আগের পর্ব- বন্ধু বানরদল, ট্রেন চড়ল জাহাজে, জুনপুটের সন্তোষ মাঝি, নীলনদের ফেরিওয়ালা, তাঁবুতে রাত্রিবাস, পুরনো ডাকাতদলের আস্তানায়, ভেলায় চড়ে ভারত মহাসাগর, আফ্রিকার সেৎসি মাছি ও বুলগেরিয়ার গোলাপ
লংকাদেশের অশোকবনে

রাবণ রাজার দেশ লংকার কথা রামায়ণের কাহিনীতে সবাই তোমরা পড়েছ। সেই লংকায়, বা এখন যার নাম শ্রীলংকা, ভারতমহাসাগরের বুকে সেই ছোট্ট একটা দ্বীপের দেশে যদি গ্রীষ্ম বা পুজোর ছুটিতে কখনও যাও, তাহলে রাক্ষসরাজ রাবণের বিরাট প্রাসাদ তোমার খুঁজতে ইচ্ছে হবেই। আর সেই অশোক বন, যেখানে সীতাকে বন্দি করে রেখেছিল রাবণ, সারা দিন হাঁউমাউখাউ চেরিরা তাঁকে ঘিরে থাকত, সেই অশোক বনটা ঠিক কোথায় তাও জানতে ইচ্ছে হবে নিশ্চয়ই।
শ্রীলংকার নুয়ারা-এলিয়ায় আমি অশোক বনের সামনেই পাহাড়ের কোলে সীতামন্দির দেখেছি, সেখানে বিরাট পাহাড়ি বনজঙ্গলও দেখেছি, কিন্তু সেই বনে একটা অশোক গাছও চোখে পড়েনি। নুয়ারা-এলিয়াতে সীতামন্দিরের এলাকা ছাড়িয়ে কিছু দূর গিয়ে পাহাড়ের উঁচু ঢালে সুন্দর একটা উদ্যান চোখে পড়ল। শুনলাম ওটা নাকি রাবণের প্রমোদ কানন।
রামায়ণের গল্পে আছে জানো নিশ্চয়ই, আহত, অজ্ঞান লক্ষ্মণকে বাঁচাতে মৃতসঞ্জীবনী গুল্ম দরকার হয়েছিল? মৃতসঞ্জীবনী চিনতে না পেরে হনুমান আস্ত গন্ধমাদন পাহাড়টাকে বয়ে এনেছিল মনে পড়ছে? শ্রীলংকার পাহাড়ি অঞ্চল নুয়ারা-এলিয়া থেকে অনেক দূরে সমুদ্র-ঘেঁষা গল-এ হনুমানের বয়ে আনা সেই পাহাড়টাও দেখেছি। দেখেছি, কিন্তু বিশ্বাস করতে পারিনি।
রামায়ণ এক আশ্চর্য মহাকাব্য। আমাদের মনে এমন গভীরভাবে আঁকা আছে যে এখনকার শ্রীলংকায় ঘুরতে ঘুরতে আমরা পুরাকালের সেই রাবণ রাজার দেশ ভুলতে পারি না। বরং মনে মনে খুঁজে বেড়াই। আমাদের দেশেও মধ্যপ্রদেশের চিত্রকূটের পাহাড়ি জঙ্গলে রাম লক্ষ্মণ সীতা চোদ্দ বছর বনবাস করেছিলেন, জানো নিশ্চয়ই? চিত্রকূটের জঙ্গলে, নদীতে, পথের ধুলোয় রামায়ণের কাহিনি মনে হয় যেন জীবন্ত হয়ে ফুটে আছে।
ভালো বই একবার পড়লে সারাজীবন আর ভোলা যায় না। তার প্রভাব আমাদের মনে খুব গভীর। রোমানিয়ায় ড্রাকুলা ক্যাসল-এর কথা হয়তো শুনেছ, দশ-বারো বছর আগে একদিন ঠিক দুকুরবেলা আমি সেই গাছমছম দুর্গের এঘরে-ওঘরে ঘুরে যত না ভয়ে শিউরেছি, তার চেয়ে বেশি অবাক হয়েছি ওদেশের মানুষের মনে ব্রাম স্টোকারের ‘ড্রাকুলা’ উপন্যাসে, ফাঁসি- দেওয়া ভ্লাদ থ্রি ড্রাকুলা-র প্রভাব লক্ষ করে। সে-দেশে সব্বাই সেই উপন্যাস পড়েছে, ড্রাকুলা ক্যাসল সেই কল্পকাহিনীর সৃষ্টি। অত দূরে যাবারই বা কী দরকার! আমি তো স্কুলে বঙ্কিমচন্দ্রের ‘রাধারানী’ পড়ে সেই ছেলেবেলাতেই শ্রীরামপুরে মাহেশের রথের মেলায় ঘুরতে ঘুরতে কত দিন রাধারানীর দুঃখে চোখের জল ফেলেছি।
কাব্য কাহিনী এভাবেই আমাদের মনে ঢেউ তোলে। জীবনের আর পৃথিবীর পথ দেখায়।
বড় লেখকদের বই থেকে আমরা কী পাই বলো তো? আনন্দ। জানার আনন্দ, বোঝার আনন্দ, ভাবার আনন্দ। বিস্ময় আর অনুভূতির আনন্দ। কারও কোনও লেখা পড়ে সেই আনন্দটুকু পেলে তবেই তাঁর লেখা গল্প-কবিতা সার্থক সৃষ্টি। আমাদের পড়াও সার্থক।
ঠাম্মু-দিদুর গল্প বলা

