বড়োগল্প-প্যানগমে প্যানিক- সর্বাণী বন্দ্যোপাধ্যায়-বসন্ত ২০২২

golpopangomepanic01

এবারের বেড়ানোটা যে খুব জমজমাট হবে তা আগেই বুঝেছিল টুবাই। তবে বেড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে যে বিপদজনক ঘটনাটার সঙ্গে ওরা জড়িয়ে যাবে তার এতটুকু আঁচও ওরা আগে পায়নি।

দিল্লিতে পৌঁছেছে গতকাল সকালে। আর আজ ভোরের প্লেনেই এসে নামল লেতে। গরমের ছুটিতে বেরিয়ে পড়ার একটা অভ্যাস ওদের আছে। তবে রওনা দেবার আগে বেড়ানোর প্ল্যানটা বাবা কোনও বারেই ফাঁস করতে চান না। এবারে সারপ্রাইজ দিলেন একেবারে শেষমুহূর্তে। গন্তব্যস্থল নাকি সেই স্বপ্নের দেশ, লে-লাদাখ। জায়গাটার অলটিচিউড অনেক হাই, একেবারেই দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল। তাই সবসময় ওখানে পর্যটন চলে না। মে মাসের শেষের দিকে টুরিস্টদের জন্য পথ খুলে দেওয়া হয়। সেপ্টেম্বর অবধি যাতায়াত চলে। শীতকালে প্রচণ্ড বরফে রাস্তাঘাট ঢাকা পড়ে যায়। তাছাড়া সে-সময় প্রচণ্ড ঠান্ডায় স্থানীয় বাসিন্দারা ছাড়া কেউ ওখানে টিকতে পারে না।

নিজেদের ব্যবস্থাপনায় লে-লাদাখ যাওয়া বেশ কঠিন। অনেক সময় আর অভিজ্ঞতা থাকলেই সম্ভব হতে পারে। তাই ওখানে যাওয়ার জন্য বাবা ‘ভ্রমণ’ ট্যুর কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। পুরো ট্যুরের প্যাকেজই তাঁদের দেওয়া। কন্ট্রাক্ট অনুযায়ী ঘোরার জন্য ড্রাইভার সমেত গাড়ি, হোটেল, এমনকি সকালের চা থেকে রাতের ডিনার পর্যন্ত সব ব্যবস্থাই ভ্রমণ করবে। লে পৌঁছতেই ওরা সে-দায়িত্ব বুঝে নিল।

ভোরবেলার উড়ান। তাই রাত থাকতে দিল্লি এয়ারপোর্টে পৌঁছতে হয়েছিল ওদের। নেহাত অভ্যাসবশতই লম্বা লাইনে ফ্লাইটের অপেক্ষমাণ যাত্রীদের লক্ষ করেছিল টুবাই। যদিও তখন কোনও অসঙ্গতি নজরে আসেনি। টুবাইদের গ্রুপটা বেশ বড়োই। ও ছাড়া বাবা, মা, দিদি আর কাকিমা, কাকু, বুবু। সব মিলিয়ে ওদের ফ্যামিলির সাতজনকে লে এয়ারপোর্টে দাঁড়িয়ে থাকা নীল ঝকমকে স্করপিওটাতে বেশ ভালোভাবেই ধরে গেল। টুবাই বুঝল, এই গাড়িটাই সারাক্ষণের সঙ্গী হবে। এয়ারপোর্ট থেকে হোটেলের দূরত্ব নেহাত কম নয়। পৌঁছানোর পরেই রিসেপশনে লের পরিবেশ সম্পর্কিত প্রাথমিক বক্তৃতাটা ভ্রমণ সংস্থার লোকেরাই দিল। ফ্লাইটে এসেছে ওরা। তাই হাই অলটিচিউডে হঠাৎ এসে পড়লে অক্সিজেন সংক্রান্ত কী কী অসুবিধা হতে পারে সেটাই ওদের জানানো হচ্ছিল। ভয় ধরানো একঘেয়ে বক্তৃতাটা ছোটোরা কেউই মন দিয়ে শুনছিল না। লম্বা টানা কাচের শার্সিতে চোখ রেখে ঢেউ খেলানো পাহাড়ের ধবধবে সাদা বরফচূড়া দেখছিল তারা। সত্যি কথা বলতে, ওই অপার্থিব সৌন্দর্য দেখার লোভ টুবাই নিজেও সামলাতে পারছিল না। খানিক আগেই প্লেনে আসার সময় ওগুলোকেই টপকে এসেছে যে। ভাসমান মেঘের সারির নীচে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকা সাদা ত্রিকোণগুলোকে বুঝি কোনও জ্যামিতিই ব্যাখ্যা করতে পারে না। ভারি অবাস্তব মনে হয়।

প্লেনে সামনের রোতে জানালার পাশে বসে থাকা বুবু পেছন ফিরে ফিসফিস করেছিল, “এই দাদা, পাহাড়গুলো ঠিক ক্যালেন্ডারের ছবির মতন, না?”

প্যাসেজের ও-ধারে বসেছিল দিদি। সেও উশখুশ করে তাকাচ্ছিল এদিকে। উইন্ডো সিট পাওয়ার জন্য দুজন অপরিচিত লোকের পাশেই বসে ছিল ও। নিজের লোকের সঙ্গে কথাই বলতে পারছিল না বেচারা। দিদির রোর একদম ধারে প্যাসেজের পাশেই বসেছিল একজন। মাথার চুল সাদাকালো মেশানো। বয়স কাকুর মতো হবে। জানালা দিয়ে পাহাড় দেখার সঙ্গে সঙ্গে ওই লোকটাকে লক্ষ করছিল টুবাই। পাশে বসে থাকা মা সেজন্য বকলেন ওকে, “কী, হচ্ছে কী? ছটফট করছিস কেন?”

লোকটাকে দেখার পেছনের বিশেষ কারণটা মাকে বলেনি ও। কে জানে কেন লোকটা ঘনঘন দেখছিল ওদের। বিশেষ করে বুবুকে। টয়লেটে যাওয়া-আসার পথেই ব্যাপারটা নজরে আসে টুবাইয়ের। জানালার ধারের দিকে একমনে কী যেন দেখছে লোকটা। পরমুহূর্তেই খেয়াল হল, আরে ওখানেই তো বসেছে বুবু। আকাশ পাহাড়ের শোভা না দেখে বুবুকে দেখছে কেন? তাহলে কি ওর বিশেষ কোনও মতলব আছে?

***

ফটফটে সকালে লের মাটিতে পা দিয়ে প্লেনের ঘটনাটা বেমালুম ভুলেই গেছিল টুবাই। প্লেন থেকে নেমে বাস ধরার ব্যস্ততা ছিল। ওই বাসই পৌঁছে দিল লাউঞ্জে। সেখানে বিভিন্ন এয়ার-লাইনসের অফিস, সিকিউরিটি চেকের ব্যস্ততা আর নানা দেশের লোকের অবিরাম চলাচল। এতই অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিল ও যে অন্য কিছু আর মাথায় ছিল না।

প্লেনেই কফি, চা, লাইট ব্রেকফাস্ট সার্ভ করেছে। প্লেন থেকে নেমে লম্বা বাসটায় চেপে যেতে যেতে চারপাশের ধূসর প্রকৃতিকে দেখছিল টুবাই। কত জায়গায় বেড়াতে গিয়েছে, হরেক রকমের পাহাড়ও দেখা আছে, কিন্তু এরকম তেঢ্যাঙা রুক্ষ পাহাড়ের সঙ্গে এর আগে মোলাকাত হয়নি। অবাক হয়ে দেখছিল আর ভাবছিল বাংলাদেশের সবুজ প্রকৃতির সঙ্গে এর কত তফাত।

লের সৌন্দর্যের মধ্যে কেমন একটা ভয়াবহতা আছে। অন্য হিল স্টেশনে যেমন একটা হালকা ভাব থাকে, বেড়ানোর জন্য মনের মধ্যে ফুরফুরে হাওয়া বয়, এখানে ঠিক তার উলটো। টুবাই ভাবছিল তবে কি সেনাবাহিনীর স্থানে স্থানে জমায়েত, গাড়িতে সার সার সৈন্যদের যাওয়া আসা মনের মধ্যে ছাপ ফেলছে? জমিয়ে ঠান্ডা করে দিচ্ছে মনটাকেও? দিদি, বুবু একদম চুপচাপ হয়ে আছে। বুবু এমনিতে সারাক্ষণই ওর সঙ্গে লেপটে থাকে। ক্লাস এইটে পড়লেও ভাইবোনদের মধ্যে সবচেয়ে ছোটো বলেই বোধ হয় ওর মানসিক বৃদ্ধি তেমন ঘটেনি। ওকে নিয়ে টুবাইয়ের একটা নিজস্ব টেনশন সবসময়ই থাকে। তবে এবারেরটা আর একটু অন্যরকম। ওই লোকটার অদ্ভুত ব্যবহার টুবাইয়ের মনেও এক আশঙ্কার জন্ম দিয়েছে।

তবে বিপদ এল অন্যদিক থেকে। লেতে নামার পরপরই মার একটু শ্বাস নেওয়ার অসুবিধে হচ্ছিল। যদিও ব্যাপারটা খুব একটা অস্বাভাবিক নয়। প্লেনে করে আচমকা হাই-অলটিচিউডে পৌঁছে গেলে এরকম অসুবিধে তো হতেই পারে। এইজন্যই ফ্লাইটে এলে লেতে একদিন পরে ভ্রমণপর্ব শুরু হয়। বসার ঘরের বক্তৃতাটা একঘেয়ে লাগলেও পরে ওটার প্রয়োজনীয়তা বেশ বোঝা গেল। ওটা মন দিয়ে শোনাই উচিত ছিল।

মায়েদের যা অভ্যেস, রাস্তা থেকে এলে পা ধুতে হবে। হোটেলে ঢোকার পর থেকে সেটা হয়নি। ঘর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাথরুমে ঢুকে পায়ে জল দিতেই ঠকঠক করে কাঁপুনি শুরু হল। চটজলদি ঘরে নিয়ে এসে কম্বল মুড়ি দিয়ে, কফি খাইয়ে, ব্যাপারটা কোনোরকমে সামলানো হল।

মার জন্য কফি আনতে কাকুর সঙ্গে কিচেনে ছুটেছিল টুবাই। আসলে রুমের বেল অনেকবার বাজানোর পরও কোনও বেয়ারা আসেনি। শেষে নিজেরাই পৌঁছেছিল রান্নাঘরে।

বড়ো ডাইনিং হলের এককোণে টেবিলের কফির জাগ থেকে কফি খেতে খেতে একটা ম্যাপ বিছিয়ে বিশেষ কোনও জায়গাই খুঁজছিল সেই লোকটা। হাতে একটা ঢাউস পেন্সিল নিয়ে দাগও দিচ্ছিল ম্যাপে। পাশে বসে ছিল আরেকটা লোক। মুখটায় স্পষ্ট টিপিক্যাল মোঙ্গলিয়ান ছাপ। এ অঞ্চলেরই অধিবাসী হবে। ওদের দুজনের চোখ এড়িয়ে বড়ো জাগ থেকে কফি মগে কফি ঢালতে ঢালতে ম্যাপটা আড়চোখে লক্ষ করার চেষ্টা করেছিল ও। যদিও তেমন সফল হয়নি।

যাই হোক, গরম কফি খাওয়ার পর মা একদম ফিট। মা ঠিকঠাক হয়ে যাবার পর ওই একটা চিন্তাই মাথায় ঘুরছিল টুবাইয়ের—লোকটা কে? কীজন্য এসেছে লেতে? বেড়াতে যে আসেনি সে-কথা তো বোঝাই যায়। বুবুকে ওভাবে দেখার পেছনে কি বিশেষ কোনও উদ্দেশ্য কাজ করছে? তক্ষুনি তক্ষুনি কোনও প্রশ্নেরই মীমাংসা করতে পারেনি। তাই চিন্তাটা মাথায় ঘুরছিল সারাক্ষণ।

বিকেলে সবাইকে নিয়ে গাড়ি ছুটল শান্তি স্তূপের উদ্দেশে। উচ্চতা বারো হাজার ফিট। পাহাড়ের মাথায় বুদ্ধের এক বিশাল মূর্তি আছে। টুবাইয়ের ভালো নাম তথাগত। তাই কাকু গাড়িতে মজা করছিলেন, “সঙ্গে বুদ্ধদেব, তবু আমরা বুদ্ধ দেখতেই চলেছি।”

golpopangomepanic02

বাবা হেসে উত্তর দিলেন, “এ বুদ্ধ কি সে বুদ্ধ! এর বোধের জায়গায় তো যত গোলমাল।”

কাকু অবশ্য সঙ্গে-সঙ্গেই বললেন, “সে বললে হবে? সবে ক্লাস ইলেভেন, তবু এরই মধ্যে দু-দুটো কেস সলভ করেছে। তোমরা যাই বলো, গোলমালের মধ্যে ঝাঁপায় ঠিকই, কিন্তু বেরিয়েও তো আসে। তাছাড়া বোধশূন্য যে নয় তার প্রমাণ তো আগেই পাওয়া গেছে।”

টুবাই চুপচাপ বসে মজা দেখছিল। ও জানে, মা ছাড়া বাড়ির বাকি সকলে ওর এই গোয়েন্দাগিরির ব্যাপারে খুব সাপোর্টিভ। চুরি হয়ে যাওয়া হায়ার সেকেন্ডারির খাতা ফিরিয়ে দেবার পর রিপোর্টাররা ছবি তুলতে এলে বেশ ব্যাজার মুখেই মা দাঁড়িয়ে ছিলেন পাশে। দিঘায় বেড়াতে গিয়ে রাতদুপুরে হোটেলের ঘর থেকে উধাও সুটকেস, নগদ টাকা আর গয়নাগাটি উদ্ধার করে দেবার পরও মা তেমন খুশি হননি। বরং একটু রেগেই বলছিলেন, “এসবই কোরো। পরীক্ষার রেজাল্ট খারাপ হলে থানার পাশে একটা চেম্বার খুলে বোসো।”

বাবা বলেছিলেন, “না না, অতদূর যাবে কেন? বাইরের গ্যারেজটা ফাঁকা করে একটা সাইনবোর্ড ঝোলালেই হবে।”

মা কড়া চোখে সেবারও জরিপ করেছিলেন ওকে আর বাবাকে।

মায়ের আশঙ্কাটা টুবাই একেবারে উড়িয়ে দেয় না। এসব কাজে বিপদের আশঙ্কা তো আছেই, তাছাড়াও পড়াশোনার ক্ষতি হবার সম্ভবনাও ভালোরকম থাকে। তাই বেশি মাতামাতিও কখনও করে না। এবারেও একটু চুপচাপভাবেই চারদিকে নজর রেখেছে। কেমন যেন মনে হচ্ছে ওর, কিছু একটা ঘটতে চলেছে। যদিও কোনও অঘটন না ঘটলেই ও সবচেয়ে খুশি হবে।

