গল্প-এক রাতের গল্প-সত্যজিৎ দাশগুপ্ত -বর্ষা ২০২৩

সত্যজিত দাশগুপ্তর আগের গল্প মোতিবিবির আয়নাক্লাইম্যাক্স, ফ্ল্যাট নম্বর ২০১, সেই মেয়েটা, সুরের জালে,  প্রতীক

golpoekraatergolpo

অনেক দিন আগেকার কথা। শহর থেকে গ্রাম, পাহাড় থেকে সমুদ্র—চাকরির সূত্রে আমাকে ঘুরে চরকিবাজি কাটতে হত প্রায় সবসময়। ব্যাপারটা জলভাত হয়ে গেছে এই ক’দিনে। ঘোরাঘুরি আমার বরাবরই খুব প্রিয়। তাই এই চাকরিতে আমার মন বসে গেছিল ষোলো আনা। আর সেটা যে কাজকে ভালোবেসে নয়, সেটা আশা করি আর আলাদা করে বোঝাতে হবে না। ঘোরাঘুরি না থাকলে এই চাকরিকে কবে আমি টা টা করে দিতাম।

তো সে-বার এরকমই একবার যেতে হল মুর্শিদাবাদের একটা গ্রামে। সঙ্গে অফিসের গাড়ি ছিল। তাই কখন ফিরব, কীভাবে ফিরব—কোনও চিন্তা নেই। একদিন বেশি হাতে নিয়ে গেছিলাম। মুর্শিদাবাদ জায়গাটার ওপর আমার বিশেষ কৌতূহল বরাবরের। ইতিহাস যেন গিজগিজ করছে অলিতে-গলিতে। আমি বরাবরই একটু বেশি কল্পনাপ্রবণ। এখানকার রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে গা শিরশিরানিটা খুব স্বাভাবিক। এই মনে হচ্ছে কামানের আওয়াজ শুনতে পেলাম, তো এই মনে হল কয়েকশো ঘোড়া টগবগ করতে করতে আমার দু-হাতের মধ্য দিয়ে চলে গেল! অজান্তেই কখন যে সেই নবাবি আমলে পৌঁছে যাচ্ছিলাম, বুঝতে পারছিলাম না।

বেশ মজা করে কয়েকটা দিন কাটল মুর্শিদাবাদে। খেলাম, ঘুরলাম, কাজ সারলাম—বেশ হল ব্যাপারটা। এবার ফেরার পালা। দিনটা ছিল রবিবার। পরেরদিন যে-করেই হোক অফিসে শরীর জমা করতে হবে। তাই আজই বাড়ি ফিরতে হবে। কিন্তু গেছি তো সেই অফিসের কাজেই। তাই রবি হোক কি শনি, খুব ছোট্ট হলেও কাজ ঠিক পড়েই গেল! আর তা সারতে সারতেই হয়ে গেল সন্ধে। আর তাতেই আমাদের ব্রাঞ্চ ম্যানেজারের আতিথেয়তা মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। সে তো রাতের খাবার না খাইয়ে ছাড়বে না। ওদিকে আমিও মনে এক মুখে আর-এক কথা নিয়ে ‘না না’ করে যেতে লাগলাম। তারপর যখন সে বলল যে রাতে সে আমাদের জন্য দেশি মুরগির ব্যবস্থা করবে, তখন আর নিজেকে সামলাতে পারলাম না। দেশি মুরগির কথা শুনেই আচমকা যেন একটা ঘোরের মধ্যে চলে গেছিলাম। সেটা কাটতেই আবিষ্কার করলাম, এতক্ষণ স্বপ্নে আমি মুরগির ঠ্যাং চিবোচ্ছিলাম!

খেয়ে উঠতে উঠতে বেজে গেল রাত ন’টা। পেটপুজোর লোভে পড়ে বড্ড বেশি দেরি হয়ে গেল। কিন্তু আগেই বলেছি, উপায় নেই। ফিরতেই হবে। ম্যানেজারের হাসি হাসি মুখটা দেখে গা জ্বলছিল। বুঝতে পারছিলাম ওটা আসলে হাসি নয়, হাসির পেছনে লুকিয়ে থাকা একটা লোভ। হেড অফিসের বাবুকে বেশ করে খুশি করে দিয়েছি। এবার একটা ভালো রিপোর্ট জমা পড়লেই বছরের শেষে ভালো বোনাস। আর তার সঙ্গে মাইনেটাও বাড়বে ভালো!

তো যাই হোক। রাগ-টাগ করে আর লাভ নেই। রাত সাড়ে ন’টা নাগাদ বেরিয়ে পড়লাম কলকাতার উদ্দেশ্যে। যেতে হবে প্রায় দুশো তিরিশ কিলোমিটার। লাগবে ছ’ঘণ্টামতো। মানে বাড়ি পৌঁছতে পৌঁছতে সেই ভোর। এর মধ্যে একটু চোখ বন্ধ করে নেওয়া যেতেই পারে। একটু ধকল যাবে বটে, কিন্তু ওসবে আমার অভ্যেস আছে। দেশি মুরগির জন্য এটুকু করব না! তবে খারাপ লাগছিল ড্রাইভার বাবুদার জন্য। আমার লোভের শাস্তি ওঁকে ভোগ করতে হবে! বেচারাকে সারারাত গাড়ির স্টিয়ারিং ধরে বসে থাকতে হবে। অবশ্য তাতে ওঁর কোনও হেলদোল নেই। বেশ হাসিমুখেই গাড়ি চালাতে লাগলেন। সঙ্গে আবার মাঝে মাঝে হেমন্ত, মান্না, শ্যামল থেকে মানবেন্দ্র বা কিশোরকেও মনে করিয়ে দিচ্ছিলেন। বলতেই হবে, খাসা গলা বটে দাদার! কিছুটা যেতেই আমাদের গাড়ি হাইওয়ে নিল। আর জানালা দিয়ে বর্ষার ফুরফুরে ঠান্ডা হাওয়া এসে আমার দু-চোখ আরামে বুজিয়ে দিতে লাগল। আমিও মাথাটা পেছনের সিটে এলিয়ে দিয়ে রাতের যাত্রাটা উপভোগ করতে লাগলাম।

