভাত-ডাল-ফুলকপির তরকারি মেখে এক থালা ভাত সাবাড় করে দিল নাড়ু। পাশে বসা একজন অবাক হয়ে বলল, “এর মধ্যেই শেষ? মাংস আছে যে!”
“মাংস?”
“হ্যাঁ, রোববারে মাঝে-সাঝে মাংস হয়।”
দু-পিস মাংস, ছোটু চেটেপুটে খেল। নাড়ু আরও একথালা ভাত সাবাড় করে দিল। পাশে বসা ছেলেটি বলল, “উরিব্বাস! তোর কি জলহস্তীর পেট?”
নাড়ু আঙুল চাটতে চাটতে বলল, “জানি না।”
“আমার নাম কাঞ্চন বেরা। ভালোবেসে সবাই পটলদা বলে। নাইনে উঠব এবার। তোর নাম তো নাড়ু?”
“হ্যাঁ।”
থালা-বাটি নিজেদেরই ধুয়ে নিতে হয়। ছোটুও নিমেষে ধুয়ে ফেলল। প্রতিদিনই তাকে অনেক প্লেট, চামচ মেজে পরিষ্কার করতে হত।
“ওরে খুদে রাক্ষস, তুই প্রতিবেলা এমন বেড়াল-টপকানো ভাত নিবি নাকি?” নাড়ুকে উদ্দেশ করে বলল গোপালদা।
যে দুজন সবার খাবার পরিবেশন করছিলেন, তাঁদের নাম জানতে পেরেছে ছোটু। খেতে বসে সবাই নাম ধরে ডাকছিল। একজন রোগা চেহারার মানুষ, বালতি হাতে ছুটছিলেন খুব, তাঁকে সবাই বলছিল গোপালদা। আর একজনের মস্ত ভুঁড়ি, মুখে সারাক্ষণ পান চিবোচ্ছিলেন, তাঁর নাম রঘুদা।
নাড়ু লজ্জা পেল, “কাল থেকে কম খাব।”
“ভাত-ডাল যা চাইবি অঢেল পাবি। লজ্জার কিছু করবি না। তবে এত খেলে ক্লাস নাইনের গাবলুর মতো মোটা হয়ে যাবি।”
“গাবলু!”
“গাবলু খায়-দায় আর পড়ে। এখন বাড়ি গেছে। এলেই দেখে চিনতে পারবি। নড়তে পারে না, থপথপ করে হাঁটে।”
“আমি খুব ছুটতে পারি। ওর’ম হবই না।” নাড়ু পেটে হাত বুলিয়ে বলে।
“আর এই রোগা সিড়িঙ্গেটা! শুধু পাখির মতো খাবার খুঁটে গেল দেখলাম।”
লাট্টু বলল, “আমার কিছুই খেতে ভালো লাগে না।”
নাড়ু বিছানায় বসে বলল, “বজ্রাসন করে নিই। হজম ভালো হবে।”
লাট্টু হাই তোলে, “খুব ঘুম পাচ্ছে।”
“ঘুমিয়ে পড়। আমি রাত্তির ছাড়া ঘুমোতেই পারি না। কাল সকাল থেকে ব্যায়াম শুরু করব। তোরা ব্যায়াম জানিস?”
“না।”
“শিখিয়ে দেব।”
লাট্টু বলল, “ওসব ব্যায়াম-ট্যায়াম পারব না। শিখব না।”
“কী ঝামেলা! ফড়িং হয়েই থাক গে যা। ছোটু, তুই শিখবি? ভোরে উঠতে হবে বলে দিলাম।”
ছোটু মাথা নেড়ে বলল, “হ্যাঁ, খুব ভোরে উঠতে পারি আমি।”
সারাটা দুপুর সে ও নাড়ু কতরকম গল্প করল। লাট্টু অঘোরে ঘুমোল। নাড়ু বলল, “তুই খাটতি এত? সে কি রে? আমি তো পড়াশোনায় গোল্লা, বই খুলতে ইচ্ছেই করে না। খেলতে বড্ড ভালো লাগে। এখানে বাইরে বেরোতে দেবে না। কখন খেলব তাহলে?”
নাড়ুকে বেশ চিন্তিত দেখাল।
***
তিনজনকেই হিমেন ভরতি করে দিয়ে এল শশীধর বয়েজ হাই স্কুলে।
হেডমাস্টার প্রণব প্রধান বললেন, “ঊষা ভবনের ছেলেরাই স্কুলের ভবিষ্যৎ। তাই এলেই ভরতি করে নিই।”
“তবে এই তিনজনের একজন কিন্তু ড্রপ-আউট স্টুডেন্ট। একজন পড়াশোনায় ভালো নয় বলেই মনে হয়েছে। সৌম্যকান্তি ছেলেটা ব্রিলিয়ান্ট, একদিন পড়িয়েই বুঝেছি।”
ঊষা ভবনের সবাই শশীধর বয়েজেই পড়ে। একসঙ্গে যায়, স্কুল থেকেও একসঙ্গে ফেরে। হিমেনদা বলে দিয়েছে যে কেউ যেন কখনও দলছাড়া না হয়। স্কুল থেকে ফেরার পথে রাস্তায় একদল ছেলে টিটকিরি করল, “ওরে দ্যাখ, শশীধরের শসারা যাচ্ছে।”
“পচা স্কুলের পচা আলুরা আবার একসঙ্গে যায়!”
নাড়ু রেগে ঘাড় ঘোরাতেই পটলদা বলল, “খবরদার, কিছু বলবি না। হিমেনদা রাস্তাঘাটে কোনও ঝগড়ায় যেতে মানা করেছে। ওরা আমাদের ফাঁদে ফেলার চেষ্টা করবে, রাগলে চলবে না।”
“ওরা কোন স্কুলের?”
“হীরালাল আদর্শ বিদ্যাভবন। নামকরা স্কুল। তাই খুব দেমাক ওদের।”
ওরা চুপচাপ হাঁটলেও হীরালাল স্কুলের ছেলেরা হেসেই যাচ্ছিল, মন্তব্য করে চলছিল।
“ওই দেখ সুমো যায় সাদা জামা গায়।”
গাবলুদাকে ব্যঙ্গ করেই বলছিল ওরা। ছোটু নীচুগলায় লাট্টুকে জিজ্ঞাসা করল, “সুমো কেন বলছে?”
“সুমো হল জাপানি কুস্তিগির। মস্ত চেহারা তাদের। গাবলুদাকে তাই মজা করে বলছে।”
গাবলুদা আর পটলদা এই দুই দাদার সঙ্গে তাদের খুব ভাব হয়ে গিয়েছে।
দ্বিতীয়দিন রোল-কলের সময় নাড়ু বলে ওঠে, “স্যার, স্পোর্টস কবে?”
“এই মাসেই হবে। নোটিশ ঠিক সময়েই পাবি। ফার্স্ট পিরিয়ড থেকেই স্পোর্টসের চিন্তা কেন তোর?”
নাড়ু বসে পড়ল।
ক্লাস শেষ হতেই লাস্ট বেঞ্চ থেকে একটা ছেলে উঠে এসে নাড়ুর দিকে তাকিয়ে বলল, “স্পোর্টস নিয়ে জানতে চাইলি কেন?”
“নাম দেব।”
“আমি নির্মল, আগেরবার পাঁচটায় ফার্স্ট হয়েছি।”
নাড়ু মেজাজে বলল, “এবার আর হতে দেব না।”
“ফু! তুই পাত্তাই পাবি না।”
“দেখা যাবে।”
ছোটু টিফিনে মিড-ডে মিল খাওয়ার সময় নাড়ুকে বলল, “খুব যে বললি! পারবি কিছু?”
“একশোবার পারব।”
লাট্টু পড়াশোনায় বেশ ভালো। ক্লাস ফাইভে দেবায়ন নামের যে ছেলেটি ফার্স্ট হয়েছিল, লাট্টু তার থেকে কোনও অংশে কম যায় না। নাড়ু কিছুই পারে না, স্যার-ম্যাডামরা কিছু জিজ্ঞাসা করলে দাঁত বের করে হেসে অদ্ভুত সব উত্তর দেয়। ইতিহাসের ক্লাসে স্যার জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “আকবরের রাজসভায় একজন সঙ্গীতজ্ঞ ছিলেন। তার নাম বলতে পারবে?”
নাড়ু উত্তর দিয়েছিল, “অরিজিৎ সিং।”
স্যার রেগে তাকাতেই নাড়ু মাথা নেড়ে বলল, “না স্যার, কুমার শানু হবে।”
সারা ক্লাস হাসিতে ফেটে পড়েছিল।
ইংরেজির ক্লাসে ম্যাডাম প্রেজেন্ট টেনসের উদাহরণ দিতে বলতেই নাড়ু মাথা চুলকে বলল, “টেনস? টেনস পড়তে বসলেই বড্ড পেট গুলোয়, ম্যাডাম।”
ছোটু পড়তে গিয়ে থমকে যায়, ভুল বানান লেখে, একবছর পড়াশোনার সঙ্গে তার কোনও সম্পর্কই ছিল না। হিমেনদা ছাড়াও দুজন স্যার সপ্তাহে তিনদিন সন্ধেতে এসে সবাইকে পড়িয়ে যান। তবু সে ঠিকভাবে পারছে না।
অ্যানুয়াল স্পোর্টসের নোটিশ পড়তেই নাড়ু ভোরে উঠে ব্যায়াম সেরে বাগানের ফাঁকা জায়গায় দৌড় মারে অসংখ্যবার, লাফ-ঝাঁপ দেয়। ক্লাসে একদিন ঘুমিয়েই পড়ল। স্যার ডাকলেন, “নিতাই।”
নিতাইয়ের ঘুম তবু ভাঙে না। ব্যাগে মাথা রেখে সে নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে।
“অ্যাই নিতাই!” খুব জোরে আওয়াজ দিতেই ধড়মড়িয়ে জেগে উঠল নাড়ু।
সারা ক্লাসে হাসির রোল; তার মধ্যেই সে বলল, “আ-আমি কোথায়?”
“কুম্ভকর্ণের প্রাসাদে। ক্লাস কি ঘুমের জায়গা? কান ধরে দাঁড়িয়ে থাক।”
বাকি ক্লাসটা কান ধরেই দাঁড়িয়ে থাকল। বেঞ্চে ফিরে আসতেই নির্মল মুখ ভেংচে বলল, “চব্বিশ তারিখেও তোকে কাঁদতে হবে, জেনে রাখ।”
***
চব্বিশে জানুয়ারি এসে গেল। স্যাক-রেসে ছোটু নাম দিয়েছিল, পার্টনার লাট্টু। মাঝপথে দুজনেই ব্যালান্স হারিয়ে উলটে পড়ল। লাট্টু সাম-রেসে পাঁচ নম্বরে শেষ করেছিল, কিন্তু আগের দুজন অঙ্ক ভুল করায় থার্ড হয়ে গেল। নাড়ু স্যান্ডো গেঞ্জি আর হাফ-প্যান্ট পরে জগিং করেই চলেছে। সাম-রেস, স্যাক-রেস, দুটো ইভেন্টেই সে নাম দেয়নি। তার মতে ওগুলো খেলাই নয়, দুধদাঁত ওঠা বাচ্চাদের ইভেন্টে সে নামবে না।
স্পুন অ্যান্ড মার্বেল রেসে ছোটু নাম দিয়েছে। ধীরে ধীরে সে এগিয়ে যাচ্ছে। প্রায় সবারই মুখে ধরা চামচ থেকে গুলি পড়ে গিয়েছে। ছোটু শান্তভাবে ব্যালান্স রেখে দড়ি ছুঁয়ে পেছনের দিকে তাকাল। কেউ নেই। তার মানে সে ফার্স্ট হয়ে গেছে! পটলদা এসে পিঠ চাপড়ে দিয়ে গেল।
এবার নাড়ুর পালা। সে লং জাম্পে থার্ড হল। দুশো মিটার রেসে দু-বার হিটের পর ফাইনাল। প্রথমে নাড়ু এগিয়ে ছিল, নির্মল তাকে ধরে ফেলল, লম্বা লম্বা স্টেপে সে এগিয়ে গেল অনেকটা। নাড়ু শেষ করল তিন নম্বরে।
লাট্টু বলল, “বাহ!”
নাড়ু মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, “নির্মল হারিয়ে দিল। একশো মিটারে ওকে দেখে নেব।”
লিস্ট ধরে ধরে ট্র্যাকে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছেন অমিত-স্যার। নাম ডাকতেই চার নম্বর ট্র্যাকে দাঁড়ায় নাড়ু। এক নম্বর ট্র্যাকে দাঁড়িয়ে নির্মল একবার তেরছা চোখে তাকাল। লম্বা হুইসল দিতেই লাইনটা যেন একঝাঁক রকেট হয়ে গেল মুহূর্তে। নাড়ু জোরেই শুরু করেছিল। নির্মল যেন বাতাস কেটে বেরিয়ে গেল; সোঁ সোঁ করে পৌঁছে গেল ফিনিশিং পয়েন্টে। নাড়ু টক্কর দেবার চেষ্টা করেছিল; ফিনিশিং পয়েন্টের কাছে এসে ব্যালান্স হারিয়ে মুখ থুবড়ে পড়ল।
দৌড় শেষ হতেই পটলদা ছুটে গেল।
“লাগেনি তো?”
নাড়ু কিছুক্ষণ খোঁড়ানোর পরে হাঁটুর মধ্যে মুখ রেখে বসে পড়ল।
“কী হল রে ঝামেলা? ওভাবে বসলি কেন?” পটলদা জানতে চাইছিল। নাড়ুকে ঊষা ভবনের অনেকেই নাম দিয়েছে, ‘ঝামেলা’।
নাড়ু মুখ তুলে তাকাল। চোখ তার জলে ভরা, ভেউ ভেউ করে কাঁদছে সে। হাঁটুর নীচটা সামান্য ছড়ে গেছে, কনুই ধুলোময়, সেখানটা কেটে গিয়েছে। টেন্টে বসিয়ে তাকে ফার্স্ট-এইড দেওয়া হল।
প্রাইজ হিসেবে লাট্টু পেল বই, নাড়ু জলের জগ, স্টিলের বাটি আর ট্রফি, ছোটু পেল স্টিলের বাটি। নাড়ু সেগুলো ছোটুর হাতে দিয়ে বলল, “তুই রাখ এগুলো।”
“তোর প্রাইজ। আমি কেন রাখব?”
নাড়ু নিশ্বাস ফেলে বলল, “কিছুতেই ফার্স্ট হইনি। একটাও রাখব না আমার কাছে।”

ফাইভ-সিক্সের স্টুডেন্ট মিলিয়ে মিনি গ্রুপ, সেই গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন হল নির্মল। মিনি গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন হিসেবে চারটা পুরস্কার ছাড়াও সে একটা বড়ো সোনালি রঙের ট্রফি পেল। নাড়ুর কাছে এসে হাসল, “বলেছিলাম পাঙ্গা নিবি না। উড়ে যাবি। মুখ থুবড়ে পড়ে গেলি। নির্মল রায়কে চ্যালেঞ্জ জানাতে গেলে দম লাগে।”
নাড়ু কিছু না বলে ম্লান হাসল। সে লাট্টুকে ধরাগলায় জিজ্ঞাসা করে, “পাঙ্গা কী রে?”
“চ্যালেঞ্জ নেওয়া বোঝায়। হিন্দি কথা। শহরে খুব চলে।”
“তুই এত জানিস কীভাবে?”
লাট্টু বলল, “কিছুই জানি না। আমাকে অনেক জানতে হবে।”
ফেরার সময় হইচই করল সবাই। ঊষা ভবনের ছেলেরা পড়াশোনায় ভালো, স্পোর্টসে অ্যাদ্দিন দর্শক থাকত, এবার সিক্সের ছেলেরা পাঁচটা প্রাইজ এনেছে। ছোটুকে সবাই অভিনন্দন জানাল, বেশ লজ্জা হল তার। খেলাধুলো সে পারে না, কীভাবে যেন সে ফার্স্ট হয়ে গেছে, এমন একটা ইভেন্টে যেখানে দৌড়ঝাঁপ কিছুই করতে হয় না।
নাড়ু রাতে না খেয়েই শুয়ে পড়ল। বার বার ডাকার পর মুখ গোঁজ করে বলল, “ঝামেলা করিস না। খাব না। মন ভালো নেই।”
***
ফেব্রুয়ারির শুরুতে রুমে নতুন একজন এল। রাকিব হোসেন। লম্বা, গায়ের রঙ ফর্সা, মুখে মিষ্টি হাসি। এই শহরেই মির্জাবাজার মহল্লায় বাড়ি। বাবা রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন, একদিন কার্নিশে কাজ করার সময়ে পড়ে যান। কোমর ভেঙে পড়ে ছিলেন চার মাস। খুঁড়িয়ে হাঁটেন, পরিশ্রমের কাজ করতে পারবেন না বলে পান-দোকান খুলেছেন।
নাড়ু জিজ্ঞাসা করল, “তোর ডাকনাম কী?”
“সবাই রাকিব নামেই ডাকে।”
“সে কি! এখানে ভালো নামে কেউ ডাকে না। তোর একটা নাম দিয়ে দেবে পটলদা।”
রাকিব ক্লাস সেভেনে ভরতি হল। লাট্টু বলল, “তোকে দাদা বলে ডাকতে হবে?”
রাকিব হাসে, “দূর, আমি তোদের বন্ধু হয়ে গেছি। দাদা বললে মাথায় চাঁটি মারব।”
লাট্টু আর গাবলুদাকে দেখে ছোটুর ধারণা হয়েছিল যে পড়াশোনায় ভালো ছেলেরা ভিতু হয়। রাকিবকে দেখে তার ভুল ভাঙল। স্কুলে ক্লাস নাইনের এক দাদা রাকিবের থুতনি টেনে বলেছিল, “বাচ্চা ছেলে, স্কুলের দাদাদের সম্মান দিবি। ডাকলাম তোকে। সাড়া না দিয়ে চলে যাচ্ছিলি কেন? বড্ড সাহস দেখছি।”
“কাউকে ভয় করি না। থুতনিতে হাত দিয়েছ কেন?” চোখে চোখ রেখে তাকিয়েছিল রাকিব।
রাকিবের কথা শুনে দাদাটি রেগে বলেছিল, “তোকে দেখে নেব টিফিনের সময়।”
রাকিব হেসেছিল, “তোমার রোগা হাত মুচড়ে দেব তখন।”
হিমেনদা বলেছেন, রাকিবের অঙ্কে দারুণ মাথা। ওর কাছ থেকে ছোটু পারলে যেন অঙ্ক শিখে নেয়। একদিন একটা অঙ্ক কিছুতেই পারছিল না সে। রাকিব এত সুন্দর করে বুঝিয়ে করে দিল যে ছোটুর কোনও অসুবিধেই হল না।
একদিন গল্প করতে করতে লাট্টু জানতে চাইল, “তোর কী হবার ইচ্ছে আছে, রাকিব?”
“আমি বিজ্ঞানী হব। কালাম-স্যার আমার আদর্শ।”
“মিসাইল ম্যান! যিনি রাষ্ট্রপতি ছিলেন তাঁর কথা বলছিস?”
“হ্যাঁ।”
নাড়ু বলল, “আমি অ্যাথলিট হব।”
লাট্টু পা দোলাতে দোলাতে বলল, “আমি ডাক্তার হব। ছোটু, তোর কী ইচ্ছে?”
ছোটু ঘাড় নেড়ে বলল, “জানি না।”
সে কালামের নামও শোনেনি, বিজ্ঞানীরা কী করেন তাও জানে না। পড়াশোনা করতে তার কষ্ট হয়, বুঝতে পারে না অনেক কিছুই। এখানে নাড়ু বাদে সবাই পড়াশোনায় ভালো, সেজন্যই রমিতকাকু এনে রেখেছেন। নাড়ু তাও খেলাধুলোয় চৌকস, সে কিছুই পারে না। তার মাঝে-মধ্যে ভয় লাগে খুব। রেজাল্ট ভালো না করলে কি আর থাকতে দেবে রমিতকাকু?
***
ক্লাস-রুমের সামনে একটি ঝাঁকড়া তেঁতুলগাছ আছে, টিফিনের সময় ছেলেরা ঢিল ছুড়ে তেঁতুল পাড়ে। স্যাররা প্রেয়ারের সময় মানা করলেও অনেকে শোনে না। বাধ্য হয়ে একটি ছেলেকে শাস্তি দিতেই সবাই তেঁতুল পাড়া ছেড়ে দিল। নাড়ু বড়ো গাছটার দিকে তাকিয়ে নিশ্বাস ফেলে, জিভে জল এসে যায়। মরিয়া নাড়ু একদিন কসরত করে গাছেই উঠে পড়ল। গাছের নীচে বিভিন্ন ক্লাসের ছেলেদের ভিড় জমে গেল। নাড়ু হাত বাড়িয়ে পেড়ে ছুড়ে দেয় নীচে, ছেলেরা লুফে নেয়। ব্যাপারটা সুকান্ত-স্যারের চোখে পড়তেই তিনি এসে ধমক দিলেন, “নিতাই, গাছে উঠেছিস কেন? পড়ে পা ভাঙাবি! আজ তোর কঠিন শাস্তি হবে।”
নাড়ু বলল, “ঢিল ছুড়ে তেঁতুল পাড়া মানা। গাছে উঠে পাড়া যাবে না বলেননি কেউ।”
“নেমে আয়। তোকে আইন দেখাচ্ছি হতচ্ছাড়া।”
“তাহলে স্যার আমি এই ডালেই বসে থাকলাম।”
“দেখি তুই কতক্ষণ বসে থাকতে পারিস।” সুকান্ত-স্যার চলে গেলেন ফিফথ পিরিয়ডের ক্লাস করতে।
ক্লাস শেষের ঘণ্টা পড়তেই অনেকে মনিটরদের নিষেধ অগ্রাহ্য করে গাছের নীচে ভিড় জমাল। নাড়ু দিব্যি গাছেই বসে আছে, পকেট থেকে তেঁতুল বের করে তারিয়ে তারিয়ে খেয়ে চলেছে।
সুকান্ত-স্যার উঁচু গলায় বললেন, “নিতাই, এখনও বসে আছিস? নেমে আয়।”
“নামব না। নামলেই আপনি শাস্তি দেবেন।”
“আচ্ছা, দেব না। নেমে আয় বাবা।”
“সত্যি?”
