এই লেখকের আগের উপন্যাস- বিষচক্র

১
চং এবং তাং
তোমাদের জন্য একটা জম্পেশ গপ্পো লিখব বলে সবে আমার ল্যাপটপটা খুলে বসেছি, অমনি পিছন থেকে একটা ফ্যাঁশ করে আওয়াজ। আমি বাপু বড্ড ভিতু মানুষ, রাতে অন্ধকার ঘরে একলা ঘুমুতে পারি না; আমি ভোরবেলা ‘ফ্যাঁশ’ শুনে পিছনে তাকাতে বেশ ভয় পেলাম। অই দ্যাখো, পড়তে পড়তে খিক খিক করে হাসছ যে! হেহ্। তোমাদের সাহসের দৌড় আমার বেশ জানা আছে। মাঝরাত অবধি ইস্কুলের প্রোজেক্ট করতে করতে বাইরের জানালার অন্ধকার কাচের সামনে পর্দা নড়ে উঠলে তোমরা কীরকম ভয় পাও, আমি বেশ জানি। ঘরের মধ্যে ক্যাঁচ করে, খুট করে, খসখস করে শব্দ হলে তোমরা ভয় পাও না বলতে চাও? ইস! ভয়ে ভয়ে মাকে ডাকো। এদিক-ওদিক জুলজুল করে তাকাও। কিন্তু কিছুতেই নিজের পড়ার টেবিল ছেড়ে এক পাও নড়ো না। চেয়ারে পা তুলে বসে থাকো। খাটে সিঁটিয়ে শুয়ে থাকো। হে হে, আমি স-অ-ব জানি।
কী করে জানলাম? আরে বাবা, গোল্লুর ঘরে দেওয়ালজোড়া কাঠের আলমারির পাল্লাটা ভরদুপুরে একটু ক্যাঁচকোঁচ শব্দ করেছে কি করেনি, গোল্লু অমনি হাঁকডাক শুরু করে। দুপুরেই এ-ই। রাতে এসব ঘটলে কী কী যে হতে থাকে, সে আমি জানি। গোল্লু তো তোমাদেরই মতো কচিকাঁচা মানুষ। ওকে দেখে বেশ বুঝি তোমরা কীরকম ভিতু আর ভয় পেলে তোমরা কে কী করো। কিন্তু এখন মাঝরাত নয়। সকাল সাড়ে পাঁচটা বাজে। অল্প একটু আলো ফুটেছে। আর আমি রাত জেগে তোমাদের মতো ইস্কুলের প্রোজেক্ট করছি না। ওসব ঝামেলা আমার কবে মিটে গেছে।
আমি এখন রাতদিন পড়ি। তোমাদের চেয়ে ঢের বেশি পড়াশুনো করি। হুঁ হুঁ, খুব মজা করে রোজ পড়তে বসি। কেন জানো? কারণ, আমায় পরীক্ষায় নম্বর পেতে হয় না। আমাকে যদি তোমরা পরীক্ষা নিয়ে জিজ্ঞাসা করো, তাহলে আমি জোর দিয়ে বলব, পরীক্ষা খুব ভালো জিনিস। পরীক্ষা দিলে বোঝা যায়, আমি কী জানি, কতটা জানি। কতটা মনে রাখতে পারি, সেটাও দিব্যি বোঝা যায়। কিন্তু নম্বর ব্যাপারটা খুব খারাপ। সব সময় দেখবে, পরীক্ষা ব্যাপারটা খুব ভালোই হয়। কিন্তু নম্বরটা কখনোই ভালো হয় না। অন্তত নিজের ভালো হয় না। অন্য সকলে গাদা গাদা ভালো নম্বর পেয়ে যায়। আর নিজের বেলা—সব ফাঁকি। এই দুঃখে আমার গোটা ছেলেবেলা কেটে গেছে। কিছুতেই আমি তোমাদের মতো কোনও ভালো নম্বর পাইনি। পড়েছি, মুখস্থ করেছি, পরীক্ষা দিয়েছি, পরীক্ষা দিয়ে বেরিয়ে বলেছি, ‘উফ, ফাটিয়ে দিয়েছি’। কিন্তু যে-ই রেজাল্ট বেরোয়, নম্বরের ঘরে শুধু হতাশা। তখন মায়ের বকুনি, বাবার ধমক, বন্ধুদের ফিসফাস, নিজের লজ্জা।
এখন ইস্কুল-কলেজ সব মিটে গেছে আমার। বাব্বা, খুব বাঁচা বেঁচেছি। এখন আমি রাতদিন পড়ি আর বসে বসে গপ্পো লিখি।
এই দাঁড়াও, এই অবধি পড়ে দুম করে উঠে যাচ্ছ যে? ফ্যাঁশ করে আওয়াজটা কেন হল জানতে চাইলে না? এই তোমাদের বাপু বড্ড দোষ। অল্পেই ধৈর্য হারিয়ে ফেলো। আরে, আওয়াজটা যে করেছে, সে তো আমার নাকের সামনে এসে বসেছে। আর সে এসে বসে মুচকি মুচকি হাসছে বলেই তো আমি এতগুলো লাইন লিখে ফেললুম। ভয় পেলে কি লিখতে পারতুম নাকি!
দাঁড়াও, তোমাদের সঙ্গে ওর আলাপ করিয়ে দিই।
এই হল চং। চং একটি বেড়ালের নাম। অ্যাই, যে-সে বেড়াল নয়। দেখে তাকে একটি বড়োসড়ো বাঘের ছোটোখাটো চেহারার ফুলমাসি বা ন’মাসির মতো মনে হলেও সে একটি অত্যন্ত শিক্ষিত, ভদ্র, মার্জিত মহিলা। তার দাপটে পাড়ার পাজি হুলোরা তটস্থ থাকে।
“হ্যালো চং, এসো এসো। ছোট্ট বন্ধুদের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিচ্ছি তোমার।”
“হুম, সে তো দেখতেই পাচ্ছি। বেশ করেছ। পড়তে পড়তে ওরা তো আমাকে দেখতে পাবে না, ওদের ভালো করে ভাবতে বলো বরং। শোনো মাসি, ফট করে তুমি আবার আমার একটা ছবি ছেপে দিও না। ওইসব ছবিছাবা দিয়ে দিলে ওরা কল্পনা করতে পারবে না আমার ল্যাজ কতটা মোটা, একটা কানে কালচে ছোপ, চোখের মণি গাঢ় নীলচে হলুদ। ওদের গুছিয়ে ভাবতে দাও।”
“বেশ। এখানে তোমার ছবি দিচ্ছি না তাহলে। ওরা বরং বসে বসে ভাবুক তোমার একটা কানে কালচে ছোপ, চোখের মণি… এ বাবা, তোমার মতো আমিও অনেকটা বলে দিলাম। যাহ্, কী হবে?”
“কী আবার হবে! শোনো, ওরা তো এখানে সিনেমা দেখতে বসেনি, বা মোবাইল নিয়ে তোমাকে কেউ ভিডিও কল করছে না, কাজেই ওরা নিজেরা বসে বসে বাকিটা ভেবে ফেলুক।”
“এই শোন চং, তুই এসে ভালো করেছিস। আমার চশমাটা খুঁজে দে দিকি, অনেকক্ষণ ধরে হাতড়ে বেড়াচ্ছি। জানিস তো খালি চোখে ঝাপসা দেখি। ক্লাস টু থেকে একটা চশমার বোঝা নাকের ওপর নিয়ে…”আমার কথা শেষ হওয়ার আগে চং বলে, “মাসি, চশমাটা তোমার নাকের ওপরেই আছে, তবে একটু ঝাপসা। ওটার ওপর দিয়েই মুখে ক্রিম-টিম লাগিয়ে ফেলেছিলে বোধহয়।”
“হিঁঈক, “
চং-এর কথায় নিজের নাকের ওপর হাত দিয়ে সত্যিই চশমা টের পেয়ে মন ভালো হয়ে গেল। ঠিকই, একগাদা ক্রিম বা তেল কিছু একটা লেগে রয়েছে। ছ্যা ছ্যা। আসলে আমার চশমা নিয়ে খুব বিপত্তি। প্রায়ই খুঁজে পাই না, তখন চং এসে বলে, ‘মাসি তুমি চশমায় ট্র্যাকার লাগাও’। বৃষ্টিতে ভিজলে চশমা ঝাপসা হয়ে আরেক ঝামেলা, তখন চং বলতে থাকে, ‘চশমাতে গাড়ির কাচের মতো একটা ওয়াইপার লাগানো যায় না?’
তাহলেই ভাবো, চং-এর কত বুদ্ধি!
চং বলল, “মাসি, তুমি আমাকে একটা কথা বলো, তুমি ল্যাপটপ খুলে এই সাতসকালে কী খুটুরখাটুর করছ শুনি? গোল্লুর ইস্কুল আছে না? মেসোর আপিস আছে না? দিদা ঘুম থেকে উঠেছে? চা-টা সব দিয়েছ দিদাকে? ঋতুমাসি রান্না করতে আসেনি এখনও?”
চং একের পর এক প্রশ্ন করছে।
এই হোল চং-এর দোষ। প্রশ্নগুলো ঘাড়ের ওপর বসিয়ে দেয়। দাঁড়ি কমা ফুলস্টপ ফেলার জন্য একটু সময় দেয় না।
“আরে দাঁড়া বাপু। ছোটোদের জন্য একটা গপ্পো লিখতে হবে। সম্পাদক জেঠুমণি তাড়া দিচ্ছেন। এখনও বাড়ির কেউ ঘুম থেকে ওঠেনি। তাই এই ফাঁকে দু-চারলাইন লিখে রাখছিলুম। যতটা যা মনে হয় আর-কি।”
“অ, তাই বলো। কিন্তু মাসি, তুমি ওদের ছোটো বলছ, খুব কানে লাগছে আমার।”
আমি চমকে উঠি, “অ্যাঁ! কী বলব তবে? বড়ো?”
চং ঘাড় নাড়ে, “আহা-হা। তা’ নয়। ছেলেমানুষ বলবে। অল্পবয়সী বলবে। শিশু কিশোর এইসব বলবে। এখন দুম দুম করে যা খুশি তাই বলা যায় না, জানো না? এটা খুব অন্যায়।”
“তা বটে, ঠিক ঠিক। গোল্লু আমায় বুঝিয়েছে। আমি তোমার কথাও মনে রাখব।”
আমি চংকে খুব শ্রদ্ধা করি। ওর সমস্ত বিষয়ে একটা সুচিন্তিত স্পষ্ট মতামত থাকে। বেশ যুক্তিপূর্ণ কথাবার্তা। আমি দেখেছি ওর কথা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ঠিকই তো। বয়সে ছোটোদের ‘ছোটো’ না বলে ‘ছেলেমানুষ’ বলার ভাবনাটা দিব্যি লাগল আমার।
চং সোফার নীচে পা ছড়িয়ে বসে বলে, “তবে মাসি, তুমি যাদের জন্য গপ্পো লিখতে বসেছ, তারা কিন্তু আজকাল খুব চটপট পাতা উলটে বই বন্ধ করে দেয়, অনেকে গল্পের বইও পড়ে না। আবার যারা পড়ে, তারা আবার বাংলা বই-টই এক্কেবারে পড়ে না। কেউ কেউ একটু-আধটু কমিকস পড়ে। গোল্লু বলছিল, তাদের সব ফার্স্ট ল্যাঙ্গুয়েজ ইংরেজি। তাপ্পর তারা হিন্দি পড়ে। শেষে সময় থাকলে একখান বিদেশি ভাষা শেখে। ওসব বাংলা…। নাঃ! ভাবলে খুব স্যাড লাগে।”
চং-এর ‘স্যাড লাগে’ শুনে আমার আরও মন খারাপ হয়ে গেল। সত্যিই তো, চারপাশে আজকাল শুনি তোমরা বই-টই পড়ো না। এই যে সাতসকালে ঘুম থেকে উঠে তোমাদের জন্য একটা গপ্পো লিখতে বসেছি, সে যদি তোমরাই না পড়ো, তাহলে মনটা হু হু করে না? আর বাংলা পড়ো না শুনলে খুবই কষ্ট হয়। আরে নিজের মাতৃভাষা পড়বে না, জানবে না, এ কেমন কথা? বিদেশের মানুষজন কিন্তু কক্ষনও অমন করেন না। বিশ্বাস না হয় নিজেরা গিয়ে দেখেশুনে খবর নিয়ে এসো।
“মাসি, কী আর বলব। তোমার নিজের মেয়েটাকেই দেখো না, দিনরাত শুধু মোবাইল ঘাঁটছে।”
চং-এর কথায় আমি এবার নিজে আরও ‘স্যাড’ হয়ে যাই। কত ওকে বোঝাই, ওরে গোল্লু এত মোবাইলের দিকে তাকিয়ে থাকিস না, ওতে চোখের ক্ষতি। মাথার মধ্যেও সব জট পাকিয়ে যাবে। সব পড়া ভুলে যাবি। ওই আলো, ওই কুচি কুচি ছবি, হাবিজাবি লেখা, রাতদিন বন্ধুদের সঙ্গে চ্যাট। ইস শুনলেই কেমন চ্যাট চ্যাট করছে মাথার ভেতরটা।
চং-এর কথায় আরও মনে পড়ে গেল। গোল্লুর কথা তোমাদের বলাই হয়নি। তিস্তুকেও চেনো না তোমরা। চংকেও তেমন গুছিয়ে আলাপ করাইনি।
তবে আগে চং-এর কথা শোনো…”অ্যাই অ্যাই, একদম এখন মোবাইলের দিকে তাকাবি না বলে দিলুম, ” চং প্রচণ্ড ধমকে উঠল। কাকে বলল কে জানে! তোমাদের মধ্যেই কাউকে বোধহয়। ওর চেঁচানির চোটে আমি এত চমকে উঠলাম, আরেকটু হলে আমার হাত কেঁপে অর্ধেক লেখা ল্যাপটপের মধ্যে থেকে ধাঁ করে মুছে যেত।
চং-এর ভ্রুক্ষেপ নেই। সে চেঁচিয়ে এসে দিব্যি সোফায় উঠে বসে ল্যাজ দোলাচ্ছে।
চং এই পাড়াতেই থাকে। নির্দিষ্ট ঠিকানা নেই। সাতসকালে আমাদের বাড়িতে এসে গুছিয়ে বসে দুধ আর কর্ণফ্লেক্স খায়, পাশের বাড়ির জন্টির মা এক-আধদিন পাঁউরুটি দেন, বেলার দিকে উল্টোদিকের বাড়ির বাবাই মাছের তেল, কাঁটা, আঁশ খেতে ডাকে। দুপুরে লাঞ্চ টাইমে তিস্তু আর গোল্লু মাছের ঝোল-ভাত মেখে জোর করে তাকে ঠুসে খাওয়ায়। ঠুসে খাওয়ানোর কারণ হল, ওই সময় চং একা আসে না, তার দুটি হুলো বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে আসে। তাদের তিস্তু আর গোল্লুর একদম পছন্দ নয়। ফলে ওরা দুই বন্ধুকে সরিয়ে আগে চংকে পেট ভরে খাইয়ে নেয়।
চং যে এপাড়ার একটি অতি বিচ্ছু বেড়াল, সেটা নিশ্চয়ই আর বলে দিতে হবে না। কিন্তু চংকে বিচ্ছু, বদমাইশ তো দূরস্থান, সামান্য দুষ্টু বললেও তিস্তু আর গোল্লু হাঁ হাঁ করে তেড়ে এসে তার চুল ছিঁড়ে মাথায় টাক বানিয়ে তাতে পারমানেন্ট মার্কার পেন দিয়ে হাবিজাবি লিখে ছেড়ে দেবে। উফ! চংএর নামে গোল্লু বা তিস্তুকে একবার কেউ কিছু বলে দেখুক। সাবধান, তোমরা ভুলেও যেন চং-কে কিছু বোলো না।
তবে আমি নিজে বিশ্বাস করি, চং মোটেই দুষ্টু নয়, সে অত্যন্ত ভদ্র এবং বিচক্ষণ।
এবার গোল্লু আর তিস্তুর কথা বলি।
আমি তিস্তুর মাসি এবং গোল্লুর মা। তিস্তু আমাকে মাসি না বলে ‘তাং’ বলে। কিছুদিন আগে অবধি ‘তাং-ব্যাং’ বলত, এখন সবার সামনে শুধু ‘তাং’ বলে ডাকে। সেসব বিস্তারিত কারণ যদি বলি, তোমাদের হাসিই পাবে। বলি?
আমি যখন জন্মেছি তখন আমার ন্যাড়ামুণ্ডি লিকপিকে চেহারা দেখে আমার দিদিভাই প্রথমে নাম রাখল ‘আন্তানিয়া’। আসলে সে তখন ‘ভূতপত্রীর দেশ’ পড়ছিল। পড়ার মধ্যিখানে বাড়িতে ‘ওরে এবার তোর একটা বোন আসছে’ বলায় সে নেচে উঠল। আমার ক্ষুদ্র চেহারা দেখে সে গান গেয়েছিল খোনা সুরে—‘তাঙ্কুকে দিব অন্তা আ-নি-রে-এ সজনী’… ওই গানটি আসলে অবন ঠাকুর লিখে গেছিলেন ‘কিচকিন্দের গল্প’তে। সেসব নিজস্ব সুর বসিয়ে গেয়ে উঠেছিল আর-কি। ওর বক্তব্য, ‘আন্তানিয়া’ শব্দটির থেকে ‘তাংকু’ শব্দের প্রতি ক্ষুদে বোনের প্রীতি এবং আগ্রহ ফুটে ওঠায় সে বোনের ডাকনাম রাখে তাংকু। আর তার কন্যা তিস্তু তেইশ বছরের বড়ো মাসিকে প্রকাশ্যে তাং এবং সকলের আড়ালে তাং-ব্যাং বলে সম্বোধন করে। অতএব, আমি তিস্তুর তাং। ওর বন্ধুদেরও। তোমরাও তা-ই ডাকতে পারো। আমার বিন্দুমাত্র অসুবিধে নেই।
গোল্লু ‘মা’ ডাকলেও প্রায়ই আজকাল ‘ভাই’ বলছে। দু-একবার ‘ব্রো’ বলেছিল বলে চোখ পাকিয়ে তাকিয়েছিলাম। যত্তসব বিজাতীয় ব্যাপার। তার চেয়ে ‘ভাই’ ব্যাপারটা ভালো। বেশ একটা সৌভ্রাতৃত্বসুলভ ইয়ে তৈরি হয়। তোমাদের চুপি চুপি বলে রাখি, ‘মা’ মানেই আমার কাছে ‘মার’। আমার মা, যিনি ছিলেন অঙ্কের দিদিমণি, তিনি ছেলেবেলা আমি অঙ্ক না পারলে লম্বা স্কেল কিংবা তালপাতার পাখার বাঁট দিয়ে মারতেন কি-না। মা বললেলেই আমি পরের ‘র’ অক্ষরটা শুনতে পাই। মায়ের চেয়ে ‘ভাই’ ঢের ভালো।
তিস্তু কলেজপত্তর শেষ করে আরও পড়াশুনো করবে, গবেষণা করবে। আর গোল্লু আইসিএসসি শেষ করে পরের ধাপে উঠবে। এদের প্রাণের বন্ধু চং। আর চং-এর যাবতীয় বিচ্ছুপনা ওদের নিয়ে।
হঠাৎ আমার মনে হোল, আমার যেমন সক্কালবেলা রাজ্যের কাজ থাকে, তেমন চং-এর এই বাড়িতে ঢোকার একটা নির্দিষ্ট সময় আছে। এখন এই সাতসকালে সে ঢুকেছে কেন? প্রশ্নটা মাথার মধ্যে না রেখে ওকে বলে ফেলি।
“আচ্ছা চং, তুমি এই ভোরবেলা কোত্থেকে হাজির হলে শুনি? এত সকালে তোমার ঘুম ভেঙে গেল?”
“আর বোলো না। খুব ঝামেলায় পড়েছি মাসি। প্রথমে এসেছিলাম তিস্তুর কাছে। দেখলাম সে চলে গেছে সাঁতার কাটতে। আমারই ভুল। মনে ছিল না। ওদিকে গোল্লুটা তো কুঁড়ের হদ্দ। গিয়ে দেখি, ফোঁস ফোঁস করে নাক ডেকে ঘুমোচ্ছে। নির্ঘাত অনেক রাত অবধি জেগে বন্ধুদের সঙ্গে হোয়্যাটস অ্যাপে চ্যাটিয়েছে। জানলা বন্ধ বলে ওকে আর চেঁচিয়ে ডাকতে পারলাম না। ওদিকে দেখোগে যাও কতগুলো গাছ ওরা পট পট করে কেটে দিল। শেষ রাত্তিরে নালার মধ্যে একরাশ রাবিশ ফেলল ধড়াস করে। বর্ষায় ওই নালাটা উপচে গেলে সারা পাড়া যে জলে ভাসবে। এসব কাকে বলি বলো তো? বুড়োদের এসব বললে তাদের কানে জল ঢোকে না। এদিকে পাড়ায় একটা বাচ্চাও ঘুম থেকে ওঠেনি। আর উঠলেও বা কী হবে? হাঁই হাঁই করে ছুটে সব ইস্কুলবাসে গিয়ে উঠবে। বিকেলে খুঁজতে গিয়ে দেখব, একটাও বাড়ি নেই। সব কোচিং ক্লাসে। নয়ত নাচের ক্লাসে, আঁকার ক্লাসে, গানের ক্লাসে, ক্যারাটের ক্লাসে, টেবিল টেনিসের ক্লাসে… ক্লাসের শেষ নেই। ওদের কেমন লাগে জানি না, আমার আর ভাল্লাগে না বাপু।”
“সত্যি রে চং, আমাদের কেমন সুন্দর সব বিকেলবেলা ছিল। ইস্কুল থেকে ফিরে দৌড়ে খেলার মাঠ, পাড়ার খেলুড়ে বন্ধু। বিকেল মানে এক-একদিন এক-একটা খেলা। আমি তো এখন ভুলেই গেছি দাঁড়িয়াবান্ধা খেলা কেমন ছিল, বা বুড়িবাসন্তী খেলতাম কেমন করে। নামগুলো মনে আছে শুধু। আর মাঠে চৌখুপি দাগ কেটে এক্কাদোক্কা খেলায় আমি চিরকালের চ্যাম্পিয়ন। অমন দম ধরে রেখে চু-কিতকিত বলতে বলতে লাফিয়ে লাফিয়ে ঘর পেরোনো… এখন আর ভাবতেই পারি না।”
“খামোখা ওসব পুরনো কথা ভেবো না মাসি, লোকে তোমাকে বুড়োমানুষ বলবে।”
আমি হাঁ হয়ে বলি, “কথাটা ভেবে বললি চং? বাপরে! তুই যে ক্রমশ দার্শনিক হয়ে যাচ্ছিস।”
“আমার কথা বাদ দাও মাসি, পাড়ার অবস্থাটা ভাবো একবার। আজ তোমার পাড়া, কাল তোমার দেশ, পরশু তোমার পৃথিবী…”আমি হইহই করে থামাই ওকে, “ওরে দাঁড়া বাপু, কিসের থেকে কোথায় চলে যাচ্ছিস। সিধে মঙ্গলগ্রহে গিয়ে থামবি মনে হচ্ছে।”
“তোমাকে সকালে এসে ওই যে বললাম, পাড়াটাকে ওরা নোংরা, অস্বাস্থ্যকর করে ফেলল। গাছ কেটে, জঞ্জাল ফেলে যা-তা। পাড়ার বাচ্চাগুলোর হুঁশ নেই কোনও। সারাদিন ক্লাস করতে ব্যস্ত। আরে বাপু, এত ক্লাস করে হবেটা কি! এই নোংরা পৃথিবীটার মধ্যে তোরা বাঁচবি কী করে?”
আমি শুনতে থাকি, ক্লাস-সংক্রান্ত আলোচনাটা তেমন দাগ কাটে না মাথায়। কিন্তু গাছ কেটে ময়লা ফেলে…”অ্যাঁ! সে কি! আরে কবে থেকে এসব হচ্ছে? আমি কিছুই জানি না। কী আশ্চর্য! কারা করছে এসব?”
“পাজি লোকেরা। পাজি আর দুষ্টুদের আলাদা নাম থাকে না মাসি। তারা পাজি, এটুকুই তাদের পরিচয়।”
“আরে সে তো বুঝলাম। তোর সঙ্গে আমি একশোভাগ সহমত। কিন্তু এসব আমাকে আগে বলবি তো!”
“তোমাকে?” চং এমন করে আমার দিকে টানা সাড়ে আট সেকেন্ড হাঁ করে তাকিয়ে রইল, মনে হল ওর লম্বা দুটো ক্যানাইন দাঁতের ফাঁকে ছোট্ট লাল জিভ আর খাড়া কানের পাশে নীলচে চোখদুটো আরেকটু হলে ঠেলে বেরিয়ে আসবে।
“মাসি, তুমি যে কীসব বলো না! হেঃ, দিনরাত্তির হয় তুমি বইপত্তর পড়ছ, নয় লিখছ। আমার সাহস আছে তোমাকে বিরক্ত করি?”
আমি চরম অবাক। বললাম, “অ্যাই, দাঁড়া দাঁড়া। এগুলোকে বিরক্ত করা বলে না। কিন্তু তিস্তু আর গোল্লু এই সাতসকালে এসে কী করবে শুনি?”
“আঃ! ওরা খুব বুদ্ধিমান। ঠিকঠাক পরামর্শ দেবে, এই পরিস্থিতিতে আমাদের কী করা উচিত। তিস্তু সাঁতরে আসুক, নির্ঘাত সাঁতার কেটে ফেরার সময় চারটে গরম কচুরি আর জিলিপি খেতে খেতে আসবে। দেখি গিয়ে মোড়ের মাথায় দাঁড়াই। আমার জন্য ঠোঙায় করে দুটো না আনলে আজ ওকে আমি দেখাব মজা!”
“সে কি!”আমি আঁতকে উঠি, “সাঁতারের মতো এক্সারসাইজের পরে কচুরি-জিলিপি! এ তো বিষ!”
