ভূতের আড্ডা- ভূতের গল্প-শলকেনের ছবি-শেরিডান লে ফানু-অনু- মহাশ্বেতা- জয়ঢাক৪৯-বর্ষা২০১৫

মহাশ্বেতার আগের গল্প- শুকতারার গল্প, খুলির আর্তনাদ(১ম) , খুলির আর্তনাদ(২য়), খুলির আর্তনাদ(৩য়) খুলির আর্তনাদ(৪র্থ) শলকেনের ছবি তুফান ১ম পর্বতুফান ২য় পর্বকালো বিড়াল (অ্যালেন পো)গ্যাব্রিয়েল আর্নেস্টঅতিথিজলসাঘরের ভূত, সুইমিং পুল

bhuteradda4902

এই মুহূর্তে শলকেনের আঁকা একটা অসাধারণ ছবি আমার হাতে রয়েছে। ছবিটা ভাল ভাবেই সংরক্ষিত। আর শলকেনের অধিকাংশ ছবির মত এটারও আপাতদৃষ্টিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল চিত্রকরের আলোর ব্যবহার। ‘আপাতদৃষ্টিতে’ বললাম কারণ আসলে ছবির বিষয়টিতেই ছবির মূল্য, চিত্রকরের কারিগরিতে নয়। ছবির বিষয়টি সাধারণ। প্রাচীন কোন মঠের একটা কক্ষের ভিতরের দৃশ্য। আর তার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে সাদা পোশাক পরা একটি মেয়ে। তার মুখের সামনে আধা-স্বচ্ছ কাপড়ের ঘোমটা। ধর্মীয় পোশাক নয়। তার হাতে একটা বাতি। সেটার টিমটিমে আলোতেই তার শরীর আলোকিত হয়ে উঠেছে। তার মুখে একটা মিটমিটে হাসি। কিন্তু সেই হাসি আনন্দের নয়, বরং মেয়েলী দুষ্টুমির হাসি বলা চলে সেটাকে। আর তার অনেক পেছনে আধো অন্ধকারে দাঁড়িয়ে একটা লোক। ফায়ারপ্লেসের নিভু নিভু আগুনের আলোয় তার চেহারাটা অল্প বোঝা যাচ্ছে। তার মুখে পরিস্ফুট ভয়। তার হাতটা তার কোমরে বাঁধা তরবারির হাতলে, যেন টেনে বার করতে চলেছে। তার পরণে ফ্লেমিশ পোশাক। 

কিছু ছবি দেখলে মনে হয় যে তার বিষয়বস্তু শুধু শিল্পীর কল্পনাই নয়, তার পেছনে আছে বাস্তবেরই কোন ঘটনা। শলকেনের এই ছবিটাও সেরকম। এর দৃশ্যপট, চরিত্র, ঘটনা, সবকিছু কেমন যেন জ্যান্ত। ছবিটাতে এমন কিছু একটা আছে যেটা তার ওপর একটা বাস্তবের ছাপ ফেলে।

অবশ্য সেটা আশ্চর্যের ব্যাপার নয়। আসলে ছবিটাতে একটা অতীব রহস্যময় অথচ সত্যি ঘটনার নিখুঁৎ বিবরণ দিতে চেয়েছিলেন শিল্পী। ছবির কেন্দ্রে যে মেয়েটিকে আমরা দেখতে পাই, সে নাকি জেরার্ড ডোউয়ের ভাইঝি, রোজ ভেল্ডেরকস্টের প্রায় আক্ষরিক প্রতিচ্ছবি। গডফ্রে শলকেনের জীবনে ওই এক রোজ ছাড়া আর কোন নারীর আবির্ভাব ঘটেনি। আমার প্রপিতামহ শলকেনের বন্ধু ছিলেন, আর তার নিজের মুখেই এই ছবির পেছনের ভয়ংকর গল্পটা শুনেছিলেন। আসলে ছবিটা তাঁর থেকেই উপহার হিসেবে পেয়েছিলেন তারপর। সেদিন থেকে ছবিটা ও গল্পটা আমাদের বংশানুক্রমিক সম্পত্তি। প্রথমটার কথা বলেছি, এবার দ্বিতীয়টার কথা বলা যাক।

গডফ্রে শলকেনের চেহারায় বা আচরণে দর্শনীয় কিছুই ছিল না। হ্যাঁ, ছবিটা বরাবরই ভালই আঁকতেন। চিরকালই তার তেলরঙের হাত ভাল। তার কাজের অথচ মানুষ হিসেবে ছিলেন অমার্জিত ও ভোঁতা। তার ছবি এই এত বছর পরেও সমালোচকদের চোখের মণি অথচ তার জীবদ্দশায় তাঁকে সবাই এড়িয়েই চলতেন তাঁর অসামাজিক আচরণের জন্য। তাতে অবশ্য তাঁর জনপ্রিয়তা একটুও কমেনি। ভাবতেই অবাক লাগে যে এই বদমেজাজি, রুক্ষ, জেদি, জনপ্রিয় মানুষটাও একসময় অন্যরকম ছিলেন। তাঁরও আনন্দের সময় ছিল, তাঁর জীবনেও বসন্ত এসেছিল। বা কোন রহস্য-রোমাঞ্চের কাহিনীতে তিনিই ছিলেন নায়ক।

অমর শিল্পী জেরার্ড ডোউএর ছাত্র ছিল শলকেন একসময়। সে তখন এক অনভিজ্ঞ তরুণ। স্বভাবতই ধীর স্থির হওয়া সত্ত্বেও জেরার্ডের ফুটফুটে ভাইঝি রোজকে তার খুব মনে ধরেছিল। রোজ তখনও কিশোরী, সবে সতেরোয় পড়েছে। দেখতে অপূর্ব সুন্দরী। নরম-সরম, বাচ্চাদের মত চেহারা, সোনালী চুল –ওই এলাকার সবচেয়ে রূপবতী মেয়ে সে। ধনী শিল্পীর একমাত্র ভাইঝি, আর শলকেন কিনা চালচুলোহীন এক ছোকরা! বিয়ের কথা মাথায় আসা সত্ত্বেও লজ্জায় ও ভয়ে মাস্টারমশায়কে ঘুণাক্ষরেও কিছু বলতে পারেনি সে। কিন্তু মনে মনে ঠিক করে রেখেছিল, একদিন না একদিন সে বড় হবেনই। পাবে অনেক খ্যাতি, স্বীকৃতি ও অর্থ। সেইদিন মাথা উঁচু করে রোজকে বিয়ের প্রস্তাব দেবে। অতএব দারুণ খাটতে লাগল সে। রাতের পর রাত জেগে আঁকার হাত পাকাতে লাগল। তার সামনে অবশ্য ছিল অনেকগুলো দুঃসহ বছর। কিন্তু সে কথা তো সে আর তখন জানতো না, তাই প্রাণপণে খেটে এক সোনালী ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখত সে। পরবর্তী কালে শিল্পী হিসেবে তার খ্যাতিই দেখিয়ে দেয় যে তার সেই অধ্যাবসায় ও হাড়-ভাঙা খাটুনি বৃথা যায়নি।

তারপর একদিন তার সব স্বপ্ন চুরমার হয়ে গেল এমন রহস্যময়ভাবে যে এখন প্রায় এক শতাব্দি পরে আমার সে কথা বলতে গায়ে কাঁটা দেয়। যাহোক ঘটনাটায় আসা যাক। সেদিন শলকেন একা একাই একটা ছবি আঁকছিল। ডোউ এর অন্যান্য ছাত্রেরা সবাই একে একে বিদায় নিয়েছে। কিন্তু শলকেন আঁকার নেশায় তখনও এঁকে চলেছে। আস্তে আস্তে দিনের আলো পড়ে এল। তখন রঙ ছেড়ে শলকেন পেন্সিল ধরল। সেইন্ট অ্যান্থনি ও শয়তানের একটা স্কেচ অনেকদিনই অসম্পূর্ণ পড়েছিল তার কাছে, সেটাই শেষ করছিল সে মন দিয়ে। অনভিজ্ঞ হওয়া সত্ত্বেও তরুণ শলকেনের মনে ছিল এক শিল্পীসুলভ অসন্তুষ্টি। নিজের প্রতিটি ছবিতেই খুঁৎ খুঁজে পেত সে। এই ছবিটার ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার ঘটছিল। বারবার মেজে, ঘষে, মুছেও সে কিছুতেই ছবিটাকে ঠিক নিখুঁৎ করে তুলতে পারছিল না। তার আঁকার ঘরটা ছিল বিশাল বড় আর সন্ধে নামার ঠিক আগের মুহুর্তে তাতে খেলা করে বেড়াচ্ছিল ভূতুড়ে সব ছায়া। একেবারে নিস্তব্ধ চারিদিক, তার মধ্যে খুটখুট করে কাগজে পেন্সিল বুলিয়ে চলেছিল তরুণ শিল্পী। এর মধ্যে দিয়ে কীকরে যে ঘন্টা দুয়েক কেটে গেল, শলকেনের খেয়ালই রইল না। রাত তখন হল বলে, চারিদিকে তীব্র অন্ধকার। অথচ ছবিটা যেন জেদ করেই আর সুন্দর হতে চায়না। আস্তে আস্তে ধৈর্য হারিয়ে ফেলছিল শলকেন। গায়ে তার সারাদিনের ক্লান্তি, হাতে রঙ ও চারকোলের দাগ, পোশাক ও চুল আলুথালু। বিভ্রান্ত হয়ে এক হাত তার লম্বা চুলে দিয়ে আর অন্য হাতে চারকোল নিয়ে ক্যানভাসের গায়ে কালোকালো দাগ টানছিল সে। অত টানাটানির পর ছবিটা তখন প্রায় নষ্টের মুখে। ফিসফিস করে অভিশাপ দিচ্ছিল শলকেন, “যমে নিক, সবকটাকে যমে নিক।“