“হ্যাঁ, সত্যি।”
নাড়ু কিছুটা সময় নিল নামতে। সুকান্ত-স্যার চোখ পাকিয়ে বললেন, “পাজি ছেলে, আর একবার গাছে উঠলে হেড-স্যারের কাছে নিয়ে যাব। সাসপেন্ড হয়ে যাবি। এবারটা তোকে মাফ করে দিলাম।”
নির্মল ও তার কয়েকজন বন্ধু সেই থেকে নাড়ুর নতুন নাম দিল। সুযোগ পেলেই তারা নাড়ুকে ক্ষ্যাপায়, “এই হনুমান, কলা খাবি?”
গেমস ক্লাসে সুকান্ত-স্যার তাদের ক্লাসের কিছু ছেলেকে দুটো গ্রুপে ভাগ করে কবাডি খেলাচ্ছিলেন। নাড়ু বিপক্ষের অংশে ‘কবাডি কবাডি’ বলে লাফাচ্ছে। নির্মল সুযোগ বুঝে খপাস করে চেপে ধরেছে নাড়ুর ডান পা। নাড়ু টান মারল জোরে। সুকান্ত-স্যার বললেন, “বাহ্, সলিড খিঁচ দিয়েছে।”
অমনি নির্মল মুখ থুবড়ে পড়েছে মাটিতে। উঠতে আর পারে না। চারজন ধরাধরি করে নিয়ে এল মাঠের বাইরে। চামড়া ছড়ে গেছে, যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে নির্মল। সুকান্ত-স্যার দেখে বললেন, “হুম, হাড় ভাঙেনি। রক্ষে প্বেয়েছিস।”
নির্মল যন্ত্রণার চোটে এক সপ্তাহ স্কুলে আসতে পারেনি। তার বন্ধুরা আর ভুলেও নাড়ুকে ক্ষ্যাপায় না, ভয় করে। পটলদা শুনে হাসল, “বাহ্! ঝামেলার দেখছি গাঁটে গাঁটে বেশ বুদ্ধি!”
নাড়ু বলল, “না দাদা, মাথায় কিছু নেই গো আমার। ভগবান পায়ের দিকে বেশি নজর দিয়েছেন, মাথার দিকে তাকাতে ভুলে গেছেন।”
***
ফার্স্ট ইউনিট টেস্ট হয়ে গেল এপ্রিলের শুরুতে, খাতা বেরোল মে মাসের প্রথমে। পনেরো নম্বরের পরীক্ষা। নাড়ু সাতখানা বিষয়ে মোট তিরিশ নম্বর পেয়েছে, অঙ্কে দুই, ইংরেজিতে তিন, ভূগোলেই তার সর্বাধিক নম্বর। পাঁচ পেয়েছে। সেই আনন্দে সে টিফিনে ভোল্ট খেল দু-বার। লাট্টু আর দেবায়নের নম্বর সমান, ক্লাসে দুজনেই হায়েস্ট মার্কস পেয়েছে। ছোটুর অবস্থা খুব ভালো নয়, বাংলায় দশ পেলেও বাকিগুলোতে ছয়ের নীচে।
হিমেনদা দেখে বললেন, “তোর কোথায় অসুবিধে?”
ছোটু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকল। হিমেনদা মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, “আমি দেখছি কী করা যায়।”
রাকিব ক্লাসে সেকেন্ড হয়েছে। ইতিহাসেই সে কম পেয়েছে, বাকি বিষয়ে সে সবাইকে টপকে গেছে।
গ্রীষ্মের ছুটি পড়ে গেল। একুশ দিন পরে স্কুল খুলবে। ঊষা ভবনের সব আবাসিকদেরও ছুটি। এই ক’টা দিন সবাই ঘরেই কাটাবে। ছোটুর মনখারাপ হয়ে গেল। নাড়ু বেজায় খুশি। সে মাঠে বাগানে ঘুরে ঘুরে আম-জাম পাড়বে, দুপুরে পুকুরে সাঁতার কাটবে আর রোজ সকালে দৌড় প্র্যাকটিস করবে। ছোটুর কিছু করার নেই। বই নিয়ে বসলে ঝাপসা লাগে সবকিছু, মন বসে না, খেলাধুলো সে পারে না। বাড়ি ফিরে সে মুখ কালো করে শুয়ে থাকল।
সুলেখা জিজ্ঞাসা করেন, “কী হয়েছে তোর?”
“কিছু না।”
“মুখটা গোমড়া কেন?”
সত্যি কথা বলতে চাইল না ছোটু। শুনলে মা আর যেতে দেবে না, কাজে লাগিয়ে দেবে। বিকেলে ঘরের দরজায় রাকিবকে দেখে সে চমকে উঠল, “তুই?”
“চলে এলাম। হিমেনদা ঠিকানা দিয়েছিলেন। খুঁজে পেয়ে গেলাম। রোজ তোকে পড়াতে বলেছেন হিমেনদা। একদম লজ্জা করবি না। সব বুঝে নিবি।” রাকিব বলল।
“এখন?”
“না, কাল থেকে আসব। সকালেই আসব। এখন চল, ঘুরে আসি।”
সাইকেলের ক্যারিয়ারে ছোটুকে চাপিয়ে রাকিব বেরিয়ে পড়ে। গির্জার মাঠ, স্টেশন পেরিয়ে রাকিবের সাইকেল ছুটল শহরের শেষ মাথায়।
ছোটু জিজ্ঞাসা করে, “কোথায় যাচ্ছিস?”
“নদী দেখতে। নদী আমার খুব ভালো লাগে।”
“আমারও।”
সাইকেল রেখে নদীর পাড়ে বসল ওরা। একটা ট্রেন শুঁয়োপোকার গতিতে রেল-ব্রিজ পার হল। মৃদুমন্দ বাতাস বইছে। রাকিব জানতে চায়, “বর্ষাকালে নৌকায় চেপে নদী পার হয়ে কখনও ও-পাড়ে গেছিস?”
“না।”
“আমি একবার গেছি। ভরা নদীতে নৌকোয় চাপার আনন্দই আলাদা। তোকে একদিন নিয়ে যাব তখন।”
“যদি নৌকো উলটে যায়? আমি সাঁতার জানি না।”
“তুই কেন সবেতেই এত ভয় করিস রে? তোকে সাঁতার শিখিয়ে দেব।”
“পারব?”
“সব পারবি। হিমেনদা বলেন যে মনের জোর আর ইচ্ছে থাকলে সবকিছু পারা যায়।” রাকিব হেসে বলে।
সন্ধে হবার আগে ওরা ফিরে এল। রাকিব বলল, “কাল থেকে সকাল দশটায় আমি আসব। একসঙ্গে পড়ব। ছোটু, পিছিয়ে থাকলে চলবে না। আমাদের পড়াশোনা শিখে বড়ো হতেই হবে।”
ছোটু অবাক হয়ে ভাবে যে রাকিবের মন কত শক্ত! কী সহজভাবে ও সবকিছু ভাবতে পারে। সে ভিতু, মনে সাহস পায় না। সে প্রায়ই স্বপ্নে দেখে যে মধুকাকুর দোকানে সে কাপ-প্লেট ধুচ্ছে, পরিষ্কার হয়নি বলে মধুকাকা চোখ রাঙাচ্ছে তাকে। কিছুই পারে না, রেজাল্ট খারাপ বলে ঊষা ভবন ছেড়ে চলে আসতে হয়েছে তাকে। দুঃস্বপ্ন দেখে একদিন মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেল তার। সে গ্যারেজে কাজ করছে। তার জামায় তেল-কালির দাগ, হাত নোংরা, বাইক সারাচ্ছে সে। বন্ধুরা তাকে দেখে হাত নাড়তে নাড়তে স্কুল যাচ্ছে। তাদের মুখগুলো আর দেখা গেল না, হারিয়ে গেল বহুদূরে।
***
হিমেন উদ্বেগে পায়চারি করছে। সত্যবান থমথমে মুখে বসে আছেন। রমিতকে এর মধ্যেই ফোন করা হয়েছে। দরকারি কাজে ব্যস্ত, শেষ হলেই আসবে।
স্কুল থেকে নিয়ম মেনে প্রতিদিনের মতোই সবাই একসঙ্গে ফিরেছিল। ছোটু বিছানার ওপরে ব্যাগ রেখে বলেছিল, “একটু আসছি।”
“কোথায় যাবি?” লাট্টু জিজ্ঞাসা করেছিল।
ছোটু কোনও উত্তর দেয়নি। লাট্টুও আর জিজ্ঞাসা করেনি। ছোটু যে পালিয়ে যাবে তা কীভাবে তার মাথায় আসবে? আধঘণ্টা বাদে ছোট্টুর দেখা না পেয়ে সে সত্যবানকে বলেছিল। ঊষা ভবন তন্নতন্ন করে খুঁজেও ছোটুর দেখা পাওয়া যায়নি। দারোয়ান পান্ডেজি জানিয়েছে যে সে ছোটুকে মেন গেট দিয়ে বেরোতে দেখেইনি। এমনিতে পাস ছাড়া সে ছেলেদের কাউকেই বাইরে বেরোতে দেয় না। সত্যবান হিমেনকে ফোন করে ডেকেছেন। একটা ছেলে এখান থেকে নিরুদ্দেশ হয়ে গেছে জানতে পারলে শোরগোল পড়ে যাবে চারদিকে। ছোটুর মাকেই-বা তাঁরা কী জবাব দেবেন? তাঁদের দায়িত্বে রেখেছিলেন, এখন ছেলেকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কী যে হবে!
হিমেন ছোটুর ব্যাগ থেকে বইখাতা বের করে দেখল। সেকেন্ড ইউনিট টেস্টের খাতা বেরিয়েছে। অঙ্কে পঁচিশের মধ্যে আঠারো পেয়েছে ছোটু। বাকি সব সাবজেক্টেই পাঁচের নীচে নম্বর তার।
নাড়ুকে প্রশ্ন করতেই সে বলল, “হ্যাঁ। ও মুখ কালো করে বসে ছিল বেঞ্চে। কী ঝামেলা! এর জন্য কেউ পালিয়ে যায়? আমারও সবেতেই পাঁচের নীচে নম্বর। বাংলায় দশ পেয়ে গেছি। ওই আনন্দে আজ একহাতা ভাত বেশি খাব।”
সত্যবান ধমকে ওঠেন, “ছোটুকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বাংলায় দশ পেয়ে তোর আনন্দ হচ্ছে!”
নাড়ু মাথা চুলকে বলল, “নম্বর কম পাবার দুঃখে কেউ পালিয়ে গেলে কী করব?”
হিমেনের নির্দেশে রাকিব ছোটুর বাড়ি ঘুরে এসেছে। রাকিব একমাত্র ওর বাড়ি চেনে, সে জেনে আসতে পারবে।
রাকিব ম্লানমুখে বলল, “ছোটু বাড়িতে যায়নি।”
“ওর মা কী বললেন শুনে?”
“এখনই ছোটুর দাদাকে নিয়ে আসছেন।”
সত্যবান মুখ গম্ভীর করে বললেন, “এবার আমাদের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ করবেন হয়তো। ছোটুর নামে মিসিং ডায়েরি করে দেওয়া উচিত ছিল।”
হিমেন বলল, “এত ঘাবড়ে যাচ্ছেন কেন? চব্বিশ ঘণ্টা না পেরোলে কারও নামে নিখোঁজ হবার ডায়েরি করা যায় না। রমিত নিজে গোয়েন্দা অফিসার, ও ঠিক খুঁজে বের করবে। কাজে আটকে গেছে বলে আসতে দেরি হচ্ছে।”
ঠিক তখনই রমিত এসে পৌঁছল। তার মুখে কোনও দুশ্চিন্তার ছাপ নেই। সে বলল, “কয়েকজন পুলিশকে কাজে লাগিয়ে দিয়েছি। মনে হয় ঠিক খুঁজে পেয়ে যাবেন। বাস-স্ট্যান্ড, স্টেশন, পার্ক সব জায়গাতে খোঁজ চলছে। মোবাইলে ওঁদের কাছে ছোটুর ছবি পাঠিয়ে দিয়েছি।”
রাকিব বলল, “আর একটা জায়গা খুঁজে দেখলে হয়।”
হিমেন জানতে চায়, “কোথায়?”
“নদীর ধারে। সামার ভ্যাকেশনে আমি আর ছোটু প্রায়ই নদীর ধারে ঘুরতে যেতাম, গল্প করতাম। মাঝে-মধ্যে ও নিজেই সাইকেল চালিয়ে চলে যেত। মনখারাপ হলে ও একা-একাই নদীর কাছে বসে থাকে। বলেছিল আমাকে।”
সত্যবান মৃদু ধমক দিলেন, “আগে বলিসনি কেন?”
রমিত বলল, “সত্যদা, বাচ্চা ছেলে। সব কি ওর মাথায় আসবে ঠিক সময়ে? ফোন করে বলে দিচ্ছি। এখনই দু-তিনজন যেন নদীর ধারে গিয়ে খুঁজে দেখে।”
সবাই চুপচাপ। গোপালদা গালে হাত দিয়ে বসে আছে, কড়াইতে ডাল পুড়ে গেল। রাকিব, নাড়ু, লাট্টু বিছানায় বসে আছে, মুখে কথা নেই কারও। কিছুক্ষণ পরে রমিত হাসিমুখে বলল, “ছোটুকে পাওয়া গিয়েছে। নদীর ধারে জলের কাছে একা বসে ছিল। রাকিব, তুমি জানালে বলেই খুঁজে পেলাম।”
সত্যবান স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বললেন, “বাঁচলাম। ছোটুর মা এখনও পৌঁছননি এখানে। তাহলে বিশ্রী কাণ্ড হত। ভাই রমিত, তুমি এদিকে শুনে যাও। আলোচনা আছে।”
সত্যবানের ঘরে বিছানায় বসে রমিত বলে, “সত্যদা, কী বলবে বলে ডাকলে?”
“বলছি, ছেলেটাকে আর এখানে রাখা ঠিক হবে না। হিমেনকে আগেই বলেছি। যা কাণ্ড বাধাল! তোমার বোর্ডিং, তোমার সিদ্ধান্ত। বেশ তো চলছিল। সবাই পড়াশোনায় ভালো, তাই আলাদা করে দেখিয়ে দিতে হত না। পিছিয়ে পড়া ছেলে, তাকে আলাদা করে দেখানোর জন্য কে সময় দিতে পারবে?”
“কাউকে রেখে দিতে হবে। স্পেশাল টিউটর।”
হিমেন মাথা দোলায়, “না, রমিত। সেটা ঠিক হবে না। বাকিরা কী দোষ করল? একজনের জন্য শুধু টিউটর আসবে, তা হতে পারে না। নাড়ু যেমন পড়েই না। তা নিয়ে দস্যিটা ভাবেও না। ছোটু তেমন নয়। ওকে নিয়ে তুই কী করবি এখন?”
রমিত বলল, “ভাবতে হবে। সমস্যা থেকে পালিয়ে গেলে চলবে না। সমাধান করতেই হবে। ছোটুর মা অনেক ভরসা করে ওকে এখানে পাঠিয়েছেন। এখন ছোটুকে তাড়িয়ে দেব? না, এটা অন্যায় হবে। ছোট্ট ভুল ক্ষমা করে দেওয়া যায় না?”
হিমেন হাসল, “তুই আমার চোখ খুলে দিলি। ঠিক আছে। ছোটুর ছোট্ট ভুল মাফ করে দিয়ে কী করা যেতে পারে?”
***
রমিত ব্যালকনিতে চুপচাপ বসেছিল। রাত নেমে আসছে, ব্যালকনির সামনে ঝাঁকড়া আমগাছটায় লাইট পোস্টের হলুদ আলো এসে পড়েছে। সমস্যাটা মাথায় জট পাকিয়ে যাচ্ছে, কোনও সমাধান আসছে না তার মাথায়। ফেরার পর ঊষা ভবনের অফিসে সে ছোটুকে একা নিয়ে বসেছিল। মাথায় হাত বুলিয়ে জানতে চেয়েছিল, “এরকম করলি কেন তুই? কী হয়েছে? আমাকে খুলে বল।”
ছোটু চোখ মুছতে মুছতে বলেছিল, “আমার ভালো লাগছে না।”
“কেন?”
“এখানে পড়াশোনায় আমি সবচেয়ে খারাপ। একটাতেও পাঁচের বেশি নম্বর পাইনি।”
“অঙ্কে যে আঠারো পেয়েছিস!”
“রাকিবের জন্য পেয়েছি। ও কত করে শিখিয়েছে আমাকে।”
রমিত হেসেছিল, “বোকা ছেলে! নাড়ুও তো কম পেয়েছে। ও নাকি ক্লাসে লাস্ট হয়েছে এই পরীক্ষায়। ও তো মনখারাপ করেনি। দিব্যি হাসিখুশি আছে।”
“নাড়ু খেলাধুলোয় ভালো। ও ঢোল বাজাতেও জানে। আমারই কোনও গুণ নেই।” ছোটু ফোঁপাতে লাগল, “রেজাল্ট ভালো না করলে তোমরা রাখবে এখানে?”
হেসে ফেলেছিল রমিত, “এই কথা! তুই এখানেই থাকবি। একেবারে টেন ক্লাস অবধি তুই এখানকার বোর্ডার থাকবি। রেজাল্ট নিয়ে মাথা ঘামাব না আমরা।”
“অমন থেকে কী লাভ? মা বলেছে যে লেখাপড়ায় ভালো না হলে কোনও লাভ নেই। তার চেয়ে খেটে খাওয়া ভালো।”
“ও নিয়ে তোকে ভাবতে হবে না। এই সবে ক্লাস সিক্সে পড়ছিস।” রমিত বলেছিল।
“ক্লাসে অনেকে খুব হাসছিল। বলছিল যে আমি আসলে ফেল করেছি। ফেল করলেও ক্লাস সেভেনে উঠে যাব। পাশ-ফেল নাকি নেই!” ছোটু বলেছিল।
“সবাই লেখাপড়ায় ভালো হতে পারে?” রমিত হেসেছিল, “তা কীভাবে পালিয়েছিলি?”
“পেছনের পাঁচিলে উঠে লাফ মেরে রাস্তায় নেমেছিলাম।”
“নেমেই হেঁটে হেঁটে নদী পৌঁছে গেলি? পা ভাঙতে পারত। একা পেয়ে তোকে যদি কেউ জোর করে নিয়ে চলে যেত? মা কান্নাকাটি করতেন। সবাই বিপদে পড়ত। এবার থেকে আর ওরকম করবি না। মন না চাইলে আমাকে জানাবি। তোকে বাড়িতে রেখে আসব। বুঝেছিস?”
ছোটু বলল, “আমার যে বাড়িতেও যেতে ইচ্ছে করছে না। তখন চা দোকান বা গ্যারেজে কাজ করতে হবে।”
কীভাবে ছেলেটাকে ধরে রাখা যায়? সবাই তো লেখাপড়ায় উজ্জ্বল হয় না। রমিত বাইরের দিকে তাকাল। রাস্তায় একজন রিকশা চালিয়ে যাচ্ছে। রিকশা চালাতে চালাতে আপনমনে গান গাইছে, ‘হরি দিন তো গেল সন্ধ্যা হল পার করো আমারে।’ বয়স্ক মানুষ, বেসুরো গলা, তবু নিজের খেয়ালে গাইছে।
রমিতের মাথায় নিমেষেই খেলে গেল চা-দোকানের সেই ভোরবেলার দৃশ্য। ছোটু হাতপাখা দিয়ে উনুনে বাতাস করতে করতে গুনগুন করে গান গাইছিল। ওই হাড়কাঁপানো শীতেও দিব্যি নিজের খেয়ালে ছেলেটা গেয়ে চলেছিল। গানটা শুনেই তো তার ছোটুর প্রতি বিশেষ আকর্ষণ তৈরি হয়েছিল।
পরের দিন সকালেই রমিত ঊষা ভবন গেল। সত্যবান অবাক হলেন, “আরে তুমি? এত সকালে?”
রমিত বলল, “ছোটু কী করছে?”
“বিছানায় শুয়ে আছে।”
ছোটু বিছানায় কুঁকড়ে শুয়ে ছিল। রমিতকে দেখেই সে উঠে বসল।
“এখনো শুয়ে আছিস কেন?”
ছোটু জবাব দেবার আগেই নাড়ু বলল, “দেখো না কাকু, কী ঝামেলা! মুখ-হাত ধুয়ে আবার শুয়ে পড়েছে। ওর নাকি কিছুই ভালো লাগছে না।”
“তোর ভালো লাগছে তো এখানে?” নাড়ুকে জিজ্ঞাসা করল রমিত।
নাড়ু দাঁত বের করে হাসে, “কী সুন্দর আছি এখানে। ক্লাসের বন্ধুরা যাকে বলে ‘বিন্দাস’ থাকা। ওই কথাটা শিখেছি নতুন স্কুলে। পেটভরে খাচ্ছি, স্কুল যাচ্ছি। রোজ সকালে সামনের মাঠে তিরিশ পাক ছুটছি। ব্যায়াম করছি। পরের বার স্কুলের স্পোর্টসে চ্যাম্পিয়ন হতেই হবে।”
“ব্যস? শুধু স্কুল স্পোর্টসে চ্যাম্পিয়ন হলেই চলবে? ওটা হতে পারলে তোকে একজন কোচের কাছে পাঠাব। যেদিন জেলাতে চ্যাম্পিয়ন হতে পারবি সেদিন বুঝব কিছু একটা করেছিস।” রমিত বলল, “তোকে ওই জন্যই এখানে এনে রেখেছি। দেখি, এই অবোধ বাচ্চাটাকে ঠিক করি।”
এতক্ষণে ছোটুর মুখে কথা ফোটে, “আমি বাচ্চা নই।”
“বাচ্চা না হলে কেউ অকারণে অমন পালিয়ে যায়? ভালো করে বোস। একখানা গান কর দেখি। সকালে তোর গান শুনতেই ছুটে এলাম।” রমিত বলল।
“গান? ও তো আমি জানি না।”
“আমার এই কবজিটা দেখেছিস? এটা দিয়ে ষণ্ডা-গুন্ডাদের একবার চেপে ধরলে ছটফট করে। যা বলা হচ্ছে সেটাই কর।” মৃদু ধমক দিল রমিত।
লাট্টু বলল, “যে-গানটা তুই রাতে খেয়েদেয়ে প্রায়ই করিস সেটাই কাকুকে শুনিয়ে দে। ভয় পেলে চোখ বন্ধ করে গা।”
ছোটু চোখ বুজে গাওয়া শুরু করল, ‘রঘুপতি রাঘব রাজা রাম/ পতিতপাবন সীতারাম/ ঈশ্বর আল্লা তেরো নাম/ সবকো সম্মতি দে ভগবান।’
গান শেষ হতেই ছোটুর পিঠে আলতো থাপ্পড় দিল রমিত, “এই তো, বেশ হয়েছে।”
ছোটু বলল, “ওরে বাবা, পিঠে বড়ো লাগল।”
“লাগুক। ওটা তোকে আদর করলাম। ভালোই লাগছিল শুনতে, তবে গলা কাঁপছিল। আমার ভয়ে?”