গান শুনতে শুনতে অন্য জগতে চলে যাবার সময় হেমন্ত মুখার্জীর ‘আমি ঝড়ের সাথে রেখে গেলাম…’ কানে আসছিল। এবার চোখ খুললাম ড্রাইভার দাদার ডাকে।—“স্যার উঠুন।”

অনেক কষ্টে চোখ মেলে দেখি জানালার সামনে একটা মাথা। বার কয়েক চোখ কচলে আবিষ্কার করলাম ড্রাইভার বাবুদাকে।

“কী হল দাদা?” একটা হাই তুলে আড়মোড়া ভেঙে ওঁকে জিজ্ঞাসা করলাম।

“গাড়িটা একটু বিগড়েছে মনে হচ্ছে স্যার।”

“সে কি!”

মুহূর্তের মধ্যে ঘুম চটকে গেল আমার। ধড়মড়িয়ে উঠে বসলাম। ঝট করে ডাইনে বাঁয়ে তাকিয়ে দেখি গা-ছমছমে অন্ধকার একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি আমরা।

“এটা কোথায়?” যদিও জায়গাটা আমার চেনা নয়। তবুও চারপাশটা দেখতে দেখতে জিজ্ঞাসা করলাম।

“চিনি না স্যার। তবে আমরা পঞ্চাশ কিলোমিটার রাস্তা চলে এসেছি।” বললেন বাবুদা।

“ও। কী হয়েছে গাড়ির?”

“বড়ো কিছু নয় বলেই মনে হচ্ছে। আশা করি জলদি ঠিক হয়ে যাবে।”

আমি তখন ভাবলাম এভাবে গাড়ির মধ্যে বসে থেকে আর কী লাভ? একটু নীচে নেমে দেখাই ভালো। বাবুদাকে কথাটা বলতে উনি বললেন, “বেশি দূর যাবেন না স্যার। অজানা অচেনা জায়গা। আপনি কাছেই থাকুন। আমি এখুনি গাড়ি ঠিক করে ফেলছি।”

গাড়ি থেকে নেমে দেখলাম আমরা হাইওয়ে থেকে ছিটকে একটা নির্জন জংলা জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছি। চারদিক ঘুটঘুটে অন্ধকার। মনে পড়ল, গতকালই ছিল ঘোর অমাবস্যা। তাই আপাতত চাঁদের ‘চ’-ও দেখা যাবে না। আর রাস্তায় কোনও আলোও নেই। সামনে একটা জঙ্গল। নজর স্থির করে বুঝলাম সেটা একটা বিশাল বাঁশঝাড়। এবার ডানদিকে ঘাড় ঘোরাতে আবিষ্কার করলাম বিশাল আকারের একটা দোতলা বাড়ি। গড়নটা সেই আদ্যিকালের হলেও তাতে মরচে পড়েনি। দেখে মনে হল সেটা বেশ পরিচর্যার মধ্যে থাকে। যদিও আলো না থাকার জন্য বাড়িটাতে আদৌ কেউ আছে কি না তা বোঝা যাচ্ছিল না। আরও আশ্চর্যের বিষয় এই যে, বাড়িটার চেহারা ঝকঝকে থাকলেও সেটাকে ঘিরে রয়েছে একটা জঙ্গল!

দেখতে দেখতে এক পা দু’পা করে কখন যে আমি বাড়িটার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলাম, বুঝতে পারিনি। এবার থামতে আবিষ্কার করলাম একটা বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছি। মোটা কাঠের দু-পাল্লার সেকেলে দরজা। অন্ধকারে ততক্ষণে চোখ সয়ে গেছে। মাথা তুলে দেখলাম দরজার ওপরে আর্চ করে কাচ লাগানো। অন্ধকার থাকার জন্য কাচগুলো সাদা-কালো দেখাচ্ছিল। তবে সম্ভবত সেগুলো রঙিন। আরও তিন পা এগোলাম। আমি তখন দরজার একেবারে সামনে। একবার হাত বাড়িয়ে দরজাটা ছুঁতে গেলাম। কিন্তু কী মনে হতে সঙ্গে সঙ্গে হাত নামিয়ে নিলাম। চারদিক একেবারে নিস্তব্ধ। তার সঙ্গে পিচ-কালো অন্ধকার তো আছেই। খুব ভালো করে কান পারতাম। নাহ্‌, কোথাও কোনও শব্দ নেই। মনে হচ্ছে পৃথিবীতে সবাই একসঙ্গে ঘুমিয়ে পড়েছে। হাত উলটে ঘড়ি দেখলাম—এগারোটা। কলকাতা শহরে এ নিছক সন্ধ্যা। ডাইনে বাঁয়ে একবার করে মাথা ঘোরালাম। আমাদের গাড়িটা দেখা যাচ্ছে না। বুঝতে পারলাম, আমি বেশ কিছুটা দূরে চলে এসেছি। গা-শিরশিরে হাওয়াটা বেশ নিয়ম করেই বয়ে চলেছে। মাথা তুললাম। রাস্তার ও-পাশের একটা বিশাল গাছ ডালপালা মেলে রাস্তার এ-পাশে এসে বাড়িটার ওপর ঝুঁকে পড়ে আমাকে আকাশ থেকে প্রায় আলাদা করেছে। শিরশিরে হাওয়াটা গাছের পাতাগুলোকে হালকা চালে দোলাচ্ছে। তবে আকাশ যে একেবারেই দেখা যাচ্ছে না, তা নয়। কিন্তু সেটা ভয়ানক কালো। আর তাতে ভেসে চলা মেঘগুলো ভীষণ ঘোলাটে।