এই সময় হঠাৎ পিছন থেকে একটা অচেনা নিঃশ্বাসের শব্দ শুনে ঝট করে ঘুরে দাঁড়াল সে। একজন সম্পূর্ণ অপরিচিত লোক তার ঠিক পিছনে দাঁড়িয়ে তার ছবি আঁকা দেখছিল। ছবি আঁকার নেশায় শলকেন এতক্ষণ পর্যন্ত টেরই পায়নি। কতক্ষণ দেখেছে ভগবান জানে। লোকটির শরীরের একরকম জান্তব শক্তির ছাপ ছিল। তার পরণে ছিল একটা সেকেলে ক্লোক, আর একটা বড়সড় ছুঁচোলো মাথাওয়ালা টুপি। তার মোটা দস্তানায় মোড়া হাতে একটা কালো দামী কাঠের পালিশ করা লাঠি। সেটার মাথায় আবার একটা চকচকে গোল মত কী। একটু ঠাহর করতেই শলকেন বুঝল সেটা সোনার আস্ত একটা তাল, লাঠির মাথায় কারুকার্য করে লাগানো। ক্লোকের আড়ালে তার বুকেও একটা সোনার ভারী শেকলের কিছুটা দেখতে পেল সে। ঘরের টিমটিমে আলোয় এর চেয়ে বেশি কিছু ঠাহর করতে পারল না শলকেন। তার টুপির ছায়ায় মুখটাও ভাল ভাবে দেখা গেল না। তার বয়স বোঝাটাও কঠিন ছিল। কিন্তু টুপির পেছন থেকে ঝাঁকড়া কালো চুলের যে রাশি নামছিল, আর তার শরীরের শক্ত ঋজুতা দেখে এটুকুই বলা যাচ্ছিল যে তার বয়স ষাটের বেশি হবে না।  সে একরকম পর্বতের মতই নিশ্চল ভাবে দাঁড়িয়েছিল শলকেনের পেছনে। লোকটার মধ্যে একটা অবর্ণনীয় অপ্রীতিকর ব্যাপার ছিল যে তাকে দেখে ভক্তির চেয়ে ভয়ই বেশি হচ্ছিল তরুণ শিল্পীর। এরকমভাবে লুকিয়ে লুকিয়ে তার ছবি আঁকা দেখছিল বলে শলকেনের রাগ হলেও সে ভয়ে তা আর প্রকাশ করতে পারলো না। তার চমক কিছুটা ভাঙতে সে অপ্রত্যাশিত এই অতিথিকে বসতে বলল।  জিজ্ঞেস করল সে তার শিক্ষকের সাক্ষাৎ চায় কিনা।

লোকটা যেরকম দাঁড়িয়েছিল সেরকমই রইল। তারপর নিচু ঘড়ঘড়ে গলায় বলল, “ছোকড়া, জেরার্ড ডোউকে গিয়ে জানাও যে রটারড্যাম থেকে মিনহির ভ্যান্ডারহাউজেন তার সাথে দেখা করতে চান। কাল সন্ধ্যাবেলায় কিছু দরকারি বিষয়ে কথা বলবেন তিনি তার সঙ্গে। তার আপত্তি না থাকলে এই ঘরেই হবে কথাবার্তা।“

এই বলেই লোকটা তার উত্তরের অপেক্ষা না করে লম্বা লম্বা পায়ে খটখট আওয়াজ করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। অন্ধকারে রাস্তা হারিয়ে ফেলতে পারে এই ভেবে শলকেন তাড়াতাড়ি দরজার ধারে গিয়ে দাঁড়ালো। সেখান থেকে একটা লম্বা একটানা দালান, তারপরে সদর দরজা। কিন্তু সে দেখার জন্য দাঁড়াতে গিয়ে দেখে কেউ কোত্থাও নেই। দালান একেবারে শুনশান। এটা কীভাবে হয়? শলকেন অনেক ভেবেও বুঝে পেল না কী করে ওইটুকু সময়ের মধ্যে লম্বা দালান পেরিয়ে সদর দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল। বাইরে বেরোবার আর কোন রাস্তা অন্তত শলকেনের জানা নেই। সে কী আদৌ বেরিয়েছে? নাকি অন্ধকারের মধ্যে কোথাও গা ঢাকা দিয়ে রয়েছে চুরি-ডাকাতির মতলবে। দেখতেও তো দস্যুর মত। তার ওপরে ওরকম রাশভারী আচার আচরণ! এ কথা ভেবেই শলকেনের অস্বস্তি  লাগতে লাগল। একা ঘরে থাকতেও ভয় আবার দালানে যাওয়ার মতও অবস্থা রইল না তার। বেশ কিছক্ষণ সেখানে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকবার পর শলকেন অতিকষ্টে সাহস করে ঘর থেকে বের হল। তারপর রুদ্ধশ্বাসে দরজায় তালা দিয়ে, পকেটে চাবিটা নিয়ে কোনদিকে না তাকিয়ে সে দালান ধরে এগিয়ে গেল। কিছুক্ষণ আগেই রহস্যময় মানুষটা হয়তো এখানে ছিল। কিন্তু এখন তার কোন চিহ্নই নেই। কোনমতে শলকেন সদর দরজা অবধি পৌঁছোল। তারপর দরজা খুলে রাস্তায় নেমে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।

“মিনহির ভ্যান্ডারহাউজেন!” সারাদিন ধরে জেরার্ড ডাউ নিজের মনেই নামটা বারবার আওড়াতে লাগলেন। “রটারড্যামের মিনহির ভ্যান্ডারহাউজেন! গতকালই প্রথম লোকটার নাম শুনলাম। কী চান তিনি? আমায় দিয়ে ছবি আঁকাবেন, না কোন গরীব আত্মীয়কে কাজ শিখতে পাঠাবেন আমার কাছে, নাকি নিজের কোন সংগ্রহের মূল্য ঠিক করাতে চান আমায় দিয়ে, নাকি–ধ্যাৎ! না, রটারড্যামে আমার নামে সম্পত্তি রেখে যাওয়ার কেউ নেই। যাই হোক, সন্ধ্যেবেলাই জানা যাবে।”

অবশেষে দিন শেষ হয়ে এল। অন্ধকার নামতে লাগল ধীরে ধীরে। আঁকার ঘরটা আবার আগের দিনের মতই শুনশান হয়ে উঠেছিল। তাতে তখন শুধুই শলকেন ও জেরার্ড ডাউ। তিনি অবশ্য অস্থির ভাবে পায়চারী করছিলেন। মনে তার দুশ্চিন্তা ও প্রতীক্ষার অধিরতা। মাঝে মাঝে অন্যমনস্কভাবে কোন অনুপস্থিত ছাত্রের কাজে চোখ বুলিয়ে নিচ্ছিলেন। আর ঘন ঘন জানালার ধারে গিয়ে দাঁড়িয়ে তার স্টুডিওর পাশের ঘিঞ্জি গলিতে মানুষের চলাচল দেখছিলেন চিন্তিত মুখে।

বেশ কিছুক্ষণ টানা তাকিয়ে থাকবার পর ডাউ শলকেনকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “গডফ্রে, তুমি আমায় ঠিক কী বলেছিলে যেন? স্ট্যাডহাউসের ঘড়িতে ঠিক সাতটা বাজলে ভদ্রলোক আসবেন বলেছেন, তাই তো?”

“না, সেরকম কিছু নয়, স্যার। আসলে গতকাল ঠিক ওই সময়ই উনি এসে উপস্থিত হয়েছিলেন আরকি।” শলকেন ভয়ে ভয়ে উত্তর দিল।

“তাহলে তার আসার সময় তো প্রায় হয়ে এল দেখছি।” পকেট থেকে একটা কমলালেবুর মত বড় ঘড়ি বের করে সময় দেখে বললেন তিনি, “নামটা কী বললে যেন-মিনহির ভ্যান্ডারহাউজেন, তাই না?”

“হ্যাঁ, ঠিক তাই।”

“বয়স্ক ভদ্রলোক, পরণে মূল্যবান পোশাক?” ডাউ চিন্তামগ্ন ভাবে জিজ্ঞেস করে চললেন।

“হ্যাঁ, তাই তো দেখলাম। খুব বয়স্ক নন আবার একেবারে তরুণও নন। প্রৌঢ় বলা চলে। আর তাঁর পোশাক বেশ ধনী ও বিশিষ্ট ব্যক্তির উপযুক্ত বলেই মনে হল দেখে।”

ঠিক সেইসময় বাইরে থেকে স্ট্যাডহাউজের ঘড়িতে সাতটা বেজে উঠল ঢং ঢং করে। শিক্ষক ও ছাত্র দুজনেরই দৃষ্টি গিয়ে পড়ল সদর দরজার ওপর। ঘন্টার শেষ ঘায়ের শব্দটা প্রতিধ্বনিত হয়ে আস্তে আস্তে মিলিয়ে যাওয়ার পরই ডাঊ বলে উঠলেন, “বেশ, তাহলে তাঁর আসার সময় হল, অবশ্য যদি তিনি আদৌ সময়মত আসতে মনস্থ করেন। যদি না করেন, তাহলে গডফ্রে, তুমি তাঁর জন্য অপেক্ষা কোরো। কিন্তু যদি এটা ভ্যাঙ্কার্প বা ওরকম কোন  ফক্কড়বাজের ঠাট্টা হয়? ইস! গডফ্রে, তোমার না একটু সাহস করে কালকেই তাকে ভালভাবে যাচাই করে দেখে নেওয়া উচিৎ ছিল, সে আসলেই সেই ব্যক্তি কিনা। আমি এক ডজন রেনিশ বাজি রেখে বলতে পারি যে একটু টানাটানি করলেই লোকটির স্বরূপ বেরিয়ে পড়ত। দেখতে ঠিক ওই পরিচিত কেউ বোকা বানাতে চলে এসেছে আমাদের। আমরা গরিব শিল্পী, আমাদের বোকা বানিয়ে যে কী আনন্দ এরা পায় তা ঈশ্বর—”

