এই লেখকের আগের গল্প- ম.জা.রু এল বঙ্গে, ঘণ্টা রহস্য

এক
“সেই ছোটবেলা থেকেই আমার একটা ভূত পোষার খুব শখ।” দীপের বলা হাড়হিম করা ভূতের গল্পের রেশ কেটে উঠবার আগেই বলে উঠল অমিত।
“মানে?” প্রচণ্ড বিস্ময়ে একসঙ্গে বলে উঠল রাজু, কৌশিক, তীর্থ সবাই।
আজ শুক্রবার। স্কুলে আজ পুরো এক ঘণ্টা দশ মিনিটের টিফিন। স্কুলের জন্মলগ্ন থেকেই এই নিয়ম চলে আসছে। এই দিনটা সবার খুব প্রিয়। বেশ জমিয়ে খেলা যায় স্কুলের মাঠে। কিন্তু আজ মাঠে খেলতে বারণ করে দিয়েছেন স্যারেরা কারণ, দু-দিন পরেই স্কুলের বাৎসরিক স্পোর্টস হবে বলে মাঠ সারানো আর সাজানোর কাজ চলছে। তাই সবাই মিলে আজ দীপকে ঘিরে ধরে গল্প শোনানোর দাবি জানিয়েছিল টিফিনের সময়। দীপ তার স্বাভাবিক, সহজাত দক্ষতায় একটা রোমহর্ষক ভূতের গল্প বলছিল এতক্ষণ ধরে। আর দীপের গল্প বলার এমনই কৌশল, যে সেটা আদৌ গল্প বলে মনেই হয় না—মনে হয় একদম সত্যি ঘটনা, যেন চোখের সামনেই ঘটে চলেছে ঘটনাগুলো। গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠছিল সবারই। তার মাঝে হঠাৎ অমিতের এমন বে-আক্কেলে কথা শুনে সবাই সন্দেহের চোখে তাকিয়ে রইল ওর দিকে।
সবার দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে অমিত জামার কলারটা একটু তুলে নিয়ে আবার বলল, “অমন করে দেখার কী আছে? তোদের কি বোধবুদ্ধি কিছুই নেই! যত্তসব বোকা-হাঁদার দল। ভূত বলে কিছু আছে নাকি? থাকলে তো কবেই আমি দু-চারটে পুষে নিতাম।”
“একদম ঠিক বলেছিস। গতবছর আমি যখন টেবিল টেনিস টুর্নামেন্ট খেলতে ভিয়েতনাম গিয়েছিলাম তখন ওখানকার প্যাগোডাগুলোয় ভূতের সন্ধানে ঘুরে বেড়িয়েছিলাম। ওখানে তো যুদ্ধে নিহত কোটি কোটি ভূতের বাস শুনেছি। আমি তো কই একটাও দেখতে পেলাম না।” রাজকীয় চালে জিৎ বলল।
অন্যসব বন্ধুরা তখন একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে আর মুখ টিপে হাসছে। তীর্থর মুখ একটু পাতলা। সে আর থাকতে না পেরে জিৎ আর অমিতের দিকে তাকিয়ে বলেই উঠল, “তোদের এই বড়ো বড়ো ডায়ালগগুলো আর বন্ধ হবে না বল। সবে দীপের গল্পটা শেষ হল, এখনও গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠছে। আর তোরা আবোল-তাবোল বকতে শুরু করে দিলি!”
