
চেন্নাই থেকে পাক্কা সাড়ে আট ঘণ্টা লাগল খারতুম পৌঁছতে। মাঝে অবশ্য বাহারিনে এয়ার-ক্রাফট বদলের সময় ঘণ্টাখানেক হাত-পা ছুড়তে পেরেছিলাম।
যেদিন মিস্টার সেন আমায় বলেছিলেন, “আপনার কি পাসপোর্ট আছে?” সেদিন একটু চমকে উঠেছিলাম। পাসপোর্ট আছে ঠিকই, কিন্তু কোনোদিন বিদেশে যাইনি।
“যাবেন নাকি মরুভূমির দেশে?” কোনও উত্তরের অপেক্ষা না করেই বলেছিলেন মিস্টার সেন।
লাফিয়ে উঠেছিলাম।—“মরুভূমি, সাহারা! মিশর? নীল নদ! পিরামিড?”
“পিরামিড আর নীল নদ দেখতে পাবেন ঠিকই, এমনকি মরুভূমিও, তবে ঠিক সাহারা নয়। অন্য মরুভূমি। আর দেশটাও মিশর নয়।” একটা বইয়ের পাতা ওলটাতে ওলটাতে বলেছিলেন মিস্টার সেন। অনেকক্ষণ চেষ্টা করেও বইটা কী দেখতে পাইনি।
চিন্তায় পড়লাম। মিশর ছাড়া অন্য কোনও দেশে আবার পিরামিড আছে নাকি!
“কী ভাবছেন? জলদি বাড়ি থেকে পাসপোর্টটা নিয়ে আসুন! ভিসার ব্যবস্থা করতে পাসপোর্ট ডিটেল লাগবে।”
“মানে কীরকম খরচ-খরচা লাগবে…”
“খরচ নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবে না, সেটার ব্যবস্থা হচ্ছে।”
মিস্টার সেনের হাতে আমার পাসপোর্টটা হ্যান্ড-ওভার করে কয়েকটা কাগজে সই করার পর আর এই বিষয়ে কথা হয়নি। মিস্টার সেন কোনও বিষয়ে অহেতুক কথা পছন্দ করেন না। উনি বাড়ি থাকলে মোটামুটি রোজ সকালে একবার ওঁর বাড়ি হানা দিই। বেশ কয়েকদিন ধরে যখনই ওঁর বাড়ি গেছি, দেখি সকালবেলাতেই ড্রয়িং-রুমের টেবিলের ওপর একগাদা বই আর ম্যাপ ছড়িয়ে একটা ডায়েরিতে কীসব নোট করে যাচ্ছেন। টেবিলের ওপর ল্যাপটপে গুগল আর্থ খোলা। আমি যাওয়ার পর যথারীতি এক কাপ চা আর বিস্কুট হাজির হয় নিয়ম করে। চা-বিস্কুট খেয়ে, ওঁর বাগানে খানিক ঘুরঘুর করে গুড বাই বলে চলে আসি। মিস্টার সেন আমাকে দেখেও দেখেন না।
দিন দশেক পর মিস্টার সেন বললেন, “আমি আজ সন্ধের ফ্লাইটে দিন কয়েকের জন্য দিল্লি যাচ্ছি। ফিরে এসে কথা বলব। বাই দ্য ওয়ে, আপনার স্লিপিং ব্যাগ আছে?”
“ইয়ে মানে…”
“সোজা উত্তর দিন, ইয়েস অর নো!”
“পাহাড়ে কোনোদিন যাইনি তো, তাই…”
“তার মানে নেই। ঠিক আছে। আপনার মোবাইল সবসময় অন থাকে তো?”
“হ্যাঁ হ্যাঁ, আমি মোবাইল কখনও বন্ধ করি না।”
“গুড হ্যাবিট।” বললেন মিস্টার সেন।
পরের দিন সন্ধেবেলা মিস্টার সেনের ফোন এল, “কথা বলা যেতে পারে?”
“অফ কোর্স!”
“শুনুন, আমি আজ রাতের ফ্লাইটে ফিরছি। পরশু সকালের ফ্লাইটে চেন্নাই হয়ে আমরা বাহরিনের ফ্লাইট ধরব। সেখান থেকে অন্য ফ্লাইটে খারতুম। আপনি আপনার ব্যাগেজ গুছিয়ে রাখবেন। সঙ্গে নেবেন রোদচশমা আর সান হ্যাট। গরমের পোশাকের সঙ্গে একটা সোয়েটারও নিয়ে নেবেন। মরুভূমিতে রাতে ঠান্ডা লাগে।” এক নিশ্বাসে কথা বলে থামলেন মিস্টার সেন।—“এনি কোশ্চেন?”
“ইয়ে, আমরা যাচ্ছি কোথায়?” আমতা আমতা করে আমি বললাম।
“বললাম যে খারতুম!”
“না মানে খারতুমটা কোথায়?”
“খারতুম সুদানের ক্যাপিটাল। কেন, আপনি ভিসার কাগজে সই করার সময় দেখেননি?” প্রায় ধমকে উঠে ফোনটা কেটে দিলেন মিস্টার সেন।
সত্যি বলতে কি, আমি কোন কাগজে সই করছি দেখিইনি। মিস্টার সেন কাগজটার যেখানে সই করতে বলেছিলেন, সই করে ফেরত দিয়ে দিয়েছিলাম। উচিত ছিল কাগজটা উলটেপালটে দেখা। কিছু প্রশ্ন করতে ভয় হচ্ছিল পাছে বিদেশযাত্রার সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যায়।
***
খারতুম ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে কাস্টমস ক্লিয়ার করার জন্য লম্বা লাইন পড়ে গেছে। শক্তপোক্ত চেহারার কয়েকজন মহিলা ও পুরুষ অফিসার খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সব ব্যাগ খুলিয়ে যাত্রীদের মালপত্র দেখছে। সব এয়ারপোর্টেই কি এরকম হয়? আমার প্রথম বিদেশ ভ্রমণ, কাজেই কোনও ধারণা নেই। মিস্টার সেন কলকাতা থেকে চেন্নাই ও চেন্নাই থেকে বাহরিন পর্যন্ত সারাক্ষণ প্লেনে চোখ বন্ধ করেই ছিলেন। বাহরিনে গালফ এয়ারের প্লেনে ওঠামাত্র কানে কানে বলে দিয়েছিলেন, “চোখ-কান খোলা রাখবেন আর যথাসম্ভব মুখ বন্ধ রাখবেন।”
এ-কথা শোনার পর আমার সারা শরীরটা কেঁপে উঠেছিল। তবে কি আমরা বেড়াতে আসিনি?
মিস্টার সেন অনেকগুলো লাগেজ এনেছেন, কী আছে কে জানে ওই লাগেজগুলোতে। আমরা কাস্টমস ডেস্কে পৌঁছতেই পাসপোর্টে আমাদের নাম দেখে পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে চোখ বুলিয়ে কাগজটা আবার পকেটে ঢুকিয়ে, পাসপোর্টে ছাপ্পা মেরে, চোয়াল শক্ত করে বসে থাকা অফিসারটা মুখে মৃদু হাসি এনে বললেন, “হ্যাভ অ্যা নাইস টাইম ইন সুদান।”
বলে এগিয়ে যেতে ইশারা করলেন। অবাক হলাম, আমাদের ব্যাগেজগুলো কোনোরকম চেক করা হল না!
ট্রলিতে ব্যাগেজগুলো চাপিয়ে লাউঞ্জ ধরে এগোচ্ছি, হঠাৎ একজন বাদামি স্যুট পরা লোক আমাদের সামনে যেতে যেতে পা পিছলে পড়ে গেলেন। ওঁর হাতের ব্যাগটা থেকে একটা বই ছিটকে গেল খানিক দূরে। মিস্টার সেন ছুটে গেলেন ভদ্রলোককে তুলতে, আর আমি এগোলাম বইটা কুড়িয়ে আনতে। বইটার মলাটের ওপর দিগন্তবিস্তৃত মরুর মাঝে একটা লম্বা স্তম্ভের মতো পাহাড়ের ছবির ওপর লেখা—‘দ্য সিক্রেট মাউন্টেন’।
ছবিটা দেখে মনে পড়ল, বাহরিন থেকে প্লেনটা ছাড়ার খানিক পর মিস্টার সেন আমার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলেছিলেন, “পেছনের রোতে ভদ্রলোকের মুখের সামনে ধরা বইটার মলাটের ছবিটা দেখুন—আমাদের ডেস্টিনেশন।”
তার মানে এই ভদ্রলোকই আমাদের পেছনের সিটে বসে ছিলেন!
আমি বইটা কুড়িয়ে নিয়ে আসতে আসতে ভদ্রলোককে মেঝে থেকে উঠিয়ে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন মিস্টার সেন। মিস্টার সেনের কাঁধে ভর দিয়ে ভদ্রলোক ডান পাটা নাড়াচ্ছিলেন।
“ব্যথা হচ্ছে?” বললেন মিস্টার সেন।
“না না, ঠিক আছি। হঠাৎ মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠেছিল।” বললেন ভদ্রলোক।
তারপর নিজের ডানহাতটা মিস্টার সেনের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, “আই অ্যাম প্রফেসর ওমর আলি। স্থানীয় ইউনিভার্সিটিতে ইতিহাস পড়াই।”
মিস্টার সেন ওঁর হাতটা ধরে বললেন, “আমি তপনানন্দ সেন, ইন্ডিয়া থেকে আসছি।”
“সেন! আর ইয়ু গোয়িং টু কারিমা?” বললেন প্রফেসর।
“ইয়েস, বাট হাউ ডু ইউ নো?”
ভদ্রলোক কিছু না বলে মুচকি হাসলেন। তারপর আমার হাত থেকে বইটা নিয়ে ‘থ্যাংক ইউ’ বলে মিস্টার সেনের কাঁধে হাত রেখে, “ইউ হ্যাভ টেকেন অ্যা টাফ অ্যাসাইনমেন্ট। অল দ্য বেস্ট। হোপ টু সি ইউ সুন। সাবধানে থেকো।” বলে চলে গেলেন।
আমি লাগেজের ট্রলি ঠেলতে ঠেলতে মিস্টার সেনকে বললাম, “ভদ্রলোক কী অ্যাসাইমেন্টের কথা বলে গেলেন? আমরা কি কোনও বিশেষ কাজে এসেছি?”
“আরে না না, সেরকম কিছু নয়, হোটেলে পৌঁছে বলব। হোটেল থেকে গাড়ি পাঠানোর কথা, সেটাকে আগে লোকেট করতে হবে।”
“হোটেলের নামটা জানতে পারি কি?”
“হোটেল করিন্থিয়া। হোটেলের জানালা দিয়েই দেখতে পাবেন হোয়াইট আর ব্লু নাইলের সঙ্গম।”
“আর পিরামিড?”
হো হো করে হেসে উঠলেন মিস্টার সেন।—“আরে ব্যস্ত হচ্ছেন কেন?”
