
আমি একজন ফরেস্ট অফিসার। সিমলিপাল অরণ্যে কয়েক মাস হল পোস্টেড হয়েছি। আমার এখানে আসা খুবই অপ্রত্যাশিত। আমার আগে এখানকার চিফ ফরেস্ট অফিসার ছিলেন মনীশ তেওয়ারি। একটি দুর্ঘটনায় তাঁর আকস্মিক মৃত্যুর পর আমায় এখানে নিয়োগ করা হয়। অফিসার তেওয়ারির মৃত্যুটা অত্যন্ত মর্মান্তিক। একদিন সন্ধ্যার দিকে নিয়মমাফিক জঙ্গলে টহল দিয়ে ফেরার পথে দুর্ভাগ্যবশত একটি অতল খাদে তাঁর জিপ গাড়িটি উলটে পড়ে যায়। অফিসার এবং তাঁর ডাইভার কেউ বাঁচেননি।
অফিসার তেওয়ারি খুব অরণ্যপ্রেমী মানুষ ছিলেন। সিমলিপাল অরণ্যে কয়েক বছর আগে খুব চোরাশিকারি এবং চোরাকাঠুরের উৎপাত শুরু হয়েছিল। মনীশ তেওয়ারির উদ্যোগে সম্প্রতি তা বেশ কমেও গিয়েছিল। ভদ্রলোকের অনেক সুনাম ছিল উপরমহলে। এমন সৎ, নিষ্ঠাবান বন্যপ্রেমী মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু সহজে ভোলার নয়।
আমার সেক্রেটারি শুভঙ্কর আগে অফিসার তেওয়ারির সেক্রেটারি ছিল। এই কয়েক মাসে তার মুখে মনীশ তেওয়ারির অনেক গল্প শুনেছি কীভাবে তিনি প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে চোরাশিকারিদের পুলিশে ধরিয়ে দিতেন, গরিব আদিবাসীর শিশুদের টিকা দিতেন, ডাক্তারের বন্দোবস্ত করতেন এইসব।
একদিন বিকেলবেলা আমি জিপে চড়ে জঙ্গলে টহল দিয়ে ফিরছিলাম। সঙ্গে রামসুক নামে এখানকার এক স্থানীয় সরকারি গাইডও ছিল। জঙ্গলের আনাচে-কানাচে সমস্ত রাস্তা তার নখদর্পণে। একটা জায়গায় এসে পড়তেই রামসুক উত্তেজিত হয়ে জানাল, “বাবু, এ তো তেওয়ারি সাহেবের মৃত্যুর সেই জায়গাটা! এখানটা পুলিশ অনেকদিন ঘিরে রেখেছিল।”
তার কথা শুনেই একটা বিদ্যুৎ খেলে গেল আমার সর্বাঙ্গে। কেন যেন মনে হল, একবার জায়গাটা ভালো করে নেমে দেখে আসি।
আশেপাশে তাকিয়ে দেখি সত্যিই একটা অতল খাদ রাস্তার ধারে নেমে গিয়েছে। খুবই বিপদসংকুল। সেদিকে তাকাতেই শিউরে উঠলাম। মাটিতে শুকনো পাতার ওপর আমাদের জুতোর খসখস শব্দ কানে এল। এই শব্দ কত পরিচিত আমার। কিন্তু তা সত্ত্বেও আমার একটা অদ্ভুত অনুভূতি হল। কেন যেন মনে হল, এই শব্দটা যেন কত সজীব, কত জীবন্ত! ঠিক কোনও মানুষের হাতে আঘাত লাগলে ‘উফ’ করে আপত্তি জানানোর মতো যেন!