অমিত একেবারে লাফিয়ে উঠে রণং-দেহি মেজাজে তীর্থর সামনে এসে কিছু একটা বলতে গিয়ে ক্লাসের দরজা দিয়ে সৌমেন-স্যারকে ঢুকতে দেখেই একেবারে চুপচাপ হয়ে শান্তশিষ্ট, ভালো মানুষের মতো বেঞ্চে তার জায়গায় বসে পড়ল। দরজার একদম সামনেই দাঁড়িয়ে ছিল রাজু আর দীপ। সৌমেন-স্যার দুই হাতে দুজনের কান শিঙাড়ার মতো পাকিয়ে বললেন, “কী হে বাছাধনেরা, টিফিন পিরিয়ড যে শেষ হয়ে গেছে সে খেয়াল নেই? এখনও ফুর্তি চলছে! এমন চললে তো স্কুলের গণ্ডিটাই পার হতে পারবে না, বাছারা।”
ততক্ষণে সবাই যে-যার বেঞ্চে নিজের নিজের জায়গায় বসে পড়েছে। স্যার কানের ওপর হাতের জোর একটু আলগা করতেই রাজু আর দীপও নিজেদের জায়গায় বসে পড়ল। এমন নয় যে রাজু বা দীপ ক্লাসের খারাপ ছেলে, বরং রীতিমতো স্ট্যান্ড করা ছেলে তারা। তবু স্যার যে কেন তাদেরই এমন অ্যাটাক করেন, কিছুতেই মাথায় ঢোকে না তাদের। মনটা বেশ ভারী হয়ে গেল তাদের। তবে স্যার পড়ানো শুরু করতেই তারা সম্পূর্ণ মনোযোগী হয়ে ভৌতবিজ্ঞানের চিহ্ন-সংকেতের গোলকধাঁধায় মনোনিবেশ করল। অবশেষে স্যার পড়ানো শেষ করে যখন বলে ওঠেন, “এই চিহ্নগুলো সারাজীবন মাদুলি করে গলায় ঝুলিয়ে রাখবি, তবেই উতরাতে পারবি পরীক্ষায়।” তখন নড়েচড়ে বসে তারা। স্যার ক্লাস শেষ করে বেরিয়ে যাবার সময় বলে যান, “রাজু, তীর্থ, কৌশিক আর দীপ, স্কুল শেষ হলে বাড়ি যাবার আগে টিচারস রুমে আমার সঙ্গে দেখা করে যাবি।”
তারা চারজন তো ভয়েই অস্থির—না জানি আরও কী শাস্তি অপেক্ষা করে আছে তাদের জন্য। সবথেকে বেশি ভয় তো এই যে, যদি স্যার বাড়িতে খবর পাঠিয়ে অভিভাবক ডেকে পাঠান! তবেই তো চিত্তির। জিৎ আর অমিতের তখন খুব মজা। অমিত বেঞ্চে বসেই বলে ওঠে, “কেমন, গর্দভের দল! এবার হল তো। বলেছিলাম, আমার সঙ্গে পাঙ্গা নিবি না। এবার দেখ কেমন লাগে।”
রাজুরা কোনও উত্তর না দিয়ে মনে ভয় নিয়ে চুপ করে বসে থাকে। দুরুদুরু বুকে একটু অন্যমনস্ক হয়েই বাকি ক্লাসগুলো কাটিয়ে দেয়—কী জানি কী শাস্তি অপেক্ষা করে আছে তাদের জন্য, এই ভাবতে ভাবতে।
অবশেষে স্কুল ছুটির ঘণ্টা পড়ে গেলে দীপ, রাজু, তীর্থ আর কৌশিক গুটি গুটি পায়ে অতি ভয়ে ভয়ে টিচারস রুমে গিয়ে দেখা করে সৌমেন-স্যারের সঙ্গে। তাদের দেখেই স্যার বলে ওঠেন, “ও, তোরা এসে গিয়েছিস! সামনেই তো বাৎসরিক পরীক্ষা। তোদের প্রিপারেশন কেমন?”
