এই লেখকের আগের লেখা-এই লেখকের আগের গল্প – প্রতীক্ষা, নকশি কাঁথা, আইকম বাইকম তাড়াতাড়ি

সুমেরু মহাসাগর, সেপ্টেম্বর ২১২৩
প্রমোদ তরণীটি দেখতে বেশ প্রাচীন। সাদা পালগুলো হাওয়ায় ফুলে উঠেছে। কবেকার লুপ্ত হওয়া প্রাণী রাজহাঁসের কথা মনে পড়ছে জেনির। গ্রিনল্যান্ড থেকে আলাস্কা যাওয়ার বিখ্যাত এই নর্থ-ওয়েস্ট প্যাসেজ দিয়ে সেপ্টেম্বর মাসে এমন তরতরিয়ে যাওয়ার কথা বছর সত্তর আগেও ভাবা যেত না। মস্ত মস্ত বরফের চাঁই পথের বেশিরভাগটাই ঢেকে রাখত। মাথাটা সামান্য উঁচু করতে চায় জেনি, পারে না। কাঁধের নীচ থেকে বাকি শরীরটা এখনও অসাড়। ঘাড়ের কাছটা চিনচিন করে ওঠে। ওখানেই সিরিঞ্জটা ঢুকিয়েছিল হতচ্ছাড়া বটটা। ছলাৎ ছলাৎ শব্দ আসে নীচ থেকে। সাদার উপর বড়ো বড়ো টকটকে লাল অক্ষরে কনিয়াক লেখা প্রমোদ-তরণীর খোলের উপর সুমেরু মহাসাগরের জল এসে ঝাপটা দিচ্ছে—এ তারই আওয়াজ। তবে স্বয়ংক্রিয় এই তরণীর চেহারাটাই যা প্রাচীন। ধনীদের খেয়াল মেটানোর জন্যই এমন রেট্রো রূপ। জেনির সৌভাগ্যই বলতে হবে—কনিয়াকে চড়ার না হোক, অসাড় অবস্থায় ডেকে অন্তত পড়ে থাকার সুযোগ পেয়েছে সে।
ভারতবর্ষ থেকে এখানে আসাটা মনে পড়ে। বন্দি অবস্থায় কনিয়াকে ওঠাটাও। তারপর আর কিছু মনে নেই। ঘনিয়ে আসা ঘোর বিপদের কথাও জেনি মুহূর্তে ভুলে যায় যেন। আচ্ছা, এই জলে কি কোথাও কিছু ভেসে থাকে না আর? কোনও প্রাণের সাড়া নেই কোথাও? জলের রঙটা অন্তত একটু চোখে যদি পড়ত। মাথায় জোর একটা ঝাঁকুনি দেয় জেনি। সঙ্গে সঙ্গে তীব্র পিঁ-পিঁ একটা আওয়াজে কান ঝালাপালা হওয়ার জোগাড়। গড়গড় করে কিছু একটা এগিয়ে আসছে তার দিকে। জেনি জানে সেটা কী। কনিয়াকের অতন্দ্র প্রহরীদের একজন জেনির পাশে এসে দাঁড়ায়। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে আবার অতল ঘুমে তলিয়ে যায় জেনি।
সুমেরু মহাসাগর, সেপ্টেম্বর ২০৫৬।
সবজেটে জলে সাদা রঙের চিহ্ন নেই কোথাও। না, ভুল হল—সামান্য একটু সাদার ছিটে আছে। প্রায় চৌকো একটা তুষারখণ্ড। তার উপর নড়বড়ে পায়ে কোনোক্রমে দাঁড়িয়ে আছে আর একটা সাদা ছিটে। দলছুট ছোট্ট মেরু ভালুকটা ঘাবড়ে গেছে খুব। ছোট্ট পেটটায় খিদের জ্বলুনি। দু-দিন আগে খেয়েছিল একবার। এই তুষারখণ্ডটা আরও একটু বড়ো ছিল তখন। মা-ভালুক জল থেকে শিকার টেনে তুলেছিল তার উপর। মায়ের গা ঘেঁষে আরাম করে বসে পেট ভরে খেয়েছিল সে। আস্তে আস্তে তুষারখণ্ডটা গলে যে এমন ছোটো হয়ে যাবে, সে মোটেও বুঝতে পারেনি। একসময় দুজনের জায়গা আর হচ্ছিল না। মা যখন জলে লাফিয়ে পড়ল, সে ভেবেছিল আবার শিকার বুঝি। কিন্তু কতক্ষণ হয়ে গেল তারপর, কোথায় মা আর কোথায়ই-বা খাবার? সে তো শিকার করতেই শেখেনি এখনও। সাঁতার কাটতেও পারে না তেমন। জলের উপর সবুজ সবুজ কীসব ভাসছে, ভালো বোঝা যায় না। মুখে ঢুকলে বিস্বাদ লাগে।
পাতলা হয়ে আসা তুষারখণ্ডটা হঠাৎ ভেঙে দুই টুকরো হয়ে যায়। সামলাতে না পেরে ছোট্ট মেরু ভালুক শাবকটি একেবারে জলে গিয়ে পড়ে। হ্যাঁচোড়প্যাঁচোড় করে উঠতে চায় কাচের মতো পাতলা তুষারখণ্ডতে। কিন্তু ততক্ষণে সেটা টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে অজস্র ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন মেশানো সবুজ জলে। সমুদ্রের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার ফলে মেরু অঞ্চলের সমুদ্রেও জন্ম নিয়েছে অজস্র প্ল্যাঙ্কটন। কিন্তু এদিকের সমুদ্রে ওই প্ল্যাঙ্কটন খাওয়ার মতো প্রাণী কোথায়?
