
ঘন কুয়াশার চাদরের ফাঁকে বরফ-চূড়ার উঁকিঝুঁকি, না নীল জলরাশির ছোটো-বড়ো ঢেউয়ের দোলা? পাহাড়, না সমুদ্র? অথবা কয়েকশো বছর পেরিয়ে কোনও কেল্লায়, দুর্গে বা মন্দিরের গায়ে কোনও এক নিমগ্ন শিল্পীর অপূর্ব নির্মাণ? নাকি গহিন অরণ্যে অজানা কোনও পশুর ডাক? ভয়াল কোনও জীবের পায়ের ছাপ?
আলোচনাটা খুব জমে উঠেছে। এবার ছুটিতে কোথায় বেড়াতে যাবে এই নিয়েই ওদের জল্পনা-কল্পনা আজ তুঙ্গে। ওরা বলতে রোহণ, শমিত, প্রিয়াঙ্কা আর শৈলেশ। শমিতের যমজ বোন প্রিয়াঙ্কা। রোহণ ওদের বড়ো মাসির ছেলে। শৈলেশ শমিতের মায়ের খুড়তুতো ভাই। রোহণদের মামা।
রোহণ, শমিত, প্রিয়াঙ্কা তিনজনেই এবার ক্লাস ইলেভেনের পরীক্ষায় বেশ ভালো ফলই করেছে। সামনে ক্লাস টুয়েলভের বিরাট চাপ। এবার পুজোর ছুটিতে কোথাও বেড়াতে যাওয়া হয়নি ওদের। এখানে তখন উৎসবের আমেজ। চারদিকে বাঁশ, প্যান্ডেলের সাজসজ্জায় পুজোর কলকাতা একদম অন্যরকম। পুজোয় এখানে থাকলেও ওদের কিন্তু একরকমের শহুরে ক্লান্তি গ্রাস করছিল। কোথাও বেড়াতে যাওয়ার জন্য মন সকলেরই আকুলিবিকুলি। কোনও পরিকল্পনা করার আগেই যেন দ্রুত পুজোর ছুটিও শেষ হয়ে গেল!
এই বছর ছুটি বলতে আর কেবল বড়দিন থেকে নতুন বছর পর্যন্ত। তারপরেই ওদের পড়া ও পরীক্ষার ব্যস্ততা। এই শীতের ছুটিতে চার-পাঁচদিনের জন্য বেড়াতে যেতে চাইলে আজই সেই পরিকল্পনা ও সবকিছু আয়োজন ঠিক করে ফেলতে হবে।
শৈলেশ ওদের বাড়ির কাছেই থাকে। সে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এর দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। মহামারী পরিস্থিতিতে ওর কলেজের ক্লাস বিশেষত ল্যাবের কাজগুলো নিয়ে বেশ চাপেই ছিল গোটা দুটো বছর। গত দু-বছর পুজোতে কোথাও বের হয়নি ওরা। এমনকি একই পাড়ায় থেকেও কেউ কারও বাড়িতেও আসেনি। এ-বছর পরিস্থিতি অনেকটাই ভালোর দিকে। পুজোয় পাড়ায় ও এই শহরের বেশ কয়েকটা জায়গায় ওরা ঠাকুর দেখেছে। মানুষ আর প্রকৃতির সহাবস্থানই বোধ হয় সব বিপদ কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করেছে। আবার সবকিছু এখন মানুষের নিয়ন্ত্রণেই বলা যায়। অবাধ ঘোরাফেরা ও মেলামেশায় আর কোনও বাধা নেই। তবে প্রকৃতি যে-কোনো সময়ই যে ভয়ংকর শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে তা বহুবার প্রমাণিত।
বড়দিনের আর দু-দিন মাত্র বাকি! হাতে সময় নেই একদমই। আজই ওদের বেড়াতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এই ছুটিতে ওদের সকলেরই মন চায় বেরিয়ে পড়তে।
ওরা সবাই মিলে অনেকদিন কোথাও বেড়াতে যায়নি। পাহাড়, সমুদ্র, জঙ্গল, প্রাচীন কেল্লা সব ওদের আলোচনায় ঘুরেফিরে আসছে। কোথায় যে শেষ পর্যন্ত যাওয়া হবে সেই সিদ্ধান্ত এখনও ওরা নিতে পারেনি।
রোহণের মা বিমলা এক প্লেট বিস্কুট আর চায়ের ট্রে নিয়ে ঘরে এলেন। মাসিকে দেখে প্রিয়াঙ্কা বললে, “মণিমা, আমরা কি তাহলে এবার বড়দিনেও বাড়ির মধ্যে একা একা…”
প্রিয়াঙ্কাকে শেষ করতে না দিয়ে শৈলেশ বলল, “দিদি, তুমিই একটা জায়গা ঠিক করে দাও তো! এরা যেখানেই যেতে চাইবে আমি রাজি। তবে এই একদম ছুটির মুখে মুখে কোথাও কি বুকিং পাওয়া যাবে? গেলেও বাজেট খুবই চাপের। আগে থেকে বুকিং করা থাকলে অবশ্য এত ভাবনার কিছুই থাকত না। তার ওপর রেলের টিকিট পাওয়াও দুষ্কর হয়তো। তৎকালে টিকিটের কী যে অসম্ভব দাম!”
শমিত একটা লম্বা হাই তুলল, “বেড়াতে গেলে আমি খুশিই হব। তবে স্রেফ শুয়ে-বসে, লেপমুড়ি দিয়ে গল্পের বই পড়ে, ভালো ভালো খাবার খেয়েও দিব্যি কাটিয়ে দিতে পারি। আমার তেমন কোনও খারাপ লাগবে না বাড়িতে থাকতে।”
শমিতের কথা শুনে বাকিরা হইহই করে উঠল।
রোহণ বললে, “তুই থাম তো। তুই থাক বাড়িতে। আমরা বেড়াতেই যাব। বেশি দূরে না হলেও কাছেপিঠে কোথাও যাব।”
বাকিরাও রোহণের কথায় সম্মতি জানাল।
“কিন্তু যাবি কোথায়? সেটা ঠিক করলি?” বিমলা জানতে চাইলেন।
শৈলেশ চায়ের কাপে বিস্কুট ডুবিয়ে এক কামড় দিতেই একটা স্বর্গীয় অনুভূতি এল ওর মুখে, “দিদি, এই বিস্কুট কোথায় পেলে? আহা! কালোজিরে দেওয়া এই বিস্কুট কেবল চায়ের দোকানেই পাওয়া যায়। এক টাকা না দু-টাকা মাত্র দাম। কী অপূর্ব স্বাদ! গত দু-বছর চায়ের দোকানে আসতেই পারিনি। চায়ের দোকান আমাকে যেন নেশার মতো টানত। কত মানুষের একসঙ্গে বসে গল্প-আড্ডা আর সেই আড্ডায় চিন-জাপান-রাশিয়া থেকে বর্ধমান-পুরুলিয়া-কন্যাকুমারী—সবই থাকে। চায়ের দোকানের আড্ডা মিস করে বাঁচা যায়?”
শৈলেশের কথা বলার ভঙ্গিতে ওরা সবাই হেসে ফেলল।
“কী যে একটা অদ্ভুত জীবন কাটালাম! এখন তাও অনেক স্বস্তি।”
শৈলেশের কথার উত্তরে বিমলা বললেন, “রোহণের রাঙামামা গত সপ্তাহে এসেছিল। এই বিস্কুট এক প্যাকেট নিয়ে এসেছে।”
রাঙামামার নাম শুনে সবার মুখেই কৌতুকের হাসি।
“উফ্! রাঙামামার মতো কিপটে মানুষ এই জগতে আর দুটো নেই। নিজের বাড়িতে শোওয়ার ঘরে এয়ার কন্ডিশনার লাগানো থাকলেও প্রবল গরমে উনি ফ্যান পর্যন্ত চালান না। একটা হাতপাখা নিয়ে সারা দুপুর বারান্দায় বসে থাকেন। ভাগ্যিস শহরে থাকেন না। বাড়িতে একটা মস্ত পুকুর আছে। পুকুরের হাওয়াটুকু বিনা পয়সায় তাও পাচ্ছেন।”
“তা বলে সারাবছর ফ্যান পর্যন্ত চালাবেন না? সব ইলেকট্রিক্যাল গ্যাজেট তো খারাপ হয়ে যাবে।”
রোহণের কথার মাঝে প্রিয়াঙ্কাও যোগ করল—“রাঙামামা কিন্তু আমরা গেলে সবসময় এসি চালিয়ে দেয়। নিজে বেচারা ওরকম থাকে।”
“বেচারা?” রোহণ একটু রেগে গেল।
শৈলেশ না রাগলেও মৃদু হেসে বললে, “একবার সাধনদার (রাঙামামার নাম) বাড়িতে শীতে গিয়েছিলাম। তা, অত সুন্দর ঝকঝকে বাথরুমে একগাদা বালতি। পাম্প চালাবে না বলে নীচ থেকে জল তুলে এনে ভরে রাখে।” কথা বলতে বলতে বিমলাকে আড়চোখে দেখে নিল, “দিদি, তুমি প্লিজ রাগ কোরো না। সাধনদা মানুষ খুব ভালো। কিন্তু এটা ওর একটা রোগ হয়তো। না-হলে সে-বারের আর একটা ঘটনা বললে তুমি বিষয়টা বুঝবে।”
সবাই জমিয়ে গল্প শোনার অপেক্ষায়। ওদের রাঙামামার বিচিত্র স্বভাব গল্পের খোরাকই বটে। সারাজীবন রেলে চাকরি করে এবং প্রচুর কৃচ্ছ্রসাধন করে বেশ ভালোরকমই টাকাপয়সা জমিয়েছেন। বাবার প্রায় দশ বিঘা জমি—একটা পুকুরসমেত বিরাট সম্পত্তির একাই মালিক। থাকার মধ্যে রাঙামামি আর রোহণদের ছোটো মাসি। সাধনের ছোটো বোন খুকু অবিবাহিতা। এখন বয়স হয়েছে। একই বাড়িতে থাকলেও খুকুর আলাদা রান্নাঘর ও সবকিছুই আলাদা। খুকু ভাইয়ের ওপর নির্ভরশীল নয়। একটা কলেজে বাংলার অধ্যাপক ছিল। এখন অবসরজীবনেও ছাত্রছাত্রীদের পড়িয়েই বেশ সময় কাটছে। দাদার মতো কৃচ্ছ্রসাধনের জীবন নয়, বরং বেশ আরাম-আয়াসে থাকতেই ভালোবাসে খুকু। সাধনও ছোটো বোনের ড্রয়িং-রুমে এসির ঠান্ডায় আয়েশ করে সোফায় পা তুলে ঘুমিয়ে পড়ে প্রায় প্রতিদিনই। সাধনের বউ রঞ্জু বাতে প্রায় পঙ্গু। হোমিওপ্যাথি ওষুধ খায়। এক ঘর থেকে আর এক ঘরে হেঁটে আসতে বেজায় কষ্ট।
শৈলেশ গল্প বলে যায়, “সে-বার শীতে গিয়েছিলাম সোনাহাটি। তা মফস্সল তো এখন আর সেই মফস্সল নেই। আধুনিকতার মোড়কে ঢেকে গিয়েছে আমাদের সব গ্রাম-গঞ্জ-মফস্সল। আমাদের সোনাহাটি সেখানে অবশ্যই একটা ব্যতিক্রম। সে-কথা এখন থাক। যা বলছিলাম…”
কথার খেই হারিয়ে ফেলা শৈলেশের স্বভাব।
“সে-বার তো প্রবল শীত পড়েছে। জল একেবারে বরফের মতো ঠান্ডা। হাত ছোঁয়ানোই যায় না। দুপুরে স্নান করতে যাব। দেখলাম সাধনদার বাথরুমে গিজার লাগানো। নিশ্চিন্ত হলাম। স্নান করতে বাথরুমে ঢুকব, সাধনদা হা হা করে উঠল—‘শৈল, গিজার চালাসনে ভাই।’
“আমি অবাক!—‘এই শীতে কি ঠান্ডা জলে চান করব? পুকুরে কিন্তু ডুব দিতে পারব না!’
“অভিমানই হল বেশ। তা সাধনদার পরের কাণ্ডটা আরও অদ্ভুত। বললে, ‘তুই আমায় আধঘণ্টা সময় দে ভাই। কল খুললেই গরম জল পড়বে। তোর একদমই ঠান্ডা জলে স্নান করতে হবে না। স্নান ও বাকি যা কিছু প্রয়োজন সব গরম জলেই কর বাবা!’
“আমি গুম হয়ে বসে আছি। আর কোনোদিন সোনাহাটি আসব না ঠিক করলাম। তা বেশ কিছুক্ষণ পর একবার ছাদে গেলাম। সাধনদা কী করছে দেখতে। যা দেখলাম, শুনলে তোমরা হাসবে না সাধনদার জন্য কষ্ট পাবে তা জানি না। তবে আমি কষ্টই পেয়েছিলাম।
“দেখলাম, সাধনদা ছাদের এককোণে শুকনো পাতা জ্বেলে উনুন ধরিয়েছে। সেই উনুনে বসানো একটা বড়ো ডেকচিতে জল গরম হচ্ছে। ফুটন্ত জল একটা লোহার বালতিতে ঢালছে। আর গরম জল-ভরতি লোহার বালতিটা হাতে নিয়ে মই দিয়ে খুব সাবধানে উঠে নিজের হাতে গরম জল ঢেলে দিচ্ছে ট্যাংকির ভেতর!
“বোঝো কাণ্ড! এইভাবে ট্যাংকিতে গরম জল ভরছে? গোটা একটা জলের ট্যাংক কি এভাবে ভরা সম্ভব? না এই জল অনেকক্ষণ গরম থাকবে? তাও গিজার চালাবে না?”
শমিত বললে, “আশ্চর্য! এইভাবে বিদ্যুৎ খরচ বাঁচাচ্ছে? কিন্তু মামার পেনশন, জমা টাকা তার ওপর কী একটা দোকানও তো এখন রিটায়ারের পর করেছে শুনলাম।”
প্রিয়াঙ্কাই শুধু অবাক হল না। বললে, “এভাবে এত পরিশ্রম করে রাঙামামা কি কিছু আদৌ সাশ্রয় করতে পারছে? বাইরে কাউকে বললে বিশ্বাসও করবে না। কিন্তু এটা রাঙামামার একটা অসুখ নিশ্চয়ই। ডাক্তার দেখানোর প্রয়োজন।”
প্রিয়াঙ্কার কথায় সবাই একমত হল। বিমলার মুখ গম্ভীর। ভাইটাকে যে বড়ো ভালোবাসেন। অনেক বুঝিয়েছেন। কোনও অভাব না থাকা সত্ত্বেও এমন আচরণের কী যে প্রয়োজন! ছেলেমেয়েদের সামনে ওরা দুই বোনই লজ্জায় পড়ে। এই তো সে-বার পুজোয় সব বাচ্চাদের হাতে দশ টাকা দিয়ে বলেছে, ‘মিষ্টি খেও।’
দশ টাকায় কি মিষ্টি পাওয়া যায় এখন? কে বলবে ওকে? সেই কোন সময়ে যে ভাইটা এখনও পড়ে আছে! বাচ্চাদের সামনে শুধু শুধু অপ্রস্তুত বোনেরাই হয়। আজ শৈলেশটা বড়ো বেশি বলছে। ভুল কিছুই বলেনি অবশ্য। সাধনের পক্ষে এই আচরণই স্বাভাবিক। তবুও বিমলা রাগ করলেন, “হচ্ছে কথা পুজোয় বেড়াতে যাওয়ার কথা, তার মধ্যে এখন এইসব না বললেই নয়?”
“মা, তুমিই বলো না কোথায় যাব।”
“আমি বলব? তোরা শুনবি?”
সকলে সমস্বরে ‘হ্যাঁ’ বলল।
“তোরা বরং সোনাহাটিই যা।”
“সোনাহাটি!” সকলের গলায় নিরুৎসাহ ও বিস্ময়।
বিমলা কিন্তু নিরাশ হলেন না। বললেন, “এক মিনিট অপেক্ষা কর।”
এক মিনিটেরও বেশি আগেই বিমলা বুক-শেলফে একটা বইয়ের পিছনে ভাঁজ করা পুরোনো খবরের কাগজের দুটো পাতা টেবিলের ওপর মেলে ধরলেন। একটা ভ্রমণকাহিনির পাতা। ভ্রমণকাহিনির দুটো জায়গায় লাল কালিতে দাগ দেওয়া আছে। তার মধ্যে প্রথম জায়গাটা বিমলা পড়ে শোনালেন ওদের। সোনাহাটি আর চন্দ্রপুরের সীমানায় বড়ভোলা গ্রামে খননকার্য চলছিল অনেকদিন ধরেই। সেখানে এক অদ্ভুত দেবীমূর্তি পাওয়া গেছে। দেবীর গলায়, কানে অলংকারের মতো পেঁচিয়ে ছোটো ছোটো সাপ। আবার মূর্তির মাথায়ও রয়েছে একটা ফণাধারী সাপ। সাপের প্রতিকৃতি-সমেত এই মূর্তিটাকে মনসা মূর্তিই মনে করা হচ্ছে। সাধারণত বাংলার গ্রামে-গঞ্জে যে-ধরনের মনসা মূর্তি দেখা যায় তার সঙ্গে এই মূর্তির সাদৃশ্য যেমন আছে, বৈসাদৃশ্যও কিছু আছে। এই মূর্তির দু-হাতে বিরাট আকৃতির দুটো মাছ। সোনাহাটি মহাবিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক শান্তনু কর্মকার বলেছেন, মূর্তিটা পনেরশো শতকের।
এই পর্যন্ত পড়ে বিমলা বললেন, “হাতে বিরাট দুটো মাছ নিয়ে সর্পালংকার-ভূষিতা এই দেবীমূর্তি এখনও সোনাহাটির স্থানীয় মিউজিয়ামেই আছে। তবে খুব বেশি দিন থাকবে না। পুরাতাত্ত্বিকদের একটা দল সম্ভবত আসছে সোনাহাটিতে। ওখানে আরও কিছু পুরোনো ঐতিহাসিক নিদর্শনের উৎস রয়েছে। মূর্তিটার প্রাচীনত্ব বিচার করে জাতীয় যাদুঘরেই স্থানান্তরিত হবে সেটা। তোরা অবশ্য তোদের ছোটোবেলার সোনাহাটিতে পাওয়া মূর্তি যাদুঘরে গিয়েও দেখতে পারিস। তবে আমি বলব, ওটা সোনাহাটির মাটিতে দেখা আর যাদুঘরে অনেক অনেক পুরোনো মূর্তির মাঝে আলাদা করে দেখার মধ্যে একটা পার্থক্য আছেই।”
বিমলার কথাটা বোধ হয় সবার মনঃপূত হল।
শৈলেশ বলল, “তাছাড়া, সোনাহাটির বিরিয়ানির কোনও কথা হবে না। আমি অনেকদিন ধরেই ভাবছি সোনাহাটির বিরিয়ানি নিয়ে একটা লেখা লিখব। আমরা বিরিয়ানি বলতেই হায়দ্রাবাদ, কলকাতা, দিল্লি এসব শহরই বুঝি। গ্রামে-গঞ্জে, মফস্সলেও এই শাহি খাবারটি পাওয়া যায় আর আমাদের সোনাহাটির বিরিয়ানির স্বাদই বলে দেয়, এখানে এখনও মুঘল-পাঠানদের আত্মা ঘোরাঘুরি করে। না-হলে অত স্বাদের বিরিয়ানি সোনাহাটিতে কোন জাদুতে পাওয়া যায়?”
