শিবানী রায়চৌধুরীর আগের গল্প খোক্কস, বাড়ি থেকে পালিয়ে(গল্প), ফুলঝাড়ু, ইচ্ছেপূরণ, অদৃশ্য

ঝুমুরের শোবার ঘরে একটা কাঠের বুককেস ভর্তি এক গাদা পুরনো গল্পের বই। সবই ওর মার ছোটোবেলার বই। গত বছর গরমের ছুটিতে ঝুমুর চন্দননগরে ওর মামার বাড়ি গিয়েছিল। চন্দননগরে মামারবাড়িটা মান্ধাতা আমলের। মামারা ওর মাকে বলেছিলেন, “তোমার বইপত্তর আর যা কিছু আছে নিয়ে যাও। আমরা বাড়ি সারাব কি প্রমোটারকে দিয়ে দেব। তখন ওসব ফেলে দিতে হবে।”
ওর মা বললেন, “বইটই আমি নিয়ে যাবার ব্যবস্থা করছি। তোমরা ভেবো না।”
অ্যাকাউন্টেন্ট বড়োমামা বললেন, “পুরনো পোকায় কাটা আদ্যিকালের গল্পের বই তুই টাকা খরচ করে ইংল্যান্ডে নিয়ে যাবি!”
ওর মা চুপ করে শুনলেন। ছোটোমামা কলেজে ইংরিজি পড়ান। উনি বললেন, “নিয়ে যাক । ঝুমুর পড়বে।”
ঝুমুরের মা বললেন, “আমি সেই কথাই ভাবছিলাম। ঝুমুরকে পড়ে শোনাব। ও যদি শনিবারের বাংলা ইস্কুলে ভাষাটা শিখে ফেলে তাহলে নিজে নিজে পড়তে পারবে।”
বইপত্তর সব প্যাক হয়ে গেল। বড়োমামা টিপ্পুনি কাটলেন, “এখানে ছেলেমেয়েরা ‘হ্যারি পটার’-এ মজে আছে। আর ঝুমুর ‘ঠাকুরমার ঝুলি’ পড়বে!”
ওর মা বইপত্তর প্যাক করার সময় ঝুমুরকে একটা হালকা নীল রঙের শক্ত মলাটের বই দেখিয়ে বলেছিলেন, “আমার আট বছরের জন্মদিনের উপহার ‘ঠাকুরমার ঝুলি’। রূপকথা আছে। ফেয়ারিটেলস।” বইয়ের নাম নীল মলাটের ওপর রূপোলি রঙে লেখা।
এসব দু’বছর আগের কথা। লন্ডনে ফিরে ঝুমুরের মা পুরনো আসবাবের দোকান থেকে কাঠের বুককেস কিনে বইগুলো ঝেড়েমুছে রেখে দিলেন। ছোটোবেলার স্মৃতি বইগুলো বন্দি হয়ে রইল। গত দু’বছরে মা’র ঝুমুরকে গল্প পড়ে শোনাবার সময় হয়নি। আজ হবে কাল হবে করে ঝুমুর আর বাংলা ক্লাশে ভর্তি হয়নি। ও শুধু ইংরিজি বই পড়ছে। ঝুমুরের আট বছর হতে এক মাস বাকি। মা বললেন এবার তোমার জন্মদিনে বই কিনে দেব। ঝুমুর গল্পের বইতে ডুবে থাকতে ভালবাসে। মার কথায় ঝুমুর খুব খুশি। মাকে বলল, “আমি কিন্তু বই পছন্দ করব।”