আশেপাশে গাছগুলির দিকে তাকালাম। এখানে প্রচুর শালগাছ আছে। চোরাকাঠুরেরা এই শালগাছ কেটে পাচার করার চেষ্টা করে। তাদের প্রকোপ যখন বেড়ে গিয়েছিল, তখন শালগাছের গুঁড়ির গায়ে নম্বর লিখে মার্কিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। সেইসব অক্ষরগুলো এখন বিবর্ণ হয়ে গেলেও পড়া যায়। এমন সময় একটা ফুরফুরে হাওয়া গাছের ডালে মড়মড় শব্দ করে আমাদের গায়ে এসে লাগল। একে একে সমস্ত গাছের মাথায় একটা আলোড়ন ছড়িয়ে পড়ল। মুখ তুলে তাকিয়ে দেখি, গাছের ডালে অজস্র পাতার দল বিচিত্র একটা আওয়াজ করে বারে বারে হাওয়ায় দুলছে। যেন আমায় হাতছানি দিয়ে কিছু বলার চেষ্টা করছে। আবার যখন বাতাস বওয়া বন্ধ হয়ে গেল, চারদিক নিশ্চুপ। তা সত্ত্বেও আমার মনে একটা খটকা রয়েই গেল। বার বার মনে হতে লাগল, এই গাছগুলিতেই অফিসার তেওয়ারির মৃত্যু রহস্য লুকিয়ে আছে। হ্যাঁ, মনীশ তেওয়ারির মৃত্যুটা কোনোভাবেই আমার কাছে শুধু দুর্ঘটনা বলে মনে হচ্ছিল না। অবশ্য এমন আশঙ্কার কোনও যুক্তিযুক্ত আমি কারণ খুঁজে পাইনি।
একবার একটি গাছের গুঁড়িতে আলতো করে হাত বোলাই। পরমুহূর্তেই চমকে উঠি—গুঁড়ির ভিতর একটা ক্ষীণ স্পন্দন! কোনও মানুষের হাতের কব্জির ধমনীর মধ্যে রক্তসঞ্চালনের ফলে যে পালস অনুভব করা যায়, এ যেন অবিকল তাই! কিন্তু গাছে এমন হয় বলে তো কখনও শুনিনি। আমার গাইড রামসুককে ব্যাপারটা জিজ্ঞাসা করলাম। সেও রীতিমতো ঘাবড়ে গেল।
এরপর আর বিলম্ব না করে বাংলোয় ফিরে এলাম। গেটে দারোয়ান জানাল, একটি লোক নাকি কিছুক্ষণ আগেই আমার সঙ্গে দেখা করতে এসে অপেক্ষা করছে। লিভিং-রুমে ঢুকে দেখি, আটাশ-ত্রিশ বছর বয়সি একটি যুবক বসে। তাকে দেখে এখানকার আদিবাসী গোছের লোক বলেই মনে হল। সে উঠে দাঁড়িয়ে নমস্কার করে বলল, “স্যার, আমি হীরক মাঝি, এখানকার সকলে আমায় হীরু বলে ডাকে। আপনার সঙ্গে কিছু কথা বলার ছিল।”
“কী কথা?”
