আগের পর্ব ধনেশ, মাছরাঙা, মুনিয়া, কাজল পাখি , দোয়েল-কোকিল-ময়না বুলবুল, বকপাখি, মোনাল দেখার গল্প, পাঁচ বউয়ের কাহিনি, ঘুঘুর বাসা, টুনটুনি, বাঁশপাতি, মোহনচূড়া , হাট্টিমাটিমটিম থেকে হটিটি, রামগাংড়া, ডাহুক কেন ডাকে, বাদামি কোকিল, পাপিয়া, পাতি জলমুরগি
(Spotted Owlet / Jungle Owlet)
সুকুমার রায় ছড়া বেঁধেছিলেন প্যাঁচা আর প্যাঁচানিকে নিয়ে। তার সুরের ডাকের বর্ণনা দিয়েছিলেন সেই ছড়ায়। বোধহয় প্যাঁচানির ডাকেই রাতে গাছপালাও চমকে ওঠে। এক তো রাতের পাখি, তার ওপর যদি গভীর নিদ্রায় থাকাকালীন এই চমকে ওঠা ডাকে ঘুম ভেঙে যায় তাহলে তো আর সারারাতে ঘুম ফিরে আসবে কি না বলা দায়। এরকম আমার বেশ কয়েকবার ঘটেছে। খাটের পেছনেই পুবদিকের জানালা; শীত, গ্রীষ্ম আমি ওই জানালা খুলেই রাখি কারণ বদ্ধ ঘরে আমার ঘুম আসে না। জানালার খুব কাছেই একটা নিমগাছ, তার পাশে বেলগাছ আর একটা কদম ফুলের গাছ। দিনের বেলায় অনেক পাখির সমাগম হয়। রাতে কিছু পাখি থাকে মাঝে-মধ্যে যেমন ফিঙে, তবে বেশি রাতে আর থাকে না। কখনও বাদুড় এসে ঝুলে পড়ে, কিন্তু তারা খুব একটা উপদ্রব করে না। রাতের ঘুম ভালোই হচ্ছিল এতদিন। চারদিক নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে, অল্প-স্বল্প শব্দ হলেও কানে আসে, তবে খুব একটা শান্তিভঙ্গ হয় না। কিন্তু এক রাতে সত্যিই চমকে উঠে পড়ি—কীসের এই বিকট ডাক? আমাদের জানালার ওপর কেউ এল নাকি? টর্চ হাতে এক লাফে খাট থেকে নেমে অনুসন্ধান করতে উঠলাম। জানালার সামনে দাঁড়িয়ে খোঁজার চেষ্টা করছি, আবার সেই বিকট চিৎকার। আমার তো আত্মারাম শুকিয়ে কাঠ। এ আবার কী প্রাণী এল রে এখানে এই রাতদুপুরে! আরও একবার কানে এল সেই তীক্ষ্ণ চিৎকার। এবার বুঝতে অসুবিধা হল না যে আওয়াজটা নিমগাছের ডালের ফাঁক থেকেই এল। এত রাতে গাছে টর্চ জ্বালিয়ে দেখতে গিয়ে যদি কারও বাড়িতে আলো পড়ে, সে হবে আরেক বিপত্তি। তাই অন্ধকারে হাতড়ে বেড়ালাম যদি কিছু দেখা যায়। হ্যাঁ, এবার চোখে পড়ল, গাছের একবারে মগডালে বসে দিব্য ঘাড় নাচিয়ে চলেছে। এরকম পিলে চমকানো ডাক যখন তখন আমার সুকুমার রায়ের ছড়ার কথাই মনে হল, এ—নিশ্চয় প্যাঁচানি। এবার টর্চ জ্বালিয়ে সোজা ওর গায়ে। আলো পড়াতে বেচারার নড়াচড়া বন্ধ হয়ে গেল। স্থির দৃষ্টিতে যেন আমার দিকেই তাকিয়ে রয়েছে; জানতে চাইছে আবার আলো কেন বাবা, বেশ তো অন্ধকারে ছিলাম। ততক্ষণে আমার স্ত্রীর ঘুম ভেঙে গিয়েছে, সেও আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে দেখার জন্য। এবার ওর একটু সহানুভূতি হল প্রাণীটির প্রতি। সে বললে, “আহা রে, রাতের পাখি, আলোতে দেখতে পায় না বেচারি, টর্চটা নিভিয়ে দাও।” আমারও কেমন একটা মায়া হল আর আলো নিভিয়ে দিলাম। ওর উড়ে যাওয়া পর্যন্ত আমরা দাঁড়িয়ে ছিলাম। প্রায় আধ-ঘণ্টা ধরে ওকে কেবল পর্যবেক্ষণ করে গিয়েছি। পরের দিন সকালে মনে হল যে আমার পাখির অ্যালবামে প্যাঁচার কোনও ছবি নেই, আসলে আমি এর আগে বন্য প্যাঁচা দেখিনি। একবার শিলংয়ের চিড়িয়াখানায় খাঁচায় বন্দি বেশ কয়েক প্রজাতির প্যাঁচা দেখেছিলাম। কিন্তু বনে অথবা খোলা আকাশে নীচে দেখতে পাওয়া যে-কোনো বন্যপ্রাণীর চেহারা অন্যরকম দেখায়। তাই ঠিক করলাম, এবার প্যাঁচা কার্যসূচি তৈরি করতে হবে—প্রজেক্ট আউল। আরম্ভ হল আমার প্যাঁচা নিয়ে গবেষণা।
এরপর অবশ্য রাস্তায় গাড়িতে চলাকালীন প্যাঁচা দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছে, কিন্তু লেন্সবন্দি করতে সক্ষম হইনি। সু্যোগ এল প্রথমবার বাড়ির খুব কাছে আর পরেরবার হরিদ্বারে মনসা পাহাড় থেকে নামার সময়, জয়ঢাকি দলের সঙ্গে ২০১৯ সালে উত্তরাখণ্ডের তুঙ্গনাথ ট্রেক করে ফেরার পথে। সে-গল্পে পরে আসছি। তার আগে আমার প্যাঁচা পরিকল্পনা কী করে উদ্ভাবন হল তারই বর্ণনা দিই। বই পড়ে জানলাম যে প্রায় ৪১ প্রকারের প্রজাতি ছড়িয়ে রয়েছে আমাদের দেশজুড়ে।
সন্ধে গড়িয়ে গেলে আমি তক্কে থাকি কোনও রাতের পাখি দেখা যায় কি না। তার মধ্যে অবশ্যি বাদুড় সামিল আছে যদিও-বা সে-পাখি গোত্রের মধেই পড়ে না, কিন্তু আকাশে ওড়ে। দুয়েরই দেখা পেয়েছি, কিন্তু দ্বিতীয়টি সেইভাবে লেন্সবন্দি করতে সক্ষম হইনি। প্রথম জনের সঙ্গে বেশ কয়েকবার সাক্ষাৎ হলেও লেন্সবন্দি মাত্র দু-বার করতে পেরেছি। চলন্ত গাড়ি থেকে পাখির ছবি তোলা ভীষণ কঠিন। গাড়ি সামনে দাঁড় করিয়ে ক্যামেরা তাক করতেই সে ফুড়ুৎ।
২০১৯ সালেই দার্জিলিং জেলার লাটপাঞ্চারে গিয়েছিলাম কেবল ধনেশ দেখার জন্য, তার সঙ্গে আর কিছু হিমালয়ার পাখি। সেবক থেকে কিছুটা এগিয়েই কালিপোখরি বলে এক জায়গা আর সেখান থেকেই বাঁদিকে একটা পথ বেঁকে সোজা পাহাড়ের ওপরে উঠে গেছে। গাড়ির চালক রঙবাহাদুর জানাল, এই চড়াই ৬ কিমি আর রাস্তা বেশ খারাপ, অর্থাৎ গাড়ি হেলেদুলে ওপরে উঠে চলেছে। পথের দু-দিকেই ঘন জঙ্গল, মহানন্দা অভয়রাণ্যের অন্তর্গত। আমার সঙ্গে সঙ্গী বলতে আমার স্ত্রী কন্যা, দুজনেই এখন আমার মতো পক্ষী-প্রেমিক, বেশ কিছু পাখির ডাক ও নাম জানা হয়ে গেছে তাদের ইতিমধ্যে। এই তথ্য এইজন্য দিলাম যে আমার সঙ্গে থাকলে প্রথমে এদের নজরেই পাখি ধরা পড়ে আর আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