লাউঞ্জ থেকে বেরোবার মুখে একজন লম্বা লোক একটা বোর্ড হাতে দাঁড়িয়ে ছিল। বোর্ডটার ওপরে লেখা ‘হোটেল করিন্থিয়া’ আর নীচে ‘ওয়েলকাম মিস্টার সেন।’
আমরা এগিয়ে গেলাম লোকটার দিকে। কালচে বাদামি তেল কুচকুচে লোকটা নয় নয় করেও ছয় ফুটের মতো লম্বা। পরনে একটা একটা সাদা জোব্বা। জোব্বার নীচ দিয়ে জিনসের প্যান্ট আর স্পোর্টস-শু উঁকি মারছে। ছোটো করে ছাঁটা দাড়িভরা গোল ফেজ টুপি পরা মুখে একটা হাসি ঝুলে আছে। মাথায় একটাও চুল নেই। দেখে মনে হল লোকটার বয়স হবে পঞ্চাশের আশেপাশে।
লোকটার সামনে ট্রলি-ভরতি মালপত্র নিয়ে দাঁড়াতে লোকটা কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, “মিস্টার সেন?”
“ইয়েস, হিয়ার ইস মাই পাসপোর্ট।”
লোকটা হাত বাড়িয়ে পাসপোর্টটা এক ঝলক দেখে ফেরত দিতে দিতে বলল, “সরি পাসপোর্টটা দেখতে হল বলে। কিছুদিন আগে অন্য একটা হোটেলে একদল বিদেশি উগ্রপন্থী ভুল পরিচয় দিয়ে থেকে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে বহু লোককে মেরে ফেলেছিল। তারপর থেকে আমাদের ওপর কড়া হুকুম আছে প্রতিটি গেস্টের পরিচয় ভালো করে যাচাই করার। সরি স্যার। ওয়েলকাম টু সুদান। আমি আরমিন।”
লোকটাকে ভালো লেগে গেল। ভোরের আলো সবে ফুটতে শুরু করেছে। ট্রলিটা আমার হাত থেকে নিয়ে পার্কিং লটের দিকে ইশারা করে বলল, “আসুন স্যার।”
হোটেল পৌঁছে রিসেপশনে যেতে এক মহিলা একটা সাদা খাম মিস্টার সেনের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, “স্যার, এটা আপনার নামে কাল সন্ধ্যায় একজন দিয়ে গেছেন। আপনাদের রুম নাম্বার ৭০২-এ আপনাদের লাগেজ পৌঁছে গেছে।”
আছে কী ওই খামে? মিস্টার সেন খামটা খুলে একটা ভাঁজ করা কাগজ বের করে এক ঝলক দেখে আবার কাগজটা ভাঁজ করে খামে ঢুকিয়ে রাখতে রাখতে বললেন, “ঠিক দশটার সময় আমরা বেরোব। ক্যামেরা নিয়ে নেবেন। আর র্যান্ডম ছবি তুলবেন।”
“আমরা কি মরুভূমিতে যাচ্ছি! মানে ওই পিরামিড দেখতে?” আমি বললাম।
“না, ইউনিভার্সিটি।” মিস্টার সেন ওঁর একটা ব্যাগের চেন খুলতে খুলতে উত্তর দিলেন। তারপর একটা বই আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, “এখনও হাতে খানিক সময় আছে। টায়ার্ড না থাকলে বইটায় একবার চোখ বুলিয়ে নিতে পারেন।”
বইটা হাতে নিয়ে চমকে উঠলাম। খানিক আগেই এই একই বই এয়ারপোর্ট প্রফেসর ওমরের ব্যাগ থেকে এয়ারপোর্টের লাউঞ্জে ছিটকে পড়েছিল—‘দ্য সিক্রেট মাউন্টেন’। এই একই বই মিস্টার সেনের কাছে কেন? কী আছে ওখানে?
বইটা ভরতি পিরামিড আর অনেকগুলো পাথরের মূর্তি আর ভাঙা মন্দিরের ছবি। কয়েক পাতা ছাড়া সেরকম লেখা নেই। বালির মাঝে একটা পাহাড়—জেবেল বারকেল। তাকে ঘিরেই সব ছবি। ছবিগুলো যেমনি অসাধারণ, তেমনি ছাপা। মুগ্ধের মতো তাকিয়ে থাকতে হয়। একটা বড়ো ম্যাপ বইটার শেষে। তাতে এই অঞ্চলের নকশা। মরুভূমির মাঝে একটা পাহাড়কে ঘিরে অনেকগুলো ভাঙা মন্দির। খানিক দূরে ছোটো ছোটো পিরামিড আর মরুর এক পাশ দিয়ে বয়ে চলা নদী। মনে হয় আকাশ থেকে তোলা।
“ম্যাপটা মাথায় বসিয়ে নিন, আমরা ওখানেই যাব।” বললেন মিস্টার সেন।—“ও, ভালো কথা, আমরা কয়েকদিন মরুভূমিতে তাঁবু খাটিয়ে থাকব একদম পিরামিডের কাছাকাছি। প্রাণ খুলে মরু সাম্রাজ্য উপভোগ করতে পারবেন।” বলে হা হা করে হেসে উঠলেন মিস্টার সেন। এরকমভাবে কোনোদিন হাসতে শুনিনি ওঁকে।
দরজায় ঠক ঠক করে একটা হালকা আওয়াজ হল।
“কফি এসে গেছে।” বলে দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন মিস্টার সেন।
টেবিলে কফির কাপ রাখার পর ট্রে থেকে একটা সাদা খাম কফির কাপের পাশে রেখে দিল হোটেলের বেয়ারা ছেলেটি। জানতে চাইল—“আর কিছু লাগবে স্যার?”
“ব্রেকফাস্ট রুমেই আনিয়ে নিই, কী বলেন? আজকে কখন খাওয়া জুটবে কে জানে।” বললেন মিস্টার সেন।—“স্যান্ডউইচ আর অমলেট বলে দিই?”
অর্ডার নিয়ে ছেলেটি চলে যেতে সোফার উপর বসে কফির কাপে এক চুমুক দিয়ে খামটা খুলে একটা একফালি সাদা কাগজ বের করে চোখ বুলিয়ে আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, “একটু পরে ইউনিভার্সিটি থেকে গাড়ি আসবে আমাদের নিতে। আপনি কিন্তু র্যান্ডম ছবি তুলতে ভুলবেন না।”
ঠিক দশটায় হোটেলের রিসেপশনে পৌঁছে যাঁকে দেখলাম, তাঁকে আশা করিনি। প্রফেসর ওমর আলি!
“বলেছিলাম দেখা হবে!” করমর্দনের জন্য হাত বাড়িয়ে বললেন প্রফেসর।—“আমি আপনাদের কথা জানতাম। আমাদের ডিপার্টমেন্টের হেড ড. আবুল আহমেদ আপনাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন তাই আপনাদের আমাকে জানার কথা নয়।” আন্তরিকভাবে বললেন প্রফেসর।
মিস্টার সেনের মুখে হালকা হাসি ছাড়া কোনও অভিব্যক্তি নেই। উনি যেন জানতেন যে প্রফেসর আলিই আমাদের নিতে আসবেন।
হোটেল থেকে বেরিয়ে নীল নদের কিনারা ঘেঁষা আলগাম্মা অ্যাভিনিউ দিয়ে গাড়ি চালাতে চালাতে প্রফেসর বললেন, “এ এক অদ্ভুত রহস্য, মিস্টার সেন। জেবেল পাহাড়ের মাথায় রাতের আবছা অন্ধকারে বেশ কয়েকবার একটা মানুষের মতো আকৃতি দেখা গেছে। তার সারা শরীরে আলোর ছটা। অথচ রাতের অন্ধকারে ওই পাহাড়ের ধারেকাছেও কারও যাবার অনুমতি নেই। সিকিউরিটি ওখানে খুব কড়া। একজন সাংবাদিক এই খবরটা ফ্ল্যাশ করার পর আমাদের প্রেসিডেন্টের নজরে আসে ব্যাপারটা। তিনি আমাদের আর্কিওলজিক্যাল ডিপার্টমেন্টকে বলেন খোঁজখবর করতে। বুঝতেই পারছেন, জেবেল পাহাড় সংলগ্ন ইতিহাস অন্তত সাড়ে তিন হাজার বছর পুরোনো। অতগুলো পিরামিড রয়েছে ওখানে। আমরা এখনও সবকিছুর খোঁজও করে উঠতে পারিনি। জেবেল বারকেল পাহাড়কে সেই প্রাচীনকাল থেকে বাতাসের দেবতা আমুনের বাসস্থান বলে মনে করা হয়। তাই এই পাহাড় আমাদের সবার কাছে খুব পবিত্র। নানা সংস্কার জড়িয়ে আছে এই পাহাড়ের সঙ্গে। আমাদের ডিপার্টমেন্টের লোকও গেছিল অনুসন্ধান করতে, কিন্তু একদল কট্টরপন্থী ধর্মভীরু আমাদের লোকেদের প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে তাড়িয়ে দিয়েছে। ওদের বিশ্বাস, আমন দেবতা আবার ফিরে এসেছেন। ওখানে মানুষ গিয়ে… ” এক নিশ্বাসে বলে গেলেন প্রফেসর।
“আমাদের প্রেসিডেন্টও একজন ইতিহাসবিদ। উনিও সত্যটা জানতে চাইছেন, কিন্তু মিলিটারি দিয়ে জায়গাটা ঘিরে ফেলে নয়। মাঝে-সাঝে কিছু বিদেশি পর্যটক আসেন জেবেল বারকেল দেখতে। তাই অ্যাডমিনিস্ট্রেশন চাইছে না পর্যটকরা ভীত হক। জানেনই তো, পাশের দেশের সঙ্গে আমাদের দেশের সম্পর্কটা আবার…” কথাটা শেষ করেলন না প্রফেসর।
“বিশ্বের যে-কোনো সাধারণ মানুষকে প্রশ্ন করুন, ‘পিরামিড কোন দেশে আছে’—খুব কম লোকই আমাদের দেশের কথা বলবে।” একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন প্রফেসর।
