বৈজ্ঞানিকের দপ্তর -বিজ্ঞানের গল্প- শিম্পাঞ্জির হাত-সৌম্যকান্তি জানা-বসন্ত২০২২

সৌম্যকান্তি জানা-র আগের লেখা- ক্লোরোফিল চোর, বঁটিঝাঁপের মেলায়, রঙবদল, অবচেতন মনের আয়না, হাওয়া বাবা হাওয়া, অ্যাটমোবাবু কাবু 

biggangolpo

(এক)

জানুয়ারির শীতের রোববারের সকাল। বেলা ন’টার সময় রোদের তেজ বড়োই নরম। বেশ আরামদায়ক। আর তাই পিঠে রোদ মাখিয়ে লেট্টু আর তার পাঁচ স্যাঙাত এসে বসেছে পরেশের দোকানে। এই সময় গরমাগরম বেগুনি আর মুড়ির লোভ সামলানো মুশকিল। সঙ্গে লেট্টুর স্পনসর করা মাথাপিছু একটা করে পিঁয়াজি।

খবরের কাগজওয়ালা সাইকেল না থামিয়ে পরেশের দোকানের খবরের কাগজটা লেট্টুর হাতে ধরিয়ে দিয়ে চলে গেল। লেট্টু বেগুনি-মুড়ির ঠোঙাটা পাশে বেঞ্চের ওপরে রেখে কাগজের ভাঁজ খুলতেই একটা রঙিন কাগজ খসে পড়ল লেট্টুর পায়ের কাছে। মেনাল্ডো বাম হাতে কাগজটা তুলে নিতেই লেট্টু ছোঁ মেরে নিয়ে পড়তে শুরু করল।

খবরের কাগজের মধ্যে এমন কাগজ প্রায়শই থাকে। সাধারণত স্থানীয় বিজ্ঞাপন হয়। অধিকাংশ লোকই ওই কাগজ এক ঝলক দেখে ফেলে দেয়। কিন্তু লেট্টুকে বেশ মনোযোগ দিয়ে কাগজটা পড়তে দেখে মেনাল্ডোরা বেশ অবাকই হল।

“কী এত মনোযোগ দিয়ে পড়ছ গো লেট্টুদা?” মুড়ি চিবোতে চিবোতে টুকুন বলে উঠল।

লেট্টু টুকুনের কথা শুনতে পেয়েছে বলে মনে হল না। একমনে পড়ছে। ওরা লেট্টুর মুখের দিকে তাকিয়ে দেখে তার দুই ভ্রূর মাঝে ভাঁজ পড়েছে।

“কোনও সিরিয়াস ব্যাপার নাকি লেট্টুদা?” পিচকু শরীরটাকে বাঁদিকে অনেকটা বেঁকিয়ে বিজ্ঞাপনের কাগজটার লেখা দেখার চেষ্টা করল।

ততক্ষণে লেট্টুর বাঁদিকে বসা কেতোও উৎসুক মুখ বাড়িয়েছে লেট্টুর হাতে ধরা কাগজটার ওপর।

“ওহ্‌, এই ব্যাপার! ধুস।” এক ঝলক দেখেই চোখ সরিয়ে নেয় কেতো।

“দেব এক থাবড়া জানিস?” কেতোর দিকে ডানহাতটা তুলে চোখ পাকায় লেট্টু। “এসব কিছু বুঝিস তুই?”

লেট্টুর রুদ্রমূর্তি ওদের কারও কাছে অপরিচিত নয়। ওরা জানে এই সময় লেট্টুকে না ঘাঁটানোই মঙ্গল। একটু বাদেই লেট্টু ব্যাপারটা খোলসা করে বলবেই।

পড়া শেষ করে লেট্টু কাগজটা ভাঁজ করে প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে নিল। আর তারপর কিছুই হয়নি এমন মুখ করে বলল, “সান হোটেলটা কোথায় রে? বাস স্ট্যান্ডের পেছনে না?”

