সম্পূর্ণ উপন্যাস-সারদা দেবী বালিকা বিদ্যালয়-যূথিকা আচার্য্য-শরৎ ২০২৩

uponyassaradadevi

অ্যাডমিশনের আগে

অ্যাডমিশন ফর্মে স্কুলের নাম দেখেই মনখারাপ হয়ে গেল তিন্নির। ম্যাগো! নামটা কী বিশ্রী! শুনলেই মনে হয় দাদু-ঠাকুমাদের সময়কার পুরোনো ব্যাপার-স্যাপার। সারদাদেবী বালিকা বিদ্যালয়! এটা একটা স্কুলের নাম হল? এরকম বাজে স্কুলে ভরতি হলে তো স্কুলের নাম বলতেই লজ্জা করবে তিন্নির। মাসির ছেলেমেয়ে তাতাইদাদা, তিথিদিদি, পাশের বাড়ির গুঞ্জাদিদি, বড়ো জেঠুর ছেলে রুবাইদা—সব্বাই ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়ে, তাদের আদব-কায়দাই আলাদা। তাদের কাছে গিয়ে তিন্নি কী বলবে—‘হাই, শোন তিথিদি, আমি না সারদাদেবী বালিকা বিদ্যালয়ে ভরতি হচ্ছি এই বছর! হাউ কুল বল!’

অমন বাজে-পচা নামের একটা স্কুলে ভরতি হলে কি ওরা আর কেউ কথা বলবে ওর সঙ্গে? তিন্নির দুই গাল বেয়ে জল গড়িয়ে পড়তে থাকে। কিছুক্ষণ কান্নাকাটি করার পর সে ঠিক করল—নাহ্, শেষ চেষ্টা করে দেখতে হবে। মা তো দিনরাত নিজের কাজ নিয়েই ব্যস্ত থাকে, বললে শুনবে কি না কে জানে। তার চাইতে বরং বাবাইকে বলাই ভালো।

মা অফিসে ছিল, বাবাই বসার ঘরে বসে কাজ করছে। তিন্নি বসার ঘরের দরজাটা একটুখানি ফাঁক করে দেখল বাবাই কম্পিউটার মনিটরের দিকে তাকিয়ে আছে আর মাঝে মাঝে কিছু নোট করছে পাশে রাখা ডায়েরিতে। তিন্নি মুখটা ভেতরে ঢুকিয়ে বলল, “বাবাই, একটু আসব?”

অনিন্দ্য মনিটরের থেকে চোখটা সরিয়ে তিন্নির দিকে নিজের হুইল চেয়ারটা ঘুরিয়ে বলল, “বাহ্ তিন্নি, তুই তো বড়ো হয়ে গেছিস দেখছি! বাবাইর কাছে আসার জন্য পারমিশন নিচ্ছিস?”

“বারে! তোমরাই তো শিখিয়েছ, দরজায় সবসময় নক করে ঢুকতে হয়—তাই তো করলাম!”

অনিন্দ্য হেসে ফেলে এবার, “আমি কি বলেছি, তুই কিছু ভুল করেছিস? আচ্ছা আয়, ছাড় ওসব। কী হয়েছে বল, মনখারাপ কেন?”

তিন্নির গলায় অভিমান। ফোঁস করে ছোট্ট একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে বলল, “তুমি আমার অ্যাডমিশন ফর্মটা দেখেছ?”

“হ্যাঁ, দেখেছি।”

“স্কুলের নামটা দেখেছ?”

বাবাই এবারও হাসিমুখে বলল, “অবশ্যই দেখেছি। তোর কী মনে হয়, নাম না জেনেই অমনি উলটোপালটা স্কুলে তোকে ভরতি করে দেব আমরা?”

ধপ করে কম্পিউটার টেবিলের উলটোদিকে রাখা ছোট নীল চেয়ারটাতে বসে পড়ল তিন্নি। চোখ দুটো আবার ছলছল করতে শুরু করল ওর, “তোমরা সবকিছু জেনেও ওরকম একটা পচা বোর্ডিং স্কুলে পাঠাবে আমায়?”

অনিন্দ্য বলল, “তুই নাম শুনেই বুঝে গেলি যে ওটা পচা স্কুল!”

“তা নয় তো কী? ভালো স্কুল হলে কি এমন বিচ্ছিরি নাম হয়! কত ভালো স্কুল আছে তো কাছে। মডার্ন গার্লস হাইস্কুল, সেইন্ট পলস, কুইন এলিজাবেথ স্কুল—সেগুলো কী দোষ করল?”

“না, দোষ কিছুই করেনি, কিন্তু আমি আর তোর মা যে সবসময় সবচাইতে ভালো জিনিসটাই তোকে দিতে চাই তিন্নি।”

মাথাটা নীচু করে তিন্নি বলল, “আমি জানি, তোমরা কেন আমাকে একটা পচা স্কুলে পাঠাচ্ছ।”

মেয়ের গলায় স্পষ্ট অভিযোগের সুরে অনিন্দ্যর মুখটা কয়েক সেকেন্ডের জন্য অন্ধকার হয়ে গেল। কিন্তু একটু সামলে নিয়েই সে বলল, “আমি জানতাম তিন্নি, তুই এই কথাটাই ভাববি। কিন্তু জানিস, আজ যদি আমার অ্যাক্সিডেন্টটা নাও হত, তবুও এই স্কুলটাকেই প্রেফার করতাম আমরা। স্কুলের পরিচয় তার ইংরিজি নাম, আর আদব-কায়দার বাহারে বোঝা যায় না। স্কুলের পরিচয় তার ছাত্রছাত্রীদের চরিত্র ও যোগ্যতা গঠনে হয়। সারদাদেবী স্কুলে কিন্তু তোর মাও পড়াশোনা করেছিল। তোর মাকে কি সেকেলে মনে হয়?”

অনিন্দ্য এত সোজাসুজি কথাটা বলতে চায়নি মেয়েকে। বছর খানেক আগে কার অ্যাক্সিডেন্টে ওর দুটো পা-ই কাটা যায়। ছবির মতো সাজানো সংসার ওলটপালট হয়ে যায় এক নিমেষে। এই পুরো বছরটা এত শোকের মধ্যেও তিন্নির মা রোহিণী নিজের চাকরি ও সংসার—দুটোই শক্ত হাতে সামলে রেখেছিল। তিন্নির দাদু-দিদা-মাসি, বড়ো জেঠু—সবাই সবসময় পাশে ছিলেন ওদের। তারপর বছর খানেক পরে একটু সুস্থ হওয়ার পর অনিন্দ্য ধীরে ধীরে বাড়ি থেকেই কনসালটেন্সির কাজ করতে শুরু করে। কিন্তু সবকিছুর মধ্যেও সে বুঝতে পারে, এই এক বছরেই পরিস্থিতির চাপে ছোট্ট তিন্নির বয়স যেন অনেকটাই বেড়ে গেছে। তিন্নির শৈশবে কখন যেন মিশে গেছে জেদ আর স্বার্থপরতা।

মনকে শক্ত করে অনিন্দ্য। কাছাকাছি স্কুলগুলোর কোনোটাই তেমন ভালো নয়। যখন তখন মাশরুমের মতো মাটি ফুঁড়ে ওঠা ইংরেজি নামের ধ্বজাধারী স্কুলে পাঠিয়ে মেয়ের ভবিষ্যৎ মাটি করার কোনও ইচ্ছে ছিল না ওদের। এই স্কুলগুলো এক-একটা ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান ছাড়া আর কিছুই নয়। আজ আছে তো কাল নেই। স্কুলে ডিসিপ্লিনের কোনও বালাই নেই। পড়াশোনা ছাড়া আর সবকিছুই হয়। আর কথায় কথায় শুধু টাকার শ্রাদ্ধ।

বড়দার ছেলে রুবাই মাত্র ক্লাস এইটে পড়ে, নিজের স্কুলের হেড মাস্টারমশায়কে বলে ‘হেডু’! অলরেডি মা-বাবার কাছে বলে রেখেছে, বোর্ডের এক্সামে ভালো রেজাল্ট করতে হলে তার নাকি ল্যাপটপ চাই-ই চাই। বাবার পুরোনো কম্পিউটারে নাকি কাজ করা যায় না। রোহিণীর দিদির মেয়ের তিথির স্কুলে স্পোর্টসের জন্য কোন ব্র্যান্ডের জুতো কিনতে হবে তাও নির্দিষ্ট করে বলে দেওয়া হয়। সেই দামি ব্র্যান্ডের জুতো ছাড়া পি.টি. ক্লাসে ঢোকাই বারণ।

বড়ো বউদি আর রোহিণীর দিদি দুজনেই হেসে বলেন, “আজকালকার দিনে এটাই তো স্বাভাবিক। বাচ্চাদের স্মার্ট করতে গেলে এটুকু তো করতে হবেই।”

অনিন্দ্য আর রোহিণী দুজনেই সেদিন ঠিক করেছিল, মেয়েকে স্মার্ট করার আগে ভালো মানুষ বানাবে তারা। তিন্নি বড়ো হয়ে হাসি-খুশি, স্বাবলম্বী, বুদ্ধিমতী, বিবেচনাময়ী একজন মানুষ হোক—যার উপর বিপদে দশটা লোক যেন ভরসা করতে পারে। বড়োদের অসম্মান করা, দামি গ্যাজেট নইলে পড়াশোনা হবে না, মা-বাবাকে দিনরাত এটা কিনে দাও, ওটা দিলে না কেন—এই যদি স্মার্টনেস হয় তবে অমন স্মার্টনেস থেকে মেয়ের দূরে থাকাই মঙ্গল।

তাও বোর্ডিং স্কুলে পাঠাতে হবে মেয়েকে, সে নিয়ে যথেষ্ট কিন্তু কিন্তু করছিল সে। কিন্তু ভেবে দেখল আবার, মেয়েকে যদি স্বাবলম্বী করতে হয়, তবে এই ভালো। তিন্নি বড়ো স্বার্থপর হয়ে যাচ্ছে দিন দিন। আজকাল মাকে নিয়েও কমপ্লেন করতে শিখেছে। মা কেন মাসি আর জেঠির মতো বাড়িতে থাকে না! মা আমাকে সময় দেয় না, মা জেঠির মতো টিউশনির ক্লাসে আমার সঙ্গে যায় না ইত্যাদি ইত্যাদি। অথচ কখনও দেখবে না রোহিণী কতটা শক্ত হয়ে সবকিছু সামলে যাচ্ছে। এতটুকু বয়স মেয়েটার—কে জানে এত নেই নেই আর চাই চাই শিখল কোথায়!

“বাবাই, তুমি প্লিজ মাকে বলো না, আমাকে ওই স্টুপিড স্কুলটায় না পাঠাতে—প্লিজ বাবাই!”

অনিন্দ্য শক্ত গলায় বলল এবার, “তিন্নি, তোর মা আর আমি যে ডিসিশনই নিই না কেন, তাতে তোর ভালো ছাড়া খারাপ হবে না।”

দুমদুম করে পা ফেলে রাগ করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল তিন্নি। অসহায় চোখে দরজার দিকে তাকিয়ে রইল অনিন্দ্য।

যাত্রা হল শুরু

বাসের সিটে বসে রোহিণী মেয়ের এলোমেলো চুলগুলো ঠিক করে দিতে দিতে খুব শান্ত গলায় বলল, “জানি রে তিন্নি, আমাকে আর বাবাইকে ছেড়ে যেতে তোর মনকেমন করছে। কিন্তু দেখবি দু-সপ্তাহের মধ্যেই নতুন বন্ধু, নতুন টিচার্স, হোস্টেল লাইফ—সবকিছু এত ভালো লাগবে যে আমাদের সব্বাইকে তুই ভুলেই যাবি। সবারই তাই হয়। জানিস, আমি যখন প্রথমবার স্কুলে যাচ্ছিলাম…”

রোহিণীর কথা শেষ না হতেই তিন্নি বলল, “মা, চুপ করো। আমার ঘুম পাচ্ছে। ভালো লাগছে না এসব।”

মেয়ের কথা বলার ভাবভঙ্গীতে রোহিণী একটু বিরক্ত হলেও কিছু বলল না। বরং হেসে তিন্নির মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।

চোখ দুটো বন্ধ করে তিন্নি ভাবল, গুঞ্জাদিদি যেমন বলেছে ঠিক তেমনি করব। ক্লাসে গিয়ে খুব দুষ্টুমি করব। কিছুতেই মিসদের কথা শুনব না আর প্রতি সপ্তাহে মা-বাবার ফোন এলে স্কুলের সবকিছু নিয়ে কমপ্লেন করব। তাহলেই কয়েকমাস পরে মা-বাবাই এসে আমাকে নিয়ে যাবে। পরে বাড়িতে গিয়ে কান্নাকাটি করে গুঞ্জাদিদির স্কুলেই ভরতি হব। ব্যস, সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে।

চোখ দুটো অল্প খুলে মায়ের দিকে একবার তাকাল সে। মা চুপচাপ বাসের জানালা দিয়ে বাইরের দৃশ্য দেখছে। রোহিণীর হাতটা তিন্নি মাথার ওপর থেকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে মুখখানা বিকৃত করে বলল, “ইস, তোমার হাতটা কী সোয়েটি!”

রোহিণী তার কপালের বিরক্তির রেখা দুটোকে বাড়তে না দিয়ে নিজেকে সংযত করল আবার। এগুলো সব তিন্নির বদমায়েশি। সন্তানের মা সে। এসব বুঝতে কি বেশি সময় লাগে! তিন্নি এখন জাস্ট চেষ্টা করছে যেনতেন প্রকারে পাবলিক প্লেসে একটা সিন ক্রিয়েট করার। আজকালকার বাচ্চাগুলো পুঁচকে অবস্থাতেই মা-বাবাকে চাপে ফেলার হাজারখানা উপায় শিখে যায়। প্রথম প্রথম ভেঙে পড়ত রোহিণী, কিন্তু ধীরে ধীরে বুঝল ভেঙে পড়লে চলবে না। সময় বদলেছে এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ছেলেমেয়ের বেড়ে ওঠার নিয়মকানুনও বদলে গেছে। তবে বেসিক জিনিসগুলো একইরকম থেকে যায়। তিন্নির এখন যা বয়স তাতে সময়মতো ওর রাশ টেনে না ধরলে ভবিষ্যতে মা হিসেবে নিজেকে কখনও ক্ষমা করতে পারবে না সে। কাজেই সন্তানপ্রেমে অন্ধ হয়ে বসে থাকার অপশন নেই তার কাছে। দাঁতে দাঁত চেপে তাকে নিজের কর্তব্য করে যেতে হবে।

রোহিণীরা নিজেরা দুই বোন। বড়ো বোন কুমুদ, আর ছোটো রোহিণী। তিন্নির দাদু আর দিদিমা অমনিতে যথেষ্ট আধুনিক হলেও দুই মেয়েকে কড়া হাতেই মানুষ করেছেন। মা মাই ডিয়ার হলেও বাবাকে তো রীতিমতো ভয় পেত ওরা দুই বোন। অথচ আশ্চর্যের ব্যাপার, বাবা কখনও ওদের গায়ে হাত তোলেননি বা চেঁচিয়ে কথাও বলেননি। বরং রেগে গেলে ওদের মা দু-ঘা বসিয়ে দিতেন পিঠে যখন-তখন। চিরুনি, ছাতা, হাতপাখা, ভাঁজ করা নিউজ পেপার, টুথ ব্রাশ—এসব ছিল মায়ের অস্ত্র। হাসি পেল রোহিণীর হঠাৎ।

মজার ব্যাপার হল এই যে মায়ের হাতে চিরুনিপেটা হলেও দু-বোনের কারোরই তেমন দুঃখ হত না। ওরা সবচাইতে বেশি ভয় পেত মা-বাবার গম্ভীর মুখ। ক্লাস এইটে পড়ার সময় রোহিণী ওর বন্ধু ফাতিমার একটা হেয়ার ব্যান্ড চুরি করেছিল। কেন যে করেছিল তা সে নিজেও জানে না। প্লাস্টিকের ব্যান্ডের ওপর বড়ো একখানা ভেলভেটের লাল গোলাপ বসানো হেয়ার ব্যান্ডটা ফাতিমার কাকু এনে দিয়েছিলেন দিল্লি থেকে। ওটা পরে ফাতিমার মুখখানাও ফুটফুটে গোলাপের মতোই সুন্দর দেখাচ্ছিল। ভারি লোভ হয়েছিল রোহিণীর। ফাতিমার কাছে একবার লজ্জার মাথা খেয়ে সে বলেও ছিল, “ওই, হেয়ার ব্যান্ডটা আমাকে একবার পরতে দিবি? দশ মিনিট পরেই দিয়ে দেব।”

ফাতিমা তাতে ভেংচি কেটে বলেছিল, “ইস! আমার নতুন হেয়ার ব্যান্ড। তোকে কচু দেব। কাকু দিল্লি থেকে এনে দিয়েছে। তোর বাবাকে বল, কিনে দেবে।”

ভীষণ রাগ হয়েছিল তাতে রোহিণীর। দিবি না তোর ইচ্ছে, কিন্তু আমার বাবাকে নিয়ে ও-কথা বলবি কেন? তখন থেকেই হাত দুটো নিশপিশ করছিল তার। দু-দিন পর টিফিন পিরিয়ডে সে যখন দেখল যে ফাতিমা হেয়ার ব্যান্ডটাকে মাথা থেকে খুলে বাথরুমে গেছে, তখন নিশ্চুপে সে হেয়ার ব্যান্ডটাকে নিজের পিঠ ব্যাগে ঢুকিয়ে নিয়েছিল। তারপর তাড়াতাড়ি ক্লাস থেকে বেরিয়ে লক্ষ্মী মেয়ের মতো লাইব্রেরিতে গিয়ে পড়তে বসেছিল সে। ফাতিমা বাথরুম থেকে ফিরে আসার পর পুরো ক্লাস তন্নতন্ন করে খুঁজেও হেয়ার ব্যান্ডখানা পায়নি। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করেছিল মেয়েটা। রোহিণী শান্ত মুখে দেখছিল সবকিছু। অন্য সকলের সঙ্গে ফাতিমাকে সান্ত্বনাও দিয়েছিল সে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে হাসি পাচ্ছিল তার। চুরি নিয়ে লজ্জিত হওয়ার কোনও প্রয়োজন আছে বলে তার মনে হয়নি। উলটে মনে হয়েছিল যে এই শাস্তিটা ফাতিমার প্রাপ্য। আমার বাবাকে অমন বলল কেন ও? আমার বাবা ওর কী করেছে! বেশ করেছি ওর হেয়ার ব্যান্ড নিয়ে নিয়েছি। দেখি ও কী করে!

সেদিন স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পর সন্ধ্যাবেলা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দু-বার হেয়ার ব্যান্ডটা পরে মোমের পুতুল সেজে নেচেছিল সে। তৃতীয় বারে মা দেখতে পেয়ে জিজ্ঞাসা করেছিল, “ওই, এদিকে আয় তো। তোর মাথায় ওটা কী? কোথায় পেলি?”

প্রথমে বেশ কনফিডেন্টলি মিথ্যে কথা বলেছিল সে—”আমার বন্ধু দিয়েছে।”

মার মুখ গম্ভীর, “কোন বন্ধু?”

“নিরু।”

“নিরু, মানে নিরুপমা ঘোষ?”

“হুঁ।”

রোহিণীর মাথা থেকে হেয়ার ব্যান্ডটা খুলে নিয়ে মা ভালো করে দেখে বললেন, “এ তো বেশ দামি জিনিস। এখানকার বাজার থেকে কেনা বলে তো মনে হচ্ছে না। নিরু কোথায় পেল এমন হেয়ার ব্যান্ড?”

একটা অন্যায় চাপা দিতে গিয়ে একের পর এক মিথ্যে বলে যাচ্ছিল রোহিণী। মায়ের জেরার সামনে তার তখন দিশেহারা অবস্থা। সে শেষরক্ষা করতে বলল, “ওর কাকু এনে দিয়েছে। দিল্লি থেকে।”

মার মুখ রাগে গনগন করছিল তখন, “নিরুর কাকুর দেওয়া উপহার তোর কাছে এল কী করে? সত্যি কথা বল।”

বলার মতো আর কিছুই ছিল না রোহিণীর। সে মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে ছিল। মাও ছেড়ে দেওয়ার পাত্রী নন। ওর কান ধরে বলেছিলেন, “সত্যি কথা বল রোলি, তুই নিরুর কাছ থেকে চুরি করে এনেছিস? নিরু না তোর বেস্ট ফ্রেন্ড!” এরপর বাবাকে ডেকে মা বললেন, “ওগো শুনছ? কোথায় গেলে?”

বাবা তখন সদ্য অফিস থেকে বাড়িতে ঢুকেছেন। মা ওর হাত ধরে টানতে টানতে ওকে বারান্দায় এনে বললেন, “জামাকাপড় ছেড়ো না। অফিসের ব্যাগটা রেখে তোমার গুণধরী মেয়েকে নিয়ে সুবল-ঠাকুরপোদের বাড়িতে যাও তো একবার। দেখো তোমার মেয়ে কী করেছে!”

রোহিণী তখন আতঙ্কে নীল হয়ে গেছে। মিথ্যে কথার জল যে এতদূর গড়াবে তা তার চিন্তাতেও আসেনি। হেয়ার ব্যান্ডটা তো নিরুর নয়, ওটা ফাতিমার। এখন নিরুর বাড়িতে গেলে নিরু জেনে যাবে যে রোলি চোর। সে-ই ওটা চুরি করেছিল। হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলেছিল সে। মায়ের পা জড়িয়ে ধরে সব সত্যি কথা বলেছিল। ফাতিমা যে বাবার কথা তুলেছিল বলেই ও চুরি করেছে সে-কথা জানাতেও ভুলল না।

অথচ মা-বাবা সে-সব কথা কানেই নিলেন না। রোহিণী কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল, “কিন্তু ও যে তোমাকে অপমান করল, তার কোনও শাস্তি নেই? শুধু আমার চুরি করাটাই অন্যায়!”

বাবা নির্লিপ্ত মুখে বলেছিলেন, “আমাকে অপমান যদি কেউ করে থাকে, সে তুমি নিজে। লোভীর মতো বন্ধুর শখের জিনিস চেয়েছ; সে যখন দিতে চায়নি তখন তুমি চুরি করেছ। কাজেই আমাকে অপমান তোমার বন্ধু নয়, তুমি নিজেই করেছ। কারোর কাছে হাত পেতে কিছু চাওয়ার আগে দশবার ভেবে দেখো যে জিনিসটা কি আদৌ তোমার দরকার? আর যদি চেয়েই ফেলো, তাহলে মনে রেখো যে যার জিনিস সে হ্যাঁ বা না দুটোই বলতে পারে। অন্য মানুষের সিদ্ধান্তকে সম্মান জানাতে শেখো, নইলে তোমার সিদ্ধান্ত কেউ কখনও মেনে নেবে না।”

মা-বাবা দুজনে সেদিন ওকে সঙ্গে নিয়ে ফাতিমাদের বাড়িতে গিয়ে হেয়ার ব্যান্ডটা ফিরিয়ে দিয়ে এসেছিলেন। তারপর রোলি সকলের সামনে সে যে মস্ত বড়ো অন্যায় করেছে এ-কথা স্বীকার করে এবং ফাতিমার কাছে ক্ষমা চায়। মা-বাবা তারপর পুরো তিনদিন তার সঙ্গে ভালো করে কথা বলেননি।

সেই প্রথম আর সেই শেষ। জেনেশুনে অন্যায় কাজ করলে যে কতখানি লজ্জা প্রাপ্য হয়, হাড়ে হাড়ে বুঝে গেছিল রোহিণী। জিনিস হিসেবে হেয়ার ব্যান্ডটা হয়তো অতি তুচ্ছ ছিল, কিন্তু সেদিনের শিক্ষার মতো মূল্যবান তার কাছে আর কিছুই নেই। নিজের মা-বাবার কথা ভাবলে গর্ব হয় তার। চড়-থাপ্পড় মারেননি, একখানাও মন্দ কথা বলেননি। অথচ নিজের সন্তান বলে তার দোষকে ছোটো করেও দেখেননি। যথাযোগ্য শাস্তি দিয়েছেন। আবার শাস্তিভোগের সময় তারা নিজেরাও তার সঙ্গে দাঁড়িয়ে ছিলেন। অন্যায়কারীর লজ্জা তারাও তার সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছিলেন।

“চণ্ডীতলা, চণ্ডীতলা! ও ম্যাডাম, উঠুন। আপনার স্টপ এসে গেছে।”

চোখ দুটো লেগে এসেছিল রোহিণীর। কন্ডাক্টর ছেলেটির ডাকে সে ধড়মড়িয়ে জেগে উঠল। বাস থেকে নামার সময় হাতঘড়িতে সময় দেখল সে। কাঁটায় কাঁটায় সাড়ে সাতটা বাজে। হাতে আধঘণ্টা সময় আছে এখনও। বাস-স্টপ থেকে সারদাদেবী বিদ্যালয় মাত্র পাঁচ মিনিটের রাস্তা। হেঁটেই যাওয়া যায় অনায়াসে। কিন্তু সঙ্গে জামাকাপড়, বইপত্র, আর শুকনো কিছু খাবার-দাবার দিয়ে ভরা একটা ট্রলি স্যুটকেস আর একটা মাঝারি মাপের ব্যাগ রয়েছে। লটবহর নিয়ে টানাটানি করে হাঁটা খুব বেশি বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। এক হাতে তিন্নির হাত ধরে, আর এক হাতে লাগেজগুলো ধরে রেখে রোহিণী দেখছিল কাছাকাছি রিকশা স্ট্যান্ড আছে কি না। হঠাৎ শোনে কানের কাছে ভেঁপুর আওয়াজ—প্যাঁকু-প্যাঁকু-প্যাঁকু!

“ও দিদিভাই, সারদা ইস্কুলে যাবেন বুঝি! রয়েন, আমি মালপত্তর সব উঠায় দিচ্ছি।”

কিছু বলার আগেই কোঁকড়া চুলের, হাসি হাসি মুখের ছেলেটা এসে চটপট ওদের ব্যাগ দুটো রিকশায় উঠিয়ে দিল। অগত্যা রোহিণী একটু এদিক ওদিক দেখে, তিন্নিকে সিটে বসিয়ে, নিজেও রিকশায় চড়ে বসল। তারপর বলল, “ও ভাই, ভাড়া কত নেবে তা তো বললে না?”

“এক টাকা দিয়েন দিদিভাই!”

রোহিণী একটু বিরক্ত হল, “সে আবার কী কথা! এক টাকা কেন? এখানে যা ফিক্সড রেট তাই দেব।”

রিকশা ততক্ষণে চলতে শুরু করেছে। রিকশাওয়ালা ছেলেটা খুব অল্পবয়সি। গায়ের রঙ কালো, চোখ দুটো বড়ো বড়ো, নাকটা বেশ টিকালো। দেখে মনে হয় ভালো ঘরের ছেলে।

ছেলেটা রিকশা চালাতে চালাতেই বলল, “সারদা ইস্কুলে আমার বুনুও ভরতি হইছে দুই হপ্তা আগে। আমাগো মা নাই, বাপ নাই—অনাথ বলতি পারেন। এই রিকশা আছে বলেই দুইজন বাঁইচ্যা আছি। বড়ো দিদিমণি এত ভালো মানুষ যে আমাদের অবস্থা দেখে ইস্কুলের ফিটাও নিলেন না। উলটা ভরতির পরীক্ষায় বুনুর রেজাল্ট ভালো তাই এক বছরের জন্যি বৃত্তির ব্যবস্থাও করে দিলেন। বুনুর বইখাতা, ইস্কুলের জামা-জুতা—সবকিছু নিজের খরচায় কিনে দিলেন। বলুন দিদিভাই, আজকালকার দিনে কে কার জন্যি এত করে! তাই সারদা ইস্কুলের ছাত্রীদের জন্যি আমার রিকশা সবসময় হাজির। নেহাত বউনি হয় নাই, তাই আপনারে বললাম এক টাকা দিতে।”

আনন্দে রোহিণীর চোখে প্রায় জল চলে এল। সত্যি, বড়দি মানুষটা আজও সেই একইরকম রয়ে গেলেন। পড়াশোনা ডিসিপ্লিনের ব্যাপারে এত শক্ত যে স্কুলের দেওয়ালে কাক-চিল অবধি বসতে ভয় পেত, কিন্তু মনের ভেতরে মানুষটা ফুলের মতো নরম। এমন জায়গায় তিন্নিকে ভরতি করে দিলে মা হিসেবে সে নিশ্চিন্ত হবে। মেয়ের হাতটা ধরে সে বলল, “বড়দি বরাবরই ওরকম। কিন্তু একটা কথা বলো ভাই, তুমি জানলে কী করে আমরা স্কুলেই যাচ্ছি?”

“হেইডা তো সহজ ব্যাপার দিদিভাই, ভরতির সময় তো শেষ হয় নাই এহনো। আপনি সাতসকালে ভাগনির হাত ধরে, বইখাতা, জামাকাপড়ের ব্যাগ হাতে নিয়ে ইস্কুলের স্টপে এসে দাঁড়াইছেন। তাই আন্দাজ করলাম আর কী।”

রোহিণী হাসিমুখে মেয়েকে বলল, “দেখলি, কত ভালো স্কুলে ভরতি হচ্ছিস তুই!”

তিন্নি চোখ ঘুরিয়ে, ঠোঁট ব্যাঁকাল, “হুম, দারুণ স্কুল! রিকশাওয়ালার বোনও পড়বে আমার সঙ্গে একই স্কুলে। ওয়াও!”

ছি ছি ছি! এ কী বিকৃত চিন্তাভাবনা হয়েছে মেয়েটার! কড়া গলায় রোহিণী বলল, “তিন্নি!”

রিকশা ততক্ষণে সারদাদেবী বালিকা বিদ্যালয়ের বিশাল গেটের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। জিনিসপত্র নামিয়ে ছেলেটি সামনে এসে দাঁড়াতেই কুড়ি টাকার একখানা নোট জোর করে ওর হাতে দিয়ে রোহিণী বলল, “না বললে শুনব না ভাই। দিদি বলে ডেকেছ, তাই তোমার বোনের জন্য মিষ্টি খাওয়ার টাকা দিলাম। নিতেই হবে।”

অনেক কাকুতি-মিনতি এবং একটুখানি ধমক খাওয়ার পর শেষ পর্যন্ত নোটখানা হাতে নিল ছেলেটি। যাওয়ার আগে ঢিপ করে নমস্কার করে বলে গেল, “আমার নাম মধুসূদন গড়াই দিদিভাই, ভাগনিরে বলবেন কখনও কিছু দরকার হলে যেন চিন্তা না করে। তার মধুসূদনমামা আছে।”

স্কুল না জেলখানা

বাইরে থেকে স্কুলটা দেখে তিন্নির মনে হল তাকে যেন জেলখানায় ঢুকতে হচ্ছে। স্কুল আর স্কুলের মাঠ ঘিরে বিশাল প্রাচীর। প্রাচীরের গায়ে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, স্বামী বিবেকানন্দ, আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু, মাদার টেরেসা, সারদা মা, রানি রাসমণি, ভগিনী নিবেদিতার ছবি আঁকা। ছবিগুলো দেখলেই বোঝা যায় অপটু হাতের, কিন্তু দেখলে চিনতে পারা যায় সব্বাইকে। সব মহামানব ও মানবীরা যেন একসঙ্গে ঘিরে আগলে রেখেছেন এই স্কুলের মাটি।

স্কুলটা উলটো ‘ইউ’ শেপের। মেটে লাল রঙের বিল্ডিং। সামনে ঘাসে ঢাকা বড়ো খেলার মাঠ। মাঠের দু-মাথায় বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘেরা ফুলের বাগান। বাগানে সব দেশি ফুলেদের ভিড়। বিভিন্ন রঙের জবা, বেলি, রজনীগন্ধা, লাল কাঞ্চন, সাদা কাঞ্চন, দোলনচাঁপা। বেড়ার গায়ে অপরাজিতার লতা সকালবেলার হাওয়ায় অল্প অল্প দুলছে। শান্ত, সবুজ রঙে আঁকা ছবির মতো সাজানো সবকিছু।

নিজের পুরোনো স্কুলখানা দেখতে পাওয়া মাত্রই রোহিণী যেন তার কিশোরীবেলায় ফিরে গিয়েছিল। সে দেওয়ালের দিকে দেখিয়ে বলল, “জানিস তিন্নি, প্রাচীরের গায়ে যে ছবিগুলো দেখলি, ওগুলো সব স্কুলের ছাত্রীরাই আঁকে। দিদিরা হেল্প করবে, কিন্তু সবকিছু ছাত্রীরা নিজেরাই করে। আমিও করেছি স্কুলে পড়ার সময়। বাগানে গাছ লাগানো, ফুলগাছের যত্ন করা, নাচ-গান-নাটক। দেখবি পড়াশোনা ছাড়াও কত মজা হয়।”

বাগানের দিকে তাকিয়ে মনে মনেই নাক সিঁটকাল তিন্নি। ভারি তো বাগান! একটা ভালো ফুলও নেই। গোলাপ, ডালিয়া, ম্যাগনোলিয়া হলে তাও বুঝতাম। এসব দেশি গাঁইয়া ফুল আবার অত সাজিয়ে রাখার দরকার কী? ও তো এমনিই হয়। মায়ের বকুনির ভয়ে যদিও মুখে বলল না কিছু।

স্কুলের গেট ভেতর থেকে বন্ধ ছিল। দু-বার নক করতেই বাঁদিকের লাল রঙের বিল্ডিং থেকে এক বয়স্কা মহিলা বেরিয়ে এলেন। রোহিণী ওঁকে দেখে চেঁচিয়ে উঠল—”সরলাদি, আমি গো! রোহিণী সেন, রোলি—মনে আছে? মেয়েকে ভরতি করাতে নিয়ে এসেছি। বড়দিকে চিঠি পাঠিয়েছি। উনি আমাদের আসার কথা জানেন।”

সরলাদি গেটের কাছে এসে তালা খুলে একটু ভুরু কুঁচকে ভালো করে মাকে দেখে বলল, “আরে, এ তো আমাদের রোলি! কোন ইয়ারের ব্যাচ ছিলিস, তা কিন্তু ভুলে গিয়েছি বাপু। সঙ্গে মেয়ে নাকি? আয় আয়, ভেতরে আয়। বড়দির অফিস খুলে দিচ্ছি, তোরা ভেতরে বোস। আমি বড়দিকে ডেকে দিচ্ছি। চা-কফি কিছু খাবি?”

