গল্প-রূপতরাসির পরে-ঋতুপর্ণা চক্রবর্তী

এই সিরিজে লেখকের আগের গল্প- জাপানি বিভীষিকা

সকাল সকাল বেল বাজতেই মাথাটা গরম হয়ে গেল ঝট করে। সব্বাই জানে রাতে কাজকর্ম সেরে শুতে শুতে আমার তিনটে-সাড়ে তিনটে বাজে, দশটার আগে আমি উঠতেই চাই না। এখন আবার কে এল? কোনও প্যাকেটও আসার কথা নয়। কোনোমতে ঘুম চোখে উঠে, নাইট গাউনটা নাইট স্যুটের ওপরে চাপিয়ে দরজা খুলতেই দেখি সামনের ফ্ল্যাটের জ্যোতি-আম্মা কাঁচুমাচু মুখ করে দাঁড়িয়ে।

“সরি সরি, বাট বহুত ইম্পরট্যান্ট বাত করনা হ্যায়।” বলল জ্যোতি-আম্মা।

ইম্পরট্যান্ট বাত তো সাতসকালে কেন বাপু? ঘড়িতে দেখি সাড়ে আটটা বেজেছে। আর হিন্দির তো ওই ছিরি, আবার বলার দরকার কী? তেলুগু আর ইংরেজি ছাড়া যখন কিছুই জানো না তখন ইংরেজিই বলো। তেলুগুর অভ্যাস হয়ে ওঠেনি আমার এই আট বছরেও। আর ইম্পরট্যান্ট বাত যখন তখন আর ঘুম আসার সম্ভাবনা নেই। অগত্যা বললাম, “কাম ইনসাইড। প্লিজ সিট, লেট মি বি ফ্রেশ, দেন বাত করেঙ্গে।”

ভেতরে এসে আমার ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা জিনিসপত্র দেখে যে খুব একটা খুশি হলেন না জ্যোতি-আম্মা, সে আমি বুঝতেই পারলাম। মরুক গে’, আমার কী? উনি সোফায় বসলেন আমি টুক করে ব্রাশ-টাশ সেরে এসে জিজ্ঞাসা করলাম, “টি? কফি?”

কফিতে জ্যোতি-আম্মা সায় দিলেন। তা খাবে না কেন? অন্যদের জ্বালাতে পারলে আর কিছু চায় না মহিলা। যাক গে’, আমি কফি মেকারে পটটা বসিয়ে বললুম, “ইয়েস, টেল মি নাও।”

জ্যোতি-আম্মা দেখলুম উঠে এসে আমার পাশে দাঁড়িয়ে বললেন, “নলিনী-আম্মা, মণিকাকে ফ্ল্যাট মে কুছ প্রবলেম হ্যায়।”

আমার মাথা এত গরম হয়ে গেছে, মনে হয় এবার পপকর্ন বেরোবে। মণিকা থাকে আমাদের ফ্ল্যাটের পাঁচ তলায়, ওর ফ্ল্যাটে প্রবলেম তো আমি কী করব বাপু? এই জ্যোতি-আম্মাটার কোনও কাজ নেই, সারাক্ষণ এর ফ্ল্যাট ওর ফ্ল্যাটে আড্ডা মেরে বেড়ায়। ওর মেয়েটা, রুদ্রা, বাপে খেদানো মায়ে তাড়ানো, রুক্ষ চুল আর ফাটা পা নিয়ে এদিকে সেদিকে ঘুরে বেড়ায় আর অন্যদের বাচ্চাদের পড়ার টাইমে ডিসটার্ব করে। ওর মায়ের বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই ওকে নিয়ে। এদিকে মণিকার বাড়ি কী হচ্ছে তাই নিয়ে মাথাব্যথা। কিছু না বলে কফিতে মন দিলাম।

দু-কাপ কফি বানিয়ে এনে যখন বসলাম, জ্যোতি-আম্মা বলল, “দেয়ার ইজ সামথিং ভেরি রং উইদ হার কিড, সিরি।”

এবার প্রথমবার আমি একটু অবাক হয়ে বললাম, “হোয়াট? সিরিকে যতদূর চিনি, বাচ্চা মেয়ে, ক্লাস ওয়ান-টুতে পড়ে, কিন্তু খুবই গোছানো এবং ভদ্র।”

জঘন্য হিন্দি আর ইংরেজি মিশিয়ে জ্যোতি-আম্মা বলল, “বিকেলবেলা ফ্ল্যাটের পেছনের মাঠে বাচ্চারা খেলতে যায় না? সেখানে পরশু বিকেলে সিরি, সিরির দাদা সাই, রুদ্রা, ফ্ল্যাটের আরও কয়েকটা বাচ্চা ক্রিকেট খেলছিল। একবার বলটা পাঁচিলের ও-পারে চলে যায়, সিরি সেই বলটা আনতে গিয়েছিল। পাঁচিলের ও-পারে একটা কবরখানা আছে তো জানোই, তাই অন্য বাচ্চারা সেখানে যেতে চায়নি, কিন্তু সাই আর সিরি দুজনেই গেছিল। সিরিই বলটা খুঁজে নিয়ে আসে।

“কিন্তু সেই সন্ধ্যা থেকেই সিরি কেমন একটা চেঞ্জ হয়ে গেছে। গা থেকে বিচ্ছিরি একটা হিসু হিসু মার্কা গন্ধ বেরোচ্ছে। অন্ধকারে বসে আছে। দিনের বেলায় একদম নির্জীব হয়ে আছে, কথা বলছে না বেশি, বললেও স্বাভাবিক গলার আওয়াজ না, একটা সর্দি বসা ঘড়ঘড়ে আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে।

