জয়তী রায়ের আগের গল্প- চোখ, গজুমামা জিন্দাবাদ, আলোর কৌটো , আলো আসবে, গজুমামা ও গুহা রহস্য, উড়ন্ত কাকু আর গজুমামা

চ্যাটার্জি বাড়ি আজ থমথম করছে। অকারণে নয়। কারণ বেশ প্যাঁচালো। জটিল। বাড়ির সদস্য সংখ্যা ছয়। বুড়োকর্তা বিমলবাবু রিটায়ার্ড পুলিশ ইন্সপেক্টর। পুলিশ অফিসার না হয়ে কবি হলে মানাত বেশি। চাকরি করাকালীন থানায় বসে হম্বিতম্বি না করে তিনি লিখতেন কবিতা। এই নিয়ে চোরেরা হাসাহাসি করত। রিটায়ার করেই সুযোগ নিয়ে কবিতার স্রোত বইয়ে দিয়েছেন। বাড়ির লোক তাই ওঁকে একটু এড়িয়ে চলে। তস্য গিন্নি সৌদামিনী ছিলেন উচ্চমাধ্যমিক স্কুলের অঙ্কের শিক্ষিকা। রিটায়ার করলে কী হবে, মাস্টারি মেজাজ আছে ভালো মতন।
চ্যাটার্জি কর্তা-গিন্নির আছে দুই পুত্র। বড়োজন অরিন্দম, কলেজের ইংরেজির লেকচারার। বিবাহিত। একটি মিষ্টি কন্যার পিতা। কন্যার নাম মিঠু, বয়স চার। কন্যার মা পামেলা, বাড়িতেই থাকে। পামেলা ইদানীং খুব বেশি চুপ করে থাকে। ভিতরে কোনও প্রবলেম হচ্ছে।
ছোটো ছেলে সঞ্জয়, ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে। থার্ড ইয়ার। ক্রিকেট খেলে। হাতখরচের জন্য এখনও মায়ের দরবারে হাত পাততে হয়।
বাড়িতে দুজন কাজের লোক। মিনতি রান্না করে। কৈলাস বাজার করে, ফাইফরমাশ খাটে। দুজনেই সকালটুকু থাকে, নিজেদের কাজ গুছিয়ে চলে যায়। পুরোনো লোক এবং বিশ্বাসী। মিনতি আজকাল ঝামেলা করছে। কাজ ছেড়ে দেবে। মাসের টাকা বাড়াতে বলছে।
***
তদন্ত করতে এল রজত রে। লোকাল থানার অফিসার। বিমলবাবুর বন্ধু ও প্রাক্তন কলিগ ইন্সপেক্টর অনিমেষের ছেলে। এই বাড়িতে যাতায়াত আছে। ঘনিষ্ঠতার সূত্রে গতকাল রাতে অরিন্দম সরাসরি ফোন করে। রজত কথা দেয় সে নিজেই আজ আসবে।
রজতের চেহারা স্মার্ট। কাটা কাটা। লম্বা, সুগঠিত, শ্যামলা। বয়স বত্রিশ হবে। প্লেন ড্রেস অর্থাৎ জিন্স আর টি-শার্ট পরে এসেছে। ঘরে ঢুকে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করল বিমলবাবু আর সৌদামিনীকে। চোখের দামি সানগ্লাস খুলে বাইরের ঘরের টেবিলে রেখে হাতজোড় করে নমস্কার করল সবাইকে। বিমলবাবু খুশি। চশমা পরা ভাসা ভাসা চোখ দুটো উজ্জ্বল হয়ে উঠল। স্নেহ মেশানো স্বরে বললেন, “এসো এসো, রজত। শুনলাম, তুমি আসবে। বেশ করেছ। আজ এখানেই দুটো ডাল-ভাত খেয়ে যেও। আপত্তি কোরো না।”
রজত মিষ্টি হেসে বলল, “হ্যাঁ, কাকাবাবু। তার আগে যে কাজটার জন্য এসেছি, দেখি কতটা কী পারি!”
