বন বন্দুকের ডায়েরি আগের পর্বঃ হাতি হাতি, শঙ্খচূড়ের ডেরায়, আলাদিনের গুহা, শিকারী বন্ধু গোন্দ, হুনসুরের আতঙ্ক… পীর বক্স (১), হুনসুরের আতঙ্ক… পীর বক্স (২), বোয়া সাপের খপ্পরে, বে-ডর লছ্মণ, মানুষখেকো নেকড়ে , নেকড়ে মানুষ সিয়াল, বাঘমারা ভীম, ডাইনি প্যান্থার, মহিষাসুরের খপ্পরে, অরণ্যের সন্তান জুয়াং, জল হুপু, সাদা বাঘ, সামনে ভালুক, পরদেসি ডোম

“সাহেব সাহেব, নদীতে দুটো বাঘ!”
বর্ষার ভ্যাপসা গরমে সারাটা রাত ছটফটিয়ে ভোরের দিকে ঠাণ্ডা হাওয়া ছেড়েছিল। তাইতে বেশ আরাম করে সবে ঘুমিয়েছি ঠিক তখন ঘরের দরজায় ডাকটা শুনে ঘুম ভেঙে গেল। অবশ্য নাকের ডগায় দু-দুটো বাঘের খবর পেলে কার চোখেই বা আর ঘুম থাকে! ব্যাপারটা ভাল করে শোনা দরকার।
তাড়াতাড়ি উঠে পায়ে স্লিপার গলিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলাম। সেখানে আমার আর্দালি মহা ব্যস্তসমস্ত হয়ে ছটফট করছিল দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। বলে, গ্রাম থেকে খবর এসেছে একজোড়া বাঘ নাকি কোয়েল সাঁতরে তার ডানপাড়ে আমার বাংলোর দিকেই আসছে। তখনও তারা মাঝনদীতে। গ্রামের লোকজন পাড়ে দাঁড়িয়ে শোরগোল করে তাদের পাড়ে ওঠা আটকাতে ব্যস্ত।
তার কথা চলতে চলতেই দূর থেকে ভেসে আসা চিৎকার চ্যাঁচামেচির শব্দ জানান দিচ্ছিল, লোকজন যে জড়ো হয়েছে নদীর পাড়ে সে-কথাটা অন্তত মিথ্যে নয়। জামাকাপড় পালটাবার জন্য আর দেরি করলাম না আমি। যেমনভাবে ছিলাম সেই অবস্থায় গোটাচারেক ভারী বুলেট আর বারো বোরের ডাবল ব্যারেলটা কাঁধে ঝুলিয়ে নিয়ে তাড়াতাড়ি আর্দালির পিছু পিছু রওনা দিলাম।
ভরা বর্ষায় কোয়েলের জল বেড়েছে প্রায় কুড়ি ফিট। পাক খেয়ে ফেনা তোলা ঘোলা জলে কানায় কানায় ভরা নদী ছুটেছে দুকূল ছাপিয়ে। নদী সেখানটায় প্রায় দুশো গজ চওড়া। প্রায় তিনশ গজ দূরে মাঝনদীতে দুটো কালো কালো বস্তু নজরে পড়ছিল। প্রাণপণে তারা উজানের দিকে সাঁতরে আসছে।
নদীর বাঁ-পাড়ে একগাদা গরুর গাড়ি দাঁড়িয়ে। ভরানদীতে ফেরির নৌকো চলা বন্ধ হয়ে গেছে। ‘বেরু’র দিকে যাবার গাড়িগুলো তাই নদী পার হতে না পেরে সেইখানেই অপেক্ষা করছে। নদীর ডানধারে আমাদের সোমিজ গ্রামের লোকজন লাঠি, বল্লম গুটিকয় গাদাবন্দুক, যে যা পেরেছে হাতে করে নদীর ধারে লাইন বেঁধে দাঁড়িয়ে। দুধারের এহেন ভিড়ভাট্টা আর হাঁকডাক মিলে জন্তুদুটোকে তখন পাড়ের কাছে আসতে দিচ্ছিল না।
তাড়াতাড়ি একটা ডোঙা জোগাড় করে আনা হল। দুজন শক্তপোক্ত
