চোখে দেখা গল্প- আফ্রিকার সেৎসি মাছি ও বুলগেরিয়ার গোলাপ-অমরেন্দ্র চক্রবর্তী-শীত২০২৩

আগের পর্ব- বন্ধু বানরদল, ট্রেন চড়ল জাহাজে, জুনপুটের সন্তোষ মাঝি, নীলনদের ফেরিওয়ালা, তাঁবুতে রাত্রিবাসপুরনো ডাকাতদলের আস্তানায়, ভেলায় চড়ে ভারত মহাসাগর

১। আফ্রিকার সেৎসি মাছি

chokhedekhagolpo (4)

আফ্রিকার সেৎসি মাছির কথা শুনেছ? যে মাছি কামড়ালে খালি ঘুম পায়! আ পরে এক সময় সেই ঘুম নাকি আর ভাঙে না।

আমাকে একবার সেৎসি মাছি কামড়েছিল। সেবার আফ্রিকা মহাদেশের কেনিয়া, তাঞ্জানিয়া আর দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রুগার-জঙ্গলে বন্যপ্রাণীদের বিচরণভূমি ঘুরে অনেক ছবি তুলেছিলাম। জিরাফ জেব্রা সিংহ হাতি গন্ডার চিতা হায়েনা আর হাজার হাজার হরিণ ইত্যাদি বন্যপ্রাণীর চমকে দেওয়া সব ছবি। পাখি যে কত রঙের আর কত ভাবভঙ্গির আর কত রকম চেহারার দেখেছি! সবশেষে তাঞ্জানিয়ার তৃণভূমিতে একটা ছোট নদী কিংবা হয়তো বিরাট একটা জলাশয়ে একদল জলহস্তীর দেখা পেয়ে খুব আনন্দ হল। বেশ কিছুক্ষণ জলের মধ্যে তাদের ছবি তুলতে তুলতে একটা জলহস্তীর বিরাট হাঁ দেখে সেই হাঁয়ের ছবি তুলতে লাগলাম। প্রথমে সবচেয়ে বেশি জুম করে আস্তে আস্তে জুম কমিয়ে ক্রমশ গোটা জলহস্তি খুব মন দিয়ে ক্যামেরাবন্দি করছি। হঠাৎ মনে হল আমার বাঁ কানে কেউ তীক্ষ্ণ একটা ছুঁচ ফোটাচ্ছে। তখন কানে হাত দেওয়া দূরে থাক, এক চুল নড়াচড়ার উপায় নেই। পুরো শটটাই তাহলে ফেলে দিতে হবে। বইবার ভয়ে সঙ্গে ট্রাইপয়েড নিয়ে যাই না, ফলে হাতে ক্যামেরা ধরে ছবি তুলি তো, তাই সবসময় খেয়াল রাখতে হয় ছবি তোলার সময় হাত নড়ে না যায়! নিঃশ্বাস নিলেও ছবি কেঁপে যাবে বলে প্রত্যেকটা শট নেবার সময় দম বন্ধ করে রাখি।

হাঁ সমেত জলহস্তীটা পুরো ক্যামেরাবন্দি না হওয়া পর্যন্ত দাঁত চেপে কানের লতিতে ছুঁচ ফোটানোর জ্বালা সহ্য করতেই হল। শটটা শেষ হওয়া মাত্র হাতের ঝাপটায় যেটা মাটিতে গিয়ে পড়ল, সেটা একটা বড়সড় মাছির মতোই।

বড় একটা মাছির মতো দেখতে পোকাটা মাটিতে চিৎ হয়ে পড়ে রাগে রী-রী করতে করতে হুল নাড়াচ্ছে। গাইডকে দেখিয়ে বললাম, দ্যাখো তো ওটা কী? আমার আফ্রিকার গাইড তক্ষুনি মাটির ওপর ঝুঁকে পড়ে বলল, সেৎসি ফ্লাই।

– সেৎসি ফ্লাই! মানে, যার কামড় খেলে মানুষ ঘুমিয়ে পড়ে?

