সত্যজিত দাশগুপ্তর আগের গল্প মোতিবিবির আয়না, ক্লাইম্যাক্স, ফ্ল্যাট নম্বর ২০১, সেই মেয়েটা, সুরের জালে, প্রতীক, এক রাতের গল্প

প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট ধরে অবিশ্রান্তভাবে ঘুরতে ঘুরতে লোকনাথদাদুর গাড়িটা এসে দাঁড়াল ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটির গেটের সামনে। শ্যামবাজার, বাগবাজার থেকে শুরু করে গড়পার, রাজাবাজার, মানিকতলা, শিয়ালদা, কলেজস্ট্রীট, আরমহাস্ট্রীট, কোনকিছুই বাকি রাখেনি ওরা। ওরা মানে, লোকনাথদাদু নিজে তো বটেই, ওনার সাথে কিডো, দ্যুতি, রায়ান আর রিবাইরা। বহুদিন ধরেই ওরা লোকনাথদাদুর মুখে উত্তর কলকাতার গল্প শুনে আসছিল। কিন্তু তেমন ভাবে ওদের কারুরই উত্তর বা মধ্য কলকাতা ঘোরার অভিজ্ঞতা হয়নি। লোকনাথদাদু তো বলেন, উত্তর আর মধ্য কলকাতাতেই নাকি পাওয়া যায় আসল কলকাতার গন্ধ। ঘুরতে ঘুরতে এখানকার পুরোনো বাড়িগুলো দেখতে দেখতে সত্যিই গায়ে কাঁটা দিচ্ছিল কিডোর। রাস্তায় যেতে যেতে মনে হচ্ছিল, এখানেই একসময় বুক চিতিয়ে রাজত্ব করে গেছেন স্বামীজী থেকে শুরু করে নেতাজী। কলকাতার এই অংশেই জন্মেছিলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ বা নাট্যাচার্য গিরিশ ঘোষ। কিছু দূরেই কলকাতার শেষ প্রান্ত দক্ষিণেশ্বর। সেখানেই থাকতেন রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব। এর মধ্যে কিডো তো একবার কল্পনার চোখে দেখেই ফেলল, কম করে প্রায় একশ ইংরেজ সৈন্য ভারী বুট জুতো পায়ে বন্দুক হাতে গট গট করে ওদের গাড়ির সামনে দিয়ে হেঁটে গেল! তাতে একবারের জন্য যদিও ও ভয়ে গাড়ির ভেতর সিঁটিয়ে গেছিল, কিন্তু শেষে যখন বুঝতে পারল এটা শুধু ওর কল্পনামাত্র, তখন এমনভাবে গাঝাড়া দিয়ে উঠল, যেন সামনে পেলে ও একাই ইংরেজদের সাবার করে দিত!
“এবার আমরা কোথায় যাব দাদু?” জিজ্ঞাসা করল কিডো।
“লালবাজার,” বললেন লোকনাথদাদু।
ড্রাইভার এবার গাড়িটা ইউনিভার্সিটির পাশের গলিতে ঢোকাল। তখন লোকনাথদাদু বললেন, “আমরা এবার সেন্ট্রাল এভিনিউতে বা সি আর এভিনিউতে উঠব। এই রাস্তাটা হয়েছিল সি আর দাশের মানে চিত্তঞ্জন দাশের নাম অনুসারে।”
কিডোরা যে রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল, তুলনা মূলক ভাবে সেই রাস্তাটা বেশ ফাঁকা। লোকজনের আনাগোনাও প্রায় হাতে গোনা। লোকনাথদাদু যেন একেবারে শিশু হয়ে গেছেন উত্তর কলকাতায় এসে। বারবার বলছেন, “শৈশবটা ফিরে পেয়েছি দাদুভাইরা!”
