উপন্যাস-দুর্গাদাস-মুনশি প্রেমচন্দ-অনুবাদ: রাজীব কুমার সাহা-শরৎ’২৬

এই লেখকের আগের সমস্ত লেখাপত্র

এক

যোধপুর-মহারাজ যশবন্তসিংহের রাজসভায় অত্যন্ত সৎ, বীর, বিনয়ী ও পরোপকারী এক রাজপুত সেনাপতি ছিলেন। নাম তাঁর অসকরণ। শত্রু শিবিরে কাঁপন ধরত তাঁর নামে, এমনি ছিল দাপট। রাজা-সেনাপতি উভয়েই এমন দয়ালু, মারওয়াড়ের কোনও অনাথ-দুঃখীই খালি হাতে ফেরে না কখনও। রাজা যশবন্তসিংহ অত্যন্ত সম্মান ও আদর-যত্ন করতেন তাঁকে। দুর্গাদাস সেই সেনাধ্যক্ষেরই জ্যেষ্ঠ সন্তান। কনিষ্ঠ পুত্রের নাম যশোদাস।

এহেন রাজপুত সেনাপতি অসকরণকে ১৬৫৮ সালে উজ্জয়িনীর যুদ্ধে প্রতারণার ছলে হত্যা করা হল। তখন দুর্গাদাস মাত্র বছর কুড়ির। অত্যন্ত প্রতিভাবান এই নব্য যুবাকে রাজা যশবন্তসিংহ জ্যেষ্ঠ কুমার পৃথ্বীসিংহের মতোই স্নেহ করতেন। কিছুদিন পর দিল্লি থেকে মহারাজ যখন দাক্ষিণাত্যে সুবাদারির দায়িত্ব পেলেন, তখন পৃথ্বীসিংহের হাতে রাজ্যের ভার দিয়ে দুর্গাদাসকে সেনাপতি করে সঙ্গে নিয়ে গেলেন।

দক্ষিণে তখন মরাঠা বীর শিবাজির সাম্রাজ্য। মুঘলদের তিনি কানাকড়িরও পাত্তা দেন না। অউরংজেব অতিষ্ঠ হয়ে যশবন্তসিংহকে পাঠালেন। যশবন্তসিংহ এসে পৌঁছার সঙ্গে-সঙ্গেই যুদ্ধবিগ্রহ বন্ধ হল। ধীরে ধীরে শিবাজি ও যশবন্তসিংহের মধ্যে সৌহার্দ্য গড়ে উঠল। অউরংজেব চাইছিলেন শিবাজিকে পরাস্ত করতে, সন্ধি নয়। সে উদ্দেশ্য পূরণ না হওয়ায় যশবন্তসিংহকে সেখান থেকে সরিয়ে আনলেন তিনি। কিছুদিন লাহোরে রেখে পরে তাঁকে পাঠালেন কাবুলে। সেখানে তখন তুমুল অশান্তি।

কাবুলি মুসলমানেরা এত সহজে দমবার পাত্র ছিল না। ভয়াবহ যুদ্ধ হল সেখানে। তাতে মহারাজের দুই পুত্র নিহত হলেন। বার্ধক্যে গভীর আঘাত পেলেন যশবন্তসিংহ। ভগ্নমনোরথে কাবুল থেকে পেশোয়ারে চলে গেলেন তিনি।

আর ঠিক সেই সময়ই অজমের-এ বিদ্রোহ দেখা দিল। অউরংজেব পৃথ্বীসিংহকে সেই বিদ্রোহ দমন করার আদেশ দিলেন। পৃথ্বীসিংহও ক’দিনের মধ্যেই বিদ্রোহ দমন করে ফেললেন। সংবাদ পেয়ে অউরংজেব অত্যন্ত আনন্দিত হলেন এবং পৃথ্বীসিংহকে পুরস্কৃত করতে দিল্লি ডেকে পাঠালেন। কেউ কেউ বলেন, সেখানে তাঁকে বিষ মাখানো খিলত (সম্মানসূচক পোশাক) পরানো হয়েছিল। ফলত, ধীরে ধীরে সেই বিষ তাঁর শরীরে ছড়িয়ে পড়ল এবং অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই পৃথ্বীসিংহ ইহলক ত্যাগ করলেন।

এও হয়তো অসত্য নয় যে অউরংজেবের মনে মারওয়াড় দখলের লোভ জেগেছিল, আর সেই কারণেই তিনি যশবন্তসিংহকে বারংবার যুদ্ধে পাঠাতেন। অউরংজেবের এই অসন্তোষের কারণ সম্ভবত এই যে, দিল্লির সিংহাসনের দখল পেতে শাহজাদাদের মধ্যে যখন রেষারেষি চলছিল, যশবন্তসিংহ তখন দারাশিকোর পক্ষ নিয়েছিলেন। অউরংজেব এই অপরাধ ক্ষমা করতে পারেননি এবং তখন থেকেই প্রতিশোধের সুযোগ খুঁজছিলেন। প্রকাশ্যে যশবন্তসিংহের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া মানে সমগ্র রাজপুতানায় আগুন দেওয়া, বাদশাহ্‌ তাই কূটনীতির আড়ালে নিজের উদ্দেশ্য সাধনে তৎপর হলেন।

পৃথ্বীসিংহের মৃত্যুর সঙ্গে-সঙ্গেই অউরংজেব একজন মুঘল সুবাদার পাঠিয়ে দিলেন মারওয়াড়ে। ওদিকে যশবন্তসিংহ তখনও পেশোয়ারে। অউরংজেব মারওয়াড়ে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার সুযোগ পেয়ে গেলেন।

পৃথ্বীসিংহের মৃত্যুসংবাদে মহারাজের মাথায় বজ্রাঘাত ঘটল। পড়েই যাচ্ছিলেন, শোনিংজি ধরে ফেলে ধীরে ধীরে পালঙ্কে শুইয়ে দেন। কিছুক্ষণ পর চোখ খুললেন যশবন্তসিংহ। শোনিংজিকে সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে দু-চোখে জল ভরে এল তাঁর। বললেন, “ভাই শোনিংজি, এ কি প্রিয় পুত্রের মৃত্যুসংবাদ? নাকি আমাকে নিয়ে যেতেই যমদূত হাজির হল এসে? মৃত্যুর আগে তোমাকে কিছু কথা বলে যেতে চাই, ভাই।”  

শোনিংজিকে সঙ্গে নিয়ে অন্দরে চলে গেলেন মহারাজ। ছোটো এক লোহার সিন্দুক এগিয়ে দিয়ে বললেন, “আমার এই সিন্দুক তোমার হাতে তুলে দিলাম, ভাই। যদ্দিন না কোনও রাজপুত মুঘলদের হাত থেকে মারওয়াড় উদ্ধার করে সিংহাসনে বসে আবার, তদ্দিন একে আগলে রাখবার দায়িত্ব তোমার। ঈশ্বর যদি কখনও সেই দিন দেন, তবে রাজ্যাভিষেকের সময় এই উপহারটি দিও রাজাকে। তার আগে তুমি বা অন্য কেউ এটি খুলে দেখবার ইচ্ছা মনেও আনবে না। এতে যদি তোমার আপত্তি থাকে, তবে আমার এই শর্ত জানিয়ে দায়িত্ববান কারও হাতে তুলে দিও।”  

পরদিন মহারাজ তাঁর সমস্ত সর্দারদের ডেকে বললেন, “ভাইসব! অউরংজেবের রাজপুতদের ওপর প্রতিশোধের অভিলাষ পূর্ণ হয়েছে। এখন আমার পরে রাজবংশে এমন কেউ নেই, যে সিংহাসনে বসতে পারে। যদিও দুই রানি—ভাটি ও হাড়ি গর্ভবতী, কিন্তু এমন দুর্দিনে কী করে আশা রাখি যে পুত্রসন্তানই জন্মাবে? তবু ঈশ্বরের কৃপায় সিংহাসনের উত্তরাধিকারী যদি জন্মায়, তবে আপনাদের সহায়তায় মুঘল বাদশাহের কবল থেকে মারওয়াড় উদ্ধার করা অসম্ভব নয়। অতএব, আমার শেষ আদেশ এই— ভাবী রাজকুমারের প্রতি ঠিক তেমনই বাধ্য থাকবেন, যেমনটি আমার প্রতি আছেন।

“ভাইয়েরা! যে মারওয়াড় অন্যের বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়ত এতদিন, আজ স্বয়ং অন্যের সাহায্যের মুখাপেক্ষী। সময়ই সর্বশ্রেষ্ঠ শক্তিমান, মানুষ নয়। একসময় অউরংজেব আমাকে সমীহ করত, আর আজ আমি তাকে ভয় করি। এই বার্ধক্যে উপনীত হয়ে নিজ মাতৃভূমির তরে আমার আর কীই-বা সাধ্য? কিছুই নয়।”  

চোখ সজল হয়ে উঠল মহারাজের। আর কিছু বলতে পারলেন না তিনি। কিছুক্ষণের জন্যে নিস্তব্ধতা নেমে এল সভায়। সবার মুখে বিষাদের ছায়া। পরস্পরের মুখে নির্বাক তাকিয়ে রইলেন সবাই। খানিক বিলম্বে অন্দরে চলে গেলেন মহারাজ; সর্দাররাও ফিরে গেলেন যে যাঁর শিবিরে।

এক সপ্তাহ পর মহারাজ দেহত্যাগ করলেন। বীর রাজপুত—একই সঙ্গে শোক ও পরাজয়ের আঘাত সইতে পারেননি। সমস্ত রানিই মহারাজের সঙ্গে সতী হলেন। কেবল ভাটি ও হাড়ি—এই দুই রানিকে সর্দারেরা আটকে দিলেন।

দুই

১৬৭৮ সাল। মাঘ মাসের কৃষ্ণপক্ষের চতুর্থ দিনে রানি ভাটি এক পুত্রসন্তানের জন্ম দিলেন। পরদিন রানি হাড়িও শিশুপুত্র প্রসব করলেন। জ্যেষ্ঠ কুমারের নামকরণ হল অজিত, আর কনিষ্ঠের দলথম্ভন।

সংবাদ পেয়ে অউরংজেব পেশোয়ার থেকে দিল্লিতে তলব পাঠালেন রানিদের। শীতকষ্টে পথেই মৃত্যু হল দলথম্ভনের। বাকিরা নিরাপদে দিল্লি পৌঁছে রূপসিংহ ওদাওয়তের হাভেলিতে আশ্রয় নিলেন। এ দিল্লির সর্ববৃহৎ তথা সর্দারদের থাকার উপযুক্ত স্থানও বটে।

পরদিন দুর্গাদাস কর্ণোৎ মহারানিদের আগমনের সংবাদ জানাতে অউরংজেবের দরবারে হাজিরা দিলেন। বাদশা লোকাচার সেরে বললেন, “দুর্গাদাস! দেখো, হতভাগা দলথম্ভন তো চলে গেল। এখন আমাদের উচিত অজিতের প্রতি অত্যন্ত যত্নবান হওয়া, যাতে হতভাগ্য যশবন্তসিংহের বংশটা অন্তত রক্ষা হয়। তাই অজিতকে এইখানেই রেখে যাও তোমরা। আমার চোখে শাহজাদারা যেমন, যশবন্তসিংহের পুত্রও তেমনি। আমি নিজেই তার দেখভালো করব এবং বড়ো হলে তাকে যোধপুরের সিংহাসনে বসাব।”  

দুর্গাদাস বাদশাহের অভিপ্রায় বুঝে গেলেন। তদুপরি অত্যন্ত নম্রভাবে প্রস্তাব রাখলেন, “জহাঁপনা! এতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই যে অজিতের রক্ষা ও প্রতিপালন এখানে যতটা উত্তমরূপে সম্ভব, অন্যত্র কোথাও নয়। আপনার এই স্নেহ ও দয়া অজিতের সৌভাগ্য। কিন্তু শিশুর বয়স উপস্থিত তিন মাস মাত্র, আর সে সম্পূর্ণরূপে মাতৃদুগ্ধের ওপরই নির্ভরশীল। তাই দুধ ছাড়ার পর তাকে আপনার সেবায় পাঠালেই উত্তম।”  

অউরংজেব অমত করলেন না, দুর্গাদাসের কথা মেনে নিলেন।

দুর্গাদাস ফিরে এসে মহারানি ও সমস্ত রাজপুত সর্দারদের কাছে বাদশাহের মনোবৃত্তি হুবহু ব্যক্ত করলেন। সে-সব কর্ণগোচর হওয়া মাত্রই সর্দারদের চক্ষু রক্তবর্ণ ধারণ করল।

দুর্গাদাস নিরস্ত করলেন, “ভাইসকল! ক্রোধের সময় এ নয়, চাতুর্যের। যে-কোনো উপায়ে হোক অনতিবিলম্বে রাজকুমারকে দিল্লি থেকে সরিয়ে ফেলতে হবে। তারপর যা হবার হবে।”  

সর্দারদের মধ্যে সবচাইতে চতুর মানুষ আনন্দদাস খেঁচি। সেদিনই এক মুসলমান সাপুড়েকে মোটা অর্থের লোভ দেখিয়ে এনে পরদিন তার সাপের ঝুড়ির মধ্যে রাজকুমারকে লুকিয়ে দিল্লির বাইরে নিয়ে এলেন ভোর ভোর। সেখান থেকে আবুর ঘন পাহাড় পেরিয়ে মারওয়াড়ের ডুন্ডওয়া গ্রামে সুহৃদ জয়দেব ব্রাহ্মণের বাড়িতে উঠলেন গিয়ে। সেখানেই গোপনে রাজকুমারের লালন-পালন শুরু হল। ওদিকে দিল্লিতে মহারানির কোলে রাজকুমারের জায়গায় অন্য এক শিশুকে তুলে দেওয়া হল।

এক বছর কেটে গেলে অউরংজেব বুঝলেন যে রাজপুতরা সরাসরি অজিতকে তাঁর হাতে তুলে দিতে নারাজ। তখন রাজকুমারকে তুলে আনবার হুকুম দিয়ে নগর কোতওয়াল ফৌলাদকে পাঠালেন তিনি। সে দুই হাজার সশস্ত্র সৈন্য নিয়ে রূপসিংহ ওদাওয়তের হাভেলি ঘিরে ফেলল।

আচমকা বিপদের সংকেত পেয়ে দুর্গাদাস সর্দারদের একত্র করে বললেন, “ভাইসব! রাজপুতেদের কাছে অন্যের রক্ষার্থে নিজের প্রাণের মায়া তুচ্ছ। আমরা নিজ হাতে প্রতিপালিত শিশুকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে পারি না। নাই-বা হল সে রাজপুত্র।”  

মহারানি আশ্বস্ত করলেন—”আমার চিন্তা তোমরা কোরো না। নিজের মান রক্ষার জন্যে হাতের এই কাটারিই যথেষ্ট। রাজপুতদের রক্ত এখনও জল হয়ে যায়নি, সে দেখার আকাঙ্ক্ষা না থাকলে আমি আগেই শেষ করে দিতাম নিজেকে।”  

রূপসিংহ শিশুর রক্ষার দায়িত্ব নিলেন। মহারানি বুকে কাটারি বসিয়ে দেহত্যাগ করলেন। এরপর আর কী! রাজপুত বীরেরা নিশ্চিন্ত হয়ে খোলা তলোয়ার হাতে গগনভেদী ‘হর হর মহাদেব’ হাঁকার দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন শত্রুসেনার ওপর। তিন-তিনটি বিশাল মুঘল বাহিনীর সামনে দুই-আড়াইশো জনের ক্ষমতাই-বা আর কী! রাজপুতেরা অধিকাংশই শহিদ হলেন।

সূর্যাস্ত অবধি যুদ্ধ চলল। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সমস্ত মৃতদেহ সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার পর রূপসিংহের হাভেলি তন্নতন্ন করে খুঁজল নগর কোতওয়াল, কিন্তু রাজকুমার অজিতের কোনও সন্ধান সে পেল না। এত এত রাজপুতকে হত্যা করেও শূন্য হাতেই ফিরতে হল তাকে।

সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছিল। নির্মল আকাশে ঝলমল করে তারা ফুটেছে। চাঁদের স্নিগ্ধ প্রভা এসে সান্ত্বনার পরশ বুলিয়ে দিচ্ছে আহত বীরদের ক্ষতে। শীতল বাতাসের হালকা পরশে তারা চোখ মেলে একে অপরের সহায়তায় ব্যস্ত হল। সবার মধ্যে একমাত্র দুর্গাদাসের শারীরিক অবস্থাই তুলনামূলক ভালো। চাঁদের আলোয় একে একে জীবিত রাজপুত সর্দারদের খুঁজে বের করলেন তিনি। তুলে আনতে লাগলেন একে একে তাঁদের। আড়াইশো রাজপুতের মধ্যে কেবল দুর্গাদাস রাঠৌর কর্ণোৎ স্বয়ং, মোকহমসিংহ মেড়তিয়া, ভোজরাজ বিদাওয়ত, রূপসিংহ ওদাওয়ত, মহাসিংহ ও দুধোজি চম্পাওয়ত—হাতে গোনা এই ক’জনাই বেঁচে আছেন শুধু।

বৃদ্ধ দুধোজি উক্তি করলেন, “চাঁদের আলো মরে আসছে। রাতও হয়েছে অর্ধেকের বেশি। এখন আর এখানে থাকা ঠিক নয়। দেহ ক্ষতবিক্ষত, বাকি প্রাণগুলো রক্ষা করা দরকার।”  

দুর্গাদাস গর্জে উঠলেন, “থামুন আপনি!। মহারানির মরদেহ বিনা এখান থেকে জীবিত ফিরতে চাইছেন কোন আক্কেলে? ধিক্কার! আমাদের বেঁচে থাকতে মহারানির পবিত্র দেহ যেন মুঘলের হাতে না পড়ে।”  

কথাটায় এমন জাদু ছিল, অন্যের সাহায্য ছাড়া উঠে দাঁড়াতেও পারছিলেন না যাঁরা, তাঁরাই মহারানির দেহ তুলে নিয়ে ভোর হতে না হতেই দিল্লি থেকে পাঁচ-ছয় ক্রোশ দূরে পৌঁছে গেলেন দ্রুত। সেখানে আবুর ঘন পাহাড়ে দাহকার্য সম্পন্ন হল।

রাতটা সেখানেই কাটল। পরদিন জয়দেব ব্রাহ্মণের বাড়িতে গিয়ে হাজির হলেন সবাই। রাজকুমারকে সুস্থ-সবল চাক্ষুষ করে জয়পরাজয় সব ভুলে গেলেন তাঁরা।

তিন

পরদিন আনন্দদাস খেঁচিকে রাজকুমারের প্রতিপালন বিষয়ে সতর্ক করে, পরস্পর আলিঙ্গন শেষে নিজ নিজ গ্রামে রওনা হলেন রাজপুতেরা। পথে যত ছোটো-বড়ো গ্রাম পড়ল, সর্বত্রই মুঘল সৈন্যের চৌকি ও ঘাঁটি নজরে এল দুর্গাদাসের। কোনোমতে লুকিয়ে-চুরিয়ে কল্যাণগড়ে পৌঁছলেন তিনি। হারানো বাছুর গাভীকে পেলে যেমন করে, দুর্গাদাসও তেমনি গিয়ে লুটিয়ে পড়লেন মায়ের চরণে। বৃদ্ধা মা পুত্রকে তুলে আঁকড়ে ধরলেন বুকে। দুজনারই চোখ বেয়ে তখন স্নেহ আর ভক্তির অশ্রু ঝরছে।

অমনি দুর্গাদাসের পুত্র তেজকরণ ও ছোটো ভাই যশোদাসও হাজির হল এসে। দুজনই বড়ো সুদর্শন আর বলবান। দুর্গাদাস যেমন দেশ-কল্যাণের খাতিরে মনঃপ্রাণ, সহায়-সম্পদ সব উৎসর্গ করে বসে আছেন, তাঁর সন্তান ও সহোদরও দেশের স্বাধীনতার তরে সম্পূর্ণ সঁপে রেখেছে নিজেদের। দুর্গাদাসের বৃদ্ধা মাও মুঘলদের অত্যাচারে অত্যন্ত বিচলিত। সর্বদাই তিনি নিজের সন্তানদের দেশরক্ষার জন্য প্রাণ বাজি রাখার উৎসাহ দিয়ে গিয়েছেন। কিন্তু স্বজনেরাই যখন দেশ ধ্বংসে উঠে পড়ে লাগে, তখন কীই-বা করার থাকে আর?

যশবন্তসিংহের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা অমরসিংহের পুত্র চন্দ্রসিংহ রাজ্যের লোভে অউরংজেবের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিল। তার ইচ্ছা, পথের কাঁটা ওই প্রভাবশালী রাজপুত সর্দারদের নিশ্চিহ্ন করে নির্বিঘ্নে মারওয়াড় শাসন করে। অউরংজেবও তো এমনটির অপেক্ষাতেই ছিলেন। এই বাসনা তাঁর মনে আগে থাকতেই ছিল। ফলে উপায়টি বেশ মনে ধরল তাঁর। তৎক্ষণাৎ মারওয়াড়ের মুঘল সুবাদারের নামে ফরমান জারি হল— সমস্ত রাজপুত সর্দারকে গ্রেফতার করো।

এরপর আর কী! গ্রামে গ্রামে ঢুকে আত্মগোপন করে থাকা সর্দারদের খোঁজ শুরু হল। অনেকেই প্রাণভয়ে আত্মসমর্পণ করল। কেউ কেউ এদিক-ওদিক লুকিয়ে রইল। তাদের ঘর-বাড়ি লুঠ হয়ে গেল, তবু প্রকাশ্যে এল না।

শোনিংজি চম্পাওয়ত সর্দারদের এই দুরবস্থা দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়লেন। দেশের এই অবস্থায় মহারাজ যশবন্তসিংহের দেওয়া সেই লোহার সিন্দুক কী উপায়ে রক্ষা করবেন, এই চিন্তা গ্রাস করল তাঁকে। ভাবতে ভাবতে মনে পড়ল দুর্গাদাসের কথা। তক্ষুনি ঘোড়া নিয়ে আরাবল্লি পর্বতের পাদদেশে অবস্থিত কল্যাণগড় রওনা হয়ে গেলেন।

শোনিংজিকে আসতে দেখে দুর্গাদাস এগিয়ে গিয়ে স্বাগত জানালেন। আন্তরিক আলিঙ্গনাবদ্ধ হলেন দুজনে। দেশের পরিস্থিতি বিষয়ক আলোচনা শুরু হল। শোনিংজি প্রস্তাব রাখলেন—”এ ঘরে বসে থাকার সময় নয়, ভাই। এখনই আমার সঙ্গে চলো।”  

দুর্গাদাস মায়ের অনুমতি নিয়ে শোনিংজির সঙ্গে রওনা হলেন। সূর্য অস্ত যাওয়ার আগেই আভাগড় দুর্গে পৌঁছে গেলেন তাঁরা। দুর্গের চতুর্দিকে মুঘল সৈন্যের কড়া পাহারা। ভেতরে ঢুকতে খানিক দ্বিধা হল দুর্গাদাসের। শোনিংজি ধীর কণ্ঠে বললেন, “দেশের মঙ্গল চাও যদি, এগিয়ে চলো তবে।”  

অন্ধকার এক কক্ষে এসে উপস্থিত হলেন দুজনে। শোনিংজি অন্দর থেকে ছোট্ট এক লোহার সিন্দুক এনে দুর্গাদাসের সামনে রেখে বললেন, “এই সিন্দুক মহারাজ যশবন্তসিংহ তাঁর মৃত্যুর দশ দিন আগে আমার হাতে তুলে দিয়ে বলেছিলেন, ‘যে বীর মারওয়াড়কে স্বাধীন করে যোধপুরের সিংহাসনে বসবে, এই উপহার তারই প্রাপ্য। সে ব্যতীত আর কেউ জানারও চেষ্টা করবে না এর ভেতরে কী আছে।’ এর রক্ষা আমার পক্ষে আর সম্ভব হচ্ছে না, ভাই। তাই তোমার হাতে তুলে দিচ্ছি। ঈশ্বর না করুন, কখনও যদি তোমার অবস্থাও আমার মতোই হয়, তবে তুমিও আমার মতোই কোনও উপযুক্তের হাতে তুলে দিও।”  

দুর্গাদাস সমস্ত কথা মনোযোগ দিয়ে শুনলেন। তারপর সিন্দুকটি তুলে মটকার সাহায্যে কোমরে বেঁধে ‘রাম জুহার’ বলে ঘোড়ায় চড়ে বসলেন। মূল পথ ছেড়ে পাকদণ্ডি ধরে অদৃশ্য হয়ে গেলেন তিনি।

চার

চারদিক অন্ধকার, দুর্গম পথ। হতভাগ্য ঘোড়া হোঁচট খেতে খেতে এগিয়ে চলেছে। নিজের খুরের শব্দই পাহাড়ে ধাক্কা খেয়ে এসে বারংবার চমকে দিচ্ছে তাকে। রাত হয়েছে অনেকটাই। ধীরে ধীরে চাঁদের আলো ছড়িয়ে পড়ছে চরাচরে। কন্টালিয়া গ্রামটা ধোঁয়ার মতো আবছা নজরে আসছে দূরে। দেশমাতৃকার এই দুর্দশায় ক্রমশ ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছেন দুর্গাদাস।

এমনি সময় তলোয়ারের ঝনঝন শব্দ কানে এল হঠাৎ। সতর্ক হয়ে দুর্গাদাসও তলোয়ার খুলে এগিয়ে গেলেন সেদিকে। দেখেন, বাইশ জন মুঘল মিলে ঘিরে ধরেছে দুই রাজপুতকে। অসীম ক্রোধে দুর্গাদাস মুহূর্তে ঝাঁপিয়ে পড়লেন মুঘলদের ওপর। দু-চারজন মারা পড়ল, আহত হল ক’জনা। ‘মদদ, মদদ’ বলে চিৎকার করতে করতে পিছু হটতে লাগল মুঘলরা।

দুর্গাদাস দেখেন, দুজন রাজপুতের একজন মারা গেছে, অন্যজন গুরুতর আহত। আহত রাজপুতকে তুলে নিয়ে যেতে উদ্যত হতেই চাঁদের আলোয় দেখেন, প্রায় কুড়ি-পঁচিশ জন মুঘল ছুটে এসেছে ততক্ষণে। শত্রুরা তাঁকে চিনে ওঠার আগেই দশ-এগারো জনকে শুইয়ে দিলেন দুর্গাদাস।

“খুন! খুন! জোরাওয়র খাঁ খুন!”— চিৎকার করতে করতে মুঘলরা পিছু হটল আবার। দুর্গাদাস বুঝলেন, এখানে থাকা নিরাপদ নয় আর। আহত রাজপুতকে কাঁধে তুলে কল্যাণগড়ের পথে ছুটলেন তিনি।

রাত আর অল্পই বাকি তখন। বাড়ি পৌঁছলেন দুর্গাদাস। নিজ সন্তান আর আহত রাজপুতকে রক্তে ভেজা দেখে অত্যন্ত বিচলিত হয়ে উঠলেন বৃদ্ধা মা। অনতিবিলম্বে দুজনেরই প্রাথমিক চিকিৎসা শুরু হল। তাঁরা কিছুটা সুস্থ বোধ করলে মা জানতে চাইলেন, “এ অবস্থা কী করে হল, বাছা?”

সমস্ত ঘটনা খুলে বললেন দুর্গাদাস। মা কিন্তু আহত রাজপুতকে চিনে ফেলেছেন আগেই। পুত্রকে জিজ্ঞেস করলেন, “তুই কি একে চিনতে পারিসনি?”

