অবন্তী পালের আগের গল্প- অস্ত্র সিন্দুকের রহস্য

অক্টোবর, সাল ২২২৩
রাত প্রায় দুটো। অনতিদূরের গির্জা থেকে জোরালো ডং-ডং শব্দে সময়ের জানান দেওয়া বার্তাটি কানে ঢুকল না সমুর, একমনে একরাশ ফাইলের মধ্যে ডুবে রইলো আটচল্লিশ বছরের সুঠাম চেহারার বৈজ্ঞানিক। চোখে সোনালি রঙের সরু ফ্রেমের চশমা, মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, গায়ে চাপানো সাদা ওভারকোট। ল্যাবরেটরির লম্বা কাঠের টেবিলের ওপর হাজারো কাগজপত্র বাদেও ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে যন্ত্রপাতি আর বই। ঘরের ছাদ থেকে ঝুলন্ত ল্যাম্পের হলুদ আলো সমুর উপর তির্যকভাবে পড়েছে, সেই আলোয় তাকে বয়সের ভারে ন্যুব্জ, ক্লান্ত এক মানুষ মনে হচ্ছে। আদপে কিন্তু সমু ক্লান্ত নয়, বরং গত কয়েকদিন ধরে একনাগাড়ে ল্যাবরেটরির মধ্যে কাজ করে চলেছে। সময়ে সময়ে সহায়ক নুরু এসে খাবার রেখে যাচ্ছে। খাবারের কোনটা হয়ত সমু গোগ্রাসে গিলছে, কোনটা একটু আধটু মুখে দিচ্ছে আবার কোনটা একইভাবে পড়ে থাকছে টেবিলে। নুরু জানে, এইসব সময়ে দাদাবাবুকে একেবারে বিরক্ত করা চলে না। গবেষণাগারে নিজেকে বন্দী রেখেছে মানেই দাদাবাবু আবার কোনো চমকপ্রদ আবিষ্কারের মুখোমুখি। পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাওয়া ছাড়া আর অন্য যেকোনো খবর এখন দাদাবাবুর কাছে অকিঞ্চিৎকর।
দেরাদুনের এই নিরিবিলি এলাকায়, তামাম দুনিয়া থেকে অনেকখানি পিছিয়ে থাকা শান্তিপ্রিয় এই অঞ্চলে, অজস্র পাইনের ঘেরাটোপে, জনবসতি থেকে বহুদূরে সোমনাথ করের এই গবেষণাগার। তার দেখভালে নিয়োজিত নুরু ল্যাবরেটরির আশেপাশের বাগানের পরিচর্যা থেকে শুরু করে, পাখিদের নিত্যদিন ছোলা দেওয়া, রান্নাবান্না থেকে কাচাকাচি, বাজার করা, সমস্তটাই সামলায়। আর সমুর কাছে কতরকম রোমাঞ্চকর আবিষ্কার আর অভিযানের কথা শুনে শিহরিত হয়ে ওঠে।
ইদানিং সমু একটা বিশেষ কারণে চিন্তিত। অহরহ মাথার ওপর যুদ্ধবিমানের যাতায়াত বেড়েছে। বিশ্বস্ত সূত্রের মাধ্যমে সে খবর পেয়েছে, মানবসৃষ্ট রোবট-মানব উঠে পড়ে লেগেছে মানুষের থেকে দখল নিতে নিজস্ব রাজ্যক্ষেত্র। সেখানে থাকবে একমাত্র রোবট-মানবের বাস। স্বীকৃতি পাবে তাদেরই নাগরিকত্ব। তাদের অধীনে থাকা অঞ্চলের মধ্যে মানুষ এসে পড়লে তাকে হত্যা করতেও দ্বিধা করছে না এরা। ইতিমধ্যেই