“জাদু মুঘল-পাঠান আত্মাদের নয় মামা। জাদু আশরাফচাচার হাতের।”
প্রিয়াঙ্কার কথায় রোহণ অবাক হল, “আশরাফচাচা?”
“হ্যাঁ রে। আশরাফই তো আজ দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে ‘সোনাহাটির ইস্পেশাল বিরিয়ানি’ দোকানের রাঁধুনি। তুই চিনিস না? আমার সঙ্গে তো ভালোই আলাপ আছে। সোনাহাটি গেলেই ওর সঙ্গে গল্পগুজব করি। খুব লেখাপড়া জানা মানুষও সোনাহাটিকে ওর মতো চেনেন না। পুরোনো সোনাহাটির কত গল্প যে ওর ঝুলিতে!”
শৈলেশের কথার উত্তরে রোহণ বললে, “তাহলে আশরাফচাচা হল গিয়ে আমাদের সোনাহাটির সিধুজ্যাঠা? গুগলেও সোনাহাটির যে-কথা জানা যায় না, সেই কাহিনিও মজুত চাচার কাছে?”
সকলের হাসিঠাট্টা আর গল্পের মাঝে বিমলা কখন রান্নাঘরে আবার চলে গিয়েছেন কেউই টের পায়নি। এখন ধোঁয়া-ওঠা কফির কাপ আর হাতে কয়েকটা প্লাম-কেকের টুকরো নিয়ে আবার ঘরে আসাতে সবারই মনোযোগ বিমলার হাতের ট্রের দিকে। টেবিলে ট্রেটা নামিয়ে বিমলা শৈলেশকেই জিজ্ঞেস করলেন, “তাহলে কিছু ঠিক করলি, কোথায় বেড়াতে যাবি?”
শৈলেশ প্লাম-কেকে একটা কামড় দিয়ে বলল, “চলো বেড়িয়ে আসি।”
“আমি? না না, আমার কোমরে যা ব্যথা!” আঁতকে উঠলেন বিমলা।
“চল বেড়িয়ে আসি, শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের লেখা একটা বইয়ের নাম। ভ্রমণকাহিনি।” শৈলেশ বললে।
বিমলা একটু অধৈর্য হলেন, “আহা, শৈল! হচ্ছে কথা বাচ্চাগুলোর বেড়াতে যাওয়ার আর এর মধ্যে এসব বাদ রাখ না! একটা কোনও সিদ্ধান্তে আসতে হবে তো! তোর জামাইবাবু বেঙ্গালুরু আছেন এখন। চাস তো সেখান থেকে ঘুরে আয়। বেঙ্গালুরু কিন্তু দারুণ। একেবারে চির-বসন্তের আবহাওয়া। না ঠান্ডা, না গরম। ওখান থেকে মাইশোর, উটি, কুর্গও ঘুরে আসতে পারিস।”
“আরে দিদি! তুমি তো সোজা দক্ষিণে নিয়ে ফেলতে চাও দেখছি। তা এখন ওসব দখিনা বাতাস-টাতাস থাক। আমরা সোনাহাটিতেই যাব। আর জামাইবাবুও তো নেই এখানে, তুমিও চলো না আমাদের সঙ্গে! মূর্তিতে সাপের কথা শুনেই মনসামঙ্গল মনে পড়ছে। তবে আমার অত পড়া নেই। ওদেরও নিশ্চয়ই মঙ্গলকাব্য পড়া নেই কারও। তোমার তো পি.এইচ.ডি-তে বিষয়ই ছিল মঙ্গলকাব্য। তোমার আর সনৎদার বইটাও আছে আমাদের বাড়িতে। তবে এখনও পড়া হয়নি সে-বই। যা পড়ার চাপ এখন! সরি। এইবার সোনাহটি থেকে ঘুরে এসে পড়ে ফেলবই।”
একসঙ্গে অনেকটা কথা বলে শৈলেশ থামল।
রোহণ বললে, “মা, তুমি আর না বলো না প্লিজ? চলো সবাই মিলেই ক’দিন সোনাহাটি থেকে ঘুরে আসি।”
“হুট বললেই যাওয়া যায়?” বিমলা নিমরাজি যেন।
“মণিমা, হুট বলে বেরিয়ে পড়ার আনন্দই আলাদা। তাছাড়া, সোনাহাটি গেলে আমাদের তো আর হোটেলের রুম বুক, টিকিট কনফার্ম এসবের প্রয়োজন নেই। ছ’-সাত ঘণ্টা বসে যাওয়ার ট্রেনে টিকিট নিশ্চয়ই পাব। রাঙামামার কাছে না হোক, ছোটো মাসির কাছেই উঠব। যেমন উঠি প্রতিবারই।” কথাগুলো বলেই শমিত মোবাইলে রেলের টিকিট দেখে ফেলল, “হ্যাঁ। রিজার্ভড টিকিট আছে তো। কেটে ফেলি মণিমা? তুমিও চলো আমাদের সঙ্গে?”
ছেলেমেয়েদের উৎসাহের সামনে বিমলা না করতে পারলেন না। যদিও কোমরের ব্যথাটা জানান দিচ্ছে মাঝে-মাঝেই। তবে সে-সব তো একেবারে জীবনের সঙ্গে জুড়েই আছে। এদের বাদ দেওয়া যাবে না। তাই বলে কি ঘোরাঘুরি একদম বাদ দিয়ে দেবেন জীবন থেকে?
বিমলা রাজি হতেই ওরা আন্তর্জালে টিকিট কেটে ফেলল। আগামী পরশু বড়দিনের ভোরেই ওদের যাত্রা।
দুই
সাড়ে সাতটার মধ্যে বিমলা, রোহণ, শমিত, প্রিয়াঙ্কা আর শৈলেশ পৌঁছে গেল হাওড়া স্টেশনে। ট্রেন ছাড়তে এক ঘণ্টা বাকি। শৈলেশ জলের বোতল কিনতে গিয়ে একটা খবরের কাগজও কিনল। এত সকালে ব্রেকফাস্ট সারা হয়নি তেমন। বিমলার টিফিন ক্যারিয়ার থেকে কড়াইশুঁটির কচুরি, আলুরদম আর ফ্রুট-কেক ওদের হাতে হাতে চলে এল। এক ফ্লাস্ক কফিও বিমলা সঙ্গে করে এনেছেন। শমিতের অবশ্য ভাঁড়ের চা খাওয়ার ইচ্ছে। ট্রেন ছাড়ার মুখে এক ভাঁড় করে চা খাওয়া হল সকলেরই।
ট্রেনটা কারশেড পেরিয়ে সবে একটু গতি নিয়েছে। বিমলার একটু তন্দ্রামতো ভাব এসেছে। বাকিরা যাত্রার উত্তেজনায় গল্পগুজবে মশগুল। শৈলেশ খবরের কাগজে মন দিল।
কাগজ পড়তে-পড়তেই শৈলেশের মুখ-চোখ কেমন অন্যরকম হয়ে যাচ্ছে। কেউই তেমন খেয়াল করেনি প্রথমে। প্রিয়াঙ্কাই লক্ষ করল, “কী হয়েছে শৈলমামা? তুমি এরকম থম মেরে আছ কেন?”
প্রিয়াঙ্কা বসেছিল শৈলেশের মুখোমুখি উলটোদিকে। ওর কথা শুনে সবাই শৈলেশের দিকে তাকাল। বিমলারও তন্দ্রাভাব কেটে গেছে। শৈলেশ খবরের কাগজের ভিতরের একটা পাতা মেলে ধরল।
‘সোনাহাটির চন্দ্রপুর সংগ্রহশালা থেকে গতকাল একটি প্রাচীন মূর্তি চুরি গেছে। মূর্তিটা সদ্য একটি পুরাতাত্ত্বিক খননকার্য চলাকালীন উদ্ধার হয়েছিল। সর্পালংকার-ভূষিতা একটি দেবীমূর্তির দুই হাতজোড়া বিশালকৃতি মাছ। স্থানীয় ইতিহাসবিদদের দাবি, মূর্তিটা চতুর্দশ অথবা পঞ্চদশ শতকের তৈরি। চন্দ্রপুর সংগ্রহশালার দুই নাইট গার্ডের মৃতদেহ পাওয়া যায় আশরাফাকুল নামে এক ব্যক্তির দোকানে। জানা যায়, আশরাফাকুল স্থানীয় একটি হোটেলে রান্নার কাজ করেন। প্রাথমিক তদন্তে অনুমান, নিহত ব্যক্তিদ্বয়কে প্রথমে কিছু খাইয়ে অজ্ঞান করা হয়েছিল। তারপর হত্যা করা হয়েছে। মৃতদেহ ময়না তদন্তের পর খুনের পদ্ধতি বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাবে। আপাতত তদন্ত চলছে। আশরাফাকুলকে গ্রেপ্তার করেছে স্থানীয় পুলিশ। চন্দ্রপুর সংগ্রহশালা পুলিশি ঘেরাটোপে সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আপাতত দর্শনার্থী সকলেরই সংগ্রহশালায় প্রবেশ নিষেধ।’
খবরটা পড়ে রোহণের মুখ দিয়ে একটা চুক শব্দ হল। বাকিরাও খবরটা পড়ে বেশ মুষড়ে পড়েছে। সমস্ত যাত্রাপথে ওদের মধ্যে আর তেমন কোনও কথা হল না। সবাই চুপচাপই ছিল প্রায়। মাঝে একবার মশাগ্রামে ঝুড়ি করে একজন চপ বিক্রেতা এলে সবাই গরম গরম চপ খেল। চা খাওয়ার সময়টুকুও পেল না। ট্রেনে ছেড়ে দিয়েছে। চায়ের কেটলি হাতে লোকটা দ্রুত নেমে পড়েছে ট্রেন থেকে। বিমলার কফির ফ্লাস্কই কাজে এসেছিল। বিমলা মনে করে কয়েকটা কাগজের কাপও নিয়ে এসেছেন।
***
ছয় ঘণ্টার রাস্তা ট্রেন লেট হওয়ার জন্য প্রায় দশ ঘণ্টায় পৌঁছাল। স্টেশনে নেমে হা-ক্লান্ত সকলেই দেখল সোনাহাটির তেমন বদল হয়নি। সেই পুরোনো দিনের মতোই স্টেশন ও তার বাইরের চত্বর। কলকাতা থেকে এসে হঠাৎ করে এই স্টেশনে নামলে যেন মনে হয় বিভূতিভূষণের নিশ্চিন্দপুরে এসেছে।
স্টেশনের বাইরে কয়েকটা টোটো অপেক্ষা করছে যাত্রীদের জন্য। পরিবর্তন বলতে ওইটুকুই।
ওরা টোটোয় চেপে বসল। পথের দু-ধারে ঘন জঙ্গল, বাঁশঝাড়, মাঠ। আমলকি, বেল আর মধুফলের গাছগুলো ওরা চিনতে পারল। আম-কাঁঠালের বাগানও দেখতে পেল। টোটো আর একটু ভেতরের রাস্তায় এলে ওরা দেখল বেশ কয়েক জায়গায় জঙ্গল এখন আর নেই। কোথাও নতুন বাড়ি হয়েছে, কোথাও আবার দোকান খুলেছে বেশ কয়েকটা। একটা বেশ সাজানো-গোছানো আসবাবপত্রের দোকানও চোখে পড়ল। ধানক্ষেতের মাঝখানে সরু একটা রাস্তা দিয়ে টোটো যাওয়ার সময় ওরা দেখল, ক্ষেতের একদিকে বিরাট একটা বাড়িমতো কী যেন তৈরি হচ্ছে।
শৈলেশ বলল, “এখানে এটা কী তৈরি হচ্ছে? এ তো বিরাট একটা কর্মকাণ্ড। হাসপাতাল তৈরি হচ্ছে নাকি এখানে?”
প্রশ্নটা টোটোচালক-দাদাকে উদ্দেশ করেই করেছিল। আড়চোখে একবার নির্মীয়মাণ বাড়িটির দিকে তাকিয়ে টোটোচালক উত্তর দিলেন, “ভাই, এখানে একটা হোটেল হচ্ছে। রিসর্ট না কী যেন বলে এখন? ওরকমই কিছু। বাইরে থেকে এখন আপনাদের মতো লোকজনরা সব আসছেন তো সোনাহাটি দেখতে! আগে এখানে লোক বলতে আমরা স্থানীয়রা। এখন দুটো স্টেশন আগে বৈকুণ্ঠপুরে নতুন একটা বেসরকারি কলেজ খোলার পর থেকেই এখানে থাকার জন্য বাইরের লোকেরাও আসছে। তাছাড়া, শহরে জমির দাম যা চড়া। জানেনই তো, বাঙালি জমিপ্রিয় একটা জাতি! সময় থাকতে থাকতে এখানে জমি কিনে রাখছে কেউ কেউ।”
“সময় থাকতে থাকতে মানে?” প্রশ্নটা রোহণ করল এবার।
টোটোচালক হাসলেন, “না না, সময় বলতে আয়ু-টায়ুর কথা বলিনি। বলছিলাম জমির দামের কথা। জমির দাম যেভাবে ঊর্ধ্বমুখী! এখানেও আর জমিতে হাত দিতে পারবে না কেউ সহজে।”
খুব সুন্দর গল্প করেন টোটোচালক-ভাই। এখন এখানে রাস্তায় যথেষ্ট আলোই আছে। আগের মতো অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে ওদের যেতে হচ্ছে না। সোনাহাটির নতুন-পুরোনো সব গল্প শুনতে শুনতে ওরা হারান ব্যানার্জী লেনে এসে পড়ল। মোড়ের মাথায় টোটো ছেড়ে দিল ওরা।
একটুখানি পথ হেঁটেই যাবে ঠিক করল। এখানে মিষ্টির দোকান বলতে মোড়ের মাথায় সরমা মিষ্টান্ন ভাণ্ডার। নবদ্বীপ খুব বেশি দূরে নয় তাই এখানে বারোমাসই নদীয়ার লাল দই পাওয়া যায়। রাঙামামা, খুকুমাসি—দুজনেরই লাল দই খুব প্রিয়। বিমলা দু-ভাঁড় লাল দই কিনলেন।
মামাবাড়ির কাছে এসে সেই পুরোনো পুকুরটাকে দেখতে পেল ওরা। আবছা আলোতেও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে পুকুরের চারধারে থোলো থোলো সাদা শাপলার সারি।
গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই রাঙামামার উঠোনজোড়া ফুলের বাগানে এল রোহণরা। চাঁপা, বেলি, শিরীষ, গন্ধরাজ, মাধবী, টগরে ছেয়ে আছে সমস্ত উঠোন। সন্ধে হলেই পুকুরপাড়ের কামিনীর ঝাড় থেকে মনমাতানো গন্ধ আসবে। গন্ধরাজ ফুলগুলো হলুদ হয়ে গেছে। ওগুলো গত সন্ধের। গন্ধ কমেনি এখনও। উঠোনজুড়ে অপূর্ব সব ফুল আর পাতাবাহার গাছ। বাড়ির ভেতরে এসে ওদের মনে হল, কেবল এই বাড়ি আর তার চারপাশের পরিবেশের জন্যই সোনাহাটি আসা সার্থক।
রাতে খুকুমাসির ওখানে হাঁসের ডিমের ঝোল আর খাসির মাংস দিয়ে বেশ একটা ভুরিভোজই হল। পরদিন সকাল সকাল সাধন পুকুরে জাল ফেলেছে। টাটকা সব মাছ ধরে খাওয়াবে ভাগনি আর ভাগনেদের। রোহণ, শমিত, প্রিয়াঙ্কা, শৈলেশ সবাই মাছধরা দেখছে। বিমলা রঞ্জুর সঙ্গে রান্নাঘরে।
মাছ ধরতে এসেছে আবিদ মাঝি। রোহণরা ছোটোবেলা থেকেই আবিদ মাঝিকে চেনে। আগেও বেশ কয়েকবার ওকেই সাধন পুকুরটা লিজ দিয়েছিল। আজ মাছ ধরতে এসে গাছের নারকোল আর একটা আস্ত কাঁঠালও উপহার পেয়েছে আবিদ। রঞ্জুর দেওয়া গুড়ের চায়ে একটা চুমুক দিয়ে খোশগল্প করছে রোহণদের সঙ্গে। শৈলেশ হঠাৎ প্রশ্ন করল, “আচ্ছা আবিদকাকা, জেলেপাড়ায় কি মনসাপুজো হয়?”
