চোখে দেখা গল্প- পুরোনো ডাকাতদলের আস্তানায় ও ভেলায় চড়ে ভারত মহাসাগর-অমরেন্দ্র চক্রবর্তী-শরৎ২০২৩

আগের পর্ব- বন্ধু বানরদল, ট্রেন চড়ল জাহাজে, জুনপুটের সন্তোষ মাঝি, নীলনদের ফেরিওয়ালা, তাঁবুতে রাত্রিবাস

পুরনো ডাকাতদলের আস্তানায়

chokhedekha8604

ফরাসিদেশে একশো বছর আগের একটা পুরনো বাড়ি। তখনকার দিনে মস্ত এই বাড়িটা ছিল ডাকাতের ডেরা। পরে অনেক দিন এ বাড়ি খালি পড়ে ছিল। সেই ডাকাতে-খালিবাড়িতে এখনকার একটা ছোট্ট মেয়ের কবিতা লেখার কথা শোনাব তোমাদের। সেকালের ফরাসি ডাকাতদলের আস্তানায় একালের এক ফরাসি বালিকা-

কবির বাড়িতে তার মা-বাবা ভাইবোনের সঙ্গে দিনটা আমার কী যে আনন্দে কেটেছিল কী বলব!

অনেকখানি জায়গা নিয়ে ছড়ানো ছেটানো সে এক মস্ত তেতলা বাড়ি। ঘর যে কতগুলো, আমি গুণে শেষ করতে পারিনি। কোনও ঘর নিচুতে, কোনও ঘর উঁচুতে, সিঁড়ি বেয়ে এই উঠছি, এই নামছি। তাছাড়া অনেক ঘর চট করে চোখেও পড়ে না। এ-দেয়াল সে-দেয়ালের আড়ালে বা কোথাও অনেক কালের প্রাচীন গাছের ডালপালার পিছনে লুকনো সেসব ঘর।

আমাকে দেখেই বাড়ির দুই বালিকা, দুই বোন এমোলিন আর অ্যানায়েল এগিয়ে এসে ভেতরের ঘরে নিয়ে গেল। এদের মাসি, এঁরাও দুই বোন, প্যারিস থেকে আমাকে তাঁর এই বোনের নিমন্ত্রণে এই ফরাসি গ্রামে নিয়ে এসেছেন। তাঁর দুই ছেলেও মায়ের সঙ্গে তাদের মাসির বাড়ি এসেছে। অনেকদিন পর চার ভাইবোন এক সঙ্গে হয়ে সকলে আনন্দে আহ্লাদে মেতে উঠল। তাদের মায়েরাও তো দুই বোন,তাদেরও আজ  আনন্দের সীমা নেই।

সবাইকে দেখছি,কিন্তু যিনি প্যারিসে গিয়ে আমাকে নেমন্তন্ন করে এসেছেন,দুই মেয়ের সেই বাবাকে তো কোথাও দেখছি না।

একে তো গ্রামীণ পরিবেশ, বাড়িময় আনন্দের ঢেউ,তার ওপর এমোলিন আর অ্যানায়েলের সঙ্গে পরিচিত হয়ে খুব ভালো লাগল।ওরা অনেকক্ষণ ধরে অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল,সেটা কেউ না বলে দিলেও বোঝা যায়।

অ্যানাবেলের বয়েস সাত-আট বছর।সে তার মাসির কাছে আগেই শুনেছে বিদেশি একজন কবিকে নাকি মাসি আজ তাদের বাড়ি নিয়ে আসছেন।সবাই মিলে হই-হুল্লোড়ের মধ্যে থেকে প্রথম সুযোগেই সে আমাকে তার পড়ার ঘরে টেনে নিয়ে গেল। তারপর তার খাতা খুলে চারটে কবিতা শুনিয়ে দিল,সবই তার নতুন লেখা। আমিও ‘শাদা ঘোড়া’-র গল্পের ফরাসি অনুবাদ কিছুটা তাকে পড়ে শোনালাম। ক্ষুদে এই ফরাসি কবির সঙ্গে ইংরিজি ফরাসি জগাখিচুড়ি ভাষায় আবোলতাবোল কত কী যে কথা হল, সে তোমরা বুঝবে না। এক যদি সেখানে থাকতে,আমাদের দু’জনের চোখ-মুখের ভাব, হাত নাড়ানাড়ি দেখতে পেত, তাহলে ঠিক বুঝতে পারতে।