“ওই, উনি আসছেন স্যার।” শলকেন নিচু গলায় বলল। সেই মুহূর্তে দরজার দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে জেরার্ড ডাউ দেখলেন সেই রহস্যময় মূর্তিটিকে, যে আগের দিন আচমকাই শলকেনকে দেখা দিয়েছিল।

মূর্তিটি কেমন যেন একটা অস্বস্তিকারক আভাস দিচ্ছিল যা প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই অভিজ্ঞ শিল্পীকে বুঝিয়ে দিল যে ব্যাপারটা ঠাট্টা বা তামাশা নয়, একেবারেই গুরুতর। সে ব্যক্তিকে ভয় না করলেও অন্তত সম্ভ্রম করে চলা উচিৎ। অতএব ডাউ ভদ্রতার খাতিরে তার টুপিটা  নামিয়ে রেখে বিনীতভাবে তাঁকে অভিবাদন জানিয়ে বসতে বললেন। অতিথি অবজ্ঞার সাথে হাত নাড়িয়ে সেসব স্বীকার করলেন কিন্তু বসলেন না, সেই একভাবে দাঁড়িয়ে রইলেন।

“আমার সৌভাগ্য যে হুজুর আমার বাড়িতে পায়ে ধুলো দিয়েছেন। আপনিই রটারড্যামের মিনহির ভ্যান্ডারহাউজেন নিশ্চয়ই?” জেরার্ড ডাউ আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করলেন অতিথিকে।

 “হ্যাঁ। আমিই।”

“শুনলাম, হুজুর আমার সাথে কথা বলতে চান।” ডাউ বিনীতভাবে বলে চললেন, “আমি কেবল আপনার আদেশের অপেক্ষায়—”

তাকে কথাটা শেষ না করতে দিয়েই আগন্তুক শলকেনকে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করল, “এই ছেলেটি কি বিশ্বাসযোগ্য?”

“নিশ্চয়ই!”

“তাহলে ওকে এই বাক্সটা কাছাকাছি  কোন গয়নার দোকানে অথবা স্যাকরার কাছে নিয়ে গিয়ে এর ভিতরের যাবতীয় সামগ্রীর দাম যাচাই করে নিয়ে আসতে বল। যাচাই করা দামের একটা লিখিত প্রমাণপত্রও যেন ও নিয়ে আসে।”

এই বলে সে একটা ছোট্ট চৌকো বাক্স জেরার্ড ডাউয়ের হাতে দিল। বাক্সটার এরকম আচমকা আগমন আর অত  ছোট্ট বাক্সের ভারী ওজন দেখে ডাঊ আশ্চর্য হয়ে গেলেন। কিন্তু বেশি উচ্চবাচ্য না করে তিনি শলকেনের হাতে সেটা ধরিয়ে দিয়ে তাকে বাইরে পাঠিয়ে দিল।

শলকেন ক্লোকের তলায় বাক্সটাকে সেঁধিয়ে নিয়ে বেরিয়ে গেল। তারপর জোর পায়ে দুটো সরু গলি ছাড়িয়ে অবশেষে একটা বাড়ির সামনে থামল। বাড়িটার একতলায় এক ইহুদি স্যাকরার দোকান। সে দোকানে ঢুকে সেই ইহুদি স্যাকরার নাম ধরে ডাকল।

দোকানের পেছনদিকে অন্ধকার একটা কোণা থেকে খচমচ করে বেরিয়ে এলেন ছোটখাটো একজন ভদ্রলোক। শলকেন ক্লোকের তলা থেকে ভ্যান্ডারহাউজেনের দেওয়া সেই বাক্সটা বের করে তার সামনে রাখল। লন্ঠনের উজ্জ্বল আলোয়ে দেখা গেল গোটা বাক্সটাই সীসের পাতে মোড়া। বাইরের দিকটা বেশ ময়লা। ঘষা খাওয়ার চোটে সাদাটে হয়ে গেছে। সীসের পরতটাকে কিছুটা সরাবার পর তার নিচে একটা শক্ত কাঠের বাক্স পাওয়া গেল। সেটাকে বেশ জোর দিয়ে খোলা হল, তারপর তার মধ্যে কাপড়ের ভাঁজ খুলতে খুলতে শেষ পর্যন্ত যা দেখা গেল তা দেখে দুজনেই চমকে উঠল। বেশ কয়েকটা চকচকে সোনার বাট, আঁটোসাঁটোভাবে সাজানো। স্যাকরা প্রত্যেকটা বাঁটকে খুঁটিয়ে পরীক্ষা করে নিয়ে বলেন, “একেবারে খাঁটি, উৎকৃষ্ট মানের সোনা।”

ভদ্রলোক সোনার পিন্ডগুলোকে ছুঁয়ে, ও ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে একটা অদ্ভুত সুখ পাচ্ছিলেন, আর বারংবার বলে উঠছিলেন, “মেইন গট! মেইন গট! কি নিখুঁত! একফোঁটা ভেজাল নেই! আহ—কি সুন্দর! কি সুন্দর!” কিছুক্ষণের মধ্যে তাঁর পরীক্ষা শেষ হল, তারপর নিজের হাতে একটা প্রমাণপত্র তৈরি করে তাতে সোনাটার দাম তিনি লিখলেন প্রায় বেশ কয়েক হাজার রিক্স-ডলার।

প্রমাণপত্রটা পকেটে পুড়ে, দুর্মূল্য সোনার বাক্সটা বগলে রেখে ক্লোক দিয়ে ঢেকেঢুকে নিয়ে শলকেন ফের স্টুডিয়োয় ফিরে এল। ঘরে ঢুকে দেখে তার শিক্ষক ও আগন্তুকটি ঘনিষ্ঠ ভাবে বসে জরুরি আলোচনা করছেন।  শলকেন ঘর থেকে বাক্স নিয়ে বেরোনো মাত্রই ভ্যান্ডারহাউজেন ডাউকে কয়েকটি কথা বলেছিলেনঃ

“আমি তোমার সাথে কয়েক মিনিটের বেশি আজ সময় কাটাতে পারবো না, অতএব আমি কী কাজে এসেছি সেটা সংক্ষেপে বলে দিই। তুমি রটারড্যাম শহরে কয়েক মাস আগে গিয়েছিলে। তখন সেইন্ট লরেন্স গির্জায় তোমার ভাইঝি, রোজ ভেল্ডারকস্টকে আমি দেখেছিলাম। আমি তাকে বিয়ে করতে চাই। আর আমি যদি তোমায় বিশ্বাস করাতে পারি যে তার জন্য তোমার জোটানো যেকোন পাত্রের চেয়ে আমি বেশি ধনী, তাহলে আশা করছি তুমি আমার এই প্রস্তাব তোমার ভাইঝিকে অভিভাবক হিসেবে জানাবে, ও অনুমোদন করবে। তুমি যদি রাজি থাকো, তাহলে আমাদের আলোচনা এখনই শেষ করবো। আমি হিসেব-নিকেশের জন্য অপেক্ষা করতে পারবো না।”

জেরার্ড ডাউ এই কথা শুনে  আকাশ থেকে পড়লেন, কিন্তু তাঁর বিস্ময় প্রকাশ করার সাহস পেলেন না। এই ভয়টা শুধু সাধারণ বিচক্ষণতা বা ভদ্রতা থেকে নয়। আগন্তুকের সান্নিধ্যে ডাউয়ের একটা অদ্ভুত শিরশিরে অনুভূতি হতে লাগল, যা সাধারণত অজান্তে সহজাত ভীতির বস্তুর উপস্থিতিতে মানুষ অনুভব করে থাকে। একটি অনির্দিষ্ট অথচ শক্তিশালী অনুভূতি।

সেই বিচিত্র আগন্তুকের সঙ্গে সেই টিমটিমে আলোয় একা বসে ডাউ তাঁকে ঠিক চটাতে সাহস পাচ্ছিলেন না। বেশ কয়েকবার উত্তর দিতে গলা খাঁকারি দিয়েও থেমে গেলেন ডাউ। তারপর কিছুক্ষণ মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে বললেন, “আপনি যে প্রস্তাবটি দিলেন, সেটা যে আমার ভাইঝির পক্ষে অত্যন্ত সৌভাগ্যের ও সম্মানজনক, তাতে আমার কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু আপনার একটা কথা ভাবা উচিৎঃ তার নিজেরও একটা মত আছে এ বিষয়ে। আমরা যেটা তার পক্ষে শুভ মনে করি সেটা তার ইচ্ছে নাও হতে পারে।“

“আমাকে ঠকানোর চেষ্টা করো না, শিল্পীমশায়,” ভ্যান্ডারহাউজেন বলল, “তুমি ওর অভিভাবক, তোমার সন্তানতুল্য সে—তুমি তাকে যা বলবে সেটা তার পক্ষে অপরিহার্য। অতএব বিয়ে সে আমায় করবেই, তুমি যদি তাকে জোর দিয়ে বল। বলতে বলতে আগন্তুক ডাউয়ের দিকে এগিয়ে এল, তার চকচকে চোখদুটোর দিকে তাকিয়ে ডাউ মনে মনে কামনা করতে লাগল শলকেন তাড়াতাড়ি ফিরে আসুক।

“আমি তোমার হাতে আমার ধন-সম্পদের একটা প্রমান দিতে চাই, ও তোমার ভাইঝির সঙ্গে অবাধে মেলামেশা করার জন্য তার কিছুটা জামিন হিসেবেও রেখে দিতে চাই। তুমি ও সেই মেয়েটা উপযুক্ত পাত্রের কাছে কত ধন আশা কর? আর কিছুক্ষণের মধ্যেই তার প্রায় পাঁচগুণ মূল্যের সম্পদ নিয়ে ওই ছোকরা ফিরে আসবে। এর পুরোটা আমি কন্যাপণের সাথে তোমার হাতে তুলে দেব, আর তুমি সেই গোটা টাকাটা দিয়ে তোমার রোজের পক্ষে যা ভাল মনে হয় তাই করবে। যতদিন সে বেঁচে থাকবে ততদিন সেটা তার নিজস্ব সম্পত্তি হয়ে থাকবে। এবার কী মনে হয়, শিল্পী মশায়? আমি কি অত্যাধিক উদারতা দেখাচ্ছি না?”