“আঃ, বাদ দাও। পোলাপান মানুষ। এই তো খাবার বয়স। ওদের বয়সে তুমি লোহা চিবিয়ে হজম করতে।”
উফ, এইসব শব্দ আমার মায়ের কথাবার্তা শুনে শুনে শিখেছে চং। পারেও বাপু।
চং গম্ভীর মুখে বলে, “শোনো মাসি, তুমি গোল্লুকে ডেকে একটু চা-টা খাওয়াও তো। উঠুক আগে। চায়ে একটু কাঁচা আদা থেঁতো করে দিও। আদায় এনার্জি পাবে। আর হ্যাঁ, আমাকেও এক ডেকচি দুধ দিও। বেশি গরম করবে না, হালকা উষ্ণ। একটু ইন্সট্যান্ট কফি মিশিয়ে দিও প্লিজ। গোল্লু একদিন দিয়েছিল। দারুণ লাগে খেতে।”
আমি হাঁচড়পাচড় করে উঠে পড়ি। যাই। গোল্লুকে ডাকতে হবে। কার আদা-চা, কার দুধ-কফি, কার চ্যবনপ্রাশ। রইল পড়ে গপ্পোটা। পরে লিখব। তার আগে দেখিগে যাই, কার কী লাগবে।
ও হ্যাঁ, তোমরাও প্রস্তুত থেকো। তোমাদেরও ডাকব একটু পরে।
২
চং এবং গাছপালা
গাছপালা নিয়ে আমাদের পাড়ায় বাপু বড্ড ঝামেলা চলে। তোমাদের পাড়ায় এমন হয়? আমরা থাকি দিব্যি শহরে, যেখানে চারপাশে হাঁই হাঁই করে উঁচু ফ্ল্যাট উঠে যাচ্ছে। তার মধ্যে আমাদের পাড়ায় এখনও বেশ কয়েকটা একতলা আর দোতলা বাড়ি রয়েছে। এইরকম একটি বাড়িতে আমার মা, মানে তোমাদের দিদা, আমাদের বাড়ির সামনে আর বাড়ির পেছনে বিস্তর গাছ লাগিয়েছেন। তার মধ্যে একটা নারকেল, একটা সুপুরি, একটা কাঁঠাল, একটা নিম আর একটা মস্ত তেজপাতা গাছ আছে। আর বাকি সব ছোটোখাটো কচিকাঁচা ফুলগাছ। শিউলি টগর গন্ধরাজ বোগেনভেলিয়া। গ্রিলের গেটের ওপর একটা মাধবীলতা আছে। একটা শ্বেত করবী। একটা হলুদ কলকে। এই ভালো কথা, তোমরা সব গাছপালা চেনো নিশ্চয়ই। গোল্লু যেমন কোনও গাছের নামই জানে না। অনেকবার কান ধরে শিখিয়েছি। সব মন দিয়ে শোনে, তারপর কানে হাত বুলিয়ে ঘরে চলে যায়। নির্ঘাত শোনার ভান করে। বেলগাছ দেখলে চোখমুখ কুঁচকে আমগাছ বলে দেয়, আর বকুনি খায়। তোমরা নিশ্চয়ই তেমনটা নও। হ্যাঁ, যেকথা বলছিলাম। সেইসব গাছের ডালে ডালে সকাল থেকে হরেক পাখির মেলা। ভোরবেলা আমাদের ঘুম ভাঙে তাদের কিচিরমিচির শুনে। টুনটুনিগুলো বোঁ করে দোল খায় এখান থেকে ওখান। মাধবীলতা আর শিউলি গাছের শুঁয়োপোকা লুকিয়ে থাকে ওদের ভয়ে। মৌমাছিরা খুঁজেপেতে দেখে কোন গাছের ঘন পাতার আড়ালে ওদের মৌচাক বানাবে। একটা কাঠঠোকরা এসে গম্ভীর মুখে তেজপাতা গাছের গুঁড়ি ঠুকে পরীক্ষা করে যায় কাঠটা ওর বাড়ি বানানোর জন্য কতটা পোক্ত। গাঢ় হলদে রঙের বেনেবউ কালো টুপি পরে কাচের জানলার কাছে এসে বসে থাকে, আর ডেকে ওঠে ‘ইষ্টিকুটুম’। ছাতারেগুলোর ক্যাচর ম্যাচর শুরু হলে আর থামতেই চায় না। ওদের সাত ভাই মিলে সারাদিন কেবল ঝগড়া চলে। পায়রাদের বকবকম তো লেগেই আছে। ওদের কী এত প্রাণের গল্প, বুঝি না বাবা। নির্জন দুপুরে কান পাতলে ঘুঘুদের ডাকও দিব্যি শোনা যায়।
গোল্লুর ভারি ইচ্ছে বাগানে একটা কলাগাছ লাগায়। আমার মায়ের কাছে এই আবেদন রাখায় তিনি প্রথমে জানতে চাইলেন, “হঠাৎ কলাগাছ কেন? তুমি তো কলা খেতে ভালবাসো না।”
“আহা-হা, খামোখা কলা খাবার জন্য গাছ লাগাব কেন? আমি দেখব।”
“দেখবে? কলাগাছ এমন কিছু মনোহারী চমৎকার দেখতে বলে তো মনে হয় না। তার চেয়ে একটা জারুল কৃষ্ণচূড়া বা অমলতাস ঢের ভালো দেখতে।”
গোল্লু একটু গলা নামিয়ে বলল, “আসলে কি জানো তো, বাই চান্স একটা শালিখ দেখে ফেললে তারপর একটা কলাগাছ না দেখলে সারাদিন শুধু দুঃখ আর দুঃখ। কতবার এমন হয়েছে। একটা শালিখ যেই-না দেখলাম, অমনি মায়ের বকুনি ফ্রি। সেদিনই স্কুলে স্বাগতার সঙ্গে ঝগড়া হবে, লিখতে লিখতে ফেভারিট জেল পেনের কালি ফুরিয়ে যাবে, পাজি মহীরাজ বাক্স থেকে টিফিন চুরি করে খেয়ে নেবে, ঝুমা মিস চোখ পাকিয়ে বকবে… অথচ একটা শালিখ দেখার পরে দোষ কাটানোর জন্য একটা কলাগাছ দেখলে নো চাপ। কলাগাছটা বাইরে কোথায় খুঁজতে যাব? বরং ওটা চোখের সামনে থাকলে সব ঝামেলা মিটে যায়। বাগানের একটা কোনায় লাগিয়ে দাও না একটা কলাগাছ, “গোল্লুর সে কি অনুনয়-বিনয়।
আমার মা প্রায় রাজি হয়ে যাচ্ছিলেন। কী ভেবে বললেন, “শোনো, একটা কাজ করো। তুমি এসব কুসংস্কার মেনো না। ওসব ঠিক নয়। এক শালিখ দু- শালিখ আবার কি! বাজে অবৈজ্ঞানিক ব্যাপার। তবে কলাগাছ ব্যাপারটা আমি অন্যভাবে ভেবে দেখছি। আর তো তেমন জায়গা নেই বাগানে। এরপর ডাইনোসর লুকিয়ে থাকলেও খুঁজে পাব না।”
চং অবশ্য ফুট কাটতে ওস্তাদ। সে বিকেলবেলা চায়ের টেবিলে এসে বলল, “শোন গোল্লু, তুই কেবল নিজের দিকটাই ভাবলি। ওই শালিখটার তোকে দেখে দিন খারাপ হয় না বলতে চাস? ওই শালিখটা যেদিন তোর কাঁদো-কাঁদো মুখটা দেখে ফেলে, ও নিজেও ওর মা-র কাছে বকুনি খায়। সেদিন বাগানে একটাও ভালো পোকা পায় না। খুঁটে খাবার মতো কিছুই হয়তো পেল না সারাদিন। ওর দিকটাও একবার ভাবিস।”
তিস্তু শুনে হেসে গড়িয়ে পড়ল, গোল্লু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল চং-এর কথা শুনে। কী অদ্ভূত কথা!
হ্যাঁ, কথা হচ্ছিল আমাদের বাড়ির বাগানের গাছপালা ফুল পাখিদের বিষয়ে।
আরে আরে, তোমরা কি ভাবছ আমি এইসব তোমাদের বানিয়ে বানিয়ে বলছি? বিশ্বাস না হয় গোল্লুকে ডাকো। ও মোবাইলের ক্যামেরায় অনেক ছবি তুলে রেখেছে। ভিডিও করে রেখেছে। তিস্তুকেও ডাকতে পারো। আর যদি আমাদের বাড়িতে এসে স্বচক্ষে দেখতে চাও, যেদিন খুশি এসো। তোমরা সকলে দল বেধে এলে ছাদে একটা জম্পেশ পিকনিক করা যাবে বরং।
তাপ্পর, যেটা বলছিলাম। শহরের হট্টগোলের মধ্যেই দিব্যি রয়েছে আমাদের বাড়ি, বাগান, গাছপালা আর পাখি। বেশ মনোরম ব্যাপার না? আমি জানি তোমাদের শুনে খুব পছন্দ হচ্ছে। কিন্তু দুঃখের কথা কি জানো, আমাদের চারপাশে যারা থাকে, তাদের এসব এক্কেবারে পছন্দ নয়।
ধরো, তেজপাতা গাছ থেকে সারা বছর টুপটাপ ঝরে পড়ে হলদে পাতা। আমাদের বাগান, বাগানের পাশের রাস্তা, আশেপাশের বাড়িতে সেসব পাতা উড়ে যায়। আমরা কিছু তেজপাতা কুড়িয়ে ধুয়ে মুছে শুকিয়ে রাখি। রান্নায় দিই। ঠিক তেমন শীতকাল এলে নিমগাছ সব পাতা ঝরিয়ে ন্যাড়া হয়ে দাঁড়াবে চুপচাপ। আবার বসন্ত এসেছে জানিয়ে দেবে কচি লালচে নিমপাতারা। তখন কত মানুষ হাত বাড়িয়ে একমুঠো নিমপাতা ছিঁড়ে নিয়ে যান, আমরাও রোজ তখন নিমপাতা খাই একটু। তোমরাও খেও কিন্তু। ভীষণ উপকারী। গোল্লু তেতো খেতে চায় না, আবার তিস্তু নিম-বেগুন দিয়ে একথালা ভাত খেয়ে নেয়। আমাদের বোগেনভেলিয়া গাছের কাগজের মতো ফুরফুরে হালকা গোলাপি-সোনালি ফুলেরা কেবল উড়ে উড়ে চলে যাবে পাশের বাড়ির উঠোন, কিংবা বাড়ির সদর দরজার সামনে। বা রে! ওদের বুঝি এদিক-সেদিক ঘুরে বেড়াতে ইচ্ছে করে না! রাস্তায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে থাকবে হলুদ কলকে ফুল, সাদা করবী, কুচি টগর। তোমাদের পড়েশুনে বেশ ভাল্লাগছে না? কিন্তু আমাদের চারপাশের বাড়ির লোকজনেদের এসব ফুল পাতা নিয়ে ভারী আপত্তি।
উলটোদিকের বাড়ির বাবাইয়ের মা মুখ ভার করে বলেন, “ইস সারাদিন একগাদা ফুল পাতা উড়ে উড়ে আসে, কেবল ঝাঁট দিতে দিতে হাতব্যথা। আমাদের বাড়িটা ফুলে আর শুকনো পাতায় এত নোংরা হয়ে যায়!”পাশের বাড়ির জন্টির মা একদিন ডেকে বলেন, “শুনছেন, আপনাদের নারকেল গাছ থেকে তো যে কোনওদিন একটা নারকেল পড়বে আমাদের কারও মাথায়! একটা দুর্ঘটনা ঘটল বলে। আপনারা গাছটা এবার কেটে দিন না। নারকেল তো বাজার থেকে কিনেই খাওয়া যায়।” আচ্ছা, তোমরাই বলো, আমাদের বাড়ির নারকেল গাছ থেকে আমাদের বাড়ির কারও মাথায় নারকেল পড়বে না, পড়বে ওদের বাড়ির লোকের মাথায়? কিংবা তিনি ডেকে বলবেন, “ইস, আপনাদের বড়ো বড়ো গাছগুলোর জন্য আমাদের ঘরে এত মশা হচ্ছে! এবার আমাদের সবার ম্যালেরিয়া হবে!”কে ওঁকে বোঝাবে ম্যালেরিয়ার মশাদের চেহারা কেমন হয়! একদিন সকালে হাঁকডাক করে তিনি পাড়া মাথায় করলেন। কি ব্যাপার! না, নিমপাতা উড়ে উড়ে ওর খোলা জানলা দিয়ে ঘরের বিছানায় ঢুকে পড়েছে। এসব অত্যাচার তিনি একেবারে সহ্য করবেন না। দূরের ফ্ল্যাটের আরেক বউদি একদিন কাঁঠাল গাছ কেটে দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে গেল বাড়ির কলিংবেল বাজিয়ে! কাঁঠালের গন্ধে নাকি তাঁর গা গোলায়! কী মুশকিল বলো দেখি। মজুমদারবাড়ির মাসিমা, আমার মা তাঁকে রাঙাদি বলে ডাকেন বলে আমি তাঁকে রাঙামাসি এবং তিস্তু-গোল্লু-চং তাকে রাঙাদিদা বলে। এই দিদাটি অন্যের গাছের সব ফুল আঁকশি বাগিয়ে কুড়িয়েকাছিয়ে নিয়ে যান, কিন্তু গাছপালা কেটে উড়িয়ে দেবার ব্যাপারে তিনি ভীষণ উৎসাহী। আরে গাছ না থাকলে গাছের ফুল পাবে কেমন করে? এই সহজ সরল কথাটা তাঁর মাথায় ঢোকানো যায়নি আজ অবধি।
সব মিলিয়ে একটা বিতিকিচ্ছিরি ব্যাপার। বুঝতেই পারছ আমরা কোন পাড়ায় কাদের সঙ্গে বসবাস করছি। একদিকে তারা গাছ কেটে দিতে বলবে, আবার শেষ রাত্তিরে টুকটুক করে এসে আমাদের বাগানের সব ফুল চুপিচুপি তুলে নিয়ে চলে যাবে। গাছ থেকে নারকেল মাটিতে পড়ল কি পড়ল না, ফস করে চুরি করে নিয়ে গেল কেউ। কাঁঠাল গাছটায় তো পুঁচকে ফল এল কি এল না, পাঁচিল থেকে গলা বাড়িয়ে সব দেখতে লাগল। ভাবখানা এমন, পাকিলেই খাইব। মিটারঘরের চালে উচ্ছেগাছ কিংবা বাগানে লঙ্কাগাছে ছিটেফোঁটা ফল ধরলে আমাদের আগে তাদের চোখে পড়ে। গোল্লু খুব ছোটোবেলায় বারান্দা দিয়ে ওদের ‘পাজি ভুতু’ বলত। ভাগ্যিস কচি বাচ্চার আধো গলায় এসব শব্দ তারা বুঝতে পারেনি!
আমি সব দেখি, সব শুনি। পাত্তা দিই না। এদের সঙ্গে কেউ ঝগড়া করে? ছি ছি। খামোখা সময় নষ্ট। এখন তো তোমরা সক্কলে জানো, গাছেরা পরিবেশ থেকে নোংরা দূষিত কার্বন ডাই অক্সাইড নিয়ে আমাদের পরিষ্কার অক্সিজেন ফেরত দিচ্ছে। সেই কোন আদিকাল থেকে সবুজ গাছেরাই বাঁচিয়ে রেখেছে পৃথিবীকে। ওদের এসব বলতে গেলে হয়ত শোনাবে, ‘অক্সিজেন চাই তো সিলিণ্ডারে করে ভরে নিয়ে এলেই পারো! এত গাছপালা লাগিয়ে চারপাশে ডালপালা পাতা-ফুল দিয়ে নোংরা না করলেই নয়? ওই ডালপাতায় ইলেক্ট্রিকের তার-ফার জড়িয়ে একটা দুর্ঘটনা ঘটল বলে।
ওরে বাবা, আমি বাপু এসব প্রাণীদের লাইফ সায়েন্সের সালোকসংশ্লেষ চ্যাপটার পড়াতে যেতে পারব না। ওরা যা-খুশি বলে যাক, আমাদের বাড়ির গাছেরা যেমন আছে থেকে যাক। আমাদের বাড়ির সব লোকের একটাই সিদ্ধান্ত, আমাদের বাড়ির মধ্যেকার গাছপালা আমরা কিছুতেই কাটব না। তাতে যে যা করে করুকগে।
কিন্তু গোল বাধল অন্য জায়গায়। আমাদের বাড়ির পিছনদিকে একটা বেশ বড়ো নালা আছে। সেখান দিয়ে পাড়ার যাবতীয় নোংরা জল যায়। অনেক বড়ো, বেশ লম্বাচওড়া। সে বহুদূরের পথ বেয়ে চলে। তার দু-পাশে বিশাল মোটাসোটা ঝাঁকড়া সব গাছ। অনেকদিনের পুরনো গাছ সেসব। অশ্বত্থ, জারুল, কৃষ্ণচূড়া, কদম। তোমরা ভাবতে পারবে না, রাস্তায় কী দারুণ ছায়া হয় গাছগুলোর জন্য। গরমের দুপুরে যখন ঠা-ঠা রোদ্দুরে পুড়ে ঝলসে যাচ্ছে চারপাশ, তখন কোনও রিকশাকাকু এসে একদণ্ড জিরিয়ে নেন গাছতলায় বসে। দিব্যি ফুরফুরে হাওয়া দেয় গাছের তলায়। একবার আমাদের বাড়ির সামনের রাস্তায় যেখানে নালাটা দেখা যায়, সেখানে আমি গোল্লু তিস্তু চং সকলে মিলে পাঁচটা বকুল ফুলের গাছ লাগালাম। আহা! কেমন তারার মতো ছোট্ট ছোট্ট ফুল ফুটবে। চমৎকার গন্ধ বকুলফুলের। জানো নিশ্চয়ই তোমরা। সে গাছগুলো চার-পাঁচ বছর ধরে জলে-হাওয়ায় দিব্যি বাড়ল আড়েবহরে। ও মা! হঠাৎ একদিন দেখি এক-একটা গাছ কেমন পাতা ঝরিয়ে ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে, নির্জীব নিষ্প্রাণ শুকনো হয়ে যাচ্ছে একে একে। আরে! ব্যাপারটা কি? বুঝতেই পারছি না।
প্রথম খবর এনেছিল চং।
দুপুরবেলার শুনশান সময়ে, যখন গোল্লুরা ইস্কুলে থাকে, ঠিক তখন একটা লোক এসে চুপি চুপি গাছের গোড়ায় কীসব গুঁড়ো জিনিস ছড়িয়ে দিয়ে চলে যাচ্ছে। ওটা নির্ঘাত কোনও বিষ, যে জন্য গাছটা কয়েকদিন পর থেকে মরে যাচ্ছে একটু-একটু করে।
প্রথমে পাত্তা দিইনি। চং নিশ্চয়ই ভুল দেখেছে। কার এত সময় আছে, আর তাছাড়া এসব কাণ্ড কেন করবে? বকুলগাছগুলো কি কারও কোনও ক্ষতি করেছে? কিন্তু খটকা লাগল, যখন একটা গাছ পুরোপুরি মরে গেল, আর পাশের গাছটা শুকিয়ে যেতে শুরু করল। কিন্তু চং একা পাহারা দিয়ে কী করবে? কে একটা লোক কোন ফাঁকে কী ছড়িয়ে দিয়ে চলে যাচ্ছে, তাকে ধরা কি চঙের একার কাজ?
তিস্তু গোল্লু আর চং মিটিঙে বসল।
“একটা কিছু করতেই হবে, একটা গাছ মেরেছে, আরেকটাকে মারছে। এখন না আটকালে বাকিগুলোকেও মারবে।”
তিস্তু বলল, “আগে খোঁজ নিতে হবে কেন মারছে। কী এমন হবে এই নালার পাড়ে যে এই গাছগুলোকে না মারলে চলবে না?”
চং বলে, “শোন ভাই, পাড়ার মোড়ে বুদ্ধকাকুর পানের দোকানের পাশ দিয়ে আসছিলাম, ভোঁদু আর পল্টুর কথা কানে এল, ওরা বলছে নালার পাড়ে রেলিং বসবে, মেশিন দিয়ে ড্রেজিং করে নালা পরিষ্কার করবে, তাই নালার পাড়ে সব গাছ কাটতে হবে।”
“মানে?”চটে ওঠে গোল্লু, “নালা পরিষ্কার করার জন্য পাড়ের বকুলগাছগুলোই কাটতে হবে? উফ! এরা সব মগনলাল মেঘরাজের মতো পাজি!”
“উঁহু!”তিস্তু গম্ভীর, “মগনলাল নয়, ইয়ে গাছ মুঝে দে দে ঠাকুর… এরা সব গব্বর। এদের শিক্ষা দেব জব্বর।”
চং বলল, “ওদের কাদের নাম বললি? ঠাকুর আর গব্বর… ওরা কি এ পাড়ার কেউ?”
“আঃ না, “তিস্তু রেগেমেগে বলে, “তোকে এক্ষুনি আমি হিন্দি সিনেমা চালিয়ে দিতে পারছি না। তুই মা-র কাছে জেনে নিস পরে। ওই গব্বর একটা সিনেমার দুষ্টু লোক।”
“ও। বুঝেছি। বাদ দে। এরা হিন্দি সিনেমার দুষ্টু লোকের চেয়েও বেশি ইয়ে। কী করবি ভাবছিস?”
তিস্তু বলে, “শোন, গোল্লু তখন একেবারে ‘কচি তারা, কথা ফোটে নাই’ গোছের ছোটোমানুষ, তোর মনে নেই। চং তো জন্মাসনি তখন। সেই সময় একবার আমি নালার ধারে বড়ো গাছ কেটে ফেলার বিরুদ্ধে এই পাড়ায় একটা আন্দোলন গোছের করতে গিয়েছিলাম।”
“তাই? এই পাড়ায়? একেবারে আন্দোলন? বাপ রে! সাংঘাতিক ব্যাপার! কী করেছিলি শুনি?”চং-এর উত্তেজনা তুঙ্গে।
“সেরকম কিছুই না। আমি ওই চিপকো আন্দোলনের কথা পড়েছিলুম বইতে, ভাবলুম সেইভাবে যদি কিছু করা যায়। ভালো কথা তোরা চিপকো আন্দোলন সম্বন্ধে কিছু শুনেছিস?”
চং আর গোল্লুকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকতে দেখে তিস্তু গম্ভীর গলায় বলে, “গাছ কাটার বিরুদ্ধে সেটাই এই দেশের সবথেকে জরুরি আন্দোলন। সেই সত্তর দশকের কথা। ঠিকাদাররা যখন বড়ো বড়ো গাছগুলোকে কাটতে আসে, গ্রামের মেয়েরা তখন এক-একজন এক-একটা গাছ জাপটে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে ছিল। মূল বিষয় হল, গাছ কাটার আগে তাদের মারতে হবে। ইন্টারনেট খুলে দেখ, ছবি রয়েছে, লেখা রয়েছে। গ্রামের মেয়েরা অমন রুখে দাঁড়িয়েছিল বলেই তো আর গাছগুলো কাটা গেল না।”
ততক্ষণে গোল্লু গুগলে চিপকো মুভমেন্ট খুঁজেপেতে ছবি দেখে নিয়েছে। চং-ও এক ঝলক দেখল।
“তুই কি এরকম কিছু করলি?”
“হুম, “তিস্তু গম্ভীর হয়ে বলে, “আমি বড়ো কদমগাছটা জড়িয়ে ধরে দাঁড়ালাম। আমাকে দেখে শুভকাকুর চায়ের দোকান, বুদ্ধকাকুর পানের দোকান থেকে সবাই হাসতে লাগল। যারা বাজারে যাচ্ছিল, তারা অবাক হয়ে তাকাল। তবু আমি অনেকক্ষণ ঠায় দাঁড়িয়ে রইলাম। কিন্তু শেষ অবধি কোনও লাভ হোল না জানিস?”
“কেন কেন?”চং বেজায় উত্তেজিত হয়ে জিগ্যেস করে।
“বা রে! ওই রোদ্দুরে, গরমে আমার খুব কষ্ট হতে লাগল। পায়ে কাঠপিঁপড়ে কামড়াতে লাগল। হাত পা প্রবল চুলকোচ্ছে, কিন্তু গাছ জড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছি, গাছকে তো ছেড়ে দিয়ে ঘ্যাসঘ্যাস করে হাত-পা চুলকোনো যায় না। আমার তখন কতই বা বয়স। ক্লাস সিক্স না সেভেনে পড়ি। ছুটে ছুটে চলে গেছি, কিন্তু পাড়ার বড়ো মানুষরা সক্কলে হাসাহাসি করছে। আমাকে ডেকে বলছে, ইকি! তুই এখানে এর’ম করে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? তোর মা জানে? তোর ইস্কুল নেই? তোর বাবাকে ফোন করব? আমি কাউক্কে কোনও কথার উত্তর দিচ্ছি না। শেষে যখন মাথার ওপর একটা কাক পুচ করে…, “বলতে বলতে তিস্তু নাক-মুখ কুঁচকে ফেলল, যেন এখনও সেই কাকের পুচ করে ফেলা ময়লা ওর মাথায় লেগে আছে।
গোল্লু বলল, “এটা এক ধরনের ষড়যন্ত্র। কাকগুলো নিশ্চয়ই ওদের দলে, তা না হলে এমন করবে কেন?”
চং বলল, “তুই থাম গোল্লু। কাকেরা মানুষের মতো অমন ষড়যন্ত্র করতে পারে না। আমার ধারণা, ও তিস্তুকে আন্তরিকভাবে সমর্থন করতে এসেছিল। উত্তেজনা সামলাতে না পেরে পুচ করে একটু হয়ে গেছে, ওটা হতেই পারে। ওসব ছোটোখাটো ব্যাপারে আন্দোলন বন্ধ হবে কেন?”
তিস্তু ভাঙা গলায় বলল, “নাঃ, তারপর আর ওখানে দাঁড়াতে পারিনি। বাড়ি চলে গেলাম। সাবান ঘষে চান-টান করে আবার আসব ভেবেছিলাম, তখন অঙ্কস্যার চলে এল অঙ্ক করাতে। বেলার দিকে শুনলাম গাছটা ইলেক্ট্রিক করাত দিয়ে ঘ্যাঁচাঘ্যাঁচ করে কেটেকুটে ক্রেন দিয়ে বয়ে সব নিয়ে গেছে পাজি লোকগুলো।”
তিস্তু ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলল একটা। চোখ ছলছল। ওই কদমগাছটা দেখে দেখে ও পুঁচকে বয়সে ‘বাদল-দিনের প্রথম কদম ফুল করেছ দান’ গানটা শিখেছিল। গানটা গুনগুন করে গেয়ে নিল একবার।
সব ঘটনা শুনে-টুনে চং আর গোল্লুর মুখ প্রচণ্ড গম্ভীর।
“সব অঙ্ক এক ফর্মুলায় হয় না, বুঝলি? কখনও কখনও অন্য রাস্তা দিয়ে ঘুরপথে যেতে হয়, “চং বলে।
“সে তো বুঝলাম। কিন্তু এক্ষেত্রে আমরা কী-ই বা করতে পারি! দেখছিস তো, এমনিই আমাদের চারপাশের প্রতিবেশিরা সব প্রতিবাঁশি। অন্তত গাছপালার ব্যাপারে সব সময় বেসুরে বাজাই তাদের কাজ। খালের পাড়ে বকুলগাছ কাটল না নটেগাছ মুড়োল, তাতে এদের ভারি বয়েই গেল। আর একটা কথা মনে রাখিস ভাই, একা কোনও আন্দোলন হয় না। আমি সেদিন একা একা গিয়ে গাছটাকে জড়িয়ে ধরে কতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম। সঙ্গে আর পাঁচটা মানুষ থাকলে বা আরও কেউ প্রতিবাদ করলে তবে তো একটা কাজের কাজ হত। তাই না?”