পরের শনিবার দুপুরে ঝুমুর মার সঙ্গে পিকাডেলি সার্কাসে এক চারতলা বইয়ের দোকানে গেল। দোকানের নাম ‘ওয়াটারস্টোনস’। এক এক তলায় এক এক রকমের বই। সবচেয়ে ওপরে তলায় ছোটোদের বই। বিশাল ঘরভর্তি থরে থরে কত রকমের বই যে তার ঠিক নেই। ঝুমুরের মনে হল এ তো হ্যানসেল আর গ্রেটেলের জিঞ্জার ব্রেড আর ক্যান্ডির বাড়ির মতো নানা রকম ছোটোদের বইয়ের বাড়ি! মা বললেন, “তুমি এখানে বই পছন্দ করো, আমি নীচের তলায় বড়োদের বই দেখে আসছি।”
ঝুমুর আশ্চর্য হয়ে তাকের পর তাক বই ঘেঁটে দেখছিল। বই দেখতে দেখতে ঝুমুর এক অন্য জগতে চলে গিয়েছিল। একেবারে শেষ তাকের সবচেয়ে উঁচুতে একটা লাল মলাটের ইয়া মোটা বই। বইটা নিজের ভারে ঘাড় কাত করে আছে। প্রায় পড়ে যাচ্ছে। ওপরের তাকে ঝুমুরের হাত পৌঁছল না। ঝুমুর দেখল একজন একটা ছোটো কাঠের মইয়ে উঠে ওপরের তাকের বই দেখছে। মইটা খালি হতেই ঝুমুর সেটা টেনে আনল। তারপর মইয়ে উঠে বইটাকে তাকে দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছিল। বইটা এত ভারী যে ঝুমুর টাল সামলাতে না পেরে বইশুদ্ধু মেঝেতে পড়ল।
বইটা বলল, “তুমি আমায় বাঁচালে। কত দিন যে কাত হয়ে শুয়েছিলাম তার ঠিক নেই। আমার ঘাড় ব্যথা করছে, পিঠ টন টন করছে, দাঁড়াতে পারছি না।”
ঝুমুর বলল, “তোমাকে আমি ওপরে তুলতে পারব না। তুমি এত ভারী যে ফেলে দেব।”
বই বলল, “আমি ওপরে উঠতে চাই না। অত উঁচুতে কেউ আমাকে ফিরেও দেখে না। আমার গায়ে কত ধূলো জমেছে, একটু ঝেড়ে দেবে?”
ঝুমুর ওর রুমাল দিয়ে ধূলো ঝাড়ছে দেখে দোকানের লোক বলল, “খুকি, বইটা রেখে দাও। আমরা পরে ঝেড়েঝুড়ে ওপরে তুলে রাখব।”
বই ঝুমুরকে বলল, “আমি ওপরে উঠব না। আমি এখানে থাকতে চাই না। আমাকে তোমার সঙ্গে নিয়ে চলো।”
ঝুমুর জিজ্ঞেস করল, “তোমার দাম কত?”
বই উত্তর দিল, “দাম আবার কি? ওসব আমি জানি না।”
ঝুমুর বলল, “তোমাকে বাড়ি নিয়ে যেতে হলে দোকানে পয়সা দিয়ে আগে তোমাকে কিনতে হবে। তারপর আমি তোমাকে বাড়ি নিয়ে যেতে পারব।”
ঝুমুর বইয়ের পাতা উল্টে দামটা খুঁজছিল। হঠাৎ চোখে পড়ল একটা ছবি। জঙ্গলের মধ্যে লম্বা নাকওয়ালা এক ডাইনী। তার ছূঁচলো সরু থুতনী আর ধারালো নখ। বইটা এক ঝাপটায় ঝুমুরের কাছ থেকে সরে গিয়ে পাতা বন্ধ করে বলল, “উঁকি মেরে দেখা চলবে না। নাক গলানো ছেলেমেয়েদের কাছ থেকে আমি দূরে থাকি।”
ঝুমুর বলল, “তুমিতো আমার সঙ্গে বাড়ি যেতে চেয়েছিলে এখন কেন আমাকে ছবি দেখতে দিচ্ছ না। কী আছে এ বইতে?”