“আজ্ঞে, তেওয়ারি-স্যারের ব্যাপারে।”
অফিসার তেওয়ারির নাম শুনে আমি নড়েচড়ে বসলাম। হীরক বলে চলল, “যখন উনি প্রথম এখানে পোস্টেড হন, তখন আমার সঙ্গে ওঁর আলাপ হয়। খুব প্রকৃতিপ্রেমী মানুষ ছিলেন। তখন আমাদের এই জঙ্গলে চোরাকাঠুরেদের উৎপাত তুঙ্গে। কিছুতেই তাদের ঠেকানো যাচ্ছিল না। আদিবাসীদের টাকার লোভ দেখিয়ে তারা সমস্ত নিরাপত্তা ফাঁকি দিয়ে জঙ্গলে ঢুকে পড়ত, আর একের পর এক গাছ কাটত। প্রচুর শালগাছ এইভাবে কাটা পড়ে। তখন আমি এইসব চোরাকাঠুরেকে ধরিয়ে দিতে তেওয়ারি-স্যারের অনেক সাহায্য করেছিলাম। তিনি মৃত্যুর কয়েকদিন আগে আমায় একটা ডায়েরি দিয়ে বলেছিলেন, হীরু, আমি আর খুব বেশিদিন নেই। কখন কী হয়ে যায়, বলা তো যায় না। তোকে এই ডায়েরিটা দিয়ে যাচ্ছি। কোনও অঘটনে আমার মৃত্যু হলে এটা তুই একজন উপযুক্ত ব্যক্তির হাতে তুলে দিস।”
হীরক এরপর তার কাঁধের চটের ব্যাগ থেকে সত্যিই একটি ব্রাউন মলাটের মোটা ডায়েরি বের করল। আমার হাতে দিয়ে বলল, “স্যার, আমি আপনাকেই এটা দিয়ে যাচ্ছি। ডায়েরিটা পুলিশকে দিতে তেওয়ারি-স্যারের নিষেধ ছিল। আর একটা কথা স্যার, দয়া করে এই ডায়েরিটার কথা কিংবা আমার নাম কাউকে বলবেন না।”
লোকটির কথা শুনে বেশ রোমাঞ্চ বোধ করলাম। হীরক মাঝিকে ডায়েরিটার জন্য ধন্যবাদ জানাতে সে বিদায় নিয়েছিল।
সেদিনই ডায়েরিটা পড়া শুরু করেছিলাম। যখন শেষ করলাম, তখন একদিকে যেমন অফিসার তেওয়ারির প্রতি মন শ্রদ্ধায় ভরে উঠল, অন্যদিকে তাঁর মৃত্যু রহস্য সম্বন্ধেও আর কোনও ধোঁয়াশা রইল না। ডায়েরির লেখা মনীশ তেওয়ারির জবানীতে ঠিক এইরকম—
‘আমি মনীশ তেওয়ারি। সিমলিপালের চিফ ফরেস্ট অফিসার। এখানে এসেই বুঝেছি, এই অরণ্যে প্রচণ্ড চোরাশিকারি ও চোরাকাঠুরের উপদ্রব। অথচ এমন নয় যে নিরাপত্তায় ত্রুটি আছে। যতই সাবধানতা অবলম্বন করি না কেন, কোনোভাবে শেষ পর্যন্ত অপরাধীদের আর ধরা যায় না।
এখানের শালগাছ চোরাকাঠুরেদের কাছে অত্যন্ত লোভনীয় বস্তু। আদিবাসীরা অনেকেই টাকার লোভে ওদের সাহায্য করে। অনেকদিন ধরেই ভাবছিলাম ওদের কীভাবে ঠেকানো যায়।