রোহণরা সকলেই নড়েচড়ে বসল। খবরের কাগজে পড়া সেই মূর্তির কথা সকলেরই মনে আছে।
“হ্যাঁ। মনসার ঘট তো জেলেপাড়ায় ঘরে ঘরে। শ্রাবণ পূর্ণিমায়, নাগপঞ্চমীতে পুজো হয়। আর ভাদ্রমাসে হয় রান্নাপুজো। পান্তাভাত ভোগ দেয় মাকে। কচুশাক দিয়ে ইলিশমাছ, ইচামাছের ঘণ্ট, নারিকেলের বড়াও ভোগের জন্য পুজোর আগের দিন রাতে রান্না করে বাড়ির বউ-ঝিরা। তারপর নতুন গড়া উনুনে সাতটা সাপ এঁকে তেল-সিঁদুর দিতে হয়। সেই উনুনের সামনেই এক বাটি দুধ, চাঁপা কলা সমেত সারাদিন ধরে উপোস করে বউ-ঝিরা যা যা রান্না করে সে-সব খাবার সাজিয়ে ভোগ দেয়। সেদিন উনুনের কাছে ফোঁস ফোঁস শব্দও শুনতে পায় অনেকে। ওই ফোঁস ফোঁস শব্দ মানেই মা এয়েছেন পুজো নিতে। একটু যাদের অবস্থা ভালো তারা ক্ষীর, দধি আরও কত কী দেয়। ছাগল, মেষ বলিও হয় মায়ের পূজায়। যার যা খ্যামতা আর কি!”
কথা বলতে-বলতেই আবিদ খুব সতর্ক ও সজাগ হয়ে পড়ল। ওর ভাইপো আলম জলে নেমেছে। সে পুকুর থেকেই চিৎকার দিল, “কাকা, এই দেখো এত্ত বড়ো মাছ পড়েছে জালে।”
সত্যিই বিরাট ওজনের একটা রুই মাছ। পাঁচ কিলো তো হবেই। একটু বেশিও হতে পারে। মাছটা পাড়ে আনলে আবিদ হেসে বলল, “একেই বলে শতভার মীন!”

“শতভার মীন!”
শব্দবন্ধটা প্রথম শুনল ওরা। অবাক বিস্ময়ে জিজ্ঞেস করল, “শতভার মীন মানে কী কাকা?”
“ওই যে আমাদের মনসা ভাসানের পালায় শতভার মীনের গপ্পো বলে গো! তা শুনবে একদিন। তবে এখন তো আর পালাগানের সময় নয়। গাওনরাও কেউ এখানে আছে কি না জানি না। শ্রাবণ মাসে এলে তোমাদের শোনাব। ভাদ্দর মাসে এলে পাবা রান্নাপুজোর প্রসাদ।”
মাছধরা দেখার চেয়েও ‘শতভার মীন’-এর কাহিনি শুনতেই ওদের আগ্রহ বেশি। সকলে ছুটে গিয়ে বিমলাকে ধরল। বিমলা তখন একটা টুলে বসে পেঁয়াজের খোসা ছাড়াচ্ছেন। রঞ্জু উঁচু একটা টুলে বসে মশলা বাটছেন। ননদ-বউদি দুজনেই কোমর আর হাঁটুর অসুখে কাবু।
রোহণদের আবদারে পেঁয়াজের খোসা ছাড়াতে-ছাড়াতেই বিমলা জালু মালুর কাহিনি বললেন, “জেলে-বউ নিছনির দুই ছেলে জালু আর মালু। জালু-মালু একটু বড়ো হলে ওদের বাবার সঙ্গে মাছ ধরতে যায়। আমাদের মঙ্গলকাব্যের মজা কী জানিস?”
সকলেই মনোযোগ সহকারে বিমলার গল্প শুনছে। মাথা নেড়ে জানে না জানাল।
“গল্পের মধ্যে গল্প, তারও মধ্যে আরও গল্প। জালু-মালুর পূর্বজন্মেরও একটা গল্প আছে।”
গল্প চলতে-চলতেই রঞ্জু কখন খুঁড়িয়ে উঠে কফি করে এনেছে কেউ টেরই পায়নি। প্রিয়াঙ্কা রাঙামামির হাত থেকে কফির ট্রে নিয়ে সকলকে দিল। কফির সঙ্গে রঞ্জুর নিজের হাতে বানানো নারকোল দেওয়া বিস্কুটও আছে। বিস্কুটে এক কামড় দিয়ে শৈলেশ বললে, “আহা! কী মুচমুচে বিস্কুট! বউদি, আপনি এই শরীরে আবার এইসবও তৈরি করেন?”
“হ্যাঁ, ভাই। গাছের নারকোল সব পড়ে থাকে। তোমার রাঙামামার তো শখ বলতে ওই একটাই। ভালোমন্দ খাওয়া। আর সব ব্যাপারে মামার খরচ করতে বাধলেও খাওয়ার বিষয়ে ওই একই মানুষ মুক্তহস্ত। দীপ কলকাতা থেকে আসার সময় এবার এই মাইক্রোওয়েভটা কিনে এনেছে। এটা আসার পরই এইসব বানাই। দীপই মোবাইল দেখে এগুলো বানানোর রেসিপিও শিখিয়েছে আমাকে। এক বয়াম-ভরতি বিস্কুট ওকে দিয়েছি। ওর বন্ধুদের খাওয়াবে। নিজেও খাবে মন চাইলেই।”
প্রিয়াঙ্কা লক্ষ করল, দীপের কথা মনে পড়ায় রাঙামামির মন কেমন উদাস হয়ে গেল। একমাত্র ছেলেকে হস্টেলে পড়তে পাঠানোর পর থেকেই রঞ্জুর মন খারাপ। গোটা বাড়িটা কেমন ফাঁকা লাগে ওর।
গল্প থেকে সরে যাচ্ছে দেখে শমিত বলল, “মণিমা, জালু-মালুর পূর্বজন্মের গল্পটা বলো না!”
বিমলা হেসে গল্প শুরু করলেন, “গল্প কিন্তু খুব ছোটো নয় যে তাড়াহুড়ো করবি। এই গল্পের জাল অনেক অনেকদূর ছড়ানো। তাও সংক্ষেপে বলছি।
“শিব তো মনসার জন্মের কথা জানতেন না। তাই প্রথমে পদ্মবনে মনসাকে দেখে চিনতে পারেননি। মনসা নিজেই জন্মের কথা পিতাকে স্মরণ করায়। শিব তখন ফুলের সাজির মধ্যে মনসাকে লুকিয়ে স্বর্গে নিয়ে আসেন। চণ্ডীকে কীভাবে মনসার কথা জানাবেন ভেবে পান না। মর্ত্যলোকের সাধারণ স্বামীদের মতো শিবও চণ্ডীকে ভয় পান খুবই। তাই ভুলটা সাধারণ গেরস্থ ঘরের স্বামীর মতোই করে ফেললেন। বার বার চণ্ডীকে ফুলের সাজিতে হাত দিতে নিষেধ করলেন। এইবার চণ্ডীও সন্দেহ করে বসলেন। নিশ্চয়ই ফুলের সাজিতে কিছু একটা আছে। শিব চলে গেলেই চণ্ডী ভালো করে ফুলের সাজিখানা দেখতে গিয়ে দেখলেন এক ভারহীন অপরূপা কন্যা শুয়ে আছে সেখানে। ব্যস! অমনি চণ্ডী তো রেগে আগুন হয়ে গেলেন। কুশ দিয়ে কন্যার চোখে দিলেন এক খোঁচা। মনসা তখন যন্ত্রণায় অস্থির হয়েও চণ্ডীকে বোঝানোর চেষ্টা করছেন তিনি শিবের কন্যা। কিন্তু কে শোনে কার কথা?
“গোলমালে শিব এসে হাজির। শিবও বোঝাতে চেষ্টা করছেন চণ্ডীকে। মনসা তাঁরই কন্যা। কিন্তু গৌরী তো মানবেনই না সে-কথা। শেষে রেগেমেগে গণেশ-কার্তিক-লক্ষ্মী-সরস্বতীকে নিয়ে বাপের বাড়ি চলে আসবেন জানালেন। শিব দেখলেন চণ্ডী ছেলেমেয়ে নিয়ে চলে গেলে তাঁর প্রেস্টিজ দেবসমাজে একেবারেই পাংচার! অগত্যা শিব মনসাকেই স্বর্গভূমি থেকে বিদায় দিয়ে সিজুয়া পর্বতে নির্বাসন দিলেন। অবশ্য বিশ্বকর্মাকে দিয়ে সিজুয়াতেই মনসার নগর নির্মাণ করে দিয়েছিলেন। আর সঙ্গে দিয়েছিলেন আর এক মেয়ে নেতাকে। নেতা শিবের চোখের জল থেকে জন্মেছিল আর মহাদেবের ঘাম থেকে জন্মাল একটি ছেলে, যার নাম রাখা হল ধামাই। ধামাইকে রাখলেন মনসার পাহারার কাজে। ধামাই আসলে দাঁড়াশ সাপ।”
এত অবধি বলে বিমলা কফির কাপে চুমুক দিলেন। সদ্য পুকুর থেকে তোলা ক’টা চিংড়ি মাছের বড়া এনে রাখল রঞ্জু। সবাই পটাপট বড়া মুখে ফেলে গল্পের বাকি অংশ শোনার অপেক্ষায়।
সাধন ঘরে এসে বলল, “তোরা সবাই খেয়ে নিস। আমি একটু বেরোচ্ছি। ফিরতে দেরি হতে পারে। আজ আর আমার জন্য অপেক্ষা করিস না।”
রঞ্জু হা হা করে উঠল—“সে কি! না খেয়ে কোথায় যাচ্ছ আবার? এই দুপুরবেলা দোকান না খুললেই কি নয়?”
“না না, দোকানে নয়। একটু থানায় যাচ্ছি।”
“থানা?” সকলেই প্রায় একসঙ্গে প্রশ্ন করল।
“হ্যাঁ, আমাদের আশরাফ যে একটা গোলমালে জড়িয়ে পড়েছে! ওর তো এখানে তেমন কেউ নেই। যাই একবার দেখে আসি। এখান থেকে হেঁটে থানায় যেতে প্রায় ঘণ্টা দেড়েক তো লাগবেই। তারপর সেখানে কথাবার্তা বলে আশরাফের জন্য কিছু একটা করার চেষ্টা করতে হবে। সব সেরে ফিরে আসতে আবারও ঘণ্টা দেড়েক।”
“এই এতটা পথ হেঁটে না গিয়ে টোটোয় চড়ে যাও না?”
শমিতের কথায় সকলেরই সম্মতি। রঞ্জু বলল, “গোপালকে ফোন করব? গোপালের রিকশায় যাবে?”
টোটো, রিকশা সবকিছুকে নাকচ করে দিয়ে সাধন বলল, “না না, আমার ওসব টোটো-রিকশায় হবে না। আমার এগারো নম্বর গাড়িই যথেষ্ট।”
সাধনের কথায় আজ ওরা জানতে পারল নিজের পাকে ‘এগারো নম্বর গাড়ি’ বলে। আজ কিন্তু সাধনের আচরণে ওরা হাসতে পারল না। সকলেরই একটু দুর্ভাবনা হল। মামা আবার কেন এসবের মধ্যে নিজেকে জড়াচ্ছে? রঞ্জু আর বিমলার মনের অবস্থাও একইরকম।
গল্পে বেশ অনেকক্ষণ ছেদ পড়েছে। সাধন বেরিয়ে যাওয়ার পর আবার ওরা বিমলাকে ঘিরে বসল। পুরো গল্পটা ওদের শুনতেই হবে। বিমলা অবশ্য প্রথমে বললেন, “পুরো গল্প কি একদিনে শেষ হয়? এমনকি গাওনরাও পুরো মনসামঙ্গল কাব্য একদিনে ভাসানের পালায় গাইতে পারেন না। বাইশ জন মনসামঙ্গলকার বাইশ দিনে এই গান গাইতেন, তাঁদের বাইশ্যা বলা হত।”
“তা হোক, তুমি সংক্ষেপে হলেও জালু-মালুর গল্পটা আজ বলো মণিমা।” প্রিয়াঙ্কার গলায় আবদারের সুর।
বিমলা আবার শুরু করলেন—“দেবলোক থেকে মনসা একরকম বিতাড়িত হয়েই সিজুয়া পর্বতে বাস করতে লাগলেন। এর মধ্যে জরৎকারু মুনির সঙ্গে মনসার বিবাহ আর আস্তিক উপাখ্যান এইসব মহাভারতীয় কাহিনিও আছে। মঙ্গলকাব্য লোককাব্য হলেও এর দেব খণ্ড পুরাণ আর মহাভারত থেকে সংগৃহীত।
“বেদ, পুরাণ, মহাভারত দেব ভাষা অর্থাৎ সংস্কৃতে লেখা। আর সেইসব পুথির পাঠাধিকার একসময় কেবল সমাজের উচ্চশ্রেণির মানুষদেরই ছিল। জেলে, মুচি, দর্জি, কামার, ছুতোর, ঘরামি, গোয়ালা, চাষি, ব্যাধ এইসব কঠোর পরিশ্রমী মানুষেরা জাতপাত, ধর্মের কড়াকড়ি ও চাপের মধ্যে নিজেদের প্রাণ ওষ্ঠাগত মনে করতেন। তাই তাঁরা দলে দলে ধর্মান্তরিত হতে লাগলেন। বিশেষ করে শাসকের ধর্মকে গ্রহণ করলে জীবন কিঞ্চিৎ সহজ হবে এমন আশাই হয়তো তাঁরা করতেন। এইরকম সময় লোকজ দেবদেবীকে কেন্দ্র করে লোকজ ভাষায় কাব্যগাথা লেখা হল। সেই লোককাব্যই মঙ্গলকাব্য।”
বিমলা কিছুক্ষণ থামলেন। তারপর আবার শুরু করলেন গল্প-
“স্বর্গের গোধন ছিল কপিলা। সে এক আশ্চর্য দৈব ক্ষমতাসম্পন্ন গাভী। কপিলা একদিন ভুল করে শ্রীরাম তুলসীর পাতা খেয়ে ফেলেছিল। তাই অভিশাপগ্রস্ত হয়ে মর্ত্যে চলে আসতে হল কপিলাকে।
“কপিলার সন্তান প্রবল বলশালী মনুরথ দৈব দুর্বিপাকে মাকে হারিয়ে ক্ষুধা-তেষ্টায় ক্লান্ত হয়ে সমস্ত সমুদ্রের জল খেয়ে ফেললে। পরে কপিলা গাভীর দুগ্ধে সমুদ্র আবার ভরে উঠল। এবার সমুদ্র হল ক্ষীরসাগর। সেই ক্ষীরসাগর মন্থন কাহিনি তো তোদের সকলেরই জানা। বাসুকিকে দড়ি করে মন্দার পর্বতের সাহায্য দেবতা ও অসুরগণ মিলে সমুদ্র মন্থন করলেন। এই সমুদ্র মন্থনে যেমন বিপুল ধনরাশি নিয়ে লক্ষ্মী উঠে এলেন এবং নারায়ণের গৃহিণী হলেন; ইন্দ্রের ঐরাবত উঠে এল; মনসামঙ্গল অনুযায়ী এসবের সঙ্গে ধন্বন্তরি ও চাঁদসদাগরও উঠে এসেছিল। মন্থনে একদিকে যেমন অমৃত উঠেছিল, আর একদিকে উঠেছিল বিষ। সমস্ত পৃথিবী হলাহলে ছেয়ে যেতে পারে তাই শিব গ্রহণ করলেন সব বিষ। বিষের তীব্রতায় শিব তো মূর্ছা গেলেন। তখন দেবতারা সবাই মনসাকে ডেকে পাঠালেন।
“বিষহরি মনসা সব বিষ বার করে আনলেন। তারপর বিশ্বকর্মার বানানো তৌল অর্থাৎ দাঁড়িপাল্লায় সমস্ত বিষ মেপে-ঝেপে সর্পকুলের মধ্যে ভাগ করে দিলেন। কেবল সর্পকুলই নয় কিছু বিষ দিলেন ভ্রমরকে, কিছু মৌমাছিকে আর কিছু পোকামাকড়কে।
“শেষে দাঁড়িপাল্লায় যেটুকু বিষ ছিল তা চেটে নিল চিতি সাপ। সব বিষ শেষ হলে এল ঢোঁড়া সাপ, ধামাই, লাউডগা আর হ্যালা সাপ। এদের জন্য কোনও বিষই আর অবশিষ্ট ছিল না। তাই আজও দাঁড়াশ, লাউডগা, হেলে সব নির্বিষ।”
বিমলাকে গল্প ভর করেছে। এবার একদম না থেমেই বলে চলেছেন, “দেবাদিদেব মহাদেবের জ্ঞান ফেরার পর থেকেই দেবতারা সবাই ‘জয় বিষহরি’ ধ্বনিতে চরাচর ভরিয়ে দিল। এরপর থেকেই মনসার পূজা দেবলোকে প্রচারিত হল। দেবতাদের পুরীতে মনসাপূজা হত যথাযথ বিধানে। একদিন মনসা ঠিক করলেন অমরাবতীতে এসে নিজের পুজো দেখবেন। সেদিন ইন্দ্র তাঁর দুই পুত্র পুরধর আর মালাবরকে পুজোর ফুল আনতে সোনার সাজি দিয়ে পাঠালেন স্বর্গের বাগানে।
“স্বর্গের সমস্ত উদ্যান ঘুরেও পারিজাত দূর, একটা বেল-আকন্দও পেলে না পুরধর-মালাবর। খরতরি বিষহরি অসন্তুষ্ট হলে মহাবিপদ। দুই ভাই তখন ফুল খুঁজতে পৃথিবীতে এল। মনসার মায়ায় পৃথিবীও সেদিন ফুলশূন্য।
“এ-বাগান সে-বাগান ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত দুই ভাই একটা নদীর ধারে এসে দেখল ধীবররা খুব সুখে মাছ ধরছে। দুই ভাই মনে মনে ভাবলে, ‘ধীবররা সব আমাদের চেয়ে অনেক বেশি সুখী। কেমন নিশ্চিন্তে মাছ ধরছে। আর আমরা সারাদিন ক্লান্ত অবসন্ন হয়ে এত খুঁজেও একটা ফুলও পেলাম না। এখন অমরাবতীতে ফিরলে না জানি কী হয়। পিতার অপ্রসন্নতা, দেবী মনসার কোপ?’ এর চেয়ে বেশি আর কিছুই ভাবতে পারল না ইন্দ্রপুত্ররা।”
এই পর্যন্ত বলে বিমলা প্রিয়াঙ্কাকে জিজ্ঞেস করলেন, “মনসা নামের মানে জানিস?”