এরা দখল নিয়েছে বহু ইউরোপিয়ান গ্রামাঞ্চল। সংঘর্ষে শক্তিশালী রোবট-মানবদের সঙ্গে পেরে ওঠা যাচ্ছে না। তারা ক্রমে ইরাক, ইরান, আফগানিস্তান ছাড়িয়ে এশিয়া উপমহাদেশে ঢুকে পড়েছে। এদিকে দক্ষিণ আমেরিকা আর আফ্রিকাতেও কিছু জায়গায় বিতর্কজনক ঘটনা ঘটেছে। সেই ছোবল থেকে ভারত আর বেশি দূরে নেই। এর মধ্যে ভারতের আকাশে বেশ কয়েকবার যুদ্ধবিমান উড়তে দেখা গেছে। এবার বিশ্ব যুদ্ধ ঘোষণা হতে আর বেশি দেরী নেই। রোবট আর মানুষের রাষ্ট্র নিয়ে কাড়াকাড়ি ভেদাভেদ দেখে উঠেপড়ে লেগেছে বিশ্বের জ্ঞানী-গুনীরা। ব্যস্ত সমুও, যদিও কী তার উদ্দেশ্য, সেটা কেউ জানে না। এই কয়েকদিনে, সে দিনরাত এক করে কোনও এক চমৎকার ঘটানোর জন্য লড়ে চলেছে।
সময়ের ওপর কাজ করছে সমু। প্রবল চৌম্বকীয় ক্ষেত্র প্রয়োগ করলে সময়রেখা বেঁকে যায়। ব্ল্যাক হোল অথবা কৃষ্ণগহ্বরের ইভেন্ট হরাইজন এলাকায় সময় আর আলো বিকৃত হওয়ার বৈশিষ্ট্য এর একটি উদাহরণ। ইভেন্ট হরাইজন সেই এলাকা, যার ভেতরে ঢুকে গেলে কোনো কিছুই কৃষ্ণগহ্বরের অমোঘ আকর্ষণ কাটিয়ে ফিরে আসতে পারে না, আলো পর্যন্ত নয়। এই তথ্য কাজে লাগিয়ে টাইম স্পাইরাল বানানোর প্রচেষ্টায় মগ্ন সমু, যার মাধ্যমে বর্তমান সময়কাল থেকে অতীতে পৌঁছানো যায়। অর্থাৎ টাইম ট্রাভেল, কিন্তু সেটা সমান্তরাল রেখা বরাবর সোজা এগোনো অথবা পিছোনো নয়। শক্তিশালী তড়িৎ-চুম্বকীয় ক্ষেত্র প্রয়োগ করে, সময়ের গতিবিধি পাল্টে, সময়কে সর্পিল আকারে বাঁকিয়ে তোলার প্রচেষ্টা। সমু পরীক্ষা করে দেখেছে, সময়রেখা পেঁচিয়ে উঠে অসংখ্য বলয়ের সৃষ্টি করে চলেছে। সেখানে কোনো রেখা অন্য কাউকে ছেদ করছে না। তার মানে সময়বৃত্তের ওপর দিয়ে সরলরেখায় এগিয়ে অনেক আলোকবর্ষ আগে অথবা পরে পৌঁছানো যাবে অকল্পনীয় দ্রুততায়, কিন্তু সেটা কোনো সমান্তরাল মহাবিশ্বে পৌঁছে দেওয়ার সম্ভাবনাও রাখে। সমুর লক্ষ্য একটি বিশেষ অতীত সময়ে পৌঁছানো। উদ্দেশ্য – ফিরে এসে এই পৃথিবীরই বাসিন্দা হতে পারা, যেখানে রোবট আর মানুষের এই বিশ্বযুদ্ধের অস্তিত্বই নেই।
হঠাৎ সে চিল্লিয়ে ওঠে, “ইউরেকা!” আর তারপরেই গবেষণাগারের নিচে, মাটির তলায়, নিজের সৃষ্ট সময়যানের কাছে যায় সমু। যানটি আকারে ছোটো, সর্বসাকুল্যে দুজন পূর্ণবয়স্ক মানুষ তার ভেতরে দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে। রয়েছে অজস্র কন্ট্রোল আর ডায়াল। যানটির নাম নেব্লইড-১। নিজের সদ্য আবিষ্কৃত তথ্য অনুযায়ী সমু ঠিক করতে থাকে নেব্লইডের বিভিন্ন সার্কিট। এরপর প্রস্তুতি পর্ব শেষ হতে প্রায় মাসখানেক কেটে যায়।
