ধারাবাহিক অভিযান-দি শাইনিং মাউন্টেন-পিটার বোর্ডম্যান- পর্ব ৮-অনুবাদ ইন্দ্রনাথ-বর্ষা ২০২৩

জয়ঢাকের অভিযান লাইব্রেরি- ভারেস্ট-এরিক শিপটন(অনু-বাসব চট্টোপাধ্যায়)  অন্নপূর্ণা-মরিস হারজগ(অনু তাপস মৌলিক) কন-টিকি অভিযান- থর হেয়ারডাল (অনু-শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায়)

আগের পর্বগুলো– পর্ব, পর্ব ২, পর্ব ৩, পর্ব ৪, পর্ব ৫, পর্ব ৬, পর্ব ৭

(জো টাসকার-এর লেখা সহ)

obhijaanHead piece Shining mountain (1)

দুজন অভিযাত্রী। হিমালয়ের একটি শৃঙ্গের দুরূহতম ঢাল। সকলেই ভেবেছিল, এমনকি বিখ্যাত পর্বতারোহীরাও, এ অসম্ভব। এ তো আত্মহত্যার নামান্তর। মাত্র দুজন, তাও হিমালয়ের গহন প্রান্তরে, শৃঙ্গ অভিযান? সঙ্গে আর কেউ নেই? যাহ অবিশ্বাস্য! সেকারণেই ১৯৭৬ সালের চ্যাঙাব্যাঙ আরোহণ এক যুগান্তকারী ঘটনা। দুই দক্ষ পর্বতারোহী পিটার বোর্ডম্যান এবং জো টাসকার চ্যাঙাব্যাঙ-এর পশ্চিম ঢাল বরাবর আরোহণের অতুলনীয় কীর্তি স্থাপন করলেন। ২২ আগস্ট ব্রিটেন থেকে রওনা হয়ে ১৫ অক্টোবর পশ্চিম গাড়োয়ালের চ্যাঙাব্যাঙ শৃঙ্গ আরোহণ সেরে ১ নভেম্বর দুজন অভিযাত্রী দেশে ফিরে যান। পরবর্তীকালে, দুর্ভাগ্যজনকভাবে ১৯৮২ সালে এভারেস্টের উত্তর পূর্ব গিরিশিরা বরাবর আরোহণ অভিযানের শেষ পর্বে চূড়ায় ওঠার ঠিক আগে দুজনেই দুর্ঘটনার কবলে পড়ে চিরকালের মতো হারিয়ে যান। ব্রিটিশ তথা পৃথিবীর সর্বকালের সেরা পর্বতারোহীদের মধ্যে এই দুই পর্বতারোহীর নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে।   

দি আপার টাওয়ার

৯ – ১৩ অক্টোবর।

এক নম্বর শিবিরটা নীচে ছোটো হয়ে আসছে—বাগিনি আর দুনাগিরির দিকে বেঁকে যাওয়া ধারের ওপর একটা ছোট্ট নীল বিন্দু—আমার অনেকটা নীচে। শব্দ বলতে আমার মাথার ওপরের হুডের কোনা দুটোয় হাওয়া লাগার শব্দ আর জুমার ঠেলে ঠেলে দড়ি বেয়ে নিজেকে ওপরে নিয়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গে হাঁপ টানার শব্দ। চড়ার সমস্যাটায় ফিরে আসছিলাম আবার, মজবুত লাগছিল নিজেকে। ক্রমশ ভোরের আলোয় আমার চারপাশটা নির্মল লাগছিল। সদ্য পড়া তুষার, কঠিন স্ফটিকের মতো গ্রানাইট, মায় বাতাস অবধি মনে হচ্ছে নতুন সৃষ্টি হয়েছে। যে বিপদের মুখে উন্মোচিত হয়েছি, তার একটা সাংঘাতিকরকম পরিচ্ছন্নতাও রয়েছে।

আমার দুশো ফুট নীচে জো, শিপটন কল থেকে আনা কয়েকটা ছোটো ছোটো দড়ি লাগাচ্ছিল এক নম্বর শিবিরের ওপরের পাথরের ধাপগুলোয়। ও নীচ থেকে উঠতে উঠতে ব্যালকনির নীচের ফিক্স রোপগুলো খুলে সঙ্গে নিয়ে ওঠার কাজটা করতে রাজি হয়েছিল। ওর বোঝা কমাতে আমি সমস্ত সরঞ্জামগুলো বইছি।

পাহাড়ে থাকাকালীন এইটাই ছিল আমাদের সবচেয়ে তাড়াতাড়ি বেরোনো। রাতে আমার ভালো ঘুম হয়নি। মাঝে-মাঝেই ঘুম ভেঙে গিয়ে চড়ার রাস্তাটার কথা ভেবেছি। রাত তিনটের সময় ঠিক করলাম, আর ঘুম-টুম হবে না। নিঃশব্দে জো-র ঘুম না ভাঙিয়ে অন্ধকারে তাঁবুর দরজা দিয়ে গলে বাইরে জমতে থাকা কিনারের বরফ খানিকটা ভেঙে নিয়ে চায়ের জল চাপিয়ে দিলাম। ‘চিরাচরিত,’ মনে মনে ভাবলাম, ‘বাজি ধরতে পারি, আরও ঘণ্টা তিনেক তিনি নড়াচড়াও করবেন না।’ আর করেওনি। সে যাই হোক, আমরা প্রথম আলো ফুটতেই সাড়ে ছ’টাতেই বেরিয়ে পড়েছিলাম।

পরিকল্পনা ছিল, প্রথম হ্যামকে বিভক করেছিলাম যেখানে, সেইখানে, ব্যালকনির নীচে খোঁচা অংশটার তলায় যে ছ’টা টেরিলিন দড়ি ঝুলছে সেগুলো সবক’টা টেনে তুলে নেব। এগুলোর সঙ্গে তুষারক্ষেত্রে লাগানো দড়িগুলো নিলে আপার টাওয়ারে ফিক্স রোপ লাগানোর জন্য যথেষ্ট হবে। এভাবে চললে ওভারহ্যাঙের ওপরও আমরা দুটো দড়ি বাঁধা অবস্থাতেই রেখে যেতে পারব। আমরা জানতাম যে এগুলোও যদি খুলে নিই, আমরা কখনোই আর ফিরতে পারব না। মনে গেঁথে ছিল একটা দুঃখজনক পরিণতি—১৯৩৬ সালে আইগারে প্রথমবার হিন্টারস্টইসার ট্র্যাভার্স পেরোনোর পর, দড়িদড়া খুলে তুলে নেওয়ায় শেষ অবধি টনি কুর্জ সহ চারজন আরোহীকে মারা পড়তে হয়; ওরা ফিরতে পারেনি। জো আর আমি ফেরার পথটা পুরোপুরি ছিন্ন করে দেবার জন্য রাজি ছিলাম না। হ্যামকের পরিকল্পনাটা কাজে লেগে গেলে আমরা হয়তো পাহাড় বেয়ে ধীরে ধীরে উঠতাম, সারাদিনের চড়া যেখানে শেষ হত, সেখানেই থেকে যেতাম। কিন্তু এখন, ওপরের তুষারক্ষেত্রে যদি একটা ক্যাম্প তৈরি করতে পারি, তাহলে ওখানে থেকে প্রতিদিন আমাদের কাজ করতে হবে এবং প্রতিদিনই জুমারিং এবং প্রুশিকিং করার বাধ্যতামূলক ঝুঁকিটা নিতেই হবে।

অবাক হয়ে গিয়েছিলাম, জুমারিংটা কী সুন্দর এবং সহজে হয়ে গেল দেখে। আমি জাপানিদের অভিযানের শিবিরের জায়গা থেকে নিয়ে আসা দুটো লম্বা বাঁশের লাঠি বইছিলাম। ও-দুটোকে স্যাকের ভেতর যতটা নীচে পারা যায় ঠেসে ঢুকিয়ে দিয়েছিলাম। এখন ওগুলোর ডগা আমার মাথার ছাড়িয়ে ওপরে অদ্ভুতদর্শন অ্যান্টেনার মতো বেরিয়ে আছে, যেন আমার এগোনোতে ওগুলোর গুপ্ত কোনও ভূমিকা রয়েছে। আমি আমার একহারা ডাউন স্যুটটা পরেছিলাম, তবু সূর্য উঠলেও ততটা গরম লাগছিল না। আবহাওয়া ক্রমাগত ঠান্ডা হয়ে চলেছে। টনি কুর্জ পিচ-এর অংশটার ওপরে তুষারক্ষেত্রের নীচের খাড়া দেওয়ালে জুমারিং করতে করতে ডাউন স্যুটের অনেকটা অংশ ছিঁড়ে ফেলায় যথারীতি লাট খাচ্ছিলাম। দড়ি ধরে বাকি অংশ ওঠার সময় আমার পোশাক থেকে নীচের দিকে বেরোনো পালকের স্রোত বাতাসে উড়ছিল, পশ্চিম দেওয়াল বরাবর ওপরে নীচে বইতে থাকা ঠান্ডা বাতাসের ধাক্কায় পালকগুলো আশেপাশে উড়ে বেড়াচ্ছিল। এখন প্রাণপণ ঠেলে ওঠার মধ্যে একটু জিরিয়ে নেবার সময় বরফের দিকে ঠায় তাকিয়ে থাকার বদলে কয়েকশো ফুট ধরে উড়তে থাকা পালকের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছি, এমন পালক উড়ছে যেন মেলায় কোনও বাচ্চা ছেলে বেলুন ওড়ানোর প্রতিযোগিতায় গিয়েছে। কিন্তু ব্যাপারটা বেশ মূল্যবান খেলা হয়ে গেল। ঠিক করলাম, ভবিষ্যতে ডাউন স্যুটের ওপর আমার ওভারস্যুটটাও পরে নেব।

সর্বোচ্চ বিন্দুতে আড়াইটে নাগাদ পৌঁছোলাম; ভালো ব্যাপারটা এই যে, দেখলাম, আমাদের রেখে যাওয়া খাবারদাবার, জ্বালানি, সরঞ্জাম সব যেমন-কে-তেমনই আছে। সঙ্গে বয়ে আনা খাবার আর জ্বালানি মিলিয়ে আমাদের কাছে এক সপ্তাহের রসদ আছে, বা খুব গোলমেলে অবস্থায় জরুরি প্রয়োজনে দশ দিনের মতো চলবে। নিজেদের তাজা আর চনমনে লাগছিল তখনও। আমি জানতাম যে আমি বেশ খানিকটা ওজন খুইয়েছি এবং অনেকটা শক্তপোক্ত ও ভেতরে ভেতরে জোরদার হয়েছি; এছাড়া গত কয়েক সপ্তাহের খাটাখাটুনিতে মাংশপেশিগুলোও লোহার মতো হয়ে উঠেছে। আবার এটাও জানতাম যে এই অনুভূতিটা বেশিদিন থাকবে না। যা হোক, এই মুহূর্তে আমার দেহ ও মন এক্কেবারে সুরে সংগত করছিল, যেন আমার অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলোকে আমি আমার ইচ্ছেমতো যে-কোনো পরিস্থিতিতে নিয়ে যেতে পারি, যতক্ষণ তারা পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছনোর প্রক্রিয়াতে লেগে থাকছে।

এরপরের আসল সমস্যাটা হল দু-নম্বর শিবিরের জন্য একটা জায়গা খুঁজে বার করা। আমি দড়ি থেকে নিজেকে খুলে নিয়ে ফিক্স রোপের ওপরের পাহাড়ের গা বরাবর পাথর বরফের মিশ্র জমিটা একা-একাই উঠে দেখছিলাম। পনেরো ফুট মতো উঠে সংবিৎ ফিরল আমার, ঠিক করলাম ফের দড়িতে নিজেকে আটকানো যাক। একবার পা পিছলে গেলে নিজেকে আর কোনোরকম সুযোগ দেওয়া যাবে না, নির্বুদ্ধিতা হবে। তুষারক্ষেত্রের ওপরে জো তখনও আমার অনেকটা পেছনে, সুতরাং যে পঞ্চাশ ফুটমতো দড়ি ওপরে রেখে গিয়েছিলাম সেইটে বেঁধে নিলাম। তারপর আরও বেশি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে চড়তে শুরু করলাম। দড়ির অর্ধেকটা উচ্চতা উঠেছি, তার মধ্যে জো পৌঁছে গিয়েছিল। জো আমায় বিলে দিচ্ছিল আর আমি সর্বোচ্চ বিন্দুটার ওপরের প্রায় সত্তর ফুটমতো জায়গা ভালো করে দেখে নিলাম। প্রত্যেকবার একটা পাথরের গায়ে খানিকটা তাকের মতো জায়গা পাওয়া যেতে পারে ভাবছি, কাছে গিয়ে ভালো করে পর্যবেক্ষণ করার পর প্রতিটি বার দেখছি ওর ওপরে শক্ত কঠিন বরফ জমে আছে। আমি গুটিগুটি জো-র কাছে ফিরি। হাওয়ার জন্য ওর কাছে না পৌঁছনো অবধি ওর সঙ্গে কথা বলতে পারছিলাম না।