– ঘুমোয়, তারপর ঘুম ভাঙে, তারপর আবার ঘুমোয়। তারপর শুধু ঘুমোতেই থাকে। আর ঘুম ভাঙে না।

– সে কী! এক্ষুনি হাসপাতালে নিয়ে চলো আমাকে। ঘুমিয়ে পড়বার আগেই ডাক্তারের কাছে নিয়ে চলো আমাকে।

এবার আমার গাইড একগাল হেসে বলল, সেৎসি মাছি কয়েকদিন ধরে কামড়ালে তবেই কারও ওই সেৎসি ফিভার হয়। একদিন একবারের কামড়ে জ্বর হয় না। শুধু একটু জ্বালা করে।

chokhedekhagolpo (1)

 

২।বুলগেরিয়ার গোলাপ

chokhedekhagolpo (2)

পর্ব ইউরোপের বুলগারিয়ায় কাজানলাক নামে একটা গোলাপরাজ্য আছে। পূসেখানে এত গোলাপ ফোটে যে কিছুক্ষণ যদি গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকো, চোখে শুধু গোলাপফুল দেখবে। লোকে যেমন সর্ষেখেতে সর্ষেফুল দেখে।

দিগন্ত অবধি শুধু গোলাপফুল। হাজারে হাজারে, লাখে লাখে গোলাপ আর গোলাপকুঁড়ি। কোনওটা সদ্য ফুটেছে, কোনওটা ফুটল বলে, কোনওটা দুয়েকদিনেই ফুটবে। সেইসব গোলাপের এমনই রং, এমনই সুগন্ধ যে মনে হয় যেন গোলাপফুলের আসল বর্ণ-গন্ধ এতদিন ভুলেই ছিলাম!

বুলগারিয়ার ওল্ড মাউন্টেন বা পুরনো পর্বতমালা পার হয়ে খুব সকালেই আমি কাজানলাকে গোলাপ উপত্যকায় পৌঁছে গেলাম। সেদিন বুলগারিয়ার গোলাপ উৎসবের দিন। জুনের প্রথম রবিবার। প্রতি বছর এই দিনই গোলাপ উৎসবের তারিখ। এবছর ২০১৩-য় এই উৎসব ১১০ বছরে পড়ল। ভাবো তো, সেই কবে ১৯০৩ সালে এর সূচনা!

গোলাপ উৎসবের দিন গোলাপ উপত্যকায় যে যত পারে গোলাপ তোলে। সারা সকাল চলে এই গোলাপ তোলার পালা। বেলায় শুরু হয় দীর্ঘ রাজপথ জুড়ে গোলাপ উৎসবের বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা। আমাদের বিজয়া দশমীর দিনে রাস্তার দুধারে সুদীর্ঘ বাঁশের বেড়ার মতো এখানেও পথের দুধারে বাঁশের বেড়া। দর্শনার্থীদের ভিড় যাতে ফুটপাত ছেড়ে রাস্তায় না নামতে পারে, তাই এই সতর্কতা। দীর্ঘ শোভাযাত্রা। চলেও দীর্ঘ সময়। বুলগারিয়ার সব অঞ্চলের মানুষ তাদের বিচিত্র সব জীবন্ত সাজসজ্জা, চিত্রপট নিয়ে শোভাযাত্রায় সামিল হয়। দেশ-বিদেশের মানুষ ভিড় করে দেখতে আসে।

দেশের যত রকম খেলাধূলা, নাচ-গান, যুদ্ধযাত্রা, বিজয়গাথা, সব চলেছে পরপর, সুশৃঙ্খলভাবে। সবার আগে আগে চলেছে বছরের রোজকুইন বা গোলাপরানি, গোলাপে গোলাপে সেজে ঠিক যেন একটা পরী।

গোলাপ উৎসবের বর্ণে-গন্ধে-আনন্দে আমার মন ভরে গেছে। এ যেন গোলাপের একটা রূপকথা।

আমরা বড় হয়ে যেন আমাদের পৃথিবীকে কাজানলাকের ভোরবেলাকার গোলাপ-উদ্যানের মতো একটা ফুলের বাগান করে দিতে পারি! গড়ে দিতে পারি একটা উৎসবের পৃথিবী!

chokhedekhagolpo (3)

অলঙ্করণ– যুধাজিৎ সেনগুপ্ত

“স্বর্ণাক্ষর” থেকে প্রকাশিত ‘চোখে দেখা গল্প’ বই থেকে নেয়া। লেখক ও প্রকাশকের অনুমতিক্রমে।

 

 

Leave a Reply