প্রিয়াঙ্কা চেষ্টা করল, “মন থেকে কি মনসা?”
বিমলা খুব খুশি হলেন, “মনসা মনের মাঝে/ সকল দেবতা পূজে/ মনসা মনের জানে কথা।। একদম ঠিক বলেছিস। মনসা তো মনের কথা সব জানতে পারেন। মনের আশা পূরণ করতে পারেন, সেই কারণেও অনেক জায়গায় এই দেবীকে মনসা বলে। হরিদ্বারে পাহাড়ের উপরে মনসা দেবীর মন্দিরের কথা ভাব! ওখানে কিন্তু সাপের কোনও গল্প নেই। দেবী ওখানে কেবলই মনের আশা পূরণ করেন।” শৈলেশের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আমি লোক-বিশ্বাসের কথা বলছি। তোদের কাউকে কিন্তু কিছু বিশ্বাস করতে বলিনি!”
শৈলেশ একটু অপ্রতিভ হল। দিদি কীভাবেই-বা ওর মনের কথা জানতে পারল?—“আরে দিদি! তুমি গল্পটা বলো না। আমি তো গল্পই শুনছি কেবল আর এই গল্প সত্যিই খুব ইন্টারেস্টিং।”
বিমলা আবার কাব্যকাহিনিতে ফিরলেন, “পুজোর ফুল না নিয়ে ইন্দ্রপুরীতে ফেরার জন্য মনসা দুই ভাইকে অভিশাপ দিয়ে মর্ত্যে পাঠালেন। ইন্দ্র আর শচীদেবী তো আকুলিবিকুলি বুকফাটা কান্নায় ভেঙে পড়লেন। ইন্দ্র আর শচীকে আশ্বাস দিয়ে মনসা বললেন, ‘পুরধর, মালাবর মর্ত্যে এক ধীবর মাতার গর্ভে জন্মগ্রহণ করবে। ওরা আমার ব্রতদাস। মর্ত্যে ওদের নাম হবে জালু-মালু। ওরাই ধীবরদের মধ্যে আমার পূজা প্রচারিত করবে।’
“মনসার ইচ্ছা অনুযায়ী এক মালোর ঘরে দুই ভাই জন্ম নিল।
“জালু আর মালু দুই ভাই বড়ো হয়ে মাছ ধরায় একেবারে ওস্তাদ হয়ে গেল। খুব তাড়াতাড়ি প্রথম শ্রেণির ধীবরে পরিণত হল। মনসার মায়ায় একদিন চাঁদসদাগর জালু-মালুকে হুকুম করলেন শতভার মীন ধরে আনতে। এই শতভার মীন চম্পাই নগরের প্রধান নদী গাঙ্গুরের সবচেয়ে বড়ো মাছ। কিন্তু সেই মাছ বড়ো দুর্লভ। জালু-মালু কী করে পাবে ওই মাছ?
“চাঁদব্যানা তখন সমাজের মাথা। তাঁর হুকুম মানতেই হবে ওদের।
“অনেক চেষ্টা করেও শতভার মীন না পেয়ে জালু-মালু বিষণ্ণ মনে ঘাটে বসে ছিল। মনসা সেই সময় বুড়ি জরতীর বেশে জালু-মালুর কাছে এলেন। ওদের নাওয়ে বুড়িকে নদী পারাপার করে দিতে অনুরোধ করলেন। গরিব বুড়ির কাছে একটা সিকিও যে নেই সে-কথাও জানালেন। পারানি দিতে পারবেন না কেবল মনের কামনা পূরণ হওয়ার আশীর্বাদই দিতে পারবেন।
“জালু-মালু কিন্তু বুড়িকে একদমই পাত্তা দিল না। বিষহরি তবুও রাগেননি ওদের ওপর। ওদের মা নিছনি যে রোজ মনসার আটনে পূজা দেয়। দেবী বরং ওদের সহায় হলেন। ছলে-বলে-কৌশলে নৌকায় উঠে পড়লেন। তারপর ঠিক যেখানে নদীতে জাল ফেলতে বললেন, সেখানেই জাল ফেলে শতভার মীন পেল ওরা। বিশাল ওই মাছটাকে নৌকায় তোলার পরে ওরা দেখল নৌকায় কেউ নেই।
“বাড়ি এসে মায়ের কাছে সব খুলে বলায় মা বুঝতে পারলেন স্বয়ং দেবী মনসার সঙ্গে আজ তাঁর দুই পুত্রের দেখা হয়েছিল। নিছনি দুই পুত্র নিয়ে নিজের সাধ্যমতো আয়োজন করে দেবীর পুজো করলেন। পুজোয় দিলেন খেজুরের রস, পাকা কলা আর নারকোল। তারপর থেকেই জেলেপাড়ায় মনসাপুজোর প্রচলন। এর পরের গল্প তো চাঁদবেনে আর মনসার দ্বৈরথের গল্প। সে-কাহিনি মোটামুটি সবটাই জানিস তোরা।”
বিমলা থামলে শমিত বললে, “ওহ্! তাহলে দেবীমূর্তিটা জরতীরূপী মনসামূর্তি!”
তিন
সাধন ফিরল রাত দশটায়। সারাদিন রঞ্জু আর বিমলার উৎকণ্ঠায় কেটেছে। দুপুরের খাওয়াটাও ওদের কারোরই তেমন জমেনি। যে-মানুষটা অত আয়োজন করে সকাল থেকে মাছ ধরাল, সেই কোন ভোর থাকতে উঠে বাজারে গেল, সে দুপুরে খেতে পর্যন্ত আসতে পারল না?
ঠিক কী কারণে সাধন বিষয়টার সঙ্গে নিজেকে জড়াতে চলেছে তা কারোরই বোধগম্য হল না। সোনাহাটি ইস্পেশাল বিরিয়ানি বার কয়েক অবশ্যই খেয়েছে সাধন, আশরাফের সঙ্গে গল্প আড্ডাও দিতে পারে, তবে এত চালু দোকানে আশরাফ তো সবসময়ই ব্যস্ত! কতটুকুই-বা গল্প করার সময় ওর? তাহলে ঠিক কী কারণে? সাধনের ব্যক্তিগত স্বভাব-চরিত্রের সঙ্গে আজকের আচরণটা ঠিক মেলাতে পারছে না ওরা কেউই। এমনকি রঞ্জু পর্যন্ত বুঝতে পারছে না কেন এমন তাড়াহুড়ো করে না খেয়ে আশরাফের জন্য ওকে থানায় ছুটতে হল?
সাধন মোবাইল ফোন ব্যবহার করে না। তাই সারাদিন উৎকণ্ঠা সত্ত্বেও ওকে কেউ ফোন করে খোঁজ নেবে তেমন সম্ভাবনাও ছিল না।
বিকেলে ওরা তীরমণি নদীতে আবিদ মাঝির নৌকায় বেড়াতে যাবে ঠিক করেছিল। কিন্তু সাধন না ফেরা পর্যন্ত রঞ্জুকে ছেড়ে কোথাও যেতে ওদের মন চাইল না। স্রেফ বাড়ির মধ্যেই আজকের সমস্ত দিনটাই কেটে গেল।
অত রাতে ফিরে সাধনের কিন্তু খুব উৎসাহ। সে বাইরের পোশাক পরিবর্তন না করেই ভাগনি-ভাগনে ও শৈলেশকে তার নতুন দোকান দেখাতে নিয়ে যেতে চায়। বিমলাকেও সঙ্গে আসতে অনুরোধ করছে। চাকরি থেকে অবসরের পরে এই দোকানই এখন সাধনের ধ্যানজ্ঞান। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা উপেক্ষা করে যেভাবে দোকানের জন্য ও খাটছে, সেই গল্প রঞ্জুর কাছে বিমলা শুনেছেন। সাধন যখন চাকরিতে ছিল তখনও একইরকম পরিশ্রমী ছিল। নিজের প্রাপ্য ছুটিগুলোও নেয়নি খুব বেশি। বরং অন্য কেউ ছুটি নিলে প্রতিদিনই ওভার ডিউটি করত। এতে অবশ্যই বেতনের অতিরিক্ত কিছু বাড়তি রোজগার হত। আত্মীয়-বন্ধু সকলেই ওর এই টাকা রোজগারের নেশাকে টাকা পাগল, কিপটে, টাকার খাই ইত্যাদি বললেও বিমলার কিন্তু মনে হয় তার ভাই টাকা রোজগারকে একটা শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। সে তো চুরি-ডাকাতি বা মিথ্যাচার কিছুই করছে না। কেবল টাকা রোজগারের জন্য নিজের সবটুকু আলস্য বিসর্জন দিয়ে পরিশ্রম করছে। এরকম পরিশ্রমী কজনই-বা হয়? আগে যেমন চাকরির জন্য কঠোর পরিশ্রম করত, এখন এই বয়সে ঠিক সেই পরিশ্রম নিজের দোকানকে দাঁড় করাতে করে চলেছে।
সাধনের ব্যতিক্রমী ভাবনাকে বিমলা শ্রদ্ধা করে। সাধন চায় না ওর একমাত্র ছেলে দীপ বিরাট কোনও চাকরি করে। বরং বাবার হাতে গড়া ব্যাবসাতে ছেলে যদি মন দিতে পারে, পরিশ্রম করতে পারে, তাহলেই ও সবচেয়ে সুখী। দীপ কলকাতার কলেজে পড়লেও বাবার দোকানেই ফিরে আসবে হয়তো পড়া শেষে। আত্মীয়দের মধ্যে অনেকের ছেলেই ভালো চাকরি করে। বিমলার মাসতুতো ভাইয়ের ছেলে ডাক্তারি পড়ছে। শৈলেশ ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্র। দীপ সাধারণভাবে বিএ পাশ করেই বাবার দোকানে এসে বসবে, এটা যেন অন্য আত্মীয়দের চোখে সাধন ও তার পরিবারকে কেমন একটা ছোটো করে দিচ্ছে। সকলেই এই কথা বলেন যে বাবার এত টাকা তবুও ছেলে মানুষ হল না।
বিমলা বিষয়টাকে অন্যভাবে ভাবেন। ব্যাবসাতে যদি সাধনের ছেলে সাফল্য পায় তাহলে সেই সাফল্য কোনও সফল চাকুরির সাফল্যের চেয়ে কম কেন?
এখনকার ছেলেমেয়েরাও এই বিষয়টা বোঝে না। সাধনের হার্ডওয়ারের দোকান দেখতে কিছুতেই ওরা রাজি নয়। শৈলেশ বলছে, “এই শীতের রাতে তোমার দোকানে একটা শর্তে যেতে পারি সাধনদা।”
“শর্ত? শর্ত আবার কীসের? বাড়ির কাছেই তো দোকান। দু-পা হাঁটতে হাঁটতে চলে যাবি, তার আবার শর্ত?”
শর্ত না মানলে কেউই দোকান দেখতে যাবে না। সকলেই জানাল।
বিমলা বললেন, “আহা! সারাদিন খাওয়া হয়নি ওর। এখন শর্ত-ফর্ত রাখ তো!”
সাধন কী যেন বলতে যাচ্ছিল। বিমলা থামিয়ে দিয়ে বললেন, “তুই খাওয়া-দাওয়া সেরে নে। আমরা তো আছিই। কাল ওরা তোর দোকান দেখতে যাবে দিনের বেলায়। কোনও শর্ত ছাড়াই।”
সাধন তবুও যেন নাছোড়, “আরে কত নতুন ডিজাইনের সব লাইট লাগিয়েছি। অল্প আলো, কিন্তু দারুণ আবেশ। একদম বাথরুমের জন্য উপযুক্ত। সেগুলো দিনের বেলায় দেখলে তোমরা বুঝতে পারবে না তেমন। তাছাড়া, আমাকেও একটা কাজে এখন দোকানে যেতেই হবে। চাবিটা ফেলে এসেছি তাই বাড়িতে এলাম। তোদের সকলকে সঙ্গে করে নিয়ে গেলে ভালো লাগবে। আর না করিস না। চল। তোদের সরমার স্পেশাল ক্ষীরকদম্ব খাওয়াব। মনটা আজ খুশি। কেন জানিস?”
বিমলা জিজ্ঞেস করলেন, “কেন?”
মিটিমিটি হাসতে হাসতে সাধন বললে, “একদম নিখরচায় আশরাফের জামিন হয়ে গেল। ও আবার ওর দোকানে ফিরে গেছে।”
সকলে এই খবরটায় সমান উত্তেজিত। শমিত বললে, “তাহলে শৈলমামার কী শর্ত জানি না, আমার শর্ত হল, এই শীতে যদি রাঙামামার দোকান দেখতে যেতেই হয় ফেরার সময়ে সোনাহাটির ইস্পেশাল বিরিয়ানি চাই-ই।”
সাধন বললে, “ওর চেয়েও ভালো বিরিয়ানি আমি তোদের খাওয়াব। তবে আজ নয়।”
শৈল সঙ্গে সঙ্গে ফুট কাটল—“আজ না হোক যেদিনই খাই, সোনাহাটির স্পেশাল বিরিয়ানিই খাব। ওর দাম এখানে সবচেয়ে বেশি। বাকি ছোটোখাটো দোকান নতুন হলেও তেমন স্বাদ হতেই পারে না।”
একটা তর্কবিতর্কের পরিস্থিতি হতে চলেছে দেখে বিমলা থামাতে চেষ্টা করলেন—“আচ্ছা। বিরিয়ানি কাল আমি তোদের খাওয়াব। সোনাহাটি স্পেশালই। আজ চল সাধনের দোকান থেকে ঘুরে আসি। সারাদিন বাড়ির মধ্যে আছি। একটু বেরোলে ভালোই লাগবে। সরমার ক্ষীরকদম্বও তো সন্ধেবেলায় বানায়। এখনই বেরিয়ে পড়ি চল।”
চার
সোনাহাটিতে আজ যেন জাঁকিয়ে শীত পড়েছে। বিমলা কোমরে ব্যথা অগ্রাহ্য করে এই শীতের রাতে সবার সঙ্গে চলেছেন সাধনের নতুন দোকান দেখতে। কাল আবিদের নৌকায় চেপে বাচ্চাদের সঙ্গে তীরমণির জঙ্গল দেখতে যাওয়ার কথা। সোনাহাটিতে এসে বিমলা যেন বাচ্চাদের বন্ধু হয়ে উঠেছেন। না-হলে শৈল একবার বলতেই উনি তীরমণি যেতে রাজি হলেন!
পথে দুটো খেজুরগাছ দেখে সাধন বলল, “কাল বাপীকে বলে দেব। এক হাঁড়ি টাটকা রস দিয়ে যাবে ভোরে। তবে বেলা করে ঘুম থেকে উঠলে রস গেঁজে যাবে। ভোরের আলো ফোটার আগেই উঠে পড়বি, কেমন? এখানে ভোরটাও এত মিষ্টি যে বিছানায় পড়ে থাকলে পরে পস্তাতে হবে।”
“খেজুরের রস যখনই খাব তখনই মিষ্টি।”
রোহণ কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গে শমিত ধমক দিল, “যা জানিস না তা নিয়ে কথা বলিস কেন? খেজুরের রস সংগ্রহ কিন্তু একটা দেখার মতো বিষয়। অত কাঁটা এই গাছগুলোতে, কিন্তু সেই কাঁটার মাঝে গাছের ঠিক কোথায় হাঁড়িটা বাঁধলে রস পাওয়া যাবে তা কেবল শিউলিরাই বুঝতে পারেন। বিরাট গুণী হন তাঁরা।”
“ঠিক কত ভোরে উঠলে হাঁড়ি বাঁধা দেখতে পাব, রাঙামামা?”
শমিতের প্রশ্ন শুনে সাধন একটু হাসল। কোনও উত্তর না পেয়ে আবার শমিত জিজ্ঞেস করল, “ক’টায় উঠলে দেখতে পাব? আমি মোবাইলে অ্যালার্ম দিয়ে শোব আজ। কাল ভোরে আমি এখানে আসবই।”
এইবার সাধন কথা বলল, “আহা! মোবাইলে অ্যালার্মের কোনও প্রয়োজন নেই। আসতে চেয়েছিস, আমি ডেকে দেব তোকে। তোর মামার চেয়ে বড়ো অ্যালার্ম আর কিছুই নেই। রোজ রাত ভোর হওয়ার আগেই আমার ঘুম ভাঙে।”
“ভোর রাত্রে উঠে তুমি কী করো? প্রাণায়াম?” প্রিয়াঙ্কার বলার ভঙ্গিতে সকলে হেসে ফেলল।
সাধন একটু রাগ করল যেন, “হাসার কী আছে? কোনটা হাসির? প্রাণায়াম, না ভোর রাত্রে ওঠা?”