বই উত্তর দিল, “ফেয়ারি টেলস।” বইটা একটু একটু করে দূরে সরে যাচ্ছিল। ঝুমুর এগিয়ে গিয়ে বলল, “আমাকে দেখতে দেবে? এক মাস পরে আমার জন্মদিন। মার সঙ্গে উপহার কিনতে এসেছি। আমি ফেয়ারি টেলস পড়তে খুব ভালোবাসি।”
বই বলল, “তুমি যেসব ফেয়ারি টেলস পড়ো এগুলো সেরকম না, এগুলো হাজার বছরের পুরনো আসল ফেয়ারি টেলস। লোকের মুখে মুখে তৈরি হয়েছে। অনেক লেখক আবার সেগুলো নিজের ভাষায় নিজের কলমে লিখেছেন। তুমি বরং এই বইগুলো পড়ো।” এই বলে সে ঝুমুরকে ছোটোদের একটা ছবির বইয়ের তাকের দিকে ঠেলে দিল – ‘জেমস এন্ড দ্য জায়ান্ট পিচ’- ‘জেমস আর রাক্ষুসে পিচের’ গল্প, ‘চার্লি এন্ড দ্য চকোলেট ফ্যাক্টরি’।
ঝুমুর বলল, “এসব বই আমার পড়া। মা আমাকে আসল ফেয়ারিটেলস পড়ে শোনাবে। তুমি আমার সঙ্গে চল।”
ঝুমুরের মা ফিরে এসে দেখেন ঝুমুর একটা ভীষণ মোটা লাল বইয়ের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। ঝুমুর বলল, “আমি এই বইটা কিনব। পুরনো ফে্য়ারি টেলস।”
মা বইটা দেখে অবাক, “এত মোটা ভারী বই তুলতেই পারছ না, পড়বে কী করে।”
ঝুমুরের সঙ্গে কথায় মা পেরে ওঠেন না। ঝুমুর উত্তর দিল, “তুমি পড়ে শোনাবে।” এই বলে মার সঙ্গে ট্রলি ঠেলে দাম দেওয়ার কাউন্টারে এল। কাউন্টারে যে বসে ছিল সে বইটা নেড়েচেড়ে ঝুমুরকে বলল, “খুকি তোমার কপাল ভালো। বইটা অনেকদিন দোকানে পড়েছিল। আজকাল আর ছোটো ছেলেমেয়েরা রূপকথা পড়ে না। কে-ই বা পড়ে শোনাবে! আজকেই দাম কমানো হয়ছে। অর্ধেক দাম,হাফ প্র্রাইস।”
ঝুমুরের মা অর্ধেক দামে বইটা পেয়ে খুব খুশি হলেন। তবে বইটা বাাড়িতে বয়ে আনতে ওঁর হাত ব্যথা হয়ে গেল। এসেই ঝুমুরের ঘরে বইয়ের আলমারির মাথায় রেখে দিলেন। পড়ার টেবিলে জায়গা হল না।
ঝুমুর রাত্তিরে খাওয়ার পর চটপট দাঁত মেজে শুতে যাবার জন্যে তৈরি হল। মাকে বলল, “আজ আর আমি নিজে নিজে গল্পের বই পড়ব না। তুমি নতুন বই থেকে পড়ে শোনাবে।”
বিছানায় শুয়ে মার জন্যে অপেক্ষা করতে করতে ঝুমুরের ঘুম পেয়ে গেল। আধো ঘুমের মধ্যে ঝুমুর শুনতে পেল, “তোমার মা আমাকে সেই উঁচুতে তুলে রাখল। এখানে তুমি হাত পাবে না। তোমার সঙ্গে এসে আমার কী লাভ হল? আগের মতোই আমি শুয়ে শুয়ে ধূলো মাখব।”
ঝুমুর বিশ্বাস করতে পারছিল না যে বই আবার কথা বলতে পারে। ও ঘুমের ঘোরে বলেই ফেলল, “তুমি তো একটা বই। কথা বলছ কী করে?”
বই বলল, “আমি একজন স্টোরিটেলার। গল্প বলি, কথা বলতে না পারলে এতো বছর ধরে গল্প শোনালাম কী করে? তোমাদের ইস্কুলে রূপকথার বই নেই? তোমরা ফেয়ারি টেলস পড় না?”
ঝুমুর উত্তর দিল,“ওসব নার্সারির বাচ্চারা পড়ে।”
বই থামল না। বলেই চলল, “তুমিও একদিন নার্সারিতে ছিলে? তখন পড়নি?”
ঝুমুর চুপ করে ভাবছে দেখে বই এবার বলল, “তোমার ব্যাঙ রাজপুত্তুরের কথা মনে আছে?”
ঝুমুর বলল, “হ্যাঁ হ্যাঁ, মনে পড়েছে কোলা ব্যাঙটা থপাস্ থপাস্ করে রাজকন্যার বিছানায় উঠেছিল। আহ্লাদী রাজকন্যা ঘেন্নায় রাগে সেই ভিজে সপসপে কোলা ব্যাঙটাকে পাথরের মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলেছিল।”
বই বলল, “এই তো গল্পটা মনে আছে। তারপর কী হল?”