“হুম, “গোল্লু ভুরু কুঁচকে বলে, “একটা কাজ করি চল। আমরা পোস্টার বানাই একটা। লেখা থাকবে, ‘গাছে হাত দিলে জরিমানা’। কিংবা ‘গাছ কাটলে শাস্তি’। তারপর চটপট পোস্টারগুলো নিয়ে গাছের গায়ে এক্ষুনি সেঁটে দিয়ে আসি চল। অন্তত পাজিগুলো বুঝবে, কেউ না কেউ প্রতিবাদ করছে। ততক্ষণে আমরা পরের ধাপটা ভেবে ফেলতে পারব।”
“বেড়ে বলেছিস। আগে পোস্টার সেঁটে আসি, তারপর দেখছি আর কী কী করা যায়।”
চং বলে, “তোরা পোস্টার বানা, আমি একটু পাড়ায় ঘুরে-টুরে পাত্তা লাগাই, আর কোনও খবর আছে কি-না।”
যেমন ভাবা, তেমনি কাজ। গোল্লু হুড়মুড় করে কম্পিউটারে বসে কীসব ডিজাইনওলা চমৎকার পোস্টার বানিয়ে ফেলল। সেগুলোতে লেখা, ‘গাছ কাটছেন? প্রাণে মরবেন’, ‘গাছে হাত দিলে কড়া শাস্তি’, ‘গাছ রাখুন, প্রাণে বাঁচুন’…। রিন্টুকাকুর দোকানে গিয়ে সেসব পোস্টার ছেপে ফেলল অন্তত গোটা কুড়ি। তিস্তু আর গোল্লু মিলে জুতোর বাক্সের পিচবোর্ড, ফেলে দেওয়া কার্ডবোর্ডে আঠা দিয়ে পোস্টার সাঁটিয়ে সেসব পোক্ত করে নিল। তারপর তো গিয়ে দড়ি বেঁধে সেগুলো নালার ধারে এক-একটা গাছের গায়ে ঝুলিয়ে দেওয়া। না না, গাছের গায়ে পেরেক ঠুকে পোস্টার লাগায়নি। ওরা জানে, গাছের গায়ে পেরেক ঠুকলে গাছের খুব ব্যথা লাগে। গাছের প্রাণ আছে, একথা তোমরাও খুব ভালো করে জানো।
এই পুরো কাজটা করতে ওদের আধ ঘণ্টার বেশি সময় লাগেনি। পড়াশুনোর ফাঁকে এটুকু ওরা করেই থাকে। আরে বাবা! পরিবেশটাকে তো সুস্থ-সবুজ তাজা করে বাঁচিয়ে রাখতে হবে! ফুসফুসে কালো ধোঁয়া ভরে আমরা কি কেউ আর বেশিদিন সুস্থ থাকব? রাস্তার ধারের গাছেরা কি আমাদের কিছু কম অক্সিজেন দিচ্ছে?
ওইসব পোস্টারে বেশ কাজ হয়েছিল সেবার। একটা বকুলগাছ মরে গিয়েছিল বটে, কিন্তু নালার পাশে বাকিগুলো আর মরেনি, বা কেউ তাদের মেরে ফেলেনি। পোস্টারে কাজ না হলে ওদের অন্য পরিকল্পনা ছিল। চং তার দুটো ধেড়ে হুলো সাকরেদ জোগাড় করে ওই গাছগুলোর আশেপাশেই ঘাপটি মেরে বসেছিল। কেউ গাছের গোড়ায় বিষ দিতে এলে বা গাছ কাটতে এলে ওরা আমাদের বাড়ির মধ্যে এসে চেঁচামেচি করে ঠিক খবর দেবে। আমরা কেউ না কেউ বেরিয়ে ধরব ওদের। বোঝাব, বড়ো গাছ কাটা ঠিক নয়।
এসব তো বেশ কিছুদিন আগেকার কথা। এবারের ঘটনা আরও ঝামেলার। সাতসকালে চং এসে বকবক করে চলে যাবার পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম ক-দিন ধরে আবার নালার ধারের বড়ো গাছ কাটার মহাযজ্ঞ শুরু হয়েছে। উদ্দেশ্য ভারি মহৎ। রাস্তা চওড়া হবে, অতএব অনেক বেশি গাছ কাটতে হবে।
আমার এসব শুনে খুব মনখারাপ হল।
তোমরাই বলো, আমরা সক্কলে জানি, রাস্তা খুব দরকার, রাস্তাঘাট চওড়া না হলে সেখান থেকে গাড়িঘোড়া মানুষজন সব যাবে কী করে? কিন্তু তার জন্য রাস্তার ধারে থাকা বড়ো গাছগুলো কী দোষ করল? তাদের রেখে কি কাজটা করা যায় না? কিংবা ধরো যে গাছটা কাটতেই হবে, তাকে শিকড়সুদ্ধ নিয়ে গিয়ে অন্য কোথাও যত্ন করে লাগানো যেতে পারে। আর যে গাছ কেটে ফেলা হল, সেখানে আরও অন্তত পাঁচটা গাছ পুঁতে দেওয়া হল। এমন করলে কিন্তু কারও আপত্তি থাকে না। এই পাজি লোকগুলো সেসব কথা বুঝলে তো! ভাব করে, বুঝেছি-বুঝেছি, কাজের বেলা ভোঁ-ভাঁ। এটা-সেটা বাহানা দিয়ে কাটিয়ে দেয়।
দুপুরবেলা খেয়েদেয়ে উঠে টেবিলে বসে একটু ঝিমোচ্ছি, ওই তোমরা বনানীমিসের ইতিহাস ক্লাসে যেমন পড়া না শুনে করে থাকো, তেমন চোখ খুলে ঝিমোচ্ছিলুম। শুনতে পেলাম পাশের বারান্দায় বেশ জটলা চলছে।
চং-এর গলা।
“শোন গোল্লু, এবার আর ওই গাছের গায়ে পোস্টার সেঁটে কোনও লাভ নেই। নির্ঘাত ওরা সব ছিঁড়ে দিয়ে চলে যাবে। অন্য কিছু ভাবতে হবে।”
“ঠিক ভাই। যা বলেছিস। শুধু পোস্টারে কাজ হবে না। আমি ভেবেছি গাছের গায়ে পোস্টার লাগিয়ে পাশে বাঁশের কঞ্চি দিয়ে একটা বেড়া দেব।”
“ভেঙে দেবে।”
“অ্যাঁ!”
“অ্যাঁ নয়, হ্যাঁ, “চং বলে, “ওরা ওসব কঞ্চির পলকা বেড়া স্যাট করে ভেঙে দেবে। পোস্টার ফরফর করে ছিঁড়ে দেবে। তারপর তোরা যখন সব ইস্কুল-কলেজে থাকবি, তখন ঘ্যাঁচাঘ্যাঁচ করাত দিয়ে নির্মমভাবে গাছ কেটে ফেলবে। সব খুনির দল। আমরা পাড়ার মেনি-হুলো-নেড়ি মিলে দল বেধে পাহারা দিয়েও কিছু করতে পারব না। আমাদের গায়ে জল-ফল ঢেলে দিলে সে এক খুব বিশ্রি ব্যাপার হবে। গতবার আমাকে হুলো-ভুতোর কাছ থেকে প্রচুর কথা শুনতে হয়েছিল। ভুতোর গায়ে কারা যেন এক বালতি কনকনে ঠান্ডা জল ঢেলে দিয়েছিল। বেচারা বুঝতে না পেরে ভিজে পুরো ন্যাতা। তারপর ওর সে কি হাঁচি। অনেক কষ্টে চারটে তুলসি পাতা একটা শিউলি পাতা আর আধখানা বাসক পাতা চিবিয়ে খেয়ে… ঠা ঠা রোদ্দুরে একটি ঘণ্টা হাঁ করে বসে বসে… গায়ের জল আর শুকোয় না… ইদিকে মুখটা পুরো হাকুচ তেতো…”
“বুঝেছি বুঝেছি, “গোল্লু চং-কে থামায়, চং-এর বন্ধুর নাম ভুতো। সে গায়ে এক ফোঁটা জল পড়লে হেঁচে মরে।
“আচ্ছা, আমরা তাহলে ইনস্টাগ্রাম ফেসবুক সব জায়গায় গাছগুলোর ছবি তুলে পোস্ট করি? হ্যাশট্যাগ সেভ আস লিখে…”
“তোদের ফেসবুকে ওসব লিখে কাঁচকলা আর ঘণ্টা হবে। লোকে তোর পোস্টে এসে ‘ইস’ ‘আহা’ ‘ভয়ংকর’ ‘মারাত্মক’ ‘সো স্যাড’ ‘পাশে আছি’ এসব লিখেফিখে দুঃখের বা রাগের মুখ এঁকে দিয়ে চলে যাবে। কাজের কাজ কিস্যু হবে না।”
গোল্লু চোখ পাকিয়ে তাকাল, “চং, তুই এত ফেসবুক সম্বন্ধে কী করে জানলি রে?”
চং হাড়-জ্বালানো হাসি হেসে বলে, “তুই তো অষ্টপ্রহর ওসবের মধ্যে থাকিস, তোর ঘাড়ের ওপর দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখে দেখে শিখলাম…”
গোল্লু হাতা গুটিয়ে তেড়ে যাচ্ছিল আর-একটু হলে, “কী! আমি সারাক্ষণ মোবাইল নিয়ে বসে থাকি? তাহলে ইস্কুল যায় কে? টিউশন ক্লাসে যায় কে? পড়ার টেবিলে এতগুলো খাতা-বই নিয়ে পড়ে কে? তুই? মারব এমন…”
তিস্তুর গলা শোনা গেল, “ভাইসব শান্ত হও। বিপদের সময় নিজেরা মারামারি করে সময় নষ্ট কোরো না বাপু। মনে রেখো একতাই বল। আমার বাবার মাস্টারমশাই লিখেছিলেন, আয় আরও বেঁধে বেঁধে থাকি। আমি সেইটা খুব মেনে চলি। ঝগড়া না করে তার চেয়ে এই সমস্যাটা কী করে সমাধান করা যায়, চলো ভাবি। আমি একটা কথা ভাবছিলাম। কিছু বাদ দেওয়া যাবে না। সব দিক থেকে ব্যাপারটা শানিয়ে নিতে হবে। গোল্লুর কথামতো আমরা এবার পোস্টার লিখে সাঁটাব, কঞ্চি দিয়ে বেড়া দেব, ইন্সটা আর ফেবুতে ছবি তুলে আর জায়গার নাম লিখে ‘সেভ দ্য ট্রি’ ‘গাছ বাঁচান’ লিখে পোস্ট করব, আর সেই সঙ্গে কাউন্সিলর, থানা, খবরের কাগজ, টিভি, রেডিও সব জায়গায় চিঠি লিখব, মেল করব। চারদিক দিয়ে চেপে ধরতে হবে। দরকার হলে গ্রিন বেঞ্চে মামলা করার কথা ভাবতে হবে। যাই, মান্টুকে একবার ফোন করে বলে রাখি।”
মান্টু হলেন তিস্তুর কাকিমা। তিনি হাইকোর্টের উকিল।
“হ্যাঁ রে, গ্রিন বেঞ্চটা কোথায় রে? তোদের ইস্কুলে? সবুজ রঙের বেঞ্চিতে…”চং-এর কথা শেষ হওয়ার আগেই দু-জন মিলে হাঁ হাঁ করে চেঁচিয়ে ওঠে।
“ওরে সেসব সবুজ রঙের বেঞ্চি নয় রে, এ হল আদালতের ব্যাপার। পরিবেশ রক্ষার জন্য মামলা করলে কোর্টের গ্রিন বেঞ্চে সেসব শুনানি হয়। ধর কেউ গাছ কাটছে, ধর কেউ পুকুর ভরাট করছে, ধর কেউ কারখানা বানিয়ে বিষাক্ত জিনিস হাওয়ায় কিংবা জলে মেশাচ্ছে… তখন মামলা করলে…”
“এই না না, ওসব মামলা না গামলায় গিয়ে কাজ নেই বাপু। বড়ো ঝকমারি ব্যাপার। দিনের পর দিন আবার আদালতে গিয়ে বসে-টসে থাকা… কে করবে, অ্যাঁ? তোদের ইস্কুল-কলেজ পড়াশুনো কিছু নেই নাকি? আর আমার দ্বারা এসব হবে না।”
“মামলা করব কেন? পয়সাও নেই, সময়ও নেই। মামলা করছি-করছি ভাব দেখাব, “গোল্লু বলে।
“না ভাই, আইন-আদালত নিয়ে একদম ছেলেখেলা নয়। তার চেয়ে চল পাড়ায় একটা মীটিং ডাকি।”
আমার ঝিমোতে ঝিমোতে এটুকুই শোনা। তারপর টেবিলে মাথা দিয়ে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি। ঘুমোতে ঘুমোতে চমৎকার স্বপ্ন দেখছিলাম, ময়দানে একটা বিরাট জমায়েত। বড়ো মঞ্চ বাঁধা হয়েছে। ওপরে রঙিন চৌখুপি শামিয়ানা খাটানো। সবুজ ঘাসে বসে রয়েছে অসংখ্য বেড়াল। পাটকিলে, সাদা, কালো, খয়েরি, পাঁশুটে… নানান রঙ তাদের গায়ে। কেউ একরঙা, কেউ দুই বা তিন রঙের। কেউ হাসছে, কেউ গোমড়া। কেউ তোমাদের মতো সিরিয়াস, কেউ আমার মতো ক্যাবলা। সেখানে সকলের সামনে মাইক বাগিয়ে চিৎকার করে বক্তব্য রাখছে চং!
“বন্ধুগণ, আজ আমাদের বড়ো দুর্দিন। মানুষ দিন দিন অসভ্য আর অমানুষ হয়ে উঠছে। কেবল হুড়মুড় করে গাছ কেটে ফেলছে, পাড়ার পুকুরে ধুপধাপ করে ময়লা ফেলছে, দুমদাম শব্দ করে বাজি ফাটাচ্ছে। নোংরা জলে কালো হাওয়ায় ভেজাল খাবারে আর কান-ফাটানো শব্দে আমরা জেরবার। কালীপুজোর সময় বাজির আওয়াজে আমার কত বন্ধু সিঁটিয়ে গুটিয়ে খাটের তলা, সোফার কোণা কিংবা আলমারির ছাদে গিয়ে লুকোয়। তবু নিস্তার পায় না। একবার আমার এক বন্ধু বাজির আওয়াজ সহ্য করতে না পেরে ছাদের জলের ট্যাঙ্কের ঢাকনা খুলে ঝাঁপ দিল। সেই হিম-সন্ধের সময় ঠান্ডা জলে ঝাঁপ দিয়ে তার যখন নিউমোনিয়া হয়, আমি তার পাশে ছিলাম। শেষ নিঃশ্বাস ফেলার সময় সে আমার দুটি থাবা পাকড়ে ধরে আবেদন করেছে ওই বাজিগুলো এবং বাজি-ফাটানো পাজিগুলোকে যেন আমরা কনকনে শীতের রাতে জলের ট্যাঙ্কে ফেলে চুবিয়ে রেখে দিই, “চং বলতে বলতে নাক টেনে নিল একবার, চোখের কোনা হাতের লোমে মুছে আবার বলতে শুরু করল, “বন্ধুগণ, মানুষ মরুক বাঁচুক তাতে আমার-আপনার কি? আসুন আমরা একটা নরম-সরম বেড়াল-পৃথিবী গড়ে তুলি। সেখানে জলে মাছ, গাছে ফল আর নীল আকাশে পাখিরা মজা করে থাকবে। মাটিতে আমাদের রাজত্ব থাকবে। সে রাজত্বে একটাও মানুষ চাই না আমরা…মানুষ সব নিপাত যাক, “সমস্বরে সব বেড়াল চেঁচিয়ে উঠল, “নিপাত যাক, নিপাত যাক।”
আকাশ-ফাটানো চেঁচামেচি শুনে আমি তো লাফিয়ে উঠলাম ঘুম ভেঙে।
ঠিকই শুনছি। তবে চং নয়, চেঁচাচ্ছে তিস্তু।
“কাকু কাকিমা জেঠু জেঠিমা মাসি মেসো দাদা দিদি ভাই বোন, সক্কলকে বলছি। আসুন আসুন। একটু দাঁড়ান। একবার শুনে যান। আপনারা জানেন, কিংবা জানেন না, আজ আমাদের বড়ো দুর্দিন। আমাদের নালার ধারে এই রাস্তা চওড়া হবে। খুব ভালো কথা। রাস্তা চওড়া হোক, কিন্তু সেজন্য এই যে সব বড়ো বড়ো গাছ কাটা হবে, এটা খুবই খারাপ। এত গাছ কেটে ফেলা মানে অনেক অক্সিজেন কমে যাওয়া। আপনারা কি দূষিত নোংরা আর কালো হাওয়ার মধ্যে বাঁচতে চান? আমরা সক্কলে জানি, এ ভারি অন্যায়। গাছ মানেই অক্সিজেন। তাদের কেটে ফেললে পরিবেশ খুব দূষিত হয়। আপনারা দলে দলে আসুন, এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করুন। জনমত গড়ে তুলুন।”
গুটি গুটি পায়ে গিয়ে দোতলার জানলা দিয়ে নীচে তাকিয়ে দেখি, তিস্তু একটা বড়ো টুলের ওপর উঠে দাঁড়িয়েছে। হাতে একটা ব্যাটারি-চালিত হ্যাণ্ড মাইক। টুলটাকে গোল্লু শক্ত করে পাকড়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছে, যাতে তিস্তু হাত-পা ছুঁড়ে উত্তেজিত হয়ে বক্তৃতা করতে করতে পড়ে না যায়। তিস্তু আর গোল্লুর পাশে গম্ভীরমুখে বসে আছে চং। আশেপাশের পাঁচিলেও বেশ কয়েকটি মেনি এবং হুলোর জুলজুলে চোখ দেখতে পেলাম। চং যে ওদের হুমকি দিয়ে জমায়েতে নিয়ে এসেছে, বেশ বোঝা যাচ্ছে। নাঃ, ওদের বক্তৃতা শোনার জন্য কোথাও কোনও মানুষ নেই। রাস্তা দিয়ে যে দু-চারজন যাচ্ছেন, তাঁরা এক ঝলক তাকিয়ে দু-এক সেকেন্ড দাঁড়াচ্ছেন, আর ফিক করে হেসে বা গোমড়া মুখে কিংবা অত্যন্ত নিরাসক্ত ভঙ্গিতে হেঁটে চলে যাচ্ছেন। ওদের কথায় কেউ পাত্তা দিচ্ছেন না। কারও সময় নেই। আশেপাশের জানলা থেকে দু-চারটে রাগী আর বিরক্ত চোখ দেখা গেল। তারা ঠাঁই ঠাঁই শব্দ করে জানলা বন্ধ করে দিল। রাঙামাসি তো বিটকেল জোরে টিভিতে চালিয়ে দিলেন সিরিয়াল। যাতে ওদের কথা তাঁর কানে না যায়!
তিস্তু বেশ খানিকক্ষণ হাঁকডাক করল। তারপর মাইকের ব্যাটারি ফুরিয়ে যাওয়াতে ওরা মনমরা হয়ে চলে এল ঘরে।
“তোরা যা, হাতমুখ ধুয়ে পড়তে বোস এবার। এজন্যই বলি, মানুষ দিয়ে এই দেশের কিস্যু উন্নতি হবে না, বুঝলি। দেশের প্রয়োজন বিড়াল-শাসন। কথা না শুনলে মাসি-বোনঝি মিলে একেবারে টের পাইয়ে দেওয়া। আঁচড়ে, কামড়ে, ঘাড় মটকে চিবিয়ে… ব্যস।” চং দাঁত খিঁচিয়ে বলে। বলার সময় ওর রাগী চোখ, খাড়া গোঁফ আর ফুলে ওঠা রোঁয়া দেখে বান্ধবগড়ের জঙ্গলে মুখোমুখি দেখা চং-এর এক বোনঝির কথাই মনে পড়ে। সেবার ফিরে এসে চং-কে সেই বোনঝির ছবি দেখানোয় ওর কী ফূর্তি!
টুল ধরে উবু হয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গোল্লুর কোমর ব্যথা। সে এঁকেবেঁকে নানান ভঙ্গিতে স্ট্রেচিং করতে করতে বলল, “সত্যি ভাই, কারও কোনও হেলদোল নেই। যত মাথাব্যথা যেন আমাদের!”
আমি নীচে নেমে ওদের হট চকোলেট খেতে দিলাম এক গ্লাস করে। সঙ্গে একটু কুচো নিমকি আর জিবেগজা। আহারে! কতক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে… ওদের কষ্ট হয় না বুঝি?
“উফ, কতগুলো মশা খামোখা কামড়ে দিল।”
তিস্তু হাত-পা চুলকোতে লাগল, গোল্লু বলল, “খামোখা হবে কেন, মশারা মশাদের কাজ করেছে। ওদের আর দোষ কি!”
“কে জানে বাবা, ম্যালেরিয়া-ট্যালেরিয়াওলা মশা কি-না। হ্যাঁ রে চং, মশাগুলোকে ভালো করে লক্ষ্য করেছিলি? অ্যানোফিলিস, কিউলেক্স, এডিস… কিছু চিনতে পারলি?”
চং বলল, “আমি মশাদের মন দিয়ে দেখিনি রে, খুবই দুঃখিত। আগে বলে দিলে পারতিস, খেয়াল করতাম। তবে গোল্লু ঠিকই বলেছে। মানুষের চেয়ে মশা ভালো, নিজেদের কাজটা মন দিয়ে করে।”
“তোরা পড়তে বোস এবার। সন্ধ্যে গড়িয়ে গেল। এবার দিদা বকুনি দেবে।”
আমার মা আর আমার বড়োমাসি দুজনেই পুরনো আমলের ইস্কুল-দিদিমণি। একজন ছিলেন ইস্কুলের বড়োদিদিমণি, একজন ছিলেন অঙ্ক দিদিমণি। তাহলে বুঝতেই পারছ আমাদের ছেলেবেলা কেমন কেটেছে। তোমাদের বেলা ইস্কুলের নিয়মকানুন ইস্কুলে শেষ হয়। কিন্তু আমাদের বাড়িতে রক্ষে নেই, সেখানেও ইস্কুলের কড়া শাসন।
ওরা দুজন গোমড়া মুখে যে যার পড়ার টেবিলে চলে গেল। ভাবলাম বলি, “হবে জয় হবে জয়, ওহে বীর হে নির্ভয়…”কিন্তু এই মুহূর্তে ওদের এসব বিষয়ে মোটিভেশনাল স্পিচ দিয়ে লাভ নেই। পরে কথা বলে নেব।
চং গোঁজ হয়ে বসে রইল চেয়ারে।
“তোকে হট চকোলেট দেব চং?”