ডাউ মাথা নাড়ল ও মনে মনে স্বীকার করল যে তার ভাইঝির ভাগ্য সত্যিই খুব ভাল, আগন্তুক শুধু ধনীই নয়, যথেষ্ট উদারহস্তও বটে আর এমন প্রস্তাব রোজ রোজ আসে না, অতএব একে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করাটা তাদের পক্ষে বোকামোর কাজ হবে। রোজের বিশেষ নাক-উঁচুমি ছিল না কোন কালেই। তার নিজের নিজস্ব টাকাও ছিল খুব কম, আর তার পুরোটাই তার ভালমানুষ কাকার দেয়া। তাছাড়া তার বাছবিচার করারও বিশেষ কোন অধিকার ছিল না, কারণ পারিবারিক দিক থেকে অভিজাত কোনরকম রক্ত ছিল না তার মধ্যে। আর যে কটা আপত্তির কারণ হতে পারত, সেই যুগের ধর্মানুসারে সেগুলোর কথা জেরার্ড ভেবেও ভাবল না। তবে ভাইঝির কথা ভেবে সে শেষবারের মত আগন্তুককে জিজ্ঞেস করল, “মহাশয়, আপনার প্রস্তাবটি খুবই উদার, কিন্তু আপনার বংশপরিচয় বা সামাজিক প্রতিষ্ঠা এ বিষয়ে কিছুই তো আমি জানিনা, তাই মনে একটা দ্বিধা। আপনি কি এ ব্যাপারে কিছু বলতে পারবেন আমায়?”

আগন্তুক হাল্কা বিরক্তির সঙ্গে উত্তর দিল, “আমার সম্মান নিয়ে তুমি বেশি মাথা ঘামিও না এখন। নিজের যা ইচ্ছে ভেবে নাও। বেশি প্রশ্ন করে আমায় জ্বালিও না। আমি যেটুকু প্রকাশ করতে চাই তার চেয়ে একচুলও বেশি তথ্য তুমি পাবে না। আপাতত আমার কথাই আমার সম্মানের পরিচয় হিসেবে খাটবে। অবশ্য সেটা তোমার ওপর নির্ভর করছে। তুমি যদি আদর্শবান হও তাহলে আমার কথাই তোমার পক্ষে যথেষ্ট, কিন্তু তুমি যদি বৈষয়িক হয়ে থাক, তাহলে তোমাকে যে সোনা দেব তা নিয়েই সন্তুষ্ট থাক।“

“বুড়ো বড়ই খিটখিটে”, ডাউ ভাবল, যা মনে করেছে একে বারে নিয়েই ছাড়বে। “অথচ সব সত্ত্বেও তার প্রস্তাব প্রতাখ্যান করারও আমার কোন কারণ নেই। যাহোক, শুধু শুধু আমি কোন প্রতিশ্রুতি দেব না তাকে।“

“শুধু শুধু তুমি আমায় কোন প্রতিশ্রুতি দেবে না তো?” ভ্যান্ডারহাউজেন অপ্রত্যাশিত ভাবে ডাউয়ের মনের কথাটাই বর্ণে বর্ণে বলে দিল, “কিন্তু আমার মনে হয় যদি পরিস্থিতি সেরকম  হয়ে দাঁড়ায় তুমি তা করতে বাধ্য হবে। ঠিক আছে, আমি তোমায় এখনি দেখিয়ে দেব যে পরিস্থিতি গুরুগম্ভীরই বটে। তোমার কাছে যে সোনাটা আমি রেখে যেতে চাইছি তা যদি যথেষ্ট হয়, আর তুমি যদি না চাও যে এই মুহূর্তে আমি আমার প্রস্তাব ফিরিয়ে নিই, তাহলে আমার চলে যাওয়ার আগে তোমায় একটা চুক্তিতে সই করতে হবে।“

এই বলে সে শিল্পীর হাতে একটা কাগজ ধরিয়ে দিল। তার শর্তের বিষয়বস্তু হল এইঃ “যদি জেরার্ড ডাউ এই চুক্তিতে সই করেন তাহলে তিনি রটারড্যামের উইলকেন ভ্যান্ডারহাউজেনকে তার ভাইঝিকে বিবাহসূত্রে দান করবেন এই দিনের ঠিক এক সপ্তাহ পরে।“ ডাউ মন দিয়ে কথাগুলো বারবার পড়ছিল, এমন সময় শলকেন ঢুকে স্যাকরার লেখা প্রমাণপত্র ও বাক্সটা আগন্তুকের হাতে দিল। তারপর না দাঁড়িয়ে সে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল এমন সময় ভ্যান্ডারহাউজেন গম্ভীর গলায় তাকে থামতে বলল। ডাউয়ের হাতে সে শলকেনের আনা জিনিসগুলো ধরিয়ে দিয়ে চুপ করে তাকে দেখতে লাগল। কিছুক্ষণ পরে ভ্যান্ডারহাউজেনই বলে উঠল, “কি বুঝছো, শিল্পী মশায়, খুশি?”

ডাউ উত্তরে বললেন যে তিনি ভেবে দেখবার জন্য আরেকদিন সময় চান।

তার উত্তরে ভ্যান্ডারহাউজেন উদাসীনভাবে বলল, “আর এক ঘন্টাও তুমি পাবে না।“

“বেশ,” ডাউ নিরুপায় ভাবে উত্তর দিলেন, “আমি রাজি। আপনার শর্ত আমি মেনে নিলাম।”

“তাহলে দেরি কিসের! এখনি সইটা করে দাও!” ভ্যান্ডারহাউজেন বলে উঠল, “আমি বড়ই ক্লান্ত।”

সে এবার একটা বাক্স থেকে লেখার সরঞ্জাম বের করে ডাউকে দিয়ে কাগজটাতে সই করিয়ে নিল।

“এই ছোকরা সাক্ষী থাকুক এই চুক্তির,” ভ্যান্ডারহাউজেন গম্ভীর গলায় আদেশ করল, আর নিজের অজান্তেই শলকেন সাক্ষী হল এমন একটা ঘটনার যা তার থেকে চিরতরে ছিনিয়ে নিল তার প্রিয় রোজ ভেল্ডারকস্টকে।

সই শেষ হলে ভ্যান্ডারহাউজেন তার সব জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়ে একটা ভেতরের পকেটে ভরে নিয়ে, বেরিয়ে যাওয়ার তোড়জোর শুরু করল। কিন্তু যাওয়ার আগে বলে গেল, “আমি কাল রাতে ঠিক নটার সময় তোমার সাথে আবার দেখা করতে আসব। তোমার বাড়িতে আসব, স্টূডিয়োয় নয়, আর রোজের সাথে দেখা করব।”  বলে সে প্রায় হনহন করে ঘর ছেড়ে চলে গেল।

এইবার শলকেন আগের দিনের রহস্যটাকে ভেদ করার জন্য আগেভাগেই জানালার কাছে এসে দাঁড়িয়েছিল, সদর দরজাটায় চোখ রাখবার জন্য। কিন্তু এবারও সে ধাঁধার সমাধান করতে পারল না। খালি তার সন্দেহই বাড়িয়ে তুলল, কারণ সে প্রায় আধঘন্টা একদৃষ্টে দরজার দিকে তাকিয়ে থাকা সত্ত্বেও কাউকে বের হতে দেখলনা রাস্তায়। ব্যাপারটা শুধু চিন্তারই নয়, ভয়েরও বটে। সে আর তার শিক্ষক বাড়ি ফিরতে হাঁটা লাগালো, আর রাস্তায় বিশেষ কথাবার্তা হল না তাদের মধ্যে। দুজনের মাথাই নিজস্ব চিন্তায় ভরা, দুজনেরই অনেক দুশ্চিন্তা ও আশা। কিন্তু শলকেনের চিন্তার প্রিয় বিষয় সুন্দরী রোজ। তাকে ঘিরে তার যত আশা ও সুখের স্বপ্ন, সব যে ধুলিসাৎ হতে চলেছে তা সে ঘুণাক্ষরেও জানতো না। ওদিকে জেরার্ড ডাউও শলকেনের এই ইচ্ছার কথা জানতেন না। আর জেনে থাকলেও তা হয়তো মিনহির ভ্যান্ডারহাউজেনের আদেশের পথে বিশেষ কোন বাধা হয়ে দাঁড়াতো না। সে গরীব ছাত্র, শিক্ষকের দয়ায় নিজেকে তৈরি করছে ভবিষ্যতে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য, আর কোথায় সেই ধনী অভিজাত লোক, যে অবহেলায় একগাদা সোনার বাঁট দিয়ে দিতে পারে এক অজানা লোকের হাতে!

