গল্প-রাঁম দাঁদুর ভূঁ-উ-ত-সবিতা বিশ্বাস-বর্ষা২০২৪

সবিতা বিশ্বাসের আগের গল্প- চিকু, গল্প-ভুতুড়ে শহরের খোঁজে, লালবাগের লাল্টু 

golporamdadu

অর্কদের বাড়িটা খুব জমাটি, চার জেনারেশন একসঙ্গে থাকে । ওর ঠাকুরদার বাবা ব্রিটিশ আমলের মানুষ । বিরানব্বই বছর বয়সেও পুরো ফিট। সময় পেলেই ওনার জীবনের নানা অভিজ্ঞতা আমাদের শোনান। এটাও অর্কর বড়োদাদু মানে শঙ্করদাদুর মুখেই শোনা।

“শিয়ালদা থেকে মাজদিয়া স্টেশনে ঢোকার আগেই ব্রিজের উপর থেকে দেখলাম সূর্যদেব মাথাভাঙা, চুর্ণী আর ইছামতীর সঙ্গমে ডুব দিয়ে শরীর জুড়োতে নেমেছেন। টলটলে জল দেখে আমারও ডুব দিতে ইচ্ছে করছিল। কয়লার গুঁড়োতে চোখ জ্বালা করছে, গা কুটকুট করছে। আর জামা-কাপড়ের অবস্থা না বলাই ভালো। মনে হচ্ছে কালিতে ডোবানো হয়েছে।

কয়লার গাড়িতে চড়ে ড্যাং ড্যাং করে আসার ইচ্ছে আমার একদম ছিল না। এর আগে আমি আসিওনি গন্ডগ্রামে। কিন্তু ঠাম্মার ভাই রামদাদু পত্তর লিখে বলেছেন, তার আর বেশিদিন নেই। মরার আগে ছোটোবোন আদুরীর নাতিকে একবার দেখতে চান। মৃত্যুপথযাত্রী দাদু নাতিকে দেখতে চেয়েছেন, অতএব চলো বাবা শঙ্কর কৈলাসে থুড়ি ধরমপুরে।

টানা পাঁচঘণ্টা ট্রেনে বসে থেকে হাত-পা সব আড়ষ্ট হয়ে গিয়েছে। খিদেও পেয়েছে খুব, বাবা বলেছে গাড়ি থেকে নেমেই গৌর অধিকারীর মিষ্টির দোকান পাবি। সেখান থেকে গোটাকতক রসগোল্লা খেয়ে তবে রামদাদুর বাড়ি যাস। মুখে যেমন সহজে বললাম রামদাদুর বাড়ি যাব, যাওয়াটা অত সহজ নয়। যাকগে এখন তো মাজদিয়া নামি!

আরে! আমার ব্যাগটা কোথায়? এই বাঙ্কারেই তো রেখেছিলাম! এ লোকগুলো কখন উঠল? সব সিট, বাঙ্কার ভর্তি। কি অদ্ভুত! সকলেই  মাথা-মুখ ঢেকে বসে আছে। ওদিকে ট্রেন ছাড়ার হুইসেল দিচ্ছে, ওই ব্যাগেই সব জামা কাপড়, মায়ের পাঠানো গয়ানাটাও ওর মধ্যেই আছে। রামদাদুর নাতবৌকে দিতে হবে। একগাদা কালো ধোঁয়া ছেড়ে ট্রেন চলতে শুরু করবে, সেই সময়ই বাঙ্কারে বসা একজন হাত বাড়িয়ে ব্যাগটা দিয়ে বলল, “এঁইটে বোঁধ কঁরি আঁপনার ব্যাঁগ। বুঁইতে পাঁরিনি, বেঁশ নঁরম দেঁইখে চেঁপে বঁসিচিলাম ।”

ব্যাগটা ছিনিয়ে নিয়ে প্রায় লাফ দিয়ে নামলাম। ট্রেন পেছন দেখিয়ে চলে গেল।  বাবার নির্দেশমত গৌর অধিকারীর দোকানে গিয়ে দেখি, তারা দোকানের ঝাঁপ ফেলছে। আমি খুব কাকুতি মিনতি করতে পদ্মপাতায় গোটা কয়েক রসগোল্লা দিয়ে ঝটপট ঝাঁপ ফেলে লন্ঠন দুলিয়ে চলে গেল। পয়সা বের করার সময় পর্যন্ত দিল না। ওরা আলোটা নিয়ে চলে যেতে চারদিক গভীর অন্ধকারে ডুবে গেল। একটাও গরুর গাড়ি নেই, যাব কী করে?