হাঁসফাঁস করে আবার জলের উপরে ভেসে ওঠে শাবকটি। আর পা ছুড়তে পারছে না সে। ছোট্ট ছোট্ট থাবাগুলো মুড়ে আসছে ক্লান্তিতে। একবার এদিক-ওদিক মাথা ঘোরালো, বোধ হয় মাকে খুঁজল। ঘাড়টা এলিয়ে ডুবে গেল তারপর। ভাসতে থাকা প্ল্যাঙ্কটনে ছোট্ট একটা ঘূর্ণি তৈরি হল মাত্র।
সুমেরু মহাসাগর, সেপ্টেম্বর ২১২৩।
জেগে আছে কি না ঠিক বুঝতে পারছে না জেনি। তবে শরীরে সামান্য হলেও সাড় ফিরেছে। মনে হচ্ছে দু-দিক দিয়ে ধরে কেউ তাকে দাঁড় করিয়ে রেখেছে। চোখের পাতা ভারী। হঠাৎ জোরালো একটা ধাক্কা খেয়ে জেনি ঝুঁকে পড়ে সামনে। প্রতিবর্ত ক্রিয়ায় হাত বাড়িয়ে ধরে নেয় কনিয়াকের রেলিং। চোখ দুটোও খুলে যায় এক ঝটকায়। সামনে তাকিয়ে স্থির হয়ে যায় জেনি। গাঢ় সবুজ জল কেটে এগিয়ে চলেছে কনিয়াক। শরীরটাকে প্রায় ঘষটে রেলিংয়ের দিকে আরও এগিয়ে যায় যায় সে। নাহ্, কোথাও কোনও প্রাণীর চিহ্নমাত্র নেই। শুরু হয়ে গেছে তবে সেই প্রক্রিয়া। রেলিং ধরে এবার ঝুঁকে পড়ে জেনি। ঘন সবুজ রঙের ফাঁকে ধূসরের ছোপ।
ঠান্ডা ধাতব একটা ছোঁয়া লাগে জেনির ঘাড়ে। ও অবশ্য জানে কে দাঁড়িয়ে আছে পেছনে। এরা আন্তর্গ্রহ বাণিজ্য সুরক্ষা বিভাগের কর্মী। চেহারায় মানুষের সঙ্গে বিশেষ তফাত নেই, এমনকি চোখের পাতা পর্যন্ত পড়ে এদের। অনেকেই মানুষ ভেবে ভুল করে, যদিও এরা আসলে বিশেষভাবে তৈরি হিউম্যানয়েড রোবট। মঙ্গলগ্রহে প্রথম পার্থিব উপনিবেশ সফল হওয়ার পরই এই বিশেষ সিরিজের বটগুলো তৈরি করা শুরু হয়েছিল। উদ্দেশ্য, পৃথিবীর সঙ্গে মঙ্গলের বাণিজ্যিক সম্পর্ক অটুট রাখা। সে প্রায় চল্লিশ বছর আগেকার কথা। ইতিমধ্যে মঙ্গলগ্রহে থোরিয়ামের খনি আবিষ্কার হওয়ার পর তার স্বত্বাধিকার নিয়ে পার্থিব মানুষ আর মঙ্গল গ্রহবাসী মানুষদের মধ্যে তীব্র মতভেদ দেখা দেয়। একটা গ্রহেই শান্তিতে থাকতে পারেনি যে প্রজাতি, দু-দুটো গ্রহ পেয়ে তারা যে দ্বিগুণ অশান্তি তৈরি করবে সেটা বলাই বাহুল্য। প্রাথমিকভাবে সেই শান্তিরক্ষার কাজটাই দেওয়া হয়েছিল আন্তর্গ্রহ বাণিজ্য সুরক্ষা বিভাগকে। তাছাড়া সেই বাণিজ্যের কাজে বিঘ্ন ঘটায় এমন কিছু বা এমন কাউকে সরিয়ে দেওয়ার মহান কাজটাও এরাই করে থাকে।
“এগিয়ে চলো জেনি, আরও দু-পা এগিয়ে রেলিংয়ের উপরে চাপ দিলে ফুট খানেক রেলিং গেটের মতো খুলে যাবে। ডু দ্যাট।” মানুষের মতো কণ্ঠস্বর, উচ্চারণেও কোনও যান্ত্রিকতা নেই।
জেনি মাথা সামান্য হেলিয়ে পেছনে তাকায়। স্বচ্ছ নীল দুটো ভাবলেশহীন চোখ তাকিয়ে আছে তার দিকে। তর্ক করে বা পালানোর চেষ্টা করে কোনও লাভ নেই জেনি জানে। একে এখনও তার হাত-পায়ের চলনশক্তি সম্পূর্ণভাবে ফেরেনি, তার উপর এই বটগুলোর সামরিক শিক্ষাও আছে। সামান্য গোলমাল টের পেলেই ছোট্ট ধাতব অস্ত্রটা ব্যবহার করতে এক মুহূর্তও অপেক্ষা করবে না। চাপ দিলেই ছোট্ট সিরিঞ্জ বেরিয়ে এসে আরও কয়েক ঘণ্টার জন্য অসাড় করে দেবে জেনিকে। আজকাল এই ধরনের জৈব অস্ত্রই ব্যবহার করে সব দেশ।
