ঋতা বসুর আরো গল্প: শিকার ও শিকারী, মিষ্টিবুড়ির কাণ্ড, ঘুমপাড়ানি মাসিপিসি, মৌটুসীর বাসা, বিজু যা দেখে, আলো ছায়ার খেলা , সুশোভন বাগচির এক্সপেরিমেন্ট, ডাইনীর প্রতিশোধ

বৃষ্টির কতরকম শব্দ। টিনের চালে ঠং ঠং, গাছের পাতায় টুপটাপ, ভেড়ির জলে কুলকুল। এইসব শুনতে শুনতে মনের আনন্দে সোনার গ্যাঙর গ্যাঙর গ্যাং করে গলা ছেড়ে গান গাইতে ইচ্ছে করল। পাড়ার অন্য সবাই কচুপাতার ছাতার তলায় বসে গান গাইছিল। কিন্তু তার খুব ইচ্ছে করছিল এই ছাতাটা থেকে বেরিয়ে ভেড়ির গায়ে যে সরু নালাটা আছে, সেটা ধরে দূরের আলোজ্বলা রাস্তাটার কাছে যেতে। কতরকম মানুষ, গাড়ি-বাড়ি। ওদিকটায় যাবার জন্য তার মনটা নাচানাচি করলে কী হবে, যতবারই যাবার চেষ্টা করেছে, মা থপ থপ করে লাফিয়ে সামনে এসে কড়া গলায় ‘না’ বলে দিয়েছে। আজ কিন্তু একটা অদ্ভুত কাণ্ড ঘটল। কচুপাতার ছাতার পাশে দুই ঠ্যাঙে দাঁড়ানো লোহার মস্ত খাঁচাটার গায়ে আপাতত গাড়ির বিরাট যে ছবিটা লাগানো আছে, সেটা ঝড়ের ধাক্কায় ঝপ করে খুলে জলের মধ্যে পড়ল। সেই ধাক্কায় কচুপাতার ছাতাটা ভেঙে চৌচির। কে যে কোথায় ছিটকে পড়ল তার ঠিক নেই। সোনাও এক ধাক্কায় একেবারে সরু নালাটার মধ্যে। আজ বৃষ্টির জন্য সেই নালায় নদীর মতো স্রোত। সেখানে নাকানি-চোবানি খেতে খেতে সরু-মোটা কতরকমের নালা বেয়ে ভেসে যেতে লাগল। কতরকমের জল—ঘোলা, কালো, বদ গন্ধ, ভালো গন্ধ। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আওয়াজ। দূর থেকে জায়গাটা যতই ইন্টারেস্টিং মনে হোক না কেন, কাছে এসে তার পিলে চমকে গিয়েছে।
বেশ কয়েকদিন পর একটা জায়গায় এসে চেনা ডাক শুনতে পেল। যে-নালাটা দিয়ে সে ভেসে আসছিল, সেটা শেষ হয়েছে একটা পোড়ো বাড়ির বাগানে। জলের পরেই ভেজা মাটি। ভেলভেটের মতো নরম। থপ থপ করে সাতটা লাফ দিয়ে পায়ের আড় ভাঙল সোনা। বুকভরে শ্বাস টানল—আহ্, ভেজা ঘাস, গাছপালার সোঁদা গন্ধে মন জুড়িয়ে গেল। চারদিকে ঝুপসি গাছপালায় অন্ধকার হয়ে আছে। তার মধ্যে সরু-মোটা গলায় এদিক ওদিক থেকে গ্যাঙর গ্যাঙর গান সোনার কানে যেন মধু ঢেলে দিল। কোন দিকে যাবে ভাবতে না ভাবতেই থপ করে লাফিয়ে সামনে এসে হাজির হল একজন। সোনাকে আগাপাশতলা দেখে বলল, ”তুমি কে বটে হে? কোথা থেকে হুট করে চলে এলে? তারপর আমাদের জাতীয় সংগীতও গাইছ না। কেমন যেন ভ্যাবলাকান্ত হয়ে এদিক ওদিক দেখছ। গাঁ থেকে এলে নাকি?”