সকালের গাড়িটা ধরতে পারলে এই ভোগান্তি হত না। আচ্ছা এই গাড়ি থেকে কি আর কেউ নামেনি? তারা সব গেল কোথায়? তবে কি স্টেশন মাস্টারের কাছে গিয়ে সাহায্য চাইব?”

হঠাৎ একেবারে কানের কাছে কে যেন বলল, “কিঁ আঁবোল তাঁবোল ভাঁবচেন? উঁটে পঁড়েন, আঁকাশের অঁবস্তা ভাঁলো না, দিঁয়া নঁল্কাচ্চে।”

“কিসে  উঠব?”

“চোঁকের মাঁতা খেঁয়িচেন নাঁকি? ওঁটেন, ওঁটেন, আঁপনার দাঁদু বাঁরবাঁর কঁরে বঁলে দেঁচে, নাঁতির যেঁন কোঁনো কঁষ্ট নাঁ হঁয়।”

“কে বলেছেন, রামদাদু?”

“ওঁই দেঁকো আঁবার নাঁম কঁরে! ওঁটবেন তোঁ ওঁটেন, নাঁহলি আঁমি চঁললাম।”

“আরে আপনি রাগ করছেন কেন?” বলেই লাফ দিয়ে উঠে পড়লাম ।

গরুর গাড়ি তো নয় যেন পক্ষীরাজ! উল্কার বেগে ছুটছে, আমি বাখারি চেপে ধরে একবার এদিকে কাত হচ্ছি, একবার ওদিকে। তার উপর সোনায় সোহাগা! কান ফাটানো বাজ পড়ছে, সেই সঙ্গে মুষলধারে বৃষ্টি। যত বলি, “ও গাড়োয়ান দাদু ভিজে ঝুপ্পুস হয়ে গেলাম, কোনো একটা গাছের তলায় দাঁড়াও।” কিন্তু কে কার কথা শোনে! বুঝতে পারছি রাস্তা নয়, কোনো আঘাটা দিয়ে আমাকে নিয়ে যাচ্ছে। হয়তো শর্টকাট হবে, কিন্তু  হাড়গোড় সব খুলে যাবার জোগাড়। অবশেষে একটা বিরাট বটগাছের নীচে এসে গাড়িটা থামল।

“এঁই ন্যাঁন কঁত্তা, আঁপনার নাঁতি। আঁমি চঁললাম।”

কি আশ্চর্য! ঝুরি নামা বিশাল বটগাছের নীচে আমাকে নামিয়ে দিয়ে গাড়োয়ান হাওয়া। এ কোথায় এলাম আমি? এমন দুর্ভোগে পড়তে হবে জানলে কিছুতেই আসতাম না।

“দাঁদুভাইয়ের দেঁখছি খুঁব রাঁগ হঁয়েছে? এঁই নেঁ ভিঁজে জাঁমাকাঁপড় ছেঁড়ে এঁই কাঁপড়খানা পঁর। হাঁতে কীঁ ধঁরে রেঁখেছিস? রঁসগোল্লা? নিঁশ্চয় আঁমার জঁন্য এঁনেছিস?”

আরে! হাতের মুঠো থেকে পদ্মপাতায় বাঁধা রসগোল্লা ভ্যানিশ। নিশ্চয় রামদাদু মিষ্টি খেতে খুব ভালবাসেন! আমি যদি খেয়ে ফেলতাম, তাহলে খুব লজ্জায় পড়ে যেতাম। দোকান বন্ধ না করলে এক হাঁড়ি আনার কথাই ছিল। যাকগে কালই তো ফিরছিনা, দিনের বেলা কিনে আনব। গ্রামটা ঘোরাও হয়ে যাবে।