ডাউ কিন্তু এই গোটা প্রস্তাব ও চুক্তির ব্যাপারে রোজকে কিছুই বললেন না। রোজ যে এতে স্বাভাবিক ভাবেই প্রবল আপত্তি জানাবে তা তিনি আঁচ করেছিলেন মনে মনে। কিন্তু শুধু তাই নয়, তাঁর সংকোচের আরেকটা কারণও ছিল- ওই এক ঘন্টায় রোজের ভাবী স্বামীর মুখটাও ভাল করে দেখার সুযোগ পাননি তিনি। দিনের আলোয়ও তাকে চিনতে পারবেন কিনা সন্দেহ আছে। তার ওপর যদি রোজ তার জন্য ঠিক করা সেই পাত্রকে দেখতে চায়, তাহলেও তো চরম বিব্রত হতে হবে কাকাকে। অতএব পরদিন, দুপুরের খাওয়া হয়ে গেলে রোজকে ডেকে পাঠালেন ডাউ। বেশ কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে তারপর তার হাতটা ধরে তার সন্দর, সরল মুখের দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বললেন, “রোজ, মা, তোর এই সুন্দর মুখটাই তোকে অনেক সৌভাগ্য এনে দেবে, দেখিস।”

রোজ লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করল। কিন্তু ডাউ বলে চললেন, “ভাবতেই কেমন যেন লাগে, তোরও একদিন বিয়ে হবে। এই বুড়োকে ছেড়ে চলে যাবি তুই শ্বশুরবাড়ি। বড় একা হয়ে যাবো জানিস। যাই হোক এসব ছোটখাটো ব্যাপার নিয়ে এখন আর সময় নষ্ট করব না। আমার হাতে আর বেশি সময় নেই। তুই এক কাজ কর, বড় ঘরখানা সাজিয়ে রাখ তো দেখি মা! আজ রাত আটটার মধ্যে সব কিছু ফিটফাট চাই, বুঝলি তো। আমার এক বন্ধু আসবেন। আর শোন, সুন্দর সেজে গুজে আসবি কিন্তু তার সামনে, সে যেন একবারের জন্যও না ভেবে বসে আমরা কৃপণ বা গরিব। বাড়ির সম্মান রক্ষা করতে হবে তোকে আজ মা।”

এই কথা বলে ডাউ চলে গেলেন।   

সন্ধে নামতেই জেরার্ড শলকেনকে ডেকে পাঠালেন। শলকেন তখন জিনিসপত্র গুছিয়ে তার নিজের বাড়ির দিকে রওনা হওয়ার তোড়জোড় করছিল। যখন জেরার্ড তাকে রোজ ও ভ্যান্ডারহাউজেনের সাথে নৈশভোজ করার নেমন্তন্ন করলেন তখন সে না বলল না। কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা গিয়ে হাজির হল বাড়ির পুরোন বৈঠকখানায়। সেটা সেই বিশেষ উপলক্ষে সুন্দর করে সাজানো হয়েছিল। ফায়ারপ্লেসে আগুন জ্বলছিল, তার পাশেই রাখা ছিল একটা সেকেলে টেবিল। আগুনের আভায় টেবিলের পালিশ করা কাঠ সোনার মত উজ্জ্বল লাগছিল। তার ওপরেই খাবার পরিবেশন করা হবে আর তার তোড়জোড় চলছিল জোরকদমে। সোজা লাইন করে লম্বা লম্বা কাঠের চেয়ার সাজানো হয়েছিল। দেখতে বনেদি না হলেও সেগুলো ছিল দারুণ আরামদায়ক। আর এই ঘরেই রোজ, তার কাকা ও শলকেন বসেছিল ভ্যান্ডারহাউজেনের অপেক্ষায়। তারা বেশ অধৈর্য হয়ে উঠেছিল।

ন’টা বাজল, আর সঙ্গে সঙ্গেই সদর দরজায় আওয়াজ হল। অতিথি উপস্থিত। দরজা খোলার শব্দ, তারপর বাড়ির ভেতরেই ধীর অথচ জোরালো পদক্ষেপের শব্দ কানে এলো তাদের। তারপর তাদের বৈঠকখানার দরজাটা খুলে গেল আস্তে আস্তে আর ঘরে যে মূর্তি প্রবেশ করল তাকে দেখে সংযমী শিল্পী আঁতকে উঠলেন। রোজ তো প্রায় চিৎকারই করে উঠল ভয়ে। মূর্তিটির চেহারা ও পোশাক মিনহির ভ্যান্ডারহাউজেনের মতো হলেও তার মুখের চেহারা আজ একেবারেই আলাদা। তার গায়ে আজ একটা ছোট কালচে রঙের ক্লোক। পায়ে গাঢ় বেগুনি রঙের মোজা।   জুতোর ওপরে ওই একই বেগুনি রঙের গোলাপ লাগানো। ক্লোকের নিচেও তার পোশাক আশাক ফায়ারপ্লেসের আলোয় দেখে মনে হল ঘোর কালো। হাতে ভারী চামড়ার দস্তানা। এক হাতে লাঠি ও টুপি, ও অন্য হাত খালি। মাথা থেকে নেমে আসছিল সিংহের কেশরের মত একরাশ কোঁকড়া চুল, আর একটা শক্ত গলবন্ধের আড়ালে তার গলা ছিল পুরোপুরি ঢাকা। এই অবধি ঠিকই ছিল, কিন্তু তার মুখখানা! কেমন যেন একটা নীলচে, সীসের মত রঙ ছিল সেটার, যেমনটা অতিমাত্রায় ধাতব ওষুধ খেলে দেখা যায়। তার চোখগুলোর ভেতরে ময়লা সাদাটে ভাগই বেশি ছিল আর তার ভেতর থেকে তার চরিত্রের এক অতীব হিংস্রতা ফুটে উঠছিল। তার মুখের রঙের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ঠোঁটগুলোও ছিল প্রায় কালো। সম্পূর্ণ মুখটাতেই একটা দুর্দান্ত ও ক্রূর ভাব।

তবে খটকা লাগার ব্যাপার ছিল এই যে মানুষটি যতটা সম্ভব নিজেকে ঢেকেঢুকে রাখছিল, শরীরের যতটা কম অংশ দেখানো যায় তার আপ্রাণ চেষ্টা করে চলছিল। ঘরের ভেতরে আগুনের সান্নিধ্যে আসার পরেও সে তার দস্তানা খুলল না।

কিছুক্ষণ সে দরজায় দাঁড়িয়ে থাকার পর জেরার্ড ডাউয়ের চমক ভাঙলো। উঠে দাঁড়িয়ে অতিথিকে আপ্যায়ন করে ভেতরে আনলেন তিনি। অতিথি নীরবে ঘরে পদার্পণ করল। তার নড়াচড়াটাও বেশ অস্বাভাবিক- হাত পা গুলোকে এমনভাবে চালাচ্ছিল যেন অনেককাল সেগুলোর কোন ব্যবহার ঘটেনি। আধঘন্টার বেশি সে থাকল না আর গোটা সময়টাতে দু-একটার বেশি শব্দ উচ্চারণ করল না সে। আর ডাউও কয়েকটা আবশ্যক শিষ্টাচারের বাইরে গেল না। ভ্যান্ডারহাউজেনের উপস্থিতিটা ছিল এতই প্রচন্ড ভীতিকর যে সে আরেকটু এগোলে হয়তো বাড়ির লোকেদের ভয়ে পালানোর উপক্রম হত। কিন্তু এত আতঙ্ক সত্ত্বেও তারা দুটো জিনিস খেয়াল করল। এক, এই আধ ঘন্টায় অতিথির একবারও চোখের পলক পড়েনি আর দুই, তার গোটা শরীরটাই ছিল একটা মূর্তির মত স্থির। কোন নড়াচড়ার আভাস ছিল না কোথাও। এমনকি নিঃশ্বাস প্রঃশ্বাসে বুকের ওঠা নামাটা পর্যন্ত নয়! কিছুক্ষণের মধ্যেই অতিথি, ভয়ার্ত শিল্পী ও বাকিদের থেকে বিদায় নিল। তার চলে যাওয়ার পর সবাই যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস নিল।

রোজ বলল, “কাকাবাবু, কি ভয়ঙ্কর লোকটা! আমি আর কখনো ওনাকে দেখতে চাইনা, পৃথিবীর সমস্ত সোনাদানা দিয়ে লোভ দেখালেও নয়।”

“চুপ! বোকা মেয়ে!”, ডাউ বলে উঠলেন। তাঁর নিজের মনোভাবও যে খুব স্বস্তিকারক ছিল তা নয় কিন্তু তবুও তিনি বলে চললেন, “একথা বোলো না। মানুষকে দেখতে খারাপ হতেই পারে। কিন্তু মনের দিক থেকে ভাল হওয়াটাই জরুরি। সেটা হলে সে আজকালকার এই ছেলেছোকরাদের থেকে দশগুণ ভালো। রোজ, মানুষটি দেখতে সুন্দর নন, কিন্তু ইনি যে শুধু ধনীই নন, দয়ালুও বটে, তার পরিচয় আমি পেয়েছি। তার বদলে ইনি যদি এর দশগুণ বিশ্রিও হতেন, তবুও এই দুটো জিনিসের জন্য তার অসৌন্দর্য আমি ক্ষমা করে দিতে তৈরি থাকতাম।“

“কিন্তু কাকাবাবু, ওনাকে যখন আমি ওরকমভাবে দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম তখন আমার কীসের কথা মনে হল জানেন? রটারড্যামের সেইন্ট লরেন্স গির্জায় ওই কাঠের মূর্তিটার কথা, যেটাকে দেখে আমি প্রতিবার আঁৎকে উঠতাম। কেন জানিনা বারংবার আমার শুধু সেই মুখটাই চোখের সামনে ভেসে উঠছিল।”

জেরার্ড হেসে উঠলেন, কিন্তু মনে মনে রোজের মতে সায় দিলেন। হ্যাঁ, সাদৃশ্য আছে বটে। কিন্তু তিনি মনে মনে এটাও ঠিক করে নিয়েছিলেন যে তাঁর ভাইঝির মনে লোকটির অসৌন্দর্য সম্বন্ধে যদি কোন বিদ্বেষ জন্মে থাকে তাহলে সেটাকে তিনি তাড়াবেন। কিন্তু একটা জিনিস দেখে তিনি মনে মনে খুশি হয়েছিলেন যে ভ্যান্ডের্হাউজেনকে দেখে তার ও শলকেনের মধ্যে যে অনির্দিষ্ট আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছিল, তার আভাসমাত্র রোজের মধ্যে হয়নি।