শান্তি স্তূপে যাওয়ার রাস্তাটা পাহাড়ের গা বেয়ে ঘুরে ঘুরে উঠেছে। সব হিল স্টেশনেই পাহাড়ের রাস্তা এমনই হয়ে থাকে। তবে এখানের বৈশিষ্ট্য পাহাড়গুলো একেবারে ন্যাড়া। গায়ে কোনও সবুজ আচ্ছাদন নেই। আর দূরের পাহাড়গুলোর মাথা সাদা বরফে ঝকঝক করছে। রাস্তার শেষে বেশ খানিকটা সমতল জায়গা রেলিং দিয়ে ঘেরা। ঠিক তার মাঝেই অনেক ধাপ সিঁড়ি বেয়ে উঠে বুদ্ধমূর্তির পায়ের কাছে পৌঁছানো যায়। প্রসন্ন বুদ্ধের মূর্তি। একেবারে নিখুঁত স্থাপত্য! বিশাল আকারের মূর্তিটার কাছে সবাইকে লিলিপুটের দেশের লোক মনে হচ্ছিল।

পাহাড়ের ওপরে ঝোড়ো ঠান্ডা হাওয়ায় জামাকাপড় ঠিক রাখা যাচ্ছিল না। শীত করছিল খুব। ছবি তোলার জন্য মাকে সাবধানে ধরে ধরে অনেক সিঁড়ি টপকে একেবারে বুদ্ধের পায়ের কাছে গেছেন কাকিমা। বাবার পাশে দিদি। তার পাশে দাঁড়িয়েছেন মা, কাকু, কাকিমা আর বুবু। সবাই হাসছে। ক্যামেরার অ্যাঙ্গেল ঠিক করে শাটার টিপতে গিয়েই চমকে গেল টুবাই। একটু দূরে রেলিংয়ের ধার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে প্লেনের সেই মূর্তিমান। ডিপ ব্লু রঙের জ্যাকেট, জিনসের প্যান্ট, চোখে ঢাউস রোদচশমা, মাথায় ছোটো হ্যাট। একদম অন্যরকম দেখাচ্ছে। হয়তো ওকে চিনতে পারত না টুবাই, বিশেষ একটা কারণেই চিনেছে ও। আজও দূরবীক্ষণে কিছু দেখছিল লোকটা। দূর থেকেও টুবাইয়ের মনে হয়েছে দূরবীনের পুরো ফোকাসটাই আছে বুবুর ওপরে।

সবাই ছবি তুলছে। চারদিকে বাজছে ক্যামেরার ক্লিক, ক্লিক। নিজের ছবিগুলো তুলে একটু দূরে সরে গেল টুবাই। বারো হাজার ফিটের ওপরে এই বুদ্ধমূর্তি। কনকনে ঠান্ডা হাওয়া সব গরমজামা ভেদ করে ঢুকছে। দূরের পাহাড়গুলো রুক্ষ চেহারা নিয়ে খাড়া দাঁড়িয়ে। বাবা-কাকুরা সবাই তারিয়ে তারিয়ে ফ্লাস্কে আনা গরম কফি খাচ্ছেন। শুধু টুবাইয়ের মনে শান্তি নেই। আগামী দিনে কিছু একটা যে ঘটতে চলেছে সেটা ও স্পষ্ট টের পাচ্ছে। যা ঘটবে, তা একেবারেই মঙ্গলজনক হবে না যে সেটাও ও বেশ বুঝেছে। অথচ কাউকে কোনোভাবেই সাবধান করতে পারছে না। কাল্পনিক কোনও ঘটনার জন্য ভয় দেখিয়ে তো লাভ নেই। আর সেক্ষেত্রে ওকে অবিশ্বাস করার সম্ভবনা হান্ড্রেড পার্সেন্ট থেকে যায়।

সেদিন অন্ধকার নামার অনেক আগেই হোটেলে ফিরে এসেছিল ওরা। ডাইনিং হলে চা, বিস্কুট, পকোড়া খেতে খেতে বাবা তুললেন কথাটা—“কী রে টুবাই, এখানে কোনও রহস্যের সন্ধান পেলি নাকি? তোকে কেমন যেন অন্যমনস্ক দেখছি।”

“ও কিছু না।” টুবাই হাসে। মনে মনে ঠিক করেই রেখেছে, এখন কাউকে কিছু বলবে না।

একটু আগে ঠিক ওরা ঘরে ঢোকার মুখেই নীল জ্যাকেট বেরিয়ে গিয়েছে হন্তদন্ত হয়ে। তবে টুবাই লক্ষ করেছে বেরোবার মুহূর্তেও ওর দৃষ্টি ছিল বুবুর দিকে। বুবুকে নজর করতে করতে সামান্য আনমনাভাবে বেরিয়ে গেল লোকটা। তবে কি ও বুঝেছে যে টুবাই লক্ষ রাখছে ওর ওপর?

সেদিন সন্ধ্যায় অবশ্য একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। লের ফুটপাতে বসা তিব্বতি বুড়িদের কাছে মা আর কাকিমা একে-ওকে দেবার টুকটাক জিনিস কিনছিলেন। টুবাই আর বাবা ওখানেই দাঁড়িয়ে ছিল। পুলিশের একটা গাড়ি যেতে যেতে থমকে দাঁড়িয়ে গেল। জিপ থেকে নেমে পেটানো চেহারার এক হ্যান্ডসাম ভদ্রলোক এগিয়ে এলেন ওদের দিকে। সাদা ফুল শার্ট আর কালো স্ট্রাইপ প্যান্টে বেশ মানিয়েছিল ওঁকে। মাথার চুল ছোটো ছোটো করে ছাঁটা। ওদের সামনে দাঁড়িয়ে টুবাইয়ের দিকে হাত বাড়িয়ে দিলেন উনি—“আমি অরিন্দম সেন। আপাতত এই ডিস্ট্রিক্টটার চার্জে আছি। তুমি কি সেই তথাগত, যার ছবি আমরা কাগজে দেখেছি?”

নরম করে হাসল টুবাই—“হ্যাঁ, আপনার সঙ্গে পরিচিত হতে পেরে…”

কথাটা কেড়ে নিলেন উনি—“কী বলছ! সৌভাগ্য আবার কী? তোমার মতো সাহসী ছেলের মুখে এ-কথা মানায় না। ঠিক আছে, এই ফোন নাম্বারটা রাখো, কোন অসুবিধে হলে ফোন কোরো।”

উনি চলে যাবার পরও সেদিকে তাকিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল টুবাই। ওঁর দৃষ্টিশক্তির তারিফ করতে হয়। জিপে বসেও ঠিক চিনতে পেরেছেন ওকে। ভদ্রলোক আই.পি.এস.। ভবিষ্যতেও নিজে সিভিল সার্ভিসে যেতে চায় তো। যে সমস্যাটা ফিল করছে, সেটা ফোনে ওঁকে জানালে কেমন হয়? পরমুহূর্তেই নিজেকে সংযত করল, নাহ্‌, এখন নয়। পরে সত্যি-সত্যিই কোনও সংকটে পড়লে কনট্যাক্ট করা যাবে। কিছুক্ষণ আগে পাওয়া সম্মানটা এভাবে নষ্ট করার কোনও মানে হয় না।

পরের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে হোটেলটার চারপাশ ঘুরে দেখছিল টুবাই। এটা মাঝারি মানের হোটেল হলেও বিশাল একটা খোলা চত্বর আছে। তার সামনেই হোটেলের গেট। রাস্তা থেকে হোটেলের চত্বরে ঢুকলেই চোখে পড়ে দু-পাশে সারিবদ্ধ ধূলিধূসরিত গাড়ির লাইন। যেন অনেক পথ পার করে এই চত্বরে এসে তারা বিশ্রাম নিচ্ছে। আসলে কাশ্মীর সম্পূর্ণ ঘুরে অনেকে লে-লাদাখ আসেন। আবার লে-লাদাখ ফেরতও অনেকেই কাশ্মীরে বেড়াতে যান। ওদেরই সেরকম একটা অফার ছিল। ছুটি পাওয়ার সমস্যায় সেটা সম্ভব হয়নি। টুবাইয়েরও ইলেভেনের পড়াশুনার চাপ আছে। জুন মাসের এই ক’টা দিন চলতে পারে। তারপরে ছুটি নেওয়া মানে ও অনেক পিছিয়ে যাবে। যেটা মা কোনোমতেই হতে দেবেন না।

হোটেলের বাগানটি বেশ পরিপাটি। একদিকে ফুলের, অন্যদিকে ফলের বড়ো বড়ো গাছ। লম্বা পাথরের বেঞ্চ। দোলনা, ঢেঁকি, স্লিপ ফাঁকা পড়ে আছে। এত সকালে কে আর ওগুলোতে চাপবে? এগিয়ে যেতে যেতে নজরে এল সেই লোকটা বেঞ্চে বসে কানে মোবাইল ঠেকিয়ে কার সঙ্গে যেন কথা বলছে। গলার আওয়াজ এমন নামানো যে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। পাশ দিয়ে যেতে যেতে ওই ফোনের কথা শোনার জন্যই বুট ঠুকে নকল ধুলো ঝাড়ছিল ও। লোকটা চট করে ফোন করা বন্ধ রেখেই উঠে দাঁড়াল। তারপর ওর দিকে না তাকিয়েই বেরিয়ে গেল চটপট। ওর অদ্ভুত আচরণ দেখে সিদ্ধান্তে এল টুবাই যে খুব বিশ্রী একটা ঘটনাই ঘটতে চলেছে। আগেও দেখেছে, এসব ব্যাপারে ওর ইনটুইশন কখনও ভুল বলে না। তবে অনুমানের ওপর নির্ভর করে কারও শান্তিভঙ্গ না করাই ভালো। আনন্দ করে সবাই বেড়াচ্ছে বেড়াক। যখন সমস্যা আসবে তখন মোকাবিলা করা যাবে।

বাগান থেকে ফিরে খুব চটপট তৈরি হয়ে নিয়েছিল ও। সেদিন ওদের অনেকগুলো জায়গায় যাবার কথা ছিল।

প্রথমেই ওরা গেল ডিফেন্স মিউজিয়ামে। এত জায়গায় বেড়াতে গিয়েছে, কিন্তু সামরিক বাহিনীর কোনও মিউজিয়াম দেখার সৌভাগ্য এর আগে ওর হয়নি। স্থানীয় জন্তু, পোশাকের প্রদর্শনী তো আছেই, সবচেয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে কার্গিল যুদ্ধ সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়কে—সৈন্যদের পোশাক, নানান ভৌগোলিক তথ্য ছাড়াও রয়েছে নিহত বীর সেনাদের ছবি। ইন্দো-পাকিস্তান যুদ্ধের বিভিন্ন স্মারক দেখতে দেখতে টুবাইয়ের বার বার মনে হল কত আরামে, শান্তিতে সাধারণ মানুষের জীবন বয়ে চলেছে, অথচ এই সুখ-শান্তির পেছনে যে মানুষগুলো নিজেদের পারিবারিক আরাম দিনের পর দিন বিসর্জন দিচ্ছেন, সেই বীর সৈনিকদের কথা সারাদিনে একবারও আমরা ভাবি না। বরফের মধ্যে শুধুমাত্র একটা ‘বুকারি’ সম্বল করে কীভাবে একজন সৈনিক দিন কাটান, তার একটা মডেল ওখানে রাখা ছিল। ঘরের এককোণে সাজানো সেই ছোট্ট তাঁবুতে ছিল একটা বুকারি, বালতি ও আরও কিছু একান্ত প্রয়োজনীয় জিনিস। হিমশীতল আবহাওয়ার উপযোগী এক বিশেষ ধরনের স্টোভকেই বুকারি বলা হয়, যা জল গরম করে আবার ঠান্ডা পরিবেশে তাপ সঞ্চালনও করতে পারে। এক এক করে অনেকেই সেই তাঁবুতে ঢুকে দেখছিলেন কীভাবে কায়ক্লেশে মোটে একজন মানুষ সেখানে রাত্রিবাস করতে পারে।

তাঁবুটার মধ্যে ঢুকেছিল টুবাই। বরাবরই নতুন কিছু দেখলে সেটা ও নিজে নিজে যাচাই করে নিতে চায়। বেরিয়েই বুবুর খোঁজ করল ও। একটু আগেই তো দাঁড়িয়ে ছিল তাঁবুতে ঢোকার লাইনে। তাহলে গেল কোথায়? ছেলেটার একদম মতি স্থির থাকে না। কাকিমা বললেন, “ও তো নীচে গেল। যুদ্ধের কী সিনেমা দেখানো হচ্ছে, সেখানেই গেছে।”

তড়বড়িয়ে সিঁড়ি দিয়ে একতলায় নামল টুবাই। এক মুহূর্তও যে বুবুকে চোখের আড়ালে যেতে দেওয়া যাবে না, সে-কথা ওর থেকে কে বেশি ভালো জানে?

যা ভেবেছিল তাই। যে-ঘরে ডকুমেন্টারি ছবি চলছে, সেখানে বুবু নেই। অন্ধকারে ঘরের সাদা পর্দায় কার্গিল যোদ্ধাদের পাহাড়ে চড়া দেখানো হচ্ছিল, সবাই মগ্ন হয়ে ছবি দেখছে। আর ও নিঃশব্দে বুবুর ছোটো মাথাটা খুঁজে চলেছে। না, বুবু সত্যিই ছবি দেখছে না। দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে এল ও। নীচের সব ঘরগুলো একছুটে দেখে নিয়ে বাগানের দিকে ছুটে চলল।

পুরো বাগানটা একদম শুনশান। চড়া রোদে কেউ কোথাও নেই। তাহলে কি ওর আশঙ্কাই সত্যি হল! বুবুকে কেউ কিডন্যাপ করল? বাগানের শেষপ্রান্তে টয়লেট। কী মনে হতে সেখানেও একবার ঢুঁ মারতে গেল ও। অবশেষে সেখানেই সন্ধান মিলল ছেলেটার। টয়লেটে ঢোকার লাইনে দাঁড়িয়ে একমনে গল্প করছে একজনের সঙ্গে। তবে সেই একজনটা আর কেউ নয়, সেই বিশেষ লোকটা। বুবুর সামনেই দাঁড়িয়ে সে। বুবুকে পিছন দিক থেকে লক্ষ করতে করতে এগোচ্ছিল টুবাই। আশ্চর্যের ব্যাপার, ও কাছাকাছি হতেই লোকটা অন্যদিকে হাঁটা দিল। বুবু ঠিক সেই সময়ই ঢুকল টয়লেটে। একবার ভাবল টুবাই, একটু সতর্ক করে দেবে। পরমুহূর্তে মনে হল, থাক, আর একটু দেখা যাক।

ওদের পিছু পিছু বড়োরাও বেরিয়ে এসেছিল বাইরে। ডিফেন্স মিউজিয়ামের নাম ‘হল অফ ফেম’। গাড়িতে যেতে যেতে দূরের পাহাড়-চুড়োর বরফ দেখতে দেখতে ভাবছিল ও, ওই ঠান্ডার মধ্যে তাঁবু খাটিয়ে বসে আছেন জওয়ানরা। ঘরে তাঁদের মা, বাবা, ভাইবোন হয়তো উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন। আর দেশের সব লোককে নিরাপদে রাখার জন্য প্রতিদিনের দুঃসহ কষ্ট সহ্য করেও দুর্গম সীমান্তে পাহারা দিচ্ছেন ওইসব মানুষগুলো। সাধারণ জীবনে যে অসাধারণ কাজ করে চলেছেন ওরা, তা অনেক সম্মানের যোগ্য। টুবাই মনে মনে বলছিল, সরি, ভেরি সরি!

