তন্ময়বিশ্বাসের আরো গল্প- উৎসর্গপত্র, রূপকথার ভাঁজে, পর্দার আড়ালে, ক্যারন, আনক্যানি ভ্যালি , রাজকন্যা

কাশবনে কাঠবিড়ালি আসার কথা নয়। কিন্তু এটা কীভাবে যেন ঢুকে পড়েছে। ওরা বোধ হয় লেজ না নাড়িয়ে ডাকতে পারে না। বাবিদিদি একবার একটাকে পুষেছিল। এইটুকুনি সাইজ। বাবিদিদির আঙুল জড়িয়ে ফিডিং বোতল থেকে দুধ খেত। ওটারই লেজ ধরে টিউবওয়েলের মতো ওপর-নীচ করে দেখেছিলাম, একবারও ডাকেনি। বেচারা ছোটো থেকে বাবিদিদির বাংলা কথা শুনে শুনে নিজের ভাষাটাই বোধ হয় ভুলে গেছিল।
এইখানা অবশ্য বেশ ডাকাডাকি করছে। একবার শ্রেয়াদির স্কুটির চাবিটা নেড়েচেড়ে দেখে আবার পালিয়ে গেল।
তোমরা তো আর লেখা পড়ে সবটা দেখতে পাচ্ছ না। তাই আগে একটু বলে নিই, হ্যাঁ? উঁচু থেকে আমরা যখন নামছিলাম, তখন গোটা কাশবনটা দেখাচ্ছিল একদম নদীর মতো। এত্ত ঘন! হাওয়া দিলে ইয়াবড়ো সব ঢেউ খেলে। কিন্তু একবার ভেতরে ঢুকে পড়লে সবকিছু একদম অন্যরকম। তখন তোমার চারদিকে কী সুন্দর দোল খাবে কাশফুলগুলো। ওদের বোঁটায় আবার খুব ধার।
আমরা এসেছি আসলে অনেকজন। আমি, শ্রেয়াদি, বল্টু, অন্তু আর পনির। সবাই আমাদের ক্লাসেই পড়ে। শেষ নামটা শুনে কি হাসলে? আসলে হয়েছে কী, ও সারাক্ষণ খালি খালি নিরামিষ খায়। কেক, বিস্কুটের প্যাকেট পেলেই দেখে গায়ে সবুজ ফুটকি আছে কি না। বাদামি ফুটকি হলেই সেটা নাকি আর নিরামিষ থাকে না। বেশি বেশি একেবারে!
এটা নিয়ে অবশ্য পনিরকে কিছু বলি না আর। আসলে ওর তো অনেক দুঃখ। স্কুলে ওকে সবাই লেডিস বলে খুব খেপায়। ও একটু দুলে দুলে হাঁটে। কথার ধরনও অন্যরকম। অন্তু নাকি ওকে একবার আয়নার সামনে লুকিয়ে লুকিয়ে লিপস্টিক লাগাতেও দেখেছিল। অন্তুটা অবশ্য মহা গুলবাজ।
একবার বলেছিল, ওর সেজো জেঠুর চিলডাঙার ভূতুড়ে বাড়িটার দোতলায় পরিরা নাকি মেস করে থাকে। তারা আবার হবিটদের থেকেও ছোটো। ঠাকুমার গোপালের মতো পুঁচকে সব বিছানায় ঘুমায়। আর রাত হলেই চাঁদকে ঘিরে শ্যামাপোকার মতো ওড়াউড়ি করে। রোজ উড়তে উড়তে নাকি তাদের তুলো তুলো ডানাগুলো আলগা হয়ে যায়। তবু চাঁদ না ডোবা অবধি পরিদের বাসায় ফেরার নিয়ম নেই। তাই তারা ওই ডানা নিয়েই উড়ে চলে। নিজেরা গান বানাতে পারে না বলে মাঝিদের গান গায়। তারপর একসময় সেই ডানা পিঠ থেকে একটু একটু করে খসে পড়ে। তখন তাদের সে কী যন্ত্রণা! ডানার সঙ্গে সঙ্গে রক্তও উঠে আসে। ক’দিন আর তাদের বেরোনো হয় না। চাঁদের দিকে তাকিয়ে শুধুই কাঁদে। তারপর পুরো ডানা ঝরে গেলে প্রতিমাসেই নাকি আবার নতুন করে ডানা গজায়। তখন আবার…
আমি যে গোটাটা বিশ্বাস করেছি এমন নয়। তবে অন্তু একদিন ওদের জেঠুদের বাড়ির পিছনে সত্যি-সত্যিই পরিদের ডানা দেখিয়েছিল। ডানাগুলো যে লাল হয়ে ছিল, এটাও সত্যি।
শ্রেয়াদিকে বলতে তার সে কী হাসি। তারপর আমি রাগ করছি দেখে আমার নাকটা টিপে দিয়ে বলেছিল, “পৃথিবীর সব পরিরই মাসে একবার করে ডানা কাটা যায় রে। কিন্তু তাতে চাঁদের দিকে তাকিয়ে আর কাঁদতে হয় না। মনে মনে কাঁদলেই চলে।”
পনিরের কথা বলাতে অবশ্য খুব রেগে গেছিল শ্রেয়াদি। চোখ পাকিয়ে, কোমরে হাত রেখে বলেছিল, “ইলিশ! তুইও কি ওকে লেডিস বলে খেপিয়েছিস? সত্যি করে বল।”
শ্রেয়াদি ভালো তো ভালো, কিন্তু রেগে গেলে এমন চোখ বড়ো বড়ো করে তাকায়, যে মনে হয় আর কোনোদিন ওখান থেকে নড়তে চড়তে পারব না। তবে ভয় পেলে তো আর চলবে না আমার। এখন লিখতে শিখছি। ওপরের মাড়ির দাঁত দুটো আবার করে গজাচ্ছে মানে কিছুটা লেখক হয়েও গেছি নিশ্চয়। দু-দিন পর যে কলমের জোরে হিল্লি-দিল্লি করবে, তার কি এরকম করে ভয় পেলে চলে!