“হ্যাঁ, লেট্টুদা। তুমি কি ওখানে যাবে?” বুবাইয়ের চোখে তখন কৌতূহল।

“যাব কি যাব না সে তো পরের ব্যাপার। তবে ব্যাপারটা পড়ে আমার গা রি রি করছে।”

“কেন গো? কী পড়লে ওই কাগজে? এনিথিং রং?” মেনাল্ডোর চোখেও কৌতূহল।

“বেশি ইংরেজি ঝাড়িস না তো!” খিঁচিয়ে উঠল লেট্টু। “এই করে করেই বাঙালি জাতটা ডুবছে। ‘কোনও সমস্যা’ বলতে কি লজ্জা লাগে?”

লেট্টুর খিঁচুনি শুনে সবাই চুপ। কী জানতে চাইল, আর কী উত্তর পেল! ওরা মনে মনে ভাবল, আর কাজ নেই জানতে চেয়ে।

(দুই)

পিচকু বাড়ি ফিরে দেখে গেটের সামনে ওদের খবরের কাগজটা পড়ে আছে। তুলে নিয়ে ভাঁজ খুলতেই চায়ের দোকানে লেট্টুকে পড়তে দেখা একইরকম আরেকটা কাগজ দেখতে পেল। কী এমন লেখা আছে ওই কাগজে যা দেখে লেট্টু এতটাই চিন্তিত?

পুরোটা পড়ে নিয়ে মনে মনে হাসল পিচকু। ব্যাপারটা হল, পরের রোববার সকাল দশটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত সান হোটেলে চেম্বার করবেন বিখ্যাত জ্যোতিষী বিকাশ শাস্ত্রী। নামের পাশে আবার লেখা পি.এইচ.ডি! উনি হস্তবিচারে গোল্ড মেডালিস্ট। কম্পিউটারে হস্তরেখা বিশ্লেষণ করে গ্যারান্টি সহকারে ভাগ্যগণনা করে থাকেন।

পিচকু মনে মনে বলল, ‘জ্যোতিষীরা যে ভণ্ড তা তো ওরা জানেই। যারা বিশ্বাস করে, তারাই যায়। লেট্টু একবার শিরাকোলে এমনই এক জ্যোতিষী শ্রী গম্ভীরানন্দকে খুব জব্দ করেছিল। তার মুখোশ খুলে দিয়েছিল। তবে কি বিকাশ শাস্ত্রীকে নিয়ে এমনই কিছু ভাবছে লেট্টু? তবে যা-ই হোক, এভাবে দিন দিন তাদের শত্রু বাড়ানোয় তার মন সায় দেয় না। ওদের পরিবার কারও সাতে-পাঁচে থাকে না। কোনও ঝুট-ঝামেলায় জড়ায় না। আর তাই ওদের বাবা-মা এসব জানতে পারলে নিশ্চিতভাবে লেট্টুর সঙ্গে আর মিশতে দেবে না।’

এসব ভাবতে ভাবতে ঘরে ঢুকতেই পিচকুর মা বলল, “একটু আগে লেট্টু ফোন করে বলল আজ বিকেল চারটের সময় কী জরুরি দরকার আছে, ওর বাড়িতে ডেকেছে। কী দরকার রে?”

পিচকু বুঝতে পেরেছে দরকারটা কী। নিশ্চিত বিকাশ শাস্ত্রীর ব্যাপারে। কিন্তু তাতে পিচকু কী করবে? কোনও ঝামেলায় যেতে তার মন সায় দেয় না। কিন্তু লেট্টুর ডাক এড়ানোও তার পক্ষে সম্ভব নয়। আর মাকেও সে-সব কথা বলা যাবে না। তাহলে যেতেই দেবে না।

“মনে হয় লেট্টুদা আজ স্পেশাল কোনও রান্না করবে। সকালে তেমনই বলছিল। আমাদের সবাইকে মনে হয় খাওয়াবে।” বেশ গুছিয়ে মিথ্যে বলল পিচকু।

চারটের আগেই পিচকু পৌঁছে গেল লেট্টুদের বাড়ি। লেট্টুর বাড়ি থেকে ওর বাড়িই সবচেয়ে কাছে। সাইকেলে মিনিট পাঁচেক লাগে। মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই হাজির বাকি চার পাণ্ডব—মেনাল্ডো, কেতো, টুকুন আর বুবাই। চায়ের দোকানের পরেশদা ওদের পঞ্চপাণ্ডব উপাধি দিয়েছে। আর লেট্টুকে বলে দ্রোণাচার্য। পঞ্চপাণ্ডবের গুরু।