লেতে প্রচুর দ্রষ্টব্য আছে। সব হয়তো দেখা যাবে না। তবে শুরু থেকেই ভ্রমণপর্বটি নানা বৈচিত্র্যে ভরা। হল অফ ফেম-এর পরেই স্করপিওটা ছুটল গুম্ফার উদ্দেশ্যে। বৌদ্ধ গুম্ফার ভেতরে কালভৈরবের মূর্তিটা ভয়ানক! না বলে দিলে দেবতাকে দানবই ভাবত ও। বিশাল বড়ো বড়ো বত্রিশটা হাত, বিরাট মুণ্ডু। দশানন রাবণের কথা মনে করায়। গুম্ফায় পৌঁছতে গেলে প্রচুর সিঁড়ি ভাঙতে হয়। মা-কাকিমার পক্ষে এত সিঁড়ি ওঠা সত্যি কষ্টকর। কিন্তু হলের মধ্যে ঢুকে সবাই খুব খুশি। বিরাট বড়ো হলটাতে সারি সারি ছবি সাজানো। দেওয়ালের একদিকে কাচের ঘেরাটোপে কিছু মূর্তি আছে। মেঝেতে পাতাবাহারি কার্পেটে বসে আছেন বৌদ্ধ শ্রমণরা। তাদের হাতের মালা ঘুরছে আর তারা মন্ত্র জপ করছেন নিবিষ্টভাবে। পরিবেশ এত নিস্তব্ধ যে ফিসফিস করেও কথা বলা যায় না। হলের পাশেই সরু সিঁড়ি। সেই সিঁড়ির শেষে গুহার মতো ঘরে কালভৈরবের দর্শন মেলে। ওই গুম্ফায় কেলসাং লামার ছবির সঙ্গেই ছিল একটি ছোটো ছেলের ছবি। আগের কেলসাং লামা মৃত। ওই ছোটো ছেলেটিকেই ভাবী কেলসাং লামা হিসেবে শিক্ষিত করে তোলা হচ্ছে।

পরে অনেক গল্প শুনল টুবাই। বিশেষ লক্ষণ দেখেই নাকি এই নির্বাচন করা হয়। তারপর বাবা-মার কাছ থেকে শিশুটিকে নিয়ে এসে বড়ো করা হয় বৌদ্ধমঠে। বৌদ্ধধর্ম সম্বন্ধে জ্ঞান লাভ করে সে। ভাবী কেলসাং লামার হাসিখুশি মুখটি ভারি বিষণ্ণ করল টুবাইকে। একদম অন্যরকম জীবন মেনে নিতে হবে ছেলেটিকে। যেখানে সব থাকবে, শুধু থাকবে না নিজের ইচ্ছেমতো চলার স্বাধীনতা।

গুম্ফায় নানান গলিঘুঁজি। সিঁড়িতে একবার ওঠা, একবার নামা। সারাক্ষণ বুবুর দিকে নজর রাখল ও। ওই লোকটা অবশ্য গুম্ফায় দেখা দেয়নি। অন্য কোথাও ঘুরছে হয়তো।

গুম্ফা থেকে রাস্তায় ফেরার পথে আবার সেই সিঁড়ি ভাঙার পর্ব। খুব দ্রুত নামছিল টুবাই। এরকম মজা ও মাঝে-মাঝেই করে। সিঁড়ির বাঁকে বাঁকে টুরিস্টরা দাঁড়িয়ে ছবি তুলছে। অনেক উঁচু থেকে নীচের রাস্তা, ঘরবাড়ি একদম অচেনা লাগে। ঠিক যেন বড়ো শিল্পীর আঁকা ল্যান্ডস্কেপ। সিঁড়ির দুটো চাতালেই বড়ো ড্রামের মতো চক্র বসানো আছে। তার গায়ে বিচিত্র সব লিপি খোদাই করা। হাতে ঠেলে ঘোরাতে বেশ গায়ের জোর লাগে। কিছু লোকজন ঘোরাচ্ছে দু-হাতে। টুবাই দাঁড়াল না, একদম নীচে এসে কাঁধের ব্যাগ খুলে বাইনোকুলার আর জলের বোতল বার করল ও। রীতিমতো হাঁপিয়ে গিয়েছিল। কয়েক ঢোঁক জল গলায় ঢেলে, বাইনোকুলার বার করে চোখে লাগিয়ে মা-বাবা-কাকা-কাকিমাদের নেমে আসা লক্ষ করছিল। তখনই নজরে এল, তিনজনে ঠেলছে চাতালের বড়ো ধর্মীয় চক্রটা। দিদি আর বুবুর সঙ্গে হাত লাগিয়েছে সেই লোকটা। আশ্চর্য! সব জায়গায় ওর আবির্ভাব ঘটছে ঠিক সেখানেই, যেখানে বুবু উপস্থিত। তার মানে ওদের পিছু ছাড়ছে না ও। কিংবা ওরই মনের ভুল। লোকটা নেহাতই এক টুরিস্ট, তাই গুম্ফা দেখতে এসেছে, আর ও আকাশপাতাল ভাবছে।

সেদিন ফেরার পথে ম্যাগনেটিক ফিল্ড দেখার অভিজ্ঞতা হল সবার। গাড়ি ওখানে নিজে নিজে বেশ খানিকটা চলে। একটুও গড়ানো নেই, একদম প্লেন রাস্তা। ইঞ্জিন স্টার্ট না করে, স্টিয়ারিং না ঘুরিয়ে, গাড়ির চুম্বকের টানে এগিয়ে চলাটা দেখালেন ড্রাইভার। পাশের খাড়া দাঁড়ানো বিশাল পাহাড়ে, নাকি মাটির নীচে, কোথায় ম্যাগনেট আছে কে জানে।

গুরুদ্বারা পড়ল পথে। গুরু নানকের পাদস্পর্শে বিখ্যাত এই গুরুদ্বারার নাম ‘পত্থর সাহিব’। এখানে নিয়মিত সেবাব্রত পালন করা হয়। এক দুষ্টু দৈত্য নাকি নানককে মারার জন্য পাথর ছোড়ে আর পাথর গলে জল হয়ে যায়। শেষপর্যন্ত সে নানকের শিষ্য হয়েছিল। একটা ঘরের মধ্যে সেই বড়ো পাথরটা নানকের চিহ্ন সমেত এখনও সযত্নে রেখে দেওয়া আছে।

ভীষণ ভালো লাগল সিন্ধু নদী আর জাস্কর নদীর সঙ্গমে গিয়ে। জলের দু-রকম রঙে দুটি নদীর আলাদা অস্তিত্ব ধরা পড়েছে। দু-পাশ থেকে দুটি নদী এসে মিলেছে। চারপাশে খাড়া পাহাড়, বড়ো বড়ো গাছ। অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। নদীতট থেকে সিঁড়ি বেয়ে উঠে একটি মন্দিরে পৌঁছানো যায়। জলের প্রচণ্ড স্রোতে নৌকা ভাসিয়েছে কেউ কেউ। রাবারের নৌকা—লাইফ জ্যাকেট পরা কিছু লোকজন নৌকা উলটে জলে হাবুডুবু খাচ্ছে, আবার উঠে পড়েছে নৌকায়। বুবু বায়না করছিল ওই নৌকায় চাপবে। তারপর কাকুর বকুনি খেয়ে থমথমে মুখে গাড়িতে উঠে বসল। টুবাই একমনে খুঁজছিল সেই লোকটাকে। না, এবারে লোকটা সত্যি আসেনি এখানে।

হোটেলের ঘরে পৌঁছে মাঝে-মাঝেই ওর মনে পড়ছিল ভাবী কেলসাং লামার কথা। বুকের মধ্যে চিনচিন করে সামান্য কষ্টও হচ্ছিল। ‘রোমান হলিডে’ সিনেমার সেই রাজকুমারীর মতো ছোটো ছেলেটার জীবনেও কোনও স্বাধীনতা থাকবে না। স্বাচ্ছন্দ্য, সম্মান, ঐশ্বর্য, আনুগত্য কি স্বাধীনতার ফাঁক পূরণ করতে পারে? কে জানে!

নুব্রা ভ্যালিতে পরের দিনই যাওয়ার কথা। অথচ মার শরীর নিয়ে খুঁতখুঁতানিটা যাচ্ছে না। সেই কাঁপুনির পর থেকে মা একটু নার্ভাসই হয়ে আছেন। অতদূরের জার্নি, তার ওপর আবার পৃথিবীর উচ্চতম গাড়ি যাবার রাস্তা পেরিয়ে—ব্যাপারটা চিন্তাভাবনা করার মতোই। শেষপর্যন্ত ভোর-ভোরই রওনা দিল ওরা। ব্রেকফাস্ট হোটেল থেকেই প্যাক করে সঙ্গে নেওয়া হয়েছে। খারদুংলা পাস আঠারো হাজার তিনশো আশি ফুট উচ্চতায়। গাড়ি থমকে দাঁড়াল সেখানে। মাকে হোটেলে রেখে আসা যায়নি। বায়না করে তিনি সঙ্গেই এসেছেন। তবে কাকিমা সারাক্ষণ মাকে আগলে আগলে রাখছেন। কোনও অসুবিধে দেখলেই রিপোর্ট করতেও বলা হয়েছে।

নুব্রা ভ্যালির উচ্চতা দশ হাজার ফিটের মতো। গাড়ি করে একেবারে ক্যাম্পের কাছে পৌঁছে যাওয়া হল। তাঁবুতে থাকার অভিজ্ঞতা এর আগে হয়নি। দিদি, বুবু বেশ উত্তেজিত। মায়েরা বাথরুম নিয়ে চিন্তিত হলেও গরম কফি খাওয়ার পর ঠান্ডা হলেন। বাথরুমের কলে গরম জল পাওয়া যাবে না। বালতিতে এরাই জল সাপ্লাই করবে। এমনিতে আর সব ব্যবস্থা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। মোটামুটি ঠিকঠাক বলা যায়।

আসার সময় খারদুংলা পাসের অভিজ্ঞতা খুব সুখের হয়নি। ওই মারাত্মক উচ্চতায় ঠান্ডাও খুব বেশি। গাড়ি দাঁড়াতেই বুবুকে নিয়ে টুবাই নেমেছিল পিচ রাস্তার নীচে, বরফের উপত্যকায়। সেখানে এবড়োখেবড়ো পাথর, কোথাও-বা বরফগলা জলের সরু নদী তিরতির বয়ে চলেছে। রাস্তার ওপরে উঁচু ফলকে খারদুংলা পাসের উচ্চতা ও অন্যান্য বিবরণ খোদাই করা আছে। পতপত করে সিল্কের কাপড়ের অনেক পতাকা উড়ছে। একটা পাথর টপকে আরেকটা পাথরে যেতে গিয়ে বুবু পড়ছিল ওই নালার মতো নদীতে। পেছনে থাকায় এগোতে এগোতে ওকে ঠিক খেয়াল করেনি টুবাই। ‘দাদা’ বলে বুবু আর্তনাদ করতেই চমকে পেছন ফিরল ও। দেখল এক ম্যাজিক! অদ্ভুত কৌশলে বুবুকে ধরে নিয়েছে সেই লোকটা। আশ্চর্য তো! ও কোথা থেকে এল?

সেদিন ধন্যবাদ জানালেও টুবাইয়ের মাথায় ওই ঘটনাটাই ক্রমাগত ঘুরপাক খাচ্ছে। লোকটা ঠিক সময়ে ওই জায়গায় পৌঁছল কী করে? না পৌঁছলে বুবুর আঘাত হয়তো মারাত্মক হত। তবু বিদঘুটে চিন্তাটা ওর মাথা ছাড়ছিল না। লোকটার ওই আবির্ভাব  মোটেই আকস্মিক নয়। নিশ্চয়ই সারাক্ষণ অনুসরণ করছে বুবুকে। বিনা কারণে যা কখনোই সম্ভব নয়। তাহলে ওর মতলবটা কী? টুবাই ভাবছিল, বুবুকে একমাত্র চোখে চোখে রাখা ছাড়া ওর আর কিছুই করার নেই।

নুব্রা ভ্যালিতে একটা অদ্ভুত প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য আছে। ভারতবর্ষের ‘নানা ভাষা নানা মত নানা পরিধানের’ মতোই নুব্রা ভ্যালি যেন একই অঙ্গে বহুরূপ ধারণ করেছে। চারদিকে খাড়া বাদামি পাহাড়, সাদা বালির মরুভূমি, তারই পাশে তিরতিরে রোগাপাতলা এক নদী। বয়ে যাওয়া নদীটাকে এতই শীর্ণ লাগে যে মনে হয় মোড় ঘুরলেই সে হারিয়ে যাবে। মরুভূমির ব্যাপ্তি বেশিদূর নয় যদিও, তবু দু-কুঁজওলা উটের পিঠে চাপতে চাপতে বাবার মুখে শোনা সেই বিখ্যাত উক্তিটাই মনে এল ওর। চন্দ্রগুপ্ত নাটকে লেখক আলেকজান্ডারকে দিয়ে বলিয়েছিলেন, ‘সত্য সেলুকাস, কী বিচিত্র এই দেশ!’

মরুভূমির পাশের রাস্তাটায় সারাক্ষণ গাড়ি চলছে। তার ঠিক ধার ঘেঁষে বিশাল বিশাল পাহাড়গুলো থম মেরে দাঁড়িয়ে আছে। গায়ে খোপ খোপ গর্ত। যেন কেউ পাহাড় কুঁদে শিল্প নির্মাণের চেষ্টা করেছে। তবে সেই প্রকৃতির হাতে বোনা কারুকার্য ভারি বিস্মিত করে। একফোঁটা সবুজের চিহ্ন নেই কোথাও। বলিষ্ঠ পাহাড়গুলোর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে একটু অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিল টুবাই। হঠাৎ খেয়াল হল, বুবুর উটটা তো পাশে নেই। ওর ঠিক ডান পাশের উটটায় দিদি আর বাঁ পাশেরটায় ছিল বুবু। চমকে তাকাল ও। সত্যি-সত্যিই বুবুর উটটাকে সামনে পেছনে কোথাও দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না। বার বার বুবুকে নিজের উটে রাখতে চেয়েছিল ও। কথা শোনেনি। জেদ করে ওরা দুজনে নিজস্ব উট নিল। দিদির উটটা ঘুট ঘুট করে পাশে-পাশেই চলেছে। ওর অমনোযোগের সুযোগে বুবুরটা একদম ভ্যানিশ।

অনেক অনুরোধেও বুবুর খোঁজে যেতে রাজি হল না উটওয়ালা। তার মুখে একটাই কথা, ‘উহ্‌ চলা গয়া।’ ফিরে আসতেই হল। দূর থেকে কাকু আর বাবাকে দেখে ছুটল ও।

“বুবু ফিরেছে?”