“ইয়ে, একটাও ভালো চ্যাটালো জায়গা নেই। এখানেই বা যেখানেই হোক বরফ কেটে জায়গা বার করে নিতে হবে।”

আমরা ফুট পনেরোর একটা দড়িতে নিজেদের বেঁধে নিয়ে বরফ কুঠার দিয়ে বরফ কাটা শুরু করলাম।

প্রচুর উৎসাহ নিয়ে শুরু করলাম কাজটা। এই হল পর্বতারোহণ—এক্কেবারে গোড়ার ব্যাপার, মারাত্মক খেলা। ছোটোবেলায় আমি গাছের ওপরে ঘাঁটি বানাতে ভালোবাসতাম, খুঁড়ে খুঁড়ে গুহা বানাতেও ভালো লাগত। এটাও ওই একইরকম বাসা বানানোর মতো, পার্থক্যটা হল উপাদান এবং পরিবেশ-পরিস্থিতির। যদি ঠিকঠাক ভালোভাবে কাজটা না করি, তবে আমাদের ওপর ঘুরঘুর করবে খারাপ আবহাওয়ার হুমকি আর মাথার ওপর তুষার ধ্বসের খাঁড়া। নিরাপদ আস্তানাই সাফল্য এবং ব্যর্থতার মধ্যে পার্থক্য গড়ে দেবে।

বরফ-কাটার কাজটা খুবই পরিশ্রমের। যতক্ষণ না হাঁপ ধরে যায় কিংবা হাত ধরে আসে ততক্ষণ পাগলের মতো বরফ কাটতে থাকি। খুব শিগগিরিই বরফের তলায় পাথর অংশটা বেরিয়ে পড়ল। তার মানে তাকমতো অংশের জন্য এটুকু চওড়াই পাওয়া যাবে। দুনাগিরির ও-পাশে মেঘের মধ্যে সূর্য ডুবে যেতে যেতে আমরা ছ’ফুট লম্বা এবং চওড়ায় একদিকে আড়াই ফুট অন্য পাশটায় সরু হয়ে ফুট দুয়েক মতো দৈর্ঘ্যের একটা অংশ কেটে বার করে নিয়েছিলাম। আমি যতক্ষণে নাট, পিটন, ওপরে লাগানো বরফ-পিটন দিয়ে তাঁবুটাকে টানটান করে নিচ্ছিলাম, জো বাঁশের লাঠি দুটো একসঙ্গে বেঁধে বাঁকিয়ে নিয়ে তাঁবুর দরজায় আড়াআড়ি লাগিয়ে দিল। ও টেন্টের গায়ের দড়িগুলোর সঙ্গে পাথরের নুড়ি বেঁধে তার সঙ্গে দড়ি দিয়ে হ্যামকের স্পেসার বারগুলো টান করে বেঁধে বরফে গেঁথে তাঁবুর খুঁটি তৈরি করেছিল।

সূর্য অস্ত যাবার আগেই আমি যে পিচটা চড়া শুরু করেছিলাম সেটা শেষ করে ফেলেছিলাম। এই আরোহণটা একটু বেখাপ্পা, কিন্তু নীচের তুষারক্ষেত্রের তুলনায় বেশ সহজ, হেঁটে ওঠার মতো। মনের মধ্যে একটা আলোড়ন উঠছিল, ভাবছিলাম গোটা আপার টাওয়ারটাই এমন হলে চড়াটা খুব তাড়াতাড়িই হয়ে যাবে।

বহু ওপরে পাহাড়ের গা থেকে সূর্যের শেষ আলোটাও মুছে গেল, আর আমাদের ‘বাসা’ও প্রস্তুত।

“মনে তো হচ্ছে না যে খুব একটা জায়গা পাব।” আমি বলি।

“আমাদের নিজেদের ভালো করে বেঁধে-ছেঁদে নিতে হবে।” জো বলে।

“ওটাই বিরক্তিকর। তাঁবুর একটা অংশ খুলে রাখতে হবে দড়িটা যাবার জন্য। স্লিপিং ব্যাগের মধ্যেও আমাদের হারনেস পরে থাকতে হবে।”

আমরা আমাদের ফুল বডি হারনেসগুলো নীচের এক নম্বর শিবিরে রেখে এসেছিলাম, শুধু সিট হারনেস কোমরে বেঁধে উঠে এসেছি, ভেবেছিলাম খানিকটা ওজন কমবে আর তাছাড়া ফুল বডি হারনেসগুলো আমাদের ওভারস্যুটের পকেটের ওপর দিয়ে লাগানোর ফলে অসুবিধেও ছিল। এখন এই সিদ্ধান্ত নিয়ে আপশোশ হচ্ছে, কেননা সিট হারনেসে দড়ি আটকানোর জায়গাটা অনেকটা নীচের দিকে। তাঁবুর বাইরে সাজসরঞ্জাম দড়িদড়া মিলিয়ে একটা লণ্ডভণ্ড ব্যাপার, ওগুলো গুছিয়ে গাছিয়ে রাখার পর যে প্রশ্নটা উঠে এল তা হল—‘তাঁবুর বাইরের দিকে কে শোবে?’ যদি জো এখনও লেগে থাকে যে আমাকেই সকালের খাবার বানাতে হবে তাহলে আমি এই প্রশ্নে সহজে ছেড়ে দিচ্ছি না, লড়ে যাব। আমি অবাক হয়ে দেখলাম, ও তাঁবুর যেদিকটা কিনারার ওপরে ঝুলছে সেদিকটায় শুতে রাজি হয়ে গেল।

obhijaanshiningdwitiyashibiredooretibeter pahar

“কয়েক রাত্তিরের জন্য, মনে রেখো।” ও বলে।

তাঁবুর মধ্যে জায়গা এতটাই কম যে এক-একবারে একজনই ভেতরে গুছিয়ে নিতে পারবে। আমি ভেতরে ঢুকে ম্যাট আর হ্যামকগুলো নীচে পেতে, জুতো খুলে স্লিপিং ব্যাগে সেঁধিয়ে গেলাম। জো পাশ দিয়ে গলে গিয়ে একই কাজ করল।

“যিশুর দোহাই, আমার হাঁটুটা কিনারার বাইরে বেরিয়ে আছে।” ও বলে ওঠে।

“বেশ আরামের না?” আমি বলি।

“ভালো যে আমাদের হিসু করার বোতলগুলো এনেছি।” জো বলল, “মাঝ-রাত্তিরে হিসি করার জন্য মোটেও উঠতাম না!”

“মনে করে ওটা বাঁদিকেই খালি কোরো, চাই না যে রান্নার জন্য যে বরফ ব্যবহার করি সেটা নষ্ট হোক।” আমি বললাম।

তাঁবুর মুখে আমার জুতো জোড়ার মধ্যিখানে স্টোভটাকে আটকে চায়ের জল চাপালাম। তাঁবুর পাতলা কাপড় ভেদ করে হাওয়া ঢুকছিল বলে মনে হয় না।

“তুমি আজ রাত্রে ডালমেন বা ভ্যালিয়াম খাবে?” জো জিজ্ঞেস করে।

“দয়া করো, আমার মাথা জুড়ে ডালমেন আর ডালমেন।”

শুক্রবার, অক্টোবরের ন’তারিখ। বি.এম.সি-র পিক এরিয়া মিটিংয়ে থাকা হল না! কায়দা করে লাগানো তাঁবুটা আমাদের বাঁচাচ্ছিল—আস্তানার সমস্যাটার সমাধান হল, মনে মনে আগামী কার্যকলাপের কথা ভেবে আমার চনমনে লাগছিল।

ঠিক করেছিলাম আপার টাওয়ারে আমরা প্রত্যেকে পালা করে এক-একবারে দুটো করে পর্যায়ে আগে যাব অর্থাৎ লিড করব। আমরা প্রত্যাশা করেছিলাম নীচের অংশতে আমরা যেভাবে উঠেছিলাম সেভাবেই ধীরে ধীরে ওপরের টাওয়ারেও উঠব, দেখলাম চারটে দড়ির সমান দৈর্ঘ্য লিড করা এক-একজনের পক্ষে বড্ড বাড়াবাড়ি—দু-দিন পরপর আগে আগে চড়াটা খুবই পরিশ্রমের, আর যদি তুমি পরে পেছন পেছন যাও, তুমি আসলি কাজ করার অনুভূতিটা হারাবে।

পরদিন জো ধরে নেবার আগে আমি আর-একটা দড়ির সমান দৈর্ঘ্য চড়ে নিতে চাইছিলাম।

সকালের ঠান্ডায় চড়ার কাজ শুরু করার বদলটা বেশ একটা উত্তেজনাপূর্ণ ব্যাপার ছিল, ক্যাম্প থেকে সটান ওঠা, আর জুমার করে নয়। কিন্তু আগের দিনের বিকেলের আশাটা শিগগিরই নিভে গেল। চড়ার একমাত্র রাস্তা যা দেখা যাচ্ছিল সেটা পাহাড়ের গায়ে একটা দীর্ঘ অতলান্ত খাঁজ, আর সেটাকে আমার থেকে আড়াল করে একটা বরফের ঢিপি। ঢিপিটার ওপরে উঠতে-উঠতেই ক্লান্ত লাগছিল। চড়াটা কঠিন হয়ে আসছিল, হাওয়া আর ঠান্ডা আমার শক্তি নিংড়ে নিচ্ছিল। আমি এখন পালকের পোশাক আর ওপরে নাইলনের গরম কাপড়ের ওভারস্যুট পরা—গতবছর এভারেস্টে থাকাকালীন যা পরার প্রয়োজনীয়তা দেখিনি, তার চেয়েও বেশি পোশাক পরে আছি এখন। একটা বড়ো দস্তানা কব্জিতে বাঁধা, ঝুলছে, ভেতরের দস্তানাটা পরে থাকায় আঙুল দ্রুত ঠান্ডা মেরে যাচ্ছে। আমি আরও ঠান্ডা না হয়ে যায় এই ভেবে আগে জুতোর ক্র্যাম্পন আটকানোর চেষ্টা করলাম। বাঁদিকে পাথরটার ওপর দিয়ে আড়াআড়ি পার হয়ে নীচে যেখানে ফুলে ওঠা অংশ একটা ওভারহ্যাঙ হয়ে এসেছে সেখানে পৌঁছোলাম। এটায় ফাটল পেরিয়ে একটা ধাপ, কোনোমতে ওটায় উঠে লম্বা ঝুলন্ত পাথরের খাঁজের ওপরে যে বরফ জমে ছিল সেই বরফের দেয়ালের পাশ বরাবর আড়াআড়ি সরে গেলাম। ক্র্যাম্পন লাগানোর চেয়ে আমি বরফের মধ্যে একটা আইস-পিটন গেঁথে দিলাম। ওটা অনেকটা ঢুকে গিয়ে তলায় শক্ত পাথরের গায়ে ঠেকল। যে অংশটুকু বরফের ওপরে বেরিয়ে ছিল তাতে একটা নাইলনের দড়ির ফাঁস আটকে তার ওপরে উঠে দাঁড়ালাম। এইভাবে খাঁজের ওপরের দিকে বরফে একই কায়দা পরপর আরও দু-বার করতেই পাথরের খাঁজের দু-পাশের দেওয়াল নাগালে এসে গেল আর পায়ের সাহায্যে দু-পাশের দেওয়ালে ব্রিজিং করে ফেলতে পারলাম। কয়েক ফুট চড়ে ফেলতেই খাঁজটার মাথায় পৌঁছে গেলাম।

খাঁজটার মাথার ওপরে একটা ছ’ফুটের ওভারহ্যাঙ বসানো। আমি বাঁদিকে একটা দেড় ফুট চওড়া তাকের মতো অংশ দেখতে পেলাম, যেটা বাঁদিকের কোণ দিয়ে উত্তরের দেয়ালের দিকে চলে গেছে। আমি জোকে চেঁচিয়ে সাবধান করে দিয়ে ওটার ওপর দিয়ে গুঁড়ি মেরে এগোলাম। আমার ওপরে পাহাড়ের গা-টা ঠেলে বেরিয়ে এসেছে আর আমি প্রকৃতপক্ষে চার হাত-পায়ে হামাগুড়ি দিচ্ছিলাম। সরু তাকের মতো অংশটা ভয়ানক ছিল, নীচে সান্ত্বনা-দৃশ্যের মতো নরম তুষারক্ষেত্রটাও ছিল না। আমার তলায় সোজা বাগিনি হিমবাহ, চার হাজার ফুটের পতন। পাশের ধরার মতো জায়গাগুলোতে আঙুল বাঁকিয়ে ধরে পাশে সরে সরে কোনাটা পেরিয়ে অন্যপাশে উঁকি দিলাম। নীচের হিমবাহ থেকে আমরা বাইনোকুলার দিয়ে দেখেছিলাম আপার টাওয়ারের ধার বরাবর একটা হেলানো দীর্ঘ খাঁজ, পশ্চিম আর উত্তর দেওয়ালের মাঝামাঝি অংশে। ওটাই ছিল আপার টাওয়ারে আমাদের দেখা একমাত্র সম্ভাব্য চড়ার মতো অংশ আর আমরা আশা করেছিলাম ওই ফাটল ধরেই সোজা একটা চড়ার মতো রাস্তা আমরা পেয়ে যাব। আমরা ওটার নাম দিয়েছিলাম ‘নিশে’। এখন মাথা তুলতেই আমি দেখতে পাচ্ছি সেটাকে, আর ওদিকে তাকাতেও ভয় পাচ্ছি! কোনার ধারটা পুরো খাড়া, বরফে ঢাকা আর দুশো ফুট উঁচু। আমি নীচে জোকে উদ্দেশ করে চেঁচাই।

“নিশেটা দেখলাম। কোনাটা পেরিয়ে গিয়ে রয়েছে। ওটা পাহাড়ের উত্তর ঢালের ওপরে ঝুলে আছে, ওভারহ্যাঙ আর শালা এক্কেবারে অসম্ভব মনে হচ্ছে। ওটায় পৌঁছোনো, তারপর চড়া অথবা ওটার ডগায় পৌঁছে এগোনো। আপার টাওয়ারের ডানদিক ধরে আর কয়েকটা পিচ যদি চড়তে পারি তাহলেই কেবল ওটায় পৌঁছোতে পারব!”