লেট্টু ঘরে ঢুকেই ভেতর থেকে দরজাটা বন্ধ করে চেয়ারে গিয়ে বসল। আর বিছানার ওপর থেকে পাঁচজোড়া চোখ তখন নিবদ্ধ লেট্টুর চোখে। তাদের লিডার কী বলে শোনার জন্য সবাই উদগ্রীব।

লেট্টু শুরু করল। “সকালে পরেশদার দোকানে যে কাগজটা আমি পড়েছিলাম, সেই বিষয়ে তোদের বলার জন্য আমি ডেকেছি।”

“তা দোকানেই তো বলতে পারতে লেট্টুদা।” কেতো ফুট কাটল।

“ফের কথার মাঝে কথা! কতবার তোদের বলেছি, আমি যখন বলব তখন চুপ করে থাকবি! তোর আরও একটু শিক্ষা বাকি আছে।” একরাশ বিরক্তি ঝরে পড়ল লেট্টুর চোখে-মুখে।

“সরি লেট্টুদা। আর হবে না।” কেতো দু-কান ধরে জিভ কাটল।

“হ্যাঁ, যা বলছিলাম।” লেট্টু আবার শুরু করল। “আগামী রোববার সকাল দশটা থেকে সান হোটেলে এক জ্যোতিষী, বিকাশ শাস্ত্রী না কী যেন নাম, চেম্বার করতে আসবেন। তিনি নাকি হস্তরেখা বিশারদ, পি.এইচ.ডি! আবার কম্পিউটারের সাহায্যে হস্তবিচার করেন। তা কেমন হস্তবিচার করেন তা একবার পরখ করতে চাই।”

“তুমি? হাত দেখাবে জ্যোতিষীকে?” ফুট কাটল টুকুন।

“কেন নয়? সত্য মিথ্যা পরখ করে দেখতে ক্ষতি কী? দেখাই যাক না। আমি কিছুক্ষণ আগে সান হোটেলে গিয়ে জেনে এসেছি, উনি প্রতি মাসের দ্বিতীয় ও চতুর্থ রবিবার আসবেন। আমি পিচকু আর বুবাইয়ের নাম লিখিয়ে এসেছি। ফি এক হাজার টাকা।”

হাঁ হাঁ করে উঠল এতক্ষণ চুপ করে থাকা পিচকু আর বুবাই।

“আমি? একদম না! আমার ওসব দরকার নেই।” পিচকু মাথা দোলাতে লাগল।

“তোর দরকার না থাকলেও আমার আছে।”

“বাবা আমাকে হাত দেখাতে এত টাকা দেবে না। তাছাড়া আমি তো বাবাকে বলিনি। আর বাবা এসবে বিশ্বাসও করে না।” বুবাই কাঁদো কাঁদো হয়ে উঠল।

“ওরে বোকা, এত চাপ নিচ্ছিস কেন? তোদের নাম আমি যখন লিখিয়েছি তখন ফি আমিই দেব। তোরা শুধু আমার সঙ্গে সেদিন যাবি। পিচকুর নাম সাতে আর বুবাইয়ের নাম আছে আটে। বুবাই, তোর ভালো নাম প্রকৃতিশ তো?”

সম্মতিসূচক মাথা ঝাঁকাল বুবাই।

“সকাল এগারোটার সময় সান হোটেলে আমরা মিলিত হব। বাড়ি থেকে ভাত খেয়ে আসবি। দেরি হতে পারে তো। ঠিক আছে?” কথাগুলো বলে লেট্টু থামল।

“আমি, কেতো আর মেনাল্ডো তাহলে কী করব?” টুকুন বলে উঠল।

চেয়ার থেকে উঠতে উঠতে লেটু নির্লিপ্তভাবে বলল, “নাকে তেল দিয়ে শীতের দুপুরে লেপ মুড়ি দিয়ে ঘুমোবে!”