দেওয়ালের গায়ে লাগানো সরু মই বেয়ে অ্যানায়েলের তেতলার এই ঘরে উঠতে হয়। ঘরটা নতুন আর মস্ত বড়। দেওয়ালের গায়ে সদ্য ফোটানো জানলা দিয়ে অনেক দূর পর্যন্ত ঘন বনজঙ্গল দেখা যায়। অ্যানায়েলের সঙ্গে আমার চুক্তি হল,শীতকালে আবার এসে এ-ঘরে বসে আমি অনেক কবিতা লিখব। ও-ও লিখবে। আমরা দুজনে মিলেই কবিতা লিখব।

এর সঙ্গে আমি যোগ করলাম— কবিতা লিখব আর জানলা দিয়ে নীল আকাশ আর সবুজ বন দেখব।

অ্যানায়েল একটুখানি ভুরু কুঁচকে বলল, ‘শীতকালে তো নীল আকাশ পাবে না, আর সবুজ বনও বরফে সাদা হয়ে যাবে।’

নীচে নেমে এসে পুরো বাড়িটাই প্রায় দেখা হয়ে গেল,কিন্তু অ্যানাবেলদের বাবা সোলে সাহেব কোথায়? তাকে কেন দেখছি না? ঘুরতে ঘুরতে বাড়ির পিছন দিকে খোলা জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছি।এখানেই আজ রাতের খাওয়া-দাওয়ার টেবিল সাজানো হয়েছে। আমি ভেবেছি অনেক অতিথি আসবেন,এখন শুনলাম চার ভাইবোন,তাদের মা-মাসি,আমি আর অ্যানায়েলদের বাবা।মাত্র এই ক’জন। কিন্তু অ্যানায়েলদের বাবা কোথায়? একটু দূরে মাটির ওপরে কাঠের বড় একটা তক্তা নড়তে শুরু করেছে। কী ব্যাপার? অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি।

আস্তে আস্তে তক্তার একটা দিক উঁচু হল আর সেই ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে এল মানুষের একটা মাথা, ক্রমে গোটা একটা মানুষ। তার দু-হাতে পুরনোকালের খুব সুন্দর দেখতে দুটি বোতল। তাতে নাকি ফরাসি দেশের কোনও এক পাহাড়ি গ্রামের খুব দামি কালো আঙুর রসের ওয়াইন আছে। অতিথির জন্য মাটির নীচে ঠান্ডা কুঠুরি থেকে তুলে এনেছেন সোলেবু সাহেব। তাঁর হাতে, গালে, মাথার চুলে রং লেগে আছে।

chokhedekha8603

কোথাও সূর্যমুখীর টকটকে হলদে রং, কোথাও ল্যাভেন্ডারের বেগুনি, কোথাও সাদা। বাড়ির কত্তামশাই নাকি সারা দুপুর বাড়ির এখানে ওখানে রং করছিলেন। বাড়িটা তো একশো বছরের পুরনো। মেরামতি, অদল-বদল, রং করারও তাই শেষ নেই! তিনি নিজে প্রায় কুড়ি-পঁচিশ বছর এ-কাজ করছেন,তার আগে তাঁর বাবা-ঠাকুরদাও করেছেন। বাড়ি সারাইয়ের কাজটা কখনও মিস্ত্রির ওপর ছাড়েন না। একে তো শতাব্দীপ্রাচীন বাড়ি, তার ওপর এটা আবার ছিল ডাকাতদের পানভোজনের আস্তানা। খুব নামকরা ডাকাতের দল ছিল এই অঞ্চলে,বিশ শতকের গোড়ার দিকে। তারা ডাকাতি করতে যাবার আগে এখানে বসেই হই-হুল্লোড় করে খানাপিনা সারত।

ফরাসিদেশের সেই ডাকাতে-বাড়িতেই একশো বছর পর একটি ফরাসি বালিকা আমাকে তাঁর লেখা কবিতা শোনাচ্ছে— কথাটা ভাবলেই ছোটদের কবিতা পড়তে আর লিখতে আজও  আমার আনন্দ হয়।

ভেলায় চড়ে ভারত মহাসাগর

chokhedekha8602

একবার কী হল, ভারত মহাসাগরে ক্যাটাম্যারানে চড়ে ভেসে পড়বার সুযোগ পেয়ে গেলাম। ক্যাটাম্যারান কাকে বলে জানো? শক্তপোক্ত একটা ভেলা। কয়েকটা গাছের গুঁড়ি একসঙ্গে বেঁধে তার ওপর একটা মস্ত পাল খাটিয়ে প্রাচীন কাল থেকে সিংহলীরা সমুদ্রে যাবার জন্য ক্যাটাম্যারান বানায়। স্বামী বিবেকানন্দের ‘পরিব্রাজক’ বইয়েও আছে, ‘উড়িষ্যা পর্যন্ত কট্টুমারণ (Catamaran)দেখেছ তো? ভেলা কেমন সমুদ্রেও দূর দূর পর্যন্ত চলে যায় দেখেছ তো?’

