গল্প-তোমার মোহন রূপে- দীপঙ্কর চৌধুরী শরৎ ২০২৫

দীপঙ্কর চৌধুরীর আগের গল্প- ফড়িং সাহেবের বাংলো, কিষ্কিন্ধ্যা

“ঐ যে ঘরের কোণে ঐ উপরের দেওয়ালে দেখছ একটা টিকটিকি! দেখেছ তো? এই রুমের আদি বাসিন্দা সে। তুমি আসবার অনেক আগে থেকেই ও আছে। ও এখন খোলস ছাড়ছে। ওকে বিরক্ত করবে না। কী বুঝলে?”

কিছুই বুঝল না নতুন চাকরিতে জয়েন করতে আসা যুবকটি, বরঞ্চ প্রথম আলাপেই স্বয়ং হেডমাস্টারের কাছ থেকে এহেন উদ্ভট সম্ভাষণে নিতান্তই ঘাবড়ে গেল রোগাসোগা সেই বঙ্গসন্তান। নতুন জয়েনিকে হস্টেলে তার রুম দেখিয়ে দিচ্ছিলেন উনি, উপরন্তু তিনি কথা বলছিলেন পাক্কা উত্তরভারতীয় হিন্দোস্তানীভাষায়, যার সঙ্গে তেমন পরিচয় নেই ভুজঙ্গধরের।

ইনি হলেন  শ্রীমান ভুজঙ্গধর মিত্র। আদতে  বারেন্দ্রী কায়স্থ, যদিও ইদানীং  শহর কলিকাতার কলুটোলা অঞ্চলে পারিবারিক নিবাস তাঁর।   হিন্দু বা প্রেসিডেন্সি কালেজ থেকে সিভিল এঞ্জিনিয়ারিঙে  গ্র্যাজুয়েশন  করে সরকারি সেচ বিভাগে চাকরি পেয়েছে তেইশ বছর বয়সী এই সদ্য যুবক। কলেজের প্রিন্সিপাল সাটক্লিফ সাহেবের রেকমেন্ডেশন ছিল অবশ্য।  ট্রেনিঙের জন্যে ভুজঙ্গধরকে জয়েন করতে বলা হয়েছে এই নতুন কারিগরি ইস্কুলে। জায়গাটার নাম রুড়কি। জেলা সাহারানপুর। বৃটিশ ভারতের যুক্তপ্রদেশের এক্কেবারে পশ্চিমপ্রান্তে অবস্থিত।  এখানেই ভারতীয়দের প্রযুক্তিবিদ্যা ও জরিপের কাজ শেখানোর জন্যে প্রথম এক কলেজ খুলেছে ইংরেজ সরকার। গঙ্গা ও অন্য অন্য নদীতে খাল কেটে কেটে জলপথ বানানো তথা কৃষিতে জলসেচের উন্নতি ঘটানোই লক্ষ, সেইজন্যই আধুনিক এঞ্জিনিয়ারিঙের শিক্ষা চাই। তাই রুড়কিতে এই কলেজ খোলা।

এ ১৮৫৯ সালের কথা।

বৃটিশ তখৎ নাড়িয়ে দেওয়া সিপাহীদের বিদ্রোহ তখন সবেমাত্র মিইয়ে এসেছে। রেলপথ ও টেলিগ্রাফ তখন ভারতবর্ষে সদ্য এসেছে বা আসতে চলেছে। ভুজঙ্গকে তিনবার যান ও নৌকা বদল করে করে পঁচিশ দিনের জল ও স্থলপথে কলিকাতা থেকে রাজমহল-পাটনা-বারাণসী-কানপুর হয়ে আসতে হয়েছে এই রুড়কি গ্রামে। মহাতীর্থ হরিদ্বার এখান থেকে মাত্র বিশ মাইল উজিয়ে; দিল্লি শহর সওয়া-শ মাইল দক্ষিণে ফেলে আসতে হয়েছে।

বারোজন ট্রেনি এঞ্জিনিয়ার জয়েন করেছে এই কোর্সে বা চাকুরিতে, তার মধ্যে ভারতীয় মাত্র দুইজন। কলিকাতার এই ভুজঙ্গধর মিত্তির, ও কাশ্মীরি ছেলে শ্যামলাল দার । অসম্ভব মাথা শ্যামলালের গণিতবিদ্যায়। হেডমাস্টার লক্ষ্মণচন্দ্রের বিশেষ প্রিয়ভাজন তাই হয়ে পড়ল সে, কারণ হেডমাস্টারমশাই নিজে গণিতের একজন ধনুর্ধর পণ্ডিত বটেন, কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতজ্ঞেরা পর্যন্ত তাঁর প্রতিভা মেনে নিয়েছেন। নৈলে মাত্র চল্লিশ বছর বয়সে এক সাহেবী ইস্কুলের হেডমাস্টার হয়ে বসতে পারতেন কি তিনি?

তবে, অলক্ষ্যে সকলে এই হেডমাস্টারমশাইকে ‘পাগলাটে’ বলত। যেমন, ওই সে ভুজঙ্গের রুমের টিকিটিকির অবস্থান ও গতিপ্রকৃতি! উনি পর্যবেক্ষণ করেছেন তা, এবং তার মধ্যে খুঁজে পেয়েছেন গাণিতিক ছন্দ ও জ্যামিতিক প্যাটার্ন। পৃথিবীর সকল কার্যকারণের মধ্যেই গণিত খুঁজে পান হেডমাস্টার লক্ষ্মণচন্দ্র, বলেন, “চরাচরের একমাত্র নিখাদ সত্য হল গণিত… এবসল্যুট ট্রুথ, যা যুগে কালে স্থানে পাত্রে বদলায় না; অক্ষয়-অব্যয়-অনড় থাকে! দুই আর দুয়ে যোগ করলে চার হবে, হবেই। যেখানেই করো। যবেই করো।”

ভুজঙ্গধরের অবিশ্যি অতটা গণিত না শিখলেও চলবে, কারণ সে মূলত প্রযুক্তিবিদ্। গণিত তার কাছে একটি কেজো যন্ত্র বা শস্ত্র মাত্র।

এ জায়গাটার নাম তেহ্‌রী।

হিমালয়ের উপরে ভাগীরথী নদীর তীরে ছোট্ট একটি গ্রাম, দেহরাদুন থেকে মাইল সত্তর দূরে।

প্র্যাকটিক্যাল ট্রেনিং করতে এখানে ছাত্রদের ক্যাম্প পড়েছে জুলাই মাসের গোড়ায়।

ট্রেনিং চলাকালীন কোনো এক সপ্তাহান্তে কুলিদের সর্দার নিবেদন করলে, “হুজুর চলুন, কাল রবিবার আমাদের পারমার মা-কালীর মন্দির দেখিয়ে আনি আপনাদের । অসাধারণ করালী রূপ তাঁর, দেখলে ভয় করে!”