আমিও বেশ বুক চিতিয়ে, মিনমিন করে বললাম (কিছুতেই গলা উঠল না যে), “কয়েকবার বলেছি— এই দু-তিনবার হবে।”
তারপরও দিদি ওরকম কটমট করে তাকিয়ে আছে দেখে বাকিটাও হড়বড়িয়ে বলে ফেললাম, “বা রে, মেয়েদের মতো স্বভাব হলে লেডিস বলব না! ছেলেরা ওরকমভাবে হাঁটে কখনও?”
“কেন, হাঁটলে কী হয়?” তখন শ্রেয়াদির সে কী গমগমে গলা! যেন মেঘের ভেতর থেকে কথা বলছে।
আমি তো শুনেই বেশ খানিকক্ষণ বুড়ো আঙুলের নখটা দেখলাম। বাগানে যে শুঁয়োপোকাটা কুড়িয়ে এনে জারের ভেতর পাতার বিছানা বানিয়ে রেখেছিলাম, তার ঢাকনায় আলপিন দিয়ে আরও ক’টা ফুটো করে দিলাম। কিন্তু ঠাকুমা ঠিকই বলে, শ্রেয়াদিটা আসলে খুব কুঁড়ে। তখন থেকে আমার দিকেই স্থির হয়ে তাকিয়ে আছে। কতক্ষণ আর না তাকিয়ে থাকা যায়? সে কী বড়ো বড়ো চোখ! সোঁ সোঁ করে শব্দ হচ্ছিল নিশ্বাস ফেলার। আর আমার চোখে চোখ পড়তে নিজেই নিজের ঠোঁটটা এমনভাবে দাঁত দিয়ে চেপে ধরল, যে মনে হল আমার হাড়গোড়ই বুঝি মনের মধ্যে চিবিয়ে চিবিয়ে খাচ্ছে।
তারপর একসময় আমাকে চিবানো শেষ হলে খুব ঠান্ডা গলায় বলল, “ইলিশ, তুই বাড়িতে কাকে সবথেকে বেশি ভালোবাসিস?”
এই প্রশ্নটা অবশ্য বড়োরা প্রায়ই করে। অন্য সময় হলে আমার গুলিয়ে যায়। কিন্তু কাল রাতেই বাবা আর ভুলির সাথে ক্যারম খেলা নিয়ে প্রচণ্ড ঝগড়া হয়েছিল বলে আমি কিছুই না ভেবে বলে দিলাম, “কেন, মা কে!”
শুনে শ্রেয়াদি দাঁত বের করে ভয়ানক টাইপের একটা হাসি হাসল। তারপর আমার দিক থেকে চোখ সরিয়ে শুঁয়োপোকার জারটার গায়ে নাক ঠেকিয়ে নিজের মনেই যেন বলল, “বড়ো হয়ে তুই যদি খানিকটা তোর মায়ের মতোই হোস, তাহলে কি তোর খুব লজ্জা লাগবে?”
ভেজা হাতে ফ্যানের সুইচ দিতে গেলে যেমন শক লাগে, তেমনি করেই যেন একটা ধাক্কা লাগল মনে। মায়ের মুখটা হঠাৎ করে ভেসে উঠে ঘরদোর, শ্রেয়াদি, সিলিং ফ্যান সবকিছু ঢেকে ফেলল। আর তখন তো আমি ঠিক আস্ত ছিলাম না। অনেক হাড়গোড়ই খোয়া গেছিল। তাই সে-সব গজিয়ে ওঠার আগেই ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেললাম।
লেখকদের কাঁদবার নিয়ম আছে কি না কে জানে। কিন্তু আমি যেন স্পষ্ট দেখলাম আমাকে কাঁদতে দেখে দেওয়ালের হুমদো মুখো টিকটিকিটা টিকিস টিকিস করে হাসছে। যে নীল রঙের চকচকে মাছিটার জন্য ও এতক্ষণ ওঁত পেতে ছিল, সেও হাসতে হাসতে উড়ে গেল। এমনকি অকৃতজ্ঞ শুঁয়োপোকাটা যাকে আমি না বাঁচালে পিঁপড়েই খেয়ে ফেলত, সেও নিজের গুটির মধ্যে কয়েকবার নড়ে উঠল যেন।
অবশ্য শ্রেয়াদিও হাসছিল। কিন্তু সেটা মোটেই ওদের মতো বিচ্ছিরি না। এগিয়ে এসে কাঁধে হাত রেখে বলল, “তুই কি জানিস, লোকে বলে পুরুষ মানুষদের কাঁদতে নেই!”