এতক্ষণ চারপাশটা দেখছিলাম। এবার আবার সামনের দিকে মাথা ঘোরালাম। বন্ধ দরজার দিকে আরও এক পা এগোলাম। কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে রইলাম। এবার ডানহাতটা তুলে দরজায় রেখে আলতো চাপ দিতেই সেটা মসৃণভাবে খুলে গেল।

অন্ধকারের যেন আর-একটা পোঁচ। এটা আরও ঘন। চৌকাঠের ভেতরে পা রাখতেই কালোর মধ্যে মিশে গেলাম। অন্ধকার ঘরে শুয়ে শীতের সময় পা থেকে মাথা পর্যন্ত মোটা লেপ চাপা দিলে অনেকটা এইরকম মনে হয়—কিছু দেখা যায় না, খুব ভয় ভয় করে!

কয়েক সেকেন্ড লাগল অন্ধকারটার সঙ্গে মানিয়ে নিতে। এবার আবিষ্কার করলাম আমি একটা হলঘরের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছি। ডাইনে-বাঁয়ে তাকিয়ে দেখলাম, কয়েকটা দরজা। বুঝলাম, বেশ কিছু ঘর দিয়ে ঘিরে রয়েছে এই হলঘরটা। ভেতরে কী আছে দেখব? নাকি ফিরে যাব? বাবুদার কাজ হয়ে গেলে নিশ্চয়ই এতক্ষণে আমাকে খোঁজাখুঁজি করতে শুরু করেছেন। নাহ্‌, ফিরেই যাই।

ফেরার জন্য পা বাড়িয়েছি, ঠিক তখন একটা মিহি গলা কানে এল।—“আপনার গাড়ি এখনও ঠিক হয়নি লোকনাথবাবু।”

“কে!”

অন্ধকারে আচমকা একটা গলা কানে আসতে আমি আঁতকে উঠলাম। সারা শরীর কাঁপতে শুরু করল। বার কয়েক ঢোঁক গিললাম। ঝট করে একবার ডাইনে-বাঁয়ে তাকালাম। কিন্তু গলার মালিককে দেখতে পেলাম না। ঠিক তখন আবার সেই গলাটা কানে এল।—“আমি এদিকে।”

আবার বুক কেঁপে উঠল।

“কে? কে আপনি? কোথা থেকে কথা বলছেন?” বুঝলাম, আমার গলা কাঁপছে।

“আপনি যেখানে দাঁড়িয়ে আছেন, তার ঠিক বাঁদিকে।” বলল লোকটা।

ধীরে ধীরে বাঁদিকে ঘুরে দাঁড়ালাম। দেখলাম সামনে একটা দরজা।

“হ্যাঁ, এটাই।” বলল লোকটা। আমি একবার সদর দরজার দিকে তাকাতে সে আবার বলে উঠল, “বাবুদা এখনও গাড়ি ঠিক করছে। সময় লাগবে। আপনি ঘরে আসতে পারেন। একটু গল্প করে নেওয়া যেতে পারে।”

বুঝলাম লোকটা সব জানে। কিন্তু কী করে সেটা আমি জানি না। আমি কি কোনও আত্মার ফাঁদে পড়েছি? ভেবে আমার সারা শরীর শিউরে উঠল। অবশ্য এ-জিনিস আমার জীবনে নতুন নয়। এতদিন নানা জায়গা ঘুরে বিভিন্ন ধরনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা রয়েছে আমার ঝুলিতে। তাই প্রথমে ভয় পেয়ে গেলেও, শেষটায় সামলে নিলাম। তারপর এগিয়ে গেলাম ঘরটার দিকে।

দরজাটা বন্ধ ছিল। আমি দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াতে আবার লোকটা বলে উঠল, “দরজায় চাপ দিন। খুলে যাবে।”

ভাবলাম লোকটা কি আমাকে কোনোভাবে সরাসরি দেখতে পাচ্ছে? এখনকার দিনে হলে না-হয় বলা যেত যে সিসিটিভি লাগানো আছে। অবশ্য বিনা লাইটে তা কী করে চলত, সেটা ভেবে দেখিনি। তার ওপর যা অন্ধকার! দেখাই তো যেত না।

“কী হল, চলে আসুন!” আবার বলল লোকটা।

বুঝলাম, এর সামনে কিছুই লুকোনো যাবে না। তাই এবার দরজাতে আলতো চাপ দিলাম। আরও একটা অন্ধকার জগৎ।

“ও বাবা, আপনি কোথায়?”