পা ঘষে ঘষে এগিয়ে যায় জেনি। চাপ দেয় নির্দিষ্ট রেলিংয়ে। খুট করে গেটের মতো খুলে যায় একটা অংশ। নীচে সবজেটে জল পাক খাচ্ছে। জেনি টের পায়, হাত দুটো একবার পিছন থেকে টেনে ধরল নীল চোখের হিউম্যানয়েড। তারপর এক ধাক্কায় জেনি ছিটকে পড়ল প্রমোদ-তরী কনিয়াক থেকে; আর পড়তে পড়তে টের পেল তার হাত দুটো বেঁধে দিয়েছে দক্ষ রোবট। জৈব উপাদান দিয়ে তৈরি সে-বাঁধন জলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে গলে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে, তবে ততক্ষণে জেনি আর বেঁচে থাকবে না। সূত্রও থাকবে না কোনও।
লর্ড হাউ দ্বীপ, অস্ট্রেলিয়া, জানুয়ারি ২০৪০।
এ যেন স্বর্গরাজ্য। অনেক কাল আগে বোধ হয় এই দ্বীপের কথা ভেবেই প্রাচীন পৃথিবীর এক কবি লিখেছিলেন— নীলের কোলে শ্যামল সে দ্বীপ প্রবাল দিয়ে ঘেরা/ শৈলচূড়ায় নীড় বেঁধেছে সাগর বিহঙ্গেরা।
ভোরের নরম আলো ছড়িয়ে পড়েছে টিলাগুলোর মাথায়। শিয়ারওয়াটার শ্রেণির পাখিদের বাস এই অঞ্চলে। স্থির ডানা মেলে উড়তে উড়তে সমুদ্র থেকে খাবার নিয়ে আসে এরা। ঠোঁটে নতুন ধরনের খাবারের টুকরো নিয়ে বাসার পাশে ডানা গুটিয়ে বসে মা-পাখি। আজ ছোটো মাছ, স্কুইড কিচ্ছু পায়নি সমুদ্রে। ইদানীং এরকম ঘনঘনই হচ্ছে। এদিকে তিন-তিনটে ছানা বাসায় হাঁ করে চেঁচাচ্ছে। শিয়ারওয়াটার ছানারা অবশ্য দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকতে পারে, তবু তারও তো একটা সীমা আছে। তিনটেতে ঠোঁট ফাঁক করে চিৎকার করছে এখন। এগিয়ে যায় মা-পাখি। যত্ন করে বাচ্চাদের মুখে তুলে দিতে থাকে নতুন ধরনের খাবার।
সুমেরু মহাসাগর, সেপ্টেম্বর ২১২৩।
ফুসফুস দুটো যেন ফেটে যাবে এবার। কিছুই কি করার নেই আর? শরীরটা বেঁকিয়ে বাঁধা হাত দুটো বাড়ায় জেনি—আর একটু, আর সামান্য একটু। ট্রাউজারের বাঁদিকের জিপ লাগানো পকেটটায় একবার যদি হাত পৌঁছায়। এই তো, জিপের মাথাটা ছুঁতে পেরেছে দুটো আঙুল দিয়ে। এবার টানতে হবে। নীচের ঠোঁটটা দাঁত দিয়ে সজোরে চেপে ধরে জেনি। যেন অনন্তকাল কেটে যায়। খুব ধীরে সরতে থাকে জিপটা। আঙুল ঢুকিয়ে এবার জেনি বের করে আনে ছোট্ট একটা কৌটো। বুড়ো আঙুল দিয়ে চাপ দিতেই কৌটোর মাথাটা খুলে যায়। অদৃশ্য কিছু ছড়িয়ে পড়তে থাকে মহাসাগরের জলে। পরমুহূর্তেই জ্ঞান হারায় জেনি। তার জ্ঞানহীন দেহটা ভাসতে থাকে সেই অদৃশ্য বস্তুর পাশাপাশি।
লর্ড হাউ দ্বীপ মিউজিয়াম, অস্ট্রেলিয়া, এপ্রিল ২০৪০।
মধ্যবয়সি ডক্টর বোসের গ্লাভস পড়া হাত দুটো সামান্য কাঁপছে। গুনে গুনে ছোটো ছোটো টুকরো স্পেসিমেন ভরছেন একটা পাত্রে। পাত্রের মুখটা বন্ধ করে ধরা গলায় বললেন, “দুশো চুয়াত্তরটা টুকরো, সব প্লাস্টিক। বুঝতে পারছেন ডক্টর বন্ড, কেন শিয়ারওয়াটারদের মধ্যে অকালমৃত্যুর হার এইভাবে বেড়ে গেছে? এই একটা শাবকের পেট থেকে বেরিয়েছে দুশো চুয়াত্তরটা টুকরো। কতই-বা বয়স হবে এর? বড়োজোর ছয় মাস। স্বাভাবিক খাদ্যের অভাবে সমুদ্র থেকে প্লাস্টিকের টুকরো তুলে বাচ্চার মুখে তুলে দিয়েছে মা-পাখি।”