“মণিকা ভেবেছিল, সর্দিজ্বর হয়েছে বলে এমন নির্জীব হয়ে আছে মেয়েটা। সকালে গরম জলে কষে স্নান করিয়েছে মেয়েকে। কিন্তু তবু তার গা থেকে ওই বাজে গন্ধটা যাচ্ছে না। চুল আঁচড়ানো যাচ্ছে না। সন্ধ্যা হতে হতে সিরি এতই হিংস্র হয়ে গেছে, ওর পছন্দমতো কিছু না হলেই কামড়ে দিচ্ছে। মণিকাকে কামড়ে রক্ত বার করে দিয়েছে। সাই ওর পাশে যেতেই ভয় পাচ্ছে।

“ওরা ভেবেছিল, কবরখানা থেকে কোনও জ্বিন-প্রেতের আছর হয়েছে ওর ওপরে। গতকাল এক মুসলিম পীরবাবাকে ডেকেও এনেছিল। কিন্তু সে কিছু করতে পারেনি, বরং সিরি তাকে এমন কামড়েছে, সে প্রাণ নিয়ে পালিয়েছে, আর জানিয়েছে যে এসব জ্বিন-পরির ব্যাপার না। সিরিকে যে ধরেছে সে অনেক প্রাচীন কিছু। তুমি তো বাঙালি আছে নলিনী-আম্মা। তুমলোগ তো ব্ল্যাক ম্যাজিক জানো, তুমি কিছু করো। এই ফ্ল্যাটে থাকতেই তো ভয় ভয় লাগছে, আম্মা।”

শেষের কথাগুলো শুনে আবার রাগ ধরে গেল। এই যে বাঙালি মেয়েরা ব্ল্যাক ম্যাজিকে পোক্ত বলে কয়েকটা কথা এই হায়দ্রাবাদ শহরে বসে শুনতে হবে, আমি ভাবিনি। কিন্তু চিন্তার কথা হল, সিরির যা যা হয়েছে, সেই একইরকম লক্ষণ আমি আগে নিজের চোখেই দেখেছি।

কফি খেয়ে জ্যোতি-আম্মা বিদায় নিল। আমি ওকে বললাম, “রুদ্রাকে মানা করো এখন ফ্ল্যাটে একা একা ঘুরে বেড়াতে। আর আমি দেখছি কিছু করতে পারি কি না।”

জ্যোতি-আম্মা বেরিয়ে যেতে মণিকাকে ফোন করলাম। বার তিনেক রিং হওয়ার পরে মণিকা ফোন ধরল। জিজ্ঞাসা করলাম, “সিরির এখন অবস্থা কী?”

সে বলল যে সিরি আপাতত একটা ঘরে বসে আছে। দরজা বন্ধ করার সাহস কারোরই হয়নি। সাইকে মামার বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। মণিকা আর ওর বর দুজনেই ভেবে পাচ্ছে না কী করবে।

“শোনো, সিরির লক্ষণগুলো আমাকে বলবে?”

মণিকা বলল, “ওর গা থেকে সারাক্ষণ একটা ঝাঁজালো অ্যামোনিয়ার মতো গন্ধ বেরোচ্ছে, চুলে জট পড়ে গেছে। আলো যেন সহ্য হচ্ছে না, দিনের বেলায় গা মাথা ঢেকে কোনায় বসে আছে। আর আশ্চর্য ব্যাপার হল, ক’দিন আগেই গ্রামের বাড়ি ঘুরতে গিয়েছিলাম আমরা, সেখান থেকে মাথায় একগাদা উকুন এনেছিল, এখন দেখছি উকুনগুলো ওর ঘাড় বেয়ে নেমে পালিয়ে যাচ্ছে। এরকম কখনও দেখিনি আগে।”

“সিরির বয়স কত গো?”

“এই তো এ-বছরে সাত হল। আর একটা অদ্ভুত জিনিস দেখেছি জানো, ওর হাইট কমে গেছে। সত্যি বলছি। আগে ও প্রায় চার ফুট ছিল। এখন মনে হয় মাপলে দেখা যাবে তিন ফুটের কাছাকাছি হয়ে গেছে।”

ব্যস ব্যস, এটাই জানার ছিল। একদম শিওর হয়ে গেলাম আমি। এ-ঘটনা আগেই ঘটেছে, আমার চোখের সামনে।

সেই দু-হাজার চারের ঘটনা। স্কুল থেকে শান্তিনিকেতনের ট্রিপে গেছি। তখন আমি ইলেভেনে পড়তাম। রাস্তায় বাস খারাপ হয়ে গেছিল। সে কী বিচ্ছিরি অবস্থা! রাস্তার ধারের একটা ঝুপড়ি, যেটা মূলত চা-টিফিনের জন্য, সেটাকেই আশ্রয় করে ঠাকুররা দুপুরের রান্নাবান্না শুরু করেছিলেন, আর আমরা বাসে বসে বসে বিরক্ত হচ্ছিলাম। কলকাতা থেকে নতুন বাস আসবে, তবে আমরা তাতে চড়ে পৌঁছব।

গার্লস স্কুলে পড়তাম, বাস-ভরতি মেয়ে— ক্লাস নাইন, ইলেভেন আর টুয়েলভ। যত সময় যাচ্ছিল, বাথরুম যাওয়ার দরকারও ততই বাড়ছিল। শেষে তিন-চারজনের ব্যাগ থেকে বড়ো বড়ো কয়েকটা ওড়না বার করে নিয়ে আমি আর আমার বন্ধুরা টেম্পোরারি বাথরুম বানিয়েছিলাম মাঠের খানিকটা ওড়না দিয়ে আড়াল করে, আর সেখানেই বেশিরভাগই বাথরুম করছিল। কিন্তু গৌরী আমাদের সঙ্গে আসেনি। ওর খুব লজ্জা, অন্যরা পেছন ফিরে দাঁড়ালেও ও স্বচ্ছন্দ নয়। ও গেছিল একটা ঝোপের আড়ালে, মৌমিতাকে পাহারাদার হিসাবে নিয়ে। ফিরে যখন এল, তখন আমরাও একটা ঝাঁজালো গন্ধে একটু দূরে-দূরেই বসেছিলাম ওর থেকে।

গৌরী বি সেকশনের মেয়ে ছিল, যদিও অনেকগুলো ক্লাসই আমাদের সঙ্গে করত। কী অদ্ভুত ছিল দিনগুলো তখন। ইস্কুলে আমি আর নীলা অবিচ্ছেদ্য ছিলাম। তারপরে কে যে কোথায় হারিয়ে গেলাম। বহুবছর পরে ফেসবুকের সৌজন্যে আবার আলাপ হয়েছে।

নীলা! সত্যিই তো, নীলাই এই সমস্যার খানিক সমাধান করতে পারে। গতবারও ও-ই বাঁচিয়েছিল আমাদের।

নীলার নাম্বার ডায়াল করলাম। খানিক বাদে পরিচিত গলার আওয়াজ ভেসে এল— “হ্যাঁ বল রে, এখনই উঠে পড়েছিস?”