“আসুন, ভেতরে আসুন।”

আমি ভেতরে ঢুকলাম। ডাইনে-বাঁয়ে তাকালাম। কিন্তু কিছুই দেখতে পেলাম না। লোকটা তখন বলল, “আপনার ঠিক বাঁদিকে একটা বেতের চেয়ার আছে। সেটায় বসতে পারেন।”

“কিন্তু আপনি কোথায়? আর এই অন্ধকারের মধ্যে আপনি সবকিছু দেখতে পাচ্ছেন কী করে?” লোকটার সঙ্গে কথা বলতে বলতে মনে হচ্ছিল, আমিই হয়তো অন্ধ।

“অন্ধকার!” বলে লোকটা হো হো করে হেসে উঠে বলল, “অন্ধকার ভাবলেই অন্ধকার। আলো ভাবলেই আলো। পৃথিবীকে আপনি যেমনটা দেখবেন বা দেখতে চাইবেন, তেমন করেই সে আপনার কাছে ধরা দেবে।”

এই লোকের সঙ্গে কথায় পারব না বুঝতে পেরে আমি হাতড়ে হাতড়ে একটা চেয়ার পেয়ে তাতে বসে পড়লাম। বসে বুঝলাম সেটা বেতের। এবার লোকটাকে বললাম, “আমি আপনাকে দেখতে পাচ্ছি না যে!”

তাতে লোকটা আবার হেসে বলল, “আমরা তো গল্প করব। একে অপরকে দেখে কী হবে?”

আবার সেই হেঁয়ালি করে কথা! এর মধ্যে আরেকটা আশ্চর্য জিনিস বলে রাখি। লোকটার গলা ঘরের মধ্যে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। কখনো-কখনো মনে হচ্ছিল বেশ দূর থেকে ভেসে আসছে। আমি বেশ কিছুক্ষণ চুপ থেকে এবারে ওকে জিজ্ঞাসা করলাম, “আপনি মনে হচ্ছে আমার ব্যাপারে সব জানেন?”

তাতে সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “সব আর পারলাম কই?”

“আমার গাড়ি খারাপ হয়েছে, আমার ড্রাইভারের নাম বাবু—এতসব আপনি জানলেন কী করে?”

“ওই আর কি। জেনে গেলাম বলতে পারেন।”

“আর কী কী জানেন?”

“বেশি কিছু না। আপনার নাম লোকনাথ দাশ। কলকাতায় থাকেন। এসেছিলেন আপিসের কাজে। মুর্শিদাবাদে। এখন ফিরছিলেন। গাড়িটা গেল বিগড়ে।” বলে থামল লোকটা।

আমি তাতে অবাক হয়ে বললাম, “আশ্চর্য! কে আপনি? কোনও জ্যোতিষী-টোতিষী নাকি?”

লোকটা তাতে আবার হেসে বলল, “না না, তেমন কিছুই নয়।”

“তাহলে?”

“আমার নাম রামচরণ বাঁড়ুজ্জে। এই বাড়িতেই থাকি।”

“কতদিন ধরে থাকেন এখানে?”

“তা সে বহুবছর।”

“একাই থাকেন?” জিজ্ঞাসা করলাম আমি।

“হ্যাঁ।” বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল লোকটা।

“আর কেউ থাকেন না এত বড়ো বাড়িতে?” আমি অবাক হয়ে বললাম।

“ছিল একসময়। এখন আর নেই।” বলে আবার একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল লোকটার মুখ থেকে।

“কোথায় তারা?” আবার জিজ্ঞাসা করলাম আমি।

তাতে সে বলল, “সে লম্বা ঘটনা লোকনাথবাবু।”

“সেটা কেমন?” আবার জিজ্ঞাসা করলাম আমি। লক্ষ করলাম, লোকটার প্রতি ভয়টা যেন আমার আচমকা মিলিয়ে গেছে!

এবার আমার প্রশ্নের উত্তরে লোকটা যা বলল, তা অনেকটা এই—

“প্রায় একশো বছর আগেকার কথা। এই বাড়িটা ছিল জমিদার কালিকাপ্রসাদ সরকারের। দোর্দণ্ডপ্রতাপ জমিদার বলতে যা বোঝায়, উনি ছিলেন তাই। ওঁর ভয়েতে বাঘে-গোরুতে এক ঘাটে জল খেত বললেও কম বলা হবে। চোখের এক চাউনিতে বাঘ, গোরু, কুমির, পাখি আর মানুষ পাশাপাশি বসে পাত পেড়ে ভাত খেতে বসত। দশাসই চেহারা আর সিংহের মতো মোটা গলার আওয়াজ। চওড়া কাঁধ। মোটা শক্তপোক্ত কবজি। আমার মতো মানুষকে তো দু-আঙুলে গলা টিপেই মেরে ফেলতে পারতেন!