আমি তো শুনেই তাড়াতাড়ি চোখ মুছতে গেছি। অমনি আমাকে জড়িয়ে নিয়ে নিজের ওড়নাটাকে একটু গুটলি পাকিয়ে কত যত্ন করেই না সবটা জল মুছিয়ে দিল। দিদির গায়ে তখন জুঁই ফুলের গন্ধ। তার খানিকটা আমার গায়েও চলে এল। সব ছেলেকে বলছি, ভুলেও কোনোদিন কাঁদতে ভুলে যেও না। কী সুন্দর গাল, চোখ সব ঠান্ডা হয়ে যায়। ঘুমোনোর আগে কাঁদতে পারলে আরামের ঘুম হয়। আর তোমাকে যারা ভালোবাসে তাদের সামনে কেঁদে ফেললে অনেকটা আদর বেশি পাওয়া যায়।
“এবার বুঝলি তো কেন বকছিলাম?”
“কিন্তু পনির তো কথাও বলে কেমন…”
“মায়ের মতো করে?”
আমি আবার বুড়ো আঙুলের নখটার দিকে মন দিতে যাচ্ছিলাম। কিন্তু তার আগেই শ্রেয়াদি আমার দুই গালে দুটো হাত রেখে আমার মুখটাকে ঘুরিয়ে নিজের মুখের দিকে ফেরাল।— “এই তো তুই ছেলে আর আমি মেয়ে। বল দেখি আমাদের মধ্যে কী আলাদা?”
“তোমাকে পরিদের মতো দেখতে। আমাকে কেমন যেন একটা…”
“তোকেও খুব খুব সুন্দর দেখতে। কেউ চোখ, নাক, মুখ বা গায়ের রঙে সুন্দর হয়ে পরি হয় না। মনের দিক থেকে সুন্দর হতে হয়। এই যেমন শুঁয়োপোকাটার কাছে তুই-ই ওর গার্ডিয়ান অ্যাঞ্জেল। তুই-ই পরি।”
“ছেলেরাও পরি হয়?”
“কেন, ছেলেরা ভালো কাজ করে না? ভালো কাজ, মন্দ কাজ— কোনোকিছুরই ছেলে-মেয়ে হয় না। বুঝলি?”
তারপর আমার চুলগুলো ডানদিক থেকে বাঁদিকে ঘেঁটে দিয়ে বলল, “তবে তুই হলি গিয়ে আমাদের লক্ষ্মী পরি। কিন্তু তোর ক্লাসের বাকি বাঁদরগুলোকে বোঝাতে না পারলে বেচারা পনিরের জীবনটা ওরা অতিষ্ঠ করে তুলবে।”
আমারও তক্ষুনি পনিরের জন্য খুব মনখারাপ হল। আবার কাঁদব কি না ভাবছি, কিন্তু তার আগেই শ্রেয়াদির ফোনটা বেজে উঠল। একদম আমার সামনেই ছিল তো, তাই দেখতে পেয়েছি। পল্লবীদি। সেই দেখে শ্রেয়াদির মুখের হাসিটা যদি দেখতে। বাবা অনেকদিন পর অফিস ট্যুর থেকে বাড়িতে ফিরলে মা এরকম করে হাসে। পল্লবীদি ফোন করলেই শ্রেয়াদি আমাকে ঘর থেকে তাড়িয়ে দেয়। আমি নিজে-নিজেই বেরিয়ে আসছিলাম, শ্রেয়াদিই বরং ওদের দরকারি কথা পজ রেখে পিছন থেকে বলল, “এই ইলিশ, কাল বল্টু আর অন্তুকে আমার কাছে আনবি তো একবার। ওদের স্ক্রুগুলোও একটু নেড়েচেড়ে দেখতে হবে। কীভাবে রাজি করাবি সেটা তোর ব্যাপার। দোষ যখন করেছিস, সেটা শুধরানোর কর্তব্যও তোর।” বলেই দড়াম করে দরজাটা বন্ধ করে দিল।
কী আর বলি। কর্তব্যের পথ কি আর অত সোজা! পরদিন বোকার হদ্দ ভুলিটা আমার একটা রাবার অর্ধেক চিবিয়ে খেয়েছিল বলে তার সে কী পেটখারাপ। তোমরা পড়ে বলবে এতে ইলিশের কী দোষ! কিন্তু আমাদের বাড়িতে তো আর ন্যায়বিচার বলে কিছু নেই। আমিই যেহেতু অন্যমনস্কভাবে রাবারখানা বাইরে ফেলে রেখেছিলাম, তাই সারা সকাল আমাকেই বার বার ভুলিকে পরিষ্কার করতে হল। সে-সব বেশি বর্ণনা দিলে তোমরা বমি করে ফেলবে। আমিও করতাম, কিন্তু মা সারাক্ষণ ক্যামেরা হাতে ভিডিও করছিল বলে কোনোমতে সবকিছু গিলে নিলাম।
তবে কাজটা বোধ হয় ভালোই করেছি। নইলে কি আর মা নিজে থেকে টিফিনে লুচি-ছোলার ডাল বানিয়ে দেয়!