মা হাসিমুখে ওঁর পা ছুঁয়ে প্রণাম করে বলল, “না সরলাদি, আমরা দুজনে আসার আগে পেটভরে ব্রেকফাস্ট করে এসেছি। তোমাকে চা-কফি কিছু করতে হবে না।”

“ঠিক আছে, তোরা দুটিতে বোস এখানে, আমি বড়দিকে ডেকে নিয়ে আসি।”

লাগেজগুলো অফিসের ভেতরে রেখে তিন্নিকে বাইরে ডাকল রোহিণী—”তিন্নি, এদিকে আয়, একটা জিনিস দেখাব।”

তিন্নি এতক্ষণ মায়ের দিকেই অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল। স্কুলের মাটিতে পা পড়ার সঙ্গে-সঙ্গেই মা যেন তার সমবয়সি হয়ে গিয়েছে। চড়াই পাখি, কাঠবেড়ালি, ফুলের গাছ, খেলার মাঠ, ক্লাসরুম—সবকিছু দেখেই বাচ্চাদের মতো খুশি হয়ে হাসছে। বাড়িতে মায়ের যে গম্ভীর মূর্তি দেখে অভ্যস্ত তিন্নি, তা যেন ছু-মন্তরে কোথায় উড়ে গেছে। রাশভারী রোহিণী সেনের জায়গায় ঝলমল করছে ছোট্টোবেলার ছটফটে রোলি। মায়ের মুখ থেকে চিন্তার দাগগুলো যেন ইরেজার দিয়ে ঘষে ঘষে তুলে দিয়েছে কেউ। রামধনুর মতো জ্বলজ্বল করছে মার ঠোঁটে হাসি।

দুজনে হাত ধরে হেড-মিস্ট্রেসের অফিস থেকে বাইরে এসে রোহিণী বাঁদিকে বাগানের দিকে দেখাল—”ওই দ্যাখ, ওই বড়ো লাল কাঞ্চন গাছটা দেখছিস, আর ওর পাশে ওই সাদা জবার গাছটা—ওই গাছ দুটো আমি আর আমার বেস্ট ফ্রেন্ড নিরু লাগিয়েছিলাম। দ্যাখ, কত পুরোনো গাছ, তাও কত ফুল হয়! আর ওই দিকে দ্যাখ, ওখানে টিফিনের সময় ঝালমুড়িওয়ালা রামখিলাবনকাকা আর তার বউ লছমীকাকি তেলেভাজা আর নুন-লংকা মাখানো বিলিতি আমড়া নিয়ে বসত। বড়দি এত বকত আমাদের—রোজ রোজ তেলেভাজা খেলে নাকি পেটে ব্যথা হবে, কিন্তু আমরা তাও লুকিয়ে লুকিয়ে… হিহিহি!”

“বাহ্, বাহ্, বাহ্! অপূর্ব! একে তো নিজে ছিলে দুষ্টুদের সর্দার, তার উপরে আবার মেয়েকে গর্ব করে সে-গল্প শোনাচ্ছ!”

uponyassaradadevi (2)

মা-মেয়ে একসঙ্গে পেছনে ঘুরে তাকাল, “বড়দি, আপনি!”

রোহিণী বড়দির পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে তিন্নিকে বলল, “তিন্নি, প্রণাম কর। উনিই স্কুলের হেড-মিস্ট্রেস।”

কুশল বিনিময়ের পর বড়দি বললেন, “তোমার চিঠি পেয়ে যতখানি কষ্ট পেয়েছি, ঠিক ততখানি গর্বও হয়েছে রোহিণী। জীবনে কী হবে, তা হয়তো আমাদের হাতে থাকে না, কিন্তু পরিস্থিতির সঙ্গে লড়াই করে সবকিছু আবার স্বাভাবিক করতে মনের জোর লাগে। আর সেইদিক থেকে বলছি, তোমার শিক্ষিকা হিসেবে আমি গর্বিত।”

কে জানে কেন, মায়ের জন্য খুব গর্ব হল এখন তিন্নির। সে নার্ভাস মুখে একটু তাকিয়ে দেখল হেড মিস্ট্রেসের দিকে। ওঁর বয়স প্রায় পঞ্চান্ন—দীর্ঘ, ঋজু শরীর, উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ গায়ের রঙ। মাথার কাঁচায় পাকায় মেশানো চুলে খোপা বাঁধা। পরনে চন্দন রঙের একখানা শাড়ি, চোখে চশমা। বাঁহাতের কব্জিতে একখানা সোনালি রঙের রিস্ট-ওয়াচ, ডানহাতে একটা সোনার চুরি আর গলায় সরু সোনার চেন। সবকিছুই সামান্য, কিন্তু ওঁর সৌম্য চেহারা আর ব্যক্তিত্বের জোরে যেন পুরো ঘরখানা থমথম করছে।

তিন্নির দিকে তাকিয়ে বড়দি এবার বললেন, “তোমার নাম কী?”

রোহিণী বলতে যাচ্ছিল কিছু, কিন্তু তার আগেই বড়দি বললেন, “তুমি নয় রোহিণী, যাকে জিজ্ঞাসা করেছি সে-ই উত্তর দেবে।”

ভয়ে তিন্নির গলা শুকিয়ে গেল। ও যেমন ভেবে এসেছিল, তার কোনোটাই হিসেবে মিলছে না। ভেবেছিল বাংলা মিডিয়াম স্কুল, তার টিচাররা কী আর এমন হাতিঘোড়া হবে? কিন্তু এখন বড়দির সামনে দাঁড়িয়ে ইংলিশ মিডিয়ামে না পড়তে পারার রাগ ছাপিয়ে উঠে এল নার্ভাসনেস। হাত-পা-মাথা কোনোটাই কাজ করছে না। সে ভেবেছিল মায়ের বড়দি হেড-মিস্ট্রেস মানে কড়া করে চোখ পাকিয়ে কথা বলবেন, হাতে বেত থাকবে একটা, ভাঁটার মতো বড়ো বড়ো চোখ হবে, মুখে পান। মানে ওই পচা বাংলা মুভিগুলোতে যেমন দেখায় আর কী। কিন্তু সেরকম কিছুই তো নয়। তিন্নির সব স্মার্টনেস আর রাগ সবকিছু যেন বড়দির অফিসের বাইরেই রয়ে গেছে।

অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে একটু ভয়ে ভয়ে তিন্নি বলল, “আমার নাম রাজনন্দিনী সেনগুপ্ত। ডাকনাম তিন্নি।”

“তোমার মায়ের নাম?”

“ড. রোহিণী সেন।”

“বাবার নাম?”

“অনিন্দ্য সেনগুপ্ত।”

“গুড। আমি প্রভাবতী গাঙ্গুলি। আমি সারদাদেবী বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা। ওয়েলকম ইন ইয়োর স্কুল।”

“থ্যাংক ইউ ম্যাম!”

“স্কুলের সব ছাত্রীরা আমাকে বড়দি বলে, তুমিও তাই বলবে রাজনন্দিনী। আমার পরিবারের সদস্য তুমি আজ থেকে। আশা করি তোমার মায়ের মতোই তুমিও আমার মুখোজ্জ্বল করবে। মন দিয়ে পড়াশোনা করবে। আর পড়াশোনা ছাড়াও নিজের ইচ্ছেমতো নাচ-গান-ছবি আঁকা অভ্যাস করো। আর ফিজিক্যাল এডুকেশন, খেলাধুলোও প্রতিটি ছাত্রীর জন্য দরকারি। মন দিয়ে ক্লাস করবে। সমস্ত সাবজেক্টের টিচাররা আছেন; তাঁরা পড়াশোনা ছাড়াও অন্যান্য যে-কোনো সমস্যার ব্যাপারে তোমাকে সাহায্য করবেন। আর কোনোরকম অসুবিধে হলে তুমি আমার কাছে এসো।”

লক্ষ্মী মেয়ের মতো মাথা নাড়াল তিন্নি।

বড়দি এবার বললেন, “আমি সরলাকে ডাকছি, সরলাদি এসে তোমাকে তোমার রুমে নিয়ে যাবে।”

বড়দির টেবিলে রাখা একটা ঘণ্টিতে একটু চাপ দিতেই সরলাদি অফিসে এল, “ডেকেছেন বড়দি?”

“হ্যাঁ, সরলা। রাজনন্দিনী আমাদের নতুন ছাত্রী। ওকে ওর ঘরটা দেখিয়ে দাও।”

“ঠিক আছে দিদি। এসো রাজনন্দিনী। চলো তোমাকে তোমার ঘর দেখিয়ে দিই।”

মাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে, গালে একটা চুমু খেয়ে নিজের লাগেজগুলো হাতে নিল তিন্নি। স্যুটকেসটা তো চাকা লাগানো—টানলেই দিব্যি চলে আসবে, খালি কাঁধের ব্যাগটাই যা একটুখানি ভারী। একটু কষ্ট হবে ঠিকই, কিন্তু তিন্নি ঠিকই পারবে। বড়দির অফিস থেকে বেরোনোর আগে কিছু একটা বলতে ইচ্ছে করছিল তার, কিন্তু কী বলবে ভাবতে-ভাবতেই দরজার কাছে চলে এল তারা। পেটের ভেতর থেকে অনেকখানি কান্না গুড়গুড়িয়ে প্রায় গলার কাছে এসে গেছিল। কপ করে সেটা গিলে ফেলল সে। নাহ্, এখন কাঁদা যাবে না। একটু হলেও মার কষ্ট বুঝতে পারছে সে এখন। তিন্নি কাঁদলে মা আরও কষ্ট পাবে।

রোহিণীর চোখ দুটোও ছলছল করছিল। তিন্নি পারবে তো সবার সঙ্গে মিলেমিশে থাকতে? নাড়িছেঁড়া ধন তার। বাচ্চাকে নিজের থেকে আলাদা করে দেওয়ার যন্ত্রণা মায়েদের থেকে বেশি অন্য কেউ বোঝে না। মানুষ হাজার আধুনিক হয়ে গেলেও এই টান উপেক্ষা করার ক্ষমতা কোনও মায়েরই কখনও নেই। কেউ মনের জোরে সহ্য করে নেয়, আর কেউ নতজানু হয়ে ভেঙে পড়ে। এটুকুই পার্থক্য। রোহিণী ধরা গলায় বলল, “ভালো করে থাকিস তিন্নি। বন্ধুদের সঙ্গে মিলেমিশে থাকবি, দিদিদের কথা শুনবি। ঠিক আছে। আমি প্রতি সপ্তাহে ফোন করব। মনখারাপ করিস না।”

খুব জোর করে হলেও হাসল তিন্নি। মাকে যে ও কত মিস করবে সেটা তো বলাই হল না। আসার সময় পুরো রাস্তাটা ও ইচ্ছে করে দুষ্টুমি করেছে। এখন মনে হচ্ছে ও কত বড়ো স্টুপিড। মা বোধহয় ভাববে যে ও মাকে ভালোই বাসে না। কিন্তু সেটা তো সত্যি নয়। ভেতরের দুঃখটাকে চাপা দিয়ে তিন্নি মিছিমিছি হেসে বলল, “তুমি চিন্তা কোরো না মা, আমি বড়ো হয়ে গেছি।”

সরলাদির সঙ্গে হোস্টেলের দিকে যেতে যেতে বড়দি আর মায়ের কথা কিছুটা শুনতে পেল সে, “মনখারাপ কোরো না রোহিণী, সব ঠিক হয়ে যাবে।”

“না বড়দি, আমি জানি। আপনার দায়িত্বে দিয়ে যাচ্ছি ওকে, ওর ভালোই হবে। কিন্তু ওকে ছেড়ে থাকতে হবে…”

মার বাকি কথাগুলো কান্নায় ডুবে গেল। হলের মাথায় পৌঁছে হোস্টেলের করিডোরে ঢোকার আগে ঘাড় ঘুরিয়ে আবার দেখল তিন্নি। মা চেয়ারে বসে মাথা নীচু করে কিছু বলছে আর কাঁদছে, বড়দি পাশেই দাঁড়িয়ে আছেন—ওঁর ডানহাতখানা মায়ের মাথায়।

এরপর আর কান্না আটকে রাখতে পারল না তিন্নি। চুপিচুপি জামার হাতায় চোখের জল মুছতে মুছতে সরলাদির পিছু পিছু এগিয়ে চলল সে। সত্যি, মা যে কী না! নিজের কষ্ট সব বুকে পুঁটুলি বেঁধে লুকিয়ে রাখে, তাও কাউকে কিচ্ছু বলবে না।

স্কুলে প্রথম দিন

মা-বাবাই দুজনেই তিন্নির পেছনে ছুটছিল। আর তিন্নি তার নতুন কেনা পিংক কালারের লেডি বার্ডে প্যাডেল করে আরও তাড়াতাড়ি এগিয়ে গেল সামনে। বাবাই খুব জোরে চিৎকার করে বলল, “তিন্নি, একটু ধীরে চালা! আমার যে পা নেই—ছুটব কী করে?”

সে-কথা শুনে তিন্নি এবার পেছন ফিরে তাকাল। সত্যিই তো, বাবাই তো আর আগের মতো নেই—তার কাছে দৌড়ে আসবে কী করে? তিন্নি চেষ্টা করল বাইসাইকেলটাকে থামাতে। কিন্তু কী মুশকিল, লেডি বার্ডখানা এবার নিজের ইচ্ছেমতো মাটি ছেড়ে আকাশের দিকে উড়তে শুরু করল। আকাশের গায়ে আবার মস্ত বড়ো একখানা লোহার গেট। গেটের সামনে গম্ভীর হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন সিস্টার নিবেদিতা। তাঁর পরনে চন্দন রঙের শাড়ি। চোখে চশমা। হাতে হাতঘড়ি। তিন্নিকে দেখে তিনি বললেন, “এই গেট দিয়ে একবার ঢুকলে বেরোতে দেব না কিন্তু!”

এবার কী হবে!—লেডি বার্ডটা হুড়মুড়িয়ে এগিয়ে যাচ্ছে ওই লোহার গেটের দিকেই। থামছে না মোটেই। মা-বাবাইয়ের কাছে ফিরে যাবে কী করে তিন্নি? মা-বাবাইকে আর দেখাই যাচ্ছে না। তিন্নি ভয়ে কেঁদে উঠল— “মা-বাবাই! সাইকেলটা থামছে না-আ-আ-আ…”

“ওই, কী হল, কাঁদছ কেন? বাড়ির জন্য মনকেমন করছে বুঝি?”

পাশ থেকে অন্য একজন বলল, “না না, আমার মনে হয় ভূতের স্বপ্ন দেখেছে।”

অপরিচিত গলার আওয়াজ শুনে হুড়মুড়িয়ে বিছানায় উঠে বসল তিন্নি। যাক বাবা, ও তাহলে এতক্ষণ স্বপ্ন দেখছিল। ওর বিছানার পাশে ওর দুজন রুমমেট দাঁড়িয়ে আছে। গতকাল রাত্রিতেই দুজনের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। একজনের নাম পারিজাত মুখোপাধ্যায় আর অন্যজন কবিতা সরকার। পারিজাত ওরফে পরি দেখতে ভীষণ মিষ্টি। বয়-কাট চুল, কাঁচা হলুদের মতো গায়ের রঙ, ভীষণ ছটফটে—ডানপিটে মেয়ে। আর ওদিকে কবিতা, মানে বিতু বেশ হাসিখুশি কিন্তু একটু ভিতু স্বভাবের। ওর মাথাভরা কোঁকড়ানো চুল, শ্যামলা গায়ের রঙ, গোল মুখ, চোখে চশমা আর বগলে সবসময় থাকে গল্পের বই।

পরি আর বিতুকে বিছানার দু-পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে একটু লজ্জাই পেয়ে গেল তিন্নি। এমা, ছি ছি, ও স্বপ্ন দেখে চেঁচামেচি করছিল! ওরা কী ভাবল কে জানে! ও চোখ দুটো কচলে নিয়ে বলল, “না না, আমার কিচ্ছু হয়নি। সরি, তোমাদের ঘুম ভাঙিয়ে দেবার জন্য। তোমরা ঘুমিয়ে পড়ো।”

পরি বলল, “ঘুমোব মানে! ক’টা বাজে সে-খেয়াল আছে?”

বিতু বলল, “পাঁচটা বেজে গেছে, উঠে পড়ো তাড়াতাড়ি। নিজের টুথব্রাশ, তোয়ালে নিয়ে নাও। দেরি হলে বাথরুমে এই অ্যাত্ত বড়ো লাইন লেগে যাবে। ওঠো ওঠো, তাড়াতাড়ি ওঠো।”

বড়ো বিরক্তি বোধ করল তিন্নি। ধুস! এ আবার কী—জেলখানার মতো নিয়মকানুন! ভোর পাঁচটায় উঠতেই হবে, এ আবার কোন দেশি কথা! মনে মনে বিরক্ত হলেও মুখে কিছু বলল না সে। নিজের কাবার্ড থেকে টুথপেস্ট বের করে এক টিপ পেস্ট ব্রাশে লাগিয়ে তোয়ালেটা ঘাড়ে নিয়ে বলল, “চলো।”

বাথরুমের সামনে গিয়ে দেখে সেখানে বিভিন্ন ক্লাসের প্রায় কুড়ি-পঁচিশজন মেয়ে শান্তভাবে লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। বাঁদিকে একটা সরু লম্বা করিডোর—সেখানে টানা লম্বা বেসিন, পাঁচখানা ট্যাপ রয়েছে। আর মুখ ধোয়ার জায়গা পেরিয়ে সামনে এগিয়ে গেলে একসারিতে দাঁড়ানো পাঁচখানা টয়লেট আর টয়লেটের উলটোদিকেই রয়েছে পাঁচখানা শাওয়ার রুম। ছোটো ছোটো খুপরি মতো জায়গাগুলো, কিন্তু নোংরা নয়, বেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন।

বিতু একটু ঝুঁকে তিন্নির কানে কানে বলল, “দেখলে, বলেছিলাম না লাইন লেগে যাবে?”

তিন্নির বিরক্তি বাড়ছিল বই কমছিল না। সে ভুরু কুঁচকে বলল, “তোমরা থাকো কী করে এভাবে! জেলখানার মতো নিয়মকানুন সব!”

বিতু কথাগুলো বলেছিল ফিসফিসিয়ে, তিন্নির কানে কানে। কিন্তু তিন্নি ওসবের ধার ধারেনি। আর তাছাড়া সে ভেবেছিল তার মতো সবাই অপছন্দ করে এরকম উলটোপালটা নিয়মকানুন। শুধু অন্যরা ভয়ে কিচ্ছু বলতে পারে না। কিন্তু তিন্নির তো আর ভয়ের কিছু নেই। সে এমনিতেই বছর ঘোরার আগেই এই পচা স্কুল ছেড়ে কোনও একটা ভালো মর্ডান স্কুলে ভরতি হয়ে যাবে। তাই ফিসফিসিয়ে না বলে তার কথাগুলো বেশ জোরেই বলেছিল সে। আশ্চর্য, আশেপাশের সবগুলো মেয়ে কেমন যেন রাগী রাগী চোখে তার দিকে তাকাল। গুনগুনিয়ে আওয়াজ উঠল—”নতুন এসেছে।”

কেউ আবার বলল, “থাক, জিনিয়াদিকে কিছু বলিস না। মা-বাবার জন্য মনখারাপ, তাই অমন বলেছে বোধহয়।”

বিতু আর পরি ভ্যাবাচ্যাকা মুখে দাঁড়িয়ে রইল। ইস, ছি ছি ছি, কী লজ্জা! সিনিয়র দিদিরা কী ভাবল!

ততক্ষণে সামনের পাঁচজনের দাঁত মাজা, মুখ ধোওয়া, এক নম্বর, দুই নম্বর—সব হয়ে গিয়েছিল। এবার ওদের পালা। হুড়োহুড়ি করে সকালবেলার কাজকর্ম সেরে তিনজন দৌড়োল ওদের ঘরের দিকে। ঘরে ঢুকেই পরি বলল, “তুমি সবার সামনে ওভাবে কেন বললে? জানো, জিনিয়াদি জানলে ওর কত খারাপ লাগবে!”

তিন্নি বলল, “দেখো, আই ডোন্ট কেয়ার হু ইজ জিনিয়াদি। সো একটা সত্যি কথা শুনে তার যদি খারাপ লাগে তো আমার কিছু করার নেই। আর তাছাড়া জিনিয়াদিকে এত ভয় পাও কেন তোমরা?”

বিতু ঠান্ডা মাথায় ওকে বোঝানোর চেষ্টা করছিল। সে বলল, “জিনিয়াদি আমাদের হোস্টেল মনিটর। ক্লাস এইটে পড়ে। আমরা দিদিকে ভয় পাই না, ভালোবাসি।”

পরি রেগে কিছু বলতে যাচ্ছিল। বিতু ওর হাত ধরে বলল, “রাগ করিস না পরি। ও নতুন তো তাই অমন বলছে—ক’টা সপ্তাহ যেতে দে, দেখবি সব ঠিক হয়ে যাবে।”

ওরা তিনজনই এরপর চটপট গতরাত্রির বাসি জামাকাপড় বদলে নিল। তারপর বিতু বলল, “এবার ব্রেকফাস্ট। সকালের জলখাবার খেতে ডাইনিং হলে যেতে হবে। তুমি ‘আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে’ গানটা জানো তো?”

“কেন, এখন গানবাজনা হবে নাকি? তোমরা খেতে বসেও নাচগান করো!”

“তুমি সবকিছু উলটো বোঝো কেন বলো তো? ওটা আমাদের ভোরবেলার প্রার্থনা সংগীত। সকালবেলা শুরু হওয়ার আগে ঠাকুরকে প্রণাম করা। এতে মন্দ কী?”

তিন্নি ঠোঁট ওলটালো। তারপর একটু ভেবে বলল, “না, ওই গানটা আমার জানা নেই। তোমার কাছে লেখা আছে?”

“আমার কাছে নেই, তবে চিন্তা কোরো না। আমরা যেখানে বসব, তার ঠিক সামনে, কিচেনের পাশে দেওয়ালে একটা বড়ো পোস্টারে পুরো গানটা লেখা আছে। আমরা অবশ্য প্রথম চারটে লাইনই গাই। পুরো গানটা তো অনেক বড়ো, পুরোটা গাইতে গেলে খাবার ঠান্ডা হয়ে যাবে। তুমি পোস্টার থেকেই দেখে নিও। আর তাছাড়া দু-একদিন পর দেখো গানটা এমনিতেই মুখস্থ হয়ে যাবে। তখন পোস্টার না দেখলেও চলবে।”

বিতুর কথা শেষ হবার আগেই ওরা ডাইনিং হলে পৌঁছে গেল। গতকালও লাঞ্চ-ডিনার এখানে করেছিল তিন্নি। কিন্তু তখন মনখারাপ ছিল। মাকে মিস করছিল আর লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদছিল বলে কিছুই দেখা হয়নি। এখন পুরো হলটা ভালো করে দেখল ও। বেশ বড়ো জায়গা নিয়ে তৈরি ঘরখানা। নীচের মেঝেতে গ্রে কালারের খসখসে টাইলস বসানো। সারি সারি টেবিল আর চেয়ারে স্টুডেন্টদের খাওয়ার ব্যবস্থা‌। দেওয়াল আর ছাদের রঙ লেমন ইয়েলো। ডানদিকে দুটো বড়ো বড়ো খোলা জানালা। হলঘরটা ভোরের মিষ্টি নরম আলোয় ভরে আছে।

মেয়েরা লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল কিচেনের সামনে। সবার হাতে একটা করে প্লেট, চায়ের কাপ আর ছোটো একটা বাটি। কিচেনের সামনে দেওয়ালে একটা চারকোনা কাটা জায়গা। সেখান থেকেই সরলাদি সবাইকে চা আর জলখাবার দিচ্ছে। ভেতরে আরও দুজন মহিলা বড়ো বড়ো ডেকচিগুলো সাবানজল দিয়ে ধুচ্ছে।

আজকের জলখাবারের মেনুতে আছে মটরের ঘুগনি, পরোটা, কলা, একখানা ডিমসেদ্ধ আর চা। সব মেয়েরা খাবার নিয়ে বসার পর জিনিয়াদি আর সরলাদি হলঘরের সামনে হাতজোড় করে নমস্কারের ভঙ্গিতে দাঁড়াল। তিন্নি দেখল সবাই নিজের খাবারের প্লেটটাকে একবার প্রণাম করে, চেয়ার ছেড়ে উঠে একইরকম নমস্কারের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়েছে‌। তারপর শুরু হল প্রার্থনা সংগীত। রবিঠাকুরের গানের প্রথম চারটি চরণে সুরে সুর মেলাল ঘরের প্রত্যেকটি মানুষ,

‘আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে বিরাজ সত্যসুন্দর॥
মহিমা তব উদ্ভাসিত মহাগগনমাঝে,
বিশ্বজগৎ মণিভূষণ বেষ্টিত চরণে॥
আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে বিরাজ সত্যসুন্দর॥’

গান শেষ হলে তিন্নি কেমন যেন আনমনা হয়ে গেল। বহু চেষ্টা করেও রাগ করে থাকতে পারল না আর। গানের শব্দগুলো কী সুন্দর। ঠিক মনে হচ্ছিল যেন কোনও মন্দিরে বসে আছে ও। আর জিনিয়া বলে যে সিনিয়র দিদিটা, ওর গলার আওয়াজটাও এত সুন্দর! গম্ভীর অথচ সুরেলা গলা, শুনলে প্রাণ জুড়োয়।

হঠাৎ আঙুল চাটতে চাটতে পরি বলল, “ওহ্, আজকের ঘুগনিটা কী দারুণ হয়েছে না!”

পাশের বেঞ্চ থেকে আর একটা মেয়ে বলল, “আমার মনে হয় আজকের রান্না সরলাদি নিজের হাতে করেছে। আজকে প্রায় ভোর চারটে নাগাদ দিদি ঘুম থেকে উঠে গিয়েছিল জানিস?”

আর একজন বলল, “সত্যি বাবা, সরলাদি পারেও। আমাদের সব্বাইকে ঘুমুতে পাঠিয়ে, হোস্টেলের সব দরজা-জানালায় তালা লাগিয়ে সেই কোন রাত্রিতে নিজে ঘুমুতে যায়। আবার কিনা ভোর চারটেয় উঠে পড়ে! আমি হলে তো বাবা পারতামই না।”

বিতু বলল, “জানিস, মোহর আর কৌশিকী তো সরলাদির পাশের রুমেই থাকে। ওরা বলছিল যে ঘুম থেকে উঠতে নাকি অ্যালার্ম ঘড়িও লাগে না সরলাদির। আমরা তো শুনে হাঁ।”

ওদের কথাবার্তা শুনে কেন জানি না খুব লজ্জা পেল তিন্নি। ভোর পাঁচটায় উঠতে হয়েছে বলে ও কত রাগ করেছে আজকে। অথচ ওদের সবার জন্য সরলাদি প্রত্যেকদিন সূর্য ওঠার আগে ঘুম থেকে উঠে যায়‌। কই, ওঁর মুখে তো কোনও বিরক্তি নেই! সবসময় হাসিমুখে থাকে সে। তিন্নির রাগ-বিরক্তি নিজে থেকেই ঝাপসা হয়ে গেল। বরং আজ সকালে নিজের ব্যবহারের জন্য লজ্জাই পেল সে। একবার ভাবল জিনিয়াদির কাছে গিয়ে সরি বলে আসে, কিন্তু দেখল জিনিয়াদির আশেপাশে আরও অনেক মেয়েরা আছে, তাই আর সরি বলা হল না।

ব্রেকফাস্টের পালা শেষ হল সাতটা নাগাদ। মেয়েরা সবাই উঠে নিজের কাপ-প্লেট-বাটি বেসিনে ধুয়ে রওনা দিল নিজের নিজের ঘরের দিকে। তিন্নি ঘরে গিয়েই পরি আর বিতুকে বলল, “আই অ্যাম সরি!”

পরি অবাক হয়ে বলল, “সরি, কিন্তু কেন?”

তিন্নি বোকার মতো দাঁড়িয়ে রইল, এমা, এ আবার কী? এই না পরি ভোরবেলায় কত রাগ করল তার উপরে, আর এখন বলছে কেন?

পাশ থেকে বিতু হেসে বলল, “হিহিহি… পরির ভারি ভুলো মন। ও খুব তাড়াতাড়ি রেগে যায়, কিন্তু দু-মিনিটের মধ্যেই ভুলে যাবে কেন রাগ করেছিল। আর মিনিট দশেক পরে যার উপরে রাগ করেছিল তার গলা জড়িয়ে ধরে শিঙাড়া খেতে বসে। হো হো হো…”

বিতুর বলার ধরনে পরি আর তিন্নি দুজনেই হেসে ফেলল। পরি একটু লাজুক হেসে বলল, “যা যা, মেলা বকিসনে তো। কবে কার গলা জড়িয়ে ধরে শিঙাড়া খেয়েছি আমি?”

বিতুর হাসি এখনও থামেনি। ও হাসতেই-হাসতেই বলল, “ওমা, তাও ভুলে গেলি! যখন তুই আর আমি নতুন নতুন এই রুমে এসেছিলাম তখন তোকে ঢ্যাঙা বলেছিলাম বলে তুই কী রাগটাই না করেছিলি! তারপর বিকেলবেলায় আমাকে এসে শুধোচ্ছিলি আমি শিঙাড়ার সঙ্গে তেঁতুলের চাটনি খাব কি না! সেদিনই বুঝেছি তোর মাথার মধ্যে কিরি পোকা আছে।”

হঠাৎ তিনমূর্তি দেখল দরজায় সরলাদি দাঁড়িয়ে, “পরি, তিন্নি, বিতু—এখনও পড়তে বসোনি তোমরা? এতক্ষণ ধরে হাহা-হিহি করছ, আমি কিন্তু সব শুনতে পাচ্ছি।”

পরি আর বিতু দুজনেই একসঙ্গে বলল, “এই তো দিদি, এক্ষুনি বসছি। আমরা তিন্নিকে একটা জিনিস বোঝাচ্ছিলাম তো…”

“ওইসব বোঝাবুঝি পরে হবে, আগে পড়তে বসো তিনজনে। বড়দির কানে খবর গেলে জানোই তো কী হবে!”

বড়দির নাম শুনতেই বিতু আর পরির মুখ শুকিয়ে এত্তটুকু হয়ে গেল। পরি বলল, “না না দিদি, বড়দিকে বোলো না। এই তো পড়তে বসে গেছি আমরা।” হুড়মুড়িয়ে নিজের নিজের টেবিলে বইখাতা নিয়ে পড়তে বসল ওরা।

সরলাদি মুখ টিপে হেসে চলে গেল ওদের ঘর থেকে। তিন্নির খুব জানতে ইচ্ছে করছিল যে ওরা দুষ্টুমি করেছে জানলে বড়দি কী সাজা দেবেন। গতকাল যখন বড়দির সঙ্গে দেখা হল, তখন তো একবারও তাঁকে মিস ভয়ংকরী বলে মনে হয়নি। হয়তো একটু বকবকি করবেন অথবা কান ধরে নিল-ডাউন করিয়ে রাখবেন। আর যদি তাই হয় তো তাতেই-বা অত ভয় পাওয়ার কী আছে? সে ফিসফিস করে পাশের ডেস্কে বসে থাকা পরিকে জিজ্ঞাসা করল, “আচ্ছা, বড়দি জানলে কী হবে?”

পরি কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু বাইরে সরলাদির গলার আওয়াজ শুনতে পেয়ে সে ঠোঁটের উপর আঙুল রেখে বলল, “শ-শ-শ-শ… এখন নয়, পরে সব জানতে পারবে।”

তিন্নি একটু ঘাবড়ে গিয়ে তাড়াতাড়ি ভূগোল বইয়ের প্রথম চ্যাপ্টারখানা খুলে বসল।

আটটা পঁয়তাল্লিশ নাগাদ আবার হুড়োহুড়ি শুরু হল। তবে লাইন এবারে শাওয়ার রুমের সামনে—সবার হাতে তোয়ালে, সাবান, শ্যাম্পু। পাঁচজন করে শাওয়ার রুমে ঢুকছে আর চটপট স্নান সেরে বেরিয়ে আসছে। তারপর যাচ্ছে পরের পাঁচজন। সরলাদি ওদের দুপুরের খাবারের তদারকি করছে আর মাঝে মাঝে এদিকে এসে চেঁচামেচি করছে, “অ্যাই মৌরি, কতবার বলেছি ভেজা পায়ে দৌড়বি না! পিছলে পড়লে হাত-পা ভাঙবে, বুঝবি তখন মজা। শিউলি তুই চুল মুছিসনি ভালো করে। হ্যাঁ, তারপর ওই ভেজা চুলে বেণী বাঁধো আর ঠান্ডা লাগাও। আবার লাফাচ্ছিস! চুপ করে দাঁড়া। চুলগুলো মুছে দিই ভালো করে। হাসিনা, আর কতক্ষণ লাগবে তোর? তাড়াতাড়ি বেরো। বাইরে এখনও এতগুলো মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে।”

সবার সঙ্গে সঙ্গে তিন্নিও ঝটপট স্নান সেরে স্কুলের জন্য তৈরি হয়ে নিল। তারপর ইউনিফর্ম পরে, চুল বেঁধে ক্লাসের দিকে রওনা দিল সবাই। ক্লাসে ঢুকে কিছুক্ষণ সময় লাগল তিন্নির ধাতস্থ হতে। ও ভরতি হয়েছে ক্লাস ফাইভে, সেকশন এ-তে। বিতুও ওর সঙ্গে একই সেকশনে পড়ে। পরি অবশ্য সেকশন বি-র স্টুডেন্ট। তিন্নিদের ক্লাশে প্রায় চল্লিশ জন ছাত্রী। বেশিরভাগই ডে-স্কলার, মানে তারা কাছাকাছিই থাকে তাই বাড়ি থেকেই স্কুলে যাওয়া-আসা করে। মাত্র চার-পাঁচজন আছে যারা তিন্নির মতো হোস্টেলে থাকে।

বিতু আর তিন্নি ক্লাসে ঢুকতেই বিতু বলল, “দাঁড়া, একজনের সঙ্গে দেখা করিয়ে দিই তোর।”

নিজেদের ব্যাগ দুটো বেঞ্চে রেখে বিতু ওর হাত ধরে টেনে নিয়ে গিয়ে আর একটা মেয়ের কাছে গিয়ে বলল, “সুমতি, দেখ আমার নতুন রুমমেট প্লাস বন্ধু। ওর নাম তিন্নি আর ভালো নাম রাজনন্দিনী।”

তারপর তিন্নির দিকে তাকিয়ে বিতু বলল, “আর ও হল সুমতি। আমাদের ক্লাসের ফার্স্ট গার্ল আর ওর আবৃত্তি শুনলে তুই পাগল হয়ে যাবি।”

সুমতি লজ্জা পেল, “না রে তিন্নি, ওর কথা শুনিস না। বিতু সবসময় উলটোপালটা বকে, ওর মাথার ঠিক নেই।”

বিতু বলল, “হু হু বাবা, লুকোলে হবে? আমরা সব জানি। জানিস তিন্নি, শ্রাবণীদি মানে আমাদের ক্লাস টিচার বলেছেন যে সুমতির লেখা কয়েকখানা রচনা নাকি স্কুলের মডেল অ্যানসার ফাইলে রাখা আছে। যাতে অন্যান্য বছরের ছাত্রীদের সুবিধে হয়।”

তিন্নি খুব মন দিয়ে সুমতির দিকে দেখছিল। সুমতি দেখতে পরির মতো অত সুন্দর নয়, কিন্তু কী যেন একটা অদ্ভুত আলো আছে ওর চেহারায়। ওকে দেখলেই মনে হয় ওর সঙ্গে খেলি, গল্প করি। সুমতির গায়ের রঙ শ্যামলা, মাথার চুল ছোটো করে কাটা, টিকালো নাক আর চোখ দুটো বুদ্ধির আলোয় ঝকঝক করছে‍। আর সবথেকে বড়ো কথা হল ওর মিষ্টি ব্যবহার। সুমতির সঙ্গে কথা বলে মনে হল যেন কতদিনের চেনা। তিন্নির খুব গর্ব হল। ক্লাসের ফার্স্ট গার্ল তো ঠিক এমনিই হওয়া উচিত।

সুমতির কথায় চমক ভাঙল তিন্নির, “দূর, চুপ কর তো বিতু! তোরা বসেছিস কোথায়?”