অরিন্দম কাতর গলায় বলে, “দেখো ভাই রজত, পারলে তুমিই পারবে। কতগুলো ঘটনা শুনেছি তুমি বেশ অদ্ভুত কায়দায় সমাধান করেছ।”
রজত কাঁধ ঝাঁকিয়ে তাকায় অরিন্দমের দিকে। ছোটো থেকে চেনা। গোলগাল ভালোমানুষ অরিন্দমের স্বভাব চিরকাল নরমসরম। গতকাল ফোন করার সময় কেঁদেই ফেলে প্রায়। রজত আশ্বাস দেয়—”না গো। আমি তেমন কিছু না। একদমই শখের গোয়েন্দা। তোমরা আপনজন, তারপর দরকারি জিনিস। বাবা বলল, যা, তুই একবার যা। আচ্ছা, এবার একটু জিজ্ঞেস করি? শুক্রবার রাতে দেখলে ওই দুটো নেই, তাই তো? শনিবার সারাদিন খুঁজে রাতে আমায় ফোন করলে?”
অরিন্দম মাথা চুলকে টেনশন-ভরা গলায় বলে, “হ্যাঁ, ঠিক তাই। আর একটা কথা, গ্যারান্টি যে বাইরের লোক একজনও আসেনি, বুঝলে? কাজের লোক দুজনও ভীষণ বিশ্বাসী। একটা সেফটিপিন কোনোদিন নেয়নি। ভালো করে ভেবে তোমাকে বলছি।”
রজত খুশি হল।—”বাহ্, অরিন্দম। তুমি তো দারুণ হোমওয়ার্ক করে রেখেছ। এইটা একটা ভালো পয়েন্ট। এতে সহজ হবে ব্যাপারটা।”
অরিন্দম হাত কচলে বলল, “কী করব ভাই? আমার যে জলে ডোবা মানুষের অবস্থা।”
খোলামেলা আড্ডার ঢঙে ঘরোয়াভাবে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হলে রজত বলল, “চুরি হয়েছে দুটো জিনিস। গোপাল ঠাকুরের মাথার হিরের মুকুট আর অরিন্দমের পাসপোর্ট। শুক্কুরবার বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত অঘটন ঘটেনি, কারণ কাকিমা বিকেলে ঠাকুরের ভোগ দেওয়ার সময় মুকুট দেখেছেন। আর অরিন্দম নিজের হাতে পাসপোর্ট রাখে ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ারে। তখন বাজে সন্ধ্যা সাতটা। কাজের লোক দুজন সন্দেহ থেকে বাদ। কারণ, ওরা বাড়ি চলে যায় দুপুর দুটোর মধ্যে। ঠিক বলছি তো?”
সকলে মাথা নেড়ে সমর্থন জানালে রজত জিজ্ঞেস করে, “গোপালের হিরের মুকুট কতবছর আগের?”
উত্তর দেয় সঞ্জয়—”আড়াইশো বছর তো হবেই।”
রজত তারিফ করল—”দারুণ তো! প্রাচীন সম্পত্তি।”
সঞ্জয় মাথা নেড়ে বলে, “হ্যাঁ। পূর্বপুরুষের থেকে পাওয়া। ওইটুকুই দামি কিছু আছে বাড়িতে।”
“হিরে তো। অনেক দাম হবে। কত আন্দাজ?”
অরিন্দম হাসে।—”আরে না না। ছোট্ট সোনার গোপাল, তার ছোট্ট মুকুট। তবে হ্যাঁ, সেন্টিমেন্টাল ভ্যালু একটা আছে আর দাম? পাঁচ লাখ?”
রজত বলল, “উঁহু। প্রাচীন জিনিসের মার্কেট ভালো। বিক্রি হচ্ছে দেশের বাইরে। আরও বেশি হবে।”
এই সময় মিনতি চা দিয়ে গেল।
একপ্রস্থ চা খেয়ে রজত বলল, “আচ্ছা, একটা কথা, বাড়িতে অনেকদিন ধরে টুকটাক জিনিস মিসিং? তাই তো?”
“এক্কেবারে।”
“যেমন?”
পায়ের উপর পা তুলে আরামে বসে রজত। রবিবার সকাল। প্রচন্ড গরম ছিল দিন কতক। বৃষ্টি হয়ে একটু নরম আবহাওয়া। কাকুদের বাড়িটা খোলামেলা। গড়িয়া দিনে দিনে ঘিঞ্জি হয়ে উঠছে, তবু ব্যতিক্রম দু-একটা চোখে পড়ে বইকি। যেমন এই বাড়িটা। ড্রইংরুম বেশ বড়ো। বেতের সোফা দিয়ে সাজানো। তার সংলগ্ন তিন-চারটে ঘর। বাড়িটা একতলা। সামনে বাগান। সাজানো নয় তেমন। ঘর সাজিয়ে রাখায় উৎসাহ আছে বলে মনে হয় না।
সঞ্জয় বলল, “বাড়ির ছোটো ছোটো জিনিস। বৌদির ক্লিপ, মায়ের ছুঁচ-সুতো, মিঠুর রঙ-পেন্সিল… তারপর চায়ের ছাঁকনি। কে আর এগুলোকে পাত্তা দেয়?”