একদিন সকালে নুরু হঠাৎ হন্তদন্ত হয়ে সমুর গবেষণাগারে এসে হাঁফাতে হাঁফাতে বলল, “এক্ষুনি পরিমলবাবু এই কাগজটা দিয়ে গেলেন। বললেন, এক দৌড়ে সোমনাথকে দিয়ে আসবি চিঠিটা, খুব জরুরি।”
সমু চিঠিটা খুলে পড়ে ফেলে এক নিশ্বাসে, “ওরা ভারতবর্ষ হামলা করেছে, ওদের প্রথম নিশানা বৈজ্ঞানিক আর ডাক্তার। আর্মি ইতিমধ্যে অ্যাকশানে নেমে পড়েছে, কিন্তু শত্রু তো ডেঞ্জারাস। পালাও, এখনই!”
পরিমলবাবু জ্ঞানীগুণী মানুষ, উচ্চপদস্থ সরকারি অফিসার। সমুকে নিজের ভাইয়ের মতো স্নেহ করেন। যেকোন পরিস্থিতির সামনে দাঁড়িয়ে সমস্যার মোকাবিলা করার চেষ্টা করেন। তাঁর থেকে এমন পালানোর বার্তা এসেছে মানে ঘোর বিপদ। ইতিমধ্যে অনেকেই পৃথিবীর বিভিন্ন দুর্গম এলাকায় গা-ঢাকা দিতে শুরু করেছে। কিন্তু বৈজ্ঞানিক হয়ে দেশ-দশের কথা না ভেবে, সমু কি করে একা নিজেকে বাঁচানোর কথা ভাবতে পারে?
বেশ কিছুক্ষণ চিন্তা ভাবনার পর, সমু নুরুকে ডেকে বলল, “চল্ নুরু, যাই।”
“কোথায় যাব দাদাবাবু?”
“নিরাপদ জায়গায়। এই যুদ্ধ থেকে অনেক দূরে। যাবি তো আমার সঙ্গে?”
“হ। কিন্তু এই বাগানবাড়ি?” নুরুর কাছে এই বাগানবাড়ি স্বর্গভূমি।
“দেখি কী করতে পারি” আতঙ্কিত সহায়কের কাঁধে হাতের হালকা স্পর্শ রেখে তাকে আশ্বস্ত করে সমু।
দুজনে চেপে বসে নেব্লইডে। সমু কন্ট্রোল প্যানেলে বেশ কিছু নির্দেশ দিতেই সময়যানটির মধ্যে ঘড়ঘড় শব্দে প্রাণ সঞ্চারিত হয়।
২
চারিদিক কুয়াশাচ্ছন্ন, কিন্তু তার মধ্যেও বেশ বোঝা যাচ্ছে, প্রকাণ্ড বড় মহীরুহেরা দাঁড়িয়ে আছে নিস্তব্ধ প্রহরীর মতো। আকাশচুম্বী গাছের চাঁদোয়া দেখে নিজেকে বড্ড ক্ষুদ্র মনে হলো সমুর। নেব্লইডে ফুটে ওঠা লেখাটা দেখাল ফেব্রুয়ারি, সাল ২৩৬৮।
সমু বুঝল নেব্লইড কাঙ্ক্ষিত অতীতে না গিয়ে ভবিষ্যতে নিয়ে এসেছে ওদের। এই মুহূর্তে যানটি নিষ্প্রাণ দাঁড়িয়ে রয়েছে। নুরুকে বলল, “চল্, হাঁটি।”
দুজন মানুষ এক অচেনা আগামী পৃথিবীর বুকে হেঁটে চলল একটুকরো আলোর সন্ধানে, মানবসভ্যতার খোঁজে।
অনেকটা পথ চলার পর নুরুই প্রথম খেয়াল করল, “দাদাবাবু, অই দেখেন, আলো!”
