ধারাবাহিক অভিযান- অজানা আফ্রিকায়- আর্থার ডোনাল্ডসন স্মিথ-ভাষান্তর: অরিন্দম দেবনাথ-অধ্যায় ৫-(পর্ব-৩)-শরৎ ২০২৬

জয়ঢাকের অভিযান লাইব্রেরি- ভারেস্ট-এরিক শিপটন(অনু-বাসব চট্টোপাধ্যায়)  অন্নপূর্ণা-মরিস হারজগ(অনু তাপস মৌলিক) কন-টিকি অভিযান- থর হেয়ারডাল (অনু-শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায়)

পূর্বপ্রকাশিত–> পর্ব-১ পর্ব ২

পর্ব ৩

আরাসুরা

শেবেলি নদীর কাছে বসবাসকারীরা খুবই গরিব, অন্তত এই দেশের পশ্চিমে বসবাসকারীদের তুলনায় তো বটেই। কিন্তু আমি ওদের মার্জিত আচরণ দেখে অবাক হয়ে গেছিলাম। শারীরিক গঠন অন্যান্য সোমালিদের মতোই। ঘন বাদামি রঙ, কোঁকড়ানো চুল। কিন্তু গলার স্বর নরম আর সুরেলা। ঔদ্ধত্যের লেশমাত্র নেই। প্রায় সবার পিঠেই একটা করে গোরুর চামড়ায় তৈরি ছোটো ঢাল। আর ঢালগুলোর ওপর সুন্দর কারুকার্জ করা। হাতে একটা করে ছোটো হাতলের বর্শা। শুনলাম, এই বর্শা ওরা সবসময় নিয়ে ঘোরে না। সবার শরীরেই নানাধরনের অলংকার। আমি আশ্চর্য হয়ে গেছিলাম অলংকার তৈরির ধরন দেখে। ছোটো ছোটো লোহার টুকরো, কাঠ, শিং আর হাড় দিয়ে বানানো গলার হার। হাতে হাতির দাঁত থেকে তৈরি কঙ্কণ। প্রতিটিতে অসাধারণ শিল্পমান ফুটে উঠেছে। এছাড়া ওদের সঙ্গে ছিল সুন্দর আকৃতির দু-পাশে হাতল দেওয়া কারুকার্য করা মাটি আর কাঠের পাত্র, আর কলশি। পুরুষদের কোমরে একখণ্ড কাপড় জড়ানো থাকলেও মহিলাদের কোমরে ছিল ভেড়ার চামড়ায় তৈরি ছোটো স্কার্ট।

আমরা যে দস্যু নই, স্থানীয়রা তা বুঝতে পেরে বার বার অনুনয় করতে লাগল আবিসিনিয়ানদের থেকে ওদের রক্ষা করতে। ওরা আমাকে ওদের ধ্বংস হয়ে যাওয়া গ্রামে নিয়ে গিয়ে উনুনগুলো দেখাল, যেগুলোতে ওরা শেখ হোসেন শহর থেকে শস্য কিনে নিয়ে এসে রুটি পাকাত, খাবার তৈরি করত— সেগুলো পর্যন্ত দস্যুর দল ভেঙে তছনছ করে দিয়ে গেছে। ওরা কাঁদতে কাঁদতে জানিয়েছিল, ওদের কাছে এখন আর এমন কিছু নেই যার বিনিময়ে ওরা খাবার বা অন্য কিছু কিনতে পারে। দস্যুর দল ওদের পশুপালের প্রায় সব ছাগল আর ভেড়া লুট করে নিয়ে গেছে। এখন তাদের কাছে যে সামান্য পশু অবশিষ্ট আছে, তার অর্ধেক ওদের খাজনা হিসেবে শাসকদের দিয়ে দিতে হয় রক্ষা পাওয়ার জন্য।

যাওয়ার আগে হারি বেরোইসকে বেশ কিছু পেতলের অলংকার উপহার হিসেবে দিয়েছিলাম। এই পেতলের গয়না পেয়ে হারি সব-হারানো মানুষগুলোর দেশে বেশ ধনী হয়ে উঠেছিল বলে স্বীকারোক্তি দিয়েছিল।

পরের দিনের হাঁটা খুব কমই ছিল। আমি এক স্থানীয় আরাসু উপজাতির প্রধানের সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলাম। বৃদ্ধ প্রধান আমাদের আন্তরিকভাবেই স্বাগত জানিয়েছিলেন। উনি আমাদের জন্য খানিক দুধ আর একটা মোটাসোটা ভেড়া উপহার দিয়েছিলেন। প্রধান ছিলেন একজন লম্বা ও সুদর্শন ব্যক্তিত্বধারী পুরুষ। আমার কাছ থেকে উনি একটি চাটনির খালি বোতল আর বিস্কুটের টিনের ঢাকনা পেয়ে ওঁর গলার দু-পাশে ঝুলিয়ে নিয়েছিলেন। এখানে এই দুটো বস্তুই দুষ্প্রাপ্য। তিনি আমাকে বলেছিলেন যে তিনি বা তাঁর লোকজন বিশ্বাস করে না যে আমি এমনি এমনি এসে উপস্থিত হয়েছি। আবিসিনিদের থেকে দেশকে মুক্ত করতে খোদ ঈশ্বর নাকি আমাকে পাঠিয়েছেন।

৯ সেপ্টেম্বর দারদে নদী পার হয়ে বারবাডচে-তে ক্যাম্প করেছিলাম। এখানে নদী খুবই সরু, চলতে চলতে ছোটো ছোটো জলপ্রপাতের আকার নিয়ে পাহাড়ি ভূমি দিয়ে ছুটে চলছে। এখনও পর্যন্ত গালা দেশের এই অংশের যে যে জনপদের মধ্যে দিয়ে এসেছি, সেগুলো আকারে এবং লোকসংখ্যার নিরিখে খুবই ছোটো। যদিও প্রায় পরিত্যক্ত ও নির্জন হয়ে থাকা গ্রামগুলো দেখে টের পেয়েছিলাম, একসময় এখানে বহু লোকজন বাস করত। অবশ্য যতক্ষণ পর্যন্ত না মালভূমির ওপরের অংশে পৌঁছনো যায়, ততক্ষণ পর্যন্ত এই দেশ সোমালিল্যান্ডের মতোই শুষ্ক অঞ্চল। শুধুমাত্র পশুচারণের উপযুক্ত। উত্তরের দিকে উচ্চ মালভূমি আর একের পর এক সুউচ্চ পাহাড়ের সার একে অপরের মাথা টপকে দাঁড়িয়ে। আর দক্ষিণে কাঁটাগাছ আর ঝোপঝাড়ভরা সমতল, তারই মাঝে এখানে ওখানে মাথা তুলে আছে ছোটো ছোটো টিলা।

আমরা পাহাড়ের ঢাল বেয়ে উঠতে উঠতে দিনের শেষে পৌঁছে গেছিলাম সমুদ্রতল থেকে হাজার তিনেক ফুট উঁচুতে। আকাশ মেঘাছন্ন হয়ে ছিল। ঠান্ডা ঠান্ডা ভাব হাওয়ায় মিশে ছিল আর ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টিও ঝরে চলছিল।

রোকো নামের জলের খোঁদল পরিপূর্ণ এক জায়গায় পৌঁছতে না পৌঁছতেই কাছের গ্রামের এক প্রধান ছুটে এসেছিল। জিল্লো নুবোন্না গ্রামের প্রধানের প্রথম আর একমাত্র আকুতি ছিল খানিক আগে আবিসিনিয়ানদের লুট করে নিয়ে যাওয়া ভেড়া আর পশুর পাল উদ্ধার করে দেবার। এই পশু আর ভেড়ার পাল তার মৃত ভাইয়ের সম্পত্তি ছিল। আমি অনেক কষ্টে ওকে বোঝাতে পেরেছিলাম আমরা লুটপাট বা লড়াই করতে আসিনি। কোনও উপজাতির সঙ্গেই আমরা যুদ্ধে জড়াতে পারব না। এই অঞ্চলের সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব বজায় রেখে এই দেশকে জানাই আমাদের উদ্দেশ্য। ও কী বুঝেছিল জানি না, কিন্তু আমাদের কথা শুনে যে হতাশ হয়েছিল, তাতে সন্দেহ নেই।

এই অঞ্চলে চলার জন্য উট মোটেই সুখকর বাহন ছিল না। কিন্তু একটা বিষয়ে আমরা নিশ্চিন্ত হয়েছিলাম, যে পথ ধরে এগোচ্ছি, তাতে করে আগামী কিছুদিন জলের অভাব আমাদের হবে না। উঁচুনীচু ভূতল ধরে দিনে ছ’ঘণ্টা চলে ন’ বা দশ মাইলের পথ পার হওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। আমরা চলছিলাম উত্তরপূর্ব দিক লক্ষ্য করে।