একখানা সাদা কাপড় আমার সামনে দুলতে দুলতে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অবশ্য তা কি করে হয়? মনে হয় গাছের ডালে রয়েছে। তাড়াতাড়ি জামা কাপড় ছেড়ে ধুতিখানা পরে ফেললাম। আচ্ছা এই গাছের পিছনে কি দাদুর বাড়ি? যাই একটু এগিয়ে যাই।

পা বাড়াতেই বাধা, হ্যাঁচ্চো হ্যাঁচ্চো- হাঁচি আর থামে না। এখন বুঝলাম এরা সব বৃষ্টিতে ভিজেছে বলে নাকি নাকি কথা বলছে। আমারও দেখছি সেই দশা হল! রামদাদুকে একবার ডেকে দেখি, কেউ যদি লন্ঠন নিয়ে এগিয়ে আসে।

“দাদু, ও রামদাদু কোথায় গেলে? আমি কি সারারাত এই বটগাছের নীচে দাঁড়িয়ে থাকব?”

“নাঁ, নাঁ তাঁ কিঁ কঁরে হঁয়? আঁমি সঁব ব্যঁবস্তা কঁরছি। তঁবে গুঁরুজঁনদের কিঁ নাঁম ধঁরে ডাঁকতে হঁয়? তুঁই আঁমায় শুঁধু  দাঁদু বঁলে ডাঁকবি।

তঁবে এঁখন তোঁ তোঁর ধঁরমপুর যাঁওয়া হঁবে না, সেঁ এঁখান থেঁকে দুঁ মাঁইল দূঁর। এঁই জঁলকাদায় কোঁথায় খাঁনা-খঁন্দে মুঁখ থুঁবড়ে পঁড়বি। আঁবার অঁন্য ভঁয়ও আঁছে, রাঁতটুকু এঁখানে থাঁকলে আঁমার চোঁখের সাঁমনে থাঁকবি। কাঁরোর ক্ষঁমতা হঁবেনা তোঁকে ছুঁয়ে দেঁখে।

“কিন্তু আমি তো তোমায় এখনো দেখতেই পেলাম না। তুমি কোথা থেকে কথা বলছ?”

কোনো উত্তর নেই। হঠাৎ ধপ করে একখানা মোটা কাঁথা আর বালিশ পড়ল আমার সামনে। অন্ধকারে সাদা ধপধপ লাগছিল কিন্তু কেমন যেন বদখত গন্ধ, অনেকটা শ্মশানের মড়া পোড়ানোর মত।

“শুঁয়ে পঁড়েন, শুঁয়ে পঁড়েন। এঁকন এঁর বেঁশি সুঁবিদে কঁরে দিঁতি পাঁরবো নাঁকো। কঁত্তার কঁতায় আঁমার গাঁয়ের পুঁ-”

“বিঁপে—এঁ খঁড়ম পেঁটা খাঁবার শঁখ হঁয়েছে নাঁ-কিঁ? চোঁপ। আঁর এঁকটা কঁথা বঁললি কাঁন টেঁনে ছিঁড়ে নেঁব। তাঁমুক সেঁজে দেঁ।”

তারপর মোলায়েম গলায় বললেন, “কীঁ হঁল দাঁদু? ঘুঁমিয়ে পঁড়ো।”

ভয়ে হাত-পা পেটের মধ্যে সেঁধিয়ে যেতে লাগল। এ কাদের পাল্লায় পড়লাম! ঠাকুমার কথায় এতদিন হেসে উড়িয়ে দিয়েছি কিন্তু – না বাবা, শুয়ে চোখ বন্ধ করি। দাদুকে দেখার শখ আর নেই। বৃষ্টির বিরাম নেই, মেঘও ডাকছে কিন্তু এই বটতলায় তার এতটুকু আভাস পাওয়া যাচ্ছেনা। একবার চোখ খুলতে বিদ্যুতের আলোয় দেখি কারা যেন বটগাছ থেকে ঝুলছে। ওরে বাবা! এই কি সেই গলায় দড়ি বটগাছ? আমি উঠে দৌড় দেব ভাবছি, কে যেন আমায় ঠেসে ধরে রেখেছে।

বিভীষিকাময় রাত্রি যত লম্বাই হোক না কেন, সকাল তো হবেই।

সূর্যের আলো চোখে পড়তে দেখি কয়েকজন লোক আমায় ঘিরে নানা কথা বলছে। একজন বলছে, “এ তো কত্তামশায়ের কাপড় পরে আচে। তাইলে নিচ্চয় তেনার কেউ হবে!”