ক্লাসের ভেতর কতবার যে ব্যাগের ভেতর মুখ ঢুকিয়ে তার গন্ধ শুঁকলাম। ইচ্ছে করেই আজ আর বল্টুদের কাছে বসলাম না। ওদের গায়ে যা জোর, চাইলে তো আর না বলতে পারব না।
তাই টিফিনের ঘণ্টা পড়তেই ফুড়ুৎ করে বেরিয়ে গিয়ে একটা ছোটোদের ক্লাস-রুমে লাস্ট বেঞ্চের ডেস্কের নীচে কৌটোটা লুকিয়ে রেখে লুচিগুলো একটু একটু করে ছিঁড়ে ছোলার ডালে ডুবিয়ে ডুবিয়ে যখন খাচ্ছি, তখন দেখি ওদের ক্লাসে পেন ফাইটিংয়ের টুর্নামেন্ট হচ্ছে। আমি বড়ো ক্লাসের ছেলে বলে আমাকে আর নাম লেখাতে হল না। দুটো ম্যাচে জিতেও গেলাম। কিন্তু অভিজ্ঞতার তো একটা দাম আছে। বাইরের বারান্দা দিয়ে ছেলেরা দুড়দাড় করে দৌড়ে পালাচ্ছে দেখে টিফিন কৌটোটা চটপট গুছিয়ে নিয়ে পেনটাকে মোজার মধ্যে লুকিয়ে সেই ক্লাস থেকে সরে পড়লাম। ততক্ষণে অবশ্য সিঁড়ির দিক থেকে বেতের শব্দ পরিষ্কার শোনা যাচ্ছে। আমাদের স্কুলে পেন ফাইটিং নিষিদ্ধ কিনা।
আমি টিফিন বাটির ভেতরটা আরও একবার ভালো করে চেটে নিয়ে চুপিচুপি তিনতলায় উঠে এলাম। কোথাও কেউ নেই। খা খা বারান্দা। এদিককার ছাদগুলো জলে ভিজে নষ্ট হয়ে গেছে কিনা। সেই জন্য সবার ওপরে ওঠা বারণ। তাই আমাদের জরুরি কাজকর্ম সব এখানেই করি।
আমার পায়ের শব্দ পেয়ে আমাদের স্কুলের একমাত্র বিড়াল, গড়াগড়ি প্রথমে খানিকটা ভয় পেয়ে দৌড়ে নিল। তারপর আমাকে চিনতে পেরে জুতো-মোজায় মাথা ঘষে সে কী আদর। আমি ওকে কোলে নিয়ে সামনের দরজা ভাঙা ঘরটায় ঢুকে দেখি বল্টু আর অন্তু দুজনেই ভয়ানক গম্ভীর মুখ করে একে অন্যের দিকে তাকিয়ে বসে আছে। আমি শ্রেয়াদির কথা বলব কী, তার আগেই অন্তু আমাকে বেজায় ধমক দিয়ে জিজ্ঞেস করল, “অ্যাই ইলিশ, তোকেই খুঁজছিলাম এতক্ষণ। কাজের সময় কোথায় যে যাস। আজ পনির স্কুলে আসেনি কেন জানিস?”
আমি আবার বাড়ির বাইরে মিথ্যে কথা বলতে পারি না। সত্যিটাই বললাম, “কাল তোরা ওর গোলাপি ব্যাগটা নিয়ে খুব হাসাহাসি করেছিস। খুব কাঁদছিল। সেই জন্যই তো…”
“অ্যাই চুপ কর তো তুই! ভারী একেবারে কান্না। তোকে বলেছি না পরিরা ডানা খসে গেলে সারা দিনরাত ধরে খালি কাঁদে?”
“মানে?” আমি তো আমি, এমন অদ্ভুত কথা শুনে কোলের ওপর গড়াগড়ির অবধি সমস্ত লোম খাড়া হয়ে উঠেছে।
“মানে কিছুই না। ও ছেলে সেজে আমাদের স্কুলে পড়ে। ভেতরে ভেতরে আসলে পরি। এখন ডানা হারিয়ে বেকায়দায় পড়েছে।”
“ছেলেরা পরি হতে পারে না নাকি? মন ভালো হলেই পরি হওয়া যায়।”
“তুই থামবি কি না! নোনাজল থেকে মিষ্টি জলে এসে আবার বড়ো বড়ো কথা। আজ মনোহরপুকুরে ওদের বাড়ির পিছনে একগাদা রক্তমাখা পালক দেখেছি তা জানিস? মেয়ে না হলে কেউ এমন বোকামি করে নাকি!”
গড়াগড়ি বোধ হয় এবার বিরক্ত হয়েই আমার কোল থেকে নেমে কোথায় যেন চলে গেল। ও আসলে মেনি বিড়াল কিনা। কিন্তু বুদ্ধি থাকলেই বুঝতে পারত, অন্তু যা বলছে সবই আসলে গুল। মিথ্যে কথা বলে বলেই ওর নাকটা এখন খানিকটা বড়ো হয়ে গেছে। আমি পনিরের থেকে দু-আঙুল লম্বা বলে বরাবর ওর পিছনে বেঞ্চে বসি। জামার মধ্যে ডানা লুকানো থাকলে এতদিনে কি আর বুঝতে পারতাম না? একবার ভাবলাম বড়ো হয়ে মায়ের মতো হবার কথাটা অন্তুকে বলি। কিন্তু ওর মা অনেক দূরে তারাদের দেশে থাকে কিনা। মাকে না দেখলে আর মায়ের মতো হবে কী করে!