কোনও উত্তর না দিয়ে তারা চারজন চুপ করে মাথা নীচু করে থাকে।
কিছুক্ষণ পর স্যার আবার বলে ওঠেন, “দীপ, সামনের রবিবার থেকে প্রতি রবিবার সকালে আমার কাছে চলে আসবি। তোর অঙ্কের হাল এখনও পাতে দেবার মতো নয়। আর তোরা তিনজন চলে যাবি রমাপদ-স্যারের কাছে। তোদের বাংলা আরও ভালো করতে হবে। যা, এবার লেজ গুটিয়ে বাড়ি যা আর মন দিয়ে পড়াশুনা কর। মনে রাখবি, তোদের ওপর স্কুলের অনেক আশা।”
টিচারস রুম থেকে বেরিয়ে এসে ওরা আনন্দে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে। শুধু তীর্থ বলে, “অমিত আর জিৎকে একটু জব্দ করতে হবে।”
দুই
পরীক্ষার চাপে ক’দিন আর বন্ধুদের ঠিকমতো দেখাসাক্ষাৎ বা গল্পগুজব হয়নি। সবে গতকাল পরীক্ষা শেষ হয়েছে আর আজ তারা সকলে মিলিত হয়েছে রাস মাঠে। সামনেই নীলুর দিদির বিয়ে; সেই উপলক্ষ্যে উপহার কেনাকাটা করতে যাবে আর একটু গল্পগুজবও হবে। গল্প বেশ ভালোই জমে উঠেছে নিজেদের মধ্যে। বিশেষ করে যেখানে দীপ উপস্থিত আছে সেখানে গল্প না জমার কোনও কারণই নেই। গল্প-কবিতা শুধু লেখায় নয়, মুখে মুখে তৈরি করে নেওয়ার অসম্ভব সুন্দর দক্ষতা আছে দীপের। তাদের সব বন্ধুদেরই স্থির বিশ্বাস, দীপ পরবর্তীকালে অনেক বড়ো সাহিত্যিক হবে। কৌশিক তো এখন থেকেই দীপকে ‘কথা সাহিত্যিক’ বলে অভিহিত করে।
গল্পের মাঝেই রাজু বলে ওঠে, “আচ্ছা, নীলুর দিদির বিয়েতে দীপ যদি একটা কবিতা আমাদের সকলের পক্ষ থেকে উপহার দেয়, কেমন হয়?”
বলার সঙ্গে সঙ্গে অন্য সকলে হইহই করে রাজি হয়ে দীপকে চেপে ধরে এখুনি একটা কবিতা লেখার জন্য। লাজুক দীপ নিমরাজি হয়ে বলে, “কাগজ-কলম দে, লিখেই ফেলি একখান।”
সঙ্গে সঙ্গে পকেট থেকে কাগজ-কলম এগিয়ে দিয়ে জিৎ বলে, “তুই লিখলে ভালো ছাড়া খারাপ হবে না কখনও।”
দীপকে কবিতা লিখতে দিয়ে একটু সরে এসে তারা নীলুর দিদির বিয়েতে কে কী কাজ করবে সেই নিয়ে আলোচনা করতে থাকে। সেখানেই জিৎ দায়িত্ব নেয়, বর-কনের বসার জায়গা সমেত পুরো বিয়েবাড়িটা সে অমিতের সাহায্য নিয়ে সাজিয়ে দেবে। এর আগে তারা সবাই জিৎ-এর শিল্প-প্রতিভার অনেক কথা শুনেছে। এবার চক্ষু-কর্ণের বিবাদভঞ্জন হবে। নীলু তো খুব খুশি। সুমনও খুব খুশি কারণ, বিয়েবাড়িটা তাদেরই বাগানবাড়িতেই হবে কিনা।
এইসব আলোচনার মধ্যেই দীপের কবিতা লেখা হয়ে গেছে। সবাই দীপকে ঘিরে ধরে তার উদাত্ত কণ্ঠে স্বরচিত কবিতা শুনতে থাকে। শেষ হয়ে যাবার পরেও সকলে একটা অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে রয়ে যায়। এত তাড়াতাড়ি এত সুন্দর কবিতার যে জন্ম হতে পারে সেটা তাদের কল্পনারও অতীত।
অবশেষে ঘোর ভাঙে দীপেরই ডাকে—“কী রে, কেমন হয়েছে বললি না? চলবে তো?”