রজত বলল, “পাত্তা দিতে হবে ভাই সঞ্জয়। যেখানে দেখিবে ছাই… যাক গে, চটপট কিছু কথা জেনে নিই।”
অরিন্দম আবার কাতর মুখে তাকায়। উফ্! এই গোপালের হিরের মুকুটের চাপে তার ব্যাপারটা ঢিলে পড়ে গেলে মহা মুশকিল। সে বলল, “রজত! আমার জিনিসটা—মনে আছে তো?”
“পাসপোর্ট?”
“খুব বিপদে পড়ে যাব ভাই। নিজের ঘরের ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ারে রাখা। একটাও হাবিজাবি জিনিস নেই। সযত্নে পরিপাটি। কোথায় যেতে পারে?”
“বাইরে যাচ্ছ নাকি?”
“ওই আর কি! কলেজ থেকে চান্স দিচ্ছে। স্টেটসের একটা সেমিনারে যোগ দিতে যাব। পাসপোর্ট হাওয়া হয়ে গেলে পরশু ভিসার জন্য যাব কী করে? উফ্!”
“একলাই যাচ্ছ?”
“বিরাট খরচ। একলাই যাব। কলেজ ওটা দেবে তাই…”
“বিরাট খরচ! সত্যিই তো। টাকা জোগাড় করেছ তো?”
অরিন্দম তুতলে বলে উঠল, “হ্যাঁ, কিন্তু… ম্যানেজ করেছি, কিন্তু… প্লিজ ভাই। পুলিশের বড্ড ইয়ে। তার জন্য নিজের বাড়িতে চুরি করব নাকি?”
রজত হো হো করে হাসে।—”পুলিশ কাউকে বিশ্বাস করে না—এটা একদম ঠিক। মিছিমিছি উত্তেজিত হচ্ছ। আচ্ছা, এক মিনিট, একটা কথা পামেলাবৌদিকে জিজ্ঞেস করি। বলুন বৌদি, আপনার রাগ হচ্ছে না?”
রজতের প্রশ্ন সপাটে এসে পড়ে পামেলার কাছে। সে চমকে উঠে বলে, “রাগ ঠিক নয়, তবে দুঃখ হয়েছে। জন্মের শোধ কোথাও যাই না। চাকরি করতে পারলাম না। লাইফ খুব বোরিং।”
“বৌদি, আপনি স্মার্ট, আধুনিক। বুটিক খুলতে পারেন। বাড়ি বসেও অনেক কিছু করা যায়।”
পামেলা গলা নামিয়ে বলল, “এতগুলো লোক বাড়িতে অথচ আমার বাচ্চা কেউ দেখাশোনা করবে না? রাগ হয় ভীষণ। আর তাছাড়া বুটিক করার মূলধন আমার নেই।”
হাতের ফোন নাড়াচাড়া করতে করতে রজত ঘাড় নাড়ে—”বাড়ির লোক পাশে না থাকলে রাগ হতেই পারে। রাগ আর হতাশা থেকে কিছু খারাপ কাজ করে ফেলে লোক। অন্যের মনোযোগ পাওয়ার ইচ্ছে আর কি!”
পামেলা লাল মুখে বলল, “পাসপোর্ট আর মুকুট কোনোটাই আমি নিইনি।”
সৌদামিনী রেগে বলে উঠলেন, “অ্যাহ্! অদ্ভুত তো তুমি বৌমা! নিজেই চাকরি পাওনি আর আমাদের দোষ দিচ্ছ?”
রজত হাত তুলল।—”প্লিজ। আপনারা শান্ত হয়ে বসুন। আচ্ছা সঞ্জয়…”
সঞ্জয় মুখ লাল করে তেড়ে জবাব দিল, “নো ওয়ে! দুটোর কোনোটায় আমার কোনও ইন্টারেস্ট নেই। বাড়িতে থাকাই হয় না। কাজেই… রজতদা, প্লিজ আমার কাছে কোনও উত্তর নেই।”
রজত ঘাড় নাড়ল। সঞ্জয় ছোটো থেকে একরোখা। পাড়ায় অরিন্দম মার খেত আর সঞ্জয় পিটিয়ে আসত। সে বলল, “ওক্কে! ওক্কে! তোমার হাতখরচ কে দেয়?”