পরদিন সকাল থেকেই শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে রোজের জন্য দামি দামি উপহার আসতে লাগল। রেশম, মখমল, গয়নাগাঁটি আরও কত কিছু। জেরার্ডদের নামেও একটা প্যাকেট এল। সেটা খুলে জেরার্ড পেলেন একটা আইনি বিয়ের চুক্তি। রটারড্যামের ভিলকেন ভ্যান্ডারহাউজেন ও লেডেনের শিল্পী জেরার্ড ডাউয়ের ভাইঝি, রোজ ভেল্ডারকস্টের বিয়ের চুক্তি। তাতে  আরও ছিল ভ্যান্ডারহাউজেনের তরফ থেকে রোজের নামে একটা মোটা টাকার অঙ্কের সেটেলমেন্টের প্রতিশ্রুতি, যেটা পরবর্তীকালে জেরার্ড ডাউয়ের হাতে এসে পড়বে।

পাত্র ও পাত্রীর প্রথম দেখার এক সপ্তাহের মধ্যেই তাদের বিয়ে হয়ে গেল, আর শলকেনের চোখের সামনে তার এত সাধের রোজকে তার বড়লোক স্বামী ঘটা করে নিয়ে চলে গেল। তারপর দুই কি তিনদিন সে শিল্পশালায় এল না, তারপর ফিরে এসে আবার কাজ শুরু করল। হয়তো আগের মত অত আনন্দের সাথে নয়, কিন্তু আগের চাইতে অনেক বেশি জেদ নিয়ে। আগের ভালবাসার জায়গায় এখন তার মনে শুধুই উচ্চাশা। বেশ কয়েকটা মাস চলে গেল, কিন্তু তাদের হাজার প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও ভাইঝি ও জামাইয়ের কাছ থেকে কোন খবরই পেলেন না ডাউ। তাঁকে দেওয়া ভ্যান্ডারহাউজেনের কাগজপত্র তার হাতেই পড়ে রইল, টাকাগুলো আর গিয়ে আদায় করা হল না।

ভীষণ চিন্তিত হয়ে পড়লেন ডাউ। রটারড্যামে মিনহির ভ্যান্ডারহাউজেনের ঠিকানা তাঁর জানাই ছিল। তাই কিছুদিন দোনামোনা করার পর ঠিক করলেন সেখানে গিয়েই দেখা করবেন আদরের ভাইঝির সাথে। রটারডাম যাওয়া কোনও বিশাল ব্যাপার নয়, একটুখানি রাস্তা। কিন্তু  তাঁর অনুসন্ধান ব্যর্থ হল। রটারড্যামে কেউ কস্মিনকালে মিনহির ভ্যান্ডারহাউজেনের নাম শোনে নি। ডাউ সেখানকার প্রত্যেকটা বাড়িতে খুঁজে দেখলেন, একটাও বাদ দিলেন না, তবুও রোজ অথবা মিনহির ভ্যান্ডারহাউজেন- কারুর কোন খোঁজ পেলেন না। আর কেউ তাঁকে কোনও খবরও দিতে পারল না তাদের সম্বন্ধে। ফলে তিনি লিডেন ফিরে এলেন আগের চেয়ে অনেক উদ্বিগ্ন অবস্থায়। বাড়ি ফিরে এসে একটুও অপেক্ষা না করে তিনি ভ্যান্ডারহাউজেন যে দোকান থেকে রোজকে রটারড্যাম নিয়ে যাওয়ার জন্য সেই বিলাসবহুল ঘোড়ার গাড়ি ভাড়া করেছিলেন সেখানে হানা দিলেন। তাদের গাড়ির চালক তাঁকে একটু একটু করে তাদের সেই যাত্রার কথা অনেকটা বলল। বেশ ধীরে ধীরেই যাচ্ছিল তারা। রটারড্যাম পৌঁছোতে পৌঁছোতে বেশ অনেকটা সন্ধ্যা হয়ে গেছিল। কিন্তু শহরে ঢোকার প্রায় এক মাইল আগে তাদের থেমে যেতে হল। ছুঁচলো দাড়িগোঁফওয়ালা ও সেকেলে পোশাক পরিহিত কয়েকটা লোক একটা ছোট জটলা করে রাস্তা আটকে দাঁড়িয়েছিল। চালক বেশ ভয় ভয়েই ঘোড়াগুলোর রাশ টেনে ধরল। চারিদিকে কোনধরণের জনবসতির চিহ্ন মাত্র ছিল না, সময়টাও খুব একটা ভাল ছিল না। সে মনে মনে ধরেই নিয়েছিল যে লোকগুলোর উদ্দেশ্য ভাল নয়। অবশ্য লোকগুলোর সাথে ছিল একটা বিরাট, পুরোন ধরণের ডুলি আর তাই দেখে তার সেই দুশ্চিন্তা কিছুটা কমল।

তাদের ঘোড়ার গাড়ি দেখেই তারা সঙ্গে সঙ্গে ডুলিটা রাস্তার পাশে নামিয়ে রাখল। তখন বর গাড়ি থেকে নেমে এল ও  কনের হাত ধরে নামিয়ে আনল। মেয়েটি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদেই চলেছিল, কিন্তু বরের তাতে কিছু এসে গেল না। সে তার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে তাকে টেনে নিয়ে চাপিয়ে দিল সেই ডুলিতে আর তার পেছন পেছন নিজেও চড়ে বসল। তারা উঠে গেলে লোকগুলো সেই ডুলি কাঁধে তুলে নিয়ে শহরের দিকে চলে গেল। কিছু দূর যেতে চারিদিক থেকে ঘনিয়ে আসা রাত্রের গাঢ় অন্ধকারের মধ্যে মিলিয়ে গেল। পরে তার গাড়ির মধ্যে সে একটা থলি খুঁজে পেয়েছিল, তাতে আগে ঠিক করা ভাড়ার প্রায় তিনগুণ টাকা ছিল। কিন্তু মিনহির ভ্যান্ডেরহাউজেন আর তার সুন্দরী বউয়ের তারপর কি হল তা সে জানতে পারেনি।

এই রহস্যময় কাহিনী শোনার পর ডাউ দুশ্চিন্তা ও দুঃখে প্রায় ভেঙেই পড়লেন। ভ্যান্ডারহাউজেন যে তাঁর সাথে বিশাল এক প্রতারণা করেছে এতে আর তাঁর কোন সন্দেহ রইল না। কিন্তু কেন, তিনি তা ভেবে পেলেন না। তাঁর মনে হতে লাগল যে যার ওইরকম চেহারা সে শয়তান ছাড়া আর কী হতে পারে। ভাইঝি নিরুদ্দেশ, যত দিন যেতে লাগল, তাঁর দুশ্চিন্তা কিছুই কমল না, বরং বেড়েই চলল। তাঁর এত আদরের ফুটফুটে মেয়েটির সঙ্গ না পেয়ে মনমরা হয়ে পড়ে রইলেন তিনি। এই প্রবল বিষণ্ণতা কাটানোর জন্য তিনি মাঝেমাঝেই শলকেনকে নিজের বাড়িতে ডেকে আনতেন, তার সাথে গল্প করতেন অথবা নৈশভোজ সারতেন এক টেবিলে।   

এরকমই এক সন্ধেয় ডাউ ও শলকেন খাওয়াদাওয়ার পর আগুনের ধারে চুপ করে বসেছিল। হঠাৎ সদর দরজায় একটা জোরাল শব্দ হওয়ায় দুজনে চমকে উঠল। কে যেন প্রাণপণে সেটার গায়ে ধাক্কা লাগিয়ে যাচ্ছে আর গা ঘষে যাচ্ছে। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই একজন চাকর সেখানে দৌড়ে দেখতে গেল কী হচ্ছে। এরপর তারা তার গলার আওয়াজ শুনতে পেল। সে দরজায় ধাক্কা দিতে থাকা ব্যক্তিটিকে প্রশ্ন করছিল। তার উত্তরে ব্যক্তিটি কী বলল সেটা অবশ্য খুব অস্পষ্ট বলে বোঝা গেল না। তার পর হলঘরের দরজা খোলার শব্দ হল, আর মোমবাতির আলো দেখা গেল। একটা দ্রুত পায়ের শব্দ শোনা গেল সিঁড়িতে। শলকেন উঠে গিয়ে ঘরের দরজাটা খুলে দিতে গেল কিন্তু তাকে সেটা করার সুযোগ না দিয়েই দরজাটা ধড়াম করে খুলে রোজ হুটোপাটি করে ঢুকে পড়ল। তার চেহারাপত্র একেবারে অগোছালো, মুখে গভীর ক্লান্তি ও আতঙ্কের ছাপ। কিন্তু সবচেয়ে বেশি অবাক তারা হল তার পোশাক আশাক দেখে। গায়ে তার ছিল একটা মলিন উলের র‍্যাপার, তার গলার কাছ থেকে পা অবধি তাতে ঢাকা। দেখে বড়ই ছেঁড়াখোঁড়া ও পুরোন মনে হল। রোজ কোনরকমে ঘরে ঢুকেই অচেতন হয়ে মাটিতে পড়ে গেল। অনেক কষ্ট করে ডাউ ও শলকেন তার চেতনা ফিরিয়ে আনল। জ্ঞান ফিরতেই সেই ভয়ার্ত কন্ঠে চিৎকার করে উঠল, “আমায় একটু কিছু খেতে দাও তোমরা, একটু পানীয়। তাড়াতাড়ি! নয়তো আমি আর বাঁচব না!”

bhuteradda4903

তার গলার অভাবিক উত্তেজিত স্বরে তারা বিচলিত হয়ে গিয়ে তারা সঙ্গে সঙ্গে তাকে কিছু পানীয় দিল। হাতে পাওয়া মাত্র সে পাগলের মত ঢকঢক করে খেয়ে ফেলল নিমেষের মধ্যে। শেষ হওয়া মাত্র সে আবার চেঁচিয়ে উঠলল,

“খাবার দাও কিছু, খাবার চাই। হায় ভগবান, কিছু একটা খেতে দাও আমায় তোমরা! নয়তো আমি মারা পড়ব!”

