টাইম মেশিন-লোম্যান হত্যাকাণ্ড-কৃষ্ণেন্দু দেব -শীত ২০২৫

আগের লেখাভূবনডাঙার ভূত  অছু সাহেবের বিষয় আশয়, শিক্ষাব্রতী বিদ্যাসাগর, আহত ঈশ্বর, স্বাধীনতার তিন অধ্যায়, আন্দামানে ভাইসরয় নিধন, স্বাধীনতার তিন অধ্যায়

বিভি মানে বেঙ্গল ভলেন্টিয়ার্স-এর বিপ্লবীদের কাছে খবর বাংলার গভর্নর স্যার হিউ ল্যান্সডাউন স্টিফেনসন ২৫ আগস্ট (১৯৩০) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কনভোকেশনে উপস্থিত থাকবে। দলের নেতারা ঠিক করলেন এই সুযোগেই লোকটাকে নিকেশ করা হবে। এটাই হবে বিভি-র প্রথম বড় অ্যাকশন। অস্ত্র এবং অন্যান্য রসদ সরবরাহ করা হবে কলকাতা থেকে আর কাজটা করবেন দলের অত্যন্ত আস্থাভাজন বিনয়কৃষ্ণ বসু। বিনয়ের জন্ম ১৯০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ঢাকার রাউতভোগে। ছোটো থেকেই তিনি দারুণ মেধাবী।

বিনয় এখন ঢাকার মিডফোর্ড স্কুলে ডাক্তারি পড়ছেন, ফোর্থ ক্লাসের ছাত্র তিনি। ক’দিনের জন্য কলকাতায় গিয়েছেন জ্যাঠতুতো দাদা রাখালকৃষ্ণ বসুর বাড়িতে। দলের দাদাদের ডাক পেয়ে উনি ২৪ আগস্ট (১৯৩০) সকালেই ঢাকায় ফিরে এলেন। উঠলেন নিজের মেসে। সুপতি রায়চৌধুরী ক’দিন আগেও কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে বিনয়ের সঙ্গেই থাকতেন। এখন চলে গেছেন অন্য মেসে। সকালেই সুপতি এলেন বিনয়ের সঙ্গে দেখা করতে।

“বিনয়, তুমি কাল সকালে দীনেশের মেসে চলে যেও। অনিমেষ ওখানেই রিভলভার নিয়ে আসবে।”

“স্টিফেনসনকে নাগালের মধ্যে পাওয়া যাবে তো?”

“সেটা বলা কঠিন। পুলিশ খুব তৎপর। শুনলাম হাডসন তার বিশাল বাহিনী আর অ্যালসেশিয়ান কুকুর নিয়ে গভর্নরের নিরাপত্তা দেখভাল করছে। দেখা যাক কী হয়।”

২৫ তারিখ কনভোকেশনের দিন অনেক চেষ্টা করেও বিনয় স্টিফেনসনের ধারেকাছে পৌঁছতে পারলেন না। সেই রাতেই সুপতি আবার এলেন বিনয়ের মেসে।

 “এ যাত্রায় গভর্নরের নাগাল পাওয়া অসম্ভব। তাই প্ল্যান বদলানো হয়েছে। আমাদের টার্গেট এখন বাংলার আইজি লোম্যান।”

“লোকটা কবে কোথায় থাকবে, সেসব কিছু জানা গেছে?”

“চিন্তা কোরো না, আমাদের ছেলেরা শিগগিরই সব জোগাড় করে ফেলবে।”

২৯ আগস্ট, ১৯৩০। আগেরদিনই রিভার পুলিশের বড়োকর্তা বার্ট মৃগীতে আক্রান্ত হয়ে মিডফোর্ড হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। সকালবেলাই একটা কাজ সেরে হাডসনকে সঙ্গে নিয়ে লোম্যান তাই হাজির হলো তাকে দেখতে। বিনয়ের সেদিন হাসপাতালে ডিউটি। সকাল সাড়ে আটটায় রোলকলের সময় নিজের হাজিরা দিয়েই উনি চলে গেলেন অনিমেষ রায়ের বাড়ি। একটু বাদেই পাঁচটা বুলেট ভর্তি একটা রিভলভার সঙ্গে নিয়ে আবার ফিরে এলেন হাসপাতালে। মেসের রুমমেট গোপাল এতক্ষণ ইউরোপিয়ান ওয়ার্ডের দিকে নজর রাখছিলেন। তাঁর কাছেই বিনয় জানতে পারলেন যে একটু আগেই লোম্যান হাডসনকে সঙ্গে নিয়ে ভিতরে ঢুকেছে বার্টকে দেখতে। বিনয় চুপচাপ গিয়ে দাঁড়ালেন গাড়িবারান্দার কাছে।