“কালিকাপ্রসাদের জমিদারির সীমানা ছিল অনেকটা। সে কয়েক ক্রোশ তো হবেই। আজ এই বাড়ি অন্ধকার দেখছেন, তখন আলোয় ঝলমল করত। লোকজন গমগম করত। পাড়াপড়শি, চাকরবাকর, আত্মীয়স্বজন—সারাক্ষণ মানুষের আনাগোনা আর আনাগোনা। কাজের চাপে নিশ্বাস ফেলার সময় ছিল না কারও। সবাই সারাদিন যেন দৌড়োচ্ছে! আর তার ওপর সরকার সাহেবের চোখ রাঙানি তো আছেই। ও হ্যাঁ, বলতে ভুলে গেছি—কালিকাপ্রসাদকে সবাই সরকার সাহেব বলে ডাকত। এমনকি ওই গোরা ইংরেজরাও।

“সেই সময় দেশে ফিরিঙ্গিদের রাজত্ব। শাসক দলের আনাগোনা লেগেই থাকত এই বাড়িতে। সামনেই তো মুর্শিদাবাদ। আপনি জানেন। নবাবি আমল শেষ। ফিরিঙ্গিরা দেশকে লুঠছে। আর তার সঙ্গে হাত মিলিয়েছে কিছু স্বেচ্ছাচারী জমিদার। এই সরকার সাহেব ছিলেন সেইরকমই একজন।

“সেটা ছিল এক দুর্গাপুজোর রাত। অষ্টমী। প্রতিবারের মতো সে-বারেও বাড়িতে পুজো। পুরো সরকারবাড়ি গমগম করছে লোকজনে। দুপুর থেকে কয়েকশো লোক সেদিন মায়ের ভোগ খেয়েছে। রাতেও খাওয়া। সময় তখন সন্ধে গড়িয়ে রাতের দিকে এগিয়ে চলেছে। সামনেই একটা গির্জা ছিল। তার ঘড়িতে ঢং ঢং করে আটটার ঘণ্টা পড়ল। ঠিক সেই সময় ঝাঁ-চকচকে একটা ফিটন গাড়ি এসে দাঁড়াল বাড়ির সামনে। আর তারপর সেটা থেকে নেমে এলেন দুজন সাহেব। দুর্গাপুজোর জন্য ওঁরা ছিলেন বিশেষভাবে নিমন্ত্রিত। আসল কথা হল, ওঁরাই ছিলেন সরকার সাহেবের আসল অতিথি। বাকিরা তো লোক-দেখানো মাত্র। ভেতরের খবর হল, সেই বছর সরকার সাহেব রায়বাহাদুর উপাধি পেতে চলেছিলেন। তাই উনি এবারের পুজোয় সাহেব-সেবায় উৎসাহিত হয়ে উঠেছিলেন। আর এই দুই সাহেব ছিলেন সেই দুজন, যাঁরা খুশি থাকলে সেই বছর সরকার সাহেব সহজেই রায়সাহেব উপাধি পেয়ে যেতেন। কারণ, ওঁদের হাতেই ছিল সরকার সাহেবের ভাগ্য।

“সাহেবরা বাড়িতে পা দিতে সরকার সাহেব নিজে এগিয়ে এসে ওঁদের গোলাপ জলে অভ্যর্থনা জানালেন। তার সঙ্গে গলায় পরিয়ে দিলেন রজনীগন্ধার মালা। লাল কার্পেট বিছানো রাস্তা দিয়ে নিয়ে আসা হল সাহেবদের। হেঁটে আসার সময় চলতে থাকল পুষ্পবৃষ্টি। সরকার সাহেবের স্ত্রী অন্নপূর্ণাদেবী নিজে এসে সাহেবদের অভ্যর্থনা করলেন। একে একে পরিবারের প্রায় সবাই এসে সাহেবদের পায়ে মাথা ঠুকে গেলেন। এতক্ষণ মনে হচ্ছিল দেবী দুর্গাই সবাইকে রক্ষা করেন, কিন্তু এবার দেখে মনে হতে লাগল, সেই ক্ষমতা ততক্ষণে চলে গেছে ফিরিঙ্গিদের হাতে।

“এবার ঘরে ঢুকতেই শুরু হল আসল সাহেব-পুজোর ঘটা। প্রথমেই তাঁদের বসতে দেওয়া হল পাথরের সিংহাসন মার্কা চেয়ারে। শরবত থেকে শুরু করে একে একে নানান খাবারে ভরে উঠল খাওয়ার টেবিল। শুরু হল গানবাজনা। হইহই-রইরই কাণ্ড। তার সঙ্গে তো মদের ফোয়ারা রয়েইছে! বোঝাই যাচ্ছিল না যে দুর্গাপুজোর অনুষ্ঠান চলছে, নাকি কোনও নৈশভোজের আসর!

“রাত বাড়তে লাগল। তার সঙ্গে বাড়তে লাগল হই-হুল্লোড়। সাহেবরা তখন আর নিজেদের মধ্যে নেই! মদের নেশায় চুর হয়ে প্রায় লুটিয়ে পড়ছেন। কিন্তু তবুও ফুর্তি কমছে না। ঠিক এই সময় ঘটল একটা অঘটন।

“অষ্টমীর এই নৈশভোজে শুধুমাত্র সাহেবরাই ছিলেন না, ছিলেন সরকার সাহেব নিজে, তাঁর প্রচুর বন্ধুবান্ধব আর আত্মীয়স্বজন। আর এদের খাবার এবং মদ পরিবেশন করে যাচ্ছিল পাঁচজন বেয়ারা। এই বেয়ারার মধ্যে একজন ছিল বাড়ির সবথেকে বয়স্ক কাজের লোক। লোকে সবাই তাকে কানুদা বলে ডাকত। কানুদার বয়স ছিল আশির ওপরে। কিন্তু ওই বয়সেও সে ছিল প্রচণ্ড কর্মঠ। আর সবথেকে বড়ো কথা হল, সে ছিল বিশ্বাসী। প্রায় ষাট বছর ধরে সে এই সরকারবাড়ির সেবা করে যাচ্ছিল। পুজো থেকে শুরু করে বিয়ে—সব অনুষ্ঠানেই ছিল তার প্রধান দায়িত্ব। তিনকুলে কেউ ছিল না কানুদার। কবে যে বাড়ি ছেড়ে এসেছিল তাও মনে নেই। সরকার সাহেবের বাবা ওকে কাজে রেখেছিলেন। সেই থেকে সে এ-বাড়িতে।