কিন্তু বল্টুটাও সেরকম। ওর সবকিছুতেই কথা বলা চাই। বলে কিনা, গেলে আজকেই পরি দেখতে যাব। নইলে ডানা গজিয়ে গেলে নাকি আর ধরা যায় না। পরিদের নিয়ে ওরা এত পড়াশুনো কবে করল কে জানে! এদিকে এখনও ১৩-র নামতাটা গোটাটা বলতে পারে না। এবার ওরা গেলে তো পুরো বিকেলটা আমি একা পড়ে যাব, তাই তেতো মুখ করেই রাজি হয়ে গেলাম আর কী।
তবে পনিরের বাড়িটা সত্যি খুব বাজে জায়গায়। মনোহর কথাটার মানে নাকি যে মন হারিয়ে গেছে। আমি জানি না। সবজান্তা বল্টুটা কোথায় যেন পড়েছে। তবে এখানে এলে মনে হয়, এখানকার মানুষের মন বোধ হয় সত্যি-সত্যিই চুরি গেছে। নইলে পুকুরের মধ্যে এমনি করে কেউ ময়লা ফেলে! আমরা যখন গিয়ে পৌঁছলাম তখন গুপীদের লাল-সাদা প্রিন্টের ইয়াবড়ো গোরুটা চোখ-টোখ বুজে খুব আরাম করে একটা কালো রঙের প্লাস্টিক চিবিয়ে চিবিয়ে খাচ্ছিল। যতই টানি কিছুতেই আর ছাড়ে না। শেষে অন্তু গলার কাছটায় কাতুকুতু দিতেই সব ছেড়েছুড়ে মহা বিরক্ত হয়ে অন্যদিকে চলে গেল। আসলে গোরু তো, মানুষের উপকার বোঝে না।
তবে পালকগুলো এত সহজে পেলাম না। যা ময়লা চারদিকে! অনেক খোঁজার পর শেষমেশ একটা নয়নতারা ঝোপের তলায় প্রায় সবক’টা পালককেই পড়ে থাকতে দেখা গেল। তার কয়েকটায় যে রক্তের দাগ লেগে আছে সে-কথাও সত্যি। অন্তু তো সবার আগে গিয়ে তার সামনের ঘাসের ওপর ঝপাং করে বসে পড়েছে।
আমার অবশ্য কাছে গিয়েই গা-টা রাগে রিরি করে উঠল। গন্ধটা পেলে তোমাদেরও ক’জনের মাথা ঠান্ডা থাকত কে জানে। অন্তুটার নিশ্চয় নাকে সর্দি জমে আছে। আমি আর বল্টু কাছে গিয়েই যে-যার নাক কুঁচকে ফেললাম। বাতাসে স্পষ্ট হাঁস হাঁস গন্ধ। ওই গুপীদেরই একগাদা হাঁস আছে বাড়িতে। গোরুটা ভালোমানুষ মতো হলে কী হবে, হাঁসগুলো বেজায় বজ্জাত। গুপীদের বাড়িতে তো আর সরস্বতী পুজো হয় না, তাই হাঁসগুলোকে শাসন করবার কেউ নেই। সাহেব হাঁসগুলো কালো হাঁসগুলোর সঙ্গে সারাদিন মারামারি করে। একজন ডানদিক দিয়ে পুকুরে নামলে অন্য দল বাঁদিকের গোটা জলটা ঘোলা করে রাখবে। আর ডাকেও বড়ো বিচ্ছিরি। লড়াইয়ের কথা তো আগেই বললাম। এইসব যে তারই চিহ্ন এটা আমি কেন, রাবার খেয়ে বিছানা ময়লা করা ভুলিও বলে দেবে। ভুলির কথা ভেবে আমার আবার বমি পেতে লাগল। কিন্তু তাহলে তো আর রাগ দেখানো যাবে না। তাই একটুখানি নীচু হয়ে একটা পালক তুলে ছুড়ে মারলাম অন্তুর মুখে।
তবে ও হল গিয়ে প্রাইজ পাওয়া গুলবাজ। প্রথমে পালকের ঘায়ে একটু ঘাবড়ে গেছিল বটে। কিন্তু তারপর একটু সামলে নিতেই কত যে আজগুবি সব কথা বলে চলল! অবশ্য এবার দেখলাম বল্টুটাও আমার দলে এসে জুটেছে। ও তো মুখের ওপর বলেই দিল, “মাইরি অন্তু, তুই হেব্বি ঢপবাজ হয়েছিস। পনিরটা লেডিস টাইপ হলেও তোর চেয়ে অনেক ভালো।”
শেষ কথাটা শুনে অবশ্য আমারও বেশ রাগ হল। তেড়েমেরে উঠেই আসছিলাম, কিন্তু তখনই সেই হাড়হিম করা ঘটনাটা ঘটে গেল। মানে তখন ঘটার আগের মুহূর্তে সবকিছু থেমে আছে আর কী।
যে নয়নতারার ঝোপটার কথা বললাম, তার চেয়ে কুড়ি ফুটমতো দূরে সে কী বিশাল বড়ো একটা কুকুর! অন্তুর কথা শুনেই কি না কে জানে খুব রেগে গেছে আমাদের ওপর। মুখে গরগরে একটা শব্দ করে এক পা এক পা করে এগিয়ে আসছে আমাদের দিকে। সারা গা বুলেট গাড়ির মতো থরথর করে কাঁপছে। কিন্তু ও এগোলে কী হবে, আমরা তো কেউ নড়তেই পারছি না।