আহত রাজপুতের তন্দ্রা ভেঙেছে ততক্ষণে। দুর্গাদাস কিছু উত্তর দেওয়ার আগেই তিনি বলে উঠলেন, “উনি আমাকে চেনেন, মা। কিন্তু এই অবস্থায় চিনতে পারেননি। আগের সঙ্গে এখনকার পার্থক্য তো অনেক! দাদা, আমি আপনার চরণসেবক মাড়োরাজ মহাসিংহ।”  

বৃদ্ধা মা তাঁর মাথায় হাত বুলিয়ে জানতে চাইলেন, “হ্যাঁ রে, তুই তো দুর্বল হয়ে গেছিস খুব। কী এমন বিপদে পড়লি বল তো?”

মহাসিংহ কিছু বলার আগেই গৃহ পরিচারক নাথু দৌড়ে এল।—”পালান, পালান শিগগিরই! অস্ত্রধারী মুঘল সৈন্য তেড়ে আসছে হুংকার ছেড়ে।”  

মাও সায় দিলেন, “আপাতত কোথাও লুকিয়ে প্রাণ বাঁচা, বাবা। মুঘলেরা নিশ্চয়ই দলে ভারী, আর তুই একা। মহাসিংহ আহত। অকারণে প্রাণ খোয়ানো বুদ্ধিমানের কাজ নয়।”  

দুর্গাদাস বিচলিত। বলেন, “কী বলছেন, মা! আপনাদের সবাইকে এমন বিপদে ফেলে আমি নিজের প্রাণ বাঁচাব?”

মহাসিংহ এইবারে বুঝিয়ে বললেন, “না দাদা, মায়ের কথা মানো। বেঁচে থাকলে তবে না দেশ!”

দুর্গাদাস উত্তর দিলেন, “মুঘলদের তলোয়ারের শব্দ শুনতে পাও না? তারা এসে পড়ল যে। এখন পালানোর সময় কোথা? আর পালাবই-বা কই?”

নাথুই পথ দেখাল।—”আপনারা পেছনের অন্ধকূপে নেমে যান, প্রভু।”  

মায়ের কথা রাখতে আত্মগোপনে রাজি হলেন দুর্গাদাস। আহত মহাসিংহকে কুয়োতে নামানো হল প্রথমে। তারপর শোনিংজির দেওয়া সেই লোহার সিন্দুক। এরপর তেজকরণ ও যশোদাস যেই নেমেছে, অমনি মুঘলরাও দরোজা ভেঙে ঢুকল এসে। দুর্গাদাস আর নামতে পারলেন না, পাশের এক ঝাঁকড়া বটগাছে উঠে পড়লেন চটপট।

সৈন্যরা তন্নতন্ন করে খুঁজল, দুর্গাদাসকে পেল না। বদলে কে একজন তাঁর বৃদ্ধা মাকে ধরে সর্দার মুহম্মদ খাঁর কাছে নিয়ে যেতে উদ্যত হলে মুহম্মদ খাঁ ধমক দিল, “খবরদার! বৃদ্ধা নারীর গায়ে হাত দিও না।”  

ভয় পেয়ে সরে দাঁড়াল সেপাই। তারপর সর্দার নিজেই মায়ের সামনে এসে নরম স্বরে জানাল, “মা, কন্টালিয়ার সর্দার শমশের খাঁর ভাইজাদা জোরাওয়র খাঁকে হত্যা করেছে দুর্গাদাস। বাদশার আদেশে এই অপরাধের শাস্তি ফাঁসি। অপরাধীকে লুকিয়ে রাখলেও একই শাস্তি।”  

মা উত্তর দিলেন, “তুমি কার সঙ্গে কথা বলছ, সর্দার? আমি দুর্গাদাসের মা। কোন মা নিজের হাতে ছেলেকে ফাঁসিতে দেয়? তাছাড়া আমি কী করে বলি সে কোথায় আছে, বলো তো। যদি প্রাণের বদলে প্রাণ নেওয়াই ন্যায় হয়, তবে দুর্গাদাস অপরাধী নয়। সে তো এক রাজপুতকে হত্যার বদলেই জোরাওয়র খাঁকে হত্যা করেছে।”  

মুহম্মদ খাঁ মাথা নাড়ল।—”আমি জানতাম না জোরাওয়র খাঁ প্রতিশোধের বদলায় মারা গেছে। এখন চলে যাচ্ছি আমি। তবে সূর্য ওঠার আগেই দুর্গাদাসকে কোনও অজ্ঞাত স্থানে পাঠিয়ে দিও অবশ্যই। ফের অন্য কোন সর্দার এসে পড়লে পণ্ড হয়ে যাবে সব।”  

সজ্জন মুহম্মদ খাঁ চলে গেল। সৈন্যদের আদেশ দিল অন্য গ্রামে সন্ধান চালাতে। সত্যিই, বিপদকালে অনেক সময় সেখান থেকেই সাহায্য আসে, যা কল্পনাতেও থাকে না।

মুঘলরা চলে গেলে দুর্গাদাস গাছ থেকে নেমে মায়ের কাছে এলেন। মা মুহম্মদ খাঁর আচরণের প্রশংসা করলেন। বললেন, “সূর্য ওঠার আগেই বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়, দুর্গা।”  

দুর্গাদাস রাজি হলেন। তবে যশোদাস ও তেজকরণকে মায়ের দেখভালের জন্য রেখে যেতে চাইলেন। মা রাজি হলেন না। বললেন, “না বাবা, আমি একা মানুষ, নাথুই যথেষ্ট। তুমি যশো আর তেজকেও সঙ্গে নাও। কখন কার দরকার পড়ে বলা যায় না।”  

ভোর হওয়ার আগেই মাকে প্রণাম করে ভাই ও সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন দুর্গাদাস। নাথুকে বলে গেলেন, “রোজ মায়ের খবর আমাকে পাঠাবি। মুঘলদের থেকে সাবধান থাকবি। মহাসিংহ বেঁচে থাকলে আজই কোনোভাবে মাড়োতে পৌঁছে দিবি, আর যদি মারা যায় তবে দাহকর্ম সারবি। আর এই লোহার সিন্দুকটা ধর, নিজের প্রাণের মতো রক্ষা করবি। কিন্তু কখনও খুলে দেখার চেষ্টা করবি না।”  

সূর্য ওঠার আগেই আরাবল্লির পাহাড়ে পৌঁছে গেলেন দুর্গাদাস। মা দরোজায় দাঁড়িয়ে রইলেন অনেকক্ষণ। দুই সন্তান আর পৌত্র চোখের আড়াল হল যখন, ঘরে ফিরে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করলেন— ‘আমার সন্তানদের নিরাপদে রেখো, ভগবান।’

নাথু বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল তখনও। হঠাৎ দৌড়ে এসে বলে, “মা, ঘোড়সওয়ার!”

কথা শেষ হওয়ার আগেই দেড়-দুশো মুসলমান সেপাই ঘরে ঢুকে ঘিরে ফেলল মাকে। আতঙ্কে নীল হয়ে গেল নাথু। তেজোময়ী এক বৃদ্ধা ক্ষত্রণী মুঘল সৈন্যদের মাঝে অসহায় দাঁড়িয়ে আছেন—দৃশ্যটা সহ্য করতে পারছে না সে। কিন্তু চারজন সেপাই মিলে তাকে ধরে ফেলেছে আগেই।

সর্দার প্রশ্ন করল, “অ্যাই বুড়ি, বল তোর খুনি ছেলে দুর্গাদাস কোথায়?”

মা উত্তর দিলেন, “আমি জানি না। বাড়ি এসেই উঠলে যখন, খুঁজে নাও।”  

সর্দার এইবার গলা নরম করল।—”সত্যি বললে আমি দুর্গাদাসের প্রাণভিক্ষা দিতে পারি, মা। যথাসাধ্য সাহায্যও করতে পারি। বাদশাকে বলে তোমাকেও ধনরত্নে মুড়ে দেব। দুর্গাদাস আসল অপরাধী নয়। অপরাধী তো সেই রাজপুত, যার জন্য জোরাওয়র খাঁ খুন হল। দুর্গাদাসের বিরুদ্ধে অভিযোগ নেই কোনও। সেই রাজপুতের নামঠিকানা বলে দাও আমাকে, নইলে মরতে হবে সবাইকে।”  

উত্তর এল, “সন্তানের রক্ষায় প্রাণ দেব, এর চাইতে উত্তম আর কী? আমি বুড়ি মানুষ, দিন আমার ঘনিয়েই এল, কিন্তু সন্তানের প্রাণ বাঁচাতে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারি না। যাকে আশ্রয় দিয়েছি, তাকে স্বার্থের জন্য তোমার হাতে তুলে দিতে পারি না।”  

কথা শুনে ক্ষিপ্ত হয়ে তলোয়ার উঁচিয়ে মায়ের দিকে দৌড়ে গেল শমশের খাঁ। ধরা পড়া নাথু সমস্ত শক্তি একত্র করে সেপাইদের ধাক্কা মেরে ছুটে এসে আঘাতটা ঠেকাল কোনোমতে, কিন্তু নিজে পড়ে গেল। দ্বিতীয় আঘাতে তেজোময়ী মায়েরও প্রাণ বেরিয়ে গেল। রাজপুতানি আপন প্রাণ কুলমর্যাদার বেদিতে উৎসর্গ করলেন।

তবুও সর্দারের মন ভরল না। ঘরের সব সম্পদ লুঠ করিয়ে তারপর সৈন্যদের ফিরে যাবার আদেশ দিল। এক সেপাই দাঁড়িয়ে রইল, গেল না। শমশের খাঁ গর্জন করে উঠল, “কী রে খুদাবখশ, দাঁড়িয়ে আছিস যে?”

জবাব এল, “আমি তোর মতো জালিমের আদেশ মানি না। তুই মুসলমান নোস। ধর্মজ্ঞানী মুসলমান কখনও এমন অত্যাচার করতে পারে না। কোন বীরপুরুষ অসহায় নারীর ওপর হাত তোলে রে, অ্যাঁ? তুই বুড়িমাকে মারলি কেন? কী ক্ষতি করেছিল সে তোর? দুর্গাদাসের চাইতেও বড়ো অপরাধী তো তুই। বল, যে রাজপুত মারা পড়েছিল সেদিন, তার খুনিকে কে শূলে দিয়েছে?”

ক্রোধে অন্ধ হয়ে শমশের খাঁ ঝাঁপিয়ে পড়ল তার ওপর। খুদাবখশ সতর্ক ছিল, শমশের খাঁকে মাটিতে ফেলে দিয়ে বুকে চেপে বসল নিমেষে। উপস্থিত কেউ ছিলও না যে এগিয়ে আসে। সৈন্যরা চলে গিয়েছে আগেই। খুদাবখশ এক হাতে তার গলা চেপে ধরে করৌলি বার করে আনল অন্য হাতে। শমশের খাঁ আতঙ্কে প্রাণভিক্ষার মিনতি করতে লাগল। খুদাবখশ অস্ত্র ফিরিয়ে নিয়ে ছেড়ে দিয়ে বলল, “ভাবিস না তোকে দয়া করেছি আমি। ভাবছি, বীর দুর্গাদাস নিজের বৃদ্ধা মায়ের মৃত্যুর প্রতিশোধ কার রক্তে সম্পূর্ণ করবেন। কতটা ভয়ংকর হতে পারে সে প্রতিশোধ। এই ক্রোধাগ্নি তিনি সামলাবেন কী উপায়ে? ব্যস, এ কারণেই তোর মতো পাপীর রক্তে নিজের হাত নোংরা করলাম না আর।”  

এই বলে খুদাবখশ যেই না পেছন ফিরেছে, অমনি কন্টালিয়ার দিকে পালিয়ে গেল শমশের খাঁ।

খুদাবখশ এগিয়ে গিয়ে নাথু আর মায়ের অসাড় দেহ পরখ করল—সামান্য হলেও প্রাণ আছে কি না। নাথু কিছুটা জ্ঞান ফিরে পেয়েছে ততক্ষণে। তবে আঘাত গুরুতর।

পাঁচ

খুদাবখশ নাথুকে জীবিত দেখে আল্লাহর শুকর জানাল। তার ক্ষত ধুয়ে পট্টি বাঁধল। বলল, “আমাকে ভয় পেয়ো না ভাই, আমি তেমন মুসলমান নই। কারও অমঙ্গল আমি কামনা করি না। একদিন তো আল্লাহর সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই হবে। আমার সাধ্যের মধ্যে কিছু করবার থাকল বলো। নিজের ভাই মনে করো আমায়।”  

নাথু খুশি হল। দুর্গাদাসের মায়ের মৃতদেহ একটি কক্ষে রেখে মহাসিংহকে কুয়ো থেকে তুলে আনল দুজনে। খোলা বাতাস লাগতেই ধীরে ধীরে জ্ঞান ফিরে পেলেন তিনি। নাথু সংক্ষেপে দুর্গাদাসের আত্মগোপন, মুঘল আক্রমণ, মায়ের মৃত্যু এবং খুদাবখশের কীর্তির কথা জানাল। চোখে জল ভরে এল মহাসিংহের। বললেন, “এসব আমারই দুর্ভাগ্যের ফল, নাথু। আমি যদি সেখানেই মারা পড়তাম, তবে আমার স্বজনদের আজ এই দুর্দশা চাক্ষুষ করতে হত না।”  

নাথু সান্ত্বনা দিল, “যা হওয়ার ছিল হয়ে গেছে, মহারাজ। আপনি উপস্থিত খুদাবখশের সঙ্গে মাড়োতে চলে যান। আমি প্রভুর কাছে যাচ্ছি।”  

খুদাবখশ তাড়াতাড়ি বলল, “সম্ভব হলে আমাদের জন্য অন্য কাপড় নিয়ে এসো নাথু, কেউ চিনতে না পারে যাতে। রক্ষা নেই নইলে।”  

একজোড়া কাপড় আর দুটো ঘোড়া এনে দিল নাথু। আর মহাসিংহের হাতে তুলে দিল সেই লোহার সিন্দুক। খুদাবখশের সঙ্গে মাড়োর পথে রওনা হলেন তিনি, নাথু আরাবল্লির পথে।

একদিকে বার্ধক্য, অন্যদিকে ক্ষতবিক্ষত দেহ, তার ওপর এই পাহাড় বাওয়া— ক্লান্ত হয়ে একজায়গায় বসে পড়ল নাথু। ভাবতে লাগল, ‘হে ঈশ্বর! মাত্র দু-দিনে কী অঘটন ঘটে গেল সব! গতকালও যে মহলে আনন্দ ছিল, আলো জ্বলেছে, সেই ভবন আজ মহা শ্মশান। যাঁর প্রতাপে সমগ্র মারওয়াড় কাঁপে, আজ কোন পাহাড়ের অজানা গুহায় লুকিয়ে আছেন তিনি। বৃদ্ধা মায়ের মৃতদেহ পড়ে আছে ঘরে। হায়! যাঁর পুত্রদের সামনে রথীমহারথীরাও দাঁড়াতে সাহস করে না, আজ তাঁর এই দশা! এক গৃধ্রের হাতে কিনা প্রাণ গেল তাঁর! কী অদ্ভুত লীলা তোমার, বিধাতা! কালই প্রভু আমায় বৃদ্ধা মায়ের সেবার দায়িত্ব দিলেন, আর আজই আমি তাঁর মৃত্যুসংবাদ নিয়ে যাচ্ছি। হায়! প্রভু জানতে চাইলে কী উত্তর দেব আমি? কীভাবে বলব যে নিষ্ঠুর শমশের খাঁ আমি জীবিত থাকতেই মাকে হত্যা করেছে? হে প্রভু! এ-কথা বলার আগে মরণ হয় না কেন আমার! না। না না, মরেই যাই যদি, তবে সেই দুষ্টের পরিচয় দেবে কে?’

বিড়বিড় করতে করতে অজ্ঞান হয়ে পড়ল নাথু। নিদ্রাদেবী কোলে তুলে নিল তাকে, আর কোমল দোলায় ঘুম পাড়িয়ে দিল বাতাস।

ভোর হলে উঠে বসল নাথু। ঝরনার জলে হাত-মুখ ধুয়ে ঈশ্বর বন্দনা সেরে একদিকে রওনা হয়ে গেল তারপর। দুপুর দুপুর সেই পাহাড়টায় উঠল গিয়ে, দুর্গাদাস আত্মগোপন করে আছেন যেথা। নিজের পরিচয় দিতে রাজপুত তরবারির বর্ণনা করে মাড়ো রাগিণী গাইতে লাগল সে। গান শুনে গুহা ছেড়ে বেরিয়ে এলেন দুর্গাদাস।

প্রভুকে দেখে দৌড়ে এসে চরণে লুটিয়ে পড়ল নাথু। দুর্গাদাস জানতে চাইলেন, “মা ভালো আছেন তো, নাথু?”

নাথু উত্তর দিল না। এড়িয়ে গিয়ে জানাল, “আপনার চলে আসার পর আমরা মহারাজকে কুয়ো থেকে তুলেছিলাম, প্রভু। জীবিতই ছিলেন। লোহার সিন্দুক নিয়ে উপস্থিত মাড়োতে চলে গেছেন এবং যেতে যেতে একটি আংটি দিয়ে বলেছেন, ‘নাথু, এই আংটি তোমার প্রভুকে দেবে। যার মাধ্যমে এই আংটি আমার কাছে পাঠানো হবে, তার আদেশে আমি প্রাণ দিতেও প্রস্তুত থাকব।’”

যশোদাস আর তেজকরণও মা ও পিতামহীর কুশল জানতে ব্যাকুল হয়ে উঠল। তাড়া দিল—”অন্য কথা পরে হবে, নাথু। আগে মায়ের খবর বলো।”  

গলা শুকিয়ে এল নাথুর। জল ভরে এল চোখে। দুর্গাদাসের কণ্ঠে আতঙ্ক—”কী হয়েছে, নাথু? কথা বলছিস না কেন? শিগগির বল মা কেমন আছেন!”

নাথু কাঁদতে কাঁদতে সমস্ত ঘটনার ব্যাখ্যান দিল। শমশের খাঁর তলোয়ারটা সামনে ছুড়ে দিল।

ক্রোধে আগুন হয়ে উঠল দুর্গাদাসের চোখ-মুখ। তলোয়ার তুলে বলে উঠলেন, “হে সর্বশক্তিমান, জগতের সাক্ষী! তোমার নামে শপথ করছি—যে পাপী আমাদের নির্দোষ বৃদ্ধা মাকে হত্যা করেছে, তার রক্তে এই তরবারির তৃষ্ণা না মিটিয়ে জলও স্পর্শ করব না আমি।”  

সর্বাঙ্গ কেঁপে উঠল নাথুর। বলল, “এ কী করলেন, প্রভু! অগুনতি মুঘল, আর আপনি একা। আজই যদি প্রতিশোধের সুযোগ না ঘটে, তবে কতদিন জলপান ছাড়া থাকবেন আপনি?”

দুর্গাদাস হুংকার দিয়ে উঠলেন, “তুই ভুলে যাচ্ছিস, নাথু। আমি একা নই—আমার নিষ্ঠা, আমার ঈশ্বর আছেন সঙ্গে। জয় সর্বদা সত্যেরই হয়। যে মানুষ দুর্বল নারীর ওপর হাত তোলে, তার বেশিদিন বেঁচে থাকবার অধিকার নেই। ঈশ্বর চাইলে আজই মায়ের ঋণ শোধ করব আমি। তা না হলে দেশরক্ষায় প্রাণদাত্রী ক্ষত্রণীর মুক্তি কখনোই ঘটবে না আর।”  

সূর্য পাটে যেতে বসেছে। অন্ধকার বাড়ছিল। দুর্গাদাস নাথুকে নিজের আংটি দিয়ে বললেন, “তুই মহাসিংহের কাছে চলে যা। এই আংটি দিয়ে বলিস, দুর্গাদাস নিজের বৃদ্ধা মায়ের মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে কন্টালিয়ায় যাচ্ছে। যদি বেঁচে থাকি, আবার দেখা হবে; নইলে এই শেষ বিদায়।”  

নিজ পুত্র ও ভাইকে সঙ্গে করে কন্টালিয়ার পথ ধরলেন দুর্গাদাস।

রাতের এক প্রহর পেরিয়ে পটেল সর্দারদের ঘাঁটিতে গিয়ে পৌঁছলেন দুর্গাদাস। রণসিংহ প্রায় একশো রাজপুত বীরকে সঙ্গে নিয়ে অভ্যর্থনা জানাতে এগিয়ে এল। রাজপুতদের দেখে দুর্গাদাস আনন্দিত হলেন। শমশের খাঁর সেই তলোয়ার উঁচিয়ে ধরে বললেন, “ভাইসব! এই তলোয়ার কন্টালিয়ার সর্দার পাপিষ্ঠ শমশের খাঁর। আমার পূজনীয়া মায়ের হত্যা করে দেশকে অপমান করেছে সে। এর প্রতিশোধের শপথ নিয়েছি আমি। যদি তোমাদের মধ্যে রাজপুতি গৌরব এখনও অটুট থাকে, যদি দেশকে উদ্ধার করার আকাঙ্ক্ষা থাকে, যদি নিজেদের নিরপরাধ মা-বোন-কন্যার মান রক্ষা করতে চাও, তবে আমার এই প্রতিশোধ গ্রহণে শামিল হও।”  

দুর্গাদাসের জ্বলন্ত বাক্যবাণে রক্ত উত্তাল হয়ে উঠল রাজপুত বীরদের। একসঙ্গে সবাই হল্লা তুলল—”প্রতিশোধ চাই। এ দেহে প্রাণ থাকা অবধি আপনার আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করব আমরা।”  

তক্ষুনি খাপ থেকে তলোয়ার মুক্ত করে দুর্গাদাসের পেছনে পথ ধরল সবাই।

মধ্যরাত্রি পেরিয়ে গিয়েছে। প্রাণ বাজি রেখে দুর্গাদাসের সেই দল কন্টালিয়ায় পৌঁছে আক্রমণ হানল মুঘল দুর্গে। দরোজা বন্ধ ছিল। ভেঙে ভিতরে ঢুকে পড়ল সবাই। যাকে সামনে পেল, সেখানেই হত্যা করল। অস্ত্রের ঝনঝন শব্দে শমশের খাঁ চমকে উঠল। সামনে তাকিয়ে দেখে, যমের মতো বীর দুর্গাদাস দাঁড়িয়ে স্বয়ং।

দুর্গাদাস হুংকার দিলেন, “সাবধান, পাপী শমশের খাঁ, সাবধান! নিজের কালকে সামনে দেখতে পাচ্ছিস?”

শমশের খাঁ কাকুতি-মিনতি শুরু করল। দুর্গাদাস গর্জন করে উঠলেন, “চেয়ে দেখ পাপিষ্ঠ, চিনতে পারিস? এ সেই তলোয়ার, এখনও আমার বৃদ্ধা মায়ের রক্ত লেগে আছে এতে। আরও রক্ত চাই এর। এবার তোর রক্তে তার তৃষ্ণা নিবারণ করব আমি।”  

শমশের খাঁ হঠাৎ সতর্ক হয়ে এসে ঝাঁপিয়ে পড়তেই দুর্গাদাস এক আঘাতে দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিলেন তার মাথা। তলোয়ারটা সেখানেই ফেলে দিয়ে সহকারী বীর যোদ্ধাদের নিয়ে কল্যাণগড়ের দিকে রওনা হয়ে গেলেন ফের।

***

দুর্গাদাসের ইচ্ছা ছিল মায়ের শেষকৃত্য সম্পন্ন করবেন, কর্তব্যও বটে। সেই কারণেই কল্যাণগড়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু মুঘল সৈন্যরা এর আগেই শুধু দুর্গাদাসের বাসস্থানই নয়, সমগ্র কল্যাণগড় পুড়িয়ে ছারখার করে গিয়েছে। নিজের গ্রামের এই অবস্থা দেখে চোখে জল এসে গেল তাঁর। নীরবে দাঁড়িয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর ক্রোধে ফেটে পড়ে বললেন, “ভাইয়েরা! কোনও অপরাধ না থাকা সত্ত্বেও শত্রুরা যখন মাকে হত্যা করেছে, ঘরবাড়ি লুট করেছে, গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়েছে, তবে এমন খুনিদের সঙ্গে সন্ধি করে আমরা মারওয়াড়কে অপমান করতে পারি না। আমাদের ধর্ম শুধু পাহাড়ে লুকিয়ে প্রাণ বাঁচানো নয়। এখন যখন গ্রাম-ঘর কিছুই রইল না আর, তখন সমগ্র মারওয়াড়ই আমাদের ঘর; মারওয়াড়ের পবিত্র ভূমিই আমাদের জননী। তাই আমি যতদিন না মাতৃভূমির সমস্ত সংকট দূর করতে পারছি…”এই বলে খাপ থেকে তলোয়ার বের করলেন তিনি।—”ততদিন এই তলোয়ার খাপে ফিরে যাবে না আর।”  

প্রতিজ্ঞা শেষে নিজ পুত্র, সহোদর এবং অল্প ক’জন রাজপুতকে সঙ্গে নিয়ে আরাবল্লির পথে চলে গেলেন দুর্গাদাস।

ছয়

ওদিকে দুর্গাদাসের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে পরদিন মাড়োতে এসে পৌঁছেছে নাথু। দুর্গাদাসের সেবক বলে পরিচয় পেয়ে দ্বাররক্ষী রাজা মহাসিংহের কাছে নিয়ে গেল তাকে। মহাসিংহ নাথুকে বসিয়ে দুর্গাদাসের সংবাদ নিলেন। বিষণ্ণ মনে হাতে হাত রেখে বসে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর বললেন, “বড়ো পরিতাপের বিষয় নাথু, যার জন্য মুঘলদের শত্রু করলেন দুর্গাদাস, সে মহলে বসে রাজসুখ ভোগ করছে! এমন জীবনে ধিক্কার! আমার প্রাণ বাঁচালেন যিনি, তাঁর উপকারের সামান্য প্রতিদানও দিতে পারলাম না। আমি কালই তোমার সঙ্গে যাব, নাথু।”  

মহাসিংহের স্ত্রী তেজোবাই, সেখানেই বসে বসে শুনছিলেন সব। বললেন, “এমন ভাবনা মনেও আনবেন না, মহারাজ। আপনার ক্ষত সারেনি এখনও, আর আপনি চলেছেন মুঘলদের মোকাবিলা করতে! আমি বুঝি না, মুষ্টিমেয় ক’জন রাজপুতকে নিয়ে এত বড়ো মুঘল বাদশাহের সঙ্গে কীভাবে লড়বেন আপনারা? আগুনে ঝাঁপ দিয়ে পতঙ্গের মতো পুড়ে মরা কি বুদ্ধিমানের কাজ? দুর্গাদাস এই শত্রুতা করে কী পেলেন বলুন তো? সামনে সাজানো সোনার থালায় লাথি মারা বই তো নয়। জোরাওয়র খাঁকে মেরে কী সুখ হল তাঁর? এই তো—ঘরবাড়ি সব লুট হল, বৃদ্ধা মায়ের হত্যা হল, আর তিনি এখন জঙ্গল-পাহাড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। আপনিও কি এমন উগ্র মস্তিষ্ক লোকদের সাহায্য করে নিজের রাজ্য হারাতে চান?”