“চলবে মানে! দৌড়াবে।” দীপের হাত থেকে কবিতা লেখা কাগজটা নিয়ে পকেটে রাখতে রাখতে বলে জিৎ, “আমি এটা সুন্দর করে লিখে ছবি এঁকে কারুকার্য করে নিয়ে আসব।”
সকলে জিৎ-এর এহেন দারুণ উদ্যোগকে স্বাগত জানায়।
অবশেষে সবাই মিলে একসঙ্গে বিয়ের গিফট কেনার উদ্দেশ্যে দোকানের দিকে রওনা দেয়। রাজু, দীপের পাশে পাশে হাঁটতে হাঁটতে বলে, “তুই শুধু দীপ নোস, তুই জিনিয়াস দীপ।”
তিন
অবশেষে নীলুর দিদির বিয়ের দিন আজ উপস্থিত। সন্ধ্যাবেলা একটু তাড়াতাড়িই দীপ, রাজু, তীর্থ আর কৌশিক পৌঁছে গেল সুমনদের বাগানবাড়িতে। নীলু আর সুমন মুখ কালো করে একদম ঢোকার মুখটাতেই দাঁড়িয়ে আছে। তারা আসতেই সুমন বলল, “কেলো হয়ে গেছে বুঝলি। জিৎ আর অমিতের তো সকাল সকাল এসে সাজানোর কথা ছিল। ওরা কেউই আসেনি। নীলুর মা খুব রাগারাগি করছেন।”
“সে কি রে! ব্যাপারটা তো খুব চাপের হয়ে গেল।” কৌশিক বলল।
“শোন, সময় নষ্ট করে লাভ নেই। যা হবার হয়ে গেছে। এখন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমরাই সব সাজিয়ে গুজিয়ে নিই চল।” দীপ বলল।
রাজু একটু চিন্তিত সুরে বলল, “দেখ ভাই, এসব শিল্পকলা আমার ঠিক আসে না। তোরা খুব ভালো করেই সেটা জানিস।”
তীর্থ সাহস জুগিয়ে বলে উঠল, “অরবিন্দ-স্যারের কথা ভুলে গেছিস—ট্রাই, ট্রাই অ্যান্ড ট্রাই! চল চেষ্টা করি। লেটস হোপ ফর দি বেস্ট।”
তারা ক’জন বন্ধু মিলে লেগে পড়ল বিয়েবাড়িতে বর-কনের বসার জায়গা ফুল দিয়ে সাজাতে। বেশ কিছুক্ষণের চেষ্টার ফলে মোটামুটি একটু ভদ্রস্থ সাজানো গোছানো হল জায়গাটা। নীলুর মা এসে অনেক আশীর্বাদ করে গেলেন তাদের।
বন্ধুরা সবাই মিলে তখন দিদিকে ঘিরে বসে আছে। এরপর থেকে নীলুর বাড়ি এলে আর দিদির সঙ্গে দেখা হবে না, এটা ভেবেই সকলের মনখারাপ হয়ে যাচ্ছে। নীলু তো একদম দিদির গা ঘেঁষে বসে আছে, কিছুতেই কাছছাড়া করতে চাইছে না দিদিকে। নিমন্ত্রিত অতিথিরা একে একে আসতে শুরু করেছেন। বরযাত্রীও সব চলে এসেছে। কিন্তু জিৎ আর অমিতের এখনও দেখা নেই। বিয়ের অনুষ্ঠান শুরু হবার সময় হয়ে গিয়েছে। ঠিক এমন সময় হন্তদন্ত হয়ে সুটেড-বুটেড হয়ে তুমুল সুগন্ধির গন্ধ ছড়াতে ছড়াতে এসে হাজির হল জিৎ আর অমিত। এসেই বন্ধুদের দিকে একবারও না তাকিয়ে সোজা দিদির সামনে গিয়ে নাটকীয় ভঙ্গিতে জিৎ বলল, “পরম প্রিয় দিদি, স্বহস্তে রচিয়াছি কবিতা দুইখান, এই কবি।”
কৌতুকপ্রিয় দিদি মৃদু হেসে বললেন, “তবে শুনাইয়া ফেলো।”
সঙ্গে সঙ্গে জিৎ আবেগভরে গড়গড় করে পরপর দুইখানা কবিতা আবৃত্তি করে শুনিয়ে দিল। আবৃত্তি শেষ হলে উপস্থিত সকলে হাততালি দিয়ে উঠল। আবৃত্তি যে জিৎ খুব ভালোই করে, এ-ব্যাপারে কোনও সন্দেহই নেই। তার ওপর স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি উপস্থিত সকলেরই প্রচুর প্রশংসা কুড়িয়ে নিল। শুধু দীপ আর তার বন্ধুরা বিস্ময়ে একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করছিল।
কিছুক্ষণ পর কৌশিক দীপকে প্রশ্ন করল, “প্রথম কবিতাটা তো তোর লেখা জানি। দ্বিতীয়টা কি ওর নিজের লেখা?”