“মা। আর কে? বাবা তো একটা পয়সা দেয় না।”
“কত লাগে প্রতি মাসে?”
“একটু বেশি। কারণ, ক্রিকেটের পিছনে ভালো খরচ আছে আমার।”
রজত কাঁধ নাচিয়ে বলে, “তুমি লাকি সঞ্জয়। মা আদর করে টাকা দেয়।”
“আদর করে? ক্ষেপেছ রজতদা? রীতিমতো ঘাম ঝরিয়ে ঝগড়া করে আদায় করতে হয়। খামে করে টেবিলে রেখে দিলে ঝগড়ার মতো বাজে কাজটা করতে হয় না।”
সৌদামিনী আবার চেঁচিয়ে উঠলেন—”খামে করে টাকা? দিন দিন তোমার খরচ বাড়ছে। কোথা থেকে দেব?”
সঞ্জয় তেরিয়া জবাব দেয়, “আমার খরচ? দাদার খরচ চোখে পড়ে না, তাই না? সেইখানে টাকা দাও না তোমরা?”
রাশভারী গলায় প্রতিবাদ করে ওঠেন বিমলবাবু—”আমাদের টাকা যেমন ইচ্ছে খরচ করব। তোমার পড়ার জন্য যা লাগে দিতে আপত্তি নেই। ওইসব খেলাধুলার জন্য দেওয়ার মতো টাকা আমার নেই।”
সঞ্জয় বলে, “পুলিশ ইন্সপেক্টর যদি ডিউটির সময় কবিতা লেখে, তবে টাকা কোথা থেকে হবে?”
বিমলবাবু কাঁপতে কাঁপতে উঠে দাঁড়িয়ে বলেন, “কবিতা লেখার জন্য অপবাদ আর সহ্য হয় না।”
রজত বলল, “ইয়েস। কাকু, বসুন বসুন। আপনি কবিতা লিখতেন, বাবা বলেছে।”
বিমলবাবুর মুখটা কুঁচকে গেছে কষ্টে। তিনি বললেন, “তোমার বাবা—সে একমাত্র বুঝত আমায়। নাহ্, চাকরি নিয়ে আমি সুখী ছিলাম না। পরিবারের দায় মেটাতে বাধ্য হয়ে… আমার স্ত্রী অঙ্কের শিক্ষিকা বলে কত গুরুত্ব পেত, সেই তুলনায় আমাকে… আর ভালো লাগে না!”
“সে কী কথা কাকাবাবু? আপনি কম কীসে?”
“রজত! ঠাট ছিল না। দাপট ছিল না। পরিবার আমায় গুরুত্ব দেয় না।”
সৌদামিনী অবাক হয়ে বললেন, “এসব কী বলছ? কোনোদিন বুঝিনি তো!”
“কোনোদিন কেউ বুঝতে চায়নি। ছোটো থেকেই কেউ বোঝেনি। বাবা নিরন্তর চাপ দিতেন চাকরি করার জন্য। তারপর বিয়ে, সন্তান। আমি একটু নিরিবিলি খুঁজতাম। কোথায় পেলাম?”
বিমলবাবুর কথার রেশ ধরে ঘরে একটা অদ্ভুত নৈঃশব্দ্য ছড়িয়ে পড়ল।
মিনতি আবার চা নিয়ে এল। সঙ্গে একপ্রস্থ জলখাবার। রজত বলল, “কাকাবাবু, আমি আপনার কথা বুঝতে পারছি। আসলে কী জানেন? স্বপ্নপূরণ না হলে একটা বিষাদ ঘিরে ধরে। এই বাড়িতে প্রত্যেকের কমবেশি এরকম সমস্যা আছে। সেটাই ভাবছি।”
সৌদামিনী তীক্ষ্ণ গলায় বললেন, “কেন? সমস্যা আবার কার বাড়ি না থাকে? তার সঙ্গে গোপালের মুকুট চুরির কী সম্পর্ক?”
