গল্প-আইকম বাইকম তাড়াতাড়ি-বুমা ব্যানার্জী দাস-শরৎ২০২৩

এই লেখকের আগের গল্প – প্রতীক্ষা, নকশি কাঁথা

২০৭৩, ক্যালিফোর্নিয়া

golpoAikom Baikom

ফাঁকা একটা পার্কোপডের উপর গাড়িটা রেখে নেমে দাঁড়াল বছর ছত্রিশের বেঞ্জামিন, ওরফে বেনি। একবার তাকিয়ে দেখল, মুহূর্তে লাইসেন্স প্লেটটা স্ক্যান করে গাড়িটা নিয়ে পার্কোপড মসৃণভাবে নেমে গেল মাটির নীচের নির্দিষ্ট পার্কিং লটে। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে আবার খালি পার্কোপডটা উঠে এসে অপেক্ষা করবে পরের গাড়িটার জন্য। স্টেশনের বাইরে বেশ খানিকটা এলাকা জুড়ে এরকম অসংখ্য পার্কোপড। বছর পনেরো আগেও এরকম ব্যস্ত স্টেশনের বাইরে গাড়ি রাখা মহা ঝামেলার ব্যাপার ছিল। বেশ মনে পড়ে বেনির। ফিরে এসেও গাড়ি খোঁজার বা কোথায় গাড়ি রেখেছে মনে করার কোনও মাথাব্যথা নেই। ফাঁকা যে-কোনো পার্কোপডের নির্দিষ্ট অংশে পা দিয়ে চাপ দিলেই উঠে আসবে ছোটো একটা টাচ স্ক্রিন। সেখানে গাড়ির নম্বর দিলেই পার্কিংয়ের ভাড়া দেখাবে। স্ক্রিনের সঙ্গে আটকানো ছোট্ট স্ক্যানারে বায়োমেট্রিক কার্ড ঠেকিয়ে পেমেন্ট করে দিলেই কম্ম ফতে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে একেবারে পাশে গাড়ি পেয়ে যাবে। বায়োমেট্রিক কার্ডে ফিঙ্গার-প্রিন্ট, রেটিনা আর দাঁতের গঠনের তথ্য থাকে। ব্যাংকের অ্যাকাউন্টের সঙ্গেও এই কার্ডই লিংক করা থাকে এখন। তাই পিন-কোড ইত্যাদি মনে রাখার ঝঞ্ঝাট নেই। পার্কোপডটা টুক করে নীচে নেমে গাড়ি একরকম ভাসিয়ে নিয়ে আসবে উপরে। তবে এরকম ব্যবস্থা কি আর সবার জন্য? শহর ছেড়ে একটু বেরোলেই সেই আগেকার পার্কিং লটগুলোর গুঁতোগুঁতি হুড়োহুড়ি চোখে পড়ে। তবে সে-সব নিয়ে ভাবলে চলে নাকি? তাকে অগ্রগতি বলে না। সে একাধারে বিজ্ঞান যেমন বোঝে, তেমনই বোঝে ব্যাবসাটা।

“স্যার আপনি?”

পিছন থেকে চেনা একটা গলা দিবাস্বপ্ন ভেঙে দেয় বেনির। তবে দিবাস্বপ্ন দেখার লোক সে একবারেই নয়, সম্ভবত এই স্টেশনে আসার ফলেই অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছে। স্বচ্ছ আবরণ ভেদ করে বাইরে থেকেই ভিতরের খানিকটা অংশ চোখে পড়ছে। নরম আলোয় উদ্ভাসিত প্ল্যাটফর্ম। ঝলমলে স্বয়ংক্রিয় সিঁড়ি উঠে গেছে বেশ উঁচুতে। সিঁড়ি শেষ হয়েছে একটা ঢাকা করিডোরে। করিডোরের গায়ে গোল গোল দরজা। অবশ্য বন্ধ অবস্থায় সেগুলো চোখে পড়ে না। করিডোরের গায়ের সঙ্গে মিশে থাকে। দরজা খুলে গোল ফোকর তৈরি হলে দশজন করে মানুষ ঢুকে যাচ্ছে। ঢোকা শেষ হলেই গোল ফোকরগুলো আবার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। মানুষগুলো ঢুকে কোথায় যাচ্ছে সেটা অবশ্য বাইরে থেকে বোঝা যাচ্ছে না, কারণ করিডোর অস্বচ্ছ কোনও উপাদান দিয়ে তৈরি। বন্ধও হওয়ার ঠিক তিরিশ সেকেন্ড পর আবার খুলে যাচ্ছে গোল দরজা।

ঘুরে তাকায় বেনি। যদিও গলা শুনেই বুঝেছিল কোন মূর্তিমান।

“গুড মর্নিং স্যাম। একটু সিয়্যাটল যাব, কাজ আছে।”

দেঁতো হাসি হাসে স্যাম। বেনির তথাকথিত বাঁহাত হওয়া সত্ত্বেও বসের আজ সিয়্যাটল যাওয়ার ব্যাপারে সে কিছু জানে না কেন এ-প্রশ্ন করার কথা মনেও আসতে দেয় না। টিকে থাকার লড়াইতে প্রশ্ন চলে না।

নাহ্, আর বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা যাচ্ছে না। যেভাবে গরম বেড়েছে শেষ তিরিশ বছরে, বেলা দশটার পর বাইরে থাকা দায়। স্যামকে হাতের ইশারায় যেতে বলে স্টেশনে ঢুকে আসে বেনি। এখানে তার একা ঢুকতেই ভালো লাগে। এটা তার সম্রাজ্য। এই বিশাল কর্মকাণ্ডের কাণ্ডারি সে, বেনি। যাকে ছোটবেলায় লম্বা ক্ষয়াটে চেহারার জন্য বিনপোল বেনি বলে খেপাত সবাই। এসে দেখুক তারা আজ সেই বিনপোল বেনির কত ক্ষমতা।

স্টেশনে ঢুকেই বাঁদিকে বিশাল ডিসপ্লে বোর্ডে জ্বলজ্বল করছে একজনের হাসিমুখ। ইনি বর্তমান সভ্যতার সেরা রূপকার হিসেবে সম্মানিত, যদিও এখন উনি আর জীবিত নেই। যানবাহনের ক্ষেত্রে এই বৈপ্লবিক পরিবর্তনের ধারণা  ওঁর মাথাতেই এসেছিল। তাই বর্তমান সভ্যতার সর্বত্র উনি সম্মানিত, আদৃত। বেনি মনে মনে ভাবে, একদিন তার ছবিও জ্বলজ্বল করবে এই স্টেশনে। সে না থাকলে এসব কেবল কল্পনা হয়েই থেকে যেত।

এলোমেলো ভাবনার মধ্যেই সিঁড়ি বেয়ে গোলাকার দরজাগুলোর সামনে পৌঁছে গেছে বেনি। দরজা আপাতত বন্ধ। ঠিক কুড়ি সেকেন্ডের মাথায় বেনির সামনের দরজাটা খুলে গিয়ে গোলাকার একটা ফোকর তৈরি হল। মুচকি হেসে বেনি মাথা সামান্য নামিয়ে ঢুকে পড়ে তার ভিতর। তার পিছন পিছন আরও কয়েকজন ঢুকে আসে। ভিতরে জনা দশেকের বসার জায়গা। মৃদু আলো জ্বলছে। হালকা ঠান্ডা আরামদায়ক সুগন্ধী হাওয়ার একটা কম্পন টের পাওয়া যাচ্ছে। এটা আসলে ট্রেনের কামরার মতো একটা ছোটো ক্যাপসুল বা পড। তবে জানালা নেই, সবাই ঢোকার পর স্বয়ংক্রিয় দরজা বন্ধ হয়ে গেলে পরবর্তী স্টেশনের প্ল্যাটফর্মের গোলাকার দরজার সামনে পৌঁছানো পর্যন্ত ভিতর থেকে সে দরজা খোলার উপায় আর থাকে না। উঁচু পিলারের উপর দাঁড় করানো প্রায় বায়ুশূন্য টিউবের ভিতর দিয়ে শব্দের গতির কাছাকাছি গতি নিয়ে ছুটে চলে এই যান। এটাই আধুনিক সভ্যতার সর্বাধুনিক ট্রেন। আগে যেখানে ফ্লাইটে লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে সিয়্যাটল পৌঁছাতে লাগত আড়াই ঘণ্টার কাছাকাছি। এখন সেখানে লাগে মিনিট চল্লিশ। সহযাত্রীদের দিকে আড়চোখে একবার তাকায় বেনি। এরা তাকে চিনতে পারেনি কেউ। সে না থাকলে এই হাইপার-লুপ ট্রেন বাস্তবায়িত হত না।