“নীলা, তুই কি খুব বিজি রে এখন?”

“না, এখন খুব ব্যস্ত নই, তবে অফিসের চাপ চলছে বুঝতেই পারছিস। ক’দিন আগেই খুলল সব। তোর কী খবর, অল ওকে?”

“না রে, সেজন্যেই বলছি। তুই কি হায়দ্রাবাদে আসতে পারবি এমার্জেন্সি বেসিসে?”

“কেন? কী হয়েছে? সে আমি এখনই টিকিট বুক করে নিচ্ছি, দু-তিনদিনে পৌঁছে যাব। কিন্তু কী হয়েছে সেটা তো বল। ব্যাঙ্গালোর থেকে তোর কাছে পৌঁছতে বেশি অসুবিধা হবে না।”

“অতদিন টাইম নেই ভাই, সেই গৌরীর কেসটা মনে আছে? আমাদের ফ্ল্যাটের একটা বাচ্চা মেয়ের সঙ্গে একইরকম হয়েছে।”

“এই রে! দাঁড়া, তাহলে আজ রাতেই গাড়িতে বেরোচ্ছি, কাল ভোর ভোর পৌঁছে যাব। সূর্যের আলো ফুটে গেলে একটু সমস্যা হতে পারে। ইতোমধ্যে তোরা একটা কাজ কর, ওই ফ্ল্যাটে কেউ থাকিস না। বাইরে পাহারা দিয়ে রাখ যাতে কেউ বেরোতে না পারে, আর কেজি দু-এক কাঁচা মাংস কিনে ফ্ল্যাটের মধ্যে রেখে দে, ও যাতে শান্ত হয়ে থাকে।”

“তুই কিন্তু আজও বলিসনি গৌরীর ঠিক কী হয়েছিল। আমি জিজ্ঞাসা করিনি ভয়ে, এবার জানতে চাইছি।”

“দাঁড়া, আগে পৌঁছুই, তারপরে বাচ্চাটার সঙ্গে একবার দেখা করা দরকার। তারপর তোকে বলছি। আসছি আমি, সাবধানে থাক। আর শোন, তুই, স্পেশালি তুই বাচ্চাটার সামনে একদমই যাবি না, তোর ওপরে ওদের নজর আছে।”

“মানে? আগে বলিসনি তো!”

“আগে বলিনি, এখন বলছি, চুপচাপ নিজের ফ্ল্যাটে বসে থাক দরজা-জানালা বন্ধ করে। আমি না যাওয়া অবধি কোথাও যাবি না।”

“আচ্ছা যাব না। কথা দিলাম।” ব্যাজার মুখে বললাম আমি। নীলাটার আমার ওপরে বিন্দুমাত্র কনফিডেন্স নেই। তার ওপরে আমার বসটা যা খেঁকু না!

“আমি তোকে সব বলব। এখন যা বলছি তাই করে রাখ, আমি যত তাড়াতাড়ি পারি বেরোচ্ছি। কাল দিনের আলো ফোটার আগেই পৌঁছে যেতে হবে।”

***

ফোনটা রেখে, জ্যোতি-আম্মাকে ফোন করে আমি সব নির্দেশগুলো দিলাম। বললাম আমার বন্ধু আসছে, যে এসব ব্যাপারগুলো ভালো বোঝে, ততক্ষণ যেন কেউ ওই ফ্ল্যাটে না থাকে, এমনকি মণিকা আর ওর বরও না।

ফ্ল্যাটের বাইরেই একটা ব্যারিকেড মতো করে ওরা বসে আছে।

বসকে একটা ফোন করে নিই। আমার বস মিস্টার ব্যানার্জি, দেখতে খুবই হ্যান্ডসাম, সম্ভবত সেজন্যেই সহ্য করি, কিন্তু আসলে চূড়ান্ত লেভেলের খিটখিটে। আমার মতোই বাঙালি, কিন্তু কোনও সুবিধা পাওয়া যায় না। এর থেকে তেলুগু বস হলে ভালো হত মনে হয়। ওঁকে ফোন করে ছুটির কথা বলব ভাবতেই আমার জ্বরজ্বর লাগে। কিন্তু নীলা এমনভাবে বলেছে যে আমার আর বেরোতে সাহস হচ্ছে না। বসকে ফোন করলাম, পেলাম না। মেসেজ করে দিলাম যে এমার্জেন্সি ছুটি চাই। তারপর প্রমাদ গুনছি, যে এখনি ফোন করে ঝাড় দেবে, ও মা দেখি রিপ্লাই করেছে ওকে, টেক লিভ ফর টুডে। এ তো অবিশ্বাস্য ঘটনা! যাক গে’, পেয়ে তো গেছি। নিশ্চিন্ত।

বসে বসে সেই সেদিনটার কথা ভাবতে লাগলাম আবার।

টয়লেট সেরে গৌরী ফিরে এল যখন, তখন কেমন যেন চুপচাপ হয়ে গেছে ও, আর কোনও কথা বলেনি। এমনকি দুপুরে আর রাতে দু-বেলাই খেলও না। গলা-মুখ ঢেকে চুপচাপ শুয়ে ছিল। আমরা ভাবছিলাম জ্বর এসেছে। বিকেলে নিজের ঘরে গেল, আবার দশ মিনিটে ফিরেও এল। আমাদের বলল, সায়েন্সের মেয়েরা ওকে ঘর থেকে বার করে দিয়েছে। আমি আর নীলা ঝগড়াও করতে গেলাম ওর হয়ে। তাতে ওরা বলল, গৌরীর গা থেকে একটা গন্ধ বেরোচ্ছে, তাই ওকে ঘরে থাকতে দেবে না।