আমি দাদুর নাম করতেই সবাই বলে উঠল, “তা আপনি কাদার মদ্যে শুয়ে আচ কেন? একেনেই বা এলে কী করে? সন্ঝ্য়ে নামলি এদিকপানে কেউ আসে না, এ গাচে তেনারা থাকেন।”

“মানে?”

“মানে যারা অপঘাতে মরে, তারা। আমাদের কত্তামশায়ও তো…”

আরেকজন তাকে থামিয়ে আমায় হাত ধরে টেনে তুলল।

আরে তাই তো! আমি কাদার মধ্যেই শুয়েছিলাম। কোথায় সেই মরাপোড়া গন্ধের কাঁথা বালিশ? আমি তো বটগাছের শিকড়ে মাথা রেখে কাদার মধ্যে শুয়ে আছি। না, আর না, এখান থেকেই ফিরে যাব। ধরমপুর গ্রামে যাবার ইচ্ছে আর নেই। আমি যে বেঁচে আছি এই ঢের।

না, ফিরে যাওয়া হল না। হন্তদন্ত হয়ে একখানা মোষের গাড়ি নিয়ে রামদাদুর নাতি মাধব এসে হাজির। অতএব যেতেই হল। রাস্তা কোথায়? চারিদিকে ঘন বন-জঙ্গল। বর্ষাকাল বলে রাস্তাকে পুরো ঢেকে দিয়েছে। হঠাত ঝুমঝুম বাজনা শুনে মাধব বলল, “ওই দেখো শঙ্করদা, শজারু।”

শুধু কি শজারু? হায়েনা, শেয়াল, গোসাপ, বিষাক্ত সাপ, বাঘরোল সবই নাকি আছে। সন্ধ্যার পরে কেউ আর ঘরের বাইরে বের হয়না। দিনের বেলাতেই যা অবস্থা!

এমনকি দুপুরে বাওড়ে স্নান করতে গেলেও কেউ একা যায়না। তেনারা নাকি ছদ্মবেশে এসে বাওড়ের মাঝখানে নিয়ে গিয়ে ডুবিয়ে মারে।

একটা ব্যাপারে খুব অবাক লাগছিল, মাধব একবারও রামদাদুর কথা কিছু বলল না। আমি খুবই ক্লান্ত, খিদে-তেষ্টায় মাথা ঘুরছে, কেবলই ভাবছি একটু জল, কিছু খাবার আর বিছানা। এইটুকু পেলেই চলবে, আমি আর কিছু চাই না।

বাহ্ বাড়িটা খুব সুন্দর তো! বাখারির বেড়া দিয়ে ঘেরা বড়ো উঠোন। নানারকম ফুল গাছ একপাশে, অন্যদিকে শাক-সব্জির বাগান। দোতলা মাটির বাড়ি, বিরাট বড়ো গোলা। বুঝতে পারছিলাম, ঠাকুমার ভাই গ্রামের মধ্যে ধনী ব্যক্তি।

আমাকে দেখেই বয়স্কা একজন জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠে বলতে লাগল, “সেই এলে দাদু, আর কয়েকটা দিন আগে যদি আসতে! তেনার যে বড়ো শখ ছিল গো!”

মাধবের ইশারায় অল্পবয়সী একটা বউ সরিয়ে নিয়ে গেল ওনাকে। মাধব পরিষ্কার গামছা, কাপড় দিয়ে পাটকাঠির বেড়া ঘেরা স্নানঘরে ঢুকিয়ে দিয়ে বলল, “শঙ্করদা স্নান করে এসো।”

খাওয়া হতেই দোতলার ঘরের পরিপাটি বিছানায় শুতেই ঘুম। সেই ঘুম ভাঙতে দেখি গতকালের মতই আকাশ ভাঙা বৃষ্টি নেমেছে। টিনের চালের ঝমঝম আওয়াজের মাঝেই কালকের গলাটা শুনতে পেলাম, “কিঁ দাঁদু ঘুঁম হঁল?”