কাজ শুরু হয়েছিল বহু বছর আগে, বেনি তখন জন্মায়নি পর্যন্ত। কিছু প্রযুক্তিগত ত্রুটি আর বিশাল খরচের ধাক্কায় বহুদিন বন্ধ হয়ে পড়ে ছিল এর কাজ। প্রযুক্তিগত জট খোলে বেনি। তাতে যদিও খরচা কিছু কমেনি। তবে টিকিটের দামে সব খরচা পুষিয়ে নিয়েছে তার কোম্পানি। আড়াই ঘণ্টার রাস্তা চল্লিশ মিনিটে পৌঁছাতে পারলে যাদের লাভ হয়, তারা সে-দাম দিতে প্রস্তুত বইকি। যাদের সেটা তিন ঘণ্টাতে পৌঁছালেও কোনও ক্ষতি নেই, তাদের দরকার কী এদিকে আসার? ঝকর-ঝকর ট্রেন বা সেই চিরাচরিত প্লেন তো কেউ কেড়ে নিচ্ছে না রে বাবা। বেনির সাফ হিসেব, তেল মাখতে গেলে কড়ি তো ফেলতেই হবে। আর একবার চোখের কোণ দিয়ে সহযাত্রীদের দিকে তাকিয়ে তৃপ্তিতে চোখ বোজে বেনি। এরা সব পোড় খাওয়া অভিজ্ঞ যাত্রী। নয়তো প্রথম প্রথম অনেকেরই এই মারাত্মক গতির ফলে বমি আসে। প্রত্যেক সিটের হাতলের সঙ্গে তাই বমি করার জন্য বিশেষভাবে তৈরি পাত্র লাগানো আছে। তার ভিতরে জমা বস্তু নিজে-নিজেই নিষ্কাশিত হয়ে যায়।

আর কিছুক্ষণের মধ্যেই সিয়্যাটল। খুব জরুরি একটা মিটিং আছে বেনির।

২০৭৩, জিবুতি, উত্তর-পূর্ব আফ্রিকা

ছেঁড়া রুমালটা বের করে আরও একবার কপালের ঘামটা মোছে মাকিনা। কী ভয়ানক গরম! কোথায় যেন পড়েছিল মাকিনা, গোটা পৃথিবীটাই নাকি দ্রুতগতিতে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। আর কিছু বছরের মধ্যে নাকি বাসযোগ্য থাকবে না। ধীরে ধীরে অন্য কী একটা গ্রহে নাকি বসতি তৈরি হচ্ছে। সেখানে কী করে পৌঁছানো যাবে তা নিয়ে অবশ্য কোনোরকম ধারণা নেই মাকিনার, সে হাই স্কুল ড্রপ-আউট। আয়িতির মতো কলেজে পড়ে মেম হয়ে ঘুরে বেড়ালে হয়তো জানত সে-সব। আপাতত অন্য গ্রহে নয়, শহরের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পৌঁছতে পারলেই সে ধন্য হবে। গতকাল সন্ধে থেকে ধুম জ্বর কোলের ছেলেটার। এটা-সেটা দিয়ে চেষ্টা করে দেখা হয়ে গেছে, জ্বর মোটে নামেনি। অগত্যা ট্রেনে চেপে সেই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই। তবে সেখানে গেলেও যে ঠিকঠাক ওষুধ পাবে তার কী নিশ্চয়তা? কোলের শিশুটিকে নিজের গালের সঙ্গে চেপে ধরে মাকিনা। একটু আগেও কাঁদছিল, এখন একেবারে বেহুঁশ। গরমে, থিকথিকে ভিড়ে কামরার ভিতরটা নরক হয়ে আছে। সুস্থ মানুষই অসুস্থ হয়ে পড়ার জোগাড়। এই অঞ্চলে লোকও বেড়েছে পিলপিল করে। বছর পনেরো আগে যখন হিরের খনি আবিষ্কার হল এখানে, মাকিনা তখনও স্কুলে যায়। কত কী শুনেছিল তখন—এই জায়গা নাকি স্বর্গ হয়ে যাবে, সবাই কলেজে পড়বে, তিনবেলা পেট ভরে খাবে, সাদা নরম আলো জ্বলা হাসপাতাল হবে অনেকগুলো। ছেলেগুলো সবাই হাই স্কুল ছেড়ে খনিতে চাকরি নিয়েছিল। সব্বাই খুশি হয়েছিল খুব, এক ওই বুড়ো ফারাজি ছাড়া। শান্ত চোখ দুটো মেলে ফারাজি বলেছিলেন—সুখের সময় আসছে না, বড়ো ভুল করছ তোমরা। ফারাজির কথা এমনিতেও কেউ বোঝে না, তার উপর তখন কাঁচা পয়সার নেশা। কেউ পাত্তা দেয়নি। আর এখন তো বুড়ো ফারাজির নিজের নাতনি কাজ করছে ওদের হয়ে। ঠিক খনিতে নয় অবশ্য। তা সে-মেয়ে আর কিছু না হোক পড়াশোনা করেছে বিস্তর। কোন বড়ো শহরে যেন থাকে।

তারপর একটা নয়, তিন-তিনটে হিরের খনির সন্ধান পাওয়া যায় জিবুতিতে। মাকিনার বাবাও গিয়ে চাকরি নেয় খনিতে। বলতে নেই, অন্তত পেটভরে খাওয়া জুটেছিল ক’টা বছর। এই রেললাইনটাও তখনই পাতা হয়েছিল। কিন্তু আর কিছু হল না তো! স্কুল, হাসপাতাল—কোথায় কী? তবে মন্দের ভালো, নিত্য মারামারি কাটাকাটি বন্ধ হয়েছে কিছুকাল। তিনটে দেশ মিলে নাকি এই এলাকার শান্তিরক্ষা করে এখন। খনিগুলোর মালিকও সেইসব দেশ। জিবুতির পক্ষে সম্ভব ছিল না খনির কাজ চালানো। তা হোক, মাকিনা অত বোঝার চেষ্টাও করে না।

উফ্‌, ট্রেনটা চলছে না দাঁড়িয়ে আছে বোঝা দায়। তার মধ্যে বাচ্চাদের চ্যাঁ-ভ্যাঁ, বড়োদের ঝগড়া—মাথাটা কেমন ঘুরতে থাকে তার। বাচ্চাটা নেতিয়ে পড়েছে একেবারে। কখন যে পৌঁছবে! খনি এলাকা পেরিয়ে এসেছে প্রায়। ন্যাড়া ধু ধু মাঠ চোখে পড়ছে। এই মাটিতে কিছু গজানো দুঃসাধ্য। এদিকটা আর কিছু নেই, শুধু… হঠাৎ গা হিম হয়ে যায় মাকিনার। আজ বৃহস্পতিবার তো? সর্বনাশ! ক’টা বাজে এখন? তাড়াহুড়োয় মাথা থেকে বেরিয়ে গেছিল ব্যাপারটা। হঠাৎ একটা ঝাঁকুনি দিয়ে একেবারে থেমে যায় ট্রেনটা। এক এক করে সবক’টা কামরার আলো পাখা নিভে যায়। ভিতর থেকে উঠে আসা একটা কান্না আটকায় মাকিনা। বাকিদের অবশ্য কোনও হেলদোল নেই—যেমন বসে ছিল, তেমন বসেই থাকে। চোখে শূন্য দৃষ্টি। মাকিনার কোলে এতক্ষণ পর ছটফট করে ওঠে অসুস্থ ছেলেটা। শুকনো ঠোঁট দুটো ফাঁক করে তীব্র গলায় কেঁদে ওঠে।

প্রায় কুড়ি কিলোমিটার দূরে একটা দলছুট ছোট্ট হরিণ ঘাড় ঘুরিয়ে এদিক ওদিক তাকায়। ভয়ে পা কাঁপছে তার। দলের আর কাউকে খুঁজে পাচ্ছে না সে। এদিকটায় আগে অনেক ঝোপ ছিল, এখন সব কেটে ফেলা হয়েছে। চোখ দুটো আতঙ্কে বড়ো বড়ো হয়ে উঠেছে হরিণটার; কান দুটো অল্প অল্প নড়ছে। মাটিটা হালকা কাঁপছে কি? দূরে কতগুলো পিলার দেখা যাচ্ছে—কীসের একটা মস্ত লম্বা সাদা টিউব। এদিকে জন্তুজানোয়াররা আসতে বড়ো ভয় পায়। আসবেই-বা কী করে—ঝোপঝাড় যতটুকু যা গাছপালা ছিল সব কেটে সাফ। হঠাৎ সোঁ সোঁ একটা আওয়াজের সঙ্গে মাটি কাঁপতে থাকে। লাফিয়ে হরিণটা উধাও যায় দিগন্তরেখায়।