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে দীপ উত্তর দিল, “বিখ্যাত কবি সুশীল সরকারের।”
“অ্যাঁ! বলিস কী!” বিস্ময়ে রাজুর মুখখানা হাঁ হয়ে গিয়েছে।
এর মধ্যে বিয়ের মূল অনুষ্ঠানের জায়গায় কনেকে নিয়ে যাওয়ার জন্য ঘরের মধ্যে রীতিমতো হুড়োহুড়ি শুরু হয়ে গেল। সেই সময় ওই ঘর থেকে জিৎ চুপচাপ বেরিয়ে গেল আর অমিত বেরিয়ে যাওয়ার আগে দীপের কাঁধে হাত রেখে ব্যঙ্গ করে বলে গেল, “প্রতিভা থাকলেই শুধু হয় না, সেই প্রতিভার সঠিক জায়গায় সঠিকভাবে বিচ্ছুরণও দরকার।”
বিয়েবাড়ির অত হই-হট্টগোলের মধ্যেও কথাটা তীর্থদের কানে ঠিক ভেসে এল। তীর্থ আপন মনেই বলল, ‘এর বদলা নিতেই হবে।’
কৌশিক দীপের কাঁধে হাত রেখে বলল, “সৌমেন-স্যার ঠিকই বলেন—যার বাম কান কাটা, সে রাস্তার বামদিক চেপে যায়, যার ডান কান কাটা সে রাস্তার ডানদিক চেপে যায়। আর যার দু-কান কাটা সে রাস্তার মাঝখান দিয়ে যায়।”
চার
এর বেশ কিছুদিন পর মাঘ মাসের চতুর্দশী অমাবস্যায় দীপের দেশের বাড়িতে রটন্তী কালীপূজা উপলক্ষ্যে সকলকে আমন্ত্রণ জানাল দীপ। তাদের দেশের বাড়িতে কালীমন্দির আছে। বেশ ঘটা করেই হয় সে-পূজা। দীপের কাছ থেকেই শুনেছে রাজুরা যে সেই দেবী খুব জাগ্রত। তাই রাজু, কৌশিক, সুমন, নীলু আর তীর্থ দীপের সঙ্গে আলোচনা করে ঠিক করে নিল যে তারা বিকেল-বিকেলই চলে যাবে সেখানে, পুরো পূজা দেখে একেবারে পরের দিন সকালেই ফিরবে। অমিত আর জিৎও যাবে, তবে সন্ধ্যাবেলায় যাবে আর একটু থেকেই ফিরে আসবে। আসলে ঠাকুর-দেবতায় তাদের তেমন ভয় বা ভক্তি কোনোটাই নেই। তাই দীপ যখন বলল, “অমন হেলাছেদ্দা করিস না। কখনও বলছিস ভূত পুষবি, কখনও বলছিস ঠাকুর-দেবতা নেই, ধর্মে সইবে তো?” তখন উত্তরে একটু বিরক্ত হয়েই অমিত বলল, “ধুস! গর্দভ কোথাকার! ভূত আবার কী? শুধু বর্তমানই আছে, আর কিছু নেই।”
মৃদু হেসে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রাজু বলল, “দেখ অমিত, তুই এক মুহূর্ত আগে যে-কথাটা বললি সেটা ইতিমধ্যেই ভূত-পর্বে চলে গেছে, আর একটু পরে যে-কথাটা বলবি সেটা ভবিষ্যতের গর্ভে। তাই ভূত-ভবিষ্যৎ দুটোই আছে। বরং বর্তমানটাই অস্তিত্বহীন। ভূত-ভবিষ্যৎ দুটোই স্থির, অস্থির শুধু বর্তমান। আর এই পুরোটাই নিয়ন্ত্রণ করছে নিয়তি।”