“হ্যাঁ।”
“ভয় করলে পরের বার জোরেই মারব। এই তো দিব্যি গাইলি। কে বলে তোর কোনও কোয়ালিটি নেই? ইচ্ছে হলেই নিজের আনন্দে গাইবি। আমি দেখছি তোর জন্য কী করা যায়। গান শিখতে চাস?”
ছোটু মাথা নেড়ে বলল, “শিখব।”
“সময় লাগবে। শুরু থেকে শিখতে হবে তোকে। তবে একটাই শর্ত আছে। ভুলেও এই জায়গা ছাড়ার কথা ভাবা যাবে না। মাঝপথে গান ছেড়ে দিলে পিটিয়ে ডুগডুগি বানাব।” রমিত বলল, “গানের কিছুই নিশ্চয়ই জানিস না?”
ছোটু বলল, “হারমোনিয়াম বাজাতে জানি। সা-রে-গা-মা পারি।”
“কীভাবে জানলি?”
“বাবা হারমোনিয়াম বাজিয়েই তো ট্রেনে ট্রেনে গান শোনাত। আমাকে শিখিয়েছিল। বাবা মারা যাবার পরে মা হারমোনিয়ামটা বিক্রি করে দিল।”
“কেন বিক্রি করেছিলেন, জানিস কিছু?”
ছোটু মাথা নেড়ে বলল, “হারমোনিয়াম বিক্রি করে আমার জন্য সাইকেল কিনে দিয়েছিল।”
“সাইকেলের জন্য বায়না করেছিলি নিশ্চয়ই?”
ছোটু লজ্জা পেয়ে হাসে, “হ্যাঁ। মায়ের কাছে সাইকেল কেনার টাকা ছিল না। তাই বিক্রি করে দিয়েছিল।”
নাড়ু বলল, “ও কাকু, বলছিলাম যে আমি ঢোল বাজাতে পারি। এবার বাড়ি গিয়ে ঢোলটা এনে রেখেছি। তুমি শুনবে?”
রমিত হেসে বলল, “অন্য একদিন শুনে যাব। আজ নয়। তবে ওই কথাই রইল। স্পোর্টস আর খেলাধুলোয় ভালো কিছু না করতে পারলে তোকে রাখব না। পরীক্ষার রেজাল্ট খারাপ হলেও কিছু বলব না।”
নাড়ু বলল, “ও আমি ঠিক পারব।”
ছোটুর দিকে তাকিয়ে রমিত বলল, “দ্যাখ, নাড়ুর নিজের ওপর ভরসা আছে। ও ঘাবড়ে যায় না। এটাকে কী বলে রে, লাট্টু?”
লাট্টু বলল, “আত্মবিশ্বাস। মানে হল নিজের প্রতি বিশ্বাস।”
রমিত বলল, “দ্যাটস ভেরি গুড, লাট্টু। মন দিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যা।”
***
রোববার সকালে দেখা করতে এসে সুলেখা শাড়ির আঁচলের গিঁট খুলে কয়েকটি দোমড়ানো নোট বের করলেন। সত্যবানের হাতে দিতেই তিনি জানতে চাইলেন, “টাকা কেন দিচ্ছেন? আমরা ছেলেদের রাখার জন্য কোনও টাকা নিই না। শুরুতেই রমিত বলেছিল তো আপনাকে?”
“জানি। ওটা হারমোনিয়াম কেনার টাকা।”
“হারমোনিয়াম কেনার টাকা?”
“হ্যাঁ, বাবু। শুনলাম ছোটু গান শিখবে। তার জন্য যন্ত্রটা লাগবে যে!”
সত্যবান বলেন, “আপনি কেন দেবেন? রমিত ব্যবস্থা করে দেবে।”
সুলেখা বলেন, “ছোটুর বাবা চলে যাবার পরে হারমোনিয়ামটা ঘরেই পড়ে ছিল। ছেলেটা সাইকেল কেনার আবদার করল। গরিব মানুষ, টাকা কোথায় পাব? তাই ওটা বেচে সাইকেল কিনে দিয়েছিলাম। হারমোনিয়াম দেখলেই খুব কষ্ট হত বাবু। ছোটুর বাবার কথা মনে পড়ত খুব। বেচে দিতেও কষ্ট হয়েছিল।”
“বাবু বলবেন না আমাকে। ও-টাকা আমরা নিতে পারব না।”
সুলেখা জলভরা চোখে তাকালেন, “চা-দোকানে কাজ করে যে টাকা ও পেত, জমিয়ে রাখতাম। মা হয়ে অতটুকু ছেলের কষ্টের রোজগারে হাত দিতে পারি? ওর ভবিষ্যতের জন্যই বাঁচিয়ে রেখেছিলাম। ওর টাকাতেই হারমোনিয়াম কিনে দিচ্ছি। আপনাকে নিতেই হবে।”
পরের দিন হিমেন এবং সত্যবান দরদাম করে একটি পুরোনো হারমনিয়াম কিনে নিয়ে এলেন। ছোটুর মায়ের দেওয়া টাকাতে নতুন হারমোনিয়াম হবে না। তাছাড়া রমিত শুনে বলেছে, “পুরোনো হারমোনিয়াম কিনে নে হিমেন। এখন ওতেই শুরু হোক। ছেলেটার মন বসলে, ঠিকঠাক শিখতে পারলে বেশ ভালো একখানা হারমোনিয়াম কিনে নেব।”
গানের স্যার এলেন শনিবার। এখন থেকে প্রতি শনিবার অফিস-রুমেই সন্ধ্যার সময় ছোটুকে গান শেখাবেন তিনি। স্যারের নাম পরিতোষ রায়, রোগা চেহারা, বেশ লম্বা। মুখে সুগন্ধি পান পুরে তিনি বললেন, “আজ থেকে শুরু হল তোর গান শেখা। গানকে আমরা বলি সঙ্গীত। সঙ্গীত হল সাধনা। রোজ প্র্যাকটিস করতে হবে। প্রথমে সা-রে-গা-মা দিয়েই শুরু করব। ছ’দিন ওতেই গলা সেধে যেতে হবে। ফাঁকি দিলে মাথায় জোরে গাঁট্টা পড়বে। তাহলে শুরু হোক।”
সত্যবানের নিষেধ ভেঙে পটল একবার পা টিপে টিপে জানালা দিয়ে উঁকি মেরে দেখল। তার পেছনে রাকিবও কৌতূহলে দেখতে এসেছে। একবার দেখে নিয়েই সিঁড়ি দিয়ে ওপরে চলে গেল দুজন।
রাকিব বলল, “ছোটুর গলা কাঁপছে।”
পটল চোখ নাচিয়ে বলল, “শুরুতে অমন হয়। তবে গানের স্যারকে দেখেছিস? কী রোগা! লম্বা লম্বা হাত-পা। একদম ফড়িং।”
“ঠিক বলেছ দাদা। আজ থেকে ফড়িং-স্যার নাম দিলাম।”
রোববার ভোরে উঠে হাত-মুখ ধুয়ে হারমোনিয়াম নিয়ে বসে পড়ল ছোটু। নাড়ু এর মধ্যেই সামনের মাঠে দৌড়ঝাঁপ শুরু করে দিয়েছে। লাট্টু ছুটির দিনে একটু দেরি করে বিছানা ছাড়ে। সে চোখ কচলে তাকাল। না, এখন রুমে থাকা যাবে না। সে সিঁড়ি দিয়ে নেমে মাঠে গেল।
নাড়ু বলল, “কী ব্যাপার? আজ হঠাৎ মাঠে?”
“ছোটু হারমোনিয়ামে প্যাঁ-পোঁ করছে। আর ঘুম হয়?”
নাড়ু হাসে, “কী ঝামেলা! বেলা অবধি ঘুমোতে পারবি না রোববার। বেশ জব্দ হয়েছিস। নে, জগিং কর। হালকা লাগবে। আরাম পাবি।”
মাঠে একবার জগিং করেই লাট্টু বসে পড়ল। নাড়ু হ্যাঁচকা টানে তাকে উঠিয়ে দিয়ে হাসে, “ওসব চলবে না। এদিকে তুই ‘খেলাধুলোর উপকারিতা’ লিখবি খাতায়, শরীর নড়াবি না। আরও তিনবার জগিং কর। না করলে চিমটি কাটব।”
তিনবার সারা মাঠে জগিং সেরে হাঁপাতে লাগল লাট্টু।
নাড়ু হাসল, “কেমন লাগছে?”
“হাঁপ ধরে গেল।”
“প্রথমটায় অমনি হয়। কাল থেকে আমার সঙ্গে প্র্যাকটিস করবি, বুঝেছিস?”
পরের দিন সকালে ডাকাডাকি করেও লাট্টুর সাড়া পেল না নাড়ু। ছোটু হেসে ইশারায় বুঝিয়ে দিল, মাঠে যাবার ভয়ে খাটের তলায় লুকিয়েছে লাট্টু। নাড়ু বলল, “বেরিয়ে আয়। না-হলে গায়ের ওপর টিকটিকি ছেড়ে দেব।”
সভয়ে বেরিয়ে এল লাট্টু, “এটা ঠিক হচ্ছে না। একে বলে টর্চার।”
“তোকে টর্চ কখন দেখালাম?”
লাট্টু রেগে বলল, “টর্চ নয়, টর্চার। বাংলা মানে হল অত্যাচার। হনুমান, তুই বাজে করছিস কিন্তু। সত্যদাকে বলে দেব।”
নাড়ু বলল, “বল গে যা। সত্যদা রোজ সকালে ঘুম থেকে উঠে আসন করে। ভুজঙ্গাসন, হলাসন। কী সুন্দর শরীর বাঁকাতে পারে। সত্যদাকে বললে তোকেই উলটে ওইসব আসন শিখিয়ে ছাড়বে। আসন না জগিং, কোনটা তুই করতে চাস?”
মুখ তেতো করে লাট্টু বলল, “ছোটুটা দেখছি ঝামেলা করল। রোজ সকালে আ-আ করে ঘুম ভাঙিয়ে দিচ্ছে। তুই অমনি চান্স পেয়ে আমাকে জগিং করাচ্ছিস।”
“জগিং নয়, তোকে আজ দৌড়তে হবে।” নাড়ুর চোখে মিচকে হাসি।
***
পাশের ক্লাস থেকে চেঁচামেচির আওয়াজ আসতেই সিক্স বি সেকশনের কয়েকজন ছুটে গেল। সেকেন্ড পিরিয়ড সবে শেষ হয়েছে, থার্ড পিরিয়ড শুরু হবে এখনই। নাড়ু ও বাকি তিনজন দেখল ক্লাসরুমের বাঁদিকটা খালি হয়ে গেছে। ছেলেরা হুড়োহুড়ি করে ডানদিকের বেঞ্চের দিকে ছুটে আসছে।
“কী হল রে?”
“সাপ!” ভয়ে চিৎকার করল অনেকে।
“কোথায়?”
“ওই তো, জানালার কাছে।” ক্লাসের একজন আঙুল তুলে দেখাল।
নাড়ু দেখল, লোহার শিকের ফাঁক দিয়ে একটা সাপ উঁকি দিচ্ছে। শরীর গলিয়ে সাপটা জানালা পেরিয়ে ক্লাসরুমের দেয়ালের দিকে এগোচ্ছে। নাড়ু হাসল, “কী ঝামেলা! এটাকে দেখে তোরা ভয় পাচ্ছিস?”
সে জানালার কাছে এগিয়ে যেতেই ক্লাসের একজন আর্ত চিৎকারে বলল, “যাস না রে নাড়ু। সাপের বিষ থাকে। কামড়ে দিলে সব্বনাশ হবে।”
নাড়ু গ্রাহ্যই করল না। সে বাঁহাত বাড়িয়ে সাপটাকে ধরে ফেলল। শূন্যে দু-বার পাক খাওয়াল সেটাকে, তারপর গলায় জড়িয়ে দাঁত বের করে হাসল, “এটাকে বাইরে ফেলে দিয়ে আসি। হেলে সাপ, বিষ নেই। কিছুই করবে না। ব্যাটা যাতে এদিকে আসতে না পারে তার ব্যবস্থা করি।”
নাড়ুর পেছনে পেছনে ক্লাস সিক্সের দুটো সেকশনের সমস্ত ছেলে কৌতূহলে ছুটল। ক্লাসরুম থেকে দূরে সামনের ঘাসে ভরা চিলতে মাঠে এসে নাড়ু হলুদ রঙের রোগা সাপটাকে হাতে করে পাঁচিলের বাইরে ছুড়ে দিল জোরে। তা দেখে নির্মলও পিঠ চাপড়ে বলল, “তোর কী সাহস মাইরি!”
নাড়ু তাচ্ছিল্যে বলল, “আরে ধুর। গাঁয়ে থাকার সময়ে কত হেলে সাপ দেখেছি, ধরেওছি। মাঠেঘাটে ঘুরে বেড়ায়। মারিনি কখনও। তোরা ওটাকে দেখে ভিরমি খাচ্ছিলি? কী ঝামেলা!”
ঝামেলা অবশ্য ফেরার সময়েই শুরু হল। আজ হীরালাল স্কুলের কয়েকটা ছেলে আবার তাদের দেখতে পেয়েই টিটকিরি দিয়ে চলল। হিমেনদার উপদেশ মেনে ওরা যথারীতি চুপ ছিল।
“শশধরের শসারা, বুক ফাটে মুখ ফোটে না।”
গাবলু বলল, “চুপ করে থাক সবাই। ওরা বলছে বলুক।”
হীরালাল স্কুলের একটা ছেলে সাইকেলে করে যাওয়ার সময়ে গাবলুর মাথায় চাঁটি মেরে দিল, “কী রে সুমো? ভালো আছিস।”
গাবলু এমনিতে শান্ত, সে রাগে না সহজে। আজ ফোঁস করে উঠল, “গায়ে হাত দিলি কেন?”
“গায়ে হাত কোথায় দিলাম?” ছেলেটা ঘুরে এসে গাবলুর থুতনি নেড়ে দিল, “আহা রে, লাগল?”
পটল ছুটে এসে থাপ্পড় কষাল ছেলেটার গালে, “এটা কেমন লাগল?”
মুহূর্তেই দু-পক্ষের হাতাহাতি শুরু হয়ে গেল। হীরালাল আদর্শ বিদ্যায়তনের স্কুলের ছেলেরা সংখ্যায় কম হলেও তাদের গড় বয়স বেশি, সবাই নাইন বা টেনে পড়ে। তাদের সঙ্গে গায়ের জোরে ঊষা ভবনের ছেলেরা পারল না। রাকিব এতক্ষণ সবাইকে থামানোর চেষ্টা করছিল। একটি ছেলে তাকে ঘুসি মারতেই সে মাটিতে পড়ে গেল। উঠে দাঁড়িয়ে ধুলো ঝেড়ে সে ছেলেটার চুলমুঠি ধরে ফেলল, দমাদ্দম ঘুসি চালাতে লাগল। ছেলেটা পড়ে গেল মাটিতে, গোঙাতে লাগল। রাকিবকে তিনজন ঘিরে ধরেও বাগে আনতে পারল না। সে কনুইয়ের ঝটকায় ওদের ঠেলে দিল। একজনের পেট লক্ষ্য করে রাকিব ঘুসি চালাতেই সে যন্ত্রণায় বসে পড়ল। অমনি বাকিরা সাইকেলে উঠে দ্রুত পালিয়ে গেল।
মাটিতে পড়ে থাকা দুজনের দিকে হাত বাড়িয়ে রাকিব হাসল, “কী হল? বন্ধুরা যে ফেলে পালিয়ে গেল! উঠে পড়ো, চুপচাপ ঘরে যাও। আর কখনও লাগতে এসো না। চুপচাপ সহ্য করি বলে দুর্বল ভেবেছিলে? বড়ো দাদা সব, লজ্জা করে না?”
গাবলু বলল, “কেউ কিন্তু ফিরে কিছু বলবি না। সত্যদা শুনলে রেগে যাবেন। হিমেনদা যে জানতে পারলে কী করবেন!”
লাট্টু বলল, “কেন বকবে? আমাদের দোষ কী?”
পটল বলল, “লাট্টু, তুই বাচ্চা আছিস। রাস্তায় আমরা মারপিট করেছি জানতে পারলে খুব রেগে যাবেন হিমেনদা। পানিশমেন্ট দিতেও পারেন।”
রাকিব মাথা নাড়ে, “কীভাবে লুকোব পটলদা? ছোটুর কপালে লেগেছে। তোমাকে ঘুসি চালাতেই তুমি নীচু হয়ে বসে পড়লে। মিস হয়ে ওটা ছোটুর কপালে লেগেছে। ফুলে গেছে। লাট্টুরও পা পড়ে গিয়ে ছড়ে গেছে, রক্ত ঝরছে এখনও।”
শুকনো মুখে দুরুদুরু বুকে সবাই ঊষা ভবনের গেট পেরিয়ে ঢোকে। কপালে আজ কী আছে কে জানে!
নাড়ু ব্যাগ রেখে সোজা দৌড়ে রান্নাঘর গেল। গোপালদা তখন আটা বেলছিল। সে বলল, “অত অস্থির হচ্ছিস কেন বাবা নাড়ুগোপাল? নিশ্চয়ই খিদের চোটে অন্ধকার দেখছিস? এই তো রুটি বানাচ্ছি, সঙ্গে আলুর দম। দু-মিনিট তর সইছে না?”
নাড়ু বলল, “কী ঝামেলা! আমার শুধুই খিদে পায়? ফিরিজে আইসকিরিম আছে?”
“আইসক্রিম!”
নাড়ু বলল, “দূর ছাই, আইসক্রিম নয়, বরফ। টেনশনে ভুল বলেছি গো।”
“আছে। কী করবি?”
“ছোটুর কপালে লেগেছে। তাই লাগবে।”
“কীভাবে লাগল?”
নাড়ু অধৈর্য হয়ে বলল, “লেগে গেছে। কপাল ফুলেছে। শিগগির দাও দেখি।”
ফ্রিজ খুলে গোপালদা বলল, “বরফের ট্রে-টা নিয়ে যা। ফেরত দিয়ে যাবি কাজ হয়ে গেলে।”
নাড়ু ছোটুর কপালে বরফ বুলিয়ে দিতে দিতে বলল, “খুব লেগেছে?”
“না। অনেক মার খেয়েছি আগে। ও কিছুই না।”
“আলুর মতন ফোলাটা কমে যাবে। বরফ দিয়ে দিলাম।” নাড়ু হাসল, “লাট্টুটার হাত ছড়েছে। কী যে করা যায়!”
“তোকে কিছু করতে হবে না। এসে গেছি।”
নাড়ু ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল, পটলদা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। পটল বলল, “লাট্টু, ডেটল আর তুলো এনেছি। পান্ডেজিকে কানে কানে বললাম। উনি অফিস-রুম থেকে এনে দিলেন।”
সন্ধ্যা বাড়তেই রান্নাঘর থেকে মাংসের গন্ধ ভেসে এল। নাড়ু বলল, “মাংস রান্না হচ্ছে। আজ শুক্কুরবার। শুক্কুরবারে মাংস তো হয় না। রান্নাঘরে একবার উঁকি মেরে আসি।”
ফিরে এসে নাড়ু হাসিমুখে বলল, “মাংসই হচ্ছে।”
রাতে খেতে বসে গাবলু অবাক হল, “আজ মাংস?”
নাড়ু বলল, “আগে গন্ধ পাওনি?”
“না। নীচতলা থেকে গন্ধ অত পাব কী করে?”
সত্যদা লম্বা বারান্দায় চেয়ার পেতে বসলেন, “বাবারা, তোদের জন্য হিমেন সন্ধ্যাবেলা মাংস কিনে আনতে বলল। তোরা মারধর খেয়েছিস শুনলাম। কথায় আছে, পেটে খেলে পিঠে সয়। মাংস খেলে গায়ে বল পাবি।”
সবাই মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল। কারও মুখে কোনও কথা নেই।
সত্য বললেন, “হাত গুটিয়ে বসে থাকলি কেন তোরা? কী ভেবেছিস? আমি কিছু দেখতে পাই না, শুনতে পাই না? বরফের খোঁজ চলছে, ডেটল চাওয়া হচ্ছে, সব শুনেছি আমি।”
পটল ফিসফিস করে জিজ্ঞাসা করল, “কে বলে দিয়েছে?”
নাড়ু মাংসের দিকে তাকিয়ে আছে। কেউ খাওয়া শুরু করেনি বলে সে হাত গুটিয়ে বসে আছে। জিভের জল সামলে সে বলল, “তা আমি কীভাবে জানব? মা কালীর দিব্যি, আমি কিছু বলিনি।”
সত্যবান হাসেন, “লাট্টুকে ডেকে সব শুনেছি আমি। তখন অফিসে হিমেনও এসেছিল। তোদের কীর্তির কথা জানলাম। হিমেন খুশিতে মাংস আনতে বলল। সত্যবানের কাছে সত্য লুকনো যায় না, বুঝেছিস?”