২০৫৭, জিবুতি, উত্তর-পূর্ব আফ্রিকা

ছোট্ট একটা একতলা বাড়ির বারান্দা। দারিদ্র্যের চিহ্ন স্পষ্ট হলেও পরিচ্ছন্ন, পরিপাটি। বারান্দার একপাশে ছোট্ট হাঁড়িতে সাদাটে হলুদ বাটারবল ফুল হাওয়ায় দুলছে। তার পাশে আরও ছোট্ট একটা ভাঙা সানকিতে অর্কিড। গাঢ় বেগুনি ফুল ধরেছে তাতে। নড়বড়ে চেয়ারটা রোদ থেকে ছায়ায় টেনে নিয়ে যেতে যেতে বুড়ো ফারাজি বলেন, “তুই যখন দৌড়স, উলটোদিকের হাওয়া তোকে বাধা দেয় কি না বল। সেই বাধা যদি না থাকত, তাহলে তুই অনেক জোরে দৌড়াতিস—তাই না? এটাও তাই। একটা লম্বা টিউবকে বায়ুশূন্য, মানে সম্পূর্ণ বায়ুশূন্য নয়—আংশিকভাবে বায়ুশূন্য করে তার ভিতর দিয়ে ছোটো ছোটো কামরা—এই ধর বড়ো একটা ট্যাক্সির দ্বিগুণ আকারের গাড়ি প্রায় শব্দের সমান গতিতে ছুটে যাবে। কয়েক মিনিটে কোথা থেকে কোথায় পৌঁছে যাবি!”

সস্নেহে নাতনির দিকে তাকান ফারাজি। বড়ো বুদ্ধিমতী মেয়ে। প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে তাঁকে নাকাল করে ঠিকই, কিন্তু খুব ভালো লাগে তাঁর। মা-বাপ মরা মেয়েটাকে তিল তিল করে বড়ো যত্নে মানুষ করে তুলছেন তিনি। একমাত্র ছেলে আর পুত্রবধূর শেষকৃত্য সম্পন্ন করে চার বছরের অনাথ শিশুকে কোলে নিয়ে শহর থেকে ফিরেছিলেন যেদিন, বুকটা ভেঙে গিয়েছিল তাঁর। মনে হয়েছিল পারবেন তো তিনি একে বড়ো করতে? আজ দশ বছরের ঝকঝকে মুখটার দিকে তাকিয়ে গর্বে মনটা ভরে যায় তাঁর। শহরের বড়ো স্কুলে পড়াতে পারলে হয়তো ভালো হত, কিন্তু শহরকে খুব ভয় পান ফারাজি। যদি শহরে চাকরি করতে না যেত কোফি, যদি অ্যাকসিডেন্টটা না হত, তাহলে হয়তো…

“দাদু, কী ভাবছ? বলো না সম্পূর্ণ বায়ুশূন্য কেন করবে না?”

নাতনির উৎসুক গলায় চমক ভাঙে ফারাজির। গাঢ় বাদামি চোখ দুটোর পেছনে আলো জ্বলছে যেন। মাথার কুচিকুচি চুলগুলো সরু নীল ফিতে দিয়ে টানটান করে বাঁধা।

“আরে বাবা, এ কি আর দশ-বারো ফুটের ব্যাপার? হাজার হাজার কিলোমিটার জুড়ে লম্বা পাইপ—কোথাও লিক থাকতে পারে—আর অতখানি পাইপ বায়ুশূন্য করে রাখবে তার খরচটা ভাব। তাই আংশিকভাবে বায়ুশূন্য করার কথা বলেছে। কিন্তু তাতে আবার অন্য মুশকিল।”

“কী মুশকিল, দাদু?”

এই রে! এক মুহূর্ত দ্বিধায় পড়লেন বুড়ো ফারাজি। এত ছোটো বাচ্চা—বুঝবে কি? নাতনির দিকে তাকিয়ে হেসে ফেললেন মনে মনে। নাহ্, এ ঠিক বুঝবে।

“আচ্ছা, ধর একটা ইনজেকশন সিরিঞ্জ, তার পিছন দিকটা পুরো শেষ পর্যন্ত টেনে বের করে রেখেছিস, কেমন? এবার ধর মুখের দিকটা মানে নজলটা কোনোভাবে আটকে দিলি। তাহলে এবার যদি তুই পিছনের অংশটা ঠেলে সামনের দিকে ঢোকানোর চেষ্টা করিস, তাহলে সিরিঞ্জের ভিতর আটকে থাকা হাওয়াটা ঠেলে তবেই সেটা পারবি। সিরিঞ্জের মুখটা খোলা থাকলে যতটা হাওয়ার চাপ থাকত ভিতরে, তার থেকে অনেক বেশি চাপ এড়িয়ে তবেই পেছনের অংশটা সামনে এগোতে পারবে। আবার, যত এগোবে সামনের হাওয়া ততটা সংকুচিত হয়ে যাওয়ার ফলে, একসময় গিয়ে আর আগের গতিতে এগোতে পারবে না। একে বলে ক্যানট্রোউইটজ লিমিট। এবার যদি সিরিঞ্জের পাইপটাকে আমি যদি ট্রেনের টিউব ভেবে নিই, আর পেছনের পিস্টনটাকে টিউবের ভিতর দিয়ে চলা পড বা গাড়ি ভেবে নিই, তাহলে যত গাড়িটা টিউবের শেষ দিকে যাবে, বায়ুর চাপ তত বেড়ে যাবে। সেটাকে অতিক্রম করার মতো পাওয়ার বা জ্বালানি যাই বল, পাবে কোথায় গাড়িটা? টিউবের উপরে বিছানো সোলার সেল যথেষ্ট হবে না।” ফারাজি যেন বহুকাল আগে ফেলে আসা কলেজ জীবনে ফিরে গেছেন।

“এ বাবা, কী হবে তাহলে দাদু?”

“দুইভাবে ব্যাপারটা সামলানো যেতে পারে, ভেবে দেখ। এক, যদি টিউবটাকে পডের তুলনায় অনেক বড়ো অর্থাৎ চওড়া করা যায়—কিন্তু তাতে লাভ কিছু নেই, বানানোর খরচাই উঠবে না। অথবা…” হঠাৎ অন্যমনস্ক হয়ে যান বুড়ো ফারাজি। এই ব্যাপারে কী যেন একটা খবর পড়েছেন সম্প্রতি। কে এক কলেজ স্টুডেন্ট নাকি এই ব্যাপারে কাজ এগিয়েছে, নামটা মনে করতে পারলেন না তিনি।

“অথবা দাদু?” নাতনির গলা বেশ অসহিষ্ণু।

“বলছি, বলছি। অথবা পডগুলোর মাথায় যদি এমন কিছু একটা লাগানো যায়, ধর কম্প্রেসারের মতো, যেটা সামনের বায়ুকে পডের পিছনে চালিয়ে নিয়ে যাবে। তাতে সামনের চাপ কমল, আবার পিছনে বইয়ে নিয়ে যাওয়া হাওয়া যানটাকে এগোতে সাহায্যও করল। মনে রাখিস, এ কিন্তু ট্রেনের মতো ট্র্যাক দিয়ে চলে না। এ কিন্তু ম্যাগনেটের সাহায্যে ভেসে চলে।”

“আরে বাহ্!” খুশিতে হাততালি দিয়ে ওঠে ছোট্ট মেয়েটা।—”তাহলে করেনি কেন এখনও?”

“এক তো এরকম কোনও কম্প্রেসার তৈরি নেই এখনও, তাছাড়া সেটা চলবে কীসে সেটাও তো ভাবতে হবে। সেই যদি জ্বালানি বহন করতে হয়, তাহলে তো এত কাণ্ড করার কোনও দরকারই নেই। তাছাড়া এসব করার ফলে যে তাপ তৈরি হবে সেটা কীভাবে সামলাবে সেটাও ভাবতে হবে। ওরা তো বলেছিল টিউবের মাথায় বসানো সোলার সেল থেকেই প্রয়োজনীয় পাওয়ার পাওয়া যাবে, অন্য কিছু লাগবে না, কিন্তু এখন বোঝা যাচ্ছে তা যথেষ্ট নয়। প্রত্যেকটা স্টেশনে পাম্পিং মেশিন, শুরুর গতিটা দেওয়ার জন্য মোটর, তাছাড়া এই কম্প্রেসার, তাপ নিয়ন্ত্রক, তাছাড়া ধর আলো ইত্যাদি মিলিয়ে কম নয় তো।”

“তাহলে কি হবে না কখনও, দাদু?”