“আরে দূর বাবা! তোদের শুধু যুক্তিহীন বোকা বোকা কথা। তোরা তোদের মতো চলে যাস, আমি আর জিৎ সন্ধ্যার দিকে একবার গিয়ে ঘুরে আসব। আর হ্যাঁ, যদি পারিস তোদের সাধের ভূতও আমায় দেখাস।”
ফিক ফিক করে হাসতে হাসতে জিৎ-এর কাঁধে হাত রেখে চলে গেল অমিত। রাজুরাও গুটিগুটি বাড়ির দিকে এগোল।
পূজার দিন বিকেল-বিকেলই রাজু, কৌশিক, তীর্থ, সুমন, নীলু পৌঁছে গেল হরিনগর—দীপের দেশের বাড়ি। দীপ আগের দিনই চলে এসেছে সেখানে। দীপের মা-বাবা অনেক আদর আপ্যায়ন করল তাদের। পূজা শুরু হতে অনেক দেরি আছে দেখে তারা দীপকে ছাড়াই একটু ঘুরতে বার হল গ্রামের এদিক-ওদিক। ইট-পাথরের শহরের কৃত্রিমতার কোনও চিহ্ন সেখানে নেই। গ্রামের সবুজ নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখে চোখ জুড়িয়ে গেল তাদের। ফেরার পথে মন্দিরের ঠিক কাছটায় একটা মিশমিশে কালো বেড়ালের ওপর চোখ পড়ল তাদের। অদ্ভুত সুন্দর দেখতে বিড়ালটা যেন তাদের দেখেই সোহাগভরে আদরের ডাক ডেকে উঠল—‘মিয়াঁও।’ তীর্থ এগিয়ে গিয়ে কোলে তুলে নিল বিড়ালটাকে।
“কী রে, কালো বিড়াল কোলে নিলি যে বড়ো! ওটা তো অশুভ প্রতীক।” বলল সুমন।
“আমি যতদূর জানি আমাদের শাস্ত্রে কালো বিড়াল শুভ বা অশুভ এমন কিছু উল্লেখ নেই। তবে কালো বিড়ালকে আঘাত করা বা তাকে মেরে ফেলাকে অশুভ হিসাবে গণ্য করত ইজিপ্সিয়ানরা। বিশ্বাস করত, কালো বিড়ালের মধ্যে কিছু আধ্যাত্মিক শক্তি রয়েছে। তারা কালো বিড়ালকে পুজোও করত।” রাজু বলে উঠল।
কৌশিক বলল, “অনেক দেশে ও সমাজে কালো বিড়ালকে এখনও সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এমনকি স্কটিশ, ব্রিটিশ বা ইতালিয়ানরা এখনও অনেক সময় কালো বিড়ালকে শুভ উপহার হিসাবে দেয়।”
“ওসব ইতিহাসের কচকচানি রাখ তো। আমার মাথায় একটা দারুণ প্ল্যান এসেছে।” চোখের কোণে দুষ্টুমিভরা হাসি নিয়ে তীর্থ বলে উঠল।
চুপিচুপি তীর্থ তার দুষ্টুমির প্ল্যানটা ভেঙে বলল সবাইকে। সবটা শুনে ওরা নিজেরাই বেশ এক্সসাইটেড হয়ে পড়ল।
নীলু বলল, “বাহ্! বেশ জব্দ হবে এবার।”