চড়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ব্যাপারটায় আমাদের পারস্পরিক বিশ্বাসের একটা পরিমাপ ছিল ঘটনাটা, জো তক্ষুনি মেনে নিল সবটা, নিজে দেখতেও চাইল না।

ডানদিক দিয়ে ওঠাটাই একমাত্র বিকল্প—একটা পনেরো ফুটের তেরছা ফাটল। আমি সরঞ্জাম ব্যবহার করে চড়ার চেষ্টা করলাম, কিন্তু আমার কাছে যে নাট বা পিটন ছিল কোনোটাই ফাটলটায় কাজে আসত না। ‘ভয়ে সিঁটিয়ে থেকো না তো!’ ভেতরে ভেতরে নিজেকেই বললাম।—‘গ্রিটস্টোন হলে তো ফাটিয়ে দিতে তুমি। এটা একটা লে-ব্যাক করার ফাটল আর মনে হয় না জায়গাটা খুব একটা গোলমেলে হবে। জোরে জোরে কয়েকটা শ্বাস নাও আর লড়ে যাও।’

হাতে ঝুলতেই আমার ওজন যেন দ্বিগুণ হয়ে গেল, আর মনে হচ্ছে জুতোর মধ্যে সিসা ঢোকানো। লে-ব্যাকের মাঝামাঝি পৌঁছোনোর পর ফাটলের ধার থেকে আঙুলগুলো খুলে আসছিল, ফলে আমি হাতের মুঠিটা ফাটলে ঢুকিয়ে পুরো হাতটা ফাটলে ঠেসে আটকে দিলাম, তারপর ওখানে ঝুলে রইলাম যতক্ষণ না শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিক হয়ে আসে। তারপর ফের আবার লে-ব্যাকের অবস্থানে ফিরে লড়াইটা শুরু করলাম, ক্রমশ শক্তি নিঃশেষ করতে করতে উঠে যাচ্ছিলাম। আমার আঙুলগুলো ফাটলের মাথায় অ্যারেটের ধারের ওপরটা আঁকড়ে ধরল। অ্যারেটটা একটু ঘাবড়ে দিয়েছিল—পাথরটা গ্রানাইট, কিন্তু একটু কেমন যেন। কিন্তু আমি ওটাকে সামলে নিয়েছিলাম। শেষ একটা ধাক্কা আর আমি দু-পায়ের ওপরে দাঁড়িয়ে পড়ে বাতাস টেনে হাঁফাতে থাকলাম। পেট ঠেলে এক মুহূর্তের জন্য একটা বমি বমি ভাব উঠে আসছিল; মনে হল বমি করেই ফেলব। একটা পিটন পুঁতে দড়িটা বেঁধে দিয়ে হাওয়ার মধ্যেই চিৎকার করে জোকে বললাম যে ও এবার জুমার শুরু করতে পারে।

আমি ভাবছিলাম, গ্রিটস্টোনে এটা একটা ভালো গ্রেডের ক্লাইম্বই হবে। সিদ্ধান্ত নিলাম ভবিষ্যতে এরকম মারকাটারি পরিশ্রমের চড়া এড়িয়েই যাব। জো-র পাশ দিয়ে নীচে তাকালাম, দু-নম্বর শিবিরের হালকা খয়েরি রঙের তাঁবুটা দেখতে পাচ্ছি, এখন খাড়া দুশো ফুট নীচে রয়েছে। কেবল রামানি হিমবাহ আর ধারের ওপরের এক নম্বর শিবিরটা একটুখানি বিন্দুর মতো দেখা যাচ্ছে। জো আমার নীচেই ঝুলন্ত অবস্থায় ছিল, হাত-পা খাঁজটার দু-পাশে ছড়ানো, একটা দড়ি থেকে ঝুলে রয়েছে। ও পিটনগুলো খুলে নিচ্ছিল।

“দুঃখের, যে তুমি লে-ব্যাকটা মিস করলে।” আমি বলি।

বাড়িতে, আমার এলাকায় পাথরে চড়ার সময় যখন দেখতাম পরের লোকটা একটা কঠিন জায়গায় কসরত করছে, খাবি খাচ্ছে, যেটা ইতিমধ্যে আমি চড়ে ফেলেছি, একটা নির্দয় মনোভাব হত যেটা মনে মনে উপভোগ করতাম। জো ওর বালাক্লাভা, হেলমেট আর জ্যাকেটের হুডের নীচ থেকেও আমার কথা শুনতে পেয়েছিল।

“দেখে তো সত্যিই কঠিন মনে হচ্ছে।” ও বিড়বিড় করে বলে। জুমার কয়েকবার উপরে ঠেলার পরেই ও আমার কাছে এসে পড়ল। এবারে ওর পালা।

নিখুঁত ভারসাম্যে জো আমার মাথার ওপরে কয়েক ফুট চড়ে ফেলল তারপর কোনাকুনি ডানদিকে গ্রানাইটের সরু ঢালু তাকের মতো অংশের ওপরে সাবধানে পা রেখে রেখে একসার ওভারহ্যাঙের তলা দিয়ে উঠতে শুরু করল। একটা খোঁচমতো পাথরে একটা রানার লাগিয়ে চারপাশটা দেখে নিল, অবশ্যই দারুণ মজা পাচ্ছিল।

“চড়াটা বেশ সূক্ষ্ম-কৌশলের ছিল আর রোমাঞ্চকর। ওপরের ধার অবধি টিপ-টো পদ্ধতিতে এগোনো, নীচে অতলান্ত খাদ। তাকমতো অংশটার শেষে একটা চমৎকার খাঁজ, খাড়াই উঠেছে, ওটা একটা স্কটিশ ক্লাইম্বের কথা মনে পড়ায়। আমি ক্র্যাম্পন লাগিয়ে নিলাম। বেশ শক্ত মনে হচ্ছিল কিন্তু আয়ত্বের মধ্যেই। মাঝে মধ্যে জমাট-বাঁধা ঠান্ডা পাথর স্বস্তির কিছু ধরার জায়গা করে দিচ্ছিল আর সেটা যখন ঝুরঝুরে, চড়াটায় একটু বেশিই রোমাঞ্চ এনে দিচ্ছিল। বরফের ঝোরাটার বেশিরভাগ অংশই ব্রিজিং করেই উঠলাম। এটা এমন একটা পিচ যেগুলো আমি সবথেকে বেশি আনন্দ পাই চড়তে—বৈচিত্র্যপূর্ণ, জটিল এবং অনিশ্চিত।”

আমি সূর্যের গতি দেখছিলাম। বুঝতেই পারিনি ছায়াটা গুটিগুটি আমার দিকে চলে এসেছে, কিন্তু অবধারিতভাবেই। ছায়াটা বাগিনি শৃঙ্গ থেকে নেমে এক নম্বর শিবির ছাড়িয়েছে বহুক্ষণ। দেওয়ালটা যত খাড়া হচ্ছে ছায়ার গতিও বেড়ে চলেছে। এক মুহূর্ত দেখতে পেলাম প্রবল হাওয়ার দিকে উন্মুক্ত দক্ষিণ-পশ্চিম গিরিশিরার ওপরে সূর্যের ছটায় তুষারক্ষেত্রের বরফকুচিগুলো ঝিকমিক করে উঠছে। তারপরেই আড়াল থেকে সূর্যটা বেরিয়ে এল আর ছায়াটাও দেওয়াল বেয়ে ওপরের দিকে ছুটে গেল। কিন্তু রোদ আসার সঙ্গে সঙ্গে যতটা উষ্ণতা পাওয়া উচিত ছিল বাতাস আর উচ্চতা দুইয়ে মিলে তাকে হটিয়ে দিচ্ছিল।

দড়িটা থমকে গেল, আর বেশি অবশিষ্টও নেই। পাগলা বাতাস আমাদের চিৎকার করে বলা কথাগুলোকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে পাহাড়ের চারপাশে ছড়িয়ে দিচ্ছিল। আমি ভাবলাম, জো নিশ্চয়ই দড়িটা বেঁধে ফেলেছে। আমি টেরিলিন দড়িটা টেনে দেখলাম। হ্যাঁ, ঠিকঠাকই আটকানো মনে হচ্ছে। আমি স্যাকটা পিঠে নিয়ে উঠতে শুরু করি।

শেলফটা পার হবার সময় আমি মনঃসংযোগ টানটান করে রাখি, জোকে দেখে মনে হয়েছিল ওটা ও খুব হেলেদুলে আরামসে চড়ছিল। ‘সম্ভবত আমার জুতোটা বড্ড বড়ো। মনে হয় এই স্যাকটার ওজনের জন্য। ইয়ে, সম্ভবত আজকে আমি ঠিক ছন্দে নেই। আশা করি ও যথেষ্ট রানার লাগিয়েছে, আমি দোল খেয়ে যেতে পারি।’ এসব ভাবছিলাম। জো ভালো চড়ছে তা হবে না। আমি আমার দীর্ঘশ্বাস গোপন করে নিই।

যে খাঁজটা বরাবর ও উঠে গিয়েছিল, দেখে মনে হয়েছিল চড়তে খুব মজা, মাঝে মাঝে পাথরের খোঁচ, শক্ত-জমাট বরফে পাহাড়ের গায়ে আটকে আছে, সেখানে দাঁড়ানো। কিন্তু এখন আমি দড়িতে ঝুলে ওগুলোর পাশ দিয়ে জুমারিং করে উঠছি। খাঁজটা পেরিয়ে ওপরে খানিকটা সহজ ঢালের কিছু পাথর আর তারপর দড়িটা ঝড়াকসে বাঁদিকে ঘুরে আপার টাওয়ারের ধারের দিকে চলে গেছে। আমি ওটা অনুসরণ করে উঠে দেখি জো একটা ওভারহ্যাঙের তলায় দাঁড়িয়ে। ওটা একটা ওভারহ্যাং-গ্রুভ, একটা লম্বা পাথরের খাঁজ, পাহাড়ের ধার বরাবর তিনশো ফুটের ফাটল একটা। আমরা দুজনেই আশা করছিলাম যে ওটা অন্তত চড়ার দরকার হবে না, ওটার নাম দিয়েছিলাম ‘বিগ-গ্রুভ’। যা হোক, বিকল্প ডানদিকের অংশটাও খুব একটা যে দারুণ আকর্ষণীয় কিছু তাও নয়—বিশাল ন্যাড়া পাহাড়ের গা, একের পর এক ওভারহ্যাঙ ভয়াবহভাবে পাঁচশো ফুট উঠে গেছে আমাদের মুখোমুখি।

“বাঁদিকটায় আমাদের এবং ‘নিশে’-র মধ্যে নিশ্চই কোনও সহজ চড়ার রাস্তা থাকবে।” এই বলে আমাকে বিগ-গ্রুভের তলায় দাঁড় করিয়ে রেখে জো ধারটার ও-পাশে অদৃশ্য হয়ে গেল। দু-ঘণ্টা ধরে বিগ-গ্রুভের বাঁদিকে পাহাড়ের উত্তর ঢালে, বরফ আর পাথরে জো শক্তপোক্ত এবং দক্ষ হাতে একটা লড়াই চালিয়েছিল।