টেবিলে তখনও তাদের নৈশভোজের অনেকটা পড়েছিল। শলকেন দৌঁড়ে গিয়ে তার কিছুটা তুলে আনতে গেল। কিন্তু তার কিছু করার আগেই রোজ উঠে এসে খাবারগুলোর ওপর প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ে দুর্ভিক্ষপীড়িতের মত খেতে লাগল। তার ক্ষিদে কিছুটা মিটলে সে অঝোরে কান্না শুরু করল। সে কান্না লজ্জার না অন্য কিছুর সেটা বোঝা গেল না।

“গির্জার কোন পাদ্রিকে ডেকে আনো, এক্ষুণি! যতক্ষণ সে না আ্সে আমার বিপদ কাটবে না। তাড়াতাড়ি ডেকে আনো!”

জেরার্ড ডাউ সঙ্গে সঙ্গে একজন বেয়ারাকে পাঠিয়ে দিল পাদ্রির খোঁজে। তারপর সে ভাইঝীকে তার ঘরে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দিল। বলল সে অনেক দূর থেকে এসেছে, এবার একটু বিশ্রাম করুক। কিন্তু রোজ নারাজ, সে কিছুতেই যেতে চাইল না। অবশেষে তার অনুমতি পাওয়া গেল এই শর্তে যে তাকে আমরা কোনমতেই একা ছেঁড়ে যেতে পারব না। সর্বক্ষণ অন্তত একজনকে তার সাথে থাকতেই হবে।

“উফ! পাদ্রি এলে আমি বেঁচে যাবো। জীবিত ও মৃতের এক হওয়া কখনই উচিৎ নয়। স্বয়ং ভগবানের এতে নিষেধ আছে।“

এইটুকু বলেই সে তার শরীর ছেড়ে দিল। ডাউ ও শলকেন তাকে কোনমতে ধরে ধরে তাকে ঘরে নিয়ে যেতে তৈরি হল। সে ক্ষণে ক্ষণে কেঁদে উঠছিল। তারপর একসময় সে আবার বলল “কাকাবাবু, আমায় ছেড়ে যেও না তোমরা। এক মুহূর্তের জন্যও নয়। যদি যাও তাহলে চিরটাকালের মত আমায় হারিয়ে ফেলবে।”

জেরার্ড ডাউয়ের ঘরে ঢোকার ঠিক আগে একটা বেশ বড়সড় ঘরে গিয়ে ঢুকল তারা। শলকেন ও ডাউ দু’জনের হাতেই একটা করে মোমবাতি ছিল, অতএব ঘরের চারিদিক অল্প হলেও আলোকিত হয়ে উঠেছিল। এই বড় ঘরটাতে ঢুকেই রোজ হঠাৎ থেমে গেল আর ফিসফিস করে যা বলল তাতে তারা ভয়ে কাঠ হয়ে গেল—

“ভগবান! সে চলে এসেছে! সে এখানেই আছে! ওই তো! ওই তো দেখো ওই তো দাঁড়িয়ে আছে!”

এই বলে সে ভিতরের ঘরের দিকে আঙুল তুলে দেখাল। শলকেনের মনে হল যে সে একটা ছায়ামূর্তিকে সেই ঘরের মধ্যে ভেসে ভেসে ঢুকতে দেখল। কোমর থেকে তলোয়ারটা টেনে হাতে তুলে নিয়ে, আর ঘরটাকে আরও বেশি আলোকিত করবার জন্য মোমবাতিটা উঁচিয়ে সে সেই ঘরটাতে ঢুকে পড়ল। কিন্তু কোথাও কিচ্ছু নেই। ঘরটা একেবারেই ফাঁকা। অথচ সে প্রায় স্পষ্টভাবেই ঘরে কাউকে একটা ঢুকতে দেখেছিল। হঠাৎ ভয় ও উৎকন্ঠার একটা স্রোত বয়ে গেল তার শরীর জুড়ে। সে ঘামতে লাগল। ঠিক তখনি রোজের গলা শুনতে পেল সে। অত্যন্ত আতঙ্কিত ও ব্যাথিত স্বরে সে তাদের তাকে না ছেড়ে যেতে অনুরোধ করছিল। আর শান্ত থাকতে পারল না শলকেন।

“আমি দেখেছি ওকে,” রোজ বলছিল, “ও এইখানেই আছে। আমাকে ও বোকা বানাতে পারবে না। আমি ওকে চিনি। আমার কাছাকাছিই আছে, আমার সাথেই আছে, এই ঘরের মধ্যেই আছে। ভগবানের দিব্যি, আমাকে এই বিপদের হাত থেকে বাঁচাতে চাইলে আমায় এক নিমেষের জন্যও একা ছেড়ে যেও না।”

শেষমেষ তারা দুজন মিলে রোজকে বিছানায় শুতে রাজি করল। কিন্তু শুয়ে থেকেও সে তাদের দুজনকে প্রাণপণে সেখানে তার সাথে থাকতে অনুরোধ করল। মাঝে মাঝে অদ্ভুত, দুর্বোধ্য কিছু কথাও বলছিল সে – “জীবিত ও মৃত কখনও এক হতে পারে না। ভগবানের বারণ আছে এতে।” তারপর, “যে জেগে আছে, তাকে ঘুম পাড়িয়ে দাও, স্বপ্নচরকে ঘুম দাও।”

পাদ্রি আসা অবধি সে এইরকম রহস্যময়, বিচ্ছিন্ন কথা বলতেই থাকল। জেরার্ড ডাউ আশঙ্কা করছিলেন যে কোন এক সাংঘাতিক মানসিক আঘাতে মেয়েটার বুদ্ধি লোপ পেতে বসেছে। তার এত রাত্রে আসা, পোশাক আশাকের এই দুরবস্থা, পাগলের মত আচরণ দেখে ডাউয়ের মনে হচ্ছিল সে পাগলাগারদ বা সেরকম কোন জায়গা থেকে পালিয়ে এসেছে, আর ভয় পাচ্ছিল তাকে ধরবার জন্য কেউ না কেউ উপস্থিত হবে। সে ঠিক করল পাদ্রির কথাবার্তায় ভাইঝির মাথাটা একটু ঠিক হলেই সে ডাক্তার ডেকে আনবে। আর তা হওয়া অবধি সে তাকে আর কোন প্রশ্নই করতে সাহস পেল না পাছে কোন বেদনাদায়ক স্মৃতি মনে পড়ে গিয়ে সে আরও ভেঙে পড়ে। কিছুক্ষণের মধ্যেই পাদ্রি চলে এল। বেশ বয়স্ক এক ভদ্রলোক, মুখে ঈশ্বরভক্তির ছাপ। ডাউ এঁকে খুবই সম্মান করতেন। তিনি ছিলেন এক নাম করা তার্কিক, কিন্তু মানুষ হিসেবে ভালবাসার থেকে তর্কের প্রতিপক্ষ হিসেবে ভয়টাই অন্য লোকের তরফ থেকে তার ভাগ্যে বেশি পড়ত। তাঁর নীতিবোধ পবিত্র, মস্তিষ্ক তুখোড়, ও হৃদয়টি বরফের মতই ঠান্ডা। তিনি দরজা দিয়ে বাইরের ঘরে ঢুকলেন। ঢোকামাত্র রোজ তাঁকে তার জন্য প্রার্থনা করতে অনুরোধ করল।

          এর পরে যে ঘটনাটা ঘটল, সেটাকে বোধগম্য করতে হলে সেই স্থানে প্রত্যেক ব্যক্তির আপাত অবস্থান আমাকে বিশদে বোঝাতে হবে। বৃদ্ধ পাদ্রি ও শলকেন ছিল বাইরের ঘরে, রোজ শুয়েছিল ভিতরের ঘরে, তার দরজা খোলা ছিল। তার খাটের ধারে তার অনুরোধে দাঁড়িয়েছিল তার কাকা। শোবার ঘরটাতে একটা মোমবাতি জ্বলছিল। এবার পাদ্রি গলা খাঁকারি দিয়ে তার প্রার্থনা শুরু করার তোড়জোড় করতে লাগলেন। ওমনি হাওয়ার একটা অপ্রত্যাশিত ঝাপটায় রোজের ঘরে জ্বলতে থাকা মোমবাতিটিকে নিভিয়ে দিল। সে তখন ভয়ার্ত গলায় বলে উঠল,

“গডফ্রে, আরেকটা মোমবাতি নিয়ে এস। এই অন্ধকারটা মোটেই ভাল নয়!”

জেরার্ড ডাউ তখন হঠাৎ রোজের বারংবার অনুরোধটা ভুলে গিয়ে অনেকটা ঝোঁকের বশেই ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন মোমবাতি আনবার জন্য।