“হ্যাঁ তো। তুই হাঁপাচ্ছিস কেন?”

“কখন ফিরল ও? দেখছি না তো।”

ওরা সবাই তাঁবুতে ফিরে গেছে। আসলে বুবুর টয়লেট যাবার তাড়া ছিল। তবু না বলে ওর ফিরে আসাটা একদম ঠিক হয়নি।

কাকুর সঙ্গে তাঁবুতে ফেরার সময় ভাবছিল টুবাই, ও কি একটু বেশিই রি-অ্যাক্ট করছে বুবুর ব্যাপারে? এইটুকু জায়গায় না ফিরে ও যাবে কোথায়? তবে নিজের অনুভূতিকে ও কীভাবে অস্বীকার করবে? সেটা যে বলছে কোনও একটা দুর্ঘটনা শীঘ্রই ঘটতে চলেছে।

নুব্রা ভ্যালি থেকে ফেরার পথে আরেকটা মরু অঞ্চল চোখে পড়ল ওদের। ‘ভাগ মিলখা ভাগ’ ছবির শ্যুটিং হয়েছে সেখানে। সাদা বালির মরুভূমির পাশে কোনও নদী বইছে না। গাড়ি থামাতেই নজরে এল, বালির মধ্যে মিশেছে ছোটো ছোটো দু-তিন রঙের পাথর। ওরা তিনজনেই ওই সাদা বালি আর পাথরের নমুনা নিল প্ল্যাস্টিকের প্যাকেটে ভরে। বুবু অবশ্য বলছিল, ওর এবারের ভূগোলের প্রজেক্টে ওই পাথরগুলো কাজে লাগাবে।

নুব্রা ভ্যালিতে সে-রাতটা ভালোই কেটেছিল। বড়ো একটা তাঁবুতে খাওয়ার ব্যবস্থা। সবই নিরামিষ খাবার। গরম রুটির সঙ্গে তড়কা, সবজি। খেতে বেশ মুখরোচক। সেদিন বুবুকে নিজের সঙ্গে নিয়ে শুয়েছিল ও। রাতে হাওয়ায় তাঁবুর কানাত ফুলে ফুলে উঠছিল। ঘুমন্ত বুবুর মুখ দেখতে দেখতে কখন যে ও নিজেই ঘুমিয়ে পড়েছে, টের পায়নি। সকালে ঘুম থেকে উঠে হোটেলে ফিরে যাওয়া ছাড়া আর কোনও প্রোগ্রাম ছিল না।

সেদিন ফিরল ওরা বিকেল গড়িয়ে। রাতে খাওয়ার টেবিলে বসে চারদিকে নজর বোলাতে বোলাতে ওই লোকটাকে খুঁজছিল। কোথাও নেই। এতদিনে বোধ হয় ওদের পিছু ছেড়েছে লোকটা। ফেরার পথে ‘লাফিং বুদ্ধা’-র বিশাল মূর্তি দেখার সময়ও লোকটাকে একঝলক দেখেছিল টুবাই। মনে মনে ভাবছিল, সেটাই যেন শেষ দেখা হয়। পরের দিন ঘুম থেকে উঠেই ‘প্যানগম’ রওনা দিতে হবে। লোকটা ওখানে যাবে না তো!

লের ওই জায়গাটার নামকরণ হয়েছে একটা লেকের নামে। অসাধারণ নাকি তার সৌন্দর্য। ‘প্যানগম লেক’ দেখার পরেই ওদের ভ্রমণপর্ব শেষ হবে। রাতে শুতে যাবার আগে বুবু ফিসফিস করে বলছিল, “আমার আর এখান থেকে ফিরতে ইচ্ছে করছে না। বাড়ি ফিরলেই সেই একঘেয়ে পড়া আর পড়ার জন্য দিনরাত বকুনি খাওয়া। আমি ভাবছি প্যানগমেই থেকে যাব।”

এক ধমক লাগাল টুবাই—“খুব ফাঁকিবাজ হয়েছিস দেখছি! রেজাল্ট খারাপ হলে এর পরের বেরোনোটায় তোকে নিয়েই আসব না।”

মুখ গোঁজ করে নিজের কম্বলে ঢুকে পড়ল বুবু। টুবাই ভাবছিল, বেচারাকে অতটা বকুনি না দিলেই হত। মনের কথাটা না-হয় বলেই ফেলেছে।

রাতে বিছানায় শুয়ে বুবুর শেষ কথাটা হঠাৎ ঝিলিক দিল মাথায়। প্যানগমে বুবু থেকে যাবার কথা বলল কেন? তাহলে কি লেক-পর্বটা ভালোভাবে মিটবে না? নিজেকে শান্ত করার জন্য পরক্ষণেই ভাবল, যা হবার তা হবে। ভবিতব্যকে কে কবে আটকাতে পেরেছে?

প্যানগম লেক যাওয়ার পথেই পড়ল ‘শে’ মনেস্ট্রি। বিশাল উঁচু ওই মনেস্ট্রিতে সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে উঠেছিল ওরা। রীতিমতো পা ব্যথা করে। টুবাইয়ের খুব লাগছিল। যেসব লামারা ওখানে বসবাস করছেন, তাঁদের মধ্যে বেশিরভাগই বেশ বয়স্ক। তাঁরা যে কী করে ওই উঁচু সিঁড়ি ওঠানামা করে কাজকর্ম সারেন, সেটাই ভাবার। মনেস্ট্রিতে ঘরে ঘরে উপাসনা চলছে। ধ্যানস্থ ভঙ্গিতে নানা বয়সের লামারা বসে আছেন। বুদ্ধমূর্তি ছাড়াও বিচিত্রসব দেবতার মূর্তি আছে। নানা রঙের পোশাক-আশাক এবং শরীরে ধারণ করা বিভিন্ন অলংকার সমেত চিত্র-বিচিত্র ওইসব দেবতারা বেশ দৃষ্টিনন্দন।

golpopangong e panic

মিউজিয়াম নীচের তলায় শুরু, দোতলায় শেষ। নানা সময়ের পোশাক, গহনা সব সাজিয়ে গুছিয়ে রাখা আছে। রাজারাজড়ার পোশাকে সোনা-রুপোর কাজ, তাদের বিভিন্ন অস্ত্রশস্ত্র দেখতে দেখতে টুবাইয়ের রাজস্থানের অসাধারণ মিউজিয়ামগুলোর কথা মনে পড়ছিল। মিউজিয়ামে অনেক সময় কেটে গেল। পথে হোটেলে ঢুকে লাঞ্চ খেতে হবে। তাছাড়া প্যানগমের দূরত্বও অনেকখানি! তাই কাকুর তাড়ায় খুব মন দিয়ে মিউজিয়াম দেখা হল না টুবাইয়ের।

তাছাড়া ওখানে ঘোরার সময় বুবু আর দিদিকে সারাক্ষণ নজরে নজরে রেখেছিল ও। কেনাকাটা তেমন কিছু হয়নি। কয়েকটা কার্ড অবশ্য কেনা হয়েছে। শোভাযাত্রা, সমবেত মুখোশ নৃত্য, ছোটো কেলসাং লামার পোট্রেট। শোভাযাত্রার ছবিটা বেশ জমকালো। ছোটো কেলসাং লামাকে সাজিয়ে গুছিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সঙ্গে অনেক মানুষ। কেউ কেউ আবার নানা ধরনের ভেঁপু, ঢোল বাজাচ্ছে। ড্রাইভার জানালেন দু-একদিনের মধ্যেই ওই শোভাযাত্রাটা হওয়ার কথা। প্রস্তুতি এখনই শুরু হয়ে গিয়েছে।

মিউজিয়ামের নীচে সিঁড়ির পাশের ধাপেই বসেছে চায়ের দোকান। চমরী গাইয়ের দুধে তৈরি লাদাখের চা। মা-কাকিমা ছাড়া সবাই খুশি মনেই গরম গরম খেয়ে নিল।

প্যানগম যাওয়ার পথে পেছনের সিটে জানালায় চোখ রেখে বসে ছিল বুবু। দিদি প্রথম থেকেই ঘুমিয়েই কাদা। ভোর ভোর উঠতে হয়েছে সবাইকে। বাবা ড্রাইভারের পাশে বসেই ঢুলছিলেন বলে বাবাকে পেছনের সিটে পাঠিয়ে টুবাই বসল সামনে। ও বুঝতে পারছিল, পেছনে যখন কোনও সাড়াশব্দ নেই, প্রায় সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। যেতে যেতে মন দিয়ে প্রকৃতির বিচিত্র রূপ দেখছিল ও। চারপাশের রুক্ষ পাহাড় ভেদ করে পথ কাটা হয়েছে। পাহাড়ের পায়ের নীচে একখানা বরফের মাঠ। দূরে উঁচু উঁচু পাহাড়-চূড়ায় বরফের সাদা রঙ রোদে ঝলকাচ্ছে। টুবাই ভাবছিল, পৃথিবীর ওই শুভ্র সৌন্দর্যের কোনও তুলনা হয় না। তবু আশেপাশের অনেক মানুষ সারাক্ষণ অনিষ্ট চিন্তা করে চলেছে। এই পৃথিবীতে জন্ম নেওয়া সত্ত্বেও তাদের ওই ধরনের আচরণ সত্যিই অবাক করে।

যেতে-যেতেই হঠাৎ বেশ শব্দ করে একটা টায়ার বসে গেল মাটিতে। সারা রাস্তা শুনশান। তাই আওয়াজটা খুব জোরেই হয়েছে। সবাইকে গাড়ি থেকে নামিয়ে স্টেপনি বার করে ড্রাইভার চাকা বদল করছিলেন। হঠাৎ পাশ দিয়ে একটা টাটা সুমো হুশ করে বেরিয়ে গেল। গাড়ির ভেতর থেকে বুবুর নাম ধরে কেউ একজন চেঁচাল বলেই মনে হল টুবাইয়ের। সেই বেরিয়ে থাকা হাতের বিদায় সম্ভাষণের উত্তরে বুবুও চেঁচিয়ে উঠল, “টা টা।”

একটু অবাক হয়ে বলল টুবাই, “বাব্বা! এখানেও এত চেনা! কে রে?”

বুবু মুচকি হাসল। “না, এখানে এসেই চেনা হয়েছে। তুমিও চেনো তো, সেই ভদ্রলোক। যিনি আমাকে সেদিন বাঁচিয়েছিলেন।”

টুবাইয়ের বুঝতে একটুও অসুবিধে হল না। সেই লোকটা! তাহলে ওরাও প্যানগম গেল।

গাড়িতে উঠতে উঠতে ও গম্ভীর গলায় সাবধান করল বুবুকে, “আমাকে না বলে কারও সঙ্গেই কোথাও যাবি না, কেমন? অচেনা জায়গা, অচেনা লোকজন—কথাটা মনে রাখিস।”

চাকা বদলানো শেষ হতেই গাড়ি ছুটতে শুরু করেছে প্যানগমের দিকে। গাড়ি দাঁড়িয়েছিল যখন, সঙ্গে রাখা ফ্লাস্কে গরম জলের সদ্গতি করেছেন মা আর কাকিমা। তাজা কফি বানিয়ে নোনতা বিস্কুট সহযোগে দিয়েছেন সবাইকে। এখন আর কেউ ঘুমোচ্ছে না।

বাবা তরতাজা গলায় বলেন, “বুবু আর রুনু দুজনে একসঙ্গে একটা গান শোনাও তো।”

ভরা গলা মিলিয়ে শুরু করে, “বিপদে মোরে রক্ষা করো…”

টুবাই ভাবে, ভারি অদ্ভুত তো! এই গানটাই ওরা ধরল কেন? বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে তো গানটা একদম মেলে না। তাহলে কি ভবিষ্যতে সত্যিই বিপদ আছে কোথাও?

ভাবতে-ভাবতেই মা-কাকিমার গলা কানে এল ওর—“সহায় মোর না যদি ছুটে, নিজের বলো না যেন টুটে।”

টুবাই চুপ করে শুনছিল গানটা। গানের প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি লাইন ওর মনের মধ্যে অনায়াসে গেঁথে যাচ্ছিল।

প্যানগম লেকের ধার বরাবর একটু উঁচুতে বাঁধানো রাস্তা। এই পথেই সব গাড়ি যাতায়াত করে। দূর থেকে উঁকিঝুঁকি মারতে মারতে লেকটা যেন বুক চিতিয়ে সামনে এসে দাঁড়াল। অসাধারণ সেই সৌন্দর্যের মুখোমুখি হয়ে একটা অদ্ভুত অনুভূতি হল টুবাইয়ের। মানুষের জীবনের সবটুকু মাধুর্যই তো আসলে প্রকৃতির দেওয়া। কোনও অর্থ, ক্ষমতা, প্রতিপত্তিই তা দিতে পারে না, যা প্রকৃতি অনায়াসে দেয়। এক নিমেষে সে-সব অঞ্জলি পূর্ণ করে দিতে পারে, কিন্তু পরিবর্তে কিছু দেওয়ার কথা আমরা ভাবি না কেন যে!

এখানে আসার জন্য সামান্য ফি জমা দিয়ে পারমিট নিতে হয়। আসলে এই লেকের মালিকানা নিয়ে চিন আর পাকিস্তানের সঙ্গে দ্বন্দ্ব লেগেই থাকে। তাই এখানে আসা-যাওয়াটা সরকারি নজরদারির আওতায় রাখা হয়।

গাড়ি যত এগোচ্ছে ততই লেকের অগাধ নীল জল, নীল আকাশের পটভূমিকায় নিজেকে মেলে ধরেছে। বাবা, কাকু ক্যামেরায়, মোবাইলে ছবি তুলতে ব্যস্ত। টুবাই শুধু দেখছিল মন দিয়ে। কেননা ও জানে প্রথমবারের এই দেখার অভিজ্ঞতাটুকু সঞ্চয় করে রাখতে হয়। এরপরের দেখায় এই বিস্মিত হবার আনন্দ থাকবে না। অনেকে গাড়ি থেমে নেমে ছবি তুলছেন।

বাবা ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করেন, “ক্যাম্প আর কত দূরে?”