ইউনিভার্সিটির বিশাল বড়ো বন্ধ গেটের সামনে গাড়ি দাঁড়াল। এগিয়ে এল মাথায় ফেট্টি বাঁধা কালো পোশাক ও কালো চশমা পরা দুই গার্ড। প্রফেসর গাড়ির কাচ নামিয়ে কিছু বললেন। একজন এক ঝলক আমাদের দেখে ওয়াকিটকিতে কিছু বলতে গেট দুটো দু-পাশে খুলে গেল।
ঘড়িওয়ালা ইউনিভার্সিটির গেট পার করে একটা দোতলা বাড়ির সামনে গিয়ে গাড়ি দাঁড় করিয়ে প্রফেসর বললেন, “আমরা পৌঁছে গেছি।”
ঘন সবুজ ঘাসে ছাওয়া একটা বড়ো মাঠ বাড়িটার সামনে। মাঠের ধার দিয়ে খেজুরগাছের সার। মনেই হচ্ছে না আমরা আছি মরুদেশে। ইসলাম স্থাপত্যের বড়ো বড়ো খিলানওয়ালা বাড়ি। খুব নিস্তব্ধ পুরো চত্বরটা। কোনও জনমানবের দেখা নেই। আমার কেন জানি না মনে হচ্ছিল সুদান-ফুদান নয়, বাঁকুড়ায় বেড়াতে এসেছি।
সার সার বন্ধ দরজার পাশ দিয়ে লম্বা করিডোর পার হয়ে প্রফেসর আলি আমাদের নিয়ে বসালেন একটা বই-ঠাসা ঘরে। আমরা ঢোকার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ঘরের ভেতরের একটা দরজা ঠেলে সাদা জোব্বা পরা এক ছোটোখাটো চেহারার ভদ্রলোক বেরিয়ে এসে মিস্টার সেনকে জড়িয়ে ধরলেন। দেখলাম, ভদ্রলোকের একটি হাত নেই।
“আরে সেন, কতদিন পরে দেখা! মনে আছে কঙ্গোর টেলি লেকে অভিযানের কথা? লেকে বোট উলটে দুর্ঘটনাটা না ঘটলে হয়তো মোকিলি মিবিমিবির রহস্য ভেদ হত। কী যে হয়ে গেল! তুমি না থাকলে জলে ডুবেই মারা যেতাম হয়তো। শুধু হাতটাই যা হারাতে হল।”
মিস্টার সেন প্রফেসরের সঙ্গে, আমার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিয়ে বললেন, “মিট হিম, আ গুড ফটোগ্রাফার অ্যান্ড আ রাইটার। আমার সঙ্গে বেশ কয়েকটা অভিযানে গেছে। ভালো ডকুমেন্টেশন করে।”
“আলাপ করে খুব ভালো লাগল। ভিসুয়াল ডকুমেন্টশনটা খুব জরুরি, অন্তত এই ক্ষেত্রে। জানেনই তো, আমাদের শত্রু দেশের অভাব নেই। যদি দেখা যায় ওরা বদমাইশি করে ইউরোপ-আমেরিকার হাত ধরে জেবেল পাহাড়ের মাথায় মানুষের আকৃতির কোনও রোবট-টোবট লাগিয়ে সুদানবাসীকে ভয় দেখাতে চাইছে, তা হলে ছবি দেখিয়ে আমরা আন্তর্জাতিক মঞ্চে প্রতিবাদ করতে পারব। লড়াই করতে আমরা আর চাই না।”
একটানা বলে থামলেন ড. আবুল আহমেদ। ইনিই যে ড. আবুল আহমেদ তা বুঝতে পেরেছিলাম দরজার ওপর লাগানো নেমপ্লেট দেখে। খালি ভাবছিলাম, উনি যদি জানতে চান তুমি কী নিয়ে লেখো, ক’টা বই আছে, তাহলেই হয়েছে। কয়েকটা পত্রপত্রিকায় লেখা ছাপা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু আজ পর্যন্ত আমার একটাও বই প্রকাশিত হয়নি। অবশ্য খান দুই বার হব হব করছে।
“সেন, চলো লাইব্রেরিতে যাই, ওখানেই বসে আলোচনা হবে।” বলে করিডোর দিয়ে হাঁটতে শুরু করলেন ড. আহমেদ।
আমি পটাপট ছবি তুলে যাচ্ছি। ডিজিটাল ক্যামেরায় ফিল্মের কোনও খরচ নেই, শুধু ক্লিক করে গেলেই হল। দু-দিকে সার সার ঘর, তার মধ্যে দিয়ে চকচকে টাইলস বিছানো করিডোর। পুরো ইউনিভার্সিটিটাই শুনশান। ছুটি চলছে কি না বুঝতে পারছি না। এসব কথা জিজ্ঞেসও করা ঠিক নয়।
করিডোরের শেষে অন্তত দশ ফুট চওড়া একটা সিঁড়ি বিশাল হলঘরের মাঝ থেকে উঠে গেছে। বিল্ডিংটার বাইরেটা প্রাচীন হলেও ভেতরটা বোধ হয় নতুন করে তৈরি। সিঁড়ির দু-পাশে ফ্রস্টেড গ্লাস, তার ওপর স্টিলের গোল পাইপের হাতল। হলঘরের একপাশে ‘লিফট’ লেখা একটা খোপ। সব জায়গায় আরবি ও ইংরেজি নেমপ্লেট। একসময় আমাদের দেশের মতো সুদানও ব্রিটিশ শাসনে ছিল, তাই ইংরেজির ব্যবহার প্রায় সব জায়গায়—এটা এয়ারপোর্টে নামার পর থেকেই লক্ষ করেছি। সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বললে অবশ্য সবাই ইংরেজি জানে কি না বুঝতে পারতাম।
সিঁড়ি দিয়ে উঠতেই গিয়ে পড়লাম একটা বড়ো হলঘরে। কাচের জানালার মধ্যে দিয়ে দেখা যাচ্ছিল নীল নদ। প্রচুর গাছপালা চারদিকে। মাটির জায়গায় বালি না থাকলে এটাকে মরুদেশ বলে মনেই হত না। অবশ্য আমি আর দেখেছি কতটুকু।
বড়ো হলঘরটা পুরোটাই লাইব্রেরি। ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম। মিস্টার সেন আর ড. আহমেদ একটা বড়ো টেবিলে বসতেই এক ভদ্রলোক কতগুলো বই আর একটা ম্যাপ এনে রাখলেন। লিফটের দরজায় খট করে আওয়াজ হতে ওদিকে তাকিয়ে দেখি হাতে একটা ল্যাপটপ নিয়ে প্রফেসর আলি এগিয়ে যাচ্ছেন মিস্টার সেনদের দিকে। আমার দিকে তাকিয়ে হাত নেড়ে ওদিকে যেতে ইশারা করলেন।
“আমরা পুরো লাইব্রেরিটাই ডিজিটালাইজড করার চেষ্টা করছি।” বলে পকেটে রাখা মোবাইলটা বেজে উঠতে প্রফেসর আলি খানিক থামলেন। ফোনটা কানে নিয়ে মিস্টার সেনের দিকে তাকিয়ে বললেন, “এখন কফির সঙ্গে স্ন্যাক্সে আপত্তি নেই তো?”
“চলতে পারে, সানবুসাক।” বললেন মিস্টার সেন।
হালকা হেসে ঘাড় নেড়ে প্রফেসর আলি আরবিতে ফোনের ও-পারের কাউকে কিছু বললেন।
“হ্যাঁ, যা বলছিলাম, ডিজিটালাইজেশনের কাজ শেষ হতে আরও বছর পাঁচেক লাগবে। খুব সাবধানে কাজগুলো করতে হচ্ছে। শয়ে শয়ে বছরের পুরোনো সব বই আছে আমাদের লাইব্রেরিতে। সেই বই সবাইকে ঘাঁটতে দেওয়া সম্ভব নয়, কিন্তু বইয়ের কন্টেন্ট জানার অধিকার সবাই আছে। দুজন স্টাফকে মাইক্রোসফট কোম্পানি থেকে ট্রেনিং দিয়ে নিয়ে আসা হয়েছে এই কাজের জন্য। ‘নাইল পেট্রলিয়াম’ কোম্পানি পুরো প্রজেক্টটা স্পনসর করছে, তাই ফান্ডের অভাব হবে না।”
“সেন, তোমাকে পুরো মিশনটার বিষয়ে খুঁটিনাটি আর বলছি না, এটা নিয়ে আমাদের মধ্যে অনেক আলোচনা হয়েছে। শুধু মনে রেখো, আমরা কেউ তোমার সঙ্গে থাকব না। তোমরা দুজনই শুধু যাবে জেবেল বারকেলে। তোমাদের সঙ্গে থাকবে এক ড্রাইভার—ড্রাইভার আমাদের মিলিটারির লোক, একজন কমান্ডো। ওকেও কিছু জানানো হয়নি মিশনের বিষয়ে। শুধু বলা হয়েছে, তোমরা দুজন আমাদের প্রেসিডেন্টের বিশেষ পরিচিত। জেবেল বারকেল মানে জেবেল পাহাড়ের মিথ নিয়ে লিখতে চাও, তাই অঞ্চলটা দেখতে এসেছ।” ট্রলি ঠেলতে ঠেলতে একজনকে আমাদের টেবিলের দিকে আসতে দেখে চুপ করে গেলেন ড. আহমেদ।
ট্রলি থেকে কফির পট, কাপ এসবের পাশাপাশি দুটো বড়ো বড়ো ঢাকনা দেওয়া পাত্র নামিয়ে রেখে লোকটা চলে যেতে ড. আহমেদ কফি চারটে কাপে ঢেলে পাত্রের ঢাকনা খুলতে অবাক হয়ে গেলাম। মিস্টার সেন সানবুসাক না কী যেন একটা বলেছিলেন, এ তো দেখছি শিঙারা!
“ভাবছেন কী? খেয়ে দেখুন! এই জিনিস মিডিল ইস্ট ছাড়া অন্য কোথাও পাবেন না। মরু থেকেই এই খাবার আমাদের দেশে পৌঁছে সমোসা হয়েছে। ওই শিঙাড়া যেটা খান সেটার শেপ ভেবে দেখুন, পিরামিডের মতো। এটা তেলে ভাজা নয়, রোস্টেড। ওই যেভাবে লিট্টি বানায়, উনুনে সেঁকে—ভেতরে মাংসের পুর দেওয়া।”
মিস্টার সেনের কথা শুনে খানিক ঘাবড়ে গেছিলাম। আমি যে শিঙাড়া ভেবে নাক সিটকেছি, সেটা উনি খেয়াল করেছেন।
সানবুসাকে একটা কামড় দিয়ে বুঝলাম, সত্যিই উপাদেয়। পাত্রে অনেকগুলো ছিল, গোটা ছয়েক আমিই সাবড়ে দিলাম। তেলে যখন ভাজা নয় তখন অম্বল হবার ভয় নেই।
“সেন, তাঁবু-টাবু সব এনেছ তো? নাকি ব্যবস্থা করব?”