কথাগুলো তিরের মতো বিঁধল এসে মহাসিংহের বুকে। কিন্তু অন্দরে বিবাদ সৃষ্টি হয়, তাই ক্রোধ প্রকাশ করলেন না। বললেন, “তেজোবাই! দুর্গাদাস কি সেই উগ্র মস্তিষ্কের মানুষ, যিনি তোমার সিঁদুর রক্ষা করেছিলেন, দাম্পত্যের মর্যাদা রক্ষা করেছিলেন? দুর্গাদাস কি আমাদের বংশের মান রক্ষা করেননি? দুর্গাদাস নিজের জন্য নয় তেজোবাই, আমার প্রাণ বাঁচানোর জন্যেই মুঘলদের সঙ্গে শত্রুতা করেছেন। যদি জোরাওয়র খাঁ নিহত না হত, তবে আজ তোমার কী ঘটত, ঈশ্বরই জানেন! আর আজ, বিপদ শেষে তুমি সেই বীরপুরুষকে মূর্খ বলছ! ধিক্কার তোমাকে আর তোমার জন্মদাতাকে। ব্রহ্মার উচিত হয়নি তোমাকে ক্ষত্রিয়কন্যা করে সৃষ্টি করা।”  

তেজোবাইয়ের রাজসুখে লোভ, মহাসিংহের উপদেশ তাঁর ভালো লাগল না। অন্যত্র চলে গেলেন উঠে। তারপর রাজার ভ্রাতুষ্পুত্র মানসিংহকে ডেকে বললেন, “বাবা, তোমার কাকাকে বুঝিয়ে বলো, বসে বসে অন্যের শত্রুতা নিজের মাথায় না নিতে। এতে মঙ্গল হবে না কিছু।”  

মানসিংহ উত্তর দিল, “এ তো অন্যের শত্রুতা নয় কাকি-মহারানি, আমাদের নিজেরই বিষয়। বীর দুর্গাদাস মুঘলদের সঙ্গে যে শত্রুতা করলেন, সে আমাদের বংশের সম্মান রক্ষার খাতিরেই। এতে তাঁর স্বার্থ নেই কোনও। বিপদগ্রস্তকে সাহায্য করা রাজপুতদের ধর্ম। দুর্গাদাস তা পালন করে চলেছেন। এইবারে আমরা যদি তাঁর সাহায্যে এগিয়ে না যাই, তবে কাকি-মহারানি, আমাদের রাজপুত মর্যাদায় কি কলঙ্ক লাগবে না? যদি কাকা-মহারাজের যাওয়া আপনার পছন্দ নয়, আমি নিজেই চলে যাব তবে।”  

মহারানির কাছ থেকে বিদায় নিয়ে মহাসিংহের কাছে এল মানসিংহ। বলল, “কাকা-মহারাজ! আপনার ক্ষত সারেনি এখনও। তাই আমাকে আপনার বাহিনীর দায়িত্ব দিয়ে বীর দুর্গাদাসকে সাহায্য করতে যাওয়ার অনুমতি দিন।”  

ভ্রাতুষ্পুত্রের এই সাহস ও বিবেচনা দেখে মহাসিংহ তৃপ্তি বোধ করলেন। তিনশো বীর রাজপুতকে ডেকে পাঠালেন তক্ষুনি। সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, “ভাইয়েরা, আমি কোনও রাজপুতকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে যুদ্ধে পাঠাতে চাই না। যদি কারও নিজের স্ত্রী-পুত্র বা প্রাণের প্রতি মোহ থাকে, তবে সে এই মুহূর্তেই ঘরে ফিরে যাক। দুর্দম শত্রুর সামনে থেকে পালিয়ে গিয়ে রাজপুতদের হাস্যাস্পদ না করে যেন।”  

বীর যোদ্ধারা উত্তর দিল, “মহারাজ! দেশের স্বাধীনতার অঙ্গীকারে বাড়ানো কদম পিছিয়ে আসতে পারে না। মৃত্যুর পরে স্বর্গ, আর বেঁচে থাকলে সুখ ও যশ—উভয়তই আমাদের মঙ্গল।”  

বীরদের উৎসাহ দেখে অত্যন্ত আনন্দিত হলেন মহাসিংহ। তিনশো সৈন্যকে তিনটি দলে ভাগ করলেন তিনি। একদলকে রূপসিংহ ওদাওয়তের সঙ্গে পাঠালেন আর দ্বিতীয় দলটিকে মোহকমসিংহ মেড়তিয়ার সঙ্গে রওনা করিয়ে দিলেন অন্য একটি পথে।

অল্প অল্প করে রাজপুতদের পৃথক পৃথক পথে পাঠানোর কারণ ছিল। এত অস্ত্রধারী রাজপুতদের একসঙ্গে যেতে দেখলে মুঘলেরা সন্দেহ করবে। বাধা দিতে গিয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লিপ্ত হওয়া রাজপুতদের কাছে নতুন কিছু নয়; কিন্তু তার ফলে মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হত। দুর্গাদাসকে সাহায্য করা তো দূরের কথা, নিজেদের রক্ষাই কঠিন হয়ে পড়ত তখন। এইসব বাধা এড়ানোর জন্যেই দুটি দলকে পাঠিয়ে দেওয়া হল প্রথমে। তৃতীয় দলটি মানসিংহ নিজের সঙ্গে রাখল।

***

ভোরের আবছা আলো মাত্র ফুটতে শুরু করেছে তখন। তেজোবাই ও লালবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাইরে এল মানসিংহ। রাজপুতদের কুচকাওয়াজের আদেশ দিতে যাবে, এমনি সময় হঠাৎ দক্ষিণে তাকিয়ে দেখে, কালো মেঘের মতো ধুলো উড়িয়ে ধেয়ে আসছে মুঘল সেনা।

দেখামাত্রই মানসিংহ অন্দরে ঢুকে গেল খবর দিতে। মুঘলেরাও অমনি গড় ঘিরে ফেলল। রাজপুতেরা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়েই দাঁড়িয়ে ছিল, সঙ্গে সঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়ল তারা। শুরু হল ভয়ংকর রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ।

মহাসিংহ উতলা হলেন—”বাবা, মানসিংহ! যেভাবেই হোক, লালবাকে এখান থেকে বের করে নিয়ে যাও। মৃত্যুকে ভয় করি না; তবে বংশের কলঙ্কে বড়ো ভয়।”  

ছুটে লালবার কাছে পৌঁছে তাকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে সুড়ঙ্গের কুঠুরিতে নিয়ে গেল মানসিংহ। লালবা উৎকণ্ঠিত। বলে, “ভাই! বৃদ্ধ নাথুকে বাঁচানো উচিত যে করেই হোক।”  

মানসিংহ রাজি হয়—”আচ্ছা, বেশ। তুই এখানেই দাঁড়া বোন, নাথুকে আনতে যাচ্ছি আমি। যদি আমার আসতে দেরি হয়, তবে এগিয়ে যাবি সোজা। খানিক দূরেই স্বামী মহেন্দ্রনাথের মঠ পাবি। তাঁর কাছে যাস, এর মধ্যেই চলে আসব আমি।”  

মানসিংহ সুড়ঙ্গের মুখ বন্ধ করে বাইরে এল। দেখে, মুঘল সৈন্যরা গড়ের চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। চন্দ্রসিংহ, লালবার সৌন্দর্যে মুগ্ধ ছিল যে, একের পর এক কুঠুরিতে শুধু লালবাকেই খুঁজে বেড়াচ্ছে উন্মাদের মতো। একখানা ঝরোখার আড়ালে লুকিয়ে চোখ রেখেছে মানসিংহ। হঠাৎ তিনজন সৈন্য এসে লাফিয়ে পড়ল সেখানে। মানসিংহ মুহূর্তের মধ্যে তিনজনকেই যমপুরীতে পাঠিয়ে সরে গেল অন্যদিকে। সেখানেও একজন মুঘল সৈন্য এসে পড়ল সামনে। মানসিংহ তাকেও দোজখের পথে পাঠাতে উদ্যত হতেই পেছন থেকে কে বলে উঠল, “আরে, আরে, এ যে খুদাবখশ!”

মানসিংহ নিরস্ত হল। ফিরে তাকিয়ে দেখে, নাথু দাঁড়িয়ে আছে। তারপর তিনজন একসঙ্গে নেমে গেল সুড়ঙ্গে। লালবা তখনও সেখানে দাঁড়িয়ে। ডাকল, “ভাই মানসিংহ! নাথুকে নিয়ে এলে কি?”

অন্ধকারে উত্তর আসে, “হ্যাঁ, রাজকুমারী, আমি ঠিক আছি। খুদাবখশকেও সঙ্গে এনেছি।”  

পথে যেতে যেতে লালবা প্রশ্ন করে, “আমার পিতামাতার কী অবস্থা, নাথু?”

“আমার সামনেই তাঁদের বন্দি করা হয়েছিল, রাজকুমারী। এরপর কী হয়েছে, জানি না। মহারাজ আমাকে পালিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত করেছিলেন। আমি তাঁর অভিপ্রায় বুঝে পালিয়ে এসেছি। নিজের জন্যে নয়, এই লোহার সিন্দুকটা রক্ষার খাতিরে।”  

সাত

খুদাবখশ বলছিল, “মাতাপিতার চিন্তা আপনি করবেন না, রাজকুমারী। আমি মুসলমান, তাই ধরা পড়ার ভয় আমার ছিল না। আমি সেখানেই দাঁড়িয়ে শুনছিলাম সব। কিছুক্ষণের মধ্যেই সমস্ত রহস্য ফাঁস হয়ে গেল। দেশদ্রোহী চন্দ্রসিংহ শাদির প্রস্তাব পাঠিয়ে একখানা পত্র লিখেছিল মহারাজকে। আপনার হয়তো জানা নেই; রাজা মহাসিংহ তার দুষ্ট প্রকৃতি সম্পর্কে অবগত ছিলেন, তাই তার অনুনয়ে কর্ণপাত করেননি। এই অপমানেই চন্দ্রসিংহ ক্ষুব্ধ হয়ে তাঁকে হেয় করার ফিকির খুঁজতে থাকে। দৈবক্রমে জানতে পারে যে নাথু এসে হাজির হয়েছে এবং বীর দুর্গাদাসকে সাহায্য করতে এখান থেকে রাজপুতদেরও পাঠানো হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে সে মুঘল সর্দার ইনায়ৎ খাঁর কাছে মহারাজকে রাজদ্রোহী বলে অভিযুক্ত করে মাড়ো আক্রমণ করে। এই সবের মূলে ছিলেন এক আপনি। কিন্তু খোদার রহমে আপনি সেই দেশদ্রোহী দুষ্টের হাতে পড়েননি, নইলে বড়ো বিপদ হত আজ। বহু সন্ধানের পরও যখন চন্দ্রসিংহ আপনার হদিস পায়নি, তখন মহারাজ আর মহারানিকে কয়েদ করে সোজিতগড়ে রাখার সিদ্ধান্ত নিল। আল্লাহ্‌ চাইলে দু-একদিনের মধ্যেই মুক্তি পাবেন তাঁরা।”  

বলতে বলতে সুড়ঙ্গ ফুরিয়ে এল। মানসিংহ এগিয়ে গিয়ে মুখ খুলে দিল তার। একে একে বার করে আনল সবাইকে।

মঠে মানুষের পদশব্দ শুনে স্বামী মহেন্দ্রনাথ উপস্থিত হলেন এসে। উঠে এসে প্রণাম করল সবাই। স্বামীজি আশীর্বচন শোনালেন। তিনি জানতে চাওয়ার আগেই মানসিংহ মুঘলদের আক্রমণ ও পালানোর কারণ ব্যক্ত করল সব।

স্বামীজি লালবার পিঠে হাত বুলিয়ে অভয় দিলেন, “এখন আর কোনও চিন্তা নেই, বেটি। সানন্দে থাকো এখানে। এখনই এক দাসী ডেকে দিচ্ছি তোমার সেবায়। এখানে কারও ক্ষমতা নেই তোমাকে কষ্ট দেয়।”  

স্বামীজি বাকি সবাইকেও সান্ত্বনা দিলেন। শয়নকক্ষ দেখিয়ে দিয়ে চলে গেলেন অন্য মঠে।

ভয় আর দুশ্চিন্তায় ঘুম কোথা! রাতটুকু কাটল কোনোমতে। ভোর হলে বিদায়ের অনুমতি চাইল খুদাবখশ। স্বামী মহেন্দ্রনাথ নিরস্ত করলেন—”এত উতলা কেন, বেটা? যাবার তো সময় আছে।”  

জবাব এল, “আমি মুসলমান, স্বামীজি। মুসলমানদের অত্যাচার দেখে শরম হয় তাই। সাচ্চা মুসলমান কখনোই অন্যের মা-বোনেদের নির্যাতন করে না। এ তার ধর্ম নয়। সে দুঃখীকে তকলিফ দেয় না, অসহায় নারীর ওপর হাত তুলে বাহাদুরি দেখায় না। আমাকে ক্ষমা করুন, স্বামীজি। আজ্ঞা দিন—যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই দেশ ছেড়ে চলে যেতে পারি যাতে।”  

তারপর মানসিংহকে গভীর স্নেহে আলিঙ্গন সেরে পরস্পর তরবারি বদল করল দুজনে। খুদাবখশ স্বামীজিকে প্রণাম জানিয়ে চলে গেল। খানিকটা এগিয়ে গিয়ে ফিরে বলল, “ভাই মানসিংহ, আমার তলোয়ার দিয়ে কখনও জানের রহম চাওয়া কোনও কাপুরুষকে হত্যা কোরো না।”  

মানসিংহের চোখে জল ভরে এল। সাচ্চা মুসলমানটির দিকে তাকিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে রইল সে। একসময় দৃষ্টির বাইরে মিলিয়ে গেল খুদাবখশ।

***

স্বামীজি, নাথু, লালবা আর মানসিংহদের মধ্যে খুদাবখশের কথাই আলোচনা চলছিল তখন। এমন সময় দেখা গেল ক’জন মুঘল সৈনিক মিলে অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে মারতে মারতে নিয়ে যাচ্ছে এক রাজপুতকে। স্বামীজির দয়া হল। সহ্য করতে না পেরে দৌড়ে গিয়ে জানতে চাইলেন, “এই হতভাগ্যকে মারছ কেন, ভাই?”

সেপাইরা উত্তর দিল, “এ রাজদ্রোহী মহাসিংহের পক্ষের লোক, স্বামীজি। মহাসিংহের আংটিও আছে এর কাছে।”  

স্বামী মহেন্দ্রনাথ বললেন, “এ তো কোনও প্রমাণ নয়। ধরো আংটিটা কারও কাছ থেকে ছিনিয়ে এনেছে সে, বা মহাসিংহ নিজেই দিয়েছেন, কিংবা চুরি করে এনেছে—তাতে তাকে মহাসিংহের লোক বলা যায় কী উপায়ে? তোমাদের ধর্মগ্রন্থ কোরানে নির্দোষকে হত্যা করা মহাপাপ বলা হয়েছে। এক্ষুনি ছেড়ে দাও একে।”  

স্বামীজির কথা দলের সর্দারের ভালো লাগল। রাজপুতটিকে ছেড়ে দেওয়ার হুকুম দিল সে। স্বামীজি লোকটাকে মঠে নিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলেন, “রাজা মহাসিংহের এই আংটি তুমি কোথা থেকে পেলে বেটা, আর যাচ্ছিলেই-বা কোথা?”

রাজপুত উত্তর দিল, “আমার প্রাণ বাঁচিয়েছেন আপনি স্বামীজি, তাই আপনাকে বিশ্বাস করা উচিত। কিন্তু যতক্ষণ না নিশ্চিত হচ্ছি যে আপনি আমাদের মঙ্গলকামী, ততক্ষণ কিছু বলব না—প্রাণ নিলেও না।”  

লোকটার কণ্ঠস্বর নাথুর পরিচিত মনে হল। সে বেরিয়ে এলে রাজপুত বলে উঠল, “আরে, নাথু! এখানে কী করছ তুমি? সামন্তরাজ মহাসিংহ দুর্গাদাসকে সাহায্য করার ব্যবস্থা করলেন কিছু?”

নাথু বিস্মিত।—”সে কী! সেনা পৌঁছায়নি? গতকালই তো দুশো জনের দল পাঠানো হল দুটো।”  

“না নাথু, এখনও পৌঁছায়নি কেউ। মুঘলরা চারদিক ঘিরে রেখেছে। খাবার জোটাবারও উপায় নেই। আরও দু-দিন এমন কাটলে মারওয়াড় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাবে।”  

মানসিংহের মুখে তাকিয়ে তখন স্বামী মহেন্দ্রনাথ গর্জে উঠলেন, “হতাশ হচ্ছ কেন? মারওয়াড় স্বাধীন হবেই। আর বীর দুর্গাদাসেরও সংকল্প সফল হবে। পুরুষ হও যদি তবে পুরুষার্থ দেখাও। আজ রাতেই তোমার কাকা কল্যাণসিংহের কাছে যাও, যতটা সাহায্য পাওয়া যায় নিয়ে আরাবল্লিতে পৌঁছাও। জয় তোমাদের হবেই।”  

***

স্বামীজির আদেশে মানসিংহ ও করণসিংহ বোন লালবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে প্রায় মধ্যরাতে কল্যাণসিংহের মহলে পৌঁছল গিয়ে। প্রহরীরা ঘুমে অচেতন। একে একে জাগানো হল সবাইকে। সামন্ত সর্দার ভয় পেয়ে গেলেন। জিজ্ঞেস করলেন, “বেটা মানসিংহ! সব কুশল তো? এই অসময়ে এসে উঠলে যে?”

মানসিংহ পা ছুঁয়ে প্রণাম সেরে বসে বলল, “মাড়োর খবর শোনেননি, কাকা? দুষ্ট চন্দ্রসিংহ সর্দার ইনায়ৎ খাঁকে নিয়ে গড়ি লুঠ করেছে, কাকা-কাকিকে ধরে নিয়ে গেছে। বোন লালবাকে তার চাই। বীর দুর্গাদাসও কাকা-মহারাজকে রক্ষা করতেই জোরাওয়র খাঁকে হত্যা করেছিলেন—আজ তারই ফল ভোগ করছেন। ঘর লুঠ হয়েছে, গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে, তাঁর মা নিহত হয়েছেন। আরাবল্লিতে আশ্রয় নিয়েও শান্তি নেই, চারদিক থেকে মুঘলরা ঘিরে রেখেছে। তাই কাকা, এমন বীর মরদের জন্য আপনার তরফ থেকে কিছু সাহায্য চাই।”  

কল্যাণসিংহ আঁতকে উঠলেন, “কথা তো সত্য, বাবা; কিন্তু আমাদের ছোটো গাঁ। অউরংজেব জানতে পারলে ধুলোয় মিশিয়ে দেবে। তখন যাব কোথা?”

মানসিংহ বোঝায়, “রাজপুতেরা কবে এত ভয় পেতে শুরু করল, কাকা? দেশের স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দেওয়াই রাজপুতের ধর্ম। আপনি নিজে যুদ্ধে যেতে না চান, আপনার অধীনে থাকা ক’জন বীর রাজপুতকে সাহায্যের জন্য পাঠান—আপনার কোনও অপরাধ হবে না।”  

মানসিংহের অনুরোধ ও দৃঢ়তায় কল্যাণসিংহ ষাট জন রাজপুতকে দুর্গাদাসের সাহায্যে পাঠানোর অনুমতি দিলেন। পরদিন সন্ধ্যায় তাদের নিয়ে আরাবল্লির দিকে রওনা হল মানসিংহ।

আট

কন্টালিয়ার সর্দার শমশের খাঁ নিহত হওয়ার সংবাদ পেয়ে অউরংজেব আর সামলাতে পারলেন না নিজেকে। সঙ্গে সঙ্গে আদেশ দিলেন, যে উপায়েই হোক দুর্গাদাসকে আমার চাই—জীবিত বা মৃত। পরদিনই চারদিক থেকে আরাবল্লি পর্বত ঘিরে ফেলল মুঘলেরা। বেয়ে উঠে রাজপুতদের সঙ্গে লড়াই করার সাহস কারও ছিল না, তাই সিদ্ধান্ত হল, শত্রুকে অনাহারে মারতে হবে। পাহাড়ে ওঠানামা করতে দেওয়া হবে না কাউকে। লাশের খাটিয়া পর্যন্ত খুলে দেখা হচ্ছে।

দুর্গাদাস ও সঙ্গী রাজপুতদের অবস্থা শোচনীয় হয়ে উঠল। সামান্য কন্দমূলও জোটে না এমন অবস্থা। টানা তিনদিন উপবাস চলেছে। সঙ্গীদের কষ্ট আর সহ্য করতে পারলেন না দুর্গাদাস। ডেকে বললেন, “আমার ভাইয়েরা! নাথুকে পাঠানো হয়েছে চারদিন হল। সে নিজেও ফিরল না, সাহায্যও এল না। সে-ই বা পাঠাবে কাকে? সে তো নিজেই মহাসিংহের কাছে ভিক্ষা চাইতে গেছে। এক সময় ছিল, সারা দুনিয়ায় রাজপুতদের বীরত্বের জয়গান হত। আজ সেই রাজপুতেরা মুষ্টিমেয় মুঘলের ভয়ে ঘর ছেড়ে বেরোতে সাহস করে না। যে যার বাড়ি ফিরে যাও সবাই। আমাকে আর আমার এই হতভাগী দেশটাকে ঈশ্বরের ওপর ছেড়ে দাও। যে শপথ নিয়েছি, পূরণ আমি করবই। স্বাধীন বাঁচব, নইলে মাতৃভূমির জন্য লড়ে তার কোলেই শরণ নেব চিরতরে।”  

দুর্গাদাসকে এমন বিষণ্ণ দেখে রাজপুতেরা উত্তেজিত হয়ে উঠল। বলল, “ঠাকুর, আপনার শপথই আমাদের শপথ। আপনি যেখানে, আমরাও সেখানে। মারওয়াড় স্বাধীন না হওয়া পর্যন্ত জীবিত ঘরে ফিরব না আমরা।”  

এই সাহস দেখে দুর্গাদাসের নিভে যাওয়া আশার আলো জ্বলে উঠল ফের। বললেন, “চলো তবে, অনাহারে মরার চেয়ে যুদ্ধ করেই মরি।”  

পথটি ভয়ংকর। মানুষ তো দূর, জন্তুজানোয়ারেরাও আসতে যেতে দু-বার ভাবে। সেই পথেই এমন সময় হঠাৎ হল্লা উঠল—‘রাম নাম সত্য হ্যায়।’ নজরে এল, চারজন লোক এক মরদেহ তুলে নিয়ে আসছে, পেছনে আরও শ-খানেক লোকজন। খাটিয়ার পেছনে একজনের হাতে আধপোড়া কাঠ, অন্যজনের হাতে হাঁড়ি ঝুলছে একখানা। সন্দেহ হল—শ্মশান তো ওদিকে, এরা এদিকে আসছে কেন?

খাটিয়া খুলতেই এক রাজপুত লাফিয়ে উঠে দুর্গাদাসের পায়ে লুটিয়ে পড়ল এসে। গম্ভীরসিংহ তার নাম।

রূপসিংহ ওদাওয়ত খানিক পিছিয়ে পড়েছিলেন। দৌড়ে কাছে এসে অভিবাদন সেরে জানালেন, “এই রাজপুতের নাম গম্ভীরসিংহ, ঠাকুর। আপনার কাছে পৌঁছার চেষ্টায় নিষ্ফল ঘুরে বেড়াচ্ছিল এদিক ওদিক। দেবযোগই হবে হয়তো, দেখা হয়ে গেল হঠাৎ। এদিকে আমরাও ব্যাকুল আপনার দলে যোগ দিতে। ওদিকে মুঘলেরা চারদিক ঘিরে। কী করি, এই গম্ভীরসিংহই উপায় বার করল শেষে। শ্মশানযাত্রীর ছদ্মবেশে মুঘলের চোখকে ফাঁকি দিয়েছে সে। চার-চারটে জায়গায় খাটিয়া খুলেও কিছু সন্দেহ হল না ওদের। সত্যি বলতে, এই গম্ভীরসিংহই আপনার সহায়তায় এগিয়ে এল, মহাসিংহ নন।”  

দুর্গাদাস বুকে জড়িয়ে ধরলেন গম্ভীরসিংহকে। বললেন, “বেটা গম্ভীরসিংহ, এই মারওয়াড় দেশ তোমার ঋণী রইল আজীবন। তোমার মতো চতুর আর সাহসী বীরেদের হাতেই স্বাধীন হবে এই মাটি।”  

রূপসিংহ ওদাওয়ত তাড়া দিলেন, “সূর্য অস্ত গেল, ঠাকুর। পথ বন্ধুর। আঁধার নেমে গেলে পথচলা দায় হবে। শীঘ্র রওনা হওয়া উচিত।”  

দুর্গাদাসের আদেশ পেতেই রাজপুতেরা পাহাড় বেয়ে নেমে ক্ষুধার্ত সিংহের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল মুঘলদের ওপর। শত শত মুঘল নিহত হল মুহূর্তে। সর্দারকে খবরটুকু পাঠাবার মতো কেউ বেঁচে রইল না আর।

দুর্গাদাস নিশ্চিন্ত হলেন খানিকটা। পথে আর বাধা নেই তেমন।

রাত হলে আরাবল্লি পার হয়ে দলটা এক সমতলে পৌঁছল এরপর। আগামী কর্তব্য স্থির করতে একত্র হল সবাই। হঠাৎ কার এক আর্ত চিৎকার কানে এল। দুর্গাদাস ছুটে গিয়ে দেখেন, এক অসহায় নারীর ওপর অত্যাচার চালিয়েছে কোন দুষ্কৃতী, অন্ধকারে লোকটাকে চেনা যাচ্ছে না। গম্ভীরসিংহ আর যশোদাসও দৌড়ে গেল পেছন পেছন। দুর্গাদাস হাঁক দিলেন, “কে রে তুই, পাপিষ্ঠ? এ কী করছিস তুই?”

উত্তর এল, “তাতে তোর কী প্রয়োজন, অ্যাঁ?”

দুর্গাদাস অস্ত্র খুলতে উদ্যত হতে সেই লোকও দৌড়ে এল খোলা তলোয়ার হাতে। গম্ভীরসিংহ মুহূর্তে শিরচ্ছেদ করল তার।

দুর্গাদাসের প্রশ্নে নারী পরিচয় দিল, “আমি মাড়োরাজ মহাসিংহের কন্যা লালবা, ঠাকুর। আর ওই পাপিষ্ঠ হচ্ছে চন্দ্রসিংহ। নিজের পাপের শাস্তি পেল আজ।”  

এমনি সময় পেছনে কার পায়ের শব্দ পেলেন দুর্গাদাস। ঘুরে তাকিয়ে দেখেন, গম্ভীরসিংহ আর যশোদাস দৌড়ে মিলিয়ে যাচ্ছে অন্ধকারে। দুর্গাদাসও তলোয়ার খুলে লালবাকে আগলে দাঁড়ালেন এসে। খানিক বাদেই লাগাম ধরে পাঁচটা ঘোড়া টেনে নিয়ে এল গম্ভীরসিংহ আর যশোদাস মিলে। জানাল, “ওই পাপিষ্ঠের আরও তিন দোসর ছিল, ঠাকুর। দেখতে পেয়েই তাড়া করেছিলাম আমরা। পালাবার আগেই নরক পৌঁছে দিয়েছি ওদের। আর ঘোড়াদের আপনার সেবায় নিয়ে এলাম।”  

গম্ভীরসিংহের গলা শুনে লালবা বলে উঠল, “ভাই গম্ভীরসিংহ, তুমিও কি চিনতে পারছ না আমায়?”

গম্ভীরসিংহ যারপরনাই আশ্চর্য হল।—”কে, রাজকুমারী লালবা? আপনি এই পাপিষ্ঠের খপ্পরে পড়লেন কী উপায়ে?”

“মাতা তেজোবাইয়ের কারণে, ভাই। কোনও ক্ষত্রণীর লক্ষণ নেই তাঁর রক্তে। শুধুই রাজসুখ ভোগের আকাঙ্ক্ষা। কবে যে এই চন্দ্রসিংহ লোভের ফাঁদে ফাঁসিয়েছে তাঁকে কে জানে। মহারাজের আংটি দেখে আংটিবাহকের সঙ্গে লালবা চলে আসবে, এই হয়তো ষড় করেছিল।”  

গম্ভীরসিংহ সন্দেহ করল, “কিন্তু রাজকুমারী, মহারানি তেজোবাই আর মহারাজ মহাসিংহ বন্দি হয়েছেন, বিশ্বাস হচ্ছে না যে। এক বন্দি করা ছাড়া তাঁর অভিজ্ঞান আংটি অন্যের হাতে পড়বে কী করে?”