“হায় ভগবান, কাকাবাবু যেও না! আমায় ছেড়ে যেও না!” সে চেঁচিয়ে উঠল। আর একই সঙ্গে সে খাট থেকে লাফিয়ে নেমে পড়ল আর তার পিছনে ধেয়ে এল তার হাত ধরে তাকে রুখবার জন্য। কিন্তু একটু দেরিই বোধহয় হয়ে গেছিল। সে ঘরের চৌকাঠ পেরোনো মাত্রই, ঘরের দরজাটা ধরাম করে বন্ধ হয়ে গেল। শলকেন তক্ষুণি দৌড়ে দরজার কাছে গিয়ে ঠেলতে লাগল। ডাউও তার বিস্ময় কাটিয়ে হাত লাগাল, কিন্তু দু’জন সর্বশক্তি প্রয়োগ করেও দরজাটাকে এক চুলও সরাতে পারল না। চিৎকারের পর চিৎকার ভেসে আসতে লাগল দরজার ওপাশ থেকে। ভয়ঙ্কর আতঙ্ক, ত্রাসের চিৎকার। শলকেন ও ডাউ ঠেলতেই লাগল, কিন্তু কিছুতেই কিছু আর হল না। ভিতর থেকে লড়াই বা হাতাহাতির কোন আওয়াজ আসছিল না, শুধু রোজের ভয়ার্ত চিৎকার যেগুলো ক্রমে আরও জোরালো হয়ে উঠছিল। সেইসঙ্গেই তারা শুনতে পেল ভারি জানালার ছিটিকিনি খোলার আওয়াজ, তারপর জানলাটার ঘষে ঘষে খুলে যাওয়ার শব্দ। তারপর শেষ একটা চিৎকার, ব্যথায় পরিপুর্ণ একটা চিৎকার, আগেরগুলোর থেকে অনেক বেশিক্ষণ ধরে চলল সেটা। কোন মানুষ যে ওইরকম চিৎকার করতে সক্ষম তা ওটা না শুনলে হয়তো বিশ্বাসই হত না তাদের। তারপরেই একটা মৃত্যুর মত নিস্তব্ধতা নেমে এল গোটা ঘরে। খাটের ওপর থেকে জানালার দিকে চলে যাওয়া হাল্কা দুটো পায়ের আওয়াজ শোনা গেল, আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই দরজাটা খুলে গেল। অন্যদিক থেকে যারা চাপ দিয়ে যাচ্ছিল, তারা প্রায় মাটিতেই পড়ে গেল হুড়মুড়িয়ে। জানালাটা হাট করে খোলা ছিল, শলকেন লাফিয়ে উঠে জানালা দিয়ে উঁকি মেরে দেখল নিচের রাস্তা ও খালের দিকে। একটা কেউ ছিল না সেখানে। শুধু তার মনে হল সে দেখল খালের জলে একের পর এক বিশাল গোলাকৃতি এলাকা জুড়ে ঢেউ উঠে যাচ্ছে। যেন সেখানে খানিকক্ষণ আগেই ভারি কিছু একটা পড়েছে।

রোজকে আর কখনও খুঁজে পাওয়া যায়নি। আর তার সেই রহস্যময় স্বামীরও কোন খবর পাওয়া যায়নি। এই জটিল রহস্যের জালের ওপর আলোকপাত করার মত কোন সন্ধানই আর কেউ পায়নি। কিন্তু একটা ঘটনা ঘটেছিল, যা হয়তো যৌক্তিক ভাবে বিশ্বাস করা যায় না, কিন্তু তা শলকেনের ওপর একটা দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব বিস্তার করেছিল। এইসব ঘটনার অনেকদিন পরে শলকেন একবার রটারড্যামের গেছিল। তখন সে অনেক দূরে থাকত। কিছুদিন আগেই তার বাবা মারা গেছিলেন আর রটারড্যামের গির্জাতেই তাঁকে সমাধিস্ত করা হবে, এমন কথা হয়েছিল। গ্রাম থেকে গির্জায় যাওয়ার জন্য সমাধিযাত্রীদের বেশ অনেকটা রাস্তাই হাঁটতে হয়েছিল, আর খুব বেশি লোকও আসেনি। শলকেন দুপুরের দিকে এসে গির্জায় বসে তাঁদের অপেক্ষা করছিল।

আস্তে আস্তে সন্ধে হয়ে এল কিন্তু সমাধিযাত্রীদের তখনও কোনও সন্ধান নেই।শলকেন হাঁটতে হাঁটতে গির্জার ভিতরে ঢুকে গেল। সমাধিযাত্রাটির বিজ্ঞপ্তি আগে থেকেই দিয়ে দেওয়া হয়েছিল। যে সমাধিকক্ষে দেহটা রাখবার কথা সেটাও খুলে রাখা হয়েছিল। গির্জার তত্ত্বাবধায়ক ভদ্রলোক তাকে সেখানে ঘোরাঘুরি করতে দেখে তাকে তাঁর সঙ্গে চা পান করবার  আমন্ত্রণ জানালেন। সেটা শীতকাল। প্রতিবছরের মত সে বছরও তিনি ফায়ারপ্লেসে একটা বড়সড় আগুন জ্বালিয়ে বসেছিলেন। ঘরের অন্য দিকে একটা সিঁড়ি, সেটা দিয়েই সমাধিকক্ষে যেতে হয়। শলকেন ও তত্ত্বাবধায়ক ভদ্রলোক আগুনের ধারে বসল। তাঁর সাথে কথা বলবার বেশ কয়েকটা ব্যর্থ প্রচেষ্টার পর, শেষে হাল ছেড়ে দিয়ে নিজের পাইপটা জ্বালিয়ে ফুঁকতে লাগল।

অনেক দুঃখ, দুশ্চিন্তা ও ভাবনা সত্ত্বেও শলকেন আগুনের ধারে বসে সে আস্তে আস্তে ঘুমে ঢলে পড়েছিল। তার ঘুম ভাঙল ঘাড়ে একটা হালকা ঠেলা খেয়ে। প্রথমে সে মনে করল গির্জার তত্ত্বাবধায়ক ভদ্রলোকই তাকে ডেকে তুলছেন। কিন্তু এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখল ভদ্রলোক আর ঘরে নেই। সে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল। তারপর চোখ কচলে তাকাতে দেখে একটা মেয়ের অস্পষ্ট মূর্তি দাঁড়িয়ে রয়েছে। গায়ে সাদা রঙের একটা পোশাক। তার কিছুটা তার মুখের সামনে ঘোমটার মত ঝুলছে। তার হাতে একটা জ্বলন্ত লম্ফ। সে তার থেকে আস্তে আস্তে দূরে চলে জ্বাচ্ছিল, ঘরের কোণে সেই সিঁড়িগুলোর দিকে।

শলকেনের একটু ভয় ভয় লাগল মেয়েটিকে দেখে, কিন্তু তাকে অনুসরণ করবার একটা অদম্য ইচ্ছাও তার হতে লাগল একই সঙ্গে। শেষ পর্যন্ত সে তার পিছু পিছু যেতে লাগল। কিন্তু কিছুটা নেমে যাওয়ার পর মেয়েটি হঠাৎ থেমে গেল। শলকেনও সিড়িগুলোর মাথায় এসে দাঁড়িয়ে পড়ল। মেয়েটা তার লম্ফটা মুখের কাছে এনে শলকেনের দিকে ঘুড়ে দাঁড়ালো। লম্ফের আলোয় শলকেন লক্ষ্য করল যে মেয়েটার মুখটা অবিকল তার প্রথম ভালবাসা, রোজ ভেল্ডারকস্টের মত।

bhuteradda4904

সেই মুখে কোন ভয়ের বা দুঃখের ছাপ ছিল না। তার বদলে তার মুখে ছিল সেই প্রাণখোলা হাসিটা যা অল্পবয়সে শলকেনের প্রাণ জয় করে নিয়েছিল। বিস্ময় ও কৌতুহলের এক অদ্ভুত মিশ্রণ তাকে মেয়েটার সেই ছায়ামূর্তির পিছন পিছন নিয়ে চলল।  সে সিঁড়ি বেয়ে নেমে গেল, শলকেন তাকে অনুসরণ করল। তারপর বাঁদিকে ঘুরে গিয়ে, একটা সরু গলিমত দিয়ে কিছুটা হেঁটে গিয়ে তারা যেখানে পৌঁছুলো, সেখানে ঢুকে শলকেন অবাক হয়ে গেল। একটা সেকেলে ডাচ শোওয়ার ঘর। ঠিক যেমনটার ছবি জেরার্ড ডাউ এক সময় এঁকে বিখ্যাত হয়েছিল। চারিদিকে অনেক দামি দামি অ্যান্টিক আসবাবপত্র ছড়ান। ঘরের এককোণে একটা বিশাল পালংক, তার চারিদিকে মোটা ভারী কালো কাপড়ের পর্দা ঝুলছে।

এই সময় মূর্তিটি বারংবার তারদিকে ফিরে তাকাতে লাগল আর আস্তে আস্তে পালঙ্কটার দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। বিছানার একদম কাছে গিয়ে সে পর্দাগুলো টেনে সরিয়ে দিল, আর তার লম্ফের আলোয় আতঙ্কিত শলকেন দেখল, বিছানায় সোজা হয়ে বসে আছে ভ্যান্ডারহাউজেনের সেই ভয়ঙ্কর মূর্তি! তার মুখের ভাবে ভয়ঙ্কর এক ক্রোধ প্রকাশ পাচ্ছিল। তাকে দেখা মাত্রই শলকেন অজ্ঞান হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। আর সেখানেই সে পড়ে রইল পরদিন সকাল অবধি। কিছু লোক সমাধিকক্ষের দরজা বন্ধ করতে এসে তাকে খুঁজে পেল সেই অবস্থায়। সে একটা বেশ বড়সড় কক্ষে পড়ে ছিল যেখানে তার আগে বেশ অনেককাল কেউ পদার্পণই করেনি। তার পাশেই ছিল কয়েকটা পিলারের ওপর দাঁড় করানো একটা বিরাট কফিন। পোকা-মাকড়ের আক্রমণ থেকে বাঁচাতেই এমন ব্যবস্থা।

বুড়োবয়সে মৃত্যু অবধি সেইরাত্রে সে যা দেখেছিল তা বিশ্বাস করে গেছিল শলকেন। আর সেই ঘটনা তার ওপরে যেরকম প্রভাব বিস্তার করেছিল তার একটা চিহ্ন হিসেবে রেখে গেছিল স্মৃতি থেকে আঁকা একটা ছবি। সেই দৃশ্যটা দেখার কিছুদিন পরই সে সেই ছবিখানি এঁকেছিল। ছবিটাতে শলকেনের সেইসব বিশেষত্বগুলো সবই ছিল যেগুলো পরে তার ছবি এত বিখ্যাত করে তোলে। কিন্তু তার সাথে আরেকটা বস্তুও ছিল যার জন্য সেই ছবিটিকে আমি আরও মূল্যবান গণ্য করি। ছবিটিতে ছিল সেই রোজ ভেল্ডারকস্ট, রহস্যময় ভাবে উধাও হয়ে যাওয়ার পর যাকে আর কখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি।

ছবিঃ মৌসুমী

জয়ঢাকের বিপুল ভূতের আড্ডা

Leave a Reply