গাবলু আমতা আমতা করল, “না, ইয়ে মানে, ওই…”
সত্যবান হাত তুলে থামিয়ে দিলেন, “অত সাফাই দিতে হবে না। বেশ করেছিস। অন্যায় সহ্য করতে নেই। অন্য স্কুলের ছেলেরা আগে গণ্ডগোল শুরু করেছিল, গায়ে হাত তুলেছিল। চুপচাপ অন্যায় সহ্য যারা করে তাদের ভীরু বলা হয়। তবে তোরা প্রথমে মারপিট আরম্ভ করলে কড়া শাস্তি দিতাম। রাতের খাওয়াই বন্ধ করে দিতাম। আমার ছেলেরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মার খায়নি। এতে আমি খুশি, হিমেনও খুশি। তবে তোরা আমার কাছে গোপন করলি, এটা জেনে দুঃখ পেয়েছি।”
গাবলু বলল, “ইয়ে, মানে ভেবেছিলাম তুমি বকবে খুব।”
“অন্যায় করলে বকতাম। রমিত ওই স্কুলের হেড-স্যারকে ফোন করে সব বলেছে। পরের দিন ওরা আর ওরকম যাতে না করে সেটা উনি দেখবেন। একদম ভয় পাবি না। হীরালালের ছেলেরা আবার এসে মারপিট শুরু করলে পুলিশ ধরে নিয়ে যাবে। রমিত বলেই দিয়েছে। ওরা আসলে ভিতু, তাই দুজনকে ফেলে পালিয়ে গিয়েছিল। এবার থেকে তেমন কিছু হলে বা ঘটলে আমাকে জানাবি। নে, খাওয়া শুরু কর। বেশি মাংস আনা হয়েছে, ইচ্ছে হলে চেয়ে নিবি।”
সত্যবান চলে যাচ্ছিলেন। ঘুরে দাঁড়িয়ে বললেন, “বলতে ভুলে যাচ্ছিলাম। লাট্টু, খাওয়ার পর আমার রুমে আসবি।”
“কে-কেন?”
“ওষুধের দোকানে ফোন করে দিয়েছি। ঠিক দশটার সময়ে ওখান থেকে একজন আসবেন। তোকে টেট-ভ্যাক দেওয়া হবে। রাস্তায় পড়ে ছড়েছে, রক্ত বেরিয়েছে। চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে এই ইঞ্জেকশন নিতেই হবে তোকে।”
পটল বলল, “আমরা তখন যাব।”
“কেন? একটা ইঞ্জেকশন দেওয়া হবে, তোদের আসার দরকার নেই।”
পটল বলল, “ও কিন্তু খুব চেঁচাবে। ধরাধরি করতে হবে।”
লাট্টুকে ইঞ্জেকশন দেবার সময়ে তাকে দুজন ধরে রাখল। স্পিরিট দিতেই সে চিৎকার জুড়ে দিল। সত্যবান হেসে বললেন, “স্পিরিট দিয়েছে। ইঞ্জেকশন এখনও দেয়নি। তাতেই মড়াকান্না শুরু করে দিলি?”
ইঞ্জেকশনের সূঁচ ফোটাতেই প্রচণ্ড জোরে চেঁচিয়ে উঠল লাট্টু।
***
সত্যবান সবাইকে অফিস-রুমে ডেকে বললেন, “অক্টোবরের তিন তারিখ মানে পরশু একজন এখানে আসবেন। তিনি মস্ত অফিসার, ওইদিন তাঁর ছেলের জন্মদিন। সেই উপলক্ষ্যে তিনি তোদের খাওয়াবেন।”
নাড়ু জিজ্ঞাসা করল, “খাওয়া কখন হবে? দুপুরে না রাতে?”
“জানি তোর মাথাতেই এটা সবার আগে আসবে। রাতেই খাওয়াবেন। ছেলের জন্মদিনে তিনি অন্য কিছু ছেলেকে খাওয়াতে চান। তাই আসবেন। জানিয়ে রাখলাম। একটু ভদ্রসভ্য হয়ে থাকবি ওইদিন। হ্যাংলামো করবি না। কেউ জন্মদিনে শুধু ছেলে বা মেয়ের জন্যই টাকা উড়িয়ে দেন। কেউ অন্যদের জন্য ভাবেন। বড়ো হলে যেন মনে থাকে। অন্যের জন্যও ভাবতে হয়।”
দিনটা রোববার, দুপুরে বিশেষ কিছু রান্না হল না। নাড়ু অন্যদিনের তুলনায় অর্ধেক খেল। গোপাল পান চিবোতে চিবোতে জিজ্ঞাসা করল, “কী হল নাড়ুগোপাল? আজ মুখে কিছু রুচল না যে!”
নাড়ু বলল, “পেট খালি রাখতে হবে না? রাতে ভালোমন্দ খাওয়া হবে।”
“তার জন্য দুপুর থেকেই উপবাস?”
“বড্ড হ্যাংলা তুই!” পটল বলল।
“খাওয়ার ব্যাপারে আমার কোনও লজ্জা নাই গো পটলদা।”
রাত আটটায় গেটের সামনে দুধসাদা রঙের গাড়ি এসে দাঁড়াল। গাড়ি থেকে এক ভদ্রলোক নেমে এলেন। একটু পরে নামল একটি ছেলে। মেরুন রঙের পাঞ্জাবি আর সাদা পায়জামা পরেছে সে, শ্যামলা গায়ের রঙ, সামান্য খুঁড়িয়ে হেঁটে সে অফিস-রুমে এল।
হিমেন বলল, “ছেলেরা, এ হল শুভদীপ দে। আজ এর জন্মদিন।”
ছেলেরা আজকে একদম চুপ, অন্য সময় কলরবে অস্থির করে দিত অফিস-রুম। গাবলু ঊষা ভবনে সবচেয়ে সিনিয়র; সে ফুলের তোড়া তুলে দিল শুভদীপের হাতে। উষা ভবনে সবচেয়ে পরে এসেছে রাকিব, হিসেবমতো সে জুনিয়র। রাকিব ভদ্রলোকের হাতে ফুলের তোড়া তুলে দিল।
হিমেন বলল, “ইনি হলেন রজত দে। ফরেস্ট অফিসার। তোদের স্কুল যাবার পথে দেখবি মস্ত জায়গা, গাছগাছালিতে ভরতি, মাঝখানে একটা সুন্দর বাংলো। সেই বাংলোতে ইনি থাকেন।”
রমিত ইশারা করতেই সবাই রজতবাবুকে প্রণাম করল একে একে। রজতবাবু শুরুতে বলেছিলেন, “এ কী, প্রণাম কেন? থাক ওসব।”
রমিত বলল, “না। ওটা ভালো অভ্যেস। সম্মান করতে শেখা ভালো।”
শুভদীপ শহরের নামি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ক্লাস সেভেনে পড়ে। ইংরেজি মিডিয়ামে পড়া ছেলেমেয়েদের ব্যাপারে পটলের অন্যরকম ধারণা ছিল। তারা বেজায় অহংকারী, অন্যদের নীচু নজরে দেখে, অতি পাকা হয়ে থাকে। লাট্টু ফিসফিস করে বলল, “পটলদা, তুমি যেমন বলেছিলে, এই ছেলেটা তেমন নয়।”
পটল ঘাড় নেড়ে বলল, “তাই দেখছি। এ তো তোর থেকেও লাজুক।”
বিশাল একখানা কেক এনেছিলেন রজত। টেবিলে কেক রেখে তার ওপর গুনে গুনে তেরোখানা মোমবাতি সাজাল হিমেন। সবাই হাততালি দিয়ে ‘হ্যাপি বার্থডে’ বলল; মোমবাতি নিভিয়ে কেক কাটল শুভদীপ। প্রত্যেকের মুখে নিজের হাতেই একটি করে বড়ো টুকরো দিল সে।
রাকিব অবশ্য এর মধ্যেই শুভদীপের সঙ্গে ভাব জমিয়ে ফেলেছে। সে ছোটুকে বলল, “জানিস, শুভর মা নেই? দু-বছর আগে মারা গেছেন।”
“ইস।”
“জিজ্ঞাসা করলাম যে ও খুঁড়িয়ে হাঁটছিল কেন। জন্ম থেকেই ওর বাঁ পা নাকি ওরকম। পা টেনে হাঁটে।”
“পড়াশোনায় কেমন জেনেছিস?” লাট্টু জিজ্ঞাসা করল।
“তোর খালি পড়াশোনা নিয়েই মাথাব্যথা। ওটা জিজ্ঞেস করা যায় নাকি?”
রমিত বলল, “মাইক্রোফোনের ব্যবস্থা করেছি। এবার তোরা একে একে সবাই এসে নিজের সম্পর্কে বলবি।”
গাবলু জানতে চায়, “কী বলব, রমিতকাকু?”
“নিজের নাম, ক্লাস বলবি। কী ভালো লাগে তা বলবি। হবি থাকলে বলবি। নিজেকে নিয়েও দু-চারটা কথা বলতে পারিস। দেখি, তোরা কেমন স্মার্ট হয়েছিস!” সবাইকে কাছে ডেকে বলল রমিত। ইতিমধ্যে একটি করে ছোটো প্যাকেট পেয়েছে সবাই। ঝুরিভাজা, লাড্ডু আর দুটো সন্দেশ আছে প্যাকেটে।
নিজের নাম, ক্লাস বলে চেয়ারে এসে বসে পড়ল অনেকে। গাবলু শুধু তা বলে থামল না। হেসে বলল, “আমাকে অনেকে সুমো বলে। খারাপ লাগে না শুনতে। সুমোরা সাহসী হয়। আমি বেশ ভিতু। হবি কিছুই নেই। তবে ঘুমোতে খুব ভালো লাগে।”
পটল বলল, “ভালো নাম নবেন্দু হলেও সবাই ভালোবেসে ‘পটলদা’ বলে। কমিকস পড়তে ভালো লাগে। গোয়েন্দা গল্প পড়ি খুব। স্কুল লাইব্রেরিতে থাকা সমস্ত ডিটেকটিভ বই শেষ করে ফেলেছি।”
নাড়ু বলল, “আমার অনেক নাম। কোনটা যে বলব! নিতাই দাস নাম হলেও সবাই নাড়ু নামেই চেনে। পড়তে এক্কেবারে ভালো লাগে না। খেলাধুলা, দৌড়ঝাঁপ করতে পারলে সব ভুলে যাই।”
রাকিব গেল মাইক্রোফোনের সামনে। সে বলল, “একটা কথা নাড়ু বলেনি। ও র-ফলা উচ্চারণ করতে পারে না। ফ্রিজ তাই ওর কথায় ফিরিজ।”
হাসির রোল উঠল আবার। রাকিব নিজের নাম, ক্লাস ইত্যাদি বলে হাসল, “অঙ্ক করতে ভালো লাগে। ঘুমের মধ্যেও অঙ্ক করি। ইতিহাসকে বাঘের থেকেও বেশি ভয় পাই।”
সুপ্রতীম রাকিবের সঙ্গে একই রুমে থাকে। সে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “ইতিহাস পরীক্ষার দিন সকাল থেকেই ওর পেটখারাপ হয়ে যায়। ওটা বললি না কেন, রাকিব?”
লাট্টু বলল, “আরশোলা, টিকটকিকে খুব ভয় পাই।”
পটল থামিয়ে দিয়ে বলল, “সবচেয়ে বেশি ভয় পায় ইঞ্জেকশনকে।”
লাট্টু তোতলাল, “মো-মোটেই না। আমার ঘুমোতে ভা-ভালো লাগে। সকালে উঠতে বড়ো কষ্ট লাগে।”
শুভদীপ হাততালি দিয়ে বলল, “আমারও।”
ছোটু নিজের পরিচয় জানিয়ে মাইক্রোফনে বলল, “আমার টম অ্যান্ড জেরি কার্টুন খুব পছন্দ। তবে টম সবসময় শাস্তি পায়, এটা ভাল্লাগে না। বেড়াল আমার খুব প্রিয়। বড়ো হলে আমি অনেক বেড়াল পুষব।”
নাড়ু মাথা নেড়ে বলে ফেলল, “ছ্যা, বেড়াল দেখলে গা জ্বলে যায়। খালি আরাম করবে আর ঘুমোবে। একবার এক হুলো বেড়ালকে ধরে আমি পি.টি. করিয়েছিলাম, কিছুতেই ছাড়িনি।”
শুভদীপ অবাক হল, “কামড়ায়নি তোমাকে?”
“কী করে কামড়াবে? বেড়ালটার মুখে শক্ত করে রুমাল বেঁধে দিয়েছিলাম কিনা!”
পরিচয়-পর্ব শেষ হলে রমিত শুভদীপকে বলল, “তোমার আজ স্পেশাল দিন। মাইক্রোফোনের সামনে যাও, কিছু বলো।”
“ও আমি পারব না। মাইক্রোফোনের সামনে গেলেই হাত-পা কাঁপে, গলা শুকিয়ে যায়।” শুভদীপ অনুরোধ করল, “তুমি আমার হয়ে বলে দাও না কাকু। খুব ভালো লেগেছে। গ্র্যান্ড কাটছে এখানে। প্লিজ।”
“বেশ। তাই হোক।” রমিত মাইক্রোফোনে বলল, “শুভদীপ লজ্জা পাচ্ছে বলতে। তাই ওর হয়ে আমিই বলে দিচ্ছি। দারুণ লাগছে এখানে এসে। সবাইকে থ্যাংকস জানিয়েছে। তবে এটাও একটা অনুষ্ঠান, ওর জন্মদিনের অনুষ্ঠান। আড়ম্বর নেই, প্রাণ আছে। যে-কোনো অনুষ্ঠানে গান থাকতেই হয়। ছোটু চেষ্টা করবে একটা গান শোনানোর। এদিকে আয় ছোটু।”
ছোটুর মুখ শুকিয়ে গেল, “আমি পারব না।”
রমিত চোখ পাকিয়ে কাছে গিয়ে নীচু গলায় বলল, “আবার ভয়? পারতেই হবে। এই দেড় মাসে কী শিখেছিস তাহলে?”
“কোনও গান যে এখনও শিখিনি। ফড়িং-স্যার বলেছেন যে আগে গানের গ্রামার ভালো করে শেখাবেন, তারপর গান।”
“গানের স্যারের নাম ফড়িং-স্যার?”
ছোটু জিভ কেটে কুঁকড়ে গেল, “আমি না, রাকিব আর পটলদা নামটা দিয়েছে।”
“একটা গান তো জানিস। ওটাই কর।”
রমিতের কথায় ছোটু মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়াল। চোখ বন্ধ করে শুরু করল, ‘তুমি নির্মল করো মঙ্গল করে মলিন মর্ম মুছায়ে।’ কী যে লজ্জা আর ভয় লাগছে তার! এতজনের সামনে গান করা যায় নাকি? সে চোখ বন্ধ করল। প্রথম লাইনটা গাওয়ার পরেই তার ভয় কেটে গেল। চোখ বন্ধ, এখন তেমন ভয় নেই, বেশ লাগছে তার। গলা ছেড়ে বিভোর হয়ে সে গাইতে থাকল। গান শেষ হতেই সে ভয়ে ভয়ে চোখ খুলল। কী আশ্চর্য, হাততালি দিচ্ছে সবাই। তার মানে ভালো হয়েছে? বিশ্বাস হচ্ছিল না ছোটুর।
রজত দে এসে হাত ঝাঁকিয়ে বললেন, “সো বিউটিফুল! শ্যামসুন্দর, তুমি মন দিয়ে গান শেখো। কখনও যেন তোমার গান শেখা থেমে না যায়।”
ক্যাটারার খাবার পৌঁছে দিয়েছে এর মধ্যেই। খেতে বসে গেল সবাই। শুভদীপ রাকিবের পাশে বসল। ফ্রায়েড রাইস, চিলি চিকেন, সর্ষে-ইলিশ, দই, মিষ্টি, পাঁপড়, চাটনি তৃপ্তি করে খেল সবাই। রজত নিজের হাতে পায়েস পরিবেশন করলেন। সবার শেষে ছিল আইসক্রিম। নাড়ু তিনবার চিলি চিকেন, দু-বার ফ্রায়েড রাইস নিল। আরও নেবার ইচ্ছে ছিল তার। সত্যবান কাছে এসে নীচু গলায় বললেন, “রাতে শরীর খারাপ হলে হাসপাতাল নিয়ে ছুটতে পারব না। এবার তোর রাক্ষুসে খাওয়াটা থামা।”
রাত সাড়ে দশটায় রজত চলে গেলেন। শুভদীপ গাড়িতে উঠে হাত নেড়ে সবাইকে গুড নাইট জানাল। নাড়ু ঘরের মধ্যেই হাঁটা শুরু করে দিল।
“শুবি না?” লাট্টু জিজ্ঞাসা করে।
“একটুকুন হেঁটে নিই। হজম হতে হবে।” নাড়ু পেটে হাত বুলিয়ে বলল।
লাট্টু বলল, “কী সুন্দর কাটল আজ! তাই না রে ছোটু?”
“হুম।”
“তোর আজ স্পেশাল দিন ছিল রে ছোটু। গান গাইলি, কত প্রশংসা পেলি!”
ছোটু বলল, “সবারই স্পেশাল দিন ছিল আজ।”
কেন যে আজ খেতে খেতে তার মায়ের কথা ভীষণ মনে পড়ছিল। ইস, মা কতদিন এমন ভালোমন্দ খেতে পায়নি। দাদাও এমন ভোজ খেতে পায় না।
ছোটু ঘুমিয়ে পড়ল। স্বপ্নে সে একটা ট্রেনের কামরায় উঠল; কাঁধে হারমোনিয়াম ঝুলিয়ে সে গান গাইতে লাগল। হঠাৎ বাবা হাসিমুখে হাজির হয়ে তার কাঁধ থেকে হারমোনিয়াম নামিয়ে বলল, “না, ছোটু। আমার মতো কষ্ট করতে হবে না তোকে। তুই গলা সাধ আরও, রোজ মন দিয়ে প্র্যাকটিস করবি। ট্রেনে ট্রেনে নয়, অনেক লোকের সামনে ফাংশনে গাইতে হবে তোকে।”
ঘুম ভেঙে গেল তার। সে খাটের নীচ থেকে হারমোনিয়াম বের করে আনল। তারপরেই মনে হল, এখন হারমোনিয়াম নিয়ে গান গাওয়া যাবে না। সবাই ঘুমোচ্ছে, ঘুম ভাঙলে সবাই বিরক্ত হবে খুব। সে বিছানায় রাখা হারমোনিয়ামটাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকল অনেকক্ষণ।
ঘুম ভাঙল নাড়ুর ঠেলায়, “ কী রে ছোটু, বিছানায় যন্তরটা রেখে ঘুমোচ্ছিলি কেন? কী ঝামেলা! ওঠ, পাঁচটা বাজে।”
মুখ-হাত ধুয়ে হারমোনিয়াম নিয়ে বসে পড়ল ছোটু। লাট্টু অঘোরে ঘুমোচ্ছে, আজ গলা সাধার সময়েও তার ঘুম ভাঙল না। নাড়ু বলল, “আজ ওকে আর তুলছি না। একাই মাঠে নামি।”
***
পরিমল বললেন, “এবার একটা গান শেখাচ্ছি তোকে। সহজ সুরের গান, তুই পারবি। রবীন্দ্রনাথের গান। আলো আমার আলো আলো ভুবনভরা। শুনেছিস কখনও?”
“না।”
“দু-মাস তোকে তাল, লয় কিছুটা শেখাতে পেরেছি। স্বরলিপি এবার তুই বুঝতে পারবি। আগে গানটার স্বরলিপি তোর খাতায় লিখে দিই।”
গেয়ে শোনালেন পরিমল। ছোটু ভুল করছিল গাইতে, পরিমল বিরক্ত হলেন না।
“প্রথমটায় অমন হয়। তুই প্রথম থেকে আবার শুরু কর।”
সাতবার গানটা গাইল ছোটু। ভুল করলে পরিমল নিজে গেয়ে শুনিয়ে দিচ্ছেন। ঘড়িতে রাত ন’টা বাজল। পরিমল বললেন, “আর মাত্র তিনদিন পরেই তোর স্কুলে পুজোর ছুটি পড়ে যাচ্ছে। ঘরে থাকলে আবার ফাঁকি দিস না যেন। রোজ সকালে একঘণ্টা গলা সাধা, তারপর গানটা তিন-চারবার গেয়ে যাবি। একুশ দিন পরে তোকে নিয়ে বসলেই বুঝে যাব কী করেছিস। আমার গাঁট্টা খেলে মাথা দশ মিনিট জ্বলে। মনে রাখবি।”
বাড়ি যাবার আনন্দে অস্থির হলেও পঞ্চমীর দিন সবার মনখারাপ হয়ে গেল। কতদিন দেখা হবে না, একসঙ্গে মজা করা যাবে না, হইচই করে থাকা ভুলে যেতে হবে। কারোর ফোন নেই। তবে বাবা-মার ফোন আছে, সুযোগ পেলে ফোনে কথা বলা যাবে।
ঊষা ভবনের প্রতিটি ছেলেকে পুজোয় জামা-প্যান্ট উপহার দিয়েছে রমিতকাকু। তার দাদা টাকা পাঠিয়েছেন, সেই টাকায় সবাইকে জামা-প্যান্ট কিনে দিয়েছেন রমিতকাকু। নতুন জামা পরে মায়ের সঙ্গে প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে ঘুরল ছোটু।
পু্জোর ছুটি দেখতে দেখতে কেটে গেল। আবার ঊষা ভবন, আবার স্কুল। লাট্টু প্রথম দু-দিন মাঝে-মধ্যেই কান্নাকাটি করল। তার নাকি ঘরের জন্য মনকেমন করছে।
নাড়ু বলল, “কী ঝামেলা! বাচ্চাদের মতন কাঁদিস কেন?”