“তো অনুষ্ঠান চলছে। একের পর এক মদের গেলাস শেষ হয়ে যাচ্ছে। তার সঙ্গে মাংস। অতিথি দুই সাহেবের মধ্যে একজন ছিল একটু বয়স্ক। সেই ছিল আসল লোক। ইংরেজ সরকারের খুব উঁচুতলার কর্মী। বড়লাটের খুব কাছের। আর সেইমতো তাঁর মদের তেষ্টাটাও ছিল একটু বেশি। বেচারা তখন ঠিক করে দাঁড়াতেও পারছিলেন না, কিন্তু মদ্যপান চালিয়ে যাচ্ছিলেন। হাতের গেলাসটা শেষ হতে উনি এবার তার পরের গেলাসের জন্য ইশারায় কানুদাকে ডাকলেন। কানুদা ট্রে-ভরতি গেলাস নিয়ে সাহেবের দিকে এগিয়ে গেল। আর-একটা জিনিস বলিনি। খানাপিনা হচ্ছিল দোতলার ঝুল-বারান্দায়। সাহেব ছিলেন বারান্দার একেবারে ধারে। তো কানুদা যখন সাহেবের কাছে ট্রে নিয়ে পৌঁছল, তখন সাহেব চেয়ার ছেড়ে উঠে কানুদার দিকে এগিয়ে গেলেন গেলাস নেবার জন্য। কিন্তু মাটিতে বিছানো কার্পেটে ওঁর পা গেল আটকে। আর উনি অমনি হুমড়ি খেয়ে পড়লেন কানুদার ওপর। আর সঙ্গে সঙ্গে সাহেব চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘ইউ ব্ল্যাক স্টুপিড নেটিভ!’

“ওদিকে কানুদাও আচমকা সাহেব এভাবে গায়ের ওপর পড়ে যাওয়াতে টাল সামলাতে পারল না, সঙ্গে সঙ্গে দুজন মিলে ঝুল-বারান্দার পাঁচিল টপকে পড়ল একেবারে নীচে, বাড়ির সামনের উঠোনের বাগানে। আগের দিন, মানে সপ্তমীতে ভারী বৃষ্টি হওয়ার জন্য মাটিতে কাদা তৈরি হয়ে ছিল। তাই সে-যাত্রা বেঁচে গেলেন দুজনেই। সাহেবের কোমরে সামান্য একটু লেগেছিল। তা অবশ্য পরের দিনই ঠিক হয়ে গেছিল। আর কানুদার লেগেছিল পায়ে। কিন্তু সেটা আর ঠিক হবার সময় পেল না কানুদা।

“আচমকা এমন একটা ঘটনা ঘটে যাওয়াতে বাড়িতে তখন তুলকালাম কাণ্ড! সবাই দৌড়ে নীচে নেমে গেছে। সরকার সাহেবের তো হৃৎপিণ্ড বেরিয়ে হাতে চলে আসার মতো অবস্থা। নেমন্তন্ন খেতে এসে স্বয়ং বড়লাটের কাছের লোকের যদি কিছু একটা হয়ে যায়, তাহলে রায়বাহাদুর তো দূরের কথা, জমিদারি পর্যন্ত হারাতে হতে পারে! তখন পথের ভিখিরি হয়ে ঘোরা ছাড়া আর কোনও উপায় থাকবে না।

“কিন্তু মা দুর্গার অসীম কৃপা যে সাহেবের কিছু হয়নি। আগেই বলেছি, কোমরে একটু ব্যথা লেগেছিল। কিন্তু সেটা যে এমন কিছু নয়, তা সাহেব মাটি থেকে উঠতে-উঠতেই বুঝে গেছিলেন। ছোটো সাহেবকে উনি জানালেনও সে-কথা। ততক্ষণে তাঁর নেশা কেটে গেছে। এবার কী ঘটেছিল সে মনে পড়তে বেচারা লজ্জা পেয়ে গেলেন। তাই নিজের কাণ্ড ঢাকতে কানুদার ওপর চোটপাট শুরু করলেন।—‘ইউ স্কাউন্ড্রেল! ব্ল্যাক নেটিভ! ইউ ডিড ইট টু মি!’ বলে কানুদার দিকে এগিয়ে গেলেন। ওদিকে কানুদা বেচারা তখন অনেক কষ্টে উঠে দাঁড়িয়েছে। যদিও তার চোটটাও বিশেষ কিছু নয়, তবে তাকে দেখার কেউ ছিল না। বাড়ির অন্যান্য চাকররা ইচ্ছে থাকলেও তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে যেতে পারছিল না। সরকার সাহেবের ভয়ে। কারণ, গোরা সাহেবের হিসেবমতো কানুদা তখন দাগি আসামি!