গ্লাভস দুটো টেনে হাত থেকে খুলে ফেলেন ডক্টর জেনিফার বোস, তাসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের টক্সিকোলজিস্ট। রাগে মুখ থমথম করছে তাঁর। জন্মসূত্রে তিনি ভারতীয়, কর্মসূত্রে বিশ্বনাগরিক।
পাশে দাঁড়ানো পক্ষীবিদ ডক্টর হেনরি বন্ড এতক্ষণ মাথা নীচু করে ছিলেন, এবার মুখ তুলে তাকান। স্টিলের টেবিলের উপর পড়ে আছে মৃত পক্ষীশাবক, পেটটা চেরা। রোজই মরছে এরা, দলে দলে। অদ্ভুত এক অপরাধবোধ ঘিরে ধরে তাঁকে।
মেক্সিকো, ২০০০। আন্তর্জাতিক ভূপৃষ্ঠ ও প্রাণীমণ্ডল বিজ্ঞানী সম্মেলন।
জ্ঞানগর্ভ বাকবিতণ্ডায় সরগরম হয়ে উঠেছে বিজ্ঞানসভা। সম্মিলিত বিশেষজ্ঞগণ স্পষ্টতই দুইভাগ হয়ে গেছেন। অবশ্য সমান দুইভাগ নয়। বেশিরভাগ বিজ্ঞানীদের মতে, আমরা এখনও হোলোসিন যুগেই বাস করছি।
মার্কিন বিজ্ঞানী ক্রিস স্টোন গলা চড়ালেন—“মাথা খারাপ হয়েছে ক্রুটজেনের। পৃথিবীর ইতিহাসের নিরিখে কতটুকু সময় ধরে আছি আমরা, মানে এই হোমো সেপিয়ানরা? মাত্র শূন্য দশমিক শূন্য শূন্য সাত শতাংশ সময় ধরে—ঠিক তো? তুষার যুগের পর শুরু হয়েছে যে নতুন যুগ, তার বয়স মাত্র ১১,৭০০ বছর। ভূতাত্ত্বিক যুগগুলোর মধ্যে সময়ের হিসেবে এই যুগ সবথেকে ছোটো, কারণ এখনও আমরা এবং বাকি প্রাণীমণ্ডল এই হোলোসিন যুগের মধ্যেই বাস করছি। এরই মধ্যে কেবল হোমো সেপিয়ানদের নিয়ে সম্পূর্ণ নতুন একটি যুগের সূচনা করা অযৌক্তিক এবং অবৈজ্ঞানিক। ভূতাত্ত্বিক যুগ ওইভাবে নির্ধারিত কখনোই হয় না।”
বায়ু-রসায়নবিদ পল ক্রুটজেন অবশ্য এইসব শোনার জন্য বসে নেই। তিনি সেমিনার হল ছেড়ে বেরিয়ে গেছেন বহুক্ষণ।
হঠাৎ সবার নজরে আসে, ঈষৎ ঝুঁকে পড়া এক বৃদ্ধ ধীরে ধীরে চলেছেন পোডিয়ামের দিকে। এঁকে অনেকেই চেনেন, তবে খুব একটা পাত্তা দেন না কেউই। নিজের মতো করে কীসব গবেষণার কাজ করেন ইনি। সে-সব কাজের খুব একটা ব্যাবসায়িক মূল্য না থাকায় কোনোদিনই ঠিক যাকে বলে লাইমলাইটে আসেননি ইনি। একদিকের ভ্রূ সামান্য তুলে সেদিকে ইঙ্গিত করেন ফরাসি বিজ্ঞানী ডক্টর লিয়াম বার্নার্ড।
“ইনিও আমন্ত্রিত বক্তা নাকি?” পরিবেশ বিজ্ঞানী ডক্টর সিলভিয়া ফ্লসের নিটোল কপালে ভাঁজ পড়ে।
নাক দিয়ে শব্দ করেন ডক্টর স্টোন। হালকা মেজাজে বলেন, “আর কিছু না হোক, কমিক রিলিফ তো হবে।”
একটা একটা করে ধাপ পেরিয়ে স্টেজে ওঠেন বৃদ্ধ। কেউ এগিয়ে এসে সাহায্য করে না। তিনি নিজে ভালোভাবেই জানেন যে এখানে তিনি ব্রাত্য। তবে বিজ্ঞানী হিসেবে তিনি স্বাধীন। সামান্য কিছু আয় আছে তাঁর, তাতেই চলে যায়। বিখ্যাত একটি সংস্থা একবার তাঁকে চাকরি দিতে চেয়েছিল। বলেছিল, মঙ্গলগ্রহে যে নতুন উপনিবেশ তৈরির প্রস্তুতি চলছে, সেখানে নাকি তাঁর মতো প্রতিভার প্রয়োজন আছে। হাসি পেয়েছিল তাঁর। এরা নামেই বিজ্ঞানী, আসলে তুখোড় ব্যবসায়ী। একপেশে হাসিটা হেসে বলেছিলেন, ‘আমি বরং পৃথিবীতেই কাজ করি, কেমন? গ্রহটা আসলে বড়ো প্রিয়।’