সেপ্টেম্বরের ১২ তারিখ আমরা ফুরজা নামের এক জায়গায় পৌঁছনোর পর ওয়াচাল্লি উপজাতির দুই গ্রাম প্রধান, ওসে বুরদে আর দরদি হারি—দুটো স্বাস্থ্যবান উট নিয়ে দেখা করতে এসেছিল। সঙ্গে এনেছিল কিছু দেশীয় বর্শা আর অলংকার। আমি এগুলো কিনে নেব বলে জানিয়েছিলাম। এরাও আবিসিনিয়ানদের লুটতরাজের করুণ কাহিনি বলে গেছিল। একসময় এরা খুবই বর্ধিষ্ণু ছিল, কিন্তু আবিসিনিয়ানরা এদের সমস্ত ধনসম্পদ কেড়ে এদের ভিখারি করে ছেড়েছে। সুন্দর সুঠাম চেহারার দুই পুরুষ অত্যাচারের বর্ণনা দিতে দিতে কেঁদে ফেলেছিল। আমার খুবই অসহায় লাগছিল এদের অত্যাচারিত হবার কথা শুনে, কিন্তু আমি নিরুপায়। গ্রামের পর গ্রাম বিধ্বস্ত করে দিয়েছে আবিসিনিয়ানরা। এত দুঃখের মধ্যেও অবাক লাগছিল শুনে যে এই দুই প্রধানের একজন ওসে বুরদেকে এখন আবিসিনিয়ানদের হয়ে স্থানীয়দের কাছ থেকে কর সংগ্রহ করে দিতে হচ্ছে। কারণ, আবিসিনিয়ানরা সরকারকে জমা করার জন্য স্থানীয়দের নিয়োগ করেছিল খাজনা সংগ্রহে।

অন্যরকম

পরদিন মাইল তেরো চলার পর আমরা এক মনোরম জায়গায় গিয়ে উপস্থিত হয়েছিলাম। এই দেশের অন্য অঞ্চলের থেকে পুরোপুরি আলাদা চারপাশটা। খোলা সমতল হাঁটু সমান সবুজ ঘাসে ভরা। তারই মাঝে এখানে ওখানে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আপেলের মতো ফলে ভরা অজস্র গাছ। খানিক এগোতেই আমরা পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে পৌঁছেছিলাম এক অসাধারণ সুন্দর উপত্যকায়। উপত্যকায় পৌঁছে এক টলটলে জলের ঝরনার ধারে ক্যাম্প করেছিলাম। নানারকম গাছে ভরা জায়গাটা। পুরো উপত্যকা ছেয়ে রঙবেরঙের ফুলের ঝোপে। ফুলের সুগন্ধে ম ম করছে চারপাশ। খানিক ভিজে আর ঠান্ডা ঠান্ডা ভাব আমাকে নিজের দেশের বসন্তের কথা মনে করিয়ে দিয়েছিল। দৈত্যাকার সিকামোরস, পাইন আর ইউফোরবিয়াসের মোটা শেকড় ঝোপঝাড়ের মধ্যে ছড়িয়ে। ঠিক একই পরিবেশ আর অনুভূতি। শুধু ফুল আর উড়ে বেড়ানো পাখি, প্রজাপতি আর পতঙ্গের দল একদমই আলাদা—আফ্রিকার নিজস্ব। জায়গাটার নাম গোরগোরা।

ফুচিয়াস, মিষ্টি মটর-সহ অগণিত গাছপালা যেন বলে উঠছিল, ‘আমায় দেখ, আমায় দেখ।’ ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি গান করতে করতে এক গাছ থেকে আর এক গাছে উড়ে গিয়ে বসছিল। উড়তে-উড়তেই ঠোঁটের ফাঁকে পুরে নিচ্ছিল উড়ন্ত প্রজাপতি। কিন্তু সব ছাড়িয়ে স্পষ্ট হয়ে ছিল হাতির পালের চলার দাগ, আর লেপার্ড ও সিংহের পদচিহ্ন। শেবেলি ছাড়ার পর জেব্রা, গ্যাজেল আর অরিক্সের কিছু দলবল বাদে এত জন্তুর পায়ের ছাপ একসঙ্গে নজরে আসেনি।

পরদিন হেঁটে আমরা এমন জায়গায় পৌঁছলাম যেখান থেকে পশ্চিমের বহুদূর প্রান্তে দুটো সুউচ্চ পর্বতশ্রেণি দেখা দিল। নয় নয় করেও পঞ্চাশ মাইল দূরে হবে পর্বতগুলো। সঙ্গী নেটিভরা একটার নাম বলল—দারো। নামহীন অন্যটির আমি নামকরণ করলাম ‘গিলেট পর্বত’, বন্ধু ও সহ-অভিযাত্রী ফ্রেড গিলেটের নামে।

১৫ সেপ্টেম্বর দারার নামক একটা ছোটো গ্রামের কাছে তাঁবু ফেলেছিলাম। সেখানকার গ্রামবাসীদের কাছে শুনলাম, শেখ হোসেনে এক বিশাল ধর্মীয় উৎসব সমাগত প্রায়। আমরা সেই উৎসব দেখলে খুবই আনন্দ পাব। আমি শেখ হোসেন সম্পর্কে খবর পেতে মুখিয়ে ছিলাম। উৎসবের কথা জানতে পেরে দলবল নিয়ে দ্রুত এগোনোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।

অঞ্চলের সকল অধিবাসী মুসলিম ধর্মাবলম্বী। পরের পথ গিয়েছিল মাইলের পর মাইল চাষের ক্ষেতের ধার দিয়ে। শয়ে শয়ে একর জমিতে ফলে আছে ভুট্টা, মটরশুঁটি আর কুমড়ো। চাষি বলদ জুড়ে হাল টেনে চলেছে। এই উর্বর মাটি আর জলহাওয়া পেলে যে-কোনো ইউরোপিয়ান কৃষক আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠবে। দিনের গড় তাপমাত্রা ৭০ ডিগ্রি ফারেনহাইট।

১৭ সেপ্টেম্বর প্রথম এক আবিসিনিয়ানের (বর্তমানে আবিসিনিয়ানরা ইথিওপিয়ান নামে পরিচিত) সঙ্গে দেখা পেলাম। এই আবিসিনিয়ান এই অঞ্চলের একটা বড়ো অংশের দেখভালের দায়িত্বে ছিল। প্রথম দর্শনেই আমি মুগ্ধ হয়ে গেছিলাম লোকটাকে দেখে। ছয় ফুটের ওপর লম্বা, পেশিবহুল শরীর আর চেহারাতে লাবণ্যের ছোঁয়া। লোকটার নাম ছিল গাবর আমারিয়া।

লুকুর বাসিন্দারা

গাবরের কাছেই জানতে পারলাম, সে কুরাগাজ অঞ্চলের লোক। যা আবিসিনিয়ান সাম্রাজ্যের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশ। এখন সে এই লুকু অঞ্চলের দারোগার ভূমিকায়। বর্তমানে এই দেশের সেনাধ্যক্ষ তার সৈন্যবাহিনী নিয়ে দক্ষিণে নেটিভদের সঙ্গে যুদ্ধে ব্যস্ত। অল্প কয়েকজন আবিসিনিয়ান এখন এই অঞ্চলে উপস্থিত, তবে তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে কোনও অসুবিধা হবে না।

গাবর আমিনিয়ার দেখানো পথে আমরা নির্বিঘ্নে লুকুতে পৌঁছে ক্যাম্প করেছিলাম। লুকু মূলত কৃষিজীবীদের এলাকা। শেখ আলি এখানকার প্রধান। পরদিনটা আমরা লুকুতেই থেকে গেছিলাম স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলতে আর গিলেটকে হাতি শিকারের সুযোগ দিতে। এই অঞ্চলে হাতির ছড়াছড়ি। গ্রাম প্রধান আর গ্রামের সব বাসিন্দারা সারাদিন আমাদের ক্যাম্পেই ভিড় করে ছিল, আর আমি একে একে কয়েকটা খেলনা দেখাতে তারা মুগ্ধ হয়ে তার দিকে তাকিয়ে ছিল। কয়েকটা চিনামাটির খেলনা ওদের দিতেই আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠছিল। খুশিতে ডগমগ হয়ে ওরা আমাদের শেখ হোসেন যাবার সোজা রাস্তা দেখিয়ে নিয়ে যেতে রাজি হয়েছিল, যা এখান থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমে প্রায় মাইল তিরিশ দূরে অবস্থিত। কোনও সন্দেহ নেই, ওরা আমাদের পথ দেখিয়ে না নিয়ে গেলে শেখ হোসেন পৌঁছানো আমাদের পক্ষে জটিল হত প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতার জন্য। শেখ আলি স্পষ্ট বলে দিয়েছিল, শেখ হোসেন যাওয়াটা সহজ হবে না। তবে বুদ্ধিমান প্রধান, ওঁর লোকজন সবরকম সাহায্য করবে বলে আশ্বাস দিয়েছিল। ওরা নিজেরাও শেখ হোসেনের উৎসব দেখতে উৎসাহী ছিল। লুকু থেকে তিনদিন লেগেছিল পাথর সরিয়ে, গাছ কেটে রাস্তা বানিয়ে শেখ হোসেন পৌঁছতে।

আমার দলের ছেলেরা সবাই মুসলিম ধর্মাবলম্বী। ওরা স্থানীয়দের ধর্মাচরণের নানা রীতি দেখাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল। স্থানীয়দের সঙ্গে আমার লোকেরা বন্ধুত্ব পাতিয়ে চলুক, এই নীতি নিয়ে প্রথম থেকেই চলছিলাম। আমার ছেলেরা আর্জি জানিয়েছিল শেখ হোসেনে পৌঁছে ওদের মতো করে খানিক ধর্মীয় কসরত দেখাবে। তাই ওদের ধর্ম নিয়ে মেতে ওঠায় কোনও বাধা দেইনি, কিন্তু ওদের প্রার্থনার মাতামাতিতে রাতের ঘুম ছুটে গেছিল!