“এবার সাহেব কানুদার দিকে এগিয়ে গিয়ে বাঁহাতে তার জামার কলার চেয়ে ধরলেন। তারপর ঠাস করে মারলেন তার গালে একটা চড়! আচমকা চড় খেয়ে কানুদা তখন কথা হারিয়েছে। হয়তো বলতে গেছিল যে তার কোনও দোষ নেই বা ইচ্ছে করে সে এমনটা করতে চায়নি। কিন্তু সুযোগ পেল না।

“কিন্তু নাটকের এখানেই শেষ ছিল না। সাহেব দোতলা থেকে একতলায় পড়ে গেছেন বলে কথা! তার ওপর তিনি নিজে থেকে কানুদাকে দোষী বলে সাব্যস্ত করেছেন। এ সত্যিই সাংঘাতিক ব্যাপার! তাই দোষীকে শাস্তি না দিয়ে থাকা যায়? বা থাকাও উচিত নয়। আর-একটু হলেই রায়বাহাদুর খেতাবটা চলে যাচ্ছিল। এমনকি জমিদারিটাই হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছিল আর-একটু হলে! কার জন্য? না কানুদার জন্য? একটা চাকরের জন্য? অসভ্য। বেয়াদপ লোক একটা! রাগে ফুঁসছিলেন কালিকাপ্রসাদ। মনে মনে বলছিলেন, কানুদা ঘোর অপরাধী! না না, অপরাধী নয়, সে ঘোর পাপী! আর তার এই পাপের শাস্তি তাকে পেতেই হবে।

“এমনিতেই তিনি তখন মদের নেশায় চুর। তার ওপর এই সাংঘাতিক ঘটনা ওঁকে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য করে তুলল। দৌড়ে গেলেন ঠাকুরঘরে। সেখানে রাখা আছে জিনিসটা। আগামী কালীপুজোয় ব্যবহার হবে। বলতে গেলে বছরে ওই একদিনই ব্যবহার হয়। এ-বছর তাহলে দু-বার হবে।

“কালিকাপ্রসাদের চোখজোড়া তখন জ্বলছিল। প্রচণ্ড রাগে ক্ষিপ্র বেগে উনি এবার এগিয়ে গেলেন কানুদার দিকে। সরকার সাহেবের ওই রূপ দেখে কানুদার তখন বুক কাঁপতে শুরু করেছে। মালিকের এমন চোখ সে এর আগে দেখেনি। কিছু বলার আগেই এবার কালিকাপ্রসাদের বাঁহাত চেপে ধরল কানুদার বাঁ-কাঁধ। এবার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল গলাফাটা একটা চিৎকার। ঠিক যেমনটা কালীপুজোর রাতে হয়। আচমকা শূন্যে উঠে গেল ডানহাতটা। সঙ্গে গলার চিৎকারটা আরও বীভৎস আকার নিল। এবার সঙ্গে সঙ্গে প্রবল বেগে ডানহাতটা নামতে লাগল। এবার সেটা থামার ঠিক এক সেকেন্ড আগে খচ করে একটা শব্দ উপস্থিত সবাইকে চুপ করিয়ে দিল। ঠিক যেন কালীপুজোর রাতের দৃশ্যটার পুনরাবৃত্তি হল। সেদিন কাটা পাঁঠার মাথাটা মাটিতে গড়াগড়ি খায়। আজ কানুদার মাথাটা খাচ্ছে! আর কালিকাপ্রসাদের ডানহাতে ধরা মায়ের বলিতে ব্যবহৃত খড়্গটা কানুদার রক্তে মাখামাখি হয়ে গেছে। ওটা থেকে চুঁইয়ে চুঁইয়ে রক্তের ধারাটা কালিকাপ্রসাদের হাত থেকে কনুই হয়ে মাটিতে পড়ছে।”

এতটা বলে থামল লোকটা। আমি হাঁ করে এতক্ষণ ওর গল্প শুনছিলাম। গল্প শেষ হতেই জোরে জোরে শ্বাস নেওয়া শুরু করলাম। মনে হয় সেটা এতক্ষণ আটকে ছিল। আর ঘোর কাটল একটা বাজের শব্দে। বাইরে ঝমঝম শব্দে মালুম হল বৃষ্টি নেমেছে।

“এই হল এই বাড়ির গল্প। কেমন লাগল?” বলল লোকটা।

“এ-ঘটনা সত্যি?” এমন বীভৎস ঘটনা এর আগে কোনোদিন শুনিনি।

“আপনাকে মিথ্যে বলে আমার কী লাভ?” বলল লোকটা। কিন্তু এই সময় লক্ষ করলাম, লোকটা যেন দু-হাত ডানদিকে সরে এসেছে। কারণ, ওর আওয়াজটা এবারে সামান্য ডানদিক থেকে আসছে। কিন্তু পরক্ষণেই একটা শব্দ হতে মনে হল লোকটা সেই আগের জায়গাতেই রয়েছে।

“কী হল?” জিজ্ঞাসা করলাম আমি।

“আরে বাপু,” দু-বার কেশে নিয়ে লোকটা বলল, “সেই কখন থেকে একভাবে শুয়ে আছি। তাই এবার একটু ওপর দিকে উঠে শুলাম।”

কিন্তু এবার কথা শুনে আবার মনে হল লোকটা ফের দু-হাত ডানদিকে সরে গেছে।

লোকটা সত্যি বলছে না মিথ্যে, সেটা যাচাই করবার কোনও প্রয়োজন ছিল না আমার। কিন্তু যেটা ভাবার বিষয়, সেটা হল, এবারও আওয়াজটা বেশ কিছুটা ডানদিক থেকে এল। অন্ধকারে কিছু দেখতে পাচ্ছি না। ওদিকে বৃষ্টি থামার কোনও লক্ষণ নেই। বললাম, “এ তো ফেঁসে গেলাম দেখছি।”