বিড়ালটাকে কোলে করে নিয়ে তারা যখন দীপের বাড়িতে ঢুকল, দীপ বললো, “কী রে তোরা মিনিকে পেলি কোথায়? ও তো অচেনা কারও কোলে ওঠে না। মন্দিরের মধ্যেই থাকে। তোদের কাছে তো দেখছি বেশ আছে।” তারপরই বলল, “সন্ধ্যা হয়ে গেছে। তোরা এবার ঘরেই বোস। জিৎ আর অমিতও এসে গেছে, ওরা ঘরে বসে আছে। পূজা শুরু হয়ে গেলে আমি ডেকে নিয়ে যাব তোদের। আমি একটু মন্দির থেকে ঘুরে আসি।”
কৌশিক শুধু দীপের কাছে জানতে চাইল, “তোদের মেন সুইচটা কোথায় একটু বলে যা।”
“ওই তো সিঁড়ির ঘরের কাছে। কেন রে, ওতে আবার কী দরকার? দেখিস পূজা-পার্বণের দিনে কোনও দুষ্টুমি করিস না যেন।” বলেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল দীপ।
দীপ বেরিয়ে যেতেই নিজেদের মধ্যে আর-একবার পুরো প্ল্যানটা ছকে ফেলল তারা। প্ল্যান অনুযায়ী মেন সুইচের কাছে পজিশন নিল কৌশিক। তীর্থ মিনিকে কোলে করে নিয়ে চুপিচুপি পা টিপে টিপে গিয়ে দাঁড়াল জিৎ আর অমিত যে-ঘরে বসে আছে ঠিক তার পাশের ঘরটায়। বাকিরা নীচে বারান্দায় অপেক্ষা করতে থাকল। এবার প্ল্যান অনুযায়ী কৌশিক মেন সুইচ বন্ধ করবে আর সঙ্গে সঙ্গে তীর্থ মিনিকে কোল থেকে নামিয়ে ঢুকিয়ে দেবে অমিত আর জিৎ যে-ঘরে বসে আছে সেই ঘরে। অন্ধকারে কালো বিড়ালের জ্বলন্ত চোখ দেখে যে অমিত আর জিৎ পিলে চমকে গিয়ে চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করবে সে-ব্যাপারে ওরা নিশ্চিত। যতই মুখে হম্বিতম্বি করুক, ওরা দুজনেই যে ভিতুর ডিম এটা ওরা সবাই জানে। এখন শুধু আলো বন্ধের অপেক্ষা।
দু-এক মুহূর্ত অপেক্ষা করতে না করতেই ওপর থেকে ত্রাহি চিৎকার শুনে দুদ্দাড় করে ওপরের ঘরের দিকে দৌড়ল ওরা সবাই। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হল এই যে কৌশিক তখনও মেন সুইচ না নেভানোয় পুরো বাড়িতে আলো কিন্তু দিব্যি জ্বলছে। কৌশিকও রাজুদের সঙ্গে সিঁড়ি ভেঙে পৌঁছে গেল তীর্থর কাছে। তারা অবাক হয়ে দেখল তীর্থ সেখানেই কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মিনিকে কোলে নিয়ে আর পাশের ঘর থেকে পরিত্রাহি চিৎকার শোনা যাচ্ছে অমিতের। ঝটপট ঘরে ঢুকে ওরা দেখল জিৎ আর অমিত খাটের এককোণে জডসড় হয়ে বসে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে ঠকঠক করে কাঁপছে আর চোখ বন্ধ করে তুমুল চিৎকার করছে। ওরা তো কিছুই বুঝতে পারল না। কৌশিক প্রথম বলে ওঠল, “কী হল রে? কেসটা কী? এমন চেঁচাছিস কেন?”