“তোমাদের তুলনায় আমাদের জায়গাটা তাই বটে।”
“আচ্ছা, সে-সব পরে শুনব। এখনই ভোজ শুরু হবে। তার আগে গান গাও।”
“আগে শুনি, তারপর তো গাইব।”
“খুব সোজা। একটা হাত কানে দাও, আর একটা হাত সামনের দিকে মেলে দাও। এই যে এভাবে।”
ওদিক থেকে কে যেন মোটা গলায় ডাকল—”কোলা, আর দেরি নয়, শুরু করো।”
অমনি চারদিক থেকে শুরু হয়ে গেল—ওনামাসি ঢং গুরুজি চিতং। মেরা সারং মে বাজিছে ক্যায়সা ভালা রঙ। মেরা সারংমে। এই কথাগুলোই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কখনও ‘ক্যায়সা নয়া রঙ’ কখনও ‘ক্যায়সা অ্যায়সা রঙ’ এসব বলে খুব ভাব দিয়ে তারা গাইতে লাগল।
সোনা কোলার কান থেকে হাতটা সরিয়ে ফিসফিস করে বলল, “গানটা তো ভালো, কিন্তু কথাগুলো যেন কেমন কেমন।”
“এদিকে হিন্দিটাই বেশি চলে তো, তাই ওটার উপরেই ঝোঁক বেশি।”
সোনা দেখতে দেখতে কোলাদের দলে দিব্যি মিশে গেল। আগে যেখানে থাকত সেখানে বেশিরভাগ লোকগুলোর চেহারা ফর্সা। চ্যাপ্টা নাক, খুদে চোখ। একদিন একটা বাচ্চা গাড়ি থেকে মুখ বার করে বলেছিল—চিনেম্যান চ্যাংচুং। তার মা তাকে খুব বকুনি দিয়ে মাথাটা গাড়ির মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছিল। তাইতেই সোনা বুঝেছিল, তাদের মধ্যে যেমন সোনা, কোলা এসব ভাগ আছে, মানুষের মধ্যেও আছে।
ভাগাভাগি নিয়ে সোনার বলার কিছু নেই। কিন্তু বিপদ হল ‘ফ্রগ লেগ’ চিনেম্যানদের প্রিয় খাদ্য বলে মার কড়া শাসনে নড়াচড়া প্রায় বন্ধ ছিল সোনার। জলের শ্যাওলা, পোকা আর মাছের চারা খেয়ে এসেছে এতদিন। চারদিকে ভেড়ির জল আর জল। চিনেরা চামড়া শুকোতে দিত, সেই পচা চামড়ার গন্ধ শুঁকে দিন কাটত।
এখানে রোজই মহাভোজ। পোকামাকড়ের সঙ্গে টিকটিকি, মাকড়শা—কতরকমের সুস্বাদু খাবার। লম্বা জিভ দিয়ে শিকার ধরতে ওস্তাদ তার প্রাণের বন্ধু কোলা। সে যেভাবে উড়ন্ত প্রজাপতি সুড়ুত করে জিভ দিয়ে শিকার টেনে নেয়—দেখে তাজ্জব হতে হয়। এখানের সুবিধে হল, জলও আছে আবার ভিজে মাটির মজাও আছে। দু-চারটে মোটা মোটা লোক ঘুরে বেড়ায়। তাদের কাজ হল এই পোড়ো জমি পাহারা দেওয়া। তবে তারা ভুঁড়ির জন্য নিজেদের পা-ই দেখতে পায় না, মাটিতে ঘুরে বেড়ানো অন্য জিনিস কী করে দেখবে? সেইজন্য কোলারা সংখ্যায় বেড়ে বেড়ে এ-তল্লাটের মানুষের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছে।
পোড়ো জমিটা যেখানে শেষ হয়েছে, ভাঙা সীমানা পাঁচিলের ও-পারে একটা বাচ্চাদের স্কুল আছে। সোনা আর কোলা পাঁচিলের ফোকরে বসে বিরাট চোখ দুটো ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বাচ্চাদের কাণ্ডকারখানা দেখে। ওখান থেকেই ‘এলেম নতুন দেশে’ বলে একটা গান শিখেছে যেটা ওদের ভারি পছন্দ। দুই বন্ধু ওই গানটা গায় আর পাইপের অলি-গলি পেরিয়ে কত বাড়ির রান্নাঘর, বাথরুম দিয়ে ভেতরে ঢুকে উঁকি দিয়ে পালিয়ে আসে।