এই ক্ষেত্রেও তাই হল। গাড়ি ধীরে ধীরে দুলকি চালে এগিয়ে চলেছে; দু-পাশে জঙ্গল আর নানারকমের পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে—কিছু চেনা আর কিছু অচেনা। দু-একটা ডাক আবার রঙবাহাদুর চিনিয়ে দিল। পাখি চিনি, কিন্তু আগে ডাক শোনা হয়নি, তাই নির্ধারণ করতে অক্ষম। হঠাৎ মেয়ে বলে উঠল, “প্যাঁচা!” গাড়ি থামাতে নির্দেশ দিলাম। মেয়ে আঙুল উঁচিয়ে এক গাছের ডালে বসে থাকা প্যাঁচা দেখিয়ে দিল। দিনের আলোয় এইভাবে প্যাঁচা দেখতে পাওয়া সৌভাগ্যের ব্যাপার।
এই প্যাঁচা সত্যিই জঙ্গলের বাসিন্দা; ছোটো কালো প্যাঁচা—জাঙ্গল আউলেট (Jungle Owlet)। কিন্তু এবারও লেন্সবন্দি করতে পারলাম না। ক্যামেরা তাক করার আগেই সে পলাতক। রঙবাহাদুর বললে, “সাবজি, বহুত মিলেগা, ফিকর মৎ কিজিয়ে।” (সাহেব, অনেক পাবেন, চিন্তা করবেন না)। চিন্তা করব কেন, যে পাখিরই দেখা পাব তাকেই বন্দি করব; অবশ্যই আমার লেন্সে। কিন্তু সে-যাত্রায় পেঁচক মশাইর সঙ্গে আর দেখা হয়নি।
২০১৯ সালের মে মাস। এবার জয়ঢাকি দলের সঙ্গে তুঙ্গনাথ ও চন্দ্রশিলা যাত্রা এবং এই যাত্রা কিন্তু খুব আনন্দের হয়। যাঁরা ছিলেন এখানে তাঁরা জানেন আর যাঁরা এখনও যাননি, এর পরে অবশ্যই জুড়ে যাবেন জয়ঢাকি দলে। অনেক অজানা স্থান, তথ্য জানা যায়।
সেই যাত্রায় অনেক হিমালয়ের পাখি সংগ্রহ করতে পেরেছিলাম, কিন্তু প্যাঁচার দেখা পেলাম মা মনসার দরবারে, হরিদ্বারে গিয়ে, ফেরার পথে, সেই কালো ছোটো প্যাঁচা। আমরা মা মনসার মন্দিরে উঠেছিলাম কেবল কারে, কিন্তু নামার সময় পায়ে হেঁটে।
সন্ধে হয়ে আসছিল, কিন্তু এদিকে মে মাসে প্রায় সন্ধে ৭টার পরেও সূর্যের আলো থাকে, তাই নামার সময় এদিক ওদিক লক্ষ রাখছিলাম আর তখনই চোখে পড়ল এই প্রাণীটি। এবার আর সময় নষ্ট করিনি, বেশ কয়েকটা শট নিয়ে নিলাম।

মুখে কোনও শিকার ধরা ছিল, তাই ওর মন ওদিকেই, ক্যামেরা লক্ষ করতে পারেনি। আমি অবশ্য অনেকটা দূরে, আমার জুম লেন্স কাজে লেগেছিল ওকে বন্দি করতে। এই প্রথম এক প্যাঁচাকে আমার পাখির অ্যালবামে যোগ করতে পারলাম আর তার সঙ্গে আরম্ভ হল আমার ‘প্রজেক্ট আউল’।