“নিশ্চয়ই হবে। কাজ চলছে তো।”

আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলেন ফারাজি, বাইরে থেকে ডাক আসে—”আয়িতি, অ্যাই আয়িতি!”

লাফিয়ে উঠে দাঁড়ায় বুড়ো ফারাজির নাতনি।—”দাদু, ওমারি খেলতে ডাকছে। যাই?”

লাফাতে লাফাতে বেরিয়ে যায় আয়িতি। সমবয়সি ওমারি সেই শিশুকাল থেকে ওর খেলার সঙ্গী। দুটো বাড়ি পরেই থাকে ছেলেটা।

২০৭১, ক্যালিফোর্নিয়া

সম্পূর্ণ কাচে ঢাকা আকাশছোঁয়া বিল্ডিংটার দিকে ঘাড় উঁচু করে তাকায় আয়িতি। সকালের ঝলমলে রোদে তার পিছনের আকাশ, সাজানো গাছপালা সব কেমন প্রতিফলিত হয়েছে কাচের গায়ে। আয়িতির হাতের তালু ঘামছে, বুকের মধ্যে ডুনডুন ড্রাম বাজছে। দাদুর কথা মনে পড়ছে খুব। দাদু না থাকলে সে কি আর এতদূর আসতে পারত কখনও? সেই কোন ছোটবেলায় দাদু তাকে ক্যানট্রোউইটজ লিমিট বুঝিয়েছিল—অবশ্য ছোটোদের মতো করে। সেই হাইপার-লুপ নিয়ে কত জল্পনা, কত প্রশ্ন। সে ছোটো বলে কোনোদিন কিন্তু দাদু তার প্রশ্ন এড়িয়ে যায়নি, ধৈর্য ধরে সব উত্তর দিয়েছে। আর আজ সেই হাইপার-লুপ যারা সত্যি করে তুলেছে সেই এক্সপ্লোর-এক্স-এর হেড-কোয়ার্টারের সামনে দাঁড়িয়ে আছে সে। ঠিক পনেরো মিনিটের মাথায় তার ইন্টারভিউ।

***

“কনগ্র্যাচুলেশনস মিস আয়িতি ওবি! এক্সপ্লোর-এক্সে স্বাগত। আলাপ করিয়ে দিই—ইনিই মিস্টার বেঞ্জামিন কুপার, যাঁর অবিশ্বাস্য প্রতিভার ফলে এই হাইপার-লুপ বাস্তবায়িত হয়েছে।” লিসা নামের মেয়েটি কলকল করে ওঠে।

আয়িতির হাত-পা কাঁপছে। ডানহাতের আঙুল দিয়ে বাঁহাতের তালুতে চট করে চিমটি কেটে একবার দেখে নিল স্বপ্ন দেখছে কি না। সত্যি সে তার স্বপ্নের জায়গায় চাকরি পেল তবে। তার সামনে দাঁড়িয়ে এ যুগের অন্যতম সেরা বিজ্ঞানী বেঞ্জামিন কুপার। আয়িতি ইতিহাসে পড়েছে, আগে নাকি সেরা বিজ্ঞানীদের নোবেল পুরস্কার দেওয়া হত। সে নাকি খুব সম্মানের ব্যাপার ছিল। এখনও সে-প্রথা থাকলে ইনি নিশ্চয়ই সেটা পেতেন।

“আমাকে সবাই বেনি বলে ডাকে।” করমর্দনের জন্য হাত এগিয়ে দেয় বেঞ্জামিন।

ইন্টারভিউ প্যানেলে সাত-আটজন ছিলেন। ঠিক মাঝখানে বসা রোগা-লম্বা প্রায় ক্ষয়াটে চেহারার ভদ্রলোকটি যে বেঞ্জামিন কুপার মানে দ্য বেঞ্জামিন কুপার, সে সন্দেহ আয়িতির অনেকক্ষণ ধরেই হচ্ছিল। অনেক ছবি, ইন্টারভিউ দেখেছে সে, চিনতে ভুল হওয়ার কথা নয়। আজ সেই এক্সপ্লোর-এক্সে সেও কাজ করবে, শিখবে কত কিছু! এতদিনের স্বপ্ন আজ সত্যি হল। সামনে দাঁড়ানো মানুষটিকে কত কিছু জিজ্ঞেস করার আছে। হড়বড় করে সেরকম একটা প্রশ্নই হঠাৎ বেরিয়ে এল তার মুখ থেকে।

“এবার নিশ্চয়ই সাধারণ মানুষেরও আয়ত্ত্বে আসবে এই অবিশ্বাস্য যাত্রা। সেটাই কি পরবর্তী লক্ষ্য?” উত্তেজনায় মুখ লাল হয়ে গেছে আয়িতির।

ঘরের মধ্যে ঠান্ডাটা একটু বেড়ে গেল নাকি? সবাই কেমন একটা ভাবে তার দিকে তাকাচ্ছে না? এই রে, বেফাঁস কিছু বলে ফেলেছে নির্ঘাত। হবেই তো, সদ্য চাকরি পাওয়া একজন কর্মচারীকে পরবর্তী কাজের পরিকল্পনা কেনই-বা বলতে যাবে এরা? সেও যেমন। লজ্জায় কান গরম হয়ে যায় আয়িতির।

মুহূর্তে সামলে নিয়েছে বেঞ্জামিন। কুঁচকে যাওয়া কপালটা সমান করে নিয়ে আর একজনের দিকে আলাপ করানোর ভঙ্গিতে হাত বাড়িয়ে বলে, “ইনি ফ্রেডরিক। তোমার দেশের সঙ্গে হাইপার-লুপের সম্পর্ক স্থাপন করবেন ইনি।”

এবার হেসে ফেলে আয়িতি। মানেটা কী?

“আমার দেশে ট্রেন চলে কোনোরকমে। তাও হিরের খনি আবিষ্কার হওয়ার পর নতুন রেল চালু হয়েছে এই কয়েক বছর আগে। সোমালিয়া থেকে তোমাদের দেশের সৈন্য সরে যাওয়ার পর আবার যে ভয়ানক গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব শুরু হয়, সেই সময়েই জিবুতির রেলপথও ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। সে অবশ্য আমার জন্মের বহু আগে। তারপর তো আর পরিবহণ ব্যবস্থা সেভাবে নতুন করে তৈরিই হয়নি। সেখানে হাইপার-লুপ? চড়বে কারা?” শেষের দিকে আয়িতির গলাটা তিক্ত শোনায়।

“আরে ভুল বুঝছ আয়িতি,” বেঞ্জামিন বন্ধুত্বপূর্ণ গলায় বলে, “তোমাদের হিরের খনি থেকে যা হিরে ওঠে তার সিংহভাগ ক্রেতা থাকে সৌদি আরবে। তাই হাইপার-লুপ বসবে তোমার জিবুতি থেকে টানা জেদ্দা পর্যন্ত। শুধু তাই নয়, বাব-এল-মান্দেব প্রণালীর উপর দিয়ে যাবে রুটটা। এই প্রথম জলের উপর দিয়ে হাইপার-লুপ ট্র্যাক বসবে। বুঝতে পারছ এর নিহিত অর্থ?”

সত্যি বলতে কী, এর কোনও অর্থই বোধগম্য হয় না আয়িতির। তিনটে খনি থেকে হিরে যাবে আরবের বাজারে, তার জন্য হাইপার-লুপ বসবে। ধনকুবের ব্যবসায়ীরা নিত্য যাতায়াত করবে। এতে জিবুতির ভালোটা কোথায় বোঝা মুশকিল। কোনও খনিরই মালিক জিবুতি নয়। একটা ইতালির, একটা অবশ্যই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের, আর একটা বোধহয় যুগ্মভাবে ইজিপ্ট আর সৌদি আরবের।

সম্ভবত আয়িতির মনের ভাব মুখে ফুটে থাকবে। এতক্ষণে ফ্রেডরিক নামক ব্যক্তি কথা বলে ওঠে—”আরে এইভাবেই তো সব উন্নতির শুরু হয়। দেখবে এরপর জিবুতিতে কত ধনী পর্যটক আসবে, আস্তে আস্তে অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি হবে কত।”

আয়িতির মনটা দমে যায় কেমন। হ্যাঁ, এটা ঠিক যে খনির কাজ শুরু হওয়ার পর থেকে আগের মতো দাঙ্গা, গৃহযুদ্ধ আর হয় না ইদানীং। জিবুতির বাসিন্দারা কাজ পেয়েছে খনিতে। ২০৬২-তে গঠিত ইউরো-আরব কনফেডারেট নিজেদের স্বার্থেই খনি এলাকায় শান্তিরক্ষা করে। কিন্তু একই সঙ্গে ভয়ানক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে বনাঞ্চল। একে তো জিবুতিকে প্রায় আধা মরুভূমি বললেই চলে। দুই টুকরো জঙ্গল টিকে ছিল কোনোক্রমে। কিন্তু মাবলা পর্বতমালা আর ডে ফরেস্ট ন্যাশনাল পার্কের মধ্যবর্তী অঞ্চলেই হিরের খনিগুলো আবিষ্কৃত হল। সত্যি কথা বলতে কী, সেই সময় জিবুতি পড়েছিল চরম অর্থনৈতিক সংকটে। খনি অঞ্চল বণ্টন করে ভেবেছিল দুর্দশা ঘুচবে। কিন্তু বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের কোনও ব্যবস্থাই যে করা হবে না সেটা সম্ভবত বুঝতে পারেনি জিবুতি গভর্নমেন্ট। খুব সামান্য বনাঞ্চল পড়ে আছে এখন, এর মধ্যে আবার হাইপার-লুপ?