লাট্টু রেগে বলল, “তুই কী বুঝবি? আমি বাচ্চা হলে তুইও বাচ্চা।”
নাড়ু হাসল, “ঘর থেকে আসার সময় অমন মনখারাপ আমারও হয়েছিল। তোদের পেয়ে এখন ফূর্তি লাগছে খুব।”
গাবলুদা খানিক রোগা হয়ে গেছে। দুর্গাপুজোর পরেই তার টাইফয়েড হয়েছিল, এখনও শরীর দুর্বল। প্রথমদিন স্কুল যাবার পরে আর গেল না। বাড়ি থেকে নাকি এখন আসতে দিতে চাইছিল না। গাবলুদা বলল, “ঘরে শুয়ে থাকতে আর ভাল্লাগে নাকি? ক’টা দিন ভালোমন্দ খাব, ঘুমোব এখন।”
ছোটু বুঝতে পারল গাবলুদা কী বলতে চাইছে। ঘরে এখানের মতো ভালমন্দ খাওয়া তারও জুটত না। এখানে সকালে বাটার-টোস্ট আর ডিম, স্কুল যাবার আগে ভাত-ডাল-তরকারি-মাছ, স্কুল থেকে ফিরে কোনোদিন রুটি-তরকারি বা লুচি-আলুর দম, রাতে ডিম বা মাছ। স্কুলে টিফিনে খাওয়ার জন্য রোজ একটা করে কেক দেওয়া হয়।
স্কুল খোলার কয়েকদিন বাদেই হুড়মুড়িয়ে যেন পরীক্ষাটা চলে এল। প্রতিটি রুমে সবাই পড়ছে, পড়া মুখস্থ করছে। টেস্ট পরীক্ষার জন্য এখন দশদিন ছুটি। তারপরেই পরীক্ষা হবে। পরিমল-স্যার বেশ খুশি হয়েছেন, নতুন আর একটা গান শিখিয়েছেন। এখন গান শেখার ছুটি, পরীক্ষা হয়ে গেলে আবার আসবেন।
নাড়ু বইপত্র খুলে বসছে। কিছুক্ষণ পড়ার পরেই সে উঠে পড়ে, “ধুস, মাথাটা বড়ো ভারী লাগছে। অত পড়েই কী হবে? সেভেনে উঠে যাব। ফেল করানোর নিয়ম নাই।”
দুপুরে সবাই খাওয়ার পরে একটু ঘুমিয়ে নিয়ে পড়তে বসে যায়। নাড়ু ঘুমোয় না। দুপুরে ঘুমোলে শরীর হালকা থাকবে না, সে অ্যাথলিট। নীচে নেমে যায়, মাঠের ঘাস ছাঁটে, গাছের গোড়ার মাটি কোপায়।
একদিন এক কাণ্ড হল। নাড়ু ‘বাবা রে, মা রে’ করে ছুটে ওপরে চলে এল। আমগাছের ডালে এক হনুমান বসে ছিল, নাড়ুর দিকে সে তেড়ে এসেছে। সত্যদা তাড়াতাড়ি নীচের গেট বন্ধ করে দিলেন। হনুমান ঢুকে পড়লে মুশকিল হবে। কখনও তিনি নাড়ুর ওপর রাগেন না।
“কী করেছিলি তুই?”
“কিছু না।”
“এমনিই তোকে তাড়া করল?” সত্যদা গর্জে ওঠেন।
নাড়ু কাঁচুমাচু মুখ বলল, “ভ্যাংচাচ্ছিলাম একটুকু।”
“চল, তোকে ওই হনুমানের কাছেই ছেড়ে দিয়ে আসি। হনুমানের থাপ্পড় কী তা টের পাবি।”
নাড়ু কাতর গলায় বলল, “পায়ে পড়ি গো সত্যদা, অমন কোরো না। আমি নিজেই দশবার কান ধরে ওঠবোস করছি।”
“বন্ধ কর। বিচ্ছু ছেলে।” সত্যদা বললেন, “কাল থেকে দুপুরে পড়বি। নীচে নেমে ঘুরঘুর করবি না।”
লাট্টু হাসল, “দ্যাখ, নাড়ু ভয় পেয়েছে। ও-ও ভয় পায়।”
***
পরীক্ষার রেজাল্ট বেরোল। দিন পনেরো আগে পরীক্ষা শেষ হয়ে গেলেও সবাই ঊষা ভবনেই আছে। সকাল-বিকেল ছোটো মাঠেই দু-খানা টিমে ভাগ হয়ে ক্রিকেট খেলে দিব্যি সময় কাটছে। রেজাল্ট বেরোলে তবেই ছুটি, বাড়ি যেতে পারবে।
গাবলুদা ক্লাস নাইনে সেকেন্ড হয়েছে। পটলদা ক্লাস এইটে ফার্স্ট। রাকিব সেভেনে সেকেন্ড। ক্লাস সিক্সে লাট্টু ফার্স্ট। লাট্টুকে জড়িয়ে ধরল নাড়ু, “আরিব্বাস, তুই বিরলিয়ান্ট ছেলে মাইরি।”
“ব্রিলিয়ান্ট?”
“ওই হল। আমি সব সাবজেক্টে ফেল। তবু পাশ, ক্লাস উঠে গেলাম। কী ঝামেলা!”
ছোটু অবশ্য সব বিষয়েই পাশ করেছে। কোনোমতে পাশ, একটাতেও ভালো নম্বর পায়নি। একমাত্র বাংলাতে সে পঞ্চাশ পেয়েছে। তার খুব ভয় ছিল যে কয়েকটা বিষয়ে ফেল করবে, বকাঝকা খাবে। রাকিব বলল, “পরের ক্লাসে সবেতেই এমন পঞ্চাশের ওপর পেতে হবে, মনে রাখিস।”
“তুই ফার্স্ট হতে পারলি না কেন?”
“ফার্স্ট কেন হতেই হবে? অঙ্কে ফুল মার্কস পেয়েছি। ওতেই আনন্দ।” রাকিব হেসে বলল।
ভালো রেজাল্টের উপহার হিসেবে রমিতকাকু আর হিমেনদা মিলে রাতে খাওয়াল সবাইকে। চিকেন বিরিয়ানি, রায়তা, রাজভোগ। নাড়ু কম খেল, একবারও চাইল না। ছোটু অবাক হল, “সব্বাই আর একবার নিচ্ছে। তুই নিবি না?”
নাড়ু শুকনো মুখে নীচু গলায় বলল, “আমার কি লজ্জা করে না? ভালো রেজাল্টের জন্য খাওয়া, ফেলু হয়েও খাচ্ছি। কী করব বল, পড়াশোনায় যে মন বসে না।”
বড়দিনের ছুটিতে সবাই সাতদিনের জন্য বাড়ি থাকবে। কাল সকালেই বাবা-মায়েরা নিতে আসবেন। তার সামনেই বাড়ি, দিব্যি হেঁটে হেঁটে চলে যেতে পারে। কাউকে একা বাড়ি যেতে দেবেন না সত্যবান, নিয়ম আছে।
পরের দিন ঘুম থেকে তাড়াতাড়ি উঠে পড়ল ছোটু। কী অবাক ব্যাপার, দাদা এসেছে! দাদা একটা টোটো ডাকল। রাকিব একাই হারমোনিয়াম বয়ে নিয়ে এসেছে নীচে। ছুটি পড়লেও গানের ছুটি নেই। ফড়িং-স্যার তাকে বাড়িতে হারমোনিয়াম নিয়ে যেতে বলেছেন। বাড়িতে প্র্যাকটিস করতে হবে। মাঝরাস্তায় একটা দোকানের সামনে টোটোকে থামতে বলল দাদা। দৌড়ে গিয়ে বড়ো ক্যাডবেরি কিনে এনে তার হাতে দিল, “তোর জন্য। পাশ করেছিস।”
***
পরিমল বললেন, “নিউ ইয়ার্স উপলক্ষ্যে বিদ্যুৎবাহিনী ক্লাব একটা ফাংশন করছে। ছোটু সেখানে গাইবে। আপনি পারমিশন দেবেন তো?”
রমিত বলল, “এখনই ফাংশনে গান? এই তো ক’দিন শিখছে।”
“সাড়ে চার মাস শিখেছে। গানের বেসিকস আগে শিখিয়েছি, গান মাত্র দুটো। তবু চাইছি ও ফাংশনে গাক। সবার সামনে গাওয়ার সাহস পেতে হবে। প্রথমবার সবাই স্টেজে উঠে নার্ভাস হয় শুরুতে, কেটে যায়।”
“আপনি যা ভালো বোঝেন তা করবেন। সত্যিই কি ও স্টেজে উঠে গান গাওয়ার মতো উপযুক্ত হয়েছে?”
“দেখুন, বছরের পর বছর শিখেও অনেকের গান হয় না। ছোটুর গানের প্রতিভা সহজাত। একমাসের মধ্যেই বুঝেছিলাম। তবু ওকে গানের ব্যাকরণ শিখিয়ে গেছি, সেটা হবার পরে মাত্র দুটো গান তুলিয়েছি। আস্তে আস্তে তৈরি করছি। ওর গলা তৈরি করছি। প্রোগ্রামে গাইলে ওর সাহস হবে, উৎসাহ পাবে।”
“বলছেন?”
“ওকে আপনিই আবিষ্কার করেছেন। এরকম কত ছেলেমেয়ে যে পরিচর্যা না পেয়ে হারিয়ে যায়! তবে ওই কথাই রইল। ওকে আমার বাড়িতে কাল থেকে পাঠিয়ে দেবেন? এই ক’দিন প্র্যাকটিস করাতে হবে ওকে। বড়ো ফাংশন করে ক্লাবটা, অনেক সমঝদার শ্রোতা আসেন। খরচ করে কলকাতা থেকে নামি শিল্পীদের আনে।”
“অবশ্যই।”
দায়িত্বটা হিমেনকে দিল রমিত। প্রতিদিন সন্ধ্যায় বাইকে করে সে পরিমল-স্যারের বাড়িতে ছোটুকে পৌঁছে দেবে, হয়ে গেলে নিয়ে চলে আসবে।
নির্দিষ্ট দিনটি চলে এল। সত্যবান দেশের বাড়িতে, তিনি আসতে পারেননি। নিউ ইয়ার্স ইভ, পুলিশের প্রচুর দায়িত্ব, রমিত যেতে পারবে না। সে হিমেনকে বলল, “মোবাইলে ভিডিও করে রাখিস।”
পূজার জামা-প্যান্ট পরেই গাইবে ছোটু। রমিত একটা পাঞ্জাবি, হাফ-জ্যাকেট কিনে দেবে বলেছিল। পরিমল বলেছেন, “থাক। গানটাই আসল। অত পোশাকের দরকার নেই।”
কচিকাঁচাদের আবৃত্তি, নাচ ইত্যাদির পরে ছোটুর পালা এল। প্রথম গান গাইল সে, ‘আলো আমার আলো’।
পরিমল মাথা নাড়েন, “এমনিতে যেমন গায় তেমন গাইতে পারল না। গলা বেশি কেঁপে গেল। ঘাবড়ে যায়নি, পুরোটা গাইতে পেরেছে। দেখা যাক, নতুন যে গানটা শিখিয়েছি কেমন গায়।”
কোনও মিউজিক ছাড়াই ছোটু খালি গলায় গান শুরু করল, ‘সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে।’
হিমেন বলল, “লালন ফকিরের গান গাইছে!”
পরিমল সোজা হয়ে বসলেন। তাঁরও চাপা টেনশন হচ্ছে। আসলে ছাত্রের সঙ্গে আজ যে তাঁরও পরীক্ষা হচ্ছে। গান শেষ হতেই হাততালির ঝড় বয়ে গেল। পরিমল হাসিমুখে বললেন, “হিমেনবাবু, কেমন লাগল?”
হিমেন বলল, “এতটা ভালো গাইবে আশা করিনি।”
“রিস্ক নিয়েছিলাম। লোকগীতি ওর গলায় মানাবে ভেবে এই গানটাই শিখিয়েছি এই চারদিন। উতরে দিয়েছে।”
কলকাতার নামি সুরকার এবং গায়ক আর্য ঘোষাল গ্রিনরুমে ডাকলেন পরিমলকে, “আপনার ছাত্র শুনলাম।”
“হ্যাঁ।”
“ন্যাচারাল ভয়েস। বেশ গাইল। আমি ইম্প্রেসড।”
“ঘষামাজা করে তৈরি করছি। মাত্র চার মাস শিখছে গান।” পরিমল জানালেন।
আর্য বললেন, “আপনার ফোন নম্বর দিন। ছেলেটাকে মনে রাখব। শ্যামসুন্দর রাউতের জন্য কিছু করতে পারি কি না দেখব।”
পরিমল নাম এবং ফোন নম্বর দিয়ে নমস্কার জানিয়ে আবার দর্শকের চেয়ারে বসলেন। এই ব্যাপারটা নিজের মধ্যেই রাখবেন তিনি, কাউকে বলবেন না। নামকরা শিল্পীদের ব্যাপার-স্যাপার আলাদা। এখন অভিভূত হচ্ছেন, ফিরে গিয়েই ভুলে যাবেন। তাঁর এমন অনেক অভিজ্ঞতা আছে।
হিমেন ছোটুর পিঠ চাপড়ে দিল, “চারদিন ধরে তোকে দিয়ে আসা আর নিয়ে আসার জন্য ছুটেছি। পরিশ্রম জলে যায়নি। মান রেখেছিস।”
রাকিবকে জানয়েছিল ছোটু। সেও এসেছে। হাসিমুখে বলল, “নার্ভাস হয়ে যাসনি। জানতাম তুই ঘাবড়ে না গেলে দিব্যি গেয়ে দিবি।”
আনন্দে ভাসতে ভাসতে বাড়ি ফিরল ছোটু। ফুলের তোড়া, মিষ্টির প্যাকেট পেয়েছে সে। মায়ের হাতে তুলে দিল সে। পকেটে একটা খাম দিয়েছিল ফাংশনের কাকুরা। খুলে দেখলেন সুলেখা, “পাঁচশো টাকা!”
দাদা বলল, “গান গেয়ে ভাই রোজগার করল! খুশিতে আমার নাচতে ইচ্ছে করছে।”
ছোটু বলল, “দাদা, তুই কিছু কিনে নিবি ওই টাকায়।”
“মারব এক থাপ্পড়। গান গেয়ে প্রথম রোজগার, খরচ করতে নেই। মা, ওই নোটটা ভাঁড়ে রেখে দিয়ো।”
***
নতুন ক্লাসের বইখাতা পেয়ে গেল সবাই। নতুন বইয়ের গন্ধ ছোটুর কী যে ভালো লাগে! সত্যবান সবাইকে মলাট করতে শিখিয়ে দিয়েছেন। লাট্টু আর ছোটু প্রতিটা বই আর খাতায় মলাট করল উৎসাহে। নাড়ু মুখ শুকনো করে বলল, “কী ঝামেলা! সংসকিরিত পড়তে হবে সেভেনে।”
“সংস্কৃত।” লাট্টু বলল।
“ওই হল। আমার মলাটগুলো করে দে তোরা। বই এখন খুলছি না। সামনে স্পোর্টস। পাখির ডানা করেছি ওটাকে।”
লাট্টু ফিক করে হাসল, “যা জানিস না বলতে হবে কেন? পাখির ডানা নয়, পাখির চোখ। লক্ষ্যভেদে স্থির থাকা বোঝায়।”
“দূর ছাই, খালি ভুল ধরে মরে। আমার ইয়ে এখন খুব চাপ। স্পোর্টসে ভালো কিছু না করলে রমিতকাকু রেগে যাবেন।”
জানুয়ারির সতেরো তারিখে স্পোর্টস, নাড়ু ভোরে উঠে দৌড়ঝাঁপ করে যায়। ঊষা ভবনের মাঠ ছোটো, এখানে তেমন সুবিধা হচ্ছে না। সে কলেজ মাঠে প্র্যাকটিস করতে চায়। সত্যবান বললেন, “পারমিশন দিচ্ছি। তবে তোকে একা ছাড়া হবে না। রাকিব যাবে সঙ্গে। সকাল আটটার মধ্যে ফিরে আসতে হবে।”
বছরের শুরু, পড়াশোনার চাপ নেই, রাকিব তাই রাজি হয়ে গেল। খালি পা, মাঠে কাঁকর খুব, পায়ে কাঁটার মতো ফোটে। দৌড়তে দৌড়তে থেমে যায় নাড়ু, বসে পড়ে।
“তোর একজোড়া জুতো দরকার।”
নাড়ু বলল, “কে কিনে দেবে বল?”
“তুই হিমেনদাকে বল।”
“ধ্যাত, লজ্জা করবে।”
রাকিব নিজেই সত্যবানকে বলল। সত্যবানের কাছে শুনে হিমেন মাথা নেড়ে বলল, “খরচা বাড়ছে। গাবলু ক্লাস টেনে উঠল। ঠিক করেছি ওর জন্য টিউটর রাখব দুজন। ক্লাস টেনের জন্যই শুধু এবার থেকে টিউটর রাখার নিয়ম চালু করছি। ঠিক আছে, বিচ্ছুটাকে স্পোর্টস শু কিনে দেওয়া হবে। তবে যেন যত্ন করে রাখে।”
দু-দিন ধরে চলবে স্কুল স্পোর্টস। এবার সে সাব-জুনিয়র গ্রুপে, ক্লাস সেভেন আর এইট থাকবে এই গ্রুপে।
গাবলু ডেকে বলল, “শোন ঝামেলা, সব ইভেন্টে নেমে যাস না। আসল সময়ে দম পাবি না। শুধু রানের ইভেন্টে নাম দিবি।”
“তাহলে গুরুপ চ্যাম্পিয়ন হব কীভাবে?”
“এইটের বড়ো বড়ো ছেলেরা থাকবে। অত আশা করিস না।”
“তাই হবে।” নাড়ুর মনে হল গাবলুদা ঠিকই বলেছে। সে লং-জাম্প, হাই-জাম্প এসবে নাম দেবে না ঠিক করল। রাকিবও সকালে একই কথা বলেছে। দুজনেই কি আর ভুল বলবে?
প্রথমদিন একশো মিটার, দুশো মিটারের হিটে দৌড়ে ফাইনালে উঠল নাড়ু। দ্বিতীয়দিন ফাইনাল হবে। নাড়ু জোর করে রাকিবকে লং-জাম্পে নামাল, “রাকিব, তোর লম্বা লম্বা ঠ্যাং। পারবি না?”
“প্র্যাকটিস করিনি যে!”
“দূর ছাতা, ক’জনে প্যারেকটিস করে? নেমে যা।”
রাকিব থার্ড হয়ে গেল লং-জাম্প ইভেন্টে। নাড়ু জগিং শুরু করেছে আবার। চারশো মিটারের দৌড় হবে, একেবারে ফাইনাল। দশজন নাম দিয়েছে।
হুইসল দিতেই দৌড় শুরু হল। শুরুতে পিছিয়ে থাকলেও শেষটায় খুব জোরে টেনে দিল নাড়ু। থার্ড হয়ে দৌড় শেষ করল। নাম ঘোষণার সময়ে সেকেন্ড হয়ে গেল সে। নাড়ুর আগে যে দড়ি ছুঁয়েছিল, ট্র্যাক চেঞ্জ করার জন্য সে বাতিল হয়ে গেছে।
ফেরার সময়ে নাড়ু বলল, “কাল আসল রান। জান লড়িয়ে দেব।”
দু’শো মিটার স্প্রিন্টে নাড়ু ফিফথ হয়ে শেষ করল। মুখ কালো করে মাঠের কোণে হাঁটুর মধ্যে মুখ গুঁজে বসেই থাকল। পটল বলল, “ওঠ এবার। আরও রান আছে।”
নাড়ু মুখ তুলে তাকাল, তার চোখে জল। গাবলু মাথায় আলতো হাত বোলাল, “এতেই চোখে জল! কী ঝামেলা! স্পোর্টসম্যান স্পিরিট কাকে বলে জানিস না?”
“সেটা কী?”
“একজন স্পোর্টসম্যান হেরে গেলেও তা সহজভাবে নেয়। সহজে হার মানে না। জানে আবার সুযোগ আসবে। হেরে গেলে রেগে যাওয়া বা ভেঙে পড়া চলে না।”
“গাবলুদা, তুমি কতকিছু জানো গো! আমি মুখ্যুই রয়ে গেলাম।”
“তোর কাজ জানা নয়, ছোটা। উঠে পড়।”
একঘণ্টা বাদে একশো মিটার রানের ফাইনাল হবে বলে ঘোষণা হল তাঁবু থেকে। স্টার্টিং পয়েন্টে পজিশন নিল নাড়ু, তার চার নম্বর ট্র্যাক। হুইসল বাজতেই নাড়ু যেন পাখির মতো উড়ে যাচ্ছে। ধারেকাছে কেউ নেই। মুহূর্তেই ফিনিশিং পয়েন্ট ছুঁয়ে ফেলল নাড়ু। গাবলু তার মোটা শরীর নিয়ে মাঠের ধারেই ডিগবাজি খেল খুশিতে; পটল লাফাতে লাগল। নাড়ুকে জড়িয়ে, মাথায় চাঁটি মেরে, পিঠে আলতো থাপ্পড় মেরে আদরে অতিষ্ঠ করে দিল ঊষা ভবনের ছেলেরা। নাড়ু হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “এখনো আটশো মিটার বাকি যে!”
“পরপর অত পারবি না।”
“কী ঝামেলা! মাত্তর দুটো পেরাইজ পেলে চলবে কী করে?”
“হোক গে। একশো মিটারে ফার্স্ট হল সেরা রানার। তোর মাথায় চ্যাম্পিয়নের ভূত চেপেছে দেখছি।”
“তাহলে আর কিছু নাই যে!”
তখনই নির্মল এসে বলল, “নাড়ু, তুই রিলে রেসে নামবি?”
“চারজন লাগবে যে!”