একদিন ওরা ঠিক করল স্কুলটার ভেতরে যাবে। কোন পাইপ কোথায় যায় সে-সব এখন তাদের নখদর্পণে। বাথরুমের পাইপ দিয়ে ভেতরে ঢুকে কমোডের গামলায় এক চক্কর সাঁতার কেটে জোরে দম নিয়ে সহজেই বাইরে লাফিয়ে পড়া যায়। এর মধ্যে দু-দিন স্কুল বন্ধ হবার পর ঘুরেও এসেছে। সোনার খুব ইচ্ছে স্কুলের বাচ্চাগুলোর সঙ্গে ভাব করার। দূর থেকে দেখেছে ওরা ফ্রগ রেস দিচ্ছে। ওদের লাফানো দেখে সোনা হেসে কুটিপাটি।
কোলাকে সে বলছিল, “ওদের দিদিমণিটার বদলে আমাদের বললে কেমন চমৎকার শিখিয়ে দিতাম বল।”
কমোড থেকে বাথরুমের মাটিতে লাফ দিয়ে পড়ে দরজার কোণে দাঁড়িয়ে দুই বন্ধু বড়ো করে শ্বাস টেনে জিরিয়ে নিল। তারপর ছোটো ছোটো লাফে ক্লাসরুমে ঢুকে তাজ্জব হয়ে গেল। একটা ছড়ার বই খুলে ব্যাঙের ছবি দেখিয়ে দিদিমণি গাইছে—তাঁতির বাড়ি ব্যাঙের বাসা কোলা ব্যাঙের ছা। খায়দায় গান গায় তাইরে নাইরে না।
“তারপর একদিন সেই সুবুদ্ধি তাঁতির কুবুদ্ধি ঘনাল। সে ওই নাচিয়ে গাইয়ে গুণধর ব্যাঙের ছানাকে মেরে ফেলল। আর অমনি হাজার হাজার ব্যাঙ লাঠি সোঁটা নিয়ে তাঁতির বাড়ি আক্রমণ করল।”
এই শুনে সোনা আর কোলার রসগোল্লার মতো চোখ রাজভোগ সাইজের হয়ে উঠল। তারপর তারা দেখল, তাদেরই একটা ছবি আঁকা বিরাট ক্যালেন্ডার হাতে হাতে ঝুলিয়ে একটা দিদিমণি পাশের ঘরে ঢুকল। ছবিটা একেবারেই ঠিক হয়নি। সামনের পা দুটো বেখাপ্পা বড়ো। গায়ের রঙ, নকশা কোনোটাই ঠিক হয়নি। তাদের সামনে বসিয়ে ছবি আঁকলে তো এই ভুল হয় না। এইসব ভাবতে ভাবতে গুটিগুটি তারাও পাশের ঘরে গিয়ে ঢুকল। সোনা বিজ্ঞের মতো বলল, “আজ বোধহয় ফ্রগ ডে। সবার জন্যই আজকাল একটা ডে থাকে। সেদিন তাদের নিয়েই আলোচনা হয়। সবাই উইশ করে। নানারকম উপহার দেয়।”
কোলা উত্তেজিত হয়ে বলল, “ছবির বদলে জ্যান্ত এসে গিয়েছে দেখে ওরা নিশ্চয়ই খুব খুশি হবে। আমাদের খাওয়াবে-টাওয়াবে।”
“হতে পারে। এখন মন দিয়ে শোন কী বলছে।”
এই ঘরের বাচ্চাগুলো একটু বড়ো। দিদিমণি বলছে, “কূপমণ্ডূক মানে কী? কুয়োর ব্যাঙ। ব্যাঙ কুয়ো ছেড়ে নড়ে না তাই তাদের নামে এই প্রবাদ বাক্যটা চালু হয়েছে।”
সোনার ইচ্ছে হল প্রতিবাদ জানায়। সোনার জীবনচরিত শুনলে ওই প্রবাদ বাক্যটা মিথ্যে হয়ে যাবে। তাছাড়া সোনা-কোলারা কোনোদিন কুয়ো চোখেই দেখেনি দিদিমণি আরও কত কী বলছে, “ব্যাঙ যদিও খুব উপকারী প্রাণী, তবু কত লোক না জেনে ব্যাঙ মারে। এতে পরিবেশ নষ্ট হয়। ব্যাঙ প্রচুর অনিষ্টকারী পোকামাকড় খেয়ে আমাদের পরিবেশের স্বাস্থ্য বজায় রাখে। সেই জন্য আমাদের উচিত… ও বাবা গো, এগুলো কী?”