“নাঃ, আমার মন ভেঙেচুরে টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে। জোড়া লাগানোর মতো কিছু চাই। মাসি, তুমি বরং আমাকে চারটে ক্রিম বিস্কুট আর চারটে জ্যাম বিস্কুট দাও।”
ওকে পছন্দের বিস্কুট বের করে দিলাম। জোড়া বিস্কুট থাবা দিয়ে খুলে ফেলে তার থেকে একবার ক্রিম, একবার জ্যাম চেটে চেটে খেতে লাগল চং। এসব খাবার কায়দা ওকে তিস্তু আর গোল্লু শিখিয়েছে। ওভাবে বিস্কুট খুলে জিভ দিয়ে চেটে খেতে দেখলেই আমার মা বকবে। আমি আড়চোখে তাকিয়ে দেখি, মা চারদিকে কোথায় আছে। ঘড়িতে ছ-টা বাজে। এখন বোধহয় পুজোর ঘরে। সন্ধেবেলা ধূপকাঠি জ্বেলে সেখানে বসে খানিকক্ষণ রবীন্দ্রনাথের গান করবেন। তারপর এসে চা খেয়ে গীতা খুলে বসবেন। সকালে গীতবিতান, সন্ধেবেলা গীতা। মায়ের প্রিয় বই। ওই সময় মায়ের মুড ভালো থাকে।
খেতে খেতে চং বলল, “এভাবে হয় না, বুঝলে মাসি। আমরা যতই চেষ্টা করি না কেন, আমাদের কথা কেউ কানে তুলবে না। সবাই আসলে বড্ড স্বার্থপর হয়ে যাচ্ছে। অথচ কোভিডের সময় কী কাণ্ড হল বলো দেখি। কী ভয়ানক সব অসুখবিসুখ। তখন চারদিকে ভয় আর ভয়। পরিষ্কার থাকো, হাত-পা ধোও, ফ্যাঁচ করে স্যানিটাইজার লাগাও, মাস্ক পরো। তিস্তু তো আমাকে দেখলেই থাবায় স্যানিটাইজার লাগিয়ে দিত। মাস্কটা কেবল আমি ঠিক করে পরতে পারিনি। কান থেকে ফস করে খুলে যেত। তেমন এটাও ঠিক, পশু-পাখিদের তো এমন অসুখ হয়নি। মারাত্মক অসুখে দমবন্ধ হয়ে শুধু ভুগেছে সব মানুষগুলো। কিন্তু একবার ভাবো, সেই সময় সামান্য একটু এদিক-সেদিক হল কি হল না, বাপরে! চারদিকে সব যায়-যায় অবস্থা। নিঃঝুম রাস্তায় শুধু অ্যাম্বুলেন্সের আওয়াজ। তারপরেও কারও এতটুকু শিক্ষা হল না।”
আমি চুপ করে রইলাম। কী-ই বা বলি! কথাটা একদম ঠিক। ছেলেমানুষ বয়সীরা যদি-বা বোঝে, বড়োমানুষেরা যদি একেবারে পাত্তা না দেন, তাহলে যা-হবার তা-ই হবে। আমাদের জীবনটা তো রুপোলী পর্দার ছায়াছবি নয় যে চং-তিস্তু-গোল্লু মিলে চারপাশে হইচই জমিয়ে একটা ওলটপালট করে ফেলবে। আমরা কেউ ম্যাজিক জানি না। পরিবেশ নিয়ে কারও কোনও মাথাব্যথা নেই। আর আমাদের পাড়ার লোকেদের কথা তো আগেই বলেছি তোমাদের। তবে হ্যাঁ, তিস্তু আর গোল্লু হাল ছাড়েনি। চিঠিপত্র লেখা হল প্রচুর। কাউন্সিলর, থানা, পরিবেশ দপ্তর, খবরের কাগজ… যে যেভাবে পারি চিঠি লিখলাম। ফেসবুকে লেখা-টেখা হল। যতদূর সম্ভব সকলকে জানানো হল।
গাছ কাটা পুরোপুরি বন্ধ করা গেল না। কিন্তু খানিকটা আটকানো গেল।
নালার ধারের বড়ো কিছু গাছ ধীরে ধীরে কাটা হয়ে গেল। অল্প কিছু রইল। এখন রাস্তা চওড়া। হুস হুস করে গাড়ি যাচ্ছে। গাড়ির তেলের ধোঁয়া মিশছে বাতাসে। শুকনো ধুলো উড়ছে। ধুলো-ধোঁয়া কার্বন ডাই-অক্সাইড ভর্তি রাস্তায় মুখে মাস্ক পরে হাঁটি। রাস্তার পাশে বড়ো টব বসিয়ে কিছু গাছ লাগানো হয়েছে। আর অন্য সময় নিজেদের বাগানে, নিজেদের ছাদে, বাড়ির জানালায় আরও আরও অনেক গাছ লাগাই। জল দিই। ওদের ফিরিয়ে দেওয়া অক্সিজেনের জন্য ওদের কাছে ঋণী থাকি। ওদের পাশে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে বলি, ভালো থাকো, ভালো রাখো।
ছাদ-বাগানে একদিন পিকনিক করা হল। তিস্তু-গোল্লুর বন্ধুরা এল। গাছপালা চেনার খেলা হল কিছুক্ষণ। তাদের পাশে চং ভদ্র-সভ্য ভিজে বেড়াল সেজে বসে রইল।
বন্ধুরা হইচই করে চলে যাওয়ার পর চং বলল, “বুঝলি গোল্স, তোদের বন্ধুদের নিয়ে এসে রাস্তার ধারে জমায়েত করলে বোধহয় এতগুলো গাছ কাটা পড়ত না।” অন্য সময় ‘গোল্স’ ডাকতে শুনলে গোল্লু ক্ষেপে গিয়ে বলে, “বডি শেমিং করবি না চং। ভালো হবে না। জানিস না, মোটাকে মোটা, রোগাকে রোগা, লম্বাকে লম্বু, গোলকে গোল্লু বলতে নেই?”কিন্তু এদিনটা অন্যরকম। চঙের কথায় রেগে গেল না গোল্লু। বরং ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল একটা।
“যাই, গিয়ে এনভায়রনমেন্টাল স্টাডিজের প্রজেক্ট করি। অ্যান্টার্কটিকায় ওজোন হোল ভবিষ্যতে কী কী করলে কতটা কমতে পারে। জটিল সব বিষয়। আর তিস্তু রে, তুই বরং পড়েশুনে এনভায়রনমেন্টাল ল-ইয়ার হোস। যদি পৃথিবীটা বাঁচানো যায়।”
তিস্তু গেয়ে উঠল, “চল চল চল…”দেখলাম তিস্তু গোল্লু গলা মিলিয়ে গাইছে, ‘নিম্নে উতলা ধরণীতল, অরুণ প্রাতের তরুণদল, চল রে চল রে চল’। চং পিছন পিছন চলল, সে-ও সুর মিলিয়ে বলছে, ‘চল চল চল’।
এই পর্যন্ত পড়ে তোমরা হতাশ হয়ে গেলে? উঁহু! খুব বড়ো বড়ো আর ভালো কাজ করতে গেলে এমন বাধা একটু-আধটু আসে। এতে অমন ভেঙে পড়লে চলে?
৩
চং এবং বাংলা
চঙের দৃঢ় বিশ্বাস আমাদের বাড়িতে গুপ্তধন আছে। ওই দেখো, গুপ্তধনের নাম শোনামাত্র সব তিড়িং করে লাফিয়ে উঠলে যে! আরে দূর, আমাদের বাড়িটা বানানো হয়েছে এই ধরো পঁয়ত্রিশ কি চল্লিশ বছর আগে। তখন এখানে চারদিকে শুধু ধানক্ষেত। লোকাল ট্রেন চলে যাওয়ার আওয়াজ পাওয়া যেত স্পষ্ট। অনেক দূরে দূরে একটা কি দুটো ছোটো একতলা বাড়ি। এসব ধানক্ষেতে কেউ কখনও গুপ্তধন লুকিয়ে রাখে? গরিব মানুষদের গুপ্তধন হল তাদের পরিশ্রম আর সততা। সেসব মাটির নীচে পুঁতে রাখতে হয় না।
সেই কালে ওই নীচু জলাজমিতে মাটি ফেলে উঁচু করে ভিত তুলে বাড়ি বানানোর এতদিন পরে গুপ্তধন দূরস্থান, খুঁড়ে-টুড়ে পাথর আর রাবিশ ছাড়া একখানা সিকি বা আধুলিও পাওয়া যাবে না। ভালো কথা, তোমরা ‘সিকি’ আর ‘আধুলি’ জানো? ‘চার আনা’, ‘আট আনা’? এগুলো এখন পাওয়া যায় না ঠিকই। কিন্তু টাকাপয়সার এই পুরনো হিসেবটা না জানলে বড়োদের একবার জিগ্যেস করে নিও। জেনে রাখতে ক্ষতি কি!
সে যাক। যে কথা বলছিলাম। তোমরা গুপ্তধন রহস্য অ্যাডভেঞ্চার ভূত যতই ভালোবাসো না কেন, হাজার চেষ্টা করলেও আমাদের বাড়িতে ওসব পাবে না। আমি মাঝেমধ্যে তোমাদের জন্য যা লিখিটিখি, সব বসে বসে বানিয়ে বানিয়ে লিখি।
কিন্তু চং হল এক আশ্চর্য প্রাণী। অত্যন্ত কল্পনাপ্রবণ। তার একদিন মনে হোল, আমাদের বাড়ির ঈশান কোণে একটা অস্বাভাবিক কাণ্ড ঘটছে। ঈশান কোণ চেনো তোমরা? ঈশান কোণ হোল উত্তর আর পূবদিকের ঠিক মাঝখানের অংশ। সেইদিকে নাকি থরথর করে মাটি কাঁপছে। আচ্ছা, ভাবো একবার। বাগানের এক কোণে যেখানে চমৎকার একটি শিউলি গাছ আর তার চারধারে অপূর্ব গন্ধওলা হাস্নুহানা ফুলগাছের ঝাড়, শুধু সেইটুকু জায়গায় হঠাৎ হঠাৎ মাটি কাঁপতে যাবে কোন দুঃখে?
তিস্তু একদিন সারা দুপুর ধরে চং-কে ভূমিকম্পের কারণ ইত্যাদি পড়াল। ছবি-টবি দেখাল। আমি বেশ জানি, চং চোখ আধবোজা অবস্থায় ঝিমোচ্ছিল, ওদের কথা কিচ্ছু শোনেনি। বিকেলবেলা গোল্লু গিয়ে দেখল ওইখানে ইঁটের আড়ালে একটা বড়োসড় গর্ত, সে গর্তে দিব্যি সেঁধিয়ে গেল পর পর দু-খানা ধেড়ে ইঁদুর।
“ওই দেখ, ইঁদুরেরা সপরিবারে গর্তে ঢুকছে আর বেরোচ্ছে। তাদের দেখে আমাদের বীর বেড়াল চং সেই ভয়ে ঠকঠক করে কাঁপছে। কোনও মানে হয়?”
“ওই হল ওর মাটি কাঁপা! ভাবা যায়? ইঁদুরের আসা-যাওয়ায় মাটি কাঁপছে?”
“আর ইঁদুরের ভয়ে বেড়াল কাঁপছে! হি হি হি হি!”
“চং ক্রমশ শান্তিপ্রিয় হয়ে উঠছে। আমাদের বাড়িতে ক-দিন পর ইঁদুরে-বেড়ালে এক বাটিতে মাছ-ভাত খাবে।”
তিস্তু আর গোল্লু হেসে কুটোপাটি।
চং ওদের হাসাহাসিতে পাত্তাও দিল না। পাশের গলির নতুন ফ্ল্যাটবাড়ির একতলায় দুটো যমজ ছেলে-মেয়ে ওকে দুদিন ডেকে আমোদী মাছ ভাজা খাইয়েছিল। ও লাফিয়ে তাদের বাড়ির পাঁচিলে গিয়ে উঠে বসল।
তিস্তু আর গোল্লু আরও হাসল, গোল্লু ফিসফিস করে বলল, “দেখ, ওদের বাড়িতে লোভীর মতো বাসি মাছভাজা খেতে চলে গেল, তবু নিজে ভিতু সে-কথা স্বীকার করবে না।”
তিস্তু বলল, “চং কিন্তু প্রায়ই আজকাল রহস্য আর ভূতের গপ্পো শুনতে চায়। ওসব শুনেটুনে ওর ওই অবস্থা। দিনরাত সব জায়গায় গুপ্তধন আর অ্যাডভেঞ্চার খুঁজছে।”
“নির্ঘাৎ সারাক্ষণ পচা পচা অডিও স্টোরি শুনছে, “গোল্লুর গম্ভীর মতামত।
“তোর জন্য। এগুলোর জন্য তুই-ই দায়ী। তুই নিশ্চয়ই গেলাচ্ছিস ওগুলো।”
গোল্লু হাঁ হাঁ করে ওঠে, “মোটেই না, আমি কখন অডিও স্টোরি শুনলাম? আমি সরাসরি বই পড়ি। নাহলে মা কান টেনে ছিঁড়ে পচা নর্দমার জলে ছুঁড়ে ফেলে দেবে। আমি এক কানকাটা হয়ে থেকে যাব। কিন্তু শোন ভাই, আমি চং-কে কমিকস বইয়ের পাতা উলটোতে দেখেছি একদিন।”
“হুম। বুঝেছি। শোন, ওকে হাঁদা-ভোঁদা, বাঁটুল, নন্টে-ফন্টে কেল্টুদা ছাড়া কিচ্ছু দিবি না।”
গোল্লু খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “আমি তাহলে রাপ্পা রায়ের কমিকসটাও এবার থেকে চুপি চুপি পড়ব। ওর সামনে খুলে রাখব না।”
“রাপ্পা রায় পড়ুক, অসুবিধে নেই। বরং সুযোগকাকুকে বললে পরের রাপ্পা সিরিজে চং-এর কথাও এঁকে-টেকে লিখে দেবে নিশ্চয়ই। কিন্তু বইয়ের ক্ষেত্রে ওকে লীলা মজুমদার আর সত্যজিৎ রায়ের বাইরে এখন আর কিছু পড়ে শোনাস না। মাথার মধ্যে সব ঘেঁটে ফেলবে।”
“না না, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের অদ্ভুতুড়ে সিরিজের গল্পগুলো মা যখন পড়ে শোনায়, ও খুব মজা পায়।”
“যা-ই বলিস, চঙের মতো একটা শিক্ষিত বেড়াল কিন্তু আমাদের গর্ব, তাই না?”
“হ্যাঁ, সে তো বটেই।”
তিস্তু আর গোল্লুর আলোচনা শুনে ওদের নিজের ঘরে ডাকি, “ওরে তোরা নিজেরা যা-ও বা বাংলা পড়িস, আশেপাশে আর কি তেমন কাউকে দেখতে পাস যে বাংলা গপ্পো-টপ্পো পড়ছে?”
“নাঃ, ইস্কুলে সবাই ফার্স্ট ল্যাঙ্গুয়েজ ইংরিজি, সেকেন্ড ল্যাঙ্গুয়েজ হিন্দি আর থার্ড ল্যাঙ্গুয়েজে ফরাসি কিংবা জার্মান ভাষা পড়ে। বাংলা কেউ কিচ্ছু পড়ে না।”
অ্যাঁ! সে কি রে! খুবই খারাপ ব্যাপার। কিন্তু এসব আমি ভেবে কী করব? আমার কী-ই বা করার আছে? জনে জনে গিয়ে বলে বেড়াব আপনি বাংলা পড়ুন, বাড়ির শিশুদের বাংলা পড়ান—লোকে খামোখা আমার কথা শুনবে কেন? বরং পালটা জিগ্যেস করবে, বাংলা গপ্পো পড়ে হবেটা কি!
আমি বললাম, “আচ্ছা, আমরা তো ছোটোবেলা ইস্কুলের লাইব্রেরি থেকে কত কী বইপত্র এনে পড়তুম। আমাদের একেবারে একটা গোটা পিরিয়ড থাকত। সপ্তাহে একদিন। লাইব্রেরি পিরিয়ড। তোদের এমন কিছু নেই? তোরা পড়িস না?”
গোল্লু ঘাড় নাড়ল, “নাঃ, লাইব্রেরিতে বসে জেনারেল নলেজ পড়া হয়। অন্য বই-টই পড়া হয় না।”
“কী আর করা যাবে। গপ্পো লিখে-টিখে লাভ নেই কোনও, বুঝলি? কেউ আর তোরা পড়বি না, আমি খামোখা খানিক সময় নষ্ট করছি বোধহয়।”
চং কোত্থেকে আলোচনার মধ্যে চলে এসেছে, যেমন আসে প্রতিবার, সে বলল, “এ বাবা! এসব ভেবো না মাসি, তুমি কেন লেখা ছাড়তে যাবে? তার চে’ তুমি বরং একটা বাংলা শেখার কেলাস শুরু করো। পুঁচকেরা আসবে, বাংলা ছড়া বলবে, কবিতা আবৃত্তি করবে, উচ্চারণ শিখবে, গল্প লিখবে, চেঁচিয়ে বাংলা বই-টই পড়বে…”
“হুম। কথাটা কিন্তু মন্দ বলিসনি। দাঁড়া, ভেবে দেখি।”
ভেবে দেখা শুধু নয়। করে দেখানোর জন্য নেমেও পড়লাম।
আসলে বাংলা নিয়ে আমার মনে একটা হালকা চিনচিনে ব্যথা আছে। বাংলা পড়তে চেয়ে বড়ো হেনস্থা হয়েছিলুম বাড়িতে। সকলে মিলে বলেছিল, বাংলা নয়, বিজ্ঞান পড়তে হবে। সে-কালে আমরা বড়োদের মুখে মুখে তক্কো করতাম না বাপু। আমাদের অত কেরিয়ার চয়েস বা হায়ার স্টাডি অপশন বলেও কোনও বস্তু ছিল না। বাড়ির বড়োরা যা বলছেন, তাকে চোখ-কান বন্ধ করে মেনে চলতে হবে। ব্যস। অত মতামত কিসের অ্যাঁ!
সে ছিল একরকম। এখন আরেকরকম। দুটোই ভালো। তখনও যা হোত, ভালোই হোত। এখনও যা হয়, সব ভালোই হয়।
আমার সব কাজে মূল উৎসাহদাতা চং, সহকারী তিস্তু আর গোল্লু। যথারীতি আবার পোস্টার। গোল্লুই একটা রঙিন পোস্টার বানিয়ে দিল। আমাদের বাড়ির দেওয়ালে, গলির মোড়ে বুদ্ধদার পানের দোকানে, সমীরের এগ-রোলের দোকানে, পঞ্চুদার মুদি-দোকানে, সীমা মেডিক্যাল স্টোর্সের বাইরে, এমনকি লক্ষ্মীনারায়ণ মিষ্টান্ন ভাণ্ডারেও পোস্টার সাঁটিয়ে এল তিস্তু আর গোল্লু। ‘এসো বাংলা পড়ি, বাংলা বলি, বাংলা শিখি’। অনলাইন আর সামনাসামনি দু-রকম ব্যবস্থা রইল। যোগাযোগের নম্বর হিসেবে আমার ফোন নম্বর দেওয়া। তিস্তু আর গোল্লু মিলে ফেসবুক ইন্সটাগ্রাম আর কোথায় কোথায় সব দিল। কিছুদিন নিজের জটিল লেখালেখি সরিয়ে রাখব ভাবলাম। কচিকাঁচারা আসুক। ওদের সঙ্গে বসে একটা অভিজ্ঞতা হবে। ওরা কী চায়, কেমন গল্প ওদের পছন্দ। তারপর লিখব না-হয়।
প্রথম ফোন এল।
একজন কাকু-জেঠু গোছের হেঁড়ে গলা।
“হ্যালো, আপনি কি বাংলা পড়ান?”
আমি চিরকাল একটু জোরে কথা শুনলেই সিঁটিয়ে যাই। কুঁ কুঁ করে বললাম, “হ্যাঁ, ওই আর কি!”
“ওই আর কি মানেটা কী? পড়ান, না-কি পড়ান না?”আরও জোরালো গলা।
হেঁড়ে গলায় ধমক শুনে বেশ ভয় পেয়ে গলা কেঁপে একশেষ। ঢোঁক গিলে বলি, “আজ্ঞে হ্যাঁ, পড়াই।”
“কোন ক্লাস?”
“যে কোনও ক্লাস।”
“অ। আমার ছেলে নাইন থেকে টেনে উঠবে বলে মনে হয়। পড়াবেন?”
“নিশ্চয়ই পড়াব, কেন পড়াব না?”সবেধন নীলমণি এক প্রথম ছাত্র আসছে শুনে ফূর্তি হয় প্রাণে। জিগ্যেস করতে ভুলে যাই, ‘নাইন থেকে টেনে উঠবে বলে মনে হয়’ বাক্যটিতে বক্তা কী বোঝাতে চেয়েছেন। যদি সে টেনেটুনে ক্লাস টেনে না ওঠে, তাহলে কি সে আর বাংলা পড়তে আসবে না?
তিনি আমার নাম ঠিকানা বাড়ি পৌঁছনোর রাস্তা সব জেনে নিলেন। আমি ‘ত্রাহি মধুসূদন’ জপতে লাগলুম।
‘ত্রাহি মধুসূদন’ মানে জানো নিশ্চয়ই। মধুসূদনদাদার কাছে একটু ভরসা চাইলুম।
দ্বিতীয় ফোন এক মহিলার। ততক্ষণে আমি ধাতস্থ।
“আপনি পড়ান শুনলাম। তা’ আমার ছেলেকে একটু পড়াবেন? সে কিন্তু একেবারে বাংলা লিখতে জানে না। ধরুন ওই অ-আ-ক-খ’ থেকেই শেখাতে হবে, “গড়গড়িয়ে বলে গেলেন তিনি।
“সে কি! কোন ক্লাস?”
“সবে ফাইভে উঠেছে।”
“সে কি! অ্যাদ্দিন তাহলে কী করল?”
“সেসব হয়ে গেছে ওই একরকম করে। জেনে লাভ নেই। বাদ দিন। শুনুন, সিক্স থেকে আর বাংলা-টাংলা নেই। ততদিন একটু চালিয়ে দিন।”
‘বাংলা-টাংলা’ শুনে প্রথমে দাঁত কিড়মিড় করি, তারপর সামলে নিই নিজেকে। আহা! একবার আসুক পড়তে, বাংলায় এত গল্প-টল্প বলব, সে আর বাংলা ছাড়তেই চাইবে না।
ফোন চলতে থাকল। শেষ পর্যন্ত সর্বসাকুল্যে গুটিচারেক ছাত্র-ছাত্রী এসে পৌঁছল। কয়েকদিন ধরে গাদাগুচ্ছের যেসব ফোন এল, তাতে কেউ জানতে চান আমি কোন ইস্কুলে পড়াই। কেউ জানতে চান আমি সপ্তাহে ক-দিন ক-ঘণ্টা পড়াব। কেউ জানতে চান আমি আদৌ বাংলার দিদিমণি কি-না। কেউ জানতে চান আমার কোচিং ক্লাসে ক-জন ছাত্র। কেউ জিগ্যেস করেন আমি তাদের বাড়িতে গিয়ে পড়াব কি-না। আমি প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে রীতিমতো ক্লান্ত। এবং একটু বিরক্ত।
আমার মা, মানে তিস্তু গোল্লু এবং তোমাদের দিদা, যিনি নিজে ছিলেন ইস্কুলের কড়া দিদিমণি, তিনি পর্যন্ত একদিন সকালে আমাকে ডেকে বকাবকি করতে লাগলেন।
“হ্যাঁ রে, তুই শুনলাম বাংলা পড়াবি। তুই কি পারবি? তুই নিজে তো একটু-আধটু কীসব লিখিস-টিখিস। দু-চারটে গপ্পো লিখলেই কি কেউ একটা ভাষার সব জেনে ফেলতে পারে? অ্যাঁ! কচি ছেলেপিলেগুলোর ভবিষ্যৎ বলে কথা। এত বড়ো দায়িত্বটা না নিলেই নয়? দিব্যি তো হাবিজাবি লিখছিস, কেউ কেউ পড়ে। অধিকাংশ লোকই পড়ে না, ভালোই করে। কিন্তু এই জ্ঞান নিয়ে বাচ্চাদের একটা ভাষা শেখানো… তোর তো কিছুই মনে নেই। সন্ধি সমাস প্রত্যয় অনুসর্গ উপসর্গ… আদৌ মনে আছে কিছু?”
“হ্মাঃ, “কাঁদো কাঁদো মুখে চেঁচিয়ে উঠি, এখনও মায়ের মুখে মুখে তর্ক করি না, ঘ্যানঘেনে গলায় বলি, “দেখো মা, ভালো হচ্ছে না কিন্তু! তুমি ওসব গপ্পো-টপ্পো আর কী কী সব বলছ, খুউব অপমানিত লাগছে আমার! আর তাছাড়া, গোল্লুকে তো বরাবর আমিই পড়াই, পড়ালাম এতদিন। তার বেলা?”
মাতৃদেবী আমার শব্দগুলোকে যেন বড়ো একটা ফুঁ দিয়ে হাওয়ায় উড়িয়ে দিলেন, ওই তোমরা যেভাবে মেলায় গিয়ে সাবানজলের বুদবুদ ওড়াও, ঠিক সেইভাবে।
“নিজের মেয়েকে তুমি নিজে পড়াবে না তো পড়াবে কে শুনি? তাহলে নিজে শিখলে কী?”আচ্ছা, তোমরাই বলো, এটা আমাকে পালটা চাপ দেওয়া নয়? এদিকে মা তো থামছেন না, তাঁর ছুটলে কথা থামায় কে?”রাখো বাপু তোমার মান-অপমান। আজকালকার ছেলেমেয়েদের বাংলা পড়াচ্ছ, ভেবেই আমার হৃৎকম্প হচ্ছে। ভাষাটা তারা এমনিই ভুলতে বসেছে, তোমার পাল্লায় পড়ে আরও ভুলে না যায়, “মায়ের গলা গম্ভীর, চোখ রাগী-রাগী। আমি পিন-ফুটিয়ে চুপসে দেওয়া বেলুনের মতো বসে আছি। কী মুশকিল, আমি কি একটু বাংলাও পড়াতে পারব না?