ঝুমুর উত্তর দিল, “রাজকন্যা দেখল কোলা ব্যাঙের জায়গায় এক রাজপুত্তুর দাঁড়িয়ে আছে। গায়ে জরির জামা, গলায় মুক্তোর মালা। রাজকন্যা তো অবাক। রাজকন্যার ব্যাঙ রাজপুত্তুরের সঙ্গে ধূমধাম করে বিয়ে হল। আলোর মালায় চারদিক ঝলমল করে উঠল। সানাই বাজল। রাজ্যের লোক তিন দিন ধরে পেটপুরে খেল।”
ঝুমুর বইকে বলল, “এসব ফেয়ারি টেলস্ আমার জানা। আমি শুনতে চাই না। নতুন কিছু শোনাতে পারলে বলো। আমার খুব ঘুম পাচ্ছে। কাল রাত্তিরে এসো, আমি জেগে থাকব।”
পরের দিন রাত্তির সাড়ে আটটা। ঝুমুর বিছানায় শুয়ে আধঘণ্টার ওপর অপেক্ষা করেছিল। যেই ঘুম এসেছে হঠাৎ বইটা যেন লাফ দিয়ে টেবিলে নেমে এল। ঝুমুর বলল, “দিলে তো আমার ঘুমটা ভাঙিয়ে!”
বই বলল, “তোমার তো এখন গল্প শোনার কথা। আমি নতুন গল্প এনেছি।”
ঝুমুর বলল, “তাড়াতাড়ি করো। কাল সকালে আমার ইস্কুলে যেতে হবে।”
বইয়ের পাতাগুলো ঝটপট উল্টতে উল্টতে এক জায়গায় এসে থেমে গেল। তারপর বলতে শুরু করল:
প্রায় একশো বছর আগের কথা। ইউরোপের এক ছোটো শহরে থাকত মালিকা। পাহাড়ঘেরা পুরনো শহর। মালিকা সারাদিন কাচের জানালার ধারে বসে শহরটা দেখতে ভালোবাসত। হালকা নীলচে বেগুনি রঙের ল্যাভেন্ডার ঝোপে ঢাকা পাহাড়, ছোটো নদী ঢেউ তুলে এঁকেবেঁকে চলেছে। রাস্তার ধারে ফুলের ভারে নুয়ে পড়েছে চেরি ফলের গাছ। মালিকা জানালা দিয়ে দেখত বাইরে শানবাঁধানো চত্বরে ছোটো ছেলেমেয়েরা ছোটাছুটি করছে। এদের কেউবা পাহাড়ে উঠে ঘুড়ি ওড়াচ্ছে, কেউবা গাছ থেকে চেরি তুলে খাচ্ছে। মালিকার বাবা ছিলেন শহরের মেয়র। সম্ভ্রান্ত লোক। তাঁর দায়িত্ব ছিল শহরের লোক যাতে খেয়েপরে ভালো থাকে সেদিকে নজর রাখার। মালিকার মা ছিল না। মেয়র মালিকাকে খুব আগলে রাখতেন। সবার সঙ্গে মিশতে দিতেন না, সবার সঙ্গে খেলতে দিতেন না। মালিকা পিয়ানো প্র্যাকটিস আর ফ্রেঞ্চ ভাষা শেখার মাঝখানে যেটুকু সময় পেত তখন জানালা দিয়ে দেখত। কল্পনা করত ও একদিন বাইরে ছেলেমেয়েদের সঙ্গে খেলা করছে।
মালিকার দশ বছর বয়স হল। ওর বুদ্ধিশুদ্ধি বয়েসের চেয়ে বেশি এগিয়েছিল। আর ওর মনটা ছিল খুব নরম। লোকের দুঃখকষ্ট সহ্য করতে পারত না। একদিন লক্ষ করল শহরে লোকের অবস্থা আর আগের মতো নেই। জানালা দিয়ে দেখছিল পাহাড়ের ওপর ছেলেময়েরা ঘুড়ি ওড়াচ্ছে। তাদের গায়ে ছেঁড়া জামাপ্যান্ট, চুল উশকোখুশকো, পায়ে জুতো নেই। ওদের মা-বাবা রাস্তায় ভিক্ষে করছে। দুটো রুটির জন্যে থালা হাতে দাঁড়িয়ে আছে। একজন থুত্থুরে বুড়ি খিদেতেষ্টায় কাহিল হয়ে দুহাতে আঁজলা ভরে নদীর জল খাচ্ছিল দেখে মালিকার খুব কষ্ট হল। ও চুপচাপ নিজের ঘরে বসে রইল। সাজসজ্জায় মালিকার মন নেই। সিল্ক, সাটিন আর ভেলভেটের জামা আলমারিতেই তোলা রইল। কেক, চকলেট, আঙুর, পেস্তা, কিসমিস টেবিলে পড়ে থেকে শুকিয়ে গেল। মালিকার খেতে ইচ্ছে করছিল না। ওর বাবা শহরের গণ্যমান্য লোক। সব সময় কোটপ্যান্ট পরে ফিটফাট বাবু। মালিকাকে দেখতে না পেয়ে পাকানো গোঁফে তা দিতে দিতে মালিকার ঘরের দরজায় টোকা মারলেন “টক, টক”। মালিকা দরজা খুলতেই বললেন, “মালিকা, তোমার এখন লাইব্রেরিতে বসে পড়ার কথা। কালকের সব অঙ্ক করা হয়েছে? খাটের ওপর বসে আছ কেন?”