পোডিয়ামের কাছে পৌঁছে থামলেন তিনি। হল-ভরতি নামিদামি বিজ্ঞানী তাকিয়ে আছেন তাঁর দিকে। একরাশ দ্বিধা হঠাৎ ঘিরে ধরে তাঁকে—বক্তব্য রাখা কি আদৌ উচিত হবে? হঠাৎ চোখ পড়ে যায় হলের একেবারে কোণে—পা দুটো সিটের উপরে ভাঁজ করে তুলে হাঁটুর উপরে মাথাটা রেখে বড়ো বড়ো চোখ মেলে তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে বছর দশেকের একটা বাচ্চা, তাঁরই কন্যা। সদ্য মাতৃহারা মেয়েটাকে বাড়িতে একা ফেলে রেখে আসতে পারেননি বিজ্ঞানী। বিশেষ অনুরোধ করে তার জন্যও অনুমতিপত্র জোগাড় করেছিলেন। মেয়েটার গলা থেকে তাই পরিচয়পত্র ঝুলছে। তাতে বড়ো বড়ো অক্ষরে লেখা—জেনিফার বোস। ফরাসি মায়ের নামেই তার নাম রাখা।
বিজ্ঞানী মুহূর্তকাল তাকিয়ে থাকেন কন্যার দিকে। মন দৃঢ় হয়। গলাটা সামান্য ঝেড়ে বলতে শুরু করেন পরিবেশ বিজ্ঞানী ডক্টর সত্যপ্রিয় বোস।
“ডক্টর পল ক্রুটজেনের সঙ্গে আমি সম্পূর্ণ একমত। আমার একমত হওয়াতে কিছু যায় আসে না ঠিকই, তবে দয়া করে আমার বক্তব্য আমাকে রাখতে দিন।” গলা জোরালো হয়ে ওঠে ডক্টর বোসের, ছড়িয়ে যায় সেমিনার হলের কোণ থেকে কোণে—“সাম্প্রতিক ভূতাত্ত্বিক যুগ অর্থাৎ হোলোসিন শুরু হয়েছে আনুমানিক বারো হাজার বছর আগে। নতুন যুগ শুরু হওয়ার সময় সত্যই আসেনি, কিন্তু শেষ পঞ্চাশ বছরে মানুষের কর্মকাণ্ড ভূপৃষ্ঠ ও প্রাণীমণ্ডলে যে অপরিবর্তনীয় ছাপ রেখে গেছে, তাকে আর হোলোসিন যুগের ধারাবাহিকতা বলা চলে কি? পারমাণবিক বোমা পরীক্ষার ফলে ছড়িয়ে যাওয়া তেজষ্ক্রিয় বস্তু অর্থাৎ রেডিও-নিউক্লাইড, বিদ্যুৎ উৎপাদন-জনিত দূষণ, সর্বোপরি প্লাস্টিক উৎপাদন ও ব্যবহার সংক্রান্ত দূষণের ছাপ কি কোনোভাবে হোলোসিন যুগের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মেলে? গত পঞ্চাশ বছর ধরে পৃথিবীতে যে ছাপ আমরা রাখছি তা মোছা একপ্রকার অসম্ভব। শুধু তাই নয়, আমরা সম্ভবত পরবর্তী গণ-অবলুপ্তি বা মাস এক্সটিংশনের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। আর এই অবলুপ্তির কারণ একান্তভাবেই আমরা।”
আবার চিৎকার চেঁচামেচি শুরু হল পুরোদমে। কেউ একজন জোর গলায় বলে উঠলেন, “আপনি কি জঙ্গলে বাস করেন, অপ্রচলিত শক্তির কথা শোনেননি? অবশ্য জঙ্গলে থাকলে অন্তত বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের বিষয়ে সভ্য দেশগুলো যা পরিকল্পনা নিয়েছে সে-বিষয়ে কিছু জানতেন।”
হইচই ভেদ করে গলা তুললেন ডক্টর বোস। তিনি স্বভাবত মৃদুভাষী। অনভ্যস্ত জোরালো স্বর ভেঙে যেতে থাকল, তবু চিৎকার করে বললেন, “ছেষট্টি মিলিয়ন বছর আগে ডাইনোসররা যখন লুপ্ত হল, সেই যুগকে কীভাবে আমরা আলাদা করে ধরতে পারি একবার ভাবুন আপনারা। যে উল্কাপাত এই অবলুপ্তির কারণ, সে বয়ে এনেছিল ইরিডিয়াম। পৃথিবী জুড়ে মাটির স্তরে খুঁজে পাওয়া সেই ইরিডিয়াম সেই ক্রিটেশিয়াস যুগের অবসানকে চিনতে সাহায্য করে। আর আমরা একটা নয়, পৃথিবীর স্তরে স্তরে রেখে যাচ্ছি অগুনতি চিহ্ন। অ্যালুমিনিয়াম, কংক্রিটের কণা তো আছেই—মাটিতে রেখে যাচ্ছি কৃত্রিম সার ব্যবহারের ফলে বহু পরিমাণ নাইট্রোজেন আর ফসফেট। আর রেখে যাচ্ছি প্লাস্টিক। যা ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে মাইক্রোপ্লাস্টিকে। আমাদের পরবর্তী যুগের প্রাণীরা আমাদের যুগের ফসিলে এই প্লাস্টিকই খুঁজে পাবে। একা হাতে আমরা এই হোমো সেপিয়ানরা ধ্বংস করতে চলেছি এই গ্রহকে। তাহলে এই নামে আপত্তি কীসের? নাকি দোষ স্বীকারের লজ্জা?”