শুনলে তোমাদের আনন্দ হবে, ভূমধ্যসাগরের বুকে সাইপ্রাস দ্বীপের শিশুরা আদ্যিকাল থেকে তাদের ঠাকুমা-দিদিমাদের মুখে গান, গল্প, ছড়া শোনে। তার একটা এইরকম:
ঘুমোও আমার চোখের মণি মেয়ে
ভেবে ভেবে থেকো না আর চেয়ে
এই সোমবার রাজা আসবে গাঁয়ে
বিয়ের কনে খুঁজে নিয়ে ফের ভাসবেন নায়ে
সম্রাট আলেকজান্ডারের নাম তো তোমরা সবাই শুনেছ। বহু দূরের গ্রিস দেশ থেকে খ্রিস্টজন্মেরও আগে বিরাট সেনাবাহিনী নিয়ে বহু দুর্গম পথ পার হয়ে, পাহাড়-পর্বত ডিঙিয়ে ভারত আক্রমণ করতে এসেছিলেন।
সেই গ্রিসের মূল ভূখণ্ড থেকে বেশ কিছুটা দূরে সাইপ্রাস দ্বীপের কথা তো অনেকেই তোমরা জানো। ভূমধ্যসাগরের বুকে সেই সাইপ্রাস দ্বীপটিকে এখনও আমরা কেউ কেউ গ্রিসেরই একটা অংশ বলে ভাবি।
কয়েক বছর আগে মেক্সিকোয় সমুদ্রের ধারে আকাপুলকো নামে একটা শহরে পৃথিবীর নানা দেশের কবিদের সঙ্গে আমাকে কবিতা নিয়ে ক’টা দিন কাটাতে হয়েছিল। সেখানে সাইপ্রাসের দুজন মহিলা কম্পিউটার- ইঞ্জিনিয়ার, তাঁরা কবি নন, মেক্সিকোয় এসেছেন তাঁদের সাইপ্রাসের কোম্পানির কাজে, হোটেলের ব্রেকফাস্ট হল-এ আমাকে ভারতীয় দেখে আমার সঙ্গে আলাপ করে সাইপ্রাসে যাবার নিমন্ত্রণ করলেন।
যেই বলেছি ‘চার বছর আগে একবার আপনাদের গ্রিসে গিয়েছিলাম’- দুজনেই হইহই করে উঠলেন, ‘১৯৬০ সাল থেকে সাইপ্রাস একটা স্বাধীন দেশ!’ সাইপ্রাস একসময় ছিল অটোমান-শাসিত তুরস্ক বা টার্কির অধীন। তিনশো বছরেরও বেশি সেই অটোমান-শাসনের পর আরও বিরাশি বছর ব্রিটিশদের অধীনে থেকে ১৯৬০ সালে সম্পূর্ণ স্বাধীন একটা রাষ্ট্র হয়ে যায় সাইপ্রাস। গ্রিস কিন্তু আর আগেকার সেই অখণ্ড গ্রিস নেই। সেই গ্রিস ভেঙে তিনটে আলাদা দেশ হয়ে গেছে- ম্যাসিডোনিয়া, আলবেনিয়া আর গ্রিস।
সাইপ্রাসের কম্পিউটার-ইঞ্জিনিয়ার দুজন সেই যে তাঁদের দেশে যাবার নিমন্ত্রণ জানিয়ে তাঁদের ঠিকানা ইত্যাদি লিখে দিয়ে গিয়েছিলেন আজ অব্দি আমার আর যাওয়া হল না, সেই কাগজটাও হারিয়ে গেছে। তবে সাইপ্রাস সম্পর্কে দু-একটা কথা জেনে নিয়েছিলাম।

স্বাধীনতার পর সাইপ্রাস দুটো আলাদা অঞ্চলে ভাগ হয়ে গেছে। এই দ্বীপরাষ্ট্রে এক অংশের মানুষদের সাহিত্য-সংস্কৃতির ওপর গ্রিকদের প্রভাব, আরেক অংশে তুর্কিদের প্রভাব। দেশটার শিশুসাহিত্যেও এই দুটো ধারা।
এত সব কথা তোমাদের এখন না জানলেও চলবে। শুধু এইটুকু জানলেই হবে গ্রিক-সাইপ্রায়ট ছেলেমেয়েরা চিরকাল তাদের মা-বাবা ঠাকুমা-দিদিমার মুখে রূপকথা, উপকথা, পুরাণের গল্প, গান, ছড়া, হেঁয়ালি, প্রবাদ, ঘুমপাড়ানি গান শুনে আসছে। সাইপ্রাসে তখন স্কুলও হয়নি, বইও নেই, তাই বলে গল্প, ছড়া, ধাঁধাঁ ছাড়া তো ছোটদের চলতে পারে না। তাই এই শোলোকবলা ঠাম্মা- দিদুর মুখে গল্প ছড়া রূপকথা শোনার এমন চল। দ্বীপবাসীর স্মৃতিতে সেই কবে থেকে গেঁথে আছে এইসব রূপকথা, উপকথা, গান, ছড়া, হেঁয়ালি।
চারদিকে সমুদ্রঘেরা সাইপ্রাসের সেকালের এক গরিব-দুঃখীর কুঁড়েঘর থেকে এরকম একটা ঘুমপাড়ানি গান তোমাদের জন্য কুড়িয়ে নিলাম:
ঘুমোও আমার চোখের মণি মেয়ে
ভেবে ভেবে থেকো না আর চেয়ে
এই সোমবার রাজা আসবে গাঁয়ে
বিয়ের কনে খুঁজে নিয়ে ফের ভাসবেন নায়ে

অলঙ্করণ– যুধাজিৎ সেনগুপ্ত
“স্বর্ণাক্ষর” থেকে প্রকাশিত ‘চোখে দেখা গল্প’ বই থেকে নেয়া। লেখক ও প্রকাশকের অনুমতিক্রমে।