আমার স্কুলের এক বন্ধু, চিন্ময় ব্যানার্জি আই.আই.টি. খড়্গপুরের বায়ো-টেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক। তাকে আমার অভিনব পরিকল্পনার কথা জানালাম—যদি গাছেরা নিজেরাই তাদের নিধন রুখতে প্রস্তুত হতে পারে, তাহলে কেমন হয়? অনেকটা মানুষের ইমিউন সিস্টেমের মতো। অবিশ্বাস্য শোনালেও, এমনটাই আমরা করে দেখিয়েছি প্রায় এক বছরের গবেষণার পর। চিন্ময় তার ল্যাবে একটি সম্পূর্ণ নতুন প্রক্রিয়ায় একটি ড্রাগ আবিষ্কার করেছে যার সাহায্যে কোনও গাছের মধ্যে মানুষের সমান চেতনা ও বোধশক্তি সঞ্চার করা সম্ভব হয়েছে! একটা সিরিঞ্জে করে সেই ড্রাগ গাছের গুঁড়িতে ইনজেক্ট করলে গাছেরা মানুষ কিংবা যে-কোনো পশুর মতো আত্মরক্ষার জন্য সজাগ হয়ে ওঠে। অবশ্য গাছ পশুদের মতো জায়গাবদল করতে পারে না। কিন্তু নেই মামার চেয়ে কানা মামা তো ভালো! চোরাশিকারিরা যখন কাঠ কাটার উদ্দেশ্যে গাছের গায়ে আঘাত করবে, তখনই গাছের দল সজাগ হয়ে উঠবে। তাদের শরীরে একটা মৃদু আলোড়ন সৃষ্টি হবে। জঙ্গলের সর্বত্র মাটিতে একটি করে ভাইব্রেশন ডিটেক্টর পুঁতে রেখেছি। আমার মোবাইল ফোনের সঙ্গে সেই সমস্ত ডিটেক্টরের সংযোগ করা আছে। যখনই চোরাকাঠুরে কোনও গাছে আঘাত করবে, তখনই তার কাছাকাছি ডিটেক্টর আমার ফোনে সিগন্যাল পাঠাবে—‘বিপদ!’ ইতিমধ্যেই শালগাছগুলোর গায়ে নম্বর লিখিয়েছি যাতে সহজে চিহ্নিত করা যায় কোন এলাকার গাছ। আমি নিরাপত্তা বাহিনীকে তৎক্ষণাৎ নির্দেশ দিই, অমুক জায়গায় একবার টহল দিয়ে আসো।
তবে এসব গবেষণার কাজ খুবই গোপনীয়তার সঙ্গে আমাদের করতে হয়েছিল। শুধুমাত্র আমার সেক্রেটারি শুভঙ্কর ছাড়া আর কাউকে ব্যাপারটা খোলসা করে বলিনি। কেননা, গাছের মধ্যে চেতনা সঞ্চার করার পুরো পদ্ধতিটাই সরকার এখনও অনুমোদন দেয়নি। সরকারের অনুমোদনের জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করা আমি অবশ্য সমীচীন মনে করিনি। যদি করতাম, তাহলে এতগুলো অমূল্য গাছ বাঁচানো যেত না।
তবে একটা কথা সত্যি, জঙ্গলের উপকার করতে গেলে অনেক ঝুঁকি নিতে হয়। এক্ষেত্রেও তেমনটাই হয়েছে। ইতিমধ্যে কতবার যে পোচার আর চোরাকাঠুরেদের শাসানি শুনতে হয়েছে আমায়! ওদের ব্যাবসার ক্ষতি হচ্ছে বলে রীতিমতো ক্ষুব্ধ হয়ে আছে আমার উপর। যে-কোনোদিন আমায় মেরে ফেলতে পারে। অবশ্য জঙ্গলের বুকে প্রাণ বিসর্জন দিতে আমার কোনও দুঃখ নেই। কেননা, জঙ্গল ছাড়া আমার যে আর কোনও অস্তিত্ব নেই। এতদিনে আমি এই অরণ্যের সঙ্গে মিলেমিশে তার অঙ্গ হয়ে গিয়েছি যে!’