লালবা পালটা প্রশ্ন করল, “বেশ, ধরেও যদি নিই যে চন্দ্রসিংহ কোনও না কোনও ছলে পিতা-মহারাজের আংটি হাসিল করেছে, তারপরও আমি সুড়ঙ্গ পার করে যে স্বামীজির গড়িতে গিয়ে উঠেছি, সেই খবর পেল কী করে? আমার বিশ্বাস, মাতা তেজোবাইই স্বয়ং রয়েছেন এই ষড়যন্ত্রের পেছনে।”  

গম্ভীরসিংহ জানতে চাইল, “আচ্ছা রাজকুমারী, আমি বুঝতে পারছি না আপনি চন্দ্রসিংহের স্বভাবচরিত্র জানতেনই যখন, তার ছলে ফেঁসে গেলেন কী করে?”

“কী করব! পিতামহারাজের আংটি দিয়ে তো অন্য এক রাজপুতকে পাঠিয়েছিল সে, নিজে আসেনি। সে এসে বলে, মহারাজ কী এক বিপদে পড়েছেন, রানি তেজোবাই নাকি পত্রপাঠ তলব করেছেন আমাকে। দূতের হাতে রাজ-অভিজ্ঞান, অবিশ্বাস করি কী করে? স্বামীজির কাছে বিদায় নিয়ে আমিও তক্ষুনি চলে এলাম দূতের সঙ্গে। এরপর এই বিপদ, সে তো স্বচক্ষেই দেখলে। পাপিষ্ঠের ইচ্ছে পূরণের আগেই ঈশ্বর তোমাদের হাতে রক্ষা করলেন আমায়।”  

দুর্গাদাস আশ্বস্ত করলেন, “যা হবার হয়েছে মা, স্থির হ। এইবারে আমার প্রথম কাজ হচ্ছে তোকে এমন সুরক্ষিত জায়গায় কোথাও রাখা, যেখানে বিপদআপদের আশঙ্কা থাকবে না।”  

লালবা বলে উঠল, “না, আর একা থাকতে চাই না আমি। আমাকে রক্ষা করতে চান তো আপনার সঙ্গেই থাকার অনুমতি দিন। আমি সৈনিকের বেশে থাকব, যথাসাধ্য সাহায্য করব আপনাকে। নিজেকে রক্ষার এর চাইতে ভালো উপায় আর দেখি না।”  

রাজসুখে লালিত এক রাজকন্যার এই সাহস দেখে প্রসন্ন হলেন দুর্গাদাস। সম্মতিও দিলেন।

গম্ভীরসিংহ চন্দ্রসিংহের পোশাক-পরিধান খুলে নিয়ে এল তক্ষুনি। আর লালবাও অমনি রাজপুত বীরের বেশ নিল। খোলা তলোয়ার হাতে ঘোড়ার পিঠে পিছু পিছু চলল দুর্গাদাসের।

খানিকটা এগোবার পরই কাদের পায়ের শব্দ এল কানে। গম্ভীরসিংহ সাহসী যুবক, এগিয়ে গেল অনুসন্ধানে। দেখে, পঞ্চাশ-ষাট জনের এক দল এগিয়ে আসছে এদিকেই। আকাশে চাঁদ উঠেছে ততক্ষণে। হাবেভাবে তাদের রাজপুত বলেই ঠাহর হয়। দলটা খানিক কাছে আসতেই গম্ভীরসিংহ হাঁকল, “কে যায়?”

উত্তরে প্রশ্ন ভেসে এল, “তোমার পরিচয়?”

গম্ভীরসিংহ এই কণ্ঠস্বর চেনে। নেমে এল ঘোড়া থেকে। উচ্ছ্বাস ঝরে পড়ে কণ্ঠ থেকে, “ভাই মানসিংহ! আমি গম্ভীর।”  

বলেই মানসিংহের হাত ধরে দুর্গাদাসের সামনে নিয়ে হাজির করে তাকে। বড়ো আনন্দে মানসিংহকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন দুর্গাদাস। মানসিংহ লালবাকে চিনতে না পেরে যশোদাসকে শুধোয়, “কে এই রাজপুত, ভাই?”

যশোদাস উত্তর দেবার আগেই লালবা পরিচয় দেয়, “আমি তোমার বোন লালবা, ভাই মানসিংহ।”  

বড়ো আশ্চর্য দৃষ্টিতে লালবার মুখে তাকিয়ে রইল মানসিংহ। জিজ্ঞেস করে, “তুই এখানে কী উপায়ে, বোন?”

লালবা খুলে বলল আদ্যোপান্ত। মানসিংহ আক্ষেপ করে, “আমি তো তোর সর্বোচ্চ নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে গিয়েছিলাম। অথচ ভাগ্যের পরিহাস দেখ। যাই হোক, ঈশ্বর তোর সহায় আছেন, এই যথেষ্ট।”  

নয়

তারপর দুই দল মিলে সেনাছাউনিতে পৌঁছে দেখে মোহকমসিংহ মেড়তিয়াও উপস্থিত রয়েছেন সেখানে। চতুর্দিক থেকে বিখ্যাত সব যোদ্ধা রাজপুতেরা এসে মিলিত হয়েছেন ছাউনিতে। দেখেশুনে মনে হয়, মারওয়াড়ের ভাগ্যাকাশে সূর্যোদয় আসন্ন এইবারে। মোহকমসিংহকে আলিঙ্গন করে আগামী রণনীতি ঠিক করতে বসলেন দুর্গাদাস। সিদ্ধান্ত হল, সোজিতগড় আক্রমণ করা হবে। তাতে মহাসিংহও মুক্তি পাবেন, গড়ও হাতে আসবে।

রাত প্রায় অর্ধেক গত হয়েছে। রাজপুত বীরদের আজকের মতো এই জঙ্গলেই বিশ্রামের আদেশ দিলেন দুর্গাদাস। এখন আর গড় আক্রমণের সময় নেই। পৌঁছতে পৌঁছতে সকাল হয়ে যাবে। দিনের আলোতে পাহারায় থাকা মুঘলদের আক্রমণ করা সমীচীন হবে না।

দ্বিতীয় দিন রাতের প্রথম প্রহরের পর লুকিয়ে সোজিতগড় সীমান্তে পৌঁছে গেল রাজপুত সেনা। আক্রমণের উপযুক্ত সময়ের অপেক্ষায় রইল তারা।

উত্তেজনায় টগবগ করছে গম্ভীরসিংহ। আপন মাতৃভূমির রক্ষায় প্রাণ হাতে করে বেড়ায়, দুর্গাদাসের বিনা অনুমতিতেই টহল দিতে বেরিয়ে গেল সে। ফিরে এল রাত বারোটার আগেই। নিজের পরামর্শ আর অনুসন্ধানের ফিরিস্তি শোনাল দুর্গাদাসকে। প্রশংসায় পঞ্চমুখ হল সবাই। গম্ভীরসিংহের পরামর্শমতোই রাজপুত সেনাকে সোজিতগড়ের ফটকের আশেপাশে প্রহরায় রাখা হল শেষে। আর রূপসিংহ, যশোদাস, মানসিংহ ও তেজকরণ— এই চার যোদ্ধা দুর্গের পেছনের প্রাচীরের ওপর উঠে পড়ল গম্ভীরসিংহের সঙ্গে।

ফটকের মাথার ছাদের চারজনাকে লুকিয়ে রেখে নিজে দক্ষিণদিকে চলে গেল গম্ভীরসিংহ। কোমরে গোঁজা চকমকি ঠুকে চতুর্দিকের চালায় চালায় আগুন দিল। এইবারে আর কী, প্রহরীরা দিশেহারা হয়ে যে যেদিকে পারছে আগুন নেভাতে ছোটোাছুটি লাগিয়েছে। ওদিকে সংকেত পেতেই চার রাজপুত ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে ফটকের আগল দিল খুলে। অমনি রাজপুত সেনা নিয়ে দুর্গাদাস ঢুকে এলেন ফটক পেরিয়ে। শুরু হল ধুন্ধুমার যুদ্ধ। আচমকা এই আক্রমণের জন্যে মোটেই প্রস্তুত ছিল না মুঘল সেনা। একদিকে লেলিহান আগুন, অন্যদিকে রাজপুত সেনা— কোনোরকম পালিয়ে বাঁচল তারা। অস্ত্র ফেলে দিয়ে আত্মসমর্পণও করল অনেকে। নিরস্ত্রের ওপর কখনও হাত তোলে না রাজপুতেরা। ফলে হামলা বন্ধ হল অচিরেই।

প্রথমেই ইনায়ৎ খাঁর সন্ধান করল মানসিংহ। জানা গেল, জান নিয়ে সে পালিয়েছে আগেই। বাদশাহি পতাকা নামিয়ে দুর্গের মাথায় রাজপুতদের পঞ্চ-রঙা নিশান ওড়াল গম্ভীরসিংহ।

যশোদাস, তেজকরণ আর রূপসিংহকে দুর্গের প্রহরায় রাখলেন দুর্গাদাস। তারপর মানসিংহ আর লালবাকে সঙ্গে করে মহাসিংহের কাছে এলেন। এক পালঙ্কে পড়ে আছেন সামন্তরাজ, ঠোঁট কামড়ে ধরে কীসব ভেবে চলেছেন নিরন্তর। দেহের ক্ষত সারেনি এখনও, অতিকষ্টে পাশ ফিরেই তিনজনকে সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলেন। আঁতকে উঠে প্রশ্ন করলেন, “একি, তোমরাও বন্দি হলে শেষে? হা ঈশ্বর!”তারপর জিজ্ঞেস করলেন, “আমার লালবার সন্ধান দিতে পারো, মানসিংহ? পাপিষ্ঠ চন্দ্রসিংহের খপ্পরে পড়েছে সে। সর্বনাশ হয়ে গেল, হায়। মৃত্যুও যে কেন হয় না আমার!”

মানসিংহ উত্তর দিল, “চন্দ্রসিংহকে যমপুরীতে পাঠানো হয়েছে মহারাজ, আপনি শান্ত হন। রাজকুমারী লালবাও আমাদের সঙ্গেই দাঁড়িয়ে আছে। তিলমাত্র কিছু ক্ষতি হয়নি তার। আর আমরাও কেউ বন্দি হইনি। বীর দুর্গাদাস মাড়োর পাশাপাশি সোজিতগড়ও জয় করেছেন। পাপী ইনায়ৎ খাঁ পালিয়েছে কোথা। এই দুর্গে এখন রাজপুত নিশান উড়ছে।”  

আনন্দের আতিশয্যে মুহূর্তে পালঙ্ক ছেড়ে উঠে দুর্গাদাসকে আলিঙ্গন করলেন মহাসিংহ। মানসিংহ আর লালবাকে বুকে টেনে নিলেন তারপর।

তেজোবাই রয়েছেন পাশের কক্ষেই। লোকজনের কথাবার্তায় আকৃষ্ট হয়ে দ্বারপ্রান্তে দাঁড়ালেন এসে। লালবার নাম শুনেই বুক কাঁপতে লাগল তাঁর। ধীরে ধীরে মানসিংহ খুলে বলল গোটা বৃত্তান্ত। কিছুক্ষণ নিশ্চুপ বসে রইলেন মহাসিংহ। কে জানে কী ভেবে চললেন অবিরাম। তারপর একসময় তেজোবাইয়ের কক্ষে পাঠিয়ে দিলেন রাজকুমারী লালবাকে।

রাত প্রহর খানেকের বেশি বাকি নেই আর। ক্লান্ত রাজপুত সেনাকে বিশ্রামের নির্দেশ দিলেন দুর্গাদাস। বাকি রাতটুকু আনন্দ উল্লাসেই কাটিয়ে দিল সবাই।

মহাসিংহ মুক্ত হলেন। বিজয়ের উল্লাস ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে।

সকাল হলে সোজিতগড়ের আশেপাশের রাজপুত বাসিন্দারা বড়ো আশ্চর্য হল দুর্গের মাথায় রাজপুতি নিশান উড়তে দেখে। খোঁজখবর নিয়ে আশ্বস্ত হয়ে দলে দলে এসে যোগ দিতে লাগল এইবারে। এছাড়া যতজন রাজপুত সর্দার দিল্লির লড়াই থেকে বেঁচে ফিরেছেন, সবাই নিজের নিজের সেনাদল নিয়ে এসে একত্র হলেন দুর্গাদাসের সাহায্যে। সশস্ত্র সেনাদলে গিজগিজ করতে লাগল সোজিতগড়ের চতুর্দিক। কণ্ঠে সবার মাড়ো রাগের গান। অসীম বল বুকে। উপযুক্ত নেতৃত্ব আর সুযোগ পেলে দিল্লি জয়ের স্বপ্ন দেখছে তারা।

দেখেশুনে মনে মনে পরমেশ্বরের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করলেন দুর্গাদাস। যোধপুর আক্রমণের সিদ্ধান্ত নিলেন এইবারে। সমস্ত সর্দারেরাও এককথায় রাজি।

তেজোবাইয়ের কানে গেল কথাটা। মানসিংহকে তলব পাঠিয়ে এনে বললেন, “দুর্গাদাসকে জিজ্ঞেস করো, একটা যুদ্ধ জেতার পর পরক্ষণেই আবার নিশ্চিত পরাজয়ের পানে ধাবিত হওয়া কেমন বুদ্ধিমানের কাজ? এই এত এত লোকজন, সবাইকে কুয়ো থেকে টেনে তুলে সমুদ্রে নিক্ষেপ করতে চাইছেন কেন তিনি? তোমরা সবাই যোধপুর চলে গেলে আমাদের রক্ষার দায়িত্ব নেবে কে শুনি? দুর্গাদাসের এর কোনও পরোয়া না থাকলে আমাকে পিত্রালয়ে পাঠিয়ে দিন উনি। তারপর তোমরা যা খুশি কোরো।”  

মানসিংহ বোঝাল, “আপনাদের সোজিতগড়ে রেখে যাওয়া হবে, সেই-বা কে বলল, কাকি-মহারানি? সর্দার রূপসিংহ ওদাওয়তের অধীনে এক হাজার সেনা থাকবে এই গড়ের প্রহরায়। উপস্থিত আহত আছেন। এখনি লড়াই করবার অবস্থায় না থাকলেও দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠছেন তিনি।”  

কিন্তু শত যুক্তিতেও তেজোবাইকে সন্তুষ্ট করা গেল না। বাধ্য হয়ে দুর্গাদাসের কানে তুলতেই হল বিষয়টা। দুর্গাদাসও সায় দিলেন, “বেশ, তাই হোক তবে। মহারানিকে পৌঁছে দিয়ে আসা যাক আগে।”  

দশ

পরদিন সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে দুর্গাদাস, মহাসিংহ, যশোদাস, তেজকরণ, মানসিংহ আর গম্ভীরসিংহ ঘোড়ার পিঠে রওনা হলেন তেজোবাই আর লালবার শিবিকার পেছন পেছন। রূপসিংহ ছোটো একটা সেনাদল সাজিয়ে দিয়েছিলেন সঙ্গে যাবে বলে। দুর্গাদাস বারণ করলেন। সেই দল থেকে পঁচিশ জন বিশ্বাসী প্রহরীকে বেছে নিলেন কেবল।

বড়ো তাপ সেদিন। পথে এক মহিরুহের ঘন ছায়ায় খানিক বিশ্রাম আর জলপান সেরে তেজোবাইকে তাঁর পিত্রালয়ে পৌঁছে দিলেন দুর্গাদাস। দিন আর সামান্যই অবশিষ্ট তখন। দুর্গের ফটকেই তেজোবাইয়ের ভাই পৃথ্বীসিংহের সাক্ষাৎ পাওয়া গেল। মহাসিংহের সঙ্গে এই দলবল দেখে ঘাবড়োে গিয়েছেন তিনি। এই বীরেরাই তাঁর ভগিনীর সিঁথির সিঁদুর রক্ষা করেছে বলে আশ্বস্ত করলেন রাজা। পৃথ্বীসিংহ এগিয়ে এসে আলিঙ্গনে জড়ালেন দুর্গাদাসকে। বাকিদেরও যথাবিহিত আপ্যায়নে অন্দরে এনে বসালেন। শুরু হল খোশগল্প। কেউ গম্ভীরসিংহের চাতুর্যের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হলেন, কেউ-বা যশোদাসের বীরত্বে।

পৃথিবীর পরিক্রমা শেষে সূর্যদেব পশ্চিমে অস্ত যেতেই চাঁদ উঠল পুবে। রুপোলি আভায় উদ্ভাসিত চরাচর। মহাসিংহ আর দুর্গাদাস যোধপুর আক্রমণের ছক কষতে বসলেন একান্তে। তখুনি এক দ্বারপাল দেসুরি থেকে আসা এক বার্তাবাহকের আগমন সংবাদ দিল এসে। দুর্গাদাস ভেতরে ডাকলেন তাকে। সে এসে দাঁড়াতেই জিজ্ঞেস করেন, “কী সংবাদ, গুলাবসিংহ?”

উত্তর এল, “আপনার সোজিতগড় জয়ের খবর দেসুরিতে পৌঁছতেই রাজপুতদের ঘরে ঘরে আনন্দোৎসব শুরু হল। এরই মধ্যে ইনায়ৎ খাঁ এসে হাজির হল কোত্থেকে। দু-চোখ ঠিকরে আগুন বেরোতে লাগল তার। সমস্ত শিরোমণিদের নিজ দরবারে তলব পাঠাল সে। কোনও কারণবশত আপনার শ্বশ্রূপিতা ঠাকুর নাহরসিংহ ও আর আমার পিতার হাজিরা দিতে সামান্য বিলম্ব হয়। বাকি সব রাজপুতদের ধমকে চমকে তাড়িয়ে দিলেও এই দুজনকে অপেক্ষা করতে বলল ইনায়ৎ খাঁ। সহজ সরল দুই সর্দার ভেবে অকূল হলেন দরবারে কী প্রয়োজন তাঁদের। সবাই বিদেয় হলে ইনায়ৎ খাঁ বিদ্রোহী ঘোষণা করে শিরশ্ছেদ করল এই দুই বীর সর্দারের। খবরটা পেয়েই সোজা সোজিতগড়ে দৌড়ে গেলাম আমি। সেখানে জানলাম, উপস্থিত এই বালুতে আছেন আপনি। তক্ষুনি বেরিয়ে পড়লাম আবার। ঈশ্বরের কৃপায় সাক্ষাৎ পেয়েও গেলাম আপনার। এইবারে আপনি যেমনটা উচিত মনে করেন।”  

সমাচার শুনে ক্রোধে আর আক্রোশে সর্বাঙ্গ কাঁপতে লাগল দুর্গাদাসের। গর্জে উঠলেন, “যশোদাস! এক্ষুনি সোজিতগড়ে রওনা হয়ে নিজের সেনাদল নিয়ে বেলা বারোটার আগে দেসুরি পৌঁছবে তুমি। ওই পাপী ইনায়ৎ খাঁকে আজই নরকে পাঠাব আমি।”  

গুলাবসিংহ জানাল, “সর্দার রূপসিংহ ওদাওয়ত দেসুরির সংবাদ পেয়েই হাজার খানেক বীর রাজপুত রওনা করিয়ে দিয়েছেন আপনার কাছে। ওরা এসে পৌঁছল বলে।”  

দুর্গাদাস ফটকে এসে দেখেন সত্যিই এদের জয়ধ্বনিতে আকাশ বাতাস কেঁপে উঠছে এই মরুদেশের। দুর্গাদাস সেই অশ্বারোহী দলের আগে আগে চললেন। তাঁর পেছনে যশোদাস, তেজকরণ, মানসিংহ আর গম্ভীরসিংহ প্রভৃতি। জনপদের আভাস পেতেই সবাইকে নিঃশব্দে এগোতে নির্দেশ দিলেন দুর্গাদাস। কোনও অর্থেই ইনায়ৎ খাঁ যেন তাঁদের আগমনের সংবাদ না পায়।

নিস্তব্ধ চরাচর। শ্বাপদের মতো নিকটবর্তী গাঁয়ে প্রবেশ করল রাজপুত সেনা। আচমকা কার কান্নার শব্দ কানে এল দুর্গাদাসের। মানসিংহকে দলের ভার দিয়ে এগোতে বলে নিজে গেলেন সেই শব্দের সন্ধানে। ঘরের দরোজা খোলাই ছিল, ভেতরে ঢুকলেন দুর্গাদাস। দেখেন, এক মৃতদেহ পড়ে আছে সেখানে। তার শিয়রে বসে এক বৃদ্ধা কপাল চাপড়ে হাহাকার করে চলেছে। তার কারণ জানতে চাইলেন দুর্গাদাস। বৃদ্ধা কোনোরকমে জানাল, “আমি তোমার পত্নীর ধাই ছিলাম, বাবা। নিজের দুধ খাইয়ে বড়ো করেছি তাকে। আজ সেই দুধের ঋণের বদলে মুঘল নাশের দাবি করি আমি তোমার কাছে।”  

দুর্গাদাস পণ করলেন, উপযুক্ত শাস্তি তিনি দেবেন। মৃতদেহ দাহ সংস্কারের ব্যবস্থা করলেন। তারপর সেই চিতার জ্বলন্ত কাঠ হাতে রওনা হলেন ইনায়ৎ খাঁর মহল পানে। পথে দেখা গম্ভীরসিংহের সঙ্গে। দুর্গাদাসের হাতে এক চিরকুট দিয়ে বলে, “কেল্লার সামনের ফটকে সাঁটা ছিল। আপনাকে দেখাব বলে খুলে আনলাম। দেখুন একদিকে সব হত্যা করা রাজপুতদের নাম লেখা, অন্যদিকে যারা বন্দি হয়েছে এবং শিগগিরই ফাঁসির আদেশ আসবে, তাদের। আর সইতে পারি না, ঠাকুর। তালিকায় আমার বৃদ্ধ পিতা কেশরীসিংহের নামও রয়েছে দেখুন। যদিও যে-কোনো রাঠৌর মাত্রই আমার পিতৃসম, কারাগারে সবার দশাও একই, তথাপি পিতার কষ্ট পুত্রের বুকে বেশি বাজে বইকি। পিতার ইচ্ছার বিরুদ্ধে বছর খানেকেরও বেশি হল দেশসেবায় ব্রতী হয়ে ঘর ছেড়েছি আমি। সে থেকে আজও সাক্ষাৎ হয়নি তাঁর সঙ্গে। তিনি ছাড়া আর যে কেউ নেই আমার।”  

দুর্গাদাস সান্ত্বনা দিলেন, “ধৈর্য ধরো, গম্ভীরসিংহ। সোজিতগড় জয়ে আশীর্বাদ ছিল যাঁর, সেই পরমেশ্বর চাইলে দেসুরিও জয় করব আমরা। শুধু তোমার পিতৃদেবই নন, সমগ্র মারওয়াড়ই ছিনিয়ে আনব মুঘলের হাত থেকে। চলো, ইনায়ৎ খাঁর কর্মফলের বিচারটা সেরে ফেলা যাক আজই।”  

এই বলে কেল্লার পেছনের প্রাচীরের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন দুর্গাদাস। জানা গেল, রাজপুতেরা ফটক ভেঙে কেল্লায় ঢুকে গিয়েছে। গম্ভীরসিংহ তৎক্ষণাৎ এক লাফে ঢুকে গেল ভেতরে। ষাটের ষাট, ইনায়ৎ খাঁও ফটকের ঠিক কাছেই ধরা পড়ে গেল অমনি। প্রাণ বাঁচিয়ে ফের পালাবার সুযোগ খুঁজছিল সে। তা আর হল কই, গম্ভীরসিংহের এক আঘাতেই আধমরা হয়ে পড়ে গেল। আর তক্ষুনি হাতের জ্বলন্ত চ্যালাকাঠটা তার মুখে ঠুসে দিলেন দুর্গাদাস। সেনাপতির এই পরিণতি চাক্ষুষ করলে কারই-বা আর যুদ্ধে সাহস হয়? অর্ধেক মুঘল কাটা পড়ল রাজপুতেদের হাতে। বাকিরা আত্মসমর্পণ করল দুর্গাদাসের কাছে। প্রাণে বেঁচে গেল তারা।

মানসিংহ আর গম্ভীরসিংহ দৌড়ে কারাগারে ঢুকল গিয়ে। সেখানকার নিরাপত্তার প্রধান শিহাবুদ্দিন এই দুই যমদূতকে দেখা মাত্রই দরোজা খুলে দিল তক্ষুনি। বিনা বাধায় ভেতরে ঢুকে গেল দুজনে। দেখতে পেয়েই নিজ পিতার পায়ে গিয়ে পড়ল গম্ভীরসিংহ। কেশরীসিংহও টেনে তুলে বুকে জড়িয়ে ধরলেন সন্তানকে। বছর খানেক পর দেখা দুজনার। দরদর করে আনন্দাশ্রু বইতে লাগল দু-গাল বেয়ে। কণ্ঠস্বর রুদ্ধপ্রায়। পরস্পর তাকিয়ে দুজনে, কারও মুখে কথা নেই। শেষে কেশরীসিংহই বললেন, “বাবা গম্ভীর, তোর পালিয়ে আসার পর থেকে বড়ো উৎকণ্ঠায় কাটিয়েছি বাপ, কে জানে কেমন আছিস তুই। সেও একদিন সয়ে গিয়েছিল, কিন্তু দেশের এই দুর্দশা যে আর সয় না রে।”  

গম্ভীরসিংহ সামান্য হেসে উত্তর দেয়, “না পিতা, আমি বা আপনি কেউই এই মুহূর্তে বন্দি নই আর। ঈশ্বর আপনার হাহাকার শুনেছেন। মারওয়াড় শিগগিরই আবার স্বাধীন হবে, পিতা। ঠাকুর দুর্গাদাস নিজ বাহুবলে সোজিতগড় জয় করে দেসুরিকেও মুক্ত করেছেন আজ। ইনায়ৎ খাঁ তার প্রাপ্য শাস্তি পেয়েছে। এই কেল্লার মাথায় এখন রাজপুতি নিশান উড়ছে।”  

আনন্দে, রোমাঞ্চে গায়ে কাঁটা দিল কেশরীসিংহের। গম্ভীরসিংহকে ফের একবার জড়িয়ে ধরে তৎক্ষণাৎ দুর্গাদাসের সাক্ষাতে বেরিয়ে গেলেন তিনি।

এদিকে মানসিংহ অন্যসব রাজপুত বন্দিদেরও যথোচিত সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে কারাগার থেকে মুক্ত করে আনল। মুহূর্তের মধ্যেই আকাশ কাঁপিয়ে জয়ধ্বনি শুরু হল। চতুর্দিক থেকে রাজপুতেরা এসে ঘিরে ধরল দুর্গাদাসকে। দুর্গাদাসও আন্তরিক অভ্যর্থনা জানিয়ে স্নেহভরে আলিঙ্গন করলেন সবাইকে।

ধীরে ধীরে সূর্য উঠল পুবে। সকাল হতেই দেসুরি দুর্গের চূড়ায় রাজপুতি পতাকা উড়তে দেখে আবালবৃদ্ধ রাজপুত সব গান গাইতে গাইতে, আনন্দে উল্লাস করতে করতে দুর্গাদাসের কাছে উপস্থিত হল এসে। রাজপুতদের বুকে তখন অদম্য বল। এই মুহূর্তে কাপুরুষও যেন তলোয়ার উঁচিয়ে মারওয়াড়কে স্বাধীন করার শপথ নিতে পারে। দেসুরিতে এমন কোনও রাজপুত নেই আজ, যে দুর্গাদাসের সাক্ষাতে আসেনি।

এক প্রহর দিন অতিক্রান্ত হল প্রায়। দুর্গাদাস সবার সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে শ্বশুরালয়ে গেলেন। সেখানে আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ ও ভোজন সমাপনান্তে সন্ধ্যার পূর্বেই দুর্গে ফিরে এলেন আবার।

দেসুরির সর্দার সুরতানসিংহ, কেশরীসিংহ প্রমুখ একত্রে বসে চিন্তাভাবনা শুরু করলেন কী উপায়ে মুঘল বাদশাহের মোকাবিলা সম্ভব, মারওয়াড়ে শান্তি কীভাবে প্রতিষ্ঠা করা যায় ফের। ঠিক সেই সময় দুর্গাদাসের নামে পত্র নিয়ে এল এক দূত। দুর্গাদাস গম্ভীরসিংহকে পড়ে শোনাতে বললেন। গম্ভীরসিংহ পড়তে লাগল—

‘দয়াবীর দুর্গাদাস,

আপনি দেসুরি চলে যাওয়ার পর মুঘলরা সুযোগ বুঝে বালিগড় আক্রমণ করেছে। এখানে তেমন কোনও সেনাবাহিনীও ছিল না, আর যে ক’জন ছিল তারা প্রস্তুতও ছিল না। মাতুলদেব নিজেকে মুঘলদের মোকাবিলায় অক্ষম ভেবে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে গেছেন। মুঘলরা দুর্গ লুঠ করে আমাদের বন্দি করে যোধপুরে নিয়ে এসেছে। পিতা-মহারাজের বিরুদ্ধে রাজদ্রোহের অভিযোগ এনে তাঁর মৃত্যুদণ্ডের আদেশ হয়েছে। যদি দুই দিনের মধ্যে আমাদের এই বিপদ থেকে উদ্ধার না করা যায়, তবে মারওয়াড়ের স্বাধীনতা আর পরাধীনতা— আমাদের কাছে তারপর দুই-ই সমান।

ইতি,

আপনার কৃপাভিলাষিণী

লালবা’

পত্রের বয়ান শুনেই আগুনের মতো জ্বলে উঠলেন দুর্গাদাস। পাশে উপবিষ্ট সর্দারদেরও রক্ত টগবগ করে উঠল। মানসিংহ আর গম্ভীরসিংহের তো কথাই নেই। নব রক্ত, সামান্য উত্তেজনাতেই আকুল হয়।

দেসুরির সর্দার প্রায় আঠারো হাজার রাজপুত সৈন্য জড়ো করে ফেললেন। তক্ষুনি এক হাজার সৈন্য বালিগড়ের উদ্দেশে রওনা করিয়ে দিলেন দুর্গাদাস। দু-হাজার রাখলেন দেসুরিতে। অবশিষ্ট পনেরো হাজার সৈন্য নিয়ে যোধপুরের দিকে অগ্রসর হওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হল। যদিও পনেরো হাজার কেন, পঁয়ত্রিশ হাজার রাজপুত সৈন্যও যদি যোধপুর আক্রমণ করে, তবুও মুঘলদের বিপুল শক্তির সামনে অসহায়। কিন্তু এখানে লড়াইটা সত্যরক্ষার। মানুষ পুরুষকার-বলে পথ চলে, ঈশ্বর তার সহায় হন— এই বিশ্বাসই এদের শক্তি।

রাত তখন এক প্রহর অতিক্রান্ত। গম্ভীরসিংহ এসে দুর্গাদাসকে জানাল, “সৈন্য প্রস্তুত। আপনার আদেশের অপেক্ষা কেবল।”  

এমনি সময় কোন দূর থেকে ডঙ্কার শব্দ ভেসে এল। বিস্মিত দুর্গাদাস দুর্গের বাইরে দাঁড়ালেন এসে। এইবারে ডঙ্কার তালে তালে শোনা যেতে লাগল জয়ধ্বনির গর্জন— মহারাজ রাজসিংহের জয়! অজিতসিংহের জয়! মারওয়াড়ের জয়!