আগের রাতে শ্রীলংকার রাজধানী কলম্বো থেকে নেগম্বো এসেছি। রাতেই সমুদ্রতীরের হোটেলের জেনারেল ম্যানেজারকে জিজ্ঞেস করে জানলাম ভোরে হোটেলের সামনের এই সৈকত থেকেই ক্যাটাম্যারানে চড়ে সমুদ্রে যাওয়া যায়। শুনে আমি বললাম,আমি যেতে চাই। হোটেলের একজন কর্মচারীকে দিয়ে পরিচালিকা ক্যাটাম্যারানে আমার সমুদ্রে যাবার কথা সেই রাতেই জেলেপাড়ায় খবর করিয়ে দিলেন।

সমুদ্রের ঢেউ যেখানে এসে আবার ফিরে যাচ্ছে, সেখান থেকে দশ-পনেরো হাত পিছিয়ে বালির ওপর চার কোণে চারটে মশাল জ্বালিয়ে মাঝখানে টেবিল চেয়ার পেতে আমাকে রাতের খাবার দেওয়া হল। সমুদ্রের ঢেউ দেখতে দেখতে প্রথমেই শ্রীলংকার প্রিয় স্যুপ গোটুকোলাকেণ্ডা খাচ্ছি আখের গুড় দিয়ে।সবশেষে নারকোলদুধের পায়েস খেতে খেতে শুনছি সমুদ্রের গর্জন বেড়ে চলেছে।তার মানে,জোয়ার শুরু হয়ে গেছে।

পরদিন খুব ভোরে উঠে সমুদ্রের সামনে এসে দেখি, খুব ছোট ছোট চারটে সিংহলী ছেলেমেয়ে ঝিনুক কুড়োচ্ছে। ক্যাটাম্যারানের কোনও চিহ্নই নেই কোথাও। অনেক দূরে কয়েকজন লোক ঝুঁকে ঝুঁকে কী করছে দেখে এগিয়ে গেলাম। দেখি তারা মোটা মোটা গাছের ডাল বাঁধাবাঁধি করছে।

আমি নিজের নাম বলতেই একজন উঠে দাঁড়িয়ে ইংরেজিতে বললেন,আর আধঘণ্টায় আপনার ক্যাটাম্যারান তৈরি হয়ে যাবে।

বাঁধাবাঁধি হয়ে গেলে তার ওপর পাল বাঁধা হল। আমিও তাতে উঠে বসলাম। সমুদ্রের হাওয়ায় পাল ফুলে উঠছে। ঢেউয়ের দোলায় টাল সামলে সোজা দাঁড়িয়ে দেখছি,চারদিকে শুধু মহাসাগর। মাথার ওপর অসীম নীল আকাশ। আমি যেন কলম্বাসের মতো চলেছি নতুন কোনও দেশ আবিষ্কার করতে। নিদেনপক্ষে অজানা একটা দ্বীপ!

ক্যাটাম্যারানে বসে পায়ের ফাঁক দিয়ে নীচে চোখ পড়তেই দেখি, সমুদ্র আমার সঙ্গে কেবলই খেলতে চাইছে। চারপাশ থেকে অবিরাম ঢেউ ছিটকে উঠে আমাকে সমুদ্র-স্নান করাবেই।মন আনন্দে রোমাঞ্চিত। সত্যিই আমি নেগম্বো সমুদ্রসৈকত থেকে ওই ক্যাটাম্যারান চড়ে মহানন্দে সাগরযাত্রা করছি।

chokhedekha8601

অলঙ্করণ– যুধাজিৎ সেনগুপ্ত

“স্বর্ণাক্ষর” থেকে প্রকাশিত ‘চোখে দেখা গল্প’ বই থেকে নেয়া। লেখক ও প্রকাশকের অনুমতিক্রমে।

 

 

 

Leave a Reply