কিডোরাও গাড়ির ভেতর থেকে মাথা উঁচিয়ে বাইরেটা দেখার চেষ্টা করছে। এমন সময় একটা লাইট পোস্টের সামনে এসে গাড়ি দাঁড় করালেন লোকনাথদাদু। এবার ধীরে ধীরে গাড়ি থেকে নামলেন। পেছন পেছন নামল কিডোরাও। আস্তে আস্তে লাইটপোস্টটার কাছে গিয়ে সেটা ছুঁলেন লোকনাথদাদু। তারপর সামনের বাড়িটার একতলার মাথায় একটা সিমেন্টের ছাউনি দেখে আপনমনে বলে উঠলেন, “এখনো আছে!” আর তারপরই হো হো করে হেসে উঠলেন উনি।
কিডোরা তখন লোকনাথদাদুর অবস্থা দেখে অবাক। ব্যাপারটা কী? দাদু ওভাবে হাসছে কেন? কী আছে লাইটপোস্টটাতে? নাকি দাদু ওই ছাউনিটা দেখে হাসছে? অবাক হয়ে ওরা তখন একে অপরের দিকে তাকাতে শুরু করল।
লোকনাথদাদু এবার ঘুরে দাঁড়ালেন। মনে হয় ওদের মনের কথা বুঝতে পেরেছিলেন। বললেন, “এই রাস্তায় যতবার আসি, ততবার মনে পড়ে যায় আমার সেই ঘটনাটা। তাই নিজেকে আর ধরে রাখতে পারি না। পাগলের মত হেসে উঠি।”
“কোন ঘটনা?” এই প্রথম প্রশ্ন করার সুযোগ পেল কিডো।
“সে বলতে গেলে তো পুরো ঘটনাই বলতে হয় দাদুভাইরা।”
গল্প! কথাটা শুনে আবার একে অপরের দিকে তাকাতে শুরু করল কিডোরা।
“শুনবে?”
লোকনাথদাদুর প্রশ্নে সবাই প্রায় একসাথে মাথা সামনের দিকে ঝোঁকাল। দেখে লোকনাথদাদু হেসে বললেন, “এখানে দাঁড়িয়ে তো গল্প হবে না। চল তবে কলেজ স্কোয়ার। জমিয়ে গল্প করা যাবে।”
হৈ হৈ করতে করতে ওরা এবার এসে হাজির হল কলেজ স্কোয়ার। লম্বা একটা চেয়ার দখল করে বসে পড়ল সবাই। পাশে ঘুরতে থাকা চা ওয়ালার থেকে এক কাপ চা নিয়ে এবার গল্প বলতে শুরু করলেন লোকনাথদাদু –
“বহুদিন আগের কথা। বাংলা চলচ্চিত্রের আকাশে তিনটে তারা তখন জ্বলজ্বল করছে – সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন আর ঋত্তিক ঘটক। ওদিকে কমার্শিয়াল সিনেমাতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন উত্তম কুমার আর সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়।
“বিশা মানে আমাদের বিশ্বনাথ ছিল একজন সিনেমা পাগল মানুষ। তবে আদতে ও সিনেমার জন্য যতটা না পাগল ছিল, তার থেকে বেশি ছিল ওর সিনেমার জন্য পাগল হওয়ার দেখনদারি। ওর ধারণা ছিল, সিনেমার জ্ঞান ওর অসাধারণ। নিজেকে দাবি করত চিত্রনাট্যকার হিসেবে। ওর বক্তব্য ছিল, ওর মত চিত্রনাট্যকার নাকি বাংলাদেশে কমই জন্মেছিলেন! একবার তো ঘনিষ্ঠ মহলে এও বলেছিল যে, হীরক রাজার দেশের চিত্রনাট্য যদি ওকে দিয়ে লেখানো হত, তবে তার গুনগত মান আরও উন্নত হত! যেখানে সেখানে যাকে তাকে ধরে নিজের লেখা গল্প শোনাত বিশা। শেষে গল্প শোনার ভয়ে লোকে ওকে দেখলেই পালিয়ে যেত! এক কথায় লোকের কাছে ও হয়ে উঠেছিল একটা আতঙ্ক।