সাহেবদের কাছ থেকে টু পাইস বখশিসের লোভ হয়তো থেকে থাকবে তার।

অধিকাংশ সাহেব-সুবোর কোনো টান নেই নেটিভ দেবীর মূর্তি-ফূর্তি দেখবার, কেবল ওসুলিভান বলে এক আইরিশ ছোকরার খুব টান ছবি আঁকায়, সে চলল নেটিভদের সঙ্গে এই মিনি-ট্রেকিঙে।

পরদিন সকালে ব্রেকফাস্ট সেরে শ্যামলাল দার, ভুজঙ্গধর, ও ওসুলিভান চলল সেই মন্দির দেখতে, সঙ্গে হেডমাস্টার লক্ষ্মণচন্দ্র লাল স্যর-ও, যাঁর টান মন্দিরের জ্যামিতিটাকে জানবার।

পথে যেতে যেতে কুলি সর্দার শোনাতে লাগল কীভাবে তাদের রাজা প্রদ্যুম্ন গোর্খাদের সাথে যুদ্ধে প্রাণ দেন, পরে ইংরেজদের যোগসাজসে….

“এই ইংরেজরা যেখানেই গিয়েছে লোকালদের বিষয়ে নাক গলিয়ে ও তাদের সঙ্গে ঝগড়া করে…” গজ গজ করতে থাকে ওসুলিভান।

“সে কী! তুমি নিজে ইংরেজ হয়েও….” বলেন হেডমাস্টার লক্ষ্মণচন্দ্র।

“ইংরেজ? আমি ইংরেজ? আমি পাক্কা এক আইরিশম্যান!” ফুঁসে উঠল সেই ছোকরা এঞ্জিনিয়ার!

বলতে বলতে হঠাৎ গুড় গুড় করে শব্দ শুনে তাঁরা উপরের দিকে তাকিয়ে দেখেন মস্ত মস্ত পাথরের চাঙড় গড়িয়ে গড়িয়ে নেমে আসছে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে।

বর্ষাকালে নরম মাটিতে এমন ধ্বস ঘটেই থাকে।

চকিতে তাঁরা পাঁচজন পাহাড়ের গা-ঠেসে আশ্রয় নিলেন, যাতে উপর থেকে গড়িয়ে পড়া পাথর সরাসরি গায়ে না এসে পড়ে। কিন্তু পায়ের তলার নরম মাটি ধ্বসে পড়ে গেলেন তাঁরা নীচে কোনো গর্তের ভিতরে।

উপর থেকে আরও পাথর গড়িয়ে এসে তাঁদের বেরোনোর পথ বন্ধ করে দিল! ফাঁক-ফোকর দিয়ে মন্দ মন্দ আলো আসতে লাগল কেবল।

কিছুক্ষণ পরে গুড় গুড় থেমে গেলে তাঁরা বুঝলেন কোনো সাধারণ গর্ত নয়, তাঁরা পড়ে গেছেন এক চতুষ্কোণ প্রকোষ্ঠের মধ্যে। উপর থেকে আসা সামান্য আলোতে যে টুকু দেখা-বোঝা যায়, আরকি!

“তার মানে, আমরা কালীমন্দির থেকে বেশি দূরে নেই। কারণ, মায়ের মন্দির ঘিরে এমন এমন কিছু লুকানো ঘর আছে মাটির তলায়, শুনেছিলাম,” বললে সেই গাইড পারমার।

“অন্ধকূপ!” ফিসফিস্‌ করে বললেন গণিতজ্ঞ হেডমাস্টার লক্ষ্মণচন্দ্র, “এখান থেকে বেরোনোর চাবি আছে…আছে এক গাণিতিক ফর্মূলা! পাণ্ডবরা বারণাবত থেকে কী ভাবে বেরিয়ে পালিয়েছিলেন, জানো না?”

নেহাত পাগল না হলে কেউ এই অবস্থায় অঙ্কের ফর্মূলা আওড়ায়? ভাবল ভুজঙ্গধর। এখন কী ভাবে এর থেকে উদ্ধার পাওয়া যায়?

“অত পিছিয়ে মহাভারতের কালে যেতে হবে কেন? অন্ধকূপ তো একালেও হয়েছিল। কলিকাতা শহরে। বাংলার নবাব সিরাজ শতাধিক ইংরেজ নারীপুরুষ ও শিশুকে এক বদ্ধ প্রকোষ্ঠে আটকে মেরেছিল এক জ্যৈষ্ঠ মাসের গরমের রাত্রে। আজ থেকে একশ” বছর আগে। “বললে কাশ্মীরি যুবক শ্যামলাল দার, “তুমি জানো না ভুজঙ্গধর সে গল্প? তোমার শহরেরই তো ঘটনা।”

“জানব না কেন?  ক্যালকাটার গঙ্গার ধারে এখন যেখানে জি পি ও রয়েছে, তার কাছেই সেই অন্ধকূপ ঘরটা আমি চোখেও দেখে এসেছি গিয়ে, কিন্তু সুদূর কাশ্মীরে বসে তুমি তা জানলে কী করে, শ্যামলাল? তোমার কি ইতিহাসেও উৎসাহ আছে?”

“তা নেই বটে, তবে আমার এক শ্রদ্ধেয় পূর্বপুরুষ সেই যুদ্ধে বাংলার নবাবের সেনাপতি ছিলেন। পলাশীর গল্প তাই আমাদের বংশ পরম্পরায় চলে আসছে আজ একশ” বছর ধরে।” গর্বের সঙ্গে বললে শ্রীমান শ্যামলাল দার, গণিতশাস্ত্রে যার প্রখর মেধা!