যতই শেখ হোসেনের দিকে এগোতে লাগলাম, ততই সচ্ছলতার নমুনা নজরে আসতে লাগল। তিরিশ থেকে চল্লিশ ফুট জায়গা জুড়ে এক-একটা বাড়ি, শক্তপোক্ত মোটা কাঠের খুঁটির ওপর খড়ের ছাদ মাটি থেকে ফুট পাঁচেক উঁচুতে। প্রত্যেক পরিবার নানারকম খাদ্যশস্য, কড়াইশুঁটি, কুমড়ো চাষের পাশাপাশি মধু সংগ্রহ করে থাকে। প্রায় সবাই যথেষ্ট সংখ্যায় ছাগল, ভেড়া, গাধা আর গবাদি পশুর মালিক। এমনকি কয়েকটি পরিবারের কাছে উটও আছে। যদিও এই রুক্ষ দেশে এরা উটকে মাল বহনের কাজে লাগায় না। শুধুমাত্র দুধ পাওয়ার জন্য প্রতিপালন করে।

স্থানীয়রা ধরে নিয়েছিল, আমরা এই বিশাল ক্যারভান নিয়ে এখানে হাজির হতে পেরেছি শুধুমাত্র ঈশ্বর চেয়েছেন বলে।

উপত্যকার খানিক দক্ষিণ থেকে আমরা প্রথম দুই সুউচ্চ পাহাড়ের মাঝে অবস্থিত পাহাড়ের ঢালে শেখ হোসেন শহরের দেখা পেলাম। সার সার খড়ে ছাওয়া বাড়ি, তারই মাঝে পাহাড়ের ঢালে গোটা পাঁচেক সাদা বিশাল আকৃতির সমাধিক্ষেত্র ও কয়েকটি পাথরের মসজিদ। মৌমাছির চাকের মতো নকশার জাল বোনা। বিশিষ্ট ভ্রমণকারী তথা পুরোহিত শেখ হোসেনের সমাধি তার আকৃতি, অলংকরণ ও গঠন বৈশিষ্ট্য দিয়ে দূর থেকেই আলাদা করে চিনিয়ে দিচ্ছিল।

অনেকটা জায়গা জুড়ে বর্গাকৃতি সমাধিক্ষেত্রটি নয় নয় করেও ফুট চল্লিশেক উঁচু। সমাধিক্ষেত্রের ছাদের ওপর একটা বিশাল গম্বুজ। তাকে ঘিরে উঠে যাওয়া পাঁচিলের চার কোনায় চারটে মিনার। সমাধিক্ষেত্র ঘিরে ফুট দশেক উঁচু পাঁচিল আর তার সংলগ্ন দুটো পাথরের বড়ো বড়ো বাড়ি। সমাধিক্ষেত্রের সুদৃশ্য প্রবেশপথ দূর থেকেও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। পুরো সমাধিক্ষেত্রটির গায়ে সাদা পলেস্তারা চাপানো, যা সবুজ গাছপালার ফাঁক দিয়ে বহুদূর থেকেও নজর কেড়ে নেবে অনায়াসে।

আন্তরিক অভ্যর্থনা

আমরা ধীরে ধীরে পাহাড়ের গা বেয়ে উঠতে লাগলাম। আমার দলের ছেলেরা ইতোমধ্যে সুন্দর পোশাকে সেজেগুজে নিয়েছিল। দলের আগে আমাদের ইউরোপিয়ানদের ছোটো দল, তার পেছনে সুন্দর আরবি পোশাকে ইদ্রিস, তার পেছনে সারা গায়ে ঘি মেখে সাদা কাপড়ের পাগড়ি বেঁধে ষাটজন বন্দুকবাহক। তার পেছনে পিঠে মালের বোঝা চাপিয়ে সার সার উট, ছাগল আর ভেড়ার দলের পাশাপাশি সঙ্গে আসা লুকুর বাসিন্দারা শহরের প্রান্তে পৌঁছতেই আমাদের স্বাগত জানাতে তৈরি থাকা শহর প্রধানের নেতৃত্বে শ-তিনেক মানুষ হুল্লোড় করে উঠেছিল। একবারে দেশীয় ধর্মীয় পদ্ধতিতে ওরা আমাদের অভ্যর্থনা জানিয়েছিল। এখানে এই বিশেষ সময়ে এই বিশাল দলের উপস্থিতি ওদের কাছে অভাবনীয় ছিল। ওরা পুরো বিষয়টিকেই ঈশ্বরের অশেষ কৃপা বলে ধরে নিয়েছিল। প্রথমেই একজন লম্বা চুলওয়ালা অতি বৃদ্ধ লোক সাপের মতো এঁকে-বেঁকে এগিয়ে এসেছিল। কোনও মানুষ যে এরকম সর্পিলভাবে এগোতে পারে তা নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করতে পারতাম না। উপস্থিত প্রত্যেকের হাতে ছিল বর্শার পরিবর্তে লম্বা লাঠি। একটা লাঠি আর একটার ওপর আড়াআড়ি করে ছুঁয়ে ছিল। আমরা পৌঁছতেই সেই লাঠি ঠুকে ঠুকে অসাধারণ সুরবাদ্য শুরু করেছিল উপস্থিত জনতা। সঙ্গে শুরু হয়েছিল ড্রাম বাজিয়ে সুরেলা স্বরে গান। হাততালি দিয়ে অদ্ভুত ভঙ্গিমায় শরীর দুলিয়ে নাচ শুরু করেছিল একদল নর্তক। খানিক সময় ধরে নাচগান চলার পর এগিয়ে এসেছিল লুকুর গ্রাম প্রধান শেখ আলি। উনি আগে পৌঁছে আমাদের ক্যাম্প করার জায়গা ঠিক করে পরিষ্কার করিয়ে রেখেছিলেন। নাচগান করতে করতে শহরবাসীর আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে গিয়েছিল কয়েকশো গজ দূরে আমাদের থাকার জন্য নির্দিষ্ট করা জায়গায়। বিকেল আমাদের জন্য এলাহি খাওয়াদাওয়ার আয়োজন করেছিল স্থানীয়রা। সেই ভোজের জন্য আমি একটা মোটাসোটা উট আর খানিক ঘি দিয়েছিলাম।

মহিলাদের এই ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করার অনুমতি নেই, তারা শুধু দূর থেকে দেখতে পারত। দিনের বেলা সামান্য ঝিরঝিরে বৃষ্টি হলেও রাতভর অঝোরে বৃষ্টি হয়ে চলেছিল। বৃষ্টি হতেই শুরু হয়েছিল কনকনে ঠান্ডা।

বেশ কিছু আবিসিনিয়ান আমার সঙ্গে ক্যাম্পে দেখা করতে এসেছিল। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সবাই সামনে এগোনো যে কতটা ভয়াবহ হবে, তাই বলে যাচ্ছিল। আমি বেশ বুঝতে পারছিলাম, ওরা সুকৌশলে আমরা যাতে আর না এগোই তারই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল। আমিও ওদের বোঝানোর চেষ্টা করে চলেছিলাম যে আমি এই দেশে এসেছি শুধুমাত্র ডেম্বলের দক্ষিণে অবস্থিত লেকগুলো দেখতে, যেগুলোর জলস্রোত দক্ষিণ পশ্চিমের লেক রুডলফে গিয়ে মিশেছে। আবিসিনিয়ানরা কিন্তু আমার সঙ্গে খুবই ভদ্র ও নম্র ব্যবহার করে গেছিল প্রথম থেকেই। ওরা আমাকে যথেষ্ট পরিমাণে খাদ্যশস্য আর পশুর দল খুবই কম দামে সরবরাহ করেছিল।

বিদ্রোহ

শেখ হোসেনে দু-দিন থাকার পর দলের জনা পনেরো ছেলে হঠাৎ বিদ্রোহ করে বসল—তারা আর আগে যাবে না, ওরা এখনই এখান থেকে ফেরত চলে যাবে। আমি জানতে পেরে প্রথমেই ওদের কাছ থেকে বন্দুকগুলো সরিয়ে নেবার ব্যবস্থা করলাম। বিদ্রোহের কারণ শুনে হতবাক হয়ে গেছিলাম। ওরা আর যাবে না, কারণ ওরা জেনেছে সামনে ঠান্ডার জায়গা আসছে, আর ওরা ঠান্ডা সহ্য করতে পারবে না। আমি ওদের স্পষ্ট বলে দিলাম, ওরা চাইলে দলের সঙ্গে আগে না গিয়ে ফিরে যেতেই পারে, কিন্তু চুক্তি অনুযায়ী কোনও বেতন ওরা পাবে না। এমনকি কোনও খাদ্য বা বন্দুকও সঙ্গে পাবে না। আমার কথা শুনে খানিক পর সবাই সুড়সুড় করে কাজে ফিরে এসেছিল। কিন্তু শাস্তি স্বরূপ ওদের অতিরিক্ত কাজ করতে দেওয়া হয়েছিল আর বেশ কিছুদিন ওদের বন্দুকে হাত দিতে দেওয়া হয়নি।