কথায় কথায় ওরা সাধনের হার্ডওয়ারের দোকানে চলে এসেছে। ঘড়িতে প্রায় দশটা বাজে। সাধন অতি উৎসাহে দোকানের শাটার তুলে আলো-টালো সব জ্বেলে দিল। শৈল, বিমলা আর ভাগনেদের মন দিয়ে দেখাচ্ছে নতুন কেনা জিনিসপত্র।
প্রিয়াঙ্কা একটু বিরক্ত যেন। এই শীতের রাতে এখন বাথরুমের শাওয়ার, জলের কল, নতুন কেনা কমোড এসব দেখতে ওর মোটেই ভালো লাগছে না। বিমলা ছাড়া বাকিদেরও একই মনের অবস্থা। প্রিয়াঙ্কা বলেই ফেলল, “এই ঠান্ডায় টয়লেট যেতেই মন চায় না আর এখন এখানে আস্ত সব টয়লেট বাথরুম দেখতে আমার একটুও ভালো লাগছে না। এবার ফিরে যাই চলো।”
সাধন কিন্তু দমবার পাত্র নয়, “আরে শৌখিন বাথরুমে ফিট করার জন্য কত নতুন রঙবেরঙের আলো এনেছি সেগুলো দেখবি না? তাছাড়া কত নতুনভাবে যে বাথরুম সাজানো যায় তা এই ব্যাবসায় না নামলে বুঝতেই পারতাম না। সব দেখে নে ভালো করে। যত দেখবি, জ্ঞান বাড়বে বই কমবে না।”
“ধুর! বাথরুম সাজানো নিয়ে জ্ঞান বাড়ানোর কোনও প্রয়োজন নেই আমার।” প্রিয়াঙ্কার কথায় সবাই হেসে ফেলল।
বিমলা কখন যে দোকানের ভেতরের ঘরে চলে গেছেন কেউ খেয়ালই করেনি। সাধন বাইরে থেকে চিৎকার করল, “দিদি, ওখানে আলো নেই রে। একটা জিরো পাওয়ারের লাইট ছিল। কেটে গেছে। তুই বেরিয়ে আয়। আমি একটা ছোটো বাল্ব্ লাগিয়ে দিচ্ছি।”
বিমলার অন্ধকারে চোখ সয়ে গেছে। বেরিয়েই আসছিল। কী যেন শক্তমতো পায়ের কাছে ঠেকল। বিমলা কোমরে স্লিপ-ডিস্কের কারণে নীচু হতে পারেন না। বেরিয়ে আসতে গিয়েও কী মনে করে মোবাইলের আলোটা নীচে ওই শক্তমতো জিনিসটার ওপর ফেললেন। যা দেখলেন, ওঁর মুখ-চোখ একেবারে সাদা হয়ে গেল!
সাধন কিন্তু মুখে বললেও কোনও বাল্ব্ ওই ঘরে লাগাল না। বরং প্রায় টেনে বিমলাকে ঘর থেকে বার করে দরজাটা বন্ধ করে দিল। এরপর সাধন আরও কিছুক্ষণ ওদেরকে সব নব্য আবিষ্কৃত বাথরুম সাজানোর জিনিসপত্র দেখিয়ে সেদিনকার মতো ক্ষান্ত দিল।
বিমলা ওই ঘরে যা দেখেছিলেন, তারপর আর একটা কথাও বলতে পারেনি। নিজের পরিশ্রমী সৎ ভাইটাকে এরপর যেন চিনতে পারছিলেন না। এই যে ভাগনেদের প্রচণ্ড বিরক্তি উপেক্ষা করে অত মনোযোগ দিয়ে সবকিছু দেখাচ্ছে, এটা ওর সরলতা, না সরলতার আড়ালে অন্য কিছু?
বাড়ি ফেরার পরও বিমলা কিছুতেই চিন্তাটা মাথা থেকে ঝাড়তে পারছেন না। সরমার ক্ষীরকদম্ব ছুঁয়েও দেখেননি। রঞ্জুর অনেক সাধাসাধিতেও রাত্রে বিশেষ কিছু খাননি।
রাতে বিমলা ছোটো বোন খুকুর ঘরে শুতে এলেন। ছেলেমেয়েরা সব ওপরে সাধনের ঘরেই শোবে। খুকু টুকটাক গল্প করছে। এবার আমফানে খুকুর ঘর জলে থইথই করছিল। একা ও প্রায় পঁচিশ বালতি জল ফেলেছে। সাধন একবারও সাহায্য করতেই আসেনি। সারাদিন সাধন কেবল টাকা আর টাকা করেই কাটিয়ে দেয়।
এই কথা শুনে বিমলা জিজ্ঞেস করলেন, “টাকার জন্য নতুন কিছু কি করছে সাধন?”
খুকু কথাটা বুঝতে পারল না।
“নতুন কোনও বন্ধুবান্ধব বা তোর অচেনা কোনও লোকজন কি সাধনের কাছে আসে? তুই দেখেছিস?”
খুকু সেরকম কিছু দেখেনি বলল। তারপর দু-বোন কখন ঘুমিয়ে পড়েছে খেয়াল নেই। খুকুর ঘরের দরজায় ধাক্কা শুনে বিমলা ধড়ফড় করে উঠে বসল। ঘড়িতে তখন রাত তিনটে। বাইরে সাধনের গলা, “বড়দি জেগে আছিস?”
খুকু বেড সুইচ জ্বালিয়ে বিছানা থেকে নেমে দরজা খুলল। সাধন ঘরের ভিতর ঢুকে দরজা বন্ধ করে বলল, “ওদের পাঠালাম শিউলির হাঁড়ি বাঁধা দেখতে। এরকম সময়ই তো খেজুরগাছে হাঁড়ি বাঁধে।” তারপর সোফায় আরাম করে বসে বিমলাকে বলল, “তোর সঙ্গে কিছু কথা আছে আমার। এখনই বলা প্রয়োজন। খুকু শুনলেও ক্ষতি নেই।”
পাঁচ
পরদিন দুপুরে ওরা সবাই সোনাহাটির ‘ইস্পেশাল বিরিয়ানি’ খেতে গেল। সবাই বলতে রোহণ, প্রিয়াঙ্কা, শমিত আর শৈল। খুকুর কাছেই আজ বিমলা দুপুরে খাবেন। সাধন আর রঞ্জুরও নেমতন্ন। বাচ্চারা সব রাত্রে খাবে বলে সকালবেলাই হইহই করে বেরিয়ে পড়ল।
সাধন অবশ্য বলল, ওই বিরিয়ানি খেলে শুধু শুধু টাকা নষ্ট হবে। সাধনের এই টাকা নষ্টের কথা কেউই আমল দিল না। সারাদিন প্রচুর ঘোরাঘুরি করল ওরা। বারো মন্দির ঘাট, ক্ষিরীশতলা কালীবাড়ি, চণ্ডীতলার মাঠ এইসব পুরোনো জায়গা দেখতে দেখতে ওরা এল তালপুকুরের কাছে ‘সোনাহাটি ইস্পেশাল বিরিয়ানি’-র দোকানে।
একে সারাদিন ঘোরাঘুরিতে ওরা খুব ক্লান্ত। তায় এই বিরিয়ানির লোভেই তো বার বার ফিরে আসতে চায় সোনাহাটিতে। এক প্লেট ধোঁয়া ওঠা বিরিয়ানি ওদের সামনে রাখতেই মন যেন সব ক্লান্তি দূর করে দিল।
“আহা! কোথায় লাগে রয়্যাল আমিনিয়ার বিরিয়ানি। এই সোনাহাটির বিরিয়ানিই আমার কাছে অমৃততুল্য।”
“অমৃত? বিরিয়ানি আবার অমৃত কেন? বিরিয়ানি কি মিষ্টি যে অমৃত হবে?”
রোহণ আর শমিতের কথাবার্তায় একদম মনোযোগ না দিয়েই প্রিয়াঙ্কা এক চামচ বিরিয়ানি মুখে দিয়েছে। শৈলেশ তা দেখে বললে, “আমি বিরিয়ানি হাত দিয়েই খাই।”
তারপর এক গরাস বিরিয়ানি মুখে দিয়েই ওর মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেল। একই অবস্থা রোহণ-শমিতেরও। কেউ কোনও কথা বলতে পারল না প্রথমটায়। কেবল ফ্যাল ফ্যাল করে বিরিয়ানির দিকে তাকিয়ে আছে। দ্বিতীয় গরাসটাও শৈলেশ মুখে দিয়ে ফেলল। তারপর প্রায় চিৎকার করে বলল, “এ কী? এ কেমন করে সম্ভব?”
বাকিদের মুখেও একই প্রশ্ন।
রোহণ বলল, “এটা তো সোনাহাটির বিরিয়ানি নয়। আমরা ভুল দোকানে আসিনি তো?”
ওর কথাটা বেশ জোরেই বলল। যে-ছেলেটা টেবিলে খাবার দিচ্ছিল, সে এসে বললে, “হ্যাঁ, স্যার। এটা সোনাহাটির ইস্পেশাল বিরিয়ানির দোকান। আজকের নয়, প্রায় পঁচিশ বছরের পুরোনো এই দোকান। কলকাতার লোকজন এসে এখানে বিরিয়ানি খেয়ে অবাক হয়ে ফিরে যান। এত স্বাদ!”
“স্বাদ না ছাই! এটা একটা বিরিয়ানি? এত বাজে বিরিয়ানি আগে কখনোই খাইনি। সোনাহাটি বলতেই গাছ নয়, পুকুর নয়, সোনাই নদী নয়, এমনকি আমাদের মামাবাড়িও নয়, কেবল এই দোকানের কথাই মনে পড়ে। আর তা কেবল এই দোকানের বিরিয়ানির জন্যই। সেই বিরিয়ানির এই হাল?” রোহণের কান্না পাচ্ছে কথাগুলো বলতে।
শমিতের মাথা এদের সবার মধ্যে সবচেয়ে ঠান্ডা। সেই শমিতও রেগে গিয়ে বলল, “তোমাদের রাঁধুনি কি বদলেছে?”
ছেলেটে উত্তর দিল, “না স্যার, রাঁধুনি বদলাবে কেন? একই রাঁধুনিই তো আছে।”
“হতেই পারে না। রাঁধুনিকে অ্যারেস্ট করা হয়েছিল। আমরা কাগজে পড়েছি। যদিও কাল শুনলাম তোমাদের রাঁধুনি এখানে ফিরে এসেছে। তবে এ-রান্না সে রাঁধেনি।”
প্রিয়াঙ্কার কথা শুনে ছেলেটি বলল, “ম্যাডাম, আপনার ভুল হচ্ছে। আমাদের সব কর্মচারীই হোটেলে আছে। কেউ আজ কামাই করেনি। আর অন্য রাঁধুনির প্রশ্নই নেই।”
“তাহলে একবার রান্নাঘরটা দেখব আমরা।”
শৈলেশের কথায় ছেলেটা ঘাবড়াল না। খুব সহজভাবেই বলল, “এভাবে রান্নাঘরের ভিতর দেখা কি ঠিক দাদাভাই?”
শৈলেশ একটু রেগে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল। শমিত তার আগেই শান্তভাবে উত্তর দিল, “এতে তোমাদেরই লাভ। উনি লেখক। বিরিয়ানি নিয়ে প্রবন্ধ লিখছেন। তোমাদের রান্নাঘরটা একবার দেখে এলে ভালো করে লিখবেন এই দোকান সম্বন্ধে। এ তো আমাদের ছোটোবেলার চেনা দোকান!”
এই কথায় চিঁড়ে ভিজল। ছেলেটা ওদেরকে রান্নাঘরের ভিতর নিয়ে এল। বলল, “এই যে এরাই প্রতিদিন রাঁধে। কত লোক খায় এখানে রোজ। বিরিয়ানির লোভে দূর দূর থেকে লোক আসে এখানে।”
উনুনে বড়ো কড়াইতে মাংসের ঝোল নাড়তে নাড়তে কাঁধের গামছায় মুখ মুছছিল একটা লোক। এই শীতেও লোকটা অল্প অল্প ঘামছে। লোকটা বলল, “আমার হাতের রান্না খেতে মুর্শিদাবাদ, কলকাতা সব জায়গা থেকেই লোক আসে।”
প্রিয়াঙ্কার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল—“তোমার হাতের রান্না খেতে? তুমি এখানে রান্না করো?”
লোকটা হাসতে হাসতে উত্তর দিল, “আজ্ঞে। আপনারা এই মাংসের শোরমাটা একটু চাখবেন? এটারও আজকাল খুব সুখ্যাতি। খাবেন দিদিমণি?”
“না, থাক।” মুখে এইটুকু কথা বললেও মনে মনে প্রিয়াঙ্কা বলল, “যা বিরিয়ানির নমুনা টের পেলাম, আর শোরমা চাখার প্রয়োজন নেই বাবা!”
দোকান থেকে বেরিয়ে ওরা নিজেদের মধ্যে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করছে।
“এ কী? আশরাফকে তো দেখলাম না? ওরা নিশ্চয়ই মিথ্যা কথা বলছে।”
ওদের দোকানের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে একটা লোক এগিয়ে এল, “কাউকে খুঁজছেন?”
লোকটার অদ্ভুত চেহারা। এই শীতেও গায়ে কোনও শীত-পোশাক নেই। কিন্তু পায়ে একটা গামবুট। লোকটা কি জঙ্গল বা পাহাড় থেকে এল নাকি?
“খুঁজব কেন বলুন তো?” শৈলেশ উত্তর দিল।
“আপনারা হোটেলে বিরিয়ানি অর্ডার করলেন। তারপর খেলেন না কেউই। রান্নাঘরের ভিতরে রাঁধুনিকে দেখতে চাইলেন শুনলাম। কী সব যেন লিখবেন-টিখবেন। তা পুরো ব্যাপারটা খুলে বলুন না।”
“ভারি আশ্চর্য! ব্যাপার আবার কী? জঘন্য বিরিয়ানি মুখে রোচেনি তাই খাইনি। রান্নাঘরে দেখতে গেছিলাম…”
প্রিয়াঙ্কাকে থামিয়ে দিয়ে শমিত বলল, “সোনাহাটির বিরিয়ানি নিয়ে আমাদের শৈলমামা লিখবে। তাই রান্নাঘরে রাঁধুনির সঙ্গে কথা বলতে গিয়েছিলাম। তা আপনার নাম কী মশাই?”
“আমার নাম দুর্জয় মণ্ডল। এই দোকানের মালকিন অভয়া মণ্ডলের ভাই। আমিও এই দোকানের মালিকই। তা লিখতে চান ভালো ভালো কথা লিখে দেবেন না-হয়? এখানে কোথা থেকে আসা হচ্ছে?”
“কলকাতা।” এবার রোহণ উত্তর দিল।
“কলকাতা থেকে সোনাহাটি কি কারও বাড়িতে?”
“এমনিই ঘুরতে।” শৈলেশ চটপট জবাব দিল, “আজই চলে যাব।”
“আজ কীভাবে যাবেন? এখানে তো ট্রেন ছাড়ে সেই ভোর পাঁচটায়। আজ তো আর কোনও ফেরার ট্রেন নেই। কোথায় উঠেছেন?”
ওদের কথার মাঝে একজন মাঝবয়সি বেশ লম্বাচাওড়া মহিলা এসে কী যেন বলল লোকটার কানে কানে। লোকটা কেবল একবার ওদের দিকে তাকাল। তারপর দোকানের ভেতর চলে গেল।
ছয়
কথামতো সকাল আটটার মধ্যে আবিদ এসে গেছে সোনাই নদীর ঘাটে। আজ শৈলদের সঙ্গে বিমলা আর খুকুও এসেছে। সাধনকে অনেকবার বলাতেও ও আসতে রাজি হল না, “বাড়ির সামনে এই জঙ্গল তো রোজই দেখি। দলবেঁধে তা দেখতে যাওয়ার কোনও মানে হয়? তার চেয়ে বরং দোকানে বসি। এখানে এখন সব নতুন নতুন বাড়ি হবে, হোটেল হবে। ওই তীরমণির জঙ্গলই আর থাকবে? রিসর্ট হয়ে যাবে। এই বেলা আমার দোকানের ক’টা বাথরুম ফিটিংস নিশ্চয়ই বিক্রি হবে। আমি দোকান বাদ দিয়ে ওসব ঘুরতে-ফুরতে যাব না।”
রঞ্জু কেবল বলেছিল, “আমার হাঁটু একটু সুবিধার হলে আমি তোমাদের সঙ্গে যেতাম। বাড়িতে বসে বসে একঘেয়ে লাগে। কিন্তু কী করব।”
বিমলার রঞ্জুর জন্যই চিন্তা হয়। ভাইটা কোনও বিপদে পড়লে একা পঙ্গু রঞ্জু কী করে সামলাবে? চোখের সামনে কেবল ওই এক ঝলক সাধনের দোকানের ভেতরের ছোটো স্টোর-রুমে রাখা মূর্তিটা ভাসছে। মূর্তিটার মাথায় বিরাট একটা সাপের ফণা আর হাতে দুটো বিরাট আকারের মাছ। মাছ আর ফণা এত বড়ো যে মূর্তির মুখটা ঢেকে গেছে। তবে ওটা একটা মেয়ের মুখের আদলই।
আবিদের নৌকায় ওরা সবাই চড়ে বসল।
“এই নদীর আর এক নাম ক্ষীরনদী। জানো দাদাবাবুরা?” আবিদ গল্প করছে ওদের সঙ্গে।
“ক্ষীরনদী!” সকলেই খুব অবাক হল।
“সোনাইয়ের জল অন্যসব নদীর মতোই। তবু এই নদীর আর এক নাম ক্ষীরনদী কেন?”
রোহণের প্রশ্ন শুনে আবিদ বললে, “এত কিছু জানলে কি আর আমি নৌকা চালাই, দাদাবাবু? তবে মনে হয় আগে এই নদীর জল ক্ষীরের মতো ঘন সাদা ছিল হয়তো।”
আবিদের কথা শুনে সকলে হেসে ফেলল। প্রিয়াঙ্কা বলল, “তুমি যে নৌকা চালাতে জানো! নদীর কোথায় কী আছে, কোথায় মাছের ঝাঁক আসে, কখন জোয়ার-ভাটা হয় সব তুমি জানো কাকা। আর তোমার মতো নদীকে জানা বা বোঝা কোনও বই পড়েই সম্ভব নয়। তুমি আমাদের থেকেও অনেক বেশি জানো।”
প্রশংসা শুনে আবিদ খুশিই হল।
নৌকা একটা ঘাটের কাছে আসতেই আবিদ বলল, “একে নারিকেলডাঙ্গা বলে। আগে এখানে অনেক নারিকেল গাছ ছিল। আমফানে আর পরপর বাজ পড়ে সব গাছগুলো মরে গেল। এখন কেবল ওই বাঁশবন।”
নৌকা ঘাটের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। রোহণ বলল, “ওটা কী, আবিদকাকা?”