বুকে বল নিয়ে ফের দুজনে তাড়াতাড়ি পা চালাল। যতক্ষণে আলোর উৎসের কাছে এসে দাঁড়াল, ততক্ষণে সমু উপলব্ধি করেছে যে প্রাচীর ঘেরা পেল্লায় বিশাল দুর্গটা আর কিছুই নয়, তার ফেলে আসা পৃথিবীর গবেষণাগারের উন্নত সংস্করণ। কারা রয়েছে এর ভেতরে তবে? সন্তর্পণে সমু আর নুরু এগিয়ে চলল দুর্গের ভেতরে। যত দরজা আছে, আশ্চর্যের ব্যাপার সেখানে কোথাও কোন প্রহরী নেই। আছে আঙুলের ছাপ আর চোখের মণি সনাক্ত করে প্রবেশের অধিকার। এই সবকটি প্রবেশদ্বারেই অনায়াসে প্রবেশাধিকার পেয়ে গেল দুজনে। সব মিলিয়ে দুর্গের ২৮০টি সিঁড়ি পেরিয়ে যখন সমু আর নুরু মূল কক্ষে প্রবেশ করল, তখন জোর কদমে আলোচনা চলছে। যারা সামনে বসে রয়েছে, তারা দুজন এদের দুজনকে দেখে অবাক হওয়ার বদলে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল, যেন এতক্ষণ এদেরই অপেক্ষা করছিল।
সমু আর নুরুর চকিত চাহনি দেখে একজন এগিয়ে এসে বলল, “আসুন, আপনাদের জন্যই অপেক্ষা করছিলাম।”
“কিন্তু… আপনারা কারা? কিভাবে জানলেন যে আমরা এখানে এসে পৌঁছব?” আশ্চর্য হয় সমু।
“আমরা অতীত দেখতে পাই। অতীতকে খুব সামান্য হলেও প্রভাবিত করতে পারি। এভাবে আমরা জানতে পেরেছি যে অতীত থেকে আমাদের এই বর্তমান মুহূর্তে আসছে দুজন হোমো স্যাপিয়েন্স।”
“আমরা তো এখানে বেঁচে থাকার চাবিকাঠি খুঁজতে এসেছি! তাহলে কি খাঁটি মানব প্রজাতি আর বেঁচে নেই ভবিষ্যতে? আচ্ছা, আপনারা ঠিক কী? পুরোপুরি মানুষের মতো দেখতে অথচ আমাদের দুজনকে এভাবে প্রজাতির নামে, অর্থাৎ হোমো স্যাপিয়েন্স নামে ডাকছেন?”
“আমি বুঝিয়ে বলছি আর্থার।” একজন বয়স্ক লোক এগিয়ে এসে সামনের লোকটিকে থামাল।
“আমাকে চিনতে পারছ সোমনাথ?” লোকটির এমন প্রশ্নে খানিক থতমত খেয়ে গেল সমু। লোকটা তার নাম জানল কী করে?
সমুর নিরুত্তর চাহনিতে লোকটা হেসে বলল, “আমি সাকা, সোমনাথ কর। না না, অত অবাক হওয়ার কিছু নেই, আমি এই পৃথিবীতে তোমারই ভবিষ্যত। তোমরা আমার আহ্বানেই এখানে এসেছ। আমিই তোমাদের দুজনকে সময়যানের মাধ্যমে, অতীত থেকে ডেকে নিয়ে এসেছি।”
“কিন্তু কেন? তাছাড়া, আপনি কিভাবে আমাদের ডাকবেন, আমি নিজেই তো নেব্লইড তৈরি করে নিজের ইচ্ছায় এখানে এসেছি!” সমু ভাবতে নারাজ যে তার চিন্তাশক্তি, তার ইচ্ছে সাধন অন্য কারুর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়েছে। হোক না সে তার নিজেরই আগামী রূপ, তবুও তার বর্তমান তো নয়!