“ওই তো, সেকেন্ড বেঞ্চে।”

সুমতি বলল, “আমার বেঞ্চেও জায়গা আছে। বসবি নাকি?”

বিতু আর তিন্নি একসঙ্গে মাথা নাড়াল, “হ্যাঁ-অ্যা-অ্যা-অ্যা।”

“চলে আয় তাহলে ব্যাগ নিয়ে।”

ব্যাগ আনতে গিয়ে বিতু বলল, “দেখলি, সুমতি কী ভালো না! এত ভালো আবৃত্তি করে, এত ভালো পড়াশোনায়, অথচ এতটুকুও অহংকার নেই। আর তাছাড়া—এই রে, এসে গেছে!”

“কে?”

বিতু হাসি চেপে বলল, “টুনটুনি ও বিড়ালিনী।”

“মানে?”

“দরজার দিকে দ্যাখ।”

তিন্নি দরজার দিকে তাকিয়ে দেখল, ক্লাসরুমের দরজায় দাঁড়িয়ে দুটো মেয়ে কী নিয়ে যেন ঝগড়া করছে। অবশ্য ঝগড়া বলা ভুল—একজনই শুধু হাত-পা ছুড়ে, রেগেমেগে কথা বলছে আর আর একজন গোমড়া মুখে মাথা নীচু করে কথা শুনছে।

তিন্নি খুব অবাক হয়ে বিতুকে জিজ্ঞাসা করল, “ওরা কে? ওদের নাম টুনটুনি আর বিড়ালিনী কেন?”

“সে কি, তুই টুনটুনির গল্প পড়িসনি?”

“যাহ্, টুনটুনির গল্প পড়ব না কেন, কিন্তু ওদের নাম ওরকম কেন?”

“দেখতে থাক, নিজেই বুঝতে পারবি।”

ওই মেয়ে দুটো ততক্ষণে ফার্স্ট বেঞ্চে এসে নিজেদের ব্যাগ রেখে বসেছে। তিন্নি ওদের দুজনের দিকে ভালো করে দেখল। ওদের মধ্যে একজনের গায়ের রঙ ধবধবে সাদা, বাদামি রঙের চুল বেশ কায়দা করে নীল রিবন দিয়ে বাঁধা, আর চোখ দুটো সবুজ। মেয়েটাকে দেখতে বেশ ভালো, কিন্তু চোখ দুটো দেখে কেমন যেন কুচুটে বলে মনে হয়। বিরক্তিভরা মুখখানা, যেন হাসতে জানে না। মাঝে মাঝে সে ঘাড় বেঁকিয়ে মটমট করে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। সত্যিই বেড়ালের সঙ্গে মেয়েটার অনেক মিল আছে। তিন্নির জেঠুর বাড়ির পোষা বেড়ালটাও মাছ না পেলে ঠিক অমনভাবেই তাকাত। কিন্তু অন্য মেয়েটার নাম টুনটুনি কেন তা অবশ্য তিন্নির মাথায় ঢুকল না। অন্য মেয়েটা বেশ শান্ত, গোলগাল ছোটোখাটো চেহারা, মাথার দু-পাশে দুটো ঝুঁটি বাঁধা, মুখখানা দেখলে মনে হচ্ছে এক্ষুনি ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেলবে। তিন্নির ভারি মায়া হল ওই মেয়েটাকে দেখে। তিন্নি মনে মনে ভাবছিল—বিড়ালিনী তো বুঝলাম, কিন্তু টুনটুনি কেন?

তক্ষুনি প্রেয়ারের ঘণ্টা পড়ল—টং-টং-টং-টং। লাইন দিয়ে সবাই সবার ক্লাসরুম থেকে বেরিয়ে রওনা দিল স্কুলের মাঠে। জাতীয় সংগীত ও প্রার্থনা সংগীত ‘হও ধরমেতে ধীর’ গেয়ে প্রার্থনা শেষ হল। তারপর বড়দি কিছু প্রয়োজনীয় ঘোষণা শেষ করার পর ওরা সবাই নিজের নিজের ক্লাসে ফিরে এল।

ক্লাসরুমে ফিরে আসার মিনিট পাঁচেক পরেই তিন্নিদের ক্লাস-টিচার শ্রাবণীদি এসে রোল-কল শুরু করল। তিন্নির রোল নম্বর থার্টি ফাইভ। ও তো সবার শেষে ভরতি হয়েছিল, তাই। রোল-কল শেষ হলে শ্রাবণীদি বলল, “গুড মর্নিং, ক্লাস। আমরা সবাই কি জানি যে আমাদের ক্লাসে আজকে আরও দুজন নতুন বন্ধু এসেছে? তোমরা জানো তারা কে?”

বেশিরভাগ মেয়েরা মাথা নাড়িয়ে না বলল। কয়েকজন আবার ঘাড় ঘুড়িয়ে তিন্নির দিকে দেখল। আর বাকিরা কয়েকজন নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে কথা বলতে শুরু করল।

একটু থেমে শ্রাবণীদি আবার বলল, “আমাদের দুজন নতুন বন্ধুদের নাম মোহনা মিত্র আর রাজনন্দিনী সেনগুপ্ত। দারুণ মিষ্টি নাম, তাই না! আমি এবার মোহনা আর রাজনন্দিনীকে অনুরোধ করব যে ওরা যেন আমাদের সামনে এসে নিজেদের সম্পর্কে একটুখানি জানায়। মোহনা, চলে এসো এখানে।”

মোহনা নামের মেয়েটা লাস্ট বেঞ্চের এক কোনায় বসে ছিল মুখ অন্ধকার করে। এখনও কোনও বন্ধু হয়নি বোধহয় বেচারির। সবার সামনে গিয়ে সে চুপ করে বোকার মতো মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে রইল।

শ্রাবণীদি কয়েক সেকেন্ড অপেক্ষা করে বুঝল, মোহনাকে কিছু জিজ্ঞাসা না করলে ও অমনি চুপ করেই দাঁড়িয়ে থাকবে। তাই সে চেয়ার থেকে উঠে মোহনার পাশে গিয়ে ওর কাঁধে হাত রেখে বলল, “ভয় পেয়ো না মোহনা, আমরা সবাই তোমার বন্ধু। আমাদের বলো তোমার নাম কী।”

মোহনা খুব নীচু গলায় বলল, “মোহনা মিত্র।”

“তোমার বাড়ি কোথায়?”

এর উত্তরে মোহনা কী বলল শুনতে পেল না কেউই।

শ্রাবণীদি আবার বলল, “আমরা কেউ শুনতে পেলাম না তোমার কথা। আর একটু জোরে বলো মোহনা।”

মোহনা কী যেন বলতে গিয়ে ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেলল এবার। শ্রাবণীদি কোনোরকমে ওর চোখ-মুখ মুছিয়ে বলল, “দূর বোকা মেয়ে, অমনি করে কাঁদে নাকি কেউ? ভয় পাচ্ছ কেন তুমি, আমরা তো সবাই বন্ধু এখানে, তাই না?”

মোহনা চোখের জল মুছল ঠিকই, কিন্তু ফুঁপিয়ে কান্না বন্ধ হল না ওর। শ্রাবণীদি নরম গলায় বলল, “মনখারাপ কোরো না মোহনা, যাও তুমি তোমার সিটে গিয়ে বসো।”

তিন্নি দেখল মোহনা হাতের পাতার উলটোদিক দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে আবার শেষ বেঞ্চের এককোণে গিয়ে জড়োসড়ো পুঁটুলি হয়ে বসল।

এরপরেই শ্রাবণীদি ডাকল তিন্নিকে। তিন্নি কিন্তু একটুও ভয় পেল না। স্কুলে ভরতি হওয়ার আগেই মা ওকে সেলফ ইন্ট্রোডাকশন ভালো করে শিখিয়ে দিয়েছিল। সে গটগট করে গেল শ্রাবণীদির পাশে দাঁড়িয়ে—”গুড মর্নিং ফ্রেন্ডস! আমার নাম রাজনন্দিনী সেনগুপ্ত, কিন্তু আমাকে আমার বাড়িতে সবাই তিন্নি বলে ডাকে। আমার মায়ের নাম ড. রোহিণী সেন এবং বাবার নাম অনিন্দ্য সেনগুপ্ত। আমার বাড়ি কলকাতায়। আমার হবি হল ছবি আঁকা আর গল্পের বই পড়া।”

এই অবধি বলে তিন্নি তাকাল শ্রাবণীদির দিকে। শ্রাবণীদি এবার সবার দিকে তাকিয়ে বলল, “আমরা কী বলি আমাদের নতুন বন্ধুদের?”

তিন্নি দেখল বিড়ালিনী ঠোঁট বেঁকিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে আছে এবং ও ছাড়া বাকি সবাই হাসিমুখে বলল, “ওয়েলকম ইন আওয়ার ক্লাস তিন্নি।”

তিন্নি লাজুক হাসল। তারপর মাথা নীচু করে বলল, “থ্যাংক ইউ!”

শ্রাবণী মনে মনে ভাবল—বাহ্, বাচ্চাটা দারুণ স্মার্ট তো! এতটুকু জড়তা নেই, কত সুন্দর সাবলীলভাবে কথাগুলো বলে গেল। সে হেসে বলল, “ভেরি গুড তিন্নি, যাও তুমি তোমার জায়গায় গিয়ে বসো।”

তিন্নি তার জায়গায় বসার পর পড়া শুরু হল। শ্রাবণীদির সাবজেক্ট বাংলা। সে বই খুলে বলল, “আমরা আজ কবি কাজী নজরুল ইসলামের লেখা ‘সংকল্প’ কবিতাটি পড়ব। কেউ বলতে পারো কবি কাজী নজরুল ইসলামকে আমরা অন্য কী নামে চিনি?”

সামনের বেঞ্চ থেকে তড়াক করে হাত ওঠাল বিড়ালিনী।

শ্রাবণীদি বলল, “হ্যাঁ রূপসা, বলো।”

রূপসা উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “কাজী নজরুল ইসলামকে আমরা বিদ্রোহী কবি নামেও চিনি।”

“ভেরি গুড। একদম ঠিক উত্তর। কবি নজরুল ইসলামের আর এক নাম বিদ্রোহী কবি।”

তিন্নি ভাবল—বাহ্, বিড়ালিনীর নামটা তো বেশ মিষ্টি। কী সুন্দর কবিতার মতো শোনাল—‘রূপসা’!

শ্রাবণীদি এরপর সুমিতার দিকে তাকিয়ে বলল, “সুমতি, সংকল্প কবিতাটি আবৃত্তি করে শোনাও তো আমাদের।”

সুমতি বাংলা পাঠ্যপুস্তক হাতে নিয়ে আবৃত্তি শুরু করল।

‘থাকব না’ক বদ্ধ ঘরে
দেখব এবার জগৎটাকে
কেমন করে ঘুরছে মানুষ
যুগান্তরের ঘূর্ণিপাকে।
দেশ হতে দেশ দেশান্তরে…’

সুমতির গলার আওয়াজ রিনরিনে মিষ্টি। কবিতার গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে কখনও তা সুরমালার মতো লতিয়ে উঠছিল চড়ার দিকে, আবার কখনও গম্ভীরভাবে গড়িয়ে এল খাদে। কখনও এল প্রশ্ন, কখনও আবার অজানাকে জানতে চাওয়ার বিস্ময়। তিন্নি চোখ বুজে বসে রইল। কবিতাটা শুনতে শুনতে তার মনে হল, বিদ্রোহী কবির কবিতা নয়, সুমতি যেন তার নিজের মনের হাজার হাজার প্রশ্নকেই সবার সামনে আবৃত্তি করে শোনাচ্ছে।

সুমতির আবৃত্তি শেষ হলে তিন্নি চোখ খুলে দেখল ও-ই শুধু একা নয়, আশেপাশের অনেকেই চোখ বুজে বসে আছে। কারো-কারো মুখে ঘোরলাগা ভাব। বিতু যখন বলেছিল যে সুমতি দারুণ আবৃত্তি করে, তিন্নি ভাবতেও পারেনি সে-ভালো মানে এতটা ভালো। বিতু তিন্নির হাত ধরে বলল, “শুনলি, বলেছিলাম না? দেখলি কী ভালো!”

ফিসফিসিয়ে কথার আওয়াজ শুনে ওদিক থেকে শ্রাবণীদি বলল, “বিতু, তিন্নি, কী হচ্ছে ওখানে? ক্লাসের সময় কোনও কথা নয়।”

ওরা দুজনেই কথা বলা বন্ধ করে ক্লাসে মন দিল। শ্রাবণীদি পড়াতে শুরু করল, “সংকল্প কবিতাটি আসলে প্রতিটি মানুষের মনে লুকিয়ে থাকা অজানাকে জানতে চাওয়ার ইচ্ছে। মানুষের জিজ্ঞাসার শেষ নেই, তাই কবি লিখেছেন…”

শ্রাবণীদির ক্লাস শেষ হতেই তিন্নি সুমতির দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি আবৃত্তি কোথায় শেখো?”

“না গো, সেভাবে কারও কাছে শিখি না। পাশের বাড়ির একজন দিদি আবৃত্তি করে। সময় পেলে ওই দিদিই দেখিয়ে দেয়।”

“ওহ্, আচ্ছা।”

এরপর পরের ক্লাস শুরু হল।

বাংলা, অঙ্ক, ইংরেজি, বিজ্ঞান ক্লাস শেষ হলে টিফিনের ঘণ্টা বাজল ঢং ঢং ঢং করে।

তিন্নির একটু খিদে পেয়েছিল। আশেপাশে মোটামুটি অনেকেরই ব্যাগ থেকে টিফিন বাক্স বেরোতেই পুরো ক্লাসরুমখানা ভরে উঠল নানারকম খাবারের গন্ধে। সুমতির ব্যাগ থেকেও একটা ছোটো প্লাস্টিকের থলেতে রাখা একটুখানি চিঁড়েভাজা বেরোল। আর তার সঙ্গে বেরোল গল্পের বই—অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ক্ষীরের পুতুল’।

বিতু তিন্নির হাত ধরে বলল, “চল বাইরে যাই। আগে খেলবি, না খেতে যাবি?”

“চল খেয়ে নিই আগে। খিদে পেয়েছে।”

তিন্নিরা দৌড়োল আবার হোস্টেলের ডাইনিং হলে। ক্লাসরুম থেকে বেরোতে বেরোতে ওরা শুনল, বিড়ালিনী মানে রূপসা চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে টুনটুনিকে বলছে, “এমা, তোর মা তোকে আজকেও পরোটা আর তরকারি দিয়েছে! আমার মাম্মি আমাকে হাক্কা নুডলস বানিয়ে দিয়েছে। হাক্কা নুডলস খেয়েছিস কখনও?”

বিতু যেতে যেতে বলল, “বিড়ালিনীটা কোনোদিনও শুধরাবে না।”

তিন্নি বলল, “ও এরকম ঝগড়ুটে কেন রে?”

“বিড়ালিনীর আসল নাম রূপসা রায়চৌধুরী। শুনেছি রূপসার দাদু প্রতাপনারায়ণ রায়চৌধুরীই প্রায় চল্লিশ বছর আগে আমাদের স্কুলটা তৈরি করেছিলেন। তাছাড়াও ওরা খুব বড়োলোক তো, তাই ও পুরো স্কুলটাকেই নিজের বাড়ি ভাবে। আমার একটুকুও ভালো লাগে না ওকে। মাম্পুটা যে কী করে ওর বন্ধু হল, ও-ই জানে!”

“মাম্পু আবার কে?”

“ওই যে টুনটুনি, ওরই নাম তো মাম্পু।”

“ওহ্, এবার বুঝলাম।”

তারপরেই তিন্নি একটু নীচু গলায় বলল, “ওই, সুমতি শুধু ওইটুকু চিঁড়েভাজা খাবে?”

সে-কথা শুনে বিতু বলল, “একটা কথা বলব, প্রমিস কর কাউকে বলবি না।”

তিন্নি একবার ঢোঁক গিলে বলল, “বলব না, কী রে?”

“আমার মনে হয় সুমতিরা খুব গরিব, বুঝলি তো। আমি দেখেছি ও প্রত্যেকদিন টিফিনের সময় শুধু নুন-লংকা মাখা শুকনো চিঁড়েভাজা খায়। আমি প্রথম প্রথম কয়েকদিন ওকে ডেকেছিলাম আমার সঙ্গে টিফিন খাওয়ার জন্য। ও এড়িয়ে যেত। তারপর একদিন জোর করেই ওর পাশে গিয়ে বসে থাকলাম টিফিনের সময়। দেখলাম ও সেদিন লজ্জা পেয়ে ওর টিফিনের থলেটা বেরই করল না। আমার ওয়াটার বটল থেকে জল খেয়েই কাটিয়ে দিল। তাই আমি ওকে এখন আর ডাকি না, বুঝলি!”

“হুউউউ।” বিজ্ঞের মতো মাথা নাড়াল তিন্নি।

খাবার খেতে গিয়ে দেখল দুপুরের মেনুতে রয়েছে ব্রেড টোস্ট, সোয়াবিন-আলুর তরকারি আর শসা-গাজর-টম্যাটোর স্যালাড। পাশে বড়ো ট্যাপ লাগানো পিচারে ঘোলের শরবত।

লাইনে দাঁড়িয়ে ফিসফিসিয়ে পরিকে জিজ্ঞাসা করল তিন্নি, “এমা, আজকে ভাত নেই? কালকে তো ভাত দিয়েছিল!”

“প্রতিদিন লাঞ্চে ভাত হয় না। বেশিরভাগ দিন হাতেগড়া রুটি, নয়তো পাঁউরুটি হয়। দুপুরে ভাত খেলে শরীর ভারী হয়ে ঘুম পায় তো, তাই। ভাত আমরা রাত্রিবেলায় খাই‌।”

“ও, আচ্ছা।”

খাবার খেতে খেতে পরি বলল, “কী, ভয় পাচ্ছ নাকি! তোমার প্রথম ক্লাস আজকে।”

তিন্নি বলল, “তুৎ, ভয় পাব কেন? আমি কি আগে স্কুলে যাইনি নাকি! আর শোনো, আমাকে আর তুমি তুমি বোলো না, তুই করেই বোলো।”

পরির মুখভরতি খাবার ছিল। ও হাসিমুখে ওপর-নীচে মাথা নাড়ল। দুপুরের খাওয়া শেষ হলে ওরা ক্লাসে ফিরে এল।

টিফিন আওয়ার্স শেষ হলে ইতিহাস ক্লাস শুরু হল, তারপর ভূগোল। ক্লাস-টিচার শ্রাবণীদি ছাড়াও ভূগোল টিচার অর্চিতাদি আর ইতিহাসের মিস রাকাদি তিন্নিদের পুরো ক্লাসেরই খুব প্রিয়। বিশেষ করে রাকাদির ইতিহাসের ক্লাসগুলোকে স্কুলের ক্লাস বলে মনেই হয় না। ইতিহাসের সব ঘটনাগুলো এমন সুন্দর গল্পের মতো বুঝিয়ে দেয় রাকাদি যে শুনতে শুনতে সময় কী করে কেটে যায় বোঝাই যায় না। ওদিকে অঙ্কের দিদিমণি বৈশাখীদিকে আবার যমের মতো ভয় পায় সবাই। বৈশাখীদির যেমন বড়োসড়ো চেহারা, তেমনি গুরুগম্ভীর গলার আওয়াজ। অঙ্কের ক্লাসে একটুও ট্যাঁ-ফোঁ করার জো নেই কারও—করেছ কি মরেছ!

আর শেষের আধঘণ্টা ছিল গল্প বলার ক্লাস। শ্রাবণীদি গ্রিস দেশের এক বীরপুরুষ হারকিউলিসের গল্প শোনাল তাদের। গল্প বলার ক্লাস শেষ হলে সবাইকে টা টা বলে তিন্নি আর বিতু একসঙ্গে বেরোল ক্লাসরুম থেকে। পরি এইটের ক্লাসরুমের সামনে দাঁড়িয়ে জিনিয়াদির সঙ্গে কথা বলছিল। ওদের দুজনকে দেখে সে হাত নাড়িয়ে বলল, “একটু দাঁড়া, আমিও আসছি।”

হোস্টেলে ফেরার পথে পরি বলল, “কিছু খাবি—ঝালমুড়ি, বনকুল মাখা, আলুর চপ?”

বাড়িতে তিন্নির মা কখনও অ্যালাও করত না বাইরে থেকে আনা খাবার। কখনো-কখনো বিকেলবেলা ঝালমুড়ি, আলুকাবলি খেতে ইচ্ছে করলে মা নিজেই বানিয়ে দিত। বাবাইর অ্যাক্সিডেন্টের আগে অবশ্য কয়েকবার বাপ-বেটিতে লুকিয়ে লুকিয়ে পার্কের পাশে অবুদাদার দোকানে ফুচকা খেয়েছিল। সেটা ছিল ওর আর বাবাইর সিক্রেট, মাকে বলা বারণ। পুরোনো কথা মনে পড়ায় তিন্নির একটু মনকেমন করে উঠল। ও বিতুকে জিজ্ঞাসা করল, “ওই, এখানে ফুচকা পাওয়া যায় না?”

“যায়, কিন্তু বড়দি ফুচকা খেতে দেখলে ভীষণ বকবেন।”

বিকেল সাড়ে চারটা নাগাদ ঝালমুড়ি খেয়ে, একটু গল্পগুজব করে ওরা সবাই পড়তে বসল নিজেদের ঘরে। তারপর আটটার সময় ভাত, মাছের ঝোল আর বাঁধাকপির ঘণ্ট দিয়ে ডিনার করে সাড়ে ন’টার মধ্যে সবাই লাইট নিভিয়ে শুয়ে পড়ল বিছানায়। দোতলার কয়েকখানা রুমে অবশ্য লাইট জ্বলছিল দশটার পরেও। বিতুকে জিজ্ঞাসা করতে ও বলল, “ওগুলো ক্লাস নাইন-টেনের দিদিদের ঘর। ওদের সামনে বোর্ডের পরীক্ষা তো। তাই ওদের পারমিশন আছে বেশি রাত অবধি লাইট জ্বালিয়ে পড়াশোনা করার।”

মাথার পাশের জানালা বেয়ে আসা আলোর রেখাগুলোর দিকে তাকিয়ে তিন্নি আজকের পুরো দিনটার কথা ভাবল। বাড়িতে মা-বাবাইয়ের সঙ্গে তার একার রাজত্ব চলত। তার ইচ্ছেমতো ব্রেকফাস্ট, তার ইচ্ছেমতো টিফিন; বেলা করে ঘুম থেকে উঠলে মা বকত ঠিকই, কিন্তু পাঁচ মিনিট পরেই বাবাই এসে তাকে কাতুকুতু দিয়ে, গাল টিপে আদর করত। বাড়িতে থাকার সময় থালা-বাটি ধোয়া, জামাকাপড় ভাঁজ করা তো দূরের কথা, কোনোদিন নিজের মোজাটা অবধি ঠিক করে গুছিয়ে রাখেনি। মা কত বকত। বলত—তিন্নি, স্বাবলম্বী হও, নিজের কাজ নিজে করতে শেখো। মায়ের কথা এক কান দিয়ে শুনে আর এক কান দিয়ে বের করে দিত সে। অথচ এখন দেখো, হোস্টেলে দু-দিন থেকেই ও কত কাজ শিখে গেল। প্রথম দিন সরলাদি সবকিছু বলে বলে দিচ্ছিল, কিন্তু আজ সকাল থেকে তিন্নি একা একাই সবকিছু করেছে। নিজের কাপ-প্লেট-বাটি সব ধুয়েছে, স্নান করে ভেজা চুল মুছে, চুল আঁচড়ে বিনুনি করেছে একা একা। জামাকাপড় ভাঁজ করে, গুছিয়ে নিজের ছোটো আলমারিতে তুলে রেখেছে। এমনকি বিতুর দেখাদেখি জুতোও পালিশ করেছে নিজে নিজে। স্কুলের মিসরা কত ভালো। শ্রাবণীদি কত সুন্দর পড়ায়। ফার্স্ট গার্ল সুমতি কী মিষ্টি দেখতে আর কত সুন্দর কবিতা আবৃত্তি করে। নতুন সিলেবাস, সরলাদির বকুনি, লছমীকাকির ঝালমুড়ি—চোখ দুটো বন্ধ করে তিন্নি ভাবল, কয়েকটা মাস যাক না শুধু, এবার পুজোর ছুটিতে মা যখন দেখবে আমি কত বড়ো হয়ে গেছি, তখন কী মজাই না হবে। মা-বাবাই যখন দেখবে আমি সব কাজ একা-একাই করতে পারি, ঠিক সময়মতো পড়তে বসে যাই, তখন ওরা কত্ত খুশি হবে!

অবশ্য এ-কথাটাও ভাবল যে যাই হোক, এই স্কুলে তো বেশিদিন থাকছে না সে। কয়েক মাসের মধ্যেই এই স্কুল থেকে বেরিয়ে গুঞ্জাদিদির স্কুল ভিক্টোরিয়া মর্ডান গার্লসে ভরতি হবে তিন্নি। কিন্তু আবার মাথায় এল যে গুঞ্জাদিদির কাছে অনেক সুন্দর সুন্দর জামা-জুতো আর স্মার্ট ফোন আছে ঠিকই, কিন্তু গুঞ্জাদিদি সুমিতার মতো অত সুন্দর কবিতাও আবৃত্তি করতে পারে না আর জিনিয়াদিদির মতো অমন গানও গাইতে পারে না।

কাল রাত্রির ওই বন্ধ গেট আর সিস্টার নিবেদিতার স্বপ্নটা আজকেও দেখল তিন্নি। তবে সিস্টার নিবেদিতা আজ বেশ হাসিমুখে দাঁড়িয়ে ছিলেন আর সারদাদেবী স্কুলের লোহার গেটখানা ঢাকা ছিল উমরি-ঝুমরি মাধবীলতা ফুলে। এবার তিন্নি একটুও ভয় পেল না। মা-বাবাইকে টা টা করে তিন্নি দৌড়তে দৌড়তে গিয়ে ঢুকল ওই গেটের ভেতরে।

বাড়ি থেকে ফোন

দেখতে দেখতে একটা সপ্তাহ যে কী করে হুড়মুড়িয়ে কেটে গেল, তিন্নি টেরই পেল না। পড়াশোনা তো ছিলই, তার সঙ্গে বিতু, পরি আর সুমতির সঙ্গে হই-হুল্লোড়, খুনসুটি—এসবকিছুর মধ্যে দিয়ে সাত-সাতটা দিন যেন পাখির মতো ডানা মেলে উড়ে গেল।

রবিবার সকালবেলা ব্রেকফাস্টের সময় সরলাদি বলল, “সব নতুন মেয়েরা শুনে রাখো, আজ সন্ধ্যা ছ’টা থেকে আটটা পর্যন্ত পেরেন্ট কলের সময়, তাই সবাই কমন-রুমের কাছাকাছি থাকবে সেই সময়। কাউকে ডাকাডাকি করে সময় যেন নষ্ট না করতে হয়। মনে থাকবে সবার?”

সবাই একযোগে বলল, “হ্যাঁ দিদি, থাকবে।”

ছ’টা চল্লিশ নাগাদ তিন্নির নাম ধরে ডাকল সরলাদি। পরির বাড়ির সঙ্গে আগেই ওর কথা হয়ে গেছে। বিতুর কল এখনও আসেনি। ওরা তিনজনে কমন-রুমের বাইরে পাশাপাশি বসে খবরের কাগজ ভাঁজ করে এরোপ্লেন বানাচ্ছিল। সরলাদি ওর নাম ধরে ডাকতেই তিন্নি তড়াক করে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল। কতদিন হয়ে গেল মা-বাবাইয়ের সঙ্গে কথা হয়নি। যতই নতুন নতুন বন্ধু হোক, তবুও মা-বাবাইয়ের জায়গা কি আর অন্য কেউ নিতে পারে! ও এক ছুটে কমন-রুমে ঢুকে সরলাদির হাত থেকে ফোনের রিসিভারখানা নিয়ে বলল, “হ্যালো!”

“তিন্নি, কেমন আছিস সোনা?”

মায়ের গলার আওয়াজ গলা বুজে এল তিন্নির। সারা সপ্তাহ ধরে কত কথা জমিয়ে রেখেছিল মাকে বলবে বলে, কিন্তু টেলিফোনের ও-পার থেকে রোহিণীর গলার আওয়াজ পেয়ে সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেল। কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে কান্নাটা আটকাল তিন্নি, তারপর জামার হাতায় টুক করে চোখের জল মুছে নিয়ে বলল, “ভালো আছি মা, খুব ভালো আছি। তুমি আর বাবাই কেমন আছো?”

শেষের দিকে গলা কেঁপে গেল তিন্নির। মা কিন্তু সব বুঝতে পারে। ও-পাশ থেকে রোহিণী বলল, “অ্যাই, কাঁদছিস কেন রে তিন্নি? সব ঠিক আছে ওখানে?”

এবার তিন্নির মাথার মধ্যে একটা ভারি বিদঘুটে জিনিস হল। ভেতর থেকে যেন দুটো তিন্নি একই সঙ্গে কথা বলতে শুরু করল। একটা তিন্নি চিৎকার করছিল—‘এই সুযোগ তিন্নি, মাকে বলে দে স্কুলটা খুব বাজে, পচা, ভালো খেতে দেয় না, মিসরা মিছিমিছি শাস্তি দেয়। তাহলেই মা তোকে গুঞ্জাদিদির স্কুলে ভরতি করে দেবে। বল তিন্নি, বল তাড়াতাড়ি!’

ওদিক থেকে আর একটা তিন্নি আবার রিনরিনে স্বরে বলছিল, ‘মিথ্যে কথা বলবি তিন্নি! ভেবে দেখিস, গুঞ্জাদিদির স্কুলে পরি আর বিতুর মতো ভালো বন্ধু পাবি তো? শ্রাবণীদির মতো এত ভালো করে গল্প বলে শোনাবে কেউ?’

কেমন যেন ছটফট করে উঠল ওর ভেতরটা। তিন্নি ইচ্ছে করেই কথা ঘোরাল—”তোমার আর বাবাইর জন্য খুব মনখারাপ হয়।”

“ক’জন নতুন বন্ধু হল ওখানে?”

“তিনজন। বিতু, পরি আর সুমতি। আর জানো তো, সুমতি না আমাদের ক্লাসের ফার্স্ট গার্ল আর ও দারুণ সুন্দর আবৃত্তি করে।”

তারপর আরও অনেক গল্প হল—টুনটুনি ও বিড়ালিনীর ঝগড়া; সরলাদি একদিন বিকেলে তিন্নির চুলে বেড়া বিনুনি বেঁধে দিয়েছিল; বিতু‍, তিন্নি আর পরি একসঙ্গে কত মজা করে—সে-কথা। তিন্নি কত কাজ শিখে গেছে এখন; মোহনা নামের ছিঁচকাঁদুনি মেয়েটার কথা—তিন্নির কথার ফুরঝুরি থামতেই চায় না আর।

মেয়ের সঙ্গে সঙ্গে রোহিণীও খুব হাসছিল। তিন্নি একা একা জুতো পালিশ করতে শিখেছে শুনে সে যেমন অবাক তেমনি খুশি হল। আবার মেয়েকে এটাও বোঝাল যে কাউকে নিয়ে এমন মজা করতে নেই, যাতে সে দুঃখ পায়। তিন্নি বুঝতে পেরে সরি বলল মাকে। ফোন রাখার আগে রোহিণী বলল, “তিন্নি, তুই ভালো আছিস তো?”

তিন্নির মাথার ভেতরে ওই বিচ্ছিরি ঝগড়াঝাঁটি এতক্ষণে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ও হেসে, শান্ত সুরে উত্তর দিল, “হ্যাঁ মা, আমি খুব ভালো আছি।”

রিসিভারটা ক্রেডলে নামিয়ে রেখে রোহিণী আনন্দে কেঁদে ফেলল। নাহ্, মেয়েকে নিয়ে আর কোনও ভয় নেই তার। তার তিন্নি ঠিক পথে চলতে শুরু করেছে।

মোহনা সংকট

শনিবার টিচারদের উইকলি মিটিংয়ে শ্রাবণীদিই কথাটা তুলল, “বড়দি, এবারের ক্লাস ফাইভের ব্যাচটাতে মোহনা মিত্র বলে যে বাচ্চাটা আছে, ওর ব্যাপারে কি কিছু জানেন আপনি?”

প্রভাবতী একটু অবাক হলেন এমন প্রশ্নে। তিনি চশমাটা খুলে টেবিলে রেখে বললেন, “তেমন কিছু শুনেছি বলে মনে পড়ছে না আমার। ওই মেয়েটি আর রাজনন্দিনী একই দিনে স্কুলে ভরতি হয়েছিল। দুজনেই বিশেষ কারণবশত অ্যাডমিশন টেস্টে বসতে পারেনি, পরে স্পেশাল পারমিশন নিয়ে দুজনে ভরতি হয়েছে। এছাড়া আর তো কিছু মনে পড়ছে না। ইজ দেয়ার এনি প্রবলেম শ্রাবণী?”

“বড়দি, প্রবলেম হয়তো বলা উচিত নয়, কিন্তু মোহনার ব্যবহার নর্মাল নয়।”

শ্রাবণী ঘোষাল বয়সে নিতান্ত তরুণী হলেও ভীষণ বুদ্ধিমতী ও কর্মতৎপর। সেজন্য প্রভাবতী-সহ অন্যান্য সিনিয়র শিক্ষিকারা খুব স্নেহের চোখে দেখেন তাঁকে। সেই শ্রাবণীর মুখে এমন কথা শুনে সবাই নড়েচড়ে বসলেন।

রাকা বলল, “কয়েকটা আনইউজুয়াল জিনিস আমিও লক্ষ করেছি অবশ্য। কিন্তু আমি ভেবেছিলাম, ক্লাসে নতুন তাই বোধহয় ওর মানিয়ে নিতে অসুবিধে হচ্ছে।”

শ্রাবণী বলল, “মোহনার ভরতি হওয়ার প্রায় পাঁচ সপ্তাহ কেটে গিয়েছে বড়দি। নর্মালি এত সময় লাগে না বাচ্চাদের নিজেকে অ্যাডাপ্ট করতে। কারণ, এই কাজটা ওরা বড়োদের থেকে অনেক বেশি তাড়াতাড়ি করতে পারে। তাছাড়া মেয়েটা সবসময় ভয়ে কুঁকড়ে থাকে, কারও সঙ্গে মিশতেও চায় না। লাস্ট বেঞ্চের এক কোনায় মুখ লুকিয়ে থাকে। পড়াশোনাতেও তেমন কোনোরকম ইনভলভমেন্ট দেখছি না ওর। উইকলি টেস্টের রেজাল্ট খারাপ করছে প্রতিবার।”

ভুরু কুঁচকে তাকালেন প্রভাবতী, “সে কি! এ তো খুব চিন্তার বিষয়! শ্রাবণী, তুমি ওর সঙ্গে আলাদা করে কথা বলার চেষ্টা করে দেখেছ?”