“তুমি কি সেনাপতি মোহনলালের কথা বলছ? কিন্তু তিনি কি নীচু জাতের মানুষ ছিলেন না? যাদব…, নাকি নেহাতই চাষাভুষো…” ভুজঙ্গধরের নিরীহ প্রশ্ন।

“এইও! সাবধান!” মাটির তলার সেই প্রায়ান্ধকার প্রকোষ্ঠে বসেও তড়পে উঠল শ্যামলাল দার, “কায়স্থ কুলশ্রেষ্ঠ দেওয়ান-ও-সেনাপতি মোহনলাল, যুদ্ধ শেষে যাঁকে সেঁকোবিষ দিয়ে মারবার চেষ্টা করেছিল শয়তান রায় দুর্লভ…” ইত্যাদি ইত্যাদি।

সেবার বহু ক্লেশে স্থানীয় মানুষজনের সহায়তায় তাঁরা সেই ভুগর্ভস্থ ‘অন্ধকূপ’ থেকে উদ্ধার পেয়েছিলেন গভীর রাত্রে।

“ছোটো ছোটো তেলেঙ্গাদল লাল কুর্তা গায়।
হাঁটু গেড়ে মারে তির মীরমদনের গায়।।
নবাব কান্দে সিপাই কান্দে আর কান্দে হাতি।
কলিকাতায় বসে কান্দে মোহনলালের পুতি।।”

পলাশীর যুদ্ধের পরে আম-বাঙালির অবস্থার ভয়ংকর অবনতি হয়, হতে থাকে। তার কারণ ইংরেজের অপরিমেয় অর্থলোভ! যেকোনো প্রকারেই হোক, তড়িঘড়ি কিছু টাকা কামিয়ে নেওয়াই হয়ে উঠেছিল ইংরেজের লক্ষ্য। কৃষির পাশাপাশি বস্ত্রশিল্প, যা কিনা ছিল বাংলার অর্থব্যবস্থার মেরুদণ্ড-স্বরূপ, তা একেবারেই ধ্বংস হয়ে গেল।

বাঙালী তাঁতি তখন তাঁত চালাতে ভুলে গেছে, চাষীর ক্ষেত শূন্য, ব্রাহ্মণ পায় না পূজার বরাত।

***

উত্তরে রাজমহল থেকে ভাগীরথী বা হুগলী নদী বেয়ে দক্ষিণে নেমে আসতে ডাইনে, অর্থাৎ গঙ্গার পশ্চিম পাড়ে আছে এক ক্যাথলিক চার্চ। ব্যাণ্ডেল চার্চ। পর্তুগিজদের গড়া গির্জা।

এর সওয়া শ বছর আগে, সন ১৬৩২  খ্রিস্টাব্দে মুঘলদের সঙ্গে বিবাদের কারণে বাদশা শাহ্‌ জাহানের  সৈন্যবাহিনী একবার তোপ দেগে গির্জাটির চূড়া ভুপাতিত করে দেয়। এক কৃশ্চান ভক্ত মা-মেরির মূর্তিটি বাঁচাতে নৌকায় তুলে পালাতে গিয়ে ডুবে যায় সে নৌকা। কী আশ্চর্য, এর পর থেকে মাঝরাতে নদীবক্ষ থেকে এক নারীকণ্ঠের ক্রন্দন শোনা যেতে থাকে। হয়তো কোন অনর্থের ভয়ে ভীত স্থানীয় বাসিন্দারা নিজ উদ্যোগে নদী সেঁচে মাতা মেরির সেই  মর্মর মূর্তি উদ্ধার করে ও সসম্মানে চার্চে প্রতিষ্ঠা করে দেয়। এই ব্যাণ্ডেল চার্চের তাই বড়ই মাহাত্ম্য আছে লোকপরম্পরায়।

পলাশীর যুদ্ধের পরের সেই টালমাটাল সময়ে এক বৈকালে জনৈক সৎনামী সন্ন্যাসী এসে ওই গীর্জার পাশে এক বটবৃক্ষের তলায় আশ্রয় নেন, সঙ্গে তাঁর এক বালক, গুরুরই মতো ছাই ভস্ম মাখা অবয়ব তারও। হাতে তার ছোট এক ত্রিশূল, সন্ন্যাসীর মস্ত ত্রিশূলটি মাটিতে গাঁথা।

ছাইভস্ম মাখা হলেও সেই সন্ন্যাসীর দেবপ্রতিম মূর্তি লুকাবার নয়। দাড়িগোঁফ ও জটাজূটের জঙ্গল সত্ত্বেও তাঁর উন্নত অবয়ব, আজানুলম্বিত বাহুদ্বয়, উন্নত ভাল, টিকলো নাসা বাঙ্গালীদিগের মধ্যে দেখা যায় না বিশেষ।

“খগরাজ পায় লাজ নাসিকা অতুল!”

উত্তরবঙ্গে যেহেতু তখন সন্ন্যাসী বিদ্রোহ শুরু হয়ে গিয়েছে, ব্যান্ডেলের গঙ্গার তীরের এই সাধুকেও সন্দেহের চোখে দেখা হতে লাগল ও স্থানীয় কোতয়াল তাঁর পিছনে টিকটিকি লাগিয়ে দিলেন খবরাখবর নিতে। তেমন এক চুনোপুঁটি একবার খবর সংগ্রহের উদ্দেশ্যে সন্ন্যাসীর আশপাশে ঘোরাঘুরি করতে গিয়ে তাঁর চোখে চোখ পড়াতে ঘাবড়ে টাবড়ে একশা! এমনই প্রখর তেজ ছিল সন্ন্যাসীর চোখে!