অদূরেই শিশোদিয়া সেনার আভাস পেয়ে উদ্বেল হয়ে উঠলেন দুর্গাদাস। বুঝতে পারলেন, উদয়পুররাজ তাঁর পত্রের উত্তরে এই সাহায্য পাঠিয়েছেন। অভ্যর্থনার জন্য এগিয়ে গেলেন তিনি। রাণা রাজসিংহের জ্যেষ্ঠ পুত্র জয়সিংহ দুর্গাদাসকে আসতে দেখে ঘোড়া থেকে নেমে স্নেহালিঙ্গন করলেন।

কুশল সংবাদ বিনিময়ের পর দুর্গাদাস বললেন, “আপনার আর খানিক বিলম্ব হলে আমাদের সৈন্যবাহিনী যোধপুরের উদ্দেশে রওনা হয়ে যেত, রাজকুমার।”  

জয়সিংহ জানতে চাইলেন, “কেন? আমার তো ইচ্ছে ছিল অজমের আক্রমণ করব আগে। কিন্তু আপনি কী ভেবে এই ক’জন রাজপুতকে নিয়ে যোধপুর আক্রমণের পরিকল্পনা করলেন বলুন তো?”

দুর্গাদাস উত্তর দিলেন, “ভাই জয়সিংহ, আর কোনও উপায়ও তো ছিল না। সামন্তরাজ মহাসিংহ রাজপরিবার-সহ শত্রুর হাতে বন্দি হয়েছেন। উপস্থিত তাঁকে যোধপুরেই রাখা হয়েছে এবং মৃত্যুদণ্ডের আদেশ জারি হয়েছে। এমতাবস্থায় এ ছাড়া আর কোনও উপায় ছিল আমার? আপনিই বলুন।”  

মহাসিংহের এই পরিণতির কথা শুনে জয়সিংহের রক্ত উত্তাল হয়ে উঠল। বললেন, “ভাই দুর্গাদাস, আমাদের আর এক মুহূর্তও বিশ্রাম করা উচিত নয় এখানে। সঙ্গে দশ হাজার অশ্বারোহী ও পঁচিশ হাজার পদাতিক এনেছি আমি। দ্রুত ব্যবস্থা করা হোক।”  

দুর্গাদাস মোট পঞ্চাশ হাজার সৈন্যকে পাঁচটি ভাগে বিভক্ত করে দিলেন তখুনি। তিন হাজার অশ্বারোহী ও সাত হাজার পদাতিকের নেতৃত্ব দিলেন মানসিংহের হাতে। একইভাবে অন্য চারটি অংশেরও নেতৃত্ব যথাক্রমে যশোদাস, কেশরীসিংহ, জয়সিংহ এবং করণসিংহের হাতে তুলে দিলেন। নিজে সমগ্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক রইলেন এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্যে তেজকরণ ও গম্ভীরসিংহকে দুই পাশে বহাল করলেন।

কুচকাওয়াজের ডঙ্কা বাজল, জয়ধ্বনিতে মুখর হয়ে উঠল আকাশ বাতাস। রাজপুত বীরেরা রণচণ্ডীর পূজার উদ্দেশ্যে যোধপুরের পথে অগ্রসর হল। দুর্গাদাসের মতো রাজপুতমাত্রই আজ দেশমাতৃকার জন্যে প্রাণ দিতে প্রস্তুত। সেনাবাহিনীতে এমন একজনও নেই যার হৃদয়ে স্বদেশপ্রেমের আগুন নেই। রাতভর চলার পরও বিন্দুমাত্র ক্লান্তি অনুভূত হচ্ছে না কারও, এমনই উত্তেজনা। ক্ষুৎপিপাসাও নেই। একমাত্র আকাঙ্ক্ষা, ভয়ংকর এক যুদ্ধ।

এগারো

ভোরের আলো ফুটতেই ঘন এক পাহাড়ি অঞ্চলে শিবির স্থাপন করলেন দুর্গাদাস। তারপর দিনের দুই প্রহর বাকি থাকতে কুচকাওয়াজের ডঙ্কা বাজল ফের, সেনাবাহিনী এগিয়ে চলল। রাতের শেষ প্রহরে তারা যোধপুর সীমান্তে পৌঁছে গেল এসে।

দুর্গাদাসের নির্দেশ অনুযায়ী জয়সিংহ দুর্গের পূর্ব দ্বার অবরোধ করলেন। করণসিংহও পশ্চিম দ্বার ঘিরে ফেলল, যাতে দুর্গের ভেতর থেকে কোনও সৈন্য বাইরে বেরোতে না পারে আর বাইরে থেকেও কেউ ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে। নগর রক্ষার জন্য কেশরীসিংহ নিজের দশ হাজার সৈন্য নিয়ে চারদিক ঘিরে অবস্থান নিলেন। এই ব্যূহরচনার উদ্দেশ্য ছিল একটাই, মুঘলদের কাছে যেন কোনোদিক থেকেই কোনোরকম সাহায্য পৌঁছতে না পারে। অবশিষ্ট দুই ভাগ সৈন্য বাইরের দিক থেকে আসতে পারে এমন মুঘল সেনার প্রতিরোধে এবং ক্লান্ত রাজপুত সৈন্যদের সাহায্য করার জন্যে প্রস্তুত রাখা হল।

রাজপুতেরা তখন উত্তেজনায় অস্থির। রাতের শেষ প্রহর আক্রমণের সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। মুঘল সর্দারেরা কেউ তখন প্রাতঃক্রিয়ায় ব্যস্ত, কেউ-বা নমাজ পড়ছে— অর্থাৎ, প্রত্যেকেই ছিল অসতর্ক। যতক্ষণ প্রস্তুত হতে সময় নিল তারা, রাজপুতেরা ততক্ষণে দুর্গের ফটক ভাঙতে শুরু করে দিয়েছে। প্রাচীর ভেঙে পড়তেই রাজপুত বাহিনী ভিতরে ঢুকে শুরু করল ভয়ংকর রক্তক্ষয়ী আক্রমণ। রণবাদ্য বেজে উঠল দুর্গের ভেতরে। চতুর্দিকে নৃত্য করতে লাগলেন রক্তপিপাসু রণচণ্ডী। একদিকে ‘আল্লাহু অকবর’ জিগির, অন্যদিকে ‘হর হর মহাদেব’-এর হুংকার। রাজপুতেদের তাণ্ডবে মুঘলদের পায়ের তলার মাটি সরে যেতে লাগল।

মুঘল সর্দার দিলাওয়র খাঁ উচ্চ কণ্ঠে সৈনিকদের উৎসাহিত করতে লাগল, “বেইমানি মহাপাপ! গোলাম হয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে মৌত কবুল। ইসলামের শপথ নাও! কোরআনের কসম খাও! জান থাকতে আমরা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালাব না কেউ।”  

তার এই আহ্বানে মুহূর্তের মধ্যে আবার উদ্দীপনা জেগে উঠল মুঘলদের ভেতর। ক্ষুধার্ত বাঘের মতো রাজপুত বাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল তারা। বেমক্কা এই পালটা আক্রমণে রাজপুত বাহিনী খানিক পিছু হটতে শুরু করেছে, এমনি সময় আলাদা বাহিনী নিয়ে দ্রুত উপস্থিত হলেন দুর্গাদাস। দুই পক্ষের তলোয়ার বিদ্যুতের মতো ঝলসে উঠতে লাগল। বাণ ছুটেছে অবিরাম। বিজয়ের উল্লাসে রাজপুত বীরেরা ‘হর হর মহাদেব’ ধ্বনি দিতে দিতে এগিয়ে চলেছে। ঠিক সেই মুহূর্তে কোন কাপুরুষ পেছন থেকে দুর্গাদাসের ওপর তলোয়ার তুলেছে। গম্ভীরসিংহ দেখে না ফেললে সেখানেই জীবনাবসান ঘটত তাঁর। সেই দুশমনকে এক ধাক্কায় মাটিতে পেড়ে ফেলল গম্ভীরসিংহ। বুকে চেপে বসল তার। বেগতিক বুঝে সেই মুঘল সর্দার দুর্গাদাসের কাছে প্রাণ ভিক্ষা চাইল। দুর্গাদাস তাকে ক্ষমা করলেন।

মুঘল সেনারা যেই দেখল গম্ভীরসিংহ সেই মুঘল সর্দারের বুকে চেপে বসেছে, অমনি কে রটিয়ে দিল, ইনায়ৎ খাঁ কোতল হয়েছে। নিজেদের আহত নিহত সৈনিকদের মাড়িয়ে, টপকে দিগ্বিদিক পালাতে শুরু করল মুঘলেরা। দুর্গাদাস স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। ভাবছেন, এ আবার কোন ইনায়ৎ খাঁ? তাকে তো দেসুরি দুর্গের ফটকেই হত্যা করেছেন তিনি! ধীরে ধীরে রহস্য ফাঁস হল— ইনায়ৎ খাঁ আসলে এক সৈনিককে, যার মুখাবয়ব তার সঙ্গে অনেকটাই মেলে, নিজের পোশাক পরিয়ে রেখে দেসুরি থেকে পালিয়েছিল। সেই নকল ইনায়ৎ খাঁকেই সেখানে হত্যা করেছিলেন দুর্গাদাস। আর এইমাত্র যে প্রাণ ভিক্ষা পেল, সে-ই আসল ইনায়ৎ খাঁ। এতক্ষণ নাকে-মুখে কাপড় জড়িয়ে যুদ্ধ করছিল সে।

সহসা ওপর থেকে দিলাওয়র খাঁ উচ্চৈঃস্বরে হুঁশিয়ারি দিল, “দুর্গাদাস! যদি মহাসিংহের প্রাণ বাঁচাতে চাও, তবে এখনই তোমার সৈন্যদের দুর্গের বাইরে নিয়ে যাও।”  

দুর্গাদাস ওপরে তাকিয়ে দেখেন, ক্রুর দিলাওয়র খাঁ মহাসিংহের গলায় দড়ির ফাঁস লাগিয়ে দাঁড়িয়ে। দুর্গাদাস তৎক্ষণাৎ রাজপুত সৈন্যদের দুর্গ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আদেশ দিলেন।

মহাসিংহ সেখান থেকেই চিৎকার করে বললেন, “বীর দুর্গাদাস! আমার প্রাণ কি অন্য কোনও রাজপুতের প্রাণের চেয়ে বেশি মূল্যবান? আমি অমর তো নই। এই পৃথিবীতে সবাই নির্দিষ্ট সময়ের অতিথি— একদিন না একদিন মরতেই হয়। অতএব আপনার এই জয় যেন পরাজয়ে পরিণত না হয়।”  

মহাসিংহ দুর্গাদাসকে উত্তেজিত করে তুলছিলেন। ওদিকে দিলাওয়র খাঁ গলায় দড়ি কষাতে প্রস্তুত। গম্ভীরসিংহ ক্রোধ দমন করতে পারল না আর। চকিতে সে ইনায়ৎ খাঁকে সামনে টেনে এনে হুঁশিয়ারি দিল, “শোনো দিলাওয়র খাঁ! আমাদের হাতে বন্দি যত মুঘল সর্দার আছে, প্রত্যেককে আমাদের মহারাজের প্রাণের বদলে তোমার চোখের সামনেই এমনভাবে হত্যা করব যে পাথরের চোখও কেঁদে উঠবে।”  

এ-কথা শুনে দিলাওয়র খাঁর হাত-পা অবশ হয়ে এল। সে জানে, দিল্লির দরবারে ইনায়ৎ খাঁর কেমন কদর। সত্যিই যদি ইনায়ৎ খাঁ নিহত হয়, তবে নিজেও বিপদে পড়বে সে। তৎক্ষণাৎ মহাসিংহের গলা থেকে দড়ি খুলে ফেলে বলে, “দুর্গাদাস, আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, মহাসিংহের কোনও অনিষ্ট হবে না। আর যদি সন্ধ্যা পর্যন্ত বাদশাহের কোনও নতুন ফরমান না আসে, তবে দুর্গ আপনার হাতে সঁপে দিয়ে সন্ধি করে নেব আমরা। অকারণে রক্ত ঝরাতে চাই না আমি।”  

দুর্গাদাস দিলাওয়র খাঁর প্রস্তাব মেনে নিলেন। রাজপুত সৈন্যরা ক্লান্তি মেটাতে কাছাকাছি এক পাহাড়ি অঞ্চলে সরে গেল।

শোনিংজি প্রমুখ প্রবীণ সর্দাররা আহত রাজপুত যোদ্ধাদের পরিচর্যার জন্য রাজপ্রাসাদে পাঠিয়ে দিলেন। সেখানে সমস্ত ব্যবস্থা প্রস্তুতই ছিল, কেননা সর্দার কেশরীসিংহ দুর্গ আক্রমণের আগেই রাজপ্রাসাদ দখল করে নিয়েছিলেন। একজন মুঘল সৈন্যের অস্তিত্বও নেই নগরে। বিশিষ্ট মুঘল সর্দারদের বন্দি করে রাজপ্রাসাদে আটকে রেখেছিলেন কেশরীসিংহ। ইনায়ৎ খাঁকেও সেখানেই নিয়ে যাওয়া হল।

সমস্ত জরুরি কাজ সমাপনান্তে শোনিংজি দুর্গাদাসের সাক্ষাতে গেলেন। রাজপুত সর্দারেরা একত্রিত হয়ে দিলাওয়র খাঁর প্রস্তাব নিয়ে আলোচনায় বসলেন।

দুর্গাদাস বললেন, “ভাইসব, এই ধূর্ত নিশ্চয়ই দিল্লি থেকে কোনও সাহায্যের আশায় আছে। সেই কারণেই সন্ধ্যা পর্যন্ত যুদ্ধ বন্ধ রাখার প্রস্তাব দিয়েছে সে। আমার মনে হয় মুঘল সেনার আসার সমস্ত পথ আগে থাকতেই বন্ধ করে দিয়ে দুর্গে পৌঁছানোর আগে সেখানেই পরাজিত করতে হবে তাদের।”  

রণক্ষেত্রে মুখোমুখি যুদ্ধে সুবিধে বেশি। দুর্গাদাসের পরামর্শ মনে ধরল সবারই। পথের দুই পাশে রাজপুত সেনার ছোটো ছোটো দল পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে লুকিয়ে রাখা হল।

দিনের প্রহর দুই বাকি তখনও। এমন সময় এক গুপ্তচর ছুটে এসে সংবাদ দিল, মুঘল সেনা আসছে। দুর্গাদাস তৎক্ষণাৎ রাজপুত বাহিনীকে সতর্ক করলেন। কিছুক্ষণ পরেই বাদশাহি পতাকা উড়িয়ে মুঘল সর্দার মুহম্মদ খাঁর নেতৃত্বে বিশাল এক মুসলমান বাহিনী নজরে এল। সেই সেনা পাহাড়ি পথ বেয়ে এগিয়ে আসতেই দুর্গাদাস রণবাদ্যের হুকুম দিলেন। মুহূর্তের মধ্যে বীর রাজপুতেরা রণহুংকার ছেড়ে শত্রুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।

ওদিকে গম্ভীরসিংহ ও তেজকরণ এক ঝটকায় বাদশাহি পতাকা কেড়ে নিয়ে নীচে ফেলে দিয়েছে। একজন মুহম্মদ খাঁকে বন্দি করল, অন্যজন রাজপুতি নিশান উঁচিয়ে ধরল। সর্দার বন্দি হতেই বাদশাহি সৈন্যরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পালাতে উদ্যত হল। দুর্গাদাসের নির্দেশে রাজপুতরা ঘিরে ফেলল তাদের, পালাতে দিল না। কারণ, গুপ্তচর সংবাদ এনেছিল, সত্তর হাজার সৈন্য তিন ভাগে ভাগ হয়ে এগিয়ে আসছে। এই দল পালিয়ে গেলে সামনে থেকে আসা অন্য বাহিনী সতর্ক হয়ে যেত। তখন দুর্গাদাসের পক্ষে এত অল্পসংখ্যক রাজপুত সৈন্য নিয়ে সেই বিশাল মুঘল বাহিনীকে পরাজিত করা কঠিন হয়ে পড়ত।

আর হলও ঠিক তাই। বন্দি মুঘলদের অস্ত্রশস্ত্র কেড়ে নিয়ে রাজপুতেরা সামনের পাহাড়ি খাঁজে আগুয়ান হওয়ার আগেই আর এক মুসলমান বাহিনী হাজির হল এসে। এই দলের সর্দার তহব্বর খাঁ অত্যন্ত সাহসী যোদ্ধা। নিজের সেনাদলের মনোবল জুগিয়ে প্রবল বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করল সে।

সে কী ভয়ানক দৃশ্য! দুর্গাদাস যেন রক্তস্নান সেরে উঠলেন। যশোদাস, তেজকরণ, গম্ভীরসিংহ—সকলের সর্বাঙ্গে গভীর ক্ষত।

একদিকে তহব্বর খাঁ, অন্যদিকে দুর্গাদাস—উভয়েই নিজ নিজ দলে রণোন্মাদনা জাগিয়ে তুলছেন। একজন কোরআন মজিদের ওয়াস্তা দিয়ে যাচ্ছে, তো অন্যজনের কণ্ঠে দেশমাতৃকার সম্মান রক্ষার্থে প্রাণ বাজি রাখবার আহ্বান। মোট কথা, কোনও পক্ষই কম যায় না, এমন ভয়ংকর যুদ্ধ।

দুর্গাদাসকে ঘিরে ধরতে দেখে মানসিংহ এগিয়ে এসেই সর্বশক্তি একত্র করে বর্শার আঘাত হানল তহব্বর খাঁর ওপর। গুরুতর আহত হয়ে মাটিতে পড়ে গেল সে। ওদিকে যশোদাসও সুযোগ পেয়ে মুণ্ডু আলাদা করে দিল দিলাওয়র খাঁর।

বাদশাহি পতাকা নীচে নেমে গেল। মুঘল বাহিনী পালাতে শুরু করল। রাজপুতদের জয়ঘোষ ধ্বনিত হতে লাগল চতুর্দিকে। অসীম উল্লাসের মাঝে মৃত্যুপথযাত্রী আহত রাজপুতরাও উঠে দাঁড়িয়ে ‘বীর দুর্গাদাসের জয়’ বলে নাচতে শুরু করল।

দুর্গাদাস তহব্বর খাঁকে প্রশ্ন করলেন, “খাঁ সাহেব, আপনার বাদশাহ্‌ সলামত কি এটুকু সেনাই পাঠিয়েছেন, না আরও আছে?”

জবাব এল, “না। শাহজাদা অকবর শাহের নেতৃত্বে প্রায় বিশ হাজার মুঘল সৈন্য আসছে আরও।”  

দুই বাদশাহি পতাকা এবং তিন সর্দার— ইনায়ৎ খাঁ, মুহম্মদ খাঁ ও তহব্বর খাঁকে অল্প সৈন্যসহ সামনে পাঠিয়ে দিলেন দুর্গাদাস। অকবর শাহ্‌ বাহিনী নিয়ে কাছে আসতেই মানসিংহ তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে দুর্গাদাসের বার্তা জানিয়ে দুই বাদশাহি পতাকা দেখাল। অকবর শাহ্‌ শান্ত স্বভাবের মানুষ। দুই বাদশাহি পতাকা ও সর্দারদের রাজপুতদের হাতে বন্দি অবস্থায় দেখে নিজের পতাকাও মানসিংহের হাতে তুলে দিলেন। সন্ধির পতাকা উঁচু করে দুর্গাদাসের কাছে আত্মসমর্পণ করলেন। নিজ তলোয়ার খুলে এনে দুর্গাদাসের সামনে রাখলেন। দুর্গাদাস সেই তলোয়ার তুলে সস্নেহে অকবরকে ফিরিয়ে দিলেন আবার।

জয়-বাদ্য বেজে উঠল অবশেষে।

দিলাওয়র খাঁর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দুর্গ দখল এবং মহাসিংহকে মুক্ত করার জন্য মানসিংহ ও গম্ভীরসিংহকে পাঠালেন দুর্গাদাস। দুজনকে আসতে দেখে রক্ষীরা এগিয়ে এসে দুর্গের চাবি তুলে দিল তাদের হাতে। কিন্তু মানসিংহ বা গম্ভীরসিংহ, কেউই আগে এই দুর্গে ঢোকেনি কখনও। এক রক্ষীর সাহায্যে মহাসিংহের কাছে উপস্থিত হল তারা।

ডুবন্ত মানুষ হঠাৎ কোনও অবলম্বন পেলে যেমন আঁকড়ে ধরে, ঠিক তেমনই মহাসিংহ নিজ ভ্রাতুষ্পুত্র ও ভাগিনেয়কে বুকে জড়িয়ে ধরলেন দু-হাতে। কণ্ঠস্বর রুদ্ধ হয়ে এল তাঁর। অনেক কষ্টে উচ্চারণ করলেন, “বীর দুর্গাদাস সুস্থ আছেন তো?”

গম্ভীরসিংহ সকলের কুশলসংবাদ জানিয়ে দেসুরি আর যোধপুর জয়ের সংবাদ দিল।

ওদিকে মানসিংহ ততক্ষণে লালবার কক্ষে পৌঁছেছে গিয়ে। দেখে একটা প্রদীপ মাত্র জ্বলছে কক্ষে, আর তার সামনে লালবা হাঁটু গেড়ে বসে ইষ্টদেবতার প্রার্থনায় রত। এতটাই তন্ময় যে মানসিংহের প্রবেশ টেরই পেল না সে। মানসিংহ দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ, তবুও ধ্যান ভাঙল না লালবার। অবশেষে ডাক দিল, “বোন, ঈশ্বরের কৃপায় বীর দুর্গাদাস মুঘলদের পরাজিত করে যোধপুরের রাজ্যশ্রী অধিকার করেছেন। আজ থেকে আমাদের মাতৃভূমি স্বাধীন।”  

চমকে উঠল লালবা। এ কোন দৈববাণী শুনছে সে? চোখ খুলে দেখে মানসিংহ দাঁড়িয়ে আছে সামনে। ভূতগ্রস্তের মতো উঠে পড়ে জানতে চাইল, “দুর্গাদাস সুস্থ আছেন তো, ভাই? যুদ্ধে তাঁর গুরুতর ক্ষতি হয়নি তো কোনও? আর পিতা-মহারাজ? রানিমা? তাঁদের সংবাদ কুশল তো?”

লালবার প্রশ্ন শেষ হওয়ার আগেই তেজোবাইকে নিয়ে মহাসিংহ এসে উপস্থিত হলেন কক্ষে। কন্যাকে স্নেহভরে বুকে জড়িয়ে ধরে কারাগারের সমস্ত দুঃখকষ্ট ভুলে গেলেন নিমেষে। এরপর গম্ভীরসিংহকে সঙ্গে করে দুর্গাদাসের সাক্ষাতে বেরিয়ে গেলেন তৎক্ষণাৎ। আর তেজোবাই ও লালবাকে নিয়ে মানসিংহ রওনা হল রাজপ্রাসাদ পানে।

বারো

মানসিংহ ও গম্ভীরসিংহকে দুর্গে পাঠানোর পর চার মুঘল সেনাপতিকে কেশরীসিংহের তত্ত্বাবধানে রাজপ্রাসাদের নিকটবর্তী কারাগারে বন্দি করলেন দুর্গাদাস। যোধপুরের নিরাপত্তার জন্যেও যথাযথ ব্যবস্থা নিলেন অন্যান্য। বিশ্বস্ত প্রহরী আর গুপ্তচর নিয়োগ করা হল চতুর্দিকে।

সমস্ত জরুরি কাজ শেষে ছোটো এক সভার আয়োজন করলেন দুর্গাদাস। উপস্থিত রাজপুত সর্দারদের অনুমতি সাপেক্ষে আশেপাশের গ্রামের সমস্ত মুঘলদের বন্দি করে আনা হল যুদ্ধনীতি অনুসারে। তবে শত্রুর মতো নয়, বরং বন্ধুর আচরণ করা হল সবার প্রতি। এদের নির্যাতন করা দুর্গাদাসের উদ্দেশ্য নয়, শত্রুর ওপর এমন চাপ সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন তিনি, যাতে রাজপুত বন্দিদের মুক্তি দেয় তারা।

দুর্গাদাস আজন্মই দেশ ও জাতির কল্যাণে নিবেদিতপ্রাণ। লক্ষ্য যত কঠিনই হোক না কেন, কখনও পিছপা হননি জীবনে। আজ সেই শৌর্য ও দেশপ্রেমের সুবাদেই অমর কীর্তি অর্জন করেছেন মানুষটি। মারওয়াড়ের শিশু অবধি বীর দুর্গাদাসের নামে গর্ব অনুভব করে।

যোধপুর-জয়ের সংবাদ চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়তেই শত্রুও মিত্রের বেশে অভিনন্দন জানাতে আসতে লাগল। জনসমাগম এত বিশাল হল যে যোধপুর নগরে মানুষ আর ধরে না। বাধ্য হয়ে দুর্গাদাসকে নগরের বাইরে এক বিশাল ময়দানে সভার আয়োজন করতে হল। পৌষ পূর্ণিমার দিন। রাজপ্রাসাদ থেকে সভামণ্ডপ পর্যন্ত তিলধারণের জায়গা নেই। কেউ রাজপ্রাসাদ থেকে সভায় চলেছে, কেউ-বা সভা থেকে প্রাসাদে। চলমান জনতার সেই বিরল দৃশ্যে মনে হচ্ছে যেন সমুদ্র উথলে উঠেছে। দেশে এমন কেউ নেই যে বীর দুর্গাদাসের দর্শনাভিলাষী নয়। নারীরা খিড়কি ধরে উঁকি দিচ্ছে। মুহুর্মুহু জয়ধ্বনিতে আকাশ বাতাস মুখরিত। পুষ্পবৃষ্টি সর্বত্র।

দুর্গাদাস রাজপ্রাসাদ থেকে হেঁটেই এলেন। নইলে ফুলের ভারে চাপা পড়তেন, দর্শনার্থীদের আকাঙ্ক্ষাও ব্যর্থ হত। বহু মানুষই এখনও চাক্ষুষ চেনে না তাঁকে। তারা পাশের লোকজনকে শুধোয়, ‘ভাই, বীর দুর্গাদাস কোনজন?’ উত্তর আসে, ‘ওই যে মারওয়াড়ের বীর, সবাইকে প্রণাম জানিয়ে হেঁটে চলেছেন।’ লোকজন আরও বলাবলি করে, ‘ধন্য তিনি! মহান-সব কীর্তি শেষেও অহংকারের লেশমাত্র নেই। তিনি মানুষ নন, দেবতা। মানুষের এমন সদগুণ কোথা!’