“খনির কাজ শুরু হওয়ার পর বেশ কিছু প্রজাতির হরিণ লুপ্তপ্রায় হয়ে গেছে জিবুতিতে। লুপ্ত হয়েছে মোমোসা গাছ। ওই এলাকায় হাইপার-লুপ ট্র্যাক হওয়াটা কতটা যুক্তিযুক্ত?” আর কী বলবে বুঝতে না পেরে থেমে যায় আয়িতি।

“কাম অন, লেটস সেলিব্রেট ইওর জয়েনিং ফার্স্ট।” হইহই করে ওঠে বেনি, ফ্রেডরিক আর লিসা।

***

“দাদু, আমি পেরেছি। আমার হাতে এখন অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার!” ফোনের মধ্যে যতটা সম্ভব উৎসাহ ঢেলে দিতে চায় আয়িতি।

“বলিস কী! ওয়েল ডান মাই প্রিন্সেস। কিন্তু গলাটা বলছে তুই খুশি নোস। ব্যাপারটা কী?”

হাতে সেল ফোনটা ধরে গাল কামড়াতে থাকে আয়িতি। দাদু এখনও সব টের পেয়ে যায়।—”আরে না না, সব ঠিক আছে, তুমি ভেবো না। আমাকে পরের সপ্তাহে জয়েন করতে হবে। লম্বা ছুটি পেলেই তোমার কাছে যাব।”

“অল দ্য বেস্ট।” বুড়ো ফারাজির গলায় একটা হাঁফ ধরা ভাব যেন।

“আর দাদু…” কী যেন বলতে গিয়ে চুপ করে যায় আয়িতি।

বুড়ো ফারাজি অপেক্ষা করতে থাকেন।

“নাহ্, কিছু নয়। দেখা হলে বলব। এখন রাখি।”

অনেকক্ষণ চুপ করে বসে থাকেন ফারাজি। শহরকে তাঁর বড়ো ভয়। শহর বড্ড পালটে দেয় মানুষকে।

২০৭২, ক্যালিফোর্নিয়া

এক্সপ্লোর-এক্স হেড-কোয়ার্টার

“এ তো লাভের গুড় পিঁপড়েতে খেয়ে যাবে!” ফ্রেডরিকের কপালে জমাট ভ্রূকুটি।—”তুমি এত বড়ো বিজ্ঞানী, কিছু উপায় বের করো। এত খরচসাপেক্ষ হলে তো কোনও মানেই থাকে না।”

“এতটা লম্বা রুট, তার উপর ওয়াটার বডি। রুটটা সোজা রাস্তা নয়। টিউব সোজা হলে খরচাটা কমে। তার উপর আধা মরু অঞ্চল। তাপমাত্রা কোথায় উঠে যায় সে খেয়াল আছে? তাপের ফলে ধাতব টিউবের যে প্রসারণ ঘটবে তাতে সব হিসেব গোলমাল হয়ে যাবে। সেটা সামলাতে গেলে খরচ বাড়বেই। যারা যাবে তারা তো বুদ্ধু নয়। শব্দের কাছাকাছি বেগ নিয়ে যাত্রার আনন্দ পেতেই তারা এত দাম দিয়ে পাস কিনবে, তাই না?” বেনির মুখে বিরক্তি স্পষ্ট। সামনের বিশাল স্বচ্ছ স্ক্রিনের উপর তর্জনী দিয়ে স্ক্রোল করতে করতে সে আড়চোখে ফ্রেডরিকের দিকে তাকায়।

“এর সঙ্গে যোগ হবে সোলার সেল, পাম্প, মোটর, কম্প্রেসার ইত্যাদি চলার ব্যবস্থা। তাই তো? সোলার সেল সেগুলো চালানোর পক্ষে যে যথেষ্ট নয়, তা আগেই দেখেছি আমরা। তার মানে পাওয়ারের ব্যবস্থা করতে খরচা প্রায় দ্বিগুণ হবে।” গলাটা বেশ চড়ে যায় ফ্রেডরিকের।

দুই আঙুলে কপাল টিপে বসে থাকে বেনি। লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে সিয়্যাটলের রুট লম্বা হলেও সেখানে ঠিক এই ধরনের চ্যালেঞ্জ ছিল না। এখন পিছিয়ে আসাও আর সম্ভব নয়। প্রচুর কারেন্সি ঢালা হয়ে গেছে।

“একটা কাজ অবশ্য করা যায়।” তর্জনী আর মধ্যমা স্ক্রিনের গায়ে ঠুকতে ঠুকতে বলে বেনি।

***

আধঘণ্টা বাদে চেয়ারে গা এলিয়ে দেয় ফ্রেডরিক। তার মুখে তৃপ্তির হাসি।

“তুমি জিনিয়াস তাতে সন্দেহ নেই, কিন্তু জিবুতির লোকজন যদি…” ফ্রেডরিকের চোখে সামান্য সংশয়।

“যাদের এমনিতেই বিশেষ কিছু নেই, তাদের যা আছে সেটাও নিয়ে নেওয়া সহজ হয় ফ্রেডি। ওরা খেয়ালই করবে না। করলেও মেনে নেবে। সাধারণ মানুষের মেনে নেওয়ার ক্ষমতা সীমাহীন।”

“লেটস ডু ইট দেন।”

বন্ধ দরজায় মৃদু করাঘাত করে কেউ। চমকে উঠে নিজের ডানহাতটা স্ক্রিনের সামনে বিদায়ের ভঙ্গিতে একবার নাড়ায় বেনি। স্ক্রিন মুহূর্তে অন্ধকার হয়ে যায়।

দরজা খুলে ঘরে ঢোকে আয়িতি। মুখে একগাল হাসি।—”বলছি, আমাদের ওখানে হাইপার-লুপের কাজ শুরু হচ্ছে, তাহলে আমি ওখানে পোস্টিং নিয়ে চলে যাই?”

নীরবে চোখাচোখি হয় ফ্রেডরিক আর বেনির।

“আরে যাবে তো নিশ্চয়ই। তার আর কী? তবে কোম্পানি পলিসি অনুযায়ী দুই বছর না হলে তো রিলোকেট করা যাবে না, তাই…”

বিমর্ষ মুখে মাথা নেড়ে বেরিয়ে যায় আয়িতি।

২০৭২, জিবুতি, উত্তর-পূর্ব আফ্রিকা

“এ কীভাবে সম্ভব স্যার? আমাদের নিজেদের ব্যবহারের জন্যই যথেষ্ট বিদ্যুৎ নেই, সেই কোন যুগ থেকে আমরা ইথিওপিয়ার কাছ থেকে জলবিদ্যুৎ আমদানি করি। গত তিন বছর ধরে তাদের কাছে কত ফ্রাঙ্ক ঋণ জমেছে তা নিশ্চয়ই আপনার খেয়াল আছে। জিবুতির না আছে খনিজ তেল, না আছে কয়লা। সৌরশক্তি আর জিওথার্মাল শক্তি দিয়ে কোনোরকমে আমরা ঠেকা দিচ্ছি বলা যায়। সেখানে অত বিশাল একটা ব্যাপার আমরা…” চশমাটা খুলে হাতের তালু দিয়ে দুই চোখ ঘষতে থাকেন জিবুতির মেয়র। তাঁর সামনে স্বয়ং প্রেসিডেন্ট।

“উপায় নেই মিস্টার মেয়র, এতে যদি জিবুতির সার্বিক অবস্থার কিছু উন্নতি হয়। আর রোজ তো এই প্রয়োজন পড়বে না।”