সবাই হো হো করে হেসে উঠল।

(তিন)

সান হোটেলে ঠিক এগারোটায় পৌঁছে গেল লেট্টু। গিয়ে দেখে তার আগেই চলে এসেছে পিচকু। জ্যোতিষীর চেম্বারের দরজা ভেতর থেকে ভেজানো। দরজার বাইরে বেঞ্চে বসে প্রায় পঁচিশ-তিরিশ জন স্ত্রী-পুরুষ। তাদের মধ্যে কয়েকটা বাচ্চাও আছে যাদের বয়স চার-পাঁচ বছর।

“বুবাই তো এখনও আসেনি লেট্টুদা।” লেট্টুকে দেখেই পিচকু উঠে দাঁড়াল।

“ওর একটা সমস্যা হয়েছে। আসবে না।”

সরে গিয়ে জায়গা করে দিতে লেট্টু গিয়ে বসল পিচকুর পাশে। পিচকু লেট্টুর কানের কাছে মুখ এনে বলল, “লেট্টুদা, তুমি কিন্তু ফালতু ফালতু এক হাজার টাকা খরচা করছ। তুমি তো জানো সব জ্যোতিষী ভণ্ড। তাহলে কেন আমার হস্তবিচার করতে নিয়ে এলে?”

“কোনও বাড়তি কথা নয়। আমি যেমন বলব, তেমন তেমন করবি। ঠিক আছে?” দাঁতে দাঁত চেপে গম্ভীর স্বরে বলল লেট্টু।

অগত্যা বাধ্য ছেলের মতো মাথা দোলাল পিচকু। মনে মনে ভাবল, ইস্, বুবাই কী বুদ্ধিমান। ঠিক একটা ফন্দি বার করে লেট্টুদাকে ফাঁকি দিয়েছে। আমার মাথায় কেন যে এমন একটা বুদ্ধি খেলল না!

দরজার পাল্লা ফাঁক করে এক সুন্দরী তরুণী পরিবেশ মিত্র বলে সুরেলা কণ্ঠে ডাক পাড়তেই পিচকু উঠে দাঁড়াল। ওর ভালো নাম পরিবেশ। লেট্টুও উঠে দাঁড়াল। পিচকুর হাত ধরে বলল, “ভেতরে চল, ডাক পড়েছে।”

ঘরের ভেতরটা বেশ মায়াময়। হালকা আলো। খুব মৃদু সুরে গায়ত্রী মন্ত্র বাজছে। সামনে টেবিলের ও-পারে বসে বিকাশ শাস্ত্রীজি। এঁর চেহারা প্রথামাফিক জ্যোতিষীদের মতো নয়। কোট-প্যান্ট-টাই শোভিত রোগাটে চেহারা। ফ্রেঞ্চ কাট দাড়ি। গলায় ঝুলছে গেরুয়া উত্তরীয়। বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ বাদে দু-হাতের প্রতি আঙুলে পাথর বসানো সোনার আংটি। ডানহাতের কবজিতে সোনার ব্রেসলেট। টেবিলে রাখা ল্যাপটপের কী-বোর্ডে কীসব টাইপ করছেন। এক ঝলক লেট্টু ও পিচকুকে দেখে আবার চোখ রাখলেন ল্যাপটপের দিকে। সালোয়ার পরা সুন্দরী তরুণীটি তাদের বসতে বললেন। টেবিলের এ-পারে রাখা দুটি চেয়ারে বসল লেট্টু আর পিচকু।

শাস্ত্রীজি ল্যাপটপ থেকে চোখ সরিয়ে এক ঝলক দুজনকে দেখে বেশ মৃদু কণ্ঠে বললেন, “কার হস্তবিচার করবেন?”

লেট্টু ঝট করে বলে উঠল, “এই যে আমার ভাই, পরিবেশ মিত্রের।”

“বয়স?”

“পনেরো প্লাস।” পিচকু উত্তর দিল।

“জন্ম তারিখ?”

“ফিফথ জুন, দু-হাজার ছয়।”

“তার মানে ওয়ার্ল্ড এনভায়রনমেন্ট ডে-র দিনে? তাই তোমার নাম পরিবেশ? এক্সেলেন্ট।”

শাস্ত্রীজি ভালো করে পিচকুকে একবার দেখে নিয়ে তাঁর প্যাডে খসখস করে কিছু লিখে ফেললেন।

“কোন ক্লাসে পড়ো?”