২৫ সেপ্টেম্বর জনা তিরিশ আবিসিনিয়ান আমার সঙ্গে ক্যাম্পে দেখা করতে এসেছিল। আমি ওদেরকে কিছু পুঁতির টুকরো দিয়েছিলাম। গালা দেশের সবাই পুঁতি, পেতলের চেন, ছুঁচ, ছুরি, রেজার এসব পেলে খুশিতে ডগমগ করে ওঠে। কিন্তু একটুকরো বিদেশি কাপড় পাওয়ার জন্য ওরা হন্যে হয়ে উঠেছিল। আমেরিকায় তৈরি একখণ্ড ছোট্ট কাপড়ের টুকরোর জন্য ওদের সঙ্গে যা কিছু আছে তাই দিয়ে দেবার জন্য প্রস্তুত ছিল, এমনকি নিজের তলোয়ারটা পর্যন্ত।

নেটিভদের সঙ্গে

অঝোরে বৃষ্টি ঝরেই চলছিল দিন কয়েক ধরে। ফলে সামনে এগোনো অসাধ্য হয়ে উঠেছিল। ফলে এই শহরেই থেকে আবহাওয়া ভালো হবার অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় ছিল না। যদিও এই থেকে যাওয়ার ফলে আমরা প্রচুর পশুপাখির নমুনা সংগ্রহ করতে পেরেছিলাম, যার অধিকাংশই আমি আগে দেখিনি।

শহরে বসে না থেকে ফ্রেড উত্তরের দিকে বেরিয়ে পড়েছিল হাতি শিকারের আশায়। কিন্তু হাতি শিকারে ফ্রেড তেমন একটা সুবিধা করতে পারেনি। যদিও সে শিকারে সিদ্ধহস্ত। এ-সময় আমি যখনই আমার থিওডোলাইট নিয়ে কাজ করতাম, তখনই স্থানীয়রা ভিড় করে আমার যন্ত্রের ভেতর দিয়ে দেখা অবাক হয়ে দেখত। আমার লোকেরা ওদের ভয় দেখাত এই বলে যে সাহেব এই যন্ত্র দিয়ে দেশের সব আনাচ-কানাচ দেখতে পায়।

এবার ফ্রেডের হাতি শিকার অভিযানের কথা শোনা যাক।

গাইডের সঙ্গে মাইল পঁচিশমতো যাবার পর ওরা একটা হাতির চলার চিহ্ন দেখতে পায়। যদিও হাতির পায়ের নিশানা দিন দু-একের মতো পুরোনো ছিল। গাইড ফ্রেডকে ওর যন্ত্রে চোখ লাগিয়ে হাতিটা কোথায় আছে তা দেখতে বলে।

“আমি প্রথমে ভেবেছিলাম লোকটা মজা করেছে। ওকে এরকম যে কিছু দেখা যায় না বোঝাতে গিয়েও চুপ করে যাই। কারণ, ওর মুখ দেখে বুঝতে পারি, সে যা বলছে তার মন থেকে বলছে। সে বলতেই থাকে, ‘আমরা জেনে গেছি তোমার বন্ধু যন্ত্রে চোখ লাগিয়ে সেই দূরের লেক দেখতে পারে, তাহলে তুমি কেন যন্ত্রে চোখ লাগিয়ে হাতিটা কোথায় আছে দেখে নাও না?’

“অগত্যা লোকটার বিশ্বাস বজায় রাখতে আমি ক্যামেরাটা বের করে অনেকক্ষণ তার ভেতর দিয়ে দেখার ভান করে গম্ভীর স্বরে বলেছিলাম, ‘ধুস, এগিয়ে লাভ নেই। হাতিটার একটা দাঁত ভাঙা, আছেও অনেক দূরে। চলো ক্যাম্পে ফিরে যাই।”

প্রবল বৃষ্টির জন্য আগে এগোনো দুঃসাধ্য ছিল। এই সুযোগে স্থানীয়দের কাছ থেকে শেখ হোসেন সম্পর্কে অনেক তথ্য পেয়ে গেছিলাম। আজ থেকে প্রায় দুশো বছর আগে বাগদাদ থেকে উনি এই অঞ্চলে এসেছিলেন শেখ মহম্মদ নামের একজনকে সঙ্গী করে স্থানীয়দের মুসলিম ধর্মে দীক্ষিত করতে। উনি সুন্দর একটি পাহাড়ি জায়গা বেছে নিয়েছিলেন, আর ওঁর সঙ্গী এখান থেকে মাইল তিরিশ দূরে মালভূমির মাঝে অন্য একটি স্থান। তারপর একসময় দুই সাধু হারারের ধারে মিলিত হয়ে একাসনে বসে মহম্মদের কাছে প্রার্থনা করেছিলেন তাঁদের এমন একটি জায়গার সন্ধান দিতে যেখান থেকে তাঁরা তাঁদের অভীষ্ট কাজ সম্পাদন করতে পারেন। আল্লা ওঁদের প্রার্থনা শুনেছিলেন এবং ওঁর নির্দেশিত পথ ধরে এখানে এসে দুই সাধু শস্যের বীজ বুনে নবির নামে নতুন শহরের পত্তন করেন। হাতি আর সিংহদের হাত থেকে শহরবাসীকে বাঁচাতে শহরকে বেষ্টন করে এক পাঁচিলও গাঁথা হয়েছিল।

শেখ হোসেনের দেহত্যাগের পর একরাতের মধ্যে অমানুষিক পরিশ্রমে ওঁর সমাধি তৈরি করেছিলেন ওঁর অনুগামীরা। রাত ঘনালে কেউ ওঁর সমাধিক্ষেত্রে প্রবেশ করে না। সবাই বিশ্বাস করে, এই সময় সাধু স্বয়ং এসে বিরাজ করেন ওঁর সমাধিতে। নানা জাতের পাখি এসে বসে ওঁর সমাধিতে। স্থানীয়রা আমাকে আর ডডসনকে বার বার সাবধান করে দিয়েছিল ভুলেও যেন আমরা এই পবিত্র পাখিগুলো ধরার চেষ্টা না করি, তাহলে সাংঘাতিক বিপর্যয় নেমে আসবে আমাদের ওপর।

শেখ হোসেন ও শেখ মহম্মদ গালা দেশের বহু মহিলাকে বিবাহ করেছিলেন ও ওঁদের অসংখ্য সন্তান ছিল। তাঁদের সন্তানরাই দুই শহরের নামকরণ করেন দুই সাধুর নামে। এই দেশে দেখা মানুষদের থেকে এই শহরের বাসিন্দারা চেহারায় অনেকটাই আলাদা। আফ্রিকান নয়, এশীয়দের সঙ্গে চেহারার সাদৃশ্য বেশি। গড় উচ্চতা পাঁচ ফুট চার ইঞ্চির ওপর। হালকা বাদামি রঙ, ছিপছিপে চেহারা। কাটা কাটা চোখ-মুখ। বুদ্ধিতেও প্রখর। সভ্যতার দিক থেকেও অনেক এগিয়ে। এরা নিজেরা কাপড় তৈরি করে পরে। গলা থেকে হাত সিসা, পেতল আর হাতির দাঁত থেকে বানানো গহনায় ভরা। এখানকার ছেলেদের আরবি শেখা বাধ্যতামূলক। কোরানের বাণী গড়গড় করে মুখস্থ বলে যায় সবাই।

পাঁচটি সাদা রঙের সমাধি ছাড়াও বেশ কিছু পাথরে তৈরি মসজিদ আছে শহরে। আছে জমি খুঁড়ে তৈরি করা এক বিশাল পুকুর। পুকুর থেকে একটা ছোটো পাথরে তৈরি নালা চলে গেছে চাষের জমিতে সেচের উদ্দেশ্যে। বছর দশেক আগে এই শহরে কলেরা মহামারী রূপে হানা দিয়েছিল আর তাতে শহরের চার-পঞ্চমাংশ বাসিন্দা মারা গিয়েছিল। এখন শহরের বাসিন্দার সংখ্যা শ-পাঁচেক। কথা বলে যা বুঝেছিলাম, তাতে টের পেয়েছিলাম, শহরবাসীরা পয়ঃপ্রণালীর বিষয়ে খুব অজ্ঞ। কলেরায় মৃত দেহগুলোকে পুকুরের কোলে কবর দিয়েছিল আর সেই পুকুরের জলই ওরা খেত। শহরের অধিকাংশ বাসিন্দা মুসলিম হলেও শাসক আবিসিনিয়ানরা, কিন্তু খ্রিস্টধর্মাবলম্বী। যদিও এই দুই ধর্মের মধ্যে কোনও বিরোধ এই শহরে আমার নজরে আসেনি। বরং একে অন্যের ধর্মকে সমীহের চোখেই দেখে। শহরের সবাই ভীষণ সৎ। আর একে অন্যকে সবরকম সাহায্যে উৎসাহী।