ড. আহমেদের কথার উত্তর দেন মিস্টার সেন, “সব এনেছি, স্যাটেলাইট ফোন পর্যন্ত। জানি তোমরা চাও না আমরা কী কাজে এসেছি তা পাঁচকান হোক।”
“একবার ম্যাপগুলো ভালো করে দেখে ছবি তুলে নাও। জি.পি.এস-এর ভরসা কোরো না। তোমাদের ড্রাইভার ওই অঞ্চলের রাস্তা ভালো করে চেনে, অসুবিধা হবে না। ভালো কথা, হেলমেট এনেছ? ওখানে কিন্তু ঈগলের ভীষণ উৎপাত। সাঁ করে নেমে এসে মাথায় ঠুকরে দিতে পারে। ওইজন্যই আমি কী কী আনতে হবে তার লিস্ট পাঠিয়েছিলাম।”
“হেলমেট আনিনি, তবে ক্যানভাসের মোটা টুপি এনেছি। টপে পাতলা স্টিল শিট দেওয়া আছে, ঈগল ঠোক্কর দিয়ে সুবিধা করতে পারবে না।”
“এবার আমরা এখান থেকে চলে যাচ্ছি, এই বইগুলো থেকে নোট নেবার ভান করতে থাকো ঘণ্টা দুয়েক ধরে। সন্ত্রাসবাদীই বলো, আর কট্টরপন্থীই বলো—ওদের নজর সবদিকে। ওরা উলটোপালটা কিছু সন্দেহ করলে যে-কোনোভাবে তোমাদের জেবেল বারকেল যাওয়া পণ্ড করে দেবে। তোমাদের ড্রাইভার আমানের কাছে অবশ্য মেশিনগান, বুলেট সব থাকবে। আমাদের দেশে কিছু হলে আগেই লোকে গুলি চালাতে শুরু করে। ছাড়ো ওসব, তোমরা দেশের অতিথি, এত কিছু না জানাই ভালো।”
“ড. আহমেদ, ওঁদের লাঞ্চ এখানেই দিতে বলে দিই?” জানতে চান প্রফেসর আলি।
“না না, অনেক খাওয়া হয়ে গেছে, একবারে হোটেলে ফিরে খাব।” মিস্টার সেন বলে ওঠেন।
“বেশ, যা ভালো মনে করো। জোরাজুরি করব না। তোমরা ফিরে এলে আমার বাড়িতে পার্টি হবে আর আমি নিজে তোমাদের শহর ঘুরিয়ে দেখাব। অল দ্য বেস্ট। ফিরে এসে দেখা হবে। আমাদের পররাষ্ট্র দপ্তরের তাই ইন্সট্রাকশন, মিশন শুরুর আগে তোমাদের সঙ্গে অ্যাকাডেমিকের মতো ব্যবহার করার।” বলে ড. আহমেদ আমার আর মিস্টার সেনের সঙ্গে হাত মিলিয়ে প্রফেসর আলির সঙ্গে চলে গেলেন।
ইউনিভার্সিটি থেকে আমাদের নিয়ে যাবার জন্য এসেছিল আমাদের আগামী ক’দিনের সঙ্গী আমান। লোকটা গাঁট্টাগোট্টা চেহারার হলেও বেশ হাসিখুশি। ইংরেজিও বলে চমৎকার।
খারতুম ইউনিভার্সিটির গেট পার হতেই শুরু হয়েছিল হালকা বালি ঝড়। টয়োটা হিওক্স এসি গাড়ির কাচ সব তোলা থাকায় ধুলো ভেতরে ঢুকতে পারছিল না। মিহি বালির কণার স্তর গাড়ির বনেটের ওপর জমে উঠেছিল। কোথায় যেন একটা পড়েছিলাম, খুব বেশি মিহি হওয়ার জন্য মরুবালি দিয়ে এখন মরুদেশে নাকি ইটের দেওয়ালের গাঁথনি হয় না, বর্তমানে গাঁথনির বালি আসে আমাদের মতো দেশ থেকে। সেই যে কী একটা কবিতা আছে না—জল জল, চারদিকে জল, নট অ্যা ড্রপ টু ড্রিংক—বালি বালি, চারদিকে বালি, তবে এ-বালিতে নেই জোর, বালি আনাও অন্য দেশ থেকে শিপে করে যত পারো, মোর অ্যান্ড মোর। ধুস, আমাকে দিয়ে কবিতা হবে না।
ঘরে ঢুকে মিস্টার সেন বললেন, “আপনাকে মিশন নিয়ে এখনই সব বলছি না। খানিকটা তো আলির মুখ থেকে শুনেছেন। এক্সাইটমেন্টটা থাকুক। কিছু কি খাবেন, তাহলে অর্ডার করি?”
“না না, এখন কিছু খাব না, পেট ডাঁই হয়ে আছে।”
“তাহলে চলুন একটু হেঁটে আসা যাক।”
হোটেলের বাইরে খানিক হেঁটে ফিরে এলাম। প্রচুর খাবারের দোকান, নানাধরনের কাবাব, ভাজা মাছ আর পরোটা। ওই স্ট্রিট ফুড আর কি। হাতিবাগানের মতো জামাকাপড়ের দোকান রাস্তার পাশ দিয়ে। টি-শার্ট, জিনসের প্যান্ট, জোব্বা ঝুলছে হ্যাঙ্গার থেকে। তবে থিকথিকে ভিড় নেই। বি.এম.ডাব্লিউ, মার্সিডিজের পাশাপাশি গাধায় টানা কার্টও চলেছে পিচ-ঢালা চওড়া রাস্তা দিয়ে।
“কালো প্যান্টের ওপর সাদা-কালো স্ট্রাইপ জোব্বা পরা দুটো লোককে অনেকক্ষণ ধরে আমাদের পেছন পেছন দেখতে পাচ্ছি।”
“পুলিশের লোক মনে হয়। আমাদের তো ডেকেছে এ-দেশের সরকার, তাই সিকিউরিটির জন্য আমাদের পেছনে লাগিয়েছে মনে হয়। চলুন হোটেলে ফেরা যাক, কাল ভোরে আমান আসবে গাড়ি নিয়ে।”
মিস্টার সেনের কথার ওপর কথা চলে না, তাই আর একটু ঘুরে দেখার ইচ্ছে থাকলেও ফিরতে হল।
***
সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা লেগে গেল খারতুম থেকে আতবারা পৌঁছতে। আমরা গিয়ে উঠলাম নাইল ভ্যালি ইউনিভার্সিটির গেস্ট হাউসে। খারতুম ইউনিভার্সিটি থেকেই এখানে আমাদের থাকার ব্যবস্থা করে রাখা হয়েছিল। আমরা দুজন একটা ঘরে আর আমান আর একটা ঘরে। রাস্তায় আসতে আসতে আমান জানিয়েছিল, ও নাইল ভ্যালি ইউনিভার্সিটি থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে সামরিক বাহিনীতে যোগ দেয়। শহরটা ভালোই চেনে।
নীল নদ আর আতাবারা নদী বয়ে গেছে শহরের পাশ দিয়ে। শহরটা যে রেলের জন্য বিখ্যাত সেটা আমান রাস্তায় আসতে আসতে জানিয়ে দিয়েছিল। এখান থেকে নদীপথে মালপত্র এসে রেলের মধ্যে দিয়ে আফ্রিকার নানা প্রান্তে চালান যায়, আবার নানা প্রান্ত থেকে তুলো-সহ নানা জিনিস এখানে এসে জলপথে পৃথিবীর নানা কোনায় পৌঁছয়।
খারাতুম শহর ছাড়ার পরপরই আসল মরুর দেখা পেয়েছিলাম। যেদিকে চোখ যায় খালি বালি আর টিলা। তার মধ্যে দিয়ে পিচ-ঢালা পথ গিয়েছে। কয়েক জায়গায় আবার পথ নেই বললেও চলে। বালির ওপর দিয়েই গাড়ি চলছে। উলটোদিক থেকে বেশ কিছু ট্রাক আমাদের পার করেছিল। একটা যাত্রীবোঝাই বাসও দেখেছি। তবে আফ্রিকা সম্পর্কে যেরকম শুনতাম, যে লোকজন বাসে মৌচাকের মতো ঝুলে থাকে, সেরকম কিছু দেখলাম না। এমনকি বাসের মাথাতেও কেউ বসে নেই যা হামেশাই আমাদের দেশের গ্রামের দিকে দেখতে পাওয়া যায়। কয়েকটা উট আর গাধায় টানা গাড়ি দেখেছি রাস্তা ছেড়ে বালির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। মাথায় হেলমেট পরে একজন সাইকেল চালিয়েকে দেখেছি, সাইকেলের প্রায় পুরো শরীরেই ব্যাগপত্র বাঁধা। বোধ হয় সাইকেলে সাহারা অভিযান করছে।
আমাদের গাড়িটা অনেকটা পিক-আপ ভ্যানের মতো। পেছনে মাল নেবার জায়গা। সেখানে দুটো একশ লিটার জলভরা ট্যাংক, এক জারিকেন পেট্রোল আর আমাদের মালপত্র রাখা। আমান বলেছিল, আতাবারা পর্যন্ত রাস্তার ধারে প্রায় সবই পাওয়া যাবে, কিন্তু তারপর শুরু হবে আসল সাহারা। কয়েকশো মাইলের মধ্যে কিছু নাও পাওয়া যেতে পারে। খারতুম ছাড়ার পর আতাবারা পর্যন্ত কোথাও একবারের জন্যও গাড়ি থামায়নি আমান। মাঝে মাঝে আমায় শুনিয়ে গেছে ওর কলেজ জীবনের কথা, আতাবারার ইতিহাস। প্রায় দেড়শো বছর আগে এই শহরের নদীর ধারে অ্যাংলো-ইজিপশিয়ান আর ব্রিটিশ সৈন্যদের মধ্যে লড়াইয়ে প্রায় হাজার তিনেক লোক নাকি মারা গেছিল।
মিস্টার সেন সারা রাস্তায় একটাও কথা বলেননি। পেছনের সিটে বসে একের পর এক বইয়ের পাতা উলটে গেছেন। শুধু নাইল ইউনির্ভাসিটিতে ঢোকার মুখে একটাই কথা জিজ্ঞেস করেছিলেন আমানকে, “পাহাড়ে চড়তে পারো?”
ঘাড় নেড়ে ‘হ্যাঁ’ বলেছিল আমান।
ইউনির্ভাসিটির গেস্ট হাউসে ঢোকার পর মিস্টার সেন বইতে মুখ গোঁজার আগে একটাই কথা আমায় বলেছিলেন, “চাইলে আপনি শহরটা আমানের সঙ্গে ঘুরে দেখতে পারেন, না-হলে আহমেদের দেওয়া বইগুলো উলটেপালটে দেখতে পারেন। কাল যেখানে যাব সেখানে পৌঁছনোর আগে এই বইটাও আবারও একবার ভালো করে দেখে নেওয়া উচিত।” বলে ‘দ্য সিক্রেট মাউন্টেন’ বইটা কাঁধের ব্যাগের চেন খুলে বের করে দিয়েছিলেন।—“যেখানে মিশনে যাচ্ছেন, সেখানকার ইতিহাসটা একবার জেনে রাখা দরকার, পরে লেখালেখিতে কাজে লাগবে।”
এ-কথা শোনার পর আর কার শহর দেখার ইচ্ছে থাকে?
“এই মরুভূমি সাহারার অংশ হলেও একে বলে নুবিয়ান ডেজার্ট। নুবিয়ান নামের এক উপজাতীয় মানুষ এখানে বাস করত, এখনও করে। তবে এখানে আমাদের মিশনের বাইরে আর কোনও কিছুর দিকে নাক গলাবেন না। নিশ্চয়ই জেনে গেছেন, এখানকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি খুব সুবিধের নয়। এখানে বালি খুঁড়ে উপজাতি লোকেরা সোনা খুঁজে বেড়ায়, আর সেই সোনা লুট করার জন্য একদল উটের পিঠে চড়ে মরুর বুকে ঘোরে। দুই পক্ষই কাঁধে বন্দুক আর গলায় বুলেটের মালা পরে থাকে।” এই পর্যন্ত বলে থেমে গেলেন মিস্টার সেন। আতাবারা ছাড়ার ঘণ্টা খানেক পর প্রথম মুখ খুললেন মিস্টার সেন। ওঁর হাতে এখন আর কোনও বই নেই।
“ছবি তুলছেন তো? যেরকম বলেছিলাম!”