মালিকা উত্তরে বলল, “পাপা, আমার এখন গরমের ছুটি।”
মেয়র বললেন, “শুয়ে না থেকে কোন কাজের কাজ কর।”
মালিকা বলল, “পাপা, আমি তোমার কাজে সাহায্য করতে পারি? পাপা, আমিও একদিন তোমার মতো মেয়র হতে চাই।”
মেয়র প্রথমে খুব আশ্চর্য হলেন। তারপর বললেন, “শহরের লোক যদি চায় নিশ্চয়ই হতে পারবে।”
মালিকা বলল, “পাপা, শহরের লোক খুব কষ্টে আছে। খেতে পাচ্ছে না, জামাাকাপড় কেনার পয়সা নেই। তারা সাহায্য চায়।”
এ কথা শুনে রাগে মেয়রের গোলাপি মুখ লাল হতে হতে পাকা টম্যাটো হয়ে উঠল। গোঁফে তা দিতে দিতে মেয়র মালিকাকে বললেন, “বিশ্বাস করো, তুমি এদের যতই সাহায্য করবে এরা ততই চাইবে। তুমি এদের সঙ্গে পেরে উঠবে না। আমি প্রত্যেক দিন রাশি রাশি চিঠি পাই। শুধু অভিযোগ আর অভিযোগ। এটা নেই, ওটা নেই। এটা চাই, ওটা চাই। কিছুতেই শহরের লোক খুশি নয়।” মেয়র রেগে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
মালিকারও জেদ বেড়ে গেল। সেও দমবার মেয়ে নয়। সে আর মেয়রের সোনার খাঁচায় এক মুহূর্তও বন্দি হয়ে থাকতে রাজি নয়। মালিকা ঠিক করল একটা কিছু করতেই হবে।
মালিকা জানালা দিয়ে নীচের দিকে তাকিয়ে দেখল সে অত উঁচু থেকে নীচে ঝাঁপ দিতে পারবে না। তবে জানালার পাশে বুড়ো চেরিগাছটার মোটা ডাল ধরে নীচে নেমে যেতে পারবে। যেমন ভাবা তেমনি কাজ। মালিকা গাছের শক্ত ডাল ধরে তর তর করে নীচে নেমে এল। সূর্যের নরম আলো আর খোলা হাওয়ায় মালিকার মনে হল এতদিনে সে খাঁচা থেকে বেরিয়ে আসতে পেরে বাঁচল । মালিকা আনন্দে ঘুরপাক খেয়ে নাচতে শুরু করল। বার দুয়েক ঘুরপাক খেতেই মালিকা একজনের সঙ্গে ধাক্কা খেল। তারপর যার সঙ্গে ধাক্কা খেয়েছিল সে হাত পেতে বলল, “আমাকে দুটো পয়সা দেবে? সকাল থেকে কিছু খাইনি।”
মেয়েটা পয়সা চেয়ে মালিকার মুখের দিকে হাঁ করে তাকিয়েছিল। মালিকার চোখে চোখ পড়তেই সে চুপ করে রইল। মালিকা মেয়েটার মুখের দিকে তাকিয়ে তাজ্জব! ওর মনে হল ও যেন আয়নায় নিজের মুখ দেখছে। ফ্রেম ছাড়া আয়নায় হুবহু নিজের মুখ। বাদামি চোখ, কোঁকড়া চুল, ডান গালে ঠোঁটের ওপর তিল। বাঁ দিকে ভুরুর ওপর কাটা দাগ। সবই এক। তবে মেয়েটার গায়ে একটা শতছিন্ন জামা। মাথার চুলে জট, খালি পা আর হাতের নখ ময়লা। মালিকা নিজের গায়ে আকাশী সিল্কের জামা, পায়ে ম্যাচিং সাটিনের চটি দেখে লজ্জা পেল। তাড়াহুড়োতে মালিকা ঘরের চটি পরে নেমে এসেছিল।
মালিকাই প্রথমে কথা বলল, “তোমার নাম কি?”
