বনের ডায়েরি-পাখি দেখা-পানডুবি -অলোক গাঙ্গুলী-শরৎ ২০২৩

আগের পর্ব ধনেশ, মাছরাঙা, মুনিয়া, কাজল পাখি , দোয়েল-কোকিল-ময়নাবুলবুল, বকপাখি, মোনাল দেখার গল্প,পাঁচ বউয়ের কাহিনি, ঘুঘুর বাসা, টুনটুনি,বাঁশপাতি, মোহনচূড়া , হাট্টিমাটিমটিম থেকে হটিটি, রামগাংড়া, ডাহুক কেন ডাকে, বাদামি কোকিল, পাপিয়া, পাতি জলমুরগি, প্যাঁচা

স্থান পূর্ব বর্ধমান জেলার পূর্বস্থলি। এক বিশালাকার জলাশয়, গঙ্গার সাথে যুক্ত, সম্পূর্ণ দুষণ মুক্ত এক জলাভুমি। পাখিদের মুক্ত বিচরণক্ষেত্র। বলা হয় কেবল শীতকালে এখানে কমকরে ৭০ প্রজাতির পাখির আগমন হয়ে থাকে। কিছু স্থায়ী বাসিন্দা সবসময়ই পাওয়া যায়, যেমন বক, ফিঙে, জলপিপি ইত্যাদি। বহু বছরের অপেক্ষার পর গত ২০২২ সালের ডিসেম্বর মাসে হটাৎ করে সুযোগ এসে গেলো। ভোর বেলায় আমার কল্যাণীর বাড়ির থেকে বেরিয়ে সকাল-সকাল এসে পৌঁছলাম চুপির চরে। লিখতে ভুলে গিয়েছিলাম, পূর্বস্থলির এই পাখিরালয় পক্ষি প্রেমিকদের কাছে চুপির চর নামে বিখ্যাত। শান্ত, নির্মল প্রকৃতির মধ্যে বিরজমান এই পাখিরালয় কেবল মাত্র পক্ষিপ্রেমিকদের জন্য নয়, যেকোনো মানুষকে আকৃষ্ট করতে বাধ্য। এখানে লাউড স্পিকারে গান চালান, আতসবাজি ফাটান অথবা চড়ুইভাতি পুরোপুরি নিষিদ্ধ এবং এর অমান্য শাস্তিসাপেক্ষ। কতদিন এই নিয়ম টিকে থাকবে জানা নেই। তবে যতদিন মানুষ প্রকৃতির নিয়ম মেনে চলে তাদের নিজেদের মঙ্গল। পশুপাখিদের জন্য বরাদ্দ স্থান আমরা কেড়ে নিতে পারি না আমাদের ফুর্তির জন্য।

এই শান্ত পরিবেশে নৌকায় ভ্রমণ আর সাথে পাখিদের কিচির-মিচির এক অন্য মাত্রা জুড়ে দেয়। জানা গেছে এখানে প্রায় ৮৫টি নৌকা রয়েছে এবং চারজন যাত্রি জন্য ঘন্টাপ্রতি `১৫০/- ভাড়া।

চুপির চরের এই দীর্ঘকায় জলাশয় গঙ্গার সাথে সরাসরি যুক্ত। নৌকায় কিছু দূর যাওয়ার পর একটা সরু খাঁড়ি পড়ে, তার দুদিকে উঁচু ঘাস, প্রায় মানুষ সমান। স্থানীয়ারা এই জায়গাটির নাম দিয়েছে অ্যামাজন। নৌকাওয়ালা আমাকে জিজ্ঞেস করায় অ্যামাজন যাব কিনা, আমি পড়ি মহা সমস্যায়। এখানে আবার অ্যামাজন এলো কোথা থেকে? শেষে মাঝি ভাই-এর কাছে জানতে চাই, “সে জায়গা আবার আমাদের পঃবাংলায় আছে নাকি?”

“আছে বইকি, এই তো ঘণ্টাখানেক নৌকা চলুক তারপর দেখবেন।”

বেশ, মাঝির কথা শুনে রাজি হলাম, দেখি এখানে অ্যামাজন কী রকমের। জানতে চাইলাম বন্য পশু নেই তো? অথবা কুমির? সে তো হেসেই অস্থির, “কী যে বলেন বাবু, দেখবেন চলুন।”

কিছুদূর যাওয়ার পর অবাক চোখে দেখি দূরে মায়াপুর ইস্কন মন্দিরের তিনটি গম্বুজ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে আর সেই গম্বুজের প্রতিচ্ছবি জলের মধ্যে এক অপূর্ব দৃশ্য। পরে স্বকথিত সেই অ্যামাজনের খাঁড়ির মধ্যে দিয়ে নৌকার দাঁড় টানার শব্দ জলের মধ্যে। এ এক ব্যাতিক্রমী পরিবেশ। এরকমটি আর বোধহয় অন্য কোনো হ্রদে পাওয়া সম্ভব নয়। এই জন্যই এখানে শীতকালে ভ্রমন সব থেকে আদর্শ। শীতকালে এখানে পরিযায়ী পাখিদের মেলা বসে কিন্তু এই পর্যায়ে পঃবঙ্গের স্থায়ী বাসিন্দা এক হাঁসশ্রেণীর পাখি, পানডুবি নিয়ে আলোচনা করা যাক।