মেক্সিকোর রাস্তা ধরে হেঁটে চলেছেন ঝুঁকে পড়া এক বিজ্ঞানী আর ছোট্ট একটা মেয়ে। বিজ্ঞানীকে বের করে দেওয়া হয়েছে সম্মেলন থেকে। অসংলগ্ন কথা বলার জন্য তাঁকে অসম্মান করা হয়েছে, উন্মাদ বলে উপহাস করা হয়েছে। চুপচাপ হেঁটে চলে বাপ আর মেয়ে।
“অ্যানথ্রোপোসিন মানে কী বাবা?”
“অ্যানথ্রোপো মানে মানুষ, সিন মানে নতুন।”
“মানুষ কি কেবল ধ্বংস করে বাবা?”
“না রে মা, রক্ষাও করে।”
“আমি পৃথিবীকে রক্ষা করার উপায় বের করব বাবা।” দশ বছরের ছোট্ট একটা মানুষ স্বপ্ন দেখে।
আচার্য সত্যপ্রিয় বোস রিসার্চ ইনস্টিটিউট, ভারতবর্ষ, জানুয়ারি, ২১২৩।
টেবিলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছিল জেনি। মৃদু কিন্তু তীব্র একটা বিপ বিপ শব্দ কানে যেতেই চমকে উঠে বসে। ঘুমের আর দোষ কী? পরপর তিন রাত প্রায় জাগা। কাল রাতের কাজটুকু অবশ্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-চালিত ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্টের হাতে ছেড়ে দিয়েছিল। এবার চাক্ষুষ তার ফলাফল দেখার পালা। অবশ্য এগোতে হল না বেশি। স্বয়ংক্রিয় ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্ট এগিয়ে এসে হাত বাড়িয়ে দিয়ে সুরেলা কণ্ঠে বলল, “অভিনন্দন ডক্টর জেনিফার লেভার্স, আপনার পরীক্ষা সফল হয়েছে।”
এ আবার এত বেশি শুদ্ধ বাংলা বলে যে কৃত্রিম শোনায়। এটা ভেবেই নিজের মনে হেসে ফেলে জেনি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাই তো রে বাবা। ল্যাবের বেশিরভাগ কাজ আজকাল এরাই করে। ছুটল জেনি, হাতঘড়ির ডায়ালে বুড়ো আঙুল ছুঁইয়ে ল্যাবের দরজা খোলার প্রথম ধাপটা ছুটতে ছুটতেই মিটিয়ে নিল। বাকি বায়োমেট্রিকস সামনে পৌঁছে তবে দিতে হবে। বড়ো গোপন এই পরীক্ষা। করিডোরের স্বচ্ছ আবরণ ভেদ করে চোখ পড়ল বাইরে। এই জানুয়ারি মাসেও বাইরে বেশিক্ষণ থাকার কথা ভাবা যায় না, এত তাপ। মার্চ থেকে বিশেষভাবে তৈরি তাপ নিয়ন্ত্রিত পোশাক পরতে হয়। ভারতবর্ষ গ্রীষ্মপ্রধান দেশ বলে এই ব্যবস্থা তা নয়, ইউরোপ বা যুক্তরাষ্ট্রের তাপমাত্রাও বেড়ে গেছে অনেকটা। তবে মঙ্গলগ্রহের উপনিবেশে লোকসংখ্যা যত বাড়ছে, পৃথিবী নিয়ে চিন্তাভাবনাও কমছে ঠিক সেই অনুপাতে। পৃথিবী এখন মঙ্গলগ্রহে সস্তায় শ্রমিক জোগানের উৎসমাত্র। সবজে নীল গ্রহ এখন ধূসর সবুজ। জলে গিজগিজ করছে মাইক্রো-প্লাস্টিক।
আন্তর্জাতিক প্রেস কনফারেন্স। আচার্য সত্যপ্রিয় বোস রিসার্চ ইনস্টিটিউট, ভারতবর্ষ, জুলাই, ২১২৩।
বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী কোনও দেশে পাঁচটির বেশি গবেষণাগার নেই, আর প্রত্যেকটি গবেষণাগার তাদের কাজের হিসেব, অগ্রগতি বা বিফলতা তিন মাস অন্তর আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান কমিটিকে জানাতে বাধ্য।