বিপুল জনতা দুর্গাদাসের সঙ্গে সভামণ্ডপে উপস্থিত হল ধীরে ধীরে। সেখানে মারওয়াড়ের সমস্ত ছোটো-বড়ো রাজ্যের সর্দারেরা তাঁর আগমনের অপেক্ষায় রয়েছেন। দুর্গাদাসকে দেখেই উঠে দাঁড়ালেন সবাই। গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে এক উচ্চাসনে এনে বসালেন তাঁকে। সুগন্ধি ফুলের মালা পরানো হল গলায়, কপালে কেশর-চন্দনের তিলক।

উদয়পুরের রাণা রাজসিংহ রাজকীয় পোশাক উপহার পাঠিয়েছিলেন। রাজকুমার ভীমসিংহ তা ভেট করলেন দুর্গাদাসকে। সেই উপহার অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করে কপালে ছুঁইয়ে সিংহাসনের ওপর রাখলেন দুর্গাদাস। তারপর দুই হাত জড়ো করে বললেন, “রাজগুরু ও প্রিয় ভ্রাতৃগণ, আজ আপনারা যে সম্মান আমাকে জ্ঞাপন করলেন, তার জন্য আজীবন কৃতজ্ঞ রইলাম আমি। আমি যা করেছি, যে-কোনো দেশপ্রেমিকই করত—মুঘল অত্যাচারে বাধ্য হয়েই করত। কিন্তু ঈশ্বরের ইচ্ছে ছিল এই কীর্তি আমার ভাগ্যে থাকুক, তাই আমাকেই বেছে নিয়েছেন তিনি। এর বেশি কিছু নয়।

“আমাদের পূজনীয় সামন্তরাজ মহাসিংহকে কন্টালিয়ায় ঘিরে ধরে হত্যার উদ্দেশ্য ছিল মুঘলদের। তাঁকে রক্ষা করতে গিয়ে আমার হাতে সর্দার জোরাওয়র খাঁর মৃত্যু ঘটেছে। তার বদলে মুঘলরা আমার বৃদ্ধা মাকে হত্যা করেছে, আমার ঘরবাড়ি লুঠ করেছে এবং কল্যাণগড় জ্বালিয়ে দিয়েছে। আমার একার পক্ষে এর প্রতিশোধ গ্রহণ সম্ভব ছিল না, কিন্তু ঈশ্বরের কৃপা ও দেশভাইদের সহায়তায় আজ যোধপুরে মুঘলদের পরাস্ত করতে পেরেছি এবং এই মহান সভায় উপস্থিত হতে সক্ষম হয়েছি।

“তবুও, ভাইসব, আমার আশঙ্কা—আরও এক ভয়াবহ যুদ্ধ ঘনিয়ে আসছে অদূরে। মুঘল সম্রাট আলমগির নিশ্চয়ই এই অপমান হজম করবেন না। পৃথিবীর কোনায় কোনায় খুঁজে সেনা জড়ো করে আবার মারওয়াড় আক্রমণ করবেন তিনি। তাই আপনাদের আবারও একবার সহায়তা প্রার্থনা করছি আমি। আপনারা যদি আপন আপন গুরুব্রাহ্মণদের যজ্ঞোপবীত, আপন আপন মন্দিরের দেবমূর্তি রক্ষা করতে চান—তবে আমায় সাহায্য করুন। মারতে, নয় মরতে প্রস্তুত থাকুন। পণ করুন, ‘স্বাধীনতা অথবা মৃত্যু’। বীজ যতক্ষণ মাটির সঙ্গে একাত্ম না হয়, ততক্ষণ অঙ্কুরিত হয় না। অনেকেই আগে কোনোরকম সহায়তা করেননি আমায়। এর কারণও ছিল। তাঁরা ভেবেছিলেন, রাজবংশ তো লুপ্ত, মহারাজ যশবন্তসিংহের কোনও উত্তরাধিকার যখন নেই, তবে শক্তিমান মুঘল সম্রাটের সঙ্গে বিরোধে গিয়ে নিজের বিপদ ডেকে আনা কেন? তাঁরা ভেবেছিলেন, রাজ্যের লোভে যুদ্ধে নেমেছি আমি। ঈশ্বর সাক্ষী, কখনোই রাজ্যলোভ ছিল না আমার, আজও নেই, কখনও থাকবেও না। অনেকেই এখনও জানেন না, মহারাজ যশবন্তসিংহের পুত্র অজিতসিংহ জীবিত আছেন এবং গোপনে তাঁর প্রতিপালন চলছে। সময় এলে সচক্ষে রাজকুমারকে চাক্ষুষ করবেন আপনারা।”  

একটানা বলে নিজের আসন গ্রহণ করলেন দুর্গাদাস। চতুর্দিকে আবার জয়ধ্বনি উঠল, পুষ্পবৃষ্টি ঝরল।

এরপর মহাসিংহ উঠে জনগণকে নমস্কার জানিয়ে বললেন, “ভাই সকল, বীর দুর্গাদাস মুঘলদের সঙ্গে বৈরিতার যে কারণ উল্লেখ করেছেন, তা সম্পূর্ণ সত্য। মারওয়াড় তিনি নিজের স্বার্থে মুক্ত করেননি, বরং পিতৃতুল্য মহারাজ যশবন্তসিংহের আদেশ পালন করেছেন। মহারাজ মৃত্যুর দশ দিন আগে সর্দারদের আদেশ দিয়ে গিয়েছিলেন, যদি হাড়ি বা ভাটি রানির গর্ভে তাঁর উত্তরাধিকারী জন্মায়, তবে সমস্ত সর্দারদের একমাত্র কর্তব্য হবে মারওয়াড়কে মুঘলদের হাত থেকে মুক্ত করে রাজকুমারকে সিংহাসনে প্রতিষ্ঠা করা। আজ বীর দুর্গাদাস সেই কর্তব্যই পালন করে দেখিয়েছেন। এখন আমাদের উচিত সর্বান্তকরণে তাঁর সাহায্যে এগিয়ে আসা, যাতে শীঘ্রই রাজকুমারকে যোধপুরের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত দেখতে পাই।”  

সমবেত জনতা সমস্বরে গর্জে উঠল, “আমরা রাজকুমার ও মারওয়াড়ের জন্য প্রাণ দিতে প্রস্তুত।”  

জনতার এই উদ্দীপনা চাক্ষুষ করে মহাসিংহ রাজগুরু জয়দেবের পানে তাকালেন। রাজগুরু মাঘ শুক্লা পঞ্চমীতে যুদ্ধযাত্রার অনুমতি দিলেন। সর্দারেরা নিজ নিজ বাহিনী নিয়ে নির্ধারিত সময়ের একদিন আগেই উপস্থিত থাকার প্রতিজ্ঞা করলেন। সভা সমাপ্ত হল। জনগণ ও রাজপুত সর্দারেরা পরস্পর বিদায় নিয়ে বীর দুর্গাদাসের গুণগান করতে করতে নিজ নিজ গৃহে ফিরে গেলেন।

দুর্গাদাসের উপস্থিত নিজস্ব কোনও গৃহ না থাকায় মহাসিংহের আহ্বানে রাজপ্রাসাদে ফিরে গেলেন। সেখানে আহত রাজপুত সৈনিক ও মুঘল বন্দিদের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করলেন তিনি। দুর্গাদাস বন্দিদের কষ্টে রাখবার পক্ষপাতী ছিলেন না কখনোই, বরং বন্ধুর মতো ব্যবহার করতেন। মুহম্মদ খাঁকে বিশেষ সম্মান দিতেন তিনি। শত্রু বা মিত্র—কারও উপকার কখনও ভোলেন না দুর্গাদাস। অনন্য এক ক্ষমাশীল পুরুষ। ইনায়ৎ খাঁ কত ষড়যন্ত্রই না করল তাঁর বিরুদ্ধে, তবুও দুর্গাদাস তাকে ক্ষমা করে দিলেন। কখনও বন্দিদের ডেকে আনেন, কখনও নিজেই তাদের কাছে গিয়ে রাতভর গল্প করেন। হৃদয়ে বিদ্বেষের লেশমাত্রও নেই তাঁর।

তেরো

ধীরে ধীরে এক মাস পূর্ণ হল একসময়। চতুর্দিক থেকে মেঘপুঞ্জের মতো রাজপুত সেনাদল গর্জন করতে করতে এসে জমা হতে লাগল যোধপুরে। রাজপুত বীরদের এক বিশাল সমাবেশ গড়ে উঠল দেখতে দেখতে। বিকানের ও জয়সলমেরের সর্দারেরা এসে উদয়পুরে শিবির স্থাপন করলেন প্রথমে, তারপর জয়সিংহের সঙ্গে দেসুরি পৌঁছলেন।

মাঘ শুক্লা পঞ্চমীর দিনে যোধপুরে সমবেত সেনাবাহিনী নিয়ে জয়সিংহের সঙ্গে দেসুরিতে মিলিত হলেন দুর্গাদাস। চারজন মুঘল সর্দারকেও তাদের মুসলমান সেনাসহ সঙ্গে আনলেন, কারণ বাদশাহের সঙ্গে বন্দি বিনিময় হওয়ার কথা আছে। এরা এতদিনে রাজপুতদের সঙ্গে এমনভাবে মিশে গিয়েছে যে তাদের বন্দি বলে চেনার কোনও উপায় নেই আর। ভাইয়ের মতো পরস্পরের আচরণ। গভীর স্নেহ আর বিশ্বাসের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে উভয়ের মধ্যে। এ অবশ্য দুর্গাদাসেরই কৃতিত্ব। ঘোর শত্রুতেও মিত্রে পরিণত হয়েছে তাঁর। সময়ে সময়ে আবার দারুণ উপকারী পরামর্শও দেয় তারা। দুর্গাদাস সানন্দে গ্রহণও করেন তা।

আজই যখন দেসুরি থেকে সেনাবাহিনী এগিয়ে নেওয়া হবে কি না—এ নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল, তখন মুহম্মদ খাঁ এর বিরোধিতা করল। তার যুক্তিও যথার্থই, কারণ ততক্ষণে গোধূলি নেমে এসেছে; সামনে যদি শিবির স্থাপনের উপযুক্ত সময় না পাওয়া যায়, তবে বড্ড অসুবিধে হবে। সেনাবাহিনীর আহার ও বিশ্রাম অত্যাবশ্যক।

ভেবেচিন্তে দেসুরির মাঠেই শিবির করা হল। রাত হলে আহার সেরে বিশ্রামে গেল সবাই। দুর্গাদাসও প্রয়োজনীয় কাজকর্ম সেরে অকবর শাহের তাঁবুতে গেলেন। কথায় কথায় অউরংজেবের প্রসঙ্গ উঠল। দুর্গাদাস বললেন, “ভাই, আপনি মানুন বা না মানুন—কারণ, তিনি আপনার পিতা; কিন্তু আমি বলব যে অউরংজেব কাউকেই বিশ্বাস করেন না। দেখুন না, রাজা যশবন্তসিংহের সঙ্গে কেমন কপট আচরণটাই না করলেন তিনি। তাঁরই ইশারায় কাবুলে বিদ্রোহ ঘটানো হল, আর বিষমাখা পোশাক পরিয়ে রাজকুমারকে হত্যা করা হল। তারপর ছলেবলে মারওয়াড় নিজ অধীনে আনেন। তাতেও সন্তুষ্ট হননি শাহেনশাহ্‌, রাজবংশ পর্যন্ত নির্মূল করতে উদ্যত হয়েছেন। দিল্লিতেই অজিতসিংহকে হত্যা করার কত চেষ্টাই না করলেন। বলুন তো ভাই অকবর শাহ্‌, নিজের বন্ধুর সঙ্গে এমন বিশ্বাসঘাতকতা কে করে? মানলাম আমরা পরধর্মী, আমাদের সঙ্গে যা করেছেন, ঠিকই করেছেন; কিন্তু আপনার পিতামহ শাহজাহানও কি কাফির ছিলেন, যাঁকে কারাগারে জলকষ্টে পর্যন্ত রাখা হল? নিজের সহোদর ভাই ও ভ্রাতুষ্পুত্রদের সঙ্গে যে ব্যবহার তিনি করেছেন, তা কি আপনার অজানা? তাঁদের কথা বাদও দিই যদি, আপনি তো তাঁর নিজের সন্তান, তবুও তিনি আপনাকেও বিশ্বাস করেন না। তাই যদি করতেন, তবে তৈবর খাঁকে আপনার পাহারায় নিযুক্ত করতেন না। বিশ্বাস না হয়, তৈবর খাঁকেই জিজ্ঞেস করে দেখুন।”  

অকবর শাহ্‌ প্রথমে বিশ্বাস করতে পারলেন না, কিন্তু কথাটি তাঁর মনে কাঁটার মতো বিঁধে রইল। শেষ পর্যন্ত প্রহরী পাঠিয়ে তৈবর খাঁকে তলব করলেন তৎক্ষণাৎ। অল্পক্ষণের মধ্যেই তৈবর খাঁ ও জয়সিংহ এসে উপস্থিত হলেন শাহজাদার তাঁবুতে। দুর্গাদাস অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে আসন করে দিলেন তাঁদের।

দুজনে বসার পর অকবর শাহ্‌ বললেন, “ভাই তৈবর খাঁ, আমি বিশ্বাস করি তুমি কখনও মিথ্যা বলো না। তবু আজ জয়সিংহ ও দুর্গাদাসের সামনে তোমাকে কোরআনের কসম দিচ্ছি—যা জিজ্ঞেস করা হবে, তার উত্তর সত্যই দেবে।”  

তৈবর খাঁ সম্মত হল।—”বলুন হুজুর, কী জানতে চান?”

শাহজাদা জিজ্ঞেস করলেন, “বাদশাহ্‌ সলামত আমার সম্পর্কে কিছু নির্দেশ দিয়েছেন কি বিশেষ?”

তৈবর খাঁ খানিক ইতস্তত করল প্রথমে, তারপর সাহস সঞ্চয় করে উত্তর দিল, “হ্যাঁ। কিন্তু আপনার কাছে তা প্রকাশ করতে ভয় হচ্ছে আমার।”  

দুর্গাদাস আশ্বস্ত করলেন, “ভয়ের কী আছে ভাই? কোরআনের কসম দেওয়া হয়েছে যখন, তখন সত্য বললে কেউ কুপিত হবেন না। নির্ভয়ে বলো।”  

তৈবর খাঁ জানাল, “দিল্লি থেকে সেনাদল নিয়ে রওনা হওয়ার মুখে বাদশাহ্‌ আমাকে একান্তে ডেকে বলেছিলেন, ‘তৈবর খাঁ, এই দুনিয়ায় তোমাকেই সবার চেয়ে বেশি পছন্দ করি আমি। আমি জানি তুমি মুহম্মদ খাঁর মতো বিশ্বাসঘাতকতা করবে না, কারণ তোমার বাদশাহির লোভ নেই। যাদের থাকে, তারাই প্রতারণা করে। আমার যদি কারও ওপর সন্দেহ থাকে, তবে সে অকবর—কারণ, তার রাজ্যের লোভ আছে। সম্ভবত সেই ধূর্ত দুর্গাদাসের বশীভূত হয়ে আমার সঙ্গেও তেমন আচরণই করবে সে, যা নিজের পিতার সঙ্গে করেছি আমি। তাই তোমাকে আদেশ দিচ্ছি—যদি তার নিয়ত খারাপ মনে হয়, তবে সঙ্গে সঙ্গে কোতল করবে। তোমাকে এ-বিষয়ে সবরকম অধিকার দিলাম আমি।’”

গুপ্ত নির্দেশ ফাঁস করে তৈবর খাঁ চুপ করে রইল।

অকবর শাহের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। বললেন, “ভাই দুর্গাদাস, আপনার কথাই সত্য। আব্বাজান মুখে বলেন এক, করেন আর এক। তাঁর কৌশল বোঝা কঠিন।”  

জয়সিংহ এইবারে বললেন, “এখন আপনিই বলুন, এমন সুলতানের অনুগত হবে কে। ভাববেন না মুসলমান মানেই আমাদের শত্রু। ন্যায়পরায়ণ বাদশাহদের আনুগত্যে আমরা আপন ভাইদেরও গলা কেটেছি। আপনার নামধারী পূর্বপুরুষ অকবর ও শাহজাহানকে রাজপুত সর্দারেরা কবে সাহায্য করেনি বলুন তো? তাঁরা প্রজাপালক ছিলেন, প্রজাকে সন্তান জ্ঞান করতেন। হিন্দু কি মুসলমান—যোগ্যতা অনুযায়ী পদ পেত সবাই। কারও স্বধর্মে হস্তক্ষেপ করতেন না। আমরা এমনসব বাদশাহদের সঙ্গী ছিলাম—আপনার আব্বাজানের মতো নয়, যিনি মন্দির ভেঙে মসজিদ গড়েন, হিন্দু দেবমূর্তি মসজিদের সিঁড়িতে বসিয়ে রাখেন, তীর্থযাত্রীদের ওপর কর চাপান আর নির্দোষ হিন্দুদের কাফির বলে বিনা অপরাধে হত্যা করেন। বলতে পারেন, এ যদি জুলুম না হয়, তবে আর কী?”

দুর্গাদাস তৈবর খাঁকে বললেন, “তোমরা যদি সত্যিই অউরংজেবের কাজকর্মকে পাপ ও অত্যাচার মনে করো এবং সে থেকে মুক্তি চাও, তবে আমরা যেমন বলব তেমনই করার জন্যে প্রস্তুত হও। কিন্তু সময় এলে আবার প্রতারণা কোরো না যেন। অউরংজেবকে বন্দি করে শাহজাদাকে সিংহাসনে বসাব আমরা। তাঁর নাম যেমন অকবর, গুণও তেমন বাদশাহ্‌ অকবরের মতোই। যদি সম্মত থাকো, তবে সর্দার মুহম্মদ খাঁকে ডেকে নাও, আমি উপায় বলছি।”  

প্রহরী মুহম্মদ খাঁকে ডেকে আনা অবধি মনে মনে কত কী ভাবতে লাগলেন শাহজাদা। মুহম্মদ খাঁ এসে হাজির হলে শাহজাদা বললেন, “ভাই দুর্গাদাস, আপনাদের যা উদ্দেশ্য, এতে কোনও সন্দেহ নেই যে আমাদের সবারই মঙ্গলের জন্যে এর চাইতে উত্তম উপায় আর নেই। কিন্তু ভাই, সিংহাসনের লোভে এই পাপ আমি করতে পারি না।”  

মুহম্মদ খাঁ বোঝাল, “শাহজাদা, আপনি এখনও বালক, রাজনীতি বোঝেন না। হাজারটা পাপ এড়াতে একটা পাপ যদি করতে হয়, তবে তা পাপ নয়, পুণ্যই হয়। এটুকু তো আপনিও বোঝেন, আপনি সিংহাসনে বসলে এখন যে অত্যাচারগুলো চলছে, সব বন্ধ হবে। তখন রাজপুতদের যেসব অভিযোগ রয়েছে, সেও দূর হবে। পারস্পরিক মিলন হলে প্রজারা কত সুখে থাকবে ভাবুন! তাই আমার চোখে এ কোনও পাপ নয়। তাছাড়া সুলতান নিজের পিতাকে কারাগারে বন্দি করে ভীষণ কষ্ট দিয়েছিলেন—আপনি তো আর তা করবেন না। ব্যস, কথা শেষ। এত কিছুর পরও যদি আপনি রাজি না হন, তবে শাহি বংশে আপনার জন্মই বৃথা—ফকির-টকির হয়ে চলে যান কোথাও।”  

তৈবর খাঁও উৎসাহ দিল, “আর এতে আপনার করণীয়ই-বা কী? আমরা বন্দি বিনিময়ের অজুহাতে আমাদের মুঘল সেনা নিয়ে এগিয়ে যাব, আর পেছন থেকে রাজপুত সেনা হঠাৎ আক্রমণ কবে বসবে। বাদশাহ্‌ নিজের সেনা ভেবে নিশ্চয়ই আমাদের দিকেই ছুটে আসবেন—ব্যস, কাজ শেষ। বাদশাহকে বন্দি করে বীর দুর্গাদাসের হাতে তুলে দেব, আর আপনি বসবেন শাহি সিংহাসনে।”  

অকবর শাহের মন দুর্বল হয়ে পড়ল। এই দুনিয়ায় কে আর লক্ষ্মীকে পায়ে ঠেলে? ততক্ষণে রাতও প্রায় অর্ধেক গত হয়েছে। সমস্ত সর্দারেরা দুর্গাদাসের সঙ্গে একমত হলেন শেষ পর্যন্ত। আলোচনা শেষ হল। সবাই নিজ নিজ শিবিরে বিশ্রামে চলে গেল। শাহজাদা শয্যায় শুয়ে নিজের ভবিষ্যতের ভাবনায় মগ্ন হলেন।

চোদ্দ

ভোর হতে হতে কুচকাওয়াজের ডঙ্কাও বেজে উঠল অমনি। সর্দারেরা যার যার সেনাদল নিয়ে বুধাবাড়ির ময়দানে রওনা হলেন। এখান থেকে অজমের দেড়-দুই ক্রোশ দূর মাত্র। রণক্ষেত্রের উপযুক্ত স্থান। সেনাবাহিনীর জন্যে সবরকম সুবিধাও বিদ্যমান। দুর্গাদাস এখানেই শিবির স্থাপনের মনস্থ করলেন। ময়দানের দুই পাশে পাহাড়ি অঞ্চল। এখানে যুদ্ধ হলে প্রজাদের ক্ষতির আশঙ্কা নেই কোনও। দুর্গাদাসের উদ্দেশ্যও তাই, নইলে তিনি আগেই জনবসতির বাইরে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সিদ্ধান্ত নেবেন কেন? অতএব দুর্গাদাসের আদেশে এখানেই শিবির করা হল। সর্দারেরা সেনাবাহিনীর খাদ্য ও বিশ্রামের পূর্ণ ব্যবস্থা করলেন।

সন্ধ্যায় জয়সিংহ, দুর্গাদাস প্রমুখ মুঘল সর্দারদের সঙ্গে বসে অউরংজেবের বিরুদ্ধে রচিত ষড়যন্ত্রের আলোচনায় রত হলেন। দুর্গাদাস বললেন, “খাঁ সাহেব, দেখো বিশ্বাসঘাতকতা কোরো না যেন। নতুবা বেচারা অকবর শাহের সব আকাঙ্ক্ষা ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। আর বিশ্বাসঘাতকতা করোও যদি, আমাদের আর ক্ষতি কী? আমরা তো যুদ্ধের জন্য ঘর ছেড়েই বেরিয়েছি—যেখানে একজনের সঙ্গে লড়তে হয়, সেখানে দুজন হলেও আপত্তি কী!”

মুহম্মদ খাঁ জবাব দিল, “আমরা মুসলমান, কথা দিলে অন্যথা হয় না জানবেন। একবার পা বাড়ালে পেছন ফিরি না। তাছাড়া এ তো আমাদের নিজেদের স্বার্থেরই বিষয়।”  

এই সমস্ত কথাবার্তা চলতে লাগল। অকবর শাহ্‌ এত উৎফুল্ল, ইতোমধ্যেই বাদশাহ্‌ হয়ে বসেছেন যেন।

কিন্তু কেউ জানে না যে গড়ে ওঠা খেলাটি ভেঙে গেছে কখন। যতই চেষ্টা করুক মানুষ, ঈশ্বরের যা ইচ্ছে, তাই হয়। তাঁর কাজ সবই আকস্মিক—কখন কী হয়, কেউ জানে না। যতই গোপনীয়তা থাকুক না কেন, রহস্য ফাঁস হতে সময় নেয় না। প্রবাদ আছে, দেয়ালেরও কান থাকে।

দেসুরিতে শাহজাদার শিবিরে এই আলোচনা চলছিল যখন, এক মুঘল সৈনিক আনওয়র তখন বাইরে পাহারায় ছিল। সব কথা কান পেতে শুনেছে সে। আনওয়র মৌলভি—কট্টর মুসলমান। শাহজাদা অকবর ও শাহজাহান তার কাছে কাফির। রোজা ও নমাজের চেয়েও হিন্দু নির্যাতনকেই বড়ো সওয়াব (পুণ্যকর্মের ফল যা বেহেশতে মেলে) মনে করে সে। ভাবল, কাফিররা এক কট্টর মুসলমান বাদশাহের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে, আমি যদি চুপ বসে থাকি তবে খোদার দৃষ্টিতে আমিও কাফির হয়ে যাব। এই মুহূর্তে বেরিয়ে যেতে হবে এখান থেকে। বিলম্বে কাজ পণ্ড হয়, তারপর অনুতাপ করতে হয়। বেঁচে বেরোতে পারি তো এক মুসলমানকে কাফিরদের হাত থেকে রক্ষা করতে পারব; আর যদি ধরা পড়ি, তবে ইসলামের নামে শহিদ হব।

কোনোরকম বাধাবিপত্তি ছাড়াই বেরিয়ে গেল আনওয়র। দুর্গাদাস মুঘল বন্দিদের কড়া পাহারায় রাখেননি। পরদিন অজমের পৌঁছে বাদশাহকে সব কথা জানাল সে। অউরংজেব অত্যন্ত ধূর্ত মানুষ। সঙ্গে-সঙ্গেই অকবর শাহের নামে চিঠি লিখিয়ে বকশিস-সহ এক ফকিরের হাতে তুলে দিলেন দুর্গাদাসের শিবিরে ফেলে আসবার উদ্দেশ্যে। ফকিরের পথ কেবা আটকায়? ভিক্ষার ছলে শিবিরে ঢুকে সুযোগমতো চিঠিটি দুর্গাদাসের তাঁবুতে রেখে এল সে।

এক প্রহরীর হাতে পড়ল চিঠি। দুর্গাদাসের কাছে নিয়ে এল সে। দুর্গাদাস দেখলেন, শাহজাদার নামে চিঠি, শাহি মোহরও রয়েছে তাতে। তিনি খুলে পড়তে লাগলেন—

‘প্রিয় পুত্র অকবর শাহ্‌! 