মায়েরা অমন বকাবকি করে থাকেন, সেসব নিয়ে ঘাড় গোঁজ করে বসে থাকলে চলে না। আমি বরং তেড়েফুঁড়ে উঠে ভাবলাম সকলকে এবার দেখিয়ে দিতে হবে, বাংলা ক্লাস কাকে বলে। বেশ জমিয়ে ক্লাস করাব, যাতে ছেলেমেয়েরা দেদার মজা পায়। ক্লাসে এসে আনন্দ পেলে, সেই বিষয়টা ওরা আরও ভালোবেসে ফেলবে। তাই না? সেইসব ভেবেচিন্তে অনেক কিছু করাব ঠিক করলাম। ছড়া লেখাব, গল্প লিখতে দেব, কবিতা বলাব, উচ্চারণ শিখবে, সঠিক বানান জানবে। নাটক-নাটক খেলা হতে পারে। ঘরে একটা বড়ো স্ক্রিন টাঙিয়ে মাঝেমধ্যে ভালো ছবি দেখানো যেতে পারে। মাথার মধ্যে গিজগিজ করছে কত রকমের পরিকল্পনা। আমার একমাত্র ভরসা চং। তার উৎসাহের শেষ নেই। আগেভাগে সে নিজে নানারকম ছড়া শিখে বলতে শুরু করল। সকালে শুনি গলা ছেড়ে বলছে, ‘সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি/ সারাদিন আমি যেন ভালো হয়ে চলি’। একটু বেলা গড়াতেই আমাকে এসে গুনগুন করে বলে গেল, ‘আদেশ করেন যাহা মোর গুরুজনে/ আমি যেন সেই কাজ করি ভালো মনে’। টুক করে একফাঁকে গোল্লুর জানলার সামনে গিয়ে হাঁক পেড়ে বলে এল, ‘ওঠো শিশু মুখ ধোও, পরো নিজ বেশ/ আপন পাঠেতে মন করহ নিবেশ’। গোল্লু তো তেড়েফুঁড়ে উঠে ওকে এই মারে কি সেই মারে।
“ইস! সাতসকালে এসে কানের কাছে কবিতা বলা হচ্ছে। বল দেখি এই কবিতাটা কার লেখা? তবে বুঝব তোর ক্ষমতা, “গোল্লুর কথায় চং ফ্যাক করে হেসে বলল, “হেঃ, আমি তোদের মতো সিলেবাস বেছেবুছে পড়ি না, যা পাই সব মন দিয়ে পড়ি। এই কবিতাটা তিস্তু আমাকে শিখিয়েছে, আমি পুরোটা মুখস্থ করেছি। এটা মদনমোহনবাবু বলে একজন পণ্ডিত মানুষ লিখেছেন। তাঁর পদবী জানিস? পদবী হল তর্ক যুক্ত অলঙ্কার। মানে সন্ধি করলে হয় তর্কালঙ্কার।”
গোল্লু একবার ঢোঁক গিলল। কারণ মদনমোহন তর্কালঙ্কারের পুরো নামটা ওরই মনে পড়ছিল না। তার ওপর সন্ধি-টন্ধি ও একেবারে জানে না। গোল্লুকে চমকে দিয়ে চং নীচের জানলায় আমার কাছে রোজকার বরাদ্দ দুধ খেতে এল। খেতে বসে দুলে দুলে বলতে লাগল, ‘আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে/ কথায় না বড়ো হয়ে কাজে বড়ো হবে’। আমি একবার মায়ের দিকে তাকালাম। মা মন দিয়ে খবরের কাগজ মুখস্থ করছেন। ভাগ্যিস আমার মা ওর কথা শুনতে পান না, শুনতে পেলে খুবই প্রশংসা করতেন, সন্দেহ নেই। তিনি এরকম কত কিছু আমাদের বলতেন এককালে; বলতেন, ‘পারিব না একথাটি বলিও না আর/ কেন পারিবে না তাহা ভাবো একবার….একবার না পারিলে করো শতবার’। এসব উপদেশের কিছুই আমি মনে রাখিনি বলে বিস্তর বকুনি শুনি আজকাল। আজ্ঞে হ্যাঁ, আমার মা আমাকে এখনও নিয়ম করে বকেন এবং আমি সেই সব কথা চুপচাপ শুনি। তোমাদের মতো বাবা-মায়ের বকাবকি শুনে ঘাড় গোঁজ করে মুখ গোমড়া করে বসে থাকি না। আর ‘জেনারেশন গ্যাপ’ বলে লাফালাফি করি না।
তোমরা নিশ্চয়ই জানতে চাইবে, আমাদের বাড়ির নতুন বাংলা ক্লাসটা কেমন। তোমাদের বলি, ক্লাসটা বেশ ভালো। বাংলা বানান, বাংলা ব্যকরণ, বাংলা বাক্য গঠন সব মিলিয়ে বেশ হইহই কাণ্ড। ক্লাসের সর্বসাকুল্যে জনাচারেক ছাত্র-ছাত্রী। তারা নানান বয়সের। সবচেয়ে ক্ষুদেটি ক্লাস ফাইভ। নাম সৌপ্তিক। সবচেয়ে বড়োজন ক্লাস নাইন। তার নাম সায়ন্তন। বাকি দুজন রঞ্জিনী আর সুচেতনা। বাংলা তারা কে কতটা জানে, প্রথমদিন দেখেই বলা মুশকিল, কিন্তু প্রত্যেকের নামের বাংলা বানান বেশ কঠিন। তারা প্রথমদিন একটু প্যাঁচার মতো মুখ করে এসে বসেছিল। তিস্তু তাদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে গেল, গোল্লু ঘরে ঢুকে হাসিমুখে ‘বাংলা ভাষা জানা কেন জরুরি’ বিষয়ে একটা ছোটোখাটো বক্তৃতা দিতে শুরু করল।
“ওরে, তোরা ভাবিস না এটা খুব জটিল আর কঠিন সাবজেক্ট। মনে রাখিস আফটার অল, এটা আমাদের মাদার টাং, মানে ওই মাতৃভাষা। আমরা রেগুলার এই ভাষায় কথা বলি, কাজেই নো চাপ। আর তাছাড়া আমার মা খুব চিল করে পড়ায়। অ্যাট লিস্ট আমাকে সেভাবে পড়িয়েছে। তোদের একটুও বোরিং লাগবে না। একটা জিনিস, ইউ শুড রিমেমবার, অন্য সব কান্ট্রি তাদের নিজেদের ল্যাঙ্গুয়েজ নিয়ে খুব প্রাউড, মানে গর্বিত আর কি। তারা নিজেদের ভাষাকে যথেষ্ট রেসপেক্ট, মানে সম্মান করে। আমাদের এই ব্যাপারটা ভাবতে হবে। যাকগে, বেশি ভাবিস না। মা হেব্বি পড়াবে। ইউ উইল রিয়েলি এনজয় দিস ক্লাস…”
“এই থাম থাম, “আমি চেঁচিয়ে উঠি, “একটা বাংলা বাক্য পুরোটা ঠিক করে বল, “বাংলা ক্লাস শুরুর আগে কীসব বিজাতীয় ভাষায় জ্ঞান দিয়ে চলে গেল! কোনও মানে হয়? নতুন পড়তে-আসা ছেলেপুলেরা ওর ভাষণ শুনে একটু নড়েচড়ে বসল। আমিও গোল্লুর ভাষণ সামলে নিয়ে প্রথমদিন তাদের একটা দমফাটা হাসির গল্প বলতে শুরু করলাম। দূর থেকে দেখলাম, ঘরের কোণে চং ধীরে ধীরে এসে চুপটি করে বসে পড়ল। বাচ্চারা যতটা না গল্প শুনল, তার চেয়ে বেশি খুশি হল চং-কে দেখে। ক্লাসের মধ্যে ফিসফাস চলতে লাগল।
“কী ভদ্র বেড়াল, দেখেছিস?”
“হ্যাঁ, আর কেমন গোল গোল চোখ করে শুনছে দেখ… যেন কত বোঝে।”
“ওর চোখটা কি কিউট না?”
“আমার তো ভীষণ চটকাতে ইচ্ছে করছে।”
আমি তো শুনি আর মুচকি মুচকি হাসি।
গল্প শেষ করে বললাম, “তোমাদের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিই, ও হোল চং, “আমি বলামাত্র চং একটা মিষ্টি গলায় বলল, “মিঁইয়াও, “আমি স্পষ্ট শুনলাম চং বলছে, “সুস্বাগতম প্রত্যেককে।”
সৌপ্তিক রিনরিনে গলায় বলে উঠল, “মিউ মিউ মিউ, “রঞ্জিনী হাত নেড়ে বলল, “আয় আয় আয়, “চং-কে নিয়ে একটা হইচই শুরু হয়ে গেল। চং নিরাপদ দূরত্বে বসে বসে ওদের সকলের দিকে তাকিয়ে যথাসাধ্য ওর ভাষায় ‘হ্যালো হাই’ করতে লাগল। আমি স্পষ্ট শুনলাম, রঞ্জিনীকে বলছে, “তোর ফুলছাপ জামাটা ভারি সুন্দর, “সৌপ্তিককে বলল, “তোর লাল লোমশ ব্যাগটা কী ভালো রে!”সায়ন্তন আর সুচেতনা ওর পিঠে হাত বোলানোর জন্য ব্যস্ত হয়েছিল বলে ‘গররর ফ্যাঁশ’ করে সরে গেল, আমি মুচকি হাসলাম। কারণ, চং বলছিল, “অ্যাই, ওই নোংরা হাতে খরদার আমাকে ধরতে আসবি না বলে দিলাম।”
চং আমাদের বাংলা ক্লাসের এক অন্যতম আকর্ষণ হয়ে উঠল। প্রথম প্রথম সে ক্লাস চলাকালীন ঘরের বাইরে জানলার রেলিং ঘেঁষে বসছিল। যখন বুঝল, বাচ্চারা সকলে তাকে বেশ পছন্দ করছে, সে ঘরে ঢুকে এক কোণে গুছিয়ে বসল। সে প্রত্যেকের দিকে তাকায়, নানারকম মুখভঙ্গি করে, কখনও বলে মিঁইয়াও, কখনও ম্যাঁও, কখনও মিঁউ মিঁউ। কখনও শুধু জিভ বের করে ঠোঁট চাটে বা ল্যাজ নাড়ায় কিংবা গাল-গলা চুলকোয়। তার ভাষা বুঝি কেবল আমি, সে হয়ত বলছে, “মাসি, আবার বলো, “কিংবা বলছে, “মাসি, এবার থামো”, “মাসি, আজ পড়া ধোরো না”, “মাসি ওই দেখো, সৌপ্তিক কিন্তু কিচ্ছু বুঝল না, অন্যদিকে তাকিয়ে আছে।” আমিও ওর কথামতো চলি।
বাচ্চারা ক্লাসে বসে ছন্দ মিলিয়ে ছড়া লিখতে শুরু করল। আমিই শেখালাম। আঙুলের কড় গুনে গুনে ছন্দ মেলানো হল। ইস্কুলের পাঠ্য বইয়ের কবিতাগুলো পড়তে পড়তে সে কি উত্তেজনা। এবার ছড়া হোক। ইস্কুলের বইয়ে লেখা কবিতা পড়ার পরে নিজেদের লেখা কবিতা নিয়ে ওদের সে কি হইচই! ধান-এর সঙ্গে গান, কাঠি-র সঙ্গে লাঠি, ছাতা-র সঙ্গে হাতা, কই-এর সঙ্গে বই মিলিয়ে যা এক-একখানা ছড়া তৈরি হল, সে আর বলার নয়। সবচেয়ে উৎসাহী সেই ক্লাস ফাইভের সৌপ্তিক, যে কি-না ক-দিন আগে অবধি ভালো করে বাংলা লিখতে জানত না। সে ছানাটি তো প্রথমে চং-কে নিয়ে চমৎকার ছড়া লিখে ফেলল।
এক যে আছে মিষ্টি মেনি/ নাম হোল তার চং।
বাংলা ক্লাসটা শেষ করলেই/ ঘণ্টা বাজায় ঢং।
রঞ্জিনী লিখল,
চং-কে আমি ভালবাসি/ চং আমাকে বকে,
আমি যখন গল্প বলি/ ও আমাকে ডাকে।
‘বকে’ আর ‘ডাকে’ নিয়ে নিজেরা ঝগড়া করল খানিকক্ষণ। সৌপ্তিক বলল, ‘বকে’র সঙ্গে ‘ডাকে’ হয় না। অ-কার দেওয়া শব্দ বসাতে হবে। বকে, ঝকে, ছকে, টকে—এইসব। এবার লেগে গেল ধুন্দুমার। বল্ তবে কোন শব্দের মানে কি? অনেক কষ্টে থামাই তাদের। আহা! সৃষ্টিশীল লেখক সব, অত ভুল ধরলে চলবে?
এইভাবে শুরু। বাকিরা ছড়ার সঙ্গে একের পর এক লাইন জুড়ছে। এইরকম সব ছড়া লেখা চলতে লাগল। লেখা কিংবা লেখা-লেখা খেলা। সে তোমরা যা খুশি বলো।
না না, ওদের লেখা সব কবিতা আমি কক্ষনও তোমাদের পড়াব না। ওরা রাগ করবে না ঠিকই, ওরা ভারী ভালো ছেলে-মেয়ে। কিন্তু ওসব তোমরা পড়ে যদি হাসাহাসি করো, তবে ওদের ভারি দুঃখ হবে। ওরা আরেকটু ভালো করে লিখুক, আমি কথা দিচ্ছি, তখন তোমাদের সব পড়াব।
ওরা দারুণ সব গল্প লেখে। আমার থেকে ঢের ঢের ভালো। গল্প লেখার ছলে বাংলা বাক্য আর বাংলা শব্দ শেখা হল কিছু। সেসব গল্পের পাশে চমৎকার ছবি আঁকা চলে। যাকে বলে অলঙ্করণ। সৌপ্তিকের ‘হাতির গল্প’-এর পাশে রঞ্জিনী কী মিষ্টি একটা হাতির ছানা আঁকল। সে আবার শুঁড় দিয়ে জল ছিটিয়ে দিচ্ছে। সে জল আবার রঙিন। হাতির শুঁড় তো নয়, যেন পিচকিরি। এসব দেখে একদিন আমার বন্ধু ইন্দ্রাণী বলল, ওদের নিয়ে একটা হাতে-লেখা ম্যাগাজিন হোক বরং। ওরা নিজে হাতে লিখবে, নিজেরা আঁকবে। তারপর কালার জেরক্স করে, সেলাই করে বেঁধে সেসব পত্রিকা নিজেরা নেবে, অন্য বন্ধুদের দেবে। বাড়িতে বাবা-মায়েরা দেখবেন, অন্যদের দেখাবেন। ব্যস, সঙ্গে সঙ্গে আমরা রেডি। হাতে-লেখা পত্রিকার নাম দেওয়া হল ‘রামধনু’। গোল্লু নাম ঠিক করে দিল। ওরা রুলটানা কাগজে গল্প লিখল, কবিতা লিখল, ছবি আঁকল। সে ছবিতে আকাশের রং সবুজ, নদীর জল বেগুনি, ঘাসের রং খয়েরি। বাঃ, ‘রামধনু’ নাম যখন, হরেক রকম রং ঢেলে দিতে হবে না?
শোনো, এসব কাণ্ডকারখানা করার জন্য আমরা কিন্তু ইস্কুলের বাংলা সিলেবাস বাদ দিইনি। ইস্কুলের বইয়ের সব গল্প পড়া হয়েছে। সব কবিতা পড়া হয়েছে। সেসবের প্রশ্ন আর উত্তর লেখা হয়েছে। না না, আমি কিচ্ছু লিখিয়ে দিইনি। ওরা নিজেরাই লিখেছে, আমি দেখে ঠিক করে দিয়েছি। বিশ্বাস না হয়, তোমরা এসে দেখে যাও একদিন।
আমরা ছাদে এবার একটা রবীন্দ্রজয়ন্তী করব ঠিক করেছি। তিস্তু আর গোল্লুকে ফোন করে চলে এসো তোমরা। আমাদের বাংলা ক্লাস থেকে নাটক হবে, তিস্তু নির্দেশক। গোল্লু মঞ্চ আর শব্দের তত্ত্বাবধানে। গান নাচ কবিতা আবৃত্তি তো আছেই। পুরো ছাদ সাজানো হবে রবীন্দ্রনাথের লেখা কবিতা আর গান দিয়ে। সেজন্য সাদা চার্টপেপার আর কালো-লাল-নীল রঙের মার্কার পেন কেনা হবে শুনছি। বাকিটা আমিও জানি না। তোমরা সবাই এলে একসঙ্গে বসে দেখব ভাবছি। এসো কিন্তু।
একটা মজার কথা বলি। আমাদের ক্লাসে প্রচুর বাংলা শব্দ শেখা হয়। চং সেগুলো সব শোনে। কিছু বোঝে, কিছু বোঝে না। কিন্তু নিজের মতো করে একটা কিছু মানে ধরে নেয়। যেমন একদিন গোল্লুর হারিয়ে যাওয়া জ্যামিতি-বাক্স খোঁজার জন্য চং মুখে করে একটা চিরুনি নিয়ে সারা বাড়ি ঘুরল।
“ই কী রে! সারাদিন এই চিরুনিটা তুই মুখে নিয়ে ঘুরছিস কেন চং?”
চং চিরুনি মুখ থেকে নামিয়ে বলল, “চিরুনি তল্লাশি করছি।”
“মানে?”আমার তো চক্ষু ছানাবড়োা।
চং গম্ভীর।” আহা হা, জ্যামিতি বাক্সটা চিরুনি-তল্লাশি না করলে খুঁজে পাব কী করে? তাই চিরুনি নিয়ে খুঁজছি।” আমরা তো ওর কথা শুনে হেসে কুটিপাটি। ওকে বুঝিয়ে বললাম শব্দটার ঠিকঠাক মানে।
কিন্তু এই ছন্দ মিলিয়ে ছড়া বানানোর ব্যাপারটা তার ভারি মনে ধরেছে। কিন্তু মুশকিল একটাই। চং তো লিখতে পারে না। মুখে মুখে যা বানাচ্ছে, সেসব তেমন মনে থাকছে না। ভুলে-টুলে যাচ্ছে। আমাদেরও সব সময় ওর বানানো ছড়া লিখে রাখা হচ্ছে না। এর মধ্যে একদিন হোল কি, আমাদের এক কবি-বন্ধু গোল্লুর জন্য একটি নতুন কবিতার বই পাঠালেন, সে বইয়ের নাম ‘বেড়ালের তালব্য শ’। ভেতরে লেখা, গোল্লুদিদিকে আবোল-তাবোল। বই খুলে বাঁদিকে তাকিয়ে দেখি, বইয়ের মধ্যে একটি ভীষণ স্মার্ট আর ঝকঝকে মিষ্টি বেড়ালের ছবি। লেখা রয়েছে, ভালো নাম আবোল তাবোল, ডাকনাম ঘন্টুরাম। বিস্তারিত দেওয়া আছে তার ছবি, নাম, পরিচয়।
ব্যস। চং তো এসব দেখে একেবারে আপ্লুত। সে গিয়ে ধরল তিস্তুকে।
“তিস্তু, আমারও এমন একটা বই চাই রে। দেখ কবি-কাকু তার আদরের ছোট্ট ছানা ঘন্টুরামকে নিয়ে কী চমৎকার বই বানিয়েছেন। সে নিজে হাতে লিখতে পারে না বলেই তো কাকু লিখে দিল। হ্যাঁ রে, তুই কি পারিস না আমাকে নিয়ে এমন কিছু করতে?”
গোল্লু পাশে বসে ছিল।
“হ্যাঁ ভাই। আমাদের চং-কে নিয়ে এমন কিছু হওয়া উচিত।”
“ঠিক বলেছিস। সেই এক হ-য-ব-র-ল ছাড়া আমরা আর চং-কে ওর বন্ধুদের ছবিওলা কোনও মজার বই দিতে পারিনি।”
“চ’ ভাই, তুই লেখ। আমার কবিতা আসে না, “গোল্লু দায়িত্ব চাপিয়ে দিল তিস্তুর ঘাড়ে। তিস্তু সব ব্যাপারে সিরিয়াস। একবার কোনও কিছু মাথায় ঢুকলে সে সেটা করে ছাড়বে। ঘাড় গুঁজে বসে বসে লিখে ফেলল মোট আটত্রিশটা কবিতা। সেই অর্থে বলা যায় তিস্তু কবি হয়ে উঠল শুধু চং-এর জন্যই। ভাবা যায়?
“বই হোক, বই হোক, “সকলের দাবি মেনে নিয়ে সেবার বইমেলায় চং-কে নিয়ে লেখা কবিতার বই বেরোল। তিস্তু বইয়ের নাম দিল, ‘বেড়ালেরা প্রোলেতারিয়েত’। ওপরে হুবহু চং-এর মতো দেখতে একটি চমৎকার মেনির ছবি। চং তো আহ্লাদে আটখানা। বইটি উৎসর্গ করা হোল, চং আর তার বন্ধুদের।
একবার চং এসে আমতা-আমতা করে জিগ্যেস করল, “হ্যাঁ রে, ‘প্রোলেতারিয়েত’ মানে কী?”
তিস্তু বোঝাতে শুরু করল, “শোন, প্রোলেতারিয়েত হল একটা ক্লাস, মানে একটা শ্রেণী, যারা হল শ্রমিক। মানে তারা কেবল খেটেই যায়, খেটেই যায়, খাটুনির জন্য সামান্য মজুরি পায়। কিন্তু তাদের আর কিচ্ছু নেই, বাড়ি-ঘর টাকাপয়সা…। আমার বিশ্বাস তুই তোরা, এই বেড়ালেরা একেবারে খাঁটি প্রোলেতারিয়েত।”
চং-এর চোখ ছলছল।” উফ! তুই কোন লেভেলে গিয়ে ভেবেছিস রে! আমাদের প্রতি তোর এই সম্মান, জাস্ট ভাবা যায় না।”
ওকে আমরা বইমেলা অবধি নিয়ে যেতে পারিনি। গাড়িতে করে অতদূর যেতে পারলেও মেলার ভিড়ে, ধুলোয় চঙের ভারী কষ্ট হবে। কিন্তু বইমেলায় বইয়ের তাকে রাখা ওর বই, বই হাতে নিয়ে সব লেখক কাকু-জেঠু পিসি-মাসিদের ছবি দেখিয়েছি মোবাইলে। চং তো আহ্লাদে গদগদ। টানা ক-দিন এরপর থেকে ও ঘাড় তুলে আকাশের দিকে তাকিয়ে গান গাইল। গানটি অবশ্য ওর নিজস্ব সুরে, কথায়। সেটা আমাদের বোধগম্য হয়নি। গোল্লু একবার বলল, চং গাইছে ‘কিন্তু ভাই বড়ো দুঃখ আমার যে পাখা নাই’। তিস্তু মানতে চাইল না। তিস্তু ছেলেবেলায় কারেন্ট চলে গেলে ‘আলোর গান’, গরমকালে ‘হাওয়ার গান’, শীতকালে ‘রোদের গান’ লিখেছিল। সেইসময় ‘পাশের বাড়ির নেড়ি কুকুর’ নামে ওর যে গানটা ছিল, চং নাকি সেই সুরটা হুবহু বসিয়ে দিয়েছে। এসব নিয়ে আমাদের মধ্যে কথাবার্তা হলেও চং আমাদের পাত্তা দিচ্ছিল না। পাঁচিলের ওপর ওর হাঁটাচলা বদলে গেল। যে-সে ডাকলে চট করে সাড়া দিত না। উদাস এবং গম্ভীর হাবভাব। গোল্লু বলল, “কে জানে বাবা কবিতার বই দেখে হঠাৎ সন্ন্যাসী হয়ে গেল নাকি?”
আমি আর কথা বাড়াইনি। কবি আর কবিতা নিয়ে আমি কি-ই বা বুঝি!