সাকা বোধহয় সমুর মনের কথা পড়তে পেরে হাসল, “সত্যিই কি ভবিষ্যতে আসতে চেয়েছিলে? চাওনি তো! যেতে চেয়েছিলে অতীতে, রোবট-মানব জন্মলগ্নের মুহূর্তে, যখন থেকে প্রথম রোবট সোফিয়াকে একটি দেশের নাগরিকত্ব দেওয়া হলো, সেই মুহূর্তে। বদলাতে চেয়েছিলে ওদের অধিকারের ইতিহাস, বন্ধ করতে চেয়েছিলে ওদের বেড়ে ওঠা। পারলে কি?”
চমকে উঠলো সমু। সামনের দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা কেমন করে জানতে পারল তার এই চাওয়ার কথা? সে তো কাউকে জানায়নি এটা, একমাত্র নিজেকে ছাড়া! তার মানে এই লোকটা সে নিজেই, কারণ নিজের বিবেক ছাড়া আর কারুর এই কথা জানা অসম্ভব।
“তুমি সেই চূড়ান্ত মাহেন্দ্রক্ষণে দাঁড়িয়ে আছ, যে সময়ের সিদ্ধান্ত স্থির করবে আগামী পৃথিবীর ভবিষ্যত। অতীতের কৃত যে কোন অন্যায় চাইলেই বদলাতে পারবে তোমার আবিষ্কৃত সময় যানের মাধ্যমে। তাই আজ তোমাকে ডেকে আনতে বাধ্য হলাম। তুমি যে অতীত বদলাতে যাচ্ছিলে, সেটা করলে মস্ত বিপদ নেমে আসবে। তোমার কাঙ্ক্ষিত সময়কালে যেতে না দিয়ে তাই আমরা তোমাকে এখানে নিয়ে এসেছি।”
“কিন্তু আমি তো আসন্ন যুদ্ধ রুখতে চাই, নাহলে মানবজাতি ধ্বংস হয়ে যাবে! রোবটেরা একের পর এক দেশ, মহাদেশ তছনছ করে বেড়াচ্ছে। তাদের আটকানো দরকার! তাদের নিজস্ব যান্ত্রিক বুদ্ধির বাইরেও যে মানুষের ঈশ্বর-সৃষ্ট বুদ্ধি কত বেশি, সেই বোধ তাদের মধ্যে যদি কোনোকালে না আসে, তাহলে তাদের সমূলে উৎখাত করতে হবে!” রুদ্ধশ্বাসে কথাগুলো বলল ক্রমশ উত্তেজিত হয়ে পড়া সমু।
সাকা বলল, “রোবটকে নষ্ট করে ফেললে আজকের আমরা অস্তিত্বহীন হয়ে পড়ব! তুমি যেখানে এখন দাঁড়িয়ে আছ, সেখানে নিরর্থক কালো মহাশূন্য থাকত। কেন জানো? কারণ আমরা ম্যানোবট। মানুষের মধ্যে মিশ্রিত করা রোবট। আমরা দুইই এক, আর একে অপরকে ছাড়া শূন্য। মানুষ আর রোবটের সমন্বয়ে যে পৃথিবী কত উন্নত হয়েছে, কত দ্রুতগতিতে এগিয়েছে, সেটা তুমি নিজের চোখে দেখলেই উপলব্ধি করতে পারবে।”
“আপনারা রোবট? তার মানে রোবট মানুষকে জয় করে নিয়েছে? ঠিক এই ভয়েই আমি আসন্ন যুদ্ধ আটকাতে চাইছিলাম!” সমু আক্ষেপ করে তার ভবিষ্যত নিয়তি দেখে।