ওরা কিন্তু সত্যিই বলেছে। তবু আমরা গৌরীকে ফেলে দিতে পারলাম না। নীলা বলল, “থাক ও আমাদের ঘরে। একটু অসুবিধা হলেও তিন-চারজনে ম্যানেজ করে নেব।”

ডবল বেড রুম হলেও তিনজন করে স্টুডেন্ট একটা রুম শেয়ার করছিল। সেখানে গৌরীকে নিয়ে চারজন হয়ে গেল। একটু অসুবিধা হল তো বটেই। তবে আমরা সবাই এত হা হা হি হি করেছি, যে ওটুকু মাথাই ঘামাইনি।

মুশকিলটা হল গভীর রাতে, যখন সবারই ঘুম পেয়ে গেছে। পাশের ঘরে মৌমিতা, রমা আর সোমার ঘুমোনোর কথা। কিন্তু রমা কিছুতেই যেতে রাজি হল না। আসলে সোমার সঙ্গে ওর ঝগড়া হয়েছে একটু আগেই। তাই একদম ইচ্ছে না থাকলেও নীলা ওই ঘরে ঘুমোতে চলে গেল। আমি, রমা, শিপ্রা আর গৌরী কোনোমতে একটা খাটে গাদাগাদি করে ঘুমোলাম। ফলে আমার আর নীলার আর আড্ডা মারা হল না।

গভীর রাত তখন। হঠাৎ দরজায় দুমদুম করে কেউ ধাক্কা দিচ্ছে শুনে উঠে বসলাম। এদিকে ম্যাডামরা বলে দিয়েছেন, ওঁদের কারোর গলার আওয়াজ না শুনে যেন দরজা না খুলি।

তারপর কিছু উত্তেজিত ক্লাস নাইনের মেয়ের আওয়াজ শুনলাম। দরজা খুলতেই দেখি কয়েকজন দাঁড়িয়ে আছে। জিজ্ঞাসা করলাম, “কী ব্যাপার রে?”

“তোমরা আমাদের ক্লাসের শ্রুতিকে কোথাও দেখেছ?”

“না তো, আমরা ঘুমোচ্ছিলাম। তোরা তো ডরমিটরিতে ছিলি, তিনতলায়। সেখান থেকে কোথায় গেল মেয়েটা?”

ততক্ষণে দুজন ম্যাডামও এসে গেছেন। শ্রুতি জল ভরতে বাইরে গিয়েছিল, তারপর অনেকক্ষণ আসছে না দেখে কয়েকজন মিলে বাইরে বেরিয়ে তিনতলাটা খুঁজেছে, তারপর আমাদের ডাকতে এসেছে। ম্যাডামদের ভয় পায় তাই আগে আমাদের ডেকেছে। আসলে নীলা খানিকটা সর্দার টাইপের তো, ওরা ভেবেছে আগে ওকেই ডাকা উচিত। কিন্তু নীলা তো পাশের ঘরে ঘুমোচ্ছে। ওকে ডাকলাম। তারপর সবাই মিলে পুরো হোটেল তন্নতন্ন করে খোঁজা হল। কোথাও নেই শ্রুতি।

শেষে নীলা বলল, “একবার ছাদে গিয়ে দেখলে হয় না?”

নীলা, আমি আর আরও দুটো ক্লাস নাইনের মেয়ে কাকলি ম্যাডামের সঙ্গে ছাদে গেলাম। কিন্তু পুরোটা যেতে হল না। সিঁড়ির ল্যান্ডিংয়েই দেখি দু-হাতে মুখটা ঢেকে বসে আছে শ্রুতি। থরথর করে কাঁপছে, প্রচণ্ড ভয় পেয়েছে যেন।

“শ্রুতি! অ্যাই শ্রুতি! কী হল? তোকে সবাই কত খুঁজছে। আয়, আর ভয় পাস না, আমরা এসে গেছি।”

“নীলাদি শোনো, গৌরীদি…”

নীলা আর আমি একটু থমকে দাঁড়ালাম।— “গৌরী? ও তো আমাদের সঙ্গেই ঘুমোচ্ছিল!”

হাউহাউ করে কেঁদে ফেলল শ্রুতি। ওকে শান্ত করতে একটু সময় লাগল। যা বুঝলাম, ও জল ভরতে যেতেই একজন ওর ঘাড়ে লাফিয়ে পড়ে। সে যদিও গৌরীর মতোই দেখতে, কিন্তু নাকি ওর থেকেও বেঁটে। কোনোমতে পালিয়ে ও লুকিয়ে পড়েছে এখানে। করিডরে অন্ধকার ছিল, কিন্তু এখানে একটা বাল্ব আছে। তাই সেই আলো জ্বেলে ও লুকিয়ে বসে আছে। আমাদের ডাকতে সাহস পায়নি যদি গলার আওয়াজ শুনে ওই অদ্ভুত জীবটা চলে আসে! বার বার বলছে জীবটাকে গৌরীর মতো দেখতে, কিন্তু অনেকটা ছোটোমতো।

নীলা শুধু একবার হুঁ বলে চুপ করে গেল। আধঘণ্টা লাগল ভয় ভাঙিয়ে নীচে গিয়ে ওকে ওর ঘরে শুইয়ে আসতে। তারপর কাকলি ম্যাডাম ঘরে যাওয়ার পরেই আমরা আমাদের ঘরে গেলাম। দেখি ও মা, এত কাণ্ড হয়ে গেল, সবাই জেগে চিন্তিত মুখে বসে আছে, শুধু গৌরী খাটের এককোণে নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে।