“কাকিমা, উপর উপর দেখলে এটা একটা সামান্য কেস। পাসপোর্ট চুরি হয়েই থাকে। ঠাকুরের সোনার মুকুট নতুন কথা নয়। কিন্তু আমাকে ভাবাচ্ছে অন্য কিছু।”
পামেলা তেতো স্বরে বলে, “আসলে রজত ভাবছে, চোর এই বাড়িতেই আছে।”
অরিন্দম রাগত গলায় বলে, “তবে তো ঘরশত্রু বিভীষণ। যার টাকার দরকার আর যে চায় না আমি বিদেশ যাই—একই লোক। উফ্!”
পামেলা বলল, “মিঠুকে নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছি। এই অপমানের পরে এ-বাড়িতে আর থাকা যায় না।”
সঞ্জয় লাফিয়ে সামনে এসে বলল, “দাদা, সাবধান! টাকার দরকার তোমারও আছে।”
“নিজের পাসপোর্ট নিজেই চুরি করেছি? এই বলতে চাস তুই?”
“হতেই পারে। ঘুরিয়ে দেবার চেষ্টা করছ তদন্ত!”
“তোর মতো বোকা নই আমি।”
রজত বলল, “প্লিজ! প্লিজ! বেলা হয়ে যাচ্ছে। শেষ করতে হবে তদন্ত। বাড়িটা একটু দেখতে হবে। কী গো মিঠুরানি, তুমি যাবে সঙ্গে?”
ঘরগুলো ঘুরে দেখতে বিশেষ সময় নিল না রজত। ঘরগুলো গোছানো নয়। খাটের তলায় অনেক হাবিজাবি রাখা আছে। উঁকিঝুঁকি মারার সময় মিঠু হঠাৎ বলল, “জানো কাকু, হারিয়ে যাওয়া পেন্সিল খাটের তলায় লুকিয়ে থাকে।”
“কী করে জানলে?”
“আমি কান্না করলে দাদু বলে।”
***
হাত-পা ছড়িয়ে রিলাক্স হয়ে বসে রজত বলল, “আরও একটু চা হয়ে যাক।”
কেউ তেমন আপত্তি করল না। ঘরের বাতাস ভারী। অরিন্দম উশখুশ। সঞ্জয়ের মুখ কালো। আর পারছে না কেউ। ভালো লাগছে না। সৌদামিনী বললেন, “চা খাও বাছা। কিন্তু বাড়ির লোককে চোর বলে ভালো কাজ করলে কি?”
“চোর তো বলিনি কাকিমা।”
“আর কত বলবে বাপু? যা হয় হোক, এবার নিষ্কৃতি দাও।”
রজত হেসে বলল, “আমার সানগ্লাস কোথায় গেল? এই টেবিলে ছিল তো?”
ঘরে পিন পড়লে শব্দ শোনা যায়। এক ঘর বিষণ্ণতার মাঝে রজত বলল, “কাকিমা? অরিন্দম? কাকু, সঞ্জয়, পামেলাবৌদি—কোথায় আমার সানগ্লাস?”
শোকসভার মতো নিস্তব্ধ ঘর। নীরবতা ভঙ্গ করে রজত বলল, “আচ্ছা, কাউকে কিচ্ছু বলতে হবে না। আমি বরং একটা বিষয়ের উপর কথা বলি। অনেকেই জানো অথবা জানো না। বিষয়টা হল, ক্লিপ্টোম্যানিয়া। এটা একটা রোগ। চুরি করার প্রবল ইচ্ছে জাগে মনের মধ্যে। প্রয়োজন নেই অথবা সহজেই কেনা যায় অথচ টুক করে তুলে নেওয়া। মনের অবসাদ, ডিপ্রেশন কেটে যায় চুরি করতে পারলে। এই অসুখের মূল ভাবনাটাই হল মনোযোগ আকর্ষণ করা।”
“নিজের বাড়ির জিনিস চুরি? রাম রাম। ছিঃ ছিঃ!”