“আমি আছি, নেপাল আর প্রত্যুষ রাজি। তুই হলে রিলে রেসে নামতে পারব। ক্লাস সেভেন ‘বি’ নামছে। সেভেন ‘এ’ নাম না দিলে প্রেস্টিজ থাকবে না।”
নাড়ু হেসে বলল, “কেলাসের পেরেসটিজ বলে কথা। দৌড়ব।”
নির্মল নাড়ুর হাত ধরে বলল, “লাস্ট রাউন্ড তুই ছুটবি।”
নির্মল চারশো মিটারে থার্ড হয়েছে, আর একটাতেও কিছু হতে পারেনি। লাট্টু রেগে বলল, “তুই রাজি হলি কেন? ও তোর পিছনে শুধু লাগে।”
“ইস্পোর্টসম্যান ইস্পিরিট। গাবলুদা শিখিয়েছে।” নাড়ু স্পোর্টস শু পরে নিল, “রিলেতে এইখান পরব, বুঝলি। খালি পায়ে ছুটে পায়ের তলাটায় বড্ড লাগছে।”
রিলে রেস সমস্ত ক্লাসের জন্য, ক্লাস ফাইভ থেকে টেন অবধি যে-কোনো ক্লাসের ছেলেরা অংশ নিতে পারে। রিলে রেসে তাদের নামতে দেখে ক্লাস টেনের একটা টিমের একজন হেসে বলল, “বাচ্চাগুলো আমাদের সঙ্গে দৌড়বে? রেস শেষ করতে পারবে তো?”
রিলে রেসে স্কুলের ছাত্রদের খুব আগ্রহ, বেশ উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। সেভেন ‘এ’ টিম দুটো ল্যাপের পরে চার নম্বরে, নির্মল প্রচণ্ড জোরে ছুটে দুই নম্বরে নিয়ে এল। তার হাত থেকে ব্যাটন নিয়ে নাড়ু যেন টগবগে ঘোড়ার মতো ছুটছে। সেভেন এ-র ছেলেরা চিৎকার করল, “নাড়ু, জোরে, আরও জোরে।”

ফিনিশিং পয়েন্টের দড়ি ছুঁয়ে ফেলার পরে নাড়ু হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল। রাকিব, গাবলু সবাই ছুটে গেল। নাড়ু উঠে পড়ে দাঁত বের করে হাসল, “টাল সামলাতে পারিনি। কিচ্ছু হয়নি আমার।”
নির্মল এসে নাড়ুকে জড়িয়ে ধরল, “আজ থেকে আমরা বন্ধু। তুই মান রাখলি রে।”
পুরস্কার বিতরণের সময়ে নিতাই দাসকে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন ঘোষণা করা হল। রিলে রেসে ফার্স্ট হবার জন্য হিসেব বদলে গিয়েছে, দুটোতে ফার্স্ট এবং একটাতে সেকেন্ড এই গ্রুপে আর কেউ হতে পারেনি।
বড়ো ট্রফিটা নিতেই তার ক্লাসের ছেলেরা ছেলেরা সোল্লাসে বলে উঠল, “থ্রি চিয়ার্স ফর নিতাই, থ্রি চিয়ার্স ফর নাড়ু।”
নাড়ু হেঁড়ে গলায় চেঁচিয়ে বলল, “থ্রি চিয়ার্স ফর সেভেন এ।”
হইহই করে ফিরল ঊষা ভবনের ছেলেরা। সত্যবান বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছেন। পটল আনন্দে বলে উঠল, “জানো সত্যদা, নাড়ু চ্যাম্পিয়ন। কী রানটাই না দিয়েছে আজ!”
সত্যবানকে গম্ভীর দেখে থমকে গেল সবাই। তারা কি কোনও অন্যায় করেছে আজ? নাহ্, কেউ খাবার ফেলেনি, নিয়ম ভাঙেনি স্কুল যাওয়ার আগে পর্যন্ত।
সত্যবান বললেন, “নাড়ু, একটা খারাপ খবর আছে। তোর বাবা আজ বিকেল চারটায় মারা গেছেন। হঠাৎ বুকে ব্যথা, হেলথ-সেন্টারে নিয়ে যাবার আগেই সব শেষ। আধঘণ্টা আগে ফোনে খবর এসেছে। ফিরতে দেরি হলে আমিই যেতাম স্কুলে।”
নাড়ুর হাত থেকে ট্রফিটা পড়ে গেল সশব্দে। ঝড়ে যেমন গাছ ভেঙে পড়ে সেভাবেই সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। সত্যবান চেঁচালেন, “রাকিব, জল নিয়ে আয় তাড়াতাড়ি। মূর্ছা গেছে বেচারা।”
চোখে-মুখে জলের ছিটে দিয়ে নাড়ুকে অফিস-রুমের বেঞ্চে শুইয়ে দেওয়া হল। নাড়ু চোখ খুলল, কোনও কথা বলল না। সত্যবান জানালেন, “ওর এক কাকা আসছেন। নাড়ুকে নিয়ে যাবেন। মনে হয় মিনিট পনেরোর মধ্যেই পৌঁছে যাবেন। রাকিব, লাট্টু, ছোটু, তোরা মিলে ওর ব্যাগ গুছিয়ে দে। জামাকাপড়, গামছা, ব্রাশ, পেস্ট দিয়ে দিবি।”
মারুতি ভ্যান পৌঁছল সন্ধে ছ’টায়। নাড়ু যেন ঘোরের মধ্যে আছে, শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকছে। গাড়িতে ওঠার মুহূর্তে সে ডুকরে কেঁদে উঠল। সত্যবান তার কাকার হাতে এক হাজার টাকা গুঁজে দিয়ে বললেন, “দস্যিটাকে দেখবেন। সামলে রাখবেন।”
ঊষা ভবন সন্ধ্যা বাড়তেই যেন নিশ্চুপ, নিঝুম হয়ে গেল। রাতে খেতে বসে গাবলু বলল, “ঝামেলাটা চ্যাম্পিয়ন হবার আনন্দ করতেই পারল না।”
ছোটুর সব মনে পড়ে গেল। দু-বছর আগে তার বাবাও চলে গেছে সব ছেড়ে, সেদিনের কথা মনে পড়ছে খুব। রাতে তার ঘুম ভেঙে গেল বার বার।
***
দু-খানা ফাংশনে গান গাইবার ডাক পেয়েছে ছোটু। পরিমলের সঙ্গেই যোগাযোগ করেছিল উদ্যোক্তারা। সরস্বতী পূজা উপলক্ষ্যে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করছে দুটি ক্লাব। বিদ্যুৎবাহিনী ক্লাবের অনুষ্ঠানে ছোটুর গান শুনে তারা উৎসাহী হয়েছে। পরিমল রাজি হলেও সমস্যায় পড়লেন। এখনও পর্যন্ত ছোটু মাত্র চারটি গান শিখেছে, ওই ক’টা গানই গাইবে শুধু? সহজ সুরের গান, চটপট শিখে ফেলতে পারে এমন দুটো গান তাড়াতাড়ি শিখিয়ে ফেলতে হবে। প্রগতি সংঘের ফাংশন আছে সরস্বতী পূজার পরের দিন, তার পরের দিন বীণাপাণি ক্লাবের প্রোগ্রাম।
প্রথমদিন তেমন ভালো গাইতে পারল না ছোটু। পরের দিন প্রথমেই ছোটু শুরু করল, ‘ও ভাই কতই রঙ্গ দেখি দুনিয়ায়।’

হীরক রাজার দেশে সিনেমার বিখ্যাত গান। শেখানোর সময়ে মন খুঁতখুঁত করছিল, ছোটু পারবে তো গাইতে? প্রথমদিন গানটা গাইতে বারণ করেছিলেন, আজ ঝুঁকি নিয়ে ওটা দিয়েই শুরু করতে বলেছিলেন। বেশ গাইছে, দরদ দিয়ে গাইছে, প্রচুর হাততালি পড়ল গান শেষ হতেই। ‘সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে’ ধরল ছোটু। তিনখানা গান গেয়ে স্টেজ থেকে নামল ছোটু। শহরের প্রখ্যাত গায়িকা অনুরাধা ধর ছোটুর গাল টিপে দিয়ে বললেন, “পরিমলদা, এ ছেলে অনেকদূর যাবে।”
হিমেন আসতে পারেনি, সত্যবান সর্দিকাশিতে কাহিল। ছোটুর মুখ শুকনো দেখে পরিমল জানতে চাইলেন, “কী হল? মুখে হাসি নেই কেন?”
“ঊষা ভবনের কেউ আসেনি দেখতে।”
“ওহ্, এই ব্যাপার? কী করবি বল? ওরা সরস্বতী পূজার সময় বাড়ি গেছে। তোর মা আর দাদা তো এসেছে দেখতে।”
“আমিও এসেছি।”
ঘাড় ঘোরাতেই ছোটুর মুখে হাসি ছড়িয়ে পড়ল, “কখন এসেছ গো কাকু?”
রমিত বলল, “মিনিট পঁচিশ আগেই এসেছি। পেছনে দাঁড়িয়ে তোর সব গান শুনেছি। খুব ভালো হয়েছে।”
পরিমল ইতস্তত করে বললেন, “একজন তবলার টিচার রাখতে হবে। তাল, লয় এসব ভালোভাবে শেখার জন্য লাগবেই।”
“আপনি এত দ্বিধা করছেন কেন, স্যার? তবলা তো মাস্ট। ছোটুর মায়ের দেওয়া টাকায় পুরোনো হারমোনিয়াম কেনা হয়েছে। তবলার টিচার রেখে দিন।”
নাড়ু এল তিনদিন বাদে। মাথা ন্যাড়া, একটু রোগা হয়ে গেছে, আগের মতো ছটফটে নেই। কেমন যেন চুপচাপ, স্কুলে গিয়েও শান্ত হয়ে বসে রইল। লাট্টু বলল, “নাড়ু, অত চুপ কেন? তোকে ওর’ম দেখতে মোটেই ভাল্লাগে না।”
ছোটু মাথা নেড়ে বলল, “হ্যাঁ, লাট্টু ঠিক কয়েছে। তুই আগের মতন হয়ে যা।”
এক সপ্তাহের মধ্যে নাড়ু আগের মতোই চঞ্চল হয়ে উঠল। তবে বই খুলে বসে, কিছুক্ষণ পড়ে, বই ফেলে আগের মতন ঘুরে বেড়ায় না। সুকান্ত-স্যার টিফিনের সময় তাকে ডেকে পাঠালেন। নাড়ু ফিরতেই ছোটু জানতে চাইল, “কেন ডেকেছিলেন স্যার?”
“বিভিন্ন স্কুলের ছেলেদের নিয়ে কী একটা স্পোর্টস হবে। আমাকেও নামতে হবে। রেডি হতে বললেন।” নাড়ুর মুখে এতদিন পরে হাসি দেখা গেল।
লাট্টু সুযোগ পেয়ে সুকান্ত-স্যারকে জিজ্ঞাসা করল, “স্যার, নিতাই কোন খেলায় যাচ্ছে?”
“মহকুমা স্কুল স্পোর্টস। যে-কেউ চাইলেই নাম দিতে পারবে না। প্রতিটা স্কুল থেকে তিনটি গ্রুপে একজন করে যেতে পারবে। তারপরে ঝাড়াই-বাছাই হবে। মূল ইভেন্টে প্রত্যেকটা গ্রুপে সারা মহকুমায় মাত্র আটজন অংশ নিতে পারবে।”
“হেভি কম্পিটিশন তাহলে?”
“সফল হতে গেলে কম্পিটিশনের মধ্যে দিয়েই নিজেকে প্রমাণ করতে হয়।” সুকান্ত-স্যার বললেন। তিনি টিফিনের পর নাড়ু আর ক্লাস নাইনের কার্তিককে নিয়ে মাঠে নামলেন। লাট্টু বলল, “স্যার কোচিং করাচ্ছেন ওদের, বুঝলি? স্কুলের প্রেসটিজ কিনা!”
টিফিনের পরে নাড়ুকে ক্লাস করতে হয় না। সুকান্ত-স্যারের কাছে ট্রেনিং চলে। শীতেও সে ঘেমে যায়, ফিরে এসে বিছানায় শুয়ে পড়ে।
“বড্ড খাটুনি রে লাট্টু। দম ঢিলে হয়ে যাচ্ছে।”
প্রতিদিন ভোর সাড়ে পাঁচটায় নাড়ু কলেজ মাঠের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ে। সবাই লেপের তলায় আরামে ঘুমোয় তখন, সে ছুটতে ছুটতে ঘন কুয়াশার মধ্যেই কলেজ মাঠে পৌঁছে যায়।
***
জেলা বইমেলার মঞ্চে গান গাওয়ার ডাক পেল ছোটু। গানের অনুষ্ঠানের মূল দায়িত্বে আছেন অনুরাধা ধর, তিনি আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। পরিমল খুশি। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ছোটুকে গান গাওয়ানো কাজে লাগছে, সে গুণী মানুষদের চোখে পড়ছে। এই প্রথম ঊষা ভবনের ছেলেরা দল বেঁধে এসেছে ফাংশনে ছোটুর গান শুনতে। সত্যবান শীতকাতুরে মানুষ, মাংকি টুপি, ফুলহাতা সোয়েটার পরে তিনিও এসেছেন। ছোটুর গাওয়া দু-খানা গান বেশ প্রশংসা পেল। নাড়ু প্রায় ডিগবাজি খেল ছোটুর পায়ের ওপর, “গুরু, তোকে পেন্নাম। এত ভালো গাইলি! আমার খুব ইয়ে মানে গব্ব হচ্ছিল।”
ছোটু পা সরিয়ে নিল, “করিস কী! তোর মতন আমি কি ছুটতে পারি? তুইও আমাদের গর্ব।”
অনুরাধা হিমেনকে বললেন, “ছেলেটাকে রিয়েলিটি শো-তে পাঠান।”
“কীভাবে পাঠাব?”
“সুরসপ্তক নামের যে রিয়েলিটি শো হয় টিভিতে দেখেছেন?”
“হ্যাঁ। প্রচুর মানুষ দেখেন টিভিতে। আমিও দেখি।”
“ওই প্রোগ্রামের অডিশন শুধু কলকাতায় হত এতদিন। এবার বাঁকুড়া আর পশ্চিম বর্ধমান জেলার অডিশন দুর্গাপুরে হবে। কবে কখন হবে তা জানিয়ে দেব।” অনুরাধা বললেন।
“ও কি পারবে? কয়েক মাস হল গান শিখছে।”
“কেন পারবে না? ওর প্রতিভা সহজাত। ছন্দ, তালের আইডিয়া আছে। দরদ দিয়ে গায়।” অনুরাধা ভরসা দিলেন।
খামটা সুলেখাকে প্রতিবারের মতোই দিয়ে দিল ছোটু। সুলেখা খাম খুলে দেখে বললেন, “এক হাজার! তবে এই টাকা আমি নোব না।”
“কেন নেবে না?” ছোটু অবাক হল, “আমি কি কোনও দোষ করেছি?”
উত্তর না দিয়ে হিমেনের হাতে দু-খানা পাঁচশো টাকার নোট গুঁজে দিলেন সুলেখা, “দাদা, এটা নিতেই হবে। আপনাদের আশীর্বাদেই আমার ছোটু উন্নতি করছে। ঊষা ভবনের ছেলেগুলো ওকে কত ভালোবাসে। নিজের চোখে দেখলুম। আপনি সবাইকে মিষ্টি খাইয়ে দেবেন। না নিলে দুখ্খু পাব।”
ছোটু শুনতে পেয়ে খুব খুশি হল। সত্যবান একশোখানা রাজভোগ কিনে ঊষা ভবন ফিরলেন। রাতে সবার পাতে চারখানা করে রাজভোগ পড়ল। নাড়ু বলল, “আজ একটা দাও গো গোপালদা।”
“বলিস কী! এ যে দেখছি বিড়াল বলে মাছ খাব না।”
নাড়ু মাথা দোলায়, “কাল আমার রান আছে। হিট হবে। শরীর হালকা রাখতে হবে যে!”
গোপালদা হেসে বলল, “তোর জন্য তিনখান রাজভোগ ফ্রিজে রেখে দোব। বিকেলে এসে খাবি।”
রুমে এসে নাড়ু ছলছল চোখে বলল, “গোপালদা আমাকে বড্ড ভালোবাসে, বুঝলি ছোটু। বাবার মতন ভালোবাসে।”
লাট্টু জিজ্ঞাসা করে, “তোর বাবার কথা মনে পড়ছে?”
নাড়ু নিশ্বাস ফেলে শুধু বলল, “খুব।”
***
নাড়ু একশো মিটারের ফাইনালে উঠেছে। গোপালদা শুনে বলল, “কবে খেলা হবে রে বিচ্ছু?”
“কী ঝামেলা! খেলা নয় গো, দৌড়।”
“খেলাই তো বটে। তোর জন্য আমি পূজা দোব ঠাকুরের কাছে।” গোপালদা বলল।
পরের দিন হেড-স্যারের কাছে গাবলু পটল রাকিব, লাট্টু, ছোটু এবং আরও কয়েকজন অনুরোধ করল, “স্যার, আজ নাড়ুর ফাইনাল।”
“নাড়ু?”
“নিতাই দাস।”
“ও! তা তোদের কী দরকার? আমার কাছে এসেছিস কেন?”
“আমরা ওর দৌড় দেখতে চাই।” পটল বলল।
“তা হয় না। তোদের স্কুল টাইমে ছাড়তে পারব না। তোদের ছেড়ে দিলে বাকিরা কী দোষ করল? নিয়ম সবার জন্য সমান।” কড়া গলায় বললেন প্রণব বর্মন।
“আমরা চিয়ার-আপ করতে চাই ওকে।” গাবলু মরিয়া হয়ে বলল।
“যে মাঠে রান দেবে সে নিজেকেই মোটিভেট করতে পারবে। ক্লাসে যা এখন।”
মুখ গোমড়া করে যে-যার ক্লাসে ফিরে এল। মন বসে না পড়ায়। উশখুশ করছে লাট্টু, সহজ অঙ্ক ভুল করায় ক্লাসে বকুনি খেল। ছোটুর মন অস্থির, কখন স্কুল ছুটি হবে তার অপেক্ষা করছে।
ফেরার সময়ে গাবলু বলল, “ইভেন্ট কি আর এতক্ষণে হয়ে যায়নি? ভালো কিছু হলে স্কুলে খবর পৌঁছে যেত।”
রাকিব সায় দিল, “খুশির খবর হলে সুকান্ত-স্যার নাড়ুকে নিয়ে সোজা স্কুলে চলে আসতেন। তাই না?”
“কী জানি!”
ঊষা ভবনে ফিরে সবাই দেখল নাড়ু এখনো আসেনি। গাবলু বারান্দায় পায়চারি করতে লাগল। লাট্টু রাস্তার দিকে তাকিয়ে বসে ছিল, সে হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল, “এসেছে, নাড়ু এসেছে। সুকান্ত-স্যার এইমাত্র ওকে বাইকে করে ছেড়ে দিয়ে গেলেন।”
তাড়াতাড়ি সবাই অফিস-রুমের দিকে ছুটল। চেয়ারে নাড়ু বসে আছে, মাথায় তার ব্যান্ডেজ। লাট্টু চাপাস্বরে বলল, “গাবলুদা, এ কী গো? ব্যান্ডেজ বেঁধে ফিরেছে।”
“হুম, ঝামেলাটা মনে হয় কিছুই হতে পারেনি।”
সবাই চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকল।
নাড়ু হাসল, “কী ঝামেলা! সব্বাই যে বোবা হয়ে গেল।”
“কী হয়েছে মাথায়?”
“শেষটায় টাল সামলানো গেল না। হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেলাম। ন্যাড়া মাঠ, একটা ইয়াবড়ো পাথরে মাথা ঠুকে গেল। স্যার হাসপাতাল নিয়ে গেলেন। ওখানে আচ্ছা করে সেলাই করল। স্যার তারপর আমাকে এখানে দিয়ে গেলেন।”
“ও!”
“সত্যদা তোদের বলেনি? সুকান্ত-স্যার ফোনে বলে দিয়েছিলেন তো।”
সত্যবান বললেন, “তোরা ধরে নিয়ে যা ওকে। নাড়ু একশো মিটারে ফার্স্ট হয়েছে। ফিনিশিং পয়েন্টে গতি সামলাতে না পেরে কাণ্ড করেছে। মাঠে পাথর ছিল কেন? অ্যাথলেটিক্সের মাঠই নয় ওটা।”
মুষড়ে পড়া ছেলেরা যেন প্রাণ ফিরে পেল। গাবলু বলল, “ধরে কেন, ওকে কাঁধে নিয়েই রুম পর্যন্ত যাব। জয়, ঊষা ভবনের জয়।”
হইচই করতে করতে ওরা সিঁড়িতে উঠল। রাকিব জানতে চাইল, “কোনও প্রাইজ দেয়নি?”
“দিয়েছে। হেব্বি দেখতে একটা টরফি আর সার্টিফিকিট।”
“সার্টিফিকিট নয়, সার্টিফিকেট।”
পটল চোখ পাকাল, “শুধু ওর কথার ভুল ধরিস! তা ঝামেলা, প্রাইজ কোথায়?”
“স্যার রেখে দিয়েছেন কাছে।”
শুনে পটল ক্ষোভে বলল, “সুকান্ত-স্যার কেন রেখে দিলেন? উচিত কাজ হল না। তোর হাতে দিল না?”
নাড়ু বলল, “অত জানি না।”
পরের দিন নাড়ু স্কুল ইউনিফর্ম পরতেই লাট্টু অবাক হল, “তুই আজ স্কুলে যাবি?”