“ও একটা পুরোনো ভাঙা দেউল। গাছগাছালিতে ঢাকা ছিল। নদী থেকে দেখাই যেত না। এখন গাছ মরে গিয়ে জায়গাটা ন্যাড়া হয়ে গেছে। তাই দেখতে পাচ্ছেন।”
বিমলা-সহ সকলেই নড়েচড়ে বসল। আবিদকে নৌকা ঘুরিয়ে ওই দেউলের ঘাটে রাখতে বলল। সকলেই পরিত্যক্ত ভাঙা দেউল দেখতে চায়। কেবল খুকু বলল, “পোড়ো একটা মন্দির। সাপখোপ থাকতে পারে এখানে।”
আবিদ হেসে ফেলল, “সাপ আর কোথায় এই সোনাহাটিতে? এমনি গরমকালেই সাপের দেখা পাই না, তায় এই শীতকালে সাপ কোথা আসবে দিদি?”
“সাপ না হোক বিছে-টিছে, পোকামাকড় তো থাকতেই পারে!”
খুকুর ভয়কে নস্যাৎ করে দিয়ে বিমলা রোহণদের দেখিয়ে বললেন, “আমাদের সঙ্গে এরাই সব এক-একটা বিছে আছে যে! এরা থাকতে তোর কোনও ভয় নেই। তাও তুই ভয় পেলে নৌকায় বসে থাক। আমি ওদের সঙ্গে নেমে একটু দেখে আসি।”
ভাঙা কোমর নিয়েও দিদি নৌকা থেকে নামছে দেখে খুকুও আর বসে থাকতে পারল না। সবাই মিলে শতাব্দী প্রাচীন জীর্ণ এক দেউল দেখতে এল।
দেউলের উপরের অংশটা ভাঙা। ভেতরে কোনও মূর্তি নেই। হয়তো ছিল কখনও? কালের নিয়মে তা ক্ষয়ে গেছে অথবা মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। দেউলের গায়ে জমে থাকা ধুলো আঙুল দিয়ে পরিষ্কার করে বিমলা বললেন, “এই দেখ। যা ভেবেছি। এর গায়ে ছবি আঁকা।”
খুব ভালো করে খুঁটিয়ে লক্ষ করলে ছবিটা যেন স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। কতগুলো বালক এক দেবীমূর্তির পুজো করছে। আর চারপাশে কয়েকটা গোরু ছড়ানো-ছিটানো ঘাস খাচ্ছে যেন।
“ওই দেখ, কতগুলো কলসি রাখা দেবীমূর্তির সামনে।” বিমলা খুব মনোযোগ সহকারে ছবিটা দেখতে দেখতে বললেন।
শৈলেশ অবাক বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে বললে, “আহা! এ তো দারুণ আর্ট-ওয়ার্ক! এর সন্ধান পায়নি ওইসব খননকারীর দল?”
“সন্ধান পেলে ওই মূর্তির মতো এই দেউলও হাওয়া হয়ে যাবে।”
রোহণের আলটপকা কথায় বিমলা একটু কেঁপে উঠলেন। ওদের জিজ্ঞাসা করল, “এই ছবি থেকে বুঝতে পারলি এটা কোন দেবী? এই ছেলেগুলো কার পুজো করছে?”
“তুমিই বলো না দিদি। আমাদের পরীক্ষা নিয়ে কী লাভ? আঞ্চলিক ইতিহাসে আবিদের থেকেও আমাদের জ্ঞান কম।”
“এটা আঞ্চলিক ইতিহাস নয়। এটা সাহিত্যের ইতিহাস বলা যেতে পারে। এখানে নিশ্চয়ই কোনও মনসামঙ্গলকাব্যের লেখক থাকতেন এক সময়। এই ছবিতে রাখালছেলেরা মনসাদেবীর পুজো করছে। ওই যে কলশিগুলো রাখা আছে দেবীর সামনে, ওটা মনসামঙ্গল অনুযায়ী দুধের কলশি। আর গোরুগুলো সব রাখালদের গোধন। রাখলরা জঙ্গলে মনসার মায়ায় গোধন হারিয়ে ফেললে দেবী সব গোধন ফিরিয়ে দেন। তখন রাখালরা দেবীর আরাধনা করে।”
“বাবা! এই দেবী তো কেবল মায়ায় আর ছলে-বলে পূজা নেয় দেখছি!”
রোহণ এই কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে কী যেন একটা ধপ করে খুকুর পায়ে কাছে পড়তেই ‘বাবাগো মাগো মরে গেলুম’ বলে ও চিৎকার করে উঠল।
রোহণ হাসতে হাসতে বলল, “ও কিছু নয়, ছোটো মাসি। এ তো একটা ভাম!”
এক লাফে ভামটা দেউলের বাইরে বেরিয়ে গেল। খুকু এইবার বেশে রেগেই গেল, “নে, তোদের সব দেখা হয়ে গেলে এবার নৌকায় চল।”
খুকু গ্রামের মেয়ে হয়েও একটা ভাম দেখে ভয় পাচ্ছে দেখে বিমলা বিরক্ত হলেন, “সামান্য একটা অবোলা জীব। এত ভয় পাচ্ছিস কেন?”
তারপর রোহণকে বললেন, “রোহণ, তোর প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছি। আসলে আমাদের সব প্রাচীন লোককাহিনিই যেন ইচ্ছে করে একটা ধোঁয়াশার স্তর রেখেই গাঁথা হয়েছে। অবশ্য মঙ্গলকাব্যগুলো চর্যাপদের মতো অত সাংকেতিক নয়। এই যে মায়ায় গোধন হারানো ও রাখালদের মনসাপুজোকে রোহণ বলল ছলে-বলে-কৌশলে পুজো পাওয়া। এর মধ্যে কিন্তু সেই সময়ের সামাজিক, রাজনৈতিক চরিত্রটাও পরিষ্কার হয়ে যায়। কোনও কারণে রাখলরা মাঠে নিরাপদ বোধ করছিল না। কেবল সাপের উৎপাত এর কারণ নয়। মনসামঙ্গলে এই রাখলদের দ্বারা দেবীপুজোর পরেই আছে হাসানপালা। কচুয়ার তটে অর্থাৎ যেখানে রাখলরা সবাই মনসাপূজা করছিল, সেখানে প্রথমে দেবীর সঙ্গে সাপদের দেখে রাখলরা ভয় পেলে দেবী নিজের অঙ্গের মধ্যে সবক’টা সাপ লুকিয়ে ফেলেন। এরপর রাখলরা ভয় না পেয়ে দেবীর পুজো করলে দেবী তুষ্ট হয়ে রাখলদের অভয় দেন, ওরা বিনা বাধায় মনের সুখে কচুয়ার তটে গোধন চরাতে পারবে। আর ঠিক এই পুজোর সময় ওখানে সুলতান হাসানের দূত আসে। এরপর হাসানের মনসাকে অবজ্ঞা আর দেবী কর্তৃক হাসানকে শিক্ষাদান ও শেষে মনসার কাছে পরাজয় স্বীকার করে হাসনাহাটিতে মনসার দেউল নির্মাণ। এর থেকে এটুকু অনুমান করাই যায়, সেই সময় নিরীহ রাখাল বালকদের প্রতি সুলতান ও তাঁর সেনাবাহিনীর অত্যাচার অসহনীয় হয়ে উঠেছিল। সেই কারণেই রাখালদের প্রয়োজন হল ভয়ংকর এক দেবীপূজার। যে দেবীর ভয়ে ত্রাসে স্বয়ং সুলতান কেঁপে উঠবেন।”
“সুলতান কি কেঁপে উঠেছিল?”
শৈলেশের প্রশ্নটা শেষ হতেই শুকনো পাতায় খসখস করে কিছু একটা যাওয়ার শব্দ ওরা সকলেই শুনতে পেল। শব্দের উৎসের দিকে শমিত, শৈলেশ, রোহণ, প্রিয়াঙ্কা দৌঁড়ে যেতেই বিমলাও ওদের পিছু নিলেন। দু-পাশে বাঁশবাগানের মাঝখানে একটা সরু মাটির রাস্তায় বুটের ছাপ দেখতে পেল ওরা। বুটের ছাপ বাঁশবাগানের দিকে গেছে। সেই বরাবর অনেকদূর পর্যন্ত এসেও ওরা কিছু দেখতে পেল না। কেবল একটা উইয়ের ঢিবির পাশে একটা খালি থার্মোফ্লাস্ক আর কয়েকটা কাগজের কাপ রাখা আছে দেখল।
ঝুঁকে ওই ঢিবিটার চারপাশে দেখতে গিয়ে রোহণ চিৎকার করে বলল, “এই দেখো এখানে আরও কীসব রাখা আছে। আবিদকাকা যে বলল এখানে কেউ আসে না? এই ঘাট আর এই দেউল পরিত্যক্ত?”
“এখন কি আর পরিত্যক্ত বলে কিছু আছে? সবই মানুষের দখলে।” শমিত একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
রোহণ যেখানে চিৎকার করল সেখানে ওরা গিয়ে দেখল একটা ঝুড়িতে ঢাকা দেওয়া শুকনো চিঁড়ে আর কয়েকটা নাড়ুর মতো কী একটা রাখা আছে যেন। আর আছে কয়েকটা সন্দেশ। ঝুড়িতে চারটে চাঁপা কলাও আছে। সন্দেশগুলো টাটকাই ছিল, কেবল কলাগুলো চটকে গেছে ঝুড়ির ভেতর। ঝুড়িটাকে ঘিরে পিঁপড়ের সারি। ওখানে মাটিতে কেউ খোঁড়াখুড়ি করেছে তাও বোঝা গেল।
প্রিয়াঙ্কা বলল, “এগুলো এখানে কী? কেনই-বা এইসব চিঁড়ে-নাড়ু-কলা এখানে চাপা দিয়ে রাখা আছে? আর খোঁড়াখুঁড়িই-বা করেছে কারা? পুরাতাত্ত্বিকের দল তো চন্দ্রপুরের বড়ভোলায় খননের কাজ করছে। সরকারি অনুমতি ছাড়া এমন খোঁড়া যায়?”
বিমলা বললেন, “সেটা একটা বিরাট প্রশ্ন। কারা এখানে চুপিসারে এসে মাটি খুঁড়ছে। কোদাল কোপানোর দাগ আর বড়ো বড়ো সব গর্ত!”
“আর খাবারগুলো এখানে রাখার মানে?”
শমিতের প্রশ্নের উত্তর নৌকায় ফিরে এলে আবিদ দিল। সে বললে, “ওই যে ঝুড়ির মধ্যে চিঁড়ে, কলা, সন্দেশ, নাড়ু দেখলেন, ওগুলোকে বলে মেলানির ভার। এখানকার জেলে কৈবর্তের ঘরে পরিবারের সদস্য মারা গেলে তার শ্রাদ্ধশান্তি না হওয়া পর্যন্ত এইরকম ঝুড়িতে করে মেলানির ভার রেখে যায়। এই মেলানির ভার মরা মাইনষ্যের যাত্রাপথের সঙ্গী। এগুলো খেতে খেতে আত্মা চলে যাবে তার নিজের দেশে।”
“নিজের দেশ? সেটা কী?” প্রিয়াঙ্কা অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে আছে আবিদের দিকে।
“সে মরা মাইনষ্যের নিজের দেশ কী তা আমি কেমনে জানব? তবে দেশ একটা তো আছেই। তোমরা যেমন বলো স্বর্গ, আমরা বলি বেহেশত। ওরকমই কোথাও যায় হয়তো।” কথাগুলো বলে আবিদ কেমন উদাস হয়ে গেল।
সাত
তীরমণি জঙ্গলে ঘোরাঘুরি করে ওদের সকলেরই ভীষণ খিদে পেয়েছে। আবিদের নৌকায় ফিরে এসে বিমলা বললেন, “আবিদভাই এখানে কোনও ভাতের হোটেল আছে? সবাই দুটো ভাত মুখে দিলে খুব তৃপ্তি পেত।”
“হ্যাঁ, আছে তো। একটা নতুন ভাতের হোটেল খুলেছে বকুলতলায়। শিগগির তোমরা নৌকায় ওঠো। আমি নিয়ে যাচ্ছি। আমার চেনা মানুষের হোটেল। খাবারও খুব ভালো। একবার খেলে আর ভুলতে পারবা না।”
খুব দ্রুতই আবিদ ওদের সকলকে একটা ছোটোমতো ভাতের হোটেলে নিয়ে এল। হোটেলটা ছোটো হলেও ছিমছাম আর খুব সুন্দর করে সাজানো। দেওয়ালে ঝোলানো লতাপাতার বাহার দেখলে হোটেলের মালিককে বেশ শৌখিনই মনে হয়। একটা ব্ল্যাকবোর্ডে খাবার আর তার দাম লেখা। খাবারের নামগুলো পড়তে পড়তে শৈল চমকে উঠল বিরিয়ানি দেখে।
এই ভাতের হোটেলে বিরিয়ানিও পাওয়া যায়? হোটেলের ক্যাশ বাক্সের কাছে বসে থাকা একটা মেয়ে বলল, “একবার খেয়েই দেখুন না আমাদের বিরিয়ানি।”
শমিত বললে, “আবার বিরিয়ানি? ইস্পেশাল খেতে গিয়ে যা কাণ্ড হল গতকাল।”
বিমলা আর খুকু মাছভাতই খেতে চাইলেন। বাকিরা হ্যাঁ-না করতে করতে সেই বিরিয়ানিই অর্ডার দিল। এই একটা বিষয়ে সাধনের সঙ্গে ওদের খুব মিল। ওরা প্রত্যেকেই বিরিয়ানি-পাগল।
খুকু আর বিমলার টেবিলে মাছ-ভাতের মিল চলে এসেছে। ঝরঝরে সাদা ভাতের ওপর একটু করে ঘি ছড়ানো। মুসুর ডাল, মুচমুচে করে আলুভাজা, একটা কীসের যেন ঘ্যাঁট, মাছের ঝোল আর চাটনি।
ওদের বিরিয়ানি আসতে দেরি হচ্ছে দেখে রোহণ বলল, “ইশ! মাছ-ভাতই ভালো ছিল। এখন খিদে নিয়ে কতক্ষণ যে অপেক্ষা করতে হবে।”
বেশিক্ষণ অবশ্য অপেক্ষা করতে হল না। চার প্লেট বিরিয়ানি টেবিলে রাখার সঙ্গে-সঙ্গেই ওরা খেতে আরম্ভ করল।
খেতে-খেতেই শৈলেশ বলল, “উফ্! এ যে অপূর্ব! বলেছিলাম না রয়্যাল আমিনিয়াকে হার মানায় এই বিরিয়ানি? এ তো সোনাহাটির চেয়েও ভালো!”
“সোনাহাটি স্পেশাল বিরিয়ানি বলতে তো আমরা এই বিরিয়ানির স্বাদই জানি।” প্রিয়াঙ্কা বলল। শমিতও মাথা নেড়ে সায় দিল।
খাওয়া হলে ওরা আবিদকে জিজ্ঞেস করল কতদিন হল এই নতুন দোকান এখানে খুলেছে। এটা কার দোকান? আবিদ হেসে ফেললে, “দাদাবাবুরা বিরিয়ানি খেয়ে চিনতে পারলেন না? এ তো আশরাফের দোকান। ওই তো অভয়াদিদির ইস্পেশাল বিরিয়ানিতে রাঁধুনির কাজ করত প্রায় বিশ বছর। কোভিডে দিদির দোকানে বিক্রি বন্ধ হল আর আশরাফও একদম বেকার হয়ে গেল। দিদি একটা টাকাও দিলে না। বললে দোকান বন্ধ। বিক্রি নেই, টাকা কী করে দেব? আশরাফের তখন কী যে খারাপ অবস্থা! আমার কাছে টাকা ধার চাইল। বলল, আশুরাকে নিয়ে দেশে ফিরে যাবে। কিন্তু দেশেও তো ওর কাজ নেই, টাকা নেই—খুবই খারাপ অবস্থা। খুবই গরিব ওরা।
“একবার বলল কলকাতায় যেতে পারলে ঠিক একটা কাজ জোগাড় করে নেবে। আমার কাছে কিছু টাকা ধার চাইল। তারপর একদিন এসে বললে ওর অনেক টাকা চাই। ও একটা হোটেল খুলবে নিজের। আমি অত টাকা পাব কনে? আমি বললাম, ‘তুই হোটেল খোল। আমি তোরে বিনি পয়সায় মাছ দেব।’
“তারপর জানি না কোথায় কার কাছ থেকে কীভাবে ও টাকা জোগাড় করল। এই হোটেলটা খুলেছে বছর খানেক হতে চলল। ওর রান্নার স্বাদে সোনাহাটি ইস্পেশালের খদ্দেররা সব এখানেই আসে। অভয়াদিদি আর দুর্জয়বাবুর খুব রাগ আশরাফের ওপর।”
আট
সেদিন রাতে প্রায় সারারাত ওরা সবাই মিলে গল্প করেই কাটিয়েছে। প্রায় দু-বছরেরও বেশি সময় পরে ওরা মামাবাড়িতে এসেছে। অনেক গল্প জমে আছে সকলেরই। রঞ্জু বাচ্চাদের পেলে জমিয়ে গল্প করে। এমনিতেই হাঁটুর ব্যথায় বাড়ির বাইরে বেরোতে পারে না। তাই কেউ এলে ওর গল্প যেন ফুরায়ই না। তাছাড়া, ওরা এখানে আর মাত্র দু-দিন আছে। পরশুদিন ফিরে যাবে। রাতের আড্ডায় বার কয়েক কফি-কুকিজ এল। সাধন কিন্তু রাত জাগেনি। ওদিকে খুকুও বারোটা বাজতেই নিজের ঘরে চলে গেল। বিমলা আর রঞ্জু বাচ্চাদের সঙ্গে জেগে রইল। গল্পে, গানে কীভাবে যে রাত পেরিয়ে ভোর হল তা ওরা টেরই পেত না, যদি না সাধন ভোরবেলায় এক হাঁড়ি টাটকা খেজুরের রস এনে ওদের সামনে রেখে বলত, “নে, এক চামচ করে খেয়ে এবার সব ঘুমাতে যা দিখি। সারারাত অনেক জেগেছিস। একটু গড়িয়ে নে। তার আগে মিষ্টিমুখ করে নে। তোর মামির তো বাড়িতে বসে বসে ইনসোমনিয়া হয়ে গেছে। না ঘুমালেও কিছু যাবে আসবে না। তোদের তো একটু ঘুম চাই বাপু। আর বড়দি, বাচ্চাদের মাঝে তুইও তো বাচ্চাই হয়ে গেলি। রাতে যে ঘুমালি না? তোর প্রেশার না বাড়ে।”
সকলের প্রতি অনেকগুলো নির্দেশনামা ঝেড়ে সাধন পুকুরপাড়ের দিকে গেল।
ওরা সবাই খেজুরের রস খেয়ে ঘুমাতে গেল। সত্যিই একটু গড়িয়ে নেওয়া প্রয়োজন। বিছানায় যেতেই সকলে ঘুমিয়ে কাদা।
ঘুম ভাঙল ভারী বুটের আওয়াজে। ঘড়িতে তখন প্রায় সাড়ে বারোটা বাজে।
নয়
পুলিশ অফিসার হরেকৃষ্ণবাবু খুব গম্ভীর মুখে পায়চারি করছেন। জুনিয়ার অফিসারদের বলছেন, “সমীর, প্রীতম, তাড়াতাড়ি করো। একবার সাধনবাবুর দোকানটাও সার্চ করতে হবে। সাধনবাবু দোকানের চাবিটা দিন আর আপনি আমাদের সঙ্গে চলুন।”
বিমলার এই কথা শুনেই বুক ধুকপুক করছে। ও তো মূর্তিটাকে সাধনের দোকানে দেখেছে। নিজের ভাইকে মূর্তি-চোর ভাবতে কিছুতেই ওর মন সায় দেয়নি। সেদিন ভোর রাত্রে সাধন এসে বলেছিল, “দিদি, তুই আমাকে বিশ্বাস করিস তো? যদি বিশ্বাস করিস তাহলে নিশ্চিন্ত থাক। আমি কোনও ভুল বা অন্যায় করিনি। টাকা রোজগার আমার একটা শখ বলতে পারিস অথবা নেশা, কিন্তু অসৎ উপায়ে নয়। নিজের খাটুনিতে একটু একটু করে বিত্ত জমিয়ে এই বাড়ি, দোকান করেছি। নিজের পরিশ্রমে এইভাবে অর্থ উপার্জন করার মধ্যে যে কী শান্তি আর ভালোলাগা! এমনি এমনি কেউ টাকার ব্যাগ এনে দিলেও আমার ও-ব্যাগ বা ব্যাগের টাকা ছুঁতেও ইচ্ছে করবে না। পড়ে পাওয়া টাকা! ও তো দু-দিনে শেষ হয়ে যাবে। পরিশ্রমের টাকায় থাকে মায়া, ভালোবাসা। তাই তা খরচ করতে পারি না প্রাণে ধরে!”