“লম্বা আর একটু ওভারহ্যাঙ-এর মতো একটা ফাটলের সামনে এলাম। আমি ঠিক করেছিলাম আরও বাঁদিকটা দেখব। ফাটলটা ধরে চড়া যেত, কিন্তু ভয়ানক খাটনি হবে। অন্য কোনাটার ওপরে বরফের একটা জিভের মতো অংশ বিস্তৃত রয়েছে—যেটা ধরে চড়াটা ঠিক হবে বলে মনে হল। বরফের ঢালটা বেশ খাড়াই, অন্তত তলা থেকে দেখে যা মনে হয়েছিল তার চেয়েও খাড়া, আর যত ওপরে উঠছি, বরফের আস্তরটা সরু আর পাতলা হয়ে আসছে। ভারসাম্য রাখতে অসুবিধেই হচ্ছিল আমার। আমি মাথার ওপরের একটা ফাটলে একখানা পাতলা ব্লেড পিটন ঠুকে ঢুকিয়ে দিলাম। ওটা মাত্র এক ইঞ্চি ঢুকল, কিন্তু আমায় খানিকটা ঠেকনা দিল। ভাবছিলাম নীচে নেমে গিয়ে অন্য কোনাটা দিয়ে চেষ্টা করব কিনা। ফের শুরু করাটা সময় নষ্ট ছাড়া আর কিছুই হবে না; পিটের টিকিও দেখতে পাচ্ছি না। ওও হয়তো আশ্চর্য হয়েছে এত ধীরে ধীরে দড়ি সরছে দেখে। আশা করি ও শক্ত হাতেই দড়িটা ধরে আছে। পরের কয়েকটা পদক্ষেপ দুজনের সবকিছু ঠিকঠাক করার ওপরে নির্ভর করবে।

“আমি বরফ-কুঠারের ছুঁচোলো অংশটা বরফে গেঁথে দিলাম; তারপর কুঠারের মাথার যে অংশটা বরফ থেকে বেরিয়ে আছে তার ওপর সাবধানে ভারসাম্য বজায় রেখে উঠে দাঁড়ালাম। আস্তে আস্তে নীচু হয়ে ক্র্যাম্পন খুলে নিলাম। ক্র্যাম্পন খুলে নেওয়ায় জুতোর ডগা পাথরের ওপরে ছোট্ট জায়গাতে রেখে সরে দাঁড়ালাম, অদ্ভুত খালি খালি লাগছিল। শরীরটা বাঁকিয়ে নীচু হয়ে বরফ কুঠারটা এক ঝটকায় টেনে খুলে নিলাম।

“পাথরের ওপর দিয়ে খুব সূক্ষ্ম-কৌশলে কয়েক পা এগোতে হত, কিন্তু দড়ির ঘষায় পেছনে টান পড়ছে। আমায় কালঘাম ছুটিয়ে বেশ কিছুটা দড়ি টেনে তুলে তুলে কয়েক ফুট উঠতে হল।

“ওপরে আর-একটা বরফের ঢাল। ওটাকে স্বর্গের নিরাপত্তার মতো লাগছিল। পাথরের ওপর আমি উন্মুক্ত এবং অসুরক্ষিত ছিলাম। বরফের ওপরে বরফ-কুঠারের ছুঁচোলো অংশটা গেঁথে নিয়ে আবার ক্র্যাম্পনগুলো পায়ে আটকে নিলাম।

“ক্র্যাম্পন পায়ে থাকায় আমি বরফের ওপর দিয়ে চড়ে একটা খোঁদলমতো জায়গাতে পৌঁছে দেখলাম বেশ কয়েকটা বোল্ডার রয়েছে। দড়িটা ওখানে আটকে নিশ্চিন্ত হলাম।”

নিঃসন্দেহে এই লিডটা দুর্দান্ত কঠিন ছিল আর, জোয়ের জন্য, এতদিনের ক্লাইম্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি কসরতের ছিল। জো-র শেষ রানারটার পর আমার তো বেশ দুরূহ লাগছিল, যাতে দোল খেয়ে পেন্ডুলামের মতো ঝুলে উত্তর দেয়ালের দিকে চলে না যাই সেজন্য—ষাট ফুটমতো দোল খেয়ে ঝুলে গেলে যথেষ্ট ক্ষতির আশঙ্কা থাকে, আর সেখান ফিরে আসতেও আমার খুবই কষ্ট হবে। জো-র কাছে যখন পৌঁছলাম তখন মানসিক ও শারীরিকভাবে আমি এক্কেবারে ক্লান্ত। “দেরি হয়ে যাচ্ছে।” আমি বললাম।

জো, এতক্ষণ ধরে পা পিছলোনো, আইস-হ্যামার নিয়ে বরফে লাফ দিয়ে দিয়ে ওঠা, এসবের পর আরও কিছু কার্যকলাপের জন্য মুখিয়ে ছিল। তখন বিকেল সাড়ে চারটে। আমরা ততটাও দূরে ছিলাম না যে তাঁবুতে নেমে যেতে পারব না, কিন্তু জানতাম যে পাঁচটায় অন্ধকার নেমে আসবে। আমাদের মাথার ওপর পাহাড়ের উত্তরের দেওয়ালে সত্তর ফুট বরফের ঢাল। এবারে আমার লিড করার পালা, কিন্তু জো আমার চেয়ে অবশ্যই বেশি তালমিলে ছিল। ও এগিয়ে গেল, রাজি হল যে ঠিক পাঁচটায় থেমে যাবে। ও সতর্কভাবেই চড়ল কিন্তু দ্রুত, দুটো পিটন ঠুকে লাগাল। ছ’ঘণ্টা আগে যে ছায়াটা ওপরে উঠে গিয়েছিল এখন সেটা নেমে আসছে। দিনের শেষে ঝটপট আরও কয়েক ফুট চড়ে ফেলতে পারাটা বেশ ভালোই। আমরা দড়ি ধরে দ্রুত দু-নম্বর শিবিরে নেমে এলাম, ভেতরে ভেতরে আনন্দ। সবকিছুই ঠিকঠাকমতো হচ্ছিল।

তাঁবুতে ফিরে এসে, আমাদের সর্বশেষ উচ্চতম বিন্দুটা মেপেজুখে নিতে আমরা পাহাড়ের ঢালের ছবিগুলো নিয়ে বসলাম। আমরা জানতাম উত্তর দেয়াল বরাবর আর বেশিদূর উঠতে পারব না, কেননা আমরা পাহাড়ের একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্যের অঞ্চলে, যেটার নাম দিয়েছিলাম র‍্যাম্প, সেখানটায় উঠতে চাইছিলাম—ছবিতে যা দেখা যাচ্ছে, তা হল অঞ্চলটা একটা সরু বরফের রেখা, পাহাড়ের চূড়ার তুষারক্ষেত্র থেকে নেমে খুব খাড়া পাথরের ঢাল বরাবর আপার টাওয়ারের ওপর অবধি নেমে এসেছে। যদি উত্তর দেওয়ালের ওপর দিকটায় চড়তে মরিয়া হয়ে লেগে পড়ি আমরা তাহলে ওই বেরোনোর পথটা পাব না, ফসকে যাবে। আমাদের কাছে ফিক্স রোপ হিসেবে লাগানোর মতো আর পাঁচটা প্রমাণ দৈর্ঘ্যের দড়ি আছে। তারপর লাইফলাইন, মানে দড়ি ছাড়াই ওপরে চড়তে হবে, আর এইখানে রাম্পটাই একমাত্র এলাকা যেটা দেওয়ালে লটকে ফাঁদে ফেলবে না বা আমাদের সাংঘাতিকরকমভাবে শ্লথগতি করে তুলবে না বরং সাফল্যের একটা ক্ষীণ সুযোগ দিতে পারে। সুতরাং পরদিন আমাদের চেষ্টা করতে হবে বিগ-গ্রুভের ওপরে আপার টাওয়ারের মাথায় যাতে পৌঁছোতে পারি। আর সেটা হবে আমার কাজ।

সকালবেলা।

“শালা, একটুও বরফের তাল নেই।” আমি খুব জোর খচে বলে উঠি।

জো চোখটা একটুখানি খুলল। “কী হল, ডেলিভারি দিয়ে যায়নি, বরফ?”

আমার জমে থাকা ভয় হতাশা সব সকালের বাতাসে গালিগালাজ হয়ে বেরোচ্ছিল। সকালের ব্রেকফাস্ট তৈরির জন্য আগেরদিন রাত্রে বরফ ভেঙে রাখতে ভুলে গিয়েছিলাম, আর এখন অন্ধকারে হাত বাড়িয়ে তাঁবুর ওপরে ঝুলে থাকা বরফ মুঠো করে আনতে হচ্ছে। বরফের যে টুকরোগুলো বাতাসের ধাক্কায় ছিটকে ছিটকে পাহাড়ের গা বেয়ে নীচে পড়ে যাচ্ছিল সেগুলোর দিকে যথেষ্ট রাগে চেঁচাতে-চেঁচাতেই বাইরের সমান জায়গাটুকুতে ধীরে ধীরে অনেকটা বরফের টুকরো জড়ো করে ফেললাম। তাঁবুর ভেতরে এসে ফের নিজেকে গরম করতে করতে অল্প অল্প করে বরফের টুকরো গলাতেও শুরু করলাম।

“পাহাড়ের ওপরে উঠলে বাঁচি!” ওগুলো গলে আসতে আসতে আমি বিড়বিড় করি। “এই একঘেয়ে দৃশ্য দেখতে দেখতে বিরক্ত লাগছে, আশা করি চূড়া থেকে নন্দাদেবী দেখতে পাব।”

প্রকৃতপক্ষে আমাকে যে একটু বাদেই ঘণ্টা দুয়েকের টানা ভয়াবহ জুমারিং করতে হবে সেই চিন্তাটাই আমায় কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছিল আর আমি অসহিষ্ণু হয়ে পড়ছিলাম। জো আরাম করে শুয়ে ঝিমোচ্ছে আর ইচ্ছা করে আমার সকালের রান্নাবান্নায় ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে এই ভাবনাটাকে দুরমুশ করলাম আর সকাল থেকে ঘ্যানঘেনে অভিযোগ করার জন্য খুব বিব্রত বোধ করলাম। আমি জোকে উদ্দেশ করে চেঁচাইনি; আমি বলতে চেয়েছিলাম যে আমি ওকে এই চড়ার প্রস্তাবটা দেবার জন্য দোষ দিচ্ছি না, ব্রেকফাস্ট বানাতে বলার জন্যও না। আমি চাপা উত্তেজনায় ফেটে পড়ছিলাম আর সমস্ত কিছুতেই চেঁচাচ্ছিলাম—ওসবের কোনও মানেও নেই আর আমি এখন এক্কেবারে ঠিক আছি। কিন্তু আমাদের কথাবার্তা তো একেবারে যেটুকু না হলে নয় তাইতে এসে ঠেকেছিল। আমি ওকে আবহাওয়া কেমন শান্ত হয়ে এসেছে বলে একটু উসকে দেবার চেষ্টা করলাম। ভেবেছিলাম যে কিছু না কিছু নিয়ে আমাদের কথা বলা প্রয়োজন। কিন্তু জো এসব ছোটোখাটো মামুলি কথাবার্তা পছন্দই করত না, ভাবত আমি ওর সঙ্গে এমন ব্যবহার করছি যেন ও বি.এম.সি-র কোনও কমিটির মেম্বার। ওর পছন্দ ছিল মগজটা একেবারে নিরপেক্ষ, উদাসীন করে রাখা।

ভোর হচ্ছে সবে। জো নীচে তুষারক্ষেত্রে নেমে গেল ওখান থেকে তিনটে দড়ি তুলে আনবে বলে যেগুলো আপার টাওয়ারে চড়তে এবং ‘ফিক্স’ করতে কাজে লাগবে। আগের দিন আমরা আগুপিছু করে অনেকবার কোনাকুনি চড়েছি, সেগুলোর পরপর তিনটে দড়ি সোজাসুজি খাড়া উল্লম্ব করে দেব বলে আমি ওপরে উঠে গেলাম। প্রথম দুটো অ্যাংকর খুলে নিলে আমার মনে হল প্রায় দেড়শো ফুটমতো অতিরিক্ত দড়ি পাওয়া যাবে ওপরের দিকে চড়ার জন্য। সবটাই তত্ত্বগত, কাগজে কলমের হিসেবে ঠিক মনে হচ্ছিল। দ্বিতীয় অ্যাংকরটার কাছে পৌঁছে আমি দড়িটাকে দুলিয়ে নিয়ে জো-র ‘শেলফ-পিচ’-এর সোজাসুজি নীচে আনতে চাইছিলাম। আমি খুঁটটা খুলে দড়ি ধরে পাশের দিকে ঝুঁকে পড়ি। কতখানি দুলে সরে যেতে পারি এ-ব্যাপারে হিসেবটা গোলমাল করেছিলাম আমি। সময় থমকে গেল আমার সামনে, এক মুহূর্তের শতাংশের ভগ্নাংশে স্বপ্নের মতো পরপর ঘটে গেল দৃশ্যগুলো। সশব্দে এমন বেগে দোল খেয়ে ছিটকে গেলাম যে সেটা একটা কোনাকুনি লাগানো বাইরের দিকে টান রয়েছে এরকম দড়ির ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক ব্যাপার নয়। পা দিয়ে আঘাতটা সইবার জন্য চেষ্টা করলাম কিন্তু দেরি হয়ে গেছে ততক্ষণে, যথেষ্ট দ্রুত পা-টা ঘোরাতে পারিনি ফলে একটা দেয়ালে গিয়ে আছড়ে পড়লাম, পরের অ্যাংকরের সোজাসুজি ঠিক তলায়, ধপ করে একটা শব্দ হল আর ভেতর থেকে সব হাওয়া যেন বেরিয়ে গেল আমার। অর্ধেক পেন্ডুলাম—প্রায় চল্লিশ ফুট দোল খেয়ে আচমকা একটা পাহাড়ের দেয়ালে এসে ঠেকেছি।