দিদিমণি হঠাৎ হাউমাউ করে চেঁচিয়ে তড়াক করে লাফিয়ে বসার চেয়ারটার ওপরেই দাঁড়িয়ে পড়ল।—”বাহাদুর, সরস্বতী—শিগগিরি এদিকে এসো। এগুলো ক্লাসরুমে ঢুকল কী করে? মেরে তাড়াও শিগগিরই!”
দিদিমণির চিৎকারে বাচ্চাগুলো ঘাবড়ে গিয়ে হুটোপাটি করে ঘরের একদিকে গিয়ে জড়ো হল। সবাই মিলে সোনা আর কোলার দিকে ঘেন্না ঘেন্না চোখে তাকাতে লাগল। সোনারা বুঝতেই পারল না তাদের কী দোষ। এইমাত্রই তো ওই একই দিদিমণি অত ভালো ভালো কথা বলছিল। সে-ই যদি সে-সব ভুলে গিয়ে এমন করে তো বাচ্চাদের কী দোষ?
চিৎকার-হট্টগোলে প্রথমে সোনা আর কোলাও ঘাবড়ে গিয়ে কী করবে বুঝতে পারছিল না। পরের উপকার করতে এসে তো আচ্ছা বিপদে পড়া গেল! বিপদটা যে কী সাংঘাতিক ভয়ংকর সেটা বাহাদুর আর সরস্বতীকে লাঠি নিয়ে এগোতে দেখে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল। সোনা আর কোলা দুজনে বলের মতো চোখ দুটোকে একবার ক্লকওয়াইজ আর একবার অ্যান্টি-ক্লকওয়াইজ ঘুরিয়েই ছুট লাগাল যেদিক থেকে এসেছিল সেইদিকে।
পাইপের মধ্যে দিয়ে গড়িয়ে বাগানে ঢুকে একটু দম নিয়ে কোলা বলল, “কীরকম ভিতুর মতো পালিয়ে এলাম আমরা?”
“কী করতিস তাছাড়া? দুটো ভীম ভবানী লাঠি পিঠে পড়লে তো অক্কা পেয়ে যেতিস এতক্ষণে।”
“আমাদের পূর্বপুরুষ কীরকম বীর ছিল আজই সেটা জানতে পারলাম। সেই বংশের ছেলে হয়ে যদি এর প্রতিশোধ না নিতে পারি তো আমার নাম কোলা নয়।”
কোলার কথায় সোনাও গরম হয়ে ওঠে। সত্যিই তো, তাদের পূর্বপুরুষ জব্দ করেছিল দুষ্টা তাঁতির ছেলেকে। এককাট্টা হলে তারাই-বা পারবে না কেন?
যেমন ভাবা তেমনি কাজ। সোনা আর কোলার কথা আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ল। পাইপের ব্যাঙ, বাগানের ব্যাঙ, পুকুরের ব্যাঙ—যে যেখানে আছে সবাই জড়ো হতে লাগল অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে। বিষাক্ত ব্যাঙেরা এল একেবারে সামনের সারিতে থাকবে বলে। জায়ান্ট ব্যাঙেরা তার পরের লাইনে। এখন রোজ কুচকাওয়াজ চলছে। তারপর একদিন সুযোগমতো ওরা প্রতিশোধ নেবে। উপকারী বন্ধুকে যে চিনতে পারে না, সেই আহাম্মক মানুষকে তারা জব্দ করবে এবার।
মাটির ওপরে মানুষরা কিছু টের পাচ্ছে না বলে ভারি নিশ্চিন্তে আছে।
ছবি-জয়ন্ত বিশ্বাস
জয়ঢাকের গল্প ও উপন্যাস
জয়ঢাকপ্রকাশন থেকে প্রকাশিত ঋতা বসুর চারটি বই। ডিসকাউন্টেড দামে বিনা কুরিয়ার চার্জে দেশের সর্বত্র পেতে নীচের ছবিগুলিতে ক্লিক করুন