“হ্যাঁ, খুব ঘুমিয়েছি। তুমি আড়াল থেকে কথা বলছ কেন? এসো আমার পাশে বোসো।”

“কার সঙ্গে কথা বলছ শঙ্করদা? এখানে তো কেউ নেই।”

“রামদাদু মানে দাদু আছে তো!”

মাধব বেশ জোরে জোরে বলল, “ওহ্ দাদু কী হচ্ছে কী? এমন করলে তো ভূতের বাড়ি বলে বদনাম হয়ে যাবে, এটা বুঝতে পারছ? তুমি তো বিচক্ষণ ছিলে, সেসব কি ভুলে গেলে? নাতিকে দেখার শখ তো মিটেছে, তার আনা মিষ্টিও খেয়েছ। বটগাছে আছ, সেখানেই থাকো। বাড়ির ত্রিসীমানায় আর যেন না দেখি, নাহলে কিন্ত তারানাথ ওঝাকে ডাকব।”

একটা ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলার আওয়াজ হল, সেই সঙ্গে বাতাসের ঝাপটা গায়ে এসে লাগল।

মাধব বলল, “চলো শঙ্করদা নীচে যাই, বাড়ির কারোর সঙ্গেই তোমার আলাপ হয়নি।”

“কিন্তু দাদু…”

“সব বলব। চলো।”

আমি ব্যাগ থেকে গয়নার বাক্স, রামদাদুর ধুতি, ঠাকুমার জন্য লালপাড় গরদের শাড়ির বাক্স নিয়ে নীচে নামলাম। দাদুর দুই ছেলে, বৌমা, ঠাকুমা সবাইকে প্রণাম করে, মাধবের বৌয়ের গয়না শাড়ি, ধুতি সব ঠাকুমার হাতে দিলাম। লাল পাড় শাড়ি দেখেই ঠাকুমা কাঁদতে লাগল। এতক্ষণে আমার খেয়াল হল, ঠাকুমা থান পরে আছে। তার মানে দাদু—মরে ভূত হয়ে গিয়েছে?

ভয়ে আমার সারা গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল, আমি তোতলাতে লাগলাম – “ভূ—ভূ—দাদু ভূ—ত!”

আমার এই অবস্থা দেখে ঠাকুমা কান্না থামিয়ে এক বাটি গরম দুধ এনে খাইয়ে দিল। তারপর মাধবের মুখে পুরো ঘটনাটা শুনলাম।

“মাস দুই আগের ঘটনা, রামদাদু গাড়োয়ানকে নিয়ে পিপুলবেড়ের হাটে গিয়েছিল। সঙ্গে ছিল মুনিষ বিপিন। বিপিনকাকা সবসময় দাদুর সঙ্গে থাকতো, ভালো লাঠি চালাতে পারতো আবার তামুকও সাজত ভালো। ঠাকুমা বারবার করে বলেছিল, আকাশের অবস্থা ভালোনা, যেতে হবেনা। কিন্তু লাউ, কুমড়ো মাঠ থেকে তোলা হয়ে গিয়েছে, না বেচলে সব নষ্ট হয়ে যাবে।

ভালো ইলিশ পেয়ে দাদু একজোড়া ইলিশ কিনে তামুক খেতে খেতে ফিরছিল। এদিকে ইলিশের গন্ধে হিদে সর্দারের ভূত পিছনে লেগেছে তা খেয়াল করেনি কেউই। হঠাৎ গরু দুটো আদাড়-বাদাড় ভেঙে দৌড়তে শুরু করলে গাড়োয়ানের খেয়াল হয়, এ নিশ্চয় হিদের কাজ। বেঁচে থাকতে হিদে লাঠির জোরে সর্বস্ব কেড়ে নিত, রামদাদুর ধানের গোলা লুট করতে এসে বিপেকাকার লাঠির ঘায়ে মাথা ফাটে। তারপর তো মরেই গেল মাথায় ঘা হয়ে।

সেদিন হিদের হাত থেকে মাছ বাঁচাতে পারলেও বাজের হাত থেকে কেউ রক্ষা পেল না। ঝড় থামলে গাঁয়ের লোক জড়ো করে গিয়ে দেখি সব পুড়ে খাক।”

“কিন্তু দাদু যে কথা বলল, আমায় কাপড় দিল।”

ঠাকুমা বলল, “ওনার তোকে দেখার খুব ইচ্ছে ছিল রে! সেই এলি, আর ক’টা দিন আগে যদি আসতি!”