জুমার থেকে ঝুলে-ঝুলেই যতটা পারি মোচড় দিয়ে দেখলাম। নাহ্‌, কিছুই ভাঙেনি মনে হয়। মন থেকে ঝেড়ে ফেললাম, ‘আরে, বেঁচে তো রেয়েছি এখনও।’ নীচে জো-র দিকে দেখলাম, তুষারক্ষেত্রের ওপরে একটা ছোট্ট বিন্দু। ও আমার এই দুর্ঘটনাটা সম্ভবত দেখতে পায়নি, আর যাইই হোক কেনই-বা এটা নিয়ে মাথা ঘামাবে ও? ও তো কিছুই করতে পারত না। একসময় বহুদিন অবধি আমাদের মধ্যে যতটা ব্যবধান তৈরি হয়েছিল তার চেয়েও দূরবর্তী হয়ে পড়েছিলাম আমরা। বহুদিন ধরে আলোচনা করে-টরে কায়দা-কৌশল ঠিক করে এখন একা একা দড়িগুলোর পথ ঠিক করাটা অদ্ভুত ঠেকছিল। কী পরিমাণ নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিলাম আমি, নিজের মনেই হেসে ফের এগোতে শুরু করে দিলাম। ঠিক করেছিলাম দড়ির পথটা ওভারহ্যাঙগুলোর মধ্যে দিয়ে জো-র চড়া খাঁজটা বরাবর রাখব তাতে ওভারহ্যাঙের ওপর দিয়ে জুমারিং করাটা এড়ানো যাবে। এগারোটার কিছু পরে আগের দিনের সর্বোচ্চ বিন্দুতে পৌঁছে জো-র অপেক্ষায় রইলাম। দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলাম যে আগের দিন ও চড়ার সময় যে গতি বজায় রেখেছিল তাইই রাখব।

সমস্যাটা ছিল আপার টাওয়ারের কিনারায় ফেরার চেষ্টা করা। আমাদের এবং আকাশের সীমারেখার মধ্যের খাড়াই পাথরের গায়ে আড়াআড়িভাবে অনেকগুলো ফাটল ছিল। ওগুলোর দিকে যাবার পথ আড়াল করে একটা বিশাল আঁশের মতো পাথরের স্তর। ওটা তেরছাভাবে ফুট দশেক মতো বিস্তৃত আর আলগা স্তরের ফাঁক দিয়ে জায়গায় জায়গায় ও-পাশের আলোও দেখা যাচ্ছে। ওটা মনে হচ্ছিল আঠা দিয়ে আটকানোর মতো জায়গায় জায়গায় বরফের চাপড়া দিয়ে পাহাড়ের গায়ে আটকানো আছে। ক্র্যাম্পন পরে নিয়ে আমি ফ্রন্ট-পয়েন্ট করে উঠে বরফ-কুঠার দিয়ে জোরে আঘাত করলাম ওটার ওপর। ‘বুমমম!’ ওটা শব্দ করে উত্তর দিল।

“কীরকম মনে করছ এটাকে, জো? নিরাপদ থাকবে? এটা আমায়সুদ্ধু নিয়ে বেরিয়ে যেতে পারে।”

“ওহ্‌, সব ঠিক থাকবে।” জো উত্তর করল। “যাইই হোক, ওটা হয়তো ওভাবেই বহুদিন ওরকমই রয়ে গেছে।” ও ফের যোগ করে, “এটা তো আমার ‘লিড’ নয়, তাই না?”

দুরুদুরুভাবে আমি পাথরের খোঁচের ওপর একটা দড়ির স্লিং ফাঁসিয়ে দিই, যেন আমি কোনও পবিত্র আদেশ পালন করছি। খোঁচটার একদিকের ধার ভালোভাবে আঁকড়ে ধরে আমার দেহের ভারটা স্লিং-এর ওপরে নিয়ে আসি। আমার মন ছাড়া আর কিছুরই হেলদোল হল না, এই গন্ধমাদন পাথরটা যদি নিজেকে খুলে নিতে চায় তাহলে আমাদের ওপরে তার যে ঝটকা আর ঝেঁটিয়ে নিয়ে ফেলার পরিস্থিতিটা নেমে আসবে তার চিন্তায় মনের ভেতর উথালপাতাল হচ্ছিল। আমি যদি এখানে মেরুদণ্ড ভেঙে বসি, জো আমায় নিয়ে কী করবে?

আমি একটা ছোট্ট গ্রানাইটের খণ্ডের সামান্য ফাঁকে ক্র্যাম্পনের সামনের কাঁটা দুটো ঢুকিয়ে দিই আর আড়াআড়ি পেরোই। দেয়ালের ওপর ঝুঁকে একটা দু-ইঞ্চি ফাটলকে ছুঁতে পারি কেবল। যতটা টান হতে পারি হয়ে একটা বড়ো বং-পিটন গুঁজে দিই ফাটলটায়। ঠুকে ঠুকে লাগাই যতক্ষণ না ওখানে থেকে যাবার মতো শক্তপোক্ত হচ্ছে। এটাকে হাত দিয়ে ধরার কাজে ব্যবহার করে আমি আরও খানিকটা পাশে সরে আসি। বরফ-কুঠারের ছুঁচোলো অংশটাকে মাথার ওপরে পাথরের একটা গর্তমতো জায়গায় আটকে নিজেকে টেনে তুলতে তুলতে পাথরের চাপড়াটার কিনার বরাবর পা দিয়ে দিয়ে আঘাত করি দাঁড়াবার জন্য একটা জায়গা পাবার জন্য। খুব আস্তে আস্তে পায়ের ওপর ভার ছেড়ে দিয়ে দাঁড়াই যতক্ষণ না ভারসাম্য পাই। পা যেখানে রেখেছিলাম সেটা বেশ ভালো, আমি নিশ্চিন্ত হই, এরকম একটা বিস্ময়কর অবস্থানে পৌঁছোতে পেরে নিজের মনেই একটা আলগা খুশির ভাব হল।

আমি যখন চড়ছিলাম ততক্ষণে আমাদের ওপর রোদ এসে পড়েছিল, আমি জো-র মাথার ওপরে পাথরের গায়ে দেখতে পাচ্ছিলাম আমার ছায়া পড়েছে। স্লিং-এ ঝুলতে থাকা ওর আত্মমগ্ন চেহারাটার ও-পাশে আমি নিষিদ্ধ উত্তর ঢালের বিস্তার দেখতে পাচ্ছিলাম, আর অনেক অনেক নীচে খয়েরি রঙের দাগের মতো বাগিনির গ্রাবরেখা। আমি বিগ-গ্রুভের ঠিক ওপরেই রয়েছি, আর এখন পশ্চিম ঢালের খানিকটা অংশ দেখতে পাচ্ছি। ঝুঁকে পড়ে বিগ-গ্রুভের পেছনের একটা ফাটলের ওপরের অংশটায় হাতটাকে ঢুকিয়ে দারুণভাবে আটকে, চমৎকার হ্যান্ড-জ্যাম করে, আড়াআড়িভাবে ব্রিজিং করলাম। কয়েক ফুট ওপরে বিগ-গ্রুভটার ডগা, অনেকটা কড়াইশুঁটির ছাড়ানো খোলার মতো, আমি ঝটপট ওটার ওপর উঠে গেলাম। এর ওপরে দশ ফুট উঁচু বরফের ঢাল, বরফের কুঠার ও হাতুড়ি দুটোই একসঙ্গে গেঁথে তাতে চড়ে পড়লাম, আর জুতোর সামনের কাঁটা গেঁথে গেঁথে টলমল করে উঠতে থাকলাম। পায়ের পেছনের কাফ-মাসলে ব্যথা করতে থাকে, পা কাঁপতে থাকে, আমি বরফ-কুঠার দিয়ে বরফের ওপরে মারতে থাকি যতক্ষণ না একটা পা রাখার মতো জায়গা হয়, পা-টা তাতে কাত করে রেখে দাঁড়িয়ে বিশ্রাম নিই। মাথার ওপরে পশ্চিম দেওয়াল ফের মাথা তুলে জেগে ওঠে, একটা সরু ফাটল দেখা যায়। নিরাপত্তার খাতিরে আমি তিন-তিনটে পিটন গাঁথি ওটায়—একটা ব্লেড, একটা সফট স্টিল ব্লেড আর আর-একটা লিপার। এই তিনটে পিটন, নীচের ষাট ফুটের নড়বড়ে অস্থিরতার পর দারুণ ভরসা এনে দিল।

জো জুমার করে আমার কাছে উঠে এল আর আমরা দ্রুত পরিস্থিতিটা আলোচনা করে নিলাম। আমরা অভীষ্ট লক্ষ্যে এমন তীব্র একাত্ম এবং একজোট হয়ে উঠেছিলাম যে জো যা বলছিল আমি মনে মনে সেটাই ভাবছিলাম। হ্যাঁ, পরদিন সকালে আমরা ফিক্স রোপগুলোকে সোজাসুজি একরেখা বরাবর করে নেব। হ্যাঁ, পরের পিচটা চড়ার পরেই র‍্যাম্পটা নজরে আসবে। হ্যাঁ, ফাটলটা ধরে চড়াটাই সবচেয়ে সুবিধেজনক, কোণ বরাবর যতক্ষণ টানটা রাখতে পারব। বাতাস, রোদ এগুলো ভুলে গিয়েছিলাম।

ফাটলটা ক্রমাগত সরু হয়ে গেছে, কিন্তু এই ন্যাড়া দেয়ালটায় আর কোনও জায়গা ছিল না যেটা ব্যবহার করে চড়তে পারা যায়। কুড়ি ফুট ওপরে ফাটলটা গ্রানাইটের দানার মধ্যে মিলিয়ে গেল। আমি সামনে ঝুঁকে, পাশে বেঁকে দেখে নিলাম যাতে আমার দেহের সমস্ত মাংসপেশি টানটান হয়ে ওঠে। ভারসাম্যটা থরথর হয়ে ছিল, যে-কোনো মুহূর্তে টলে গিয়ে তীব্র হাওয়ায় ধানের গোলার আলগা দরজার মতো পাথর থেকে ছিটকে দেবে আমায়। আমি একটা এক ইঞ্চি লম্বা ছুরির মতো ব্লেড পিটন উলটো করে ঢোকাতে সক্ষম হলাম আর এতে নির্ভর করে আর-একটা ফাটল অবধি হাত গেল আমার, সেটা ধরে একটা ধারালো উঁচু হওয়া পিঠের মতো অংশ বা অ্যারেট-এ পৌঁছোতে পারলাম। অংশটা ক্রমে ওপরে একটা গভীর খাঁজের মতো আকৃতি পেয়েছে অর্থাৎ ‘গ্রুভ’ হয়ে গেছে। কুড়ি ফুট চড়ার পর আমি চড়ার একটা ছন্দ আনতে সক্ষম হলাম, অকপটে পিটন লাগাও, ফ্রি-ক্লাইম্বিং–এর কোনও আশাই নেই, কেননা পাথরগুলো হয় উল্লম্ব অথবা বাইরের দিকে হেলে। যাই হোক, খুব শিগগিরই আমার সরঞ্জাম ফুরিয়ে এল আর একটা ছোটো ওভারহ্যাঙের ওপর দিয়ে আমি দেখতে পাচ্ছিলাম পাথরের একটা লম্বাটে গভীর খাঁজের ওপরের অংশে ঠেলে-ওঠা বরফের স্তূপ, চকচক করছে। ‘একটাও সহজ নয়।’ আমি মনে মনে ভাবি। নীচে লাগানো দুটো পিটন খুলে নিয়ে ওপরে লাগিয়ে বরফ-ভরতি ফাটলটায় দুটো আইস পিটন ঠেসে ঢুকিয়ে দিই। উঠে গিয়ে নিজের ওজনটা ওগুলোর ওপরে দিতেই, আমি ঠিক নিশ্চিত নই, পাথর, নাকি বরফ, নাকি কপাল, পিটনগুলো যথাস্থানে রয়ে গেল। এখন আমার কাছে কেবল কম্বাইন্ড-পিটন রইল, নজরে পাথরের দেয়াল থেকে বেরিয়ে আসা সরু তাক গোছেরও কিছু ছিল না।