এখানে বেশি অ্যান্টিলোপ নেই। কিন্তু এই শহর থেকে আধা মাইল দূরে জঙ্গলের মাঝে প্রচুর অ্যান্টিলোপের বাস। সেপ্টেম্বরের ৩০ তারিখ আমরা অ্যান্টিলোপ শিকার করতে মনস্থ করলাম। প্রায় চল্লিশ জনকে ঝোপ-জঙ্গল পিটিয়ে অ্যান্টিলোপগুলোকে ঝোপের বাইরে বের করার কাজে লাগানো হয়েছিল। ফ্রেড শিকারে খুব মজা পেয়েছিল। ওর জবানিতেই শোনা যাক শিকার কাহিনি।—

“খুব বিচ্ছিরি রকমের গরম দিন ছিল। আমি বন্দুকের ব্যারেলটা ধরে দাঁড়িয়ে ছিলাম। একটা ইয়াবড়ো প্রজাপতি বন্দুকটার নলের ওপর এসে বসেছিল। প্রথমে খানিক পাখা নাড়িয়ে তারপর স্থির হয়ে বসে থেকে উড়ে গেল একটা ফুলের দিকে। শুঁড়ে খানিক ফুলের রেণু লাগিয়ে আবার উড়ে এসে বসেছিল বন্দুকের মাথায়। তারপর উড়ে যে কোথায় চলে গেল আর ঠাহর করতে পারিনি।

“অজস্র রঙদার পাখি ডাকাডাকি করতে করতে এক গাছ থেকে আর এক গাছে গিয়ে বসছিল। পাখিদের কনসার্ট চলছিল রীতিমতো।

“আমার লোকেরা লম্বা লাইন করে নিঃসাড়ে ঝোপের দিকে এগোচ্ছিল তাড়া করে অ্যান্টিলোপগুলোকে বের করবে বলে। হঠাৎ কী মনে হওয়াতে পেছনে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি, কতগুলো শুকনো গাছের ডাল কাছে এক ঝোপের আড়ালে চলেফিরে বেড়াচ্ছে। খানিক পরে বুঝতে পারি, ওটা গাছের শুকনো ডাল নয়, হরিণের শিং। সামান্য আগে আমি যখন প্রজাপতির খেলা দেখতে ব্যস্ত ছিলাম, তখন সে চুপিসারে আমার পাশ দিয়েই গেছে। আজকে আমার হাতেই ওর নিয়তি লেখা ছিল, মুহূর্তে আমার বন্ধুক গর্জে উঠেছিল।”

গিনি-র পথে ফ্রেড

১ অক্টোবর দুই আবিসিনিয়ান ক্যাম্পে হাজির হয়ে জানালেন তাঁরা জেনারেল ওয়াল-দ্য-গুবরার কাছ থেকে এসেছেন। সম্রাট মেনলেক ওয়াল-দ্য-গুবরাকে দেশের এই অংশের রাজা হিসেবে নিযুক্ত করেছেন। জেনারেল সদ্য সদ্য দক্ষিণের এক যুদ্ধ জয় করে গিনি শহরে ফিরেছেন। আমরা কোনও অনুমতি না নিয়ে তাঁর রাজত্বে এসেছি বলে তিনি বেজায় ক্ষুব্ধ। আমরা কী উদ্দেশ্যে এসেছি তিনি এখনই জানতে চান। আমাদেরকে ওঁর সঙ্গে দেখা করার জন্য এখনই যেতে হবে।

শুনলাম, গিনি শহর এখান থেকে দু-দিনের পথ। তো আমি বললাম, “চাইলে তো জেনারেল নিজে এসেই আমাদের ক্যাম্প ঘুরে যেতে পারেন!”

শুনে জেনারেলের দূতরা বেজায় রেগে বলল, “অসম্ভব! জেনারেল কখনোই এখানে আসবেন না, আপনাকেই যেতে হবে জেনারেলের দরবারে।”

তবে দূতরা এও বলেছিল, আমরা যদি কোনও অসৎ উদ্দেশ্য না নিয়ে এসে থাকি, রাজা আমাদের সবরকম সহযোগিতা করবেন। আমি দেখলাম, আমাদের দীর্ঘ পথ যেতে হবে সম্রাট মেনলেক শাসিত ও তাঁর ভাই রাস দারুগের অধীনস্থ আবিসিনিয়ান সাম্রাজ্যের মধ্যে দিয়ে। এদের সাহায্য ছাড়া এগোনো সম্ভব নয়। তাই বন্ধুত্ব পাতানোর খাতিরে দেখা করে আসাটাই শ্রেয়।

পরের দিন আমাদের কী করা উচিত এটা নিয়ে জোর আলোচনা চলেছিল। আমি দেখলাম, বিশাল দলবল নিয়ে বন্ধুর সুউচ্চ পর্বতমালার মধ্যে দিয়ে প্রথমেই আবিসিনিয়ান শহরে যাওয়াটা ঠিক হবে না। তাছাড়া আলোচনা কোন দিকে এগোবে সে-সম্পর্কেও কোনও ধারণা নেই। তাই আমি একাই গিয়ে কথা বলব ঠিক করেছিলাম। বেকে বসেছিল ফ্রেড। আমার একা যাওয়ার ইচ্ছেটা তার মনঃপূত হয়নি। আমার পরিবর্তে সে যাবে বলে জেদ ধরে বসেছিল। আমাকে হার মানতে হয়েছিল ফ্রেডের ইচ্ছের কাছে।

আমার বার বার মনে হচ্ছিল, ফ্রেডকে বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছি না তো! পাশাপাশি ফ্রেড বলে চলছিল, “আবিসিনিয়ানদের অত বুদ্ধু ভেবো না। ওরা আমার কোনোরকম ক্ষতি করার চেষ্টা করবে না। ওরা ভালোই জানে, একটা বিশাল সশস্ত্র দল নিয়ে তোমার পেছনে বসে আছ।”

৩ অক্টোবর ফ্রেড আমার হেডম্যান আর আটটা ছেলেকে নিয়ে রওনা হবার পর থেকেই উৎকণ্ঠার শেষ ছিল না। একটা কথাই মাথায় ঘুরে ফিরে আসছিল— এতগুলো লোকের যেন কোনও ক্ষতি না হয়। যদিও নিশ্চিত জানতাম ওরা নিরাপদেই ফিরে আসবে। এই সময়টা হাত গুটিয়ে বসে থাকিনি। আন্দাজ ছিল, ওদের ফিরে আসতে সপ্তাহ খানেক লাগবে। এই সময়ের মধ্যে না ফিরলে কীভাবে লড়াই করব, মনে মনে সেই লড়াইয়ের ছক কেটে নিয়েছিলাম। ঠিক করে নিয়েছিলাম, যখন আমার লোকেদের নিয়ে যুদ্ধে যাব, তখন শেখ হোসেনের লোকেদের হাতে সঁপে রেখে যাব ক্যাম্প। আমার লোকেরাও ঠান্ডায় কষ্ট পেয়ে অধৈর্য হয়ে উঠছিল। ওরা বুঝে গেছিল, লেক রুডলফ যে কবে পৌঁছানো সম্ভব হবে তা কেউ জানে না।

বৃষ্টি হয়েই চলেছিল। শুধু তাই নয়, দিনের পর দিন বৃষ্টির তেজ ক্রমেই বেড়ে যাচ্ছিল। ক্যাম্প গ্রাউন্ড ইঞ্চি তিনেক জলের তলায় ডুবে, চারপাশে থকথক করছে কাদা। ছেলেগুলো যাতে ঝিমিয়ে না পড়ে তাই ওদের দিনভর কোনও না কোনও কাজ দিয়ে রাখতাম। দিনরাত ওদের দিয়ে নানারকম মহড়া করাতাম। এমনকি বন্দুক ছোড়া প্র্যাকটিস করাতাম নিয়ম করে। এটার পেছনে অবশ্য একটা কারণ ছিল, সেটা ছেলেরাও বুঝে গেছিল। যাতে আবিসিয়ানরা আক্রমণ করলে তা রুখে দিয়ে পালটা মার দেওয়া যায়। আমি এ-সময় ছেলেগুলোকে বলে দিয়েছিলাম, নতুন কোনও জন্তুর নমুনা এনে দিতে পারলে একটা করে নগদ টাকা পাবে। দিন কয়েকের মধ্যে কয়েক ডজন সাপ, পোকা, টিকটিকি জড়ো হয়েছিল আমার টেন্টে। কারশা নামের একটা ছেলে এক অদ্ভুতদর্শন প্রাণী হাজির করেছিল। ইঞ্চি চোদ্দ লম্বা, ঘন বড়ো বড়ো রূপালী লোমে ঢাকা প্রাণীটা লোফিওমিস ইমহাইটসির মতো। পুরো যাত্রায় এই প্রাণীটা আর দেখা যায়নি।