মেয়েটা উত্তর দিল, “কামিলা।”
মালিকা নিজের পরিচয় দিয়ে জিজ্ঞেস করল, “তুমি ঠিক আমার মতো দেখতে কেন?”
কামিলা উত্তর দিল, “তুমিও ঠিক আমার মতো দেখতে কেন?”
তারপর দুজনে দুজনের দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে থেকে এক সঙ্গে খিলখিল করে হেসে উঠল। হাসতে হাসতে যখন দুজনের পেটে খিল ধরে গেল তখন মালিকা বলল, “আজ থেকে আমরা দুজন বন্ধু। আমার কোন বন্ধু নেই। আয়, আমরা নিজেদের জায়গা পাল্টে নিই। তুই আমার জায়গা নে, আমি তোর জায়গা নিই।”
কামিলা নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। বলল, “তুমি মেয়রের মেয়ে। তুমি যখন মেয়রের বাড়ির জানালা দিয়ে বের হয়ে চেরি গাছের ডাল বেয়ে নেমে এলে আমি তোমাকে দেখেছি।”
মালিকা বলল, “তুমি না, আমাকে তুই বলবি। আমরা এখন বন্ধু। তাহলে তুই এবার চেরি গাছের সেই ডালটা ধরে ওপরে উঠে জানালা দিয়ে আমার ঘরে ঢুকে পড়। আমার আলমারিতে অনেক ভালো ভালো ড্রেস আছে, নরম চামড়ার নতুন স্টাইলের জুতো আছে। তুই যা ইচ্ছে পরতে পারিস। এখন আমি তোর বাড়ি যাব কী করে বলে দে।”
কামিলা বলল, “আমার বাড়ি নদীর পাড়ে যে কুঁড়েঘরগুলো আছে তাদের তিন নম্বর ঘর। আমরা একটা ঘরে সবাই মিলে থাকি। আমাদের সবদিন খাওয়া জোটে না। তুই মেয়রের মেয়ে, তুই রোজ সকালে আঙুরের রস, ডিম, দুধ খাস, তুই আমাদের বাড়ি থাকবি কী করে?”
মালিকা কামিলার কথার উত্তর না দিয়ে বলল, “আমি তোর বাড়ি যাচ্ছি। তুই কিন্তু আমার বিল্লিকে রাত্তিরে রাইস পুডিং দিতে ভুলিস না।”
শুনে কামিলা নিজের মনে বলল, বড়োলোকের বিড়াল রাত্তিরে পায়েস খায়।
সেদিন রাত্তিরে মেয়র ডিনার খেতে এসে মালিকাকে ডাকলেন। কামিলা মালিকার জামাজুতো পরে মালিকা সেজে এসে খেতে বসল। টেবিলে এত খাবার যা ও জীবনে দেখে নি। কামিলা প্লেটভর্তি করে খাবার নিল-আগুনে ঝলসানো মুরগি আর ভেড়ার মাংস, গলদাচিংড়ি ভাজা, মাংসের কাটলেট, আলুভাজা, মাখন আর ক্রিমে মাখামাখি সিদ্ধ গাজর, বিট, ফুলকপি, কড়াইশুঁটি। তার ওপর তিন রকমের সস। ওর প্লেট থেকে খাবার উপচে পড়ছিল। এছাড়া বড়ো এক বাটি গরম সুপ।
কামিলা প্রাণভরে যতটা পারল খেল। তারপর মিষ্টির পালা-তিন স্লাইস চকলেট কেক আর স্ট্রবেরি আইসক্রিম। মেয়র এতক্ষণ কামিলার খাওয়া দেখছিলেন। খাওয়ার শেষে জিজ্ঞেস করলেন, “মালিকা, খুব খিদে পেয়েছিল মনে হচ্ছে? এত খাবার কোনদীন খাওনি!”
কামিলা খাওয়ার সময় হুঁ হাঁ উত্তর দিয়ে চালিয়েছিল। এখনও তাই করল।
মেয়র বললেন, “মালিকা কাল সকালে ফ্রেঞ্চ আর পিয়ানো আছে। তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠবে।”
এই কথা শুনে কামিলা মহা দুশ্চিন্তায় পড়ল। ভাবছিল সকালে পড়ানোর দিদিমণি এলেই সব ফাঁস হয়ে যাবে।
এদিকে মালিকা অনেকটা পথ হেঁটে নদীর পারে কামিলাদের কুঁড়েঘরে পৌঁছল। মালিকার পাায়ের শব্দ শুনে ঘরের ভিতর থেকে একজনের গলা শোনা গেল, “কামিলা, এত দেরি করে ফিরলি?”