আবার ২০১৯ সাল। তবে শীতকাল, ডিসেম্বর মাস। পরের মাসে, অর্থাৎ জানুয়ারি, ২০২০-তে আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে যাওয়ার প্রস্তুতি প্রায় শেষ, তাই তার আগে আর দূরে কোথাও যাওয়ার পরিকল্পনা নেই। এক শনিবার দুপুরে ঠিক করলাম বাড়ির কাছেই এক ঘাসভূমি অঞ্চলে পাখি দেখতে যাব।
আর কেউ যেতে রাজি না হওয়ায় একাই ক্যামেরা কাঁধে বেরিয়ে পড়লাম। এই স্থানে আমি বহুবার এসেছি, ভীষণ ভালো লাগে আসতে আমার আর কখনোই নিরাশ হয়ে ফিরতে হয়নি। কিছু না কিছু নতুন প্রজাতির পাখি পেয়েছি শীতকালে।
গ্রীষ্মে এখানে আসা ঠিক নয়, কারণ ঘাসের মধ্যে বিষাক্ত সাপ লুকিয়ে থাকতে পারে। শীতকালে তারা ঘুমায়, হাইবারনেশন বলা হয়ে থাকে, তাই তখন এই ঘাসভূমি নিরাপদ।
তবে আমার আশঙ্কা, এই ঘাসভূমি আর বেশিদিন নিরাপদ থাকবে না পাখিদের আসাযাওয়ার জন্য। এক তো রাস্তা বিস্তারের কাজ চলছে, আর এই জমি চিহ্নিত করা আছে কোনও অট্টালিকা তৈরি করার জন্য। আমি ভাবি, এই পাখিগুলি গৃহহারা হয়ে কোথায় যাবে।
কারাই-বা এদের হয়ে ধর্না দেবে পুনর্বাসনের জন্য। আমরা মানুষেরা ভুলে যাই, এই পৃথিবীর ওপরে যতটা অধিকার আমাদের, ঠিক ততটাই ওদেরও। ওদের জমি অধিগ্রহণের আগে ওদের পুনর্বাসনের কথাও চিন্তা করতে হবে, যেমন আমরা মানুষের ক্ষেত্রে করে থাকি। আমি তো অতি ক্ষুদ্র মানুষ, তাই এত সাতপাঁচ ভেবে কী আর করতে পারি!
সেই দুপুরে বেশ কয়েক প্রজাতির পাখি ধরা পড়লেও আমি চাইছিলাম এই ঘন ঘাসভূমি অঞ্চলে যদি প্যাঁচা দেখতে পাওয়া যেত। কিন্তু এত আলোতে তা সম্ভব নয়। শীতকাল, বেলা বেশিক্ষণ থাকে না, বিকেল ৫টার পরেই অন্ধকার নেমে আসে। তখন বোধহয় এখানে থাকা নিরাপদও নয়।
একটু ঘুরে ফিরে দেখছিলাম। এক জলা জায়গায় দেখলাম বেশ কিছু ডাহুক ঘুরে বেড়াচ্ছে। একটা বড়ো গাছের কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। ক্যামেরা আমার তৈরি। চোখ মেলে দেখতে গিয়ে দেখি এক কুটুরে প্যাঁচা বসে দিব্য মাথা দুলিয়ে চলেছে। মনে হচ্ছে আমাকেই দেখে ইশারায় কিছু বলতে চাইছে—এই তুই আবার এখানে কেন? যা, বাড়ি যা।
অত্যন্ত বিরক্ত মনে হল আমার প্রতি। আমিও মনে মনে বললাম, এই চলে যাব, কেবল একটা পোজ দাও বেশি ঝামেলা না বাড়িয়ে।
কী বুঝল কে জানে, মাথা নাচানো বন্ধ হয়ে গেল। ছবির জন্য পোজ তৈরি; শাটার পড়ল, আমার কাজটি ফুরোলো। টাটা করে চলে এলাম। বললাম, এবার শান্তিতে রাত কাটাও আর শিকার ধরো, কেউ বিরক্ত করতে আসবে না।

বনের ডায়েরি সব লেখা একত্রে