তাতে লোকটা বলল, “চিন্তা করবেন না। বাবুদা মেকানিক খুঁজতে গিয়ে একটা লোকাল ক্লাবে দাঁড়ানোর জায়গা পেয়ে গেছেন। আপনি যেমন ওঁর কথা ভাবছেন, তেমন উনিও আপনার কথা চিন্তা করছেন। তবে বৃষ্টি না কমলে উনিও বেরোতে পারবেন না। আবার এই বৃষ্টিতে আপনারও বেরোনোটা একটা ঝক্কি হয়ে যাবে।”

“সেটা আপনি অবশ্য ঠিকই বলেছেন।” মাথা নেড়ে বললাম আমি।

“হুম। তাহলে আর-একটু সময় আমার সঙ্গে আড্ডা দিয়ে যান আর কি।” বলে হেসে উঠল লোকটা।

তখন আমি জিজ্ঞাসা করলাম, “কিন্তু আপনি অতদিন আগেকার ঘটনা এতটা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে জানলেন কী করে?”

তাতে লোকটা বলল, “ওমা, এ ঘটনা তো সবাই জানে!”

“কিন্তু আপনি এমনভাবে ঘটনাটা বললেন যেন মনে হল আপনি সেদিন ওখানে উপস্থিত ছিলেন!”

“হ্যাঁ, ছিলাম তো।” হেসে বলল লোকটা।

“মানে!” আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, “তাহলে তো মশাই বলতে হয় আপনার বয়স একশোর ওপরে।”

“হ্যাঁ, ঠিক তাই।” খুব নির্বিকারভাবে বলল লোকটা।

“মানে?” আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম।

তাতে লোকটা বলল, “আমার বয়স এখন একশো আশি।”

“একশো আশি! আপনি আমার সঙ্গে ইয়ার্কি করছেন?” আমি এবার ধৈর্য হারালাম।

তাতে লোকটা আচমকা গম্ভীর হয়ে বলল, “আমার সঙ্গে আপনার পরিচয়টা এখনও ইয়ার্কির পর্যায়ে যায়নি।”

আমি এতে সামান্য পিছু হঠলাম। নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম, “কিন্তু যে বয়সের কথা আপনি বলছেন, সেটা কি আদৌ সম্ভব?”

এতে লোকটা বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বার দুয়েক কাশল। বলে রাখি, এতক্ষণ পর্যন্ত কিন্তু আমি লোকটার গলা সেই সামান্য ডানদিক থেকেই পাচ্ছিলাম। এবার ওকে জিজ্ঞাসা করলাম, “আপনি কে বলুন তো?”

তাতে লোকটা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কষ্টের হাসি হেসে বলল, “এখনও চিনতে পারলেন না?”

আমি কোনও উত্তর না দিয়ে চুপ করে রইলাম। তখন লোকটা বলল, “আমার নাম রামচরণ বাঁড়ুজ্জে।”

আমি তখন বললাম, “সে তো আপনি আগেই বলেছেন। কিন্তু কে এই রামচরণ বাঁড়ুজ্জে?”

তাতে লোকটা আমাকে চমকে দিয়ে বলল, “লোকে আমাকে কানুদা বলে ডাকত।”

ঠিক সেই সময় সামনেই প্রচণ্ড জোরে কড়াৎ করে একটা বাজ পড়ল। আর তাতে যে আলোটা ঝলকে এসে ঘরের অন্ধকারকে ধুয়ে-মুছে সাফ করে দিয়ে ঘরের দৃশ্যটাকে আমার চোখের সামনে তুলে ধরল, তা দেখে আমার পক্ষে আর বেশিক্ষণ নিজেকে সামলে বসে থাকা সম্ভব ছিল না। কারণ, আমার সামনে তখন আধশোয়া হয়ে বসে আছে বছর আশির এক বৃদ্ধ। যার কিনা ধড়ের ওপর থেকে মুণ্ডুটা নেই! পরনের হাফ হাতা ফতুয়াটা লাল রক্তে ভিজে চুপচুপ হয়ে রয়েছে। সে তখন ঝুঁকে পড়েছে তার ডানদিকে। এবার দৃষ্টিটা ঝট করে সামান্য ডানে ঘোরাতে আবিষ্কার করলাম, সে ধীরে ধীরে সোজা হয়ে বসছে। আর তার ডানহাতে ধরা রয়েছে একটা কাটা মুণ্ডু। আমার দিকে তাকিয়ে সে তখন বলল, “মুণ্ডুটা কেটে দিয়েছিল তো, তাই মাঝে-মাঝেই সেটা ধড় থেকে খসে পড়ে গড়িয়ে এদিক সেদিক চলে যায়। তাই আবার তাকে জায়গামতো বসিয়ে নিতে হয়।”

আমি আর স্থির হয়ে বসে থাকতে পারলাম না। জ্ঞান হারাবার আগে শুধু এটুকু দেখতে পেলাম যে কানুদা তার কাটা মুণ্ডুটাকে গলার ওপর বসিয়ে দিচ্ছে!

জয়ঢাকের গল্পঘর

প্রকাশিত হয়েছে  সত্যজিৎ দাশগুপ্তের অসামান্য ভৌতিক কাহিনি সঙ্কলন- দশ ভূতুড়ে। জয়ঢাক প্রকাশন। নীচের ছবিতে ক্লিক করে জয়ঢাক ওয়েবস্টোর থেকে বইটির অর্ডার দিন।

doshbhutu

Leave a Reply