“কিছু তুলেছি।”
“ওতেই হবে। খানিক বাদে আমাদের ডেস্টিনেশনে পৌঁছে যাব, তখন সবসময় গলায় ক্যামেরা ঝুলিয়ে রাখবেন।”
“আমাদের ডেস্টিনেশন কি এসে গেল?”
“হ্যাঁ, প্রায়।”
“মানে জিবিল পাহাড়?”
“জিবিল নয়, জেবেল। জেবেল বারকেল। বাতাসের দেবতা, আমানের বাসস্থান।”
“আমান মানে দেবতাদের রাজা?”
“হ্যাঁ, ওই জন্যই গতকাল বইগুলো ভালো করে দেখতে বলেছিলাম। আপনি তো বিছানায় শুয়ে বই হাতে করে ঘুমোচ্ছিলেন।”
চুপ করে বাইরে তাকিয়ে থাকলাম। বালি আর পাহাড় চারদিকে। হলদে-লালচে রঙ চারদিকে। কাঁটাগাছ আর ক্যাকটাস ছাড়াও অন্য গাছ কিছু নজরে পড়লেও সেগুলোর নাম জানি না। রাস্তার দু-পাশে বালির মাঝ দিয়ে নানাদিকে গাড়ির চাকার দাগ দেখতে পেয়েছি অনেক জায়গায়। আশেপাশে জনবসতি আছে বোধ হয়। মিস্টার সেনের কাছে ধমক খাওয়ার ভয়ে আমানকে কিছু জিজ্ঞেস করার সাহস পেলাম না।
“স্যার, প্রথমে কোথায় যাব—জেবেল পাহাড়, না মিউজিয়াম?”
আমানের কথাতে ঘুমের চটকা ভাঙতে দেখি রাস্তার দু-পাশে মোটা মোটা দেওয়ালের কয়েকটা ঘরবাড়ি। রাস্তার পাশে দুটো লোহার পাইপের মাঝে টাঙানো বোর্ডের কাছে গাড়ি দাঁড় করিয়েছে আমান। নীল রঙের বোর্ডের ওপর সাদা রঙে আরবির ঠিক নীচে ইংরেজিতে লেখা—‘ওয়েলকাম টু কারিমা ওয়েসিস’।
ওহ্, এটা তাহলে ওয়েসিস! ওই জন্যই অল্প অল্প ঘরবাড়ি। তার মানে এখানে জল পাওয়া যায় প্রচুর। চাষবাসও হয় বোধ হয়। নজরে তো আসেনি কিছু।
“জেবেল পাহাড় চলো আমান। তোমার এখানে একটাই কাজ, যে-ক’দিন থাকব জলের ট্যাংকগুলো ভরার ব্যবস্থা করা।”
“ওকে স্যার।”
“আমরা তাঁবুতে থাকব। তুমি বরং কোনও হোটেলে থেকে যেও আমান। এখানে তো গেস্ট হাউস আছে দেখলাম।”
“না স্যার, আমি বরং গাড়িতে থেকে যাব, কিন্তু আপনাদের ছেড়ে যেতে পারব না। আপনাদের সিকিউরিটির ভার আমার।”
“ঠিক আছে, জেবেল পাহাড়ের চলো। আগে কখনও এখানে এসেছ আমান?”
“স্যার, এখানে আমার ছোটবেলা কেটেছিল। আমার বাবা এখানে ব্যাবসা করতেন। স্যার, এটা ঈশ্বর পাহাড়ের দেশ হলেও গোলাগুলি চলতেই থাকে। টেরোরিস্টরা মরুর মাঝ বা নদী পেরিয়ে এসে লুটপাট করে নিয়ে যায়। এখানে প্রায় সবার ঘরে বন্দুক থাকলেও ওদের সঙ্গে পেরে ওঠা যায় না। পুলিশ বা মিলিটারির সাধ্য নেই ওদের আটকানোর।” রাস্তা ছেড়ে পাথর আর বালির ওপর দিয়ে সাবধানে গাড়ি চালাতে চালাতে বলতে থাকে আমান।
পুরোটাই পাহাড়ি অঞ্চল। খানিকটা ঢালু পথ বেয়ে নীল নদের প্রায় ধারে এসে একটা খেজুরগাছের জঙ্গলকে বাঁয়ে রেখে নদীর পাশাপাশি গাড়ি চালাতে থাকে আমান।
হঠাৎ গাড়ি থামিয়ে নদীর ধারের কাদায় তোলা একটা বড়ো স্টিমার দেখিয়ে আমান বলে, “স্যার, ওই স্টিমারে চেপে কত খেলেছি। শুনেছি একসময় এই স্টিমারটা কারিমা ছুঁয়ে পোর্টস-মাউথ, সাউদাম্পটন, গ্লাসগো যেত। এখনও এখান থেকে স্টিমারে করে মালপত্র যায়। আবার রেলে করেও অনেক মালপত্র আনা-নেওয়া হয়। এখান থেকে তুলো এক্সপোর্ট হয় প্রচুর। পোর্টের কাছে গেলে ন্যারোগেজ রেলের লাইন দেখতে পাবেন। এখান থেকে আতাবারা হয়ে রেড-সির ধারের পোর্ট সুদান পর্যন্ত যাওয়া যায় ট্রেনে। তবে রোজ একটাই ট্রেন যায়।”
খানিক থেমে আরও খানিকটা নদীর প্যারালাল চলে ঢাল বেয়ে গাড়ি উঠতে থাকে সামনের পাহাড়টার দিকে।
“স্যার, এই পাহাড়টার ডানদিক ঘুরলেই দেখা যাবে জেবেল পাহাড়। কাউকে দেখতে পাবেন না অবশ্য। খুব কম টুরিস্ট আসে এখানে। কম কেন, প্রায় আসেই না টেররিস্টদের ভয়ে। তবে পুলিশ আর আর্মি ক্যাম্প আছে ওখানে। জেবেল পাহাড়ের পেছনেই সার দিয়ে আছে নুবিয়ান পিরামিড। এখানকার লোকেরাই বালি খুঁড়ে পিরামিডের তলা থেকে জিনিস বের করে দেয় টেররিস্টদের। ইচ্ছে না থাকলেও ওদের বন্দুকের মুখে কথা চলে না, সামান্য টাকা অবশ্য দেয় ওরা এই কাজের জন্য। টেররিস্টরা অনেক মূর্তি নিয়ে গেছে এখান থেকে। শুনেছি নানা দেশে এই মূর্তি বিক্রি করে টাকা জোগাড় করে ওরা।”
“আচ্ছা আমান, তোমার বাবার সঙ্গে কথা বলাতে পারবে, মানে তোমাদের বাড়ি তো এখানে?” মিস্টার সেন এতক্ষণ আমানের কথা শুনলেও প্রথম প্রশ্ন করলেন।
“না স্যার, বাবা-মা সহ সবাই এখন খারতুমে থাকে। টেররিস্টরা বাবাকে গুলি করেছিল তাদের টাকা না দিতে চাওয়ায়। গুলিটা হাতে লেগেছিল বলে প্রাণে বেঁচে গেছিল বাবা। গুলির শব্দে আশেপাশের লোকজন বেরিয়ে এসে গুলি চালাতে শুরু করায় টেররিস্টরা পালিয়ে গেছিল। তবে বাড়িটা আছে এখনও।”
“চেনাজানা আছে কেউ এখনও?”
“স্যার, যাবেন আমাদের বাড়ি? ভালো কন্ডিশনে আছে। ছোটো জায়গা, প্রায় সবাই সবাইকে চেনে। বাবাও বছরে একবার আসে।”
“আচ্ছা আমান, তুমি জেবেল পাহাড় নিয়ে কিছু শুনেছ কয়েকদিনের মধ্যে?”
“ওই আলোর ব্যাপারটা তো?”
“হ্যাঁ। কী জানো?”
“সেরকম কিছু জানি না। কাগজে ছোটো করে বেরিয়েছিল যে পাহাড়ের মাথায় রাতে নীলচে আলো দেখা গেছে বেশ কয়েকবার। কেউ কেউ নাকি একটা মানুষও দেখেছে পাহাড়ের মাথায়। তবে স্যার, রাতে পাহাড়ের মাথায় ওঠা নিষেধ, পুলিশ বা আর্মি কাউকেই পাহাড়ের ধারে কাছে যেতে দেবে না।”
“এরকম কাউকে আনতে পারবে যে নিজে ঘটনাটা দেখেছে?”
“স্যার, শহরে গিয়ে খোঁজ নিয়ে দেখতে হবে। এমনিতেও স্যার শহরে একবার যেতে হবে মাংস কিনতে।”
“মাংস? আমাদের সঙ্গে তো সাফিসিয়েন্ট প্যাকড ফুড আছে!”
“হ্যাঁ স্যার, বলতে ভুলে গেছিলাম। পাহাড়ের ওঠার এই ট্রিকটা লোকাল লোকেরাই বের করেছে।”
আমি আর থাকতে পারলাম না বলে উঠলাম, “মাংস দিয়ে পুজো করে উঠতে হয় নাকি পাহাড়ে?”
হেসে ওঠে আমান।—“পুজোও বলতে পারেন, স্যার ওই পাহাড়ের প্রচুর ঈগল থাকে। উঠতে গেলেই ঠুকরে দেবে। ঈগলের ভয়ে কেউ একটা পাহাড়ের উঠতে চায় না। অবশ্য পাহাড়ের মাথায় না ওঠাই ভালো। পাহাড়টা তো আমান দেবতার থাকার জায়গা। এমনিতেও এখানকার কেউ পাহাড়ের মাথার আমুন দেবতার মন্দিরে ওঠে না, দেবতার রোষে পড়ার ভয়ে। প্রার্থনা-টার্থনা যা করার পাহাড়চূড়ার সামান্য নীচে থেকেই করে চলে আসে।
“স্যার, শুনেছি ওপরে একটা বিশাল ভাঙা মন্দির আছে, তার বড়ো বড়ো থাম। অনেক মূর্তিও আছে। আর্মি সবসময় গার্ড দেয় বলে হয়তো কিছু চুরি যায়নি এখনও। তবে আর্মির লোকেদেরও পাহাড়ের মাথায় চড়ার হুকুম নেই। গার্ড যা দেবার তা পাহাড়কে ঘিরে। স্যার, এখানকার পিরামিডগুলো নাকি ইজিপ্টের থেকেও পুরোনো। সব পিরামিডের তলাতেই একটা বা তারও বেশি মমি আছে। পৃথিবীর অধিকাংশ লোক নুবিয়ান পিরামিডের নাম শোনেনি। ইতিহাস, মিথ যাই বলুন ইজিপ্ট প্রচার পেয়েছে, সুদান পায়নি। এখানকার বালির তলায় কত ইতিহাস লুকিয়ে আছে জানা নেই। টেররিস্টদের ভয়ে এদিকে কেউ আসতে চায় না। ভালোই হয়েছে, ইতিহাস বেঁচে আছে বালির তলায়।”
আমান যে এত কথা বলতে পারে আগে টের পাইনি। পাথরে ঠোক্কর খেতে খেতে নাচতে নাচতে এগোছিল গাড়িটা।
“মাংসের ব্যাপারটা বললে না আমান?” আবার বলি আমি।
“স্যার, ঈগলের ঝাঁক দেখলে মাংসের টুকরো ছড়িয়ে দিলে ওরা মাংস মুখে উড়ে চলে যায়, ফলে ঈগলের ঠোক্কর খাওয়ার ভয় থাকে না।”
“বাহ্, বেশ ভালো কায়দা আবিষ্কার করেছে তো এখানকার লোকেরা!”