“এমনই একদিন ঘুরতে ঘুরতে বিশা চলে এসেছিল কলেজ স্ট্রিট অঞ্চলে। সেদিন সকাল থেকেই আকাশ অন্ধকার। ঘন কালো মেঘে ছেয়ে ছিল চারিদিক। বিদ্যুৎও চমকাচ্ছিল ঘন ঘন। তার সাথে বুক কাঁপানো গুড়ুম গুড়ুম আওয়াজ। হাঁটতে হাঁটতে এর মধ্যে ইউনিভার্সিটির পাশের রাস্তা মানে প্যারী সরকার রোডে রোডে চলে এল বিশা। ঠিক এই সময় হুড়মুড়িয়ে বৃষ্টি নামল। এমনিতেই রাস্তাটাতে লোকজন কম। তার ওপর আবার বৃষ্টি নেমে যাওয়াতে রাস্তাটা একেবারেই ফাঁকা হয়ে গেছে। শেষে উপায় না দেখে বৃষ্টির হাত থেকে নিজেকে বাঁচাতে দৌড় লাগাল। দৌড়োতে দৌড়োতে একটা বিশাল বাড়ির এর সানশেডের তলায় এসে দাঁড়াল। তখন ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি হয়ে চলেছে। পুরো রাস্তাটাতে একটাও লোক নেই। এমন সময় বিশার নজর গেল পাঁচ হাত দূরে দাঁড়িয়ে থাকা একজন বয়স্ক লোকের ওপর। ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি, কাঁধ পর্যন্ত নেমে আসা পাকা চুল। গায়ের রং ধপধপে সাদা। বয়স আন্দাজ ষাট ছুঁই ছুঁই। অদ্ভুত সুন্দর ব্যক্তিত্ত্বে ভরপুর ছিলেন এই ভদ্রলোক। বার দুয়েক চোখাচোখি হতে প্রতিবারই মুচকি হাসলেন ভদ্রলোক।
“এর মধ্যে কেটে গেছে আরও পনেরো মিনিট। ভদ্রলোকের সাথে বিশার দূরত্ব কমে দাঁড়িয়েছে পাঁচ থেকে প্রায় এক হাতে। এদিকে বৃষ্টি হয়েই চলেছে। অনেকক্ষণ ধরেই বিশা ভাবছিল ভদ্রলোকের সাথে কথা বলবে কি না। শেষে দোনোমনা করতে করতে কথা বলেই ফেলল বিশা।
“এ বৃষ্টি কমবে বলে মনে হয় না।”
“যা বলেছেন,” মুচকি হেসে বললেন ভদ্রলোক।
“কখন থেকে দাঁড়িয়ে আছি। আর ভাল লাগছে না।” কথা এগোনোর চেষ্টা করল বিশা।
“হুঁ,” ছোট্ট করে উত্তর দিলেন ভদ্রলোক।
“এবার থামলে বাঁচি।”
“এবার আর বিশার কথার কোন উত্তর করলেন না ভদ্রলোক। বিশা তখন বলল, ‘হাতে এত কাজ, এর গুরুত্ব কে বুঝবে?’ তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, ‘ওঃ, বৃষ্টি তো হয়েই চলেছে, কখন যে বাড়ি যাব, কাজ নিয়ে বসব!’
“ভদ্রলোক হয়ত এবার বুঝতে পারলেন যে বিশা ওনাকে উদ্দেশ্য করেই কথাগুলো বলছে। তাই জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তুমি কী কাজ কর?’ বলেই জিভ কেটে বললেন, ‘এই রে! তুমি বলে ফেললাম!’
“বিশা এই প্রশ্নটার জন্যই অপেক্ষা করছিল। বলল, ‘না না, আপনি আমার থেকে বয়সে বড়। যা খুশি ডাকতে পারেন।’ তারপর এক মুহূর্ত থেমে বলল, ‘একচুয়ালি, আই অ্যাম আ রাইটার।’
“ ‘রাইটার!’ বিশার কথা শুনে চোখ বড় বড় হয়ে গেল ভদ্রলোকের।
“বিশা তখন ওনাকে জিজ্ঞাসা করল, ‘স্ক্রিপ্ট এর ব্যাপারে কোনও আইডিয়া আছে?’