ফেলুদার বইয়ের আঁকাগুলো দেখেছ তো? একদম ওরকম আঁকা দৃশ্য। মন দিয়ে শোনো, তাহলেই দেখতে পাবে। আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম একটু কুঁজো হয়ে। বল্টু কুকুরটাকে দেখতে পাওয়ার আগে এক পা সবে ফেলেছিল এগোবে বলে। আর অন্তু তো তখনও ওঠেইনি। তাই ওর স্ট্যাচু সেজে থাকতে সবথেকে সুবিধা হচ্ছিল। কিন্তু আমরা দুজন তো ওভাবেই স্থির। আর সামনে সেই যমদূত।
আর একটু হলেই বোধ হয় আমাদের মধ্যে কেউ একটা ধাঁই করে অজ্ঞান হয়ে পড়ত। কিন্তু তার আগেই পুরো ব্যাপারটা কেমন যেন উলটে গেল। সবে রাস্তার কয়েকটা ঢিলের দিকে তাকাচ্ছি, কুকুরটাও খানিক নীচু হয়েছে, বোধ হয় ঝাঁপ-টাপ দেবে, তখনই ওর ঠিক পিছনের গেটটা খুলে পনির বেরিয়ে এল। বিকেলের রোদ্দুরটা একদম সোজাসুজি গিয়ে পড়ল ওর মুখে। ওর গাল লাল। আর, শ্রেয়াদি যতই বকুক, মিথ্যে তো আর লিখতে পারি না, পনিরের ঠোঁটে সত্যি-সত্যিই লাল লিপস্টিক! রোদ পড়ে চকচক করছে একবারে।
আর ও দাঁড়িয়েছেও একটু বাঁকাভাবে। কিন্তু দেখতে একটুও খারাপ লাগছে না। আমাদের ঠাকুরের সিংহাসনের লক্ষ্মীঠাকুরও সিঁদুর কৌটো কোলে নিয়ে এভাবেই যেন দাঁড়ায়।
ও আমাদের দেখল কি না কে জানে, নিজের মনেই একটু নীচু হয়ে, গলায় চুকচুক করে আওয়াজ তুলে কুকুরটাকে ডাকতে লাগল। সে তখন মহা বিরক্ত। এতগুলো শিকার হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে কিনা। প্রথমে ঘাড় ঘুরিয়ে একবার দেখল, তারপর সাঁই করে ধুলো উড়িয়ে পুরোপুরি ঘুরে গেল পনিরের দিকে।
ও কিন্তু একটুও নড়ল না। গলা দিয়ে তখনও চুকচুক করে আওয়াজ বেরোচ্ছে। কুকুরটা ওকে যেন একটু মেপে নিল। তারপর এক পা এক পা করে এগোতে লাগল পনিরের দিকে। ব্যাপারটা নিশ্চয় খুব তাড়াতাড়ি হচ্ছিল, কিন্তু আমি দেখছিলাম স্লো মোশনে। বাবা-মাকে বললে তো বিশ্বাস করে না, তোমরা মনে হয় করবে, তাই বলছি। আমি যেন স্পষ্ট দেখলাম, কুকুরটা ইয়াবড়ো হতে হতে যেন মোষের মতো হয়ে গেছে। গায়ে যেন লোমই নেই আর, এখানে ওখানে মাসল কিলবিল করছে শুধু। আর পনিরের তো আমার মতোই স্কুলবয় ছাঁটের চুল। তখন কীভাবে যে অত বড়ো দেখলাম! হাওয়ায় ঢেউ খেলে উড়ছে চারদিকে। পিঠের পিছনেও কী যেন দু-বার নড়ে উঠল। এরপরে যেটা শুনলাম, সেটা অন্তুরাও শুনেছে বলল। প্রায় তিন-চারটে বাড়িতে একসঙ্গে শঙ্খ বেজে উঠল।
আর কুকুরটা সেই আওয়াজেই কি না কে জানে, হাতটা একবার শুঁকে নিয়েই মহা আহ্লাদে পনিরের গায়ে গা ঘষতে লাগল। তখন তার লাফালাফি যদি দেখতে। কে বলবে একটু আগে এর পিঠে এসেই যমদূত বসেছিল! লেজ নাড়তে নাড়তে এমন ঠেলা দিল যে, পনির ধপ করে বসেই পড়ল ঘাসের ওপর। তখন পনিরের কোলের ওপর দুই থাবা তুলে মহা আনন্দে পনিরকে হামি খেতে লাগল।
বললে তো মানবে না, কিন্তু আমার সাহস বাকিদের থেকে বেশি। এক আঙুল হলেও বেশি। তাই আমিই প্রথম এগিয়ে গেলাম। পিছন পিছন অন্তু আর বল্টু। তখন অবশ্য পনিরের চেহারা একদম স্বাভাবিক। এরকম অনেক কিছু আমি মাঝে মাঝে দেখি, অন্যরা যে কেন দেখতে পায় না কে জানে।
তবে পনিরের দেখলাম বেশ বুদ্ধিও আছে। আমরা জিজ্ঞেস করার আগেই কেমন ঝট করে বলে দিল, “আরে ও নতুন বাচ্চা দিয়েছে এখন। তোদের আশেপাশে ঘুরঘুর করতে দেখে ভেবেছে বাচ্চা চুরি করতে এসেছিস।”
“কিন্তু তোকে কিছু করল না যে?”