“নাইন।”

“বাহ্‌, ফাইন।” শাস্ত্রীজি মৃদু হাসলেন। “এবার তোমার ডানহাতখানা দেখাও দেখি। এই টেবিলের ওপরে মেলে ধরো।”

পিচকু ডানহাতের পাতা মেলে ধরল টেবিলে। শাস্ত্রীজি তার হাত দেখে একটা ছবি আঁকলেন। রেখাচিত্র হলেও দেখে বোঝা যায় আঁকায় সিদ্ধহস্ত। এবার ল্যাপটপে কীসব করতে লাগলেন। কী করছেন টেবিলের উলটোদিকে বসে দেখা যাচ্ছে না।

কিছুক্ষণ পর ল্যাপটপের স্ক্রিনে চোখ রেখে জিজ্ঞাসা করলেন, “ছোটবেলায় কোনও অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছিল, তাই না?”

পিচকু কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু লেট্টু তার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলে উঠল, “হ্যাঁ স্যার, ওর যখন এক বছর বয়েস তখন বিছানা থেকে পড়ে গিয়ে মারাত্মক চোট পেয়েছিল।”

পিচকু আবারও কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু পাশ থেকে লেট্টু ওর ঊরুতে চিমটি কেটে দিল। মানে চুপ থাকতে হবে। পিচকু বুঝতে পারল লেট্টুর মাথায় অন্য কিছু ফন্দি ঘুরছে, নইলে কেন তার নামে বানিয়ে অ্যাক্সিডেন্টের কথা বলবে? মোটেই সে ছোটবেলায় পড়ে যায়নি।

“অঙ্কে দুর্বলতা আছে, তাই না?” শাস্ত্রীজি ফের চোখ না তুলেই জিজ্ঞাসা করলেন।

“ঠিক ধরেছেন স্যার। একদম অঙ্ক করতেই চায় না। এইটে দুটো সামেটিভ টেস্টে তো ফেল করে গিয়েছিল।” লেট্টু ঝটিতি উত্তর দিল।

লেট্টু একের পর এক বানানো কথা বলে চলেছে। অঙ্ক তার অন্যতম প্রিয় বিষয়। নম্বরও ভালো পায়। তবে শাস্ত্রীজির সঙ্গে লেট্টুর কথা শুনে বেশ মজা পাচ্ছে পিচকু।

“একটা নীলা ধারণ করতে হবে পরিবেশকে। অঙ্কে আর ফেল করবে না। রেজাল্ট ভালোই হবে। চাকরির সমস্যা একটু হতে পারে, তবে সরকারি চাকরি পেয়ে যাবে নীলার গুণে। আর ওর আঠেরো বছর বয়সে একটা বিরাট ফাঁড়া আছে। ওটা একবার পার করতে পারলেই আর কোনও চিন্তা নেই। তবে সব ফাঁড়া কাটিয়ে দেবে নীলা।” কথাগুলো বলে ল্যাপটপ থেকে চোখ তুলে শাস্ত্রীজি লেট্টুর দিকে তাকালেন।

“সব ফাঁড়া কেটে যাবে বলছেন?” লেট্টু দারুণ অভিনয় করে চলেছে।

“অবশ্যই। তবে বছরে একবার করে চেম্বারে নিয়ে আসবেন। নীলা কলকাতার যে-কোনো নামি জুয়েলারিতে পাবেন, তবে দাম অনেক বেশি নেবে। আমাদের কাছে নিলে অনেক কমে হয়ে যাবে। যদি আজ অ্যাডভান্স করে যান তবে নেক্সট চেম্বারে পেয়ে যাবেন।” কথাগুলো বলে ঘূর্ণায়মান চেয়ারে হেলান দিলেন বিকাশ শাস্ত্রী।

“তাই হবে স্যার। তবে আরও একটা অনুরোধ আছে আপনার কাছে।” লেট্টুর গলায় অনুনয় ঝরে পড়ল।

“বলুন না।”

“আমার এক ভাইপোর বয়স চার বছর। ছোটো থেকেই ভীষণ ভোগে। কত জায়গায় দাদা-বৌদি নিয়ে গেছে। বহু টাকা খরচ করেছে। কিন্তু কিচ্ছু লাভ হয়নি। চেন্নাইতে ওরা থাকে। এই মুহূর্তে আসাও সম্ভব নয়। আর তাই আমার ভাইপোর দু-হাতের তালুর ছাপ তুলে স্ক্যান করে আমাকে পাঠিয়ে দিয়েছে। আমি তার নাম গতকাল লিখিয়ে গিয়েছিলাম। পরিবেশের পরেই তার নাম ছিল। প্রকৃতিশ মিত্র। আপনি যদি ওর একটু হস্তবিচার করে দেন। চিন্তা করবেন না। পুরো ফিজ দিয়ে দেব।” একটানা একগাদা মিথ্যে কথা বলে থামল লেট্টু।