“সুকান্ত-স্যার যেতে বলেছেন। একটু পরেই নাকি ছেড়ে দেবেন। স্কুল ব্যাগ নিয়ে যাচ্ছি না তো।”
সত্যদা এসে বললেন, “একটা টোটোকে বলে রেখেছি। তোদের স্যারের সঙ্গে কথা হয়েছে। তা না-হলে এই অবস্থায় তোকে স্কুলে যেতেই দিতাম না। টোটো দাঁড়িয়ে থাকবে। প্রেয়ার শেষ হলেই তোকে নিয়ে চলে আসবে।”
প্রেয়ার শেষ হতেই হেড-স্যার বললেন, “আজ আমাদের স্কুলের এক উজ্জ্বল দিন। অনেক সুখবর আছে। একটার পর একটা বলছি। প্রথম সুখবর হল আমাসের স্কুলের ক্লাস সেভেন এ-র ছাত্র নিতাই দাস সাব-ডিভিশনাল স্কুল স্পোর্টসে একশো মিটার স্প্রিন্টে প্রথম হয়েছে। তাকে আমাদের স্কুলের তরফ থেকে জানাই অভিনন্দন। নিতাইকে এখানে আসতে বলছি।”
সুকান্ত-স্যারের হাতে সুদৃশ্য একটি ট্রফি, তিনি তা তুলে দিলেন নাড়ুর হাতে। তুমুল হাততালিতে ফেটে পড়ল ছেলেরা।
হেড-স্যার বললেন, “নিতাই আরও সাফল্য পাক এই কামনা করছি। এবার পরের ভালো খবর। বিজ্ঞান মেধা পরীক্ষায় ‘ক’ বিভাগে ক্লাস সেভেন এ-র ছাত্র সৌম্যকান্তি দে জেলায় দ্বিতীয় হয়েছে। শহরের মধ্যে সে প্রথম। রাকিব হোসেন, ক্লাস এইট বি-র ছাত্র, সেও স্কুলের মুখ উজ্জ্বল করেছে। ম্যাথ অলিম্পিয়াডে রাকিব জেলাতে প্রথম। ইংলিশ ভার্সনে পরীক্ষা হলেও সে নিজের চেষ্টায় সফল হয়েছে। সৌম্যকান্তি এবং রাকিব দুজনকেই অভিনন্দন। তোমরা ডায়াসে এসো।”
আবার হাততালির ঝড় উঠল ছেলেদের মধ্যে। হেড-স্যার দুজনকে হেসে কিছু বললেন, তা শোনা গেল না।
ক্লাসে ফেরার সময় ছোটু জিজ্ঞাসা করল, “হেড-স্যার তোদের কী বললেন রে?”
“বললেন যে জানতাম ঊষা ভবনের ছেলেরা আমাদের স্কুলের গর্ব। গো অ্যাহেড।”
সন্ধ্যাতেই সত্যাবান ঘোষণা করলেন, “আজ রাতে গ্র্যান্ড ফিস্ট। রমিতবাবু খাওয়াচ্ছেন। রমিতবাবু আর হিমেন রাতে তোদের সঙ্গেই খাবেন।”
রমিত বিকেলেই ক্যাটারারকে বলে দিয়েছে। সে হিমেনকে সঙ্গে নিয়ে পিৎজা কিনল তিরিশটা। ছেলেরা সন্ধেতে খাবে। রাকিবের জন্য টি-শার্ট কিনল, লাট্টুর জন্য ফুল-স্লিভ শার্ট। টি-শার্ট লাট্টুর রোগা শরীরে মানাবে না। নাড়ুর জন্য ট্র্যাকসুট কিনল। রমিত বলল, “আজ বড়ো খুশির দিন। যেজন্য এত পরিশ্রম, এত খরচ তা সফল মনে হচ্ছে। গরিব ঘরের মেধাবী ছেলেদের রেখে ভুল করিনি। দাদাও জেনে খুব খুশি। স্কাইপিতে কথা হল। পূজার সময় একমাসের ছুটি নিয়ে আসবে জানিয়েছে।”
“আজ বুঝেছি পড়াশোনায় কাঁচা জেনেও নাড়ুকে কেন এনে রেখেছিলি।”
“কেন?”
“ছোটবেলায় তুই অ্যাথলিট হবার স্বপ্ন দেখতি। স্পোর্টসে তুখোড় ছিলি।” হিমেন বলল।
রমিত হাসল, “হ্যাঁ। তুই তো জানবিই। একটু বড়ো হতে বুঝলাম যে লেখাপড়া করে উন্নতি করতে হবে। অভাবটাই অ্যাথলিট হবার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াল। নাড়ুর মধ্যে নিজের ওই বয়সটাকে দেখতে পাই। দাদা ছোটো থেকেই গান শিখত, গানের স্কুলে ভরতি হয়েছিল। হঠাৎ বাবা মারা যেতে দাদা পড়াতেই মন দিল, গানের জন্য সময় দিতে পারল না। অভাবও একটা কারণ ছিল। তবে ছোটুকে এমনিই এনে রেখেছিলাম। চাইল্ড লেবার, স্কুল ড্রপ-আউট। দেখে খুব মায়া হয়েছিল।”
সন্ধ্যা সাতটার সময় দুজন ঊষা ভবনে ঢুকল। নাড়ু তখন খাটের নীচ থেকে ঢোল বের করে বাজিয়ে চলেছে, সেই ঢোলের তালে এলোমেলো নাচ করে চলেছে বাকিরা। ছোটু বসে বসে হাততালি দিচ্ছে। তাদের দেখেই ঢোল বাজানো বন্ধ হয়ে গেল, নাচ থামিয়ে দিল সবাই। হিমেন হেসে বলল, “থামলি কেন? বেশ তো চলছিল।”

“আমরা এসে পড়ায় ওরা অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছে। লজ্জাও পাচ্ছে। বাবা নাড়ু, বেশি লাফ-ঝাঁপ করিস না। মাথা ঘুরে যেতে পারে। তোর এখন শুয়ে থাকা দরকার। গাবলু, পিৎজাগুলো নে। প্রত্যেককে একটা করে দিয়ে দে। আমরা রাত ন’টায় আসছি আবার।” রমিত বলল, “তখন একসঙ্গে খাওয়া আর গল্প হবে।”
“তিন সাকসেসফুল ছেলের জন্য উপহার রইল। রাকিবের টি-শার্ট, লাট্টুর জামা, নাড়ুর ট্র্যাকসুট। আজকে নিজেদের মতো এনজয় কর।” হিমেন হাসল, “রমিত আড়াল থেকে তোদের কাণ্ড ভিডিও করে ফেলেছে মোবাইলে।”
***
মার্চের বাইশ তারিখ সুরসপ্তকের পরের পর্বের জন্য অডিশন হবে দুর্গাপুরে। অনুরাধা ধর হিমেনকে জানালেন।
হিমেনের প্রস্তাব শুনে পরিমল বললেন, “প্রথমটায় ইচ্ছে ছিল না। পরে ভেবে দেখলাম একবছর পর থেকেই ওর গলা ভাঙতে শুরু করবে বয়ঃসন্ধির নিয়মে। তখন ফাংশনে গান গাওয়া যাবে না, শুধু প্র্যাকটিস চলবে। সুযোগ পেলে খারাপ হবে না।”
তেরো বছর অবধি যে-কেউ যেতে পারে অডিশনে। হিমেন বলল, “প্রচুর ভিড় হবে, তাই না?”
“তা হবে। এখানে বড়োদের এক রিয়েলিটি শোয়ের অডিশন হয়েছিল মৌর্য হটেলে। ভোর চারটা থেকে লাইন পড়েছিল।”
“আচ্ছা, আমি ব্যবস্থা করছি। আপনি ওকে তৈরি করেই দিয়েছেন। বলছিলাম, এই ক’টা দিন জোর তালিম চলুক।”
পরিমল হাসেন, “তালিম চলবে। তবে ও বেশিদিন শিখছে না। তাই তৈরি করে দিয়েছি ভাবাটা ভুল। দেখা যাক কী হয়।”
একুশে মার্চ ছোটুকে নিয়ে ট্রেনে উঠল হিমেন, সঙ্গে রাকিব এবং নাড়ু। খুব ভোরে ওঠার অভ্যেস আছে নাড়ুর, সে ভোররাতে উঠেই লাইন দেবে। এক জায়গায় দাঁড়ানোর ধৈর্য নাড়ুর নেই, লাইনে দাঁড়ানোর কাজটা করবে রাকিব।
রমিত পইপই করে বুঝিয়েছে, “একদম টেনশন করবি না।”
পরিমল বলেছেন, “ছোটুকে ভয় না পেয়ে যেমন স্বাভাবিক গায় তেমনটাই করতে বলেছি।”
বিকেল সাড়ে পাঁচটায় ‘হোটেল রৌনক’-এ পৌঁছল চারজন। অনলাইনে হিমেন দু-খানা রুম বুক করে রেখেছিল। একটি থ্রি-বেডের রুমে তিনজন থাকল, হিমেন পাশের রুমে থাকবে। হোটেলেই খাওয়াদাওয়ার বন্দোবস্ত আছে। বিকেলে চারজনে টিফিন করল।
রাতে নীচে নেমে সবাইকে ডিনার করিয়ে রুমে পাঠাল হিমেন, “একটা এক্সট্রা মোবাইল এনেছি। ভোর তিনটা পঁয়তাল্লিশে অ্যালার্ম দেওয়া থাকল। খবরদার, ফোন ঘাঁটার চেষ্টা করবি না। আমিও মোবাইলে অ্যালার্ম দিয়ে শুয়ে পড়ছি।”
রুমে ঢুকে নাড়ু বিছানায় ঝাঁপিয়ে পড়ল, “এই নরম গদিতে কখন ঘুমোব ভেবে তর সইছিল না। কখনও ভেবেছিলি এমন একটা হোটেলে রাতে ঘুমোবি?”
রাকিব বলল, “বিশ্বাস হচ্ছে না। এত ভালো হোটেলে খাওয়া, থাকা! ক’জনের কপালে জোটে? নিজেকে লাকি মনে হচ্ছে। নাড়ু, ঘুমিয়ে পড়, খুব ভোরে উঠতে হবে।”
হাই তুলে নাড়ু বলল, “ঘুমিয়ে পড়ছি। টেনশন নিস না, ঠিক উঠে পড়ব।”
ছোটুর খুব ক্লান্ত লাগছিল। সে স্বপ্নেও ভাবেনি যে সুরসপ্তকের জন্য একদিন সুযোগ আসতে পারে। সত্যদার রুমে বড়ো টিভিতে নিয়ম করে সে অনুষ্ঠানটা দেখত। কী যে ভালো লাগত তার! তাকেও ওইভাবে কত লোক টিভিতে দেখবে? সত্যিই?
অডিশনে ভালো গাইতেই হবে তাকে।
হিমেন দরজায় শব্দ পেয়ে বিছানা থেকে উঠে বসল। দরজা খুলে দিতেই নাড়ু ভেতরে এসে বলল, “আমি রেডি হয়ে গেছি। যাচ্ছি।”
“দাঁড়া, আমিও রেডি হয়ে নিই।”
“তুমি কেন যাবে? কাল বিকেলে দেখিয়েছিলে হোটেলটা। মনে আছে। তুমি আর একটু ঘুমিয়ে নাও।”
“তোকে একা ছাড়া যাবে না। এখনও চারদিক অন্ধকার।”
নাড়ু বলল, “ও আমি দিব্যি ছুটতে ছুটতে চলে যাব। কীসের ভয়? কেউ ঝামেলা করলে ল্যাং মেরে ফেলে দেব।”
হিমেনের ঘুমের ঘোর ভাঙছিল না। এত তাড়াতাড়ি ওঠা তার অভ্যেস নেই। সে বলল, “ঠিক আছে, চল। হোটেলের গেট খোলাতে হবে। সিকিউরিটিকে বলে রেখেছি। সাবধানে যাবি। যে-ফোনটা দিয়েছিলাম রাতে, সেটা নিয়ে যা। ফোন করে জেনে নেব।”
হিমেন নাড়ুকে পাঠিয়ে দিয়ে আবার শুয়ে পড়ল। মোবাইলে রিং হতেই সে চোখ মেলে তাকাল। নাড়ুর গলা ভেসে এল, “দু-নম্বরে আছি। একটুর জন্য ফার্স্ট হওয়া গেল না।”
“হাঁদা, এখানে ফার্স্ট হয়ে কী করবি তুই?”
“এমনি বলছিলুম। পেছনে দাঁড়ানো লোকগুলোর মাথা গুনে দেখছি। বাহান্ন ছিল। এইমাত্তর তিপ্পান্ন হল।”
হিমেন বেসিনে ব্রাশ হাতে দাঁড়াল। নাড়ুর সুবাদে তার ভোরের ঘুমটা ভালোই হয়েছে, ফ্রেশ লাগছে। রাকিবকে এবার তুলে দিতে হবে। নাড়ু প্রায় আড়াই ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে আছে, পেটে কিছু পড়েনি। ছেলের আবার খিদে পেলে চোখে অন্ধকার দেখে।
হিমেন রাকিবকে নিয়ে বেরোল। মৌর্য হোটেলের সামনে পৌঁছে দেখল, হোটেলের সামনে থেকে রাস্তার মোড় অবধি লম্বা লাইন পড়েছে। ছোটুকে হোটেলের রুমেই রেখে এসেছে, ও রোদে অপেক্ষা করে কষ্ট পাবে কেন? নাড়ুকে হোটেলে পাঠিয়ে দিল হিমেন। রাকিব লাইনে দাঁড়িয়ে পড়ল। সকাল ন’টার সময় হোটেলের বল রুমের দরজা খুলবে। লাইনে দাঁড়ানো লোকেরা একে একে ফর্ম নিয়ে আসবে। ফর্ম নম্বর অনুযায়ী ডাকা হবে অডিশনে। ঠিক দশটায় শুরু হবে অডিশন।
হোটেলে ফিরে ছোটুকে নিয়ে সকাল ন’টায় বেরিয়ে পড়ল হিমেন। হোটেলের সামনে একজন মাইক্রোফোনে বললেন, “প্রথম দু’শো জন প্রতিযোগীকে আমরা অডিশনের সুযোগ দেব। প্রথমে স্ক্রিনিং। স্ক্রিনিং হবার পরে রেজাল্ট ঘোষণা করা হবে দুপুর তিনটায়। তারপর বিকেল চারটা থেকে হবে ফাইনাল অডিশন।”
ফর্ম পূরণ করে কুপন নিল হিমেন। হোটেলের লাউঞ্জে প্রথম পাঁচজন প্রতিযোগী কুপন হাতে অপেক্ষা করবে এখন। ছোটু আছে দু-নম্বরে।
আধঘণ্টা বাদে বাইরে বেরিয়ে এল ছোটু। হিমেন জানতে চাইল, “কেমন হল?”
“ভালো।”
রাকিব বলল, “হয়ে যাবে?”
নাড়ু মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, “হবে না মানে? পরেরটায় ফাটিয়ে দিতে হবে কিন্তু।”
হোটেলে ফিরে খেয়েদেয়ে বিশ্রাম করে দুপুর আড়াইটায় বেরোল সবাই। ছোটু রাকিবের হাত ধরে হাঁটছে, “খুব টেনশন হচ্ছে।”
নাড়ু বলল, “দূর ছাই! কীসের টেনশন?”
দুপুর তিনটার সময় হোটেলের সামনে মাইক্রোফোনে ঘোষণা হল, ‘যারা ফাইনাল রাউন্ডের জন্য সিলেক্টেড হয়েছে তাদের নাম বলা হচ্ছে।’
একটার পর একটা নাম বলা হচ্ছে। ছোটু উত্তেজনায় আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না। এখনও তার নাম আসছে না!
‘এই সাতজন প্রতিযোগী ফাইনাল অডিশনে থাকবে। অডিশন শুরু হবে বিকেল চারটায়। প্রতিযোগীদের শুধু একজন অভিভাবক-সহ বলরুমে অপেক্ষা করতে অনুরোধ করা হচ্ছে।’
ভিড় আস্তে আস্তে ফাঁকা হয়ে গেল। ছোটুর এখনও যেন বিশ্বাস হচ্ছিল না। তার নাম নেই, সুরসপ্তক রিয়েলিটি শো-তে সে গান গাইতে পারবে না! সে ফেরার সময় কাঁদতে লাগল।
হিমেন বলল, “ছোটু, কান্নাকাটি করার মতো কিছু হয়নি। এই তো গান শেখা শুরু করেছিস, অনেকটা পথ যেতে হবে।”
ব্যাগপত্র নিয়ে সবাই স্টেশনে পৌঁছল। চারটা বিয়াল্লিশের ট্রেন, প্ল্যাটফর্মের বেঞ্চে বসে রইল ওরা। হিমেন চারটা আইসক্রিম কিনে আনল। ছোটু মাথা নেড়ে বলল, “আমি নেব না।”
“কেন?”
“কতকিছু করলে তোমরা আমার জন্য! আমি ফেল করে গেলাম। কিচ্ছু খাব না।”
হিমেন ঠান্ডা গলায় বলল, “এখন আমি তোর গার্জেন। গানের আবার পাশফেল হয় নাকি? দু-মিনিটে যে বেশি ভালো গাইতে পারবে তাকেই পছন্দ হবে। আইসক্রিম ধর। গাওয়ার সময় ঘাবড়ে গলা কেঁপে গিয়েছিল?”
“না।”
“পরিষ্কার গলায় গেয়েছিলি?”
“হ্যাঁ। ‘সব লোকে কয় লালন কী জাত’ গানটা গেয়েছিলাম।”
“বেশ। শোন, গোমড়া মুখ করে থাকলে প্রচণ্ড রেগে যাব। ট্রেনে তিনজনে মিলে গল্প করবি, ঊষা ভবনে ফিরে হাসিখুশি থাকবি। তোকে একটা উদাহরণ দিই। অমিতাভ বচ্চনের নাম জানিস?”
রাকিব বলল, “শুনব না কেন? বাড়িতে টিভিতে অনেক সিনেমা দেখেছি। বিগ বি বলা হয়।”
নাড়ু বলল, “কত্ত বড়ো স্টার! হেব্বি লাগে গো আমার।”
“অমিতাভ বচ্চন একসময় রেডিওর ঘোষক হতে চেয়েছিলেন। অডিশনে তিনি পাশ করতে পারেননি। ভেবে দ্যাখ, সারা ভারত যার ডায়ালগে মুগ্ধ, যার গলা অমন ভারী এবং সুন্দর, তিনিও অডিশনে সফল হতে পারেননি। ওঁর হল ব্যারিটোন ভয়েস যা খুব কম মানুষের থাকে। পরে তিনিই হয়ে গেলেন মেগাস্টার, বিখ্যাত অভিনেতা। হতাশ হয়ে ভেঙে পড়েননি। ছোটু, তুই এখনও বাচ্চা। এতেই মনখারাপ?”
***
ফার্স্ট ইউনিট টেস্টের রেজাল্ট বেরোল এপ্রিলের শেষে। প্রদীপ মণ্ডল চমকে দিয়েছে। মোট নম্বর হিসেব করলে ক্লাস এইটে সে ফার্স্ট, রাকিব সেকেন্ড। ঊষা ভবনের ছেলে প্রদীপ, সেভেনে তার আহামরি রেজাল্ট ছিল না। হিমেন খুশিতে বলল, “ঊষা ভবনে দেখছি ভালো রেজাল্ট করা ছেলেদের সংখ্যা বাড়ছে। এটাই তো চাই।”
নাড়ু সংস্কৃত ছাড়া সব বিষয়ে পনেরোর মধ্যে পাশ মার্কস পেয়েছে। ছোটু সবেতেই পাঁচের নীচে, বাংলায় শুধু আট পেয়েছে। রমিত শুনে চিন্তায় পড়ল। পরিমল অভিযোগ করেছেন যে ছোটু আগের মতো গানে মন দিচ্ছে না। রিয়েলিটি শো-র অডিশনে পাঠানোটা কি তাহলে ভুল ছিল?
পরিমল বললেন, “ভুল নয়। উৎসাহ পাবে ভেবে রাজি হয়েছিলাম। তবে আসল কথা হল সিলেক্ট হলেও ছোটু বেশিদূর যেতে পারত না। অনুষ্ঠানে প্রথম দশজনের মধ্যে থাকতে পারত না।”
“কেন?”
“যারা ওই লেভেলে যায় তাদের রেঞ্জ বেশি। ছোটো থেকে চর্চা করেছে, ক্লাসিক্যাল জানে। সবরকম গান গাইতে হয় ওখানে। ওয়েস্টার্ন টাইপ, হালকা ছন্দের গান, উঁচু গলার হিন্দি গান, ক্লাসিক্যাল, বাউল, সমস্ত কিছু। তবেই কিছু করা যায়। সবার গলা সমস্ত রকম গানের জন্য নয়।”
রমিত বলল, “আগেরবার পরীক্ষায় খারাপ করে পালিয়ে গিয়েছিল। গানেও উদ্যম কমে আসছে, এদিকে পরীক্ষার রেজাল্টও খুব খারাপ।”
“বাচ্চা ছেলে। হতাশা কাটিয়ে ছন্দে ফিরতে একটু সময় লাগবে।”
নাড়ুকে নিয়ে রমিতের তেমন চিন্তা নেই। এপ্রিল মাস থেকেই দেবু মিত্রর কোচিং ক্যাম্পে ভরতি হয়েছে নাড়ু। দেবু মিত্র রাজ্য-সেরা অ্যাথলিট ছিলেন। তিনি আশ্বস্ত করেছেন, “রমিত, আমার হাতে দিয়েছ। কোনও চিন্তা কোরো না। দু-দিন প্র্যাকটিস করিয়েই বুঝে গেছি এ-ছেলের হবে। স্কিল আছে, স্ট্যামিনা সাংঘাতিক, শুধু ওকে টেকনিক্যাল দিকগুলো শিখিয়ে আরও তৈরি করে দিতে হবে।”
“জেলা স্পোর্টস আছে ডিসেম্বরে। ওখানে কিছু হতে পারলে রাজ্যস্তরে যেতে পারবে।”
দেবুদা হেসে বলেছেন, “শুধু স্কুল স্পোর্টস কেন, ওকে আমি অন্য লেভেলেও নামাব। এতদিন ছেলেটা যে কোথায় ছিল! সবাই ক্রিকেটার হতে চায় এখন, নাড়ু মন থেকেই অ্যাথলিট হবার আশা রাখে। নাড়ুকে লং- জাম্পে ট্রাই করে দেখছি। ওই ইভেন্টেও ওর সফল হবার চান্স আছে।”
শুনে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছে রমিত।
ছোটুকে নিয়ে ভাবতেই হচ্ছে। পরিমলের সঙ্গে আবার আলোচনা করল রমিত, “কিছু একটা করতে হবে। ও মোটিভেশন হারিয়ে ফেলছে।”
পরিমল বললেন, “আমিও সেটাই ভাবছি। কত সম্ভাবনা আমার চোখের সামনে হারিয়ে যেতে দেখেছি। গান তো অনেকেই ভীষণ ভালো গায়। সুযোগ ক’জন আর পায়? ছোটুর জন্য কিছু করা দরকার।”
“অন্য কোনও রিয়েলিটি শো নেই?”