আমাদের চড়ার পথটা আমাদের ক্রমশ আরও আরও ভয়ানক এবং এমন উন্মুক্ত অবস্থায় ঠেলে দিচ্ছিল, যেন যেমনটা বলবে তাইই শুনতে হবে আমাদের। পিটন খোলার সময় যতই সতর্ক থাকি না কেন, কিছু না কিছু হয় হাত ফসকে পড়ে গেছে, নয়তো ছেড়ে আসতে হয়েছে, ফলে এখন নানান মাপের পিটন কম পড়ে গেছে। যে তিনটে কম্বাইন্ড পিটন লাগিয়েছি সেগুলো আমায় খুব একটা আত্মবিশ্বাস জোগায়নি, কিন্তু তাও নিজেকে বোঝালাম যে গড়পড়তা হিসেবে একটা না একটা জায়গায় থেকে যাবেই, তো দড়িটা বেঁধে ফেলি। ঠিক করলাম ‘সকালবেলা জো এসে এখান থেকে যা করার করবে।’

“র‍্যাম্পের শুরুটা দেখতে পাচ্ছ কি?” জো চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করে।

“হ্যাঁ, মনে হয় পাচ্ছি।” পিটন থেকে নিজেকে খুলে নিয়ে নামতে নামতে আমি উত্তর দিই আর ওর কাছে পৌঁছোতে পৌঁছোতে অন্ধকার নেমে আসে। দেরি হয়ে গিয়েছিল আমাদের, আর এই প্রথম আমি ডিসেন্ডার হারিয়ে ফেলার ফল হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছিলাম, ক্যারাবিনারের সাহায্যে আমাকে নীচে অ্যাবসেইল করে পিটন এবং দড়ির গিঁট পেরিয়ে পেরিয়ে নামতে হচ্ছিল। এই নামার অসুবিধেটা আগেভাগেই জানান দিচ্ছিল যে আরও দুঃস্বপ্নের নামা বাকি আছে।

পরদিন ভোর, সকাল হয়েছে সবে, আজকে মোটামুটি একটা হিসেব করে নেবার দিন। আমায় বাইরে দু-নম্বর সারতে যেতে হত। কাল সারাদিন ধরে লড়ে গেছি যাতে না যেতে হয়। তাঁবু থেকে গুঁড়ি মেরে বেরোনোটাই তো একটা সমস্যা, তাঁবু এবং জোকে নিয়েও এতকিছু জিনিস যে ঠোক্কর খাবই। একবারে একজনই বেরোতে পারে আর এবারে আমার পালা। মনে হচ্ছে যেন মেলায় আছি আর সেই খেলাটার মতো, যাতে একটা তারের গোল রিং আঁকাবাঁকা আর-একটা মোটা তারের মধ্যে দিয়ে নিয়ে যেতে হবে, ঠেকানো চলবে না। তুমি যদি ঠেকিয়ে ফেলো ঘণ্টি বেজে উঠবে আর তোমার টাকা গেল। জো, তাঁবুর দরজা, স্টোভের ওপরে প্যান—মনে মনে ভাবি, ওদের পাশ কাটিয়ে যেতে যেতে একবার ছুঁয়ে দিলেই হইহই করে বেজে উঠবে। একবার তাঁবুর বাইরে এসে গেলে খেলাটা একইরকম কঠিন। দু-নম্বর শিবিরে তৃতীয় রাতে ঘুমোনোর সময় নিজেদের বেঁধে রাখার ব্যাপারটায় অত গুরুত্ব দিইনি, কেননা তাঁবুর ভেতর দড়ির কাটাকুটির মধ্যে একটু নড়াচড়া করাও খুব জটিল হয়ে যাচ্ছিল। বাইরে এসে এদিক ওদিক যেতে হলেও পাহাড় বাইতে হত, ফলে নিজেকে বেঁধে নেওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আমরা তাঁবুর নীচের দিকে কয়েকটা ধাপ কেটে নিয়েছিলাম আর ওইটে অনুসরণ করে ধারের পেছনটায় এসে পৌঁছোলাম। এখানে দড়িতে ঝুলে, ধ্বস্তাধ্বস্তি করে ওভারস্যুট এবং ভেতরের গরম পোশাকে বিশেষভাবে তৈরি জিপার খুলতে হল। খোলা হয়ে গেলে আমার প্যান্টটা দেওয়াল বেয়ে উঠে আসা তীব্র বাতাসে ওপরের দিকে ফতফত করে উড়তে শুরু করল যেন ক্রস-পিস থেকে ঝোলা মধ্যযুগের ফ্ল্যাগ। মাঝে মাঝে মুখে কিংবা পাছায় বরফকুঁচি অথবা ঝুলতে থাকা জিপার এসে আছড়ে পড়ছে। গোটা উদ্ভট প্রক্রিয়াটা আধঘণ্টা সময় নিল, আর তার শেষে, ‘মর্ষকাম’ শব্দটার একটা নতুন মানে তৈরি হল।

আমরা ঠিক করেছিলাম সেদিন সকালে ওপরে গিয়ে ফিক্স রোপ করার পালা জো-র, আর সেটা আমায় একরকমের স্বস্তির অনুভব দিয়েছিল—ঝুঁকিটা আমরা ভাগাভাগি করে নিচ্ছিলাম। ওপরে উঠে জো-র কাজ ছিল আঁকাবাঁকা ফিক্স রোপটাকে সোজাসুজি করা আর আগের দিনের সর্বোচ্চ বিন্দুতে গিয়ে নিজেকে গুছিয়ে নেওয়া। প্রথম লোকটা সবসময় এই ঝুঁকিটা নিতই, যে দড়িটা হয়তো বাতাসের ধাক্কায় কোনও পাথরের ধারে ঘষে ঘষে ক্ষয়ে এসেছে। তা সত্ত্বেও ওকে অনুসরণ করার সময় আমার ভয় ভয় লাগত, যদিও অনুচর যেমন দেখে নেয় সম্রাটের খাবারে বিষ আছে কি না, ও-ও তেমনি দড়ি এবং অ্যাংকরগুলো পরখ করে নিত। তুষারক্ষেত্রের নীচের পাথরটা চড়বার পর আমরা ভেবেছিলাম ওটা বেশ খাড়া, কিন্তু দেখা গেল এখন দেওয়ালটা ক্রমে আরও তীব্র খাড়াই উঠে গেছে। ফলত জুমারিংটাও ক্রমশই বেশি পরিশ্রমের হয়ে পড়েছিল। রাত্তিরে ঘুমোনোর পর আমার মাথা-টাথা পরিষ্কার হয়ে আছে, সম্ভাব্য সমস্ত বিপদের জন্য সতর্ক। দু-নম্বর শিবিরের ওপরে দড়ির নানান জায়গায় অ্যাংকরগুলো আর-একবার ঠিকঠাক করার ছিল, তাতে আমার দেরি হয়ে গেল এবং যখন বিগ-গ্রুভের নীচে গিয়ে পৌঁছোলাম আমার জন্য প্রচণ্ড একটা ধাক্কা অপেক্ষা করছিল। আমার ওপরে তিনটে দড়ির সমান দৈর্ঘ্য ওপরে জো পিটন খুলে নিয়েছিল আর তিন-পিটনের ফাটলটাতে পৌঁছে ও পুরো দড়িটাকে একটা চারশো ফুটের স্কিপিং-এর দড়ির মতো ঘুরিয়ে বিগ-গ্রুভের ওপরে এনে ফেলল। তারপর টানটান করে বাঁধল। তার ফলে পাথর থেকে সোজা আমার দিকে ঝোলা প্রায় দুশো ফুট লম্বা আট মিলিমিটার টেরিলিনের দড়ির মুখোমুখি হতে হল আমায়।

‘জোই দড়িটা ওখানে রেখেছে, সুতরাং ও নিশ্চয়ই সেটা জুমার করার জন্য প্রস্তুত।’ চড়া শুরু করতে-করতেই ভাবছিলাম, এই প্রতিযোগিতার উসকানিই একমাত্র প্রেরণা। দড়ি ছিঁড়ে পড়ার যত অনুষঙ্গ আমি জানতাম সব মনের মধ্যে হুসহুস করে একের পর এক প্রজেক্টরে স্লাইডের ছবির মতো আপনা-আপনি চলে চলে যাচ্ছে, মাঝে মাঝে আমার ছবি, নিরালম্ব পতনের রাস্তায় আপাত স্থির, শূন্যে ঝুলে আছি। ‘তবু, টেরিলিন, আর যাইই হোক, ওপরে নীচে কাটে না’ আমি ভাবি। কিন্তু আরও ওপরে ওঠার পর এই দড়িটা বিগ-গ্রুভের ওপরে একটা পাথরের কিনারায় পাশাপাশি ঝাঁকুনি দিতে শুরু করল। ডগাটা অনেকটা দূর। আমার জুমারের দিকে তাকিয়ে, যে দড়িতে বাঁধা আছি সেটাকে তীক্ষ্ণ নজরে রেখে খুব সন্তর্পণে উঠি, যাতে দড়িটায় কোনোরকম ঝাঁকুনি না পড়ে। অতি উচ্চতায় সর্বক্ষণের সঙ্গী হয় অপ্রত্যাশিত ব্যাপারে একটা অস্বাভাবিক বিলম্বিত প্রতিক্রিয়া, সেইটাই হল। আমার মনটা কি এখানে? শরীরটা এখানে কিন্তু আমার মনটা যেন নির্লিপ্ত, মুক্ত। সহসা, ডগার ওপরটায়—ছোটো তুষার-ঢাল, জো এবং তিন-পিটনের ফাটলটা। আমাদের সর্বোচ্চ বিন্দুতে পৌঁছোনোর জন্য জো শেষ পিচটা জুমারিং করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে।

“শেষ ওঠাটা কিন্তু খুব রোমাঞ্চকর—ভালো জায়গায় রয়েছে ওটা।” আমি বলি।

“অনেকটা দড়ি বাঁচিয়ে দিয়েছে ওটা।” জো বলে।

আমি জানতাম আমরা দড়িটাকে ঘষা না খাইয়ে বার বার ওতে ওঠানামা করার অবস্থায় নেই, কিন্তু সেটা উল্লেখ করলাম না। জোও জানে সেটা, আমার মতো সেও দেখেছে, আমরা যখন পরের বার আসব, ও-ও টের পাবে বিগ-গ্রুভ বরাবর জুমার করে উঠতে ঠিক কেমন লাগে! কিন্তু আমার যতটা মাথাব্যথা ছিল ওরও কি তাই ছিল? আমি অন্তর্দাহে ভুগছিলাম—আমি ওর সত্ত্বাটাকে আমার পৃথক অস্তিত্বের নিরিখে দেখছিলাম এবং মনে হচ্ছিল তাতে সঙ্গতি এবং ঐক্য দুইই ছিল যা আমার মধ্যে ছিল না।

আগের দিন যে উচ্চ বিন্দুতে পৌঁছেছিলাম, জোকে অনুসরণ করে সেইখানে উঠে এলাম। ঝুলন্ত বিলেতে নিজেকে আটকানোটা একটা জট পাকানো জটিল প্রক্রিয়া। আমি খেয়াল করলাম, আমি দোনোমনাভাবে যে তিনটে পিটন আটকেছিলাম সেই তিনটের মধ্যে দুটোতে ও দড়িদড়া বেঁধেছে।

“তুমি মাত্র দুটোতে বেঁধেছ কেন, জো?”