“ ‘স্ক্রিপ্ট?’ মনে হল কথাটা প্রথমবার শুনলেন ভদ্রলোক।
“বিশা এবার ওনাকে বোঝানোর চেষ্টা করল, ‘আই মিন স্ক্রিপ্ট, চিত্রনাট্য – মানে যেমন ড্রামা স্ক্রিপ্ট।’
“ভদ্রলোক তখন বললেন, ‘ও হ্যাঁ হ্যাঁ, জিনিসটা শুনেছি বটে। মানে যাঁরা নাটক লেখেন আরকি।’
“ ‘কারেক্ট!’ ভদ্রলোকের নাকের সামনে একটা তুড়ি মেরে বিশা বলল, ‘তবে আমি নাটক নয়, সিনেমার স্ক্রিপ্ট লিখি।’
“‘ও বাবা!’ চোখ বড় বড় করে ভদ্রলোক বললেন, ‘তুমি সিনেমা লেখ?’
“ ‘ওহ নো,’ বিশা বিরক্ত হয়ে বলল, ‘সিনেমা লিখি না, স্ক্রিপ্ট স্ক্রিপ্ট। ইউ আন্ডারস্ট্যান্ড? স্ক্রিপ্ট।’
“এবার মাথাটা দুবার সামনেরর দিকে ঝুঁকিয়ে ভদ্রলোক বললেন, ‘আচ্ছা, স্ক্রিপ্ট।’
“ওঁর কথা শুনেই বিশা বুঝতে পারল, ব্যাপারটা এখনো ওঁর কাছে পরিষ্কার নয়। তাই ও ফের ওঁকে বোঝানোর চেষ্টা করল, ‘দেখুন, পরিচালক তো শুটিং করেন। কিন্তু পর্দায় কী দেখানো হবে, অভিনেতা অভিনেত্রীরা কী কথা বলবেন, তা তো আগে থেকে লিখতে হবে, আমি সেইগুলোই লিখে দিই।’
“ ‘ও – বুঝলাম। তার মানে তোমার লেখা অনুসারে সেগুলো সিনেমায় দেখানো হয়?’
“ ‘এই তো বুঝেছেন! গ্রেট!’ বলল বিশা।
“ ‘বাবা!’ ভদ্রলোক তখন চোখ বড় বড় করে বললেন, ‘তুমি তো তাহলে নামকরা লোক হে!’
“ ‘ওই আর কী।’ লজ্জা পাওয়ার ভান করে বিশা বলল, ‘লোকে আমার লেখা ভালবাসে, এই আমার জন্য ঢের। কত ফ্যান মেইল পাই জানেন? আজ পর্যন্ত আমার লেখা বেশিরভাগ ছবিই হিট।’
“ ‘তুমি বুঝি অনেক ছবি লিখেছ?’ জিজ্ঞাসা করলেন ভদ্রলোক।
“‘অনেক মানে?’ কাঁধ ঝাঁকিয়ে বিশা বলল, ‘আজ পর্যন্ত তেত্রিশটা সিনেমার স্ক্রিপ্ট লিখেছি স্যার। এবার রাজ কাপুরের জন্য কাজের অফার এসেছে।’
“ ‘রাজ কাপুর?’ ভুরু কুঁচকে ভদ্রলোক বললেন, ‘কিন্তু উনি তো নিজের স্ক্রিপ্ট নিজেই লেখেন বলে শুনেছি!’
‘হ্যাঁ লেখেন,’ আমতা আমতা করে বিশা বলল, ‘কিন্তু ইয়ে মানে, ওনার প্রোডাকশান হাউসের জন্য আরকি। উনি বলেন, আমার লেখায় নাকি আলাদা একটা ফ্লেভার আছে। আর হ্যাঁ, যশ চোপরাও আমাকে নিয়ে কাজ করবেন বলেছেন।’
“ভদ্রলোক তখন ওকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তুমি বাংলা ছবিতে কাজ কর না?’