এর কয়েকদিনের মধ্যে একটি ঘটনা ঘটে। ঢ্যাঁড়া পিটিয়ে পিটিয়ে ঘোষণা করা হতে থাকে যে সে অঞ্চলের এক অতি মান্য হাজি সাহেবের ঘরে এক নাদান বালিকাকে সাপে কেটেছে, সে মর মর। কেউ যদি সেই বিষ নামানোর ঔষধ জানে… পুরস্কার ইত্যাদি ইত্যাদি… ডিগ্‌ ডিগ্‌ ডিগ্‌ ডিগ্‌…

সেই বিকালেই ঘেরাটোপে ঢাকা বিশাল তাঞ্জামে চড়ে ও একদল রক্ষী নিয়ে সন্ন্যাসীর কাছে এসে হাজির হলেন এক খানদানী জেনানা, যাঁর মেয়েকে সাপে কেটেছে। পর্দার কারণে তিনি নামলেন না বটে পালকি থেকে কিন্তু সেখান থেকেই হাউ হাউ করে কান্না-তিনি নাকি স্বপ্ন পেয়েছেন যে গির্জার পাশের বটগাছের তলায় এক সাধু বসে আছে তাঁর কাছেই আছে তাঁর মেয়ের বাঁচার নিদান।

মহা মুশকিলে পড়া গেল।

সাধু যতই বলেন তিনি সাপের বিষ নামানোর উপায় কিছু জানেন না ততই বেড়ে ওঠে মহিলার ক্রন্দন, পারলে পালকি থেকে নেমে এসে তিনি সন্ন্যাসীর পায়ে ধরেন।

শেষে দয়াপরবশ হয়ে বালক-চেলাকে সঙ্গে নিয়ে সাধু চললেন সেই হাজি সাহেবের নিবাসে।

সে স্থান ব্যাণ্ডেল থেকে কিছুটা দক্ষিণে। গঙ্গার তীরেই বিশাল অট্টালিকা। ইমামবাড়া।

পর্দাপ্রথা প্রায় উপেক্ষা করে সন্ন্যাসীকে অন্দরমহলে নিয়ে যাওয়া হল, ও মৃতপ্রায় কন্যাটিকে তাঁর পায়ের সামনে শুইয়ে দেওয়া হল। তার তখন শেষ অবস্থা। মুখ দিয়ে গ্যাঁজলা কাটছে।

সব দেখেশুনে সন্ন্যাসী বললেন, “এ তো সাপে কাটা বলে মনে হচ্ছে না। বিষধর সাপে কাটলে এ মেয়ে এতক্ষণ বেঁচে থাকত না। একে কেটেছে কোনো বৃশ্চিক। বিছে। সেও অবশ্য কম বিষাক্ত নয়। আমাকে একবার এক বিছেয় কেটেছিল…ত্রিভুজ-বিছে… সেই যে বছর নবাবের সঙ্গে গোরাদের তুমুল লড়াই হয়েছিল পলাশীর আমবাগানে… মরেই যেতাম আমি, নেহাত… রোসো, আমার কাছে এর এক মোক্ষম ঔষধ আছে বটে, আগে ছক-টা কাটি…”

এই বলে, কী আশ্চর্য, সেই সন্ন্যাসী মাটিতে আঁক কেটে কেটে আর ছক ও ত্রিভুজ এঁকে কী সব গণনা করতে লাগলেন! সকলে ঘিরে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগল তাঁর কাণ্ড-কারখানা।

***

এর মাসখানেক পরের দৃশ্য।

আমরা দেখতে পাচ্ছি হুগলী নদীতীরের এক মস্ত অট্টালিকার দোতলার ছাদে চলেছে লড়াই!

লড়াই?

হ্যাঁ, তবে এ কোন যে সে লড়াই নয়, এ হল চৌষট্টি ঘরের লড়াই। চৌসরের খেলা-শতরঞ্জ! সোজা বাংলায় দাবা খেলা।

সেই অট্টালিকার মালিক ধনীশ্রেষ্ঠ হাজি সাহেব কিন্তু অতি দীনহীন জীবন যাপন করেন। অকৃতদার মানুষ, সদাই শ্বেত বস্ত্র পরিধান করেন, কোনো পালঙ্কের উপরে নয়, ভুঁয়ে শয়ন করেন রাত্রে। মস্ত দাতা মানুষ উনি। অসহায় মানুষ কখনই তাঁর দুয়ার থেকে বিমুখ হয়ে ফিরে যেত না। লোকে বলত দাতা কর্ণ!

শখ বলো বা নেশা বলো, সেই হাজি সাহেবের ছিল একটিই- দাবা খেলা। আর এ নেশা যার আছে সে জানে যে অন্য সব কিছুই নগণ্য হয়ে যায় তার সামনে।

সেই বৈকালবেলায় সেই যে সন্ন্যাসী এসেছিলেন বালিকাটির সাপ-বা-বিছের বিষ ঝাড়তে, বলেছিলেন, কই, আমাকে দেখিয়ে দাও তো ঠিক কোন্‌ স্থানে সর্পদংশনটা ঘটেছিল? নিশ্চয়ই কোন গর্ত-টর্ত হবে তার আশেপাশে।

লোকজন তাঁকে নদীর তীরের এক বাগানে নিয়ে গেল।

সেই দংশনস্থান দেখতে এসে ওঁর চোখে পড়ে যায় অদূরে ঘাসের উপরে সাদা ফরাস পেতে একটি জলচৌকির উপরে সাজানো রয়েছে শতরঞ্জের সরঞ্জাম, যেন খেলা হতে হতে প্রতিদ্বন্দ্বীদ্বয় উঠে গেছেন এই ‘ওঝা’-সাধুর সঙ্গে অনেক লোকজন এখানে এসে পড়াতে।

“নিদান তো দিয়েছি, এখন আধ প্রহর অপেক্ষা করে দেখ কী হয়,” বলতে বলতে সেই সাধুবাবাজী ঘুরে এসে দাঁড়ালেন শতরঞ্জের ছকের সামনে, বললেন, “কই, বাজি কে খেলছে? কার সঙ্গে?”

বেঁটেখাটো এক মানুষ আদাব জানিয়ে বসে গেলেন দাবার ছকে। শ্বেত বস্ত্র তাঁর। দাড়িগোঁফ সাফ কামানো, মাথাতেও ফেজ নয়, পাগড়ি পরা। একজন হাজি বলে চট করে চেনা যায় না তাঁকে, যদিও আরবদেশে ও মক্কা শরীফে দীর্ঘকাল কাটিয়ে এসেছেন তিনি।

সেই থেকে সেই হাজি সাহেবের সঙ্গে নিখাদ বন্ধুত্ব হয়ে গেল সেই   সৎনামী সন্ন্যাসীর। আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হল দাবাখেলা। চৌসর। বালিকাকে বাঁচানোর ঘোষিত পুরস্কার নেবার কথা তুললে সাধু বলেন, “আমাকে আপনি যদি পরপর তিনবার শরঞ্জের খেলায় হারাতে পারেন, সেটাই হবে আমার পুরস্কার!”

বোঝো!