মাঝেমধ্যে তিস্তু-গোল্লুর ঘরে গিয়ে বইয়ের তাকে সাজানো ‘বেড়ালেরা প্রোলেতারিয়েত’ বইখানা গিয়ে দেখত চং। দেখে গুনগুন করে বলত… না ভাই, কী বলত তা আমরা কেউ জানি না।
তবে সে বইটি এখনও রয়েছে কয়েক কপি। তোমরা চাইলে জানিও। পাঠিয়ে দেব। পড়ে ফেরত দিও কিন্তু। আর পড়ে ফেলার পর চং-কে এসে জানিয়ে যেও তোমাদের কেমন লাগল।
৪
চং এবং সাইকেল
তিস্তু আর গোল্লু ছেলেবেলা সাইকেল চালাতে শেখেনি। আমিও ছেলেবেলা সাইকেল চালানোর সুযোগ পাইনি। আমরা অবশ্য তখন একটা ভীষণ ব্যস্ত বড়ো রাস্তার সামনে সরকারি আবাসনে থাকতুম, আর সেখানে নিজের সাইকেল কিনে সাবধানে রাখার কোনও জায়গা ছিল না। হামেশাই সব চুরি-টুরি হয়ে যেত। এমনকি চালানো শিখে সাইকেল চালিয়ে যাবার মতো কোনও নিরাপদ রাস্তাও ছিল না। মায়ের মনে হয়েছিল রাস্তার সব গাড়ি সাইকেলওলাকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেওয়া কিংবা চাপা দেওয়ার জন্যই পথে বেরোয়। ফলে আমার বাবা আমাকে কখনওই সাইকেল কিনে দিতে চাননি। এবং দেননি। আমরা তখন চাইলেই সব কিছু হাতের নাগালে পেতাম না, আর না পেলে তা-ই নিয়ে বায়না করে আকাশ ভেঙে ফেলতাম না। কাজেই আমার কেন সাইকেল চালানো শেখা হয়নি, সে আলোচনা আর এতদিন পরে না করাই ভালো।
কিন্তু তিস্তু আর গোল্লু বায়না ধরল, এবং খুব ঘ্যানঘ্যান করতে লাগল, তারা সাইকেল চড়া শিখবে, এবং সাইকেল চড়ে এদিক-সেদিক ইস্কুলে যাবে, পড়তে যাবে, বন্ধুবান্ধবদের বাড়ি যাবে। শুরুতে এই বিষয়ে তাদের তাতিয়ে দিয়েছিল ওদের সম্রাটকাকু।
সম্রাট এক চমৎকার মানুষ। তিনি একটি খুব কঠিন চাকরি করতেন, অনেক অনেক টাকা মাইনেও পেতেন। দুম করে একদিন চাকরি ছেড়ে দেন। এবং কী এক আশ্চর্য খেয়ালে সাইকেল নিয়ে প্রথমে দূরদূরান্ত, তারপর দেশ-বিদেশ ঘুরতে শুরু করেন। প্রথমে ছিল প্রাণের আনন্দ, তার পরে এই অভিযান হয়ে দাঁড়াল অতি জরুরি। পৃথিবীর পরিবেশকে আর একটু ঝকঝকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার জন্য ভিতর থেকে একটা ভীষণ তাগিদ অনুভব করেন। ভাবো একবার, আমাদের চারপাশে এমন দু-চারজন মানুষ আছেন বলেই তো পৃথিবীতে এখনও আমরা প্রাণভরে নিঃশ্বাস নিতে পারছি।
সম্রাট যখন কলকাতায় থাকেন, তিনি চলে আসেন আমাদের বাড়িতে। তাঁর সঙ্গে মাঝেমধ্যেই তিস্তু-গোল্লুর নানা বিষয়ে গল্প হয়। ইতিহাস আর ভূগোল তাঁর কণ্ঠস্থ। সেই সঙ্গে পরিবেশের খুঁটিনাটি। সম্রাট যখন ভারতবর্ষের উত্তর থেকে দক্ষিণের প্রান্ত আর পূর্ব থেকে পশ্চিম বরাবর একনাগাড়ে সাইকেল চালিয়ে ঘুরে ফেললেন, তিস্তু আর গোল্লু তাঁর মুখে সেসব গল্প শুনে তো রীতিমতো উত্তেজিত।
সম্রাট ওদের বললেন, “দ্যাখো, আমি কিন্তু শখের সাইক্লিস্ট নই। এমনি এমনি একদিন সাতসকালে সাইকেল চালাতে চালাতে এদিক-সেদিক চলে গেলাম, বিষয়টা কিন্তু তেমন নয়। এটাকে বাঙালির নিছক অ্যাডভেঞ্চার ভাবলেও চলবে না। মনে রাখবে, আমি হচ্ছি রিভার সাইক্লিস্ট।”
“রিভার সাইক্লিস্ট? মানে রিভারে…”গোল্লুর প্রশ্ন শেষ হওয়ার আগেই সম্রাট মুচকি হেসে বললেন, “ঠিক এই প্রশ্নটাই সকলে করে। আরে বাবা, নদীতে সাইকেল চলবে কী করে? নদীর জলে নয়, সাইকেল চলবে আসলে নদীর পাড় ধরে। আমি সাইকেল চালিয়ে দেখতে দেখতে যাই, নদীটা কেমন আছে। আমাদের যেমন মন খারাপ হয়, আকাশ নদী পাহাড় জঙ্গল তাদেরও কিন্তু দুঃখ হয়, কষ্ট হয়, মনখারাপ হয়। আমি দেখতে দেখতে যাই নদীর জল কেমন আছে। নদীর জলে আশেপাশের কারখানা থেকে, শহর থেকে, ক্ষেত থেকে কতটা নোংরা ময়লা আবর্জনা মিশছে। তোমরা কি জানো, চাষিরা আজকাল ফসলের ক্ষেতে কতরকম পোকা মারার ওষুধ দেয়। সেসব ওষুধ মাটি চুঁইয়ে একটু একটু করে ক্ষেতের পাশে আলের জলে মিশে যায়। সেই জল গিয়ে পড়ে পুকুরে, নদীতে। এবার নদীতেও মিশে গেল পোকা মারার বিষ। যে বিষে পোকা মরে যায়, সেই বিষ-জল গিলছে মাছেরা, মাছেদের খাচ্ছে মাছরাঙা, কোঁচবক। আমরা মানুষেরাও বাদ যাচ্ছি না। আমরাও ওই জলে বড়ো হওয়া মাছ খাচ্ছি।”
“জানি জানি সম্রাটকাকু, “উত্তেজিত হয়ে হাত তুলে দাঁড়িয়ে পড়ে গোল্লু, যেন ক্লাসে পড়া বলছে, এইভাবে গড়গড় করে বলে, “এই ঘটনাটাকে বলে বায়োলজিকাল ম্যাগনিফিকেশন। সবার শরীরে ওই বিষ ঢুকছে আর তার ক্ষতিকারক প্রভাব প্রত্যেক স্তরে বাড়ছে। পুরো ফুড চেন জুড়ে…পর পর ধাপে ধাপে…”
“একদম ঠিক বলেছ, “সম্রাটের চশমার মোটা কাচের আড়ালে চোখদুটো জ্বলজ্বল করে, “তাহলেই ভাবো জলের দূষণ কতরকম ভাবে রোজ বাড়ছে। আর সেই জল ব্যবহার করে আশেপাশের গ্রাম বা শহরের মানুষ কেমন আছে। আমি নদীর পাড় ধরে যেতে যেতে সাইকেল থামাই, মানুষের সঙ্গে কথা বলি। বন্যা হলে, নদীর পাড় ভেঙে পড়লে কেমন কষ্ট হচ্ছে সাধারণ মানুষের… এসব দেখি, লিখি, ছবি তুলি… আর সক্কলকে ডেকে ডেকে কথাগুলো বলি। তোমাদের মতো ছোটো ছেলেমেয়েদের বলি, বড়োদের বলি, বুড়োদের বলি। নিজের ইউ টিউব চ্যানেলে বলি। ইস্কুলে গিয়ে বলি। যদি চারপাশের পরিবেশটা আর একটু ভালো করা যায়, আর একটু সুস্থ সুন্দর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করা যায়… শোনো বাপু, পৃথিবীর তিন ভাগ জল। নদী না বাঁচলে সভ্যতা টিঁকবে না। ইতিহাস আর ভূগোল বই খুলে ভালো করে পড়ে দেখো, মানুষের সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ সভ্যতা শুরু হয়েছিল নদীর ধারে। নীলনদ হোক আর গঙ্গা হোক, নদী না থাকলে চাষবাস করে মানুষ খেয়েপরে বাঁচত না। আর এখন আমরা মানুষেরা সেই নদীগুলোর সর্বনাশ করছি। এসব কাজ স্রেফ আত্মহত্যার সামিল।”
সম্রাটের সেসব গল্প হলেও সত্যি কাহিনি শুনলে তোমাদেরও তাক লেগে যাবে। সম্রাটের গল্প তোমাদের পরে বলব বরং। সেসব গল্প নিয়ে একের পর এক রোমাঞ্চকর রোমহর্ষক অ্যাডভেঞ্চার লেখা যায়। এখন শোনো, সম্রাটের কথা শুনে গোল্লু আর তিস্তুর কী মনে হোল। প্রথমেই ওদের দাবি, ওদের দুজনকে সাইকেল কিনে দিতে হবে। ওরা রোজ বিকেলে সেই সাইকেল নিয়ম করে চালানো শিখবে। তারপর কাছেপিঠে সব জায়গায় সাইকেল চড়ে যাবে। তাতে হাতখরচের পয়সা বাঁচবে। এবং পরিবেশ দূষণ কম হবে। তারপর ওরা আরেকটু বড়ো হলে নাহয় সম্রাটকাকুর মতো কিছু-একটা করার কথা ভাববে।
খানিক গাঁইগুঁই করে তাদের দুটি সাইকেল কিনে দেওয়া হল। কিন্তু আশেপাশে খোলা মাঠ কোথায় যে বোঁ বোঁ করে সাইকেল চালিয়ে নেবে? এবার গলির মধ্যে শুরু হল তাদের কসরত। একবার তিস্তু চালায়, গোল্লু পাশে দৌড়য়। একবার গোল্লু সাইকেলে প্যাডেল করে, তিস্তু হ্যাণ্ডেল ধরে দৌড়য়। পাঁচিলে বসে তাদের এই সম্পূর্ণ ক্লাসের নির্দেশনা এবং পরিচালনার দায়িত্বে স্বয়ং চং।
“এই না না, গোল্লু, শুধু প্যাডেলে চাপ দিলে হবে না, হাতের দিকে খেয়াল রাখ। হ্যাণ্ডেলটা সোজা কর। হ্যাঁ, এইবার হয়েছে। আরে! ঘাড় নীচু করে কুঁজো হয়ে যাচ্ছিস যে! কী মুশকিল, সোজা হ’, সিধে সামনে তাকা…”চং বলতে বলতে হুড়মুড় করে সাইকেলসহ রাস্তায় পড়ল গোল্লু। তিস্তু ততক্ষণে দৌড়ে সামনে বেশ খানিকটা এগিয়ে গেছে।
চং চিৎকার করতে থাকে, “শোন গোল্লু, আছাড় না খেলে সাইকেল চালানো শিখতে পারবি না, এই তোকে পষ্ট কথা বলে দিলাম। দেখ আগে কতটা কেটেছড়ে গেছে। হাঁটুর নুনছাল উঠলে বেশ করে সেখানে দুব্বো ঘষে লাগিয়ে দিবি। আর মচকে গেলে চুন-হলুদ। দাঁড়া দিদার ঘরে একটা ব্যথার মলম আছে। আমি দেখে রেখেছি। টুক করে নিয়ে আসব। তোরা চালানো বন্ধ করিস না। লড়ে যা। এভাবেই একদিন তুই সাইকেলে হিমালয় পেরিয়ে যেতে পারবি।”
গোল্লু চোখমুখ কুঁচকে বলল, “এই থাম তো! ওইসব দুব্বো-টুব্বো তুই স্বর্গ থেকে খুঁজে আন গিয়ে যা। ভাইফোঁটার দিন দুব্বো খুঁজতে কত ঝামেলা হয় জানিস না? এপাড়ায় ঘাসের চিহ্নমাত্র নেই। চাদ্দিকে পাথর আর ধুলো। উঃ বাবা গো! গেছে হাঁটুটা।”
“সত্যি ভাই, কী দিনকাল পড়ল! মাঠ নেই, পুকুর নেই, দুব্বোঘাস নেই… এভাবে সাইকেল চালানো যায়?”
“বাবা গো!”যন্ত্রণায় চোখমুখ কুঁচকে গোল্লু ততক্ষণে উঠে দাঁড়িয়েছে, “দিদা পুজোর জন্য বাড়িতে বেলগাছ লাগিয়েছে, বেলপাতা কিনতে হয় না। এবার হয়ত বাড়ির টবে দুব্বোঘাসও লাগাতে হবে। উফ! চারপাশটা মরুভূমি বানিয়ে ছেড়ে দেবে সব…। ইস্কুলে যেমন মাঠ নেই বলে ছাদের ওপরে রুফটপ প্লেগ্রাউণ্ড বানিয়েছে, আমাদের বোধহয় এবার ছাদের ওপর উঠে সাইকেল চালানো শিখতে হবে।”
তিস্তু পিছিয়ে আসে, “উঠে পড় গোল্লু, এক্ষুনি আবার ধুলো ঝেড়ে সাইকেলে উঠে পড়। আরেক পাক চালিয়ে নে। কাল আমার পালা। আজ তুই চালা। ব্যথা বাড়ি গিয়ে বুঝে নিবি।”
চং আরও জোরে চেঁচিয়ে ওঠে, “হ্যাঁ ভাই, জয়কে ভয় করে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।”
তিস্তু চং-এর কথা শুনে হাঁ করে তাকায়, গোল্লু ব্যথা ভুলে চেঁচিয়ে ওঠে, “উফ! চং, ওটা ভয়কে জয় করার বিষয়। তুই পুরো উলটো বললি।”
চং বলে, “বুঝেছি। মনে রাখিস, সবে মিলি করি কাজ/ মরি-বাঁচি নাহি লাজ।”
তিস্তু চোখ পাকিয়ে বলে, “ওটা মরি-বাঁচি নয়, হারি-জিতি হবে।”
চং ততোধিক গম্ভীর হয়ে বলল, “ঠিক আছে বুঝেছি। ভুল মাত্রেই মানুষ হয়। বাদ দে।”
তিস্তু আর গোল্লু চং-এর উলটো কথা শুনে ব্যথা-ট্যথা ভুলে গলা ফাটিয়ে হাসছে তখন।
আমি জানলা দিয়ে সব দেখে-শুনে ব্যথার ওষুধ, কাটা-ছেঁড়ার মলম, গরম জল, ডেটলের ব্যবস্থা করতে থাকি। নাঃ, চং-কে বাংলা প্রবাদগুলো আরেকটু ভালো করে শেখাতে হবে। গতকালও দশের বোঝা, একের লাঠি জাতীয় কী একটা বলেছিল।
রোজ বিকেল হলেই চং-এর হাঁকডাক। যেন সাইকেল নয়, যুদ্ধবিমান চালানোর মহড়া হচ্ছে। সাইকেল নিয়ে সিধে উত্তরে হিমালয় দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর পেরোনোর মহা তোড়জোর। একা চং নয়, সেই সঙ্গে তার হুলো বন্ধুরাও বিভিন্ন পাঁচিলে। নানাদিক থেকে পর্যবেক্ষণ চলছে। অনেক রেফারি মিলে ম্যাচ পরিচালনা করার ভঙ্গি। আর তাতে সমূহ সমস্যা। চারদিকে বেড়ালবাছাদের অবস্থান, তাদের বিভিন্ন স্কেলে নানান সুরে মিঁইয়াও, ম্যাঁও, মিউ মিউ ধ্বনি এবং চং-এর উত্তেজিত চেঁচামেচিতে পাড়ার, মানে গলির লোকেরাও তটস্থ। তিস্তু আর গোল্লু এখন একটু সড়গড় হয়েছে। আলাদা আলাদা সাইকেলে একা একা প্র্যাকটিস করে। একে তো বাড়ির পিছনের সরু গলিতে যখন-তখন রিকশা আর মোটর বাইক ঢুকে পড়ে, বাইককাকুরা অনেকেই বিভিন্ন বাড়িতে নানান মালপত্র দেন, তাঁদের খুব তাড়া। একদিন গোল্লু এক বাইক-কাকুর ধাক্কায় প্রায় উলটে পড়ে যাচ্ছিল। কোনওরকমে সামলে নিয়েছে। চং আর গোল্লু মিলে চেঁচামেচি করার আগেই সে কাকু বাইক নিয়ে ধাঁ।
তিস্তু একদিন আরেকটু বড়ো ঝামেলায় পড়ল।
আমাদের গলি থেকে বেরিয়ে যেখানে আরও দু-তিনটে গলি কাটাকুটি করে নানানদিকে চলে যায়, সেখানে একটা পুরনো পুকুর আছে। এমনিতে এই গোটা অঞ্চলে বছর পনেরো আগে পর্যন্ত অন্তত পনেরোটা ছোটো-বড়ো পুকুর ছিল। বর্ষার সময় পুকুরের জল আর চলাচলের রাস্তা একাকার হয়ে যেত। এখন সেগুলো কোন এক ম্যাজিকে ভ্যানিশ হয়ে জল-ভর্তি পুকুরের জায়গায় তিন-চার তলা ফ্ল্যাট বাড়ি তৈরি হয়ে গেছে। এখন চারদিক খটখটে সিমেন্টে বাঁধানো। একফোঁটা জল মাটির ভেতরে ঢোকার কোনও উপায় নেই। সেজন্য বৃষ্টি হলেই আমাদের পাড়ায় রাস্তায় জল জমে। বা রে! আকাশ থেকে বৃষ্টি পড়লে মাটি তাদের শুষে নেবে, সেই জল আবার রোদের তাপে বাষ্প হবে। বাষ্প জমে মেঘ, মেঘ থেকে বৃষ্টি। মাটির তলা থেকে মানুষ জমা জল তুলে নেবে। এমনটাই তো প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম। এসব আর কত বলব বলো দেখি? মাটি না থাকলে কী হতে পারে, তোমরা জানো না? অবিশ্যি তোমাদের আর দোষ কি! বড়োরা বড়ো হলে তারা সব পড়াশুনো ভুলে যায়। তোমরাও নিশ্চয়ই ভাবো, বইয়ের কথা বইয়ে থাক। পরীক্ষায় গাদা গাদা নম্বর পেলেই হবে।
যাকগে সেসব কথা। হচ্ছিল পুরনো পুকুরের গল্প। সেই সবেধন নীলমণি পুকুরখানা পাড়ার মধ্যে এখনও বেঁচেবর্তে আছে বটে, কিন্তু সে ভারি একলা আর বেচারা। তার চারপাশে বড়োসড় ফ্ল্যাটবাড়ি। তারা মাথা তুলে ঘিরে দাঁড়িয়ে রয়েছে রাগী পাহারাওলার মতো। ঠিক দুক্কুরবেলা সেখানকার উঁচু জানলা থেকে ঝপ্পাস করে পুকুরে হয়ত কেউ একটা লোক ছুঁড়ে ফেলল প্লাস্টিক-বোঝাই এককাঁড়ি ময়লা। পুকুরটা আগে খুব চেঁচামেচি করত, “অ্যাই কে রে বদমাইশ, আবার আমার গায়ে ময়লা ফেললি? দেখছিস না ছোটো মাছগুলোর নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে? পাড়ায় ময়লাকাকু রোজ সকালে আসে না? বাঁশি বাজিয়ে ডেকে ডেকে বাড়ি থেকে ময়লা নিয়ে যায় না? তখন সেখানে বাড়ির আবর্জনাগুলো ফেলতে পারিস না?”
কে আর শুনবে পুকুরের চিৎকার? বড়োমানুষরা এসব শুনতে পায় না। তাদের চোখ-কান সব বন্ধ। চং বসে বসে পুকুরের এসব কথা শুনত, আমাকে এসে বলত সব। পরের দিকে পুকুরটা নাকি বসে বসে সারাদিন হাউ হাউ করে কাঁদত। যখন আর জলফড়িং আসে না, ছোটো কাঁকড়া গেঁড়ি-গুগলি আর শামুকগুলো মরে যেতে লাগল, ছোটো মাছগুলো হাঁফসে উঠে মরে পচে ভেসে উঠল, অনেক টোপাপানা কচুরিপানা ভর্তি হয়ে গেল ক্রমশ। প্রথমে জলটার রং হোল সবুজ। এখন আর পুকুরের স্বচ্ছ জল দেখা যায় না। কার ভালো লাগে বলো তো খামোখা খানিক ময়লা আবর্জনা জঞ্জাল মেখে বসে থাকতে? এখন পুকুরটা আর কাঁদে না। ও চুপচাপ উদাসীন হয়ে ভাবে, একদিন ওর ছবি টাঙানো থাকবে কারও কারও ঘরের দেওয়ালে। সকলে ছবি দেখিয়ে বলবে, ‘জানো, এখানে ছিল একটা দারুণ পুকুর। এ-পাড়া ও-পাড়ার অনেকে এখানে স্নান করত, ঘাটে বসে একরাশ বাসন মাজত, থুপথুপ করে জামাকাপড় কাচত। কচিরা জলে ঝাঁপ দিয়ে কত হুটোপাটি করত। কত ছেলেপুলে এখানে স্নান করতে করতে সাঁতার শিখেছে। মজুমদারবাড়িতে যখন অমন ভয়ানক আগুন লাগল, এই পুকুর থেকেই তো জল তুলে ছিটিয়েছিল দমকলকাকুরা। ভাগ্যিস এই পুকুরটা ছিল!’
পুকুরের পাশের সরু গলিরাস্তায় বাইক ঢুকেছে তার নিজস্ব উল্কার গতিতে, যেন সে এখান থেকে সিধে নেপচুন গ্রহে গিয়ে থামবে। উলটোদিকে এক রিকশাকাকু আসছে ঢিমে তেতালা মেজাজে, তার কোনও তাড়াহুড়ো নেই। দার্শনিক হাবভাব। পথেই জীবন। তিস্তু সাইকেলে নতুন শিক্ষার্থী। সে ভাবল, এই এক মওকা পাওয়া গিয়েছে। সাইকেল নিয়ে এবার বোঁ করে এদের পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে যাবে। আসলে ওর মধ্যে সব কিছুতে ফার্স্ট হতে হবে গোছের একটা ইয়ে আছে। গোল্লুর মতো কুঁড়ে আর গেঁতো নয়। রাস্তায় বেচারা বুড়ো রিকশাকাকু সামনে একটি উড়ন্ত বাইক, আর তার পাশে ছুটন্ত কিশোরী সাইকেল-আরোহীর ক্রমাগত পাশ কাটিয়ে চলে যাবার ভয়ানক তাড়া দেখে বোধহয় একটু ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন। তিনি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে ঘ্যাঁচ করে ব্রেক কষে দাঁড়িয়ে পড়লেন গলির পাঁচিল ঘেঁষে। তিস্তু স্পীড কমানো মোটরবাইকের পাশ দিয়ে টপকে প্রায় চলেই যাচ্ছিল, কিন্তু ওর ডানদিকে পুকুরের পাশের রাস্তাটা যে অত ভুসভুসে নরম, সেখানে সাইকেলের চাকা ফস করে বসে যেতে পারে, সেটা বেচারা বুঝতে পারেনি। সাইকেল নিয়ে তিস্তু হুড়মুড়িয়ে পড়ল পুকুর ঘেঁষে। ব্যাস। আর যায় কোথায়? কেতরে পড়া তিস্তুর সাইকেলখানা টাল সামলাতে না পেরে বোঁ করে বেঁকে গিয়ে পড়ল মজে-যাওয়া পুকুরের কচুরিপানা-ভর্তি একটি জায়গায়। যার চারপাশে গাদা গাদা ময়লা নোংরা আর আবর্জনা। সাইকেল ওপরে, তিস্তু নীচে। ঘাড়ের ওপর সাইকেল নিয়ে তিস্তুর সে এক ভয়ানক বেসামাল অবস্থা।
বাইককাকু বেগতিক দেখে ধাঁ করে উড়ে বেরিয়ে গেছে। রিকশাকাকু পড়েছে আতান্তরে। সে হাঁই হাঁই করে চেঁচামেচি জুড়ে দিল। পিছনে এর-তার পাঁচিল টপকে দৌড়ে আসছিল চং। সে এসে দেখে বুঝল ব্যাপার সিরিয়াস।
“তিস্তু, তুই জাস্ট উঠে আয়, তুই ঠিক পারবি।”
“আরে দূর, অত সহজ নয় রে, চারদিকে ভুসভুসে মাটি। পা-টা রাখব কোথায়? একটা কোথাও দাঁড়াতে হবে তো, “তিস্তু বলল।
তিস্তুর ডান পা পুকুরের পাঁকের মধ্যে, বাঁ পা নরম মাটিতে, সে চারপাশে কাউকে না দেখতে পেয়ে রিকশাকাকুকেই হাঁক দিল, “আরে ও কাকু, আমার হাতটা একটু টেনে ধরো না, ব্যালেন্স পাচ্ছি না যে।”
সে ছুটে এল, তাকে ধরে তিস্তু নিজে কোনওরকমে পুকুর থেকে উঠে এল, পায়ের হাঁটু পর্যন্ত পাঁক আর কাদা। পচা ময়লার গন্ধে টেঁকা দায়। কাঁধের চারপাশ দিয়ে ঝুলছে কচুরিপানা। আর তার মধ্যে সাইকেলটা পুকুরে পুরোপুরি ডোবেনি, অত জলই নেই তো ডুববে কী করে? কিন্তু পানা আর আবর্জনায় সেটা প্রায়-ডোবা অবস্থায় ছেতরে পড়ে আছে। আর সেটাকে তুলতে গেলে আগে লাঠিসোঁটা আঁকশি দিয়ে তাকে পাড়ে একটা নিরাপদ দূরত্বে টেনে আনতে হবে।
“চং, গোল্লুকে ডেকে আন শিগগিরি। আর একটা বড়ো বাঁশ আনতে বলবি।”
চং এল, গোল্লু এল, বড়ো বাঁশ নিয়ে পাড়ার সুশীলকাকু এল। সেই সাইকেল তখন প্রায় ডুবুডুবু। চং চারপাশে ভিড় করে মজা দেখতে দাঁড়ানো লোকজনকে ক্রমাগত ধমকাচ্ছে, “অ্যাই এত ভিড় কিসের অ্যাঁ? সরে দাঁড়ান বলছি।” লোকে শুনছে ‘ঘ্যাঁওওও ফ্যাঁশ’, চং বলে চলেছে, “তিস্তু শোন, তুই ঘাবড়োাবি না একদম। হোসপাইপে করে জল নিয়ে ধুয়ে পরিষ্কার করে নেব সাইকেল। আমি হেল্প করব। মানে, জলের কলটা খুলে দেব। গোল্লু পরিষ্কার করে দেবে। শুধু ওই সাইকেলটা পচা পাঁক থেকে তুলতে দে একবার।”
আশেপাশের ফ্ল্যাট বাড়ির বিভিন্ন জানলায় নানান বয়সের কৌতূহলী মুখ। কেউ নীচে নামছে না, কোনও রকম সাহায্য করার মানসিকতা নেই। দূরে দাঁড়িয়ে মজা দেখছে। চং তাদের দিকে তাকিয়ে গর্ গর্ শব্দ করল। আমরা বেশ জানি ও বলছে, “স্বার্থপর কোথাকার। মানুষের বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়তে হয়, জানিস না? এই যদি বেড়ালদের কারও এমন বিপদ হোত, সারা পাড়ার সব বেড়াল প্রাণ দিয়ে দিত। তোরা মানুষরা সব পাজি।” কিন্তু চঙের কথা শুনে বুঝতে পারা তো অত সহজ কাজ নয়। শুধু চং কেন, আমাদের চারপাশে পোষা বা না-পোষা পশু পাখি পোকামাকড় কারও কোনও কথাই কি আমরা আমাদের কান দিয়ে শুনতে পাই? আরে বাবা, শুনতে হলে বুঝতে হলে আগে ওদের ভালোবাসতে হবে। ওদের কাছে যেতে হবে, ওদের সঙ্গে সময় কাটাতে হবে।
যাক ওসব কথা।
সেই সাইকেল পচা পানা পুকুর থেকে কোনওক্রমে টেনে তোলা হোল।
কিন্তু এর পরে যেগুলো ঘটল, সেগুলো বলে রাখি তোমাদের।
তিস্তু আরও ক্ষেপে উঠল। তেড়েফুঁড়ে সে এবার সাইকেল চালাতে লাগল। এক ছুটির দিন সকালে বাড়ি থেকে বেরিয়ে সোজা চলে গেল ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল। একদিন সাইকেল নিয়ে সিধে বারুইপুর। একদিন গিয়ে পৌঁছল পানিহাটি। বাড়িসুদ্ধ লোকের রোজ আতঙ্ক, এই বুঝি তিস্তু সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে গেল। তারপর আর ফিরল না সারাদিন। এদিকে কোথায় চলে যাচ্ছে বাড়ির কেউ জানে না। ফোনটাও ধরে না। একদিন বাড়ি ফিরে এসে উলটে তর্ক জুড়ে দিল।
“তিস্তু তোমাকে কতক্ষণ ধরে ফোন করছি আমরা সবাই, তুমি কোথায় চলে গিয়েছিলে সাইকেল নিয়ে?”
“বা রে! সাইকেল চালাতে চালাতে আমি মোবাইল ফোন ধরব কী করে? হয় দুর্ঘটনা ঘটবে, নয় ট্রাফিক পুলিস দাঁড় করিয়ে বকুনি দেবে। তারপর হয়ত সিগন্যালে কান ধরে ওঠ-বস করাবে। ফোন ধরে মরি আর কি! ক্ষেপেছ?”
“যাব্বাবা! সেজন্য তুমি ফোনটাই ধরলে না? ফোন বাজছে শুনতে পাচ্ছিলে তো। একটা কোথাও সাইকেল রেখে দাঁড়াবে। ফোন ধরবে। আমাদের কত চিন্তা হচ্ছিল জানো?”
“দূর, তোমরা বড্ড ভিতু। বাড়ি থেকে বেরোলে ফিরতে একটু দেরি হতেই পারে। দেরি হলে তোমরা এমন করতে থাকো।”
“রাস্তায় কত বিপদ হতে পারে জানো?”
“যাব্বাবা, বিপদ তো যে কোনও জায়গায় হতে পারে। যে কোনও মুহূর্তে যে কোনও লোক বাথরুমে দড়াম করে আছাড় খেয়ে পড়ে মাথা ফাটিয়ে ফেলতে পারে, বাজারে গিয়ে পিছলে পড়ে পা ভেঙে যেতে পারে, রান্নাঘরে রান্না করতে করতে হাত পুড়িয়ে ছ্যাঁকা খেয়ে বা শাড়িতে আগুন লাগিয়ে ফেলতে পারে, সিঁড়ি থেকে একতলায় গড়িয়ে পড়ে কোমর ভেঙে যেতে পারে…”তিস্তু আরও কী সব গড়গড়িয়ে বলে যাচ্ছিল, আমি হাঁ হাঁ করে থামাই।
“আস্তে আস্তে। এত হুড়মুড় করে কথা বোলো না। আসল পয়েন্টে এসো। তুমি সাইকেল নিয়ে বেরোনোর সময় আমাদের একবার বলে যাবার প্রয়োজন বোধ করো না? পারমিশন বলেও তো একটা ব্যাপার থাকে, না-কি!”
তিস্তু চোখটা সরু করে বলল, “হুম বুঝেছি। তবে আমি এখন টিন-এজ, কয়েক বছরের মধ্যেই আঠারো, তখন আর সাইকেল নিয়ে অ্যাডভেঞ্চারের পারমিশন লাগবে না নিশ্চয়ই।”
তিস্তুর মা হাঁই হাঁই করে চেঁচিয়ে উঠল, “অ্যাডভেঞ্চার! মানেটা কি! কত বয়স হয়েছে তোমার? এই সম্রাটের সঙ্গে মিশে মিশে… আসুক পরদিন সম্রাট। দেখাচ্ছি মজা।”
চং পাশ থেকে গলা খাঁকরে বলল, “তিস্তু, বড্ড বকুনি খাচ্ছিস। খারাপ লাগছে। একটু বলেকয়ে গেলেই তো ল্যাঠা চুকে যায়!”