“বিশা উত্তেজিত হয়ে বলল, ‘ওহ নো, আই ডোন্ট লাইক বাংলা ছবি। লেট মি টেল ইউ, আমার টার্গেট হলিউড। তবে গোটা পাঁচেক বাংলা ছবিতে কাজ করেছি বটে। উইথ অল রিনাউনড পরিচালকস্।’
“ ‘তাই নাকি? ওরে বাবা!’ আবার চমকালেন ভদ্রলোক।
“ ‘হুঁ, সবক’টা ন্যাশনাল এ্যাওয়ার্ডের জন্য নমিনেটেড হয়েছিল। তার মধ্যে তিনটে তো জিতেওছিল।’
“কথাগুলো শুনে ভদ্রলোক প্রায় নাচতে লাগলেন– ‘আমার তো বিশ্বাসই হচ্ছে না, আমি এমন একজন লোকের সাথে দাঁড়িয়ে আছি!’
“ ‘তবে আমি যে কোন পরিচালকের সাথে কাজ করি না। আপনি চিরদীপ দাশগুপ্তের নাম শুনেছেন?’
“ ‘হ্যাঁ,’ বিশার প্রশ্নে ঘাড় কাত করলেন ভদ্রলোক।
“ ‘আমি ওর সাথে তিনটে ছবিতে কাজ করেছি। তার মধ্যে দুটো জাতীয় পুরস্কার পেয়েছে। ও তো আমার লেখা দেখে একেবারে অভি – অভি – কী যেন কথাটা?’
“ ‘অভিভূত।’
“ ‘রাইট!’ তুড়ি মেরে বিশা বলল, ‘ওটাই হয়েছিল।’
“ ‘বাব্বাঃ! ওনার সাথেও তোমার পরিচয় আছে?’
“ ‘পরিচয় মানে?’ প্রশ্নটা শুনে যেন একবারে আকাশ থেকে পড়ল বিশা। বলল, ‘কোন শট কেমন করে নেওয়া উচিৎ, তা জানতে ও তো মাঝে মাঝে আমাকে ফোনও করে। আসলে বাচ্চা ছেলে তো। আস্তে আস্তে শিখছে।’
“ ‘বাচ্চা ছেলে! কিন্তু আমি তো শুনেছি ওনার বয়স প্রায় পঞ্চান্ন!’
“ ‘আরে এই লাইনে তো বাচ্চা! অন্তত আমার কাছে।’
“ভদ্রলোক অবাক হয়ে বিশার কথা শুনতে থাকেন। বিশা বলতে থাকল, ‘তবে ছেলেটা, মানে লোকটা কাজ জানে। আই অ্যাম ইম্প্রেসড উইথ হিজ ওয়ার্ক। ও তো বলে যে, আমার চিত্রনাট্যের জন্যই ও জাতীয় পুরস্কারগুলো জিততে পেরেছিল। তাই তো ও আমাকে ওর পরের ছবির জন্যও লিখতে বলেছে।’
“ ‘তুমি লিখবে?’ জিজ্ঞাসা করলেন ভদ্রলোক।
“ ‘দেখি, টাইম পেলে তো। বললাম না যশ চোপরার জন্যও লিখতে হবে।’
“ ‘খুব ভাল,’ ভদ্রলোক এবার বিশার পিঠ চাপড়ে বললেন, ‘চালিয়ে যাও। এমন একজনের সাথে পরিচয় হয়েও ভাল লাগছে।’
“কথা বলতে বলতে তখন বৃষ্টিও থেমে গেছে। ভদ্রলোক এবার আকাশের দিকে চেয়ে বললেন, ‘এই দেখো, তোমার সাথে কথা বলতে বলতে বৃষ্টি থেমে গেছে।’ সেই সময় একটা দুধসাদা ফিয়াট গাড়ি এসে দাঁড়াল ওদের সামনে। তা দেখে ভদ্রলোক বললেন, ‘ওহ, আমার গাড়িটাও এসে গেছে।’
“চোখের সামনে এমন একটা ঝাঁ চকচকে গাড়ি দেখে বিশার তখন ভিরমি খাবার যোগার। আচমকাই ও বলে উঠল, ‘বাপরে, কি দারুণ গাড়ি!’