“প্লিজ কাকিমা, এইভাবে বলবেন না। পৃথিবীর অনেক বিখ্যাত মানুষ এই রোগের শিকার। বিখ্যাত শিল্পী ব্রিটনি, অভিনেত্রী লিন্ডসে লোহানের এই রোগ ছিল। এটিকে ইমপালস কন্ট্রোল ডিজ-অর্ডার বলা হয়ে থাকে। মনোবিদরা এখন অনেক কিছু বলছে। রিসার্চ চলছে। ওষুধ আছে। চিকিৎসা আছে খুব ভালো। তবে একটা কথা সত্যি, যাদের অতীতে হতাশা উদ্বেগ বেশি থাকে, তারা এই কাজ করে খুব শান্তি পায়। কারও ক্ষতি করে না কিন্তু। সামান্য জিনিস নিয়ে নিজের কাছে রেখে এমন ভাব করে—এই দেখ, কেমন মজা। আমার কাছে আছে। অনেক সময়, অনেকবার নিজের কাছে লজ্জা পায়, প্রতিজ্ঞা করে কিন্তু আবার করে ফেলে।”
সৌদামিনীর চোখ ছলছল করে ওঠে। দাপট ভুলে তিনি বলে ওঠেন, “মনের কষ্ট ভুলতে চুরি? রজত, স্বামী ছিল ভোলাভালা। ভোর সকালে উঠে ইস্কুল যেতাম বলে গঞ্জনা সয়েছি। মনোকষ্ট তো আছেই।”
“তাই যদি বলেন, এই বাড়ির প্রত্যেকের মনে কষ্ট আছে। দোষী কে তবে?”
“কে?”
“একজন অসহায় মানুষ। দোষী নয়, অসুখের শিকার।”
***
শোকসভার মতো করে বসে আছে সবাই। মিঠুকে ঘুম পাড়িয়ে এসেছে পামেলা। মিনিতি আর নিরাপদ বাড়ি চলে গেছে। ডাইনিং টেবিলে সাজানো ইলিশ ভাপা আর সাদা ভাতের গন্ধের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দুপুরের রোদ্দুর স্নিগ্ধ করে আবার বৃষ্টি নেমে এল।
রজত নিজের আসন ছেড়ে উঠে বিমলবাবুর পায়ের কাছে হাঁটু মুড়ে বসে বলল, “কাকু, পাঞ্জাবির পকেট থেকে আমার রোদচশমা বার করে দিন। একদম ঘাবড়ে যাবেন না। আমি আছি আপনার সঙ্গে।”
হতভম্ব বাড়ির লোকের দিকে তাকিয়ে রজত বলে, “ক্লু দেয় মিঠু। ওর রঙ-পেন্সিল কাকুর খাটের নীচে থেকে বেরিয়ে আসে। বোধহয় নাতনির কান্নাকাটি দেখে বার করে দেন। খাটের নীচে আছে পেটমোটা হোমিওপ্যাথিক বক্স। যার মধ্যে ছোটো ছোটো জিনিসগুলি আছে। পরশু রাতে ঠাকুরের মুকুট, ছোট্ট এইটুকু। সেটাও ওখানেই আছে, আমি শিওর। এইরকম কেসের কথা শুনেছিলাম বলে প্রথম থেকেই মনে হচ্ছিল কেউ তো আছে এই রোগের হাতে অসহায়। সানগ্লাস হাপিশ হওয়ায় আরও বুঝে গেলাম। রঙিন পাঞ্জাবির ঝুল পকেটে দিব্য লুকিয়ে রাখা গিয়েছিল।”
“বাবা! শেষ পর্যন্ত তুমি?” কান্না ঝরে পড়ে অরিন্দমের গলায়।
রজত তাড়াতাড়ি থামিয়ে দেয়। পুলিশি গাম্ভীর্যের সঙ্গে কঠিন গলায় বলে, “থামো অরিন্দম, এত অবাক হওয়ার কিছু নেই। কাকু মনে করতেন, তিনি লোকের উপহাসের পাত্র। এইরকম ভাবনা থেকে হতে পারে রোগ। ভালো করে কাউন্সিলিং করলে সেরে যাবে। একটু দাঁড়াও, কাকু কী বলে দেখি।”
বিমলবাবু বললেন, “আমি আর কী বলব? তুমি তো ঠিকই বলেছ রজত। আমি দোষী।”
“না, আপনি দোষী নন। আপনি কোনও ক্ষতি করেননি।”
“কিন্তু পাসপোর্ট? পাসপোর্ট কেন নিলে বাবা?”
খোলা বারান্দা দিয়ে বৃষ্টিভেজা বাতাস শীতল করে দিচ্ছে গুমোট দুপুর। বিমলবাবু চশমার কাচ মুছলেন। উদাস বিষণ্ণ দৃষ্টি বাইরে মেলে দিয়ে বললেন, “বড়ো ছেলেটা চলে যাবে কতদূর! বড্ড ভয় করছিল। ভাবলাম, পাসপোর্ট না থাকলে আর যেতে পারবে না। আমার কাছে থাকবে।”
ছবি-সুলতা মিস্ত্রী
ভালো গল্প