ওকে আর ডিস্টার্ব করলাম না, কথা তো কালও বলা যাবে। নীলা চলে গেল ঘুমোতে, আমিও ঘুমিয়ে পড়ব, এমন সময়ে রমা বলল, “একটা কথা শোন।” বলে গৌরীর দিকে একনজর তাকিয়ে আমাকে টেনে ঘরের কোণে নিয়ে গেল। ফিসফিস করে বলল, “জানিস, যখন দরজায় দুমদুম আওয়াজ হল, আমি ঘুম ভেঙে দেখি গৌরী কিন্তু আমার পাশে নেই। আবার যখন শ্রুতিকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বলে আমরা করিডরে জটলা করছি, নীলা এল, তোরা খুঁজতে গেলি, তখন ঘরে ফিরে দেখি গৌরী যেমন আমার পাশে শুয়ে ঘুমোচ্ছিল তেমনই ঘুমোচ্ছে।”

বলতে বলতে একবার ঢোঁক গিলল রমা। তারপরে বলল, “শোন, আমি সকালে বাসে ওর পাশে বসেছিলাম, তখন কিন্তু নখে কোনও নেলপলিশ ছিল না। এখন দেখ, হাতে কেমন বড়ো বড়ো নখ আর লাল নেলপলিশ। নখ বড়ো হলই-বা কীভাবে? আমাদের ইস্কুলে তো খুব কড়া করে চেক করা হয়।”

বললাম, “খেয়াল করিসনি হয়তো, অত চিন্তার কিছু নেই। যা ঘুমিয়ে পড়।”

শিপ্রা অলরেডি ঘুমিয়ে পড়েছে। রমা শুতে গিয়ে হঠাৎ কেমন একটা কাঁপা গলায় বলল, “এই নলিনী, এই দেখ,” বলে বিছানার একটা জায়গায় টর্চের আলো ফেলল। তাকিয়ে দেখি, গৌরীর মাথা থেকে রাশি রাশি উকুন বেরিয়ে রমার বালিশের ওপরে গোল হয়ে একটা কালো বৃত্ত তৈরি করছে। দেখেই গা ঘিনঘিন করে উঠল।

রমাকে বললুম, “এই তুই বেরো, পাশের ঘর থেকে নীলাকে ডেকে নিয়ে আয়।”

রমা সন্তর্পণে পা টিপে টিপে ঘর থেকে বেরোল। আমি দরজাটা আস্তে করে ভেজাতেই একটা খুট করে আওয়াজ হল, আর আমি পেছনে তাকিয়েই দেখলাম, গৌরী উঠে বসেছে। অন্ধকার ঘরেই আমি দেখতে পেলাম, কারণ গৌরীর চোখ দুটো লাল হয়ে জ্বলছে, যেন রেডিয়ামের অ্যালার্ম ক্লক।

অসম্ভব খসখসে গলায় বলল গৌরী, “কী রে! ভাবছিস আমি বুঝতে পারব না তুই কে?”

“যা শালা, আমি কে? আমি তো নলিনী। তোর ক্লাসমেট।”

“নলিনী? ক্লাসমেট? হাঃ হাঃ… কত যুগ ধরে অপেক্ষা করে আছি আমি তোর জন্য। আগেরবার তোর জন্য আমার বাবার হাত কেটে গিয়েছিল, কোনোমতে বাড়ি ফিরেছিল, কিন্তু অনেক রক্ত বেরিয়েছিল বলে মরে গেছে।”

“কীসব বলছিস? কাকুকে তো আমি কখনও দেখিইনি। আর ওভাবে বলতে হয়?”

“তুই আমাকে এখনও চিনতে পারিসনি? আমার গোষ্ঠীর সবাইকে তুই আর তোর ভাই মিলে মেরে ফেলেছিলি। আমি খুব ছোটো ছিলাম বলে সে-বারে আমাকে নিয়ে যায়নি।”

“তুই কি পাগল হয়ে গেছিস গৌরী, কী হল তোর?”

“আমি গৌরী নই। গৌরী তো ওই গুমটির পেছনেই পড়ে আছে। কিন্তু এত যুগের প্রতিশোধ আমি আজ নেবই। তোর আজকে শেষ দিন।” বলেই গৌরী উঠে দাঁড়াল।

পরিষ্কার বুঝতে পারছি, কিন্তু এ কী? গৌরী এত বেঁটে কেন? ও তো আমার থেকেও লম্বা ছিল। এখন ম্যাক্সিমাম তিন ফুটের হবে। গৌরী যদি ওই গুমটিতেই থাকে, তাহলে এ কে?

আমি পাগলের মতো শিপ্রাকে ডাকছি, “শিপ্রা! শিপ্রা! উঠে পড় এখনই।”

ধড়মড় করে শিপ্রা উঠতেই বললাম, “বাথরুমে গিয়ে দরজা লাগিয়ে দে, কুইক!”

শিপ্রা বলল, “আর তুই?”

বললাম, “তুই আগে যা।”

গৌরী বা গৌরীর মতো দেখতে জীবটা এবার আমার দিকে এগিয়ে আসছে। আমার হাতের কাছে কিচ্ছু না পেয়ে টর্চটাই ছুড়ে দিলাম, কিন্তু কিছুই হল না। ঘরের মধ্যে বোঁটকা গন্ধটা তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। গৌরীর আমাকে মারতে হবে না, এই গন্ধতেই আমি দম বন্ধ হয়ে মারা যাব।

ঘরে অন্ধকার। গৌরীর চোখ দুটো ছাড়া আর আমি কিছুই দেখতে পাচ্ছি না। সেটা এখন আমার খুব কাছে। হঠাৎ আমার পা ধরে টানল দুটো লোমশ হাত। কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমি পড়ে গেলাম, আর দুটো লোমওয়ালা লম্বা হাত আমার গলা চেপে ধরেছে। আমি নিশ্বাস নিতে পারছি না। বুকের ওপরে একটা ভার, যেন কেউ চেপে বসেছে আমার ওপর।