কৌশিকের গলার আওয়াজ পেয়ে জিৎ আর অমিত চিৎকার থামিয়ে চোখ খুলে ওদের এক পলক দেখেই আবার চেঁচাতে লাগল—“ওরে বাবা রে! কালো শেয়াল আমাদের খেয়ে নিল রে।”
“কোথায় শেয়াল? আমরা ছাড়া আর কেউ এখানে আছে?” তীর্থ বলল।
“তোর কোলে।” অস্ফুট আওয়াজ বেরিয়ে এল অমিতের মুখ থেকে।
তীর্থর মনে হল ওর কোলে থাকা মিনিকে কোনও কারণে ওরা দুজন এখন ভয় পাচ্ছে। তাই কোল থেকে নামিয়ে দিল মিনিকে। মিনিও চুপিচুপি বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।
“চোখ খোল। আমার কোলে আর বিড়াল নেই।”
চিৎকার থামিয়ে ধীরে ধীরে চোখ খুলল দুজন। ওদের দেখে বোঝাই যাচ্ছে যে ওরা কোনও কারণে ভীষণ ভয় পেয়েছে। কিন্তু ভয়ের কারণটা যে কী সেটা তীর্থরা বুঝতে পারছিল না। রাজু ওদের মুখে-চোখে জলের ঝাপটা দিল।
কিছুক্ষণ পর জিৎ আর অমিত একটু শান্ত হয়ে যা বলল, তা শুনে কৌশিকদেরও চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। হঠাৎ নাকি ঘরের আলো নিভে গিয়েছিল আর একটা কালো বিড়াল ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়েছিল। তারপর সেই বিড়ালটার আকার বাড়তে বাড়তে বিশাল একটা কালো শিয়াল হয়ে গিয়ে তাদের দিকে এগিয়ে আসছিল। রাজু, সুমন, কৌশিক, নীলু আর তীর্থ একে অপরের দিকে বিস্ময়ে চোখ চাওয়াচাওয়ি করল। তারা তো আলোও নেভায়নি, মিনিকে কোল থেকে নামায়ওনি, তাহলে এটা কেমনভাবে সম্ভব সেটাই ভেবে পাচ্ছিল না তারা।
জিৎ আর অমিত আর এক মুহূর্ত সেখানে থাকতে রাজি হল না। বাইরে বেরিয়ে তাড়াতাড়ি তাদের গাড়ি করে চলে গেল। কৌশিকরা সবাই চুপচাপ এগোতে লাগল মন্দিরের দিকে। ঘটনার আকস্মিকতায় তারাও বেশ চিন্তিত।
পথেই দীপের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল তাদের। দীপ তাদের ডাকতেই আসছিল। রাজুর মুখ থেকে সব ঘটনা শুনতে শুনতে দীপ সবাইকে নিয়ে মন্দিরের দিকে হাঁটতে থাকল। সবটা শুনে দীপ শুধু বলল, “এই পৃথিবীতে কত কিছুই তো ঘটে, সব ঘটনার কি আর ব্যাখ্যা করা যায়? আধি-ভৌতিক না আধি-দৈবিক সে নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ বিচার করতে না বসাই ভালো।”
রাজু কিন্তু একটু আনমনা হয়েই রইল। পুরো ঘটনাটা তখনও তার মনের মধ্যে পাক খেয়ে চলেছে।
কথা বলতে-বলতেই তারা পৌঁছে গেল মন্দিরে। মিনি শান্ত হয়ে বসে আছে মন্দিরের চাতালে। কালী মায়ের ভুবনমোহিনী রূপের ছটায় মন্দির যেন আরও বেশি আলোকিত হয়ে গেছে। দু-হাত জোড় করে চোখ বুজে ভক্তিভরে মাতৃ-প্রতিমাকে প্রণাম করতে-করতেই রাজুর মনের মধ্যে মায়ের চার হাতের ছবি যেন ভেসে উঠল—দু-হাতে খড়্গ আর অসুরের ছিন্ন মুণ্ডু আর অন্য দুই হাতে বর ও অভয় মুদ্রা। রাজুর মনে হল মা যেন তাদের দিকে তাকিয়ে হাসছেন। এক অনাবিল আনন্দধারা যেন বয়ে চলেছে গোটা মন্দির চত্বরে। এদিকে পুরোহিতমশাইও পূজা শুরু করে দিয়েছেন। মন্দিরের গর্ভগৃহ থেকে ভেসে আসছে পূজার মন্ত্র—
“ওঁ শবারুঢ়াং মহাভীমাং ঘোরদংস্ট্রাং বরপ্রদাম।
হাস্যযুক্তাং ত্রিনেত্রাঞ্চ কপালকর্ত্তৃকাকরাম॥
মুক্তকেশীং লোলজিহ্বাং পিবন্তীং রুধিরং মুহু।
চতুর্ব্বাহু যুতাং দেবীং বরাভয়করাং স্মরেৎ॥”
অলঙ্করণ- মিঠু ভট্টাচার্য
জয়ঢাকের সমস্ত গল্প ও উপন্যাস