গিনি পাখি

৫ অক্টোবর সকালবেলা থেকেই কুয়াশা এত ঘন হয়ে চারপাশ থেকে চেপে ধরেছিল যে কয়েক ফুট দূরের কিছু দেখতে পারছিলাম না। আবদি কেরিন প্রচণ্ড ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে যখন আমার জন্য এক বালতি জল নিয়ে এল, তখন ওকে দেখে মনে হচ্ছিল যেন হঠাৎ করে শূন্য থেকে নিঃশব্দে এক ভূত এসে হাজির হয়েছে সামনে।

পরদিন ফ্রেডের কাছ থেকে একটা চিঠি পেয়ে খানিক শান্তি পেয়েছিলাম। ৪ তারিখে চিঠিটা লিখেছিল ফ্রেড।

‘প্রিয় ডোনাল্ড,

রাস্তা খুবই খারাপ। আশা করি আগামীকাল গিনিয়া পৌঁছতে পারব। দিন সাতেকের আগে ফিরতে পারব বলে মনে হয় না। এর মধ্যে চেষ্টা করব চিঠি লিখে তোমাকে আরও খবর দেবার। গিলেট রেঞ্জ পার হয়ে এসেছি। গতকাল ওই পাহাড়ের মাথায় রাত কাটিয়েছিলাম। চারপাশ স্যাঁতস্যাঁতে আর কাদামাটি, তেমনি ঠান্ডা। অ্যানারয়েডসে জায়গাটার উচ্চতা দেখিয়েছে সমুদ্রতল থেকে ছয় হাজার ন’শো ফিট। এখান থেকে দূর সমতলের মাঝে দারো আর হাওয়াতু পাহাড়ের রেঞ্জ দেখতে পেয়েছি। কাল দারদে নদী পার হতে পারব আশা রাখি। আবিসিনিয়ানরা আমাদের যাত্রার সুবিধার জন্য তিনটে বলদ পাঠাচ্ছে। তার মধ্যে একটা আজ এসে পৌঁছেছে। বলদটা বেশ মোটাসোটা।

তোমার বিশ্বস্ত,

ফ্রেড’

বুঝতে অসুবিধা হল না, যা অনুমান করেছিলাম তার থেকেও বেশিদিন এখানে অপেক্ষা করতে হবে। পরিস্থিতি বেশ জটিল। শুধু তাই নয়, টের পাচ্ছিলাম, যা ভেবেছিলাম তার থেকেও জেনারেল ওয়াল-দ্য-গুবরার সৈন্যদল বড়ো।

কিছু করার ছিল না, তাই আমরা গিনি পাখি শিকারে মন দিয়েছিলাম। এখানে ঝাঁকে ঝাঁকে ঘুরে বেড়াচ্ছে এই পাখির দল। এই পাখিগুলো আমাদের পুরো যাত্রায় মুখ্য খাবার হয়ে দাঁড়িয়েছিল। যেখানেই খানিক জল, সেখানেই হাজির এই পাখির ঝাঁক। বেগুনি রঙের মুরগি জাতীয় এই পাখিগুলো বাড়িতে পোষা পাখির থেকে অনেক মোটাসোটা ছিল। ফলে মাংস পাওয়া যেত যথেষ্ট।

বন্ধুত্ব

দিন কয়েক বৃষ্টিটা বন্ধ ছিল। আমি ছটফট করছিলাম সুযোগটা কাজে লাগাতে। কিন্তু ফ্রেডের কাছ থেকে আর কোনও খবর না আসা পর্যন্ত কিছু করতেও পারছিলাম না।

১১ অক্টোবর গিনিয়া থেকে একটা চিঠি হাতে একা ফিরে এসেছিল হাজি ইদ্রিস।

‘প্রিয় ডোনাল্ড,

ওয়াল-দ্য-গুবরা বেশ ভালো লোক। যথেষ্ট বয়স হয়েছে এবং খুব বিচক্ষণ। যতটা সম্ভব আমাকে আরামে রেখেছেন। উনি চাইছেন তুমি নিজে আসো। কথা দিয়েছেন, তরতাজা উট আর খচ্চর দিয়ে আমাদের যাত্রা যাতে আবিসিনিয়ান সাম্রাজ্যের সীমা কাফা পর্যন্ত নির্বিঘ্নে হয় তার সমস্ত ব্যবস্থা করবেন। আমি হাতি শিকারে যাচ্ছি।

তোমার বিশ্বস্ত,

ফ্রেড’

আমি হাজির সঙ্গে জেনারেল ওয়াল-দ্য-গুবরার সঙ্গে দেখা করার জন্য সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে পড়েছিলাম। ডডসনকে ভার দিয়েছিলাম পুরো ক্যারভান নিয়ে গিলেট রেঞ্জ পার করে শেখ মহম্মদ শহরের দিকে এগোতে। শহরটা এখান থেকে মাইল পঁয়ত্রিশ দূরে।

অসাধারণ পথ আমাকে বার বার নরওয়ে আর আমার দেশের পাহাড়ের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিল। পাহাড়ের গা বেয়ে পাইনের জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে পথ চলা। ভেজা হাওয়ার কারণে গাছের গায়ে আর মাটির উপরিভাগে পুরু হয়ে জমে আছে শ্যাওলা। খানিক বাদে বাদে টপকাতে হচ্ছিল স্বচ্ছ জলের স্রোত। অগুনতি রঙিন বড়ো বড়ো আকারের প্রজাপতি উড়ে বেড়াচ্ছে চারদিকে। কুয়াশার পর্দা খানিক সরে যাওয়াতে অনেক নীচে উপত্যকার ছবি স্পষ্ট ফুটে উঠেছিল চোখের সামনে। আবউগাসিন পর্বতের গা বেয়ে গভীর গিরিখাতের মধ্যে দিয়ে শেবেলি নদী বয়ে চলেছে।

চলতে চলতে একটা আবিসিনিয়ান গ্রামের কাছে পৌঁছতে দশজন সৈন্য-সহ এক সৈন্যাধ্যক্ষ খচ্চরের পিঠে চেপে হাজির হয়েছিল আমাদের সামনে। ওরা আমাদের পথ দেখিয়ে গিনিয়া নিয়ে যাবার জন্য অপেক্ষায় ছিল। আমাদের জাল দিয়ে প্রজাপতি ধরতে দেখে ক্যাপ্টেন ও তার লোকেরা হাতের লাঠির আঘাতে প্রজাপতি মেরে আমার কাছে হাজির করতে শুরু করেছিল। লাঠির ঘায়ে প্রজাপতিগুলোর পাখাগুলো একটাও অক্ষত থাকছিল না, ফলে ডানাহীন প্রজাপতির নমুনাগুলো কোনও কাজের ছিল না। সে-কথা ওদের বুঝিয়ে বলতে ওরা সরল মনে অবাক হয়ে জানতে চেয়েছিল, ‘তোমার প্রজাপতির শুধু ডানা খাও নাকি?’

১৫ অক্টোবর তারিখে গিনিয়ার কাছাকাছি পৌঁছতে দেখি ফ্রেড আর ওর সঙ্গে আসা ছেলেরা এগিয়ে আসছে। ওরা আমাদের দিন দু-এক আগে আশা করেছিল। আমরা না পৌঁছানোয় ওরা আমাদের খোঁজেই আসছিল। আমরা সবাই মিলে আবার গিয়েনার দিকে এগোতে শুরু করেছিলাম। ফ্রেড আর অন্য ছেলেদের দেখে খানিক শান্তি পেয়েছিলাম। ওরা শেখ হোসেন ছাড়ার পর ভীষণ উৎকণ্ঠায় ছিলাম এ-ক’দিন।

ফ্রেডের সঙ্গে দেখা হবার পর সবাই মিলে খাবার খেতে বসে পড়েছিলাম। ফ্রেড শুনিয়েছিল গিনিয়ার পথে ওর অভিজ্ঞতার কথা।—

“সকাল ১১টায় শেখ হোসেন থেকে যাত্রা শুরুর পর শহরের সীমানার ধারে ওখানকার পুরুষরা আমাদের ঘিরে বিশেষ প্রার্থনা শুরু করেছিল আমরা যাতে নিরাপদে থাকি। ওরা ধরেই নিয়েছিল আমাদের মৃত্যু নিশ্চিন্ত।

“আমাদের রাস্তা গিয়েছিল দক্ষিণমুখী। রাস্তাটা প্রায় আট গজ চওড়া। বলতে দ্বিধা নেই, আজ পর্যন্ত আফ্রিকায় যত রাস্তা দেখেছি, তার মধ্যে এই রাস্তাটা ছিল অন্যতম সেরা। রাস্তাটা সেই শেখ হোসেনের সময়ে তৈরি। চওড়া রাস্তাটার দু-পাশে ঘন জঙ্গল। দুই আবিসিনিয়ান আমাদের আগে আগে পথ দেখিয়ে চলছিল।

“ঘণ্টা খানেক চলার পর মূল রাস্তা থেকে ভাগ হয়ে যাওয়া একটা রাস্তা ধরে আমাদের গাইড নিয়ে চলল। রাস্তাটা গেছে পাহাড়ের দিকে। আমাদের পাহাড় চড়া শুরু হয়েছিল। যত পাহাড়ের ওপর দিকে উঠছিলাম, ততই গাছগুলোর উচ্চতায় পরিবর্তন নজরে আসছিল। ক্রমে ঝোপঝাড় সরে গিয়ে চারপাশে শুধুই বিশাল বিশাল গাছ দেখা দিল, উচ্চতায় দুই থেকে তিন মানুষ উঁচু এক-একটা।