“করার চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু ও কোনও প্রশ্নের উত্তর দিতে চাইছে না। আর বেশি প্রশ্ন করলে কেঁদে ফেলছে।”

“আর কিছুদিন চেষ্টা করে দেখা যাক, তারপর প্রয়োজন হলে ওর পেরেন্টদের ডেকে তাদের সঙ্গে আলোচনা করে দেখব।”

বৈশাখী বলল, “বড়দি, আমার মনে হয় আমাদের বদলে ওর ক্লাসমেটরা কথা বললে মোহনার পক্ষে কমিউনিকেট করা সহজ হবে।”

শ্রাবণীও সায় দিল—”বুদ্ধিটা মন্দ নয় বড়দি। সুমতি, রাজনন্দিনী আর কবিতার গ্রুপখানা বেশ ভালো। ওই মেয়ে তিনটে ভারি হাসিখুশি স্বভাবের আর পড়াশোনাতেও বেশ ভালো। আপনি অনুমতি দিলে ওদের সঙ্গেই কথা বলব আমি।”

“ভালো কথা। তাহলে শ্রাবণী, তোমাকে দায়িত্ব দিচ্ছি। আজ স্কুল ছুটি হওয়ার পর রাজনন্দিনী, সুমতি আর কবিতার সঙ্গে কথা বলে দেখো, তারপর দেখা যাক কী হয়।”

কথামতো সেদিন তিনমূর্তির ডাক পড়ল টিচার্স কমন রুমে। স্কুল ছুটির পর তাদের দেখা করতে বলেছে শ্রাবণীদি। তিনজন মাথা চুলকে ভাবতে শুরু করল, গত কয়েক সপ্তাহে ওরা কী কী দুষ্টুমি করেছে। মানে দুষ্টুমি না করলে আলাদা করে ওদের ডাকা হবে কেন? নিশ্চয়ই বকুনি দেবার জন্য।

একটু ভেবেচিন্তে সুমতি বলল, “এই রে, সেদিন বাংলা ক্লাসে আমরা কাটাকুটি খেলছিলাম। শ্রাবণীদি নিশ্চয়ই সেটা জানতে পেরেছে।”

বিতু বলল, “না না, আমার মনে হয় বুধবার লুকিয়ে লুকিয়ে বরফ খেয়ে আমি আর তিন্নি লাইব্রেরিতে গিয়ে জিভ বের দেখছিলাম জিভটা লাল হল কি না—নিশ্চয়ই মাসি গিয়ে শ্রাবণীদিকে সে-কথা বলে দিয়েছে।”

তিন্নি অবাক হয়ে বলল, “বারে, আমরা জিভ বের করেছি তাতে মাসির কী?”

“আমার মনে হয় মাসি ভেবেছিল আমরা দুজন দুজনকে ভেংচি কাটছি, বুঝলি?”

শেষের ক্লাসখানায় ভয়ের চোটে কারোর মাথাতেই কিছু ঢুকল না। তিনজনের পেটের মধ্যেই ঢিপঢিপ করছিল। কী যে হবে, কী যে হবে ভাব। ক্লাসের শেষ হওয়ার মুখে ওরা তিনজন নিজেদের হাত ধরাধরি করে বসে রইল শক্ত হয়ে। যাই হোক, অন্তত তিনজনকে একসঙ্গে ডেকেছে শ্রাবণীদি—একা একা বকুনি খেতে হলে সেটা আরও ভয়ানক ব্যাপার হত।

বৈশাখীদির ক্লাস শেষ হওয়ার পর তিনজন ব্যাজার মুখ করে চলল টিচার্স কমন-রুমে। ওদিকে কমন-রুমে ওরা ঢোকার পর কচি কচি তিনটে মুখের অবস্থা দেখে শ্রাবণীদি-সহ বাকি টিচারদেরও হাসি চেপে রাখা মুশকিল হয়ে গিয়েছিল। শ্রাবণীদি তবুও ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছিল। আহা রে, জীবনের প্রথম টিচার্স কল—ভয়ে পুঁচকে তিনটের মুখ আমসির মতো শুকিয়ে গেছে। ওদিকে বৈশাখীদি হাসি আটকাতে না পেরে হো হো করে হেসে ফেলল। বিতু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেলল, “সত্যি বলছি শ্রাবণীদি, আমি তিন্নিকে ভেংচি কাটিনি!”

তিন্নি আর সুমতি কী বলবে বুঝতে না পেরে জোরে জোরে উপর-নীচে মাথা নাড়াল। শ্রাবণীদি হেসে এবার বিতুকে কাছে ডেকে বলল, “বোকা মেয়ে, কাঁদছ কেন? আমি কি বকেছি তোমায়?”

বিতুর কান্না একটু থামলে শ্রাবণীদি বলল, “তোমাদের তিনজনের ওপরে কিন্তু একটুখানি রাগ করেছি আমি। কেন জানো?”

“কেন দিদি, আমরা কী করেছি?”

“তোমাদের ক্লাসে যে আর একজন নতুন বন্ধু আছে, তার সঙ্গে তোমরা কেউ খেলো না কেন?”

বিতু আর তিন্নি একসঙ্গে বলল, “কে দিদি?”

শুধু সুমতি নীচু গলায় বলল, “আমি জানি কে—মোহনা।”

“একদম ঠিক।”

“আর আমি কেন রাগ করেছি বলো তো?”

সুমতি বুঝতে পেরেছিল ব্যাপারখানা। সে একটু ভেবে বলল, “আমরা ওর সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেছি দিদি, ও-ই মিশতে চায় না কারও সঙ্গে। বেশি কিছু বললে কেঁদে ফেলে। তাই আর কিছু বলিনি।”

বিতু আর তিন্নিও একই কথা বলল, “হ্যাঁ দিদি, সুমতির কথা সত্যি।”

রাকাদি কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল ওদের, কিন্তু শ্রাবণীদি চোখের ইশারায় ওঁকে থামিয়ে দিয়ে বলল, “আচ্ছা, ঠিক আছে, তোমরা যাও। যেতে যেতে কেউ কাউকে ভেংচি কেটো না কিন্তু।”

ফিক করে হেসে ফেলল বিতু।

ওরা বেরিয়ে যাওয়ার পর শ্রাবণী রাকাকে বলল, “সরি রাকা, তোমাকে ওভাবে বারণ করলাম বলে। আসলে ওরা খুব ছোটো তো, দেখা গেল আমাদের কথা শুনে বেশি জোরাজুরি করতে গিয়ে শেষটায় ঝগড়া-মারামারি লেগে গেল। তখন হিতে বিপরীত হবে। তার চাইতে বরং বড়দিকে জিজ্ঞাসা করাই ঠিক হবে।”

রাকা ম্লান হাসল, “তা একদিক থেকে ঠিকই বলেছ। আজকালকার পেরেন্টদের কোনও ঠিকঠিকানা নেই। মারপিট করলে তারা কী বুঝতে যে কী বুঝে বসবেন, বলা মুশকিল।”

বৈশাখী এতক্ষণ চুপচাপ ওদের কথা শুনছিল। এবার মুখ খুলল, “আসলে জানো রাকা, পেরেন্টদেরও দোষ নেই। দিনকাল যা পড়েছে, তাতে ছেলেমেয়েদের নিরাপত্তা, পড়াশোনা, ভবিষ্যৎ নিয়ে ওঁরাও সবসময় আতঙ্কে থাকেন।”

“তাও অবশ্য ঠিক। মা-বাবা তো নিজেদের সন্তানের ভালোই চাইবেন সবসময়।”

স্কুল ছুটির সময় হয়ে গিয়েছিল, তাই সেদিনের মতো মোহনার ব্যাপারটা নিয়ে কথাবার্তা আর এগোল না। কিন্তু বৈশাখীর মাথায় কাঁটার মতো খচখচ করছিল সমস্যাটা। অতটুকু একটা ছোট্টো মেয়ে এত ইনসিকিউরিটিতে ভুগছে কেন? প্রশ্নটার উত্তর পাওয়া গেল সোমবার গল্প বলার ক্লাসে।

সোমবার গল্প বলার ক্লাসে শ্রাবণীদি ঠিক করল বসে আঁকো প্রতিযোগিতা হবে। বিষয়—আমার চোখে আমার মা। সে একখানা দেখার মতোই ব্যাপার হল বটে। শ্রাবণীদির আনা আর্ট পেপারে রঙ-পেন্সিল দিয়ে সবাই নিজের মায়ের ছবি আঁকতে শুরু করল।

পরি আঁকল ‘সুপার-উওম্যান মা’। মা হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে কোমরে হাত দিয়ে, পরনে নীল রঙের চুড়িদার-কুর্তা, কিন্তু লাল রঙের ওড়নাটা ঘাড়ের দু-পাশে কেপের মতো লাগানো—হাওয়ায় উড়ছে বিজয় পতাকার মতো। তিন্নির নিজের ছবিটা আঁকতে আঁকতে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল যে পিছনের বেঞ্চে মোহনা চুপচাপ বসে রয়েছে। ওর সামনে রাখা সাদা আর্ট পেপারটায় রঙের একটাও আঁচড় পড়েনি। তিন্নি আড়চোখে একবার শ্রাবণীদির দিকে দেখে ফিসফিসিয়ে মোহনাকে বলল, “অ্যাই মোহনা, তুমি আঁকছ না কেন? তুমি বুঝি তোমার মাকে ভালোবাসো না?”

মোহনা শূন্য চোখে তিন্নির দিকে তাকিয়ে খুব নীচু গলায় বলল, “আমার মা শুধু কাঁদে।”

তিন্নি এবার ভুরু কুঁচকে বলল, “তাতে কী? মা কাঁদলে কি খারাপ হয়ে যায়! কান্নার ছবিই আঁকো তাহলে। তুমি ভেবলুরামের মতো বসে থাকলে কি তোমার মায়ের কষ্ট কমে যাবে? আঁকো বলছি, আমি দশ মিনিট পরে দেখব আবার।”

তিন্নির কথায় কাজ হল। মোহনা খয়েরি রঙ-পেন্সিলটা নিয়ে আর্ট পেপারে খুব সাবধানে ছোঁয়াল।

পুরো পঁয়তাল্লিশ মিনিট পর বসে আঁকো প্রতিযোগিতা শেষ হল। আর্ট পেপারের টুকরোগুলো রঙে রঙে ঝলমল করছে ততক্ষণে। বিতু এঁকেছে দুগ্গাঠাকুর মা। মায়ের দশখানা হাত—কোনও হাতে রান্নাঘরের হাতা-খুন্তি তো কোনও হাতে বাড়ির চাবি আর অফিসের ল্যাপটপ। তিন্নির ছবিতে তার মায়ের পরনে ল্যাবরেটরির সাদা কোট। হাতে ধরা দু্-খানা টেস্টটিউব। তাতে লাল-নীল রঙের তরল। রূপসার ছবিতে তার মা আয়নার সামনে সাজুগুজু করছে। রুবিনা আবার মায়ের পিঠে দু-খানা পাখনা লাগিয়ে মাকে পরি বানিয়ে দিয়েছে। কারও ছবিতে মা রূপকথার রাজকুমারী তো কেউ আবার মাকে এঁকেছে তার সাদাসিধে ঘরোয়া রূপে। তবে সবচাইতে বেশি প্রশংসা পেল সুবর্ণার আঁকা—‘আমার মা সব্বার মা’ ছবিখানা। একটা মস্ত বড়ো বটগাছের পাতাগুলোর ঠিক মাঝখানে আঁকা মায়ের হাসি মুখ, আর সেই বটগাছ ঘিরে খেলাধুলো করছে অনেকগুলি ছোটো মেয়ে। সুবর্ণার মা একটা এনজিওর দিদিমণি, আর সুবর্ণাও সময় পেলেই সেখানে গিয়ে খেলা করে। সে হাসিমুখে বলল, তার মা আরও অনেক ছোট্টো মেয়েদের মা, আর সে যখন লেখাপড়া শিখে বড়ো হবে, তখন মায়ের মতো সুবর্ণাও ওই ইস্কুলে দিদিমণি হয়ে পড়াবে। সবাই সে-কথা শুনে হাততালি দিল।

শ্রাবণীদি হাসিমুখে বলল, “সুবর্ণার আঁকা এই ছবিখানা স্কুলের নোটিস বোর্ডে ঝুলিয়ে রাখা হবে পরবর্তী এক সপ্তাহের জন্য।”

ক্লাস শেষ হওয়ার পর সবাই বেরিয়ে গেলে শ্রাবণীদি একটু চিন্তিত মুখে বড়দির অফিসে গিয়ে বলল, “বড়দি, থ্যাংকস টু রাজনন্দিনী। মোহনা সংকটের সমাধান হয়েছে। অন্তত জানতে পেরেছি কী সমস্যা।”

প্রভাবতী বললেন, “সে তো ভালো খবর। ইন ফ্যাক্ট খুবই ভালো খবর শ্রাবণী। সমস্যা জানতে পারলে তবেই না সমাধান সম্ভব।”

“সরি, বড়দি। কিন্তু এটা খবর ভালো নয়। আপনি দেখুন, তাহলেই বুঝবেন।”

গোছা গোছা রঙচঙে আর্ট পেপারের মধ্যে থেকে একখানা আর্ট পেপার বের করল শ্রাবণী। মোহনার আঁকা ছবি—আমার চোখে আমার মা। কালচে খয়েরি রঙের পেন্সিল দিয়ে আঁকা এক মায়ের ছবি। পরনের শাড়ি ছেঁড়া, এখানে সেখানে অন্য রঙের তাপ্পি লাগানো। দু-চোখ বেয়ে নেমে আসছে জলের ধারা; চোখের নীচে, কপালে কালশিটের দাগ; ঠোঁটের এককোণ থেকে গড়িয়ে পড়ছে রক্ত।

শ্রাবণী আর প্রভাবতী দুজনেই চুপ করে বসে রইলেন কিছুক্ষণ। বলার মতো ভাষা খুঁজে পাচ্ছিলেন না কেউ। মিনিট দুয়েক পর একটু ধাতস্থ হয়ে প্রভাবতী বললেন, “মোহনার বাড়িতে একটা পেরেন্টস কল পাঠানোর ব্যবস্থা করো শ্রাবণী। চোখের সামনে এ-জিনিস মেনে নেওয়া যায় না। আর একটা কথা, হাউ ডিড রাজনন্দিনী হেল্প?”

শ্রাবণী বলল, “মোহনা চুপচাপ বসে ছিল। কিন্তু রাজনন্দিনীর সঙ্গে কিছুক্ষণ ফুসফুস গুজগুজ করার পরই দেখলাম ও ধীরে ধীরে ছবি আঁকতে শুরু করল। কী বলেছে জানি না, বাট ইট ওয়ার্কড। আমাকে ইন্টারফেয়ার করতে হয়নি।”

প্রভাবতী হাসলেন, “অ্যামপ্যাথি। বুঝলে শ্রাবণী? অন্য মানুষের মানসিক অবস্থা বুঝে পরিস্থিতি সামলাতে জানা। মস্ত বড়ো গুণ এটা। রাজনন্দিনীর মা রোহিণীর মধ্যেও এই গুণখানা আছে। সে এক আশ্চর্য মেয়ে। ওর কথা পরে বলব কখনও।”

শ্রাবণী বললেন, “কিন্তু বড়দি, বলছিলাম যে এভাবে মোহনার পেরেন্টস কল করাটা কি ঠিক হবে? ওঁরা যদি বলেন আমরা ওদের পারিবারিক ব্যাপারে নাক গলাচ্ছি, তাহলে?”

“বাড়ির মেয়েদের উপর অত্যাচার করা কখনোই কারও পারিবারিক অধিকার হতে পারে না শ্রাবণী। আর সবচাইতে বড়ো কথা হল মোহনা আমাদের ছাত্রী। তাই ওকে শারীরিক বা মানসিকভাবে সুরক্ষিত রাখা যতখানি ওর মা-বাবার কর্তব্য, ঠিক ততখানিই দায়িত্ব আমাদের উপরও বর্তায়। আর এক্ষেত্রে যদি ওর বাড়ির লোক তাদের কাজ ঠিকমতো না করে, তবে শিক্ষিকা হিসেবে আমাদের দায়িত্ব তা শুধরে দেওয়া।”

শ্রাবণী বলল, “আপনার কথা ঠিক, কিন্তু ওরা কীভাবে রি-অ্যাক্ট করবে কে জানে! আমিই কালই ব্যবস্থা করছি পেরেন্টস কল করার।”

এরপরের গল্পখানা ছোট্ট। পাঁচ দিন পরে মোহনার মা শুক্লার মুখ থেকে জানা গেল, মোহনার বাবা মারা গিয়েছেন বছর খানেক আগে। আর তার মৃত্যুর পর থেকেই ওর শ্বশুরবাড়ির লোকজন ওর উপর অত্যাচার করতে শুরু করে। একবার বিষ খাওয়ানোর চেষ্টাও করেছে তারা। ওদিকে বাবার বাড়িতে ফিরে যাওয়ার মতো অবস্থাও নেই। মোহনার মুখ চেয়ে শ্বশুরের ভিটেতে কোনোরকমে মাটি কামড়ে পড়ে আছে সে, নইলে হয়তো আত্মহত্যা করে গায়ের জ্বালা জুড়োত।

শুক্লার বয়স নিতান্তই কম। হয়তো তিরিশও পেরোয়নি এখনও। অথচ অনাদরে, অত্যাচারে যেন তার শরীর ভেঙে পড়ছে। কণ্ঠার হাড় বেরিয়ে পড়েছে। মুখে বলিরেখার ছাপ। রঙচটা একখানা সুতির শাড়ি পরনে তার। শাড়িটার দু-তিন জায়গায় রিফু করা। তার মুখখানা দেখে মনে হয় কতদিন বেচারি ভালো করে পেট ভরে দুটি খায়নি। বড়দি আর শ্রাবণী দুজনেই বাক্যহারা হয়ে তাকিয়ে ছিলেন তাঁর অবস্থা দেখে।

কিছুক্ষণ পর বড়দি একটু ধাতস্থ হয়ে বললেন, “মোহনার পড়াশোনার খরচা তাহলে চালাচ্ছে কে?”

শুক্লা ধরা গলায় বলল, “আমার গয়না বিক্রি করে চালাচ্ছি দিদিমণি। শেষ হলে জানি না কী করব।”

বড়দি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর শুক্লার দিকে তাকিয়ে দৃঢ় গলায় বললেন, “শুক্লা, আজ যদি আমার নিজের মেয়ে থাকত তবে সে হয়তো তোমার বয়সিই হত। সেজন্য তোমাকে তুমি বলছি। আমি যদি কাজের ব্যবস্থা করে দিই তোমার জন্য, তাহলে মেয়েকে নিয়ে আলাদা থাকতে পারবে?”

শুক্লা ম্লান গলায় বলল, “আমি তো লেখাপড়া তেমন কিছু জানি না দিদিমণি, কে দেবে আমাকে কাজ? আর কায়েতের ঘরের বউ, লোকের ঘরে ঝি-গিরি করলেও তো লোকে মন্দ কথা বলবে। স্বামীকে হারিয়েছি। শ্বশুরের ভিটে ছাড়লে যে সম্মানটুকুও হারাব।”

“সম্মানের আর রইল কী, শুক্লা? চোখের জল দিয়ে ভাত মেখে খাচ্ছ মা-মেয়ে। এভাবে চললে তোমরা ক’দিন প্রাণে বাঁচবে কে জানে। মোহনার বাবা চলে গেছেন তার অর্থ এমন নয় যে তোমাদেরও জীবন শেষ হয়ে গেছে।”

“কিন্তু দিদিমণি, লোকে কী বলবে?”

“কোনটা বেশি দরকার তোমার শুক্লা—লোকের হাততালি কুড়োনো, না নিজের মেয়েকে ভালো করে মানুষ করা? শ্বশুরবাড়িতে থাকার সম্মানের চাইতে অনেক বেশি দরকারি হল আত্মসম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকা। এসবের কতখানি প্রভাব মোহনার ওপর পড়ছে, তা ভেবে দেখেছ কখনও? মেয়েটা কারও সঙ্গে মেশে না, কথা বলে না। কিছু জিজ্ঞেস করলে কেঁদে ফেলে। এভাবে চললে ভালোভাবে পড়াশোনা করা তো দূরের কথা, উলটে মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়বে ক’দিনেই। তাছাড়া মনে রেখো, কাজের ছোটো-বড়ো বলে কিচ্ছু হয় না। সৎভাবে করলে সব কাজই বড়ো, সব কাজই সম্মানের।”

“কে দেবে আমাকে কাজ দিদি? কোনোদিন তো চাকরি করিনি আমি।”

“সংসারের কাজ, রান্নাবান্না সে-সব জানো তো?”

শুক্লার চোখ দুখানা আনন্দে চকচক করে উঠল, “হ্যাঁ দিদিমণি, ঘরের কাজ সব জানি। তাছাড়া সেলাই-ফোঁড়াই, সোয়েটার বোনা—তাও পারি।”

“আমার বাড়িতে কাজ করবে? আমি একাই থাকি। থাকার চিন্তা কোরো না—আমার বাড়িতে খালি ঘর আছে একখানা। আমার পক্ষে যতখানি সম্ভব মাস মাইনেরও ব্যবস্থা করব। তাতে তোমাদের খাওয়া আর মোহনার পড়ার ব্যবস্থা হয়ে যাবে। তুমি কাজ করবে?”

শুক্লা হঠাৎ করে চেয়ার ছেড়ে প্রভাবতীর পায়ে লুটিয়ে পড়ল। সে হাসছে না কাঁদছে বলা মুশকিল। কোনোরকমে ধরা গলায় বার বার বলতে লাগল, “আপনি সাক্ষাৎ ভগবতী গো দিদিমণি। কতদিন ভেবেছি মেয়েটাকে নিয়ে ইঁদারার জলে ডুবে বুকের জ্বালা মেটাই। কিন্তু পারতাম না। মনে হত ভগবান ঠিক আমার কষ্ট দেখে মুখ তুলে তাকাবেন একসময়। আজ তাকিয়েছেন আমার ভগবান।”

অনেক কষ্টে তার হাত থেকে পা ছাড়িয়ে প্রভাবতী বললেন, “কেউ কারও উপকার করে না শুক্লা। আমার বয়স হচ্ছে, তার উপর স্কুলের কাজকর্ম সেরে বাড়িতে ফিরে দুটো কথা বলার লোক নেই। তুমি থাকলে ভালোই হবে।”

শুক্লা বেরিয়ে যাওয়ার পরে শ্রাবণী চোখে জল, মুখে হাসি নিয়ে তাকিয়ে ছিল বড়দির দিকে। ইচ্ছে থাকলে কত বড়ো কাজ কত অনায়াসে করতে পারে মানুষ! প্রভাবতী সেদিকে তাকিয়ে বললেন, “অমন করে তাকিয়ে দেখার কিছু নেই, সবাই নিজের স্বার্থ আগে দেখে। আমি বুড়ো মানুষ, হাত পুড়িয়ে রান্না করতে পারছি না। তাই আমার নিজের সুবিধের জন্যই এমন ব্যবস্থা।”

শ্রাবণী হেসে প্রভাবতীর পায়ে একখানা প্রণাম করে বলল, “আশীর্বাদ করো বড়দি, আমরা সবাই যেন তোমার মতো স্বার্থপর হয়ে উঠতে পারি।”

হোস্টেলের মধ্যে ভূত

সন্ধেবেলায় পড়াশোনা শেষ করে সবে বইখাতা গুটিয়ে রাখার পর পরি রাবারের একটা বল বের করে বলল, “ওই, ক্যাচ ক্যাচ খেলবি?”

তিন্নি বেশ খুশি হয়েই বলল, “হ্যাঁ, চল খেলি। বারান্দায় খেলবি, না এখানে?”

“ঘরের মধ্যেই খেলি। বারান্দায় গেলে গ্রিলের বাইরে বল চলে যেতে পারে। বাইরে অন্ধকার। বল একবার বাইরে চলে গেলে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না।”

বিতু ছোট্ট একখানা হাই তুলে কিছু বলতে যাচ্ছিল, হঠাৎ দরজার দিকে সে একটু হকচকিয়ে গেল। দরজায় টাঙানো সবুজ পর্দাটার ও-পাশ থেকে কারও পায়ের বুড়ো আঙুল দেখা যাচ্ছে। বিতু চেঁচাতে যাচ্ছিল, কিন্তু পরি ঠোঁটে আঙুল দিয়ে ওকে চুপ করতে বলে নিজে রওনা দিল দরজার দিকে। দরজায় গিয়ে এক ঝটকায় পর্দাটাকে টেনে সরিয়ে দিতেই দেখল ‘এ’ সেকশনের হাসিনা নামের মেয়েটা একটু জবুথবু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে‌।

“হাসিনা তুই, এখানে কী করছিস? ভেতরে আয়।”

বিতু আর তিন্নিও বেশ অবাক হয়েই তাকাল হাসিনার দিকে। আশ্চর্য তো, মেয়েটা অমন লুকিয়ে লুকিয়ে চোরের মতো দাঁড়িয়ে ছিল কেন ওখানে? সোজা ভেতরে এল না কেন? ওদের মুখ দেখে হাসিনা নীচু গলায় বলল, “আ-আ-আ-আমার ঘ-ঘ-ঘরে একা ভয় লাগছিল।”

ওদের তিনজনেরই মনে পড়ল—ওহো, হাসিনা তো ওর ঘরে একাই থাকে। ওর ঘরটা ছোটো, দুই বেডের। আর ওর ঘরে আগে যে মেয়েটা থাকত, সে নিজের কাকুর বাড়িতে থেকে পড়াশোনা করছে এখন। তারপর আর নতুন কোনও রুমমেট আসেনি আর ওর ঘরে। বিতু আর তিন্নি বুঝল ব্যাপারটা, কিন্তু পরি ঠোঁট ওলটে জিজ্ঞাসা করল, “কেন, ভয় পাচ্ছিলি কেন?”

হাসিনা এদিক ওদিক দেখল করুণ চোখে। তারপর ঢোঁক গিলে বলল, “আ-আ-আমার ঘর থেকে না ভূ-ভূ-ভূত দেখা যায়!”

“কী!” ওরা তিনজনে একসঙ্গে চেঁচিয়ে উঠল।

বিতুর মুখ ভয়ে প্রায় সাদা হয়ে গিয়েছিল। তিন্নির মুখে কোও কথা নেই। খালি পরি কোনোরকমে ধাক্কাটা সামলে নিয়ে বলল, “হোস্টেলে ভূত!”

হাসিনা বারকতক চোখ পিটপিটিয়ে আমতা আমতা করে বলল, “হুঁ। আমার ঘর থেকে একদিন দেখেছি, ছাদের উপর ঘুরে বেড়াচ্ছিল।”

তিন্নি বিতুর হাতখানা ধরে বলল, “তোর তো ভুলও হতে পারে। কী করে জানলি তুই ভূতই দেখেছিলি?”

“মাথায় একটা সাদা রঙের কাপড় চাপা দিয়ে এদিক থেকে ভেসে বেড়াচ্ছিল—ভূত নয়তো কী!”

পরি একটু মরিয়া হয়ে বলল, “ধ্যাত, ভূত বলে আবার সত্যি সত্যি কিছু আছে নাকি! ওগুলো সব মনের ভুল।”

ঠিক এমন সময় লোডশেডিং হয়ে গিয়ে পুরো হোস্টেলটা হয়ে গেল ঘুরঘুট্টি অন্ধকার। বারান্দার গ্রিলের ভেতর দিয়ে খানিকটা দমকা হাওয়া এসে ওদের পর্দাটাকে উড়িয়ে দিল। হাওয়ার ধাক্কায় ওদের রুমের দরজার পাল্লা দুটোও ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দ করে আপনা-আপনিই খুলতে আর বন্ধ হতে শুরু করল। রুমের ভেতর ওদের চারজনের অবস্থা তখন আর বলার মতো নয়। বিতুর প্রায় দাঁতকপাটি লেগে গেছে। হাসিনা বিড়বিড় করে পীরবাবার ভূত তাড়ানোর মন্ত্র পড়ে চলেছে। পরি আর তিন্নিরও গলা শুকিয়ে কাঠ। হঠাৎ বাইরে একটা অদ্ভুতরকমের আলো দেখতে পেয়ে পরি কেঁপে উঠল—”কে? কে রে ওখানে?”

কোনও উত্তর নেই। উলটে আলোটা কাঁপতে কাঁপতে আরও জোরালো হয়ে উঠল আর তারই সঙ্গে মস্ত বড়ো লম্বা একটা ছায়া ওদের ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে বলল, “অ্যাই মেয়েরা!”

আর যায় কোথায়! ওদের ঘরে এরপর ভয়ানক হুলুস্থুলু শুরু হয়ে গেল। হাসিনা খাটের পেছন দিকে সরতে সরতে ডিগবাজি খেয়ে পড়ল মেঝেতে। তারপর সে ‘হায় আল্লাহ্’ বলে ধাঁ করে সেঁধিয়ে গেল বিতুর খাটের তলায়। বিতুর আগেই ভয়ে দাঁতকপাটি লেগেছিল। ও গায়ে দেবার চাদরখানা দিয়ে মাথা ঢেকে চেঁচাতে লাগল—”ও ভূত, প্লিজ আমাকে খাস না, তোকে একটা কিটক্যাট কিনে দেব!” বলেই হুঁহুঁ করে কান্না।

তিন্নিও ‘আমি মার কাছে যাব’ বলে ভ্যাঁ করে কান্না জুড়ল। শুধু পরি টেবিলের ওপরে রাখা একটা প্লাস্টিকের ক্রিকেট ব্যাটকে হাতে তুলে সাঁই সাঁই করে চারপাশে ঘোরাতে ঘোরাতে চিৎকার করতে লাগল—”আসবি না বলছি, খবরদার কাছে আসবি না! কাছে এলেই কামড়ে দেব।”

এদিকে হয়েছে কী, বিতুর খাটের নীচে একখানা গিন্নি মাকড়শা দিব্যি তার ছানাপোনাদের নিয়ে বেশ বড়োসড়ো বাসা বানিয়েছিল। সেই ঝুল ঝাড়া হয়নি বলে বিতু আজ সকালেই জিনিয়াদির কাছে একপ্রস্থ বকুনি খেয়েছে। বেচারি ভেবেছিল বিকেলবেলা স্কুল থেকে ফেরার পর সরলাদির কাছ থেকে ঝুলঝাড়ুটা নিয়ে ঝুল-টুল সব পরিষ্কার করে ফেলবে, কিন্তু কোনও কারণে সেটা আর হয়ে ওঠেনি। হাসিনা খাটের তলায় ঢুকতেই সেই ঝুল-টুল সব তার মাথায় জড়িয়ে গেল। বিরক্ত হয়ে হামাগুড়ি দিয়ে বাইরে মুণ্ডুখানা বের করতেই পরির পা এসে দুম করে লাগল তার মাথায়। আর যায় কোথায়! মাথাখানা খাটের কানায় ঠুকে যেতেই হাসিনা হাউমাউ করে চেঁচিয়ে উঠল—”ওরে বাবা রে, ভূতে আমার মাথা ঠুকে দিয়েছে!”

আর হাসিনার মাথায় পা লাগার সঙ্গে সঙ্গে পরিও আঁকড়ে-মাকড়ে বিতুর পড়ার টেবিলে চড়ে—”ভূতটা খাটের তলায় ঢুকেছে!” বলে তারস্বরে চেঁচাতে লাগল।

ঠিক সেই সময় ঘরে ঘরে আলো জ্বলে উঠল আবার। এক নিমেষে চিৎকার-চেঁচামেচি বন্ধ করে ওরা একজন আর একজনের মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগল। তারপর সবাই দেখল যে দরজার বাইরে হাতে মোমবাতি নিয়ে সরলাদি অ্যাত্ত বড়ো একটা হাঁ করে দাঁড়িয়ে আছে; আর দরজার ভেতরে যে অবস্থা কী তা তো বলার মতোই নয়।

বিতুর খাটের নীচে মাকড়শার ঝুলমাখা হাসিনার মুণ্ডুখানা উঁকি দিচ্ছে। খাটের উপরে মাথায় মোটা চাদর ঢাকা বিতু এদিক ওদিক হাতড়াচ্ছে আর বলছে, “ওই কী রে, কী হল?”

তিন্নি উপুড় হয়ে শুয়ে। বিতুর বালিশে মুখ গুঁজে বাবা গো, মা গো বলে কাঁদছে আর পরিরানি ডানহাতে প্লস্টিকের ব্যাটখানা বাগিয়ে ধরে টেবিলের উপর একপায়ে দাঁড়িয়ে আছে।

হতভম্ব ভাবটা একটু কাটিয়ে উঠতেই সরলাদি বকতে শুরু করল সবাইকে—”হায় রে ভগবান, এক নম্বরের ভিতুর ডিম তোরা সবক’টা। অন্ধকারের মধ্যে মোমবাতির আলো দেখেই চেঁচিয়ে-মেচিয়ে একাকার‍, আর আমি ভাবলাম কী না কী হল! অ্যাই হাসিনা, তুই বিতুর খাটের তলায় কী করছিস? ছি ছি ছি, মাকড়শার ঝুল মেখে চুলের কী দশা করেছে দ্যাখো! বেরো, বোরো বলছি এক্ষুনি। ওটা কে চাদর মাথায় দিয়ে? তিন্নি, না বিতু?” তারপর পরির দিকে তাকিয়ে বলল, “থাক, অনেক হয়েছে বীরাঙ্গনা, আর টেবিলে উঠে ব্যাট দিয়ে ভূত পেটাতে হবে না। দয়া করে টেবিল থেকে নেমে উদ্ধার করুন আমায়।”

ওরা সবাই বোকা বোকা মুখ করে চেয়ারে আর বিছানায় ঠিকঠাকমতো বসল। ছি ছি ছি! কী লজ্জার কথা বল দেখি! চার-চারটে মেয়ে কিনা একসঙ্গে সরলাদির ছায়া দেখে ভয় পেয়ে এমন বিচ্ছিরিভাবে চেঁচাল। ভাগ্যিস হোস্টেলে আর কেউ দেখেনি।

কিন্তু চারমূর্তির কপাল সেদিন সত্যিই খারাপ ছিল। সরলাদি দরজা থেকে সরতেই ওরা দেখল হোস্টেলের অন্যান্য রুমের প্রায় দশ-বারোজন মেয়ে হাতে টর্চ-লাইট আর মোমবাতি নিয়ে বাইরেই দাঁড়িয়ে ছিল। বোধহয় ওদের চিৎকার-চেঁচামেচি শুনেই সবাই জড়ো হয়েছিল সেখানে। সরলাদি চলে যেতেই হাসির হররা উঠল।  পরদিন স্কুলের কারও আর জানতে বাকি রইল না ওদের বীরত্বের কথা। এখন বিতু, তিন্নি, পরি বা হাসিনাকে একসঙ্গে হোক বা আলাদা আলাদা দেখামাত্রই সবাই খোনা গলায় একসঙ্গে চেঁচিয়ে ওঠে—”অ্যাঁই মেঁয়েরা!”