বিকাশ শাস্ত্রী কয়েক সেকেন্ড ভাবলেন। তারপর সহকারী তরুণীটির উদ্দেশে বললেন, “এবার কি প্রকৃতিশ মিত্রের নাম আছে?” তরুণী মাথা ঝাঁকাতেই লেট্টুর দিকে ফিরে বললেন, “তালুর ছাপ স্পষ্ট তো?”

“সে আর বলতে? আপনি দেখুন না।”

“দিন তাহলে।” শাস্ত্রীজি হাত বাড়ালেন।

লেট্টু তার সাইড ব্যাগের ভেতর থেকে দুটো কাগজ বার করে টেবিলের ওপর রাখল। দুটো কাগজে শিশুর দু-হাতের ছাপ। রেখাগুলো একেবারে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।

শাস্ত্রীজি কাগজ দুটো নিয়ে গভীর মনোযোগ দিয়ে দেখে ল্যাপটপে কীসব লিখতে লাগলেন। তারপর লেট্টুর দিকে তাকিয়ে বললেন, “রাহুর মারাত্মক প্রভাব পড়েছে। এজন্যই সুস্থ হচ্ছে না। এ-বিপদ আরও বাড়বে বৈ কমবে না।”

“কোনও উপায় কি নেই স্যার?” লেট্টুর কণ্ঠে আকুতি।

“একটাই উপায়। গোমেদ ধারণ করতে হবে। ছোটো ছেলে তো। গলায় হারের সঙ্গে ধারণ করতে হবে।”

“ফাঁড়া কাটবে স্যার?”

“দেখুন, এ-দুনিয়ায় কোন বিষয়ে একশো পারসেন্ট গ্যারান্টি দেওয়া যায় বলুন তো? তবে আমার ওপর ভরসা রাখতে পারেন। মহামায়া সন্তুষ্ট হলে সব ফাঁড়া কেটে যাবে।”

“আর ভবিষ্যৎ?”

“একবার ফাঁড়া কাটাতে পারলে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। ডাক্তার বা আই.এ.এস বা ওইরকম টপ আধিকারিক হবে। পড়াশুনাতেও ব্রিলিয়ান্ট হবে।”

লেট্টু কথাগুলো শুনতে শুনতে তার সাইড ব্যাগের চেন খুলে কী যেন হাতড়াতে লাগল। মনে হল যেন ফি দেওয়ার টাকা খুঁজছে। কিন্তু অবাক করে দিয়ে লেট্টু একটা মোবাইল বের করল। আর তারপর সেটার স্ক্রিনে আঙুল চালাতে চালাতে জ্যোতিষীর উদ্দেশে বলে উঠল, “একবার এই মোবাইলে বাচ্চাটার মুখ দেখুন স্যার। কী নিষ্পাপ, সরল মুখ। আর হাতের ছাপটা ওর অভিভাবক কীভাবে নিচ্ছে দেখুন।”

লেট্টু ভিডিওটা অন করে বিকাশ শাস্ত্রীর দিকে স্ক্রিনটা ঘুরিয়ে ধরল। মাঝে মাঝে পাখির ডাক ছাড়া তেমন কোনও শব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। তবে ভিডিওটা দেখতে দেখতে শাস্ত্রীজির মুখের অভিব্যক্তি দ্রুত পালটে যেতে লাগল।

“কী দেখাচ্ছেন এসব?”