“ধ্যাত! আমাকে কেন করবে? ও তো এই পুকুরপাড়েই বড়ো হয়েছে। খালি খালি নালিতে পড়ে যেত। তখন আমি এসে তুলে বালির ওপরে ছেড়ে দিতাম। ও বালিতে স্নান করে কত খেলত আমার সঙ্গে। তাই ওর নাম দিয়েছিলাম বালুচরি।”
নিজের নাম শুনে বালুচরি পনিরের আঙুলগুলো মুখে পুরে আলতো করে কামড়াতে লাগল। পনির ওর মাথার লোমগুলো ঘেঁটে দিয়ে বলল, “এখন দেখ, দামড়া হয়ে নিজেও কেমন বাচ্চা দিয়েছে। কাজ বাড়ল। এখন ওদেরও নালি থেকে তুলতে হবে।”
দুজনের গায়েই এখন কেমন সুন্দর রোদ এসে পড়েছে। কুকুরটা কোলে নিয়ে পনির যেন সত্যি-সত্যিই একজন পরি মানুষ। আকাশ থেকে নেমে না এলে কাউকে কি এত সুন্দর দেখায়!
কিন্তু অন্তু হাঁসের পালক আর পরিদের পালকই আলাদা করতে পারে না। সে আর এসবের কী বুঝবে? বদমাশটা ওমনি ফ্যাকফ্যাক করে হাসতে হাসতে বলল, “কুকুরের নামও কিনা শাড়ির নামে। লেডিস আর কাকে বলে!”
বালুচরি তো অতটা ইংরেজি বোঝে না। তাই এটা শোনার পরও চুপচাপ আদর খাচ্ছিল। কিন্তু কেউ কিছু বোঝার আগেই পনির ঘ্যাঁক করে কামড়ে দিল অন্তুর হাতে।
“কী রে অন্তু, লেডিসের কামড় খেয়ে কেমন লাগছে?”
কাশবনের মাঝখানে বসে শ্রেয়াদি মুচকি মুচকি হাসছে, আর অন্তুর হাতে ডেটল লাগিয়ে দিচ্ছে তুলোতে করে। ফার্স্ট-এইড কিট শ্রেয়াদির স্কুটিতে সবসময়ই থাকে। আমি আর অন্তু ওই স্কুটিতে করেই এসেছি। আর বল্টু এসেছে পনিরের সাইকেলের পিছনে বসে।
এখান থেকে গল্পটা লেখা শুরু করেছিলাম। তারপর ফ্ল্যাশব্যাক দিতে দিতে কোথায় যে চলে গেছিলাম! যাক গে, শ্রেয়াদি আজ না এলে ধুন্ধুমার লেগে যেত। ওদিক দিয়ে কোথায় যাচ্ছিল কে জানে। আমাদের প্রায় কান ধরেই নিয়ে এসেছে এখানে। পনির শুধু একবার গম্ভীর মুখে বলেছিল, “আমার জ্বর এলে ঠোঁট আর গাল লাল হয়ে যায়।” তারপরে একদম চুপ।
অন্তুটাই বরং কামড় খেয়ে একটু মিউমিউ করছে।
শ্রেয়াদি যখন ওকে বলল, “দেখ অন্তু, তোকে আমি বকব না। তোরা হয়তো উঁচু ক্লাসের দাদাদের থেকে এগুলো শিখেছিস। কিন্তু তোর তো নিজের বুদ্ধি আছে। ইতিহাসে সত্তর পাস। বলার সময় ভাববি না?” অন্তু তখন নদীর বালি দেখছে।
“আচ্ছা তুই বল।” অন্তুর থুতনি ধরে ওর মুখটাকে নিজের দিকে ঘোরাল শ্রেয়াদি— “তোর বাপি-মাম্মাম দুজনেই অফিস করে। কিন্তু মাম্মাম চিকেন ডাকবাংলো রান্না করলে আমাদের বাড়ি অবধি গন্ধ আসে। আর তোর বাপি মানে ভিগুকাকা পিকনিকে চা করতে গিয়ে গরম জলের শরবত বানিয়েছিল। তার জন্য কি তোর মাম্মাম বাপিকে বুলি করে?”
অন্তু মাথা নাড়ল।
“আবার দেখ, ইলিশের পিসিমা বুলাদি একেবারেই রান্না করতে পারে না। কিন্তু বক্সিংয়ে মেডেল এনেছে। তাকে কী বলবি তাহলে?”
অন্তু তো তাও সামনে বসে শুনছে, আমি একটু দূরে বসে আছি, তাতেই আমার চোখ ছলছল করে উঠল। ভুলিও তো মেয়ে হয়ে আমার গাড়িগুলো নিয়ে খেলে। ওকে যদি এরকম কেউ বলে…
অন্তুটা সত্যিই খুব বদমাশ। ফোঁত ফোঁত করে আবার কাঁদছে এখন। শ্রেয়াদি ব্রাউন বেল্ট হলে কী হবে, আসলে তো খুব নরম মন।
“শোন অন্তু, কান্না পেলে এই যে কাঁদছিস, বড়ো হলে শুনবি অনেকে এটা নিয়েও তোকে খোঁটা দিয়ে বলছে, ব্যাটাচ্ছেলে হয়ে আবার কেউ কাঁদে নাকি?”