কোনও প্রশংসাই তোমার জন্যে যথেষ্ট নয়। কাফিরদের ফাঁসানোর খাসা কৌশল ভেবেছ তুমি। কিন্তু সাবধান, দুর্গাদাস অত্যন্ত চতুর যোদ্ধা। কোথাও ফাঁক না থাকে যেন। তৈবর খাঁর সঙ্গে পরামর্শে থেকো, সাচ্চা মুসলমান সে। শাহজাদা, তোমার চিঠির উত্তর দেওয়া আমার উচিত কার্য নয়, কারণ অন্যের হাতে পড়লে কর্ম পণ্ড হবে। কিন্তু আবার মনে হল—তুমি হয়তো বার্তার অপেক্ষায় থাকবে, যে তোমার চিঠি আমার কাছে পৌঁছেছে কি না। তাই বাধ্য হয়ে লিখলাম।

—তোমার আব্বাজান।’

চিঠি পড়ে স্বভাবতই দুর্গাদাসের মনে অকবর শাহের প্রতি সন্দেহ জাগল। চিঠি হাতে করে সোজা জয়সিংহের কাছে উপস্থিত হলেন তিনি। চিঠিটি তাঁর হাতে দিয়ে নিজে পালঙ্কে বসে বিশ্বাসঘাতকদের কুকর্মের পরিণতি সম্পর্কে ভাবতে লাগলেন। জয়সিংহ চিঠি পড়েই খাপ থেকে তলোয়ার বার করে ফেললেন। দুর্গাদাস হাঁ হাঁ করে উঠলেন, “এ কী করছেন আপনি?”

জয়সিংহ উত্তর দিলেন, “আপনি ক্ষমার অবতার। যত বড়ো অপরাধই হোক, অপরাধীকে আপনি ক্ষমা করেন। কিন্তু আমার মধ্যে সে দৈবী গুণ নেই। দুষ্কৃতীদের বিশ্বাসঘাতকতার ফল তারা অবশ্য পাবে।”  

দুর্গাদাস বোঝালেন, “ভাই! এ রাজপুতদের ধর্ম নয়। আমাদের বন্দি তারা, আর আজ পর্যন্ত আমরা তাদের সঙ্গে ভ্রাতৃত্বপূর্ণ ব্যবহারই করেছি। এখন আপনি অপরাধ প্রমাণ ছাড়াই তাদের হত্যা করতে চাইছেন—এমন অনুচিত কাজে আমার ইচ্ছা নেই।”  

জয়সিংহ খানিক শান্ত হয়ে প্রশ্ন করলেন, “তাহলে বলুন, আপনার ইচ্ছা কী?”

“আমার ইচ্ছা যদি জানতে চান, তবে যেমন ঘুমোচ্ছে তারা ঘুমোতে দিয়ে আমাদের সেনা দেববাড়ির পাহাড়ে লুকিয়ে রাখা। অউরংজেব সেনা নিয়ে এলে দু-দিক ধরে একসঙ্গে আক্রমণ করব। আমার বিশ্বাস, এই দ্বিমুখী আঘাত মুঘল সামলাতে পারবে না। পালাতে চাইলেও সামনে গিরিপথ ছাড়া আর কোনও পথ থাকবে না। সেখানে আটকা পড়লে রক্ষা পাওয়া কঠিন হবে। তখন হয় সে আত্মসমর্পণ করবে, নয়তো অকালে মরবে।”  

পরামর্শ জয়সিংহের মনে ধরল। গোপনে রাজপুত সর্দারদের সতর্ক করা হল। সবাই নিজ নিজ সেনা নিয়ে রাতের শেষ প্রহরে দেববাড়ির পাহাড়ি অঞ্চলে পৌঁছে গেলেন নীরবে।

ভোর হল। তারার আলো ম্লান হয়ে আকাশে রঙ ধরতে লেগেছে। পাখিসব বাসা ছেড়ে ডালে ডালে বসে ঈশ্বরের স্তবগান গাইছে।

ওদিকে আজান শুনে মুঘল সর্দারেরাও নমাজে বসবে। তাঁবু থেকে বেরিয়ে আসতেই প্রাণ শুকিয়ে গেল সবার। কোথায় আর নমাজ, কোথায়-বা রোজা—এ যে রীতিমতো প্রাণসংকট! অকবর শাহের অবস্থা তো না বলাই ভালো। কাল যিনি বাদশাহি আভিজাত্যে ডগমগ ছিলেন, আজ পালানোর পথ খুঁজে পাচ্ছেন না। চেহারার শাহি নূর ফিকে হয়ে গেছে। ভাবতে লাগলেন, হে খুদা! ব্যাপারটা কী? এখানে রাজপুত সেনারাই ছিল তো, নাকি কোন ইন্দ্রজালের মায়া? তৈবর খাঁকে বললেন, “দুর্গাদাস চলে গেছেন, দুঃখ নেই। কিন্তু অমন চুপিচুপি কেন? আমরা কি তাঁদের আটকে রাখতাম? আমরা তো নিজেরাই বন্দি ছিলাম। তাহলে এমন গোপনে যাওয়ার কারণ?”

তৈবর খাঁ উত্তর দিল, “এতে দুঃখের কী আছে, শাহজাদা? দুর্গাদাস আমাদের ওপর বিশ্বাস রাখেননি, তাছাড়া এটাই স্বাভাবিক। বিশ্বাস করবেনই-বা কেন বলুন? একটা পচা মাছ গোটা জল নষ্ট করে ফেলে। বাদশাহ্ও বারংবার প্রতারণাই করেছেন। দুর্গাদাস মহৎ মানুষ, আমাদের কোনোরকম তকলিফ দেননি, চলে গেছেন। চাইলেই জানে শেষ করে ফেলতে পারতেন নিমেষে। আমরা তো তাঁরই অধীন ছিলাম।”  

মুহম্মদ খাঁও একমত। বলল, “ভাই! দুর্গাদাস যা করেছেন, ভালোই করেছেন। এখন আমাদের উচিত তাঁকে দেখিয়ে দেওয়া যে সব মানুষ একরকম নয়। কিছু মুসলমান যদি মিথ্যাচারী হয়, তবে কিছু নিজের প্রতিজ্ঞার প্রতি নিষ্ঠাবানও থাকে। তাই শাহজাদাকে যেতে দাও, তিনি দুর্গাদাসের খোঁজ করুন। আর আমরা আমাদের সেনা নিয়ে রণক্ষেত্রে যাই। বাদশাহ্‌ আসছেন—মরি বা মারি, নিজ কর্তব্য পালনে অবিচল থাকব। এই খবর পেলে দুর্গাদাস নিশ্চয়ই লজ্জিত হবেন।”  

পরামর্শ তৈবর খাঁর পছন্দ হল। অকবর শাহকে বিদায় দিয়ে নিজের সেনা নিয়ে অউরংজেবের মোকাবিলায় এগিয়ে গেল সে। পথেই অউরংজেবের সেনার সঙ্গে সংঘর্ষ হল। এই সেনাদল শাহজাদা মুয়জ্জম ও শাহজাদা আজিমের নেতৃত্বে এগিয়ে আসছিল। এই দুজনের কাছেই অকবর শাহ্‌ পথের কাঁটা, কিন্তু তাঁকে সরিয়ে দেওয়ার উপায় ছিল না। আজ মনের মতো সুযোগ মিলল। প্রাণপণে যুদ্ধ শুরু করলেন তাঁরা। তৈবর খাঁর সৈন্যরা অসাধারণ বীরত্ব দেখাল প্রথমে, কিন্তু মৌলভি সাহেবের ফতোয়া শোনামাত্রই তারা দল বদলে নিজেদেরই দুই সর্দারকে ঘিরে ধরে হত্যা করে বসল।

মুহম্মদ খাঁ ও তৈবর খাঁ নিহত হওয়ার পর অকবর শাহের অনেক সন্ধান চালালেন শাহজাদা আজিম, কিন্তু পাওয়া গেল না। বাধ্য হয়ে অজমেরে ফিরে গেলেন, কারণ সেনাবাহিনীর অর্ধেকের বেশি আহত, দুর্গাদাসের মোকাবিলা করার মতো সাহস আর নেই। নইলে বিজয়ের অহংকারে অবশ্যই আগুয়ান হতেন তিনি। অবশ্য সে অহংকার তো দুর্গাদাস চূর্ণ করতেনই, বেচারা অকবর শাহের প্রাণও বাঁচত না। শাহজাদা তখন দেববাড়ির পাহাড়ে দুর্গাদাসকে খুঁজে বেড়াচ্ছেন, কোনও না কোনোভাবে কারও চোখে পড়ে যেতেনই। ঘটনাক্রমে সঙ্গে শামলদাসের দেখা তাঁর। পাঁচশো অশ্বারোহী নিয়ে দেববাড়ির পথ পাহারা দিচ্ছিল শামলদাস। প্রথমে শামলদাসের সন্দেহ হল, লোকটা হয়তো গুপ্তচর। কথাবার্তার পর সে সন্দেহ দূর হতে দুর্গাদাসের কাছে পাঠিয়ে দিল তাঁকে।

শাহজাদাকে দেখে দুর্গাদাস লজ্জিত হলেন। বললেন, “আমাকে ক্ষমা করুন, শাহজাদা। এত বছর বয়সে এই প্রথম ভুল হয়েছে আমার। আজ পর্যন্ত কারও সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করিনি, কোনও নির্দোষের ওপর তলোয়ারও তুলিনি। আপনার ব্যাপারে যে ভুলটি হয়েছে, তা প্রতারণার কারণেই। এই নিন আপনার পিতার পত্র পড়ুন এবং নিজেই বলুন এমতাবস্থায় আমাদের কর্তব্য কী হওয়া উচিত ছিল।”  

শাহজাদা চিঠি পড়ে বললেন, “দুর্গাদাস, এতে আপনার কোনও ভুল নেই—এ আমারই দুর্ভাগ্য। মৃত্যুর পরোয়ানা তো পত্রের মধ্যেই ছিল, তবু জানি না ভাগ্যে কী ছিল যে প্রাণে বেঁচে গেলাম। খুদা জানে, তৈবর খাঁর কী পরিণতি হয়েছে।”  

দুর্গাদাস আক্ষেপ করলেন, “শাহজাদা! চিরকাল দুঃখ থাকবে যে আমার ভুলের কারণে মুহম্মদ খাঁ ও তৈবর খাঁর প্রাণ গেল।”  

দুর্গাদাসের কথা শেষ হওয়ার আগেই কানে ভেসে এল ‘আল্লাহু অকবর’ ধ্বনি। শাহজাদার ওপর সন্দেহ জেগে উঠল ফের, কিন্তু এগিয়ে গিয়ে পাহাড়ের নীচে তাকিয়ে দেখা গেল অউরংজেবের সেনা গিরিপথে ফেঁসে গেছে। আর দেরি কী, রাজপুতদের নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন দুর্গাদাস। শুরু হল দ্বিমুখী আক্রমণ। মুঘল সেনা যেদিকে পালাতে চাইছে, সেদিকেই রাজপুতদের মুখে পড়ছে গিয়ে।

দুর্গাদাস দেববাড়ির একটিমাত্র গিরিপথ ছেড়ে চারদিক থেকে ঘিরে রেখেছিলেন। সেই গিরিপথের তিনদিকে সুউচ্চ পাহাড়, আর একদিকে সংকীর্ণ পথ। অউরংজেব কি আর জানতেন—এ পালাবার রাস্তা নয়, ইঁদুর ধরার ফাঁদ? তিনি সে পথেই গিয়ে ঢুকলেন, পেছন পেছন গোটা লশকর। রাজপুতরাও এমন তাড়া করল, যেমন রাখালেরা খোঁয়াড়ে ভেড়া হাঁকায়। পুরো মুঘল সেনা গিরিপথে ঢুকে পড়তেই রাজপুতরা হাসতে হাসতে সেই সংকীর্ণ পথ পাথর ফেলে বন্ধ করে দিল।

পাহাড় এতটা দুর্গমও নয় যে বেয়ে ওঠা অসম্ভব, কিন্তু সে ছিল ভীষণ কঠিন কাজ। রাত তখনও পুরো এক প্রহর পেরোয়নি, কিন্তু চতুর্দিক অন্ধকার হয়ে এসেছে। চাঁদের আলোও খুবই ক্ষীণ। তার ওপর রাজপুতরা ওপর থেকে পাথর গড়িয়ে চলেছে। মোট কথা, মুঘলের অবস্থা এখন বিনা যুদ্ধে মৃত্যুর। ফলে কেউ পাথরের ধাক্কায় মারা গেল; বেঁচে আছে যারা, তারাও জীবন্মৃত।

রাজপুতেরা তো পণই করেছে, একজন মুঘলকেও জীবিত ছাড়বে না তারা। গিরিপথও প্রায় পুরোপুরি বন্ধই করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু অউরংজেবের নিয়তি—সে ঠেকাবে কে? খুঁজতে খুঁজতে ছোট্ট এক গুহা পেয়ে গেলেন তিনি। অত্যন্ত সতর্ক হয়ে লুকিয়ে রইলেন সেখানে।

রাজপুতদের আক্রমণ থেমে গেলে চুপিসারে বেরিয়ে এলেন অউরংজেব। রাতের তখন শেষ প্রহর। চাঁদ ডুবে গেলেও আকাশজুড়ে তারা ঝলমল করছে। দুর্গাদাস ততক্ষণে নিজের সেনা নিয়ে বুধাবাড়িতে ফিরে গেছেন। পথ পরিষ্কার, অতএব অউরংজেবকে পাহাড় বেয়ে ওঠা ছাড়া আর কোনও বাধার সম্মুখীন হতে হল না। ভয় শুধু একটাই—কারও নজরে না পড়ে যান, তবেই ফের শত্রুর হাতে। গোপনে আর অত্যন্ত সাবধানে পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরে বেড়িয়ে ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত অবস্থায় তৃতীয় দিনে কোনোমতে অজমেরে এসে পৌঁছলেন তিনি।

শাহজাদা আজিম আগেই এসে পৌঁছেছেন। অউরংজেব খামোখাই ভীষণ ক্রুদ্ধ হলেন তাঁর ওপর। পেটে দানাপানি পড়ার পর মন কিছুটা শান্ত হলে সর্দারদের তলব করলেন। দেখা গেল কেউই বীর দুর্গাদাসের মোকাবিলার সাহস দেখাচ্ছে না। তখন নিজ সাম্রাজ্যের কোণে কোণে সুবাদারদের মুসলমান সেনা পাঠানোর আদেশপত্র জারি করলেন অউরংজেব। তবু মন শান্ত হল না তাঁর। ফন্দি আঁটলেন—এত বড়ো মুঘল সেনা এক সপ্তাহে জড়ো করা অসম্ভব, আর দুর্গাদাস কখন আক্রমণ করে বসবে, তারও ঠিক নেই; অতএব ফাঁদ পাততে হবে কোনও।

পনেরো

পরদিন সর্দার জুলফিকর খাঁকে চল্লিশ হাজার আশরফি দিয়ে দুর্গাদাসের কাছে পাঠালেন বাদশাহ্‌। এই মুঘল সর্দারটি অত্যন্ত চতুর। সন্ধ্যায় দুর্গাদাসের শিবিরে এসে পৌঁছল সে। পরদিন সকালে অনুমতি পেয়ে দুর্গাদাসের শিবিরে হাজির হয়ে অভিবাদন সেরে আশরফিগুলো সামনে রেখে বলল, “ঠাকুর সাহেব! আমাদের বাদশাহ্‌ সলামত আপনাকে সলাম জানিয়ে এই চল্লিশ হাজার আশরফি ভেট পাঠিয়েছেন। এখন আপনার উচিত সানন্দে এই ভেট কবুল করে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দেওয়া—কারণ, বাদশাহ্‌ সহজে কারও ওপর সন্তুষ্ট হন না। আজ আপনার বীরত্বে খুশি হয়েছেন তিনি। শুধু এই আশরফিই নয়, আরও বলেছেন—তেজকরণকে পাঁচ হাজার অশ্বারোহীর সর্দার করে দেবেন, মারওয়াড়ের সর্দারদের অধিকার যেমনটা রাজা যশবন্তসিংহের সময় ছিল, তেমনই থাকবে। যাদের জায়গির কেড়ে নেওয়া হয়েছে, তাও ফিরিয়ে দেওয়া হবে। সমস্ত রাজপুত বন্দিকেও মুক্তি দেওয়া হবে। অতএব অনুগ্রহ করে আমাকে ও শাহজাদাকে সসম্মানে শিগগির ফিরে যাওয়ার অনুমতি দিন। বাদশাহ্‌ সন্তানের বিচ্ছেদে আকুল হয়েছেন, তাঁকে দেখলে অত্যন্ত আনন্দিত হবেন। ঈশ্বর জানেন, আপনার প্রতি আর কত অনুগ্রহ করবেন তিনি।

“ভালো কাজে বিলম্ব করা উচিত নয়। সন্দেহ সর্বনাশের কারণ। সন্দেহ করলে গড়া কাজও ভেঙে যায়। আমি যদি খালি হাতে ফিরে যাই, তবে মনে রাখবেন—রাজরাজড়াদের সন্তুষ্টি ততটা সুখ দেয় না, অসন্তোষ যতটা দুঃখের কারণ হয়। ঈশ্বর না করুন, বাদশাহ্‌ যদি আপনার আচরণে ক্ষুব্ধ হন, তবে চোখের পলকে যোধপুর ধূলিসাৎ করে দিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করবেন না। যে বাদশাহ্‌ মুহূর্তে বিশ লক্ষ সৈন্য জুটিয়ে ফেলতে পারেন, তাঁর সঙ্গে আপনি মুষ্টিমেয় রাজপুত নিয়ে লড়বেন কী উপায়ে বলুন?

“আমি আপনার মঙ্গল কামনায় এসেছি, অমঙ্গল চাইতে নয়। আপনি যদি নিজ ধর্ম, পরিবার-পরিজন, আপনার নিরীহ ভাই-বন্ধু এবং দেবমন্দিরগুলোর কল্যাণ চান, তবে শাহজাদাকে আমার সঙ্গে পাঠিয়ে দিন। ঠাকুর সাহেব, একের জন্য অনেকের বিপদ ডেকে আনা বুদ্ধিমানের কাজ নয়।”  

দুর্গাদাস নীরবে জুলফিকর খাঁর কথা শুনলেন। ভাবছিলেন, কী উত্তর দেওয়া উচিত। যদি ‘হ্যাঁ’ বলেন, তবে তা অধর্ম হবে। আশ্রয় দিয়ে শাহজাদাকে আবার মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেন কীভাবে? আর যদি ‘না’ বলেন, তবে সর্দারদের মনে কী প্রতিক্রিয়া হবে কে জানে।

এই চিন্তায় ডুবে ছিলেন দুর্গাদাস। শাহজাদা অনেকক্ষণ ধরেই তাঁর দিকে তাকিয়ে আছেন—দেখছিলেন, কী উত্তর দেন। যখন দেখলেন দুর্গাদাস কিছুই বলছেন না, মৌনব্রত ধারণ করেছেন, তখন উদ্বিগ্ন হলেন। বিষণ্ণ মনে ভাবতে লাগলেন, হয়তো নিজের প্রাণ তুচ্ছ করেও দুর্গাদাস আমাকে ত্যাগ করতেন না; কিন্তু এখন তো দেশ, ধর্ম ও জাতির প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে। আমার চাইতে দেশের মঙ্গল নিশ্চয়ই বড়ো তাঁর কাছে। স্বজাতির মঙ্গলের তুলনায় একজন মুঘলের প্রাণের মূল্যই-বা কী? সেটাই হওয়া উচিত। একের বলিদানে বহুজনের যদি মঙ্গল হয়, সেখানে বিলম্ব অনুচিত। দুর্গাদাস জুলফিকর খাঁর কথার উত্তর দিচ্ছেন না কেন তবে? হয়তো দ্বিধায় পড়েছেন—যাকে আশ্রয় দিয়েছেন, তাকে ত্যাগ করেন কী উপায়ে। আমার মৃত্যু যেহেতু অবশ্যম্ভাবী, তবে আর শুভাকাঙ্ক্ষীকে অধিক কষ্ট দেওয়ার দরকার কী?

এই চিন্তা করে শাহজাদা উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, “বীর দুর্গাদাস! আমি আপনার ইচ্ছায় নয়, স্বেচ্ছায় সর্দার জুলফিকর খাঁর সঙ্গে ফেরত যাচ্ছি। এতে আপনার বিন্দুমাত্র ত্রুটি নেই; কারণ যথাসম্ভব আমাকে রক্ষা করেছেন আপনি। মানুষের শক্তির অসাধ্য আর কীই-বা থাকতে পারে? কেউ তো আর কারও ভাগ্য বদলাতে পারে না।”  

দুর্গাদাস তৎক্ষণাৎ শাহজাদার হাত ধরে পাশে বসিয়ে বললেন, “শাহজাদা! শুধু চল্লিশ হাজার কেন, বাদশাহ্‌ যদি নিজের গোটা সাম্রাজ্যের বিনিময়েও আপনাকে ফেরত চান, তবুও আমি আপনাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে পারি না এখন। আমার দ্বারা নিজের বংশ ও জাতিকে কলঙ্কিত করা সম্ভব নয়। রাজপুতদের জবান একটাই হয়। আপনি হয়তো ভেবেছেন, শত্রুপক্ষের একজনের জন্য দুর্গাদাস কেন গোটা দেশকে বিপদের মুখে ফেলবে? না, এ আপনার ভুল। শুধু সামন্তরাজ মহাসিংহের জন্যই আমাদের মারওয়াড়বাসীরা কত যাতনা সহ্য করেছে, আর এর পরিবর্তে আমরা কী পেয়েছি দেখুন। মারওয়াড় আজ স্বাধীন। বাদশাহ্‌ সলাম জানিয়ে চল্লিশ হাজার আশরফির ভেট পাঠিয়েছেন। এখন যদি আপনার কারণে আমাদের আরও কষ্ট সহ্য করতে হয়, তবে তার ফল আরও ভালো হবে নিশ্চয়ই। অন্ধকারের পরেই আলোর প্রকাশ। দুঃখভোগের পরেই সুখের আনন্দ উপভোগ করা যায়। মাটিতে মিশে যাওয়ার পরেই বীজ সবুজ বৃক্ষে পরিণত হয়।”  

দুর্গাদাস যখন শাহজাদাকে সান্ত্বনায় রত, তখন জয়সিংহ জুলফিকর খাঁর কথার জবাব দিতে সচেষ্ট হলেন। অত্যন্ত শান্ত স্বরে বললেন, “জুলফিকর খাঁ! তোমাদের বাদশাহ্‌ আজ পর্যন্ত রাজপুতদের ওপর এমন কোনও অত্যাচার বাকি রেখেছেন কি, যা করেননি? এর চেয়েও অধিক লাঞ্ছনা আর কী হতে পারে? দেবমন্দির ভেঙে মসজিদ উঠেছে, ধর্মগ্রন্থ পোড়ানো হয়েছে, ব্রাহ্মণদের উপবীত ছিঁড়ে দেওয়া হয়েছে, অবলা নারীদের নির্যাতন করা হয়েছে, তীর্থযাত্রীদের ওপর জিজিয়া কর চাপানো হয়েছে, বিনা অপরাধে নিরীহ রাজপুতদের কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়েছে। বহুজনকে তো ফাঁসিতেও ঝোলানো হয়েছে। তুমিই বলো, প্রাণদণ্ডের চেয়েও বড়ো শাস্তি আর কিছু আছে দুনিয়ায়?

“ভাই, আমাদের সঙ্গে যদি ন্যায়বিচার করতেন তিনি, তবে আমরা কালসর্পের মতো তাঁকে দংশনে সচেষ্ট হতাম না; বরং প্রভুভক্ত কুকুরের মতোই সেবা করতাম তাঁর। তখন এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হত না যে, একজন রাজদ্রোহীর জন্য দিল্লির সম্রাটকে প্রজার কাছে মাথা নত করে সলাম জানাতে হয়, চল্লিশ হাজার আশরফির লোভের ফাঁদ পাততে হয়।”  

দুর্গাদাস তাড়াতাড়ি বললেন, “ভাই জয়সিংহ, আপনি কাকে আর কেনই-বা এসব যুক্তি দেখাচ্ছেন? আমি এতক্ষণ চুপ ছিলাম শুধু এই কারণে যে জুলফিকর খাঁ অযথা কথা বলে নিজের সময় নষ্ট করছে, আমি তাতে শামিল হতে চাইনি। এদের সঙ্গে কথা বলে কোনও লাভ নেই, উত্তর দেওয়া তো বাহুল্য। যা বলার আছে বলুক। বাদশাহ্‌ না হুমকি দিয়েছেন, না লোভ দেখিয়েছেন—এ সবই তাঁর প্রতারণা ও ফাঁদ।

“সর্দার জুলফিকর খাঁ, তুমি তোমার আশরফি ফিরিয়ে নিয়ে যাও। পাপের উপার্জনের দান রাজপুত গ্রহণ করে না। আর রাজপুতের দ্বারে যে একবার আশ্রয়প্রার্থী হয়েছে, তাকে জীবিত থাকতে কখনও ত্যাগও করে না। অতএব সানন্দে ফিরে যেতে পারো তুমি, আর বাদশাহের সলামের প্রত্যুত্তরে আমাদেরও সলাম জানিও।”  

জুলফিকর খাঁ তারপরও কিছু বলার চেষ্টা করেছিল; কিন্তু রাজপুতের সেই অটল প্রতিজ্ঞা—প্রাণ যায়, বচন না যায়। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে ফিরে যেতে হল তাকে।

জুলফিকর খাঁ বিদায় নেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই উদয়পুর রাণার কনিষ্ঠ পুত্র ভীমসিংহ উপস্থিত হলেন। সমস্ত সর্দারদের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে দুর্গাদাসের পাশে বসলেন এসে।

জয়সিংহ জানতে চাইলেন”ভাই ভীমসিংহ, এত অস্থির কেন? নতুন কোনও খবর আছে নাকি?”