ঝোরা গিয়ে বসল তার দু-মাথায়। এইখানে ডোঙা বস্তুটা কী সেইটে একটু বলে দেওয়া যাক। একটা হালকা কাঠের লম্বা গাছের কাণ্ডকে খুদে ফাঁপা করে নিয়ে তৈরি হয় ডোঙা। লম্বায় বিশ ফুট, চওড়ায় পনেরো ইঞ্চি হয় কি না হয়। এর মাথাদুটো সাধারণ নৌকোর মত চোখা করে নেওয়া হয়। জলের বুকে এতটুকু এদিক-ওদিক হলেই ও জিনিস হেলে পড়ে উলটে যায়। স্থির জলেই এহেন বস্তুতে চড়তে বুক কাঁপে। আর বর্ষার কোয়েলের ক্ষ্যাপা বুকে তাইতে চেপে বাঘ শিকার করতে যেতে চাইলে তো কথাই নেই।
দু-জোড়া শক্তপোক্ত হাতের বৈঠার ধাক্কায় প্রথমে তো ডোঙা বনবনিয়ে ছুটল জল বেয়ে। কিন্তু মাঝনদীতে পৌঁছে ক্ষ্যাপা স্রোতের ধাক্কা সামলে সে আর সামনে এগোতে চায় না মোটে। দুই ‘বাঘ’ তখন আমাদের সামনের দিকে, প্রায় সাড়ে তিনশো গজ উজানে সাঁতার দিচ্ছে। ওই স্রোতে কী করে যে তারা সে অসম্ভব কাজটি করছে তা বোঝা মুশকিল।
খানিক বাদে বুঝলাম মাঝনদীর স্রোতকে হারিয়ে এগোনো সম্ভব হবে না। ডোঙার দুই মাঝি তখন চলল নদীরে পাড়ের কাছাকাছি তুলনায় কমজোরি জলের দিকে। সেখান দিয়ে জন্তুদুটোর প্রায় পাশাপাশি পৌঁছে ফের আমরা মাঝনদীতে তাদের কাছাকাছি ফিরে এলাম। এইবার নজর চালিয়ে দেখি, বাঘ কোথায়? একজোড়া বুনো কুকুর সাঁতার দিচ্ছে নদীর উজানমুখো। রেগেমেগে ভাবলাম, ফিরেই যাব। কিন্তু তারপর, রক্ত ঝরাবার ব্যাপারে মানুষের যে একটা গভীর টান থাকে, বোধ হয় সেইটেরই তাড়নায় ফিরে আর গেলাম না।
বুনো কুকুরদুটোও তখন আমাদের দেখতে পেয়েছে। দেখেই মহা উৎসাহে আরো জোরে সাঁতার দিয়ে ফের এগিয়ে গেল ডোঙাকে পেছনে ফেলে। দুই ঝোরা প্রাণপণ চেষ্টা করেও যখন দেখি তাদের নাগাল ধরতে পারছে না তখন প্রায় গজপঞ্চাশেক দূর থেকেই পেছনের কুকুরটার দিকে নিশানা করে গুলি ছুঁড়ে দিলাম একটা। তাতে কোনো কাজ হল না অব্শ্য। একে তো উলটোবার ভয়ে ডোঙায় উঠে দাঁড়াবার সাহস পাচ্ছি না। তায় জলের ভেতর জন্তুটার লেজ আর কানের ডগা বাদে আর কিছুই চোখে পড়ছে না তখন।
তবে গুলির শব্দে একটা কাজ হল। কুকুরদুটোর একটা দেখি ঘাবড়ে গিয়ে মুখ ঘুরিয়ে ভাঁটার দিকে সাঁতার দিয়ে আসছে এবারে। নৌকোর পাশাপাশি গজবিশেক দূর দিয়ে যখন সে ভেসে যাচ্ছে তখন একবার মনে হয়েছিল গুলি করি। কিন্তু তক্ষুণি খেয়াল হল নদীর ওপারে লোকজন ভিড় করে আছে। বুলেট যদি জল ছুঁয়ে সেদিকে উড়ে যায় তাহলে মুশকিল হয়ে যেতে পারে। তাই গুলি না করে আমি ঝোরাদের
বললাম, “ডোঙা ঘুরিয়ে ওটার পেছনে ধাওয়া দে।”
ডোঙা ঘোরাতে ঘোরাতেই কুকুরটা আমাদের ছেড়ে প্রায় চল্লিশ গজ এগিয়ে গিয়েছিল। প্রায় আধমাইল ধরে তার পেছনে ছুটেও সে-তফাৎ কমাতে পারলাম না আমরা। জলের বুকে যাকে বলে দৌড় প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেছে তখন। সে-কুকুর সাঁতারু বটে! ভাঁটার টানে ডোঙা ছুটছে কম করে আট ন’মাইল বেগে। কিন্তু তবু আধমাইল দৌড়েও কুকুর সেই চল্লিশ গজ আগে। ব্যাপারস্যাপার দেখে নদীর পাড়ের দর্শকদেরও তখন উত্তেজনা তুঙ্গে। নদীর দুপাশ ধরে তারাও তখন ছুটছে আমাদের সঙ্গে।