হাজি সাহেবের গৃহে আশ্রয়গ্রহণের আহ্বান যদিও করজোড়ে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন সাধুবাবা। থাকতেন গঙ্গার তীরে এক পর্ণকুটীর বানিয়ে, তবু প্রতি বিকালবেলায় একবার বন্ধু হাজি সাহেবের সঙ্গে শতরঞ্জ না খেলতে বসলে রাতের ঘুম হত না তাঁর। তাঁদের দু’জনেরই। দাবাখেলার নেশা যে কী ভয়ংকর-যে জানে সে জানে।

“আপনি সংসারত্যাগী সন্ন্যাসী হয়েও চৌসরের মতো এক নেহাত জাগতিক খেলায় মেতে থাকেন কী করে? এতে আপনার সাধনার ব্যাঘাত হয় না কি?”  খেলতে খেলতে মজা করে একদিন বন্ধুকে শুধিয়েছিলেন হাজি সাহেব।

“আপনি আপনার মন্ত্রী সামলান, হাজীসাহেব। ওইসব প্রশ্ন করে আপনার হার এড়াতে পারবেন না, এটা মনে রাখবেন।” ঘোড়াকে আড়াই ঘর এগিয়ে দিতে দিতে হেসে বলেছিলেন সন্ন্যাসীঠাকুর।

তারপর সে হাতটা শেষ হলে ফের গুটি সাজাতে সাজাতে বললেন, “নাম নাম সৎনাম!  নাম নাম সৎনাম!  সেই থেকে আমরা হলেম সৎনামী। সর্বশক্তিমানের নাম সর্বদা করে যেতে হবে, করেই যেতে হবে মনের মধ্যে কাজের মধ্যে। এ-ই আমাদের সাধনমার্গের শিক্ষা, বুঝলেন হাজীসাহেব? শতরঞ্জের সঙ্গে এর বিরোধ নেই কোনো। এদানে কিন্তু আপনাকে জিততেই হবে, মনে আছে তো?”

দাবা খেলতে খেলতে চলে গল্প টুকটাক।

একদিন বললেন সাধুবাবা, “ভয়ংকর এক চক্রব্যূহ রচেছেন যে আজ আপনি, হাজিসাহেব! ভেঙে ঢুকতে হয়তো পারব, কিন্তু বেরোনোর উপায় যে জানা নেই আমার!”

“অভিমন্যু?” খোঁচা দিলেন হাজি সাহেব।

“আপনি জানেন, মহাভারতের গল্প?” ভুরু তুলে শুধান সন্ন্যাসী।

“সে কী! জানব না কেন? আমি ভারতীয়ই বটে, কারণ বাংলায় আসবার আগে আমার ইরানি পূর্বপুরুষ দীর্ঘকাল কাশ্মীরে কাটিয়েছিলেন, এটা জানবেন। “

“সে কী! আপনিও আদতে কাশ্মীরি নাকি?” ফস্‌ করে কথাটা বেরিয়ে গেল সাধুবাবার মুখ দিয়ে।

“আর কে? আপনিও কি আদতে কাশ্মীরি?”

“নাঃ, নাঃ,” সামলে নিলেন সন্ন্যাসীবাবা, “আমার জন্ম এই পুব দেশেই। পূর্ণিয়াতে।” তারপর কথা ঘুরিয়ে বললেন, “এই চক্রব্যূহের পিছনের গণিতটা জানেন তো, হাজি সাহেব? অভিমন্যু বেচারা সেটাই রপ্ত করতে পারেনি বলেই…”

“আরে বাব্বাঃ! আপনি গণিতেও যে পারদর্শী দেখছি! আপনি তো বহু গুণের গুণী!”

“হবে না? চোদ্দ পুরুষ ধরে তো রাজার কোষাগারই সামলে এলাম আমরা, হিসেব রেখে এলাম!” ঝোঁকের বশে বলে ফেলেই সাধুবাবা বুঝলেন আবার একটা বেফাঁস কথা বলে ফেলেছেন।

হাজী বলেন, “আপনি কি পূর্বাশ্রমে কায়স্থ ছিলেন নাকি?”

পাশেই গঙ্গা বেয়ে চলে যাচ্ছে এক ভিনদেশী নাও। তার মাস্তুলের পতাকাটা অচেনা।

এ কী আরাকানি নাও? ভাবেন সন্ন্যাসীবাবা। তারপর ফের শতরঞ্জের ছকে ফিরে এসে বলেন, “হাজি সাহেব, এই যে আপনার দুটি গজ মন্ত্রীকে আগলাচ্ছে কিন্তু ঐ দূরে জয়দ্রথের মতো পথ আগলে বসে আছে ঘোড়া… তারা মনে করুন দ্রোণ-কৃপ-কর্ণ-অশ্বত্থামা… নয়ের বর্গমূল হল তিন আর দুই-তিন-পাঁচ-সাত-এগারো… এগুলি অভাজ্য সংখ্যা, জানেন নিশ্চয়ই?”

সন্ন্যাসীর মুখের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকেন হাজি সাহেব! কে এই সন্ন্যাসী? ইনি তো কোনো সামান্য মানুষ নন!

আরেকজন ব্যক্তিও কিন্তু সেই সৎনামী সাধুকে অসামান্য বলে সন্দেহ করেছিল। তার দৃষ্টিটা অবশ্য সোজা ছিল না । মানুষটিও প্যাঁচালো। যদিও ভালো মুখ করে রোজ বিকেলে দাবা খেলা দেখতে ঘিরে বসে যেত সে আর পাঁচ-সাতজন পারিষদের মতোই।

নাম তাঁর আলি হোসেন তাবাতাবাই। হাজি সাহেবের এস্টেটের খাতা লেখে সে। মানে, আজকের ভাষায়, একাউন্ট্যান্ট। নিন্দুকে বলে তলে তলে সে ক্যালকাটায় রবার্ট ক্লাইভ সাহেবের সঙ্গে তাল্লুক রেখে চলে চর মারফৎ, তাতে নাকি তার টু পাইস আমদানিও হয়।

আরেক জন লোকও ছিল।

হাজি সাহেবের অট্টালিকায় অগণিত আশ্রিতের মধ্যে ছিল এক পাক্কা ইংরেজ যুবকও!  পিটার রিভস নাম তার। দুঃখী মানুষ সে। কলকাতার ইংরেজি কেল্লাতেই থাকত, কিন্তু পলাশীর যুদ্ধের আগের বছরই মারামারির মধ্যে স্ত্রী ও শিশুপুত্রকে হারিয়েছে পিটার সাহেব। এখন হাজির গৃহের কিছু বালককে ইংরেজি ভাষা সেখায় যুবক পিটার; আর শিখে নিয়েছে সে এদেশি আড়বাঁশি বাজানো। অতি করুণ সুরে বাজায় সে সেই বাঁশি।