“ফুঃ। বললে আরও বেরোতে দেবে না। আমি যদি বলি, মা গো, আমি সাইকেল নিয়ে একটু টেরিটিবাজারে চিনে খাবার দিয়ে ব্রেকফাস্ট করে গড়ের মাঠ আর রাজভবনটা ঘুরে, আকাশবাণীর পাশ দিয়ে চট করে মিলেনিয়াম পার্ক-এ গঙ্গার ধারে বসে একটু বিশ্রাম নিয়ে দুপুরে ডেকার্স লেনে চাট্টি ভালমন্দ খেয়ে বাড়ি ফিরব বিকেলের মধ্যে, মায়ের প্রেশার বেড়ে হার্ট অ্যাটাকের জোগাড় হবে। ক্ষেপেছিস? এদের এত কথা বলার কোনও মানে হয় না। এরা সব কুপমণ্ডুক।”
চং এদিক-ওদিক তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, “ওটা কী বললি রে? ওই ‘কুপোমটুক’ না-কি…”
তিস্তু দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “উফ! কূপমণ্ডুক মানে হোল কুয়োর মধ্যে থাকা ব্যাং, যে কুয়োর বাইরের জগতটাকে দেখেনি কোনওদিন। কুয়োর মধ্যেটাকে সে নিজের পৃথিবী ভাবে।”
“অ। বুঝেছি। কিন্তু নিজের বাড়ির লোকেদের এভাবে বলাটা… অবশ্য তুই তো নিজের মাসিকেই ব্যাং-ট্যাং বলিস। যাকগে। যা পারিস কর। যাবার সময় একটু কিছু বলে যাস ভাই। বড়োরা কেবল চিন্তা করে। আমারও বড্ড ওই হয়, মানে টেনশন।”
পরের বার সাইকেল নিয়ে বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় তিস্তু বলে গেল, ফিরতে সন্ধে হবে। আসার পরে জানা গেল, সে সিধে ডায়মন্ডহারবার রোড ধরে এগিয়ে চলে গিয়েছিল। একেবারে সুন্দরবন অবধি চলে যাবার ইচ্ছে ছিল, রাস্তা চেনে না বলে পুরোটা যেতে পারেনি। তা-ও কিছুদূর এগিয়ে ভেসেলে করে নদী পেরোতে হবে শুনে সেদিনের মতো ফিরে আসে।
ফেরার পর গোল্লু সব শুনে ‘হাঁ’ করে কাঁদবে ভেবেছিল। কারণ ওকে গত শীতের ছুটিতে সুন্দরবন নিয়ে যাওয়া হয়নি সামনে পরীক্ষা ছিল বলে। আর, তোমরা তো জানোই, ইস্কুলের অ্যানুয়াল পরীক্ষাগুলো সুন্দরবনের বাঘের চেয়েও ভয়ংকর।
সাইকেলে তিস্তুর অ্যাডভেঞ্চার আর ‘লং ড্রাইভ’ বন্ধ হোল অবশ্য একবার মানিব্যাগ আর আরেকবার মোবাইল পকেট থেকে পড়ে যাওয়ায়। দু-বার দুটি জরুরি জিনিস হারানোর পরে বাড়িতে একটা সিরিয়াস বকুনি-পর্ব চলে।
“মোবাইল কী করে হারালে তিস্তু?”
“প্যান্টের পকেট থেকে পড়ে গেলে আমি কী করব? আমি কি ইচ্ছে করে হারিয়েছি, না ফেলে দিয়েছি?”
“যাব্বাবা, নিজের দামি জিনিস যত্ন করে রাখবে না?”
তিস্তু তারপর থেকে মোবাইল বাড়িতে রেখে চলে যেত। পকেটে মানিব্যাগের বদলে খুচরো টাকা। সে আর-এক দুশ্চিন্তা। আরেকপ্রস্থ চেঁচামেচি। সেসবের পরে তিস্তুর অভিযানের নেশা একটু কমল। তার জন্য খানিকটা গোল্লুও দায়ী। সে কেবলই ‘তুই আমাকে বাদ দিয়ে এভাবে চলে যেতে পারিস নাআআআআ’ বলে চেঁচামেচি আর প্রায়-কান্নার মতো একটা পরিস্থিতি তৈরি করে ফেলেছিল। তিস্তু আমাদের কথা কম এবং বোনের কথা বেশি শোনে।
একদিন চং এসে আমাকে জিগ্যেস করল, “আচ্ছা মাসি, বারমুডা কোথায় পাওয়া যায়?”
আমি ভাবছি, চং কি এখন বারমুডা পরতে চাইবে? ওকে বারমুডা পরলে কেমন দেখাবে ভেবে আর-একটু হলে ফিক করে হেসে ফেলছিলাম। হাসি সামলে বললাম, “কাছাকাছির মধ্যে স্টেশন রোডে কালীগঙ্গা বস্ত্রালয়ে পাওয়া যায়। কেন রে? তুই বারমুডা নিয়ে কী করবি? পরবি? কিনে এনে দেব?”
“আরে দূর মাসি। কী যে বলো! আমি খামোখা বারমুডা পরব কেন?”
“তাহলে?”
“না মানে তিস্তু আর গোল্লু বারমুডাতে যাবে বলছিল। আমি শুনলাম। আমি শুনে ভাবলাম বারমুডা তো একটা হাপ্প্যান্ট, যেটা মেসোরা পরে। তাহলে সেখানে আবার যায় কী করে? সবে ওদের জিগ্যেস করতে যাব, এমন সময় তিস্তুকে কে একটা ফোন করল, ও হ্যালো-হ্যালো বলতে বলতে চলে গেল। আর গোল্লু আমাকে দেখে ফস করে অঙ্ক বই খুলে বসে পড়ল। পাত্তাই দিল না। তাই এসে তোমাকে জিগ্যেস করছি।”
“ঠিক বুঝতে পারছি না রে। এক কাজ কর চং, তুই ওদের দুজনকে একসঙ্গে দেখলেই একটু আড়ি পেতে শোন দিকি। আমাকে জানাবি। আর খবর্দার। ওদের কাছে আমার নামে নালিশ করবি না বলে দিলাম।”
“না না মাসি। কী যে বলো। তুমি একটা লেখক-মানুষ, তোমাকে আমি পোচ্চওণ্ড শ্রদ্ধা করি। তোমার নামে নালিশ! ছি ছি। তিস্তু বলেছে, নালিশ করলে বালিশ পায়। আমি তো স্রেফ তোমাকে একটা ইয়ে জিগ্যেস করলাম। আচ্ছা দাঁড়াও, আমাকে একটু সময় দাও। বারমুডার ব্যাপারটা আমি একটু ওদের থেকে শুনে নিই।”
চং আমাকে ‘লেখক-মানুষ’ বলায় আর প্রচণ্ড শ্রদ্ধা করে শুনে আমি তো আহ্লাদে আটখানা। আহা! আর কে-ই বা আমাকে এমন লেখক-সম্মান দেয় শুনি? আমাদের কাগজওলা ভোম্বল অবধি রবিবারের কাগজ হাতে দিয়ে দাঁত বের করে বলে, ‘দিদি আজও আপনার গপ্পো বেরিয়েচে? অ্যাতো লেকেন কখন? ঝা লেকেন, তা-ই ছেপে দেয় বোধহয়!’ ওর প্রশ্নের ধরনখানা এমন, যেন আমি নিজে গিয়ে কাগজওলাদের হাতে-পায়ে ধরে গপ্পোটা ছাপিয়ে এসেছি। রবিবারের পাতাতেই বেরোক, কি কোনও পত্রিকায়, তার জন্য হাট-বাজার-দোকান কোথাও একটা মিনিমাম ডিসকাউন্ট পর্যন্ত কেউ দেয় না। ভালো কথা বলা তো দূরস্থান! এমনকি বইয়ের প্রকাশকরা অবধি ফোন করে বলে, ‘দিদি, ক-টা বই নিয়ে যান এবার। গোডাউনে পোকায় কাটছে। রাখার জায়গা নেই। আপনি নিজের বই নিজের কাছে রাখুন, যত্নে থাকবে।’ আমি আর ভয়ে জিগ্যেস করতে পারি না, কত কপি বিক্রি হোল। বলা যায় না, যদি বলে, ‘আপনার বই কে-ই বা পয়সা দিয়ে কিনবে দিদি’, তাহলে আমার মনটা খান খান হয়ে ভেঙে যাবে না? তা-ই ওদের কাউকে কিছু জিগ্যেস করি না। সেখানে চং-এর দেওয়া এই সম্মানে আমি খুব আপ্লুত হই।
চং আমার কথায় ‘বারমুডা’ সংক্রান্ত তথ্য জানার জন্য ওদের সঙ্গে সেঁটে থাকে।
খবরটা কয়েকদিনের মধ্যেই পাওয়া গেল।
তিস্তু আর গোল্লু ‘বারমুডা ট্র্যাঙ্গেল’ নিয়ে পড়াশুনো করছিল। তোমরা অনেকেই জানো, এটা একটা অদ্ভূত জায়গা। সমুদ্রের মধ্যে একটা কাল্পনিক ত্রিভুজের মতো অঞ্চল। এককালে এখানে প্রচুর জাহাজডুবি হয়েছে। উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের এই জায়গায় অনেক এরোপ্লেন পর্যন্ত হারিয়ে গেছে। প্রচুর গল্প, প্রচুর ভয়ের কাহিনি লেখা হয়েছে এসব নিয়ে। পরবর্তীকালে বিজ্ঞানীরা বলেছেন, এসব নিছক বানানো গল্প। এই অঞ্চলে এই সব উড়োজাহাজ আর জলের জাহাজ হারিয়ে যাওয়ার পিছনে প্রচুর বিজ্ঞানসম্মত ভৌগোলিক কারণ রয়েছে। ইন্টারনেট খুলে সেসব নিয়ে পড়তে পড়তে দুজনে ঠিক করে একবার বারমুডা ট্র্যাঙ্গেলে যাওয়া যেতে পারে। তবে অবশ্যই সাইকেলে নয়। সেটা অসম্ভব। এই অভিযানে গেলে তার জন্য টাকা-পয়সা জমাতে হবে। ওরা হিসেব করে দেখেছে সেই অভিযানে যেতে গেলে ওদের প্রোচুউউউর টাকা জোগাড় করতে হবে।
এর পর থেকে তিস্তু সাইকেলে অভিযানের পরিকল্পনা কমিয়ে দেয়। চং এসে খবর দিয়েছে, তিস্তু আর গোল্লু অনেক পড়াশুনো করে, বিরাট চাকরি করে গাদা গাদা টাকা জমিয়ে তারপর এইসব অভিযানে যাবে। তখন দরকারমতো ওরা একটা ভালো প্লেন আর একটা ছোটোখাটো জাহাজও কিনে নেবে।
তোমরা যাবে নাকি? একবার ইন্টারনেট খুলে জায়গাটা সম্পর্কে পড়ে ফেলো আগে। তারপর ওই জাহাজ কিংবা প্লেন কেনার টাকা জমানোর জন্য তৈরি হও।
গোল্লু সাইকেল চালানো ছেড়ে দিয়েছিল অনেক আগেই। আপাতত সে কেমিস্ট্রি ফর্মুলা মুখস্থ করছে।
ও হ্যাঁ, এখন সাইকেলটার ওপরে চড়ে বসে থাকে চং। সাইকেলের হ্যাণ্ডেলের পাশ দিয়ে দুলছে ওর সুন্দর সাদা মখমলের মতো লেজ। চং করবীগাছের ডালে বসা পাতিকাকের দিকে তাকিয়ে সুর করে গাইছে, “কিন্তু ভাই বড়ো দুঃখ আমার যে পাখা নাই।”
কাকটা গোমড়ামুখে বলল, “কঃ।”
৫
চং-এর গান
চং এসে একদিন জিগ্যেস করল, “আচ্ছা মাসি, সব বাড়িতে সব বাচ্চারা শুনি গান-টান শেখে। তিস্তু আর গোল্লু কেন গান শিখল না?”
“সে এক বড়ো দুঃখের কাহিনি। একদিন সময় করে তোকে বলব চং।”
আমার মনে পড়ে, তিস্তু ছেলেবেলা থেকেই স্বরচিত গান করে। নিজের কথা, নিজের সুর। বা কখনও বইয়ে পড়া কানে শোনা ছড়া, সঙ্গে নিজস্ব সুর। ধরা যাক, ওকে একটা রবীন্দ্রসঙ্গীত শোনানো হল। ‘আলো আমার আলো ওগো আলো ভুবন-ভরা’, তোমরা গানটা জানো নিশ্চয়ই। না জানলে শুনে নিও, কেমন? তিস্তু শুনল, বেশ মন দিয়ে শুনে মুখস্থ করল। ছোটোদের আসলে খুব চটপট সব মুখস্থ হয়। তিস্তু তারপর চেঁচিয়ে গাইল। তারপর হঠাৎ একদিন সাতসকালে শুনি ওই একই সুরে ও গাইছে ‘জোনাকি আলো, জোনাকি আলো, জোনাকি আলো রে/ জোনাকি আলো কেমন আছিস, কেন জ্বলিস রে’। উচ্চারণের ব্যাপারে ‘জ্বলিস’-টা ‘দোলিস’ বা ‘আছিস’ শব্দটা ‘আতিস’ হয়ে গেলেও কিংবা জোনাকিকে ‘দোনাকি’ বললেও গানটা বেশ বোঝা যাচ্ছে। শুনেটুনে আমি প্রথমে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম। ইকিরে বাবা! এ কি কাণ্ড! তিস্তুর বাবা-মা ভারী ব্যস্ত। তিস্তুর ভাষায় বাবা কলেজে গিয়ে চক দিয়ে বোর্ডে অ-আ লেখে (আসলে ওর বাবা কলেজে বাংলা পড়ান) আর মা অফিসে গিয়ে কম্পুতারে গেম খেলে (আসলে তিনি অফিসের কম্পিউটারে অত্যন্ত জরুরি কাজ করেন)। তাঁরা তিস্তুর গাওয়া গানটা দিনেরাতে অসংখ্যবার শুনেছেন ঠিকই, কিন্তু মর্ম উদ্ধার করতে পারেননি। কেন এই গান, কী এর প্রয়োজন, গানটির উপকারিতা, অপকারিতা সব কিছু নিয়ে তাঁরা অন্ধকারে। আমি মন দিয়ে গানটা আরও কয়েকবার শুনলাম। ডেকে গাইতে বললে নিজে গাইত কি-না সন্দেহ, আমি জানলায় আড়ি পেতে শুনলাম। তারপর বুঝলাম, এ হোল একটা সৃষ্টিশীল ব্যাপার। একে খুব উৎসাহিত করতে হবে।
তখন তিস্তুর বছর তিনেক বয়স। বা তার কম। এখন আর মনে নেই। আমি গিয়ে বসলাম ওর পাশে। তিস্তু দোলনা চেয়ারে দোল খাচ্ছে, আমি মেঝেতে। ওর চারদিকে নানান রঙের পুতুলেরা রয়েছে। কারও নাম লালু, কারও নাম নীলু, কারও নাম হলদি। আমি বসে প্রথমে খানিকক্ষণ ওর হাতে সুড়সুড়ি দিলাম। তারপর ওর গানটা সামনে বসে সুর করে গাইতে চেষ্টা করলাম। ও হাতের নীল রঙের পুতুলটাকে দোলাতে দোলাতে উদাসীন মুখ করে আমার গানটা শুনল। ভাবখানা এমন, নিজে গাইছ গাও না, আবার আমাকে এসে শোনানো কেন বাপু?
আমি উসখুস করি, “আচ্ছা তিস্তু, এটা কী গান?”
তিস্তু গম্ভীরভাবে বলল, “দানো না, এতা দোনাকি আলোর গান।”
“এটা তুমি কোথায় শিখেছ?”
“সে আতে একদোন। বলব না।” তিস্তু চোখ গোল করে বলল। আসলে ছোটোমানুষরা বড়োদের সব সময় বিশ্বাস করতে চায় না। সেটা আমাদেরই দোষ, আমরা তাদের মনের কাছাকাছি পৌঁছতে পারি না। হয় বকাবকি করি, নাহলে সন্দেহজনক প্রশ্ন করে তাদের মাথাটা ঘেঁটে দিই।
“তা’ বেশ। কিন্তু আমাকে গানের মানেটা একবার বুঝিয়ে দাও না গো, আমি যে গান শুনে কিচ্ছু বুঝতে পারছি না, “আমি কাঁচুমাচু মুখ করে বললাম বলে তিস্তুর একটু করুণা হোল। আসলে আমার মতো তাং-ব্যাং জাতীয় বেচারা প্রাণীর প্রতি ওর অঢেল দয়া। আমাকে ও বয়সে এবং বুদ্ধিতে নিজের সমান-সমান মনে করে এসেছে বরাবর। এখনও তা-ই করে। আমি মেনে নিই।
তিস্তু যেটা বলল, সেটা ওর সেই আড়াই বছর বয়সের ভাষায় আমি এখানে লিখে দিলাম, দেখো দিকি তোমরা পড়ে বুঝতে পারো কি-না। না বুঝতে পারলে আমাকে ফোন করে জিগ্যেস কোরো, আমি বুঝিয়ে বলে দেব। কিন্তু খবরদার তিস্তুকে যেন কেউ কিছু জিগ্যেস করতে যেও না। ওর ছেলেবেলার কীর্তিকলাপ ফাঁস করে দিলে সে বেচারা ভারী লজ্জা পাবে।
তিস্তু বলল, “শোন তাং-ব্যাং, আথোলে দোনাকিরা উড়ে উড়ে আলো কচ্ছিল। তুপ করে জ্বলে, ধুপ কোয়ে নিভে দায়। লোদছেদিং হলে নিভে দায়। আর কারেন্ এলে আলো ভ্যানিত। ওদের জন্য আমি গান কচ্ছি। ওরা গান থুনবে। আর আলো কর্বে। খুব মদা হবে।”
“ও বুঝেছি। তুমি জোনাকিদের জন্য গান গাইছ? খুব ভালো। জোনাকিরা গানটা শুনল? কী বলল শুনে?”
“জোনাকিরা খুথি। খুব মদা পেল। হাততাই দিল। তাই তাই তাই, তিত্তুবাই দাই, তিত্তুবাই ভালি মদা, কিলতড় নাই।” তিস্তু হাসছে, আমি হাসছি, দুজনে হাততালি দিয়ে গান ধরছি, জোনাকি আলোর গান।
সেটা তিস্তুর লেখা বা তৈরি করা প্রথম গান। তিস্তুর এ-ধরনের গানে ছিল প্রবল উৎসাহ। জোনাকি আলোর তুমুল সাফল্য সম্বন্ধে আমরা তখন নিশ্চিত। সন্ধে হলেই বাড়িতে জোনাকি আলোর গান ভেসে আসছে। তিস্তুর ধমকে মাঝেমধ্যে ঘরে ইলেক্ট্রিক আলো-টালো সব বন্ধ করে দিতে হচ্ছে। যাতে জোনাকিরা উড়ে উড়ে আলো দিতে পারে। গান শুনে নিশ্চয়ই মজা পায়। একদিন বললাম, “তিস্তু জোনাকি পোকারা তো সন্ধেবেলায় আসে, রাত্তিরে সেসব গান হয়, আমরা শুনি। ওরাও শোনে। ওদেরও মজা লাগে, আমাদেরও ভারী ভালো লাগে। এবার দিনের বেলার জন্য একটা গান হতে পারে না?”
তিস্তু জিগ্যেস করল, “দুপুর বেলা পোকা নেই নেই। তবে কিতের গান হবে?”
আমি বললাম, “পোকা নেই তো কী হয়েছে? আমরা কুকুর বিড়াল পাখিদের নিয়ে গান বানাব।”
তিস্তু বলল, “তা-লে তুমি আগে অ্যাকতা গান কলো।”
আমি পড়লাম মহা ফাঁপরে। কুকুর কিংবা বেড়াল নিয়ে কিছুই গান-টান জানি না। একমাত্র পাখিদের নিয়ে ‘বুলবুল পাখি ময়না টিয়ে’ আর ‘পাখিদের ওই পাঠশালাতে কোকিল-গুরু শেখায় গান’ মনে পড়ল। কী করা যায়? হঠাৎ কী মনে হল, বাজারচলতি একটা হিন্দি গান, যেটার কোনও কথা আমি স্পষ্ট জানি না, কেবল ‘তেরা সুরুর’ বলার পরে হুউউউ বলে একটা টান রয়েছে সুরে, শুনলে বলে হয় ঘেউউউউউ বলে কেউ ডাকল, সেটা বেশ ভাব দিয়ে গাইতে শুরু করলাম।
তিস্তু এ গান লুফে নিল একদম। দিন দুয়েক ধরে আমি ‘তেরা তেরা তেরা’ বলে সুরটা গুঁজে দিলাম ওর মাথায়। সকালে একদিন ঘুম ভেঙে শুনি তিস্তু গাইছে, ‘পাতের বাইর নেলি কুকুর… ও কুকুর, তুই অ্যাকতা নেলি কুকুর, উউউউউ কুকুর’…। আহা সে কি গান! শুনে আশেপাশের রাস্তার নেড়ি কুকুরেরা খানিক থমকে দাঁড়াত আমাদের বাড়ির সামনে। সুরেলা কচি গলায় ‘পাশের বাড়ির নেড়ি কুকুর’-এর প্রতি যে আবেগ ঢেলে দিয়েছিল তিস্তু, সে আমরা ভুলব না। পাড়াসুদ্ধ যাবতীয় নেড়ি কুকুর আমাদের বাড়ির চারপাশে ঘুরপাক খেতে লাগল।
ব্যস। সেই শুরু। বেশ কিছু গান পরপর তৈরি হতে লাগল। আমি আর দিদিভাই আমাদের ছেলেবেলায় ‘সে আমার ছোটো বোন’ শুনে শুনে তৈরি করা প্যারডি গান ‘সে আমার বাসনকোসন’ গানের কথা মনে করতে লাগলাম। তোমাদেরই বলছি, একটুও গর্ব করে মিথ্যে মিথ্যে বানিয়ে বলছি না, আমাদের বাড়িতে গান গাওয়ার একটা ঘরানা বহুকাল ধরেই ছিল। সকলে ন্যাচরাল সিঙ্গার। আমার ছোটোমামা শীতকালে সাতসকালে পাতকুয়োর কনকনে ঠান্ডা জলে হুড়মুড় করে স্নান করে এসে গান করতেন ‘জোছনা করেছে আড়ি, আসে না আমার বাড়ি/ গলি দিয়ে চলে zায়, লুটিয়ে রূপোলি শাড়ি’। এখন তোমরা যদি জিগ্যেস করো, কে জোছনা আর শীতের সকালে জোছনা কেন আমাদের বাড়িতে আসবে, তাহলে আমাদের যুক্তি পরিষ্কার। জোছনার ইচ্ছে হলে সে আসবে। কি এমন অসুবিধে? গান তো মানুষ প্রাণের আনন্দে গায়। গানের কোনও সময় হয় না, যখন যেটা খুশি তখন সেটা গাইব। ভরদুপুরে বসে ‘বাঁশবাগানের মাথার ওপর চাঁদ উঠেছে ওই’ গাইতেই পারি। শুধু ছোটোমামার একটা যুক্তি সারা জীবন মাথায় গেঁথে আছে। ছোটোমামা বলতেন, ‘সব ক্লাসিক্যাল গানের অনুষ্ঠান আর জলসা শীতকালে রাতের বেলায় হয় কেন জানিস? আসলে ওই হাড়-কাঁপানো ঠান্ডায় গলাটা চমৎকার কাঁপে। আর তাতে রাগের কারুকাজগুলো গলায় দিব্যি খোলে।’
কী ভয়ংকর যুক্তি।
হ্যাঁ, কথা হচ্ছিল কোন গান কখন গাইব। আমার যদি প্রচণ্ড গরমের দুপুরে ‘শীতের হাওয়ায় লাগল নাচন আমলকির ঐ ডালে ডালে’ গাইতে ইচ্ছে করে, আমার কী দোষ? আমরা এই ‘ভালো-লাগা’ নীতিতে চলি। বাড়িটা কি রেডিও স্টেশন, যে সারাক্ষণ গানের আইন মেনে গাইতে হবে? এই যুক্তি মাথায় রেখে আমরা বেড়ে উঠেছি। আমাদের বাড়ির মা-মাসি, মামা-মামি সকলেই দুরন্ত গান করেন, কাজেই তিস্তুও ক্রমে ক্রমে দুরন্ত গানওয়ালা হয়ে উঠবে, এতে আর আশ্চর্যের কী আছে!
তিস্তুর স্বরচিত গান অবশ্য বেশিদিন চলল না। আসলে ছোটোবেলায় মানুষেরা ভীষণ আগ্রহ নিয়ে সব পারে আর সব করতে চায় কি-না, তাই কিছুদিন পর পর তাদের ইচ্ছে উৎসাহ সব পালটে পালটে যেতে থাকে। গানের কিছুদিন পরে তিস্তু বাস্কেটবল নিয়ে প্রচণ্ড ব্যস্ত হয়ে পড়ল। অতএব, তখন নিজের লেখা গান ফুরিয়ে গেল, বারান্দা আর ছাদ জুড়ে শুরু হল ধাঁই ধাঁই শব্দ। বেশ কয়েকটা ফুলের টব ভাঙল, হাঁটুতে আর কনুইতে কালশিটে পড়ল। কিন্তু উৎসাহে ভাঁটা পড়ল না।
এসব গল্প গোল্লুকে অনেক শুনিয়েছি। ওই যেমন হয়। বাড়িতে একটা বড়ো দাদা বা দিদি থাকলে তার যাবতীয় গল্প ছোটো ভাই-বোনদের শুনতে হয়। আমরা অবিশ্যি খুব বুঝদার বাবা-মা, কক্ষনও তুলনা করি না, কক্ষনও বলি না, দেখো তোমার দিদি কত ভালো গান লিখত আর গাইত, তুমি কেন অমন করো না? গোল্লু গোল্লুর মতো, তিস্তু তার নিজের মতো। তুলনা করে কী হবে?