“পেস্টালোটায়োপসিস মিক্রোস্পোরা নিয়ে পরীক্ষা সফল হয়েছে আমার।” ব্যাজার মুখে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বলে জেনি। এদের কোনও কিছু জানানোর ইচ্ছা তার নেই।
“প্লিজ এক্সপ্লেইন।” স্ক্রিনের ও-পারের লোকজন একটু নড়েচড়ে বসে।
“আগেই বলেছি, বহুবছর আগে আমার চার প্রজন্ম আগের বিজ্ঞানী ডক্টর জেনিফার বোস ছাত্রাবস্থায় তাঁর বন্ধুদের সঙ্গে এই মাশরুমের প্রজাতি ও তার অসাধারণ গুণাগুণ আবিষ্কার করেন। এরা অক্সিজেনশূন্য পরিবেশে বাড়তে পারে, আর পলিইউরেথেন প্লাস্টিককে ভেঙে তাকে জৈব পদার্থে পরিণত করতে পারে। পৃথিবীর সমস্ত সমুদ্র আজ পলিইউরেথেন মাইক্রো-প্লাস্টিক, অর্থাৎ পাঁচ মিলিমিটারের থেকে ছোটো প্লাস্টিকের টুকরো দিয়ে ভরে গেছে। সামুদ্রিক প্রাণীরা গণ-অবলুপ্তির পথে।” সামান্য চুপ করে জেনি, কী যেন ভাবে।—“এতদিন এই মাশরুম ব্যবহার করে পৃথিবীর প্লাস্টিক দূষণ দূর করার কাজে কিছু অসুবিধা ছিল। এরা কেবল সম্পূর্ণভাবে পরিষ্কার করা প্লাস্টিককেই পরিপাক করতে পারত। দীর্ঘদিন ধরে কাজ করার পর এদের মধ্যে কিছু জিনগত পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছি আমি। হয়তো অনেক আগেই এই কাজ শেষ হত, কিন্তু বেশ কিছু বছর আগে দেশের বেশিরভাগ গবেষণাগার বন্ধ হয়ে যাওয়ায়…”
“পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে কী ভাবছেন আপনি?” জেনিকে কথা শেষ করতে দেয় না স্ক্রিনের অন্যদিকের কণ্ঠস্বর। জেনির সন্দেহ হয়, হয়তো মানুষ নয়, কৃত্রিম বুদ্ধিসম্পন্ন কেউ রয়েছে অন্যদিকে। চেহারা দেখে যদিও বোঝার উপায় নেই।
“সেটা নিয়ে দ্বিধার অবকাশ আছে কি?” তিক্তভাবে বলে জেনি। বহুকষ্টে তিলে তিলে তৈরি করেছে সে এই গবেষণাগার। তার পূর্বজদের স্বপ্ন এতদিনে পূর্ণ হওয়ার রাস্তা পেয়েছে।
হঠাৎ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে জেনির সামনের স্ক্রিনের অন্ধকার হয়ে যায়।
হেড-কোয়ার্টার, আন্তর্গ্রহ বাণিজ্য সুরক্ষা বিভাগ, ক্যালিফোর্নিয়া, ২১২৩।
পৃথিবী এখন প্রায় পরিত্যক্ত এক গ্রহ। এর সমুদ্র পুনরায় দূষণমুক্ত হওয়ার প্রয়োজন ফুরিয়েছে। এর পেছনে সময় বা পুঁজি কোনোটাই খরচ করা সম্ভব নয়। কিছু মানুষ স্বেচ্ছায় আর কিছু নিরুপায় হয়ে থেকে গেছে পৃথিবীতে। বেশিরভাগ সম্পদশালী মানুষের বসবাস এখন মঙ্গলগ্রহের কলোনিতে।
“কে এই জেনিফার লেভার্স? তাঁর এত স্পর্ধাই-বা কীসের?” সুরক্ষা বিভাগের হর্তাকর্তা ব্যারি মাস্ক গলা চড়ান।
“পুরোনো পৃথিবীর ইতিহাস ঘাঁটলে দুটো নাম পাওয়া যাচ্ছে। তাঁরা ডক্টর লেভার্সের পূর্বসূরি, একই বংশের লোক। ইতিহাস তাদের জেদি ও গোলমেলে বলে চিহ্নিত করে রেখেছে।” কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিষ্প্রাণ কণ্ঠ ভেসে আসে।
“তাই নাকি? আর আমার পূর্বসূরির সৌজন্যে মানুষ আজ আরও একটি গ্রহ অধিগ্রহণ করেছে। তা, সামাজিক ও বাণিজ্যিক বিভাগের বিশ্লেষণ জেনি লেভার্স সম্বন্ধে কী বলছে?”