“কেন স্যার? বাচ্চাটাকে। মানে প্রকৃতিশ মিত্রকে।” লেট্টুর ঠোঁটের কোণে কপট হাসি।

“ইয়ার্কি হচ্ছে আমার সঙ্গে?” গলা সপ্তমে চড়িয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন শাস্ত্রীজি।

“আরে ক্ষেপে যাচ্ছেন কেন? পুরোটা তো দেখুন।” লেট্টুও গলা চড়াল।

কী যে ঘটছে পিচকুর কিছুই মাথায় ঢুকছে না। কী আছে ওই ভিডিওতে? ততক্ষণে তরুণী সহকারীটি শাস্ত্রীজির পাশে এসে ভিডিওতে উঁকি দিতে শুরু করেছেন। তাঁর চোখও তখন বিস্ময়াবিষ্ট।

“গেট আউট! আপনি পেশেন্ট সাজিয়ে এনে আমার সঙ্গে প্রতারণা করছেন। জানেন আমি এজন্য আপনার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে পারি?” শাস্ত্রীজি রাগে কাঁপতে কাঁপতে বললেন।

“সে কী কথা? আমিই তো আপনার ভণ্ডামির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব বলে পুরো ঘটনাটা ক্যামেরাবন্দি করেছি। ড্রাগ অ্যান্ড ম্যাজিক রিমেডি অ্যাক্ট নাইন্টিন ফিফটি ফোর জানেন তো? এই গোপন ভিডিও রেকর্ডিং প্রমাণ। জেল-জরিমানা দুটোই হবে।” এই বলে লেট্টু তার বুক-পকেটে থাকা পেনটার দিকে নির্দেশ করল।

ততক্ষণে শাস্ত্রীজি ঘামতে শুরু করেছেন জানুয়ারির শীতে। এলিয়ে পড়েছেন চেয়ারে।

“প্লিজ, এসব করবেন না। আমার বদনাম হয়ে যাবে।” জ্যোতিষীর গলায় তখন মিনতি।

“তাহলে স্বীকার করছেন তো, হস্তবিচারের নামে এতদিন যা করছেন তা আসলে বুজরুকি? জ্যোতিষচর্চার নামে বোকা-হাবা মানুষগুলোকে দিনের পর দিন ঠকিয়ে চলেছেন?” লেট্টুর কণ্ঠ তখন বজ্রকঠিন। “কথা দিন, আর কখনও এভাবে সাধারণ মানুষকে প্রতারিত করবেন না।”

বিকাশ শাস্ত্রীর মাথা তখন নীচের দিকে ঝুলে পড়েছে। কেবল সম্মতিসূচক ওপর-নীচে একটু নড়ল।

(চার)

চারটে বাজতে না বাজতেই পরেশের দোকানে হাজির হয়ে গেছে পিচকু সহ বাকি চারজন। লেট্টু বলেছে, “বিকেলে পরেশদার চায়ের দোকানে বসে জমিয়ে পিঁয়াজি-মুড়ি খেতে খেতে বিকাশ শাস্ত্রীর চেম্বারে ঘটা কাহিনির রহস্য শোনাব।”

পিচকু খবরটা বাকি বন্ধুদের জানিয়ে দিয়েছে। কিন্তু লেট্টু কোথায়? ওদের যেন আর তর সইছে না।

বলতে বলতেই লেট্টু তার বিখ্যাত সাইকেলটা নিয়ে হাজির। “সবাই চলে এসেছিস আমার আগে? সুজ্জি কোন দিকে উঠেছে রে আজ?”

“পশ্চিমদিকে।” দাঁত বার করে বুবাই।

“ও লেট্টুদা, তাড়াতাড়ি রহস্যটা খোলসা করো।” পিচকুর আকুতি অনেক বেশি।

“বলছি। আগে একটু বসতে দে।”

লেট্টু বসল ওদের মাঝে। তারপর বলতে শুরু করল, “প্রথমে শাস্ত্রীজিকে নিয়ে আমার প্ল্যান একটু অন্যরকম ছিল। কিন্তু বুবাইয়ের নাম লেখানোর পর যখন ও জানাল যে বাড়িতে থাকবে না, বাবা-মায়ের সঙ্গে মামাবাড়ি যাবে অসুস্থ দাদুকে দেখতে তখন আমাকে পরিকল্পনা বদলাতে হল। আর সেটাই হয়ে গেল ফাটাফাটি।”

“কীরকম?” চরম ঔৎসুক্য পিচকুর গলায়।

“কয়েকদিন আগে পেপারে পড়েছিলাম চেন্নাইয়ে আন্না জুলজিক্যাল পার্কে এক শিম্পাঞ্জি দম্পতির একটা বাচ্চা হয়েছে। স্ত্রী শিম্পাঞ্জিটার নাম গৌরী, আর পুরুষটার নাম গোম্বি।”