নির্লিপ্তভাবেই উত্তর দেয় সে, “এখনও মাইল পাঁচেক।”

বুবু একবার গাড়ি থামানোর জন্য বায়না করেছিল। কাকু বললেন, “একদম চুপ। যা দেখার ক্যাম্পে পৌঁছে দেখবে।”

আসলে ক্যাম্প তো লেকের ধারেই হবে। অচেনা জায়গায় শুধু শুধু দেরি করার কোনও মানে হয় না।

সমস্যা হল ঠিক এরপরেই। গাড়ি চলছে তো চলছেই। পথ আর শেষ হচ্ছে না, অথচ মাঝে-মাঝেই লেকের পাশের একটু উঁচু জমিতে অনেক তাঁবু নজরে আসছে। লোকজন ঘুরছে, বেড়াচ্ছে। আর এদিকে গাড়িসুদ্ধু সবার পেট খিদেয় চুঁইচুঁই করছে। মায়েরা ব্যাগ হাঁটকে এটা ওটা দিলেও মন ভরছে না। ক্যাম্পে পৌঁছে খাওয়ার কথা ছিল তো।

শেষে ওপরের বাঁধানো রাস্তা থেকে গাড়ি নামল নীচের রাস্তায়। লেকের ধার ঘেঁষে এবড়োখেবড়ো হাঁটা পথে ছুটছে গাড়ি। বেশি জোরে চালানো যাচ্ছে না। পাথর ছড়িয়ে আছে চারদিকে। জোরে চালালে যে-কোনো মুহূর্তে গাড়ি উলটে যাবে। লেকের ধারে পাখিরা উড়ছে, আবার ফিরে এসে বালিতে ঘুরছে, দাঁড়াচ্ছে। একদম নির্জন রাস্তা। মাঝে মাঝে শুকনো ঘাসের ঝোপ। সমুদ্রের ধারে যেমন বালি থাকে, লেকের ধারেও তেমনই বেলাভূমি।  মাঝে মাঝে ঢেউ এসে ছুঁয়ে দেয় সেই তটভূমি। তবে সে-সব দেখার মন বা ইচ্ছে আর নেই কারও। শরীর-মন অস্থির হলে সুন্দর দৃশ্যেও দৃষ্টি দেওয়া যায় না তো।

প্রায় ঘণ্টা দুয়েক বাদে গন্তব্যে পৌঁছানো গেল। সার সার তাঁবু খাটানো রয়েছে অনেকখানি এলাকা জুড়ে। অফিসে পৌঁছে জানা গেল ওদের নামে কোনও বুকিং নেই। তবে কিছু তাঁবু খালি থাকায় তিনটে তাঁবু ওদের জন্য তক্ষুনি অ্যালট করে দিল।

কিছুক্ষণের মধ্যেই মালপত্র সমেত নিজেদের তাঁবুতে ঢুকল ওরা। নরম গদিতে পরিষ্কার চাদর পাতা। তুলতুলে কম্বল দিয়ে বিছানা ঢাকা রয়েছে। ডাবল-বেডেড খাট, চেয়ার-টেবিল—কোনও কিছুরই অভাব নেই, সব ব্যবস্থাই চমৎকার, শুধু দরজায় চেন টানা। লক করার কোনও ইচ্ছেই পূরণ হবে না।

ঘরে ব্যাগগুলো রেখে, ডাইনিং হলের তাঁবুতে এক কাপ চা আর একবাটি নুডলস খেয়ে বেরিয়ে পড়া হল লেকের উদ্দেশ্যে। তাঁবু থেকে দেখে মনে হচ্ছে লেক একদম কাছে। হাঁটতে হাঁটতে বোঝা গেল এক মাইলের কম নয়। ঠান্ডা হাওয়ায় শরীরে কাঁপুনি ধরে যাচ্ছে। মা আর কাকিমাও চলেছেন ওদের সঙ্গে। একটানা গাড়িতে আসায় সবারই পায়ে বেশ ব্যথা হয়েছে। তবু যাওয়া চাই-ই। তবে পরিশ্রম সার্থক হল লেকের ধারে পৌঁছে। জুতো খুলে পা ডুবিয়েই তুলে নিতে হল। ঠান্ডা জলের অসম্ভব কনকনানি, সহ্য করাই কঠিন।

লেকে ধারে দাঁড়িয়ে থাকতে-থাকতেই বড়ো দুশ্চিন্তা হচ্ছিল টুবাইয়ের। এখানে এক রাত কাটিয়েই ফিরে যাওয়া হবে লেতে। ওর আশঙ্কা মিথ্যে না হলে যা কিছু ঘটার ঘটবে এরই মধ্যে। লেকের সৌন্দর্যে মোহিত হলেও সে-কথা ভুললে চলবে না।

ফেরার পথে অদ্ভুত এক দৃশ্য নজরে এল। কিছু কিছু বাড়ির লাগোয়া খোলা মাঠে সার দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে অনেক কালো কালো গোরু। পাহাড়ি অঞ্চলে এই গোরুগুলোকেই চরতে দেখেছে ওরা। সমতলের গোরুদের সঙ্গে অনেক তফাত চেহারায়। সবার রঙই কালো, বড়ো বড়ো শিং, আর গায়ে প্রচুর লোম। মাঝে মাঝে পা ঠুকে শব্দ করছে ওরা। চারপাশের নীচু বেড়ার ফাঁক দিয়ে গোরুগুলোকে দেখে মা, কাকিমা বেশ কাতর হয়েই বললেন, “আহা রে! অসহায় প্রাণীগুলোকে কীভাবে ঠান্ডায় ফেলে রেখেছে দেখো। শীতে জমে যাবে তো।”

উত্তরে কাকু বলেন, “না। জমে না। এই অত্যাচার ওদের অভ্যাস হয়ে গিয়েছে। তাছাড়া মানুষের মায়া না থাকলে কী হবে, প্রকৃতির তো আছে! ওদের গায়ের লোমই ওদের বাঁচাবে।”

তাঁবুতে ফিরে খাবার খেতে সেই ডাইনিংয়ের তাঁবুতে যেতে হল সকলকে। বুফে সিস্টেমে খাওয়া। অনেক লোক একসঙ্গে খেতে বসেছে। চারদিকে নজর বুলিয়ে একটু শান্তি পেল টুবাই। না, সেই লোকটা কোথাও নেই।

রাতে টুবাইরা তিনজন মানে দিদি, বুবু আর টুবাই শুল এক তাঁবুতে। প্রচণ্ড ঠান্ডায় কম্বলের মধ্যে ঢুকতে ঢুকতে মনে হল ভাগ্যিস বিছানায় কম্বল চাপা দিয়েছিল ওরা। না-হলে বিছানাগুলো একদম জলে ভেজা মনে হত। শোওয়া যেত না।

গরম জলের ব্যাগ পায়ের কাছে রেখে চোখ বুজল সবাই। ঘুম আসছিল না টুবাইয়ের। চোখের সামনে ভাসছিল ঠান্ডায় দাঁড়িয়ে থাকা নিরীহ গোরুদের কালো কালো চেহারা। ওদের পায়ের খুর ঠোকার শব্দ ভেসে আসছিল কানে। ওসব ভাবতেই কখন যে গভীর ঘুমে তলিয়ে গিয়েছিল ও। একটু ভোরে দিদির ঠেলাতে ঘুম ভাঙল ওর। আতঙ্কিত হয়ে দিদি ডাকছিল ওকে, “টুবাই ওঠ! বুবুকে বিছানায় দেখছি না। বাথরুমেও নেই। ও গেল কোথায়? তোকে কিছু বলে গেছে?”

চোখ রগড়ে ফাঁকা বিছানাটা দেখে নিয়ে একদৌড়ে টুবাই গেল বাবা আর কাকুদের তাঁবুতে। না, সেখানেও বুবু নেই। খুব আফসোস হচ্ছিল ওর। নিজের অনুভূতিকে ও চেনে। সময় থাকতে কেন যে সাবধান হয়নি। শেষে উদ্ভ্রান্তের মতো কোনও অনুভূতির তোয়াক্কা না করে ও ছুটল লেকের ধারে। ভোরের ঠান্ডা হাওয়াটা গায়ে ফুটছে। তবু শীত করছিল না ওর। বিশাল নীল হ্রদের দিকে তাকিয়ে ভয়ে দম আটকে আসছিল। বুবু গেল কোথায়? এই অচেনা জায়গায় কীভাবে খুঁজবে ওকে? আদৌ পাওয়া যাবে তো?

বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বুবুর নিরুদ্দেশের খবর ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। ওদের তাঁবুর কাছে ভিড় জমাল অন্য টুরিস্টরা। ম্যানেজার বার বার বলছিলেন, “চিন্তা করবেন না। ছেলেমানুষ তো। একা একা অ্যাডভেঞ্চারে গেছে হয়তো। ঠিক ফিরে আসবে। এখানে ভয়ের কিছু নেই।”

কাকিমা আর মা রীতিমতো কাঁদতে শুরু করে দিয়েছেন। দিদির অবস্থাও তথৈবচ। ম্যানেজার তখনও আশ্বস্ত করছিলেন ওঁদের, “আজকের দিনটা আপনারা থাকুন। আমি লোকাল লোকেদের বলেছি। ওরা খুঁজতে শুরু করে দিয়েছে। ওকে ঠিক খুঁজে পাওয়া যাবে।”

ভাবছিল টুবাই, যেমন করে হোক বুবুকে খুঁজে পেতেই হবে। এ-ব্যাপারে একমাত্র যাঁর সাহায্য ও পেতে পারে সেই অরিন্দম সেনকে ইতিমধ্যে ফোন করেছে। লে ডিস্ট্রিক্টের চার্জে আছেন উনি, যা কিছু করণীয় তা নিশ্চয়ই করবেন।

ওর ফোন ধরেই উনি বললেন, “কে, তথাগত? এনি প্রবলেম?”

খুব আশ্চর্য হয়েছিল ও! গলা শুনেই ওকে চিনলেন কী করে? পরে কার্যকারণ ব্যাখ্যা করে বুঝেছে ঘটনাটা এমন কিছু অস্বাভাবিক নয়। এই অঞ্চলে ওঁকে ফোন করার মতো বাঙালি কোথায়? অরিন্দম সেন বলেছিলেন, “কিছু ভি.আই.পি. এসেছেন। আমি একটু ব্যস্ত আছি। আমার এক এফিসিয়েন্ট অফিসারকে পাঠাচ্ছি। ঘটনার সব ডিটেল ওঁকে দিও। আমি শুনে নেব। আশা করছি উনি তোমাদের হেল্প করতে পারবেন।”

সমস্যা অনেকগুলো। বুবুর নিখোঁজ হওয়ার সঙ্গে সেগুলোও জুড়ে গিয়েছে। প্রথমত, ফেরার প্লেনের টিকিট যে অপশনে কাটা, তাতে রিটার্নের সুযোগ নেই। তাছাড়া লে থেকে দিল্লি, দিল্লি থেকে কলকাতার এয়ার টিকিট। অনেকগুলো টাকাই ট্রাভেল না করলে জলে যাবে।

শেষপর্যন্ত ঠিক হল বাবা, মা, দিদি, কাকিমা শিডিউল অনুযায়ী ফিরে যাবে। শুধু ও আর কাকু থাকবে। প্রয়োজন অনুযায়ী যা ব্যবস্থা হল তাতে কাকিমাই সবচেয়ে আপসেট হয়েছেন। ওঁর মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছে না। সারাক্ষণ চোখের জল গড়াচ্ছে। এমনিতেই ঠান্ডা মানুষ। ঘটনাটা জানার পর থেকে চাদর মুড়ি দিয়ে থম মেরে বসে আছেন।

কাকুর মুখে কেউ যেন এক পোঁচ কালি লেপে দিয়েছে। তবু কাকুই সাহস জোগাচ্ছেন সকলকে। বার বার বলছেন, “এইটুকু তো জায়গা! বুবুটা যাবে কোথায়?”

বেলা বাড়ছে। দশটা নাগাদ কাকিমা বাবা, আর দিদিকে রওনা করে দিয়ে নিজেদের তাঁবুতেই বসে ছিল টুবাই। কাকিমা কিছুতেই যেতে চাইছিলেন না। প্রায় জোর করেই ভুলিয়ে ভালিয়ে পাঠানো হল তাকে। সেই ছবিটা বার বার মনে পড়ছিল ওর। কাকু মোবাইলে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছিলেন বন্ধুদের সঙ্গে। এই বিপদে কোনও বড়ো সোর্স যদি পাওয়া যায়। বুবুকে খুঁজে বার করতে হলে সেটা ভীষণ দরকার।

টুবাই ভাবছিল, চারদিকে চড়া রোদ উঠেছে। ওই রোদে বেরিয়ে মিছিমিছি শক্তিক্ষয় করে কোনও লাভ নেই। বুবু যদি নিজে নিজে কোথাও গিয়ে থাকে তবে তাঁবুতেই ফিরবে। আর কেউ কোনও কারণে ওকে কিডন্যাপ করে থাকলে সে নিজেই ওদের সঙ্গে যোগাযোগ করবে। বার বার মনে হচ্ছিল ওর, টাকাপয়সার জন্য কেউ বুবুকে কিডন্যাপ করেনি। অন্য কোনও উদ্দেশ্য আছে। কেননা বেশ কয়েক ঘণ্টা পেরিয়েছে, এখনও কোনও ফোন আসেনি। তাছাড়া খোঁজখবর না নিয়ে এসব লোকেরা এগোয় না। ওদের যা আর্থিক অবস্থা তার জন্য এতটা ঝুঁকি কেউ নিতে চাইবে না।

যত সময় কাটছে ততই অস্থির হচ্ছে ও। অস্থিরতা কাটানোর একটা উপায় ওকে শিখিয়েছিলেন অনীকদা। ক্রিকেটের কোচ ছিলেন উনি। তখন খুব ম্যাচ খেলত ওরা। ম্যাচের আগেরদিন ওর অস্থিরতা বেড়ে যেত খুব। উনি বলতেন, ‘বেশি করে জল খাবে, আর বজ্রাসনে বসে চোখ বুজে মনটাকে ফাঁকা করার চেষ্টা করবে।’

সেভাবেই বসে ছিল ও। তাঁবুর পর্দা সরিয়ে ঘরে ঢুকলেন কাকু আর অরিন্দম সেনের পাঠানো অফিসার। লে শহরের ইনিই ও.সি.। নাম রতন সিং। বিহারের লোক, কিন্তু কলকাতায় বহু পুরুষের বসবাস হওয়ার সুবাদে খুব ভালো বাংলা বলেন। লিখতে-পড়তেও পারেন। ভদ্রলোকের পেটানো চেহারা। লম্বায় ছ’ফুটের কাছাকাছি। বয়স তেমন বেশি নয়, চল্লিশের নীচেই। সাদা পোশাকে ওঁকে একেবারেই পুলিশ মনে হচ্ছে না। কালো চশমার নীচে একজোড়া বুদ্ধিদীপ্ত চোখ। কলেজ বা স্কুলের মাস্টারমশাই হলেই মানাত ভালো। উনি বললেন, “যা মনে হচ্ছে, ও নিজে কোথাও যায়নি। কেউ ওকে ধরেই নিয়ে গেছে। কেননা ও তো জানত আপনারা আজই ফিরবেন লেতে। আচ্ছা, কাউকে সন্দেহ হয়?”