দুজনে চুপ করে বসে থাকেন। পরপর হিরের খনি যখন খুঁজে পাওয়া গেল, মনে হয়েছিল এবার হয়তো জিবুতি মাথা তুলে দাঁড়াবে। প্রথম বিশ্বের দেশগুলোকে ঠিক ভরসা না করতে পারলেও, এটুকু ভেবেছিল তারা নিজেদের স্বার্থেই রাজনৈতিক শান্তি বজায় রাখবে অন্তত। গরিব মানুষগুলো কাজ পাবে। এমনিতেই প্রকৃতি তাদের উপর বিরূপ। এখানের মাটি চাষের উপযুক্ত নয়, তার উপর চরম জলকষ্ট। গ্রামের অবস্থা তো কহতব্য নয়। বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের ফলে গবাদি পশু নেই বললেই চলে। এরকম সময়ে হিরের খনিগুলো অনেক স্বপ্ন দেখিয়েছিল জিবুতির মানুষকে। খনি ঘিরে বসতি স্থাপন হল নতুন, রেলপথ হল। প্রথমদিকে ভালোই চলছিল সবকিছু। কিন্তু কয়েক বছর পেরোতেই বোঝা গেল, খনির প্রথম বিশ্বের মালিকরা জিবুতির উন্নতিতে তেমন উৎসাহী নন। সেটাই সম্ভবত স্বাভাবিক।

২০৭৩ জিবুতি, উত্তর-পূর্ব আফ্রিকা

মাকিনা প্রায় ঘুমিয়ে পড়েছিল। কতক্ষণ ট্রেন দাঁড়িয়ে আছে কে জানে। একবার ভেবেছিল নেমে যায়, কিন্তু নেমে যাবেটাই-বা কোথায়? আদৌ এ-বেলা আর ট্রেন চলবে কিনা তারও ঠিক নেই। গরমে, ক্লান্তিতে কেমন ঘোরের মধ্যে চলে গেছিল সে। বাকি যাত্রীদেরও বোধহয় একই অবস্থা। আর চেঁচামেচি-ঝগড়াঝাঁটি নেই, বাচ্চাদের চ্যাঁ-ভ্যাঁও বন্ধ।

হঠাৎ ঘটাং করে ঝাঁকুনি দিয়ে ট্রেন চলতে শুরু করে আবার। মাকিনার ঘোরটাও কেটে যায়। কোলের ছেলেটাকে তুলে ধরে মুখের কাছে। ছেলেটা কেমন নেতিয়ে পড়েছে না? তুলতে গিয়ে ঘাড়টা একদিকে হেলে গেল। গা-টা এরকম ঠান্ডাই-বা হল কখন? জ্বর নেমে গেছে বোধহয়। ছেলেটাকে হালকা নাড়িয়ে ডেকে তুলতে যায় মাকিনা। চোখের পাতা টেনে দেখে। কিছুতেই এলানো ঘাড় সোজা হয় না ছেলেটার। মাকিনার আর্ত চিৎকার কামরায় ছড়িয়ে পড়ে খানিক পরে। বাকি যাত্রীদের মধ্যে কেউ ওঠে না, একটাও শব্দ করে না কেউ। মানুষ না কাঠের পুতুল বোঝা দায়।

২০৭৩, ক্যালিফোর্নিয়া

এক্সপ্লোর-এক্স হেডকোয়ার্টার

অফিসের ক্যান্টিনে লাঞ্চ করতে ভালো লাগে না আয়িতির। মস্ত বড়ো টাচ স্ক্রিনে খাবার বেছে অর্ডার দেওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যে ঠিক মানুষের মতো দেখতে হিউমানয়েড রোবট এসে খাবার দিয়ে যায়। তাদের চোখের পাতা পড়ে, খাবার দেওয়ার সময়ে গাল কুঁচকে হেসে গুড ডে বলে। কিন্তু ভারি অস্বস্তি হয় আয়িতির। মানুষের মতো দেখতে অথচ মানুষ নয় ব্যাপারটা মানতে মুশকিল হয় খুব। অবশ্য মানুষের মতো দেখতে হলেই যে মানুষ হবে ঠিকঠাক সেটাও নয়।

যাই হোক, হাতে সময় থাকলে অফিস থেকে বেরিয়ে আসে আয়িতি। খানিকটা হেঁটে গেলে একটা ছোট্ট স্যান্ডউইচের দোকান পড়ে, বয়স্ক এক ভদ্রমহিলা চালান সেটা। আজও সেখানেই লাঞ্চ সেরে ফিরছিল আয়িতি। হঠাৎ সেল ফোনটা বেজে উঠল। এরকম পুরোনো সেল ফোন অবশ্য ক্যালিফোর্নিয়ায় কেউ বিশেষ ব্যবহার করে না আর, তবে আয়িতি এখনও নিজেরটা পালটায়নি।

“হ্যালো!”

“আয়িতি, আমি ওমারি বলছি।”

ভীষণ চমকে যায় আয়িতি। কতদিন যোগাযোগ নেই ওমারির সঙ্গে! দাদুর কাছে শুনেছিল খুব বেশিদূর পড়াশোনা হয়নি ওর, তবে সরকারি কিছু একটা চাকরি পেয়েছে সম্ভবত।

“চিনতে পারছিস তো আয়িতি?” ওকে চুপ দেখেই বোধহয় আবার বলে ওমারি।

“ছোটবেলার বন্ধুকে চিনতে পারব না?” আয়িতি বলে এবার।

“ভালো। যার জন্য ফোন করলাম—তোর দাদুর শরীর ভালো নেই।”

চমকে ওঠে আয়িতি। দাদু তো কিছু বলেনি তাকে!

“পারলে একবার আসিস।”

“আমি আজই ছুটি নিচ্ছি। দাদুর কী হয়েছে?”

“বয়স। আর এখানে যা চলছে…”

দাঁড়িয়ে পড়ে আয়িতি। ধরা গলায় বলে, “ওখানে কী চলছে ওমারি?”

কেমন অদ্ভুতভাবে হাসে ওমারি। গলায় শ্লেষ ঢেলে বলে, “তুই জানিস না নাকি?”

“কী বলছিস, আমি…” কথা শেষ করার আগেই ফোনটা কেটে যায়। হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে আয়িতি।

২০৭৩ জিবুতি, পূর্ব আফ্রিকা

এই বারান্দাটার কোনও পরিবর্তন হয়নি। সেই অর্কিড, সেই বাটারবল। সেই নড়বড়ে টেবিল। দুই হাতে মুখ ঢেকে বসে আছে আয়িতি। পাশে নীচু মোড়ায় বুড়ো ফারাজি। একটু দূরে দেওয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ওমারি।

আয়িতি এখনও নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না। হাইপার-লুপ চালু হয়েছে জিবুতি থেকে জেদ্দা—সেটা সে অবশ্যই জানত। শুনেছিল এই রুটটা খুব গোলমেলে হওয়ার দরুন এই প্রজেক্ট তৈরির খরচা দাঁড়িয়েছে আকাশছোঁয়া। তা নিয়ে অবশ্য মাথা ঘামায়নি আয়িতি। যারা শখ করে চাপবে, তারা তেমন দাম দিয়ে টিকিট কেটেই চাপবে। তাছাড়া কেমন একটা গোপনীয়তা রক্ষা করছিল বেনি। প্রজেক্টের ডিজাইন দেখে একটু অন্যরকম লেগেছিল, কিন্তু বেনি কোনও প্রশ্নের উত্তর দিতে চায়নি।

“নিজেদের লাভের জন্য ওরা জিবুতির পাওয়ার গ্রিডে হাইপার-লুপকে জুড়ে দিল!” আয়িতির গলায় এখনও অবিশ্বাস।

“আমরা নিজেদের জন্যই যথেষ্ট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারি না। যেদিন ওদের শব্দের কাছাকাছি বেগে চলার ইচ্ছা হয়, আমাদের ধুঁকতে ধুঁকতে চলা ট্রেনগুলোও বন্ধ হয়ে যায় সেদিন। সেরকমই এগ্রিমেন্ট হয়েছে নাকি। ইয়েমেনের অবশ্য কিছু যায় আসে না, কিন্তু ওরা যেটা পারে আমরা পারব কী করে? সেদিন মাকিনা অসুস্থ বাচ্চাটাকে নিয়ে শহরে যাচ্ছিল…” দেওয়ালে একটা ঘুসি মারে ওমারি। আয়িতি ভয়ে আর বাচ্চাটা ঠিক আছে কি না জিজ্ঞেস করতে পারে না, গলার কাছটা কেমন ঠান্ডা হয়ে আসে।

“এরকম এগ্রিমেন্টের মানে কী? আমরা কী পাচ্ছি এর বদলে?”