এখানে ডায়েরি শেষ। পুরো বিষয়টাই এখন আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। তবে আমার সন্দেহই ঠিক—মনীশ তেওয়ারির মৃত্যুটা দুর্ঘটনা নয়, খুন। নিশ্চয়ই চোরাশিকারিদেরই কেউ কাজটা করেছিল। এখন এই বিপুল অরণ্যসম্পদের নিরাপত্তার আশার আলো কেবলমাত্র আমি।
***
দিনগুলি কেটে যেতে লাগল। কাজের চাপও বাড়তে থাকল। এখন সেই পুরোনো সমস্যা আবার দেখা দিয়েছে। অফিসার তেওয়ারির দৌলতে জঙ্গলে চোরাশিকারিদের উপদ্রব যেটুকু কমেছিল, দিন দিন যেন ক্রমশ বেড়ে চলেছে। নিরাপত্তারক্ষীদের শত চেষ্টা সত্ত্বেও অপরাধীদের সঠিক সময়ে পাকড়াও করা যাচ্ছে না। কোনোভাবে তারা খবর পেয়ে যায় পুলিশ আসছে, আর অপরাধের সমস্ত চিহ্ন লোপাট করে গা ঢাকা দেয়।
একদিন আমার কাছে খবর এল, একটা চোরাশিকারির দল হাতির দাঁত চুরি করার মতলবে কয়েকদিন হল জঙ্গলে ঘাঁটি গেড়েছে। আজ রাতেই ওরা কার্যসিদ্ধি করবে। শোনামাত্র আমি উত্তেজিত হয়ে আমার সেক্রেটারি শুভঙ্করকে বললাম, “শুভঙ্কর, বন্দুক নিয়ে আজই আমাদের অভিযানে বেরোতে হবে। এবার আমি নিজের হাতে ওদের ধরতে চাই। তুমি আমার সঙ্গে যাবে। হাতের মুঠোয় সুযোগ পেয়ে কোনোভাবেই আজ ওদের ছেড়ে দেওয়া চলে না।”
কথামতো সেদিন রাত গভীর হতেই আমরা নৈশাভিযানে রওনা হলাম। শুভঙ্করই ড্রাইভারকে রাস্তা দেখিয়ে নিয়ে চলল। একটা জলাশয়ের ধারে আমরা দাঁড়ালাম। জিপ গাড়িটা খানিক তফাতে ঝোপের আড়ালে রইল। শুভঙ্করের কথায়, এখানেই হাতিটা জল খেতে আসবে রাতে। একটা গাছের ডালে মাচা বেঁধে আমরা দুজন উঠে পড়লাম, আর অপেক্ষা করতে থাকলাম কখন দুষ্কৃতীরা হাজির হয়।
রাত বাড়তে থাকল। একসময় পাতার খসখস আওয়াজ চারদিকের নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করে আমাদের সজাগ করে দিল। একটা টর্চের ক্ষীণ আলো দেখতে পেলাম। আমার বন্দুকটা হাতে নিলাম। দেখলাম, তিনটি লোক গাছের নীচে এসে দাঁড়িয়েছে আর চারদিক একবার ভালো করে দেখে নিচ্ছে। আমি আর দেরি করলাম না। শুভঙ্করকে বললাম, “ফায়ার!”
অরণ্যের শান্তি চূর্ণ-বিচূর্ণ করে তার রাইফেল শূন্যে গুলি ছুড়ল। পরমুহূর্তেই একটা ঝাঁপ দিয়ে আমি গাছ থেকে মাটিতে নেমে পড়লাম। এইসবের অভ্যাস আছে আমার। চোরাশিকারি তিনজনের উদ্দেশে বললাম, “হ্যান্ডস আপ!”
ভেবেছিলাম, দুষ্কৃতী তিনজন এতক্ষণে নিশ্চয়ই ভয় পেয়ে যাবে। কিন্তু তার ঠিক উলটো প্রতিক্রিয়া হল। ওরা তিনজন আমার কথায় বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে বরং আমার দিকেই বন্দুক উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। আমি বেশ ঘাবড়ে গেলাম। শুভঙ্করের দিকে তাকাতেই চমকে উঠলাম। তার মুখে সে কী হিংস্র ভাব ফুটে উঠেছে! চেনাই যায় না যেন। দেখি, সেও মাচায় বসে আমার দিকে রাইফেল তাক করে রয়েছে। এ যে অবিশ্বাস্য কাণ্ড! ক্ষোভের সুরে বলে উঠলাম, “এ কী শুভঙ্কর! তুমিই তাহলে…”