এ দুই অসমবয়সী মানুষের বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল। একটা কারণ দু’জনেরই ছিল সান্ধ্যকালীন আপিঙের নেশা। আর দ্বিতীয়ত, তাবাতাবাই মনে করত পিটারের মাধ্যমে ইংরেজ কোম্পানির ভেতরের খবর সে কিছু বের করে নিতে পারবে।

এক সন্ধ্যায় চণ্ডু-র পাইপে ধোঁয়া টেনে মৌতাত করতে করতে পিটার ঢুলু ঢুলু চোখে বললে দোস্ত আলি হোসেন তাবাতাবাইকে, “হুজুর, ঐ যে চেস খেলতে আসে সন্নেসী, ওর সঙ্গের বাচ্চাটা কি মুসলমান?”

“সে কী! হিন্দু সাধুর ছাইভস্ম মাখা চেলা মুসলমান হতে যাবে কেন? আর হঠাৎ একথা তুমি বলছই বা কেন, পিটার?”

“আরও অনেক বাচ্চার সঙ্গে সে-ও দুপুরবেলা গঙ্গায় নাইতে নামে। সাঁতার কাটে তিড়িং বিড়িং। নাঙ্গা। আমিও গরম থেকে বাঁচতে ডুব দিয়ে বসে থাকি। নিজ চক্ষে আমি দেখেছি ওরা মুসলমান।”

“সে কী!” চমকে উঠল আলি হোসেন, বললে, “রোসো, আমি খবর নিচ্ছি।”

***

খবর যা পাওয়া গেল তা সোজা নয়!

জানা গেল, পলাশীর যুদ্ধে নবাবের হার ও মৃত্যুর পরে পরেই তাঁর পুত্রকে নিয়ে তার মামা-তথা-সেনাপতি কোথাও ভেগেছে। আশ্রয় খুঁজে ফিরছে তারা। তাকে ধরিয়ে দিতে পারলে ক্যালকাটার ইংরেজরা তো বটেই মুর্শিদাবাদের নয়া নবাব জাফর আলি খান সাহেবের কাছ থেকেও ভারী ইনাম মিলবে!

***

এর হপ্তাখানেকের মধ্যে সেই হুগলি বন্দর-নগরীতে দেখা গেল এক গভীর অমাবস্যার রাত্রে দু’জন খোজা শাগরেদকে সঙ্গে নিয়ে তাবাতাবাই ও পিটার রিভস চলেছে গঙ্গাতীরের এক পর্ণকুটীর অভিযানে।

শাগরেদদের হাতে খোলা ছুরিকা চক চক করছে, পিটারের চোখে প্রতিহিংসার আগুন!

বিড় বিড় করে নেশার ঘোরে বলে চলে সে, “বিশে মে! তারিখটা কোনোদিন ভুলব না আমি। আমি ছিলাম ডাঃ হলওয়েলের সাকরেদ। ঐদিন নবাবের সেনাদল ক্যালকাটার ফোর্ট উইলিয়ামে আমাদের শতাধিক ইংরেজকে, তার মধ্যে অবলা নারী ও শিশুও ছিল, এক বদ্ধ কক্ষে আটকে রেখে দম আটকে মারে। আমার বৌ ও ছেলেও… “বলতে বলতে ভেউ ভেউ করে কেঁদে ওঠে সেই অসহায় ইংরেজ যুবক।

“অন্ধকূপ হত্যা!” পাশ থেকে নিজমনে বলে ওঠে আলি হোসেন তাবাতাবাই।

***

“নাম নাম সৎনাম। নাম নাম সৎনাম।”

গঙ্গাতীরের সেই ভাঙাচোরা পর্ণকুটীরের দ্বারে পৌঁছে মৃদু স্বরে ডাক দেয় আলি হোসেন।

“বীরভান! বীরভান! …কৌন?” প্রদীপটি হাতে ধরে গলা বাড়ান সেই সৎনামী সন্ন্যাসী। উনি নিশ্চয়ই ঘুমাননি, জপতপ করছিলেন।

তারপর ম্লান আলোকে পরিচিত মুখটি দেখতে পেয়ে অবাক হয়ে শুধোন সাধুবাবা, “সে কী! মুন্সী সাহেব, আপনি? এতো রাত্রে? হঠাৎ কী মনে করে?”

সতর্ক সন্ন্যাসী অবশ্য ততক্ষণে মেপে নিয়েছে যে আগন্তুকের হাত খালি, কোনো অস্ত্রশস্ত্র নেই।

“আমার সঙ্গে এই যে ইংরেজিভাষার মাস্টারমশাই রিভস সাহেবও এসেছেন, দেখছেন তো? ইনি এসেছেন আপনাকে বাঁশি শোনাতে।”

“আমাকে এতো রাতে বাঁশি শোনাতে এসেছেন আপনারা?” গলায় অতি সতর্কতা সেই সন্ন্যাসীর।

কুটীরের মেঝের উপরে চাটাই পেতে অবোধ বালকটি তখন অঘোর নিদ্রামগ্ন।

পিটার রিভস নেশা করেই ছিল। কুটীরে ঢুকেই কোনো ভণিতা না করে বললে সে, “ইউ ব্লাডি ৳#%@, তোরা নবাবের সেপাই ব্ল্যাক হোল কিলিং করে আমার স্ত্রী-পুত্রকে মেরেছিস %৳#…”

রোগাসোগা ইংরেজ পিটার রিভসের উষ্মা দেখে মোটেই ডরলেন না সন্ন্যাসী ঠাকুর, বললেন, “সেটা সত্যিই বড় অন্যায় কাজ হয়েছিল বটে। আমি শুনেছি সে ঘটনার কথা। আমি তার নিন্দা করি। কিন্তু আপনারা এখন আমার কুটীরে এসেছেন। অতিথি আপনারা। বসুন। বসতে আজ্ঞা হোক্।”

“বসতে আমরা আসিনি আজ। বলো তো সাধু বাবা এই বালক কে? এ কি মৃত নবাবের ছেলে? তুমি কি তার মামা, তার রক্ষক? কী নাম তোমার?” সপাট প্রশ্ন আলি হোসেন তাবাতাবাইয়ের।

হতভম্ভ হয়ে গেলেন সেই সাধু। গলা দিয়ে স্বর বেরোল না তাঁর।

ফট ফট করে দু”বার হাতে তালি বাজালেন আলি হোসেন। অন্ধকার ফুঁড়ে দুইজন বিরাটাকায় খোজা পেয়াদা এসে দাঁড়াল। হাতে তাদের চকচকে ছুরিকা।

এবার ঘিরে আসছে তারা সাধুর দিকে। লক্ষ্য তাদের ঐ মাটিতে শোয়া বালকটি।

“খামোশ!”