কয়েক মুহূর্ত চুপ থাকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন হিউম্যানয়েডটি। বোধ হয় বিশ্লেষণের রিপোর্ট খতিয়ে দেখছে। তারপর তীক্ষ্ম গলায় বলে ওঠে, “থ্রেট! ডক্টর লেভার্স ইজ কনসিডার্ড টু বি আ থ্রেট।”
সুমেরু মহাসাগর, সেপ্টেম্বর ২১২৩।
মাঝরাতে যখন বাণিজ্য সুরক্ষা বিভাগের হিউম্যানয়েডরা তাকে ঘিরে ধরেছিল, জেনি অবাক হয়নি। তবে তার পকেটে কৌটোয় রাখা আণুবীক্ষণিক স্পোরগুলো চোখে পড়েনি ওদের। ইচ্ছা করেই স্পোরগুলো প্রাচীন ধাঁচের কৌটোয় ভরেছিল জেনি। কী অপরাধে তাকে বন্দি করা হচ্ছে তাও পড়ে শুনিয়েছিল একজন হিউম্যানয়েড। সে নাকি আন্তর্গ্রহ সম্পদের অপচয় ঘটিয়েছে। এতে মনুষ্য প্রজাতির সাম্প্রতিক বাসস্থান অর্থাৎ মঙ্গলের অমঙ্গল হবে। ওদের ভারী ভারী বক্তব্য শুনে কেমন হাসি পেয়েছিল জেনির। তাও তো তার কাজের পুরোটা ওরা জানে না।
কিন্তু জেনি এইসব ভাবছে কেমন করে? সে তো জলে ডুবে মারা গেছে, নাকি?
গরম আর চটচটে কিছু একটা বস্তুর ছোঁয়া নাকে লাগতে ধড়মড় করে উঠে বসে জেনি। সে বেঁচে আছে! চোখের ঘোলাটে ভাবটা কাটতে প্রথমেই নজরে আসে ধূসর দুটো চোখ। চমকে উঠে বসে জেনি। এটা আবার কেমন প্রাণী? অনেকটা মেরু ভালুকের মতো দেখতে, কিন্তু সাদা নয়। আকারেও অনেক ছোটো। সবজেটে ধূসর একটা রঙ। লম্বা জিভ বের করে জেনির নাকটা আবার চেটে দেয় প্রাণীটা। তারপর জলের দিকে ঝুঁকে পড়ে খাবার খুঁজতে থাকে। এই প্রাণীটাই কি জল থেকে টেনে তুলেছে তাকে? কিন্তু টেনে তুলেছেই-বা কোথায়? এ যে একরাশ প্লাস্টিকের স্তূপ। ছোটোবড়ো টুকরো মিশিয়ে প্লাস্টিকের বিছানা বানিয়েছে যেন। হাত বাড়িয়ে অচেনা প্রাণীটার মাথা ছোঁয় জেনি। সেটাও তার পায়ের কাছে কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে পড়ে।
জলের দিকে তাকিয়ে থাকে ডক্টর জেনিফার লেভার্স। খুব কম সংখ্যক মাশরুম জলে বাঁচে, কিন্তু এই স্পোরগুলো বাঁচবে। তাদের সেই ক্ষমতা সে নিজে দিয়েছে। তারপর শুরু হবে অপেক্ষা। মানুষ মঙ্গলে পৌঁছেছে বটে, তবে তার স্বভাব তো বদলায়েনি। আরও একটা গ্রহকে ধ্বংস করার আগেই পৃথিবী আবার তৈরি হয়ে যাবে। ওই যে, তার পায়ের কাছে ঘুমিয়ে থাকা সম্পূর্ণ নতুন প্রজাতির প্রাণীটিই তো প্রমাণ করছে সেটা। প্রকৃতিকে কি আর থামিয়ে রাখা যায়?
ডক্টর সত্যপ্রিয় বোস, ডক্টর জেনিফার বোস—তোমরা শুনছ? এটাই আসল অ্যানথ্রোপোসিন। নতুন মানুষের নতুন যুগের শুরু হোক আজ থেকে। প্লাস্টিক নয়, দূষণ নয়, অবলুপ্তি নয়—পৃথিবী নামের এই গ্রহকে আবার বাসযোগ্য করার ছাপ রেখে যাব আমরা এই যুগের ফসিলে।
অপূর্ব এক পার্থিব সন্ধ্যা নেমে আসে হারতে না জানা এক বিজ্ঞানী আর এক হারতে না জানা এক নতুন প্রজাতির প্রাণীর উপর।
জয়ঢাকের সমস্ত গল্প ও উপন্যাস