bonerdiarypakhi01

ডুবসাঁতার দিতে সে বেশ পটু। তাই জুটেছে নানা নাম—পানডুবি, ডুবুরি, ডুবরি, ডুবলু, ডুবডুবি। ছোট ডুবুরি এর নতুন নাম। একসময় এই পাখিটিকে দেখা যেত দেশের নিরিবিলি জলাশয়গুলোয়। ক্রমাগত জলাশয় দখল আর জলাভূমির বন ধ্বংসের কারণে অনেক পাখিই এখন দুর্লভ হয়ে গেছে। সুন্দর এই ছোট ডুবুরিও নাম লিখিয়েছে দুর্লভদের তালিকায়। পাখিটির ইংরেজি নাম Little Grebe আর  বৈজ্ঞানিক নাম Tacybaptus Ruficollis।

এটি হাঁস আকৃতির লেজহীন ছোট পাখি। দেহের ওপরের বর্ণ গাঢ় পাটকিলে, গলা ও ঘাড়ের দুই পাশ বাদামি। বুকের নরম পালক ধোঁয়াটে সাদা। ডানায় সাদা ছোপ। ওড়ার সময় সেই ছোপটি দেখা যায়। স্ত্রী ও পুরুষ পাখি দেখতে একই রকম। জলাশয়ের ছোটো মাছ, ব্যাঙ, ব্যাঙাচি, জলজ পোকামাকড় এদের খাবার।
তবে এরা ডুবুরি হাঁসের মতো দ্রুত উড়তে পারে না। সাঁতার আর ঘন ঘন ডুব দিয়ে চলে এরা। মানুষ দেখলে ভয় পায়। স্রোতহীন ছোট জলাশয়ে নিরিবিলি থাকতে পছন্দ করে। তারা জোড়ায় ও ছোট দলে থাকে। ট্রিলি, ট্রিলি মিষ্টি সুরে ডাকে। প্রজননের সময় বড় ডোবার কাছে নলবনে ভাসমান বাসা বানায় জলজ ঘাস দিয়ে। বাসা যাতে না ভেসে যায়, সে জন্য জলজ আগাছা দিয়ে বাসাটিকে নলের সঙ্গে বেঁধে নেয়। স্ত্রী পাখি ডিম দেয় চার থেকে ছয়টি। রং সাদাটে। ডিম ফুটে ছানা বের হয় সর্বোচ্চ ২০ দিনে। খাবার খেতে বাইরে গেলে ডিম ঘাস দিয়ে ঢেকে রেখে যায়। ছানাগুলো ডিম ফুটে বের হওয়ার কিছু সময় পরই চটপটে হয়ে ওঠে। মা-পাখি ছানাদের পিঠে নিয়ে সাঁতরে বেড়ায়। বিপদের আঁচ পেলে এবং মা সংকেত দিলে ছানারা পিঠ থেকে নেমে লুকিয়ে পড়ে জলজ ঝোপে। পশ্চিম বাংলার এরা স্থায়ী বাসিন্দা।

আমার সৌভাগ্য যে চুপির চরে আমি এই পাখি বেশ অনেক পরিমাণে দেখতে পেয়েছি। নৌকার পাশ দিয়েই জলে ভেসে চলেছে আর ক্রমাগত ডুব দিচ্ছে আর উঠছে। ছবি তোলাই কঠিন হয়ে উঠছিল। যাই হোক অনেক ধৈর্য ধরে সমানে ক্যামেরার লেন্স চোখে লাগিয়ে শাটার দাবিয়ে গেছি, যে ছবিটা ভাল ওঠে আর কি। শীতকাল হওয়ার জন্য সেটা এদের প্রজননের সময় নয়, তাই ছানা-পোনা সাথে ছিলনা। একটা ক্লিক-ক্লিক আওয়াজ করে ডাক দেয় আর মানুষ দেখলে বেশি করে আওয়াজ করে, হয়তো বিরক্তি প্রকাশ করে। যেই না লেন্স ফোকাস করি, ওমনি ডুব দিয়ে দেয়, তখন আরেকটা কে ফোকাস করি ও ডুব দেয় আর পাশেরটা আবার ভেসে ওঠে। হাতে ক্যামেরা নিয়ে এর ছবি তুলতে গিয়ে রীতিমত হিমশিম খাওয়ার যোগাড়। তাও যে পেরেছি ওকে কব্জা করতে আমার সেটা সৌভাগ্য। এখন এই পাখি নেই বললেই চলে। ক্রমাগত জলাশয় দখল আর জলাভূমির বন ধ্বংসের কারণে অনেক পাখিই এখন দুর্লভ হয়ে গেছে। সুন্দর এই পানডুবিও নাম লিখিয়েছে দুর্লভদের তালিকায়। 

bonerdiarypakhi02

বনের ডায়েরি সব লেখা একত্রে

Leave a Reply