কিন্তু সাকা বলে ওঠে, “কেউ কাউকে জয় করেনি। আমরা নিজেদের মধ্যে দিব্যি চুক্তি করে একে অপরের মধ্যে রয়েছি। আমরা আজ অভেদ্য। নাহলে নিজের এই অতি দীর্ঘ আয়ুর কথা ভাবতে পারতে? ভাবতে পারতে বয়সের প্রভাব থামিয়ে নিজের শরীরকে সুস্থ রাখা, নিজেকে এতটা কর্মক্ষম রাখা? সমু, তুমি যেটা করতে যাচ্ছিলে, সেটার ফলে আমাদের আর কোনও অস্তিত্বই অবশিষ্ট থাকত না। তাই তোমাকে বারণ করতে ডেকে এনেছি। বিশ্বাস রাখো, নিজের সময়ে ফিরে যাও, দেখবে যেটা আসন্ন যুদ্ধ বলে ভাবছ, সেটা দমকা ঝড়ের মতন উড়ে যাবে। তবে আমাদের একটি উপকার করে দিতে হবে তোমাকে।”
“আমি এখনও বিশ্বাস করতে পারছি না যে যুদ্ধ না হয়ে আমাদের সকলের উন্নতি হবে! কিন্তু সবই যদি ঠিক চলছে তাহলে এই প্রাচীন অতীতের পাতা থেকে কী উপকার দরকার হল ম্যানোবটদের? তারা কি আজও স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়?”
হাসল সাকা, “আমরা চাই তুমি এই সময়যানটি নিজের জগতে ফেরার পর নষ্ট করে দাও। কারণ সেটা থেকে সৃষ্ট যে আর সমস্ত সমান্তরাল পৃথিবীতে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, সেখানে মানুষ অথবা রোবট, কারুর অস্তিত্ব নেই! কিছু ক্ষেত্রে মানুষ সম্পূর্ণ অবলুপ্ত হয়ে গেছে, তার ধমনীতে নেই রক্ত, তার জিনে ঢুকেছে হাজারো ব্যাধি, তার বুদ্ধিহীনতা ক্রমশ বেড়েছে। এই অসুস্থ বিকৃত পৃথিবী আমরা কেউই চাই না, কিন্তু তার সম্ভাবনা আছে। যদি তুমি ফিরে গিয়ে, টাইম লিপ করিয়ে ফের তোমার বর্তমান জগত থেকে আবার সেরকম ত্রুটিপূর্ণ কোন জগতে যাও, তাহলে অনিষ্ট হয়ে যাবে। এরকম সম্ভাবনা আছে। কিন্তু আজ আমরা টিকে আছি তোমার একটা সঠিক সিদ্ধান্তের জন্য। সেই সিদ্ধান্তের থেকে যেন বিচ্যুতি না ঘটে।”
“কিন্তু…” এতক্ষণ চুপ করে থাকা নুরু এবার গলা খাঁকারি দিয়ে এগিয়ে এল, “আপনারা যদি আছেনই তাহলে অন্যান্য সম্ভাব্য অতীত নষ্ট করার প্রয়োজন কী? কী করে বুঝব আপনারা ঠিক পথে চালিত করার চেষ্টা করছেন আমাদের? এর থেকে ভালো কোনো নিয়তি তো থাকতেও পারে, যেখানে রোবটের অস্তিত্বই নেই কিন্তু মানুষের আছে? আজ আপনারা ম্যানোবট হয়ে পড়েছেন বলে যে অন্যান্য সম্ভাবনা উড়িয়ে দিতে চাইছেন না, সে ব্যাপারে কী করে নিশ্চিন্ত হই?”