“বিশাল গাছগুলোর গায়ে প্রচুর পরজীবী ঝুলে। পরজীবীর ফুলগুলোর রঙ টকটকে লাল। জঙ্গল এত ঘন যে জায়গায় জায়গায় আমাদের কুড়ল দিয়ে গাছ কেটে পথ বানাতে হচ্ছিল উটদের জন্য।

“অনেকক্ষণ পথ চলার পর পাহাড়ের মাথায় এক স্যাঁতস্যাঁতে জায়গায় পৌঁছেছিলাম। পাহাড়ের মাথায় কুমড়ো আর দুর্হার ক্ষেত। জায়গাটা সবসময়ই নিশ্চয়ই ভেজা-ভেজাই থাকে, কারণ আশেপাশের সব গাছ আর মাটি-পাথরের ওপর পুরু শ্যাওলার আস্তরণ। অ্যানারয়েডে জায়গাটার উচ্চতা মেপে দেখি ছ’হাজার আটশো ফুট। ভীষণ ঠান্ডা। পাহাড়ের গা নেমে গেছে বিশাল খাদে। উটের পায়ের গুঁতোয় ছোটো ছোটো মাটির গোল্লা খাদের মধ্যে গড়িয়ে কোথায় গিয়ে যে পড়ছিল কে জানে!

“গিরিপথের শীর্ষ থেকে শ-তিনেক ফুট নীচে নেমে আমরা ক্যাম্প করেছিলাম। জায়গাটা একইরকম স্যাঁতস্যাঁতে ও একটি জলাভূমি। তারই মাঝে খানিক শুকনো জায়গা দেখে ক্যাম্প খাটিয়েছিলাম। সোঁদা গন্ধে ভরে ছিল জায়গাটা। কাছেই একটা উঁচু খুঁটি দিয়ে ঘেরা আবিসিনিয়ানদের গ্রাম। কাঠের দেওয়ালের ওপর খড়ের চাল দেওয়া বেশ কিছু ঘর সেই ঘেরের ভেতর। এখানকার উপজাতীয় লোকেরা পাহাড়ের গায়ে প্রচুর কুমড়ো, গম আর দুর্হা ফলিয়েছে।

“জায়গাটা থেকে সামনের দিকে বহু নীচে সমতলভূমি দেখা যাচ্ছিল। দেখা যাচ্ছিল অনেক অনেক দূরের দারো আর হাওয়াতু পাহাড়ের রেঞ্জ। আমাদের উটগুলো যে আর এত মালপত্র নিয়ে হাঁটতে পারছে না, এ-কথা শোনার পর আবিসিনিয়ান গ্রামের মোড়ল জনাকয়েক স্থানীয় উপজাতীয় লোককে পাঠিয়ে দিয়েছিল আমাদের মালপত্র পিঠে করে বয়ে নিয়ে যাবার জন্য। আমি কয়েকটা ঘুঘু মেরেছিলাম রাতে খাওয়ার জন্য। আবিসিনিয়ানরা আমাদের জন্য যথাসাধ্য করেছিল। কয়েক বোঝা শুকনো কাঠ পাঠিয়ে দিয়েছিল। এছাড়া দিয়েছিল প্রচুর মধু আর দুধ। সঙ্গে দুর্হা দিয়ে তৈরি রাতের খাবার। দুধের মধ্যে একটা অদ্ভুত স্বাদ ছিল। আমার ধারণা, এখানে এক বিশেষ ধরনের স্প্রুস (একধরনের পাইন গাছ) জন্মায়, যা খাওয়ার ফলে দুধের স্বাদে তার প্রভাব এসেছে।

“সারারাত ধরে বৃষ্টি হয়েছিল, ফলে সকাল সাতটার আগে রওনা হবার পরিস্থিতিতেই ছিলাম না। বৃষ্টি ধরলেও রাস্তার পরিস্থিতি এত খারাপ ছিল, উটের পিঠে সামান্য বোঝা চাপানোর উপায় ছিল না। যে আটজন উপজাতীয় লোক মালপত্র বওয়ার জন্য হাজির হয়েছিল, পথের হাল দেখে ওরাও মালপত্র নিতে গাঁইগুঁই শুরু করেছিল। তখন আবসিনিয়ান গ্রামের প্রধান ওদের হুমকি দিতেই চুপচাপ পিঠে মাল তুলে নিয়েছিল।

“আমরা সোজা দক্ষিণের দিকে নামতে শুরু করেছিলাম। সমতলে নেমে একটা গ্রামে পৌঁছতে শুনি জেনারেল ওয়াল-দ্য-গুবরা আমাদের মালপত্র বইবার সুবিধার জন্য একটা বলদ পাঠিয়েছেন। দেখি, গাছের গায়ে একটা তাগড়াই কালো বলদ বাঁধা। গ্রাম ছেড়ে এগোতেই শুরু হয়েছিল ইউফোরবিয়াসের বন। ফুলে ভরা কাঁটাগাছের বনের মধ্যে যেখানেই খানিক ফাঁকা, সেখানেই হাতির স্পষ্ট পায়ের ছাপ নজরে এসেছে। বনের মধ্যে দিয়ে অনেকটা পথ চলে আমরা পৌঁছেছিলাম দারদে নদীর ধারে। নদী এখানে পুবদিকে চলেছে। নদী জলে ভরতি থাকলেও আমরা পার হয়েছিলাম কোনও অঘটন ছাড়াই। নদী পার হয়ে খানিক বিশ্রামের জন্য  থেমেছিলাম। নদীর এ-পাড়ে ইউফোরবিয়াস গাছ থাকলেও আর আগের মতো ঘন নয়। অনেক ছেড়ে ছেড়ে খানিক ঝোপের আকারে গাছগুলো হয়ে আছে।

“বিকেল চারটে নাগাদ একটা বড়ো গ্রামের কাছে পৌঁছে আমরা ক্যাম্প করেছিলাম। একদম সমতল জায়গাটা। শুকনো আর ঘাসে ভরা। প্রচুর গিনি পাখি ঘুরে বেড়াচ্ছিল। আমি খাওয়ার জন্য তিনটেকে গুলি করে মেরেছিলাম। একটা বিশাল বড়ো বনবেড়াল ক্যাম্পের পাশে এসে গেছিল, গুলির শব্দে ওটাও ভয় পেয়ে পালিয়েছিল।

“পরদিন সকাল সাতটার সময় আবার যাত্রা শুরু করেছিলাম। রওনা হবার আগে এক আবিসিনিয়ান এসে আমাকে একটা চাবুক উপহার দিয়ে বলেছিল, ‘একজন শক্তিমান পুরুষের জন্য উপহার, এটা তোমার খচ্চর আর চাকরদের সিধে রাখতে সাহায্য করবে।’ খানিক যেতে না যেতেই আবার বৃষ্টি শুরু হয়েছিল। সঙ্গে ঘন কুয়াশায় ঢেকে গেছিল চারদিক। কয়েক হাত দূরের কিছু দেখা যাচ্ছিল না। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই চুপচুপে ভিজে গেছিলাম সবাই। বৃষ্টির মধ্যেই ঘণ্টা দেড়েক চলার পর একটা কুঁড়ের সামনে পৌঁছে আশ্রয় পেয়েছিলাম। আগুনের সামনে বসিয়ে কুঁড়ের মালিক আমাকে ভাঙা কাঠের বাটিতে দুর্হা থেকে তৈরি ‘চুকো’ নুন আর লংকা-গুঁড়ো মিশিয়ে খেতে দিয়েছিল। প্রচণ্ড ঠান্ডায় ভিজে শরীরে কাঁপতে কাঁপতে কী যে আরাম পেয়েছিলাম, বলে বোঝাতে পারব না। আমি বুঝে গেছিলাম, কাছের আবিসিনিয়ান ডেরায় উটের পিঠে মালপত্র নিয়ে রাস্তার এই অবস্থায় আমার দলবল কোনোভাবেই মাঝরাতের আগে পৌঁছতে পারবে না। এদিকে কুঁড়ের মালিকের কাছে আর বিশেষ খাবার ছিল না। তাই এগিয়ে যাওয়া ঠিক করেছিলাম।