টুবাই ভেবে নেয় একবার। সন্দেহের কথাটা এক্ষুনি ফাঁস করা ঠিক হবে না। ও বলে, “না। তেমন কেউ নেই। তবে আমার একটা কথা জানার ছিল। এখানে বাচ্চা চালানের কোনও র‍্যাকেট আছে নাকি? মানে এর আগে…”

রতন সিং ঘাড় নাড়েন, “না। আসলে ট্যুরিস্ট তো এখানে বেশিদিন আসছে না। রেকর্ডে দেখলাম উনিশশো ছিয়ানব্বই-এ লোকাল এরিয়ায় এরকম একটা ঘটনা ঘটেছিল। তবে সেক্ষেত্রে দুই বাড়ির মধ্যে একটু রেষারেষি ছিল।”

টুবাই স্থির তাকায় ওঁর দিকে। “আচ্ছা, বুবুর নিরুদ্দেশের খবরটা টি.ভি. বা রেডিওতে প্রচার হয়নি তো? আমরা কিন্তু দু-একদিন কথাটা কাউকে জানাতে চাইনি।”

টি.ভি. বা রেডিওতে এটা নিউজে যায়নি। মোবাইলে তোলা ওর যে ছবিটা আপনারা দিয়েছিলেন, পুলিশ স্টেশনগুলোতে সেটা দেখানো হয়েছে। ছোটো এরিয়া, যদি কেউ ওকে দেখতে পায় কোনোভাবে। ইনফর্মারদেরও অ্যালার্ট করা হয়েছে। মনে হচ্ছে কাজ হবে। তবে মুশকিল একটাই। একটা বড়ো মিছিল আছে আগামীকাল। আমাদের একটু ব্যস্ত থাকতে হবে। আপনারা আসার পথে রাস্তার ধারে একটা বড়ো মনাস্ট্রি পেয়েছিলেন তো?”

“হ্যাঁ, প্যানগমে ঢোকার একটু আগে তো? দেখেছি, তবে ভেতরে ঢোকা হয়নি। ক্যাম্পে পৌঁছানোর তাড়া ছিল তখন।”

“ওই মনাস্ট্রি থেকে বেরোবে মিছিলটা। ধর্মীয় শোভাযাত্রা আর কী। শুনছি নতুন কেলসাং লামাকে ওইটাতেই প্রথম জনসমক্ষে আনা হবে। তাই নিরাপত্তার একটু বাড়াবাড়ি থাকবে সে-সময়।”

কথাগুলো শুনছিল টুবাই। তবে ওর মাথায় কিছু ঢুকছিল না। একে অচেনা জায়গা, তার ওপর বুবুকে নিয়ে এরকম একটা দুর্ঘটনা! মাথাটা ঠিক কাজ করছিল না।

রতন সিং বেশিক্ষণ বসলেন না। প্যানগমের ভৌগোলিক অবস্থানের বিষয়ে কিছু আলোচনা হল ওঁর সঙ্গে। লেকটার পূর্বদিকের কুড়ি কিলোমিটারের মতো অংশ চিনের অধীন। যদিও ভারত দাবি করে ওটা ভারতেরই অংশ। পশ্চিমদিকের প্রান্তটি কাশ্মীরে অবস্থিত যার অধিকার নিয়ে পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের বিবাদ লেগেই থাকে। শুধুমাত্র পূর্ব প্রান্তের কিছু অংশ তিব্বতের অন্তর্ভুক্ত। সেখানে মালিকানা নিয়ে কোনও বিরোধ নেই। এইসব ঝুটঝামেলার জন্য লেকে সারাক্ষণ স্পিড বোটে পাহারা চলে। তাছাড়াও হেলিকপ্টারে রুটিন নজরদারি তো আছেই।

লেকে কোনও মাছ নেই। বিরল প্রজাতির অনেক হাঁস, পাখি, লেকের ধারে চরতে আসে। প্যানগম লেকের অসাধারণ সৌন্দর্য প্রতি সিজনেই টেনে নিয়ে আসে অনেক মানুষকে। তাঁবুতে কয়েক হাজার ট্যুরিস্ট সে-সময় রোজ রাত কাটায়। তাঁদের নিরাপত্তার জন্য পুলিশের চৌকিদারি চলে। এমনিতে শান্তিপূর্ণ এলাকা হলেও টুকটাক বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটতেই থাকে। চিন-পাকিস্তানের সঙ্গে লেগে থাকা গোলমালের জন্য লেকে বোটিংয়ের পারমিশন পাওয়া যায় না। এখানকার প্রধান জীবিকা ট্যুরিজম। ট্যুরিস্টদের নিরাপত্তা না দিতে পারলে সেটাই বিপন্ন হবে। তাই বুবুর ব্যাপারে প্রশাসন যথেষ্ট চিন্তিত হয়ে পড়েছে।

রতন সিং চলে যেতেই বুবুর চিন্তা অস্থির করে তুলল টুবাইকে। ও রেডি হয়ে নিল। চুপচাপ তাঁবুতে বসে থাকলে ওর অস্থিরতা কাটবে না। প্রথমে তাঁবুর ভেতরটা ভালো করে দেখার কথা ভাবল, যদি কিছু ক্লু পাওয়া যায়। বুবুর ব্যাগ হাতড়ে তেমন সুবিধে হল না। কেবল নজরে এল, ওর বারণ সত্ত্বেও সত্যজিৎ রায়ের ‘গ্যাংটকে গণ্ডগোল’ আর বিভূতিভূষণের ‘চাঁদের পাহাড়’ বই দুটো ব্যাগে নিয়ে এসেছে ছেলেটা। ও বলেছিল বুবুকে, গল্পের বই না দিয়ে একটা ডায়েরি নিয়ে চল। সবকিছুর নোটস নিতে পারবি। বুবু সে-কথাটা শোনেনি দেখা যাচ্ছে। বাথরুমে বুবুর টাওয়েল ঝুলছিল। শুধু বাড়িতে পরার এক সেট জামাকাপড়, টুপি, জ্যাকেট অদৃশ্য। তার মানে হঠাৎ করে বাড়ির জামাকাপড়েই ও গিয়েছে কোথাও, অথবা যেতে বাধ্য হয়েছে। শেষ চিন্তাটা মিলে যাচ্ছিল পরিবেশ-পরিস্থিতির সঙ্গে। মোটামুটি সবকিছুই দেখা হয়েছে। বাকি ছিল পার্স, হাওয়াই চটি। ব্যাগের মধ্যে বাবার দেওয়া বেড়ানোর পকেটমানি দুশো টাকা সমেত পার্সটা রাখা ছিল। হাওয়াই চটি অদৃশ্য। মোবাইল বুবুর নেই। দেখা যাচ্ছে ঠান্ডার মধ্যে পাজামা-পাঞ্জাবির ওপর জ্যাকেট, টুপি, চাপিয়ে হাওয়াই চটি পরেই কোথাও গিয়েছে ও। পোশাকই সেক্ষেত্রে বলে দিচ্ছে, বেশি দূর যাবার পরিকল্পনা ছিল না। সব মিলিয়ে বুবুর কিডন্যাপের ব্যাপারে মোটামুটি নিশ্চিত হল টুবাই।

শেষে বেশ খানিকটা হতাশ হয়েই তাঁবুর দরজা খুলে বাইরে বেরোল ও। চারপাশে চক্কর মারা দরকার। যদিও লাভ যে তাতে বিশেষ কিছু হবে না, সেটা ভালোই বোঝা যাচ্ছে। ঘটনাটা এমনভাবে ঘটেছে, যে মনে হচ্ছে চারপাশের বিশাল রুক্ষ পাহাড়গুলো যেন হাঁ করে গিলে নিয়েছে বুবুকে। কোথাও কোনও চিহ্ন রাখেনি।

হাঁটতে হাঁটতে প্যানগম লেকের ধারে পৌঁছে গেল ও। আগের দিনের মতোই নীল জল, পরিষ্কার নীল আকাশ। সকালের আলোয় রঙটা একটু সাদাটে দেখালেও একেবারে সাদা নয়। ঢেউগুলো ধীরে ধীরে এসে ছুঁয়ে যাচ্ছে তীরের বালি, মাটি। কোথাও কোনও পরিবর্তন নেই। শুধু অশান্ত ঢেউয়ের মতো তোলপাড় করছে ওর মন। সেখানে একটাই চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে, বুবুকে খুঁজে পাওয়া যাবে তো?

ঘুরে-টুরে তাঁবুতে ফেরার পথে বুটের ধাক্কায় পথের পাথর ছিটকাতে ছিটকাতে চলছিল ও। মন ভীষণ মুষড়ে আছে। বার বার মনে হচ্ছে, এতটা দায়িত্ব ও নিজে না নিলেও পারত। ওই লোকটার ব্যাপারে যে আশঙ্কা ওর মনে জমা হয়েছিল সেটা সবার সঙ্গে প্রথম থেকেই শেয়ার করলে হয়তো এইরকম দুর্বিপাকে পড়তে হত না। কিংবা সবটাই ভবিষ্যৎ ঘটনা ঘটতই। মাঝখান থেকে ও খানিকটা ঠান্ডা তামাশার খোরাক হত। ওর এই শখের গোয়েন্দাগিরির ব্যাপারটা সবাই ঠিক সুনজরে দেখে না তো।

হঠাৎ মাথায় একটা চিন্তা ঝিলিক দিল। রতন সিংকে ওই লোকটার ব্যাপারে সবকিছু বিস্তারিত জানিয়ে দেওয়া দরকার। প্রথমে না বললেও ওঁর কাছে বিষয়টা চেপে যাওয়া ঠিক হচ্ছে না। মোবাইল অন করে রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতেই রতন সিংয়ের নম্বরটা ডায়াল করে ও। এনগেজড আসছে। ফোন করতে গিয়ে সামনের দিকে তাকানো হয়নি। খুব জোর একটা হোঁচট খায় টুবাই। পড়তে পড়তে নিজেকে সামলে নিতে-নিতেই ওর নজর যায় পায়ের দিকে। রাস্তার ধুলোবালিতে কী যেন একটা গেঁথে আছে। দেখে চমকে ওঠে ও। এটা তো বুবুর চটি! বাড়িতে পরার হাওয়াইয়ের একপাটি। এখানে এল কী করে? তন্নতন্ন করে চারপাশটা খুঁজল ও। না, আর একপাটি কোথাও নেই। তার মানে পা থেকে এটা খুলে গিয়েছে। চারপাশটা ভালো করে আর একবার দেখল। যদি অন্য কিছু পাওয়া যায়। না, আর কিছু নেই। দূর থেকে তাঁবুগুলো দেখা যাচ্ছে। দূরত্ব কয়েক গজ হবে।

মনখারাপ হয়ে গেল টুবাইয়ের। ঘটনাপরম্পরা যাই হোক, মনের কোথাও একটা সূক্ষ্ম আশা ঝিলিক মারছিল। হয়তো বুবু নিজের থেকে কোথাও গিয়েছে, আবার ফিরে আসবে। এই কিছুদিন আগেই পুরুলিয়ায় বেড়াতে গিয়ে ও না বলে একা একা হোটেলের পেছনের পাহাড়ে উঠতে গিয়েছিল। খোঁজ পাওয়া যায়নি অনেকক্ষণ। কিন্তু এবারে তো পড়ে থাকা চটি দেখে পরিষ্কার বোঝাই যাচ্ছে কেউ ওকে ধরে নিয়ে গিয়েছে। তাই ধস্তাধস্তির সময় পা থেকে একপাটি চটি খুলে পড়েছে।

তাঁবুতে ফিরে সব ঘটনাগুলো পরস্পর সাজাল টুবাই। দিল্লি থেকে লেতে আসা, প্লেন থেকেই ওই লোকটার অদ্ভুত আচরণ নিয়ে ওর চিন্তা এক মাথা ঘামানো। লে-লাদাখ ভ্রমণ পর্বের মাঝে-মাঝেই লোকটার সঙ্গে হঠাৎ হঠাৎ দেখা হয়ে যাওয়া। এমনকি খারদুংলা পাস হয়ে নুব্রাভ্যালি যাওয়ার পথেও নির্ঘাৎ পতনের হাত থেকে লোকটার অদ্ভুতভাবে বুবুকে রক্ষা করা। এমনিতে ঘটনাগুলো স্বাভাবিক হতেই পারত যদি না ও দেখত সারাক্ষণ লোকটা বুবুর আশেপাশেই ঘুরঘুর করছে। বিনা উদ্দেশ্যে একজন অপরিচিত লোকের পক্ষে এ আচরণ কখনোই স্বাভাবিক নয়। কিন্তু সেই উদ্দেশ্যটা যে কী তা ওর মাথায় কিছুতেই ঢুকছিল না। বুবুর নিরুদ্দেশের সঙ্গে ওই মানুষটার কিছু যোগসূত্র থাকতেই পারে। অন্তত এখন আর সে-কথাটা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

আসলে ও নিজে তো ঠিক গোয়েন্দা নয়। কোনো-কোনো ক্ষেত্রে চুরি, জোচ্চুরি বা ওইধরনের কিছু অসামাজিক কাজকর্ম ওর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। আর ঘটনাস্রোতকে ধাওয়া করে ও অপরাধী পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছে। ওর নিজের মনে হয়েছে সবসময়ই খানিকটা কাকতালীয়ভাবে ও রহস্যের মুখোমুখি হয় আশ্চর্যজনকভাবে তার সমাধানও করে ফেলে। যদিও এক্ষেত্রে ব্যাপারটা ওর ব্যক্তিগত সমস্যার সঙ্গে জড়িত বলেই ও সমাধানের জন্য একটু বেশিই আগ্রহী। কিংবা তাতেই বোধ হয় বিঘ্ন ঘটছে। অপরাধীর মোটিভ বুঝতে পারছে না আর ঠিক সেই জন্যই সমাধানও কিছু করে উঠতে পারছে না। মাঝে-মাঝেই একটা হতাশাও ওকে গ্রাস করছে। বুবুকে কি কোনোভাবেই খুঁজে পাবে না ওরা! এই বিদেশে-বিভূঁইয়ে সত্যি সত্যি হারিয়ে যাবে ছেলেটা? মোবাইলটা বার করল ও। না, এভাবে দায়িত্ব নিয়ে লোকটাকে আড়াল করা উচিত হচ্ছে না। পুলিশ সমাধান করতে পারলে করুক। যেভাবেই হোক বুবুকে ফেরত পেতে হবে। রতন সিংয়ের নম্বরটা আবার ডায়াল করে ও। লোকটার ব্যাপারে ডিটেল ওঁকে এক্ষুনি দিতে হবে তো।