সন্ন্যাসীর বজ্রগম্ভীর কণ্ঠস্বরে থমকে গেল আগন্তুকের দল।

এবার প্রদীপের মৃদু আলোকে তারা স্পষ্ট দেখল যে সেই সাধুবাবা চকিতের মধ্যে কোমর থেকে বার করে নিয়েছেন এক পিস্তল। চকচক করে উঠল তার লম্বা নল!  সোজা তাক করে আছেন তাবাতাবাই-এর খুলির দিকে।

ইতালিয়ান সাবাতি পিস্তল!  অতি ভয়ংকর ও অতি মহার্ঘ্য অস্ত্র এক। সেকালের ভারতবর্ষে হাতে গোনা কয়েকজনের কাছে হয়তো ছিল এই দুর্লভ অস্ত্র!

শোনা যায়, চন্দননগরের ফ্রেঞ্চ গভর্নর মসিয়ঁ ল” স্বয়ং এমন এক আধুনিক অস্ত্র উপহার দিয়েছিলেন নবাব সিরাজ-উদ্‌-দৌল্লাকে, তাঁর বন্ধুত্ব চেয়ে। পরে, মোহনলালের ভগিনী সুন্দরীশ্রেষ্ঠা কাশ্মীরি আলেয়ারানির পাণিগ্রহণ করে উৎফুল্ল নবাব সে পিস্তল দান করে দেন দোস্ত্‌-তথা-সেনাপতিকে।

আগন্তুকগণ ভয়ে দিশেহারা হয়ে গেল সাধুবাবার হাতে এই ভয়ংক র অস্ত্র দেখে। তাদের কারো মুখ দিয়ে আর কথা সরল না।

“তোমার শাগরেদদের বলো হাথিয়ার নামিয়ে নিতে, ইংরেজের পা-চাটা কুত্তা আলি হোসেন তাবাতাবাই! নইলে আমার এই লোডেড পিস্তলের গুলিতে তোমাদের খুলি দুটো চুরমার করে দিতে আমার এক মুহূর্তও লাগবে না।”

এবার পিস্তলের নল দুলিয়ে দুলিয়ে বাহিরের পথ দেখাতে লাগলেন সেই সৎনামী সন্ন্যাসী।

“নিকলো। নিকলো।”

দূরের জঙ্গলের মধ্যে এক দল শৃগাল ডেকে উঠল।

রাত দু-প্রহর হল।

বালকটিও এর মধ্যে ঘুম থেকে উঠে বসেছে।

আগন্তুকগণ সুড়সুড় করে বেরিয়ে গেল সাধুর কুটীর থেকে।

পরদিন প্রাতে আর গ্রামবাসীরা কেউ সেই সাধুবাবা ও তার দুই বালক সঙ্গীকে দেখতে পেল না।

কেবল মাটিতে গাঁথা সন্ন্যাসীর মস্ত ত্রিশূলখানি তখনও তেমন খাড়া দাঁড়িয়ে আছে আকাশের পানে তাকিয়ে!

হোন্‌ না সেই সন্ন্যাসী নবাবের পরাজিত-কিন্তু-বিশ্বস্ত হিন্দু সেনাপতি বা আর কেউ, কিন্তু তাঁর পরবর্তী হাল-হকিকৎ কেউ লিখে রাখেনি কোনো ইতিহাস বইয়ের পৃষ্ঠায়।

 তবে, বাংলার কিছু প্রাচীন বংশের মৌখিক ইতিহাস ও খৎ /দস্তাবেজে লেখা আছে যে এরপরে উনি নাকি ময়মনসিংহের গৌরীপুর-জমিদারীর রায়চৌধুরীদের গৃহে গিয়ে আশ্রয় নেন।

রুড়কিতে ট্রেনিঙের পরে পঞ্জাব প্রদেশের রাওয়ালপিণ্ডির কাছে সোয়াঁ নদী কাটাতে লাগিয়ে দেওয়া হল এঞ্জিনিয়রদের দল-কে। সিন্ধুর এক উপনদী হল এই সোয়াঁ ।

শ্যামলাল দারের বাড়ি পুঞ্চ্‌ এখান থেকে বেশি দূরে নয়। তার ইচ্ছা, একবার বাড়ি থেকে ঘুরে আসে। তার বাপ-মা-বৌ-ছেলে আছে সেখানে। কিন্তু সাহেব কর্তা ছুটি দিতে নারাজ।

 কী আর করবে, বিমর্ষ বেচারী শ্যামলাল গল্প জোড়ে সহকর্মী ভুজঙ্গের সঙ্গে।

যেহেতু শ্যামলাল গণিতে অতি উৎসাহী, গল্প করতে বসলেই তাই ঘুরে ফিরে আসে গণিতজ্ঞ রাধানাথ শিকদারের কথা, সম্প্রতি পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ এভারেস্টের উচ্চতা মেপে যিনি জগতবিখ্যাত হয়েছেন। দেরাদুন শহরও এখান থেকে বেশি দূরে নয়, যেখানে তাঁর অধিষ্ঠান।

শ্যামলাল দার যদিও ‘দিল্লি কলেজ’ থেকে পাশ করে এসেছে যার প্রতিষ্ঠা ক্যালকাটার হিন্দু কালজের চাইতে সওয়া-শ” বছর আগে, তবু হাল আমলে খোলা ইংরেজদের এই কলেজ আজ ধারে ভারে অনেক এগিয়ে গেছে!