এভাবে আমি মরে যাব? বাবা-মা কত মানা করেছিলেন, তবু বেড়াতে এসেছিলাম। এখন বাড়িতে আমার লাশ ফিরে যাবে? উফ্‌… নীলা…

হঠাৎ করে যেন ভারমুক্ত হলাম। ওহ্‌, এটাই মৃত্যু? বেশি কষ্ট হল না তো! ওই গৌরীটা আমাকে মেরে ফেলেছে? এবার? ও কি নীলাকেও মেরে ফেলেছে? তাহলে নীলা আমার দিকে তাকিয়ে আছে কেন? ধ্যাত, মরেও শান্তি নেই, মুখে জল দিচ্ছে কে? বিরক্ত হয়ে কাশতে কাশতে উঠে বসলাম। দেখি সেই ঘরই, গন্ধটা অনেকটা হালকা হয়েছে। গৌরী, মানে ওই জীবটা নেই। নীলা উদ্বিগ্ন মুখে আমার দিকে তাকিয়ে।

বললাম, “কেসটা কী বল তো? এটা কে? এ আমাকে মারতে কেন এসেছিল? কে একে তাড়াল? তুই কখন এলি?”

“দাঁড়া দাঁড়া, তুই ঠিক আছিস কি না আগে বল। রমা আমাদের ঘরে গিয়ে দরজা খুটখুট করছিল, সোমা আমাকে কিছুতেই দরজা খুলতে দিচ্ছিল না ওর এত ভূতের ভয়, তাই একটু লেট হল। ঘরে ঢুকেই দেখি লাল চোখওয়ালা কিছু একটা বসে আছে মেঝেতে। ঘুটঘুটে অন্ধকার। আলোটা জ্বালতেই ব্যাটা চোখে হাত দিল। দেখি ওর নীচে তুই। বুকের ওপর উঠে তোর গলা চেপে ধরেছে। তারপর আমি মেঝে থেকে টর্চটা তুলে ওর মাথায় এক ঘা দিতেই আমার দিকে তাকাল, তারপর সোজা জানালা দিয়ে নীচে ঝাঁপ মারল।”

রমা এসে বলল, “নীলাকে কেন এত ভয় পেল কে জানে বাপু। শিপ্রা কই?”

বললাম, “আমি ওকে বলেছি বাথরুমে লুকিয়ে থাকতে।”

নীলা বলল, “এটা ভালো বলেছিস। তুইও যেতে পারতিস।”

ক্ষেপে গিয়ে বললাম, “তাহলে ও আমাদের ছেড়ে দিত ভাবছিস? আমার ওপরে মনোযোগ ছিল বলেই তো শিপ্রা পালাতে পারল।”

নীলা কিন্তু আমাদের বলেনি কেন ওকে দেখে ওই প্রাণীটা পালিয়ে গেছে। ওকে আমরা আর খুঁজেও পাইনি।

আমরা তখনই ম্যাডামদের ঘরে গিয়ে জানিয়েছি গৌরী নিখোঁজ, আর ও সম্ভবত ওই গুমটির কাছেই কোথাও একটা আছে। তারপর প্রচণ্ড বকুনি খেয়েছি, বন্ধুর গরহাজিরি এতক্ষণ টের পাইনি কেন সেই অপরাধে। কাকলি ম্যাডামকেও বড়দি খুব বকলেন কারণ, উনিই গুনেছিলেন বাসে তোলার আর নামানোর সময়।

সেই রাতেই কাকলি ম্যাডাম, বড়দি আর বাসের খালাসি ওই গুমটি অবধি গিয়ে গৌরীকে আবিষ্কার করলেন। সে বেচারা তখনও অজ্ঞান। তবে অন্য কোনও ক্ষতি হয়নি, এটা একটা বড়ো কথা।

বার বার জিজ্ঞাসা করার পরেও গৌরী বলতে পারল না ওর সঙ্গে কী হয়েছে। ওর যতদূর মনে আছে, ও ঝোপের ধারে বাথরুমে গিয়েছিল তখন একটা ঝাঁজালো গন্ধ পেয়েছিল। এটুকুই ঘটেছিল। বাড়ির লোকদের গৌরী বা ম্যাডামরা কী বলেছিলেন বা কীভাবে ম্যানেজ করেছিলেন আমার জানা নেই। কিন্তু এই সিরির ব্যাপারটার সঙ্গে গৌরীর ব্যাপারটা মিলে যাওয়াতে সবার আগে আমার মাথাতে নীলার নামটাই এল।

এই সবই ভাবছিলাম নীলার অপেক্ষায় জেগে বসে থেকে। রাত বারোটা বাজে তখন। হঠাৎ মনে হল, আচ্ছা গৌরী যদি গৌরী না হয়, তার মানে সিরিও সিরি নয়। তাই তো! তাহলে ওদের আগেই বলা উচিত ছিল, ইস্‌, ছি ছি…

ফোনটা সবে তুলেছি। তখনই বেল বাজল। হঠাৎ বেল বাজল। খুলে দেখি নীলা এসে গেছে। কুর্তি-জিন্স পরা, স্মার্ট আর কাঁধে একটা ব্যাকপ্যাক শুধু।

“কী রে, তুই এত তাড়াতাড়ি?”

বলে, “খবর পেতেই দৌড়ে এসেছি, তোকে চাপ লাগে রে ভাই। তোর ধারেকাছে ওদের আসতে দেওয়া যাবে না। চল, আমাকে দেখাবি। কোথায়?”

এক নিশ্বাসে কথাগুলো বলেই কাঁধের ব্যাগটা রেখে সোজা হয়ে দাঁড়াল ও।

“দাঁড়া, এতদিন পরে সামনাসামনি দেখা হল, একবার ফ্রেশ হয়ে নে অন্তত।”

“এয়ারপোর্টেই সেরে নিয়েছি। আর সময় নেই। রাতেই ওরা বেশি অ্যাক্টিভ হয়। তুই আগে ঢুকবি বুঝলি, তোকে দেখে ওরা সামলাতে পারে না।”

“ওরা মানে? ওই যে জীবটা? যেটা গৌরী সেজে এসেছিল, সে-ই এবার সিরি হয়ে এসেছে? এখানে? হায়দ্রাবাদে? এতদিন পরে?”