“গোম্বি, নাকি জোম্বি!” হে হে করে হেসে উঠল কেতো।

“তুই ইয়ার্কি মারবি, নাকি ঘটনাটা শুনবি? ফোট এখান থেকে।” কথার মাঝে কথা বললে লেটু বিরক্ত হয়।

কেতো জিভ কেটে দু-কান ধরল।

লেট্টু আবার শুরু করল, “আমার এক মাসতুতো দাদা চেন্নাইতে স্থায়ী বাসিন্দা। ও ওই চিড়িয়াখানায় কাজ করে। ওর কথা আমার তখন মনে পড়ল। আমি জানি, বাচ্চা শিম্পাঞ্জির হাতের ছাপ আর বাচ্চা মানুষের হাতের ছাপ প্রায় একইরকম। সামান্য যেটুকু পার্থক্য আছে তা বিকাশ শাস্ত্রীদের মতো অজ্ঞদের জানার কথা নয়। আমি ফোন করে ওই দাদাকে বললাম, কোনোভাবে শিম্পাঞ্জির ওই বাচ্চাটার দু-হাতের তালুর ছাপ তুলে পাঠাতে পারবে? খুব দরকার। যদিও কাজটা ঝুঁকির, তাও দাদা বলল চেষ্টা করে দেখবে। আর দাদা সত্যিই ছাপ তুলতে পারল। আর সেই ছাপ স্ক্যান করে পাঠিয়ে দিল আমার কাছে।”

“এইবার পিকচার পুরো পরিষ্কার হল।” পিচকুর মুখে হাসি।

“তাহলে এবার বাকিটা তুই-ই বল।” লেট্টু মাথা দুলিয়ে বলে উঠল।

“হুম। বুবাইয়ের নাম তো লেখানোই ছিল। তুমি ওই নামেই শিম্পাঞ্জির হাতের ছাপ দেখিয়ে দিলে। শাস্ত্রীজি ধরতেই পারল না যে ওটা মানুষের হাতের ছাপ নয়। বলে দিল ওর ফাঁড়া আছে। গোমেদ ধারণ করলে ফাঁড়া কেটে যাবে। আর পড়াশুনায় ব্রিলিয়্যান্ট হবে! ডাক্তার বা আই.এ.এস হবে!” হাসতে লাগল পিচকু।

ওদের কথা শুনে বাকি চার বন্ধু হেসে লুটোপুটি। পরেশও ওদের গপ্পো শুনছিল এতক্ষণ। সেও হাসতে হাসতে ফুট কাটল, “শিম্পাঞ্জির বাচ্চার ডাক্তার হওয়া বন্ধ করে দিলে তো লেট্টু! ভারি অন্যায় কাজ করেছ।”

“কিন্তু শাস্ত্রীজিকে তুমি কী দেখালে যে উনি প্রথমে ক্ষেপে গেলেন?” পিচকু জিজ্ঞাসা করল।

“আমি জানতাম, ওঁকে মুখে যদি শিম্পাঞ্জির হাতের ছাপের কথা বলি বিশ্বাস করবেন না। আর তাই দাদাকে বলেছিলাম, শিম্পাঞ্জির হাতের ছাপ নেওয়ার ঘটনাটা যেন ভিডিও রেকর্ডিং করে রাখে, আর আমাকে পাঠিয়ে দেয়।” লেট্টু পকেট থেকে মোবাইলটা বার করে ভিডিওটা চালু করল।

পাঁচটা মাথা ঝুঁকে পড়ল মোবাইলের ওপর। হাসির ফুলঝুরি ছুটছে তখন। চা তৈরি ছেড়ে পরেশও উঁকি দিল মাথা গলিয়ে।

মেনাল্ডো চিৎকার করে উঠল, “থ্রি চিয়ার্স ফর লেট্টুদা।”

সবাই সমস্বরে চেঁচিয়ে উঠল, “হিপ হিপ হুররে!”

জয়ঢাকের বৈজ্ঞানিকের দপ্তর 

1 thought on “বৈজ্ঞানিকের দপ্তর -বিজ্ঞানের গল্প- শিম্পাঞ্জির হাত-সৌম্যকান্তি জানা-বসন্ত২০২২

  1. বাঃ, বুজরুকি ফাঁস করার চমৎকার কাহিনী।

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s