“তুমি কি রাধানাথের গুরু প্রফেসর জন টাইটলারের কথা জানো, যাঁর কাছেই রাধানাথ শিখেছিলেন ইউক্লিডের জ্যামিতি ও স্ফেরিকাল ত্রিকোণমিতি?” ভুজঙ্গ শুধায়।

ঘাড় নাড়ে শ্যামলাল। শোনেনি।

“আরও ছিলেন… ছিলেন কেন, এখনও বেঁচে আছেন আমাদের কলুটোলা পাড়ায়… টাইটলারের ছাত্র আরেক ধনুর্ধর গাণিতিক রঘুনন্দন নন্দী। আমাদের রুড়কীর হেডমাস্টার লক্ষ্মণ-স্যরের মতো যিনিও সর্বত্রই গণিত খুঁজে পান। সমগ্র মহাভারতের কাহিনিগুলিকে যিনি অঙ্কের ফর্মূলায় বেঁধেছেন… দ্রৌপদীর পঞ্চপতিলাভ থেকে শকুনির পাশা খেলা থেকে অভিমন্যুর চক্রব্যূহভেদ থেকে বৃশ্চিকের কামড়ে কর্ণের অভিশাপপ্রাপ্তি…”

“সেটা আবার কী?” অবাক প্রশ্ন শ্যামলালের।

সূর্য ডুবে আসছে। একদল বক কঁক্‌ কঁক্‌ করে ডাকতে ডাকতে বাসায় ফিরছে। শ্যামলালের চোখে তাদের উড়ানের জ্যামিতিক প্যাটার্ন ধরা পড়ল।

“কেন শ্যামলাল, তুমি কি জানো না কর্ণের সে গল্প?” ভুজঙ্গধর বলে চলে, “সে রাজবংশজাত নয় বলে কর্ণকে অস্ত্রশিক্ষা দিতে অস্বীকার করেছেন দ্রোণাচার্য। ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশে কর্ণ গুরু পরশুরামের কাছে গিয়ে নাড়া বেঁধে ব্রহ্মাস্ত্র লাভ করল! একদিন শিষ্যের কোলে মস্তক রেখে নিদ্রা গিয়েছেন গুরু, এদিকে এক বিষধর বৃশ্চিক এসে কর্ণের অপর উরুতে করেছে দংশন। বিষের জ্বালায় ছটফট করছে কর্ণ, কিন্তু পাছে গুরুর নিদ্রাভগ্ন হয়ে যায়, তাই টুঁ শব্দটি করেনি সে।  কিছু পরে ঘুম থেকে উঠে শিষ্যের এই অবস্থা দেখে গুরু পরশুরাম বললেন, ‘তুমি তো ব্রাহ্মণ হতে পারো না বৎস, কারণ এতো সহ্যশক্তি ব্রাহ্মণের থাকে না। তুমি নিশ্চয়ই ক্ষত্রিয়। ছল করে তুমি আমার কাছ থেকে ব্রহ্মাস্ত্র লাভ করেছ। এই কপটতার জন্যে আমি অভিশাপ দিলাম তোমায় যে, কার্যকালে এই বিদ্যা বিস্মৃত হবে তুমি। ভুলে যাবে এর প্রয়োগ!’”

এই গল্প শুনে হা হা করে হাসতে হাসতে বললে কাশ্মীরি যুবক শ্যামলাল দার, “তাহলে বুঝছ তো ভাই ভুজঙ্গধর, আমার সেই পূর্বপুরুষ সেনাপতি কত্ত বড়ো গণিতবেত্তা ছিলেন? কেবল বিছের দাঁড়ার সংখ্যা ও লেজের দৈর্ঘ্যের অনুপাত হিসেব করে, অঙ্ক কষে, তার নিদান দিয়ে সেকালে তিনি হুগলীতে হাজি সাহেবের নাতনীর প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন! এ গল্প বংশপরম্পরায় আমাদের ঘরে চলে আসছে আজ একশ বছর ধরে। আর, গঙ্গানদীপথ বেয়ে বঙ্গালদেশের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ অব্যাহত রয়ে গেছে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে।”

সন্ধ্যা হয়েছে। দূরের গণেশ মন্দির থেকে সন্ধ্যারতির শঙ্খঘণ্টার ধ্বনি ভেসে আসছে।

“কিন্তু ভাই শ্যামলাল, সেই সৎনামী সন্ন্যাসী সত্যি সত্যি কে ছিলেন বল না? উনিই সেই পলায়নপর সেনাপতি মোহনলাল হলে….”

“নির্মোচন! নির্মোচন কাকে বলে জানো কি তুমি, ভুজঙ্গধর? ভুজঙ্গ মানে তো সাপ। সাপ, টিকটিকির মতো সরীসৃপের খোলস ছাড়াকে সংস্কৃতভাষায় বলে নির্মোচন । খোলস ছাড়লে প্রাণী পায় নতুন রূপ! যোগশাস্ত্রবলে মানুষও ছাড়তে পারে খোলস। আয়ুর্বেদের কায়কল্প-চিকিৎসায় অঙ্গের ত্বক খসে পড়ে নতুন ত্বক গজায়। নতুন রূপ পরিগ্রহ করে। মহাভারত-যুদ্ধের পরে দ্রোণের শ্যালক কৃপাচার্য রূপ বদলে কোথায় কখন অন্তর্হিত হয়ে যান, আজও খুঁজে পাওয়া যায়নি। এই যে সিপাহীদের নেতা ধন্ধুপন্থ্‌ নানাসাহেব! ইনি কোথায় গেলেন? এঁকে কি আর এই ইংরেজরা খুঁজে পাবে ভেবেছ? কদাচ না। ইনিও রূপ বদলে কোথাও আছেন, থাকবেন, থেকে যাবেন, দীর্ঘকাল বা চিরকাল, যতদিন না কলিযুগের অবসান ঘটছে।

মা বৈষ্ণোদেবীর কৃপায় সেনাপতি মোহনলাল নির্মোচন-বিদ্যায় পারঙ্গম ছিলেন। টিকটিকি বা গিরিগিটির মতো খোলস ছেড়ে এক রূপ থেকে অন্য রূপ পরিগ্রহণ করতে পারতেন। জয় মা ক্ষীর-ভবানী!”

কাছেই শিরীষগাছের উপর থেকে এক তক্ষক তখনই ডেকে উঠল-

ঠিক্‌ ঠিক্‌ ঠিক্‌ ঠিক্‌!

জয়ঢাকের সমস্ত গল্প ও উপন্যাস

Leave a Reply