“সোমালিয়ায় গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব আবার মাথা চাড়া দিচ্ছে। যে-কোনো সময় সেটা জিবুতিতে ছড়িয়ে পড়বে। গতমাসে দু-দু’বার খনি এলাকায় বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে কারা। জিবুতি জুড়ে আবার যদি গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে যায় সেই আগের মতো?” বুড়ো ফারাজি কোনোরকমে এই ক’টা কথা বলে হাঁফাতে থাকেন।

“বুঝলাম। আসলে জিবুতির শান্তি রক্ষার নামে নিজেদের খনি রক্ষা করছে ওরা। তার বদলে আমরা আমাদেরই অকুলান বৈদ্যুতিক শক্তি তুলে দিচ্ছি ওদের হাতে।” তিক্তভাবে বলে আয়িতি।—”এই কারণেই তবে এত গোপনীয়তা? কিন্তু মিডিয়াও তো কোনও কথা বলেনি এই ব্যাপারে!”

বুড়ো ফারাজি হাঁফাচ্ছিলেন। মুখটা কেমন বেগুনি দেখাচ্ছে। সেইদিকে আঙুল তুলে ওমারি বলে, “দেখ আয়িতি, এখন যদি দাদুকে নিয়ে শহরে হাসপাতালে যেতে হত, কী করতিস তুই? ন্যাশনাল পার্কে সেদিন একটা সেমিনার ছিল, সেখানে বলল আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে নাকি জিবুতির চার শতাংশ মানুষের নিজেদের গাড়ি ছিল। এখন বোধহয় দুই শতাংশেরও নেই। যদি দাদুর এখন…”

“জাস্ট শাট-আপ ওমারি!” তীক্ষ্ণভাবে চেঁচিয়ে ওঠে আয়িতি। উত্তেজনায় উঠে দাঁড়িয়েছে সে।

“ওহ্‌, তাই তো। আমি ভুলে গেছিলাম তুই ওদের হয়ে কাজ করিস।” ওমারির গলাও তীক্ষ্ণ।

“হ্যাঁ আমি ওদের হয়ে কাজ করি, কারণ আমি বিজ্ঞান ভালোবাসি। সায়েন্স ফ্যাসিনেটস মি। ওদের আসল চেহারাটা আমি দেখতে পাইনি আগে।” আয়িতির গাল বেয়ে জল নামে ফোঁটা ফোঁটা।—”এও তো একধরনের কলোনিয়ালিজম। আগে ভাবতাম আমাদের জেনারেশন উপনিবেশিকতার হাত থেকে অন্তত মুক্ত। কখনও ধর্ম মানুষকে আলাদা করেছে, কখনও বর্ণ। অন্তত বিজ্ঞান সেই বিভেদ আনবে না, এটাই ভাবতাম।” চোখের জলে ঝাপসা হয়ে আসে আয়িতির দৃষ্টি। পা মুড়ে মেঝের উপর বসে পড়ে সে। বুড়ো ফারাজি একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকেন নাতনির দিকে।

বোধহয় আধঘণ্টা পর হঠাৎ উঠে দাঁড়ায় আয়িতি। গালে লেগে থাকা জলের দাগ মুছে নেয়। দৃঢ় গলায় বলে, “তবে আমি ওদের হয়ে কাজ করি বলেই এবার আমাদের কী করতে হবে সেটাও আমি জানি।”

***

রাত বাড়ছে। বুড়ো ফারাজি প্রাচীন আরমকেদারায় বসে ঘুমিয়ে পড়েছেন। কিছুক্ষণ আগে পর্যন্তও বৈদ্যুতিক আলো জ্বলছিল। এখন লন্ঠনের আলোয় কেমন ভূতুড়ে দেখাচ্ছে চারপাশ।

নড়বড়ে টেবিলটার উপর ক্ষয়ে যাওয়া একটা চক দিয়ে লিখে চলেছিল আয়িতি। ওমারি মাথা ঝুঁকিয়ে বোঝার চেষ্টা করছিল। সামান্য আপশোশ হচ্ছিল বেশিদূর লেখাপড়া করেনি বলে।

“তোর ইলেকট্রিক অফিসের চাকরিটা আর থাকবে না সেটা বুঝতে পারছিস?” আয়িতি হেসে ফেলে হঠাৎ।

“আমি চেষ্টা করলে ডে ফরেস্ট ন্যাশনাল পার্কে কাজ পেয়ে যাব। কিন্তু তুই?”

দুজনে শব্দ করে হেসে ওঠে।

***

পুরো সিস্টেমটা দাঁড়িয়ে আছে পিলারের উপর, অন্তত চল্লিশ ফিট উঁচুতে। নেহাত টেররিস্ট না হলে ওই উঁচুতে গিয়ে কিছু করা সম্ভব নয়। প্রত্যেকটা স্টেশনে আছে একটা মোটর যেটা শুরুর গতিটা দেয় ভিতরের পড বা যানগুলোকে। আর আছে পাম্প যেটা টিউবের ভিতরটা ডিপ্রেশারাইজ করে, মানে প্রায় বায়ুশূন্য করে। এরকম পাম্প অবশ্য সারা রুটটা জুড়ে বিভিন্ন জায়গায় আছে। সবক’টা পাম্প সবসময় চালু থাকে না। মোটরগুলোও স্টেশনে কোনও পড দাঁড়ালে তবেই চালু হয়। কোথাও লিক হচ্ছে কি না মনিটর করা হয় সবসময়।

“এ তো নিশ্ছিদ্র! তবে?” ওমারি হতাশ গলায় বলে।

“দাঁড়া। তাহলে বুঝতে পারছিস, সবক’টা কম্পোনেন্টে সবসময় বিদ্যুতের প্রয়োজন পড়ে না। শুরুর গতি নিয়ে যান চলতে শুরু করলে মোটর তখন বন্ধ হয়ে যায়, যতক্ষণ না পরের যানটা স্টেশনে আবার এসে দাঁড়ায়। শুধু একটা জায়গায় কখনোই পাওয়ার সাপ্লাই বন্ধ হয় না, তা হল যানের সামনের কম্প্রেসার। সেটা সবসময় কাজ করে, না-হলে গতি কমতে থাকবে। এর কারণ হল…”

“কারণ থাক, আমার এর মধ্যেই মাথা ঝিমঝিম করছে।” ওমারির গলাটা করুণ শোনায়।

“অর্থাৎ ওই কম্প্রেসারকে থামাতে পারলে যান বা পডের গতি কমে যাবে। বুঝতে পারছিস আমি কী বলতে চাইছি?”

“বুঝেছি, কিন্তু ওখানে বিদ্যুৎ না গেলে যানের ভিতরে আলো-টালো নিভে গিয়ে অ্যালার্ম ট্রিগারড হবে না? তুই তো বললি যানের ভিতরের তাপ ইত্যাদি সবসময় মনিটর করা হয়।”

“না, হবে না। কারণ, ওটা হাইব্রিড সিস্টেম। যানের ভিতরের আলো হাওয়ার জন্য ব্যাটারি আছে। সেগুলো প্রত্যেক জার্নির শেষে পালটানো হয়। অন্য হাইপার-লুপ সিস্টেমগুলোতে বিদ্যুৎ আসে সোলার সেল থেকে, বিশেষভাবে তৈরি জেনারেটর থেকে। মানে গোটা ব্যাপারটাই স্বয়ংসম্পূর্ণ। কিন্তু এখানে ব্যাপারটা আলাদাভাবে তৈরি হয়েছে। ডিজাইনটা যখন দেখেছিলাম তখনই অদ্ভুত লেগেছিল, কিন্তু জিজ্ঞেস করে কোনও সদুত্তর পাইনি। এখন বুঝতে পারছি কেন এরকম।”

“পরিষ্কার করে বল, মুখ্যু মানুষ কিছুই বুঝতে পারছি না। চলতে শুরু করলে যানটা তো ভেসে থাকে বলে জানি, তাহলে গ্রিড থেকে পাওয়ার যাচ্ছে কী করে কম্প্রেসারে?”

চমকে তাকায় আয়িতি ওমারির দিকে। জিভ ভেঙিয়ে বলে, “ভালোই তো বুদ্ধি আছে মাথায়, পড়াশোনাটা করলি না কেন?”

“আহা, বলই না!”

“সেটা বেনির কেরামতি। মানুষ হিসেবে যেমনই হোক, বিজ্ঞানী হিসেবে ও সত্যি ভালো। আমরা যেমন সেল ফোন চার্জ করি চার্জিং প্যাডে বসিয়ে, ফোনটা সরাসরি তার দিয়ে কানেক্টেড থাকার দরকার পড়ে না—ঠিক তেমন জিনিস বসিয়েছে টিউবের এক পাশে, নীচের দিক ঘেঁষে। সেখানে বিদ্যুৎ যাচ্ছে গ্রিড থেকে, আর সেখান থেকে যান হয়ে কম্প্রেসারে।”

“বুঝলাম। তারপর?”