কাজের লোক

শনিবারের টিচার্স মিটিংয়ে শ্রাবণী আর রাকা দুজনই হেসে একই রিপোর্ট দিল—”মোহনা ইজ ডুইং মাচ মাচ বেটার দ্যান বিফোর! মাত্র দুই সপ্তাহেই মেয়েটার আত্মবিশ্বাস যতখানি বেড়ে গেছে, তা চিন্তাই করা যায় না।”

বৈশাখী মাথা নাড়িয়ে বলল, “ওরে বাবা রে, মোহনা যে এমন বিচ্ছু মেয়ে তা কে জানত! গত পরশু দেখি স্কুলের পেছনে পেয়ারাগাছের ডালে বাঁদরের মতো ঝুলছে। তার সঙ্গে সিক্সের দুটো মেয়ে। একবার ভাবলাম ডেকে দুটো ধমক দিই, কিন্তু পারলাম না। ইচ্ছে করেই অন্যদিকে তাকিয়ে ছিলাম। মেয়েটা অনেক কষ্ট পেয়েছে। এখন একটু দুষ্টুমি করুক।”

বাকি টিচাররা সবাই একই সঙ্গে হইহই করে উঠলেন—”অল ক্রেডিট গোজ টু বড়দি!”

প্রভাবতী একটু হেসে বললেন, “বাড়িতেও দেখছি মোহনা আর শুক্লা দুজনেই একটু ভালো পরিবেশ পেয়ে তরতাজা হয়ে উঠেছে। অবশ্য শুক্লার গিন্নিপনার চোটে আমার প্রায় প্রাণ যায় যায় অবস্থা। আমি নাকি পাখির মতো খাই, দেরি করে ঘুমোই, কারও কথা শুনি না—অনেকরকম অভিযোগ।”

সরলাদি কাগজের প্লেটে সবার জন্য শিঙাড়া-মিষ্টি সাজাতে সাজাতে বলল, “এবার ঠিক হয়েছে। স্কুল বিল্ডিংয়ে সরলা আর নিজের বাড়িতে শুক্লা—এবার দেখি বড়দি কীভাবে অনিয়ম করেন!”

সরলাদির অভিযোগ মিথ্যে নয়—সে-কথা সবাই জানে। কাজে ব্যস্ত থাকলে বড়দির সময়ের জ্ঞান থাকে না। নাওয়া-খাওয়া মাথায় ওঠে। এই বয়সেও যেভাবে কাজ করেন উনি তাতে পঁচিশ-ছাব্বিশ বছর বয়সের বাচ্চা মেয়েগুলোও হাঁ হয়ে যায়। অবশ্য টিচারদের গ্রুপে রমলা বসু ও মানসী চক্রবর্তীর মতো দু-তিনজন নিন্দুকও রয়েছে। তারা সবকিছুতেই দোষ খুঁজে বের করে। বড়দি প্রভাবতীর কাজকর্ম দেখে তারা নিজেদের মধ্যে মুখ বেঁকিয়ে বলে, “ভদ্রমহিলার ওসব লোক-দেখানো কাজ! সংসারের জাঁতাকলে তো আর পড়লেন না কোনোদিন, স্কুলের নামে আদিখ্যেতা করেই হাততালি কুড়োলেন সারাটা জীবন।”

কাজেই সরলাদির কথার পিঠে রমলাদি কথা শোনাতে ছাড়ল না, “তবে যাই বলো সরলাদি, বড়দি আমাদের লাকি—সে-কথা কিন্তু স্বীকার করতেই হবে। নইলে আজকালকার দিনে ঘরে-বাইরে তোয়াজ করার জন্য দু-দুটো কাজের মাসি ক’টা মানুষের ভাগ্যে জোটে বলো!”

সে-কথার সমর্থনে মুখ টিপে হাসল কয়েকজন।

সরলাদির মুখখানা কালো হয়ে গেল হঠাৎ। সেটাই স্বাভাবিক। সারদাদেবী স্কুলে প্রায় পঁচিশ বছর ধরে কাজ করছেন তিনি। হোস্টেলের মেয়েদের খাওয়া-দাওয়ার দেখাশোনাই করাই মূল দায়িত্ব হলেও হাসিমুখে স্কুল আওয়ারর্সে স্কুলের অনেক কাজকর্মের ভার তুলে নিয়েছে নিজের কাঁধে। এই স্কুল, স্কুলের দিদিরা, ক্লাসের ছাত্রীরা—এরাই তার পরিবার। সেখানে কেউ কাজের মাসি বলে ছোটো করতে চাইলে সম্মানে লাগে বইকি!

পরিস্থিতি দেখে বৈশাখী বলল, “রমলাদি, আপনার কথা কিন্তু একদম ঠিক নয়। কেননা সরলাদি আমার বা আপনার বহু আগে থেকে এই স্কুলবাড়ি, হোস্টেল এসব কিছু সামলাচ্ছেন। উনি এখানেই থাকেন এবং সারদাদেবী স্কুলের সবাইকে নিজের ফ্যামিলি বলেই মনে করেন। আর নিজের পরিবারের জন্য যাঁরা কাজ করেন, তাদের কিন্তু কাজের মাসি বলে না। বরং সেদিক থেকে দেখলে আপনি-আমি যারা ন’টা-পাঁচটার ডিউটি করি প্রত্যেকদিন, তারাই কাজের মাসি, সরলাদি নন‌।”

তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন রমলা। এই নতুন মেয়েগুলোকে দেখলেই রি রি করে গা-হাত-পা জ্বলে ওঠে তাঁর। বড়দির আশকারা পেয়ে পেয়ে সবক’টা মাথায় চড়ে বসেছে! ছোটো জাতকে মাথায় তুললে যা হয় আর কী! একটা কথা বলার জো নেই, সবসময় মুখে মুখে জবাব তৈরি হয়ে আছে। তিনি মুখ বেঁকিয়ে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু ব্যাপারটা অনর্থক ঝগড়ার দিকে গড়াচ্ছে দেখে প্রভাবতীই থামালেন তাঁকে, “কাজের মাসি মানে যে মহিলা কাজ করেন। সে তো ভালো কথা। বরং এইসব অকাজের আলোচনা বন্ধ করে আসল কাজের খবর দাও। মানসী, স্কুলের ফার্স্ট-এইড বক্সগুলোর এই দশা কেন? দু-তিনটের বেশি ব্যান্ড-এইড পেলাম না কোনোটাতে! জ্বর-সর্দিকাশির কমন ঔষধগুলো অবধি নেই। অফিস-রুমের বক্সে একটা এক্সপায়ার্ড প্যারাসিটামলের পাতা খুঁজে পেয়েছি কালকে! কাবার্ডে স্যানিটারি ন্যাপকিন একটাও নেই। কারণটা কী জানতে পারি?”

মানসী ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে তাকাল বড়দির দিকে, “না মানে বড়দি, আমি কালকের মধ্যেই ঠিক করে দেব।”

“কাল রবিবার, স্কুল ছুটি।”

মানসী সে-কথার কোনও জবাব না দিয়ে চুপ করে রইল।

কিছুক্ষণ পর বড়দিই আবার বললেন, “আজ যাবার আগেই ফার্স্ট-এইড বক্সগুলো আপডেট করে যাবে। আমি বাড়ি ফেরার আগে চেক করব। ওষুধের রিসিটগুলো আমার ডেস্কে রেখে দিও।”

মানসী নিমতেতো মুখ করে বলল, “ঠিক আছে বড়দি, তাই হবে।”

প্রভাবতী এবার বৈশাখীকে বললেন, “ম্যাথসের এক্সট্রা ক্লাস নিয়ে তুই কী বলবি বলছিলি যে?”

“হ্যাঁ বড়দি, আসলে এবারের নাইনের ব্যাচটাতে কিছু স্টুডেন্টকে আইডেন্টিফাই করেছি। ওরা ম্যাথসে একটু উইক, কিন্তু আমার মনে হয় প্রতি সপ্তাহে যদি একটা করেও এক্সট্রা ক্লাসের ব্যবস্থা করা যায়, তাহলে ব্যাপারটা ইজিলি ম্যানেজ করা যাবে। আর তাছাড়া…”

সেদিনের টিচার্স মিটিং শেষ হওয়ার পর বড়দি বেরিয়ে যেতেই বৈশাখীকে শুনিয়ে বেশ জোরেই রমলা বলল, “বুঝলি মানসী, আজকাল তো আবার সিনিয়র-জুনিয়রদের মধ্যে কোনও মান্যিগণ্যির বালাই নেই। আমরা বাবা সিনিয়রদের মুখের ওপর কথা বলার আগে দশবার ভাবি।”

বৈশাখী নিজের ব্যাগ গুছিয়ে বেরোতে বেরোতে বলল, “আপনি আচরি নীতি পরেরে শিখাও! বুঝলে রমলাদি? তুমি আমার সিনিয়র এ-কথা যেমন মনে রেখেছ, তেমনি এটাও মাথায় রেখো যে পে-স্কেলে না হোক, কিন্তু বয়সে আর অভিজ্ঞতায় এই দুটো দিক থেকেই সরলাদি কিন্তু তোমাদেরও সিনিয়র। তাই নিজের উপদেশ নিজেরা মেনে চলো আগে, তারপর আমায় বোলো। চললাম। হ্যাভ অ্যা নাইস ইভনিং।”

বৈশাখী নিজের ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে যেতেই মানসী বলল, “ওদের কথা ছাড়ো তো রমলাদি। ছোটো জাতের মেয়ে সব—ওরা জানেই-বা কী, আর বোঝেই-বা কী!”

রমলা রাগে গরগর করতে করতে মানসীর দিকে তাকাল, “এগুলো সব বড়দির আশকারার ফল। তেমন হেড-মিস্ট্রেস হলে কত ধানে কত চাল দেখিয়ে দিতাম এই চিড়িয়াগুলোকে।”

“তা যা বলেছ। আচ্ছা শোনো না রমলাদি, আমাকে একটু হেল্প করো না, নইলে বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে যাবে। রাস্তার ও-পারে সুধীরের দোকান থেকে ওষুধপত্র, ব্যান্ড-এইডগুলো নিয়ে আসতে হবে। আমার সঙ্গে একটু এসো না গো।”

রমলা মনে মনে ভাবল—ও আচ্ছা, এইজন্য এত সোহাগ দেখানো হচ্ছিল আমাকে! নিজের কাজ নিজে সময়মতো করবে না, আর ওর জন্য এখন আমি আমার বাস মিস করি। আহ্লাদ দেখে বাঁচি না! কিন্তু মনে এ-কথা ভাবলেও মুখে তো আর এসব বলা যায় না। অগত্যা একটু দেঁতো হাসি হেসে সে বলল, “ও মা, তোকে তো বলাই হয়নি, আসলে আমার বাবানটার না খুব শরীর খারাপ রে! আমি তো ভেবেছিলাম আজ স্কুলেই আসব না। কিন্তু আজকে টিচার্স মিটিং ছিল বলে আসতে বাধ্য হলাম। আই অ্যাম রিয়েলি সরি, আজকে আমায় তাড়াতাড়ি যেতেই হবে। চলি রে! সাবধানে বাড়ি ফিরিস।”

উত্তরের অপেক্ষা না করেই রমলা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ব্যাগ গুছিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেল। শূন্য কমন-রুমে বোকার মতো হাঁ করে দাঁড়িয়ে রইল মানসী।

সত্যবাদী

অঙ্কের মিস বৈশাখীদির মেজাজ বড্ড কড়া। তাকে ভয় পায় না, এমন একজন স্টুডেন্টও খুঁজে পাওয়া যাবে না পুরো স্কুলে। তবে বৈশাখীদি যেমন রাগী তেমনি স্টুডিয়াস টিচার। প্রত্যেকটি মেয়ের উপর তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি থাকে সবসময়। ঘড়ির কাঁটা ধরে ক্লাসে ঢোকে। এক মিনিট দেরি হওয়ার জো নেই। মেয়েরাও বৈশাখীদির দাপটে সবসময় ভয়ে কাঁটা হয়ে থাকে। তাই কোনও কারণে বৈশাখীদির ক্লাস থেকে যদি পাঁচ মিনিটেরও ছুটি পাওয়া যেত তবে মেয়েদের খুশির সীমা থাকত না। কাজেই বৃহস্পতিবার বাংলা ক্লাস শেষ হওয়ার পর সরলাদি এসে যখন বলল যে বৈশাখীদির আসতে পনেরো মিনিট দেরি হবে, মেয়েরা যেন বেশি হইচই না করে, সে-কথা শুনে তিন্নিদের ক্লাসে সকলের ইচ্ছে করছিল আনন্দে ডিগবাজি খেতে। কিন্তু মনের ভাব মনে চেপে রেখে সবাই ভালোমানুষের মতো সরলাদির কথা শুনে মাথা নাড়িয়ে ‘হ্যাঁ’ বলল।

পনেরো মিনিটের জন্য ছুটি, তাও আবার বৈশাখীদির ক্লাসে! এত আনন্দে কি আর চুপচাপ থাকা যায়! সরলাদি ক্লাসরুম থেকে বেরিয়ে যাওয়া মাত্র হুড়োহুড়ি শুরু হয়ে গেল।

বিতুর মাথায় আইডিয়া এলো—চল প্লেন-প্লেন খেলি। বুদ্ধিটা পুরো ক্লাসের বেশ মনে ধরল। অতএব সময় নষ্ট না করে চটপট দু-ডজন এরোপ্লেন তৈরি হল। সুমিতা খেলার নিয়মকানুন ঠিক করে দিল। চারটে টিম হবে। টিম এ, টিম বি, টিম সি আর টিম ডি। প্রত্যেক টিমের কাছে থাকবে ছয়টা প্লেন, আর প্লেনগুলোর গায়ে যে টিমের প্লেন সেই টিমের অ্যালফাবেট লেখা থাকবে। তিন রাউন্ড ছোড়াছুড়ি করার পর যে টিমের সবথেকে বেশি প্লেন ভালো অবস্থায় থাকবে, সেই টিম জিতবে, আর বাকিরা হারবে। উইনার টিমের প্রাইজ একশিশি হজমোলা। হেরে যাওয়া টিমগুলোর সবাই মিলে টাকা দিয়ে কিনবে।

কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সেই এরোপ্লেন ছোড়া শুরু হল। সবার হাতে পেনসিল বক্স। সেটাকে মুখের সামনে ধরে যুদ্ধের সিনেমায় টিভিতে যেমন শুনেছে তেমনি উঁচু গলায় সমবেত স্বরে চিল্লামিল্লি হচ্ছে—”কম্যান্ডার, ওভার, কম্যান্ডার অ্যাটাক !”

সুমতি মুখের সামনে ছাতাটাকে মাইকের মতো ধরে যুদ্ধের লাইভ কমেন্ট্রি করছে—”কম্যান্ডার তিন্নির প্লেন হাওয়ার বেগে ছুটে চলেছে আকাশ চিরে। প্লেনটা ছোটো হলে কী হবে, আর্ট পেপার দিয়ে তৈরি তাই দিব্যি ওড়ে। অ্যাই গেল গেল গেল, তিন্নির প্লেন গিয়ে লাগল মেজর মাম্পুর মাথায় ঠক করে! মেজর মাম্পু রাগ করে কম্যান্ডার তিন্নির পেছনে ছাতা নিয়ে তাড়া করলেন। উফ্‌, কী ভীষণ যুদ্ধ! দেখা যাক কে জেতে। ওদিকে কম্যান্ডার বিড়ালিনী, থুড়ি রূপসার পিংক এরোপ্লেন দু-বার আকাশে উড়েই বেঞ্চের পেছনে পড়ে গেছে। আগেই বলেছিলাম, অত ফিনফিনে কাগজে প্লেন বানালে কি আর ওড়ে! মেজর পৌলমী তার দুখানা যুদ্ধবিমান নিয়ে বীরের মতো লড়ে যাচ্ছেন। জেনারেল হাসিনার প্লেন দারুণ উড়ছে, কিন্তু ওই যাহ্, একটা প্লেন জানালা দিয়ে বাইরে চলে গেল। বড়ো দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি, জেনারেল হাসিনার যুদ্ধবিমান বাইরে তেলাকুঁচো পাতার ঝোপের মাথায় আটকে গেছে। হই-হট্টগোলের সুযোগে মেজর মাম্পু টেবিলের তলায় লুকিয়ে লুকিয়ে আরেকখানা যুদ্ধবিমান তৈরি করছেন—অ্যাই হবে না, হবে না! চিটিং, চিটিং!”

এইভাবে লাফালাফি হুড়োহুড়ি করে দিব্যি যুদ্ধ চলছিল। পনেরো মিনিট সময় যে কখন কেটে গেছে সে-খেয়াল নেই কারও। হঠাৎ যুদ্ধক্ষেত্রে অ্যাটম বোমা পড়ল। দরজার দিক থেকে শান্ত অথচ গম্ভীর গলায় শোনা গেল—”কী হচ্ছে এখানে?”

বড়দি! ক্লাসের সবাই যে যেখানে ছিল, সেখানেই বরফের মতো জমে গেল।

সুমতি ভয়ে ভয়ে‍ আড়চোখে দরজার দিকে তাকিয়ে দেখল, দরজায় বড়দি দাঁড়িয়ে আছেন। মুখ-চোখ শান্ত। রাগ করেছেন কি না বোঝার উপায় নেই। তার পাশেই বৈশাখীদি দাঁড়িয়ে আছে। রাগে মুখ থমথম করছে ওর।

পুরো ক্লাসরুমের লণ্ডভণ্ড অবস্থা। বইয়ের ব্যাগ, পেনসিল বক্স, ছাতা, জলের বোতল—সবকিছু ছড়িয়ে-ছিটিয়ে একাকার। কাগজের এরোপ্লেনগুলো যত্রতত্র মাটিতে পড়ে গড়াচ্ছে। সবার চুল এলোমেলো, মুখ ঘামে ভেজা। হাসিনার চুলের একপাশে একটা এরোপ্লেন আটকে আছে। তিন্নিদের সবার বুক ঢিপঢিপ করছে ভয়ে। কী হয় কী হয় অবস্থা!

কিছুক্ষণ পর বড়দি বললেন, “বৈশাখী, পুরো ক্লাসকে সঙ্গে নিয়ে দু-মিনিটের মধ্যে আমার অফিসের সামনে এসে দেখা করো। আমি অপেক্ষা করছি।”

বড়দি চলে গেলেন। বৈশাখীদি গম্ভীর মুখে সবাইকে নিয়ে রওনা দিল বড়দির অফিসের দিকে। তিন্নিদের ক্লাসের সবাই মাথা নীচু করে দাঁড়াল বড়দির অফিসের সামনে। বড়দি অফিসের বাইরে বেরিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন, “যা জিজ্ঞাসা করব, তার সত্যি উত্তর দেবে। কে দুষ্টুমি শুরু করেছিল?”

কোনও উত্তর নেই। সবাই মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে আছে চুপচাপ। বড়দি আবার বললেন, “কে করেছিল, তাড়াতাড়ি বলো!”

রূপসা ভাবছিল সুমি, তিন্নি আর বিতুকে বকা খাওয়ানোর এত বড়ো সুযোগ আবার নাও পাওয়া যেতে পারে। ওদের তিনজনকে বরাবরই খুব অপছন্দ করে রূপসা। কারণ একটাই—রূপসার শুধু মনে হয়, ওই মেয়ে তিনটে আছে বলেই রূপসার দিকে মিসরা ফিরেও তাকান না। নইলে ক্লাসের ফার্স্ট গার্ল তো রূপসারই হওয়ার কথা। সুমতিটা দেখতে কী বাজে! জামাকাপড়ের কোনও ছিরিছাঁদ নেই। পায়ের ঢিলে মোজা রাবার ব্যান্ড দিয়ে আটকে রাখে। হাতে-পায়ে নারকেল তেল মাখে। ফার্স্ট গার্ল না ছাই! ওর কাছে গেলেই তেলের গন্ধে বমি পায় রূপসার। ওদিকে বিতু আর তিন্নির রকমসকম দেখলে গা জ্বলে যায়। বিতু থাকে ভিজে বেড়াল সেজে। যেন কত ভালোমানুষ। কিন্তু রূপসা ঠিক জানে ও একটা মিটমিটে শয়তান; ওসব ভালোমানুষি ন্যাকামো ছাড়া আর কিছুই না। তিন্নিটা যদিও স্মার্ট, দেখতেও সুন্দর, কিন্তু এমন ভাব দেখায় যেন কোথাকার কে!

আজ যদি বড়দির কাছে রূপসা ওদের নাম বলে দেয় তাহলে বড়দি বুঝতে পারবেন ওরা কত বাজে। তাছাড়া কে জানে, সত্যি কথা বলার জন্য হয়তো প্রাইজও পেতে পারে ও। অনেক ভেবেচিন্তে রূপসা হাত ওঠাল।

বড়দি তাকালেন ওর দিকে, “হ্যাঁ, বলো রূপসা।”

“বড়দি, আমি দেখেছি, বিতু প্রথম শুরু করেছিল আর সুমতি চেঁচামেচি করছিল।”

পুরো ক্লাস একসঙ্গে ফিসফিস করে বলতে শুরু করল, “ইশ্‌, বিড়ালিনীটা কী পাজি! ও কি খেলছিল না?”

বৈশাখীদি ধমক দিয়ে চুপ করালেন সবাইকে। তারপর কটমট করে তাকালেন রূপসার দিকে, “বিতু, সুমতি চেঁচামেচি করছিল, আর তুমি তখন কী করছিলে?”

রূপসা মাটির দিকে তাকিয়ে নখ খুঁটতে লাগল।

বড়দি ওদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “বিতু-সুমতি, রূপসা যা বলল তা কি সত্যি? তোমরা শুধু চেঁচামেচি করেছ তাই নয়, নিজেদের বইখাতা মাটিতে ফেলেছ, স্কুলের ইউনিফর্ম নষ্ট করেছ। তোমরা জানো তোমাদের চেঁচামেচির জন্য আশেপাশের ক্লাসগুলোতে সবার কত অসুবিধে হয়েছে? বলো, উত্তর দাও?”

সবাই চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। বিতু আর সুমতির চোখে জল। বড়দি বললেন, “বিতু, সুমতি আমার সঙ্গে অফিসে এসো। বৈশাখী, অন্য মেয়েদের নিয়ে ক্লাসরুমে যাও।”

এবার একটা অদ্ভুত ব্যাপার হল। সবার প্রথমে তিন্নি এসে হাত ধরল সুমতির, “চল, আমিও যাব। আমিও তো খেলছিলাম। বড়দি যাই শাস্তি দিক, আমরা তিনজনে ভাগ করে নেব।”

তিন্নির দেখাদেখি হাসিনা, পৌলমী, দেবী এগিয়ে এসে হাত ধরল ওদের তিনজনের। তারপর মাম্পু-সহ সবাই এগিয়ে এসে এক লাইনে হাত ধরে দাঁড়াল।

বৈশাখীদি বলল, “এ কি, তোমরা সবাই হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছ কেন? শুনলে না, বড়দি সবাইকে ক্লাসে যেতে বললেন?”

তিন্নি বলল, “দিদি, আমরা তো সবাই চেঁচামেচি করেছিলাম, তাহলে সুমি আর বিতু কেন একা শাস্তি পাবে? সবাই মিলে দোষ করেছি, তাই সবাই মিলে শাস্তি ভাগ করে নেব।”

বৈশাখীদি হাসলেন, “আচ্ছা বেশ, ঠিক আছে। চলো বড়দির কাছে যাওয়া যাক। দেখা যাক উনি তোমাদের কী শাস্তি দেন।”

বড়দির অফিসে অতগুলি মেয়ের দাঁড়ানোর জায়গা ছিল না। তাই শাস্তি দেবার জন্য বড়দিকেই আবার বেরিয়ে আসতে হল। শাস্তি সাব্যস্ত হল—ওরা সবাই স্কুলের মাঠে পনেরো মিনিট দাঁড়িয়ে থাকবে। দাঁড়িয়ে থাকাকালীন কেউ কারও সঙ্গে কথা বলতে পারবে না। আর ওদের ম্যাথামেটিক্স হোমওয়ার্কও আগামী দু-দিনের জন্য ডবল করে দেওয়া হল।

সবাই গিয়ে দাঁড়াল মাঠে। রূপসা একাই ফিরে গেল ক্লাসরুমে। যারা শাস্তি পেয়েছিল তারা সবাই চুপচাপ, কিন্তু হাসিমুখে, হাত ধরে দাঁড়িয়ে ছিল মাঠে। ওদের দিকে কিছুক্ষণ হাঁ করে দেখল ও। খালি ক্লাসরুমটা খাঁ খাঁ করছে। রূপসা নিজের ডেস্কে গিয়ে চুপ করে বসল। ব্যাপারটা কেমন যেন হয়ে গেল! ও ভেবেছিল সুমতি আর বিতু শাস্তি পেয়ে স্কুলের মাঠে কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকবে, আর সত্যি কথা বলার জন্য বড়দি নিশ্চয়ই ওকে প্রাইজ দেবেন। কিন্তু পুরো ব্যাপারটা যেন কেমন উলটে গেল। সব দোষ তিন্নির। ও যদি আগেভাগে গিয়ে ওই শয়তান সুমতিটার হাত না ধরত, তাহলেই আর এসব কিছুই হত না। সবচাইতে বাজে ব্যাপার, মাম্পুটাও ওদের দলে চলে গেল! স্কুলের মাঠের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল রূপসা।

কান ধরে নয়, পুরো ক্লাস ফাইভের এ-সেকশন ওখানে হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে, আর রূপসা ক্লাসরুমে একা! সব দোষ তিন্নির। সব দোষ সুমতির। কিন্তু সত্যিই কী তাই? হঠাৎ ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেলল রূপসা।

বেচারি বিড়ালিনী

তিন্নিদের নাওয়া-খাওয়ার সময় নেই এখন। আর মাসখানেকের মধ্যেই তাদের হাফ ইয়ারলি এগজাম শুরু হবে। এমনিতেই এই বছর তিন্নির পড়াশোনা একটু দেরিতেই শুরু হয়েছিল। গরমের ছুটির পর সে স্কুলে ভরতি হয়েছিল। তবে তাতে যে বিরাট কিছু অসুবিধে হয়েছে এমন নয়। ক্লাস ফাইভের বইপত্র কিনে রোহিণী তাকে বাড়িতেই পড়াচ্ছিল। হাজার সমস্যাতেও তিন্নির পড়াশোনার ওপর কড়া নজর ছিল তার। সেজন্য স্কুলে একটু দেরিতে ভরতি হলেও সময়মতো সিলেবাস শেষ করতে একটুও অসুবিধে হয়নি তার।

স্কুলের দিদিরা তো আছেনই, তাদের সঙ্গে সঙ্গে তিন্নির তিন বন্ধু, মানে পরি, বিতু আর সুমতি প্রত্যেকেই খুব স্টুডিয়াস মেয়ে। এক বন্ধু যদি কোনও এক সাবজেক্টে একটু পিছিয়ে যায়, তাহলে বাকিরা তাকে হাত ধরে টেনে আনে ওপরে। এই যেমন আমাদের তিন্নি ইতিহাসে একটু কাঁচা। বিতু আর সুমতি বার বার প্রশ্ন করে ওকে ঐতিহাসিক ঘটনাগুলো মনে রাখতে সাহায্য করে। সুমতি অন্যসব সাবজেক্টে ভালো, কিন্তু ইংরিজি শব্দগুলো ঠিকমতো উচ্চারণ করতে তার অসুবিধে হয়। সে Put-কে বলত পাট, Nature-কে বলত নাটুরে। তিন্নি তাকে এখন সঠিকভাবে ইংরেজি শব্দের উচ্চারণ শেখাচ্ছে। আবার দেখো, বিতু অঙ্ক করতে গেলেই সব গুলিয়ে ফেলে। অঙ্কের স্টেপগুলো ভেঙে ভেঙে তাকে বোঝায় অন্য দুজন।

ক্লাসের মধ্যে ওদের তিনজনের গ্রুপটাকে দেখলে অন্য মেয়েদের একটু হিংসেও হত, আবার কেউ কেউ ওদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করার জন্য ছোটোখাটো জিনিস উপহার দেওয়ারও চেষ্টা করত। রূপসা এই দুই দলেই পড়ে। ওদের তিনজনকে একসঙ্গে মজা করতে দেখলে হিংসায় বুক জ্বলে যায় তার। অথচ ভেতরে ভেতরে রূপসার ভারি ইচ্ছে ওদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করার।

সুমতিকে দু-একবার ভালো টিফিনের লোভ দেখিয়ে বন্ধুত্ব করার চেষ্টা করেছে সে, কিন্তু তাতে লাভ হয়নি। সুমতি মিষ্টি হেসে বলেছে তার খিদে পায়নি। উলটে ক্লাসের অন্য দুটি হেংলু মেয়ে এসে তার চিকেন পাস্তা অর্ধেক খেয়ে ফেলেছিল।

তিন্নিকে সে একদিন বলেছিল, “তোমার চুলগুলো এত সুন্দর, রিবন দিয়ে বো বাঁধো না কেন? আমার কাছে অনেক রিবন আছে, তুমি নেবে?”

তিন্নি বলেছিল, “আমার কাছে রাবার ব্যান্ড আছে। রিবন দিয়ে বো বাঁধতে অনেক সময় নষ্ট হয়। বাট থ্যাংক ইউ।”

বেচারি রূপসা। শিশুমনের সহজাত সারল্যে সে ভালো ও মন্দের পার্থক্য বোঝে এবং তিন্নি, বিতু আর সুমতির মতো ভালো বন্ধু পাওয়া যে মস্ত বড়ো সৌভাগ্য, তাও তার অজানা নয়। অথচ কী মুশকিল—ভালোকে যে ভালো দিয়েই কাছে টানতে হয়, এ-ব্যাপারটা তাকে কেউ কখনও শিখিয়ে দেয়নি। সে সুস্বাদু খাবার আর উপহারের লোভ দেখিয়ে বন্ধু হওয়ার চেষ্টা করে, কিন্তু ওই তিনজনের ছোট্ট জীবন তো হাসি-মজা-আনন্দে কানায় কানায় ভরা। ওদের বন্ধুত্বে তাই লোভের দত্যি দাঁত ফোটাতে পারে না।

রূপসা যদি সরাসরি ওদের গিয়ে বলত যে তোমাদের আমি ভীষণ ভালোবাসি, আমার বন্ধু হবে? তাহলে হয়তো ওরা খুশি হয়েই ওদের দলে ডেকে নিত ওকে। কিন্তু ভালোবাসা সে পায়নি কখনও, তাই ‘ভালোবাসি’ বলতেও শেখেনি।

বাড়িতে মা-বাবা দুজনের কেউই রূপসাকে কখনও সময় দেন না। মার কোলে চড়তে গেলে মা বলেন, ‘বেবি, ডোন্ট বি ক্লিঙ্গি! বিহেভ প্রপারলি। তুমি এখন বড়ো হয়ে গেছ।’ বাবার সঙ্গে তো তার দেখাই হয় না। বাবা যখন অফিস থেকে বাড়িতে ঢোকে রূপসা ততক্ষণে ঘুমিয়ে কাদা। অবশ্য মা-বাবা তাকে অনেক খেলনা, জামা, জুতো কিনে দিয়েছেন। প্রতিবার জন্মদিনে দাদু তাকে সোনার দুল গড়িয়ে দেন। তাদের কুক প্রতিদিন তার জন্য সুন্দর সুন্দর টিফিন বানিয়ে দেয়। সে বিউটি পার্লার থেকে চুল কাটায়। মা তাকে লিপস্টিক, পাউডার মাখিয়ে পরির মতো সাজিয়ে রাখেন সবসময়। সে জানে ভালোবাসা মানেই রঙচঙে দামি উপহার। ঝকঝকে জামা-জুতো। ওদিকে বিতু, তিন্নি আর সুমতির কাছে সে-সবের কিছুই নেই, তবুও কী যেন একটা গুপ্তধনের হদিস জানে ওরা তিনজন। রূপসা লোভীর মতো তাকিয়ে থাকে ওদের দিকে। অথচ কিছুতেই বুঝতে পারে না যে গুপ্তধনটা কী বা কোথায় রাখা আছে। শিশুমনের হিংসে একসময় হতাশার রূপ নেয়। একা-একাই মিছিমিছি তখন ওদের ওপর রাগ করে মুখ ফুলিয়ে বসে থাকে সে।

গত কয়েকখানা উইকলি টেস্টের রেজাল্টও খুব খারাপ হয়েছে রূপসার। অনেক মেয়েরা ওর নামে কমপ্লেন করেছে। কারও ইউনিফর্মের ব্লাউজে স্কেচ-পেন দিয়ে ‘মাংকি’ লিখে দিয়েছে ও, আবার ইচ্ছে করে কারও শখের পেনসিল ভেঙে দিয়েছে। দিন চারেক আগে মাম্পুর চুলে চেবানো বাবল গাম আটকে দিয়েছিল দুষ্টুমি করে। মাম্পু বেচারি প্রথমে বুঝতেই পারেনি। কিছুক্ষণ পর অন্য মেয়েদের কথা শুনে আনাড়ি হাতে টানাটানি করতে গিয়ে বিচ্ছিরিভাবে বাবল গামটা চুলে জড়িয়ে যায়। মাম্পু তখন কাঁদতে কাঁদতে শ্রাবণীদির কাছে গিয়ে কমপ্লেন করে। শ্রাবণীদি তার চুলের অবস্থা দেখে বুঝলেন যে ডানদিকের ঝুটি কেটে ফেলা ছাড়া অন্য কোনও উপায় নেই। আর ডানদিকের ঝুটি কাটলে যে বাঁদিকেরটাও কাটতে হবে এ-কথা সবাই জানে। শেষ পর্যন্ত সরলাদি কাঁচি দিয়ে তার চুলগুলো সমান করে কেটে দেয়। অমনভাবে চুল কাটার পর মাম্পুকে দেখাচ্ছিল ঠিক নাক চ্যাপ্টা চিনে পুতুলের মতো। সে-সব নিয়ে স্কুলের মেয়েরা হাসাহাসি করায় মাম্পুর কান্না আরোই বেড়ে যায়। পরে শ্রাবণীদি তার মাকে ডেকে পাঠায়। মাম্পু তখন মার হাত ধরে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিরে যায়।

পুঁচকেদের কাণ্ডকারখানা দেখে হাসি পেলেও শ্রাবণীদি রূপসাকে নিয়ে যথেষ্ট চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন। ছোটোরা একটু-আধটু দুষ্টুমি করলে সেটা নরমাল। তবে ক্রমাগত অন্যকে মানসিক কষ্ট দেওয়ার এমন ব্যবহার স্বাভাবিক কিছুতেই নয়। বিশেষত মাম্পু রূপসার একমাত্র বন্ধু। সেই বন্ধুকেই কষ্ট দিয়ে বড়োদের কাছ থেকে অ্যাটেনশন দাবি করার অর্থ হল ডেসপারেট ক্রাই ফর হেল্প। এখানে রূপসাকে বকুনি বা শাস্তি দিয়ে তেমন লাভ হবে না। বড়দির অনুমতি নিয়ে শ্রাবণীদি রূপসার পেরেন্টস কল করল। ব্যাপারটা তার বাড়ির লোককে না জানালেই নয়।

পরের দিন টিফিনের সময় রূপসার মা নিজেই গাড়ি চালিয়ে স্কুলে এলেন। রায়চৌধুরী বাড়ির পুত্রবধূ শর্মিলি রায়চৌধুরী স্কুলে পা রাখতেই রীতিমতো হইচই পড়ে গেল। রূপসার মা সত্যিই অপরূপ সুন্দর। ঝকঝকে সবুজ রঙের শাড়ি পরেছেন। রূপসার মতোই ফর্সা গায়ের রঙ। রঙ করা হালকা লালচে চুল। সুন্দর করে আঁকা ভুরু, আই-লাইনার দিয়ে আঁকা চোখ। গোলাপ ফুলের মতো রাঙানো ঠোঁট। তাঁর গায়ে কী সুন্দর ফুরফুরে পারফিউমের গন্ধ! স্কুলের মেয়েরা হাঁ করে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইল।

শর্মিলি এসেই প্রভাবতীর অফিসে গেলেন। প্রভাবতী ভেবেছিলেন শর্মিলি হয়তো মেয়ের ব্যবহারের জন্য ক্ষমা চাইবেন। অবাক কাণ্ড, রূপসার মা চেয়ারে বসেই বললেন, “আপনার সঙ্গে দেখা হয়ে ভালোই হল মিস গাঙ্গুলী। ইন ফ্যাক্ট আমি আগেই দেখা করব ভেবেছিলাম, কিন্তু কাজের চাপে সম্ভব হয়ে ওঠেনি।”

প্রভাবতী বললেন, “নমস্কার মিসেস রয়চৌধুরী। আপনি নিশ্চয়ই রূপসার পড়াশোনা নিয়ে চিন্তিত, তাই তো?”