ভীমসিংহ উত্তর দিলেন, “অস্থির নয়, আশ্চর্য হলাম বেশ। আশ্চর্য এই যে, আপনাদের সবাইকে বেশ নিশ্চিন্তই দেখছি। এখনও অজমের আক্রমণ হল না, সুযোগটা ভালো ছিল, কিন্তু এখন তা হাতছাড়া হয়ে গেছে। অউরংজেব চারদিকে যুদ্ধ বন্ধ করে দিয়েছেন এবং সমস্ত মুঘল সেনাকে অজমেরে তলব করেছেন। ঈশ্বরই জানেন, এখন মারওয়াড়ের ভাগ্যে কী আছে।”  

কেশরীসিংহ এই দলের সবচেয়ে প্রবীণ সর্দার। আশ্বস্ত করলেন, “ভাইসব! আমাদের নিজের বা মারওয়াড়ের চিন্তা নেই কোনও। এই মুহূর্তে আমাদের প্রথম কর্তব্য হল শাহজাদার নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা। তারপর নয় অউরংজেবের সঙ্গে লড়াই হবে।”  

প্রস্তাব সমস্ত রাজপুত সর্দারদের মনে ধরল। সবাই ভাবতে বসলেন শাহজাদাকে কোথায় পাঠানো যায়, যেখানে তাঁর রক্ষায় কোনও ত্রুটি থাকবে না। ভীমসিংহ পরামর্শ দিলেন, “শিবাজির পুত্র শম্ভাজিই একমাত্র রক্ষা করতে পারেন তাঁর। নিজে বীরপুরুষ, দ্বিতীয়ত অউরংজেবের মহা শত্রু, তৃতীয়ত এখন সেখানে মুঘল সেনা নেই কোনও। যুদ্ধ বন্ধ, সবরকম সুবিধা রয়েছে।”  

দুর্গাদাস ও শাহজাদা দুজনেই শম্ভাজির কাছে যাওয়াই শ্রেয় মনে করলেন।

ষোলো

সন্ধ্যায় অল্প কিছু অশ্বারোহী নিয়ে শম্ভাজির দুর্গের উদ্দেশে রওনা হলেন দুর্গাদাস। সর্দারদের নির্দেশ দিয়ে গেলেন, সেনাদলকে ঘাঁটিতে নিয়ে যেতে।

বহু বনজঙ্গল, পাহাড়-পর্বত ডিঙিয়ে তৃতীয় দিনে শম্ভাজির কাছে পৌঁছলেন দুজনে। শম্ভাজি দেখামাত্রই শাহজাদাকে চিনে ফেললেন এবং অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন। নিশ্চিন্ত হয়ে দুর্গাদাস আগমনের কারণ জানালেন। শম্ভাজি উৎফুল্ল হয়ে বললেন, “ভাই দুর্গাদাস! শরণাগতকে রক্ষা করাই আমাদের প্রধান ধর্ম। তাছাড়া শাহজাদা আমাদের বড়ো উপকারও করেছেন একসময়। দিল্লির কারাগারে যখন আমি ও পূজনীয় পিতা-মহারাজ বন্দি ছিলাম, তখন শাহজাদা আমাদের সাহায্য করেছিলেন অনেক। তাঁর দেওয়া ঘোড়াটি আজও আমার কাছে আছে। নিজের প্রাণের মতোই তাঁর রক্ষা করব আমি। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন।”  

রাতে সেখানেই বিশ্রাম নিলেন দুর্গাদাস। পরদিন শম্ভাজির কাছ থেকে বিদায় নিয়ে মারওয়াড়ের পথ ধরলেন। গুজরাটের কাছে এক পাহাড়ে শামলদাস মেড়তিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ। জয়সিংহের আদেশে সে দক্ষিণ প্রদেশ থেকে আসা মুঘল সেনাকে আটকাতে নিজের বাহিনী নিয়ে সেখানে অবস্থান নিয়েছে। দুর্গাদাস এই সংবাদ জানতেন না। শামলদাস জানাল, “ঠাকুর, আপনি রওনা হওয়ার পর সর্দারেরা পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যে-সমস্ত মুঘল সেনা আমাদের অসতর্কতার কারণে অজমেরে পৌঁছে গেছে, সে তো গেছেই; কিন্তু দূর থেকে আসা সেনার সব পথ এখন বন্ধ করে দিতে হবে। নইলে জয়লাভ স্বপ্নেও অসম্ভব। এই ভেবে কিছু সেনা বাংলা, মাদ্রাজ ও পঞ্জাবের দিকে পাঠানো হয়েছে। এখন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আপনাকে পৌঁছতে হবে গিয়ে। সম্ভবত আজই আপনার অপেক্ষা শেষে সর্দার শোনিংজি অজমের আক্রমণ করতে পারেন।”  

এ-কথা শোনামাত্র শামলদাসকে যুদ্ধ বিষয়ক কিছু নির্দেশ দিয়ে দুর্গাদাস ঘোড়ায় চড়ে বসলেন ফের। লাগাম টানতেই ঘোড়া যেন হাওয়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটল। রাতের শেষ প্রহরে বুধাবাড়িতে পৌঁছে দুর্গাদাস জানতে পারলেন, সেনা ইতোমধ্যেই কুচ করেছে। সওয়ারি আর ঘোড়া—উভয়েই ক্লান্ত, তথাপি দুর্গাদাসের তো দেশসেবায় পূর্বেই উৎসর্গিত প্রাণ। মারওয়াড় স্বাধীন না হওয়া পর্যন্ত তাঁর শান্তি কোথা? সোজা অজমেরের পথে রওনা হয়ে ভোরের আলো ফোটার আগেই নিজ সেনাবাহিনীতে পৌঁছে গেলেন তিনি।

এই সংবাদ যখন অউরংজেবের কাছে পৌঁছল, অত্যন্ত বিচলিত হয়ে পড়লেন তিনি। কারণ, অজমেরে তখনও পর্যন্ত মুঘল সেনার দুটো দল মাত্র পৌঁছেছে এসে, বাকিদের অপেক্ষা চলছে। নিজের অর্ধেক সেনার ওপরও বিশেষ আস্থা নেই বাদশাহের। তাই আরও এক কূট চালের বন্দোবস্ত করলেন। ভোর হতেই সর্দার দিলের খাঁর হাতে সন্ধির বার্তা পাঠালেন তিনি।

দুর্গাদাস জবাব দিলেন, “সর্দার দিলের খাঁ! সরলমনা রাজপুতেরা বহুবার প্রতারিত হয়েছে। এখন আর আমরা তোমাদের বাদশাহের মুখের কথায় বিশ্বাস রাখি না। যদি তিনি সত্যিই সন্ধি চান, তবে শাহি মোহর অঙ্কিত লিখিত প্রতিশ্রুতি দিন—আমাদের ধর্মবিশ্বাসে আঘাত আসবে না, হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে কোনও ভেদাভেদ থাকবে না, যোগ্যতার ভিত্তিতেই পদের ব্যবস্থা হবে। যদি তোমাদের বাদশাহ্‌ এ-সমস্ত মেনে নেন, তবে আমরাও সন্ধিতে রাজি। নচেৎ তলোয়ার একবার উঠেছে যখন, যুদ্ধ শেষেই কোষবদ্ধ হবে ফের। যাও, আমাদের তরফে যা বক্তব্য ছিল শুনলে। শর্ত না মানলে যুদ্ধক্ষেত্রে অস্ত্র হাতেই উপস্থিত হয়ো তবে।”  

দিলের খাঁ শূন্য হাতে ফিরে অউরংজেবের কানে চারগুণ বাড়িয়ে লাগাল গিয়ে। অউরংজেব আগুন হয়ে তক্ষুনি যুদ্ধ প্রস্তুতির ডঙ্কা সংকেতের আদেশ দিলেন। মুঘল সেনা ময়দানে একত্র হল। উঁচু এক স্থানে দাঁড়িয়ে অউরংজেব তাদের ধর্মোপদেশ দিলেন প্রথমে। সৈন্যদের এমন উন্মত্ত করে তুললেন যে ধর্মান্ধ মুঘলেরা যুদ্ধের কৌশল পর্যন্ত ভুলে গেল।

ঢেউ যেমন তটবর্তী উপলখণ্ডে আঘাত করে ফিরে যায়, তেমনই মুঘল বাহিনী রাজপুতদের সঙ্গে ধাক্কা খেতে লাগল। বীর রাজপুতরা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে আক্রমণ প্রতিহত করল প্রথমে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই অর্ধেক মুঘল সেনাকে কচুকাটা করে ফেলল। ধর্মান্ধ অউরংজেবের হুঁশ ফিরল এইবারে। ধর্মের সমস্ত অহংকার উবে গিয়ে প্রাণ বাঁচানোর আতঙ্কে দিশেহারা হয়ে পড়লেন তিনি। এদিক-ওদিক তাকিয়ে সুযোগ পেয়ে প্রাণ নিয়ে পালালেন শেষে। বাদশাহ্‌ পালিয়ে যেতেই সেনাদলের মনোবল গেল ভেঙে। টলমল পায়ে পালাতে শুরু করল তারাও।

দুর্গ ছাড়া আর কোনও পথ খোলা নেই তখন, এমনি ব্যূহরচনা করে রেখেছে রাজপুতেরা। মুঘল সেনা দুর্গে গিয়ে ঢুকতেই রাজপুতরা চারদিক থেকে ঘিরে ফেলল তাদের। এমনি সময় এক গুপ্তচর এসে বাদশাহকে খবর দিল—শামলদাস ও দয়ালদাস মিলে দক্ষিণ থেকে আসা মুঘল বাহিনীর একজনকেও জীবিত ছাড়েনি, আর মালওয়াতেও রাজপুতেরা তাণ্ডব চালিয়েছে ভীষণ।

অউরংজেব অত্যন্ত আতঙ্কিত হয়ে পড়লেন এই সংবাদে। তৎক্ষণাৎ রাজপুতদের সঙ্গে সন্ধির সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি। জ্যেষ্ঠ শাহজাদা মুয়জ্জমকে ডেকে রাজপুতদের সব দাবি সন্ধিপত্রে লিখিয়ে তাতে শাহি মোহর লাগিয়ে দুর্গাদাসের কাছে পাঠালেন।

দুর্গাদাস সন্ধিপত্র পড়ে শোনালেন দলের সর্দারদের। দুর্গের দরোজা খুলে দেওয়া হল। বাদশাহি পতাকা নামিয়ে এনে রাজপুত নিশান উত্তোলিত হল। মারওয়াড়ের সমস্ত ছোটো-বড়ো রাজ্যকে একীকরণের সংবাদ পাঠিয়ে কুমার অজিতসিংহের রাজ্যাভিষেকে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হল।

কুমার অজিতসিংহের রাজতিলক অউরংজেবের হাতেই করাবেন বলে স্থির করলেন দুর্গাদাস। তাই আপাতত দিল্লি ফিরে যেতে দেওয়া হল না তাঁকে।

সতেরো

পরদিন দুর্গাদাস করণসিংহ, গম্ভীরসিংহ, আর অল্প ক’জন অশ্বারোহী নিয়ে আবুর ঘন পাহাড়ে অবস্থিত ডুন্ডওয়া গ্রামে হাজির হলেন গিয়ে। জয়দেব ব্রাহ্মণের বাড়ির সামনে ভিল ছেলেদের সঙ্গে মহানন্দে খেলতে থাকা কুমার অজিতসিংহকে দেখা গেল। যদিও অজিত এখনও আট বছরের, তবু রাজচিহ্ন দেখে দুর্গাদাস চিনে ফেললেন তাকে। আনন্দাশ্রুতে চোখ ভরে এল তাঁর। অজিতকে কোলে তুলে নিলেন তিনি।

এমনি সময় আনন্দদাস খেঁচিও উপস্থিত হলেন এসে। পরস্পর স্নেহালিঙ্গন সাঙ্গ হল। দুর্গাদাস গত আট বছরের সমস্ত সুখ-দুঃখের কথা খুলে বললেন আনন্দদাসকে। অজমের জয় ও কুমার অজিতসিংহের রাজসিংহাসন আরোহণের সংবাদে পরম আনন্দিত সকলে। বাতাসের মতো মুহূর্তে গোটা গ্রামে ছড়িয়ে পড়ল এই শুভসংবাদ।

গ্রামবাসী আর রাজকুমারের খেলাসঙ্গীরা জড়ো হয়ে গেল সবাই। রাজকুমারের সুকুমার মুখমণ্ডলে অপূর্ব এক রাজকীয় দীপ্তি। ছেলেপিলেরা বলাবলি করতে লাগল— ‘ভাই, না জেনে কত অপরাধ হয়তো করে ফেলেছি আমরা। খেলতে খেলতে কতবার যে রাজকুমারকে মেরেছি! একদিন যে আমাদের সঙ্গে ধুলোবালি মেখে খেলত, কাল সে গোটা মারওয়াড়ের অধিপতি হয়ে সিংহাসনে বসবে। রাজগৌরবে মত্ত হয়ে সে কি আমাদের মতো গরিব বন্ধুদের দিকে ফিরে তাকাবে আর?’

একদৃষ্টে রাজকুমারের মুখে তাকিয়ে রইল তারা। রাজকুমারও প্রিয় সখাদের পানে স্নেহভরে তাকাচ্ছে আর ভাবছে—কাকা এদের সবাইকে সঙ্গে নিয়ে যাবেন তো? বন্ধুদের থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে এইবার আনন্দদাস খেঁচির দিকে তাকাল সে। খেঁচি মহাশয় রাজকুমারের মনের কথা বুঝে ফেলে ছেলেদের বললেন, “যাও, যার যার বাপেদের নিয়ে রাজকুমারের সঙ্গে চলো। তোমাদের কাছে এর চেয়ে বড়ো আনন্দ আর কী হতে পারে—যে তোমাদের সঙ্গে খেলত অ্যাদ্দিন, আজ সে মারওয়াড়ের রাজা!”

অল্প সময়ের মধ্যেই গোটা গ্রামের লোকজন প্রস্তুত হয়ে রাজকুমারের রাজ্যাভিষেক চাক্ষুষ করতে রওনা দিল সঙ্গে। যার যেমন সামর্থ্য, তেমন উপহারও নিল সঙ্গে।

বন্ধুরা সঙ্গে যাচ্ছে দেখে রাজকুমারও খুব খুশি। বছর আষ্টেক বয়স—খেলাধুলারই তো সময়। রাজ্য কী জিনিস, রাজ্যাভিষেকই-বা কী—কী আর বোঝে সে; সব তো ছেলেখেলাই এখনও তার কাছে। আজ পর্যন্ত কখনও পিতার নাম উচ্চারিত হয়নি তার সামনে। দুনিয়ায় সে আপন বলে জানে যাঁদের—কেবল আনন্দদাস খেঁচি, জয়দেব আর তাঁর স্ত্রী—যাঁদের কাকা-কাকি বলে ডাকে সে। শেয়ালের পালে বেড়ে ওঠা সিংহশাবক যতক্ষণ না সিংহের দেখা না পায়, সিংহ ভাবে না নিজেকে—এ যাবৎ এই পরিস্থিতিই তো ছিল রাজকুমার অজিতের। ভিলদের মধ্যে মানুষ, রাজ্যশাসনের সে কী জানে?

যাত্রাশেষে পরদিন দুপুর গড়াতে অজমেরে পৌঁছল সবাই। বিপুল জনসমাগম সেখানে। একদিকে মুঘল সেনা, অন্যদিকে রাজপুত বাহিনী সুন্দর পোশাকে সজ্জিত হয়ে রাজকুমারকে স্বাগত জানাতে দাঁড়িয়ে। স্থানে স্থানে বাদ্যবাজনা, নাচ-গান। এমন এক গৃহ নেই, যার দরোজায় পুষ্পসজ্জা নেই, মঙ্গলকলশ স্থাপন করা হয়নি। ঘরে ঘরে আনন্দ উচ্ছ্বাস, আকাশে বাতাসে জয়ধ্বনি।

মারওয়াড়ের সমস্ত ছোটো-বড়ো রাজ্যের সর্দারেরা উপস্থিত আছেন। রাজকুমারকে অত্যন্ত ধুমধামের সঙ্গে স্বাগত জানানো হল এবং শুভ লগ্নে সোনার সিংহাসনে বসিয়ে অউরংজেবের হাতেই রাজতিলক পরানো হল তাঁকে। সর্দারেরা মহারাজের চরণে মাথা ছুঁইয়ে সাধ্যানুসারে নজরানা দিলেন।

ঠিক সেই সময় বৃদ্ধ নাথুকে সঙ্গে করে স্বামী মহেন্দ্রনাথ উপস্থিত হলেন এসে। জনতা শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করল। নিজ প্রভুর হাতে মহারাজ যশবন্তসিংহের দেওয়া লোহার সিন্দুকটি তুলে দিল নাথু। দুর্গাদাস ভরা সভায় তা মহারাজ অজিতসিংহের হাতে অর্পণ করলেন। পাশাপাশি যে পরিস্থিতিতে ও যে নির্দেশ-সহ মহারাজ যশবন্তসিংহ সিন্দুকটি শোনিংজি চম্পাওয়তকে সঁপেছিলেন, সেও ব্যক্ত করলেন।

অজিতসিংহ গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে সিন্দুকটি দুর্গাদাসকে ফিরিয়ে দিয়ে জনতাকে খুলে দেখানোর আদেশ দিলেন। রাজসভায় সিন্দুক খোলা হল। আবিষ্কৃত হল মহারাজ যশবন্তসিংহের রাজমুকুট। রাজকুমারের মাথায় স্থান পেল তা। এরপর জনতার সামনে দাঁড়িয়ে অজিতসিংহের জন্ম থেকে রাজতিলক পর্যন্ত সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করলেন দুর্গাদাস। দর্শনার্থীদের মাঝে সেই মুসলমান সাপুড়েটিও উপস্থিত ছিল, খেঁচি মহাশয়ের বুদ্ধিতে শিশু অজিতকে লুকিয়ে বার করে এনেছিল যে। তার সাক্ষ্যে জনতার সব সন্দেহ দূর হয়ে গেল। প্রজারা কোটি কোটি ধন্যবাদ দিল বীর দুর্গাদাসকে। মহারাজ যশবন্তসিংহের বংশ ও রাজ্যের প্রকৃত রক্ষক একমাত্র তিনিই।

রাজপুতদের এই আনন্দোৎসব অউরংজেবের ভালো লাগল না; মাত্র তিনদিন অজমেরে থেকে মহারাজ অজিতসিংহের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে দিল্লি চলে গেলেন তিনি। ওদিকে যোধপুরের প্রজারা মহারাজের দর্শনের ইচ্ছায় অত্যন্ত ব্যাকুল হয়েছে। কিছুদিন পথ চেয়ে রইল তারা; কিন্তু তখনও মহারাজ যোধপুরে গেলেন না যখন, বৃদ্ধ ও শিশু—চলার শক্তি নেই যাদের, তারা বাদে বাকিরা সবাই রওনা হল অজমেরের পথে। কয়েকদিনের মধ্যেই গানবাজনা সহযোগে উল্লসিত প্রজা অজমেরে উপস্থিত হল এসে।

নব অভিষিক্ত রাজার প্রতি প্রজাদের এমন ভালোবাসা দেখে দরবার বসালেন দুর্গাদাস। রাজদর্শন শেষে অজিতসিংহকে যোধপুরের শূন্য সিংহাসন অলংকৃত করার আর্জি জানাল প্রজারা। মহারাজও পূজ্য পিতার সিংহাসনে বসতে সম্মতি জানালেন।

প্রায় তিন মাস অজমেরে অবস্থান শেষে যোধপুরে আগমন ঘটল মহারাজের।

আজ যে আনন্দ প্রজাদের, সে সম্ভবত মহারাজ যশবন্তসিংহের শাসনকালেও হয়নি কখনও। ঘরে ঘরে যজ্ঞ, দ্বারে দ্বারে মঙ্গলকলশ আর সুগন্ধি পুষ্পসজ্জা। শীতল বাতাস বইছে। রাজসভায় ঝলমলে পোশাকে সজ্জিত সর্দারেরা আর যোগ্যতা অনুযায়ী প্রজারা বসে। সম্মুখে সোনার সিংহাসনে মহারাজ অজিতসিংহ আসীন।

নিকটেই দুর্গাদাস দাঁড়িয়ে মহারাজের আদেশে যুদ্ধে সাহায্যকারী রাজপুতদের জায়গির বৃদ্ধি ও পাট্টা বণ্টনে ব্যস্ত। বৃদ্ধ মহাসিংহকে কোষাধ্যক্ষের পদ দেওয়া হল। গুলাবসিংহ ও গম্ভীরসিংহকে মহারাজের দেহরক্ষী নিযুক্ত করা হল। করণসিংহকে দেওয়া হল সেনানায়কের পদ। আর সভাসদদের সম্মতিক্রমে দুর্গাদাস স্বয়ং রাজ্যের ভার গ্রহণ করলেন।

সবশেষে মহাসিংহের কন্যা লালবার পালা এল। দুর্গাদাস সর্বোত্তম এক অমূল্য পুরস্কার দিলেন তাকে। অর্থাৎ, রাণা রাজসিংহের জ্যেষ্ঠ পুত্র জয়সিংহের সঙ্গে তার বিবাহ স্থির করে রাজ্যের পক্ষ থেকেই ধুমধাম করে বিবাহ সম্পন্ন করালেন।

সমস্ত প্রয়োজনীয় কাজ শেষ হওয়ার পর একদিন শাহজাদা অকবরের কথা মনে পড়ল দুর্গাদাসের। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, দক্ষিণে অউরংজেবকে সাহায্যার্থে মুঘল সেনা যাচ্ছিল যখন, তখন শাহজাদা শম্ভাজিকে তাদের আটকাতে অনুরোধ করলে শম্ভাজি তা উপেক্ষা করেন। এতে শাহজাদা রুষ্ট হয়ে মক্কায় চলে যান এবং কিছুদিন পর সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন। এই সংবাদে দুর্গাদাস গভীর দুঃখ পেলেন বটে, আবার ঈশ্বরের তাই ইচ্ছা ভেবে মন শান্ত করলেন।

খুদাবখশ ও মুসলমান সাপুড়েকে মহারাজ সসম্মানে রাজসভায় স্থান দিলেন। রাজকুমারের খেলার সঙ্গী সেই ভিল বালকদের শিক্ষার ব্যবস্থা যোধপুরেই করা হল এবং তাদের পিতাদের বড়োসড়ো জায়গির প্রদান করা হল। দুর্গাদাস এমন সুনিপুণ নীতিতে রাজ্য পরিচালনা করছেন যে কোথাও দুঃখকষ্ট নেই কোনও। চুরি-ডাকাতি নেই নামমাত্রও। প্রজারা নিশ্চিন্ত সুখে বাস করে। মুক্তহস্তে ধন ব্যয়ের পরও কোষাগারে অভাব নেই, বৃদ্ধিই পাচ্ছে ক্রমশ। ভাঙা-ধসা দুর্গগুলোর যথাযথ সংস্কার করা হল। যেখানে প্রয়োজন, নতুন দুর্গ তৈরি হল। পাশাপাশি উজাড় হয়ে যাওয়া কল্যাণগড় পুনর্বাসনের আদেশ দিলেন মহারাজ।

আঠারো

মহারাজ অজিতসিংহের বয়স এখন আঠারো। ধীরে ধীরে রাজকার্য বুঝে নিতে শুরু করেছেন তিনি। দেখতে দেখতে দুর্গাদাসের সহায়তা ছাড়াই রাজ্যভার বহনের যোগ্য হয়ে উঠলেন। সে দেখে ১৭০০ সালে অজিতসিংহের হাতে শাসনভার তুলে দিলেন দুর্গাদাস, প্রয়োজনে পরামর্শ দেন কেবল।

১৭০৭-এ অউরংজেব দাক্ষিণাত্যে মৃত্যুবরণ করলে তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র মুয়জ্জম দিল্লির সিংহাসনে বসেন এবং সম্রাট অকবরের ন্যায় প্রজাপালন শুরু করেন। হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে কোনও ভেদাভেদ তিনি রাখেননি। দেখেশুনে নিশ্চিন্ত হয়ে রাজ্যভার সম্পূর্ণরূপে অজিতসিংহের হাতে ছেড়ে দিলেন দুর্গাদাস।

এদিকে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা পেয়ে অজিতসিংহের স্বভাব ধীরে ধীরে বদলে যেতে লাগল এইবারে। উচ্ছৃঙ্খল হয়ে পড়লেন তিনি। স্বার্থপর মোসাহেবদের প্ররোচনায় প্রজাদের অন্যায় কঠোর শাস্তি দেন। ক্ষতিবৃদ্ধির বিচারবোধ ধীরে ধীরে লোপ পেতে লাগল। যে যেমন উপদেশ দিচ্ছে, তাই মানেন। নিজে কিছু দেখেন না, কানে শোনেন কেবল। প্রজাদের মুখেও ধীরে ধীরে নিন্দা রটতে লাগল।

দুর্গাদাস বহুবার নীতি-বাক্য দিয়ে বোঝালেন, কিন্তু পদ্মপাতায় জলের ফোঁটার মতো সে উপদেশ ক্ষণিকের মধ্যেই স্বার্থপর বান্ধবদের তৎপরতায় উধাও হয়ে যায়। এমনকি তারা মহারাজের মনে দুর্গাদাসের বিরুদ্ধে নানা বিদ্বেষও জাগিয়ে তুলল। অন্যায় ক্রমেই বৃদ্ধি পেতে লাগল। বাধ্য হয়ে দুর্গাদাস নিজ পরিবারকে উদয়পুর পাঠিয়ে দিয়ে একা যোধপুরে এই অন্যায়ের পরিণামের অপেক্ষায় রইলেন।

যে মানুষ স্বহস্তে রোপণ করা বিষবৃক্ষও শুকিয়ে যেতে সহ্য পারে না, এ তো পূর্বতন মহারাজ যশবন্তসিংহের একমাত্র সন্তান—তার সর্বনাশ দুর্গাদাস সহ্য করেন কী উপায়ে? সমস্ত দেখেশুনে তাই যোধপুর ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি।

একদিন বিদায় নিতে রাজসভায় যাওয়ার পথে এক বৃদ্ধ সাবধান করল, “আজ দরবারে না গেলেই মঙ্গল, ঠাকুর। শুনেছি, গোপনে আপনাকে হত্যার আদেশ দিয়েছেন মহারাজ।”  

দুর্গাদাস হাসলেন। বললেন, “বৃদ্ধ হয়েছি ভাই, মরতে তো হবেই। তাছাড়া ক্ষত্রিয় হয়ে মৃত্যুকে ভয় পাব কেন? রাজপুতের কলঙ্ক হব শেষে?”

এই বলে নির্ভীক সিংহের মতো রাজসভায় উপস্থিত হয়ে তীর্থযাত্রার অনুমতি চাইলেন দুর্গাদাস। মহারাজও ওপর ওপর বললেন, “আপনি থাকবেন না কাকা, দুঃখ তো হবেই; তবে আপনার বয়স হয়েছে, তীর্থযাত্রা বলেই অনুমতি দিচ্ছি। শীঘ্র ফিরে আসবেন।”  

দুর্গাদাস প্রণাম সেরে দরোজা পর্যন্ত গিয়ে ফিরে এসে জানালেন, “মহারাজ, আপনার পিতা এক গোপন ভাণ্ডারের চাবি দিয়েছিলেন আমাকে। সে জিনিস আপনাকে না দিয়ে গেলে মন শান্ত হবে না আমার। বয়স হয়েছে, কে জানে কোথায় কখন দিন ফুরিয়ে যায়। সে ঘটলে তো ওই ধনভাণ্ডারের হদিস পাবে না কেউ।”  

লোভে পড়ে অজিতসিংহ হত্যার আদেশ স্থগিত করলেন তক্ষুনি। এইভাবে বিচক্ষণ দুর্গাদাস প্রাণরক্ষা করলেন নিজের। তারপর নিজ মহলে ফিরে, অস্ত্র ধারণ করে, ঘোড়ায় চড়ে বলে পাঠালেন—”দুর্গাদাস কুকুরের মতো মরার জন্যে জন্মায়নি। কারও সাহস থাকলে রণক্ষেত্রে আসুক।”  

এ-কথা শুনে অজিতসিংহের অন্তরাত্মা কেঁপে উঠল। বললেন, “অউরংজেবের মতো সম্রাটের মুঠো থেকে নিজের দেশ ছিনিয়ে এনেছেন যিনি, তাঁর মোকাবিলা করা চলে না।”  

বীর দুর্গাদাস তিক্ত মনে উদয়পুরে চলে গেলেন শেষে। সেখানে রাণা জয়সিংহ তাঁকে রাজপরিবারের সদস্যের মতো সম্মান ও জায়গির দান করলেন। কিছুদিন রাজদরবারে কাটিয়ে রাণার অনুমতি নিয়ে উজ্জয়িনীতে একান্তবাসে মহাকালেশ্বরের উপাসনায় রত হলেন দুর্গাদাস।

১৭১৮-তে বীর দুর্গাদাসের মৃত্যু হয়। রাজা যশবন্তসিংহের সন্তানের প্রাণ রক্ষা করে মারওয়াড়ের সিংহাসনে বসিয়েছিলেন যিনি, আজ তাঁর দেহ শিপ্রা নদীর তীরে শুষ্ক ঝাউয়ের নিভৃত চিতায় ভস্মীভূত হল।

হে বিধাতা! তোমার লীলা বড়ো আশ্চর্য।

জয়ঢাকের সমস্ত গল্প ও উপন্যাস

Leave a Reply