আমার কথা শুনে মুচকি হাসে আমান।
গাড়িটা একবারে খাড়া পাহাড়ের তলায় গিয়ে থামতে খাকি পোশাক পরা মেশিনগান হাতে জনা দশেক সোলজার পাথরের আড়াল থেকে বেরিয়ে আমাদের ঘিরে দাঁড়াল। আমান গাড়ি থেকে নেমে ওদের কিছু বলতে একজন এগিয়ে এসে আমাদের দুজনের সঙ্গে হ্যান্ড-শেক করে আরবিতে কিছু বলল। বুঝতে না পারলেও মনে হল ওয়েলকাম জাতীয় কিছু বলল।
পুরো জায়গাটা একদম ন্যাড়া। একটাও গাছ নেই কোথাও। গাড়ির এসির ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে গরমটা টের পেলাম। এপ্রিল মাস। আমার তো মে-জুনের কলকাতার গরমের মতো লাগল। মরুভূমিতে আছি বলে মনে হল না। অবশ্য কলকাতা থেকেই মিস্টার সেন বলে দিয়েছিলেন, ‘যেখানে যাচ্ছি সেখানে দিনে গরম হলেও রাতে খুব ঠান্ডা, গরম পোশাক নিতে ভুলবেন না।’
সামনে কলকাতার পুরোনো দিনের বাড়ির মতো কতগুলো পাথরের গোল মোটা থাম সোজা উঠে গেছে। তবে থামের মাথায় কিছু নেই। বেশ কিছু থামের বেসের চিহ্ন লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে। বোঝাই যায়, একসময় এখানে সার সার থাম ছিল, হয়তো এর মাথায় ছাদও ছিল। সবই এখন ধ্বংসস্তূপ।
গতকাল বইতেই দেখেছিলাম, জেবেল বারকেল-সহ পুরো অঞ্চলটাই ইউনেসকো গ্লোবাল হেরিটেজ সাইট। আরবি ‘জেবেল বারকেল’ শব্দের মানে পবিত্র পাহাড়। প্রচলিত মত অনুযায়ী, জেবেল বারকেল হল ঈশ্বরের রাজা ও বাতাস দেবতা আমুনের বাসস্থান। গতকাল বইগুলো খানিক না ঘাঁটলে জানতেই পারতাম না আফ্রিকার মরুভূমির ইতিহাস। বহু শতাব্দী ধরে এই জেবেল বারকেল পাহাড় ছিল ইজিপ্টের ফারাও রাজত্বের শেষ সীমা। এই পর্যন্তই আসা যেত নদীপথে। এই পাহাড় টপকালেই শুরু ভয়ংকর নুবিয়ান মরুপ্রদেশের।
আজ থেকে প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছর আগে, খ্রিস্টপূর্ব ১৪৫০ সালে ইজিপ্সিয়ান সম্রাট থুতমোস তিন, তাঁর নুবিয়ান মরু সাম্রাজ্যের অংশ হিসেবে জেবেল বারকেল পাহাড়কে ঘিরে গড়ে তুলেছিলেন ১৩টি মন্দির ও তিনটি রাজপ্রাসাদ। আর পাহাড়ের মাথায় বানিয়েছিলেন আমুন দেবতার মন্দির। এর কিছুকাল পরে এই কারিমা শহর চলে আসে খুশ সাম্রাজ্যের অধীনে। খ্রিস্টের জন্মের আনুমানিক ২৫ বছর আগে রোমানরা সাম্রাজ্য জয়ের লোভে আক্রমণ হানে জেবেল বারকেল-এ। আমুন দেবতার মূর্তি উঠিয়ে নিয়ে যায় মন্দির থেকে। কিন্তু মরুপ্রদেশে সাম্রাজ্য চালানো মোটেই সুখকর নয় বুঝে পুরো শহরটাকে ধ্বংস করে দিয়ে রোমান সৈন্যের দল চলে যায়। পরবর্তীকালে রোমানদের গুঁড়িয়ে দেওয়া শহর খুশ-অধিপতি নাতাকামানি আবার খানিক গড়ে তোলেন।
মরুভূমির প্রান্তে নীল নদের ধারের জেবেল পাহাড় ঘিরে বালির তলায় প্রায় চাপা পড়ে থাকা মন্দির ও শহরের ধ্বংসস্তূপের কথা প্রথম জানা যায় এক ইউরোপিয়ান অভিযাত্রীর লেখা থেকে, ১৮২০ সালে। ১৮৬২ সালে এক ইজিপশিয়ান আধিকারিক এই ধ্বংসস্তূপ থেকে পাঁচখানা শিলালিপি তুলে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন কায়রো মিউজিয়া মে। ১৯১৬ জর্জ রেইসনারের নেতৃত্বে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও বোস্টনের মিউসিয়াম অফ ফাইন আর্টসের একদল বিশেষজ্ঞ প্রথম বিজ্ঞানসম্মত প্রত্নতাত্ত্বিক খনন শুরু করেন জেবেল বারকেল ঘিরে। বালি সরিয়ে পাওয়া যায় একের পর এক পাথুরে রাজপ্রাসাদ এবং মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ ও রাজকীয় সমাধি।
পাহাড়ের তলায় পৌঁছে বই পড়ার মজাটা আবার টের পেলাম। প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছরের প্রাচীন শহরে দাঁড়িয়ে আছি ভেবেই গায়ের লোম খাড়া হয়ে উঠছিল। এতক্ষণে ক্যামেরাটার পুরো সদ্ব্যবহার শুরু করলাম। কয়েকটা ছবি তোলার পর টের পেলাম, ছবি তোলার বিশেষ কিছু আর টিকে নেই। চারপাশে তো খালি বালির ধু ধু মাঠ আর দূরে সবুজ গাছের মাঝ দিয়ে বয়ে চলা নীল নদ। পিরামিড এখনও চোখের আড়ালে।
গাড়িতে হেলান দিয়ে মিস্টার সেন একভাবে তাকিয়ে ছিলেন জেবেল বারকেল পাহাড়ের দিকে। পাহাড়টা বলতে গেলে একদম খাড়া উঠে গেছে। এই পাহাড়ের মাথায় যে কী করে মন্দির গড়া হয়েছিল কে জানে। শুধু মন্দির, ওইরকম নিখুঁত মাপে পাথর কেটে পিরামিড বানানো! না, এলেম ছিল সেকালের মানুষদের।
আমান আর্মির লোকগুলোর সঙ্গে কোথায় যেন চলে গেছিল। মিস্টার সেন আমানের নাম ধরে ডাকতেই একটা বড়ো থামের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে বলল, “স্যার, খানিক দূরে খেজুর বনের ভেতর তাঁবু খাটাতে সাজেস্ট করছে এখানকার সিকিউরিটি। বলছে, ছায়াও পাওয়া যাবে, আর টেররিস্টদের ওপেন টার্গেট হবার সম্ভাবনাও কম থাকবে। স্যার, আমার মনে হয় ওদের কথা শোনাটাই ঠিক হবে।”
“তাতে কোনও অসুবিধা নেই আমান, তুমি খালি একবার তোমার বাড়িতে গিয়ে দেখো কেউ রাতের বেলা পাহাড়ের মাথায় আলো দেখেছে এরকম কাউকে পাও কি না। চাইলে আজ রাতে বাড়িতে থেকে কাল সকালে ফিরে এসো।”
পাহাড় থেকে খানিক দূরে খেজুর বনের মাঝে তাঁবু খাটানো হলে আমাদের জিনিসপত্র আর জলের ট্যাংক দুটো আর্মির লোকেদের নিয়ে ধরাধরি করে নামিয়ে আমান গাড়ি নিয়ে চলে গেল। আমান আর আমুন—কী অদ্ভুত মিল দুই নামে!
আমান চলে যেতেই পা-টা খানিক টলে উঠল। ব্লাড প্রেশার বেড়ে গেছে নাকি?
“ভূমিকম্পটা টের পেলেন?” মিস্টার সেন বললেন।
“ভূমিকম্প! আমি তো ভাবলাম আমার মাথা কোনও কারণে ঘুরে গেছে।”
“তাঁবুর ক্যানোপিটা লক্ষ করুন—কয়েক ফোঁটা জল, মানে বৃষ্টি। এখানে বৃষ্টি প্রায় হয়ই না বলে জানতাম, বিশেষ করে এই সময়। আকাশেও মেঘ নেই এক ফোঁটা। রহস্যটা ঘনিয়ে উঠছে।”
“হ্যাঁ, শত হলেও ভগবানের থান।”
“অত হালকাভাবে নেবেন না। এটা কলকাতা শহর নয় যে বিনা মেঘে দু-এক ফোঁটা বৃষ্টি হলেও কেউ তার কারণ খুঁজতে যাবে। এখানকার লোকেরা খুব ধর্মভীরু। ভূমিকম্প আর সঙ্গে ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি। বিষয়টা কীভাবে নেবে বোঝা মুশকিল। যদি ভেবে নেয় বিদেশিরা এসেছে বলেই এইরকম কল্যাণ বা অকল্যাণ ঘটছে, তাহলে সমস্যা বাড়বে। ওই দেখুন, আর্মির লোকেরা মাটিতে বসে প্রার্থনা শুরু করে দিয়েছে।”
“কল্যাণ-অকল্যাণ মানে?”
“কল্যাণ ভাবলে এখানকার লোকেরা আমাদের সঙ্গে দেখা করতে ভিড় জমাবে আর অকল্যাণ ভাবলে আমাদের তাড়াতে ভিড় জমাবে। সে যাই হোক, আজ রাত কিন্তু অমাবস্যার, অন্ধকার ঘন হলে পাহাড়ের মাথায় সামান্য আলো জ্বললেও দেখা যাবে।”
“কিন্তু রাতে আমরা পাহাড়ের মাথায় উঠব কী করে, দিনের বেলাতেও শুনলাম পাহাড়ের চুড়োয় ওঠা বারণ!”
আমাকে কোনও পাত্তা না দিয়েই বলে চলেন মিস্টার সেন, “ড. আলি ঠিকই বলেছিলেন, মরুকে সবুজ করার চেষ্টা মোটেই ভালো হচ্ছে না। শুকনো অঞ্চলে যদি বৃষ্টি ঝরানো হয় তবে এখানকার ক্ষতিই হবে, ইকো-সিস্টেম ধ্বংস হয়ে যাবে। কল্যাণ হবে না, অকল্যাণই হবে।”
“মরুকে সবুজ!”