সেদিন সাধনের কথাগুলো খুকু-বিমলা দুজনেই বিশ্বাস করেছিল। আজ হরেকৃষ্ণবাবু তো আর দিদিদের মতো ভাইয়ের কথা অন্ধের মতো বিশ্বাস করবেন না।
একটা কী হয় কী হয় ভাব সবার মধ্যে। প্রিয়াঙ্কার ঘুম দেরিতে ভেঙেছে। চোখ কচলাতে কচলাতে এসে শুনছে পুলিশের পোশাক পরা একটা অফিসারগোছের লোক ওর রাঙামামার ওপর হম্বিতম্বি করছে। বলছে, “আপনি ঠিক করে বলুন সাধনবাবু। হঠাৎ আশরাফের জামিন আপনি করালেনই-বা কেন? ওর বউ আশুরার কথা অনুযায়ী, আপনি কাল বিকেলে ওকে ফোন করে দেখা করতে বলেন। আপনার সঙ্গে দেখা করতেই আশরাফ বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল। তারপর সারারাত সে বাড়ি ফেরেনি। সকাল দশটা থেকে আশুরা থানায় হত্যা দিয়ে পড়ে আছে। ওর স্বামীকে খুঁজে এনে দিতে হবে। একটা আস্ত মানুষ আপনার সঙ্গে দেখা করতে এসে উবে গেল নাকি?”
সাধন কিন্তু এত পুলিশ দেখে বা পুলিশি তল্লাশির মধ্যে একদমই ভেঙে পড়েনি। খুব শান্তভাবেই হরেকৃষ্ণবাবুর কথার উত্তর দিল, “আমি আশরাফকে ফোন করেছিলাম। কিন্তু ও তো এখানে আসেইনি। আমি ওকে বাড়ি আসতে বলেছিলাম।”
“কেন? কেন ওকে আপনার বাড়িতে আসতে বলেছিলেন?”
“আশরাফ আমার কাছে পরামর্শ চেয়েছিল। চন্দ্রপুর সংগ্রহশালার দুজন নাইট গার্ড খুনের ঘটনায় যেভাবে বেচারি জেল খাটল, পরে আবার আপনাদের ঝামেলায় পড়বে তাই কীভাবে কী করবে সেই বিষয়ে ও নিজেই আমার সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিল। আমার বাড়িতে ও এলে আমার চেনা এক উকিল বন্ধুকে ফোন করাতাম। তার কাছেই ও পরামর্শ নিত কী করা উচিত। কিন্তু সে তো বকুলতলা থেকে এখানে এসেই পৌঁছাল না। আপনারা আশরাফকে না খুঁজে আমার বাড়ি দোকান তল্লাশি করছেন?”
“আমাদের কাজ আমাদের করতে দিন। আর আপনি একদম আমাকে না জানিয়ে স্টেশন লিভ করবেন না।”
দশ
পুলিশি তল্লাশি শেষ হলে পরে গোটা বাড়িটা থম মেরে গেল। সবারই চোখে-মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ। ওরা চারজন বিমলাকে বলে বাইরে বেরোল। আবিদের কাছ থেকে ঠিকানা নিয়ে আশরাফের পাড়ায় গেল। তখন সন্ধ্যা হয় হয়। মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি আর আজানের শব্দ একসঙ্গে শুনতে পেল। কেউ নামাজ পড়ছে। কেউ কাঠের চুল্লিতে রান্না করছে, কেউ-বা স্টোভে জল গরম করছে—হয়তো-বা চা করছে। একটা শান্ত নিরুদ্বেগ পল্লি যেমন হয়, ঠিক সেরকমই। সবাই সবার কাজে মশগুল।
আশুরার দরজায় কড়া নাড়তে আশুরা দরজা খুলে বাইরে এল। কিন্তু রোহণ-শৈলেশদের সঙ্গে একটা কথাও বলতে চাইল না। ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে টিনের ঘরের দরজা বন্ধ করে দিল। দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দটা যেন ওদের চারজনের কানে এসে বাজল।
আবিদের নৌকায় বাড়ি ফিরে আসছিল ওরা। নারকেলডাঙ্গার কাছে যখন নৌকা এল, তখন সন্ধ্যা শেষের দিকে। ঘাটের কিনার থেকে দেউলটা দেখতে পেল ওরা। মনে হচ্ছে দেউলের ভিতর আলো জ্বলছে। খুব জোরালো আলো নয়। একটা ক্ষীণ প্রদীপের আলো যেন।
শমিত বলল, “গ্রামবাসীদের কেউ হয়তো প্রদীপ জ্বালিয়েছে।”
আবিদ অবাক হল, “এমন তো হতে পারে না। গ্রাম তো অনেকটা দূরে। এই দেউলে কেউই আসে না। এখানে প্রদীপ জ্বালবে কে?”
আবিদের কথা শুনে প্রিয়াঙ্কা বলল, “আমাদের একবার এখন ওই দেউলেই যাওয়া উচিত। পোড়ো দেউলে কে আলো জ্বেলেছে তা জরুরি বিষয় নয় হয়তো, কিন্তু আমাদের সামনে কোনও রাস্তাও নেই। পরশু ফিরে যেতে হবে। এর মধ্যে আশরাফের গায়েব হওয়া আর তার থেকেও বড়ো বিষয় রাঙামামাকে একটা বিপদের মধ্যে ফেলে চলে যেতে আমার মন একদমই চাইছে না। কিছু একটা করতে হবে। কিন্তু কী করব সেটাই বুঝতে পারছি না। আপাতত কোনও লাভ হবে না ভেবেই ওই দেউলে যাই। আলোর সন্ধানে।”
“ঠিক বলেছিস। ওখানে কাঁচা মাটিতে বুটের ছাপ দেখেছি। থার্মোফ্লাস্ক আর চায়ের কাপ দেখে আমার সেদিনই সন্দেহ হয়েছিল। আবিদভাই তো বললই এখানে কেউ আসেই না এখন। তাহলে কে বা কারা এখানে আশ্রয় নিল? কিছু পাই না পাই একবার গিয়ে তো দেখি।”
শৈলেশের কথায় সকলেই সম্মতি জানাল। আবিদ ঘাটে নৌকা রেখে ওদের সঙ্গে দেউলে এল।
দেউলে এসে দেখল একটা ছোটো মাটির প্রদীপ একদম টিমটিম করে জ্বলছে। প্রদীপের তেল প্রায় শেষের দিকে। সেদিন খুকুর তাড়ায় ওরা ভালো করে দেখতে পায়নি। আজ রোহণ এসেই হোঁচট খেলে একটা পাথরে। সেই পাথরটা পা দিয়ে একটু ঠেলতেই দেখল একটু ফাঁক যেন। ওরা সবাই মিলে পাথরটা সরিয়ে দেখল, একটা ছোটো কাঠের সিঁড়িমতো। সিঁড়িটা নেমে এসেছে পাতালে একটা সুড়ঙ্গের দিকে।
এর মধ্যে প্রদীপের তেল শেষ হয়ে প্রদীপটা একেবারেই নিভে গেল। সুড়ঙ্গের ভেতরটা রোহণ দেখতে চাইল। কিন্তু এই ঘুটঘুটে আঁধারে কীভাবেই-বা নীচে নামবে? এতক্ষণ ওদের মনেই পড়েনি মোবাইলের টর্চের কথা। প্রিয়াঙ্কার প্রথম মনে পড়ল।
ওদের সবার মোবাইল টর্চগুলো জ্বলতেই জায়গাটা আবার আলোকিত হল। মোবাইল টর্চের আলো নীচে সুড়ঙ্গের দিকে ফেলে শৈলেশ দেখতে পেল কী যেন একটা ভারীমতো পড়ে আছে নীচে।
রোহণ বলল, “বাঘ-ভাল্লুক নয় তো?”
শুনে আবিদ হো হো করে হেসে উঠল, “বাঘ-ভাল্লুক কি আর এখন আছে দাদাবাবু? শিয়ালই নেই তো বাঘ-ভাল্লুক। যেদিকে তাকাবেন শুধু মানুষ আর মানুষ। কেবলই মানুষই থাকবে আর কেউই থাকবে না পৃথিবীতে।”
কথাটা শুনে প্রিয়াঙ্কার খুব মনখারাপ হল। এই গ্রাম-মফস্সলগুলোতেও যদি কেবল মানুষে মানুষে ছেয়ে যায় আর কোনও জীবজন্তুই না থাকে তাহলে ওদের কলকাতা শহরের কী অবস্থা? সেখানে তো গাছেদেরও থাকার জায়গা নেই কোনও।
প্রিয়াঙ্কার ভাবনার মাঝে রোহণ কখন নীচে নেমে গেছে। নীচ থেকে চিৎকার করে বলছে, “এই দেখো, এখানে একটা মানুষ পড়ে আছে।”
‘মানুষ পড়ে আছে’ কথাটা শুনেই প্রথমে আবিদ দ্রুত নীচে নামল। আবিদের পিছনে শমিত নামল। শৈলেশ আর প্রিয়াঙ্কাও নামতে যাবে, নীচ থেকে রোহণ চিৎকার করে বললে, “সবাই নীচে নেমো না। লোকটা বেঁচে আছে। তোমরা উপর থেকে সাহায্য করো। লোকটাকে উপরে আনছি আমরা।”
ওরা তিনজন মিলে লোকটাকে উপরে আনল। টর্চের আলোয় লোকটার মুখ দেখে আবিদই প্রথমে চিনতে পারল, “আরে, আশরাফভাই যে!”
আশরাফকে ওরা প্রায় সকলেই চেনে। আশরাফের নাকের কাছে জমাটবাঁধা রক্ত। জ্ঞান হারিয়েছে আশরাফ। ওরা দ্রুত আশরাফকে নৌকায় তুলে নিল। তারপর সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র নিয়ে গিয়ে প্রথমে থানায় ফোন করল। মামাবাড়ির ল্যান্ড-ফোনেও সবটা জানাল।
এগারো
পরদিন সকালে সাধনের ড্রয়িং-রুমে হরেকৃষ্ণবাবু, আশরাফ, সাধন, রঞ্জু, বিমলা, খুকু, রোহণরা চারজন, আবিদ, আশুরা—সবাই জড়ো হয়েছে। হরেকৃষ্ণবাবুই রহস্যের জটটা খুললেন। সবার আগে তিনি সাধনকে আর ওদের চারজনকে কুর্ণিশ জানালেন। বললেন, “সিভিলিয়ানরা যদি তাদের সিভিক সেন্সগুলো ঠিকঠাক কাজে লাগান তাহলে অনেক সমস্যারই সমাধান সম্ভব। তোমাদের সকলকে যে কীভাবে ধন্যবাদ জানাব! আর সাধনবাবু, আপনাকেও।”
খুকু নার্ভের ওপর এতটা চাপ যেন নিতে পারছে না। ও অধৈর্য হয়ে বলল, “আমাদের একটু খোলসা করে সবটা বলবেন? আমরা তো যে অন্ধকারে সেই তিমিরেই।”
“আর অন্ধকার নয়, তিমিরও নয়। একটু ধৈর্য ধরে বস। সব পরিষ্কার হবে এখুনি।” সাধনের কথা বলার ভঙ্গিতে সকলে হাসল।
হরেকৃষ্ণবাবু কথা আরম্ভ করলেন—“বড়ভোলায় যে প্রাচীন মূর্তিটা পাওয়া গিয়েছিল তা স্থানীয় একটা সংগ্রহশালায় দিন কয়েকের জন্য রাখা ছিল। একদিন ভোরবেলায় থানায় একটা ফোন আসে প্রাইভেট নম্বর থেকে। ফোনটা ট্রেস করা যায়নি। সম্ভবত সিম কার্ড ফেলে দিয়েছিল ফোন করার পরেই। সেই ফোনেই প্রথম জানানো হয় মূর্তিটা মিসিং। সংগ্রহশালার দুই নাইট গার্ড প্রতাপ আর বিজয়ের মৃতদেহ পড়ে আছে বকুলতলায় আশরাফের দোকানের সামনে।”
এই অবধি বলে হরেকৃষ্ণবাবু থামলেন, “এর পরেরটা আশরাফ তুমি বলবে?”
আশরাফ মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলে পরবর্তী ঘটনা বলল,
“যেদিন প্রতাপ আর বিজয়ের লাশ পাওয়া গেল, তার আগেরদিন রাতে ওরা দুজনেই আমার হোটেলে এসে বললে খুব খিদে পেয়েছে। তাড়াতাড়ি যেন কিছু খেতে দিই। ওদের খেতে দিলাম ভাত, মাছ, তরকারি। এই খাবারই সেদিন খদ্দেররা খেয়েছিল। আমিও বাড়িতে নিয়ে এসেছিলাম হোটেলেরই বেঁচে যাওয়া খাবার। সেই একই খাবার আমি ওদের দুজনকে দিয়েছিলাম। দুজনের চোখ-মুখ কেমন অন্যরকম লাগছিল। যেন খুব ভয় পেয়েছে অথবা কোনও কারণে খুব উত্তেজিত। আমাকে কিছুই বলেনি ওরা। পরদিন সকালে আশুরা আর আমি হোটেল ঝাড় দিয়ে পরিষ্কার করতে এসে দেখি ওরা দুজনে পড়ে আছে একদম হোটেলের সামনেই। আমি ভাবলাম মদ-টদ খেয়ে বুঝি অজ্ঞান হয়ে পড়েছে। আমরা দুজনে ওদের ধরাধরি করে হোটেলের ভিতর নিয়ে আসি আর তখনই পুলিশ আসে আমার হোটেলে। পুলিশ এসেই বুঝতে পারে ওরা মারা গেছে। আমার দোকানের মধ্যেই ওদের লাশ পাওয়ায় পুলিশ আমাকে গ্রেপ্তার করল।
“আমি হরেকৃষ্ণবাবুকে বলেছিলাম সাধনদাদাবাবুকে একটা ফোন করতে। হরেকৃষ্ণবাবুর ফোন পেয়েই সাধনদাদাবাবু থানায় এসে আমাকে ছাড়ান।”
আশরাফ একটু থামতেই সাধন বলে, “এর মাঝের একটা অংশ বাদ দিয়েছে আশরাফ। ওটা আমি বলব, না তুমি বলবে হে?”