প্যানগমে থেকে কিছুই লাভ হল না। সারাদিনেও বুবুর কোনও খবর পাওয়া গেল না। রতন সিং জানালেন, প্যানগম থেকে রওনা দেওয়া সব গাড়িতেই রীতিমতো তল্লাশি হয়েছে। তবে একদিকে চিন, অন্যদিকে পাকিস্তানের সীমান্ত। এছাড়া তিব্বতের দিকের পার্বত্য পথেও যে-কোনো লোককে অদৃশ্য করে দেওয়া যায়। কাজেই বুবুর সন্ধানের কাজটা খুব সহজ হবে না।

যদিও এ-ব্যাপারে টুবাই একটুও অবাক হয়নি। আসলে সকালে রতন সিংয়ের দেওয়া আশ্বাস ওর একটুও বিশ্বাসযোগ্য লাগেনি তো। বরং ওর খুবই আফসোস হচ্ছে। মনের মধ্যে বুবুকে নিয়ে একটা আশঙ্কা তো ছিলই। তবু এত নিশ্চিন্তে ঘুমোল কী করে? তাঁবুতে নিরাপত্তা তো তেমন কিছু নেই। যে-কেউ ইচ্ছে করলে ঢুকে যেতে পারে। যদিও এক্ষেত্রে মনে হয় তাঁবুর ভেতর থেকে টানা-হ্যাঁচড়া হয়নি। যা ঘটার ঘটেছে তাঁবুর বাইরে। অবশ্য সবটাই অনুমান। উলটোটা ঘটলেও এতটুকু আশ্চর্য হবে না ও। রাতটা যা-হোক করে কাটল। দুজনেই ভালো করে খেতে পারেনি। কেবল বুবুর মুখটা চোখের সামনে ভেসেছে। দুশ্চিন্তায় ঘুম ও হয়নি একফোঁটা।

বেলা আটটায় ঘুম ভাঙল টুবাইয়ের। কাকু তখনও ওঠেনি বিছানা ছেড়ে। আসলে সারারাতের ঘুম ওদের অজান্তেই ভোরবেলা নেমে এসেছিল চোখে। দু-চোখ কখন যে সত্যি-সত্যিই বুজে গেছে। একটা ছেলে ঠিক তখনই এল ওদের চা নিয়ে। সঙ্গে একটা চিরকুট। ওরা যেন তৈরি থাকে।

কান্না পাচ্ছিল টুবাইয়ের। ওই অচেনা জায়গায় বুবুকে রেখে ওদের ফিরে যেতে বাধ্য করা হবে নিজেদের শহরে। তখন যদি বুবুকে ঠিকমতো খোঁজা না হয়? আর কোনোদিন তো ওকে ফিরে পাওয়া যাবে না।

অরিন্দমবাবুকে ফোন করল ও। উনি বললেন, “শোনো, বাস্তব অবস্থাটা তো মেনে নিতে হবে। তুমি তো যথেষ্ট বুদ্ধিমান। বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করো। তোমরা চলে এসো লেতে। আমি সব ব্যাপারটাই দেখছি। যেভাবে সমস্ত পথগুলোতে লোক লাগানো হয়েছে, ওকে নিয়ে ওরা কোথাও পালাতে পারবে না। দু-একদিন সময় লাগলেও তোমার ভাইকে নির্ঘাৎ পাওয়া যাবে। সে ক’দিন তোমাদের আটকে থাকার কোনও মানে হয় না। আমরা চাইছি তোমরা সেফ জোনে থাকো।

অনেক কষ্টে অরিন্দমবাবুকে ও বোঝাল যে আরও ক’দিন না দেখে ওদের পক্ষে কোনোমতেই বাড়ি ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়। একান্ত কিছু না হলে তখন ব্যাপারটা ভাবা যাবে।

কাকুর পরিস্থিতি খুবই খারাপ। কেমন গুম হয়ে আছেন। চোখগুলো লাল। চোখের জল লুকোতে বার বার বাথরুমে যাচ্ছেন। ফেরার পথে জানালার পাশে পেছনের সিটে বসল ও। কাকু ড্রাইভারের পাশে। শুটিং পয়েন্টে একবার দাঁড়াল গাড়ি, কাকু চুপ করে বসে রইলেন গাড়িতে।

দূর থেকে দেখছিল টুবাই। শুটিং পয়েন্ট আর কিছুই নয়, প্যানগম লেকের মাঝখানে চড়া পড়েছে। চড়ার একপ্রান্ত ধারের বালির সঙ্গে, অন্যপ্রান্ত সরু হয়ে মিশেছে লেকে। একপাশে বালির ওপর আড্ডা মারছে অল্পবয়সি কিছু ছেলেমেয়ে। এখানে নাকি অনেক সিনেমার শুটিং হয়। কিছুদিন আগেই আমির খানের ‘থ্রি ইডিয়টস’-এর শুটিং হয়েছিল। একটু দূরে চড়ার ওপর কয়েকটা হাঁস ঘুরে বেড়াচ্ছে। ফট করে গাড়ি থেকে নেমে কয়েক পা হাঁটল ও। হঠাৎ চোখে পড়ল বালির ওপর পেছন ফিরে একটা ছেলে বসে আছে। তাকে দেখতে অনেকটা বুবুর মতো। দ্রুত কাছে গিয়ে দেখল। না, বুবু নয়।

ফেরার পথেই পড়ল মিছিলটা। লম্বায় অনেকখানি হলেও তেমন বেশি লোক নেই। মহিলার সংখ্যা খুব কম। মিছিলের সামনের দিকে রণপা পায়ে বেশ কিছু মানুষ নানারকমের অঙ্গভঙ্গি করে হাঁটছে। তাঁদের ঠিক পেছনেই অনেকটা হাঁড়ির গঠনের বিচিত্র মুখোশ পরে নাচছে কিছু লোক। পেছনে ধীরে ধীরে আসছে একটা গাড়ি। সেই গাড়িতে উঁচু মঞ্চের মতো জায়গায় বসে আছেন সদ্য নির্বাচিত কেলসাং লামা। মঞ্চটা আগাগোড়া রেশমি লাল-হলুদ সিল্ক কাপড়ে মোড়া। সিল্ক কাপড়ের ঘেরাটোপের মধ্যে এক জমকালো সিংহাসনে বসে আছেন ভাবী কেলসাং লামা। সিল্ক কাপড়ে টিপিক্যাল তিব্বতি ফুল-নকশার জমকালো কাজ। নৃত্যরত দলের সঙ্গে বড়ো বড়ো ভেঁপু জাতীয় বাজনা নিয়ে বাজনদারেরাও আছে। আরও অনেক লোক মিছিলে হাঁটছে। সবার পরনে হলুদ আর মেরুন কাজ করা সিল্কের তিব্বতি জোব্বা। কোমরে ঝকঝকে চওড়া বেল্ট। কেলসাং লামাকে তেমন ভালো করে দেখতে পাওয়া গেল না। ওজনদার পোশাকের নীচে তাঁর ছোটোখাটো শরীর চাপা পড়েছে। মিছিলের চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অনেক পুলিশ।

গাইডের কাছে কেলসাং লামা নির্বাচনের গল্পটা দু-একদিন আগেই শুনেছে ও। কেলসাং লামা হলেন তিব্বতের ধর্মগুরু। জাতকের গল্পে আছে, বুদ্ধদেব অনেকবার জন্মগ্রহণ করেন। তেমনি এরা বিশ্বাস করে কেলসাং লামাও মৃত্যুর পরে আবার জন্ম নেন। প্রতি জন্মে তাঁকেই খুঁজে নিয়ে আবার কেলসাং লামার পদে অভিষিক্ত করা হয়। মোটামুটি পদ্ধতি হল এই যে কেলসাং লামার মৃত্যুর পরে মৃতদেহের বিভিন্ন অঙ্গের অবস্থান ইত্যাদি লক্ষ করেন একজন প্রবীণ লামা, যাঁর ভবিষ্যৎ দর্শনের বিশেষ ক্ষমতা আছে। তাঁর নির্দেশ অনুযায়ী নতুন কেলসাং লামার জন্মস্থানের অনুসন্ধান চলে। জন্মান্তরের অবস্থানটি চিহ্নিত হলে, সেখানে গিয়ে শিশুর দর্শন পেলে নানাভাবে তার লক্ষণ পরীক্ষা করা হয়। এমনকি পুরোনো কেলসাং লামার ব্যবহৃত জিনিস সে সনাক্ত করতে পারে কি না তাও পরীক্ষা নেওয়া হয়। সবকিছু ঠিকঠাক মিলে গেলে তখন সেই শিশুটিকে তাঁর পরিবারের কাছ থেকে নিয়ে এসে বিশেষ ধরনের শিক্ষায় শিক্ষিত করা হয়। সেক্ষেত্রে আবার একটি বিশেষ নিয়ম মানা হয়। কোনও কেলসাং লামার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে বা তাঁর কিছুদিন পর জন্ম নিয়েছে এমন শিশুকে কখনোই কেলসাং লামা হিসেবে নির্বাচিত করা হয় না। যথাসময়ে কেলসাং লামার পদে ওই চিহ্নিত বিশেষ শিশুটিকে অভিষিক্ত করা হয়। ধর্মীয় পদ্ধতিটি প্রাচীন, আর বহুদিন ধরেই নিষ্ঠা ও বিশ্বাসের সঙ্গে সেটি পালন করা হচ্ছে।

মিছিলের জন্য একপাশে দাঁড়িয়ে ছিল টুবাইদের গাড়ি। ক্যামেরার জুম ঠিকঠাক করে নিয়ে খানকতক ছবি নিল ও। যদিও ছবি তোলার মেজাজ তেমন ছিল না। আসলে খুবই মনখারাপ হচ্ছিল টুবাইয়ের। এর আগেও সবাই মিলে অনেক জায়গায় বেড়াতে গিয়েছে। এমন দুর্বিপাকে কখনও পড়েনি। পথে পড়ল বরফের সেই বিশাল প্রান্তর। প্যানগমে আসার সময় সব গাড়িগুলো সার দিয়ে ওই স্পটে দাঁড়িয়েছিল। প্রাণভরে বরফ নিয়ে খেলেছিল ওরা তিন ভাইবোন। এই ক্যামেরাতেই তখন অনেক ছবি তুলেছিল কাকু। ভাবছিল টুবাই, ঘটনার পরিবর্তন হয়, কিন্তু স্মৃতি থাকে অপরিবর্তিত।

হোটেলে ফিরে গরমজলে স্নান সেরে কফি খাওয়া হল। হোটেলের ম্যানেজার-স্টাফেরাও ওদের ঘটনায় বেশ চিন্তিত হয়ে পড়েছেন। আসলে আজ ভোরেই নির্ধারিত প্লেনে রওনা দিয়েছেন বাবা, মা, কাকিমা। দিদিও ওদের সঙ্গেই গিয়েছে। তাদের মনের অবস্থাও বিশেষ ভালো ছিল না।

কাকু অরিন্দমবাবুকে বলেছেন আরও কয়েকটা দিন হোটেলেই থাকতে হবে। বুবুর কোনও খোঁজ একান্তই না পাওয়া গেলে সপ্তাহ খানেক বাদে ওঁরা দিল্লি রওনা দেবেন।

মন খুব খারাপ, চোখের ওপর হাতচাপা দিয়ে শুয়ে ছিল টুবাই। কাকু হোটেলের টিভিটা অন করে খবর দেখছিলেন। এখন নিরুদ্দেশের তালিকায় বুবুর ছবি টিভিতে দেখানোর অনুমতি মিলেছে। ওরা বার বার করে দেখাচ্ছে ছবিটা। বাবা ফোন করেছিলেন। ওরাও নিরাপদে বাড়ি পৌঁছেছেন। তবে একটা ছোট্ট ঝামেলা হয়েছে। কাকিমা খাচ্ছিলেন না, কাঁদতে কাঁদতে বার বার ফিট হয়ে যাচ্ছিলেন। তাই হাউস ফিজিসিয়ানের পরামর্শ মতো তাঁকে নার্সিং-হোমে ভর্তি করে হয়েছে। বাবা আরও জানালেন, টিভির কল্যাণে বুবুর খবর জানতে পারায় আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীরা বাড়িতে ঘন ঘন ফোন করছেন। টুবাই ভাবল, বিরক্তি লাগলেও এ-ব্যাপারে কাউকে দোষ দেওয়া যায় না। এরকম একটা অদ্ভুত খবরে সবাই উদ্বিগ্ন হতেই পারে।

ওর নিজের মনও খুব বিষণ্ণ হয়ে আছে। এর আগে যখন যা সমস্যা হয়েছে একটা সমাধানের রাস্তা ঠিকই মিলেছে। এই প্রথমবার ও একদম বোকা বনল। প্রায় চোখের সামনে থেকেই বুবু নিখোঁজ হল। অথচ সমাধান তো দূরের কথা, সামান্য একটু আন্দাজও করতে পারছে না। খবর দেখার পর কাকু ঘরের লাগোয়া ছাদে পায়চারি করতে বেরিয়ে গেলেন। ফাঁকা ঘরে নিজেকে চাঙ্গা করতেই ক্যামেরাটা নিয়ে বসল টুবাই।

লেতে আসার পর থেকেই অনেকগুলো ছবি তুলেছে ও। এক এক করে দেখছিল সেগুলো। বেশিরভাগ ছবিতে বুবু আছে। বুবুর ছবি দেখে মন ভীষণ খারাপ হয়ে যাচ্ছে। কখনও বুবু পাহাড়ে উঠছে। কখনও বরফ নিয়ে খেলছে। প্যানগম লেকের ধারেই দিদির সঙ্গে মা, কাকিমা আর বুবুর একটা গ্রুপ ছবি তুলেছিল ও। সেটাই আপাতত বুবুর শেষ ছবি। ওই ছবিটা দেখার পর আর ছবি দেখার ইচ্ছে হচ্ছিল না ওর। কিন্তু পরের ছবিগুলো মোটেই দেখা হয়নি। ঠান্ডায় ছাদহীন খোলা ঘরে দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড়ি গোরুগুলোর ছবি, মিছিলের ছবি। একটু দূর থেকে হলেও সব ছবিগুলোই মোটামুটি স্পষ্ট। বিশেষ একটা ছবি জুম করে বড়ো করতেই চমকে উঠল। কেলসাং লামার মিছিলে কে ওটা? ছবিটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বার বার দেখছিল টুবাই। ওই তো সেই লোকটা! গাড়ির ঠিক পাশেই হেঁটে চলেছে।

কাকু যখন ঘরে ঢুকলেন তখন টুবাই ফোন করছে অরিন্দম সেনকে। “হ্যাঁ, ঠিক আছে। সকাল আটটায় আমরা রেডি থাকব।”

কাকু অবাক হয়ে ওর দিকে তাকাতেই ও বলে, “কোনও প্রশ্ন কোরো না। যা বলছি শোনো। আজ রাতে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়তে হবে। কাল সকালে শার্প আটটায় আমাদের দুজনকেই বেরোতে হবে। হ্যাঁ, গাড়ি আসবে আর অরিন্দম সেনও থাকবেন গাড়িতে।”

***

আবার একটা সুন্দর ভোর। দিল্লি রওনা দিচ্ছে প্লেনটা। সামনের দিকে করিডরের পাশে জানালার সিটটায় বসে ছিল বুবু। পাশে টুবাই। ওদের পেছনের সিটটায় কাকু। দূরের পাহাড়গুলো তেমনি খাড়া দাঁড়িয়ে। এবার ওদের ছেড়ে যেতে হবে। একটু একটু মনখারাপ লাগছিল টুবাইয়ের। ঝামেলা-ঝঞ্ঝাট সত্ত্বেও লে ভ্রমণটা বেশ এনজয় করা গেছে তো।

প্যাসেজের ঠিক ও-পাশের সিট দুটোয় বসে ছিলেন সস্ত্রীক অরিন্দম সেন। একটু আগেই টুবাইদের ওঁদের কলকাতার বাড়িতে ডিনারে নেমন্তন্ন করেছেন উনি। কলকাতায় পৌঁছানোর পর ডেট ফাইনাল করবেন।

প্লেনের জানালার কাচে মুখ ঠেকিয়ে বাইরের মেঘ-পাহাড়ের ছবি দেখছিল বুবু। টুবাই বসে বসে ভাবছিল, এবারও ভারি অদ্ভুতভাবে বুবুর অন্তর্ধান রহস্যের সমাধান করেছে সে। ঘটনাকে খানিকটা কাকতালীয়ই বলা যায়। সেদিন রাতে ক্যামেরা নিয়ে না বসলে আজ বুবু সমেত ওরা কলকাতায় ফিরতে পারত কি?