“তা শুনে ভদ্রলোক বললেন, ‘কিছু বললে?’
“ ‘না না কিছু না।’ কোনরকমে সামলে নিল বিশা।
“ভদ্রলোক তখন বললেন, ‘তোমার সাথে আলাপ করে খুব ভাল লাগল। তোমার কোন কার্ড বা কিছু –’
“ ‘ওহ সিওর,’ বিশা সাথে সাথে নিজের কার্ডটা বের করে ভদ্রলোককে দিল। উনি সেটা দেখে নিয়ে পকেটে রাখলেন। তারপর নিজেরটা বিশাকে দিলেন। বিশা সেটা সটান বুক পকেটে পুরল। ভদ্রলোক এবার গাড়িতে উঠলেন। বিশা তখনো হাঁ করে ওঁর গাড়ির দিকে তাকিয়ে রয়েছে। এবার গাড়ি স্টার্ট নিয়ে কয়েক গজ এগোতে বিশা চেঁচিয়ে উঠল, ‘কেউ সিনেমা বানাতে চাইছে বলে দেখলে আমার কথা বলবেন, কনফারমড ন্যাশনাল এ্যাওয়ার্ড।’
“গাড়িটা এবার সামনে তিন রাস্তার মোড়টা দিয়ে ডানদিকে ঘুরে অদৃশ্য হয়ে গেল। বেশ কয়েক মুহূর্ত সেদিকে তাকিয়ে রইল বিশা। এবার হঠাৎ কী যেন মনে পড়ল ওর। আচমকাই ভুরু জোড়া কুঁচকে গেল। ঝট করে এবার বুক পকেট থেকে ভদ্রলোকের দেওয়া কার্ডটা বের করল। ভাল করে সেটা দেখতে দেখতে চোখজোড়া আটকে গেল কার্ডটার ওপর। অজান্তেই মুখটা হাঁ হয়ে গেল। যেন নিঃশ্বাসও নিতে ভুলে গেছিল ও। কার্ডে লেখা নামটা দেখে নিজের চোখকে কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছিল না বিশা –
মিঃ চিরদীপ দাশগুপ্ত
ডাইরেক্টর – বেঙ্গল ফিল্ম এন্ড সিনে মিডিয়া
টালিগঞ্জ। কলকাতা।”
গল্পটা শেষ করেই আবার হো হো করে হাসতে শুরু করলেন লোকনাথদাদু। সাথে সাথে হাসতে শুরু করল কিডোরাও। এক মধ্যে একটা বাদামওয়ালা সামনে দিয়ে যাচ্ছিল। তার থেকে পাঁচ ঠোঙা বাদাম কিনে একটা নিজে রেখে বাকিগুলো একে একে কিডো, দ্যুতি, রিবাই আর রায়ানকে দিয়ে নিজের প্যাকেটটা থেকে একটা বাদাম টুক করে মুখে পুরে লোকনাথদাদু বললেন, কলেজ স্ট্রিটে বসে আড্ডা মারব, আর বাদাম খাব না, এ কখনো হতে পারে!!
ছবিঃ শিমুল
প্রকাশিত হয়েছে সত্যজিৎ দাশগুপ্তের অসামান্য ভৌতিক কাহিনি সঙ্কলন- দশ ভূতুড়ে। জয়ঢাক প্রকাশন। নীচের ছবিতে ক্লিক করে জয়ঢাক ওয়েবস্টোর থেকে বইটির অর্ডার দিন।