আশরাফ কিছুক্ষণ কাঁচুমাচু মুখে বসে রইল। তারপর বলল, “প্রায় কুড়ি বছরেরও বেশি যার নুন খেয়েছি তার গুণ না গাইতে পারি দোষ কীভাবে বলব? আপনিই বলুন দাদাবাবু।”
হরেকৃষ্ণবাবু একটু বিরক্ত হলেন। গলায় সেই বিরক্তির রেশ টেনেই বললেন, “অপরাধ যে করে তার পক্ষ কোনও কারণেই নেওয়া যায় না। নুন খেলেও না। তাহলে যে পক্ষ নিচ্ছে সে অপরাধী হয়ে যায়।”
সাধন পরিবেশটা লঘু করতে চেয়ে বললে, “আমিই বলছি পুরোটা। আশরাফ এই সোনাহাটিতে আসে বছর কুড়ি আগে। সোনাহাটি স্পেশাল বিরিয়ানি দোকানের অভয়া ওর গ্রামতুতো দিদি। সেই গ্রামতুতো দিদির দোকানে ও রান্নার কাজ নেয়। ওর বিরিয়ানির সুখ্যাতি তো তোমাদের কাউকেই নতুন করে বলার কিছুই নেই। দূরদূরান্ত থেকে অভয়ার দোকানে খদ্দের ওই বিরিয়ানি খেতেই আসে। আগে দোকানের নাম ছিল ‘অভয়ার হোটেল’। পরে ওই বিরিয়ানির জন্যই হোটেলের নাম বদলে হয় ‘সোনাহাটি ইস্পেশাল বিরিয়ানি হোটেল’।
“এরপর আসে কোভিড মহামারী। ব্যাবসাপত্র, দোকানপাট, অফিস-কাছারি, স্কুল অনেক কিছু বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অভয়ার দোকানও বন্ধ হয়ে যায়। অভয়ার কিন্তু দোকান ছাড়াও মৌমাছির ব্যাবসা আর একটা ফলের বাগান রয়েছে। অভয়া কোভিডের এক বছর দোকান বন্ধ রেখে অন্য ব্যাবসায় মন দিল। গ্রাম থেকে ওর নিজের ভাই দুর্জয়ও এসে ওর সঙ্গে ব্যাবসায় যোগ দিল। এই দুর্জয়টা একেবারেই অপদার্থ ও একটা কুচক্রের পাণ্ডা। দুর্জয়ের কথায় পরে আসছি।
“অভয়া একটি বছর আশরাফ-সহ হোটেলের কর্মচারীদের কাউকেই বেতন দিল না। আশরাফ এর মধ্যে ওর বউ আশুরাকেও দেশ থেকে নিয়ে এসেছে। বিনা বেতনে দুটো পেট চালানো খুবই কষ্টসাধ্য হল ওদের। একবার আশরাফ ভাবল দেশে ফিরে যাবে। তারপর কীভাবে যেন টাকা জোগাড় করে ও নিজে একটা ছোটোমতো ভাতের হোটেল খুলল। তোমরা বোধ হয় সেই হোটেলে গিয়ে বিরিয়ানি খেয়েও এসেছ।”
আশরাফের দিকে তাকিয়ে চোখ ছোটো করে সাধন বললে, “বিরিয়ানিতে আশরাফের হাতে জাদু আছে। সেই জাদুকাঠির ছোঁয়ায় এতদিন অভয়ার দোকানের রমরমা। এখন সে নিজে দোকান দিয়েছে। দেখতে দেখতে বিরিয়ানির টানে অভয়ার সব খদ্দের আশরাফের দোকানে ভিড় করতে লাগল।
“এবার আসি দুর্জয়ের কথায়। দুর্জয়ের কাজই স্মাগলিং অর্থাৎ দুষ্প্রাপ্য ও নিষিদ্ধ জিনিস সব পাচার করা। দেশের দুষ্প্রাপ্য সব জিনিস বিদেশে পাচার করে অনেক টাকা রোজগারও করেছে ও। দুর্জয় দিদিকে বুদ্ধি দিল। যাতে ওর নিজের কার্যসিদ্ধিও হয় আর ওই অবাধ্য আশরাফকে যেন সরানো যায় এই সোনাহাটি থেকে।”
“অবাধ্য আশরাফ?”
বিমলার প্রশ্নের জবাব আশরাফই দিল, “হ্যাঁ, দিদি। অভয়াদিদি আমাকে বলেছিল দোকান বন্ধ করে যেন ওর দোকানে আবার রান্নার কাজ করি। মাইনেও বাড়িয়ে দেবে বলেছিল। কিন্তু আমি যে নিজের ব্যাবসার স্বাদ পেয়েছি। সারাদিন খাটাখাটুনির পর ক্যাশ বাক্স নয়, আমাকে সুখী করে খদ্দেরদের খেয়ে আনন্দ পাওয়া মুখগুলো সব! তাই অভয়াদিদির কথা শুনিনি আমি। দিদি আরও বলেছিল, কাজটা ভালো করলি না আশরাফ! আমার ব্যাবসা মারার ধান্দা তোর? এখানে যখন প্রথম এলি কে মুখে ভাত জুগিয়েছিল? এই নেমকহারামির ফল তুই পাবিই।
“আচ্ছা বলুন, আমি কি সত্যি-সত্যিই নেমকহারামি করেছি?”
“সে-কথা পরে হবে’খন। এইবার পরের অংশটা ওদের জানাই।” সাধন আবার ঘটনা বলতে শুরু করল,
“বিজয় আর প্রতাপকে হাত করে সদ্য পাওয়া ওই মনসামূর্তিটা চন্দ্রপুর সংগ্রহশালা থেকে চুরি করল ওরা। তারপর সেই চুরি করা মূর্তিটা আশরাফের দোকানে এনে কয়েকদিন ওর কাছে রাখতে চাইল। সরল বিশ্বাসে আশরাফ মূর্তিটা রেখেও দিয়েছিল। আরও বড়ো বিপদে পড়তে পারত ও যদি না আমি হঠাৎই তোদের মামিকে না জানিয়ে আশরাফের হাতের বিরিয়ানি খাব বলে ওর দোকানে সেদিনই যেতাম। তা আমাকে আশরাফ সব খুলে বললে আমি মূর্তিটা ওর কাছে রাখা নিরাপদ নয় ভেবে নিজের কাছে এনে রাখলাম। তোদের যেদিন দোকান দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলাম, সেদিন মূর্তিটা আমার ছোটো স্টোর-রুমে দিদি দেখতে পায়। খুনের মামলায় আশরাফ না জড়িয়ে গেলে মূর্তিটা হরেকৃষ্ণবাবুর জিম্মায় অনেক আগেই দিয়ে দিতাম।
“বিজয় আর প্রতাপকে খুন করে আশরাফের দোকানের সামনে ফেলে রেখে দুর্জয় চাইল আশরাফকে ফাঁসিয়ে ওর দোকানটা যদি উঠিয়ে দেওয়া যায়। নারকেলডাঙ্গায় ওই ভাঙা দেউলের পিছনের বাঁশবাগানে ওর চোরাচালানকারী সঙ্গীদের লুকিয়ে রেখেছিল। আশরাফ গ্রেপ্তার হলেই মূর্তিটা উদ্ধার করে বেচে দেবে। এমনই পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু মূর্তিটা যে আমার কাছে তা ঘুণাক্ষরেও কেউ জানতে পারেনি।”
শমিত কথার মাঝেই প্রশ্ন করল, “আচ্ছা, মূর্তিটা তুমি বকুলতলা থেকে এখানে আনলে—কেউ দেখতে পায়নি?”
“খুব ভালো প্রশ্ন করলি।” শমিতের পিঠ চাপড়ে সাধন আবার বলা শুরু করল, “বিরিয়ানির হাঁড়িতে করে মূর্তিটা আমি বাড়ি নিয়ে আসি। বাড়িতে অতিথি আসবে। ভোজের আয়োজন করেছি, তাই এক হাঁড়ি বিরিয়ানি লাগবে—সে-কথাই সবাইকে বলেছি। আশরাফই বিরিয়ানি পৌঁছে দেওয়ার নাম করে মূর্তিটা নিয়ে আসে আর সোজা আমার দোকানে রেখে দেয়। তোর মামিকে কিছুই বলিনি। তার পরের ঘটনা তো সবারই জানা।”
সাধন থামলে সবাই কিছুক্ষণ একদম চুপ করে থাকে। ঘটনার আকস্মিকতা বোঝার চেষ্টা করে। কিন্তু অনেকগুলো মানুষ একসঙ্গে চুপ করে বেশিক্ষণ থাকতেও পারে না। শমিতই প্রথম বিমলাকে উদ্দেশ করে কথা বলে, “মণিমা, তাহলে এও তো একরকম মঙ্গলকাব্যেরই পুনরাবৃত্তি বলা যেতে পারে?”
শৈলেশ তক্ষুনি প্রতিবাদ করল—“তা কী করে হয়? কী যে সব অলীক কথাবার্তা বলিস!”
শমিত বোঝায়—“কেন নয়? অভয়াদিদি তো চেয়েছিল আশরাফদাদা যেন বশ্যতা স্বীকার করে ওঁর হোটেলেই কাজ করে। নিজে নিজে স্বাধীন ব্যাবসা করায় অভয়াদিদির প্রতিষ্ঠিত ব্যাবসার ক্ষতি। তাই এইসব পরিকল্পনা, জল্পনা।”
“কথাটা ভুল বলিসনি রে। সেইজন্যই তো স্বাধীনচেতা ব্যবসায়ীদের প্রতি আমার বরাবর একটু দুর্বলতা। ওই যে চাঁদসদাগরকেই ভাব না। সপ্তডিঙা ডুবে গেল, ছয় ছেলেও সাপের কামড়ে মারা গেল, তারপরেও মধুকর ডিঙা গড়ে আবার বাণিজ্যে যাত্রা করল। সব ডুবে গেলেও চাঁদ ঠিক লড়াই করে নিজেকে বাঁচিয়ে আবার ফিরে এল। প্রচুর ধনসম্পদ ও নিজের জন সব হারিয়েও বণিক সমাজে প্রতিষ্ঠা পেল। না-হলে সায়বেনের মেয়ে বেহুলার সঙ্গে লখাইয়ের বিয়ে হয়?”
সাধনের কথা শুনে বিমলা খুব খুশি হলেন। প্রায় হাততালি দেওয়ার মতো করেই বললেন, “বেশ বললি তো! একদম ঠিকই বললি।”
বারো
সেদিন রাতে আর সাধনের পুকুরের মাছ নয়, একবারে ক্ষীরনদীর জ্যান্ত মাছ এনে দিল আবিদ। আশরাফ সত্যি-সত্যিই এবার এক হাঁড়ি বিরিয়ানি নিয়ে এল সাধনের বাড়িতে।
বিমলা চুপচাপ সারাদিন কী যেন ভেবে চলেছেন। এখনও কি কোনও রহস্য সমাধান বাকি? বিমলা বললেন, “দুটো। প্রথমটা হল এই অঞ্চলে কি মঙ্গলকাব্যের কোনও পুথির লেখকের বাস ছিল?”
এই প্রশ্নের উত্তর পেতে বিমলাকে আবারও সোনাহাটি আসতে হবে আর এশিয়াটিক সোসাইটি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে গিয়ে বিস্তর পড়াশুনা করতে হবে। আর পরের প্রশ্নটার উত্তর হয়তো শীঘ্রই পাওয়া যাবে। বিমলা নিজে উত্তরটা পেলেই সকলকে প্রশ্ন ও উত্তর দুটোই জানাবেন। সে-কথাই বললেন ওদের সকলকে।
প্রিয়াঙ্কা আবদার করে জিজ্ঞেস করল, “মঙ্গলকাব্যের পুথির লেখকদের নিয়ে তুমি কেন ভাবছ, মণিমা?”
“আরে মঙ্গলকাব্যের পুথির লেখকদের সকলের জীবনেই কাব্য লেখার পিছনে একটা করে গল্প রয়েছে। তোদের আজ কেতকাদাস ক্ষেমানন্দের গল্পটাই বলি।”
গল্প শুনতে সকলেই গুটিসুটি মেরে বিমলাকে ঘিরে বসল।
“ক্ষেমানন্দ একবার নিজের মায়ের আদেশে খড় কিনতে গিয়েছিল। তখন মাঠের মধ্যে একটা ছোটো ডোবায় কয়েকটা ছেলে মাছ ধরছিল। ক্ষেমানন্দ ছেলেগুলোর সঙ্গে মাছ ধরতে চাইলে ছেলেগুলো কিছুতেই ওকে দলে নিল না। ক্ষেমানন্দ তখন ছোটো ছেলেদের থেকে বড়শি আর মাছগুলো সব কেড়ে নিল। ছেলেগুলো ওকে বলল, তোকে সাপে কাটবে। ব্যস, তারপর সব্বাই উধাও। ছেলেগুলো পালিয়ে যেতেই সমস্ত আকাশ কালো করে আঁধার নেমে এল। আকাশজুড়ে কালো মেঘের দখল আর ঝোড়ো হাওয়া। সেই সময় এক মুচিনী এসে বলল তার পরনের কাপড় খুব ছোটো, যদি কিছু টাকা দেয় তাহলে মেলা থেকে সে কাপড় কিনবে পরার জন্য। ক্ষেমানন্দ টাকা কোথায় পাবে? ওদের নিজেদেরই চলে না তেমন। আর মুচিনীর কথা বলার ভঙ্গি দেখে ওর মনে হল এ কোনও ছলনাময়ী। হঠাৎ পায়ে বিষাক্ত পিঁপড়ে কামড়ানোর যন্ত্রণা টের পেল। আর তখুনি দেখল ছোটো-বড়ো কত সাপে ছেয়ে গেছে তার চারপাশ। সেই সাপেদের মাঝে মুচিনীবেশি মেয়েটি। মৃদু মৃদু হাসছে। সে যে আসলে মুচিনী নয়! ততক্ষণে কেতকাদাস বুঝে গেছে, এ মুচিনীবেশে দেবী!
“মুচিনীরূপী দেবী বললেন, ‘আমি মনসা। আমার এই রূপের কথা কাউকে বলবি না। আমার গীত গা। তোর সকল অভাব দূর হবে।’—
‘শুন পুত্র ক্ষেমানন্দ কবিত্ব করিয়া বন্ধ আমার মঙ্গল গায়্যা বুল।।
শূন্য রস বাণ শশি সিয়রে মনসা আসি আদেশিলা রচিতে মঙ্গল।’
“স্বয়ং মনসার আশীর্বাদ নিয়ে কেতকাদাস মঙ্গলকাব্য রচনায় হাত দিল।”
প্রিয়াঙ্কা জড়িয়ে ধরল বিমলাকে, “মণিমা, তোমার পুরো মনসামঙ্গল মুখস্থ?”
প্রিয়াঙ্কার কথায় বিমলা হেসে বললেন, “শুধু কেতকাদাস নয়, আরও যত মঙ্গলকাব্যের রচয়িতা আছেন তাঁদের প্রত্যেকের জীবনই কাহিনি ও বৈচিত্র্যে ভরপুর। বিপ্রদাস পিপিলাই, বিজয় গুপ্ত, জগজ্জীবন ঘোষাল। কেবল কানা হরি দত্তর কথা কিছু জানা যায় না। হরি দত্তই প্রথম মনসামঙ্গল রচয়িতা। হরি দত্তই যে সর্বপ্রথম মনসামঙ্গল গেয়েছেন, সেই উল্লেখ বিজয় গুপ্তের কাব্যে আছে। এইসব কবিজীবনীগুলো ভালো করে জানলে সেই সময়ের ইতিহাসও জানা যায়। ভারতচন্দ্রের জীবনকাহিনি থেকে সেই সময়ের বাংলার প্রকৃত চিত্র পাওয়া যায়। সিরাজকে সরিয়ে বাংলা ঠিক করেছিল না ভুল, তার একটা রূপরেখা বুঝতে গেলে ভারতচন্দ্রের জীবনকাহিনি জানা খুবই জরুরি।”
বিমলা যখন গল্প বলেন, সবাই খুব মনোযোগ দিয়ে শোনে। পড়ার বইতে এইসব ইতিহাস কাহিনি পড়তে ওদের মোটেই ভালো লাগত না।
তেরো
সাধনের বাড়িতে সেদিন সকলকে নিয়ে বিরাট ভোজ উৎসব হল। আবিদ, আবিদের ভাই আলম, আশরাফ, আশুরা—সবাই আমন্ত্রিত। সাধন খবর পেয়েছে, দুর্জয় তার দলবল-সমেত ধরা পড়েছে। মূর্তিটা স্বস্থানে অর্থাৎ সংগ্রহশালায় জমা দেওয়া হয়েছে।
সেদিন রোহণদের এবারের মতো শেষ রাত সোনাহাটিতে। সবাই আনন্দ হইচই করতে করতে অনেক রাত হয়ে গেল। পরদিন ভোরবেলায় ট্রেন।
সাধনের ডাকে সবার ঘুম ভাঙতে বাধ্য। সাধনের জন্যই ঠিক সময়ে ওরা ট্রেনে উঠতে পারল। না-হলে বাচ্চাদের কারও ঘুমই ভাঙত না অত সকালে।
ট্রেনে সবার ঝিমুনিমতো এসেছে, এমন সময় শমিত জিজ্ঞাসা করল, “মণিমা, তোমার দ্বিতীয় প্রশ্নটার উত্তর পেয়েছ?”
বিমলা মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলার সঙ্গে সঙ্গেই শমিত বলল, “আমি কিন্তু জানি প্রশ্নটা কী।”
“কী?”
শৈলেশ জিজ্ঞাসা করল, “আশরাফ হোটেল খোলার টাকা কীভাবে পেল। যে খেতে না পেয়ে দেশে ফিরে যাবে ভাবছিল, এমনকি দেশে ফিরে যাওয়ার গাড়িভাড়াও যার আবিদকাকার কাছে চাইতে হয়, সে ছোটোখাটো হলেও একটা আস্ত হোটেল খুলে ফেলল কীভাবে? কেই-বা ওকে ধার-কর্জ দিল?”
“উত্তরটা আমি পেয়েছি রে শমু।” শমিতকে থামিয়ে বিমলা বললেন, “আশরাফকে কাল আমি সরাসরিই জিজ্ঞেস করেছিলাম। ওকে হোটেল খোলার টাকা বিনা সুদে তোর রাঙামামাই দিয়েছে। সাধন কিপটে বলে তোদের সকলের কাছে হাসির পাত্র। কিন্তু সাধনের মনটা তোরা কেউ চিনতে পারিসনি। ব্যাবসা করে কেউ দাঁড়াতে চাইলে সাধন তার মধ্যে নিজেকে দেখতে পায়। বিশেষ করে আশরাফের মতো গুণী পরিশ্রমী ছেলে সাধনের খুবই প্রিয়। নিজে যেচে এগিয়ে এসে ওকে হোটেল খোলার টাকা দিয়েছে। যখন ইচ্ছে ফেরত দেওয়ার কথাও বলেছে। আজ পর্যন্ত ও আশরাফকে কোনোদিন টাকার জন্য কোনও তাড়া দেয়নি। উলটে ওর বিপদে কীভাবে পাশে দাঁড়াল, সব দেখলি তো তোরা।”
শৈলেশ ঘুমে ঢুলে পড়ার আগে বলল, “সবই ওই বিরিয়ানির জন্য। বিরিয়ানির জন্যই তো আশরাফকে এত পচ্ছন্দ করে সাধনদা।”
ওরা সবাই হাসতে হাসতে ট্রেনের দুলনিতে একটু একটু করে ঘুমিয়ে পড়ল।
ছবি-মৌসুমী