উত্তেজনায় আমারও তখন মাথার ঠিক নেই। দুই মাঝিকে যাচ্ছেতাই গাল দিয়ে তাদের প্রাণপণে দাঁড় বাওয়াই, আর বেচারা কুকুরও জীবনপণ করে সাঁতার দিয়ে যায় আগে আগে।
আমার বাংলো থেকে আধমাইলটাক ভাঁটায় নদীর বাঁ-পাশে কারো এসে কোয়েল-এ মিশেছে। বাঁ-পাড়ের গাড়োয়ানরা তাদের গাড়ি নিয়ে কারো পেরোতে পারবে না। তাই কারোর ওপাশে কোয়েলের বাঁ পাড় খালি পড়ে আছে। একবার যদি জন্তুটা ওদিকের ফাঁকা পাড়ে গিয়ে উঠতে পারে তাহলে আর তাকে ধরা যাবে না। জন্তুটাও দেখি ভাঁটার দিকে কারো-র সঙ্গম দেখা দিতে সে-কথাটা টের পেয়েছে। আর টের পেয়েই দ্বিগুণ তেজে সাঁতার দিতে শুরু করেছে সেদিকটা লক্ষ করে। সেই দেখে আমার ডোঙারও গতি বেড়ে উঠেছে তখন। কিন্তু তবু দূরত্ব কমে না। একসময় চোখের সামনে দিয়ে সে কারো পেরিয়ে গেল। তারপর পাড়ে উঠে লম্বা লম্বা ঘাসের জঙ্গলের কাছে যখন সে পৌঁছেছে তখন শেষবারের মত তাকে পরিষ্কারভাবে দেখতে পেয়ে শেষ একটা সুযোগ নিয়েছিলাম আমি। কিন্তু সে গুলিটাও তার গায়ে লাগল না। ঘাসের জঙ্গলে অদৃশ্য হয়ে গেল জীবটা।
সত্যি বলতে কী, হেরে গিয়েও আমার একটুও দুঃখ হচ্ছিল না। এক ঘন্টা ধরে দৌড় প্রতিযোগিতা হয়েছে আমাদের। তাতে উজান আর ভাঁটি দুদিকেই কুকুরটা আমাদের গো-হারা হারিয়ে দিয়েছে। কোনো ডাঙার জীব যে জলের বুকে এমন শক্তি আর দম দেখাতে পারে তা সেদিন কুকুরটার জীবন বাঁচাবার লড়াইটা নিজে চোখে না দেখলে হয়ত আমার বিশ্বাস হত না।
ততক্ষণে তার সঙ্গীও উল্টোমুখে ঘুরে ভাঁটার দিকে সাঁতরে আসছে। তখনও সে আমাদের চেয়ে দুশো গজ উজানে। এইবার আমরা তার দিকে নজর ফেরালাম। কয়েকটা ঝুঁকে পড়া ডালের নিচে ডোঙাটাকে টেনে এনে বেঁধে ফেলা হল। এইবার চুপচাপ অপেক্ষার পালা। খানিক বাদে যখন সে আমাদের দশ গজের মধ্যে এসে পৌঁছেছে তখন একটা গুলিতেই তার খুলিটা ফুটো করে দিতে কোনো অসুবিধে হল না আমার। শরীরটা গুলি খেয়ে ডুবে গিয়ে খানিক দূরে ভেসে উঠতেই আমাদের মাঝি বর্শা ছুঁড়ে তাকে গেঁথে ফেলে ডাঙায় তুলে আনল।
দেখা গেল জীবটা একটা পূর্ণবয়স্ক পুরুষ। লালচে বাদামি লোম। মাথা আর কানের চারপাশে কালো কালো ছিট। লেজটা ফুলঝাড়ুর মতন। আকারে দক্ষিণ ভারতের সাধারণ বুনো কুকুরের চাইতে অনেকটা বড়ো। প্রায় দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার ডিঙ্গোদের আকারের চেহারা।
বেশ শক্ত লড়াইয়ের মুখেই তারা ফেলে দিয়েছিল সেবার আমাকে। সরাসরি লড়াইটায় একজনের কাছে হেরে গিয়ে কৌশলে, চতুরতায় অন্যটাকে মেরে সেই অর্ধেক বিজয় নিয়েই তাই খুশি থাকতে হয়েছিল।
বনের ডায়েরি সব লেখা একত্রে