“আমায় ক্ষমা করবেন স্যার। আমার প্রচুর টাকার দরকার। আমাদের ব্যাবসা দিব্যি চলছিল। মনীশ-স্যার আর আপনি এসে যত সমস্যা শুরু করলেন। অবশ্য কাল থেকে সে নিয়ে আর আমাদের ভাবতে হবে না। এক মাসের মধ্যে দু-দুটো অফিসার খুন—কী বিশ্রী ব্যাপার, তাই না স্যার? অবশ্য এটা যে খুন, কেউ বলতে পারবে না। হাতির পায়ের তলায় যদি কোনও মানুষের দেহ পড়ে যায়, তাহলে কি আর তাকে খুন বলে? বলে, দুর্ঘটনা।”
আমি বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেছি। রাগ, ঘৃণা মেশানো কণ্ঠে কোনোক্রমে বলে উঠলাম, “বিশ্বাসঘাতক! যা ইচ্ছে করো! আমায় মেরে ফেলো, কিচ্ছু যায় আসে না। কিন্তু একদিন দেখে নিও, এই জঙ্গলই প্রতিশোধ নেবে।”
আজও আমি ভেবে পাই না শেষ ওই লাইনটা হঠাৎ কেন বলেছিলাম। যাই হোক, শুভঙ্কর আমার কথায় যথারীতি কোনও কর্ণপাত না করে এইবার আদেশের সুরে বলল, “বন্দুকটা হাত থেকে ভালোয় ভালোয় নামান! জলদি! হাতিটা এসে পড়ল বলে।”
তার কথা শেষ হতে না হতেই একটা আশ্চর্য ঘটনা ঘটে গেল। যে ডালগুলোর উপর মাচা বাঁধা হয়েছিল, হঠাৎ বিকট শব্দ করে সবক’টা ডাল আমার চোখের সামনে মড়মড় করে ভেঙে গেল। সেই সঙ্গে মাচাসুদ্ধ শুভঙ্কর এসে পড়ল মাটিতে। মাটিতে সজোরে মাথা ঠোকা লাগায় সে অজ্ঞান হয়ে গেল।
বলাই বাহুল্য, সে এটার জন্য একেবারেই প্রস্তুত ছিল না। বাকি তিনজন দুষ্কৃতীও না। তবে আমি যেন চকিতের মধ্যে সংবিৎ ফিরে পেলাম। কয়েক মুহূর্তের সুযোগ নিয়ে আমার রাইফেলটার ট্রিগার চেপে দিলাম আমার সামনের লোকটির পা লক্ষ্য করে। তার বাকি দুজন সাগরেদ আর সময় পেল না পালানোর—পিছনদিকে ছোটার চেষ্টা করতেই মুখ থুবড়ে পড়ল। একটা লম্বা লতায় কখন যে তাদের পা জড়িয়ে গেছে, এতক্ষণ তারা খেয়ালই করেনি। লতাটা ঠিক যেন সাপের ফণার মতো তাদের পা আঁকড়ে ধরেছে। আমি নিমেষে তাদের হাত থেকে ছিটকে পড়ে যাওয়া রাইফেল দুটো কুড়িয়ে নিলাম।
এর পরের ঘটনাগুলো নেহাত সাধারণ। ভোর হওয়ার আগেই পুলিশ এল। চারজনকে প্রথমে হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা হল। যখন ওদের গাড়িতে তোলা হচ্ছে, আমি গাছটির গুঁড়ির গায়ে হাত দিলাম। বাচ্চাদের লুকোচুরি খেলার মতো সকলের চোখের আড়ালে। গাছটির গায়ে মুখ রেখে ফিসফিসিয়ে বললাম, “তোমাদের আর কোনও চিন্তা নেই। আমি আছি।” পলকের জন্য গাছের পাতায় একটা সামান্য আলোড়ন টের পেলাম যেন।
এতক্ষণে সূর্যোদয় হয়েছে। আবার একটি দিনের সূচনা হতে চলেছে। জঙ্গলময় সে কী মায়াবী আলোর উচ্ছ্বাস! এ যেন সুপ্রাচীন অরণ্যের ভাষায় তার জয়ধ্বনি ঘোষণা—সিমলিপালের অরণ্য যুগযুগান্ত ধরে যেমন ছিল, ঠিক তেমনটি থাকবে।
জয়ঢাকের গল্পঘর