“আমার পরীক্ষা ছিল তো!”

বড়ো জ্যেঠামশায় বলল, “ওই নিয়ে মন খারাপ করিস নে বাবা। যার যখন সময় হবে সে যাবেই।”

আমার খুব ভয় করছিল, যা শুনলাম তাতে এই গ্রামে কে মানুষ, আর কে ভূত বোঝা মুশকিল। কোনরকমে আজকের রাতটা পার হলে কাল সকালে মাধবকে বলব স্টেশনে পৌঁছে দিতে।

ট্রেনের কথা মনে হতে ঘটনাটা বললাম, তাতে যা শুনলাম আমার হাত-পা পেটের ভিতর সেঁধিয়ে যাবার জোগাড়। গত বছর তারকনগর রেলব্রিজের উপর অ্যাক্সিডেন্টে অনেক লোক নীচে পড়ে বিলের জলে ডুবে মারা যায়। আমি যে ট্রেনে এলাম ওই ট্রেনটাই সেই ট্রেন। তারপর থেকে তারকনগর এলেই ট্রেন থামিয়ে তেনারা পুরো ট্রেনের দখল নেয়। তবে কারো কোনো ক্ষতি করে না।

এই গ্রামে রাত্রে কারো বাড়ি মাছ রান্না হয় না। মাছের গন্ধ পেলেই কেউ না কেউ বেড়ার ফাঁক দিয়ে হাত বাড়ায়। আমার অবশ্য খেতে কোনো অসুবিধে হলনা। মাছের কাঁটা বাছার ঝামেলা নেই, শেষপাতে একবাটি ক্ষীর খেয়ে ঘুমোতে গেলাম। আমার আবদারে মাধব নতুন বৌকে ছেড়ে আমার পাশেই শুলো।

শেষ রাতে অনেক লোকজনের আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেল। মাধবের সঙ্গে নীচে নেমে দেখি অন্যরাও উঠে পড়েছে। বড়ো জ্যেঠামশায় একটা মোটা বাঁশের লাঠি নিয়ে বেরিয়ে গেল, সঙ্গে গেল বিপিন কাকার ছেলে হরেন। হরেন এখন এ বাড়ির মুনিষ।

ফিরে এসে বলল, সেনবাড়ির ছোটো বউ বড়ো বাইরে করতে পিছনের মাঠে গিয়েছিল, তখনই ওর সতীন ঘাড়ে চেপেছে।

“তার মানে?”

“তার মানে, ওদের বড়ো বউ শ্বাশুড়ির অত্যাচারে ধুতরোর বীজ খেয়ে মরেছিল। সংসার করার সাধ মেটেনি বড়ো বৌয়ের, কোলের ছেলে রেখে চলে যেতে হয়। তাই ছোটো বৌয়ের ঘাড়ে চেপে সংসার করতে এসেছে।”

আমি বললাম, “এবার কি হবে? বড়ো বৌ সংসার করবে?”

একথা শুনে মাধবের ছোটো বোন মাধবী বলল, “কি যে বল না শঙ্করদা! তারানাথ ওঝা এসে ঝেঁটিয়ে তাড়াবে। তুমি আজ যেও না, দেখে যাও কেমন করে ভূত তাড়ায়।”

আমার যে ইচ্ছে হচ্ছিল না তা বলা যাবে না। আমি ভাবছিলাম, এইরকম অজ পাড়াগাঁয়ের মানুষের জীবন কি কষ্টের! একদিকে বিষাক্ত সাপ, জন্তু, ডাকাত, চোর আবার ভূত-প্রেত। তবে প্রেতের সংখ্যাই বেশি মনে হচ্ছে। আচ্ছা এখানে কি কোনো স্কুল নেই?