“পরে এক্সপ্লেন করছি। যত টাইম যাচ্ছে তত চিন্তার বিষয় হয়ে যাবে রে। এবার ব্যবস্থা করে ফেলতে হবে। শোন, তোর কাছে ঘি আছে তো?”

“আছে মানে? জানিস চন্দননগর থেকে আনিয়েছি, মর্টন ব্র্যান্ড ঘি, দু-কিলো।”

“বাহ্‌, খুব ভালো। ওটাকে কড়াতে ঢেলে ফুটিয়ে নে, লাগবে।”

“অতটা ঘি?”

“চুপচাপ যা বলছি কর, এখন অত ভাবলে হবে না। পাঁচতলা তো, আমি যাচ্ছি। তুই ঘি নিয়ে আয়।”

ব্যাকপ্যাক থেকে একটা বেঁটেমতো লাঠি বার করে নিয়ে ও লিফটের দিকে এগোল।

“যা, যে ফ্ল্যাটটার সামনে কয়েকজন বসে আছে সেটাই।”

মিনিট পাঁচ-সাতের মধ্যেই ফুটে গেল ঘি। ভাগ্যিস একটা স্টিলের বালতি কিনে রেখেছিলুম, নইলে ওটা নিয়ে যাওয়া একটা ব্যাপার ছিল।

পাঁচতলায় গিয়ে দেখি কেউ নেই। শুধু নীলা দাঁড়িয়ে। বললুম, “ব্যাপার কী? সব কোথায় গেল?”

নীলা বলল, “গাধাই থেকে গেলি। আগেবারের অভিজ্ঞতাতেও বুঝতে পারিসনি, ওই জীবটা সিরি নয়। আসল সিরি কোথাও একটা রয়েছে অজ্ঞান হয়ে। তাই ওর বাড়ির লোকেদের খুঁজতে পাঠিয়েছি কবরস্থানে। তুই ওদের আগে বলে দিলে মেয়েটা আর একটু যত্ন পেত।”

“মাথাতেই আসেনি রে। সবে ফোন করতে যাচ্ছিলাম এটা বলতেই, তখনই তুই এসে গেলি।”

“যাক গে’, যা হওয়ার হবে। তুই আগে ঢোক।” বলল নীলা।

“মানে? আমি কেন আবার? তুই-ই তো বললি যে আমাকে এক্সট্রা অপছন্দ করে ওরা?”

“তুই ঘিয়ের বালতিটা নিয়ে ঢোক, কাছে এলেই দিয়ে দিবি গায়ে। আর শোন, ভেতরে অন্ধকার। ওরা আলো পছন্দ করে না। অন্ধকারে ভালো দেখতে পায়। তাই…” বলে মোবাইলের টর্চটা জ্বেলে আমার নাইট শার্টের পকেটে ঢুকিয়ে দিল।— “এটা থাক। আমি পেছনেই আছি। একদম ভয় পাবি না।”

বুকের মধ্যে এত জোর ঢিপঢিপ করছে কী বলব, আগের বারে প্রায় মরতে মরতে বেঁচেছিলাম। কোনোমতে ঘরে ঢুকলাম। ঘরে সেই চেনা উগ্র গন্ধ। টিভির সামনে মেঝেতে খানিকটা কাঁচা মাংস, হাড়-টাড়, আর তখনও খাচ্ছে ওই জীবটা!

এবার এটাকে সিরির মতো দেখতে খানিক, সেইসঙ্গে আবার কোঁকড়ানো রুক্ষ চুল, সেই তিন ফুটের মতো হাইট আর সেই লোমশ হাত-পা আর তীক্ষ্ম দাঁতের সারি।

ফোনের আলোটা চোখে পড়তেই হাত দিয়ে চোখটা আড়াল করে নিল সে। তারপরে কর্কশ স্বরে বলল, “তোর অপেক্ষাতেই ছিলাম রে শয়তান। এতদিন পরে তোকে খুঁজে পেয়েছি, এবার আর তুই বাঁচবি না!”

বলেই চার হাতে-পায়ে ঠিক বাঁদরের মতো এগিয়ে এল। আর আমি সর্বশক্তি দিয়ে ওই গরম ঘিটা ছুড়ে দিলাম ওর গায়ে। জঘন্য একটা পোড়া গন্ধ লাগল নাকে। জীবটা পিছিয়ে গেল। বলল, “তোর মনে আছে?” পরিষ্কার বাংলায় বলল। আমি শুনে হাঁ!

মনে আছে? মানে কী মনে থাকার কথা আমার? কিন্তু সেটা বলার সময় নয়। বললাম, “তুই কে? কেন আমার পেছনে পড়ে আছিস?”

বলল, “আরে ভুলে গেছিস? আসলে তোরা মানুষরা আর কীই-বা মনে রাখতে পারিস? তোর দিদিকে জিজ্ঞাসা কর।”

“দিদি? আমার? কী যা তা বলছিস, আমার কোনও দিদি-টিদি নেই।”

“কেন ওই মেয়েটা, যে তোকে বাঁচিয়েছিল, সেই তো তোর দিদি রে! মা আলাদা অবশ্য।”

মানে? কী যে বলছে আমি বুঝতেই পারছি না। খানিকটা যেন হতভম্ব হয়ে গেলাম।

পেছনে খুট করে একটা শব্দ আর সারা ঘরে আলো জ্বলে উঠল।

“মানে আমি বলছি। আগে এটাকে শেষ করি।” বলে আমার পেছন থেকে বেরিয়ে এল নীলা।

কী অদ্ভুত সাহস ওর চোখে-মুখে আর হাতে একটা লাঠি। হাতটা তুলে বলল, “লালকমলের আগে, নীলকমল জাগে আর জাগে এই তলোয়ার!”