“তার সব থেকে বড়ো প্রমাণ তোমরা দুজন অন্য কোথাও না, এই ঘরে এসে দাঁড়িয়ে আছ। বহুবছর পরে আবারও তোমরা এই ঘরে এসেই দাঁড়াবে, কিন্তু তখন আর সোমনাথ অথবা নুরু পরিচয়ে না, অক্ষত সাকা আর আর্থারের নামে। কিন্তু তুখোড় বৈজ্ঞানিক সমুর হাত দিয়ে এই মুহূর্তের যাতে অন্য কোন পরিণতি না হয়, তাই এই সাবধানবাণী।”
নুরুর হতভম্ব ভাব অগ্রাহ্য করে সাকা বলে চলল, “দ্বিতীয়ত, এই দেখো…”
একটা ছোটো রুপোলি রিমোটের বোতাম টিপে একটা বিশালাকৃতি ভাসমান স্ক্রিনকে প্রস্ফুটিত করল সাকা, “নিজের চোখেই দেখো কী কী পরিণতি হতে পারে অন্যান্য সমান্তরাল জগতে, যা এই জগতে এড়ানো গেছে। তবে হ্যাঁ, আমাদের এই গ্রহ মৃত্যুগামী। আজ থেকে কয়েক কোটি বছর পরে যেদিন সূর্য ম্রিয়মাণ হতে হতে দপ করে নিভে যাবে, তার বহু পূর্বেই ম্যানোবট সভ্যতা পৃথিবীতে ফসিল হয়ে যাবে।”
সমু আর নুরু এবারে সত্যিই দেখতে পেল স্ক্রিনে একের পর এক ভেসে উঠতে থাকা বিভিন্ন সম্ভাব্য জগৎ, সব সেই মুহূর্ত থেকে শুরু যেখান থেকে ওরা দুজন নেব্লইডে চেপেছিল। অগুনতি সম্ভাবনা। কিন্তু প্রায় প্রত্যেকটি ইতিমধ্যে ধ্বংসের মুখে অথবা জনবসতিহীন। কিছু কিছু পিছিয়ে চলে গেছে প্রস্তর যুগে। দুজনের আর কোনও সংশয় রইল না, যে ফিরে গিয়ে নিজেদের দায়িত্ব পালন করে যাওয়াই শ্রেয়। তাদের আগাম ভবিষ্যৎ বর্তমানের পথচলার প্রদর্শক হয়ে উঠেছে।
নেব্লইডে চেপে বসার আগে, শেষ মূহুর্তে সমু আবারও জিজ্ঞেস করল সাকাকে, “আমার কি তাহলে সত্যিই আর কিছু করণীয় নেই? তোমার আর কোনো বার্তা আছে, যা আমি এখনও বুঝতে পারিনি?”
চোখ টিপে সাকা বলল, “আছে তো! প্রবল ক্ষমতাশালী রোবট-নেতাদের সঙ্গে মানব-নেতাদের সম্মেলন সভা হতে চলেছে ঠিক দুদিন পর। রোবট-নেতাদের মগজে তোমাকে কৌশল করে এই বদ্ধমূল ধারণা তৈরি করতে হবে যে, দুইয়ের সমন্বয়েই সবাই লাভবান হবে। একা পথ চলা রোবটদের সর্বনাশ এনে দেবে। মানুষ আর রোবটদের একত্রিত হওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। তবে হোমো স্যপিয়েন্সের সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেম, যা মানুষের সমস্ত দৈহিক আর চিন্তাশক্তির মূলে, সমস্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার মুলে, সেটি তার নিজের আয়ত্তের মধ্যেই থাকবে, সেখানে বাইরের কোনো বস্তু অথবা শক্তি প্রবেশ করতে পারবে না। এই সভা চুক্তিগত হওয়ার মুহূর্ত থেকেই সমস্ত যুদ্ধ থেমে যাবে!”
চোখাচোখি হয় অতীত আর ভবিষ্যতের, ছোট্ট করে মাথা নেড়ে সায় দেয় সমু।
ছবি- মৌসুমী রায়