“যাত্রা শুরু করতে না করতেই বৃষ্টি থেমে গেছিল। খানিক যেতেই টের পেয়েছিলাম, এখানে একসময় ভালোই চাষবাস হত। মাটি পুড়ে কালো হয়ে থাকলেও সমতল জমিতে আলের বাঁধন দিয়ে জমি ভাগের ছাপ স্পষ্ট। আমি জেনারেল ওয়াল-দ্য-গুবরা প্রতিনিধি গাইডের কাছে এই বিষয়ে জানতে চাইতেই সে উত্তর দিয়েছিল কোনও রাখঢাক না করেই, ‘হ্যাঁ, এখানে চাষবাস হত। বছর চারেক আগে আমরা যখন এখানে এসেছিলাম, তখন ফসলগুলো পেকে ছিল। আমরা এখানে এসে পৌঁছতেই এখানকার লোকেরা প্রথমে আমাদের দলের কয়েকজনকে হত্যা করে। আমরাও পালটা মার দিয়ে ওদের প্রায় সবাইকে মেরে ফেলি। সব ফসল পুড়িয়ে দেওয়া হয়। ফলে যে ক’জন বেঁচে ছিল, তারাও না খেয়ে মরে যায়।’ লোকটা যে মিথ্যে বলছে না তার প্রমাণ পেয়েছি আশেপাশে পড়ে থাকা অসংখ্য হাড়গোড় আর মানুষের মাথার খুলি দেখে।

“খানিক বাদেই আবার বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছিল। সঙ্গে ঠান্ডা হাড় কাঁপিয়ে দিচ্ছিল। তবুও খচ্চরের পিঠে চেপে আমরা এগিয়েই চলছিলাম। যেতে যেতে একসময় আমাদের আবিসিনিয়ান গাইড দূরের এক পাহাড় দেখিয়ে বলল, ওই পাহাড়ের মাথায় রয়েছে আবিসিনিয়ানদের এক দুর্গ। ওইখানেই আজ রাত কাটাব আমরা। পাহাড়ের গোড়ায় যখন পৌঁছলাম, তখন বৃষ্টি ধরে গেছে। একবারে কাকভেজা হয়ে গেছি। হাজি ইদ্রিস জোরকদমে খচ্চর ছুটিয়ে আমার পাশে এসে ফিসফিসিয়ে বলল, ‘ওরা আমাদের বন্দুকগুলো জমা দিয়ে দিতে বললে কী করব, জমা দিয়ে দেব?’ আমি বলেছিলাম, ‘একবারেই না।’ ‘তার মানে লড়াই করা ছাড়া কোনও উপায় থাকবে না।’ বলে সে আবার পেছনে চলে গেছিল। একজন আবিসিনিয়ান আগে ছুটল আমাদের আসার খবর দুর্গে পৌঁছানোর জন্য। কী হবে, কী হবে এরকম একটা অস্বস্তি নিয়ে খাড়া পাহাড়ের ঢাল বেয়ে আস্তে আস্তে উঠছিলাম। পাহাড়ের মাথায় কাঠের গুঁড়ি ঘেরা সেনা ছাউনি আর তাকে ঘিরে গড়ে ওঠা একটা গ্রাম দূর থেকে দেখা যাচ্ছিল স্পষ্ট।

“দুর্গের দরজার বাইরে বহু মানুষ ভিড় করেছিল। এক দঙ্গল গবাদিপশুও ছিল জায়গাটায়। বেশ বুঝতে পারছিলাম, সবাই একবার আমায় দেখতে চাইছিল। ভিড়ের মাঝখান দিয়ে কোনোক্রমে পথ করে আমাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল দরজার ভেতর। বেশ খানিকটা চড়াই ভেঙে পৌঁছেছিলাম পাহাড়ের মাথায়। আমাকে খচ্চরের পিঠ থেকে নামতে বলা হয়েছিল। তারপর একটা দরজার ভেতর দিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল একটা বিশাল গোল তাঁবুর ভেতর। সেখানে আমার অপেক্ষায় থাকা একদল আবিসিনিয়ান আমাকে মাথা ঝুঁকিয়ে মাটিতে ঠেকিয়ে অভিবাদন করে আমাকে তাঁবুতে স্বাগত জানিয়ে একটা জায়গার দিকে ইঙ্গিত করেছিল। তাঁবুটা ধোঁয়ায় ভরে ছিল। এত ধোঁয়া যে আমার দমবন্ধ হয়ে আসছিল। আমিও তাড়াতাড়ি নির্দেশিত জায়গায় গিয়ে মাটিতে মাথা ঠুকে দিয়েছিলাম যাতে খানিক নিশ্বাস নিতে পারি। নীচু হতেই দেখতে পেয়েছিলাম দুটো পার্সিয়ান কম্বল রাখা আমার জন্য। ধোঁয়াটা উঠছিল তাঁবুর মধ্যে রাখা একটা কাঠের অগ্নিকুণ্ড থেকে। চোখটা খানিক সইতে টের পেয়েছিলাম, পুরো তাঁবুটার মেঝেতে বাদামি কম্বল বিছানো।

“জেনারেল আমার জন্য একপ্রস্থ লম্বা ঝুলের গরম পোশাক পাঠিয়েছিলেন। আমি তাড়াতাড়ি আমার ভেজা পোশাকগুলো বদলে ওগুলো গায়ে গলাতে ভীষণ আরাম পেয়েছিলাম। আমার হাতে দেওয়া হয়েছিল দার্দে নামের এক পাত্র আবিসিনিয়ান সুরা। ওটা পেটে যেতে শরীর যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছিল। আবিসিনিয়ানরা খুব সেবা পরায়ণ, এটা বলতেই হবে। আমাকে খেতে দেওয়া হয়েছিল দুধ, রুটি, মধু আর কফি। খাওয়া শেষ হতেই হাজির করা হয়েছিল একটা মোটাসোটা ভেড়া। সেটাকে তাঁবুর বাইরে নিয়ে গিয়ে আমার লোকেদের দিয়ে ওর গলাটা কাটানো হয়েছিল আমার সামনে।

“রাতে পার্সিয়ান কম্বল গায়ে দিয়ে আরামে ঘুমিয়েছিলাম ওই তাঁবুর মধ্যে। সকাল হতেই সেই দুই আবিসিনিয়ান গাইড এসে আমাকে বলল আমাদের উচিত জেনারেলের জন্য কিছু উপহার পাঠানো, অন্তত একটা বন্দুক। বন্দুকের প্রস্তাবটা আমি সঙ্গে সঙ্গে মাথা থেকে বের করে দিয়েছিলাম। ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম আমাদের ভেজা জামাকাপড়-সহ অন্যান্য মালপত্র রোদে শুকোতে। অবশ্য খানিক সময়ের মধ্যেই ওই আধ-শুকনো জামাকাপড় গায়ে চাপাতে হয়েছিল জেনারেল ওয়াল-দ্য-গুবরা দেখা করার জন্য তলব পাঠিয়েছিলেন বলে।

“জেনারেলের দোভাষী হ্যাজেক জারোর পেছন পেছন আমি ইদ্রিস আর আহমেদ নূরকে সঙ্গে করে একটা আলাদা করে ঘেরা জায়গায় প্রবেশ করলাম। একটা বিশাল ছাউনির নীচে জেনারেল বসে ছিলেন, তাঁর পেছনে সার দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল ওঁর সভাসদরা। গম্ভীর গলায় জেনারেল জানতে চেয়েছিলেন আমাদের এখানে আসার উদ্দেশ্য কী। আমাদের কি কোনও রাজা এখানে পাঠিয়েছেন? তারপরেই বলেছিলেন, আমরা কি জানি যে সামনে বর্বর লোকেদের বাস? আমাদের কি প্রাণের ভয় নেই?

“আমি বলেছিলাম, ঈশ্বর প্রাণ দিয়েছেন, ওঁর ইচ্ছে হলে ওঁর দেওয়া প্রাণ নিয়ে নেবেন, এতে আমাদের কার কী করার আছে।

“এরপর ওঁর ইশারায় সৈন্যরা খানিক কুচকাওয়াজ দেখানোর পর সভা ভেঙে দেওয়া হল, আর আমাদেরও তাঁবুতে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল।

“পরদিন সকালে নীল ফ্লানেলের পাজামা-সুট পরে আমি আবার জেনারেলের সঙ্গে দেখা করতে যাই। এবার আর এক দঙ্গল লোকের মাঝে নয়, আমাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল জেনারেলের বাড়িতে। কয়েকটা চাকর থাকলেও আর কেউ উপস্থিত ছিল না সেখানে। উনি আন্তরিকভাবে আমাকে নিয়ে ওঁর পাশের আসনে বসিয়েছিলেন। এবার আমি খালি হাতে যাইনি। ওঁর জন্য নিয়ে গেছিলাম একটা রঙিন কম্বল আর এক বোতল মদ। উনি খুশি মনে উপহার গ্রহণ করেছিলেন। তারপর বলেছিলেন, ওঁর সাহায্য ছাড়া আমরা কোনোভাবেই খুব বেশি এগোতে পারব না। আমি ওঁর সবরকম সাহায্য প্রার্থনা করেছিলাম। উনি খানিক চিন্তা করে বলেছিলেন, আমরা ওঁর এলাকায় যা খুশি করতে পারি আর যেখানে খুশি যেতে পারি, কিন্তু আমাদের এর জন্য একটা আনুষ্ঠানিক আবেদন পত্র লিখতে হবে আবিসিনিয়ান সম্রাট মেনলেককে উদ্দেশ করে। ওঁর কথা শেষ হতেই ইদ্রিস আর নূর ওঁর পায়ে চুমু খেয়েছিল। আমি অতটা করিনি, তবে ওঁর হাত ধরে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছিলাম।

(চলবে)

 

Leave a Reply