হঠাৎ দেখলাম লাঠিটা একটা লম্বা তলোয়ারে পরিবর্তিত হয়ে গেছে। এই দৃশ্যটা আমি কোথাও একটা আগেও দেখেছি। আমার মনে হল…

তারপরের ঘটনা অতি সংক্ষিপ্ত। নীলা তরোয়ালটা সোজা চালিয়ে দিলো খোক্কসটার বুকে। হ্যাঁ, সত্যিই তো, ওগুলোকে খোক্কসই বলে। মনে পড়ে গেছে আমার। আর খোক্কসটা কেমন যেন তেড়েবেঁকে শেষ হয়ে গেল। মেঝেতে পড়ে থাকল শুধু খানিকটা পোড়া লোম আর অনেকটা কালো রঙের রক্ত।

***

আসল সিরিকে পাওয়া গেছে। ওকে নিয়ে মণিকারা হসপিটালে গেছে, জ্যোতি-আম্মাও সঙ্গে গেছে।

সোফাতে ক্লান্ত হয়ে বসে ছিলাম আমি। একটা রাতে যা-সব অভিজ্ঞতা হয়েছে… কিন্তু… কিন্তু আমি ভাবতে পারছি না, বাব্বা! নীলা… আমার দিদি?

নীলা তরোয়ালটা পরিষ্কার করে বিড়বিড় করে কী একটা মন্ত্র পড়তেই সেটা আবার একটা ছোটো বেঁটে লাঠিতে পরিণত হল। সেটাকে ওর ব্যাকপ্যাকে ঢুকিয়ে সোফায় এসে বলল, “চা খাওয়াবি? তারপর সব বলছি। কাকুর ওপরে রাগ করিস না, উনি কিছুই জানেন না।”

যন্ত্রের মতো গিয়ে চা করে আনলাম।

চা খেতে খেতে নীলা বলল, “তুই আমাকে এত বছর পরে ফেসবুকে খুঁজে পেয়েছিস, এটা একশো শতাংশ সত্যি নয়। তুই চিরকালই আমার নজরে ছিলি। কিন্তু গৌরীর ঘটনাটার পরে আমি বুঝেছিলাম, তোর সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব থাকলে তোর জীবনে বিপদ আসতেই থাকবে। সেজন্যেই উচ্চমাধ্যমিকের পরে আমি তোর সঙ্গে যোগাযোগ রাখিনি।”

“আমি, আমি কে? তুই-ই-বা কে?”

“তোর পুরো নাম বল আগে।”

“নলিনী লাল। লালটা যদিও বাঙালি পদবি নয়। তবু আমরা বহুবছর ধরে বাংলায় আছি, তাই…”

“আমি জানি। আমাকে বলতে হবে না। আমার পুরো নাম জানিস?”

“নীলোৎপলা সেনগুপ্ত।”

“দুটো নামকে পাশাপাশি ভাব। কিছু মিল পাচ্ছিস?”

প্রথম মিনিটে কিছুই বুঝতে পারলাম না। তারপরে হঠাৎ করে মাথায় এল— “লাল পদ্ম আর নীল পদ্ম, মানে লালকমল আর নীলকমল?”

“রাইট। আমাদের গল্পই লেখা রয়েছে দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদারের লেখা ঠাকুমার ঝুলিতে।”

“কিন্তু, তারা… ওরা তো ছেলে ছিল, আমরা তো মেয়ে!”

“তুই মানুষের সন্তান, তোর পরের জন্ম রয়েছে। আমার নেই। কিন্তু আমি ইচ্ছেমতো রূপ ধারণ করি। এই দেখ।”

ও মা, দেখি আমার পাশে দাঁড়িয়ে মিটিমিটি হাসছেন আমারই অফিসের বস।

“স্যার, আপনি?”

“আমিই নীলকমল, আমিই নীলোৎপলা, আমিই তোর বস নীলাব্জ ব্যানার্জি। বললাম না, তোর পাশ থেকে কখনও সরিনি। আসলে সম্ভব ছিল না। তোকে নজরে নজরে না রাখলে ওরা তোর ক্ষতি করে ফেলতে পারত।

রাক্ষসের আক্রমণে তোর আসল মা মারা গেছিলেন হসপিটালেই। আমিই তোকে কাকু-কাকিমার কাছে দিয়েছিলাম। ওঁরা তোকে নিয়ে পালিয়ে কলকাতায় আসেন। নাম চেঞ্জ করেন নিজেদের। ওঁদের ওপর রাগ করিস না, আমিই মানা করেছি। ওঁরা সেই চাষি ভাইয়ের বংশধর, যার কথা ঠাকুমার ঝুলিতে রয়েছে।”

আমার মাথাটা এবার খারাপ হয়ে যাবে। কিন্তু এত কিছুর মধ্যে একটা ভালো জিনিস হয়েছে। নীলা, আমার নীলা, আমার সবথেকে প্রিয় বন্ধু, আমার দিদি, মানে আমার দাদা… ধুত্তোর!

জড়িয়ে ধরলাম ওকে।

আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, “সাহস এসেছে এবার তোর? অনেক এমন জীব আছে জগতে। যাবি আমার সঙ্গে শিকারে?”

চোখ-টোখ মুছে বললাম, “একদম। চাকরিবাকরি ছাড়ি আগে, সোমবার রেজিগনেশন দিয়ে দেব, অ্যাক্সেপ্ট করে নিস।”

“শোন, একমাস সময় দিচ্ছি, ওজনটা কমা। তারপর তোর ট্রেনিং শুরু হবে।”

“এতদিন পরে বন্ধু পেলাম, আজকে জোনাথনস কিচেনে সলিড পার্টি করে নিই, কাল থেকে পাক্কা।” বললাম আমি।

“তুই আর বদলালি না।” বলে হেসে উঠল নীলা, মানে নীলকমল।

জয়ঢাকের গল্পঘর

Leave a Reply