“থাকলেও ও তেমন কিছু করতে পারবে না। গান ওর সহজাত, ঠিক করে দেওয়া বিশেষ গানে ও খেই হারাবে।” পরিমল হঠাৎ নড়েচড়ে বসলেন, “ওর গান শুনে আর্য ঘোষাল খুশি হয়েছিলেন। মনে হয় তেমন লাভ হবে না। তবু একবার ফোন করে দেখব।”
সন্ধ্যায় পরিমল জানালেন যে আর্য ঘোষাল মন দিয়ে ছোটুর ব্যাপারটা শুনেছেন। ছোটুর কথা তাঁর মনে ছিল, মিথ্যে প্রশংসা তিনি করেন না। তাঁর গানের স্কুলের নাম হল ‘ইমন’। সেখানে মাসে দু-দিন প্রতিভাবান ছেলেমেয়েদের গান শেখান। প্রত্যেকেকে রীতিমতো টেস্ট করে ভরতি নেন। তাঁর কাছে গান শেখার জন্য অসংখ্য আবেদন আসে। শ্যামসুন্দরকে টেস্ট দিতে হবে না, বিদ্যুৎবাহিনী ক্লাবের ফাংশনেই তার টেস্ট হয়ে গিয়েছে।
মাসে দুটো রোববার কলকাতার লেকগার্ডেনসে ইমন-এর ক্লাস হয়। ছোটু যাবে।
পরিমল বললেন, “অত বড়ো শিল্পীর কাছে শেখার সুযোগ পাওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। প্রাথমিক পাঠ আমি দিচ্ছি, দিয়ে যাব। এই সুযোগ হাতছাড়া করা যাবে না।”
মুশকিল হল, ওই দু-দিন কে ছোটুকে নিয়ে যাবে? রমিত যেতে পারবে না, হিমেন শুধু রোববার অবসর পায়। সত্যবান কলকাতা তেমন চেনেন না।
“ছোটুর দাদাকে বললে হয় না?”
“সে গ্যারেজে কাজ করে।”
“তবু বলে দেখা যাক।”
ছোটুর দাদা সানন্দে রাজি হয়ে গেল। হিমেন জিজ্ঞাসা করে জানল, ছোটুর দাদার ভালো নাম রাধাশ্যাম রাউত, সবাই পল্টু বলেই ডাকে।
“তুমি কলকাতা চেনো?”
“খুব চিনি। কলকাতার একটা মোটর গ্যারেজে আগে কাজ শিখতাম। বাবা মারা যাবার পর মা-ভাইয়ের কাছে চলে এলুম।”
“তাহলে কোনও সমস্যাই নেই। তবে গান শেখানোর দায়িত্ব রমিতবাবু নিয়েছেন। ট্রেনে হাওড়াতে নামবে, ট্যাক্সি করে যাবে লেকটাউন। সময়ে না পৌঁছলে ফিরে আসতে হবে। ফেরার সময় তাড়া নেই, বাসে হাওড়া এসে ট্রেন ধরবে। সমস্ত খরচ করবে ঊষা ভবন। তুমি কি ছুটি পাবে?”
পল্টু হাসল, “ও আমি ম্যানেজ করে নোব।”
প্রথম দিন অবশ্য পরিমল সঙ্গে গেলেন, আর্য ঘোষালের সঙ্গে অন্তত দেখা করে ধন্যবাদ জানিয়ে আসা উচিত। তাছাড়া পল্টুকে একবার দেখিয়ে দিয়ে আসা দরকার। পরের বার থেকে ছোটুকে নিয়ে শুধু পল্টু যাবে। ফেরার সময় ছোটুকে জিজ্ঞাসা করলেন, “কেমন লাগল?”
“খুব ভালো।”
“ভয় করছিল?”
“শুরুতে গলা শুকিয়ে যাচ্ছিল। পরে ভয় করছিল না।”
ছোটু যেন ঘোরে আছে, অন্যরকম পরিবেশ, সারা ঘরটায় কত যন্ত্র! তার মতোই ছোটো ছোটো ছেলেমেয়ারা শিখছে। প্রথমটায় সে ওদের পাশে কুঁকড়ে বসে ছিল। আর্য-স্যার এমন আপন করে নিলেন যে অস্বস্তি কেটে গেল।
ফিরে সে শুয়ে পড়ল। বড্ড ক্লান্ত লাগছে, হাত-পা ব্যথা করছে। নাড়ু সারাদিন কী হল, কী করল ইত্যাদি গল্প শুনছিল। বলল, “তোর পা টিপে দিচ্ছি। হেভি আরাম লাগবে।”
“ধ্যাত। তুই আমার পায়ে হাত দিবি কেন?” ছোটু অমনি উঠে পড়ল।
“কী ঝামেলা! আমি তোর বন্ধু। বন্ধুর কাছে আবার লজ্জা! দেবু-স্যার মাঝে-মধ্যে আমার পা মাসাজ করে দেন। বলেন যে খেলার লাইনে লজ্জা করলে চলবে না। শুয়ে পড়।”
***
গ্রীষ্মের ছুটি পড়ে গেল। বাড়ি থেকেই কলকাতায় আর্য ঘোষালের কাছে গান শিখতে যায় ছোটু। সিন্থেসাইজার এবং গিটারের সঙ্গে গান গাইতে শিখছে সে। অদ্ভুত আনন্দ হয় গাইতে, সে মন খুলে গায়। আর্য-স্যার মাথা নেড়ে বাহবা জানান। কখনও মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করেন। লজ্জা হয়, আবার ভালোও লাগে খুব। ছুটি পড়ার আগেই তাকে মোবাইল ফোন কিনে দিয়েছিলেন রমিতকাকু। কিছু গান ভরে দিয়েছেন আর্য-স্যার। সে হেডফোন লাগিয়ে শোনে। প্রতিবার যে নতুন গানটা শেখে তা রেকর্ড করে ঘরে পনেরো দিন ধরে শোনে আর প্র্যাকটিস করে।
স্কুল খুলে গেছে, আবার উষা ভবনে হইচই করে দিন কাটছে।
একদিন সত্যদা রেগে গেলেন খুব, “ওর মোবাইল ফোন নিয়ে তোরা সবাই মেতে আছিস দেখতে পাচ্ছি। মোবাইল ফোনে নেশা ধরলে বারোটা বাজবে। পড়াশোনার দফারফা হবে দেখছি। এবার থেকে ওটা আমার কাছে থাকবে। ছোটু, সকালে রেওয়াজ করার সময়ে শুধু ফোন পাবি। অন্যসময় দরকার হলে আমার রুমে এসে শুনবি।”
সত্যদা মোবাইল নিয়ে চলে গেলেন।
***
ঊষা ভবনের যে কী হল!
একদিন রমিতকাকু এসে পটলদাকে খুব বকাঝকা করল। নাড়ু আড়ালে দাঁড়িয়ে কান পেতে শুনেছিল। এসে বলল, “খুব ঝাড় খেয়েছে পটলদা।”
“কেন রে?”
বলতে গিয়েও নাড়ু থেমে গেল। রমিত ওপরে উঠে এসেছে, সঙ্গে হিমেন। সবাইকে বারান্দায় ডাকা হল। রমিত থমথমে মুখে বলল, “ঊষা ভবনের ছেলেদের নিয়ে আমার গর্ব ছিল। তাদের নামে অভিযোগ শুনতে হচ্ছে?”
হিমেন বলল, “সবার শুনে রাখা ভালো। সেকেন্ড পিরিয়ডে স্কুলের পেছনের পাঁচিল টপকে কয়েকজন পালিয়েছিল। তারা পার্কে ঘুরে বেড়িয়েছে, সিগারেট খেয়েছে, টিফিনের সময় আবার স্কুলে ফিরে এসেছে। পরপর তিনদিন এটা হয়েছে। তাদের কীর্তি হেড-স্যারের নজরে এসেছে। ঊষা ভবনের কয়েকজন তার মধ্যে ছিল। তিনি ফোনে জানিয়েছেন যে এখানকার ছেলেরা এরকম করবে তিনি তা স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি।”
রমিত বলল, “তিনি ফোনটা আমাকেই করেছিলেন। রঞ্জন বসু ওরফে পটল, বিকাশ, কল্যাণ, সুজন, ক্লাস এইটের এই চারজনের নাম এসেছে। এরা ঊষা ভবনের বোর্ডার। হেড-স্যারকে বলেছি ঊষা ভবনের ছেলে বলে যেন খাতির না করা হয়। বিচার সবার বেলাতেই সমান হবে। রাকিব, তুই জানতিস না? বিকাশ, কল্যাণ তোর সঙ্গে এক ক্লাসে এক সেকশনে পড়ে।”
রাকিবের গলা কেঁপে গেল, “জানতাম। তবে ক্লাস নাইন আর টেনের কয়েকটা দাদা আসল পান্ডা।”
“খারাপ কাজের আবার আসল-নকল? আমাদের কাউকে জানাসনি কেন প্রথমদিনই?”
রাকিব মাথা নীচু করে বসে থাকল।
“তার মানে বদসঙ্গে পড়ে এইসব করেছিস তোরা? ক্লাস এইট-নাইন হল ভাইটাল টাইম। এই সময়টা কত ছেলে বখে যায়। তোরা কীভাবে ওদের দলে ভিড়লি? স্বাধীনতার অভাব মনে হচ্ছিল? বেশ, বাড়ি চলে যা। তোদের সিকিউরিটির জন্যই বাইরে যাওয়ার কড়াকড়ি আছে। কোনও নিয়মে তোদের বেঁধে রাখতে চাইনি।”
রাতে খেতে বসে সবাই চুপচাপ, কোনও গল্প নেই, হাসিঠাট্টা নেই। একটিও কথা না বলে যে-যার রুমে চলে গেল।
স্কুলে প্রেয়ারের পরে হেড-স্যার বললেন, “কিছু ছেলে ডিসিপ্লিন ভেঙেছে। তাদের অনেকেই পড়াশোনা এবং ব্যবহারে ভালো বলেই পরিচিত আমাদের কাছে। তাই বারোজন ছেলেকে পনেরো দিনের জন্য সাসপেন্ড করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে কোনও স্টুডেন্ট এরকম কাজ করলে তাকে স্কুল ট্রান্সফার সার্টিফিকেট দিতে বাধ্য হবে।”
নামগুলো একে একে বললেন তিনি। নাড়ু বলল, “কী লজ্জা! নামও যে বলছে সবার সামনে।”
পটলদা ফিরে এসে বিছানায় উপুড় হয়ে কাঁদতে শুরু করে দিল। বাকি দুজন ছলোছলো চোখে শুয়ে রইল। গোপালদা এসে বলল, “কাঁদিস কেন হতভাগারা? বুদ্ধিনাশ হয়েছিল তোদের। পনেরো দিনের জন্য বাড়িই পাঠিয়ে দিতেন রমিতবাবু, আমি মাফ করে দিতে বললাম। তোদের জন্য হাতজোড় করেছি এই বয়সে। খবরদার, কেঁদে ভাসাবি না। পড়তে বসে যাবি ঠিক সময়ে। পরের পরীক্ষায় খারাপ করলে গরম খুন্তি দিয়ে পেটাব। সকলে মিলে দিব্যি হাসিখুশি কাটাচ্ছিলি, কাল থেকে কেমন চুপচাপ। এমন করলে এখানকার কাজ ছেড়ে চলে যাব আমি।”
পরের দিন রবিবার, জুলাইয়ের সাত তারিখ, দাদার সঙ্গে কলকাতা গেল ছোটু। মনটা ভালো নেই। রাকিব মনমরা হয়ে আছে। বলেছে, “কেন যে সত্যদাকে শুরুতেই বললাম না!”
পটলদা কেমন যেন গুটিয়ে আছে। কথা কম বলছে। গাবলুদারও মন ভালো নেই। ধুর, কিছুই ভালো লাগছে না তার। আকাশটা থমথমে, গুমোট আবহাওয়া চারদিকে। গানের ক্লাস হয়ে গেলে সে প্রণাম করল, “আসছি স্যার।”
“আয়। তোর জন্য ভালো খবর আছে।” আর্য বললেন।
“কী খবর?”
“পরের সপ্তাহে কলকাতায় এসে কয়েকদিন থাকতে হবে তোকে। পরিমলবাবুকে ফোনে বলব। বাকিটা তাঁর কাছ থেকেই জানবি।”
ট্রেনে সারাক্ষণ সে চাপা টেনশনে রইল। স্টেশনে নামতেই দাদার ফোন বাজল। দাদা বলল, “এই নে। তোর ফড়িং-স্যার ফোনে কিছু বলবেন।”
“ছোটু, কী যে আনন্দ হচ্ছে! আর্য ঘোষাল একটি সিনেমার জন্য গান তৈরি করছেন। তিনিই মিউজিক ডিরেক্টর। সেখানে এক ছোটো ছেলের লিপে গান থাকছে। সেই গানটা গাইবি তুই। পরের সপ্তাহে রিহার্সাল হবে।”
ছোটুর বিশ্বাস হচ্ছিল না, “আমি?”
“হ্যাঁ, তুই গাইবি। আর্য ঘোষাল মনে করছেন গানটা তোর গলাতেই মানাবে। তবে খবরটা কাউকে বলবি না এখন। না হওয়া পর্যন্ত চুপ থাকতে হয়।”
ঊষা ভবনে পৌঁছে দিয়ে দাদা চলে গেল। বৃষ্টি হচ্ছে অঝোরে, টোটোতে বসেও ভিজে গেছে ছোটু। গেট পেরিয়ে সবুজ ঘাসের মাঠ, সেখানে দাঁড়িয়ে দু-হাত তুলে বৃষ্টিতে খুব ভিজতে ইচ্ছে করছিল ছোটুর। সে সারা শরীরে বৃষ্টি মাখছিল; বড়ো বড়ো ফোঁটাগুলো গায়ে পড়তেই শিহরিত হচ্ছিল রোমাঞ্চে।
নাড়ু জানালায় মুখ বাড়িয়ে বলল, “কী ঝামেলা! লাট্ট, দেখবি আয়। ছোটুটা কেমন বাঁদরভেজা হচ্ছে! বিষ্টিতে সাধ করে ভিজছে।”
লাট্টু মুখ বাড়িয়ে দেখল, “ঠান্ডা লেগে যাবে যে ওর। ছোটুটা হঠাৎ ক্ষেপে গেল নাকি?”
***
সাতদিন ছোটুর সঙ্গে কলকাতায় কে থাকবে? হিমেন চিন্তায় পড়ে গেল।
পরিমল শুনে বললেন, “এ নিয়ে চিন্তা করবেন না। আমি তো আছি।”
“আপনার গানের টিউশন?”
“বন্ধ থাকবে।”
রাসবিহারী অ্যাভিনিউর কাছে রমিতের ফ্ল্যাট আছে, ঠিক হল সেখানেই ছোটুকে নিয়ে থাকবেন পরিমল। ছোটুর বাড়িতে জানানো হল যে গানের ক্লাস বিশেষ দরকারে একটানা সাতদিন চলবে। হিমেন এবং রমিত-সত্যবানের কাছেও আসল কারণ গোপন রাখল। ছোটুকে বোঝানো হল যে রেকর্ডিং না হওয়া অবধি কাউকে বলা উচিত নয়।
আর্য ঘোষালের বাড়িতে রিহার্সাল চলতে লাগল। পরিমল নিজেই রান্নাবান্না করেন, ছোটু বাসনপত্র মাজে। চায়ের দোকানে কাজ করার অভ্যেসটা বেশ কাজে লাগছে। দুপুরে ঘুমিয়ে আবার সন্ধেতে গান নিয়ে বসে।
স্টুডিওতে রিহার্সাল শুরু হল। স্টুডিওতে ঢুকে প্রথমদিন সে হকচকিয়ে গিয়েছিল, কেমন এক ঘোরের মধ্যে ছিল কিছুক্ষণ। আর্য ঘোষাল বললেন, “পরিমলবাবু, শনিবার ফাইনাল রেকর্ডিং হবে।”
স্টুডিওতে ঢোকার আগে পরিমলকে প্রণাম করল ছোটু।
রেকর্ডিং হয়ে গেল। আর্য হাসিমুখে পরিমলকে বললেন, “একটা টেকেই ফাইনাল হয়ে গেল। আপনার ছাত্র দুর্দান্ত গেয়েছে। একটুও ঘাবড়ায়নি।”
“আপনারও ছাত্র কিন্তু।”
“অবশ্যই। সিনেমার শুটিং শুরু হয়ে গেছে। এই একটা গানের রেকর্ডিং বাকি ছিল। কিছুদিন পরেই তমাল রাউতের গান ইউটিউবে ছাড়া হবে।” আর্য বললেন।
“তমাল?”
“গানের লাইনে কত শিল্পী নতুন নাম নেয়। ওকে এই নামটাই দেওয়া হল।”
ফেরার সময় পরিমল পইপই করে ছোটুকে বললেন, “গানটা রিলিজ না হওয়া অবধি কাউকে কিচ্ছুটি বলবি না। এই লাইনে কত কিছু হয়। পরিচালকের হঠাৎ মনে হল গানের সিনটা রাখবে না। বুঝেছিস?”
***
ছোটু অপেক্ষা করতে লাগল। জুলাই শেষ হল, আগস্ট মাস পেরিয়ে গেল। পটলদা আবার আগের মতন হাসিখুশি হয়ে গেছে। বিজ্ঞান প্রদর্শনীতে শহরের স্কুলের মধ্যে শশধর বয়েজ সেরা হয়েছে। রাকিব, পটলদা, গাবলুদাদের তৈরি মডেল শহরের সব স্কুলকে টেক্কা দিয়েছে। লাট্টুর বিছানায় একদিন টিকটিকি পড়ে গেল। ভয়ে লাফিয়ে নামতে গিয়ে পা মচকেছে। নাড়ু রোজ মলম লাগিয়ে লাট্টুর মচকানো গোড়ালি মালিশ করে। সত্যবানের মাংকি টুপি প্রায়ই হারিয়ে যায়। নতুন কিনে আনলে সেটাও একদিনের মধ্যেই হারিয়ে যায়। গোপালদা চোখ নাচিয়ে বলল, “ভাদ্দরমাসে দু-ফোঁটা বিষ্টি পড়লেও আপনি হনুমান টুপি পরে ঘোরেন। বেশ হয়েছে।”
সত্যবান রেগে বললেন, “তাতে তোমার কী হে? চোরকে একবার ধরি, তার চামড়া খুলে ডুগডুগি বাজাব।”
অপেক্ষায় ক্লান্ত হতে হতে আশাই ছেড়ে দিয়েছে ছোটু। গানটা হয়তো রাখাই হয়নি সিনেমায়। সে বিছানায় শুয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
***
বিশ্বকর্মা পূজার দিন দুপুরে পরিমল ঊষা ভবনের গেটে সাইকেল থেকে নামলেন। রাকিব অবাক হল, “কী রে ছোটু? তুই আজ দুপুরে গান শিখবি নাকি?”
“না তো।”
“তাহলে ফড়িং-স্যার ওরকম হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে ছুটে আসছেন কেন?”
দোতলায় উঠে পরিমল খুশিতে চিৎকার করলেন, “কই রে ছোটু, এদিকে আয়। তোর সেই গান আজ ইউটিউবে দিয়েছে।”
রাকিব বলল, “ইউটিউবে ছোটুর গান!”
পরিমল দম নিয়ে বললেন, “হ্যাঁ। ‘দিগন্তরেখা’ সিনেমায় ছোটু গান গেয়েছে। রেকর্ডিং আগেই হয়েছিল, অ্যাদ্দিনে রিলিজ হল গানটা।”
সবাই হুমড়ি খেয়ে শুনল, ‘ইচ্ছেডানায় পাড়ি দেব/ এক অচেনা দিগন্তপুর/ তোমাদেরও সাথে নেব/ আজ হোক জীবন মধুর।’
গান শেষ হতেই লাট্টু বলল, “ছোটুর গলা মনে হচ্ছে। তবে যে দেখছি ‘তমাল’ লেখা আছে!”
পরিমল হাসলেন, “গায়ক ছোটুর নতুন নাম এখন থেকে তমাল।”
ঊষা ভবনে রমিত আজ নিয়ম ভেঙেছে। গ্র্যান্ড ফিস্ট হবে, তাই দু-খানা সাউন্ড-বক্স এসেছে। ক্যাটারার নয়, সমস্ত মেনুর দায়িত্বে থাকছে গোপালদা ও তার অ্যাসিস্ট্যান্ট। ছোটুর মা সুলেখাদেবী আজ নিজের হাতে রান্না করবেন গোপালদার সঙ্গে, “অ্যাদ্দিন শুধু অন্যের বাড়িতে অন্যের জন্য রান্না করেছি। আমার ছোটুর বন্ধুদের জন্য একদিন রাঁধতে পারি না?” সুলেখা আঁচলে চোখ মুছলেন আনন্দে।
বক্সে গান বেজে চলেছে। সবাই যে-যার মতো নাচে মত্ত। জোর করে গোপালদাকে গানের সঙ্গে নাচতে বাধ্য করেছে নাড়ু। ফতুয়া-লুঙি পরা গোপালদা নিজের মতো নেচে যাচ্ছে। সত্যবান নাচ করার ভয়ে নীচে অফিস-রুমে পালিয়ে গেলেন। হট্টগোলের মধ্যে তাঁর নতুন কেনা মাংকি টুপিটা আবার ভ্যানিশ হয়ে গিয়েছে। রমিতকাকু আর হিমেনদা হাততালি দিচ্ছেন চেয়ারে বসে।
“ঊষা ভবন আজ আনন্দ ভবন হয়ে গেছে।” রমিত হেসে হিমেনকে বলল, “ছোটু এখন আমাদের সবার গর্ব।”
ছোটু দেখল কথাটা বলতে গিয়ে আনন্দে গলা বুজে আসছে রমিতকাকুর। তার নিজের চোখ দুটো ভিজে এল জলে। এমন আনন্দের কান্না কীভাবে যে চেপে রাখবে সে!
এত সুখ কখনও পায়নি সে আগে।
ছবি-মৌসুমী