আমার কথায় বড়ো জ্যেঠিমা পর্যন্ত হেসে ফেললেন। “স্কুল আছে, মাস্টার নেই। মাস্টার আসে পথ-ঘাট শুকনো হলে, শীতকালে। এক হাঁটু কাদার মধ্যে আসবে কী করে?”

“তোমরা নালিশ কর না?”

“কে কাকে নালিশ করবে? করলেও কোনো সাহেব-সুবো এদিকে আসে না। ওসব কথা বাদ দাও দাদা, চলো আজ তোমাকে আমাদের গ্রাম ঘুরিয়ে আনি। তবে মালকোঁচা মেরে ধুতি পরে খালি পায়ে যেতে হবে কিন্তু।”

গ্রামটা দেখতে ভালোই লাগল। চারিদিক সবুজ হয়ে আছে, প্রত্যেক বাড়িতেই উঠোনের মাচায় লাউ, ঝিঙে, চিচিঙ্গা, শসা ঝুলে আছে। সবাই ডেকে বসতে বলছে। তবে তার মধ্যে ভূতের ভিটেও আছে, কানা বুড়ির ভিটে। নারকেল, সুপুরির গাছ আছে কিন্তু কেউ হাত দিতে পারে না। এমনকি মাটিতে পড়ে থাকলেও কেউ নিতে পারে না। তবে পুজো এলে বুড়ির ভূত এর ওর বাড়ির উঠোনে নারকেল রেখে যায়। সেক্ষেত্রে নাড়ু করে মাটির সরায় করে বুড়ির ভিটেয় দিয়ে আসতে হয়।

এসব শুনে আমার হাসি পাচ্ছিল, আবার ভয়ও করছিল। হাসলে যদি বুড়ির ভূত আমাকে ধরে! বুঝতে পারছিলাম, আর কয়েকদিন থাকলে আমিও মাধবদের মত হয়ে যাব।

স্কুলটাও দেখলাম। তবে স্কুল না বলে খোঁয়াড় বলা ভালো। গাঁয়ের মোড়লের ছাগল ওখানে থাকে। দুর্গন্ধে টেকা দায়! শুনলাম, বর্ষা কেটে গেলে মোড়ল যোগালে দিয়ে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে লেপে পুঁছে ধুনো পুড়িয়ে তকতকে করে দেয়। মাঠে একটাও চোরকাঁটা থাকে না। আসলে মোড়লের ঘরের হাফ ডজন গেঁড়ি গুন্ডি ওই স্কুলের ছাত্তর কিনা!

ফেরার পথে শুনলাম, তারানাথ ওঝা সন্ধ্যেবেলা আসবে, পেত্নী নামাতে। আমারও ইচ্ছা হল দেখার, এর আগে কোনোদিন ভূত তাড়ানো দেখিনি।

দুপুরে বাওড়ে স্নান করতে গেলাম মাধবীর সঙ্গে। মাধবী পাড়ের এঁটেল মাটি দিয়ে মাথা ঘসল। আমি ভাবতেই পারিনি মাটি দিয়ে মাথা ঘসলে চুল এত পরিষ্কার হয়! মাথাটা খুব হালকা লাগছে। মাধবী দুধের সর আর হলুদ বেটে মুখে মেখে এসেছিল, জোর করে আমাকেও মাখিয়ে দিয়েছিল। ওটা দিয়েই হাত-পা পরিষ্কার করতে নিজেই অবাক হয়ে দেখলাম জেল্লা দিচ্ছে গায়ে। তার মানে ধরমপুরে শুধু ভূত-পেত্নীর বাস ভাবাটা ভুল, সুন্দর মানুষও বাস করে। এইজন্যই ঠাকুমা এই বয়সেও এত সুন্দরী!