“প্রথম যানটা বেরিয়ে যাবার পর পরের যানটা মোটরের সামনে এসে দাঁড়াবে ঠিক তিরিশ সেকেন্ড বাদে। আবার গোটা প্রসেসটা চালু হবে।”

দুজনে খানিক চুপচাপ।

“বুঝলি তাহলে? এই তিরিশ সেকেন্ড আমাদের সময়। স্রেফ তিরিশ সেকেন্ড।” টেবিলে চকটা ঠুকতে ঠুকতে বলে আয়িতি। মাথা নাড়ায় ওমারি।

“কবে তাহলে?”

“আসার আগে শুনেছিলাম এই বৃহস্পতিবার মানে পরশু বড়ো দল আসবে। আমার বসও আসবে। আর কোথাকার যেন প্রিন্স।”

“তাদের সবাইকে তুই…” ওমারির চোখ গোল গোল হয়ে ওঠে।

“ধুর, ভি.আই.পি-রা আসবে, ট্রায়াল রান হবে একটা। চালু রুট হলেও ভি.আই.পি-রা নতুন রুটে যাওয়ার আগে এটা করা প্রোটোকল। গোটা রুট নয়, আংশিকভাবে হয় সাধারণত। ওই লিক-টিক পরীক্ষা করে আর কি। সেই ট্রায়াল রানের সময়ই…” মুখ নীচু করে আয়িতি। মৃদু গলায় বলে, “মানুষ মারা আমার কম্ম নয়।”

***

কী অসহ্য গরম আজ সকাল থেকে। সন্ধ্যা হয়ে এলেও হাওয়া উত্তপ্ত। এখনও ফ্যান চললেও আর কিছুক্ষণের মধ্যে বন্ধ হয়ে যাবে সব। ওমারির পা কাঁপছে। আজ সম্ভবত এই অফিসে তার শেষ দিন। ডিগ্রি নেই, তাও ইলেকট্রিক অফিসের এই চাকরিটা জুটে গেছিল কোনোভাবে। এরপর যে কী হবে। ন্যাশনাল পার্কে গিয়ে শুকনো পাতা কুড়োতে হবে বোধহয়। প্রথম যেদিন বুঝেছিল নিজেদের সবকিছু বন্ধ রেখে হাইপার-লুপে বিদ্যুৎ সরবরাহের কাজটা তার ঘাড়েই এসেছে, সেদিন নিজেকে অভিশপ্ত মনে হয়েছিল। আজ মনে হচ্ছে, ভাগ্যিস এই কাজটা তার কপালে জুটেছিল। তবে আজই এর শেষ।

সাড়ে সাতটা। মূল শহরে আলো থাকলেও অন্ধকার নেমে এসেছে বুড়ো ফারাজির গ্রামে। রাতের দিকে ট্রেন চলে না আজকাল। শেষ ট্রেনটা সন্ধেতেই চলে যায়। ক্লান্ত কিছু মানুষ নিয়ে ট্রেন ছেড়েছিল বটে, এখন দাঁড়িয়ে পড়েছে।

ওমারির সব গুলিয়ে গেল হঠাৎ। সে পারবে তো?

***

বেনি আজ মহাখুশি। এতজন বিখ্যাত ধনী একসঙ্গে তার হাইপার-লুপের সামনে দাঁড়িয়ে! এরা প্রায় সবাই জিবুতির হিরের খরিদদার। ট্রায়াল রান শুরু হল। আর মিনিট দশেকের মধ্যে সিঁড়ি দিয়ে উঠে গোলাকার ফোকরগুলো দিয়ে ঢুকে যাবে তারা। এই অনুন্নত গণ্ডগ্রামে ক্যালিফোর্নিয়ার থেকেও ঝলমলে হাইপার-লুপ স্টেশন বানিয়েছে সে। এটা একবার চড়লে এরা কেউ কি আর সাধারণ ট্রেনে চাপতে চাইবে? মনে মনে হাসে বেনি। হিরের অক্ষরে ইতিহাসে লেখা থাকবে তার নাম।

ছোট্ট একটা যন্ত্র বের করে তার স্ক্রিনে চোখ রাখে বেনি। প্রথম পড রওনা দিল। মোটর বন্ধ, যান এগোচ্ছে ঠিকঠাক। চোখ তুলে সামনে দাঁড়ানো আরব রাজবংশোদ্ভূত মানুষটির দিকে তাকায় বেনি। তিরিশ সেকেন্ড বাদে দ্বিতীয় যান চালু হবে। তারও মিনিট দশ বাদে অতিথিদের নিয়ে এগোবে বেনি।

এই তিরিশ সেকেন্ড যে প্রথম যানের কম্প্রেসার বন্ধ থাকল, সেটা অবশ্য খেয়াল করল না বেঞ্জামিন কুপার।

***

প্রায় শব্দের কাছাকাছি গতিতে এগোচ্ছে দ্বিতীয় যান। জিবুতির এলাকা প্রায় শেষ। হঠাৎ প্রক্সিমিটি অ্যালার্ম বেজে উঠল। অর্থাৎ খুব কম দূরত্বে কিছু একটা আছে যা থাকার কথা নয়। বেনির হাতে ধরা যন্ত্রটা থেকে আওয়াজ উঠল বিপ বিপ বিপ।

চমকে স্ক্রিনের দিকে তাকায় বেনি। তড়িঘড়ি যান দুটোকে ট্র্যাক করে। এ কী সর্বনাশ! দুটো পডের মধ্যেকার দূরত্ব যতখানি থাকার কথা, যন্ত্র বলছে তা নেই। কিন্তু দুটো যানের গতির তো কোনও হেরফের নেই। অর্থাৎ কোনও একটা সময় কিছুক্ষণের জন্য সামনের যানটার গতি কমে গেছিল। তাই-বা কী করে সম্ভব?

দ্বিতীয় যানে কেউ থাকলে এমারজেন্সি ব্রেক ব্যবহার করে থামাতে পারত। কিন্তু কোনও যাত্রী তো নেই।

স্টেশনের ব্রডকাস্ট সিস্টেমের দিকে উন্মাদের মতো ছুটতে থাকে বেনি। পাম্প, পাম্প চালু করে হাওয়া ঢোকাতে হবে ভিতরে। তাহলে দ্বিতীয় যানের গতিও কমবে।

ছুটতে থাকে বিনপোল বেনি। তার অতিথিরা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে তার দিকে।

দ্বিতীয় যানটা যখন পূর্ণগতিতে আছড়ে পড়ল প্রথম যানটার উপর, তখনও অবশ্য পাম্প চালু করা যায়নি।

ঠিক পাঁচ সেকেন্ডের মাথায় দুটো যান তালগোল পাকিয়ে একসঙ্গে হাইপার-লুপ টিউবটার গায়ে ধাক্কা দিল। ফাটল ধরার সঙ্গে সঙ্গে বাইরে থেকে প্রবল বেগে সামুদ্রিক হাওয়া ঢুকতে শুরু করল প্রায় বায়ুশূন্য টিউবের ভিতর। বিকট আওয়াজ করে দুলে উঠল টিউবটা। সেই তীব্র ধাক্কায় বেসামাল হয়ে পড়ল নীচের পিলারগুলো। বাইরের আর ভিতরের বায়ুর চাপ এক হওয়ার আগে বাড়তে থাকল ফাটলটা। তারপর এক মোক্ষম ঝাঁকুনি খেয়ে একদিকে হেলে পড়ল। ধীরে ধীরে ফাটল দেখা গেল তলার পিলারগুলোর গায়ে।

***

অন্ধকারে  বসে ছিল আয়িতি। হঠাৎ টেবিল ল্যাম্পটা জ্বলে ওঠায় দৌড়ে বারান্দায় বেরিয়ে এল সে। ওই তো রাস্তার আলো জ্বলছে, জ্বলছে পাশের বাড়ির বারান্দার আলোটাও। বারান্দা থেকে মাথা বের করে দেখতে থাকে আয়িতি। পাশের বাড়ি, তার পাশের, তার পাশের—আলো জ্বলে উঠেছে জিবুতির এই অখ্যাত গ্রামের ঘরে ঘরে।

থেমে যাওয়া ট্রেনটা যাত্রীদের অবাক করে দিয়ে হঠাৎ ঝাঁকুনি দিয়ে চলতে শুরু করল। আজ সে ঠিক গন্তব্যে পৌঁছবে।

ছবি- স্যমন্তক চট্টোপাধ্যায়

জয়ঢাকের সমস্ত গল্প ও উপন্যাস

Leave a Reply