“আরে ওগুলো ঠিকঠাক আছে। দুটোই যথেষ্ট।” ও বলে।

আমি তাড়াতাড়ি তিন নম্বরটায় বেঁধে নিই। তুমি নিজে না পুঁতে থাকলে পিটন সবসময় নিরাপত্তার একটা বিভ্রম তৈরি করে।

আশপাশ দিয়ে রোদ চুঁইয়ে আসছিল আমাদের গায়ে, জো লিড শুরু করল। প্রথমটায় চড়াটা হুবহু আগের পিচটার মতো। জো পরপর কয়েকটা পিটন আটকাল তারপর ফাটলটা মিলিয়ে গেল। ও একটা ব্লেড পিটন ঠুকে লাগাচ্ছিল সেটা অর্ধেকটা ঢুকল, সেটায় ক্যারাবিনার লাগিয়ে ক্লাইম্বিং রোপটা তার মধ্যে দিয়ে গলিয়ে দিল। আমি টানটান করে দড়িটা ধরে থাকলাম, ও দড়ির টানে পুরো শরীরের ওজনটা রেখে ডানদিকে আড়াআড়ি অনেকটা ঝুঁকে পড়ল। স্ল্যাবের ওপরে ছোটো ছোটো পাথরের ধরার জায়গা ব্যবহার করে ও নিজেকে টেনে অ্যারেটের কাছে নিয়ে গেল। শিগগিরিই আমি ওর বাঁ-হাত আর বাঁ-পা দেখতে পাচ্ছিলাম শুধু, আঁকড়ে ধরে সজোরে অ্যারেটটায় চড়ছিল ও। একটা চিত্তাকর্ষক পুতুলনাচ দেখছিলাম। হাত আর পা-দুটো ঝাঁকুনি দিয়ে ওপরের দিকে উঠছে তারপর সড়সড় করে নেমে আসছে। ওপরে উঠছে তারপরেই নেমে আসছে। উঠছে, নামছে। তারপরেই হঠাৎ তারা গায়েব।

কিনারার ও-পাশে জো একটা ভয়ানক লড়াই চালাচ্ছিল।

“অ্যারেট-এর ওপর থেকে ফুট ষাটেক তফাতে আমি একটা পাথরের খাঁজ আর তার মধ্যে একটা ফাটল দেখতে পাচ্ছিলাম। খাঁজটা ওপরের উঁচু হয়ে থাকা কৌণিক অংশের দিকে চলে গেছে।

“আমি অ্যারেটের ও-পাশে নিজেকে টেনে নিয়ে গেলাম। পিটন এবং আমার মধ্যে দড়িটা এখন অনুভূমিক; ওটা আমার ওজন ধরে রেখেছে এখনও। আমি খাঁজটায় পৌঁছোতে চেষ্টা করলাম, কিন্তু ডানদিকে টানটান করে খানিকটা এগোতে যেতেই পাথর থেকে আলগা হয়ে ঝুলে দোল খেয়ে যাবার উপক্রম হল। হাতে ধরার মতো বড়ো কোনও ধরার জায়গাই নেই; আমি ঘর্ষণ বলের ওপর নির্ভর করে রইলাম। অ্যারেটের ও-পাশে আরও ডানদিকে সরার মানে হাতে এবং জুতোর তলায় গ্রানাইটের ঢেউ খেলানো অংশগুলোতে এবং নিজের ভার বেশিটা দড়িতে রেখে ঘর্ষণের ফলে যে ভারসাম্য রেখেছি তা নষ্ট করা। এটা ছাড়লে আমি কুড়ি ফুট দোল খেয়ে পেছন দিকে চলে যাব আর পিটনটাও সম্ভবত খুলে আসবে।

“আমি অনিশ্চিত ভারসাম্যটাকেই এদিক-সেদিক করে প্রত্যেকবার একটু একটু করে সরতে শুরু করলাম, প্রতিবারই হাতড়ে হাতড়ে আঁকড়ে ধরার মতো কিছু না কিছু ছোটো ছোটো চুনকি পাথর খুঁজে পাচ্ছিলাম। আমি শুয়ে পড়েছি, শরীরটা প্রায় অনুভূমিক তাও খাঁজটা অবধি পৌঁছোতে পারিনি। একঝলক দড়িটা দেখলাম—প্রত্যেকবার আমি এগোলেই অ্যারেট-এর ধারালো কিনারায় ওটা ওপর-নীচ করে ঘষা খাচ্ছে। এই পর্যবেক্ষণের মধ্যে একটা বিচ্ছিন্নতার বোধ রয়েছে; ভাবছিলাম দড়িটা কেটে বেরিয়ে যাবার আগে আমি খাঁজটার নিরাপত্তায় পৌঁছোতে পারব কি না।

“বেশ শ্রান্ত হয়ে পড়েছি এতক্ষণে, শেষ চেষ্টা হিসেবে গলা থেকে একটা নাইলন স্লিং খুলে নিলাম। এটার সঙ্গে একটা অ্যালুমিনিয়ামের চোক-স্টোন আটকানো রয়েছে। একটা প্রান্ত ধরে ওটাকে ফাটলের দিকে ছুড়ে দিলাম। একবারেই ওটা ফাটলে আটকে গেল, নাইলনের টেপটায় ভর দিয়ে আমি নিজেকে ফাটলের কাছে টেনে নিয়ে গেলাম। খাঁজটা বাইরের দিকে হেলা, ওভারহ্যাঙ্গিং; পরিবেশটা অনুভব করব বলে নীচে তাকাইনি, বরং তক্ষুনি একটা পিটন ঠুকে লাগিয়েছি, ওটার সঙ্গে নিজেকে বেঁধে বিশ্রাম নিয়েছি।”

কয়েক ফুট ফ্রি-ক্লাইম্বিং ওকে একটা বড়োসড়ো গ্রানাইটের খণ্ডের কাছে পৌঁছে দিল। ও সেটার ওপরে হাত দুটো ছড়িয়ে ফের বিশ্রাম নিল।

ওই পাথরখণ্ডটা থেকে জো ওর ডানদিকে একটা অতিকায় ঝুলন্ত কৌণিক অংশ দেখতে পেল, শ-দুয়েক ফুট উঁচু। ওটার ওপরে বরফের শাখাপ্রশাখা, অর্থাৎ র‍্যাম্পের শুরু। এই কৌণিক অংশটার মাঝামাঝি, বাইরের দিকে হেলানো পাহাড়ের গা বেয়ে একটা দু-ফুট চওড়া ঢালু তাকমতো অংশ, তিরিশ ফুট লম্বা এবং পুরু বরফে ঢাকা। জো খুব সাবধানে ক্র্যাম্পন লাগিয়ে পা ঠুকে ঠুকে ওই রাস্তা বরাবর চলল যতক্ষণ না পথে একটা ওভারহ্যাঙ-এর বাধা পায়। এটা ও পিটন লাগিয়ে চড়ল। তারপর দুটো পিটন ঠুকে লাগাল ঝুলে থাকবার জন্য, তারপর অপেক্ষায় রইল।

“আমি চেঁচিয়ে পিটকে আসতে বলি। যখন মনে পড়ল যে অ্যারেটের কিনারে ঘষা খাওয়া দড়িটা পরীক্ষা করা দরকার, তাকিয়ে দেখি ওটা অর্ধেক কেটে বসে গেছে। প্রচণ্ড আতঙ্ক হল মনে, আমি নিরাপদেই রয়েছি আর কী ঘটতে পারত স্রেফ সেটা ভেবেই অনেক বেশি ভয় লাগল, সত্যি-সত্যিই যখন ওখান দিয়ে আসছিলাম তখন যা ভয় পেয়েছি তার চেয়ে ঢের বেশি আতঙ্ক হল। ক্ষয়ে যাওয়া দড়ির অংশটা কেটে ফেলে ভালো দড়ি নতুন করে কোমরে বেঁধে নিলাম।”

জো-র টেনশন-ট্রাভার্সটা অনুসরণ করা যথেষ্ট কঠিন ছিল, আমি কোনাকুনি ওর দড়ির রেখা বরাবর পিটন খুলতে খুলতে উঠতে থাকি, পরপর ঝুলে ঝুলে দোল খেয়ে খেয়ে। বেশ দড়াবাজিকরের মতো, যেন আমি টারজান, জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে ডালপালা, শাখাপ্রশাখা ধরে ঝুলে ঝুলে দোল খেয়ে চলেছি। বড়ো পাথরটায় পৌঁছে, কিনারের ও-পাশে উঁকি মেরে জোকে দেখতে পেলাম, ওভারহ্যাঙ-এর ওপরে একা একা বেচারা দাঁড়ে বসে ঝিমোচ্ছে, কালো ঝুঁটিওয়ালা বড়ো একটা পাখির মতো।

“ওখান থেকে কোথায় যাবে?” আমি চেঁচাই।

আমার মনে হচ্ছিল ওটাই শেষ, ওখান থেকে আর এগোনো যাবে না। ওর মাথার ওপরে র‍্যাম্প অবধি উঠে যাওয়া কোনাচে পিঠের মতো উঁচু অংশটা ধরে আদৌ যদি চড়াও যায় তো সারাদিন লেগে যাবে।

“অত ভেবো না।” যথারীতি স্বভাবসিদ্ধ উত্তর এল, গলার স্বরে আশ্বাস আর বেশ জোর দিয়ে বলা, “আমি একটা রাস্তা দেখতে পাচ্ছি।”

ওর গলার স্বরে ভয়-টয় ছিল না দেখে কৃতজ্ঞ হই, সরু তাকটা বরাবর হাতে ধরার রেলিঙের মতো করে দড়িটা টানটান করে নিয়ে রওনা হয়ে যাই। ভেবেছিলাম ক্র্যাম্পন লাগাতে গিয়ে সময় নষ্ট করব না, কিন্তু তাতে জো-র কেটে রাখা বরফের ধাপগুলোয় পা রাখতে গিয়ে খুবই অনিশ্চিত লাগছিল। আমার ওজনের বেশিটাই প্রায় দড়ির ওপরে ছিল, আর পাশাপাশি টান পড়ায়, স্বাভাবিকের চেয়েও দড়িটা সরু লাগছিল। মনে পড়ল অনুভূমিকভাবে প্রসারিত হবার সময় দড়ির স্থিতিস্থাপকতার সীমা অনেকটা কম হয়। বরফ পড়া আরম্ভ হয়ে গিয়েছিল আর জো বরফ আর মেঘের এই নাটকীয় মুহূর্তগুলো ওর ক্যামেরায় বন্দি করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল।

জো ঠিকই বলেছিল। বেরোনোর একটা রাস্তা ছিল। ওভারহ্যাঙগুলোর মধ্যে দিয়ে, তলা থেকে দেখা যায় না এরকম একটা ধাপ-কাটা কর্নার, ষাট ফুট পেছনে বাঁদিকে উঠে গেছে আপার টাওয়ারের মাথা অবধি।

“দারুণ রাস্তা বার করেছ।” আমি ওকে প্রশংসা করি, ভাবি ও কি ষষ্ঠেন্দ্রিয় দিয়ে বুঝে-সুঝে এখানে উঠে এসেছে নাকি স্রেফ ভাগ্যের জোরে নাকি আর কোনোদিকে চড়তে পারত না ও সেইজন্য। কর্নারের ওপরে প্রথমে ফাটলটা অগভীর আর উঠেই শেষ, ও বাঁদিকের দেওয়ালের ওপর দড়ির টানে ভর করে আড়াআড়ি সরে গিয়ে আর-একটা ফাটল ধরে চড়তে শুরু করে। এই ফাটলটা ধরে ও কর্নারের ওপরে উঠে এসে খুব সন্তর্পণে পরপর অত্যন্ত কুশলী কয়েকটা পদক্ষেপে চড়তে শুরু করে। ঘণ্টা খানেকে ও মাথায় পৌঁছে গেল।

“র‍্যাম্পটা দেখতে পাচ্ছ? যাওয়া যাবে?”

“হ্যাঁ, দেখে মনে হচ্ছে একটা দড়ির দৈর্ঘ্যের সমান দূরে। তাড়াতাড়ি করো। বহুত রাস্তা নামতে হবে। ঝট করে সন্ধে নেমে যাবে।”

তুষারপাত কেটে গিয়ে আমাদের চারপাশের পাথরে লাল রঙ ধরতে শুরু করেছিল। কিন্তু আমার হালকা লাগছিল। আমি এক্সপোজার বাড়িয়ে কমিয়ে জো-র কয়েকটা ছবি তুললাম, যাতে আলোটা ধরা যায়।

“তাড়াতাড়ি করো। ছবি তোলার অত সময় নেই।” এই প্রথমবার জো-র গলায় রাগ আর অস্থিরতা টের পেলাম।

“ভেবো না।” আমি চেঁচিয়ে বলি, “যখন বুড়ো হয়ে যাবে ওগুলো দেখে খুশিই হবে তখন!”