অন্তু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে বলে, “কাঁদে না?”
“আলবাত কাঁদে। যারা এসব বলে তারা বোকা। মাথায় গোবরওয়ালা বোকা। হাসি, কান্না, কাজকর্ম কোনোকিছুরই কোনও জেন্ডার হয় না। যার যেটাতে মন ভালো থাকে সে সেটাই করতে পারে।”
“সরি, দিদি। আসলে আমি ভেবেছিলাম ও সত্যি সত্যি লিপস্টিক মেখেছে।”
“মাখলেই-বা! এত বিটিএস-এর গান শুনিস, ওখানে তো সব ছেলেই লিপস্টিক পরে। তা বলে কি ওরা মেয়ে হয়ে যাচ্ছে? তাই জানবি মেয়েদের মতো বা ছেলেদের মতো বলে আসলে কিছু হয় না। পৃথিবীতে প্রত্যেকে তাদের মতো। ইলিশ ইলিশের মতো, তুই তোর মতো, পনিরও ঠিক পনিরের মতো। আবার কোনোদিন যদি পনিরের মনে হয় ওর আর আগের মতো থাকতে ইচ্ছে করছে না, শ্রেয়াদির মতো হবে, তাহলেও কারও বলবার কিছু নেই। বা বললেও পাত্তা দেওয়ার দরকার নেই। অবশ্য খুব রাগ হলে ঘ্যাঁক করে কামড়ে দেওয়া যায় একবার।”
বলেই ফিক করে হেসে ফেলল শ্রেয়াদি। আমার কেমন যেন মনে হল হাসলে অন্তু, পনির, শ্রেয়াদি সবাইকেই সুন্দর লাগে। তখন মনে হয় সবার পিঠেই যেন দুটো করে ডানা আছে। তাদের সাদা পালকে অবশ্য কোনও রক্তের দাগ নেই।
কথাটা ভেবে নিজেকে বেশ বড়ো বড়ো ভাবছি, তখুনি পনির হঠাৎ কথা বলে উঠল, “শ্রেয়াদি, দেখো এটা নড়ছে।”
আরে সেই শুঁয়োপোকার জারটা! এতদিন ককুনটা একেবারে স্থির ছিল, এখন যেন সত্যি-সত্যিই সেটা একটু নড়ছে। শ্রেয়াদি এগিয়ে এসে জারের মুখ থেকে ঢাকাটা সরিয়ে দিল। ততক্ষণে বাকিরা সবাই ঘিরে ধরে বসে পড়েছি চারদিকে।
প্রজাপতির জীবনচক্রের ছবি কতবার যে এঁকেছি খাতায়, কিন্তু আসলটার মতো কোনোটাই নয়। ককুন কেটে যখন প্রথমে শুঁড় আর বাঁদিকের একটা পা বেরিয়ে এল, তখন আর গায়ে আগের মতো সবুজ রঙ নেই। কুচকুচে কালো। তারপর গোটা ডানাটা ধীরে ধীরে ঢাকনা থেকে বাইরে বের করে মেলে ধরল আকাশের দিকে। সে কী বাঘের মতো ডোরাকাটা রঙ! এতদিন ঘুমিয়ে ছিল তো, তাই প্রথমে একটু ভোম্বল হয়ে পেয়ারা গাছের ডালটার ওপরই বসে রইল। তারপর নদীর দিক থেকে খুব জোরে হাওয়া শুরু হতেই ভেসে উঠল বাতাসে। তখন তার ঘুরে ঘুরে সে কী নাচ! কারোর শেখানো নয় তো, তাই আরও বেশি সুন্দর।
শ্রেয়াদি পনিরের হাতটা নিজের হাতে নিয়ে বলল, “এরকম নিজের মতো, শুধু নিজের আনন্দে আর কারোর কথা না ভেবে উড়তে হবে, বুঝলি? কী রে, পারবি তো?”
এতক্ষণ আমাদের সবাইকে কাঁদিয়ে এই প্রথমবার পনিরও কাঁদল। তাও কেমন যেন বড়োদের মতো। মুখে কোনও শব্দ নেই। দুই চোখের কোণে অনেকক্ষণ ধরে জল জমে উঠে টুপ খসে পড়ল বালির ওপরে। তখন হাওয়াটা যেন আরও বেড়ে গেছে। কাশফুলের সাদা সাদা কুচি ভেসে উঠেছে বাতাসে। আর তার মধ্যেই কেমন সাঁতার কেটে ভেসে যাচ্ছে আমাদের নকশা আঁকা প্রজাপতি।
“আমাকে উড়তে শিখিয়ে দেবে, শ্রেয়াদি? স্ট্র্যাটোস্ফিয়ার অবধি এগিয়ে দিলেই হবে। বাকিটা আমি দেখে নেব।”
গ্রাফিক্স- তন্ময় বিশ্বাস
জয়ঢাকের সমস্ত গল্প ও উপন্যাস
অসাধারণ লাগল। 🥰
দুর্দান্ত গল্প লিখেছে তন্ময়। এরকম আরও গল্প আসুক।