সেদিন ছবি দেখতে দেখতে মিছিলের ছবিটায় এসে থমকে গিয়েছিল ও। ছবিটা জুম করতেই স্পষ্ট দেখেছিল সেই লোকটাকে। যেন পাহারার ভঙ্গিতে গাড়ির পাশে পাশে হেঁটে অলেছে। তারপরেই ভারি অদ্ভুত একটা জিনিস খেয়াল করে ও। ছোট্ট কেলসাং লামার মুখটা ভীষণ চেনা। এই ব্যাপারটা মনাস্ট্রিতে কিশোর কেলসাং লামার ছবি দেখার সময়ও ঘটেছিল। তবে তখন ও অতটা মাথা দেয়নি।

কেলসাং লামার মুখ ছবিতে স্পষ্ট হতেই বিদ্যুৎ ঝলকের মতো ওর মাথায় বুবুর মুখ ভেসে ওঠে। একদম এক মুখ। এমনকি বাঁ-কপালে বুবুর মতোই একটা কালো আঁচিল আছে। একটু অবাক হতেই ও ব্যাগ খুলে ‘শে’ মনাস্ট্রিতে কেনা রঙিন ছবিগুলো বার করে। একটা ছোটো কেলসাং লামার ছবি ছিল। তখনই পার্থক্যটা পরিষ্কার হয়। না, ওই কেলসাং লামার কপালে তো কোনও আঁচিল নেই। সঙ্গে সঙ্গে অরিন্দম সেনকে ফোন করে ওর সন্দেহের কথাটা জানায় টুবাই।

কাকু আর ওকে সঙ্গে নিয়েই ওই মনাস্ট্রিতে গিয়ে বুবুকে উদ্ধার করেন উনি। ওখানকার লামারা এ-বিষয়ে একদম অন্ধকারে ছিলেন। কিছুই জানতেন না। অরিন্দম সেনের মতো পদস্থ অফিসার সঙ্গে না থাকলে কী হত বলা খুবই মুশকিল। ভাবী কেলসাং লামাকেও উদ্ধার করা হয় মনাস্ট্রির একটি তালা মারা ঘর থেকে।

সম্পূর্ণ ঘটনাটার পেছনে ছিল সেই লোকটা। অনেকদিন ধরেই এই কেলসাং লামাকে অপহরণ করে বিদেশে পাঠিয়ে দেবার ছক কষছিল ও। একবার অন্য দেশে পাঠাতে পারলেই মোটা টাকার মুক্তিপণ দাবি করত। ওর অনুচররা মনাস্ট্রির কিছু কর্মচারীকে টাকা খাইয়ে হাত করেছিল। জেরায় সবই কবুল করেছে লোকটা।

কেলসাং লামাকে কিডন্যাপ করা তো সোজা ব্যাপার নয়। তাকে বিদেশে পাঠাতে গেলেও বেশ কিছুটা সময় লাগবে। ইতিমধ্যে কেলসাং লামার খোঁজ শুরু গেলে সব কাজ পণ্ড হয়ে যাবে। হয়তো কোনোভাবেই ব্যাপারটা সামলানো যাবে না। তাই সেই সময়ের জন্য এক ডামি কেলসাং লামার প্রয়োজন হয়ে পড়ে। দিল্লি থেকে লে আসার প্লেনে হঠাৎ ওর নজর পড়ে বুবুর ওপর। দুজনের মুখ একদমই এক। শুধু বুবু অত ফর্সা নয়। এমনিতে চাপা নাক-চোখের জন্য পাড়ায় অনেকেই বুবুকে ‘পাহাড়ি’ বলে খ্যাপায়।

তখন মিছিলের প্রস্তুতি চলছে মনাস্ট্রিতে। পোশাক-আশাক, বাজনা, নাচ ইত্যাদি নিয়ে ব্যস্ত সবাই। সেই হট্টগোলের মেজাজটাকেই কাজে লাগিয়েছিল ওরা। খুব সতর্কভাবেই সব কাজ সারতে চেয়েছিল ও আর ওর দলের লোকেরা। নেহাত ভাগ্যদোষেই, টুবাইয়ের হস্তক্ষেপে সবটা এলোমেলো হয়ে গেল। ওর আর ওইসব সাঙ্গোপাঙ্গোদের আপাতত কয়েদখানায় ঠাঁই হয়েছে। কেস আদালতে উঠলে নির্ঘাৎ কয়েক বছর ঘানি টানবে ওরা।

বুবুকে জিজ্ঞেস করেছিল টুবাই, “ক্যাম্প থেকে তুই উধাও হলি কী করে?”

বুবু বলল, আগেরদিন রাতে ডাইনিং হলে মুখ ধোবার সময় লোকটা ওকে বলেছিল, ভোর ছ’টা নাগাদ হ্রদের ধারে গেলে বিরল প্রজাতির হাঁস আর পাখি দেখতে পাওয়া যাবে। তবে কথাটা আর কাউকে বলা যাবে না। একগাদা লোক জড়ো হলে হাঁসেরা একদম আসবে না। হাঁস দেখার লোভে বুবু কাউকে কিছু না জানিয়েই যাচ্ছিল লেকের দিকে। পথে জোর করে ওকে গাড়িতে তুলে নেয় ওরা। তারপরের ব্যাপারটা ওর কিছুই মনে নেই।

টুবাই সহজেই বোঝে অপহরণের পর কোনও ওষুধ খাইয়ে বুবুকে আচ্ছন্ন করা হয়েছিল। মিছিলের দিন সকালেই প্ল্যানমাফিক আসলের জায়গায় নকল কেলসাং লামাকে বসিয়েছিল ওরা। হই-হট্টগোল আর পূজা সংক্রান্ত বিভিন্ন কর্মব্যস্ততায় লামারা ব্যাপারটা ধরতেই পারেনি। ভেবেছিল কিশোর কেলসাং লামাটি বুঝি মঞ্চে বসে থাকতে থাকতে ঝিমোচ্ছে।

অরিন্দম সেন জানালেন, ওদের পরিকল্পনামতো ধর্মীয় মিছিলের এক-দু’দিনের মধ্যেই আসল কেলসাং লামাকে বিদেশে চালান করা হত। বুবুকে নিয়ে তখন ওরা কী করত সে-কথা ভেবেই চমকে উঠেছিল টুবাই। আসলে নকল কেলসাং লামাকে টিকিয়ে রাখলে ওদের বিপদ বাড়ত বৈ কমত না তো। সেক্ষেত্রে বুবু যে মারাত্মক বিপদে পড়ত সে ব্যাপারে কোনও সন্দেহ নেই।

উনি আরও জানালেন, ওই লোকটাকে অনেকদিন ধরেই খুঁজছেন ওরা। চেহারা পালটে, পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন জায়গায় একই কাজ করে চলেছে ও। লোকটার আসল নাম বিক্রমজিৎ সিং। ওর কাজই এইধরনের অপহরণ, চোরাচালান। ভয়ংকর ধরনের অপরাধী, আর এক বিখ্যাত চোরাচালানকারী গ্যাং-এর পান্ডাও বটে। দেশে-বিদেশে ওর দলের লোকেরা ছড়িয়ে আছে। এই কাজটা করে টুবাই দেশের অনেক উপকার করেছে। পুলিশমহল থেকে তাই ওর নাম সাহসিকতার পুরস্কারের জন্য সরকারের কাছে রেকমেন্ড করা হয়েছে। তবে উনি এবার থেকে টুবাইকে একটু সাবধানে থাকতে বলেছেন। আর দরকার হলেই ওঁকে ফোন করলে উনি যে-কোনোরকম সাহায্যের আশ্বাস দিয়েছেন।

এয়ারপোর্টে চুপচাপ থাকলেও বাড়িতে ঢুকেই বাবা বেশ মোটা অঙ্কের চেক তুলে দিলেন ওর হাতে। গোয়েন্দাগিরির পুরস্কার। টুবাই অবাক হল শুনে, মায়ের নির্দেশেই নাকি বাবা এই চেকটা দিচ্ছেন। গোয়েন্দাদের তো অনেক সরঞ্জাম লাগে। সে-সব কেনার জন্যই নাকি ওই চেকটা দিলেন ওঁরা। অরিন্দম সেনের সাবধান বাণীটা বেমালুম চেপে গেল টুবাই। ওটা শুনলে মায়ের প্রতিক্রিয়াটা নির্ঘাৎ বিপরীত হত।

লে থেকে ফেরার আগে ওই মনাস্ট্রির লামারাও আসল কেলসাং লামাকে ফেরত পেয়ে বার বার ধন্যবাদ জানিয়েছেন টুবাইকে। মনাস্ট্রির শিশু লামাদের হাতে বানানো সিল্কের কারুকার্য করা চাদর উপহার হিসেবে তুলে দিয়েছেন ওর হাতে। ওই চাদর বাড়িতে রাখলে নাকি গৃহস্থের মঙ্গল হয়। তাই আপাতত চাদরটা মায়ের আলমারিতে ঢুকেছে।

এই অনুসন্ধান পর্বটা চারদিকে বেশ ভালোই শোরগোল তুলেছে দেখা গেল। কয়েকদিনের মধ্যেই পাড়ার সবুজ সংঘের ছেলেরা একটা ছোটোখাটো অনুষ্ঠান করে ওকে সংবর্ধনা জানাল।

সবচেয়ে বড়ো পুরস্কার ও পেল যেদিন স্কুলে হেডস্যার নিজের ঘরে ডেকে ওর হাতে একটা বড়োসড়ো প্যাকেট তুলে দিলেন। প্যাকেটটা খুলে ও দেখল অনেকগুলো ভালো ভালো বই। আর ব্যোমকেশ সমগ্রের প্রথম পাতাতেই লেখা, আমাদের প্রিয় গোয়েন্দা তথাগতকে অনেক শুভেচ্ছা, বিদ্যালয়ের সমস্ত শিক্ষক, কর্মচারী ও ছাত্রবৃন্দর পক্ষ থেকে।

আগের চেয়েও খারাপ হয়েছে বুবুর অবস্থা। মোটেই সুবিধেতে নেই সে। কী রং ওরা লাগিয়েছিল কে জানে, লে থেকে তাড়াহুড়ো করে ফেরার পর ধবধবে ফর্সা নকল কেলসাং লামাকে নারকেল তেল ঘষে ঘষে বেশ পরিশ্রম করেই পরিষ্কার করলেন কাকিমা। এখন সে আবার পুরোনো চেহারায় ফিরে এসেছে। পাড়ায়, আত্মীয়স্বজন মহলে, স্কুলে, সব জায়গাতেই সে বিখ্যাত এখন। না বলে অচেনা লোকের কথা শুনে তাঁবু থেকে বেরোনোর জন্য কাকু অবশ্য প্রচণ্ড বকেছেন ওকে।

স্কুলের দেওয়া ব্যোমকেশ সমগ্রের পাতা খুলে একদিন ওলটাচ্ছিল টুবাই। বুবু কাঁচুমাচু মুখে এসে বসল পাশে। সম্পূর্ণ ঘটনাটা ঘটে যাবার পর একমাত্র টুবাই-ই একটুও বকেনি ওকে। সেদিন ও স্বাভাবিকভাবেই জানতে চায় কী হয়েছে।

“হ্যাঁ রে দাদা, ভাবী কেলসাং লামাকে কি স্কুলে পড়তে হয় না?”

“না। তবে ওঁদের তো মনাস্ট্রিতেই বিশেষভাবে শিক্ষা দেওয়া হয়।”

“বাবা-মার কাছেও থাকতে হয় না তো?”

“হঠাৎ এইসব জিজ্ঞেস করছিস কেন?”

বুবু মাথা নামিয়ে আবার হাসে। “এমনি।”

“মোটেই এমনি নয়। ব্যাপার কী বল তো?”

“না, ভাবছিলুম আর কী, তুমি আমায় উদ্ধার না করলে হয়তো সারাজীবন ওখানেই থাকতে হত। বেশ হত তাহলে।”

“তোর কি মাথা খারাপ? ওই শয়তানটা তো আসল কেলসাং লামার জন্য মুক্তিপণ আদায় করবে বলেই তোকে নকল কেলসাং লামা সাজিয়েছিল।”

“ধরো ও কোনও কারণে ফেলিওর হলে তখন তো আমাকেই…”

“কী, বলছিস কী?” টুবাই ভয়ংকর অবাক হয়ে তাকায় ওর দিকে।

“না, ওই আর কী। এখানে তো দিনরাত বকুনি খেতে খেতে প্রাণ যায়। নকল কেলসাং লামা হওয়া কিন্তু এর চেয়ে ঢের ভালো।”

টুবাই আদর করে ওকে কাছে টেনে নেয়। একটু হেসে বলে, “না রে, কোনও নকলই আসলের মতো ভালো হয় না।”

[সম্পূর্ণ ঘটনাটি কাল্পনিক। সত্য মিথ্যা অনেকরকম তথ্যই শুধুমাত্র কাহিনি রচনার প্রয়োজনে ব্যবহার করা হয়েছে।]

জয়ঢাকের গল্পঘর

2 thoughts on “বড়োগল্প-প্যানগমে প্যানিক- সর্বাণী বন্দ্যোপাধ্যায়-বসন্ত ২০২২

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s