“ইয়েস। এখান থেকে শ-খানেক মাইল দূরে নীল নদের ধারে আবু হামেদ নামে একটা ছোটো শহর বা বসতি যাই বলুন আছে। সেখানেই নদী থেকে বেশ খানিকটা দূরে মরুর মাঝে সৌদি আরবের একটি সংস্থা বালির ওপর মাটি ফেলে মরুকে কৃষির উপযোগী করে তোলার পরীক্ষা চালাচ্ছে। এখানকার আদিবাসীরাও একে ভালো চোখে দেখছে না।”
“ভালোই তো হবে, মরু শস্য-শ্যামলা হবে।”
“না, হবে না। এখানকার বাতাস যদি ঠান্ডা হতে শুরু করে তার এফেক্ট পৃথিবীর সব জায়গায় পড়বে। টের পাচ্ছেন না, কলকাতায় গরম ৫০ ডিগ্রির কাছাকাছি চলে যাচ্ছে!”
“কিন্তু সৌদি আরবের কোম্পানি নিজের দেশের মরুভূমি ছেড়ে এখানে কেন চাষের চেষ্টা করবে?”
“উত্তরটা জানা নেই, তবে আরব রাষ্ট্রের অনেক অর্থ। তারা নিজের দেশের ক্ষতি সহজে হতে দেবে না, তাই সুদানের মতো গরিব রাষ্ট্রগুলোকে গিনিপিগ হিসেবে ব্যবহার করছে বলে আমার ধারণা।”
“এই বইগুলোতে এরকম এক্সপেরিমেন্ট নিয়ে তো কিছু লেখা নেই!”
“সবকিছু কি আর বইতে পাওয়া যায়? যেমন কোনও বইতেই লেখা নেই জেবেল বারকেল থেকে পাওয়া এক শিলালিপির বিষয়ে। প্রায় সত্তর বছর আগে পাওয়া ছবিতে লেখা সেই লিপির অনেকটাই ডি-কোড করতে পেরেছেন ড. আহমেদ। খারতুম ইউনিভার্সিটিতে সেই লিপি গোপনে সংরক্ষিত আছে।”
“শিলালিপি?”
“হ্যাঁ, শিলালিপি শোনেননি? প্রাচীনকালে পাথরের ওপর অনেক তথ্যই খোদাই করে রাখা হত।”
“তা সেই লিপিতে কী লেখা আছে?”
“লিপি নয়, শিলালিপি—রক ইন্সক্রিপশন। লিপি হল অক্ষর, বর্ণমালা। শিলালিপিতে কী আছে তার খানিক আভাস পাওয়া গেছে, নির্দিষ্ট করে বলার সময় আসেনি বলে এখনও এটা নিয়ে উচ্চবাচ্য করেননি ড. আহমেদ।”
“এই আলোর রহস্যের সঙ্গে…”
“ঠিক ধরেছেন। আমারও তাই মনে হচ্ছে। ড. আহমেদ মনে করছেন, ডোগোনদের ‘নোমো’ আর ব্যাবিলনীয় সভ্যতার ‘ওয়ানেসদের’ মতোই কিছু একটার কথা বলা আছে শিলালিপিতে।”
“নোমো?”
“হ্যাঁ, এই আফ্রিকায় আছে মালি নামে একটা দেশ। সেখানেই বাস করে ডোগোন নামের এক উপজাতি। কয়েক হাজার বছর আগে ডোগোনদের পুর্বপুরুষরা গুহার ভেতর খোদাই করে গেছিল নোমো নামের এক মৎস্য দেবতার কথা। ওয়ানেসও এক মৎস্য দেবতা। মরুর কিনারায় নদীর ধারে মাছের দেবতার গল্পের কথা পাথরে খোদাই করে রাখতেই পারে সে-কেলের মানুষরা।”
“মাছের দেবতা পাহাড়ের মাথায়?”
“ডোগোন কাহিনি বলে, নোমোরা এসেছিল বহু আলোকবর্ষ দূরের সিরিয়াস নামের গ্রহ থেকে এক মহাকাশযানে চেপে। সেই যান থেকে নেমে নোমোরা জলে মিশে যায়।”
“তাহলে কি পাহাড়ের মাথায় সেই মহাকাশযান, মানে নোমোরা আবার এসেছে?”
“ড. আহমেদ শিলালিপি থেকে যা বুঝেছেন, সেইরকম এক মহাকাশযান জেবেল বারকেল পাহাড়ের মাথায় নেমেছিল, কিন্তু ফেরত যায়নি।”
“জেবেল বারকেল তো আমুন দেবতার থাকার জায়গা ছিল। মাছের দেবতা, মানে দুই দেবতা একই জায়গায় ডেরা বেঁধেছিল?”
“কেন, আমেরিকা ছাড়া আর কি কেউ চাঁদে যান পাঠায়নি? বহু দেশ মহাকাশযান পাঠিয়েছে চাঁদে। হতে পারে সিরিয়াস নক্ষত্রেও আমাদের মতো নানা ভাষী ও নানা প্রদেশের কোনও প্রাণী বাস করে বা করত। তারাও অন্য গ্রহে আমাদের মতোই একের পর এক দূর নিয়ন্ত্রিত যান পাঠিয়েছে। সেই যান এসে হয়তো বিশ্রাম নিচ্ছিল ফিরে যাবার আগে।”
“বলতে চাইছেন, পাহাড়ের মাথায় কোনও মহাকাশযান অপেক্ষা করছে ফিরে যাবার জন্য?”
“সাড়ে তিন হাজার বছর আগে পাহাড়ের মাথায় যখন ইজিপ্সিয়ান গভর্নমেন্ট, থুড়ি, সম্রাট আমুন দেবতার জন্য মন্দির বানিয়েছিল, তখন কি আর মহাকাশযান সেখানে থাকলে ওরা দেখত না? উই নেভার নো। ভুলে যাবেন না, এটা মরুদেশ। সবসময় বালি ওড়ে এখানে। সেই ওড়া বালির তলায় এত বড়ো বড়ো সমাধি চাপা পড়ে থাকতে পারলে সেই যানও যে চাপা পড়ে থাকেনি তা জানবেন কী করে?”
“হতে পারে সম্রাটের লোকেরা জেনেছিল, আর সেই মহাকাশযানকে ঈশ্বরের বাহন ভেবে তার ওপর মন্দির বানিয়ে দিয়েছিল?”
“গুড, ভালো বলেছেন। আমুনকে বাতাসের দেবতা বলে মানা হত। মরুভূমিতে তো সবসময় ঝড় বয়। তাই মহাকাশযানকে আমুন বা আমুনের বাহন বলে ধরে নেওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়।”
“তাহলে ড. আহমেদ নিজে বা দলবল নিয়ে তো পাহাড়ের মাথায় চড়ে মহাকাশ যানের ব্যাপারটা ভেরিফাই করতে পারতেন!”
“সেটা বর্তমানে আর সম্ভব নয়, পাহাড়ের মাথায় কারও চড়া বারণ। কয়েক ফুট নীচেই থাকতে হবে।”
“কিন্তু কেন? ওরা তো দু-নম্বরি কিছু করবে না, জাস্ট খানিক খোঁড়াখুঁড়ি করে দেখবে।”
“ভুলে যাবেন না, এখানকার লোক খুব সেন্সেটিভ। একেই প্রায় সবসময় গৃহযুদ্ধ লেগেই থাকে এখানে। সরকার আর কোনও ইস্যুতেই গুলি-গোলা চলুক, চায় না।”
“তাহলে হেলিকপ্টার থেকে তো দেখে নিতে পারতেন?”
“সবকিছু স্পটে না দাঁড়িয়ে বিশ্লেষণ করা যায় না।”
“তাহলে আমাদের, মানে আপনাকে ডাকল কেন?”
মিস্টার সেন কিছু উত্তর দেবার আগেই আবার থরথর করে কেঁপে উঠল মাটি। লম্বা পিলারগুলো দুলে উঠল সামান্য। আর্মির একটা লোক দৌড়ে এল আমাদের দিকে। মনে হল, সামান্য সময়ের মধ্যে দু-বার মাটি কেঁপে ওঠাতে ওরা ভয় পেয়ে গেছে। পাহাড়ের দিকে মুখ করে উবু হয়ে বসে বার বার মাটিতে মাথা ঠুকছে আর্মির জওয়ানগুলো।
মিস্টার সেন জোরে ‘উই আর ওকে’ বলাতে দলের দিকে ফিরল লোকটা।
“আজকের রাতটা ভাইটাল। খানিক পরেই অন্ধকার নামবে। আমি পাহাড়ের গোড়া থেকে একবার চক্কর মেরে আসছি, সম্ভব হলে আপনি খানিক চা বানিয়ে রাখবেন। আমানের সঙ্গে ছোটো গ্যাস সিলন্ডার আর ওভেন পাঠাতে বলেছিলাম আলিকে, পাঠিয়েছে কি না চেক করতে ভুলে গেছি। না-হলে আমার কালো বড়ো কিটটা থেকে প্যারাফিন কেকগুলো বের করে পাথর সাজিয়ে স্টোভ বানাতে হবে।”
মিস্টার সেন পাহাড়ের দিকে এগিয়ে যেতে ভাবলাম ট্যাংক থেকে খানিক জল নিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে নিই। তারপর মনে হল, আমাদের সঙ্গে দুটো ট্যাংকে মাত্র ২০০ লিটার মানে আট বালতি জল রয়েছে। তাই আর সে-পথে না গিয়ে চা বানাতে বসলাম।
একটা নাইলনের ব্যাগে করে গ্যাস আর স্টোভ নিয়ে এসেছিল আমান। গ্যাস সিলিন্ডারের মাথার প্যাঁচে ওভেনটা লাগিয়ে কালো ব্যাগ থেকে মেস্টিন বের করে চা বসিয়ে দিলাম। ব্যাগ-ভরতি নুডুলস আর স্যুপ। এই খেয়ে ক’দিন থাকতে হবে কে জানে।
আবারও কেঁপে উঠল মাটি। এবার আগের থেকেও বেশি জোরে। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে পাথর গড়িয়ে পড়ছে সমানে। মনে হচ্ছে কেউ যেন জেবেল বারকেলকে ধরে ঝাঁকুনি দিচ্ছে সমানে।
দুম দুম করে ফায়ারিংয়ের শব্দ আর চিৎকার ভেসে আসছে শহরে দিক থেকে। শয়ে শয়ে ঈগল ঝাঁক বেঁধে উড়তে শুরু করেছে আকাশজুড়ে। এর আগে টিয়া পাখি আর পায়রার দল আকাশে উড়তে দেখেছি, ঈগলের ঝাঁক দেখিনি কখনও। ঈগলদের তীক্ষ্ণ চিৎকারে বোবা হয়ে থাকা মরু-পাহাড় জেগে উঠেছে। একটা শেয়াল পাথরের ফাটল থেকে বেরিয়ে আমার সামনে দিয়ে ছুটে গেল নদীর দিকে।
আবারও কেঁপে উঠল মাটি। আর্মির লোকগুলো ছোটাছুটি শুরু করে দিয়েছে। পাহাড়ের ওপর থেকে একটা বড়ো পাথরের চাঁই গড়িয়ে নামছে ধাক্কা খেতে খেতে আরও পাথরের টুকরো খসিয়ে। কানটা এর আগের দু-বারের মাটি কেঁপে ওঠার সময়ের মতোই কনকন করে উঠল। কেউ সপাটে কানের ওপর থাপ্পড় মারলে যেরকম হয়, ঠিক সেরকম। স্কুলে অনেকবার স্যারেদের থাপ্পড় খেয়ে এরকম হয়েছিল। পুরো তালা লেগে গেছে যেন।
মিস্টার সেন ছুটতে ছুটতে এসেই একটা ব্যাগের ভেতর থেকে বের করে আনলেন লম্বা পারফিউমের মতো কৌটোটা। একটা বোতামে চাপ দিতেই বেরিয়ে এল লাল ধোঁয়া। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে লাল ধোঁয়া জমাট বেঁধে বড়ো শক্ত ধাতব চাদরের মতো হয়ে উঠতেই লম্বা কৌটোটায় আবার চাপ দিলেন। কৌটোর গা থেকে দুটো কব্জা বেরিয়ে আসতে ওই ভাসমান ধাতব চাদরের কাছে ধরতেই তা চুম্বকের মতো লেগে গেল চাদরটার গায়ে। চুম্বকের মতো লেগে থাকা কৌটাটায় আবার চাপ দিতে তা থেকে তিনটে ছোটো ছোটো পাখার ব্লেড বেরিয়ে এসে প্রবল গতিতে ঘোরা শুরু করতেই মিস্টার সেন বললেন, “তাড়াতাড়ি উঠে বসুন!”