শর্মিলি চোখ নীচু করে নীচের ঠোঁটখানা কামড়ে হাসলেন, “প্লিজ কল মি শর্মিলি। মিসেস রয়চৌধুরী শুনলে নিজেকে বড়ো বেশি বয়স্ক মনে হয়। হ্যাঁ, পড়াশোনা অফ-কোর্স, তবে আমি রূপসার ওভার-অল বেড়ে ওঠা নিয়ে বেশি কনসার্নড। ক্ষমা করবেন, বাট আই ডোন্ট থিংক দিস ইজ দি রাইট স্কুল ফর হার।”

প্রভাবতী অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন তাঁর দিকে। শর্মিলি অত্যন্ত আকর্ষণীয়া, তাতে কোনও সন্দেহ নেই, কিন্তু তাঁর ব্যবহারে বা কথায় বলার ধরনে এমন কিছু ছিল যে প্রভাবতীর মতো অভিজ্ঞ শিক্ষাবিদও বড়ো অস্বস্তি বোধ করছিলেন। সবচাইতে বড়ো হল রূপসার অভিভাবকদের তরফ থেকে যে স্কুলের ব্যাপারে কোনও অভিযোগ থাকতে পারে, এমন সম্ভবনা তাঁর মাথাতেও আসেনি।

প্রভাবতী অবাক হয়ে বললেন, “বেগ ইয়োর পার্ডন!”

শর্মিলি হেসে বললেন, “না বোঝার মতো কিছু তো বলিনি। এই স্কুলে রূপসার পড়াশোনা বা গ্রুমিং কোনোটাই ঠিকমতো হচ্ছে না। দেখুন কিছু মনে করবেন না, আমি আপনাদের দোষ দিচ্ছি না। মফস্‌সলের ছোটো স্কুল, আপনাদের কাছে এর থেকে বেশি কিছু আশাও করা যায় না। আই আন্ডারস্ট্যান্ড দ্যাট। বাট ইটস নট ইনাফ।”

প্রভাবতী অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলেন শর্মিলির দিকে। শর্মিলির অভিযোগ তিনি নিজের কানে শুনেছেন, তাই তাঁর কথার অর্থ অন্য কিছু হতে পারে, এমন হওয়া সম্ভব নয়। রূপসার পড়াশোনা এবং ব্যবহার নিয়ে বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরেই তিনি একের পর এক অভিযোগ পেয়েছেন। তার অভিভাবক হিসেবে শর্মিলিকে তিনি দেখা করতে বলেছিলেন যাতে রূপসার সমস্যাগুলো আলোচনা করা যায়। অথচ শর্মিলি সে-সবের ধারেকাছেও গেলেন না। উলটে তিনি নির্দ্বিধায় স্কুলের সমালোচনা করছেন। প্রভাবতী এমন কথোপকথনের জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিলেন না।

প্রভাবতী কয়েক সেকেন্ড চুপ করে বসে রইলেন। তারপর একটু ধাতস্থ হয়ে বললেন, “শর্মিলি, আপনি চা বা কফি কিছু খাবেন?”

শর্মিলি খুব শব্দ করে হেসে উঠলেন, “প্লিজ ফরগিভ মি মিস গাঙ্গুলি, আই মাস্ট সে নো। এখানকার ইনস্ট্যান্ট কফি আর কনস্ট্যান্ট সস্তার চা—দুটোর কোনোটাই আমার মুখে রুচবে না। আপনাদের কাছে অরেঞ্জ পিকো থাকলে অবশ্য অন্য ব্যাপার।”

চোয়াল দুটো শক্ত করলেন প্রভাবতী। বেচারি রূপসা! ওই ছোট্ট মেয়েটার চাইতে অনেক বেশি শিক্ষার প্রয়োজন তার মায়ের। কিন্তু সবকথা তো ওভাবে খোলাখুলি বলা যায় না। সামাজিক সৌজন্যতায় বাধে। তিনি হেসে বললেন, “একদম ঠিক বলেছেন আপনি শর্মিলি। সারদাদেবী বালিকা বিদ্যালয় মফস্‌সলের ছোট্ট স্কুল। আমাদের যেটুকু রিসোর্স আছে, মেয়েদের শিক্ষা এবং শিক্ষিকাদের বেতনের পেছনেই ব্যয় হয়ে যায়। তাই আপনাকে অরেঞ্জ পিকো চা খাওয়ানোর ক্ষমতা আমাদের নেই। তাই এবার কাজের কথায় আসা যাক। রূপসার রিসেন্ট বিহেভিয়ার কি আপনি লক্ষ করে দেখেছেন?”

শর্মিলি খুব টেনে টেনে হাসতে শুরু করলেন, “রূপসা ইজ মাই ডটার মিস গাঙ্গুলী। ওর পড়াশোনা আর বিহেভিয়ার সবকিছুই খুব ভালোভাবে অবজার্ভ করি আমি। ইজ দেয়ার এ প্রবলেম?”

প্রশ্ন শুনে প্রভাবতী বাক্যহারা হয়ে গেলেন। রূপসার দুষ্টুমির কথা হয়তো তার বাড়ির লোকজন নাও জানতে পারেন, কিন্তু গত চারটি সাপ্তাহিক পরীক্ষার রেজাল্টের কথাও তারা জানেন না এ কী করে সম্ভব? তিনি একটু ভেবে বললেন, “রূপসার লাস্ট উইকলি এগজামগুলোর রেজাল্টস আপনি দেখেছেন শর্মিলি?”

“হ্যাঁ দেখেছি, কিন্তু ওগুলো তো জাস্ট উইকলি এগজামস। ওগুলো নিয়ে অত চিন্তা করার কিছু আছে বলে মনে হয় না। তাছাড়া আমি রূপসার ওভার-অল গ্রুমিং নিয়ে বেশি চিন্তিত।”

প্রভাবতী নিজের চশমাখানা চোখ থেকে খুলে টেবিলের ওপর রাখলেন। তারপর নিজের বিস্ময় এবং বিরক্তি দুটোই সাধ্যমতো লুকিয়ে রেখে বললেন, “ক্ষমা করবেন মিসেস রয়চৌধুরী, আই মিন শর্মিলি। এই বয়সে ওর পড়াশোনার চাইতে বেশি গুরপত্বপূর্ণ আর কী হতে পারে? রূপসার ওভার-অল গ্রুমিং বলতে আপনি ঠিক কী বোঝাতে চাইছেন তা একটু খুলে বলবেন প্লিজ?”

শর্মিলি নিজের আঁচলের প্লিটগুলো ঠিক করতে করতে বললেন, “আপনি কখনও হাই সোসাইটিতে ওঠাবসা করেননি তো, তাই এসব ব্যাপার আপনাকে বলে বোঝানো মুশকিল। বাইরে খেলতে থাকা বাচ্চাগুলোকে দেখুন একবার।”

প্রভাবতী তাঁর অফিসের দরজা দিয়ে বাইরের মাঠে খেলতে থাকা বাচ্চা মেয়েগুলির দিকে তাকালেন। নিজের অজান্তেই একচিলতে হাসি ফুটে উঠল তাঁর মুখে। তাঁর নিজের সন্তান নেই, কিন্তু স্বামী, সংসার বা সন্তানের অভাব কখনোই বোধ করেননি তিনি। সারদাদেবী বিদ্যালয়ের প্রতিটি ছাত্রীই তাঁর সন্তানসমা। কচি কচি মুখগুলির দিকে তাকিয়ে তাদের মধ্যে দিয়ে প্রত্যেকদিন অসংখ্যবার নিজের শৈশব উপভোগ করেন তিনি। বাচ্চাদের তিনি যেমন পড়াশোনা আর ডিসিপ্লিন শেখান, ঠিক তেমনি তাদের শেখান বন্ধুত্বের মূল্য। বিপদের সময় তারা যাতে একে অপরের হাত ধরে দাঁড়াতে জানে, বন্ধুর আনন্দে তারা যেন গলা জড়িয়ে ধরে একসঙ্গে নাচতে জানে।

শর্মিলি কথা বলেই চলেছেন, “বাচ্চাগুলোর দিকে একবার তাকিয়ে দেখুন মিস গাঙ্গুলী। হাতে-মুখে নোংরা কাদামাটি লাগিয়ে ছুটোছুটি করছে। চুলগুলো উসকোখুসকো, ইউনিফর্মে ঘামের দাগ। জুতোয় শুকনো কাদা। মেয়ে না মাংকি বোঝা মুশকিল। কোনও আদবকায়দা-ম্যানার্স ওরা কখনও শিখেছে বলে মনেও হয় না। ইউ সি, হোয়াট আই মিন! হাই সোসাইটিতে মিশতে গেলে এসব কী করে চলবে! আমি চাই আমার মেয়ে বড়ো হয়ে একজন সুপার মডেল হোক। লাইক নাওমি ক্যাম্পবেল, বিপাশা বাসু। সেক্ষেত্রে ওর বেড়ে ওঠার দিকে মা হিসেবে আমাকে কড়া নজর রাখতে হবে বইকি। আই হোপ ইউ আন্ডারস্ট্যান্ড।”

uponyassaradadevi (4)

প্রভাবতীর মুখ থেকে বিরক্তি মুছে গিয়েছিল অনেক আগেই। তিনি গর্বের সঙ্গে মাঠে খেলতে থাকা প্রজাপতির মতো ছোট্টো মেয়েগুলির দিকে তাকিয়ে ছিলেন। তাঁর চোখে রূপকথার রাজকন্যা তারা সবাই। মেয়েগুলি ছুটছে, খেলছে, ডিগবাজি খাচ্ছে, তিড়িং-বিড়িং লাফাচ্ছে ঘাসের ওপর। বন্ধু খেলতে গিয়ে পড়ে গেলে হাত ধরে টেনে তুলছে অন্য সবাই মিলে। মুখে হাতে ধুলো-মাটি-কাদা লেগেছে—তাতে কী! শিশুর মুখে লেগে থাকা মাটির মতো সুন্দর আর কিছু আছে নাকি? এখন তো ওদের ছুটোছুটি করারই বয়স। খেলবে, ছুটবে, মাটিতে পড়ে হাঁটু ছড়ে যাবে, আবার উঠে দাঁড়াবে, এসব কি কম বড়ো শিক্ষা! কিন্তু যে মানুষ নিজে মা হয়েও ছোটোদের খেলাধুলোর মধ্যে সৌন্দর্য দেখতে পায় না, তাকে কীভাবে বোঝাবেন তিনি এসব?

প্রভাবতী নিজেকে গুছিয়ে নিলেন। শাড়ির আঁচলে চশমার কাঁচখানা মুছে চশমাটা চোখে পরলেন আবার। তারপর স্থির চোখে তাকালেন রূপসার মায়ের দিকে, “শর্মিলি, আপনাকে জানানো আমার কর্তব্য যে মডেলিং শেখার জন্য সম্পূর্ণ পৃথক প্রফেশনাল স্কুল রয়েছে। ইন ফ্যাক্ট শুধু মডেলিং কেন, পৃথিবীর প্রত্যেকটি প্রফেশনাল কোর্সের জন্যই ডেডিকেটেড স্কুল রয়েছে। তবে ভবিষ্যতে যে-কোনো প্রফেশনেই সফল হওয়ার জন্য প্রাথমিক শিক্ষার ভিতখানা শক্ত করে গড়ে তোলা ভীষণ দরকারি। আমাদের স্কুলে আমরা সেই ফাউন্ডেশনটাই গড়ে দিই। বিপাশা বসু, নাওমি ক্যাম্পবেল, শ্যারন স্টোন—কেউই তাঁদের শৈশবে মডেলিং করতে শুরু করেছিলেন বলে আমার অন্তত জানা নেই। আর সত্যি কথা বলতে কী, বাচ্চাদের মুখে মেক-আপের চাইতে লেগে থাকা মাটি আমার অনেক বেশি পছন্দের। ধুলো-মাটি পরিবেশের স্বাভাবিক অংশ। বাচ্চাদের সে-সব ঘৃণা করতে আমরা শেখাই না।”

শর্মিলি খানিকটা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে ছিলেন। তিনি এভাবে কাউন্টার অ্যাটাক আশা করেননি। অথচ প্রভাবতী একখানা খারাপ শব্দও ব্যবহার করেননি। স্কুলের ফাউন্ডিং ফ্যামিলি মেম্বার হিসেবে তিনি আশা করেছিলেন প্রভাবতী হয়তো রূপসাকে রাখার জন্য কাকুতি-মিনতি করবেন, কিন্তু ঘটনাচক্রে ব্যাপারখানা হয়ে গেল উলটো।

শর্মিলি খানিকটা মরীয়াভাবে বললেন, “তা সে যাই বলুন আপনি, আমার মেয়েকে আমি অন্য স্কুলে দেব। আমার ইচ্ছে।”

প্রভাবতী এবার তাঁর টেবিলের ডানদিক থেকে একটি ফাইল টেনে নিয়ে খুলে বসলেন, “মিসেস রয়চৌধুরী, রূপসা আপনার মেয়ে। তার ব্যাপারে আপনার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। আপনি ওকে নিয়ে বাড়ি ফিরে যান। আগামী সোমবার এসে ওর ট্রান্সফার সার্টিফিকেট নিয়ে যাবেন। মডেল নয়, মফস্‌সলের এই ছেট্ট স্কুলটাতে আমরা মানুষ গড়ি। ধন্যবাদ।”

বিপদে আমি না যেন করি ভয়

হাসপাতালে রিসেপশন ডেস্কের পাশে একটা প্লাস্টিকের চেয়ারে একা একা খুব গম্ভীর মুখে বসে ছিল তিন্নি। মুখখানা ঘামে ভিজে গেছে। চুলটুল এলোমেলো, উসকোখুসকো। জামার বেল্ট খোলা। চেয়ারে বসে অল্প অল্প হাঁপাচ্ছিল সে।

জিনিয়াদি ওকে পইপই করে বলে গেছে যে ও যেন চুপচাপ ওখানে বসে থাকে। কারও সঙ্গে কোনও কথা না বলে। কোত্থাও চলে না যায়। মধুমামা অবশ্য জিনিয়াদিকে বলেছিল, “ভাগ্নিরে নিয়া আমাদের চিন্তা করতে লাগবে না বুনু। দেখলা না, ওই ভাগ্নির বুদ্ধিতেই আজ শেষ রক্ষা হল।”

কোথা থেকে যে কী হয়ে গেল! বেচারা শিউলি। কী কষ্টটাই না পাচ্ছে! ভীষণ চিন্তা হচ্ছিল তিন্নির। হাফ ইয়ার্লি পরীক্ষা চলছে, আর এখনই এমন হল। শিউলি সোমবার পরীক্ষা দিতে পারবে কি না কে জানে। পায়ের ভেতর একটা পেরেক পুরোটা ঢুকে গেলে যে কী ভয়ানক ব্যথা হতে পারে তা সে চিন্তাও করতে পারবে না। সেদিন ওর জুতোর মধ্যে একটা নুড়ি ঢুকে গেছিল। তাতেই কত ব্যথা পেয়েছিল তিন্নি। আর এখানে তো পুরো পেরেক! আহা রে, বেচারা শিউলি। কী কষ্টটাই না পাচ্ছে।

অথচ আজকের বিকেলটা কী সুন্দর ছিল। বাংলা আর ইংরেজি পরীক্ষা দুটোই বেশ ভালোভাবেই শেষ হল। তারপর মধ্যিখানে শনি আর রবিবার ছুটি ছিল। দিব্যি ফুরফুরে মেজাজে হোস্টেলে ফিরেছিল তিন্নি। বিতুর একটু মনখারাপ ছিল। বেচারি কয়েকটা বানান ভুল করেছে। আর পরি সোমবারের অঙ্ক পরীক্ষার প্রিপারেশন নিয়ে ব্যস্ত ছিল।

তিন্নির একটু ইচ্ছে করছিল বাগানে একটু খেলতে যায়। তাছাড়া গত মাসে ও দুটো হলুদ গাছের কন্দ লাগিয়ে ছিল বাগানে। সেই হলুদের চারাগাছগুলো ঠিকঠাক বড়ো হচ্ছে কি না সেটাও দেখতে হবে। ওদিকে দুই বন্ধুর অবস্থা দেখে ওর মনে হল যে ওদের বিরক্ত না করাটাই ভালো। এমন সময় পাশের রুমের শিউলি এসে বলল, “তিন্নি, বিতু, বাইরে খেলতে যাবি?”

তিন্নি তো সে-কথা শুনে অমনি এক পায়ে খাড়া। বিতু বিছানায় চাদর চাপা দিয়ে শুয়ে ছিল। সে মাথা নাড়িয়ে বলল, “তোরা যা, আমার ভালো লাগছে না।”

পরি অঙ্ক কষছিল। ও শুধু দু-পাশে মাথা নাড়াল।

শিউলি বলল, “ঠিক আছে তিন্নি। চল তাহলে শুধু তুই আর আমিই যাই। বেশিক্ষণ থাকব না কিন্তু। রুমে ফিরে পড়তে বসতে হবে।”

তিন্নি পায়ে চটিজোড়া গলিয়ে বলল, “সে আর বলতে। সোমবার অঙ্ক আর বৃহস্পতিবার ইতিহাস—এই দুটো মিটলে তবে শান্তি।”

মাঠে গিয়ে কিছুক্ষণ কিৎ-কিৎ খেলার পর দুজনে গেল বাগানে হলুদ গাছ দেখতে। ঠিক তক্ষুনি হল দুর্ঘটনাটা। কেন যে বাগানের গেটে চড়তে গেল শিউলি! পলকা কাঠের গেট। শিউলি তাতে চড়ে বলল, “তিন্নি, আমাকে ধাক্কা দে না রে।”

তিন্নি কিন্তু কিন্তু করেও দু-বার ধাক্কা দিয়েছিল। গেটটা মাটি থেকে আধহাত ওপরে শেষ হয়েছে। তিন্নি ধাক্কা দিতেই শিউলি সমেত ওটা বাগানের বেড়ার এ-পাশ থেকে ও-পাশে ঘুরে গেল। খুব মজা পেয়েছিল শিউলি। তৃতীয়বার ধাক্কা দিতেই গেটের নীচের অংশটা ভেঙে শিউলি পড়ল মাটিতে, আর তারপরেই ওর পরিত্রাহী চিৎকার।

তিন্নি প্রথমে বুঝতে পারেনি যে শিউলি এত জোরে চেঁচিয়ে উঠল কেন। ভেবেছিল ও বোধহয় দুষ্টুমি করছে। কিন্তু তারপর শিউলির পায়ের দিকে তাকাতেই ওর গায়ের রক্ত জল হয়ে গেল। ভাঙা কাঠের টুকরো থেকে একটা পেরেক বেরিয়ে আছে। শিউলির পা পড়েছিল ওখানেই। রবারের চটি ফুঁড়ে পেরেকখানা ওর পায়ে এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে ঢুকে গেছে। গলগল করে জলের মতো রক্ত বেরোচ্ছে ক্ষতস্থান থেকে।

বোকার মতো কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে রইল তিন্নি। অত রক্ত দেখে ওর মাথা কাজ করছিল না। তারপরেই মনে পড়ল যে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকলে চলবে না। তিন্নি খুব তাড়াতাড়ি ভাবছিল । হোস্টেল থেকে বড়োদের কাউকে ডেকে আনতে হবে। নইলে বিপদ। সরলাদি একটু আগে বাজারে গেছে। ফিরতে অন্তত আরও আধঘণ্টা লাগবে। তাহলে উপায়? তক্ষুনি মনে হল জিনিয়াদিকে ডেকে আনতে হবে। জিনিয়াদি ভীষণ বুদ্ধিমতী। দিদি নিশ্চয়ই জানে কী করতে হবে। শিউলির হাতখানা ধরে ওকে সাবধানে নীচে বসিয়ে তিন্নি বলল, “ভয় পাস না শিউলি। তুই চুপ করে বসে থাক। আমি হোস্টেল থেকে জিনিয়াদিকে ডেকে আনছি। এই যাব আর এই আসব। ভয় পাস না। শক্ত হয়ে বসে থাক।”

ভাগ্য ভালো বলতে হবে যে জিনিয়াদিকে বেশি খুঁজতে হয়নি। দিদি রান্নাঘরের দিকে যাচ্ছিল। তিন্নিকে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসতে দেখে নিজেই জিজ্ঞেস করল, “তিন্নি, এত জোরে ছোটাছুটি করছিস কেন? কী হয়েছে?”

তিন্নি হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “বাগানে… শিউলি… পায়ে পেরেক… রক্ত…”

জিনিয়া অমনি ছুটল বাগানের দিকে। কী সর্বনাশ হয়েছে কে জানে! সরলাদি দু-মিনিটের জন্য হোস্টেলের বাইরে পা রেখেছে, এরই মধ্যে এমন দুর্ঘটনা। মিসরাও সবাই বাড়ি চলে গেছেন। ইমিডিয়েটলি কোনও সাহায্য পাওয়ার উপায় নেই।

বাগানের সামনে এসে ওরা দেখল শিউলি ভেজা কাগজের মতো নেতিয়ে পড়েছে ততক্ষণে। ভয়ে-যন্ত্রণায় মুখখানা নীল হয়ে গেছে বেচারার। পায়ে কাঠের টুকরোটা তখনও আটকে আছে। রক্ত বন্ধ হয়নি।

শিউলির অবস্থা দেখে জিনিয়াও হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল। পরক্ষণেই শিউলিকে ধরে নিজের কোলে বসিয়ে সে বলল, “তিন্নি, ভয় পাস না। মাথা ঠান্ডা রাখ। যা বলছি মন দিয়ে শোন। বড়দির অফিসের বাইরে ডানদিকের দেওয়ালে ফার্স্ট-এইড বক্স আছে। তাড়াতাড়ি বক্সটা সঙ্গে নিয়ে আয়। আর পাশের ট্যাপ থেকে একটা গ্লাসে জল আন। গ্লাস ট্যাপের পাশেই পাবি।”

তিন্নি ছুটল আবার বড়দির অফিসের দিকে। জল আর ফার্স্ট-এইড বক্সটা আনার পর জিনিয়াদি বলল, “এবার এদিকে আয়। শিউলিকে শক্ত করে ধর। ওর পা থেকে পেরেকটাকে সরাতে হবে। না হলে রক্ত বন্ধ হবে না।”

জিনিয়াদির কথামতো তিন্নি শিউলিকে শক্ত করে ধরে বসে রইল। জিনিয়াদি সাবধানে কাঠের টুকরোটা ধরে ক্ষতস্থান থেকে পেরেকটাকে বের করে আনল। তারপর ফার্স্ট-এইড বাক্স থেকে তুলো আর ডেটল বের করে ক্ষতটাকে মুছতে মুছতে বলল, “ওর মুখে একটু জলের ছিটে দে তিন্নি। একটু জল খাওয়া ওকে। আমি ব্যান্ডেজটা বেঁধে ওকে ধরছি। তুই হোস্টেলে যা আর একবার। রুম টেনের শর্বরীকে গিয়ে বল বড়ো রাস্তা থেকে তাড়াতাড়ি একটা রিকশা ডেকে আনতে। আর কাউকে কিছু বলিস না। নইলে পরীক্ষার সময় মিছিমিছি গণ্ডগোল বাড়বে। শিউলিকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। তাড়াতাড়ি যা। কুইক।”

মুখে জলের ছিটে দিতেই ছটফটিয়ে উঠল শিউলি। তারপর ওকে জল খাইয়ে জিনিয়াদির কাছে রেখে তিন্নি হোস্টেলে ছুটল আবার। তবে এবার কপাল মন্দ ছিল ওর। দশ নম্বর রুমে শর্বরীদি ছিল না। ওর রুমমেট ঝরনাদিও বলতে পারল না শর্বরীদি কোথায় আছে। হয়তো বাথরুমে, না হলে ছাদেও যেতে পারে। তিন্নি খুব তাড়াতাড়ি ভাবল যে এখন ওর কী করা উচিত। শর্বরীদিকে খুঁজতে গেলে দেরি হয়ে যাবে। ঝরনাদিকে বলে লাভ নেই। দিদির এক পায়ে একটু সমস্যা আছে। অল্প খুঁড়িয়ে হাঁটে। তাই ঝরনাদির পক্ষে ছুটোছুটি করা সম্ভব নয়। তার বদলে ও নিজে গেলেই বরং ভালো হবে। রাস্তায় রিকশা পেলে ভালো, না হলে ও ছুটে সোজা রিকশা স্ট্যান্ডে চলে যাবে।

তিরের বেগে হোস্টেল থেকে বেরোল তিন্নি। তারপর স্কুলের রাস্তার ফুটপাথ ধরে ছুটতে শুরু করল। মিনিট দুয়েক ছুটতেই শোনে পেছন থেকে ডাক, “ও ভাগ্নি, কোথাও যাও? কী হইল? কও আমারে। খাড়াও, খাড়াও! ও ভাগ্নি…”

তিন্নি যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেল। এই সেই রিকশাওয়ালা ছেলেটা না? তিন্নি আর ওর মাকে স্কুলে নিয়ে এসেছিল অ্যাডমিশনের দিন। কী যেন নাম বলেছিল? হ্যাঁ, মনে পড়েছে। মধুসূদন, মধুসূদনমামা। মধুসূদনমামা খালি রিকশা নিয়ে রিকশা স্ট্যান্ডেই ফিরে যাচ্ছিল হয়তো। তিন্নির অবস্থা দেখে সে তাড়াতাড়ি রিকশা নিয়ে তিন্নির কাছে এল, “ও ভাগ্নি, কী হইছে? তুমি রাস্তায় একা একা দৌড়াও ক্যান? কোনও বিপদ হইছে নাকি?”

তিন্নি সংক্ষেপে ব্যাপারটা বলতেই মধুসূদনমামা ওকে রিকশায় উঠতে বলল। তার পরের সবকিছু এত তাড়াতাড়ি হয়ে গেল যে তিন্নির মনে হল পুরো ব্যাপারটাই যেন ভোজবাজি। মধুসূদনমামা শিউলিকে ওর আর জিনিয়াদির কোলে বসিয়ে ঝড়ের মতো রিকশা ছোটাল। পনেরো মিনিটের রাস্তা কী মন্ত্রে যে পাঁচ মিনিটে শেষ করল, তা শুধু মামাই জানে। তিন্নির মনে হচ্ছিল ওরা যেন পক্ষীরাজ ঘোড়ায় চড়েছে। মামার ঘামে ভেজা স্যান্ডো গেঞ্জির দু-পাশ থেকে বেরিয়ে আসা রোগা কালো পিঠ ফুঁড়ে বুঝি এই অ্যাত্তো বড়ো বড়ো দুটো ডানা বেরোবে এখনি।

হাসপাতালে পৌঁছে তিন্নিকে রিসেপশনে বসিয়ে রেখে মধুমামা শিউলিকে কোলে নিয়ে ছুটল ভেতরে। জিনিয়াদিও তিন্নিকে সাবধানে বসে থাকতে বলে ভেতরে চলে গেল।

মধুসূদন মামা এমনভাবে সবকিছু সামলাল যে দেখে মনে হল শিউলি তার নিজেরই বোন। প্রথমদিন যখন দেখা হয়েছিল সেদিন তিন্নি কত খারাপ কথা বলেছিল মামাকে। অথচ আজকে দেখ সেই মামার জন্যই তার বন্ধুর প্রাণ বাঁচল। মামার জায়গায় অন্য কেউ হলে নিশ্চয়ই ওদের হাসপাতালে নামিয়ে দিয়েই চলে যেত। ওদের কাছে তো ভাড়া দেওয়ার টাকাও ছিল না। অথচ মামা বলল ওসব নিয়ে ওরা যেন একদম চিন্তা না করে।

জিনিয়াদিও অবাক হয়ে গেছিল। অপরিচিত একটি মানুষ কেন তাদের এত সাহায্য করবে সেটা সেও বুঝতে পারছিল না। তবে ওইসময় মামা না এলে যে কী হত বলা মুশকিল।

বসে বসে সাতপাঁচ ভাবছিল তিন্নি। মিনিট পনেরো পরে হঠাৎ দেখে হাসপাতালে দরজায় সুমতি দাঁড়িয়ে আছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে তাড়াহুড়ো করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছে। পরনে একটা বাড়িতে সাধারণ পরার জামা। চুল উসকোখুসকো। তিন্নিকে দেখে সুমতি তাড়াতাড়ি ওর কাছে এসে বলল, “তিন্নি, আমার দাদাকে দেখেছিস?”

তিন্নি অবাক হয়ে বলল, “সুমি তুই! তুই এখানে কী করছিস?”

“আমাদের বাড়ি তো হাসপাতালের পাশেই। দাদা একটু আগে হাসপাতাল থেকে আমাদের পাশের বাড়ির মাসিমাকে ফোন করে বলল স্কুলে কারও বিপদ হয়েছে। বড়দির আসতে বোধহয় একটু সময় লাগবে। মাসিমা সে-কথা শুনে আমাকে কিছু টাকা দিয়ে বললেন এখানে এসে দাদার সঙ্গে দেখা করতে।”

ব্যাপারটা এতক্ষণে তিন্নির মাথায় ঢুকল। সুমতিই তাহলে মধুসূদন মামার বোন। হবেই তো। হতেই হবে। অমন দাদা নইলে কি আর এমন গুণী বোন হয়?

মিনিট দশেকের মধ্যেই সরলাদি আর বড়দিও এসে ঢুকলেন হাসপাতালে। জানা গেল যে তাঁদেরকেও মামা সময়মতো হাসপাতাল থেকে ফোন করে জানিয়ে দিয়েছে।

বড়োদি আর সরলাদি এসে সবার আগে তিন্নিকে আর জিনিয়াদিকে ডেকে বললেন, “ওয়েল ডান তিন্নি! ওয়েল ডান জিনিয়া! বিপদের মুখেও তোমরা যেভাবে সবকিছু সামলেছ তা সত্যিই প্রশংসার যোগ্য। তবে আর দেরি কোরো না। মধুসূদনের সঙ্গে এখনি হোস্টেলে ফিরে যাও। গিয়ে তাড়াতাড়ি পড়তে বসো। সরলা আজ রাত্রে এখানেই থাকবে। তার বদলে চিত্রামাসি হোস্টেলে তোমাদের দেখাশোনা করবেন। সুমতি, তুমিও দাদার সঙ্গে বাড়ি ফিরে যাও। আর দেরি কোরো না। সন্ধ্যা হতে চলল প্রায়।”

তারপর মধুসূদনমামার সঙ্গে ওরা তিনজন হোস্টেলে ফিরল। হোস্টেলে ফেরার পর জিনিয়াদি পাকা গিন্নির মতো জোর গলায় বলল, “মধুদাদা, সুমতি, তোমরা দুজন আজকের ডিনার হোস্টেল থেকেই খেয়ে যাবে। না বললে শুনব না কিছুতেই। সারা বিকেল আমাদের জন্য ছুটোছুটি করেছ, রান্না করার সময় পাওনি। তাছাড়া সুমতির পরীক্ষা চলছে। নষ্ট করার মতো সময় নেই একদম।”

তারপর চিত্রামাসিকে বলে দুজনকে তাড়াতাড়ি পেট ভরে ডাল-ভাত, রুই মাছ ভাজা আর ফুলকপির বড়া খাইয়ে তবে ছাড়ল ওদের। আবার পরদিন সকালে খাওয়ার জন্য জোর করে দুটো ডিম, কয়েক পিস পাঁউরুটি আর দুটো কলা প্লাস্টিকের থলেতে ভরে সুমতির হাতে দিয়ে দিল।

জিনিয়াদিকে সবাই এত ভালোবাসে কেন সেটা এতদিনে টের পেল তিন্নি। দিদি ঠিক বুঝতে পেরেছে যে জোর করে না খাইয়ে দিলে চিঁড়ে-মুড়ি খেয়েই ভাইবোনের রাত কাটবে। ওদের থেকে মাত্র কয়েক বছরের বড়ো, অথচ জিনিয়াদির মাথায় যেন দশজনের বুদ্ধি!

অঙ্ক আতঙ্ক

শনিবার ভোরবেলা আকাশ বেশ পরিষ্কার ছিল। তবে বেলা একটু বাড়তেই ঝিরঝিরে বৃষ্টি শুরু হল। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে শুরু হল বিতুর কান্না। কালো মেঘে ঢাকা আকাশের মতো বিতুরও মুখ গোমড়া।

বিতুর বাংলা পরীক্ষা বেশ ভালো হয়েছে। ইংরিজি পরীক্ষাতে একটু গণ্ডগোল হয়ে গেলেও মোটের ওপর মন্দ হয়নি। তবে সোমবার অঙ্ক পরীক্ষার কথা ভাবলেই রীতিমতো দাঁতকপাটি লেগে যাচ্ছে তার। ভয়ের চোটে শুক্রবার রাতটা তো সে পুরোপুরি জেগেই কাটিয়েছিল। বিছানায় শুয়ে এ-পাশ ও-পাশ করল সারারাত। তার ফলও পেল তেমনি হাতেনাতে। শনিবার সকালবেলা ব্রেকফাস্টের পরে যেই না অঙ্ক বই খুলে বসা, অমনি বিতুর চোখে নেমে এল যত রাজ্যের ঘুম।

তিন্নি অবাক হয়ে দেখছিল বিতুর কাণ্ডকারখানা। ও একবার ওকে জাগানোর চেষ্টা করেও দেখল, কিন্তু তাতে লাভ হল না তেমন কিছু। বিতু ঘুম ঘুম চোখে একবার এদিক ওদিক দেখল, তারপর টেবিলে রাখা অঙ্ক বইয়ের ওপরে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ল আবার।

তিন্নি অবাক হয়ে পরিকে বলল, “বিতুর কি শরীর খারাপ নাকি? সকালবেলায় ঘুমোচ্ছে কেন?”