সন্ধ্যেবেলা জ্যেঠিমারা আর মাধবী বাদে সবাই সেন বাড়ি গেলাম। কুপির আলোয় আলোর থেকে অন্ধকার বেশি। তারানাথ একজন শাগরেদ নিয়ে এসেছে। সে দেখলাম আগেই সিধের চাল আলু থলেয় পুরে ফেলল। বৌটা চুল এলিয়ে ছেলে কোলে করে বসে আছে। তারানাথ নির্দেশ দিতে জোর করে শ্বাশুড়ি ছেলেটাকে নিয়ে ঘরে গেল। তারপরের ঘটনা বীভত্স, মর্মান্তিক। বৌটাকে মুড়ো ঝ্যাঁটা দিয়ে পিটাচ্ছে, লঙ্কা পোড়া মুখের কাছে ধরছে আর বলছে, “যাবি কিনা বল? নাহলে এই চিমটে দিয়ে মাথার চান্দি ফুটো করে দেব।”

আমি বললাম, “এ কী সাংঘাতিক কথা! চিমটে দিয়ে মাথা ফুটো করলে পচন ধরে বৌটা মরে যাবে তো! তোমরা কেউ কিছু বলছ না কেন?”

মাধব আমার হাত চেপে ধরে বলল, “চুপ করে দেখো, এখন কিছু বলতে গেলে গ্রামের লোক তোমায় পিটিয়ে মেরে ফেলবে।”

আমার আর দেখার শখ নেই। আবার এই অন্ধকারের মধ্যে একা ফিরেও যেতে পারছি না।

আরো অনেকক্ষণ এসব চলার পরে তারানাথ  বলল, “যা ওই আমগাছের ডাল ভেঙে দিয়ে চলে যা। আর কোনদিন যেন এই বাড়ির ত্রিসীমানায় না দেখি।”

সবাই অবাক হয়ে দেখল মড়মড় করে আমগাছের ডাল ভেঙে পড়ল। বৌটা অজ্ঞান হয়ে লুটিয়ে পড়ল। সবাই ধরাধরি করে ঘরে নিয়ে গেল। যারা ভূত মানে পেত্নী তাড়ানো দেখতে এসেছিল সকলে তারানাথ ওঝার নামে জয়ধ্বনি দিল। আমি খুঁজছিলাম ওঝার স্যাঙাতটাকে। তাকে কোথাও দেখতে পেলাম না। একবার ভাবলাম মাধবকে জিজ্ঞাসা করি! তারপরে ভাবলাম, না, থাক।

মনে মনে বললাম, “এ গ্রামের নাম ধরমপুর হতেই পারে না, এর নাম ভুতুমপুর।”

পরদিন সবাইকে প্রণাম করে টাটকা শাক-সবজি, লক্ষ্মীবিলাস ধানের চাল, সোনামুগের ডাল, নারকেল, শুকনো ক্ষীর আরো অনেক কিছু নিয়ে মাজদিয়া স্টেশনের পথ ধরলাম। খুব চিন্তা হচ্ছিল পথের মাঝে যদি রামদাদুর ভূত পথ আটকায়!

সেসব কিছু হল না, অন্য পথ দিয়ে গরুর গাড়ি করে স্টেশনে নিয়ে গেল মাধব। দিনেরবেলা জমজমাট স্টেশন দেখে কিছুক্ষণ আগের ভয় উধাও হয়ে গেল আমার। গৌর অধিকারীর মিষ্টির দোকান থেকে এক হাঁড়ি রসগোল্লা কিনে মাধবের হাতে দিলাম। আমিও বাড়ির জন্য নিলাম এক হাঁড়ি। তবে দোকানদার সেদিনের মিষ্টির দাম কিছুতেই নিল না।

কালো ধোঁয়া উড়িয়ে এসে পড়ল কয়লার গাড়ি। গাড়িতে উঠে ভালো করে দেখে নিলাম বাঙ্কারে তেনারা আছেন কিনা!

গুছিয়ে বসে ভুতুমপুর থুড়ি ধরমপুরের ভূত-পেত্নী-মামদো- ভূতবংশীয় সকলের উদ্দেশ্যে জোড় হাতে পেন্নাম ঠুকলাম।

রামদাদুর গলা পেলাম, “কিঁ দাঁদু আঁমায় পেঁন্নাম কঁরলি নেঁ?”

আমি তো -তো- করে বললাম, “রাঁ—আঁ–মঁ দাঁ—দাঁ—দুঁ  তুঁ–তুঁমি এঁ—এঁ–খাঁনে?”

          ছবি- মৌসুমী রায়

জয়ঢাকের সমস্ত গল্পের লাইব্রেরি

Leave a Reply