দুজনে উঠে বসতেই মিস্টার সেন কৌটোটা থেকে বেরিয়ে আসা একটা সরু ডাণ্ডায় চাপ দিতে হাওয়ায় ভেসে আমরা এগোতে লাগলাম পাহাড়ের দিকে।
“এই রে, গ্যাস স্টোভে চা বসিয়েছিলাম, বন্ধ করা হয়নি।”
“ওতে কিছু হবে না। গ্যাস শেষ হয়ে গেলে আপনা থেকেই বন্ধ হয়ে যাবে। খুব বেশি হলে জল শুকিয়ে জলের পাত্রটা ফেটে যাবে।”
একটা গাড়ির হেড-লাইট নদীর দিক থেকে দ্রুত এগিয়ে আসছে জেবেল পাহাড়ের দিকে। নিশ্চয়ই আমান ফিরে আসছে।
অন্ধকার হয়ে এসেছে। পাহাড়ের গা বেয়ে সমানে পাথর পড়ে চলছে ওপর থেকে।
“আমি যা বলব ঠিক তাই করবেন। অযথা প্যানিক করবেন না। যা ভাবছি তাই যদি সত্যি হয় তবে…”
“তবে কী?”
“জানি না, হয়তো ঈশ্বরের দেখা পাবেন।”
কয়েক মিনিটের মধ্যে চলে এসেছিলাম পাহাড়ের মাথায়। যদি আর্মির লোকেরা আমাদের দেখত, কী হত জানি না। হয়তো গুলি চালিয়ে দিত।
পাহাড়ের খাড়া কোনায় যেদিক থেকে পাথর গড়িয়ে পড়ছিল, সেদিকের মাটির তলা থেকে নীলচে আলো বেরিয়ে আসছিল। একটা মানুষের মাথার গিরগিটির মতো প্রাণী লেজে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল আলোর পাশে। আমি নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছি না। গিরগিটির দেহে মানুষের মতো মাথা! যদিও ইজিপ্সিয়ান অনেক দেবতার দেহ মানুষের হলেও মুখ অন্য কোনও প্রাণীর।
আলোর কাছাকাছি উড়ুক্কু চাদরটা এনে মিস্টার সেন বললেন, “নেমে পড়ুন।”
দুজন নামতেই মিস্টার সেন যানের পেছনে লাগানো বড়ো কৌটোটার ওপর একটা চাপ দিলেন। প্রচণ্ড গতিতে ঘুরতে থাকা ছোটো পাখাটা থেমে গিয়ে গুটিয়ে কৌটোর পেটের ভেতর সেঁধিয়ে গেল। দুটো কব্জা যেটা এতক্ষণ চাদরের যানের পেছনে কৌটোটাকে ধরে রেখেছিল, সেটা আলগা হয়ে চাদরটাকে ছেড়ে কৌটোর গায়ের কতগুলো খাঁজে ঢুকে গেল। মিস্টার সেন আকাশে ভাসতে থাকা চাদরটা তাক করে কৌটোর গায়ের একটা বোতামে চাপ দিলেন। ধোঁয়ার মতো খানিক কী বেরিয়ে এসে ছড়িয়ে পড়ল ভাসমান শক্ত চাদরটার ওপর। মুহূর্তের মধ্যে চাদরটা হাওয়ায় মিলিয়ে গেল।
পায়ের তলায় মাটি কেঁপেই চলছিল। যেন কোনও বিস্ফোরণ ঘটছে মাটির তলায়। এরকম অনুভূতি আমার আগে হয়েছিল ধানবাদ এলাকায় এক কয়লাখনি অঞ্চলে ঘুরতে গিয়ে।
মাটিতে কাঁপুনিটা বেড়েই চলছিল। কানে কিছুই প্রায় শুনতে পাচ্ছিলাম না। কানে জল ঢুকে বন্ধ হয়ে গেলে যেরকম হালকা শোনা যায়, সেরকম চাপ-ধরা আওয়াজে শুনতে পেলাম মিস্টার সেনের গলা—“এগোবেন না। মাটির তলায় চাপা পড়া মহাকাশযান উঠে আসার চেষ্টা করছে।”
একটা বিশাল ডিমের আকৃতির কিছু উঠে আসার চেষ্টা করছে বালি-পাথরের তলা থেকে। চকচকে ধাতুর বস্তুটা থেকে নীলচে আলো বেরিয়ে চারপাশটা হালকা আলোয় ভরিয়ে দিয়েছে। খানিক উঠেই আবার তলিয়ে যাচ্ছিল বস্তুটা দু-পাশ থেকে গর্তের মধ্যে ঝরে পড়া আলগা বালির নীচে। গিরিগিটির মতো প্রাণীটা টলতে টলতে বার বার গিয়ে গর্তটার সামনে উঁকি দিচ্ছে। লম্বা হাত দিয়ে বালি সরিয়ে বালি থেকে বের করার চেষ্টা করছে ধাতব বস্তুটাকে। কানে তালা ধরানো শব্দটার যন্ত্রণায় মাথা ফেটে যাবার উপক্রম।
মাটির তলা থেকে আবার মাথা বের করেছে ডিমের মতো জিনিসটা। একটা বড়ো পাথর বালির মধ্যে গেঁথে আছে, সেটাতে আটকে আবার বস্তুটা ঢুকে যাচ্ছে বালির নীচে। যেন চেষ্টা করছে গুঁতো দিয়ে পাথরটা সরিয়ে দিতে। যতবার পাথরটায় আটকাচ্ছে, ততবার মাটির কম্পনের মাত্রা বেড়ে যাচ্ছে। পাহাড়ের গা বেয়ে পাথর গড়ানোর আওয়াজ পাওয়া পাচ্ছি কান প্রায় বন্ধ হয়ে থাকলেও। মনে হচ্ছে কম্পন ঘটিয়ে পাথর সারানোর চেষ্টা করছে প্রাণী বা ডিমের মতো বস্তুটা।
মিস্টার সেন আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে চললেন গর্তটার দিকে। হাত দিয়ে বালি সরিয়ে বড়ো চৌকো পাথরের একটা কোনা ধরতেই বুঝে গেলাম উনি কী করতে চাইছেন। যে করে হোক পাথরটাকে সরাতে হবে বস্তুটার বেরিয়ে আসার পথ থেকে।
এতক্ষণ লক্ষ করিনি। গর্তটা একটা থামওয়ালা মন্দির ধ্বংসস্তূপের মাঝে। যদিও মন্দিরের ছাদ বলে কিছু অবশিষ্ট নেই। তাহলে কি মিস্টার সেনের অনুমানই ঠিক? প্রাচীনকালে কোনও মহাকাশযান নেমেছিল এই পাহাড়ের মাথায়? আর সেই মহাকাশযানের ওপরে তৈরি হয়েছিল এই মন্দির? এই মহাকাশযান কি বালির তলায় চাপা পড়ে গেছিল, না বালির ওপর জেগে থাকতেই তার ওপর তৈরি হয়েছিল এই মন্দির? গিরগিটি মানুষটা কি ডোগোনদের সেই মৎস্য দেবতা—যে বা যারা এসেছিল সেই সিরিয়াস নক্ষত্র থেকে?
ভাবার সময় নেই, দুজনে মিলে বালি সরিয়ে প্রাণপণে চেষ্টা করছিলাম পাথরটা সরাতে। বালি সরালে আবার দু-পাশে গর্ত থেকে তোলা জমা বালি তিরতির করে ঝরে পড়ছিল গর্তের ভেতর। মিস্টার সেন পাথর সরানোর চেষ্টা না করে গর্তের পাশে ভুর করা বালি দু-হাতে ছুড়ে ফেলতে লাগলেন দূরে। দুজনে মিলে গর্তের পাশ থেকে বালি সরাতে বন্ধ হয়ে গেছিল বালি ঝরে গর্ত বুজে যাওয়া। পাথরের ওপরটা পরিষ্কার হলে খানিক টানাটানি করাতে পাথরটা খানিক নাড়াতে পারলাম আমরা, কিন্তু ভারী পাথরটা সরাতে পারছিলাম না ধাতুর ডিমের মতো বস্তুটার পাশ থেকে। নীল আলোটা ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। বস্তুটা আচমকাই বালির ভেতর থেকে গুঁতোতে থাকল পাথরটাকে। ঠিক যেমন রিমোট কন্ট্রোল খেলনা গাড়ি কোথাও আটকে গেলে গোঁ গোঁ করে উলটেপালটে বেরোবার চেষ্টা করে। দু-বার গুঁতো খেতে ফেটে টুকরো টুকরো হয়ে গেল পাথরটা। আমরা ঝাঁপিয়ে পড়ে পাথরগুলো সরাতেই ডিমের মতো বস্তুটা গর্তের ভেতর থেকে ঠেলে উঠতে একটা ছোটো অংশ খুলে গেল ওটার। বেলুনের হাওয়া বের করে দিলে যেমন হয়, তেমনি চুপসে গিয়ে মানুষ-গিরগিটির মতো প্রাণীটা ঢুকে গেল যন্ত্রটার ভেতর। মুহূর্তের মধ্যে সেটা আলোর বিন্দু হয়ে আকাশে মিলিয়ে যেতে মিস্টার সেন বলে উঠলেন, “আবার এসো মহাকাশের পর্যটক।”