মালিকা বুঝল ইনি কামিলার মা। ও ছোট্ট উত্তর দিল, “হাঁ।”
ঘরে ঢুকে দেখল কামিলার মা কম্বল মুড়িশুড়ি দিয়ে জ্বরে কাঁপছেন। ঘরের মিটমিটে আলোয় মালিকাকে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, “গায়ের সুন্দর জামাটা কোথায় পেলি?”
মালিকা বলল, “একজন পয়সার বদলে এই পুরনো জামাটা ভিক্ষে দিল।”
মা বললেন, “কোনো পয়সা জুটল না। আজ কী খাবি?”
মালিকা বেশি কথা না বলে রান্নাঘরে এল। সেখানে কামিলার দুই ভাইবোন খাবারের জন্যে অপেক্ষা করছিল। মালিকা তো ভিক্ষে করে কিছু নিয়ে আসেনি। মা বললেন, “মিসেস জোসেফের বাড়িতে তোর কাপড় ইস্ত্র্রি করার কথা। তাড়িতাড়ি করে আয়। পয়সা পাবি। ফেরার পথে রুটি কিনে আনবি।”
মালিকা মিসেস জোসেফের বাড়ি গিয়ে দেখল এক রাশ জামাকাপড় ইস্ত্রি করতে হবে। মিসেস জোসেফ একটা বড়ো আলমারি খুলে ওকে বললেন, “লম্বা ড্রেসগুলো ইস্ত্রি করে এখানে ঝুলিয়ে রাখবে।”
ও এক নজরে দেখতে পেল আলমারিতে এত কাপড়জামা যে ধরছে না।। মালিকা জীবনে কোনোদিন ইস্ত্রি করে নি। ইস্ত্রি কী করে করতে হয় জানে না। তাও চেষ্টা করেছিল, কিন্তু প্রথমেই মিসেস জোসেফের শখের সিল্কের ব্লাউজটা পুড়িয়ে ফেলল। তাই দেখে মিসেস জোসেফ ওকে দূর দূর করে তাড়িয়ে দিলেন, “তোমার আর কাজ করে দরকার নেই। কাল থেকে আর আসতে হবে না।”
মালিকার নিজেকে খুব অপরাাধী মনে হচ্ছিল কামিলার কাজটা চলে গেল বলে। ও খালিহাতে চোখ মুছতে মুছতে বাড়ি ফিরছিল। ও দেখল রুটির দোকানে সেদিন যেসব রুটি বিক্রি হয়নি তা বিলি হচ্ছে। মালিকা লাইন দিয়ে একটা রুটি নিয়ে বাড়ি ফিরে এল। তিন ভাইবোন মিলে শুকনো রুটি খেল। মা শুধু এক কাপ চা খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন। মালিকার তখনও অনেক কাজ বাকি ছিল। ও সকালের ফেলে রাখা বাসন মাজল, রান্নাঘর পরিষ্কার করল। তারপর দুই ভাইবোনের পাশে একটু জায়গা করে শুয়ে পড়ল। ক্লান্তিতে মালিকার দু’চোখের পাতা জুড়ে এসেছিল। এক ঘুমেই ভোর। ভালো করে আলো ফোটার আগেই মালিকা ঘুম থেকে উঠেছিল। দুই ভাইবোন আর মা’র কপালে চুমু খেয়ে কামিলাদের বাড়ি ছেড়ে চলে এল।
মালিকা নদীর পার ধরে অনেকটা পথ হেঁটে ওর জানালার পাশে চেরি গাছটার তলায় এসে দাঁড়াল। শক্ত ডাল ধরে ওঠার সময় ওর মনে হল ডাল বেয়ে নীচে নেমে আসাটা সহজ ছিল। কোন রকমে ডাল ধরে উঠে মালিকা জানালা দিয়ে চুপিচুপি ঘরে ঢুকল। কামিলা তখন সিল্কের নরম লেপের তলায় আরামে ঘুমাচ্ছিল। দুবার ডাকতেই ও উঠে পড়ে বলল, “আমি কোথায়? আমি কি স্বপ্ন দেখছি?”