আর-একটা কোনাকুনি পিচ চড়তে হত। অনেকটা ঝুলে যাবার প্রবণতা চড়ার পথে। আমি পিটন আর নাটগুলো খুলতে খুলতে এগোই যাতে দড়িটা সোজাসুজি বাইরের দিকে হেলা দেওয়ালের ওপর দিয়ে নীচের বড়ো পাথরখণ্ডটার বরাবর হয়ে যায়। জো একপায়ে পাথরে দাঁড়িয়ে ছিল আর আমি ওর স্পাইক বিলের নীচে একটা স্লিঙে ঝুলে ছিলাম, এরই মধ্যে ও সরঞ্জাম গোছগাছ করে নেমে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। আগের দিন দু-নম্বর শিবিরে পৌঁছোতে ওর চেয়ে আমার আধঘণ্টা বেশি লেগেছিল কারণ আমি ক্যারাবিনার ব্যবহার করেছিলাম নামতে।

“চায়ের জল চাপাতে ভুলো না।” আমি ওকে মনে করিয়ে দিই।

“দেখা হচ্ছে শিগগির।” বলতে বলতে ও নামতে শুরু করে দৃষ্টির আড়ালে চলে যায়।

অযৌক্তিকভাবে আমি জো-র গরজটা বুঝতে চাইনি। ওপরে তাকিয়ে দেখি একটা বাইরের দিকে হেলানো, ওভারহ্যাঙ পাথরের খাঁজ, র‍্যাম্প অবধি উঠেছে। আমার কাছে ওটা বিশৃঙ্খল এলাকার মাঝখানে একটা সোনালি রেখা, যেন মোজেসের জাদুদণ্ড দিয়ে দু-ভাগ করা রয়েছে। তার ডগায় মাথার ওপরে একটা বিশালাকৃতি গ্রানাইটের পাথরের চাঁই বসানো, খাঁজের দুই দেয়ালকে সংযুক্ত করে রয়েছে, যেন ছাদহীন বাড়ির দুই দেয়ালের সংযোগে কড়িবরগা বসানো। মনে হয় না কি আমরা ওই মুকুটের নীচ দিয়েও উঁকি মারতে পারব? এখন আমাদের কিছুই ঠেকাতে পারবে না। যে দড়িটা সকালের তীব্র আলোয় আমার কাছে যন্ত্রণাদায়ক হয়ে উঠেছিল, এখন সেইই আমার বন্ধু হয়ে উঠেছে। আমি ঘোরের মধ্যে নামছিলাম। হুউস করে নেমে যাওয়া, নাচতে নাচতে, ঝুলে দোল খেতে খেতে পাশে সরে যাওয়া, নেমে যাবার খেলায় এইগুলো ছিল নামার প্রক্রিয়ার কিছু নিহিত নমুনা বিশেষ। দড়ির গিঁট বা পিটনের কাছে এসে নিজেকে পার করে নেবার জটিল পদ্ধতিগুলো ছিল বাস্তব প্রক্রিয়া যাতে দক্ষতা অর্জন করতে হতই, সেটা ছিল এই নৃত্য পরিকল্পনার অঙ্গবিশেষ। ভুল করার ফলাফলটা ভুলেই গিয়েছিলাম। চলার ঝোঁক আর ঠান্ডা, উচ্চতা এবং ক্লান্তিজনিত অসাড়তা আমার মধ্যে একটা ঘোরলাগা আচ্ছন্নতা এনে দিয়েছিল। আমার চারদিকে অর্থহীন নাম এবং জাতির একটা কাল্পনিক জগৎ গজিয়ে উঠেছিল। দড়ির গিঁটগুলোকে গোরু বলে ডাকছিলাম, পিটনগুলো আমেরিকান, আমার কোমরের ক্যারাবিনারগুলো নানান মেয়েদের নামে। আমি যেন একটা বড়োসড়ো মাকড়সা, হুড়হুড় করে নেমে চলেছি নীচে।

তাঁবুর ভেতর একটা বড়ো নীল রঙের আলো, অর্থাৎ স্টোভ জ্বলছিল। চায়ের জল চেপেছে। অন্ধকারে আমি গুঁড়ি মেরে বুঝে-সুঝে বাইরের স্লিঙ-এ নিজের সরঞ্জাম আটকে রেখে আস্তানার মধ্যে হামাগুড়ি দিয়ে ঢোকার প্রস্তুতি নিই।

“ওপরে আমি তোমাকে প্রায় একলাই ক্লাইম্বটা শেষ করার জায়গায় ফেলে দিতে যাচ্ছিলাম।” জো বলল। ওর গলাটা কাঁপা কাঁপা আর উদ্বিগ্ন শোনায়।

ওপরে যেখানে তিনটে পিটন আটকানো ছিল, দড়িটা তার মধ্যে দিয়ে এদিক-ওদিক আড়াআড়িভাবে ছিল। জো যখন ওখান দিয়ে নামছে ওর হঠাৎ মনে হয় কিছু একটা গোলমাল হয়েছে আর খেয়াল করে দেখে ওর কোমরের জুমারটা খোলা, ডিসেন্ডারটা ডানহাতে, আর সম্পূর্ণ ওজনটা বাঁহাতে ধরা জুমারের ওপর রয়েছে।

“ব্যাপারটা সত্যিই ছমছমে, উলটোপালটা চিন্তা মাথায় ঘুরঘুর করতে থাকে, ‘এটাই কি?’ আবার ‘পিট কি একা একা ক্লাইম্বটা শেষ করতে পারবে?’ ফের মনে হয় ‘আমি আমার ডিসেন্ডারটা খোয়াতে চাই না।’ শেষমেশ আমি গলা থেকে একটা নাইলন স্লিঙ খুলে দড়িটায় জড়িয়ে আমার হাতটা তার মধ্যে দিয়ে গলিয়ে নিই, যাতে জুমারটা ফের ক্লিপ করে নিতে পারি।”

রাতের খাবার খাওয়ার সময় জো খুব অল্পই বলল। খাবার যথারীতি ছিল অক্সো-র সঙ্গে শুকনো করা মাংস আর সেদ্ধ আলু আর এক কাপ চা, শেষপাতে একটু চকোলেটে কামড়। ওর রান্নার মধ্যেই আমি ঘুমিয়ে পড়ি। যা দিন গেল একটা! দ্বিধা এবং ভয় থেকে সমাধান-সংকল্প অবধি। তারপর তীব্র খাটুনি থেকে আনন্দ—জীবনের সমস্ত আবেগ উচ্ছ্বাস আমার মনের মধ্যে প্রবলভাবে আছড়ে পড়ছিল। তবু আমাদের কথাবার্তার মধ্যে শান্ত, পরিমিত আশাবাদ থেকে এক ফোঁটা বেশি আভাস ছিল না। সকালে যতটা আগে পারা যায় আমরা বেরিয়ে পড়ব, দু-দিনের খাবার সঙ্গে নিয়ে, অ্যালপাইন স্টাইলে এগোব, শৃঙ্গ আরোহণের জন্য।

ব্যাপারটা এমন যে আমাদের অবচেতনে একটাই ঘড়ি টিকটিক করে চলেছে। সকালবেলা দুজনেই দেরি করে উঠলাম, শোবার সময়েই দুজনেই ভেতরে ভেতরে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে একটা দিন বিশ্রাম নেব। এখন আমরা অপেক্ষা করছি অন্যজন এটা প্রস্তাব করুক। অবশেষে আমি জোকে জিজ্ঞাসা করি, “ভাবছি আমি রান্নাটা শুরু করব কি করব না, তুমি কী বলো?”

“খুব খুশি হয়েছি তুমিই বললে বলে।” ও বলে।

আমরা দুজনেই হাসতে থাকি তারপর নিজেদের ভাবনার জগতে তলিয়ে যাই, বেশ একটা আরাম হয় ভেবে যে রান্নাবান্না শুরু করা কিংবা বাইরে হাওয়ার মধ্যে টয়লেটে যাবার জন্য রোদ্দুর ওঠা অবধি অপেক্ষা করতে পারি আমরা। সেদিন সকালটা অন্তত আমাদের শরীরের ভেতরের ঘড়িটায় দম দিতে হবে না, থেমে থাকতে পারে।

বিকেলের দিকে তাঁবুর মধ্যে আমার ক্লস্ট্রোফোবিক লাগতে শুরু করল। আমি গুঁড়ি মেরে বাইরে বেরোতে গিয়ে অনবধানে জো-র ক্যামেরার যন্ত্রপাতির ওপরে হাঁটু দিয়ে ফেললাম। ও আমার আনাড়িপনায় ধমকে উঠল। তার আগে অবধি আমি ফটোগ্রাফার হিসেবে জো-র উৎসাহের ব্যাপারটা বুঝতেই পারিনি। ও সঙ্গে করে লেন্সের জন্য নরম কাপড় এনেছিল, ওগুলো বুরুশ দিয়ে পরিষ্কার করত নিজে, সেসব পরিষ্কারের বিষয়ে খুবই খুঁতখুঁতে ছিল।

“আমাকে ক্যামেরাগুলো কিনতে হয়েছে, ওগুলো আমাকে কেউ দেয়নি, বুঝলে।”

এভারেস্ট চড়ার জন্য আমায় একটা অলিম্পাস ও এম-ওয়ান ক্যামেরা দেওয়া হয়েছিল, সেটাই আমি আমার সঙ্গে নিয়ে এসেছিলাম, একটা ওয়াইড অ্যাঙ্গেল লেন্স লাগিয়ে। কিন্তু জো যেমনটা চাইত করি, আমি ওটার ততটা যত্নআত্তি করতাম না। স্বভাবতই, জো-র বিভক করা এবং সরঞ্জাম ব্যবহার এত নিঁখুত এবং পরিপাটি যে তার পাশে নিজেকে তালগোল পাকানো আনাড়ির মতো লাগত, যেন চিনেমাটির দোকানে ছোটো ছেলেকে বলা হয়েছে কিচ্ছু না ধরতে। কেউ কেউ পর্বতারোহীদের আরোহণের গতি বা কোনও পাথরে কত কঠিন আরোহণ তারা করতে পারেন সেই মাপে তাঁদের বিচার করে। কিন্তু চ্যাঙাব্যাঙে প্রকৃত পরীক্ষাটা ছিল কতটা দক্ষতায় তুমি চায়ের জলটা নামাতে পারো বা স্যুপ গরম করতে পারো, হাত দুটো গরম করতে পারো অথবা জুতো খুলে নিতে পারো।

বাইরে বেরিয়ে বিকেলের পড়ন্ত রোদে বাইরের দৃশ্য উপভোগ করতে থাকলাম। কাছাকাছি পাহাড়গুলোর চেহারা এত পরিচিত। দূরের ধূসর তিব্বতের মালভূমি পেরিয়ে একলা দাঁড়ানো সাদা বরফ-চূড়াটার দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছিল কৈলাস দেখতে পাচ্ছি কি? কৈলাস, ভগবান শিবের ভূমি, চমৎকার একটা বরফের পাহাড়, ঝকঝকে, স্ফটিক-স্বচ্ছ, মহাবিশ্বের কেন্দ্রবিন্দু। এশিয়ার বহু বড়ো বড়ো নদী কৈলাসের জলে পুষ্ট, রাজনীতি এবং যুদ্ধবিগ্রহ দেশের সীমারেখা এবং ধর্মাধর্ম বদলে দেবার আগে হাজার হাজার তীর্থযাত্রী এখানে পায়ে হেঁটে আসত, পরিক্রমা করত। আমার কাছে এটা ছিল নিষিদ্ধ প্রদেশের একটা সাদা রঙের নির্দেশ-স্তম্ভ। শিগগিরই, আমি ভাবি, আমি শৃঙ্গ বরাবর গিরিশিরাটির ওপরে দাঁড়িয়ে নন্দাদেবীকে দেখতে পাব, আর সেটা দেখার জন্য যথেষ্ট কঠিন পরিশ্রমও করে ফেলব। আজ ১৩ অক্টোবর, শিগগিরিই শীত পড়ে যাবে। আমাদের হাতে খুব একটা সময় নেই।

ফের গুটিশুটি মেরে তাঁবুতে ঢুকতে যাব, ঠিক দরজার বাইরেটাতে জো যেখানে কেশে ফেলছিল, বরফের ওপর দেখি গাঢ় রঙের দাগ। গলা দিয়ে রক্ত উঠছিল ওর। ও যেহেতু সেটা নিয়ে কিছু বলেনি, আমিও ঠিক করেছিলাম কিছু বলব না। ভেতরে ও ওর স্লিপিং ব্যাগের ভেতর শুয়ে ছিল, মুখ-চোখে একটা পরম আনন্দের ভাব।

“নিজের মনে এত খুশি খুশি ভাবের কারণটা কী?”

“উহ্‌।” ও বলে, “তাঁবুর কাপড়টা ধরে দেখেছ? ওটা ফুলে উঠে আমার মুখের ওপর নীচে এসে পড়েছিল, আর ওটা যখন তোমায় স্পর্শ করবে কেমন ফুলো ফুলো নরম নরম মনে হবে তোমার। আলটিমেট বিল বলে মেয়েদের অন্তর্বাসের জন্য যে কাপড় ব্যবহার করা হয় এটা তৈরির জন্যও সেই কাপড়ই ব্যবহার করা হয়।”

বাকি দিনটা অলস হাসিঠাট্টায় বয়ে গেল। চ্যাঙাব্যাঙ আর আমাদের বেশি ভাবাচ্ছিল না।

ক্রমশ

খেলার পাতায় সমস্ত ধারাবাহিক অভিযান একত্রে

Leave a Reply