একটু বাদেই লোম্যান নেমে এল, সঙ্গে আরও অনেক লোকজন। কথা বলতে বলতেই লোকটা উঠে পড়ল গাড়িতে। সেই কথা শুনে বিনয় জানতে পারলেন যে লোম্যান এখন হাসপাতালের ইস্টার্ন গেটে সিভিল সার্জেন বমফোর্ডের সঙ্গে দেখা করতে যাবে। ওদের গাড়ি চলতে শুরু করল। বিনয় আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করলেন না। হাসপাতালের ভিতর দিয়েই শর্টকাটে খুব দ্রুত পৌঁছে গেলেন ওই ইস্টার্ন গেটে। দেখলেন বমফোর্ড তার গাড়িবারান্দার সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসছে। গাড়ি থেকে নেমে লোম্যান আর হাডসন এগিয়ে যাচ্ছে তার দিকেই।

 বিনয় এবার নিজের আঙুল রাখলেন রিভলভারের ট্রিগারে। কাছাকাছি বিশেষ কেউ নেই। এটাই সুবর্ণ সুযোগ। বিনয় দ্রুত এগিয়ে গেলেন সাহেবগুলোর দিকে। তারপর ফুট পঞ্চাশ দূর থেকে পরপর দুটো গুলি ছুঁড়লেন লোম্যানের বুক লক্ষ্য করে, তারপর হাডসনের দিকে পরপর তিনটে গুলি। ওরা দুজনেই মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। দৌড় লাগালেন বিনয়। এই সময় কোথা থেকে সাহেবদের তাঁবেদার সত্যেন্দ্র সেন নামের এক কন্ট্রাকটার এসে জাপটে ধরল বিনয়কে। বিনয় অবশ্য দমলেন না। কুস্তির এক প্যাঁচে লোকটাকে কুপোকাত করলেন। কিন্তু ধস্তাধস্তির সময় হাতের রিভলভারটা পড়ে গেল ড্রেনে। ইতিমধ্যে কয়েকটা লোক তাঁকে ধরতে ছুটে আসছে। বিনয় তাই নিজের নতুন স্যান্ডেলজোড়া খুলে রেখেই দৌড় দিলেন।

যারা ছুটে আসছিল তারা বিনয়ের পিছু নিয়েছে। ওদের ভাগাতে না পারলে খুব মুশকিল। বিনয় তাই হঠাৎ একবার পিছন ঘুরে হাতের আঙুল মুড়ে বন্দুকের মতো করে ওদের দিকে তাক করলেন। লোকগুলো প্রাণভয়ে এবার উল্টোদিকে ছুটে পালাল। এই সুযোগে বিনয় লাফিয়ে উঠে পড়লেন মেসের কলঘরের ছাদে। সেখান থেকে নামলেন পাশের বাড়িতে। সেই বাড়ির সদর দরজা খোলাই ছিল। সেখান দিয়ে ছুটে বেরিয়ে গিয়ে পড়লেন আর্মেনিয়ান চার্চের সামনের গলিতে। ওখান থেকে এলেন আর্মানিটোলার ময়দানে। এবার যেন কিছুই হয়নি এরকম একটা ভঙ্গিতে ধীর লয়ে হাঁটতে শুরু করলেন। তারপর একটা টাঙা ভাড়া করে পৌঁছে গেলেন বক্সিবাজার, বন্ধু ও সহকর্মী মণি সেনের বাড়ি।

ওদিকে লোম্যান আর হাডসন, দুজনকেই ভর্তি করা হয়েছে হাসপাতালে। দুজনের অবস্থাই আশঙ্কাজনক। পুলিশ হামলাকারীকে ধরার জন্য উঠেপড়ে লাগল। মেসের দু’জন পালাবার সময় বিনয়কে চিনে ফেলেছে। তাই হামলাকারীর নাম জানতে পুলিশের অসুবিধা হলো না। ঢাকার বাড়িতে বাড়িতে পুলিশ খানাতল্লাশি চালাল। বিশেষ করে মিডফোর্ড হাসপাতালের মেসগুলোতে চলল অকথ্য পুলিশি তাণ্ডব। ৫১জন ডাক্তারি পড়ুয়াকে গুরুতর আহত অবস্থায় ভর্তি করা হলো হাসপাতালে। বেণু পত্রিকার অফিস পুলিশ একেবারে তছনছ করে দিল। নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হলো বেণুকে। বিনয়কে ধরার জন্য নানা জায়গায় টাঙিয়ে দেওয়া হলো ওঁর ছবি। যে ধরিয়ে দেবে সে পাবে পাঁচ হাজার টাকা পুরস্কার।

দুদিন বাদে যমে-মানুষে অনেক টানাটানির পর লোম্যান চোখ বুজল চিরতরে। তবে হাডসনের জান কড়া। তিনখানা গুলি খেয়েও সে আস্তে আস্তে সুস্থ হয়ে উঠল। আর ওদিকে বিনয় বসু কলকাতা হয়ে পৌঁছে নিরাপদে শেল্টার নিলেন মেটিয়াবুরুজে বিপ্লবী রাজেন গুহর বাড়িতে।

স্বাধীনতার লড়াইয়ের এমনই সমস্ত বীর যোদ্ধাদের নিয়ে জয়ঢাকের এই বইগুলো প্রকাশিত হয়েছে। জয়ঢাক প্রকাশন থেকে বইগুলো সংগ্রহ করতে নীচের লিঙ্কে ক্লিক করতে পারেন।

 

Leave a Reply