মালিকা বলল, “স্বপ্ন দেখতে হবে না। তাড়াতাড়ি উঠে ব্রেকফাস্ট খেয়ে বাড়ি যা। আমাদের অনেক কাজ আছে।”
ব্রেকফাস্টে কামিলা যতটা পারল রুটি, মাখন, জ্যাম, চিজ, সসেজ আর কেক-পেস্ট্রি খেল। কিছু খাবার বাড়ির জন্যেও নিল। মালিকা ওর আলমারি খুলে কামিলাকে বলল, “এই ড্রেসটা তোর। এগুলো আমার গায়ে হয় না, তোর ছোটো বোনের।”
যাওয়ার সময় কামিলা জানতে চাইল, “আমাদের অনেক কাজটা কী?”
মালিকা বলল, “শহরের লোকদের কাছে তারা যেসব জামাজুতো পরে না সেগুলো চাইব। পয়সাওয়ালা লোকদের বাড়ি অনেক জিনিস আছে যা তাদের কোন কাজে লাগে না।”
কামিলা জিজ্ঞেস করল, “তুই ওসব নিয়ে কী করবি?”
মালিকা বলল, “আমরা যাদের কিছু নেই তাদের দেব।” তাই শুনে কামিলা হাততালি দিয়ে বলে উঠল, “দারুণ প্ল্যান।”
তারপর দুই বন্ধু পোস্টার লিখতে বসল:
আপনার বাড়িতে কি প্রয়োজন নেই এমন জামাজুতো, কোট, ছাতা, কম্বল আছে? শিশুদের পোষাক, বই, খেলনা আছে?
যদি থাকে, এই শহরে যাদের এসব প্রয়োজন তাদের দান করুন।
আমরা সংগ্রহ করছি। মুক্ত হস্তে দান করুন।
মালিকা বলল রুটির দোকানেও দিনের শেষে বাড়তি রুটি বিলি হয়। ফলসবজির দোকানেও দিনের শেষে জিনিস ফেলা যায়। আমরা এসব দোকান থেকে বাড়তি খাবার সংগ্রহ করব।
কয়েক দিনের মধ্যে বস্তা বস্তা জিনিসে ঘর ভরে গেল। জামাকপড়, জুতো, ছাতা, কম্বল, খেলনা, বইপত্তর এল। বেকারি থেকে বাক্স করে রুটি এল। দোকান থেকে ঝুড়ি ঝুড়ি ফল আর সবজি এল।
মালিকা শহরের গরিব লোকদের ডেকে যার যা দরকার নিয়ে যেতে বলল। তারপর দেখা গেল শহরের গরিব লোক আর ছেঁড়া জামা পরে নেই। সবায়ের পায়ে জুতো। ছোটোদের এক হাতে গল্পের বই আর অন্য হাতে খেলনা। কেউ আর উপোস করে থাকল না।
কয়েক দিন বাদে মেয়র এসে মালিকার দরজায় টোকা দিলেন “টক টক”। মালিকা দরজা খুললে মেয়র বললেন, “শহরের লোক ওঁকে চিঠি লিখেছে।” ওঁর হাতে ছিল এক তাড়া চিঠি। মালিকা ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করল, “পাপা, কোনো অভিযোগ করেছে?”
মেয়র বললেন, “অভিযোগ করবে কেন? তোমার ভূরি ভূরি প্রশংসা করেছে। তুমি ওদের দুঃখকষ্ট বুঝতে পেরেছ। তুমি বুদ্ধি খাটিয়ে ওদের সাহায্য করেছ। ওরা খুব খুশি হয়েছে।”
মেয়র আরো বললেন, “আমি আমার দায়িত্ব পালন করিনি। আমি কোনোদিন ওদের অভাব-অভিযোগ শুনতে চাইনি। শহরের লোক আমার ওপর সন্তুষ্ট নয়। লেখাপড়া শিখে বড়ো হয়ে তুমি মেয়র হতে চাইলে শহরের লোক তোমাকেই চাইবে।”
বই বলল, “আমার গল্প এখন ফুরলো।” ঝুমুর বোধহয় এরকম গল্প আশা করেনি। বইকে জিজ্ঞেস করল, এ কেমন গল্প? বই তখন বলল, “নতুন রূপকথা। প্রায় তোমার বয়সি একজন মেয়ের কথা।”
ঋণ স্বীকার: ‘এ ফেয়ারীটেল ফর এভরি ওয়ান’(Edited by Boldizsar M Nagy, HarperCollins Publishers)-গল্পের ভাব অনুসরণে লেখা।