এই গানের গল্পগুলো গোল্লুর সঙ্গে সঙ্গে চং-ও শুনেছে।
জোনাকি আলো, পাশের বাড়ির নেড়ি কুকুর, কিন্তু ভাই বড়ো দুঃখ– এইসব গানগুলো আজকাল ওরা তিনজনে মিলে গলা ছেড়ে গায়। আমিও মাঝেমধ্যে যোগ দিই। ওরা ভাবছে একটা ইউ টিউব চ্যানেল করে এসব গান ওরা ইউ টিউবে ঢেলে দেবে। সেসব নিয়ে আমারও বেশ উৎসাহ। এসব গান শুনে আমার মা কিঞ্চিৎ বিরক্ত হন ঠিকই, কিন্তু নাতনিদের তিনি বকেন না। যত বকুনি সব আমার বরাদ্দে জোটে।
“শোনো, সকাল-বিকেল হাঁড়িচাচার মতো না চেঁচিয়ে, হারমোনিয়ামটা নিয়ে তো বসতে পারো। একটু গলা সাধলে, একটা রবি ঠাকুরের গান গাইলে, কি অতুলপ্রসাদ। সন্ধেবেলা বা সকালবেলা একটু ঠাকুরের গান-টান হোল। বাড়িটা পবিত্র হয়। তা’ নয়। নিজে তো সব ভালো জিনিস ভুলে গুলে খেয়ে ফেলেছ, এদিকে বাড়ির বাচ্চাগুলোকে যত আজেবাজে চেঁচামেচি শেখাচ্ছ, একটা সুস্থ সাংস্কৃতিক পরিবেশ নেই বাড়িতে।”
মা বলেই চলেন, আমি শুনেই চলি। দূরে দেখতে পাই চং জানলার বাইরে পাঁচিলে বসে ল্যাজ নাড়াচ্ছে। আমি জানি মায়ের বকুনি শেষ হলেই ও এক লাফে চলে আসবে আমাদের খাবার টেবিলের তলায়।
যথারীতি তা-ই হোল। মা বকুনি দিতে দিতে ক্লান্ত হন না, ইস্কুলে পড়িয়ে অভ্যেস তো। একটানা পঁয়তাল্লিশ মিনিট নাগাড়ে বলে যেতে পারেন। গলা শুকোয় না। ভাগ্যিস তাঁর মোবাইল ফোন বেজে উঠল। উফ! কী ভাগ্যি! মা নিজের ঘরের দিকে হন্তদন্ত হয়ে চলে যেতেই চং এসে হাজির।
“শোনো মাসি, দিদার বকুনি শুনে মন খারাপ কোরো না, “চং আমার দিকে তাকায়। ওর দু-চোখে আমার প্রতি এত মায়া দেখে আরেকটু হলে আমার চোখে জল আসছিল, আমি নিজের প্রায় ভিজে-যাওয়া চোখ মুছি, “বল চং, কী বলতে এসেছিস।”
“মাসি, তুমি বরং তিস্তু-গোল্লুর গান গাওয়ার আরও গল্প বলো। শুনি।”
আমি নড়েচড়ে বসি। গল্প লেখা এবং বলা দুটোই আমার পছন্দের কাজ।
“জানো চং, তখন আমি নিয়মিত গান প্র্যাকটিস করতাম। একদিন আমি হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান গাইছিলাম। আনন্দধারা বহিছে ভুবনে। আরে, সেই চমৎকার রবীন্দ্রসঙ্গীতটা। তিস্তু তখন ইস্কুলে পড়ে, ক্লাস টু। সে এসে আমার পাশে বসে গানটা শুনে শুনে একবার হঠাৎ গেয়ে উঠল। বেশ ভাব দিয়ে আআআআআ করে নন্দধারা অবধি পৌঁছেছে কি পৌঁছয়নি, অমনি টুপ করে একটা টিকটিকি লাফিয়ে পড়ল আমার হারমোনিয়ামে রাখা স্বরবিতানের ওপর, আর পড়েই সরসর করে নেমে বিছানায়, সেখান থেকে সিধে মাটিতে। দৃশ্যটা শুধু চোখ বন্ধ করে কল্পনা করো একবার। একে টিকটিকি, তার ওপর প্রায় গায়ের ওপর লাফিয়ে পড়া টিকটিকি। ইস! আমি তো দেখে চমকে গিয়ে ভয়ে-ঘেন্নায় সিঁটিয়ে চুপ। তিস্তু আনন্দধারার শুরুর আআআআ করতে করতে পট করে থেমে বলল, “ওটা কী গেল তাং? টিকটিকি?”
আমি ঘাড় নেড়ে ‘হ্যাঁ’ বলামাত্র তিস্তু ছিটকে দাঁড়িয়ে পড়ল বিছানার ওপর, আর সঙ্গে সঙ্গে হাঁ করে ডাক ছেড়ে সে এক বীভৎস কান্না।”
চং হাঁ করে গল্প শুনছে। তোমরা গল্পটা মন দিয়ে পড়ছ আমি জানি।
“শুরু হোল তিস্তুর কান্না! তোমরা শুনেছ কেউ? উফ! চং, তোর তো শোনার প্রশ্নই ওঠে না। বাপ রে! অত বড়ো হাঁ করে কেউ কাঁদলে তার মুখে অনায়াসে ভরে দেওয়া যাবে একটা গোটা রাজভোগ। তিস্তু কান্না শুরু করামাত্র আমরা বলতাম, ওরে অত বড়ো হাঁ করিস না। হাতি ঢুকে যাবে। আর ইস্কুলে ওই কান্নার জন্য আন্টিরা ওর নাম দিয়েছিলেন লাড্ডু। ছেলেবেলায় গোল্লু ছিল আবার আরও এক কাঠি সরেস। সে কেঁদেই যাচ্ছে, আর আমরা ক্রমাগত বলছি, ওরে এবার থাম। আর কাঁদিস না। কান্নাকাটির কারণও হয়ত মিটল। তবু সে আরও কেঁদে বলবে, আমি কান্না থামাতে পারছি নাআআআআআআ।”
কি মুশকিল বলো দেখি!
এই হল তিস্তুর গান শেখার গল্প। ওই ‘আনন্দধারা’র মধ্যে টিকটিকি লাফিয়ে পড়ার পর ওকে আর গান গাইতে বসাতে পারলাম না। এরপর তাকে কিনে দেওয়া হোল একটি সিন্থেসাইজার। সে দিব্যি বাজাতে লাগল ঝমাঝম করে।
চং চোখমুখ কুঁচকে বলল, “এ হে হে, একটা পাজি টিকটিকির জন্য তিস্তুটার আর ভালো করে গান শেখা হল না। কোনও মানে হয়? আর গোল্লু? ওর কী হোল হঠাৎ?”
গোল্লু পুঁচকে বেলা থেকেই চমৎকার গান গাইত। হারমোনিয়াম বাজাত। গীতবিতানের ক্লাসে যেত। বর্ণালী আন্টি শেখাতেন, সব কাজে হাত লাগাই মোরা। সেটা ওর জীবনের প্রিয় গান ছিল। তিস্তুর শেখানো গান ‘কিন্তু ভাই বড়ো দুঃখ আমার যে পাখা নাই’ খুব দরদ দিয়ে গাইত। একটু বড়ো হয়ে তার মনে হোল, এইসব ক্লাসিক্যাল আর রবীন্দ্রসঙ্গীতের চক্কর তার তেমন ভালো লাগছে না। সে ড্রাম বাজাতে চায়। আমি তো শুনে প্রমাদ গুনলাম।
“ড্রাম কেন গোল্লু?”
“কারণ আমি ড্রামার হতে চাই।”
“হ্যাঁ, খুব ভালো কথা, ড্রামার হতে চাইলে সে তো খুবই ইয়ে ব্যাপার, “রেগে যেতে যেতেও খুব ঠান্ডা মাথায় বলি, “তবে কি-না ড্রাম বাজাতে হলে ড্রাম কিনে একটা বড়ো জায়গায় রাখতে হবে, প্রথমে একটা ফাঁকা বড়ো ঘর চাই। সেটা আমাদের নেই। তারপর সেই জায়গাটায় বসে বসে ড্রাম বাজালে, মানে প্র্যাকটিস করলে যে শব্দ হবে, তাতে আমাদের এবং আশেপাশে আর সকলের তো কান ঝালাপালা হয়ে যাবে…”
গোল্লু বলল, “আমার কোনও ঘর লাগবে না। আমি সব ঠিক করে ফেলেছি। আমি ছাদে ড্রাম রাখব। ওখানে অনেক জায়গা। ছড়িয়েছিটিয়ে বসব। ওখানে বসেই প্র্যাকটিস করব।”
“তোমার ইস্কুল আছে, পড়াশুনো আছে, সারাদিন তুমি ছাদে বসে ড্রাম বাজাবে?”আমি শান্ত থাকার চেষ্টা করি।
“আহা, সারাদিন বাজাব কেন? রাত্তিরে বাজাব, “গোল্লু ঠান্ডা গলায় বলল। গোল্লু আসলে ওই তোমরা যেমন বলো, সেইরকম কুল।
আমি তো পরিকল্পনা শুনে আঁতকে উঠি।
ভেবে দেখো কাণ্ড। রাত্তিরে যখন সবাই ঘুমোতে যাচ্ছে, বা প্রায় ঘুমিয়েই পড়েছে, সেই সময় দুমদুমাদুম ড্রাম পেটানো শুরু হোল। কেউ ঘুমোতে পারবে? কেউ সহ্য করবে? আমরা এই পাড়ায় আর বাস করতে পারব?
“না গোল্লু, এটা অসম্ভব। রাত জেগে খোলা ছাদে বসে ড্রাম পেটানো…”
“মা, ল্যাংগুয়েজ প্লিজ। পেটানো নয়, বাজানো। এটা একটা আর্ট অ্যাণ্ড এস্থেটিক্স-এর ব্যাপার।”
আমি ক্রমশ গলা চড়িয়ে ফেলছি, “রাখো তোমার আর্ট অ্যাণ্ড এস্থেটিক্স। এটাকে আর্ট বলে না। এস্থেটিক্স তো বলেই না। কেবল ভুলভালো ইংরেজি বলছ। রাতদুপুরে ছাদে বসে কারা গান গায় জানো?”
“আমি গান গাইছি না, তুমি ভুল করছ, “গোঁজ হয়ে বলল গোল্লু।
“ওই হোল। পাড়ায় আমাদের একটা মানসম্মান আছে, বাড়িতে এসে সকলে আমাদের চাঁদা তুলে পিটিয়ে যাবে। বাড়ির মধ্যে ড্রাম বাজতে থাকলে সকলে আমরা পাগল হয়ে পাগলাগারদে চলে যাব। না-হলে গণধোলাই খেয়ে হাসপাতালে। দিদা একে কানে ভালো শুনতে পান না। তাঁর কী অবস্থা হবে ভেবে দেখেছ? বা হয়ত দিদা কানে শুনতে পান না বলে তিনি এযাত্রা রেহাই পাবেন। আমাদের কী হবে? আমরা বাড়ি থেকে পালাই বরং। তারপর তুমি একা একা বসে ড্রাম বাজিও। জানো, যখন রোম পুড়ছিল…, “আমাকে কথা শেষ করতে দিল না গোল্লু, গম্ভীরভাবে বলল, “হ্যাঁ জানি, কে একটা রাজা বসে বেহালা বাজাচ্ছিল, আমাকে দিদান বলেছে। বাট দিস ইজ নট রোম… আর আমি রোমের রাজা নই, আমি বেহালাও বাজাব না। ওটা খুব কঠিন বাজানো। তার চেয়ে বলে দাও বরং ড্রাম কিনে দেবে না। একবারে বলে দিলেই হয়। এত ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে দুঃখ দেওয়া কেন বাপু?”
গোল্লু মুখ গোঁজ করে চটির ধুপধুপ শব্দ শুনিয়ে নিজের ঘরে চলে গেল। জানি, খুব রেগে গেছে, অভিমান হয়েছে, ফ্যাঁচ ফ্যাঁচ করে কাঁদবে নিশ্চয়ই কিছুক্ষণ। সে যাক। ড্রামের বাদ্যি শুরু হলে সেটা সুস্থ ব্যাপার হবে না। আমাদের কাঁদতে বসতে হবে। গোল্লু ড্রাম না-পাওয়ার শোকে-দুঃখে গান গাওয়াও ছেড়ে দিল। কোনও মানে হয়?
চং সব শুনেটুনে বলল, “বুঝেছি মাসি। তিস্তুর টিকটিকি আর গোল্লুর ড্রাম মিলিয়ে বাড়িতে গানের পরিবেশটাই ঘেঁটে গেল।”
“অ্যাই, কে বলেছে ঘেঁটে গেল? সকাল থেকে মা রেডিওতে গান শোনে, আমি গান শুনি। কত সময় গাই। গান তো নিজের প্রাণের আনন্দের জন্য। যা খুশি শোনো, যা খুশি গাও। শুধু অন্যকে বিরক্ত করো না। ব্যস। কিন্তু চং, তুই হঠাৎ তিস্তু-গোল্লুর গানের গল্প শুনতে চাইছিস যে! ব্যাপারটা কী?”
“আসলে মাসি, “চং একটু আমতা-আমতা করে, “আমি নিজে এবার গানের তালিম নেব ভাবছি। তুমি যদি আমাকে একটু শিখিয়ে-পড়িয়ে দাও। মানে আমি তো ওই তাল-টাল একেবারে জানি না, “চং-এর গলাটা বেশ সুরেলা লাগছে না? একটু লাজুক, একটু ভীতু। কেমন সংকোচ, আহা!
“আমি ক-দিন ধরেই ভাবছি মাসি। এই যে চারপাশে হাওয়ার মধ্যে এত কার্বন-ডাই অক্সাইড, জলের মধ্যে ময়লা, খাবারে ভেজাল, তিস্তু বলছিল চারদিকে সব দেশে কীসব মারামারি… সব মিলিয়ে খুবই চাপের জীবন। আমরা তো কিছুই বদলাতে পারব না, তার চেয়ে নিজেদের যদি একটু বদলাই? একটু গান গেয়ে, মানে, আজেবাজে হাঁউমাউ চেঁচিয়ে কান ঝালাপালা করা গান নয়, একটু ভালো মিষ্টি সুর, সুন্দর ভালো ভালো কথা… মনটা ভালো থাকবে। কেমন হয় মাসি?”
“খুব ভালো বলেছিস চং, আমি ভাবতে পারিনি তুই এভাবে ভাবতে পারিস।”
আমার চোখে জল এল।
চং একটু লাজুক চোখে তাকিয়ে বলল, “সে যা-ই বলো, তিস্তু আর গোল্লু আমার একমাত্র ভরসা, আর তুমি আমার একমাত্র অনুপ্রেরণা।”
আমি ভাবছি চং-এর জন্য একটা গানের ক্লাস শুরু করব। না না, তিস্তু-গোল্লুকে আর নেব না। শুধু আমি আর চং।
কী কী গান শেখানো যায়, সেটা ঠিক করিনি এখনও। দুজনেই ভাবছি। তোমাদের মাথায় কোনও আইডিয়া এলে জানিও কিন্তু। তবে অবশ্যই বাংলা গানের লাইন বলবে। কেমন?
৬
চং এবং
কী বিষয় নিয়ে উপন্যাস লেখা যেতে পারে, তা-ই নিয়ে বাংলা ক্লাসে আলোচনা শুরু করলাম একদিন। বেজায় চিন্তা আমার তোমাদের নিয়ে। তোমরা নাকি বাংলা বই পড়ো না! তাহলে এমন কিছু লিখতে হবে, যা কি-না তোমরা লাফিয়ে-ঝাঁপিয়ে পড়বে।
সৌপ্তিক প্রথমে হাত তুলল।
“আন্টি, তুমি একটা গায়ে কাঁটা দেওয়া ভূতের গল্প লেখো। যেটা পড়লে গায়ের সব লোম খাড়া হয়ে যাবে। মাথার চুল পর্যন্ত খোঁচা খোঁচা হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে থাকবে।”
পাশ থেকে চং ফুট কাটল, “শিরদাঁড়া বেয়ে ঠান্ডা হিম স্রোত নেমে যাবে।”
আমি শুনে মুগ্ধ। আহা! ওরা কত চমৎকার বাংলা বাক্য বলছে!
“ওরে, গল্প হলে চলবে না, উপন্যাস লিখতে হবে।”
অনুষ্কা ক্লাসে নতুন, সে বলল, “তাহলে তো সেই লেখাটা আবার অনেকক্ষণ ধরে পড়তে হবে।”
“হ্যাঁ, সে তো হবেই।”
“বা রে! আমি যে গড়গড় করে অতক্ষণ ধরে বাংলা পড়তে পারি না। কঠিন বানান দেখলে আটকে যাই, “অনুষ্কা আরেকটু হলে কেঁদেই ফেলবে।
“তুই মা-কে বলবি পড়ে শুনিয়ে দেবে।”
রঞ্জিনী কাঁদো-কাঁদো মুখে বলল, “ভূত-টুত ভালো নয়। আন্টি, তার চেয়ে তুমি একটা অ্যাডভেঞ্চার লেখো। ফেমাস ফাইভের মতো। বা থ্রি মাস্কেটিয়ার্স।”
“হুম। সে লেখা যায়। তোদের নিয়েই লিখব ভাবছি।”
শুনে ওদের চোখমুখ চকচক করে উঠল।
চং চুপ করে বসেছিল। সব শুনল। দুপুরে খেতে বসেছি, খাবার টেবিলের পাশে জানলায় এসে বসল। আমি বেশ জানি, আমার মা ওকে এই সময় দেখলে খুব বকাবকি করেন। ওর জন্য আমরা বাটিতে করে মাছের মাথা, মাছের কাঁটা, মাছের ঝোল-মাখানো ভাত আলাদা করে রাখি। কিন্তু ওকে আমাদের পাঁচিলে বসে বসে খেতে দেখলে মা রেগে যান।
মায়ের বক্তব্য, “পাঁচিলটা এঁটো হচ্ছে দেখছিস না?”
আমি একদিন বুঝিয়েছিলাম, মানে মা-কে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলাম, “আরে বাবা, এঁটো হবার কী আছে? ও তো কোথাও খাবার ছড়াচ্ছে না। বাটির মধ্যে করে খাচ্ছে। তোমার বাপু সবেতেই বড্ড বাড়াবাড়ি।”
মা শুনলেন না, গজগজ করতে লাগলেন, “ওখান থেকে আঁকশি দিয়ে পুজোর ফুল পাড়ি, পাঁচিলসুদ্ধ তোরা এঁটো করে দিচ্ছিস। ওকে তোরা রান্নাঘরে এসে বসে খেতে বল।”
চং চোখ মটকে বলল, “ও মাসি, দিদার যুক্তি অনুযায়ী তোমার খাবার টেবিল পুরোটাই তো এঁটো… সেখান থেকে মেঝে, মেঝের পাশে দেওয়াল… এঁটো হয়ে গেল পুরো বাড়িটাই। খিক খিক!”
আমি কার কথায় হাসব, কার কথায় রাগব, তোমরাই বলো।
সে যাই হোক, সকালের বাংলা ক্লাসে ক্ষুদে ছাত্র-ছাত্রীরা আমি কী বিষয়ে লিখব, তা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করার পর চং এসে দুপুরে জানালার পাশে বসে বলল, “মাসি, তুমি তিস্তু-গোল্লুর বন্ধুদের নিয়ে একটা অ্যাডভেঞ্চার লেখো বরং। ওরা পড়বে, ওদের ক্লাসের বন্ধুরা পড়বে। পড়ে মজা পাবে।”
হুম। ব্যাপারটা ভেবে দেখার মতো। ওদের নিয়েই লেখা যেতে পারে। পাঁচজন কিশোরীর অ্যাডভেঞ্চার। খারাপ নয়।
হঠাৎ চং আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “আচ্ছা মাসি, দেশ কাকে বলে?”
আমি একটু অবাক হলাম। চং হঠাৎ এমন প্রশ্ন করে যে!
“কেন রে? কী হয়েছে?”
“না, ওই দিকের বাড়ির একটা বুড়ো দাদু কেবল বসে বসে কাঁদছে ক-দিন ধরে, কেবল বলছে, আমায় তোরা দেশে পাঠিয়ে দে, আমি দেশে চলে যাই। আর তার বাড়ির সব লোক কেবল বলছে, সে দেশ কি আর আছে না-কি, সেসব এখন অন্য দেশ। সেখানে যেতে চাইলেই আর যাওয়া যায় না। অনেক ঝামেলা। অনেক কাগজপত্র লাগে। তোমাকে এখন কে নিয়ে যাবে? গেলেও ঢুকতে দেবে না। আমি মাঝে মাঝে শুনছি আর সে-ই থেকে ভাবছি, দেশ ব্যাপারটা ঠিক কোন জায়গা? কেন দাদু সেখানে চাইলে যেতে পারবে না?”
শুনে মন খারাপ হয়ে গেল। আমাদের পাড়ায় একটা দোতলা বাড়ির একতলায় ভাড়া নিয়ে এসেছে একটি পরিবার। সেই পরিবারের দাদুর কথা বলছে চং। সেই মানুষটি খুবই বয়স্ক, বেশ অসুস্থ। বিছানায় শুয়ে থাকেন, মাঝে মাঝে লাঠি হাতে বাইরে পায়চারি করেন। ইজিচেয়ারে বসে থাকেন। দেখেছি, কিন্তু আলাপ হয়নি এখনও। চং তো সারাদিন পাড়া বেড়ায়, ও শুনে এসেছে। চং-কে আমি কী বোঝাব, আমি নিজেও জানি না কেন কেউ তার নিজের ফেলে আসা দেশের বাড়িতে যেতে পারবে না।
আমিও তো ফিরে যেতে চাই আমার সেই ছোটোবেলার খেলার মাঠে, যেখানে ছিল আমার পাড়ার বন্ধুরা। গাদি খেলতাম, পিট্টু খেলতাম। বিকেল হলেই মিঠু বিশু মুনমুন রাজু লাল্টু মান্তু সোমনাথদের ‘আয় আয়’ বলে ডাকাডাকি। ইস্কুলের ব্যাগ রেখে কোনওরকমে হাত-মুখ ধুয়ে নাকে-মুখে গুঁজে খেলার মাঠে। কচিরা খেলে লুকোচুরি আর কুমিরডাঙা। লুকোচুরি তোমরা নিশ্চয়ই খেলেছ, কিন্তু ‘কুমির তোমার জলকে নেমেছি’ বলে চেঁচিয়েছ কখনও? জানো, বড়োরা বড়ো মাঠে ফুটবল খেলত। শীতকালে সেখানে নেট টাঙিয়ে রাতে বড়ো আলো জ্বালিয়ে দাদা-কাকারা বাস্কেটবল। দুপুরে চলত আমাদের ব্যাডমিন্টন। একটা পালকের ফেদার-কর্ক নিয়ে, একটা রবারের ফুটবল নিয়ে, একটা ক্রিকেট ব্যাট নিয়ে সকলের ভাগাভাগি। ইঁট দিয়ে উইকেট। নর্দমা থেকে হামেশাই কুড়িয়ে আনা রবারের বল। কত ধূলো, কত নোংরা ময়লা মেখে বাড়ি ফিরেছি। তোমরা অবশ্য এত নোংরা ময়লা মাখবে না, তা-ই না? সেকালে সন্ধ্যে হবার আগেই আমরা ঢুকে যেতাম যে-যার ঘরে। রাস্তার আলো জ্বলার আগে বাড়িতে না ঢুকলে যা বকুনি খেতাম! তখন বান্টিদির মা ধূপ জ্বালিয়ে শাঁখ বাজিয়ে সন্ধ্যে দিচ্ছেন। সোমার মা বারান্দা থেকে জোর বকুনি, ‘এখনও তোরা বাড়ি যাসনি? যা গিয়ে পড়তে বোস’।
ছোটোবেলার ইস্কুল, ছোটোবেলার বন্ধু, ছোটোবেলার জীবনটা কেউ যদি ফিরে দেখতে চায়, সে কেন যেতে পারবে না?
চং যাকে ‘বুড়োদাদু’ বলছে, তাঁরও নিশ্চয়ই এমন একটা ছেলেবেলা আছে। ফেলে আসা ঘুড়ি-দুপুর, মাছ-পুকুর, শ্যাওলা-ঘাট, ধুলোমাঠ সব মনের মধ্যে বাক্সে ভরে রেখেছিলেন। হঠাৎ সেই বন্ধ বাক্সের ঢাকনা আলগা হয়ে হু হু করে উপচে বেরিয়ে আসছে। আমার মায়েরও হয়। সকালে কাগজ পড়তে পড়তে আনমনা হয়ে ছেলেবেলায় নিজের দুষ্টুমির গল্প বলেন। মায়ের কথা, বাবার কথা, ইস্কুলের দিদিমণি-মাস্টারমশাই, বন্ধুদের কথা। কত আত্মীয়স্বজনের গল্প শুনি। মা-ও তো চাইলেই আর ফিরে যেতে পারবেন না সেই জায়গায়। সেটা এখন সত্যিই অন্য দেশ। মা মেনে নিয়েছেন। আমরা মানিয়ে নিয়েছি। আমি বাসে করে ছেলেবেলার পাড়ায় ফিরে গিয়ে দেখতে পাই পাঁচিলের রং বদলে গেছে, গ্রিলের ডিজাইন বদলে গেছে, ফাঁকা জায়গায় দোকান বসে গেছে, ভাঙা মুদির দোকানের জায়গায় ঝাঁ-চকচকে শপিং মল হয়েছে। গেলে অবশ্য আরও মন খারাপ হয়। সব বদলে গেছে দেখে দুঃখ চেপে রেখে বাড়ি ফিরে আসি। কিন্তু তবু যেতে পারি। ওই বুড়ো দাদু বা আমার মায়ের মতো সবটুকু ছেলেবেলা অন্য দেশে হারিয়ে যায়নি।
চং-কে বললাম, “বুঝলি চং, আমার উপন্যাসটা এখনও লেখা শুরু করতে পারিনি। তোর কথায় আমার সব আবার কেমন গুলিয়ে গেল।”
চং ফ্যাঁচ করে হেসে বলল, “আজ হয়নি, কাল হবে। এত তাড়া কীসের?”
তা-ই হোক। সবাই তাদের ছেলেবেলার ঘর খুঁজে পাক। চারপাশে কুয়াশা কেটে গিয়ে জম্পেশ ঠান্ডা আর মাথার চাঁদি ফেটে যাওয়া গরম পড়ুক। বৃষ্টির জলে ধুয়ে যাক আবর্জনা। ফুলেফেঁপে উঠুক নদী-পুকুর-খাল-বিল। পশু-পাখি-পোকামাকড় আনন্দে বেঁচেবর্তে থাক। আর মানুষের জমানো সব অস্তর-শস্তরে জং ধরুক।
আমি এখন জানলার ধারে বসে তোমাদের জন্য উপন্যাস লেখার বিষয় খুঁজছি। তোমরা জানিও তোমরা কে কী পড়তে চাও। কেমন?
জয়ঢাকের সমস্ত গল্প ও উপন্যাস