পরি বলল, “কাল সারারাত ঘুমোয়নি তাই।”

“ওমা! কেন? শিউলির জন্য চিন্তা করছিল নাকি?”

“শিউলি নয়, অঙ্ক পরীক্ষা খারাপ হবে সেই চিন্তায় ঘুমোতে পারেনি। সারারাত শুধু ছটফট করেছে। তুই তো খুব টায়ার্ড হয়ে ঘুমোচ্ছিলিস, তাই টের পাসনি। আমি রাত্রিবেলায় একবার বাথরুমে যাওয়ার জন্য উঠে শুনি বিতু হাতজোড় করে কালী ঠাকুরের কাছে রসগোল্লা মানত করছে।”

“অঙ্ক পরীক্ষার জন্য?”

“তাছাড়া আর কী হবে?”

গতকাল দিনটা সত্যিই খুব বিচ্ছিরি ছিল। শিউলি বেচারা কত কষ্টই না পেয়েছে। ও এখন পরীক্ষা দেবে কীভাবে কে জানে। তারপরেই আবার তিন্নি ভাবল যে বড়দি তো সবকিছু জানেন, উনি নিশ্চয়ই কিছু একটা ব্যবস্থা করবেন।

ঘুমন্ত বিতুর দিকে তাকিয়ে তিন্নি একটু চিন্তিত গলায় বলল, “বিতুটা তো আচ্ছা বোকা! অঙ্ক পরীক্ষা খারাপ হবে এই ভয়ে যদি রাতে না ঘুমিয়ে সকালবেলা পড়ার সময় ঘুমায় তাহলে তো পরীক্ষা আরও বেশি খারাপ হবে।”

পরি সে-কথার কোনও উত্তর দিল না। দু-মিনিট পর ও বিতুর পাশে গিয়ে ওকে ধাক্কা দিয়ে ওঠাল, “বিতু, অ্যাই বিতু! ওঠ। বিছানায় শুয়ে ঘুমো। চেয়ারে বসে ঘুমোলে পিঠে ব্যথা হবে।”

পরির ধাক্কা খেয়ে বিতু হঠাৎ ধড়মড়িয়ে উঠল। তারপর নাকের নীচে নেমে আসা চশমাটাকে আঙুল দিয়ে ওপরে ঠেলে বিড়বিড়িয়ে বলতে শুরু করল, “সামন্তরিকের ভূমি ইনটু উচ্চতা ইজ ইকোয়াল টু ক্ষেত্রফল। সমকোণী ত্রিভুজ হলে দুই দিয়ে ভাগ করতে হবে…”

দু-মিনিট পরেই বিতু আবার ঢুলতে শুরু করল এবং মিনিট পাঁচেক পরে দেখা গেল যে সে দিব্যি চডু়ই পাখির মতো ফুডু়ৎ ফুডু়ৎ শব্দে নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছে।

তিন্নি বিতুকে ধরে সাবধানে ওর খাটে শুইয়ে দিল। পরি বিতুর চশমাটা খুলে ওর টেবিলে রাখল। তারপর বিতুর গায়ে একটা বেড কভার চাপা দিয়ে বলল, “শুইয়ে তো তুই দিলি, কিন্তু ঘুম থেকে ওঠার পর বিতু কিন্তু বড়ো চেঁচাবে।”

তিন্নি একটা লসাগুর অ্যানসার লিখতে লিখতে বলল, “চেঁচায় তো চেঁচাক। ওভাবে চেয়ারে বসে বসে ঢুলছিল। না ঘুম হচ্ছিল, না পড়া। এখন অ্যাটলিস্ট একটা কাজ ঠিক করে করছে। ঘুম থেকে উঠলে তারপরে না-হয় পড়বে।”

পরি অবাক হয়ে তিন্নির দিকে তাকিয়ে দেখল একবার। একরাতের মধ্যেই তিন্নি যেন অনেকটা বড়ো হয়ে গেছে। ও ওর টেবিলের ড্রয়ার থেকে ডালমুটের একটা খোলা প্যাকেট বের করে বলল, “তিন্নি ডালমুট খাবি?”

সাড়ে নয়টা পর্যন্ত একটানা অঙ্ক প্র্যাকটিস করল দু’জন। ন’টা পঁয়তাল্লিশ নাগাদ বিতুর ঘুম ভাঙল এবং পরির ভবিষ্যৎবাণীকে সত্যি প্রমাণ করে বিতু ঘুম ভাঙামাত্রই চেঁচামেচি জুড়ে দিল, “ইশ্, আমি পড়ে পড়ে ঘুমোচ্ছিলাম আর তোরা আমাকে একবার ডেকেও দিলি না। কী স্বার্থপর রে তোরা!”

ওরা দুজন যত বোঝায় যে বিতু পড়তে বসে ঘুমোচ্ছিল তাই ওরা ওকে ভালো করে শুইয়ে দিয়েছে, বিতু তত চেঁচায়। কিছুক্ষণ পর শুরু হল ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না আর তার সঙ্গে অভিযোগ—”আমি অঙ্কে ফেল করলে তোদের খুব মজা হবে, তাই না!”

পরি আর তিন্নি দুজনেই বিতুর কাণ্ডকারখানা দেখে অবাক। বিতু বড়ো শান্তশিষ্ট, নরম স্বভাবের মেয়ে। ওর এমন ব্যবহার তো আগে ওরা দেখেনি কখনও। বিতুর হলটা কী! সবসময় যদি ভয় পেয়ে সিঁটিয়ে বসে থাকে তাহলে অঙ্ক আর করবে কখন? উলটে ওদের দুজনের পড়াশোনাও নষ্ট হচ্ছে। অন্যদের কিছু বলাও যাবে না। সকালবেলা পড়ার সময় বিতু ঘুমেচ্ছিল জানতে পারলে সরলাদি হোস্টেলে কুরুক্ষেত্র বাধাবে।

মিনিট খানেক সসেমিরা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার পর পরি চোখের ইশারায় তিন্নিকে বলল, “চিন্তা করিস না, আমি দেখছি।”

তিন্নি হাল ছেড়ে দিয়ে নিজের অঙ্কখাতা খুলে বসল আবার। কাল সারাটা দিন ওর নষ্ট হয়েছে। শনি আর রবিবার—রিভিশন শেষ করার জন্য শুধু এই দুটো দিনই সময় রয়েছে ওর হাতে।

পরি চুপচাপ বসল বিতুর পাশে, “কাঁদছিস কেন বিতু?”

“কাঁদব না তো কী? আমি অঙ্ক পরীক্ষায় ফেল করব। কান্না পাবে না!”

“ফেল কেন করবি? মাথা ঠান্ডা রেখে পড়তে বস। এই দেখ আমি কীভাবে রিভিশন শেষ করছি।”

পরি নিজের টেবিল থেকে রাফ প্র্যাকটিসের খাতাটা নিয়ে এল সঙ্গে। বিতু হাতের উলটো পিঠে চোখ মুছে খাতার প্রথম পাতাটা খুলল।

পরি বলল, “ভয় পাস না। এখনও আমাদের পুরো দুটো দিন সময় আছে। অঙ্কের যে যে চ্যাপ্টারগুলো তুই খুব ভালোভাবে শিখেছিস সেগুলোকে খাতার একটা পেজে আগে লিখে ফেল। তারপর লেখ যেগুলো মোটামুটি বুঝেছিস, আর একদম শেষে লেখ যেগুলো একদম বুঝিসনি।”

বিতু কাঁচুমাচু মুখে বলল, “শুধু চ্যাপ্টারগুলোর নাম লিখে কী লাভ?”

পরি খুব কনফিডেন্টলি বলল, “আমার বাবা আমাকে এটা শিখিয়েছে। দেখ, রিভিশন দেওয়ারও নিয়ম আছে। অন্ধের মতো যদি সবকিছু একসঙ্গে হাতড়াতে থাকিস তাহলে তো কনফিউজড হবিই। তার চাইতে বরং আগে যে চ্যাপ্টারগুলো খুব ভালোভাবে পারবি সেগুলো রিভাইস করে নে। তারপর যেগুলো মোটামুটি পারবি সেগুলো। আর একদম শেষে যেগুলো একদম বুঝিসনি সেগুলো প্র্যাকটিস কর, বুঝলি?”

নিজের পড়ার টেবিলে বসে তিন্নিও পরির কথাগুলো বেশ মন দিয়ে শুনছিল। রিভিশনের ব্যাপারে সেও তেমন কোনও নিয়ম মেনে চলে না। হাফ ইয়ারলির সিলেবাসে যা যা ছিল, সেগুলো সবকিছুই সে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কষছিল। পরির কথা শুনে সে মাথা ঘুরিয়ে বলল, “আমার মনে হয় তুই উলটো বলছিস পরি। যেগুলো ভালোভাবে বুঝেছি সেগুলো প্রথমে কেন পড়ব? সেগুলো তো জানিই আমি। তার বদলে যেগুলো পারব না সেটাই আগে প্র্যাকটিস করা ভালো।”

পরি বলল, “বাবা বলে, রিভিশন দিতে বসে এখানেই আমরা সবচাইতে বড়ো ভুল করি।”

“মানে?”

“রিভিশন মানে হল ফিরে দেখা। পুরোনো যা কিছু শিখেছি তা আর একবার ঝালিয়ে নেওয়া। নতুন করে কিছু শেখার সময় এখন নেই। যেগুলো খুব ভালোভাবে শিখেছিস, সেগুলো খুব চটপট রিভাইস করে নেওয়া সম্ভব। একটা চ্যাপ্টার রিভিশন শেষ হলে দেখবি মাথাও হালকা হয়ে যায়। যে অংশটুকু খুব ভালো করে শিখেছি, অন্তত সেই অংশে আমরা যেন পুরো মার্কস পাই। এরপর পরের চ্যাপ্টারগুলোতে যাও। আগেরগুলো শেষ হয়ে গেছে বলে নিশ্চিন্তে এবার বাদ বাকি সবকিছু রিভাইস দাও।”

তিন্নি আর বিতু দুজনেই ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করছিল। পরি এবার আর একটু খুলে বলল, “যে চ্যাপ্টারটা বুঝিনি সেটার অ্যানসার দিতে গিয়ে যদি ভুল হয় তাহলে তাতে মনখারাপ কিছু নেই, কিন্তু যেটা বুঝিনি সেটার উত্তর ঠিক করতে গিয়ে যেটা ভালোভাবে বুঝেছিলাম সেটাও যদি ভুল করে বসি, তাহলে কেমন বিচ্ছিরি ব্যাপার হবে ভাব তো?”

তিন্নি আর বিতু দুজনেই এবার বুঝতে পারল ব্যাপারখানা। তিন্নির মনে পড়ল যে পরীক্ষার আগে আগে তার মাও তাকে বার বার মনে করিয়ে দিত যে জানা প্রশ্নের উত্তর যেন সে সবার আগে চটপট লিখে ফেলে। সেগুলো শেষ হলে তবে যেন অন্য প্রশ্নগুলো ধরে। নইলে সময় শেষ হয়ে গেলে তাড়াহুড়োর সময় জানা প্রশ্নের অ্যানসারও ভূল হয়ে যেতে পারে। এখানেও সেই একই যুক্তি। তিন্নি বলল, “থ্যাংক ইউ পরি। তোর বাবার কথাই ঠিক। রিভিশনের নিয়ম মেনেই রিভিশন দেওয়া উচিত।”

বিতুর ঘাড় ঘুরিয়ে দুই বন্ধুর দিকে দেখল দু-বার। তারপর চোখের জল মুছে নিজের রাফ খাতাটা টেনে নিয়ে পরির কথামতো অঙ্কের চ্যাপ্টারগুলো গুছিয়ে লিখতে বসল। পরি আর তিন্নির কথা শুনে ভয় কেটে গেছে আপাতত তার। সে হাতজোড় করে বিড়বিড়িয়ে বলল, “হে মা কালী, আমি যেন এবার অঙ্ক পরীক্ষায় ভালোভাবে পাশ করে যাই। আমি প্রমিস করছি আগামী বার খুব মন দিয়ে পড়ব। একটুও ফাঁকি দেব না।”

ঝটপট কালী ঠাকুরের উদ্দেশে দুটো প্রণামও করে ফেলল সে।

তিন্নি পাশ থেকে ফুট কাটল—”রসগোল্লা মানত করতে ভুলে গেলি যে। শুকনো মুখে বর চাইলে কালী ঠাকুর কি শুনবে?”

পরি মুখ টিপে হাসছিল। বিতু কিচ্ছু বলল না। শুধু কটমট করে পরির দিকে তাকিয়ে বলল, “পরীক্ষাটা শেষ হোক, তারপর তোকে দেখাচ্ছি মজা।”

পরীক্ষা শেষের পর

পরীক্ষা শেষ হতেই হোস্টেলে যেন আনন্দের ফোয়ারা ছুটল। হ্যাঁ, রেজাল্টের টেনশন আছে সেটা ঠিক। তবে হাফ ইয়ার্লি পরীক্ষা হওয়ায় অন্তত পাশফেলের আতঙ্ক নেই কারও। তাছাড়া সামনেই পুজোর ছুটি আসছে। সেটাও একটা মস্ত বড়ো আনন্দের ব্যাপার।

“আচ্ছা, পরীক্ষা তো শেষ। কিছু একটা স্পেশাল করলে হয় না?” পরি সকালবেলা পাঁউরুটি চিবোতে চিবোতে বলল।

বিতু বলল, “মুখে খাবার নিয়ে কথা বলিস না। সরলাদি দেখতে পেলে বকুনি দেবে।”

পরি তাড়াতাড়ি এক ঢোঁক চা খেয়ে রুটিটাকে গিলে বলল, “আই হ্যাভ অ্যা আইডিয়া।”

তিন্নি দিল পরির পেটে একটা খোঁচা—”অ্যা নয়, অ্যান আইডিয়া। আইডিয়ার ‘আই’ হল ভাওয়েল, এরই মধ্যে ভুলে গেলি?”

পরি বলল, “সরি, আই হ্যাভ অ্যান আইডিয়া। তোরা দুজনে শুনলে আনন্দে ডিগবাজি খাবি।”

বিতু আর তিন্নি দুজনে চোখ গোল গোল করে তাকাতে পরি ওদের দিকে একটুখানি ঝুঁকে ফিসফিসিয়ে বলল, “আচ্ছা, তোদের বন্ধু সুমতিকে একদিনের জন্য হোস্টেলে, আমাদের রুমে নেমন্তন্ন করলে কেমন হয়?”

পরির কথা শুনে বিতু খাওয়া বন্ধ করে বলল, “সত্যিই তো। এটা তো আমরা ভেবেই দেখিনি। সুমতি হোস্টেলে এলে কী দারুণ মজাই না হবে!”

তিন্নি একটু অবাক হয়ে বলল, “কিন্তু পরি, তোর সঙ্গে তো সুমতিকে কথা বলতে দেখিনি কোনোদিন, তাহলে তোর মাথায় হঠাৎ এমন বুদ্ধি এল কী করে?”

পরি বলল, “তোরা দুজন যেমন দিনরাত সুমতি সুমতি করিস, তাতে আমার মনে হয় যেন আমিও ওকে খুব ভালো করে চিনি। তাছাড়া সুমতি তো স্কুল সেলিব্রিটি। দিদিরা ওর এগজাম্পল প্রত্যেকটা ক্লাসে দেয়। ওর দাদাই তো শিউলিকে হাসপাতালে নিয়ে গেছিল। স্কুলে সবাই জানে।”

বিতু হাসি হাসি মুখে বলল, “আচ্ছা ঠিক আছে, আমি তাহলে সরলাদিকে জিজ্ঞেস করব।”

পরি চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলল, “সে-কাজও আমি সেরে রেখেছি। সুমতির গার্জেন, মানে ওর দাদার  সই করা পারমিশন লেটার চাই। তারপর ওই লেটার-সমেত বড়দির কাছে একটা রিটেন অ্যাপ্লিকেশন দিতে হবে। বড়দির অনুমতি একবার পেয়ে গেলেই আর কোনও চিন্তা নেই।”

তিন্নি আর বিতু দুজনেই একসঙ্গে চেঁচিয়ে বলল, “ওহ্ পরি! ইউ আর আ জিনিয়াস!”

পরি নিজের জামার কলারটাকে টেনে একটু উঁচু করে বলল, “ইয়েস, আই নো।”

বৃহস্পতিবার বিকেলবেলাতেই ওরা বড়দির কাছে অ্যাপ্লিকেশন লিখে জমা দিয়েছিল। রবিবার সকালবেলা সুমতির আসার কথা। শনিবার বিকেল থেকে তিন বন্ধু মহা উৎসাহে তাদের রুম গোছাতে শুরু করল। তিন্নি সরলাদির কাছ থেকে ফুলঝাডু় এনে ওদের রুমটা ঝেড়েঝুড়ে পরিষ্কার করল চটপট। পরি একটা ভেজা ন্যাকড়া জোগাড় করে জানালা, চেয়ার, টেবিল—সবকিছু মুছে ফেলল। তারপর নিজেদের বই-খাতা-জামাকাপড় ভালো করে গুছিয়ে, তিনজনের বিছানার চাদর বদলে তবে ঘর গোছানো শেষ হল ওদের।

পরদিন সকালে সুমতি এলে আনন্দের চোটে পরি, তিন্নি আর বিতুর নাওয়া-খাওয়া মাথায় উঠল। তিনজনের গল্প আর ফুরোয় না। টেবিল-চেয়ারগুলো ঘরের পেছন দিকে ঠেলে, তিনটে বেড একসঙ্গে জোড়া দিয়ে মস্ত বড়ো একখানা বিছানা তৈরি করেছে ওরা। গল্প করার জন্য আদর্শ জায়গা। পরি কখনও সুমতির আবৃত্তি শোনেনি, তাই ওর আবদারে সে চার-চারখানা কবিতা আবৃত্তি করে শোনাল। দুপুরবেলা খাওয়াদাওয়া শেষ হলে চার মূর্তি চারটে গল্পের বই নিয়ে বিছানায় গোল হয়ে বসল।

তিন্নি আর পরির হাতে টিনটিন আর অরণ্যদেব। বিতু আর সুমতি দুটো ভূতের গল্পের বই খুলে বসল। পরি একবার সুমতির হাতের বইখানা দেখে জিজ্ঞেস করল, “তুই ভূতে বিশ্বাস করিস, সুমতি?”

সুমতি একটু ভেবে বলল, “ভূত আছে কি না জানি না, তবে একটা দারুণ অবাক করা জিনিস আমি নিজের চোখে দেখেছি।”

অন্য তিনজন তাড়াতাড়ি বই-টই ফেলে বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ল। সুমিতার নিজের চোখে দেখা অলৌকিক গল্প—ভাবা যায়! সুমতি ভিতু, ছিঁচকাঁদুনি মেয়ে নয়। আর বাজে কথা বলার মেয়ে তো একদমই নয়। অতএব ওর কথার ওপর বিশ্বাস করাই যায়।

পরি বলল, “তুই ভূত দেখেছিস সুমি! নিজের চোখে!”

সুমতি বলল, “না, ভূত নয়। আমার মা বলত ওটা সাপের মাথার মণি।”

তিনজনের এবার চক্ষুস্থির। সুমতি বলে কী? সাপের মাথার মণি! এ তো ভূতের চাইতেও ভালো। ওর জায়গায় অন্য কেউ হলে ওরা হয়তো হেসেই তার কথা উড়িয়ে দিত। তবে সুমতি জেনেশুনে মিথ্যে কথা বলবে না, এটা ওরা সবাই জানে।

তিন্নি প্রায় চেঁচিয়ে উঠল—”সাপের মাথার মণি! তুই নিজের চোখে দেখেছিস?”

সুমতি বলল, “কাছ থেকে দেখিনি। সন্ধ্যাবেলা দূর থেকে দেখেছি। হালকা সবুজ রঙের একটা স্থির আলো। মাঝে মাঝে এদিক ওদিক দোলে। আমাদের বাড়ির কাছে ছোটো একটা বুনো ফুলের ঝোপ আছে। সেখানেই অনেকবার দেখেছি আলোটা। শরৎকালে তো প্রায়ই দেখা যায়। মা তখন বেঁচে ছিল। মা বলত—নমো কর, নমো কর। ও হল নাগমণি। সাপেদের রাজা তার মাথায় সাজিয়ে রাখে।”

পরি ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে ছিল। সে খানিক ভেবে বলল, “আচ্ছা, ওটা জোনাকি নয় তো?”

সুমতি বলল, “আমি গত সপ্তাহেও দেখেছি আলোটা। জোনাকি নয়। জোনাকির আলো টিপটিপ করে। উড়ে বেড়ায়। তাছাড়া ওরকম স্থির সবুজ আলো জোনাকির হবে কী করে?”

বিতু বলল, “আলেয়াও তো হতে পারে। আমি বইয়ে পড়েছি। জলা জায়গায় ওরকম ভূতুড়ে আলো দেখা যায় কখনো-কখনো।”

সুমতি বলল, “কিন্তু ওখানে তো জল নেই। আছে শুধু একটা শিউলি ফুলের গাছ, একটা পেয়ারা গাছ আর গোলাপি রঙ্গন ফুলের ঝোপ। আমি সকালবেলা ওখানে ফুল কুড়োই।”

তিন্নি একটু ভেবে বলল, “আচ্ছা, সন্ধেবেলা মানে যখন আলোটা জ্বলে, তখন কাছে গিয়ে দেখেছিস কখনও?”

সুমতি দু-দিকে মাথা নাড়িয়ে বলল, “সাপ আছে কি না জানি না, তবে কাঠপিঁপড়ে, তেঁতুলবিছে আর শুঁয়োপোকায় গিজগিজ করে ওই জায়গাটা। অন্ধকারে মিছিমিছি ওইখানে গেলে কিছুর না কিছুর কামড় খেতে হবে।”

চারজন চুপ করে বসে ভাবতে শুরু করল। সাপের মাথার মণি! সত্যি-মিথ্যে যাই হোক না কেন, ব্যাপারটা ভারি রহস্যজনক তাতে কোনও সন্দেহ নেই। সবচাইতে বড়ো ব্যাপার হল এই যে গা ছমছমে গল্পের মতো এমন অদ্ভুত ঘটনাটা ঘটছে তাদের হোস্টেলের এত কাছে।

পরি ছটফট করছিল। ওর এমনিতেই ডাকাবুকো স্বভাব। তার ওপরে হাতের কাছেই এমন অ্যাডভেঞ্চারের হাতছানি। পরীক্ষা সবে শেষ হয়েছে। পড়াশোনার চাপ তেমন নেই আপাতত। অ্যাডভেঞ্চার করতে হলে এই তো সুযোগ! সে কিছুক্ষণ ভেবে বলল, “জিনিয়াদিকে বললে হয় না? চল না সবাই মিলে গিয়ে দেখি যে ব্যাপারখানা আসলে কী?”

“কিন্তু হোস্টেলের সবাই মিলে যাওয়াটা কি ঠিক হবে? না মানে, সাপ-টাপ আছে কিনা, তাই বলছিলাম।” বিতুর সরল প্রশ্ন।

তিন্নি হেসে বলল, “দূর বোকা, সবাই মানে আমরা চারজন। হোস্টেলের সবাইকে বলছে কে? এটা আমাদের সিক্রেট।”

পরি বলল, “নো প্রবলেম। তাহলে ওই কথাই থাকল। আমি জিনিয়াদিকে বলব সবকিছু। দেখিস দিদি কিছু না কিছু বুদ্ধি ঠিক বাতলে দেবে।”

গা ছমছম

জিনিয়াদিকে বলার ব্যাপারে বিতু যদিও একটু কিন্তু কিন্তু করছিল, তবে এই ব্যাপারে পরি একদম কনফিডেন্ট ছিল। এমন একটা জিনিস দিদিকে বললে দিদি ঠিক লাফিয়ে উঠবে। আর হলও ঠিক তাই। সোমবার সন্ধেবেলা হোস্টেলের ছাদে জিনিয়াদি আর অন্য কয়েকজন দিদিরা মিলে একসঙ্গে ঝালমুড়ি আর ফ্রুটি খাচ্ছিল। তিন্নি সেখানে গিয়ে জিনিয়াদিকে নীচে ডেকে আনল, আর পরি তারপর চুপিচুপি পুরো ব্যাপারটা খুলে বলল।

সবকিছু শোনার পর জিনিয়াদির মুখখানা হল দেখার মতো। বুঝতেই পারছ যে দিদির দোষ নেই। তার জায়গায় তুমি, আমি বা অন্য কেউ থাকলে তারও অবস্থা হত ঠিক একইরকম। সাপের মাথার মণি! জিনিয়াদি কিছুক্ষণ হাঁ করে তাকিয়ে রইল। তারপর মুখে চুকচুক শব্দ করে বলল, “আহা রে! তোদের তিনটের মাথাই একসঙ্গে মাথা খারাপ হয়ে গেছে।”

জিনিয়াদি হেসে ছাদে ফিরে যাচ্ছিল আবার। তিন্নি আর বিতু এবার খুব সিরিয়াস মুখ করে চেঁচিয়ে বলল, “জিনিয়াদি, পরি সত্যি কথা বলছে। অমন অদ্ভুত একটা আলো সত্যিই দেখা যায়। সুমতি নিজের চোখে দেখেছে।”

জিনিয়াদি এবার ফিরে তাকাল, “সুমতি, মানে মধুদার বোন? তোদের ক্লাসের ফার্স্ট গার্ল সুমতি?”

পরি, তিন্নি আর বিতু তিনজনই একসঙ্গে উপর-নীচে মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বলল।

জিনিয়াদি ওদের দিকে ফিরে চোখ দুটো সরু করে বলল, “অ্যাই, তোরা তিনটে ফচকেমি কচ্ছিস না তো? যদি জানতে পারি যে তোরা ইয়ার্কি মেরেছিস তাহলে দেখিস কী হয়। সরলাদিকে বলে এক সপ্তাহের জন্য তোদের বিকেলবেলা ঘুরতে বেড়োনো বন্ধ করে দেব।”

বিতু এবার মরীয়া হয়ে বলল, “জিনিয়াদি, কালী ঠাকুরের দিব্যি বলছি। সত্যিই ওটা সাপের মাথার মণি কি না তা আমরা জানি না। তবে ওরকম অদ্ভুত একটা আলো সুমতি প্রায়ই সন্ধ্যায় দেখে। ওর মা বলত যে ওটা নাকি সাপের রাজার মণি। আমরা সেটাই ভালো করে দেখতে চাই।”

জিনিয়াদি এবার বেশ কৌতূহলী মুখে বলল, “হুম্, সাউন্ডস লাইক অ্যাডভেঞ্চার। আই লাইক ইট। অন্তত একটা নতুন জিনিস জানতে পারব। ঠিক আছে, আমি সরলাদির সঙ্গে কথা বলি আগে। আর সুমতির সঙ্গেও একবার কথা বলতে হবে।”

পরি আর তিন্নি এবার ‘হুররে’ বলে লাফিয়ে উঠল একসঙ্গে। বিতু লাজুক লাজুক মুখে জিনিয়াদির কোমর জড়িয়ে ধরে বলল, “জিনিয়াদি, ইউ আর দ্য বেস্ট।”

জিনিয়াদি ওর মাথায় একটা চাটি মেরে বলল, “আচ্ছা আচ্ছা, তোরা তিন বিচ্ছু এখন তোদের ঘরে যা। বুধবার টিফিনের সময় সুমিকে বলিস যেন আমার সঙ্গে একবারটি দেখা করে। মনে থাকবে?”

রুমে ফেরার পথে পরি প্রায় নাচতে নাচতে বলল, “দেখলি, বলেছিলাম না, আমার কথা মিলল কি না?”

বিতুর এখনও বিশ্বাস হচ্ছে না। সে যে কী ভীষণ এক্সাইটেড তা সে কাউকে বুঝিয়ে বলতেও পারছে না। স্বভাবে একটু ভিতু হলে কী হবে, অ্যাডভেঞ্চার গল্পের পোকা সে। দিনরাত গোগ্রাসে সেইসব রোমাঞ্চকর গল্প পড়ে। ‘অভিশপ্ত তিড্ডিম’, ‘মিশর সম্রাজ্ঞীর অভিশাপ’, ‘নাগদেবীর অশ্রু’, ‘অজানা দ্বীপের গল্প’ এমনি গায়ে কাঁটা দেওয়া নাম সেসব বইগুলোর। পড়তে বসলে আশঙ্কায়, উত্তেজনায় রীতিমতো বুক ঢিপঢিপ করে তার, আর এখন ঠিক সেই রকমেরই একটা রোমাঞ্চকর ঘটনা ঘটতে চলেছে তাদের সঙ্গে।

ব্যাপারটা স্বপ্ন নয় তো? বিতু নিজের গায়ে দু-তিনটে চিমটি কেটে দেখল—উহ্, লাগছে। তার মানে স্বপ্ন নয়। এবার যেন একটা অ্যাডভেঞ্চারের বইয়ের ভেতরেই ঢুকে পড়েছে ওরা তিনজন। হলই-বা হোস্টেলের কাছে—তাতে কী! সাপের মণি নাই-বা হল, অন্য কোনও একটা আশ্চর্য জীবজন্তুও তো হতেই পারে। শ্রাবণীদি তো প্রায়ই বলে যে পৃথিবীর অনেক কিছুই এখন মানুষের অজানা। সমুদ্রের নীচের জীবজগৎ সম্পর্কে নাকি মাত্র দশ পারসেন্ট জানি আমরা। তা ডাঙাতেই তো এক-আধখানা অজানা অচেনা জীবজন্তু থাকতেই পারে। এমনকি পৃথিবীর বাইরের থেকে এলিয়েন এলেই-বা আটকাচ্ছে কে! এমনও তো হতে পারে যে, অন্য গ্রহের উন্নত জীব এসে বাসা বেঁধেছে রঙ্গন ফুলের ঝোপে। হয়তো তারাই তাদের খুদে খুদে স্পেস শিপে চড়ে শিউলি গাছের আশেপাশে ঘুরে বেড়ায়। যদি তেমন কিছু হয় তো তাহলে রাতারাতি বিতু আর তার বন্ধুরা সবাই বিখ্যাত হয়ে যাবে। নিউজ পেপার, টিভি—সব জায়গায় ছবি বেরোবে ওদের। ভাবো দেখি একবার কাণ্ডখানা!

কী হয়, কী হয়

জিনিয়াদি এককথার মেয়ে। যেমন কথা, তেমন কাজ। বুধবার সুমতির সঙ্গে দিদি কথা বলে সব ঠিকঠাক করে নিল। ব্যবস্থা হল এইরকম যে সুমতি এখন থেকে প্রত্যেকদিন সন্ধ্যায় দেখবে যে শিউলি গাছের নীচে ওই আলোটা জ্বলছে কি না। যেদিন সে ওই আলোটা দেখবে সেদিন তক্ষুনি সে পাশের বাড়ি থেকে ফোন করে হোস্টেলে সরলাদি বা জিনিয়াদিকে জানিয়ে দেবে। খবর পাওয়ামাত্রই জিনিয়াদি সমেত ওরা তিনজন বেরিয়ে পড়বে এবং ঘটনাস্থলে গিয়ে তদন্ত করে দেখবে যে ব্যাপারখানা আসলে কী। কীভাবে যাবে সেই সমস্যার সমাধানও হয়ে গেল চটপট। জিনিয়াদির নিজের সাইকেল আছে। দিদি বিতুকে নিজের ক্যারিয়ারে বসিয়ে নেবে। ওদিকে পরিও বেশ ভালো সাইকেল চালাতে জানে। সে ক্লাস নাইনের অন্য একজন দিদির সাইকেল চেয়ে নেবে। তিন্নিকে পেছনে বসিয়ে নিলেই হবে।

এরপরের ইম্পর্ট্যান্ট ব্যাপারখানা হল পোশাক। কী পরে যাবে ওরা চারজন? সরলাদি বুদ্ধি দিল ওদের—”ফ্রক-টক পরে যাস না যেন। সবাই জামা ভেতরে গুঁজে প্যান্টুলুন পরবি। আর তার ওপর দিয়ে মোজা। পায়ে দৌড়োনোর জুতো। গায়ে ফুল হাতা জামা আর মাথায় টুপি।”

প্যান্টের ওপরে মোজা পরার কথা শুনে বিতু আর তিন্নি ফিক করে একটুখানি হেসেছিল। জিনিয়াদি ধমক দিতেই দুজনের হাসি বন্ধ। তবে সরলাদি কিন্তু রাগ করেনি। বরং অমন করে মোজা পরতে বলার কারণ সরলাদি বুঝিয়ে বলল তাদের, “সাপ না-হয় না-ই থাকল, কিন্তু পোকামাকড়, শুঁয়োপোকা, কেন্নো, বিছে তো থাকতেই পারে। মোজাটা প্যান্টুলুনের ওপরে পরলে পা বেয়ে সে-সব তোদের গায়ে উঠতে পারবে না।”

জিনিয়াদি মুচকি হেসে বলল, “সরলাদির বুদ্ধি, বুঝলি?”

পরি হঠাৎ বলল, “আচ্ছা জিনিয়াদি, বড়দি আবার রাগ করবেন না তো?”

জিনিয়াদি বলল, “না, রাগ করবেন কেন? সরলাদি যখন পারমিশন দিয়েছে তখন বুঝবি যে বড়দি সব জানেন। বড়দির অনুমতি ছাড়া হোস্টেলে একটা মাছিও ঢুকতে পারে না। তাই না সরলাদি?”

সরলাদি তখন ওদের রাতের খাওয়ার জন্য মেপে মেপে চাল নিচ্ছিল ডেকচিতে। চালগুলো জলে ভিজিয়ে দিদি বলল, “যেখানেই যাস, তাড়াতাড়ি ফিরিস। হাহা-হিহি করে সময় নষ্ট করবি না। আমি খুব চিন্তায় থাকব।”

জিনিয়াদি খুব স্মার্টলি কপালে স্যালুট ঠুকে বলল, “ইয়েস ম্যাম।”

রান্নাঘর থেকে বেরোনোর পর জিনিয়াদি ওদের তিনজনকে বলল, “আচ্ছা শোন, একটা জিনিস মাথায় রাখবি সবাই।”

ওরা তিনজন একসঙ্গে বলল, “কী, কী গো জিনিয়াদি?”

জিনিয়াদি ঠোঁটে আঙুল দিয়ে ইশারায় ওদের চুপ করতে বলল। তারপর এদিক ওদিক দেখে একটু চাপা গলায় ফিসফিসিয়ে বলল, “এই ব্যাপারটা নিয়ে যদি কাউকে বলিস তো যাওয়া-টাওয়া সব ক্যানসেল। মনে থাকে যেন। কেউ যদি জানতে পারে তাহলে এক এক করে সবাই যেতে চাইবে। প্ল্যান যাবে ভেস্তে। তাই মনে করিয়ে দিচ্ছি। বি কেয়ারফুল।”

বিতু একবার ঢোঁক গিলে বলল, “আর যদি সরলাদি কাউকে বলে দেয়, তাহলে?”

দিদি হেসে বলল, “হ্যাঁ, সরলাদির আর খেয়েদেয়ে কাজ নেই। দিদি অত পেট-পাতলা নয়।”

তিনজন বিজ্ঞের মতো মাথা নেড়ে বলল, “হ্যাঁ, হ্যাঁ। ঠিক কথা।”

জিনিয়াদি বলল, “ঠিক আছে, এবার নিজেদের রুমে যা। মিছিমিছি এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াস না। সন্ধে হয়ে গেছে।”

জিনিয়াদি ওখান থেকে চলে যাওয়ার পর পরি বিতুর পেটে একটা খোঁচা দিল—”ওই বিতু, পেট-পাতলা মানে কী রে? এই ওয়ার্ডটা আগে তো কোথাও শুনিনি।”

বিতু বেশ স্মার্টলি উত্তর দিল, “মানে যাদের পেটে কথা থাকে না, যেমন তুই।”

চার মূর্তির অ্যাডভেঞ্চার

গত দু-দিন ধরে তিন্নিদের চোখে ঘুম নেই। হোস্টেলের কাউকে বলা বারণ, সেই জন্য উত্তেজনাটা আরও বেশি। সুযোগ পেলেই তিনজন মিলে ফুসফুস গুজগুজ চলছে যখন-তখন। পড়াশোনা, খেলাধুলো, চুল বাঁধা, চান করা, মুখে ক্রিম মাখা, দাঁত মাজা—সব শিকেয় উঠেছে। তিন্নি ভাতের প্লেটে ডালের বাটির বদলে জলের গ্লাস উলটে দিচ্ছে। পরি টুথপেস্টের বদলে বোরোলিন টিপে ব্রাশের ওপর লাগাচ্ছে। বিতু অন্যমনস্ক হয়ে হাঁটতে গিয়ে বাথরুমের সামনে দুম করে পড়ে আছাড় খেল। কাণ্ডকারখানা দেখে সরলাদি বকল বটে, তবে তিন বন্ধু সে-সব কথা এক কান দিয়ে শুনে অন্য কান দিয়ে বের করে দিল। তিনজনেই সিক্রেট মিশনের স্বপ্নে বিভোর। কী হয়, কী হয় অবস্থা। তিন বন্ধুর হাবভাব এমন যে, এইসব তুচ্ছ খাওয়াদাওয়া, দাঁত মাজার পেছনে সময় নষ্ট করে হবেটা কী।

শনিবার সন্ধ্যাবেলায় বিতু একটু হাল ছেড়ে দেওয়া গলায় বলল, “এবার বোধহয় হবে না, বুঝলি? আর তো মাত্র দুটো দিন। তারপর তো ছুটিই শুরু হয়ে যাবে।”

তিন্নি খুব চিন্তিত মুখে কথাগুলো শুনল। কিন্তু উত্তর দেওয়ার মতো কিছু খুঁজে পেল না ও। বিতু কথাটা ঠিকই বলেছে।

পরি একটা ইয়ো ইয়ো নিয়ে খেলছিল। বিতুর কথা শুনে কিছু বলতে যাবে এমন সময় জিনিয়াদি এসে ওদের দরজায় নক করল, “ওই, রেডি হ তাড়াতাড়ি। মধুদা একটু আগে এসেছিল। সুমি খবর পাঠিয়েছে। এক্ষুনি বেরোতে হবে।”

বিতু আর তিন্নি একসঙ্গে চেঁচিয়ে উঠল ‘হুররে’ বলে। ওদিকে আনন্দের চোটে পরি ইয়ো-ইয়োটাকে এত জোরে ছুড়ল যে ইলাস্টিক সুতো ছিঁড়ে সেটা ঠকাস করে গিয়ে লাগল উলটোদিকের দেওয়ালে।

তারপর দশ মিনিটের মধ্যে হুড়োহুড়ি করে, জামা, প্যান্ট, জুতো-মোজা পরে ওরা সবাই রেডি হয়ে গেল। তিন্নি আর বিতু হাতে নিল দুটো পেনসিল টর্চ। আকারে ছোটো, কিন্তু খুব জোরালো আলো হয়। জিনিয়াদি তার প্যান্টের পকেটে নিল একটা ফোল্ডিং চাকু। বলা তো যায় না, যদি প্রয়োজন হয়? সাতটা নাগাদ সাইকেল দুটো নিয়ে সবাই যাওয়ার জন্য তৈরি।

ঝড়ের গতিতে সাইকেল চালিয়ে কুড়ি মিনিটের মধ্যেই সুমতিদের বাড়ির কাছে পৌঁছে গেল ওরা। সাইকেল দুটোকে চাবি দিয়ে আটকে জিনিয়াদি বলল, “তোরা তিনটে এখানে দাঁড়া। আমি মধুদা আর সুমিকে ডেকে নিয়ে আসছি।”

জিনিয়াদি উঠোন পেরিয়ে ডাকতে গেল ওদের। বিতু, তিন্নি আর পরি দাঁড়িয়ে রইল বেড়ার কাছে।

তিন্নি খুব মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে দেখছিল সুমতিদের বাড়িটাকে। সাধাসিধে মাটির বাড়ি। দুটো ঘর। দাওয়াতে মাটির উনুন। মাথায় টালির ছাদ। বাড়িটা চেরা বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘেরা। দাওয়ার একটা খুঁটির সঙ্গে লোহার শিকলি দিয়ে বেঁধে রাখা মধুমামার রিকশাটা। প্রচুর গাছ ওদের বাড়ির চারপাশে। বেড়ার উপরেও কী যেন একটা লতায় ছোটো ছোটো সাদা ফুল ধরেছিল। তাছাড়া গেটের একপাশে নয়নতারা আর সন্ধ্যামালতীর ছোটো একটা ঝোপ। বাড়ির বাঁদিকে ঘোমটা পরা বউয়ের মতো দুটো কলা গাছ দাঁড়িয়ে আছে। ডানদিকে খানিকটা জমিতে অনেকরকম শাকসবজির গাছ সন্ধেবেলার হাওয়ায় টুকটুক করে মাথা নাড়ছে। একটা ছোটো মাচা থেকে ঝুলছে গোছা গোছা শিম আর একখানা পুরুষ্টু পুঁইলতা। পুঁইমাচা থেকে একটুখানি দূরে মাটির তুলসী বেদি। বেদিটার পেটের কাছে খুপরিতে টিমটিমিয়ে মাটির প্রদীপ জ্বলছে একখানা। পূর্ণিমা হতে আর দু-তিনদিন বাকি। কানা-ভাঙা থালার মতো চাঁদ উঠেছিল তখন। শরৎকালের আকাশ। এতটুকু মেঘ নেই। শিউলি ফুলের গন্ধে ম ম করছে চারদিক।

মিনিট দুয়েকের মধ্যেই জিনিয়াদি সুমতি আর মধুদাকে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল। ওরা কাছাকাছি আসার পর তিন্নিরা জিনিয়াদির গলা শুনতে পেল, “সুমি, তুই সত্যি আজকে দেখেছিস আলোটা? চাঁদের আলোতে কিছু বোঝাই যাবে না মনে হচ্ছে। অমাবস্যা হলে ভালো হত বরং।”

মধুদা হেসে বলল, “কোনও চিন্তা কোরো না বুনু। শিউলি গাছের তলাটা বেশ অন্ধকার। তোমরা আমার পিছনে থাকবা। না বলে কয়ে আগেভাগে ছুডাছুডি করবা না কেউ। লতা থিক্যা সাবধান।”

তিন্নি বলল, “লতা থেকে সাবধান মানে? লতা তো গাছ।”

সুমি হেসে বলল, “আমাদের এদিকে রাত্রিবেলায় সাপকে লতা বলে।”

“ও, আচ্ছা।”

সুমতিদের বাড়ির পেছন দিকে একটা ছোট্ট ডোবা আছে। ডোবার পাশ কাটিয়ে প্রায় পাঁচ মিনিট হাঁটলে সামনে পড়বে একটা দুলফি আর পুঁটুশ ফুলের ঝোপ। সেই ঝোপের ঠিক ও-পারে শিউলি গাছ, আর তার ডানদিকে রঙ্গন ফুলের ঝোপ।

শিউলি গাছের নীচে পৌঁছনোর পর সুমতি ঠোঁটে আঙুল দিয়ে ডানদিকে রঙ্গন গাছগুলোর দিকে দেখিয়ে বলল, “চুপচাপ দেখ। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাক। দেখতে পাবি।”

ওরা চারজন রুদ্ধশ্বাসে তাকিয়ে রইল সুমির দেখানো ঝোপটার দিকে। আলো থেকে অন্ধকারে দেখতে অসুবিধে হচ্ছিল ঠিকই, কিন্তু মিনিট খানেক তাকিয়ে থাকার পর চোখ একটু ধাতস্থ হলে ওরা দেখল একটা ভারি আশ্চর্য ঘটনা ঘটছে ওই ঝোপে। হালকা সবুজ রঙের ছোটো ছোটো আলোর বিন্দু মাঝে মাঝে একসঙ্গে জ্বলে উঠছে, আবার কয়েক সেকেন্ড পরই আলোটা গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে মিশে যাচ্ছে ঝোপের আশেপাশে। পাঁচ মিনিট পর আবার সেই আলোটা জ্বলে উঠল। তারপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে মিশে গেল ঝোপের অন্ধকারে। কয়েক মিনিট পরপর আলোটা বড়ো হচ্ছে, তারপর আবার ছড়িয়ে পড়ছে।

সুমতি এক বর্ণও বাড়িয়ে বলেনি। তিন্নিদের গায়ে কাঁটা দিচ্ছিল। ওরা সবাই চোখ বড়ো বড়ো করে দেখছিল ব্যাপারটা। প্রথমে মনে হল জোনাকির আলো, কিন্তু পরক্ষণেই বোঝা গেল যে জোনাকি নয়। জোনাকির আলো হলদে, অনেক বেশি জোরালো, মিটমিট করে; আর এই আলোগুলো ঠান্ডা, সবুজ, স্থির।

মন্ত্রমুগ্ধের মতো দাঁড়িয়ে ছিল ওরা সবাই। কিছুক্ষণ পর মধুদা খুব নীচু গলায় বলল, “যাও, সামনে যাও। কাছ থেকে ভালো করে দেইখ্যা আসো এবার।”

জিনিয়াদি ফিসফিস করে বলল, “ছোটো কোনও পোকা মনে হচ্ছে। উড়তে পারে না, তাই না মধুদা?”

মধুদা হাসল, “কাছে যাও, নিজের চোখে দেখো। তাহলে শিখবা ভালো। মনে থাকবে সবসময়।”

রঙ্গন ঝোপের গায়ে টর্চের আলো ফেললে দেখা গেল জিনিয়াদির কথাই ঠিক। সাপ-টাপ কিচ্ছু নয়। ছোটো ছোটো কালো রঙের পোকা। মাত্র এক কি দেড় সেন্টিমিটার লম্বা। অনেকগুলো পা। কিলবিলিয়ে হাঁটে।

মধুদা সাবধানে একটা পোকাকে পাতার উপর তুলে ঝোপের বাইরে নিয়ে এল। তিন্নি টর্চের আলো ফেলতে সবাই আরও ভালো করে দেখতে পেল পোকাটাকে। গায়ের রঙ কালো। এমনিতে দেখতে বেশ সাধারণ। তবে লেজখানা বেশ জেল্লাদার। পোকাটার পেটের দিকে, লেজের নীচে, সাদাটে সবুজমতো একটু জায়গা আছে। অন্ধকারে লেজখানা উলটে দিলেই সেই সবজে অংশটা জ্বলতে শুরু করে, আর তাতেই অমনি আলো হয়। কোনও কারণে কয়েকটা পোকা এক জায়গায় হলে আলোটা বড়ো হয়ে ওঠে, তখন স্পষ্ট বোঝা যায়।

পরি একটা ছোটো কাঠি নিয়ে পোকাটাকে ওলটানোর চেষ্টা করছিল। জিনিয়াদি বাধা দিল। তারপর বলল, “এই পোকাগুলোকেই বোধহয় ইংরিজিতে গ্লো-ওয়র্ম বলে, বুঝলি। এইরকম আলো জ্বলার ব্যাপারটাকে বায়ো-লুমিনেসেন্স বলে। আমি যখন তোদের ক্লাসে, মানে ফাইভে পড়তাম, তখন আমার জন্মদিনে ছোটোমামু একটা দারুণ ইংরিজি ছবির বই গিফট করেছিল। পৃথিবীর অনেক আশ্চর্য জীবজন্তুর ছবি আর বর্ণনা ছিল সেখানে। ওই বইটাতে পড়েছিলাম এই পোকাগুলোর কথা। আমি তখন ভেবেছিলাম যে এসব পোকা মনে হয় শুধু বিদেশেই পাওয়া যায়, কিন্তু এখন বুঝলাম যে গ্লো-ওয়র্ম এ-দেশেও আছে।”

তিন্নি চোখ দুটো বড়ো বড়ো করে বলল, “কী, কী নাম বললে? বায়ো-লিমি…”

“লিমি নয়, বায়ো-লুমিনেসেন্স। আর পোকাটার নাম গ্লো-ওয়র্ম। আলো পোকাও বলতে পারিস। অন্ধকারে জ্বলে তো, তাই অমন নাম।”

বিতু একটু আবদারের সুরে বলল, “ও দিদি, তুমি এবার যখন ছুটি কাটিয়ে ফিরবে, তখন প্লিজ ওই বইটা তোমার সঙ্গে নিয়ে আসবে? আমি পড়ব।”

জিনিয়াদি হেসে বলল, “ঠিক আছে, নিয়ে আসব। পড়িস তুই।”

পরি বলল, “এই পাতাসুদ্ধ পোকাটাকে হোস্টেলে নিয়ে গেলে দারুণ মজা হবে, তাই না জিনিয়াদি? সবাইকে দেখাব।”

জিনিয়াও একই কথা ভাবছিল। কিন্তু এবার মধুদা বাদ সাধল, “ওই অত্তটুহুনি পুকাডারে ক্যান ওর ভিটাছাড়া করবা ভাগ্নি? ওইটুক পরাণ। কাল অবধি বাঁচলে তবে তো! ও যেহানে আছে, ওইহানেই থাকুক। অন্য কারোর দেহার ইস্যা করলে বরং হ্যায় আইয়া দেইখ্যা যাউক।”

পরির মুখখানা শুকিয়ে গেলেও সে বুঝল যে মধুমামার যুক্তিটা মোটেই ফেলে দেওয়ার নয়। ঠিকই তো, অন্য কেউ দেখতে চাইলে তারা এখানে এসে দেখুক, পোকাটাকে অন্য কোথাও নিয়ে যাওয়াটা মোটেই ঠিক নয়। পোকা বলে কি মানুষ নয়!

বিতু তাড়াতাড়ি মধুদার হাত থেকে পোকা সমেত পাতাটাকে নিয়ে বলল, “আমাকে দাও। আমি ওকে ওর বাড়িতে রেখে আসছি। জিনিয়াদি, চলো এবার হোস্টেলে ফিরে যাই। আমার ঠান্ডা লাগছে।”

মধুদা সে-কথা শুনে ব্যস্ত হয়ে উঠল, “হ্যাঁ, হ্যাঁ। ঠিক কথা কয়েছে বুনু। তোমরা বাড়ি যাও এবার। আর একটু পরেই হিম পড়তে শুরু করব। দেরি কইরো না। নইলে ঠান্ডা লাগব।”

পোকাটাকে যথাস্থানে রেখে ওরা সবাই সুমতিদের বাড়ির সামনে ফিরে এল আবার। মধুদা কিছুতেই ওদের একা ছাড়বে না। সে রিকশা বের করল। সুমতিও চটপট রিকশায় চড়ে বসল। জিনিয়াদিকে জানিয়ে তিন্নিও  এসে বসল রিকশায়, সুমতির পাশে। বন্ধুর সঙ্গে যতটুকু সময় কাটানো যায়, ততই মজা।

হোস্টেলে ফেরার পথে তিন্নি বলল, “অ্যাই সুমি, শোন না, এবার পুজোর সময় আমার বাড়িতে ঘুরতে যাবি রে? প্লিজ?”

সুমতি বলল, “না রে তিন্নি, গরমের ছুটির সময় হলে যেতে পারি। কিন্তু পুজোর সময় যেতে পারব না।”

তিন্নি ওর হাত ধরে আবার বলল, “প্লিজ সুমি, প্লিজ! আমি মামার থেকে পারমিশন নিয়ে নেব। শুধু তুই একবার হ্যাঁ বল। প্লিজ!”

সুমতি মধুমামা যাতে শুনতে না পায় এমনভাবে, খুব নীচু স্বরে বলল, “না রে তিন্নি, দাদা আপত্তি করবে না আমি জানি। কিন্তু পুজোর সময় গেলে অসুবিধে হবে অনেক। তোরা বুঝবি না।”

“আচ্ছা, কী অসুবিধে তোর বল, আমি এখনি ঠিক করে দিচ্ছি।”

সুমতি আমতা আমতা করে বলল, “আসলে পুজোর সময় আমার অনেক কাজ রে।”

তিন্নি ওকে মাঝপথে থামিয়ে বলল, “কাজ মানে পড়াশোনা, তাই তো? সে তো তুই আমাদের বাড়িতেও করতে পারবি।”

সুমতি শুকনো মুখে বলল, “না রে তিন্নি, পড়াশোনা নয়। আমি তখন পাশের বাড়ির মাসিমার সঙ্গে ফুলুরি আর ঝালমুড়ি বিক্রি করি। পুজোর ক’টা দিন যা রোজগার হয় তা দিয়ে বাড়ির কিছু খরচাপাতি মিটে যায়। নইলে আমার দাদাটার ওপর বড্ড বেশি চাপ পড়ে যায় রে।”

তিন্নি সে-কথা শুনে অবাক হয়ে বলল, “তোর কাকিমা তোকে দিয়ে দোকানের কাজ করায়! সুমতি তুই জানিস, এটাকে শিশুশ্রম বলে! এটা অপরাধ। মা বলেছে। পুলিশ জানতে পারলে তোর মাসিমাকে ধরে নিয়ে যাবে।”

সুমতির গলার আওয়াজ বড়ো করুণ শোনাল এবার, “অপরাধ কেন হবে রে তিন্নি? ওই টাকাটুকু আসে বলে সংসারে কত সুবিধে হয় জানিস? দাদা সারাদিন রিকশা চালিয়ে যা পায় তাতে আমাদের দুজনের ডাল-ভাতের খরচাটুকুই শুধু মেটে। বাড়ির উঠোন থেকে যা শাকসবজি পাই তাতে মোটামুটি চলে যায়। কিন্তু অসুখ-বিসুখ হলে, টালির ছাদ সারাতে হলে, শীতের গরম জামাকাপড় কিনতে গেলে যে বাড়তি খরচা হয় তার জন্য টাকা কাজ না করলে কে দেবে বল?”

হোস্টেলে ফেরার পর বাকি সন্ধেটা তিন্নি খুব মনমরা হয়ে কাটাল সেদিন। রাত্রিবেলা নিজের বিছানায় শুয়ে তিন্নি ভাবল ইচ্ছে করলেই কি অন্য কারও সমস্যা কেউ ভাগ করে নিতে পারে? তার মা সবসময় বলে যে সমস্যা হল গুটিপোকার গুটির মতো। শুঁয়োপোকা গুটির ভেতর ঢোকে কিলবিলে বিচ্ছিরি একটা পোকা হয়ে। অথচ দেখ গুটি কেটে যখন বেরোয় তখন সে ঝলমলে রঙে আঁকা কেমন সুন্দর একখানা প্রজাপতি। তাই সমস্যা মানেই যে খারাপ ব্যাপার এমন কিন্তু নয়।

মা যেমন শিখিয়েছে ঠিক সেভাবে তিন্নি প্রত্যেক দিন ঘুমোনোর আগে চোখ বুজে, করজোরে প্রার্থনা করে যেন ভগবান তাকে ভালো বুদ্ধি দেন, তাকে ভালোভাবে রাখেন। কিন্তু আজ তার মনে হল ভগবান তাকে খুব ভালো রেখেছেন। প্রার্থনা করতে হলে বরং সুমতির জন্যই করা উচিত। সে দু-চোখ বুজে আকুল স্বরে বলতে শুরু করল, “হে দুগ্গা ঠাকুর, হে কালী ঠাকুর, থ্যাংক ইউ। আমি খুব ভালো আছি। তুমি বরং আমার বন্ধু সুমতিকে দেখো। ওদের বড়ো কষ্ট। সুমি আর মধুমামার সব কষ্ট দূর করে…”

তক্ষুনি সম্ভবত দুগ্গা ঠাকুরের আশীর্বাদেই তার মনে হল, মধুসূদনমামার ব্যাপারে মা-বাবাকে বললেই তো হয়। ওরা হয়তো কোনও একটা বুদ্ধি বলে দিতে পারে।

বাজল ছুটির ঘণ্টা

বাড়ি ফেরার আনন্দ আর বন্ধুদের ছেড়ে থাকার দুঃখ—দুটো ব্যাপার একসঙ্গে হলে একটা ভারি বিচ্ছিরি ব্যাপার হয়। সেটা আনন্দ না দুঃখ বোঝা মুশকিল। বিতু, তিন্নি আর পরি—তিনজনের কেউই গত রাত্রে ঘুমোয়নি ভালো করে। পুঁচকে খাট তিনটে আবার জুড়ে বড়ো একটা বিছানা তৈরি করেছিল ওরা। তারপর সেখানে তিনজন একসঙ্গে শুয়ে শুয়ে রাতভর পুটুর পুটুর করে অনেক গল্প করেছে।

রাত ফুরোলেও গল্প আর ফুরোয় না ওদের। সেই যে সে-বারে ওরা ভূতের ভয়ে সবাই মিলে চেঁচিয়েছিল। টুনটুনি ও বিড়ালিনীর ঝগড়া। মোহনা আগে সবসময় মনখারাপ করে থাকত আর এখন সে হয়েছে স্পোর্টস চ্যাম্পিয়ন। খেলার মাঠে ও হরিণের মতো দৌড়ায়। সুমতির তো কথাই নেই। সুমতির দাদা, মানে তিন্নিদের মধুসূদনমামা যেমন ভালো, তেমনি লক্ষ্মী তাদের বন্ধু সুমতি। সুমতির কথা উঠলে তিন্নি আর বিতুর মুখ বন্ধই হয় না। এত ভালো মেয়ে বুঝি পৃথিবীতে আর একজনও নেই। এরই মধ্যে তিন্নি বলল যে এই স্কুলে সে নাকি প্রথমে ভরতিই হতে চায়নি, কারণ তার মনে হয়েছিল স্কুলের নামটা স্টুপিড আর সেকেলে। সে-কথা শুনে বিতু আর পরি হাসতে হাসতে প্রায় বিছানা থেকে পড়ে যায় আর কি। কথার পিঠে কথা জমতে থাকে।

অন্যান্য রুমগুলোতেও একই অবস্থা। খুকখুক হাসির আওয়াজ, চাপা গলায় গল্প চলছে সব ঘরেই। সরলাদি মাঝে মাঝে তাদের শুনিয়ে জোরে জোরে কাশছে বটে, কিন্তু বকাবকি করছে না। সরলাদির কাশির আওয়াজ শুনলে পাঁচ মিনিটের জন্য মেয়েরা চুপ করে, তারপরই আবার শুরু হয় কচি গলায় হিহিহি হাসির আওয়াজ। সরলাদি নিজের বিছানায় শুয়ে হাসে। ছুটির আগের দিনে এমনটা হবেই তা সে জানে। পুঁচকে মেয়েগুলোর এটুকু নির্দোষ নিয়ম ভাঙায় তারও কোনও আপত্তি নেই। শুধু বাড়াবাড়ি কিছু না করলেই হল। ভোর রাতের দিকে গল্প করতে-করতেই ঘুমিয়ে পড়েছিল সবাই।

পরদিন ইচ্ছে করেই পাঁচটার বদলে একটু দেরিতে সাড়ে ছ’টায় সরলাদি উঠিয়ে দিল সবাইকে, “অ্যাই মেয়েরা, ওঠ ওঠ তাড়াতাড়ি। চটপট মুখ ধুয়ে, খেয়ে নে সবাই। মা-বাবারা এসে পড়ল বলে। মানুষগুলো কতদিন দেখেনি তোদের। বইপত্তর, জামাকাপড় ভালো করে গুছিয়ে নে সবাই।”

সাতটা নাগাদ ভীষণ ব্যস্ত হয়ে গেল সবাই। দাঁত মেজে, মুখ ধুয়ে, বিছানা গুটিয়ে রাখল সবাই। বেশিরভাগ মেয়েদের ব্যাগ আগের রাত্রেই গুছিয়ে রাখা ছিল। যারা গুছোয়নি তারা চটপট সে-সব কাজ শেষ করে নিল। তারপর চুল বেঁধে, বিনুনি করে, মুখে ক্রিম লাগিয়ে সবাই ছুটল ডাইনিং হলে। আজকে থেকে এক মাসের জন্য হোস্টেল বন্ধ। ব্রেকফাস্টের মেনু আজকে তাই স্পেশাল। দুটো চিকেন স্যান্ডউইচ, কফি, বেশ বড়োসড়ো এক টুকরো ফ্রুট কেক আর মাথা পিছু এক প্যাকেট অরেঞ্জ জুস।

ব্যস্ততার মধ্যেও অবশ্য হুড়োহুড়ি, হালকা হাসিঠাট্টা সবই চলছে। আজকে আর গুরুগম্ভীর প্রার্থনা সংগীত নয়। ক্লাস নাইনের করবীদি তার ট্রানজিস্টারে পুজোর গান চালিয়ে দিয়েছে। উৎসবের মেজাজ চারদিকে। ডাইনিং হলে মিষ্টি সুরে বাজছে—

‘আয় রে ছুটে আয়, পুজোর গন্ধ এসেছে,

ড্যাম কুড়া কুড়, ড্যাম কুড়া কুড় বাদ্যি বেজেছে।’

বড়দিও আজ তাদের সঙ্গে আনন্দ করে ব্রেকফাস্ট করলেন। সরলাদি নিজেও আছে বেশ ছুটির মেজাজে। এবার ছুটিতে বড়দির সঙ্গে সে পুরী বেড়াতে যাবে। দু-দিন পরেই বেরোবে তারা। টিকিট কাটা, হোটেল বুক করা সব হয়ে গেছে। হোস্টেলের মেয়েরা চাঁদা তুলে সরলাদির জন্য হলুদ রঙের মস্ত বড়ো কাপড়ের হ্যাট কিনে দিয়েছে। তাদের প্রিয় সরলাদি পুরীর বিচে মেমসাহেবদের মতো হ্যাট পরে ঘুরবে—এই তাদের ইচ্ছে। পুরীর বিচে কী করবে তা তো জানা নেই, তবে জিনিয়াদির আবদারে সরলাদি আপাতত সেই হলুদ রঙের সোলার হ্যাট আর বেগুনিরঙা তাঁতের শাড়ি পরে রান্নাঘরে তাদের ব্রেকফাস্টের তদারকি করছে। সেই নিয়েও ইয়ার্কি-ঠাট্টা হল অনেক। জিনিয়াদি তো সরলাদিকে ঘিরে দু-পাক নেচেও নিল, “ওহ্ সরলাদি, তোমাকে দেখতে না একদম বলিউডের নায়িকাদের মতো লাগছে!”

মেয়েরা সবাই সে-কথা শুনে একসঙ্গে চেঁচিয়ে উঠল, “ঠিক ঠিক, সরলাদি আমাদের স্কুলের হিরোইন।”

বড়দিও ওদের ছেলেমানুষি দেখে হেসে বললেন, “মেয়েগুলোর বুদ্ধি দেখেছ সরলা, শেষ পর্যন্ত ওরা তোমাকেও টুপি পরিয়ে ছাড়ল।”

সরলাদি হাসতে হাসতে জবাব দিল, “বুদ্ধি হবে না! আপনারই তো ছাত্রী সব।”

সে-কথা শুনে হাসির ফোয়ারা ছুটল আবার।

ব্রেকফাস্টের পর্ব মিটলে ওরা জামাকাপড় পরে তৈরি হয়ে নিল। সাড়ে আটটা থেকেই মা-বাবারা আসতে শুরু করেছেন। হাসিঠাট্টা শেষ, এবার গুড বাই বলার পালা। তিন্নি, বিতু আর পরি—তিনজন একসঙ্গে নিজেদের ট্রলি নিয়ে বেরোল ওদের রুম থেকে। দরজায় তালা লাগিয়ে বিতু চাবিটা ওর পিঠ-ব্যাগের পকেটে ঢোকাল। পরি নিজের ব্যাগের চেন খুলে পকেটে রাখা চাবিটা আর একবার দেখে নিয়ে বলল, “তিন্নি, তুই চাবি ঠিকমতো রেখেছিস তো? একবার দেখে নে।”

তিন্নির বেশ মনে আছে যে চাবিখানা সে ব্যাগেই রেখেছে। তবুও পরিকে খুশি করার জন্য সে আর একবার পকেটখানা দেখে বলল, “হ্যাঁ, ঠিক আছে।”

বিতুর চোখ দুটো ছলছল করছিল। তিন্নি তো সকাল থেকেই কতবার লুকিয়ে লুকিয়ে কেঁদেছে তার ঠিক নেই। এখনও সে ফোঁচ ফোঁচ করে নাক টানছিল। বিতু জিজ্ঞেস করতে সে মিছিমিছি বলেছে যে তার সর্দি লেগেছে। পরি যে পরি, তারও ওই একই অবস্থা। কথা বলতে গেলেই তার ঠোঁট কাঁপছে। অনেক কষ্টে কান্না আটকে রেখেছে সে।

কী মুশকিল বলো দেখি! বন্ধুদের ছেড়ে যেতে ওদের সবার এত মনকেমন করছে কেন? শুধু একটা মাসেরই তো ব্যাপার। তারপর তো আবার ফিরেই আসবে সবাই। কয়েক মাস আগের কথা মনে পড়ল তিন্নির। তার অ্যাডমিশনের দিন মার ওপরে কতই না রেগে ছিল সে। তাদের এমন সুন্দর স্কুলটাকে জেলখানা মনে হয়েছিল তার। এখানে যাতে আসতে না হয় সেজন্য কত ফন্দিই না এঁটেছিল সেদিন। অথচ এখন দেখো অবস্থা! বন্ধুদের ছেড়ে যেতে হবে এ-কথা ভেবেই তার পা ছড়িয়ে বসে কাঁদতে ইচ্ছে করছে।

ইচ্ছে করে আবোলতাবোল কথা বলে দেরি করে করছিল ওরা, যাতে একসঙ্গে আর একটু বেশি সময় কাটানো যায়।

বিতু হঠাৎ বলল, “তোরা আমাকে ভুলে যাবি না তো? প্রমিস কর। ফোন করবি তো?”

তিন্নি আর পরি এমনভাবে বিতুর দিকে তাকাল যেন ওর মাথায় দুটো শিং গজিয়েছে। বিতুটা কী বোকা! ওরা যে ওকে কত্ত ভালোবাসে, তা এখনও বোঝেনি। ইশ্, তিন্নি আর পরি নাকি ওকে ভুলে যাবে! ওদিকে তিন্নির শুধু কান্না পাচ্ছে এই কথা ভেবে যে এখন পুরো একটি মাস তাকে বন্ধুদের ছেড়ে কতদূরে থাকতে হবে, আর মহারানি বিতু এদিকে ভাবছেন যে ওরা নাকি ওকে ভুলে যাবে! হুঃ!

পরি বিতুকে জড়িয়ে ধরে বলল, “চুপ কর বিতু, ছাগলের মতো কথা বলিস না।”

বিতু মিছিমিছি রাগ দেখাল, “আমি ছাগল! তুই তাহলে একটা শুঁয়োপোকা!”

“শুঁয়োপোকা অনেক ভালো। জীবনবিজ্ঞানে পড়িসনি? ক’দিন পর আমি গুটি থেকে প্রজাপতি হয়ে বেরোব। কিন্তু তুই তো সেই ছাগলই থাকবি। বড়োজোর ছানা ছাগল থেকে রামছাগল হবি। হিহিহি…”

হোস্টেলের অন্যান্য মেয়েরা আগেই বেরিয়ে গেছে। ওরা তিনজন সবার শেষে একসঙ্গে হাসতে হাসতে বেরোল। সরলাদি হোস্টেলের সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে ছিল। ওদের দেখে দু-হাত জড়ো করে মাথায় ঠেকিয়ে বলল, “সাবধানে যাস মেয়েরা। বেশি দুষ্টুমি করিস না। তাড়াতাড়ি ফিরে আসবি। দুগ্গা! দুগ্গা!”

মধুসূদনমামা রিকশা নিয়ে ওয়েট করছিল বাইরে। রোহিণী স্কুলের গেটে অন্যান্য অভিভাবকদের সঙ্গেই দাঁড়িয়ে ছিল। অভিভাবকেরা এতক্ষণ নিজেদের মধ্যে আলাপ পরিচয় করছিলেন। খুদেরা একে একে গেটের বাইরে বেরিয়ে আসায় তারা গিয়ে তাদের হাত ধরলেন। বন্ধুদের জড়িয়ে ধরে, চুমু খেয়ে, গুডবাই বলে মার সঙ্গে রিকশায় চড়ে বসল তিন্নি।

বাড়ি ফেরার আনন্দ না স্কুল ছাড়ার দুঃখ—কোনটা যে বেশি হচ্ছে তা বলা মুশকিল। তিন্নির মুখে হাসি, চোখে জল। মনে মনে সে বলল, মাত্র একটা মাস। তারপরেই তো আবার ফিরে আসব।

রিকশা ততক্ষণে চলতে শুরু করেছে। সিটের পেছনের ছোটো পর্দাটা তুলে স্কুলের দিকে আবার তাকিয়ে দেখল তিন্নি। অবাক কাণ্ড! অনেক চেষ্টা করেও মেটে লাল রঙের ইটের বিল্ডিংটাকে কিছুতেই দেখতে পেল না সে। তার বদলে তিন্নি দেখল এক রূপকথার প্রাসাদ। হিরে-চুনি-পান্নার বদলে রাশি রাশি ভালোবাসা আর বন্ধুদের সঙ্গে খুনসুটির স্মৃতি দিয়ে ভরা। আনন্দ আর আহ্লাদের মণিমুক্তো দিয়ে সাজানো তাদের স্কুল। দুষ্টুমি করলে যদিও বকুনি জুটবে একটুখানি, তবে তিন্নির পাওনার খাতায় হাসি জমেছে অনেক অনেক অনেকখানি বেশি।

uponyassaradadevi (3)

ছবি-মৌসুমী

জয়ঢাকের গল্পঘর

Leave a Reply